লোহিত সাগরের আতঙ্ক – মানবেন্দ্র পাল

লোহিত সাগরের আতঙ্ক - মানবেন্দ্র পাল

০১.

হ্যারিকাকু ও তাঁর ঘর

চিঠিখানা পেয়ে বাপ্পা বেশ একটু অবাক হয়ে গেল। যদিও সে ভাবছিল খুব শিগগির একদিন কলকাতায় গিয়ে হ্যারিকাকুর সঙ্গে দেখা করে আসবে, তা বলে কল্পনাও করতে পারেনি হ্যারিকাকু মনে করে তাকে চিঠি দেবেন।

তার আরও যেটা আশ্চর্য ঠেকল তা হচ্ছে চিঠিটা আসছে কলকাতা থেকে নয়, সুদূর সাঁওতাল পরগনার জগদীশপুর থেকে।

চিঠিখানা ইংরিজিতে লেখা। তার বাংলা তর্জমা এইরকম—

মাই ডিয়ার ইয়ং ফ্রেন্ডস্
আশ্চর্য হয়ো না এই খবর জেনে যে আমি আর কলকাতাতে নেই। বহুকালের বাস ছেড়ে চিরদিনের মতো এখানে চলে এসেছি। এখানে আসার জন্য আমার বন্ধু এখানকার পাদ্রী ফাদার শ্যামুয়েল অনেক দিন থেকে বলছিলেন। এখানে এসে থাকলেই আমি নাকি আমার গবেষণা, ভ্রষ্ট আত্মার অনুসন্ধান প্রভৃতি যা আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এবং যা আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন, তোমরা দুজন জানতে তার সিদ্ধি ঘটবে।…

সিদ্ধি কতদূর লাভ করতে পেরেছি তা আমি জানি না। তবে এখানে এসে আমি কেমন ভীত হয়ে পড়েছি। কেবলই মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই কি যেন ঘটবে–যা শুভ ফলপ্রসূ নয়। আর তা আমি চাইওনি কখনো। আমি যা চেয়েছিলাম, তা তো তোমরা জানোই অলৌকিক এক রহস্যের যবনিকা উত্তোলন। তার জন্যে আমি প্রায় সারাজীবন কিনা করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাকে এখানেই রুগ্ন, ভগ্নস্বাস্থ্যে চলে আসতে হলো।

আমি চাই তোমরা যত শীঘ্র পারো এখানে একদিনের জন্যেও চলে এসো। আমি বড্ড একা…।

স্টেশনে নেমে পুরনো চার্চ কিংবা ফাদার শ্যামুয়েলের কোয়ার্টার বললেই টাঙ্গা তোমাদের এখানে পৌঁছে দেবে। আমি আবার বলছি–আমি ভীত। তোমাদের আসা একান্ত দরকার।

আশা করছি তোমরা ভালো আছ।
–তোমাদের হ্যারিকাকু

কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা চিঠিখানা। ওটা পড়ে বাপ্পা ঠিক বুঝতে পারল না। তার মতো মানুষ হঠাৎ কিসের জন্যে এত ভীত হয়ে পড়লেন? চিঠিটার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। চিঠির মাথায় আর শেষে দু-জায়গায় দুটি ক্রুস চিহ্ন।

বাপ্পা এতে অবাক হয়নি। কেননা, কলকাতায় হ্যারিকাকুর বাড়িতেও এই ক্রুসচিহ্ন দেখেছিল। দেওয়ালে, টেবিলে, এমনকি মাথার কাছেও ক্রুস। তিনি যে খুব ধার্মিক প্রকৃতির, যিশুর ওপর তার যে পরম নির্ভরতা বাপ্পা ছেলেমানুষ হলেও তা বুঝতে পারত। আর তার এই ভক্তি যে মোটেই লোকদেখানো নয়, আন্তরিক, সেটা বলে দেবার অপেক্ষা রাখত না। আর সে কারণেই বাপ্পা, রঞ্জু তাঁকে ভক্তি করত।

তবে হ্যারিকাকুর ওপর বাপ্পাদের যে আকর্ষণ তা কিন্তু মোটেই তার ধর্মপ্রাণতার জন্যে নয়, অন্য কারণ ছিল।

তাহলে সব ব্যাপারটা খুলে বলা যাক।

হ্যারিকাকুর ভালো নাম হ্যারোল্ড ইভেন্স। থাকতেন কলকাতার ইলিয়ট রোডের একটা অপরিচ্ছন্ন গলিতে।

বাপ্পা মাঝে মাঝেই দেশের বাড়ি থেকে কলকাতায় তার বন্ধু রঞ্জুর বাড়ি বেড়াতে আসত। ওদের বেশ বড়োসড়ো একটা লাইব্রেরি আছে। সেখানে বিদেশী গোয়েন্দা কিংবা অলৌকিক কাহিনির নানা বই। এইসব বই পড়ার লোভেই বাপ্পা ছুটিছাটায় কিছুদিন কলকাতায় এসে থেকে যেত।

রঞ্জুই ওকে হ্যারিকাকুর কথা বলেছিল।

একদিন নিয়ে যাব। দেখবি কী অদ্ভুত মানুষ!

ভূত আর অদ্ভুত এই দুটি জিনিসের ওপর মানুষের চিরদিনের আগ্রহ। বাপ্পার মতো একজন স্পিরিটেড ছেলের অ্যাডভেঞ্চারে তো আকর্ষণ থাকবেই।

তারপর একদিন রঞ্জু বাপ্পাকে নিয়ে এল হ্যারিকাকুর ইলিয়ট রোডের বাড়িতে।

বাড়িটা কিন্তু ইলিয়ট রোডের ওপরে নয়, একটা সরু গলির মধ্যে। গলিটাও নোংরা। সেখানে কোনো ভদ্র অভিজাত মানুষ বাস করতে পারে না।

যে বাড়িটার সামনে এসে ওরা দাঁড়াল সেটা একটা তিনতলা বাড়ি। ইটগুলো যেন ছাল চামড়া ছাড়ানো কঙ্কালের মতো হাসছে।

রঞ্জু আর বাপ্পা ভেতরে ঢুকল। একতলার ঘরগুলো গুদামঘর। চুনের গন্ধ।

দোতলায় উঠে এল। এখানে কয়েক ঘর ভাড়াটে আছে। বাপ্পা এক নজর দেখে নিল। তিনতলায় উঠতে উঠতে বলল, ভাড়াটেরা সবাই বোধহয় পুরুষ মানুষ। অন্তত যাকে বলে গেরস্ত তা নয়।

রঞ্জু বলল, কি করে বুঝলি?

প্রথমত, ঘরগুলোয় লোকে বাস করে কিন্তু দরজার সামনে জঞ্জাল জমে রয়েছে। ঝট পড়ে না। মেয়েরা থাকলে এরকম হতো না। দ্বিতীয়ত, বারান্দার তারে প্যান্ট, শার্ট লুঙ্গি, পা-জামা শুকোচ্ছে, কিন্তু কোনো শাড়ি, ব্লাউজ বা ছোটোদের জামাপ্যান্ট নেই।

রঞ্জু কিছু বলল না।

সিঁড়ি অন্ধকার। কোথায় পা ফেলছে বাপ্পা নিজেও তা জানে না। শুধু অন্ধের মতো রঞ্জুর পিছু পিছু উঠছিল।

অবশেষে তিনতলায় এসে হ্যারিকাকুর ঘর।

পাশাপাশি দুটো দরজা। দুটি দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ। রঞ্জু যে দরজাটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল তার গায়ে মস্ত ক্রুস আঁকা।

রঞ্জু আস্তে আস্তে কড়া নাড়ল। সাড়া পাওয়া গেল না। আবার কড়া নাড়ল।

জায়গাটা কিরকম লাগছে? রঞ্জু হেসে জিজ্ঞেস করল।

কলকাতা শহরে এখনও এমন জায়গা তা হলে আছে? এ তো রীতিমতো ক্রিমিনালদের লুকিয়ে থাকার জায়গা!

এরকম জায়গা আরো আছে।

বাপ্পা কী বলতে যাচ্ছিল এমনি সময়ে দরজা খুলে গেল।

দরজার সামনে যিনি এসে দাঁড়ালেন, পরনে তার ছিটের পাজামা, গায়ে ঢিলে ফতুয়া। মাথার চুল পাকা, ছোটো করে কাটা। রঙ ফ্যাকাশে, চোখ কটা। হাড় বের করা শীর্ণ শরীর। দুগাল বসে হনু দুটোকে ওপর দিকে ঠেলে দিয়েছে। গলায় একটা রুপোর ক্রুস।

তিনি বাপ্পার দিকে তাকিয়ে রঞ্জুকে বললেন, কী খবর রবিনসন? ভেতরে এসো।

এ বয়েসেও বেশ গমগমে গলা। কিন্তু কেউ এলে যে মুখে একটু হাসি ফুটে ওঠে। বৃদ্ধ ভদ্রলোকের মুখে সে হাসির চিহ্নটুকু নেই। প্রথম দর্শনেই বাপ্পার মনে হয়েছিল ভদ্রলোক হাসতে জানেন না। আর–যে মানুষ হাসে না, তার চরিত্রও বড়ো জটিল।

ভেতরে ঢুকে রঞ্জু বললে, হ্যারিকাকু, এ আমার বন্ধু বাপ্পা। বর্ধমান জেলার একটা গ্রামে থাকে। কলকাতায় মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসে। ভালো ডিটেকটিভের মতো অনেক কটা চোর-ডাকাত ধরে দিয়ে নাম করেছে।

হ্যারিকাকু চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, বটে! বটে! ইয়ং ডিটেকটিভ! কিন্তু ব্রাদার, আমার এখানে তো চোর-ডাকাতের কেস পাবে না। তবে দোতলায় কয়েকটা পকেটমার আর একতলায় দুটো চোরাকারবারি আছে নগণ্য–তাদের নিয়ে কি চলবে? বলে চোখ ট্যারা করে রঞ্জুর দিকে তাকালেন।

রঞ্জু হেসে বলল, ওসব নয়। ওকে এনেছি আপনার কাছ থেকে গল্প শোনবার জন্যে। ও ভূতটুত একেবারে মানে না। কিন্তু আপনি আমায় যেসব অলৌকিক গল্প বলেছেন–বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিটের বেরিয়াল গ্রাউন্ডের কাছে আপনার নিজের দেখা–ওকে একবার শুনিয়ে দিন তো।

এ কথায় হঠাৎ কেন যে তিনি এত গম্ভীর হয়ে গেলেন তা বোঝা গেল না।

গম্ভীর হয়েই তিনি খোলা জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইলেন। সামনে যে দুটি কিশোর বসে আছে সে খেয়ালও বুঝি নেই।

বাপ্পার মনে হলো তাকে যেন হ্যারিকাকুর পছন্দ হয়নি। তার আর থাকতে ইচ্ছে করছিল না। ওঠার জন্যে উসখুস করছিল, এমনি সময় হ্যারিকাকু উঠে পর্দা সরিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে গেলেন।

বাপ্পা তাকাল রঞ্জুর দিকে। রঞ্জু ঠোঁট ওল্টাল। অর্থাৎ সেও ঠিক বুঝতে পারছে না হ্যারিকাকুর আচরণটা ঠিক কিরকম।

বাপ্পা এবার ঘরটা দেখল। চৌকো, ছোট্ট ঘর। একজন মানুষেরই উপযুক্ত। সে আমলের সাহেবদের বাড়ির জানলার মতো গরাদহীন জানলা। রঙওঠা নীল রঙের পর্দা জানলায়। সেই জানলার দিকে পিছন করে হ্যারিকাকু বসে থাকেন কুশনআঁটা চেয়ারে। চেয়ারের সামনে বহু পুরনো একটা টেবিল। টেবিলে দোয়াতদানি, কলম, খুব মোটা একটা ফাউন্টেন পেন, একটা মোষের শিঙের পিঠ চুলকোবার ছড়ি। হিজিবিজি কাটা ছুরি পেপার-ওয়েট চাপা কাগজ। আর পুরনো হলেও খুব সুন্দর কাজ করা একটা ফ্লাওয়ার ভাস। তাতে একটা লাল গোলাপ।

ঘরের একপাশে একটা ক্যাম্প খাট। তাতে রানী রঙের ময়লা চাদর, আর দুটো বালিশ।

ওরা কোনোরকমে বসেছিল ক্যাম্প খাটটায় পা ঝুলিয়ে। ঘরে আর কোনো বসার জায়গা নেই।

বাপ্পার চোখ পড়ল সামনে দেওয়ালে। একটা সাদা কাগজে বড়ো বড়ো করে লেখা, Be one with Him : তার সঙ্গে একাত্ম হও।

তোর হ্যারিকাকু কি করে রে?

