রহস্যময় রোগী – মানবেন্দ্র পাল

রহস্যময় রোগী - মানবেন্দ্র পাল

হঠাৎ টেলিগ্রাম

প্রায় ষাট বছর আগের কথা বলছি। তখন আমি ডাক্তারি পাশ করে একটা নামী হাসপাতালে ঢুকেছি। সেই সঙ্গে প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করছি। ঐ অল্প বয়সেই বেশ নামডাক হয়েছিল। ইংরিজিতে যাকে বলে জেনারেল ফিজিশিয়ান হলেও আমি বেশি চিকিৎসা করতাম মানসিক রোগীদের। আর এতেই আমার খ্যাতি। মানসিক রোগী মানেই পাগল নয়। পাগল না হয়েও কেউ কেউ অস্বাভাবিক আচরণ করে। যেমন–কেউ সবসময়ে গম্ভীর হয়ে থাকে। মোটে হাসে না। আপন মনে দিনরাত কি যেন ভাবে। কেউ কেউ সব সময় বিমর্ষ। কারো সঙ্গে মিশতে চায় না। চুপচাপ ঘরে বসে থাকে। এই রকম নানা লক্ষণ থেকে বোঝা যায় লোকটি মানসিক রোগী হয়ে গেছে।

আমি এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসা করতে বেশি পছন্দ করতাম। মেলামেশা করে তাদের মনে কিসের দুঃখ, কিসের অভাব জেনে নিতাম। তারপর চিকিৎসা করে ভালো করে দিতাম।

হঠাৎ সেদিন আমার নামে একটা টেলিগ্রাম এলো। টেলিগ্রাম এলেই মানুষ ভয় পায়—না জানি কার কী হলো।

টেলিগ্রাম খুলে নিশ্চিন্ত হলাম। না, সেরকম কিছু নয়। তবে অবাক হলাম। আমার বন্ধু নিশীথ টেলিগ্রাম করেছে বাগআঁচড়া থেকে। লিখেছে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে শীগগির চলে এসো এখানে। ভালো একটা কেস আছে।

মনস্থির করা মাত্র পরের দিনই বেরিয়ে পড়লাম। শেয়ালদা থেকে রানাঘাট। সেখান থেকে বাসে বাগআঁচড়া। জায়গাটা কলকাতা থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে। শান্তিপুরের কাছে।

জায়গাটার নাম বাগআঁচড়া কেন সে বিষয়ে নানা মুনির নানা মত।

একসময়ে শান্তিপুরের বর্তমান বাবলা গ্রাম দিয়ে গোবিন্দপুর হয়ে গঙ্গা প্রবাহিত হতো। পরে প্রাকৃতিক কারণে গঙ্গা দক্ষিণে সরে আসাতে গঙ্গার পুরনো খাত জুড়ে চর পড়ে যায়। কারও কারও মতে ঐ চরে কোনো ফসল হতো না বলে লোকে চরটাকে বলতো বাগআঁচড়া। আবার কেউ কেউ বলেন ওখানে খুব বাঘের উপদ্রব ছিল। লোকে প্রায় প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেত দরজার সামনে বাঘের আঁচড়াবার দাগ। মানুষের গন্ধ পেয়ে খেতে এসে বন্ধ দরজা আঁচড়ে থাবা মেরে খোলবার চেষ্টা করত। সেই থেকেই নাকি এই জায়গার নাম বাগআঁচড়া।

বাঘ ছাড়াও আরও কিছু অন্য ভয় ছিল ওখানে। ঐ যে ধু ধু চরদুপুরের রোদে জ্বলন্ত মরুভূমির মতো। আর রাতে? রাতে ঐ চরের অন্য রূপ। জনমানবশূন্য শুধু বালি আর বালি। ভুল করে কেউ ওদিকে গেলে সে আর বেঁচে ফিরত না। কী করে কী যে হতো কেউ তা বুঝতে পারত না। শুধু সারা চর জুড়ে একটা হু হু করে দমকা বাতাস বইত। তারপর কেমন একটা গোঙানির শব্দ। তারপরই সব চুপ। পরের দিন সকালে দেখা যেত একটা মানুষ কিংবা একটা কোনো নিশাচর পাখি, নিদেন একটা কুকুর মরে পড়ে আছে। কে যেন প্রবল আক্রোশে তাদের জিভ টেনে বের করে দিয়েছে।

এই ভয়ংকর চরে ঢের পরে বসবাস করতে আসেন এক দুর্ধর্ষ সাহসী প্রবল প্রতাপ ব্যক্তি। নাম চাঁদ রায়।

কে এই চাঁদ রায়?

কেউ কেউ বলেন ইনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের (কৃষ্ণনগর এঁরই নামে) জ্ঞাতি। কেউ বলেন–না, জ্ঞাতি নয়, চাঁদ রায় ছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান। আবার কারো মতে চাঁদ রায় একজন নিষ্ঠুর দস্যুসর্দার। যাই হোক না কেন তিনি যে একজন সাহসী আর প্রতাপশালী লোক ছিলেন তার প্রমাণ মিলল যখন দেখা গেল ঐ ভয়ংকর চরে এসে তিনি পাকাপাকিভাবে থাকতে লাগলেন। শুধু থাকাই নয়, ঐ চরের খানিকটা জায়গা জুড়ে চাষবাস শুরু করলেন। যে চর বেশ কয়েক শত বছর ধরে ভয়াল ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ হয়ে পড়েছিল, এখন চাঁদ রায়ের চেষ্টায় সেই চরে সোনার ফসল ফলতে শুরু করল। কয়েক বছরের মধ্যেই এই চাষের দৌলতে প্রচুর ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়ে উঠলেন চাঁদ রায়। তারপরেই তিনি একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার বলে গণ্য হলেন। কেউ কেউ তাকে বলত রাজা রাজা চাঁদ রায়।

এ সব প্রায় তিনশো বছর আগের কথা।

ক্রমে চাঁদ রায়ের দেখাদেখি অনেকে এখানে এসে বসবাস করতে লাগল। আর চাঁদ রায় প্রাসাদ তৈরি করে রীতিমতো রাজার হালে রাজ্য শাসন করতে লাগলেন। সে সময়ে রাজা-জমিদাররা প্রজাদের ওপর অত্যাচার-উৎপীড়ন করলেও নিজেদের নাম চিরস্থায়ী করার জন্যে অতিথিশালা, জল, রাস্তাঘাট নির্মাণ, মন্দির প্রতিষ্ঠা করতেন। চাঁদ রায়ও কয়েকটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ বাগআঁচড়ায় এখনও আছে।

চাঁদ রায় ঐ চড়ার অনেকখানি জায়গা দখল করে রাজপ্রাসাদ তৈরি করলেও যে কারণেই হোক চরের পশ্চিম দিকটা পরিত্যক্তই রেখেছিলেন। পাত্র-মিত্র-মন্ত্রী-পারিষদরা কারণ জিজ্ঞেস করলে উনি উত্তর দিতেন না। এড়িয়ে যেতেন। শুধু তাই নয়, উনি আদেশ জারি করলেন একটা বিশেষ সীমার ওদিকে যেন কেউ না যায়।

চরের পশ্চিম দিকে কী ঘটেছিল–এমন কী ব্যাপার তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা কেউ জানতে পারল না আরও আশ্চর্যের ব্যাপার তিনি নাকি পশ্চিম দিকের জানলা রাত্রিবেলায় খুলতেন না।