ঠিক জানি না। তবে আগে চার্চে পিয়ানো বাজাতেন বলে শুনেছি।

ঘরটা অপরিচ্ছন্ন। দেওয়ালে যিশুখ্রিস্টের ক্রুসবিদ্ধ ছবি, পাশেই কাঠের একটা ক্রুস ঝুলছে। আর ওদিকের দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো মস্ত একটা জাহাজের ছবি। জাহাজটা উত্তাল সমুদ্রে ভাসছে।

এরকম জাহাজের ছবি দেখা যায় না। বাপ্পা উঠে ছবিটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। রঞ্জুদের লাইব্রেরিতে একটা ইংরেজি ম্যাগাজিনে এইরকম জাহাজের ছবি দেখেছিল। স্টিমচালিত প্রথম যুগের জাহাজ। চিমনি থেকে গলগল করে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে। এইরকম একটা পোকায় কাটা পুরনো যুগের জাহাজের ছবি বাইরের ঘরে টাঙিয়ে রাখার কারণ কী?

বাপ্পা নিজের মনেই হাসল। বড্ড বেশি অকারণ কৌতূহল। পুরনো কালের ছবি তো অনেক শিল্পরসিকই পছন্দ করে। তবে?

পরক্ষণেই মনে হলো, হ্যারিকাকুকে প্রথম দর্শনে যা মনে হয় তাতে তিনি যে একজন যথার্থ শিল্পরসিক তা ভাবা যায় না।

তাহলে?

এমনি সময়ে পাশের ঘরে চটির ফটাস ফটাস শব্দ। বাপ্পা তাড়াতাড়ি তার জায়গায় এসে বসল।

হ্যারিকাকু দুহাতে দুকাপ কফি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। প্লেটও জোটেনি। টেবিলের ওপর কাপ দুটো রেখে বললেন, খেয়ে নাও। আমি একটু বেরোব। বলেই তিনি আবার পর্দার আড়ালে চলে গেলেন।

নিঃশব্দেই দুজনে কফি খেয়ে নিল। বাপ্পা কফি খেয়েই উঠে দাঁড়াল।

নে ওঠ।

দাঁড়া, উনি আসুন।

কিন্তু বাপ্পার আর তর সইছিল না। এখান থেকে চলে যেতে পারলেই বাঁচে।

এমনি সময়ে হ্যারিকাকু একটা কালো প্যান্ট, আধময়লা আস্তিন গোটানো শার্ট আর মাথায় হ্যাট চাপিয়ে বেরিয়ে এলেন। হাতে একটি ছড়ি।

তোমরা উঠছ? ঠিক আছে। আর একদিন এসো।

হ্যারিকাকুর এইটুকু সৌজন্যেই বোধহয় ওরা দুজনে কৃতার্থ হয়ে গেল।

ঘর থেকে ওরা বেরোতেই হ্যারিকাকু দরজা বন্ধ করে দিলেন।

রাস্তায় নেমে রঞ্জু বলল, আমার খুব খারাপ লাগছে রে। তোর সঙ্গে কাকু মোটেই ভালো ব্যবহার করলেন না।

বাপ্পা কোনো উত্তর না দিয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে লাগল।

তুই বোধহয় আর কখনো এখানে আসবি না!

বাপ্পা হাসল এবার। বলল, কেন আসব না? আসতেই হবে। তোর হ্যারিকাকুকে খুব ইনটারেস্টিং লেগেছে।

.

০২.

বাপ্পার গোয়েন্দাগিরি

ওরা হাঁটছিল ইলিয়ট রোড ধরে ওয়েলেসলির দিকে। রাস্তাটা মহাত্মা গান্ধী রোড কিংবা আচার্য জগদীশচন্দ্র রোডের মতো চওড়া নয়। অপেক্ষাকৃত সরু। মাঝখানে ট্রাম লাইন। বাপ্পা দুপাশের বাড়িঘর দেখতে দেখতে যাচ্ছিল। কলকাতায় ও কম এসেছে। এদিকে কখনো আসেনি।

এখানকার বেশির ভাগ বাড়িই দেখছি পুরনো। আর একটু অন্য ধরনের।

রঞ্জু বলল, এ অঞ্চলটাই খুব পুরনো। আর এখানে বেশির ভাগই থাকত যাঁদের বলা হয় ফিরিঙ্গি। অর্থাৎ খাস ইউরোপীয়ান নয়। এই বাড়িগুলো সাহেবী কায়দার।

বাপ্পা চলতে চলতেই বলল, এখানে এলে মনেই হয় না কলকাতায় রয়েছি।

রঞ্জু হেসে বলল, কী মনে হয়?

মনে হয় যেন একশো বছর আগের পথ ধরে হাঁটছি, যে পথের দুধারে শুধু সেইসব নিম্নমধ্যবিত্তদের বাস, যারা পুরো ইউরোপীয়, না ভারতীয়, যাদের সাহেবী স্টাইলে থাকার সাধ কিন্তু সাধ্য ছিল না। এর পর যখন কলকাতায় আসব তখন তোর সঙ্গে চৌরঙ্গীটা ভালো করে ঘুরবো।

হঠাৎ রঞ্জু বলে উঠল, দ্যাখ, দ্যা হ্যারিকাকু।

বাপ্পা দেখল ওদিকের ফুটপাথ দিয়ে হ্যারিকাকু ছড়ি হাতে ধীরে ধীরে হাঁটছেন। তিনিও ওয়েলেসলির দিকে চলেছেন।

দাঁড়া ডাকি। বলে ডাকবার আগেই বাপ্পা ওর হাত চেপে ধরল।

না, ডাকিস না। তার চেয়ে চ দূর থেকে ওঁর পিছু পিছু যাই।

কেন? রঞ্জু একটু অবাক হলো।

বাপ্পা হেসে বলল, ওঁকে একটু চমকে দেব।

রঞ্জু একটু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

তোর মতলবটা কি বল্ দিকি? তোকে তো অনেক দিন থেকেই চিনি। কোনো রহস্যের গন্ধটন্ধ

বাপ্পা হেসে ওর পিঠ চাপড়ে বলল, পাগল নাকি! একে বুড়ো, তার ওপর কলকাতার মানুষ, তা ছাড়া ভালো করে আলাপই জমল না, ওঁর মধ্যে রহস্য খুঁজে পাব কি করে? নে জোরে হাঁট। ঐ যাঃ! কোথায় হারিয়ে গেলেন?

রঞ্জু আঙুল তুলে বলল, ঐ তো ঐ ঝকাওয়ালার পেছনে।

দুজনে ফুটপাথ ক্রস করে একেবারে হ্যারিকাকুর পিছনে এসে পড়ল।

আরও মিনিট দশেক চলার পর হ্যারিকাকু ওয়েলেসলির মোড়ে যেখানে ফুটপাথে একজন মুসলমান পুরনো বই বিক্রি করছিল সেখানে এসে থামলেন।

হ্যারিকাকুকে দেখে বইওলা বলল, না সাহেব, বইটা এখনো আসেনি।

হ্যারিকাকু যেন একটু হতাশ হলেন। হ্যাটটা খুলে রুমাল দিয়ে মুখ মুছলেন।–সত্যি করে বলো তো ইসমাইল, বইটা পাওয়া যাবে তো?

ইসমাইল বলল, আমি তো মুম্বায়েও খোঁজ করেছি। ওরা তো বলেছে, সামনের লটে যে সমস্ত বই আসবে তার মধ্যে আপনার বইটা থাকবে।

ওরা বইটার নাম করে বলেছে তো, না আন্দাজে?

ইসমাইল বলল, আপনি তো লিখে দিয়েছিলেন। সেই সিলিপটাই পাঠিয়ে দিয়েছি। বলছে কায়রোতে ছাপা অত পুরনো বই পাওয়া কঠিন। তবু খোঁজ পেয়েছে।

হ্যারিকাকু যেন এক বিন্দু আশার আলো দেখলেন। বললেন, তোমায় তো বইটার জন্যে কিছু টাকা অ্যাডভান্স করেছি, আর কিছু দেব?

দরকার হবে না।

হ্যারিকাকু বললেন, বইটা আমার খুব তাড়াতাড়ি দরকার। বয়েস হয়ে গেছে। কোন দিন মরে যাব কিংবা রোগে পড়ে থাকব। তাহলে আর আক্ষেপের শেষ থাকবে না।

ইসমাইল বলল, বইটা পেলে আমি আপনার বাসায় দিয়ে আসব।

থ্যাঙ্ক ইউ ইসমাইল। বলে উনি ফিরলেন। আর তখুনি বাপ্পা রঞ্জুর হাতটা টেনে নিয়ে স্যাঁৎ করে একপাশে সরে গেল।

হারিকাকু বেশ কিছুদূর চলে গেলে রঞ্জু বলল, এত দূর ওঁর পিছু পিছু এসে কিছু লাভ হলো?

বাপ্পা হেসে বলল, হলো বৈকি!

কীরকম?

ঘরে একখানি বইয়ের চিহ্নও নেই, তবু বিশেষ একখানি বইয়ের জন্যে তিনি পাগল হয়ে উঠেছিলেন। কী এমন সেই বই? ঘরের চারদিকে ক্রুস চিহ্ন। খুব বড়ো পাদ্রীর ঘরেও এত ক্রুসের ছড়াছড়ি থাকে না। পুরনো চিত্রকলায় টেস্ট আছে বলে মনে হয় না, তবু তাঁরই ঘরের দেওয়ালে পুরনো কালের জাহাজের ছবি!

একটু থেমে বলল, তুই বলেছিলি হ্যারিকাকু বড়ো অদ্ভুত মানুষ। এখন মনে হচ্ছে উনি শুধু অদ্ভুতই নন, রহস্যময়ও বটে।

.

০৩.

সে কালের জাহাজের ছবিটা কেমন

এক মাস পর।

তখন সন্ধে হয়নি। সরু গলি আর ঘেঁষাঘেঁষি চাপা বাড়ি বলেই বোধহয় অন্ধকার হয়ে এসেছিল। বাপ্পা আর রঞ্জু বসেছিল ক্যাম্প-খাটে। আর চেয়ারে বসেছিলেন হ্যারিকাকু।

বাপ্পার ইচ্ছে ছিল না এইরকম অবেলায় হ্যারিকাকুর কাছে আসার। সে মফঃস্বলের ছেলে। কলকাতার রাস্তাগুলো চেনে না। তাই সন্ধে হয়ে গেলেই বাপ্পার অস্বস্তি হয়, যদি পথ হারিয়ে ফেলে। ভরসা–সঙ্গে রঞ্জু আছে। সে কলকাতার ছেলে, বড় হয়েছে, অনেক রাস্তাই চেনে। ও-ই বলল, হ্যারিকাকুর কাছে গল্প শুনতে হলে সন্ধেবেলাই ঠিক সময়। নইলে কটকটে রোদে ওঁর গল্প শুনে আরাম হয় না।

হ্যারিকাকুর ছিনে লম্বা গলা থেকে হর্ন বাজার মতো কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কি জানতে চাও বলো।

বাপ্পার দিকে তাকিয়েই তিনি যেন কথাগুলো ছুঁড়ে মারলেন।

রঞ্জু তাড়াতাড়ি বলল, ও কিছু জানতে চায় না হ্যারিকাকু। ওকে এনেছি আপনার কথা শোনাবার জন্যে।

হ্যারিকাকু গম্ভীরভাবে বললেন, না, রবিনসন, আমায় নিয়ে ওর খুব কৌতূহল।

রঞ্জুকে রবিনসন বলে ডাকতে বাপ্পা দুবার শুনল।

হ্যাঁ, আমায় নিয়ে ওর খুব কৌতূহল। তাই আগে ওর কৌতূহল মেটাতে চাই। বলো ইয়ং ডিটেকটিভ, কী জানতে চাও?

বাপ্পা অবাক হলো। সত্যিই যে ওঁর ওপরে তার একটু বিশেষ কৌতূহল আছে, মাত্র প্রথম দিনের মিনিট পনেরো দেখাতেই কি করে উনি বুঝলেন!

যাই হোক, সে কথা চেপে গিয়ে বাপ্পা বলল, ঐ জাহাজের ছবিটা আপনি টাঙিয়ে রেখেছেন কেন?

এটা কি একটা বুদ্ধিমান ছেলের প্রশ্ন হলো? হ্যারিকাকু যেন বিরক্ত হয়েই বললেন। ছবিটা ছিল। ফেলে না দিয়ে টাঙিয়ে রেখেছি। Whats wrong?

বাপ্পা বুঝল হ্যারিকাকুর মেজাজটা খিঁচড়ে আছে–বোধহয় তার ওপরেই। তবু ঘাবড়ে না গিয়ে বলল, তা নয়। আসলে জাহাজটা সেই যুগের যখন স্টিমের জাহাজ প্রথম চালু হয়। সেই জাহাজের ছবি

হ্যারিকাকুর কাঁচা-পাকা ভুরু দুটো কাছাকাছি হলো। তিনি একটু অবাক হলেন। বললেন, ছবিটা দেখে বুঝলে কী করে যে এটা প্রথম যুগের জাহাজ?

রঞ্জুদের লাইব্রেরিতে একটা ইংরেজি ম্যাগাজিনে এইরকম কিছু ছবি দেখেছিলাম।

I see.

একটু থেমে বললেন, হ্যাঁ, এটা সেই সময়েরই ছবি।

এ ছবিটা আপনি পেলেন কি করে? এ কি কিনতে পাওয়া যায়? আর কেনই বা এটা যত্ন করে বাইরের ঘরে টাঙিয়ে রেখেছেন?

হ্যারিকাকু কিছুক্ষণ চুপ করে কী ভাবলেন। তারপর বললেন, না, এ ছবি কিনতে পাওয়া যায় না। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। ছবিটা একটা পুরনো কাঠের বাক্সে পেয়েছি। সম্ভবত আমার ঠাকুর্দা রেখেছিলেন।

কিন্তু এটা টাঙিয়ে রেখেছেন কেন?

বাঃ! ঠাকুর্দার আমলের ছবি। ফেলে দেব?

বাপ্পা চুপ করে রইল।

আর কিছু জিজ্ঞেস করার আছে?

আপনি কি এখানে একাই থাকেন?

শুধু এখানে বলে নয়। ইহজগতে আমার কেউ নেই একমাত্র যিশু ছাড়া।

এই পুরনো ভাঙাচোরা বাড়িতে আপনি কতদিন আছেন?

বহুদিন।

এ বাড়িতে থাকতে আপনার ভালো লাগে?

ভালো লাগা-না-লাগা বুঝি না। অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অসুবিধে হয় না।

কিন্তু এ বাড়িতে থাকা তো risky. ভূমিকম্প হলে

কী আর করা যাবে!

অন্য কোথাও

অসম্ভব। কোথায় বাড়ি পাব? অত টাকাই বা কোথায়? তা ছাড়া পাঁচজনের সঙ্গে থাকা আমার অভ্যেস নয়।

বাপ্পা তৎক্ষণাৎ বলল, সেইজন্যই বোধহয় আপনার ঘরে ঐ একখানি চেয়ার ছাড়া আর কোনো চেয়ার নেই? লোক-আসা আপনি পছন্দ করেন না?

বাপ্পার এই ধরনের প্রশ্ন রঞ্জুর মোটেই ভালো লাগছিল না। তার মনে হচ্ছিল, বাপ্পা যেন পুলিশের মতো জেরা করছে। ও তো হ্যারিকাকুকে চেনে না। এখুনি যদি রেগে যান তাহলে আর কোনোদিন তাদের মুখদর্শন করবেন না।

রঞ্জু তাই লুকিয়ে বাপ্পাকে চিমটি কেটে থামতে ইঙ্গিত করল। কিন্তু বাপ্পা গ্রাহ্যই করল না।

হ্যারিকাকু, আমার কেমন মনে হয় আপনি খুব ডিস্টার্বড়। কিছু যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন এমন কিছু যা সহজে পাওয়া যায় না। তাই কি?

এ কথায় হ্যারিকাকু খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, সেটা আমার খুব পার্সোনাল ব্যাপার। কাউকেই বলব নয়–তোমাদের মতো বাচ্চাদের তো নয়ই।

ঠিক আছে। জানতে চাই না। আমি শুধু আর একটা কথা জিজ্ঞেস করব। যদি অনুমতি দেন

বলো।

আপনার ওপর আমার যে সত্যিই কৌতূহল আছে, মাত্র একদিন দেখে আপনি কী করে বুঝলেন?

এ কথায়, বর্ষার থমথমে মেঘের মধ্যে হঠাৎ যেমন এক চিলতে রোদ ঝিলিক দিয়ে যায়, হ্যারিকাকুর থমথমে মুখে তেমনি এক ফালি হাসি ফুটল। বললেন, তোমার চোখ দেখে। প্রথম দিনই তুমি আমায় খুব লক্ষ করেছিলে। আমার ওপর তোমার এতদূর কৌতূহল যে আমায় ফলো পর্যন্ত করেছিলে। তাই না?

হ্যারিকাকুর এ কথা শুনে দুজনেই চমকে উঠল। আশ্চর্য! এই বয়েসেও হ্যারিকাকু এত সতর্ক।

হ্যারিকাকু গম্ভীরভাবে বললেন, এরপর নিশ্চয়ই জানতে চাইবে কোন বইটার খোঁজ করছিলাম?

বাপ্পা বলল, জানতে ইচ্ছে করে। তবু না জানলেও ক্ষতি নেই। বইটা দুষ্প্রাপ্য, পুরনো। নিশ্চয়ই তাতে এমন কোনো তথ্য আছে যা জানার জন্যে আপনি যে কোনো দাম দিতে চান। কী সেই তথ্য? আমার মনে হয় ঐ জাহাজের সঙ্গে সেই তথ্যের কোনো সম্পর্ক আছে। আর সেটা যে কোনো গুপ্তধন উদ্ধারের ব্যাপার সেটা বুঝতে পারি–আপনার ঘরে এই যে এত ক্রুস রয়েছে তাই দেখে। আপনি চারদিকে ক্রুস এঁকে যেন কোনো বিশেষ। ভয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চাইছেন!

শুনতে শুনতে হ্যারিকাকুর মুখটা ফাঁক হয়ে গেল। তিনি মুগ্ধ হয়ে বললেন, তোমার বুদ্ধি, সূক্ষ্ম দৃষ্টি, অনুমান করার শক্তি দেখে আমি মুগ্ধ হচ্ছি। তুমি যা বলেছ তা হান্ড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট।

একটু থেমে বললেন, তুমি যখন এতদূর জেনে ফেলেছ, তখন যে ঘটনার জন্যে আমি সত্যি সত্যিই ডিস্টার্বড়–যার রহস্য সন্ধানের জন্যে আমি মরিয়া হয়ে উঠেছি–যে ঘটনা কাউকে বলার নয়, তাই আজ তোমাদের বলব। ঘটনাটা শুনতে শুনতে একটু রাত হলে তোমাদের অসুবিধে নেই তো?

দুজনেই বলে উঠল, না, কোনো অসুবিধে নেই।

ঘটনাটা ঘটেছিল বহুকাল আগে। কলকাতাতে তো নয়ই–বহু দূরে–ভারতবর্ষের বাইরে। কিন্তু তার জের বোধহয় এখনো মেটেনি। হয়তো আমিই নির্বোধের মতো জের টেনে চলেছি। দাঁড়াও। আগে একটু কফি করে আনি।

বলে হ্যারিকাকু টেবিল ধরে উঠে দাঁড়িয়ে পর্দা সরিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন।

.

০৪.

অশরীরী দানবের হানা

কফি খেতে খেতে হ্যারিকাকু তার কাহিনি শুরু করলেন। সে কাহিনি এইরকম :

১৮৪৪ সালে ইন্ডিয়া থেকে ইংলন্ডে যাবার প্রথম জাহাজ চালায় P & 0 কোম্পানি। তখন ইংলন্ডে যেতে হলে কলকাতা থেকে মাদ্রাজ ও সিংহল হয়ে লোহিত সাগরের ভেতর দিয়ে সুয়েজ। সুয়েজ থেকে স্থলপথে মরুভূমি পার হয়ে কায়রো। নীলনদ দিয়ে স্টিমারে চড়ে আলেকজান্দ্রিয়া। তারপর মাল্টা, নেস, রোম, ফ্লোরেন্স, ভেনিস, জার্মানির বিভিন্ন শহর পার হয়ে ইংলিশ চ্যানেল ক্রস করে লন্ডন।

কবছর পর কলকাতা থেকে ঐ P & 0 কোম্পানির জাহাজ বেন্টিঙ্ক ছাড়ল। আকারে বড়ো হলেও জাহাজটায় অব্যবস্থার চূড়ান্ত। মোটামুটি আশিজন যাত্রী ধরে। মাত্র ছটি কেবিন। এ কেবিন কটি ছাড়া আর যে সমস্ত জায়গায় থাকার ব্যবস্থা ছিল তা বসবাসের অযোগ্য। সব যেন ইঁদুরের গর্ত। যেমনি সংকীর্ণ, তেমনি নোংরা। আলো, বাতাসের বালাই নেই। এই যাত্রীদের বেশির ভাগকেই ডেকে সারাদিন সারারাত্রি কাটাতে হতো।

সেদিনও রাত্রে একদল যাত্রী পাশাপাশি ডেকে শুয়েছে। জাহাজটা তখন ইন্ডিয়ান ওশেন ছাড়িয়ে সবে লোহিত সাগরে ঢুকেছে। জাহাজের ডেকে বাতাস খুব। কিন্তু বাতাসটা যেন বেশ ভারী আর গরম।

ডেকের যাত্রীরা তবুও বেশ আরাম করেই ঘুমোচ্ছিল, মাঝরাতে হঠাৎ উঠল দারুণ ঝড়। যে ঝড়ের কোনো পূর্বাভাস ছিল না। যাত্রীরা ডেক থেকে ছুটে যে যেখানে পারল ইঁদুরের গর্তে ঢুকে পড়ল।

ঝড় বেশিক্ষণ থাকেনি। ভোর হলো। নীল সমুদ্রের বুক থেকে লাফিয়ে উঠল নতুন দিনের লাল সূর্য। সবাই খুশি মনে প্রাতঃকালীন চা নিয়ে বসল। কেউ খেয়াল করল না– যারা ডেকে শুয়েছিল তাদের মধ্যে একজন নেই।

খেয়াল যখন হলো তখন বেলা দুপুর। খাবার টেবিলে দেখা গেল একটা মিল বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ একজন প্যাসেঞ্জার নেই।

রেজিস্টার হাতে নিয়ে কাপ্তেন সবাইকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে নাম ডাকলেন। সবাই সাড়া দিল। দিল না শুধু একজন।

সেই একজন কোথায় গেল? সে তো গভীর সমুদ্রে নেমে বেড়াতে যেতে পারে না। মজা করে লুকোচুরিও খেলবে না।

তাহলে?