এরপর তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ নামকরা কয়েকজন ব্রাহ্মণ আনিয়েছিলেন। আর তাদের বসবাসের জন্যে বাগআঁচড়ার কাছাকাছি একটা জায়গা ঠিক করে দেন যেখানে ব্রাহ্মণরা নিশ্চিন্তভাবে পূজা-অর্চনা করতে পারেন। সেই জায়গাটা ব্রাহ্মণরাই শাসন করতেন, চাঁদ রায় সেখানে নাক গলাতেন না। জায়গাটার নাম হয়েছিল তাই ব্রহ্মশাসন।

কালের নিয়মে এক সময় চাঁদ রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন। রাজপ্রাসাদ ভেঙে পড়ল। যুগ বদলে গেল। তারপর কোথা থেকে উদয় হলেন এই রাজাবাবু। তার নাম চন্দ্রভানু রায়। ইনি বলেন–উনি নাকি চাঁদ রায়েরই বংশধর। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর নাম নেই। চন্দ্রভানু রায় নামেই রাজা, রাজ ঐশ্বর্য আর আগের মতো নেই। থাকেন সেই পুরনো ভাঙা রাজপ্রাসাদেই নতুন করে সারিয়ে সাজিয়ে। যখন তিনি রাজা তখন তাকেও রাজার মতোই চলতে হয়। দাস-দাসী, আমলা, গোমস্তা যেমন আছে তেমনি হাল আমলের মতো রাখতে হয়েছে একজন সেক্রেটারি। সেই সেক্রেটারিই সব রাজার ডান হাত। এই সেক্রেটারিই হচ্ছে আমার বন্ধু নিশীথ।

.

কঠিন ব্যাধি

রানাঘাট স্টেশনে নেমে বাস।

এখনকার মতো তখন এত বাস ছিল না। সারাদিনে হয়তো দুখানি বাস চলত। একখানি ঝরঝরে বাস দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতরে তিলধারণের জায়গা নেই। ছাদের ওপরেও লোক। কোনোরকমে ঠেলেঠুলে ভেতরে দাঁড়াবার একটু জায়গা করে নিলাম। নতুন জায়গা নতুন পথ। ভেবেছিলাম নিশীথ আসবে কিংবা কাউকে পাঠাবে। কিন্তু তেমন কাউকে তো দেখলাম না। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে ধুলোর মধ্যে চলার পর বাগআঁচড়া পৌঁছনো গেল।

বাস থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকালাম। প্রায় ষাট বছর আগের বাগআঁচড়া এখনকার মতো ছিল না। চারিদিকে জঙ্গল। দূরে চড়ার খানিকটা দেখা যাচ্ছিল। যেরকম জানা ছিল সেরকম দিগন্তপ্রসারী চড়া আর নেই। অতীতের সাক্ষ্যস্বরূপ খানিকটা পড়ে আছে। আমি কোনদিকে যাব ভেবে পেলাম না। এমন একজন কাউকে দেখলাম না যে জিজ্ঞেস করব রাজবাড়িটা কোন দিকে।

হঠাৎ দেখলাম দূরে একটা পাল্কি আসছে। কাদের পাল্কি কে জানে। পাল্কিটা আমার কাছে এসে থামল। একজন লম্বা লাঠি হাতে পাগড়ি মাথায় লোক এসে দাঁড়াল। সেলাম করে বলল, আপনি ডাগতারবাবু? কলকাতা থেকে আসছেন?

বললাম, হ্যাঁ। নিশীথবাবু পাঠিয়েছেন?

লোকটা বলল, সেকরিটারিবাবু পাঠিয়েছেন।

যাক, বাঁচা গেল।

জীবনে কখনো পাল্কি চড়িনি। এখানে আসার দৌলতে পাল্কি চড়া হলো। কিন্তু সেও তো এক ফ্যাসাদ। গুটিসুটি মেরে কোনোরকমে তো খোলের মধ্যে ঢুকলাম। তারপর বেহারারা যতই দৌড়য় ততই আমার দুলুনি লাগে। বারে বারে কাঠে মাথা ঠুকে যায়।

পাল্কির দুপাশের দরজা খোলা ছিল। দেখতে দেখতে চলেছিলাম। দুদিকেই জলাজঙ্গল– হোগলার ঝোপ। মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে আছে বিরাট বিরাট দেবদারু গাছ। হু হু করে বাতাস বইছে। কিন্তু বাতাসটা যেন কিরকম। সে বাতাসে গা জুড়োয় না। কেমন যেন শুকনো–আগুনের হলকা মাখানো। অথচ এতক্ষণ বাসে এলাম এরকম বাতাস পাইনি।

দরজাটা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ একটা চেঁচামেচি কানে এল। মুখ বাড়িয়ে দেখলাম একটা থুথুড়ে বুড়ি এক ঝুড়ি শুকনো ডালপালা নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আর একপাল কালো কালো প্রায় উলঙ্গ ছেলে মজা করে তাকে ঢিল মারছে। বুড়ি কিন্তু তাদের কিছুই বলছে না। শুধু ঢিল থেকে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করছে। আমি আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারলাম না। বেহারাদের পাল্কি নামাতে বলে নেমে পড়লাম। তারপর আর ডাক্তার হিসাবে নিশীথ যখন আমায় ডেকেছে তখন নিশ্চয় মেয়েটার কোনো অসুখ আছে। আর যা-তা অসুখ নয়, জটিল কোনো মানসিক রোগ। নইলে নিশীথ আমাকে ডাকতে যাবে কেন? কাছেপিঠে কি ভালো ডাক্তারের অভাব আছে?

.

রাজাবাবুর সঙ্গে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্যে আলাপ করিয়ে দিয়েই নিশীথ সেই ভাঙাচোরা রাজপ্রাসাদের একতলার একটা ঘরে এনে বসাল। বলল, এই ঘরটাতে তুমি থাকবে। পুরনো বাড়ি, কিন্তু বাথরুম, জলের কল সব নতুন করে করা হয়েছে। এখানে সাপের ভয় আছে বটে তবে বাড়িতে সাপ নেই। ডজনখানেক বেঁজি পোষেন রাজাবাবু। দিনরাত বেঁজিগুলো ঘোরে বাড়িময়, ওদের ভয়ে সাপ ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারে না।

ঘেঁষতে পারে না বলে যতই আশ্বাস দিক তবু সাপ বলে কথা। খুব ভরসা পেলাম না। প্রচুর জলখাবার আর কফি খাওয়ার পর নিশীথ যা বললে তা এইরকম–

বর্তমান রাজাবাবুর একটাই দুঃখ ছিল তাদের কোনো ছেলেমেয়ে নেই। অনেক যাজযজ্ঞ করেছিলেন, অনেক সাধু-সন্ন্যাসীর কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুই হয়নি। একদিন রাজাবাবু আর রানীমা গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে চরের ওপরে একটা সদ্যোজাত শিশুকে পড়ে পড়ে কাঁদতে দেখেন। রানীমার মাতৃহৃদয় চঞ্চল হয়ে ওঠে।–আহা! কার এত সুন্দর মেয়ে গো! এর মা-বাবা কী নিষ্ঠুর। এমন মেয়েকে ফেলে দিয়ে গেছে। বলে, তাকে বুকে তুলে নেন। তারপর তাকে নিজের মেয়ের মতো মানুষ করতে লাগলেন।

কিন্তু মেয়ে যত বড়ো হতে লাগল ততই তাকে কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হলো সবার। মেয়েটি সুন্দরী। কিন্তু গলার স্বর পুরুষের মতো মোটা। তার চোখের মণি কটা। আর মাঝে মাঝে মণিদুটো ঘোরে। মেয়েটি খুব চঞ্চল। কিছুতেই এক জায়গায় বসে থাকে না। গোটা প্রাসাদ ঘুরে বেড়ায়। কেন যে অমন করে ঘোরে কে জানে! বয়স এখন তার দশ-এগারো। আর ওকে ঘরে রাখা যায় না। কেবল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

কোথায় যায়? কথার মাঝখানে আমায় জিজ্ঞেস করতে হলো।

নিশীথ বললে, ঠিক কোথায় যায় কেউ জানে না। তবে বনের দিকে যায়।

জিজ্ঞেস করলাম, তারপর ও নিজেই ফিরে আসে?