কাপ্তেন হুকুম দিলেন জাহাজের অলিগলি, ফাঁক-ফোকর সব খুঁজে দেখতে। বলা যায় না যদি কোথাও অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে।

কিন্তু না–কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। এক অজানা ভয়ে যাত্রীদের বুক দুরুদুরু করে উঠল।

এই পর্যন্ত বলে হ্যারিকাকু থামলেন। কেমন যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। উঠে গিয়ে জানলার পর্দাটা সরিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। তখন বেশ রাত হয়েছে। উঁচু উঁচু বাড়িতে আলো জ্বলছে। রাস্তাতেও আলো ঝলমল করছে। কেমন একটা গুমোট ভাব। তিনি যেন একটু চিন্তিত মুখে আবার চেয়ারে এসে বসলেন।

তারপর? উৎসুক আগ্রহে বাপ্পা জিজ্ঞেস করল।

হ্যারিকাকু মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, লোকটিকে যখন কোথাও পাওয়া গেল না তখন সিদ্ধান্ত হলো, নিশ্চয় ঝড়ের সময় অন্ধকারে তাড়াতাড়ি উঠে আসতে গিয়ে জলে পড়ে গিয়েছে।

কথাটা সবাই মেনে না নিলেও বেশির ভাগ প্যাসেঞ্জারই বলল, তাই হবে। যা ঝড় উঠেছিল মনে হচ্ছিল সবাইকে বুঝি সমুদ্রে উড়িয়ে নিয়ে যাবে।

জাহাজ লোহিত সাগর দিয়ে ক্রমেই সুয়েজের দিকে ঝিকঝিক করে এগোচ্ছে। পরের দিনও, রাত্রে ঠিক একই সময়ে ঝড় উঠল। সবাই হুড়মুড় করে ভেতরে গিয়ে ঢুকল। তারপর সকালে দেখা গেল আর একজন নেই।

দ্বিতীয় জনটিও কি ঝড়ের সময়ে ডেক থেকে পড়ে গেছে? তা কী করে সম্ভব? বিশেষ করে যখন সকলেরই আগের দিনের অ্যাকসিডেন্টের কথা মনে আছে।

এবার সবাই রীতিমতো আতঙ্কিত। সবাই কাপ্তেনকে ঘিরে ধরল, এটা কী হচ্ছে?

কাপ্তেন আর কি করবেন? তিনি নিজেও খুব চিন্তিত। বললেন, আমিও তো আপনাদের সঙ্গেই রয়েছি। আপনাদের মতোই বিভ্রান্ত। তবু দেখছি–

জাহাজে একজন খুব সাহসী যুবক ছিলেন। নাম জোসেফ জোসেফ ইভেন্স (নামটা শুনেই বাপ্পা একটু নড়েচড়ে বসল)। তিনি কাপ্তেনকে এসে গোপনে কয়েকটি কথা বললেন। শুনে কাপ্তেনের দু-চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসার উপক্রম। বললেন, এ যে অসম্ভব কথা মিস্টার ইভেন্স!

জোসেফ ইভেন্স গম্ভীরভাবে বললেন, না, অসম্ভব নয়। আমি কায়রো থেকে পাবলিশ করা একটা বইয়ে ঠিক এইরকম ব্যাপারের কথা পড়েছি। তা ছাড়া গত রাতে ঝড়ের সময় মুহূর্তের জন্যে আমার চোখেও কিছু অবিশ্বাস্য দৃশ্য ধরা পড়েছিল। সে বিষয়ে আমি এক্ষুনি নিশ্চিত করে কিছু বলছি না। আমারও ভুল হতে পারে। তবে আজ রাত্রেও যদি ঝড় ওঠে তাহলে আমি প্রস্তুত থাকব।

কাপ্তেন বললেন, মিস্টার ইভেন্স, আপনার এই সৎসাহসের জন্যে ধন্যবাদ। আমিও সজাগ থাকব।

পরের দিন সকাল এল একটা বিমর্ষ দুর্ভাবনার বোঝা নিয়ে। আজও সকালে প্রভাতী চায়ের কাপ হাতে নিয়ে যাত্রীরা আলোচনা করতে লাগল গত রাত্রের কথা। কিছুতেই তারা ভেবে পায় না কী হতে পারে। শুধু জোসেফ ওদের মধ্যে থাকলেন না। তিনি ডেকের চারদিক ঘুরে দেখতে লাগলেন। এক সময়ে কাপ্তেন পাশে এসে দাঁড়ালেন। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, মিস্টার ইভেন্স, কি দেখছেন?

ইভেন্স বললেন, ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো চিহ্ন কোথাও আছে কিনা!

পেলেন কিছু?

না।

.

রাত্রি হলো।

যাত্রীরা কেউ আর ডেকে শুতে চায় না। অথচ ভেতরে যে শোবে সেরকম জায়গা, নেই। তার ওপরে গরম। সারারাত ঘুম হবে না। অগত্যা তারা কেউ শ্রীহরির, কেউ আল্লার, কেউ বুকে অদৃশ্য ক্রুস এঁকে ডেকেই শুলো। কিন্তু কিছুতেই দু-চোখের পাতা এক করতে পারছিল না।

তবু একসময়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ল।

রাত তখন একটা বেজে চল্লিশ মিনিট। জোসেফ ইভেন্স ঠায় বসে আছেন তাঁর কেবিনে। ঝড়টা ওঠে রাত দুটো নাগাদ। তিনি ঐ সময় পর্যন্ত জেগে থাকবেনই। তাহলে আর কুড়ি মিনিট। তিনি কেবিনে বসে আছেন। লক্ষ তাঁর খোলা জানলা দিয়ে আকাশের দিকে। ওপরে অন্ধকার আকাশ, নিচে গাঢ় নীল জল। ইভেন্স আকাশের গায়ে তারা দেখে বুঝলেন, পরিষ্কার আকাশ। তাহলে বোধহয় আজ আর তেমন কিছু ঘটবে না।

দশ মিনিট পর তিনি দেখলেন আকাশের তারাগুলো অদৃশ্য হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি খাড়া হয়ে বসলেন। মেঘ করছে। তাহলে আজও ঝড় আসছে। আশ্চর্য! পরপর তিন দিন একই সময়ে ঝড়!

ভাবতে ভাবতেই গোঁ গোঁ করে একটা প্রচণ্ড ঝড়ের ধাক্কায় জাহাজটা দুলে উঠল। বড়ো বড়ো ঢেউ আছড়ে পড়ল জাহাজের গায়ে। সঙ্গে সঙ্গে ডেকের যাত্রীদের মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি, হুটোপাটি। তারা ডেক ছেড়ে ভেতরে ছুটে আসছে।

মুহূর্তমাত্র দেরি না করি জোসেফ ইভেন্স কেবিন থেকে বেরিয়ে ডেকের দিকে ছুটলেন। এক হাতে তার টর্চ, অন্য হাতে গুলিভরা পিস্তল।

তিনি ডেকের কাছে যেতেই আতঙ্কে দু-পা পিছিয়ে এলেন। দেখলেন সাদা চাদরের মতো কিছু একটা জড়ানো বিশাল একটা মূর্তি সমুদ্র থেকে উঠে বরফের মতো সাদা পা ডেকের উপর তুলেছে। দুখানা তুষারঝরা হাত এগিয়ে আসছে একজন যাত্রীকে ধরার জন্যে।

সঙ্গে সঙ্গে ইভেন্স পরপর দুবার গুলি ছুড়লেন। কিন্তু কিছুই হলো না। ততক্ষণে হাতখানা প্রায় ধরে ফেলেছে যাত্রীটিকে। ইভেন্স টর্চ পিস্তল ফেলে দিয়ে মরিয়া হয়ে একেবারে মূর্তিটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মুহূর্তেই অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেল। একটা বিকট শব্দ করে সেই অশরীরী দানবটা শিকার ছেড়ে দিয়ে ডেক থেকে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ে হারিয়ে গেল।

…হ্যারিকাকু যখন দুহাত তুলে ঘটনাটা উত্তেজিতভাবে বলে যাচ্ছিলেন তখন তাকে কিরকম যেন লাগছিল। মনে হচ্ছিল তিনি যেন আর ইহজগতের মানুষ নন, ঘটনাস্থলও কলকাতার ইলিয়ট রোড নয়–যেন প্রায় ১২৫ বছর আগের এক ভয়াবহ সমুদ্রযাত্রীর ঘটনাটা চোখের সামনে ঘটছে।

আর ঠিক তখনই ঘরের বাইরে একটা চাপা গর্জন, যেন প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ছুটে আসছে..

ঝড় আছড়ে পড়ল কলকাতার বুকে। জানলার বাইরে একবার তাকালেন। আতঙ্ক জড়ানো স্বরে নিজের মনেই বলে উঠলেন, ঝড়!

বাপ্পা রঞ্জু দুজনেই অবাক হলো। ঝড় তো হতেই পারে। তার জন্যে এত ভয় পাবার কি থাকতে পারে? ততক্ষণে গোঁ গোঁ শব্দে ঝড় ঘরে ঢুকে পড়েছে। সব যেন চুরমার হয়ে যাবে। দেওয়ালে জাহাজের ছবিটা মাথা কুটছে। এই বুঝি পড়ে খানখান হয়ে যাবে।

হ্যারিকাকু কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালেন।

ও ঘরের জানলাটা, বলতে বলতে উনি পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন।

ঘরটায় সুইচ অফ করা ছিল। দু মিনিটও হয়নি, দড়াম করে একটা শব্দ–সঙ্গে সঙ্গে হ্যারিকাকুর আর্ত চিৎকার, বাঁ-চা-ও।

ছুটে গেল বাপ্পা আর রঞ্জু। এ ঘরটা কিরকম তা এরা জানে না। সুইচবোর্ডটাও যে কোথায় কে জানে। হাতে টর্চও নেই। কোথায় তিনি? অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু হ্যারিকাকুর আর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না কেন?

বাপ্পা চেঁচিয়ে উঠল, হ্যারিকাকু–আঙ্কেল

হঠাৎই সেই অন্ধকারের মধ্যে কী যেন দেখল ওরা। একদলা সাদা কুয়াশা লম্বা হয়ে উঠছে..যেন কী একটা টানতে টানতে জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

রঞ্জু, টর্চটা-চেঁচিয়ে উঠল বাপ্পা।

কিন্তু কোথায় টর্চ?

এমনি সময়ে বিদ্যুৎ চমকালো। সেই আলোয় সুইচবোর্ডটা দেখে নিয়ে রঞ্জু ছুটে গিয়ে আলো জ্বালিয়ে দিল। দেখল গরাদহীন জানলায় হ্যারিকাকুর দেহের অর্ধেকটা ঝুলছে। অচৈতন্য।

প্রায় এক ঘণ্টা পর হ্যারিকাকু একটু সুস্থ হলে ওরা দুজন যখন রাস্তায় নেমে এল তখন কলকাতার আলোকোজ্জ্বল রাজপথে ঝড়ের দাপটের আর কোনো চিহ্নমাত্র নেই। ট্রাম চলছে, বাস চলছে, ট্যাক্সি ছুটছে। অথচ এই কিছুক্ষণ আগে এই কলকাতার বুকেই যে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটে গেল তা কেউ জানতে পারল না।

ব্যাপারটা ওরা বাড়িতে কাউকে বলল না। প্রথমত, কেউ বিশ্বাস করবে না। দ্বিতীয়ত, ঐসব জায়গায় সন্ধের পর ছেলেমানুষদের যাওয়া রঞ্জুর বাবা মোটেই পছন্দ করেন না।

বাপ্পা পরের দিনই দেশে ফিরে গেল। কলকাতায় প্রায় এক সপ্তাহ ছিল। আর থাকা যায় না। যাবার সময়ে আড়ালে রঞ্জুকে বলে গেল, ব্যাপারটা আমায় খুব ভাবিয়ে তুলেছে। আমি শিগগিরই আবার আসব। তখন আবার হ্যারিকাকুর ওখানে যাব। অনেক রহস্য আছে।

দু-পা গিয়ে ফিরে এসে বলল, হ্যাঁ, শোন এ নিয়ে কাউকে কিছু বলবি না। আর ভুলেও কখনো ওখানে একলা যাবি না।

.

০৫.

হ্যারিকাকুর পূর্ব অভিজ্ঞতা

মাস তিনেক পরে এক রবিবার বেলা দশটা নাগাদ হ্যারিকাকুর বাড়িতে ওরা বসেছে। হ্যারিকাকু এখন বেশ সুস্থ। স্বাভাবিক। আজও উনিই বক্তা। সেদিনের ঘটনা সম্বন্ধে উনি বেশ খুশমেজাজেই বললেন, কী যে হলো আমি নিজেই তা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। ঝড় তো আগেও হয়েছে। কিন্তু এমন ভয় পাইনি কখনো। তারপর যখন ও ঘরে জানলা বন্ধ করতে গেলাম তখনই দেখলাম জানলার মধ্যে দিয়ে ঝড়ের সঙ্গে এক দলা কুয়াশার মতো কী যেন ঘরে ঢুকছে। সইচ অন করবার আগেই হঠাৎ মনে হলো আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। তোমরা ঘরে গিয়ে কী দেখলে?

রঞ্জু বেশ উত্তেজিতভাবেই কিছু বলতে যাচ্ছিল, বাপ্পা ইঙ্গিতে থামিয়ে দিয়ে বলল, আলো জ্বালতেই দেখলাম আপনি জানলার ধারে পড়ে রয়েছেন।

জানলার ধারে। হ্যারিকাকু চমকে উঠলেন।

হ্যাঁ।

কিন্তু আমি তো জ্ঞাতসারে ওদিকে যাইনি। বলে নিজেই ভাবতে লাগলেন। আর সেই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখটা যে কিরকম ঝুলে যাচ্ছিল বাপ্পার তা নজর এড়াল না। তবু তো বাপ্পা বুদ্ধি করে জানলার বাইরে অর্ধেক দেহ ঝুলছিল বলেনি।

আচ্ছা, তোমরা আর কিছু দেখোনি?

সত্যি কথা বলার জন্যে রঞ্জুর মন ছোঁক ছোঁক করছিল। সে চকিতে একবার বাপ্পার দিকে তাকাল। বাপ্পা তাকে চোখের ইশারায় নিরস্ত করে বলল, কই না তো।

কিন্তু আমি কিছু একটা দেখেছিলাম। সাদা একটা কিছু মানুষের মতো

সে হয়তো আপনার চোখের ভুল।

হ্যারিকাকু অন্যমনস্কভাবে বললেন, কী জানি।

আচ্ছা হ্যারিকাকু, এর আগে এরকম আর কখনো ঘটেনি?

না।

ভালো করে মনে করে দেখুন তো!

হ্যারিকাকু চিন্তিতভাবে মাথা নাড়লেন।

হ্যারিকাকু, হয় আপনি ভুলে যাচ্ছেন, নইলে ছেলেমানুষ বলে আমাদের কাছে বলতে চাইছেন না। কিন্তু কেন? আমরা তো আপনার কাছে গল্প শুনতেই এসেছি। আর সে গল্প যদি আপনার মতো বহুদর্শী মানুষের নিজের অভিজ্ঞতা হয় তাহলে তো কথাই নেই।

হ্যারিকাকু তবু মাথা নেড়েই যাচ্ছেন।

না হে, না। এরকম ঘটনা আর ঘটেনি।

কোনো অশরীরীর আবির্ভাব?

হ্যারিকাকু শুকনো গলায় বললেন, না না-না।

যদি নাই হবে তাহলে ঘরের চারদিকে এত সচিহ্ন কেন? কেউ তো শখ করে এত ক্রুস এঁকে ঘরের শোভা বাড়ায় না।

হঠাৎ হ্যারিকাকু যেন ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেলেন। বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। কিছু একটা প্রায়ই ঘটে। আর তা অনেক দিন ধরেই।

কীরকম দয়া করে একটু বলুন না।

এই যেমন একা বসে আছি, মনে হলো কেউ যেন আমার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি তার গরম নিশ্বাস পর্যন্ত টের পাচ্ছি। কিংবা বাথরুমে যাচ্ছি–মনে হলো কেউ যেন বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে উঠছি অন্যমনস্কভাবে–আমার মনে হলো আমার ঠিক আগে আগে খালি পায়ে কেউ উঠছে। বড়ো বড়ো পা তুলোর মতো সাদা। এইরকম আর কি!

আপনার কি মনে হয় এই ঘরটাই haunted room, না শুধু আপনাকেই ভয় দেখানো?

আমাকে–আমাকেই ভয় দেখানো।

কী করে বুঝলে?

আমি বুঝতে পারি।

কিন্তু কেন?

এবার হ্যারিকাকু কোনো উত্তর দিলেন না। হঠাৎ ওর ঠোঁট, হাত, গা তিরতির করে কাঁপতে লাগল।

আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে কাকু?

না, ঠিক আছি। তুমি একটু আগে জিজ্ঞেস করছিলে সেদিনের ঘটনার মতো ঘটনা আর কখনো ঘটেছিল কিনা। মনে পড়েছে। ঘটেছিল। তবে এরকম মারাত্মক নয়।

দয়া করে সে ব্যাপারটা বলুন না!

হ্যারিকাকু আবার কিছুক্ষণ অন্যদিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন। তারপর বলতে লাগলেন, সে বেশ কিছুকাল আগের কথা। তখন আমি ছিলাম রডন স্ট্রিটের একটা বাড়িতে। আমার দুর-সম্পর্কের এক আত্মীয় জানায় যে, তার কাছে অনেক পুরনো অব্যবহার্য জিনিস আছে, সেগুলো অল্প দামে বেচে দিতে চায়। আমি প্রথমে রাজি হইনি। তারপর সে যখন জানাল যে জিনিসগুলো আমরাই পূর্বপুরুষদের তখন জিনিসগুলো অন্তত দেখার ইচ্ছে হলো।

গেলাম তাদের বাড়ি। মস্তবড়ো পুরনো একটা কাঠের সিন্দুকে অনেক কিছুই ছিল। যেমন, কিছু বাসনকোসন, ফুলদানি, টেবিল-ল্যাম্প, একটা সেলাই মেশিন, এইরকম সব।

আমি কিছু নিলাম, অনেক কিছুই নিলাম না। যেটা সবচেয়ে পছন্দ হলো সেটা ঐ জাহাজের ছবিটা। আর একটা অমূল্য জিনিস পেলাম, সেটা একটা ডায়েরি। ডায়েরিটা আমার ঠাকুরদাদার বাবার। তার নিজের হাতের লেখা। সেদিন তোমাদের যে জাহাজের ঘটনাটা বলেছিলাম সেটা ঐ ডায়েরি থেকে পাওয়া। সেই ডায়েরিতেই লেখা আছে ছবিটার কথা। এটা সেই জাহাজের ছবি যে জাহাজে একদিন আমার ঠাকুরদার বাবা সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন।

তিনিই বোধহয় জোসেফ ইভেন্স? বাপ্পা বলে উঠল।

হ্যাঁ, তাই। যাই হোক, সেই জাহাজের ছবি জেনে আমি ছবিটা ভালো করে বাঁধিয়ে রাখলাম।

একটু থামলেন হ্যারিকাকু। তারপর বললেন, প্রথম দিনই তুমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিটার কথা জানতে চেয়েছিলে। ছেলেমানুষের এত আগ্রহ দেখে অবাক হয়েছিলাম, বিরক্তও হয়েছিলাম। তাই এড়িয়ে গিয়েছিলাম।

চুরুটটা নিভে গিয়েছিল। হ্যারিকাকু কয়েকটা দেশলাইয়ের কাঠি ধ্বংস করে চুরুটটা আবার ধরালেন।

কিন্তু আঙ্কেল, আপনি যে বলেছিলেন কী দেখেছিলেন!–রঞ্জু অধৈর্য হয়ে উঠল।

Dont worry my boy! ব্যস্ত হয়ো না। বলছি। গোড়া থেকে না বললে ঠিক বোঝা যায় না।

যাই হোক, ছবিটা এনে আমার বাইরের ঘরে টাঙিয়ে রেখেছিলাম। একদিন অচেনা এক মহিলা হঠাৎ এলেন কী একটা কাজে। ছবিটা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বেশ ভালো টাকা দিয়ে ছবিটা কিনতে চাইলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ এইরকম একটা অতি সাধারণ জাহাজের ছবি কিনতে চাইছেন কেন?

মহিলাটি হেসে বললেন, এ ধরনের জাহাজের ছবি বড়ো একটা দেখা যায় না বলেই সংগ্রহ করতে চাই।

আমি তখন খুশি হয়ে তাকে জাহাজের গল্পটা বললাম। শুনে উনি এত দূর ভয় পেলেন যে আমার চোখের সামনেই তার মুখটা সাদা হয়ে গেল।

আমি ওকে ভরসা দিয়ে বললাম, আপনি ঘটনাটা শুনে ভয় পাচ্ছেন, আর আমি ভাবছি যদি আমার প্রচুর টাকা থাকত তাহলে একবার জাহাজে করে সেই জায়গাটায় গিয়ে সেই সমুদ্র-দানবের বিষয় অনুসন্ধান করতাম।

অনুসন্ধান করতেন! মহিলাটি চমকে উঠলেন।

হ্যাঁ, করতাম। করতাম কেন, এখনো করছি এখানে বসেই। সত্যিই সেদিন কি ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল, সেরকম ঘটা সম্ভব কিনা এসব আমায় জানতেই হবে। জানতে পারলে আমি আধুনিক জগতের মানুষের কাছে তা প্রচার করব।

মহিলাটি জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু এখানে বসে কী করে আপনি অনুসন্ধান করবেন?

বললাম, আপনি বোধহয় খবর রাখেন না এখনও আমাদের দেশে এমন সব তান্ত্রিক আছেন যারা সারাজীবন এইসব অলৌকিক ব্যাপারের রহস্য সন্ধান করে যাচ্ছেন।

বললাম, আমি এমন ফকিরের কথা জানি যিনি ইচ্ছে করলে বেশ কিছুক্ষণের জন্যে নিজের আত্মাকে দেহমুক্ত করে সুদূর দেশ ঘুরে আসতে পারেন।

ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে শুনতে লাগলেন।

আমি বললাম, আমার ঠাকুরদার বাবা তার ডায়েরিতে মিশর থেকে ছাপা একটা বইয়ের উল্লেখ করেছেন যাতে নাকি সেই সমুদ্র-দানবের কথা আছে। সেই বইয়ের সন্ধান করছি।

একটু থেমে বললেন, আমি ভদ্রমহিলাকে বুঝিয়ে দিলাম, আমার কোনো বন্ধন নেই, কাজেই নির্ভাবনায় অলৌকিক বিষয় অনুসন্ধানে নেমে পড়ব।

তারপর? বাপ্পা জিজ্ঞেস করল।

হ্যারিকাকু বললেন, মহিলাটি এই পর্যন্ত শুনে খুব ভয় পেয়ে গেলেন। আমাকে সাবধান করে দিলেন। ওসব বড়ো বিপজ্জনক কাজ, মিস্টার ইভেন্স।

আমি হেসে উঠে বললাম, আমার কাছে একটা মড়ার মাথার খুলি আছে। এত বড়ো খুলি যে মানুষের হতে পারে ভাবা যায় না। তাতে দুর্বোধ্য ভাষায় অনেক কিছু লেখা আছে। দেখবেন?

মহিলাটি শিউরে উঠে বললেন, না। আমার কোনো আগ্রহ নেই।

জিজ্ঞেস করলেন, সেটা পেলেন কোথায়?