কখনও প্রহরীরা গিয়ে ধরে আনে। কখনও নিজেই চলে আসে। তবে তখন ওকে খুব ক্লান্ত মনে হয়। এসেই শুয়ে পড়ে।

কোথায় যায় জিজ্ঞেস করলে ও কি বলে?

কিছুই বলে না, উল্টে ভীষণ রেগে যায়।

জিজ্ঞেস করলাম, ও কি খুব রাগী?

সাংঘাতিক। বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর যেন রাগ বাড়ছে। রেগে গেলেই ও দৌড়োদৗড়ি, লাফালাফি শুরু করে। হাতের কাছে যা পায় ভেঙে চুরমার করে দেয়।

ডাক্তার দেখানো হয়েছিল?

নিশীথ বলল, ডাক্তার? ডাক্তার দেখলেই মারতে যায়। একবার একজন ডাক্তারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গলা টিপে ধরেছিল।

একথা শুনেই বুড়ির কথাটা মনে হয়েছিল। সে যে আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল সে কি এইজন্যেই?

নিশীথ বলল, এর রোগটা মানসিক বলেই মনে হয়। আর সেইজন্যেই রাজাবাবুকে তোমার কথা বলেছিলাম।

বললাম, কিন্তু ডাক্তার দেখলেই যদি ক্ষেপে যায় তা হলে আমি কাছেই বা যাব কি করে, চিকিৎসাই বা করব কি করে?

নিশীথ বলল, তুমি যে ডাক্তার একথা বলা হবে না। তারপর ওকে দেখে ওর সঙ্গে কথা বলে তুমি যা করতে পার কোরো।

কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা হবে কি করে? কি বলেই বা আলাপ করব?

সে কথাও আমরা ভেবে রেখেছি। ওকে বলা হবে কলকাতা থেকে একজন এসেছে। যে কাক ধরতে পারে।

আমি কাক ধরতে পারি! শুনে তো হতভম্ব।

হ্যাঁ। ও কাক খুব পছন্দ করে। ওর মর্জিমতো কত যে কাক দূর দূর পাহাড়ের দেশ থেকে ধরা হয়েছে তা দেখলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।

বললাম, কিন্তু আমি কাক ধরব কি করে?

নিশীথ বলল, তার ব্যবস্থাও হয়েছে। এ ঘরে এসো।

ও আমাকে নিয়ে পাশের ছোট্ট একটা ঘরে ঢুকল। ঘরটা অন্ধকার। তার মধ্যেই গোটা তিনেক খাঁচা চোখে পড়ল। তিনটে খাঁচাতেই বোধহয় কাক রয়েছে।

নিশীথ বলল, এসবই অম্বুজার কাক। তিনটে লুকিয়ে নিয়ে এসে রেখেছি।

আমি খুবই হতাশ হয়ে পড়লাম। এইভাবে ধাক্কা দিয়ে কি রোগীর চিকিৎসা করা যায়? অসম্ভব।

নিশীথ বলল, এবার তুমি স্নান করে খেয়ে নাও। ঐদিকে বাথরুম। চৌবাচ্চাভর্তি জল আছে। তারপর ঠাকুর এ ঘরেই খাবার দিয়ে যাবে। তোমায় কোথাও যেতে হবে না। আমি এখন যাচ্ছি।

সবেমাত্র নিশীথ চৌকাঠের বাইরে পা রেখেছে হঠাৎ দুমদাম শব্দ। শব্দটা এল দোতলার কোনো ঘর থেকে। আমি চমকে উঠলাম। নিশীথ বলল, ও কিছু নয়। অম্বুজা দরজা ঠেলছে।

অম্বুজা?

রাজকুমারীর নাম। জলের ধারে পাওয়া গিয়েছিল বলে ঐ নাম দেওয়া হয়েছে। অম্বু মানে তো জল।

নাম নিয়ে আমার মাথা ঘামাবার দরকার নেই। বললাম, ও কি ঘরে আটকে আছে?

হা, যখন-তখন পালিয়ে যায় বলে ওকে ঘরে বন্ধ করে রাখা হয়।

বলেই নিশীথ চলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা চিৎকার, দরজা খোলোদরজা খোলো

বললে কেউ বিশ্বাস করবে না গলাটা পুরোপুরি একটা রাগী পুরুষের।

ঐ গলা শোনা মাত্র বাড়ির পিছনের গাছে গাছে যে-সব পাখিরা কিচমিচ করছিল তারা থেমে গেল। উঠোনে একটা কুকুর চোখ বুজিয়ে ঘুমোচ্ছিল, হঠাৎ সোজা হয়ে কান খাড়া করে উঠে দাঁড়াল। আমি শব্দ লক্ষ্য করে দোতলার সার সার ঘরগুলোর দিকে তাকালাম। কিন্তু কোন ঘর থেকে অম্বুজা চিৎকার করেছিল তা বুঝতে পারলাম না।

খাওয়া-দাওয়ার পর লম্বা হয়ে শুয়ে বিশ্রাম করছিলাম। বিশ্রাটা হচ্ছিল শরীরের, মনের নয়। একটা চিন্তাই মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল–যে কণ্ঠস্বরটা শুনলাম সে কি একটা দশ-এগারো বছরের মেয়ের? মেয়েদেরও গলার স্বর কারো কারো মোটা হয়, কিন্তু এ যে কোনো ক্রুদ্ধ দানবের গলা। তা হলে এ তো কেবলমাত্র একটি মানসিক রোগগ্রস্ত মেয়ে নয়, অন্য কিছু। সে অন্য কিছুটা কী? আমি তার কী-বা চিকিৎসা করব?

নিস্তব্ধ দুপুর। আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগের একটা গ্রাম মাত্র। যারা পাড়াগাঁয়ে থাকে একমাত্র তারাই জানে দুপুরের নিস্তব্ধতা ওসব জায়গায় কেমন।

আমি আর শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে পারলাম না। উঠে পড়লাম। ঘরটা ভালো করে দেখলাম। সে আমলের মোটা মোটা কড়ি। আলকাতরা মাখানো। ঘরখানা ছোটোই। তিনদিকে জানলা। জানলার গায়ে লোহার জাল দেওয়া। বাড়ির পিছন দিকে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে ঘন জঙ্গল। সে জঙ্গল কতদূর পর্যন্ত গেছে কে জানে। একবার ওদিকের জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি বরাবর শহরে-থাকা মানুষ। ঘরের গায়ে একেবারে জানলার ধারেই এমন জঙ্গল কখনো দেখিনি। গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল। কিসের ভয় তা জানি না। তবু ভয়। মনে হলো কিছু একটা ঘটবে। এখানে আসা আমার উচিত হয়নি। এই জঙ্গলের ধারে– এই ঘরে আমাকে একা রাত কাটাতে হবে।

এ ঘরের মাঝখানে যে খাটটা সেটা রাজবাড়িরই উপযুক্ত। কালো বার্নিশ করা মোটা মোটা পায়। খুব উঁচু। পুরু গদি। কবেকার গদি। জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে ছোবড়া বেরিয়ে গেছে।

এবার চারপাশের জায়গাটা কিরকম দেখার জন্য দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

কোন দিকে যাব?

ঠিক করলাম বাড়িটার চারদিক আগে দেখা দরকার। বিশেষ করে দোতলার কোন ঘরে অম্বুজাকে আটকে রাখা হয়েছে সেটার যদি হদিস পাওয়া যায়।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশেই কাছারিবাড়ি। সেখানে নায়েব-গোমস্তারা একটা করে কাঠের বাক্স নিয়ে তার ওপর হিসেব-পত্তর কষছে। কিন্তু সবাই যেন বোবা হয়ে রয়েছে। কাছারিবাড়ির পাশ দিয়ে বাঁদিকে চললাম। গোড়ালি-ডোবা ঘাস। ওদিকে কলাবাগান। সজনে গাছ। কুল গাছ। একটু দূরে লম্বা লম্বা কতকগুলো দেবদারু গাছ।

আশ্চর্য হলাম সব গাছগুলোই যেন শুকিয়ে গেছে। দুটো নারকেল গাছ। একটাতেও পাতা নেই। পায়ের নিচে ঘাসগুলো কেমন হলুদবর্ণ। এমন কেন হলো?

ক্রমে গোটা বাড়িটা ঘুরে দেখলাম। অনেকখানি জায়গা নিয়ে বাড়িটা। কত যে ঘর তার হিসেব নেই। সব ভেঙে পড়ছে। ভেবে পেলাম না এখানে মানুষ কী করে থাকতে পারে।

হঠাৎ কি যেন একটা পায়ের কাছ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। চমকে লাফিয়ে উঠলাম। একটা বেঁজি।

কিন্তু এই যে বাড়ির চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছি–ঠিক কী যে খুঁজছি তা আমি নিজেও জানি না। আমি তো এই রাজবাড়ির একটি মেয়ের চিকিৎসা করার জন্যে এসেছি। তবে কেন একজন গোয়েন্দার মতো চারিদিক লক্ষ্য করে বেড়াচ্ছি?

নিজেই উত্তর খুঁজে পেলাম। আমি যে রোগীকে দেখতে এসেছি, সে সাধারণ রোগী নয়। এখানে এসে পর্যন্ত অস্বস্তিকর বাতাস, চারিদিকে থমথমে ভাব, সেই ভয়ংকর চড়া, অদ্ভুত বুড়িটা, শুকনো গাছপালা আর–আর রাজকন্যার পুরুষ মানুষের মতো গলা, কাক পোষা, বাড়ি থেকে যখন-তখন পালিয়ে যাওয়া–এসবই যেন কেমন রহস্যময়। শুধু রহস্যময়ই নয়, অশুভ কোনো কিছুর দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। একটা কথাই বারে বারে মনে হচ্ছে মেয়েটা তাহলে আসলে কী? আমার আবার বুড়ির সেই কথাটাই মনে হলো সাবধান!

.

সেই দিন রাতে

নিশীথ সেই যে চলে গিয়েছিল আর পাত্তা নেই। বুঝি তার অনেক কাজ-রাজাবাবুর সেক্রেটারি, তবু অপরিচিত জায়গায় আমাকে এভাবে একা ফেলে রাখাটা ঠিক হয়নি। এই স্তব্ধ নির্জন ঘরে কথা বলারও তো মানুষ চাই।

সারা দুপুর রাজবাড়ির চারিদিক ঘুরে পড়ন্ত বেলায় দরজার তালা খুলে ঘরে এসে ঢুকলাম।

ক্রমে সন্ধ্যে হলো। অমনি মশার ঝাক ঘেঁকে ধরল। বাড়ির চাকর গুটিগুটি এসে একটা লণ্ঠন দরজার কাছে রেখে গেল। আশ্চর্য, সেও একটা কথা বলল না। যন্ত্রের মতো শুধু ঘরে ঘরে, দালানে লণ্ঠন রেখে দিয়ে যাচ্ছে।

একটু পরে বাইরে জুতোর শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখি নিশীথ আসছে। আর তারই সঙ্গে বাবুর্চির মতো একটা লোক ট্রেতে করে চা আর ডিমের ওমলেট নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রেখে গেল।

আমি কিছু বলার আগেই নিশীথ বলল, জানি তুমি রাগ করেছ। কিন্তু আমার সমস্যা যে কতরকম তা ভাবতে পারবে না। আজকেই একটা কাণ্ড হয়ে গেছে। খাবার জন্যে অম্বুজার দরজা খোলা হয়েছিল আর সেই ফাঁকে দৌড়। ভাগ্যি প্রহরীরা ধরে ফেলেছিল! তবু ঐটুকু মেয়েকেও কায়দা করতে পারছিল না। মওকা বুঝে একজন প্রহরীকে আঁচড়ে কামড়ে এমন ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে যে তাকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে।

বললাম, ও কি বরাবর এইরকম হিংস্র প্রকৃতির ছিল?

না। যত বড় হচ্ছে ততই যেন হিংস্র হয়ে উঠছে।

একটু থেমে বলল, যাক, একটা কথা বলে নিই। অম্বুজা শান্ত হলে ওকে তোমার কথা বলেছি। তুমি কাক ধরতে পার জেনে ও চুপ করে রইল। কালকে তোমার কাছে নিয়ে আসব বলেছি। সেই সময়ে তুমি ওকে ভালো করে স্টাডি করে নিও।

আমি নিঃশব্দে মাথা দোলালাম। নটার মধ্যেই রাতের খাওয়া সেরে ভালো করে দরজা জানলা বন্ধ করে লণ্ঠনটা একটু কমিয়ে মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়লাম। বালিশের পাশে রাখলাম টর্চটা যেন দরকার হলেই পাই।

সারা দিনের ক্লান্তি আর চাপা উত্তেজনা ছিল। যতক্ষণ না ঘুম আসছিল ততক্ষণ অম্বুজার কথাই ভাবছিলাম। তাকে এখনও চোখে দেখিনি কিন্তু যা সব শুনলাম তাতে তো বেশ ঘাবড়ে যাচ্ছি। একটা দশ-এগারো বছরের মেয়ে একজন দারোয়ানের টুটি কামড়ে ধরে! তাছাড়া আশ্চর্য ঐ রাজাবাবু মানুষটি। থমথমে মুখ। নিশীথ যখন আলাপ করিয়ে দিল তখন উনি কোনো কথাই বললেন না। শুধু মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে উঠে গেলেন। এ আবার কিরকম রাজা! এত বিষণ্ণ কেন?