বললাম, প্রেতাত্মার রহস্য সন্ধানে আমি নেপাল পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেখানে এক তিব্বতী লামার সাক্ষাৎ পাই। তিনি আমার সব কথা শুনে অনেক উপদেশ, পরামর্শ আর কীভাবে কী করলে সেই প্রেতাত্মার রহস্য জানা যাবে শিখিয়ে দিয়েছেন। তিনিই সেই খুলিটা দিয়েছিলেন। সঙ্গে দিয়েছিলেন লাল একটুকরো কাপড় আর কিছু কাঠের গুঁড়োর মতন।

কিছু ফল পেয়েছেন, মহিলাটি জিজ্ঞেস করলেন।

বোধহয় পেয়েছি। লামা আমায় বলেছেন, সেই প্রেতাত্মা এখনও আছে। হয়তো তার দেখাও পেতে পারো যদি ঠিকমতো একাত্ম হও। তবে সাবধান।

একাত্ম হও মানে? মহিলাটি জিজ্ঞেস করলেন।

ঠিক জানি না। বোধহয় ঐ একটি বিষয় নিয়ে তন্ময় হয়ে সাধনার কথা বলেছেন। কিন্তু কলকাতায় বসে সেরকম সাধনা করা বড়ো কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানে বড্ড ডিস্টার্বেন্স।

তাহলে কলকাতার বাইরে কোথাও চলে যান, একান্তই যদি অপঘাতে মরার ইচ্ছে হয়ে থাকে।

আমি বললাম, দূরে কোথায় যাব? তেমন টাকা-পয়সা নেই, জায়গাও জানা নেই। তবে ছোটোনাগপুরে আমার এক বন্ধু আছে স্যামুয়েল। তাকে সব কথা জানিয়েছি। সে তো কেবলই বলে ওর কাছে চলে যেতে। জায়গাটা নাকি ঐ ধরনের সাধনার পক্ষে খুবই উপযুক্ত।

মহিলাটি আর কিছু না বলে চলে গেলেন। যাবার সময়ে আবার আমায় সাবধান করে দিয়ে গেলেন যেন আমি ওসব নিয়ে মাথা না ঘামাই।

উনি চলে যেতে না যেতেই হঠাৎ মেঘের গর্জন। সঙ্গে সঙ্গে ঝড়। তখন সবে সন্ধে। ঝড়ে নিচের সিঁড়ির দরজাটা ভয়ানক শব্দ করছিল। দরজাটা বন্ধ করার জন্যে নামতে যাব, দেখি লম্বা একটা মানুষ সর্বাঙ্গে চাদর জড়িয়ে উঠে আসছে এক-পা এক-পা করে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

তখনই আমি উঠে এসে টেবিল থেকে টর্চ নিয়ে নেমে গেলাম কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।

আর সেই মহিলা? রুদ্ধনিশ্বাসে জিজ্ঞেস করল বাপ্পা।

তাকেও দেখতে পেলাম না। ঐটুকু সময়ে ঝড়ের মধ্যেই রাস্তায় নেমে কোথায় যেন vanish হয়ে গেছেন। ঝড়ের মধ্যেই বেরনোর এমন কী তাড়া ছিল বুঝতে পারিনি।

কথা শেষ করে হ্যারিকাকু কোমরের পিছনে দু-হাত রেখে গম্ভীরভাবে পায়চারি করতে লাগলেন।

একটু পরে বাপ্পা বলল, তাহলে কাকু, এই পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে যে দুবার আপনি প্রায় একই জিনিস দেখেছিলেন। আর সেই দুবার দেখার আগে ভীষণ ঝড় উঠেছিল।

হ্যারিকাকু পায়চারি করছিলেন, দাঁড়িয়ে পড়লেন। একটু ভেবে বললেন, তা বটে।

আর এ ঝড় ঠিক সাধারণ ঝড় নয়।

সেটা ঠিক বলতে পারছি না।

তবে এটুকু বলা যায় ঝড়ের সঙ্গেই মূর্তিটার সম্বন্ধ। অর্থাৎ ঝড়ের মধ্যে দিয়েই তাঁর আবির্ভাব।

হ্যাঁ, তা অবশ্য বলতে পারো।

আর দুবারই আপনি এই বিশেষ ঝড়ের সময়ে ভয় পেয়েছিলেন।

হ্যারিকাকু একটু ভেবে বললেন, শেষবার ভয়টা খুব বেশি পেয়েছিলাম। কিন্তু প্রথমবার তেমন ভয় পাইনি। মনে করেছিলাম সাধারণ ঝড়।

রঞ্জু এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল, এবার বলে উঠল, আরো একটা ব্যাপার নোটিশ করো বাপ্পা, যে দুবারই ঝড় উঠেছে বা কিছু দেখা গিয়েছে সেই দুবারই উনি কাউকে না কাউকে জাহাজের গল্পটা শুনিয়েছেন। সেবার সেই রহস্যময়ী মহিলাকে, এবার আমাদের।

বাপ্পা প্রায় লাফিয়ে ওঠে বলল, বাঃ! দারুণ পয়েন্ট ধরেছিস তো!

হ্যারিকাকু ভুরুতে ভাঁজ ফেলে রঞ্জুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন স্বগত বললেন, রাইট!

বাপ্পা বলল, কাকু, একটা রিকোয়েস্ট করব। ঐ জাহাজের ঘটনাটা কাউকে আর নাই বললেন।

হ্যারিকাকু সামান্য একটু হাসলেন। বললেন, আর কাউকে বলব কিনা জানি না, তবে ঐ বস্তুটা যে কী, কেন এভাবে এখানে হানা দেয়, আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন সে রহস্য ভেদ করবার চেষ্টা চালিয়ে যাব।

কিন্তু সেই যে লামা আপনাকে একাত্ম হও কথাটা বলেছিলেন তার মানে এতদিনে বুঝতে পেরেছেন?

না, এখনো তা ঠিক পারিনি। একাত্ম হও-এর মানে তো এই দাঁড়ায়, Be one with Him। কিন্তু এই Him কে?

বলতে বলতে হঠাৎ তিনি দুহাতে মাথা টিপে ধরে চেয়ারে বসে পড়লেন।

রঞ্জু বলল, কিন্তু সেই জাহাজের গল্পটা এখনো শেষ করেননি। মিস্টার জোসেফ ইভেন্স তারপর কী করলেন?

হ্যারিকাকু মাথা টিপে ধরে বললেন, হ্যাঁ, সেটা অবশ্যই বলতে হবে। তবে আজ আর কথা বলতে পারছি না। শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে। তোমরা আর একদিন এসো।

.

০৬.

জোসেফ ইভেন্সের ডায়েরি

এবার ওদের আসতে দেরি হলো প্রায় চার মাস।

হ্যারিকাকুকে খুব ক্লান্ত আর বিষণ্ণ লাগছিল। মুখটা কিরকম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। গলার মোটা শিরাগুলো যেন চামড়া কুঁড়ে উঠে আসছিল।

হ্যারিকাকু তবু আন্তরিকতার সঙ্গে ওদের বসালেন। কফি তৈরি করে খাওয়ালেন। বললেন, আর কিছুদিন পরে এলে আমায় আর পেতে না।

কেন?

আমার সেই বন্ধু স্যামুয়েল বারবার আমায় ডাকছে। ভাবছি ওর কাছেই চলে যাব।

বাপ্পা চুপ করে শুনছিল আর ঘরটা দেখছিল। একটু যেন পরিবর্তন হয়েছে। ঘরটা বেশ গোছাল। বোধহয় চলে যাবেন বলেই ঘরটা গুছিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্য হলো টেবিলে সেই ফুলদানিতে লাল গোলাপের জায়গায় একটা বড়ো সাদা গোলাপ দেখে।

এবার সাদা গোলাপ দেখছি। আগে দেখতাম লাল গোলাপ।

হ্যারিকাকু বললেন, লাল গোলাপ আর পছন্দ হয় না। বড্ড যেন অহংকার। বড় আত্মপ্রচার!

বাপ্পা অবাক হলো। বাবা! হ্যারিকাকুর মুখে এসব আবার কী কথা! সত্যিই কি উনি শেষ পর্যন্ত সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে যাবেন?

যাই হোক, কফি খেতে খেতে হ্যারিকাকু সেই জাহাজের ঘটনার শেষাংশটুকু বলে গেলেন।

..জোসেফ ইভেন্স এর পর লন্ডনে পৌঁছেই জাহাজের ঘটনা নিয়ে হৈচৈ বাধিয়ে দিলেন। সভা-সমিতি করলেন, কাগজের রিপোর্টারদের ডাকলেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। সাক্ষ্য দিলেন জাহাজের কাপ্তেন স্বয়ং। তাছাড়া প্যাসেঞ্জারদের অনেকেই ছিল। জোসেফ গভর্নমেন্টের কাছে দাবি করলেন, ঐ সমুদ্র-দানবকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সন্ধান চালানো হোক।

তিনি বড়ো বড়ো থিওজফিস্টদের সঙ্গেও এই নিয়ে আলোচনা করলেন। বললেন, অতল সমুদ্র থেকে ঐ যে মূর্তিটা উঠে এল ওটা হাড়-মাংসের জীব নয়। চোখেরও ভুল নয়। তবে ওটা কি?

এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। যেমন উত্তর পাওয়া যায়নি কী করে তিনি নিজে রক্ষা পেলেন–কেনই বা সমুদ্র-দানবটা তাঁকে দেখে অমন ভয়ংকর চিৎকার করে লাফিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

এই শেষ প্রশ্নের জবাবে সেদিন ইংলন্ড আর জার্মানির প্রেততত্ত্ববিদরা একবাক্যে বলেছিলেন, নিশ্চয় মিস্টার ইভেন্সের মধ্যে কোনো দৈবশক্তি আছে যা তিনি নিজেও জানেন না।

এর পর থেকে বেশ কিছুকাল ঐ জলপথে যখন জাহাজ যেত তখন ঐ জায়গাটায় এলে যাত্রীরা কেউ ডেকে থাকত না। তারা সবাই একসঙ্গে থাকত। হোলি বাইবেল পড়ত সমস্বরে। আর প্রত্যেকের হাতে থাকত ক্রুস।

এ সবই জোসেফ ইভেন্স তাঁর ডায়েরিতে লিখে গেছেন তার পুত্র-পৌত্র-প্রপৌত্রদের জন্যে। এ কথাও লিখেছেন, কোনো দৈবশক্তি সত্যিই আমার আছে কিনা জানি না। তবে আমার মনে হয় এ শক্তি আর কিছুই নয়–শুধু পরোপকারবৃত্তি আর সাহস। আমি যদি সেদিন সেই যাত্রীটিকে বাঁচাবার জন্যে মরিয়া হয়ে ঐ সমুদ্র-দানবের ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়তাম তাহলে আরো একজনকে হারাতে হতো। আজ আমি কিছুতেই বোঝাতে পারব না সেদিন আমার ওপর কি এক অদ্ভুত শক্তি ভর করেছিল। নইলে আমি তো খুব সাধারণ একজন মানুষই।

শেষে লিখছেন, যাই হোক জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমি ঐ সমুদ্র-দানবের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা চালিয়ে যাব। তার জন্যে যদি আমাকে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে হয় তবু আমি পিছপা নই। আজ পর্যন্ত শুধু এইটুকু তথ্য পেয়েছি–একদল লোক নাকি মিশর থেকে একটা হাজার বছরের মমি চুরি করে জাহাজে করে ঐ পথে পালাচ্ছিল। জাহাজটা হঠাৎ ডুবে যায়, সেই সঙ্গে মমিটাও। তারপর থেকেই নাকি–এইটুকু তথ্য। এখনও আরো প্রমাণ দরকার।

ডায়েরি এখানেই শেষ। হ্যারিকাকু বললেন, কিন্তু তিনি বেশিদিন বাঁচেননি। একদিন সন্ধ্যায় পথ চলতে চলতে ঝড়ে গাছের ডাল চাপা পড়ে মারা যান।

হ্যারিকাকু একটু থামলেন। তারপর বললেন, এই ডায়েরি আসে আমার পিতামহের হাতে। তিনিও রহস্য ভেদ করতে করতে মধ্য বয়সেই আগুনে পুড়ে মারা যান।

তারপর আমার বাবা। তিনি এবার সেই মমির ইতিহাস সংগ্রহ করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু বজ্রাঘাতে তার মৃত্যু হয়।

কথা বলতে বলতে হ্যারিকাকু ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। তবু বলতে লাগলেন, জোসেফ ইভেন্স থেকে পরপর তিন পুরুষের কেন এই অপমৃত্যু? তোমরা হয়তো বলবে ঘটনাচক্র। বলবে অপঘাতে কি মৃত্যু হতে পারে না?–ঠিক। তবু আমার মনে প্রশ্ন থেকেই যায়, এ কি সেই অলৌকিক অস্তিত্বটির প্রতিহিংসা–জোসেফ ইভেন্স অলৌকিক রহস্যের জাল ছিন্ন করে বিজ্ঞানের আলোয় সত্যকে উদঘাটন করে মানুষকে সাহস যোগাতে চেয়েছিলেন বলে?

আর যেহেতু তার বংশধরেরা সেই একই পথে এগোচ্ছিলেন তাই তাদের ওপর অকাল অপঘাত মৃত্যুদণ্ড।

যদি তাই হয় তাহলে বাপ্পা, রবিনসন, তোমরা জেনে রাখো এবার আমার পালা আসছে।

তাই কি আপনি ঘরের চারিদিকে ক্রুস চিহ্ন এঁকে রেখেছেন? বাপ্পা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।

ধরে নাও তাই। যদি সেই করুণাময় পরম পিতার আশ্রয়ে থেকে আমি আমার সাধনা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারি, তারই চেষ্টা।

আপনি যখন এতদূর ভাবতে পেরেছেন তখন আর নাই এগোলেন!

না, তা সম্ভব নয়। যে রহস্য ভেদ করতে করতে আমার পূর্বপুরুষেরা জীবন দিয়েছেন সে কাজ আমিও করে যাব। এখন শয়নে-স্বপনে আমার শুধু ঐ একটি চিন্তা প্রেততত্ত্ব। ঐ দ্যাখো কত প্রেততত্ত্বের বই এই কমাসে যোগাড় করেছি। আর যদি অপঘাতে মৃত্যু হয় তাহলে হোক। আমি প্রস্তুত।

বলে তিনি ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলেন। এমন ধবধবে সাদা বড়ো বড়ো একপাটি দাঁত বের করে হাসতে তাকে কখনো দেখা যায়নি। ওঁর দাঁতগুলো কি এত সাদা ছিল? ঐ দাঁত আর হাসি দেখে বাপ্পার গা ছমছম করে উঠল।

হ্যারিকাকু বললেন, এক একবার আমার কেমন মনে হয় যেন আমি আর সেই পুরনো আমি নেই। খুব একটা পরিবর্তন–অদ্ভুত পরিবর্তন নেমে আসছে আমার মধ্যে। জানি না পরিণতি কী! সেদিন এই পর্যন্ত।

.

০৭.

হ্যারিকাকুর ক্রমবিবর্তন

এর পর আগস্টের এক মেঘলা দুপুরে বাপ্পা আর রঞ্জু গিয়েছিল হ্যারিকাকুর বাড়ি। জাহাজের গল্প শোনা শেষ হয়ে গিয়েছে। নতুন গল্প শোনার আর তেমন আগ্রহ নেই। এখন শুধু দেখা করতে যাওয়া-খবর নিতে যাওয়া কেমন আছেন তাদের সেই রহস্যময় মানুষটি, যাঁর নাম হ্যারোল্ড ইভেন্স ওরফে হ্যারিকাকু।

দরজার সামনে সেই বড়ো সচিহ্ন। দরজার বিবর্ণ রঙটা যেন আরো ফিকে। হ্যারিকাকুই দরজা খুলে দিলেন। কিন্তু–এ কী চেহারা হয়েছে তাঁর। শরীরটা যেন একটা শুরু কাঠির মতো শীর্ণ হয়ে গেছে। মাথাভর্তি পাকা জট-পাকানো চুল–একমুখ পাকা দাড়ি। দু-চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি। পিছনের দেওয়ালে শুধু সেই লেখাটা জ্বলজ্বল করছে–Be one with Him। তার সঙ্গে একাত্ম হও।

ঘরে ঢুকে ওরা অবাক হয়ে গেল। টেবিলে ফুলদানিতে আজ আর শুধুই সাদা গোলাপ নয়, টেবিলক্লথটিও সাদা। জানলা-দরজার বিবর্ণ নীল পর্দা আর নেই, তার বদলে সাদা পর্দা। বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড় সবই সাদা। আর যে হ্যারিকাকু বরাবর পরে এসেছেন ছিটের পা-জামা, তার পরনে সাদা পাজামা আর সাদা ফতুয়া!

হ্যারিকাকু এদিন বেশি কথা বলতে পারেননি। কোনোরকমে দরজা খুলে দিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়েছেন।

কেমন আছেন হ্যারিকাকু?

ক্যাম্পখাটটার দপাশে দুজনে বসে জিজ্ঞেস করল।

ঠিক জানি না।

এ এমন একটা উত্তর যার ওপর আর প্রশ্ন করা যায় না।

কিন্তু চারিদিকে এত সাদা কেন?

হ্যারিকাকুর সেই ভরাট গলা আর নেই। ফ্যাকাশে গলায় বললেন, সাদাই তো সব। সাদাই পবিত্রতা।

বলে শীর্ণ হাতটা বাড়িয়ে দিলেন রঞ্জু আর বাপ্পার দিকে।

.

০৮.

লোহিত সাগরের আতঙ্ক

কয়েক মাস পর বাপ্পা হ্যারিকাকুর সেই চিঠিখানা পেল।

চিঠিখানা পেয়ে বাপ্পা আশ্চর্য হলো, তাহলে এই শেষ বয়সে হ্যারিকাকু সত্যিই কলকাতা ছেড়ে চলে গেলেন ছোটোনাগপুরের একটা অখ্যাত জায়গায় নির্বিঘ্নে প্রেততত্ত্ব সাধনা করতে। কিন্তু ভীত হয়ে পড়ছেন কেন? সেই অশরীরী দানবটা কি সেখানেও হানা দিচ্ছে?

যাই হোক, তাকে জগদীশপুরে যেতেই হবে। তাদের দুজনকে হ্যারিকাকু আকুলভাবে ডেকেছেন।

পরের দিন বাপ্পা কলকাতায় চলে এল। দেখল রঞ্জুও ঐরকম চিঠি পেয়েছে। একই বক্তব্য–একই ভাষা।

কবে যাবি? রঞ্জু জিজ্ঞেস করল।

আজই।

কিন্তু

কি ভাবছিস?

ভাবছি মা-বাবাকে কী বলব! সত্যি কথা বললে যেতে দেবে না। ঠিক আছে–এমনি বেড়াতে যাচ্ছি বললে আপত্তি করবে না। বিশেষ যখন তুই সঙ্গে আছিস। বলে রঞ্জু একটু হাসল।

রঞ্জুর বাবা কিছু বলেননি। রঞ্জুর মা গজগজ করলেন, শুধু শুধু এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ানো–এ আবার কী? তাড়াতাড়ি ফিরো।

যাবার সময়ে বাপ্পা বললে, হ্যারিকাকুর ঠিকানাটা একটা স্লিপে লিখে টেবিলে রেখে যাস। বলা যায় না যদি কোনো কারণে আটকে যাই।

সেদিনই রাত্রে মোগলসরাই প্যাসেঞ্জারে ওরা চাপল। সারারাত ট্রেনে। যতক্ষণ না ঘুম এসেছিল ততক্ষণ ওরা হ্যারিকাকুকে নিয়ে আলোচনা করল।

বাপ্পা বলল, একটা কথাই ভাবছি–হ্যারিকাকু কেন লিখলেন ভীত হয়ে পড়ছি!

নিশ্চয় ওখানেও সেরকম কিছু ঘটেছে।

কিন্তু ওখানে তো তিনি একা নন। পাদ্রী সাহেবও আছেন। তিনিই তো তাকে অনেক দিন ধরে ডাকছেন। তিনি আবার হ্যারিকাকুর বন্ধু। তাহলে?

রঞ্জু বলল, কলকাতায় যেদিন সন্ধেবেলা ঝড় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঐরকম মারাত্মক ঘটনাটা ঘটল সেদিন তো আমরাও ছিলাম।

বাপ্পা চিন্তিতভাবে বলল, তা বটে। একটু থেমে বলল, আর একটা জিনিস লক্ষ করেছিলি? হ্যারিকাকুর কিরকম তাড়াতাড়ি পরিবর্তন হচ্ছিল। প্রথম দিনের সেই হ্যারিকাকু যিনি হ্যাট মাথায়, ছড়ি হাতে ওয়েলেসলির দিকে হাঁটছিলেন, তিনি যেন শেষের দিকে আর বেরোতেই পারছিলেন না। অথচ ক মাসেরই বা তফাত! শুধু তাই নয়, যিনি প্রথম দিকে কাঠখোট্টা মানুষ ছিলেন, ট্যারা ট্যারা কথা বলতেন, তিনিই ক্রমশ যেন কেমন ভীতু হয়ে পড়লেন। কথা বলতে বলতে হাত, ঠোঁট কাঁপত।

রঞ্জু সায় দিয়ে মাথা দোলাল।

তারপর হঠাৎ তার সাদার ওপর প্রীতি উথলে উঠল। লাল গোলাপের জায়গায় সাদা গোলাপ এল। জানলার পর্দা, বিছানার চাদর, টেবিলক্লথ সব সাদা। তিনি যেন হঠাৎ কেমন দার্শনিক হয়ে উঠলেন!

আর ওঁর সেই বড়ো বড়ো সাদা দাঁতের হাসি! বাবা গো!

অথচ উনি কম হাসতেন। ওঁর ঐরকম বড়ো বড়ো সাদা দাঁত আগে কখনো চোখে পড়েনি।

আর শেষ যেদিন দেখা করে এলাম সেদিন তো উনি একেবারে শয্যাশায়ী। ভালো করে কথাই বলতে পারলেন না।

এখানে একটা কথা ভাববার আছে রঞ্জু। যে মানুষকে মুমূর্ষ অবস্থায় দেখে এসেছি সে মানুষ কি এত গুছিয়ে চিঠি লিখতে পারে?

রঞ্জু বলল, চিঠি বোধহয় উনি লেখেননি। পাদ্রী সাহেবকে দিয়ে লিখিয়েছেন। তিনিও তো বৃদ্ধ। তাই কাঁপা কাঁপা লেখা।

বাপ্পা একটু ভেবে বলল, তা হতে পারে। কিন্তু চিঠির প্রথমটা পড়।

রঞ্জু পকেট থেকে চিঠিটা বের করল।

বাপ্পা আঙুল দিয়ে চিঠির প্রথম দিকটা দেখিয়ে দিয়ে বলল, এইরকম সহজ স্বাভাবিকভাবে কোনো মুমূর্য মানুষ dictate করতে পারে? আমাদের যাওয়া যখন এতই জরুরি তখন তো টেলিগ্রাম করলেই চলত। তাই না?

এটা কি তবে আগে লিখে রাখা?

তারিখটা দ্যাখ তো? বলেই বাপ্পা চিঠির ওপরে ঝুঁকে পড়ল।

আশ্চর্য! কোনো তারিখ নেই।

এর মানে কী?

অনেক ভেবে রঞ্জু বলল, হয়তো ভুলে গেছেন।

কিন্তু যুক্তিটা কারো মনঃপূত হলো না।

সকালে ওরা পৌঁছল মধুপুর। তারপর চড়ে বসল গিরিডির ট্রেনে।

স্টেশনে দুটো কেক আর দু ভড় চা খেয়ে ওরা জানলার ধার নিয়ে আরাম করে বসল। ট্রেন ছাড়ল। ওরা গল্প করছিল। কিন্তু গল্প করাতেও ক্লান্তি। প্রথমত, সারারাত ভালো ঘুম হয়নি, দ্বিতীয়ত, মনে চাপা দুর্ভাবনা কে জানে হ্যারিকাকুকে কী অবস্থায় দেখবে? ত. ছাড়া ভয়ও আছে। এ তো শুধু অসুস্থ একজনকে দেখতে যাওয়া নয়। এমন একজনকে দেখতে যাওয়া যে এক মহাশক্তিশালী অশরীরী আত্মার শিকার।

আমি কিন্তু প্রস্তুত হয়েই যাচ্ছি। বাপ্পা সকৌতূহলে তাকাল।

রঞ্জু হেসে পকেট থেকে একটা বালা বের করে দেখাল।

কী ওটা? লোহার বালা মনে হচ্ছে!

রঞ্জু বলল, হ্যাঁ, যদি আবার সত্যিই এসবের পাল্লায় পড়ি তাহলে

তাহলে লোহা তোকে বাঁচাবে?

রঞ্জু বলল, হারে, লোকে বলে সঙ্গে লোহা থাকলে ওরা ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না।

তোর মাথা। তাহলে জাহাজে আর ওসব ঘটনা ঘটত না। জাহাজটায় তো লোহার অভাব ছিল না। ডেকের রেলিংগুলো কি কাঠের ছিল?