ভাবতে ভাবতে কখন একসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎই কিসের যেন একটা মৃদু শব্দ পেলাম। ঘুমের ঘোরে প্রথমে মনে হয়েছিল এদিকের জানলার ধারে টানা বারান্দা দিয়ে বুঝি কেউ আসছে। কিন্তু তারপরেই মনে হলোনা, শব্দটা বাইরে থেকে আসছে না। ঘরের ভেতরেই। আর তা আমার খাটের কাছেই।

আমার মেরুদণ্ড দিয়ে যেন একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। সারা গা কাঁটা দিয়ে উঠল। সব দরজা-জানলা বন্ধ তবু কে ঘরে আসতে পারে? যেইই আসুক সে যে কখনোই মানুষ হতে পারে না এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।

মৃদু শব্দটা তখন ঘুরছে খাটের এদিক থেকে ওদিক। লক্ষ্য যে আমিই, আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে তা অনুভব করতে পারলাম। কিন্তু কী ওটা? পায়ের শব্দ নেই, নিঃশ্বাসের শব্দ নেই, অথচ ঘরের মধ্যেই কিছু একটা আছে। আমি ইচ্ছে করেই টর্চ জ্বালোম না। অন্ধকারের মধ্যেই এতটুকু না নড়ে ঠাওর করার চেষ্টা করলাম। কিছু দেখতে পেলাম না।

হঠাৎ আমার পায়ের দিকের মশারিটা নড়ে উঠল। মনে হলো কেউ যেন মশারিটা তোলবার চেষ্টা করছে। ভয়ে পা দুটো টেনে নিলাম। তারপরেই বস্তুটা যেন জানলার ধারে চলে গেল। গিয়ে পাশ থেকে মশারিটা তোলবার চেষ্টা করতে লাগল। আমি তাড়াতাড়ি বাঁ দিকে গড়িয়ে এলাম। সেও এবার সরে এল মাথার কাছে। এখন কোনো শব্দ নেই। শুধু নিঃশব্দে চেষ্টা চলছে আমার মশারির মধ্যে ঢোকবার। এবার মাথার দিকের মশারিটা তুলছে…আমি বালিশ দিয়ে জোরে মশারির প্রান্তটা চেপে ধরলাম। আর তখনই দেখলাম দুটো ছোট গোল গোল চোখ আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

যা থাকে কপালে ভেবে টর্চটা টেনে নিয়ে জ্বালোম। একটা বিকট কাক। বেশ বড়োসড়ো। বোধহয় পাহাড়ী কাক। এরকম অদ্ভুত কাক দেখা যায় না। কিন্তু ….ঘরের মধ্যে কাক এল কোথা থেকে? সে কথা ভাবার সময় পেলাম না। চোখের ওপর টর্চের আলো পড়া মাত্র কাকটা লম্বা ঠোঁট দুটো ফাঁক করে ফের মশারির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। টর্চ দিয়ে তাড়া করতে এবার মশারির চালে এসে বসল। বসামাত্রই তার ভারে মশারিটা অনেকখানি ঝুলে পড়ল। আমি প্রমাদ গুনলাম। ভয়ংকর কাকটা চালের ওপরে। ক্রমশই চালটা নিচু হচ্ছে। নড়েচড়ে যে আত্মরক্ষা করব তার উপায় নেই। মশারি থেকে বেরোতেও সাহস হয় না। তা হলে তো চোখ দুটো খুবলে নেবে। কোনোরকমে উপুড় হয়ে শুয়ে কি কর্তব্য ভাবতে লাগলাম।

কেমন সন্দেহ হওয়ায় আবার টর্চ জ্বালোম। আঁৎকে উঠলাম। কাকটা মশারির চাল ফুটো করে গলা আর বুক ঢুকিয়ে দিয়েছে। দুটো লম্বা ঠোঁট আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি আর এতটুকু দেরি না করে টর্চ দিয়ে জোরে এক ঘা বসিয়ে দিলাম। আঘাতটা বোধহয় মাথায় না লেগে পিঠে লাগল। দারুণ যন্ত্রণায় ডানা ঝাঁপটে মশারি থেকে উড়ে গিয়ে সশব্দে মেঝেতে পড়ল।

আমি তবু বেরোতে পারলাম না। মশারির মধ্যেই কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে রইলাম। হাতের মুঠোয় ধরা টর্চটা। ঐ রাক্ষুসে কাকের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার ওটাই এখন আমার একমাত্র অস্ত্র।

সকালে উঠেই মেঝের দিকে তাকালাম। কাকটা নেই। অবাক হলাম। যে কাকটা প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল, সে উড়ে পালাল কি করে? কাকটা ঘরে ঢুকলই বা কি করে? তখনই মনে পড়ল–তাই তো পাশের ছোটো ঘরটায় তিনটে খাঁচায় তিনটে কাক ছিল। বোধহয় একটার খাঁচা খোলা ছিল। বেরিয়ে পড়েছিল।

পাশের ঘরে ঢুকতে যেতেই ধাক্কা খেলাম। দরজায় তো শেকল তোলা।

তা হলে?

শেকল খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি তিনটে খাঁচারই দরজা বন্ধ। আর তার মধ্যে তিনটে কাকই ঘাড় বেঁকিয়ে বিরক্ত হয়ে আমাকে দেখছে।

একটু বেলায় নিশীথ এসে যখন জিজ্ঞেস করল, রাতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো? তখন সব ঘটনা খুলে বললাম। শুনে ওর মুখ-চোখের ভাব এমনিই হয়ে গেল যে আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম, কি হলো? এত কী ভাবছ?

নিশীথ বললে, ভাবছি অনেক কিছু।

বললাম, আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে কাকটা পালাল কোথা দিয়ে? সব দরজা জানলাই তো বন্ধ ছিল।

ও বলল, যেদিক দিয়ে ঢুকেছিল সেই দিক দিয়েই বেরিয়ে গেছে। বলে আঙুল দিয়ে কোণের ঘুলঘুলিটা দেখিয়ে দিল।

কিন্তু ব্যাপারটা অন্য। নিশীথ বলতে লাগল, আমি ভাবছি অম্বুজা তোমার ওপর চটল কেন? তোমাকে এখনও দেখেইনি। তুমি যে ডাক্তার সে কথাও বলিনি। তাহলে?

আমি অবাক হয়ে বললাম, ও আমার ওপর চটেছে বুঝলে কি করে?