অকাট্য যুক্তি। রঞ্জু চুপ করে গেল।

জোসেফ ইভেন্সের সেই কথাগুলো ভুলে গেলি? পরোপকারবৃত্তি আর প্রচণ্ড সাহস এই হলো বাঁচার অস্ত্র। আজ পর্যন্ত ভূতের হাতে প্রাণ হারিয়েছে ভীতুর দল। যারা সর্বশক্তি দিয়ে প্রেতাত্মার দিকে ছুটে যেতে পারে তারা মরে না। বরঞ্চ দুষ্ট আত্মাই পালায়। মানুষ যেমন ভূতকে ভয় পায়, ভূতও তেমনি ভয় পায় মানুষকে।

ট্রেন চলেছে। দুপাশে রুক্ষ মাটি। বাংলা দেশের মতো শস্যশ্যামল সমতল জমি আর নেই। উঁচু-নিচু মাঠ যেন ঢেউ খেলিয়ে ছড়িয়ে আছে। হুহু করে বাতাস আসছে খোলা জানলা দিয়ে।

রঞ্জুর একটু ঝিমুনি এসেছিল। একসময়ে সামলে নিল। সলজ্জভাবে তাকাল বাপ্পার দিকে। দেখল বাপ্পা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে যেন অস্বস্তির সঙ্গে কী দেখেছে।

কী দেখছিস অমন করে?

বাপ্পা উত্তর দিল না। শুধু আঙুল দিয়ে আকাশ দেখিয়ে দিল।

রঞ্জু দেখল আকাশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে কালো মেঘ একটা দৈত্যের মতো হুহু করে এগিয়ে আসছে।

বাপ্পা চুপ করে রইল।

জগদীশপুরে ওরা যখন নামল তখন বাতাসের গোঙানি শুরু হয়ে গিয়েছে।

ছোট স্টেশন। প্যাসেঞ্জার যে কজন নামল আঙুলে তা গোনা যায়। একটা টাঙ্গাও পাওয়া গেল। তাকে ফাদার স্যামুয়েলের কোয়ার্টার বলতে সে কিছুই বুঝল না। কিন্তু যখন বলা হলো পুরনো গির্জা–তখন সে বুঝল, বটে কিন্তু ও এতই অবাক হয়ে গেল যে ভাড়া বলতে ভুলে গেল।

যাই হোক, ভাড়া ঠিক করে ওরা দুজনে টাঙ্গায় উঠে পড়ল। ততক্ষণে ঝড়ের দাপট তীব্র হয়ে উঠেছে। তারই মধ্যে দিয়ে টাঙ্গার বুড়ো ঘোড়াটা প্রাণপণে ছুটছে…পিঠের ওপর চাবুক পড়ছে সপাং সপাং

জায়গাটা একেই জনবসতিবিরল। টাঙ্গা যতই এগোচ্ছে ততই যেন নির্জন এক জগতে তারা প্রবেশ করছে। খোয়া বের করা, ধুলো-ভরা সরু রাস্তা। দুপাশে শুধু আতা-পেয়ারার গাছ, সার সার বাবলা গাছের পাতলা ছায়া আর ঝোপঝাপ।

ও হে গাড়োয়ান, স্যামুয়েল সাহেবের কোঠী আর কেতনা দূর?

গাড়োয়ান কোনো উত্তর দিল না। গাড়ি ছুটছেই। এদিকে ঝড়টা কখনো কমছে কখনো জোরে হচ্ছে। যখন জোর ঝাঁপটা মারে–এরা মুখে চোখে রুমাল চেপে ধরে। ধুলো আর ধুলো।

শেষ পর্যন্ত টাঙ্গাটা যেখানে এসে থামল সেখানে শুধু জঙ্গল আর ঝোপঝাড় ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। রাস্তাটাও যেন হঠাৎই সেখানে শেষ হয়ে গেছে।

গির্জা কঁহা?

গাড়োয়ান কথা বলল না। হাত তুলে দক্ষিণ দিকটা দেখিয়ে দিল।

হ্যাঁ, ঐ যে গির্জার মতো কী একটা দেখা যাচ্ছে।

টাঙ্গাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে দুজনে নামল।

রঞ্জু বলল, হ্যারিকাকু তো আচ্ছা জায়গায় সাধনা করতে এসেছেন!

ওরা দুজনে চার্চটার কাছে এগিয়ে গেল। চার্চের অবস্থা দেখে ওরা অবাক। জীর্ণ বিবর্ণ দেওয়াল। জানলাগুলো ভাঙা। কেউ যে এখানে প্রেয়ার করতে আসে তার কোনো লক্ষণই নেই। দরজায় একটা তালা ঝুলছে।

রঞ্জু বলল, এর মানে কী? চার্চেরই যখন এই অবস্থা তখন পাদ্রী এখানে কী করেন? তার থাকার দরকারটাই বা কী?

বাপ্পা বলল, যাই হোক, তিনি নিশ্চয়ই কাছেই কোথাও থাকেন। নইলে হ্যারিকাকু ঠিকানা দিলেন কি করে? আর হ্যারিকাকু তো ওঁর কাছেই থাকেন।

ওরা এদিক ওদিক দেখতে লাগল। কিন্তু কোনো কোয়ার্টার চোখে পড়ল না।

এ তো আচ্ছা রহস্য। রঞ্জু বেজার হয়ে উঠল।

বাপ্পা কী বলতে যাচ্ছিল, দেখল এক বুড়ি যেন কুঁজো হয়ে ঠুকঠুক করতে করতে চার্চের দিকেই আসছে। তিনি এদের কাছে এলেন, কিন্তু যেন এদের দেখতেই পেলেন না। তিনি গুটি গুটি চার্চের দরজার কাছে গিয়ে ব্যাগ থেকে চাবি বের করে তালা খুলতে লাগলেন।

বাপ্পা কাছে গিয়ে বলল, ম্যাডাম, ফাদার স্যামুয়েলের কোয়ার্টারটা কোথায় বলতে পারেন?

মেমসাহেব তাঁর ঘোলা ঘোলা চোখ দুটো তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথা থেকে আসছ?

কলকাতা থেকে।

তোমরা কি ফাদারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছ?

হ্যাঁ ওর সঙ্গেও বটে। আবার ওঁর কাছে থাকেন মিস্টার হ্যারোল্ড ইভেন্স, তাঁর সঙ্গেও বটে।

বাপ্পা লক্ষ করল হ্যারোল্ড ইভেন্সের নাম শুনে মেম যেন চমকে উঠলেন।

একটু সামলে নিয়ে বললেন, কিন্তু ফাদার তো এখানে নেই।

নেই! ওরা দুজনে একসঙ্গে যেন হোঁচট খেল।

হ্যাঁ, উনি হঠাৎ কোথায় চলে গেলেন।

কোথায় গেলেন বলে যাননি?

না। সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। লাস্ট সানডে। হঠাৎ রাত দুটোর সময়ে ফাদার হাঁপাতে হাঁপাতে আমার কাছে গিয়ে চার্চের চাবিটা দিয়ে বললেন, আমি চলে যাচ্ছি। আমায় কিছু প্রশ্ন করো না। বলেই তিনি সেই অন্ধকার রাত্রে বেরিয়ে গেলেন। তার চোখে মুখে অস্বাভাবিক ভয়ের ছাপ দেখেছিলাম।

ভয়ের ছাপ! বাপ্পা উত্তেজিতভাবে জিজ্ঞেস করল।

হ্যাঁ, অমন ভয় পেতে এর আগে কখনো দেখিনি।

তারপর আপনি আর ওঁর কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন?

আর কিছু প্রশ্ন করো না। উত্তর দেব না। বলে ব্যাগ থেকে দুটো মোমবাতি নিয়ে দরজা খুলে চার্চে ঢুকতে গেলেন। বাধা দিয়ে বাপ্পা বলল, শুধু আর একটা প্রশ্ন। মিস্টার ইভেন্স কোথায়? উনি কি একাই আছেন? ভালো আছেন তো?

মেমসাহেবের হাত থেকে একটা মোমবাতি পড়ে গেল। তিনি কেমন একরকমভাবে বাপ্পার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কঁপা কাঁপা গলায় বললেন, তিনি লাস্ট সানডে রাত্রে মারা গেছেন।

মারা গেছেন?

হ্যাঁ, প্লিজ আমায় কিছু প্রশ্ন করো না। আমি মোম দুটো জ্বালিয়ে দিয়েই চলে যাব। বলে আকাশের দিকে তাকালেন।

ঝড়টা তখন থেমেছে। কিন্তু মাঝে মাঝেই ঝাঁপটা বাতাস বইছে। আকাশ অন্ধকার।

আপনি শুধু ওর কোয়ার্টারটা দেখিয়ে দিন। একবার সেখানে যাব। উনি আমাদের আসতে বলেছিলেন।

যাওয়াই ভালো। তবু যদি যেতে চাও, ঐ ইউক্যালিপটাস গাছটার পিছনে গেলেই পাবে।

ওরা যখন যাচ্ছিল মেমসাহেব ব্যাকুল হয়ে বললেন, তোমরা সত্যিই যাচ্ছ? প্লিজ যেও না।

আমাদের যেতেই হবে। হ্যারিকাকুকে আমরা কথা দিয়েছিলাম আসব বলে।

তবে এই ক্রুসটা সঙ্গে রাখো।

.

পুরনো একটা ঘর। ঘরের চারদিকে ভাঙা পাঁচিল। দুপাশে ঝোপঝাপ। একটা ছোটো কাঠের গেট।

ওরা গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল। এক ফালি রক। রকের সামনে দরজা। এই সময়ে প্রচণ্ড ঝড় উঠল। ঝড়ের ধাক্কায় দরজা খুলে গেল।

অন্ধকার ঘর। দেশলাই জ্বালতে জ্বালতে ওরা এগোল। মেঝেতে অনেকগুলো ছেঁড়া পাতা উড়ছে। বাপ্পা কয়েকটা পাতা তুলে নিল।

কিরে ওগুলো? রঞ্জু ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল।

মনে হচ্ছে জোসেফ ইভেন্সের সেই ডায়েরি।

ইস্! এইভাবে ছিঁড়ল কে?

বাপ্পা কোনো উত্তর দিল না।

দেওয়ালে সাদা কাগজে কী যেন লেখা। বাপ্পা আবার দেশলাই জ্বালালো। লেখাটা পড়া গেল–Be one with Him!

সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে হঠাৎই রঞ্জু বলে উঠল, আমার শরীর কিরকম করছে। আমি বাইরে যাব।

বাপ্পা বলল, আমারও অস্বস্তি হচ্ছে।

তারপর শান্ত গলায় বলল, এখানে এসেছি যখন আয়, পাঁচ মিনিট আমরা হ্যারিকাকুর জন্যে প্রার্থনা করি।

দুজনে সেই লেখাটার নিচে হাঁটু পেতে বসল।

সবে মিনিট দুই হয়েছে, হঠাৎ প্রচণ্ড একটা ঝড় আর্তনাদ করে ঘরে ঢুকে পড়ল। আর তখনই তারা দেখল ভেতরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সর্বাঙ্গে সাদা চাদর-জড়ানো একটা মূর্তি। তার সারা মাথায় জট-পাকানো সাদা চুল, মুখে সাদা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। দুচোখে মরা মাছের দৃষ্টি। তার সামনের দাঁতগুলো ঠোঁটের নিচ থেকে বেরিয়ে এসে ঝক্ঝক্ করছে।

হ্যারিকাকু!

হা, হ্যারিকাকু হাসছেন!

হ্যা-রি-কা-কু! বলে রঞ্জু চিৎকার করে উঠল।

হ্যা-রি-কা-কু, আমরা এসেছি।

দেখা গেল হ্যারিকাকু শীর্ণ ডান হাতখানা বাড়িয়ে দিয়েছেন–তুষারশুভ্র হাত। সে হাতে এতটুকু মাংস নেই, যেন হ্যান্ডশেক করতে চাইছেন।

[শারদীয়া ১৪০১]

Facebook Comment

You May Also Like