নিশীথ গম্ভীর গলায় বলল, কাকগুলো সব ওর পোষা। ঐ কাকটাকে ও-ই পাঠিয়েছিল তোমার টুটি ছিঁড়ে দেবার জন্যে। একটু থেমে বলল, শোনো ভাই, তুমি না হয় কলকাতায় ফিরেই যাও। এখানে থেকে দরকার নেই।

বললাম, এসেছি যখন তখন দুদিন থেকেই যাই। রাজনন্দিনী অম্বুজাকে একবার অন্তত চোখের দেখা দেখে যাব।

চোখের দেখা হলো সেদিন বেলা দশটা নাগাদ। ভাগ্যিস হলো, না হলে আমার ওপর রাগের কারণ জানতেই পারতাম না।

নিশীথই সঙ্গে করে এনেছিল।

সে দেখল আমায় অবাক হয়ে। তার চঞ্চল দৃষ্টি আমার গলার কাছ পর্যন্ত এসে থমকে গেল। কেমন যেন হতাশ হলো। ক্রুদ্ধ হলো। বোধহয় ও নিশ্চিত ছিল ওর পাঠানো কাকটা গত রাতে আমার চোখ খুবলে নিয়েছে, নয় তো টুটি কামড়ে দিয়েছে।

আমিও ওকে ভালো করে দেখলাম। এই কি সেই পরমাসুন্দরী মেয়ে যাকে মহারানী কুড়িয়ে পেয়েছিলেন? দেখলে কে বলবে দশ-এগারো বছরের মেয়ে। ফর্সা রক্ত। কিন্তু মুখটা যেন ইটের তৈরি। শক্ত কঠিন। সরলতা বা লাবণ্যের ছিটেফোঁটা নেই। চোখ দুটো যেন সবসময়ে অপ্রসন্ন। কপালে ভ্রূকুটি সেঁটেই আছে। ঐটুকু মেয়ের চুল কোমরের নিচে পর্যন্ত ঝুলছে। খসখসে চুল। পরনে লুঙ্গির মতো করে পরা শাড়ি। গায়ে বেনিয়ান।

নিশীথ বিনীতভাবে বললে, রাজকুমারী, এই আমার বন্ধু অসিত। কলকাতায় থাকে। ওর ব্যবসা পাখি ধরার। চিড়িয়াখানায় যোগান দেয়। আর কাক ধরতেও ওস্তাদ। কাক ধরবার জন্যে পশ্চিমে পাহাড় পর্যন্ত যায়। এই দ্যাখো, কয়েকটা নমুনা এনেছে। বলে খাঁচা তিনটে এনে সামনে রাখল।

রাজকুমারী কিন্তু সেদিকে ফিরেও তাকাল না। কর্কশ পুরুষ কণ্ঠে বললে, তুমি কি জন্যে এখানে এসেছ?

বললাম, আপনি কাক পছন্দ করেন। আমি কাক ধরতে পারি। তাই নিশীথ আসতে বলেছিল।

রাজকুমারী হুংকার দিয়ে বললে, মিথ্যে কথা। তুমি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এসেছ।

বললাম, না-না, আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।

উদ্দেশ্য নেই? অম্বুজার দুচোখ জ্বলে উঠল। উদ্দেশ্য নেই তো কাল সারা দুপুর চোরের মতো আমার ঘরের নিচে ঘুরছিলে কেন?

আশ্চর্য! এই কি একটা দশ-এগারো বছর বয়েসের মেয়ের কথা?

বললাম, আপনার কোন ঘর তা তো জানি না। আমি নতুন এসেছি। এত বড়ো ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ–তাই ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম।

রাজকুমারী পুরুষের গলায় বলল, ওসব জানি না। যত শীগগির পার এখান থেকে চলে যাও। বলে বাঁ হাতটা তুলে বাইরের পথটা দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল।

বাইরের পথটা আমার তখন দেখার অবসর ছিল না। আমি দেখছিলাম ওর বাঁ হাতটা। বেঁটে বেঁটে মোটা আঙুল। আর হাতটা ছিল লোমে ঢাকা।

নিশীথের মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। বললে, কাজ নেই ভাই, তোমার এখানে থেকে। তুমি চলেই যাও।

আমি হেসে বললাম, এসেছি যখন তখন অত সহজে যাব না। তুমি এক কাজ করো। ওকে গিয়ে বলে আমার জ্বর এসে গিয়েছে। নড়তে পারছি না। যা হোক করে দুতিনটে দিন আমায় থাকতেই হবে।

সন্ধ্যেবেলায় টেবিলের ওপর উঠে ঘুলঘুলিটা একটা ইট দিয়ে বুজিয়ে দিলাম। তবুও ভয়ে ভয়ে রাতটা কোনোরকমে কাটালাম। চোখের সামনে কেবলই ভেসে উঠছিল অম্বুজার সেই বীভত্স হাতটা। ও কি মানুষের হাত? এইরকম একটা হাত দেখেও রাজবাড়ির সকলে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় কি করে?

সেদিনও দুপুরবেলায় ফের রাজবাড়ির পিছনের দিকে যেতে হয়েছিল। ইচ্ছে করে যাইনি। খাওয়া-দাওয়ার পর চেয়ারটা ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে বসে বসে আমার কর্মপন্থার কথা ভাবছিলাম। থেকে তো গেলাম। কিন্তু কেন থাকলাম? অম্বুজার রহস্য-উদঘাটন? তা সম্ভব কি করে? ওর তো দেখা পাওয়াই ভার। তখন ঠিক করলাম যেমন করে তোক দোতলায় আমায় একবার গোপনে উঠতেই হবে। কিন্তু

হঠাৎ সোঁ সোঁ করে কিসের একটা আওয়াজ শুনে চমকে ওপর দিকে তাকালাম। বিশাল একটা কাকের মতো কী যেন সেই চরের দিক থেকে সাঁ করে উড়ে এসে রাজপ্রাসাদের পিছন দিকে চলে গেল। জিনিসটা কি দেখার জন্যে তখনই সেই দিকে ছুটলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না।

আমি গোটা বাড়িটার চারিদিক ঘুরে ঘুরে দেখলাম। প্রত্যেকটি গাছের ডালের দিকে তাকাতে লাগলাম। তারপর দোতলার ঘরগুলোর দিকে–যদি কোনো জানলা খোলা থাকে হয়তো তার ভেতর দিয়েই ঢুকে পড়েছে। জানলাগুলোও তো সাবেক আমলের মতো বড়ো বড়ো। গরাদ নেই। শুধু বিবর্ণ রঙের পাল্লা। কোনো কোনোটার পাল্লা ভেঙে ঝুলছে। তবু নাকি এটা রাজপ্রাসাদ। সেখানে একজন রাজাও থাকেন যাকে বড়ো একটা দেখা যায় না। গলার স্বরটুকু পর্যন্ত শোনা যায় না।

হতাশ হয়ে ফিরে আসছিলাম। ভিজে ঘাস–কোথাও মাটি। পায়ে একটা পিঁপড়ে কামড়াতেই দাঁড়িয়ে পড়ে দু-আঙুলের চাপে পিঁপড়েটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলাম। আর তখনই চোখে পড়ল মাটিতে কয়েকটা পায়ের ছাপ। সে ছাপ বেশ বড়। সাধারণ মানুষের মতো নয়। ছাপগুলো দেখে মনে হলো পায়ের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক বেঁটে বেঁটে।

দোতলার একটা ঘরের ঠিক নিচে এই পায়ের ছাপ এল কি করে?

আমি পায়ের ছাপের বিশেষজ্ঞ নই। তবু এটুকু বুঝতে পারলাম এই পায়ের অধিকারী যে সে দৌড়ে বনের দিকে গেছে। কিন্তু কোথা থেকে এসেছিল তার কোনো চিহ্ন নেই।

আমি সেখানে বেশিক্ষণ আর দাঁড়াতে সাহস পেলাম না। কি জানি দোতলা থেকে যদি অম্বুজা দেখে ফেলে তাহলে আর রক্ষে নেই। চিন্তা-ভারাক্রান্ত মনে ঘরে ফিরে এলাম।

একে তো অম্বুজার চেহারা, তার অদ্ভুত গলার স্বর, আচরণ আমায় ভাবিয়ে তুলেছিল, তার ওপর এই এক উটকো চিন্তা মাথায় ঢুকল। অত বড়ো কালো পাখির মতো জন্তুটা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে এসে হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল! ঐ পায়ের ছাপগুলোই বা কার? আমি কি কোনো অলৌকিক জগতে বাস করছি? আমি কি ভুলে যাচ্ছি আমি কলকাতায় থাকি আর আমি একজন ডাক্তার?

সন্ধ্যের পর নিশীথ এল দেখা করতে। মুখটা যেন দুশ্চিন্তায় কালো।

চা খেয়েছ?

বললাম, হ্যাঁ।

কি ঠিক করলে?

বললাম, দুতিন দিনের মধ্যে যাচ্ছি না। তুমি অম্বুজাকে বলেছ তো আমি অসুস্থ?

তা বলেছি। কিন্তু বিশ্বাস করেছে বলে মনে হলো না।

আচ্ছা, রাজাবাবুর সঙ্গে কাল সেই একবার দেখা হয়েছিল। আর তো দেখিনি এর মধ্যে?

নিশীথ আমার প্রশ্নে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বললে, মেয়েটিকে নিয়ে তো ওঁর সব সময়েই মাথা খারাপ। দিন দিনই কিরকম হয়ে যাচ্ছে। অথচ কোনো উপায় নেই।

রানীমা?

নিশীথ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, দেড় বছর হলো উনি মারা গেছেন।

কেন জানি না শুনে যেন ধাক্কা খেলাম। বুঝতে পারলাম কেন রাজাবাবু নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন।

আচ্ছা, রানীমা—

নিশীথ আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল, প্লিজ ভাই, আর প্রশ্ন কোরো না।

আচ্ছা, আমায় একটু সাহায্য করবে?

নিশীথ যেন বিব্রত হয়ে বলল, কি বলো।

আমায় একবার দোতলায় নিয়ে যেতে পার?

দোতলায় কেন?

এলাম যখন পুরনো রাজপ্রাসাদের দোতলাটাও দেখে যেতে ইচ্ছে করছে। জীবনে তো নতুন বা পুরনো কোনো রাজবাড়িরই দোতলায় ওঠা সম্ভব হয়নি।

নিশীথ ভুরু কুঁচকে বলল, তোমার মতলবটা কী বলো দেখি।

আমি হেসে বললাম, অম্বুজার ঘরটা একবার দেখতে চাই।

ঐ সাংঘাতিক মেয়েটার ঘর দেখবে! তুমি কি এখনও ওকে বুঝতে পারনি?

বললাম, কিছুটা পেরেছি। পুরোটা পারিনি।

নিশীথ বললে, না ভাই, ও আমি পারব না।

বললাম, আমার এ অনুরোধ তোমায় রাখতেই হবে। বেশ, আমি ওর মুখোমুখি হতে চাই না। আড়াল থেকে ওর একটা ছবি তুলতে চাই।

বাঃ! চমৎকার! তারপর কাগজে কাগজে ছবিটা ছেপে রাজাবাবুর মাথা হেঁট করে দাও। ছিঃ!

আমি ওর হাত ধরে বললাম, আচ্ছা, কথা দিচ্ছি ছবি তুলব না। কিন্তু তুমি আমায় একটিবার দোতলায় নিয়ে চলো। না হয় ওকে যখন ঘরে তালা এঁটে রাখা হয় তখনই নিয়ে যেও। আমি দোতলাটা শুধু একবার দেখব।

নিশীথ অনিচ্ছাসত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আমার অনুরোধ ঠেলতে পারল না। রাজী হলো।

ও চলে যাচ্ছিল, আমি ডেকে বললাম, আচ্ছা, তোমাদের এখানে কাকজাতীয় বিরাট কোনো কিছু উড়তে দেখেছ?

নিশীথ অবাক হয়ে বলল, সে আবার কী! এতকাল এখানে আছি অমন কিছু তো দেখিনি। কেন? তুমি কিছু দেখেছ নাকি?

বললাম, ঐরকম যেন কিছু দেখলাম দুপুরবেলায়।

কোন দিক থেকে এল?

আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম, ঐ দিক দিয়ে।

তার মানে পুরনো চরার দিক থেকে। কোথায় গেল?

কি জানি। হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে গেল।

নিশীথের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। শুধু বলল, এবার আমাকেও বোধ হয় চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হবে।

.

রাজপুরী নয়তো যেন মৃতের পুরী

পরের দিন দুপুরে নিশীথ আমাকে দোতলায় নিয়ে চলল। ও একটা কথাও বলছিল না। বুঝতে পারছিলাম ও চাইছে না আমি ওপরে যাই।

চওড়া চড়ড়া কাঠের সিঁড়ি। সিঁড়িগুলো ভাঙা ভাঙা। দেওয়ালেও অজস্র ফাঁক-ফোকর। সিঁড়িটা অনেক ঘুরে ওপরে উঠেছে। এক-একটা বাঁকে ছোটো ছোটো খুপরি ঘর–বেশির ভাগই তালাবন্ধ। মর্চে ধরা পুরনো তালা। কবে যে সে তালা শেষ লাগানো হয়েছে তা কেউ বলতে পারে না। সেসব ঘরের দরজাগুলোও ভেঙে পড়ার মতো। কি আছে ওসব ঘরে কে জানে।

দোতলায় উঠে টানা বারান্দা। দুপাশে ঘর। প্রায় প্রত্যেক ঘরেই লোকজন আছে। এত লোক আছে অথচ এই দুদিনে তা বোঝাই যায়নি। কয়েকজনকে দেখলামও। কিন্তু তাদের জীবন্ত মানুষ বলে মনে হলো না। মুখে কথা নেই, আমি যে একজন নতুন মানুষ ওপরে এসেছি–তা কোনো কৌতূহলই নেই। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আশ্চর্য এই যে, এরা যেন সবাই মুখে কুলুপ এঁটে আছে। কথা নেই। সবারই চোখের চাউনিতে ভয় ভয় ভাব–এই বুঝি কিছু হয়। আমার মনে হলো এরা যেন এ জগতের বাসিন্দা নয়। কোথা থেকে কোথায় এসেছে জানে না। কেউ কাউকে চেনে না। অথচ পরে নিশীথের কাছ থেকে জেনেছিলাম এরা সবাই রাজপরিবারেরই। বসে বসে রাজার অন্নধ্বংস করছে। তাদের অন্য কোথাও যাবার উপায় নেই বলেই দুচোখে চাপা আতঙ্ক নিয়ে এখানে পড়ে আছে। আতঙ্ক কাকে নিয়ে তা বুঝতে বাকি রইল না।

বললাম, রাজাবাবু কোন ঘরে থাকেন?

ঐ দিকে। কিন্তু ওখানে যাওয়া নিষেধ।

একটা তালাবন্ধ ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

এটা কার ঘর?

অম্বুজার।

ও এখন ঘরে কি করছে?

নিশীথ গম্ভীরভাবে বলল, জানি না। এবার চলো। আর নয়।

হঠাৎ দরজার ভেতর থেকে ক্রুদ্ধ গলা পাওয়া গেল, কে ঘুরছে বারান্দায়?

নিশীথ দরজার কাছে মুখ এনে বলল, আমি নিশীথ। দরজা খুলে দাও।

নিশীথ আমার হাত ধরে তাড়াতাড়ি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে এল। চলে আসবার সময় দেখলাম অম্বুজার ঘরের এদিকে একটা জানলা আছে। পাছে খোলে সেজন্য শেকল বাঁধা।

আমরা সবে সিঁড়ি দিয়ে নামছি, দরজায় দুমদাম শব্দ। সেই সঙ্গে ক্রুদ্ধ মোটা গলায় চিৎকার, দরজা খোলো, দরজা খোলো।

সন্ধ্যের পর নিশীথ যথারীতি এল। ও যেন এ দুদিনে কেমন হয়ে গেছে। আমার চেয়েও যেন ও-ই বেশি ভয় পেয়েছে। বিনা ভূমিকায় বলল, শোনো, ঐ কাক-টাকের কথা কাউকে বলো না যেন। সবাই ভয়ে অস্থির হয়ে যাবে।

মনে মনে হাসলাম, তাও তো অম্বুজার ঘরের নিচে মাটিতে সেই পায়ের ছাপের কথা প্রকাশ করিনি।

বললাম, বলব আর কাকে? এত বড়ো বাড়িতে লোক বলে কেউ আছে? ওপরে যাদের দেখলাম ওরা তো সবাই এক-একটা মমি। সেই রূপকথায় রাক্ষসের গল্প পড়েছিলাম রুপোর কাঠি ছুঁইয়ে মড়ার মতো করে রেখেছিল, সেই রকম।

নিশীথ চুপ করে রইল।

বললাম, আচ্ছা, অম্বুজা ঘরে একলা থাকে কেন? সঙ্গে কেউ থাকলে তো পালাতে পারবে না।

নিশীথ বলল, ও কাউকে নিয়ে শুতে চায় না। অবশ্য এতগুলো আত্মীয় রয়েছে, তাদের কাউকে বললে শোবেও না।

কেন?

কেন তা তো দেখতেই পাচ্ছ। তা ছাড়া–এই পর্যন্ত বলে নিশীথ থেমে গেল।

থামলে কেন?

তা ছাড়া এ বাড়ির সকলের ধারণা হয়েছে ওর সঙ্গে যে শোবে সেই মরে যাবে।

আমি অবাক হয়ে বললাম, সে আবার কি?

হ্যাঁ, রানীমা, ওকে খুব ভালোবাসতেন। তাই ওর কাছেই সেই ছোটোবেলা থেকে বরাবর শুতেন। কিন্তু হঠাৎ দেড় বছর আগে ঐ মেয়ের পাশে শুয়েই মরে গেলেন। অথচ কোনো রোগ হয়নি। তারপর আরও তিনজন মেয়েকে ওর ঘরে শোবার জন্যে পাঠানো হয়েছিল। জলজ্যান্ত মেয়ে। পরপর তিনটেই মরে গেল।

কিসে মরত?

কেউ বলতে পারল না। কোনো রোগ ছিল না। শুধু সকালে দেখা যেত ঠোঁট নীল হয়ে গেছে। একটু থেমে বলল, বোধ হয় সাপে কামড়েছিল।

কথাটা যে সেও বিশ্বাস করে না তা ওর গলার টোন শুনেই বোঝা গেল।

এটাও আমার কাছে নতুন তথ্য। বিষে নীল হয়ে যেত। এমনি সময়ে হঠাৎ একজন প্রহরী ব্যস্ত হয়ে নিশীথকে ডেকে নিয়ে গেল। নিশীথ চা খাচ্ছিল, অর্ধেক খেয়েই আমি আসছি বলে উঠে গেল। আমি হতভম্বর মতো বসে রইলাম। না জানি আবার কী রহস্যজনক খবর শুনব।

খবরটা রহস্যজনকই বটে। সেদিন দুপুরে দরজা খোলা পেয়ে অম্বুজা যখন পালাচ্ছিল তখন সে প্রহরীর টুটি কামড়ে দিয়েছিল, হাসপাতাল থেকে খবর এসেছে সে এই মাত্র মারা গেছে।

অত অল্প ক্ষতে মরবার কথা নয়, রক্তপাতও বেশি হয়নি। তবু মরল। ডাক্তাররা বলেছে তীব্র বিষক্রিয়ায় মৃত্যু।

আমি চমকে উঠলাম। অম্বুজার দাঁতে এত বিষ! কি করে?

.

আবার দোতলায়

গভীর রাতে সেদিন যখন আমি দোতলার সিঁড়ির মুখে গিয়ে দাঁড়ালাম তখন ভরা অমাবস্যার ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। সন্ধ্যের পর থেকেই বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মনে হয় গোটা বাড়িটাই যেন কোনো অশুভ শক্তির মুঠোর মধ্যে চলে গেছে। কারও কিছু করার নেই। শুধু অপেক্ষা। করে থাকা কবে সেই চরম সর্বনাশের মুহূর্তটি আসবে।

এ কদিনে অম্বুজা সম্বন্ধে আমার এই ধারণাই হয়েছে–দশ-এগারো বছরের বালিকাটি নিমিত্তমাত্র। তার আড়ালে লুকিয়ে আছে একটা ভয়ানক দানব। সেই দানবটিকে দেখতে চাই।

সমস্ত প্রাসাদটা নিঝুম। মাঝে মাঝে বাগানের কোনো গাছে রাতজাগা পাখি ডানা ঝটপটিয়ে উঠছে। তারাও কি কোনো কিছুর ভয় পাচ্ছে?

আমি হাতের মুঠোয় টর্চটা ধরে সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে উঠতে লাগলাম। সেদিন দিনের বেলায় নিশীথের সঙ্গে এসে সিঁড়ি, ঘরগুলো সব চিনে রেখেছি।

নিঃশব্দে একটার পর একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। হঠাৎ হঠাৎ থেমে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার পিছনে কেউ যেন আসছে। যে কোনো মুহূর্তে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু পিছু ফিরে দেখি কেউ নেই।

থাকবেই বা কে? সবাই তো ঘুমে অচেতন।

আরো কয়েক ধাপ উঠতেই একেবারে আমার গায়ের কাছে বাঁ দিকে কেমন যেন একটু শব্দ হলো। আমি চমকে তাকাতেই দেখলাম সেই তালা দেওয়া একটা ঘুপচি ঘরের দরজার ওপর দুটো চোখ জ্বলছে। একটু ঠাওর করতেই আঁৎকে উঠলাম। কাক। সেই ভয়ংকর কাক।

সেদিনের রাতের ঘটনার পর থেকে আমার কেমন কাকের ওপর ভয় ধরে গেছে।

আমি নিঃশব্দে আরও দুধাপ উঠে এলাম। আবার একটা ঘুপচি ঘর। আবার একটা কাক। এইরকম পরপর পাঁচটা। কাকগুলো কোনো শব্দ করছে না। শুধু আমায় লক্ষ্য করছে।

একই ধরনের এত কাক এলো কোথা থেকে?

তখনই মনে পড়ল অম্বুজার কাক পোর কথা। শুধু পোষাই নয়, কাকগুলো সিঁড়ির ধাপে ধাপে বসে যেন পাহারা দিচ্ছে।

আমি দোতলার টানা বারান্দায় উঠে এলাম। সেই ঘরগুলো যেখানে আগের দিন মানুষজন দেখেছিলাম সব বন্ধ। শুধু দরজাই বন্ধ নয়, জানলাগুলোও। এত ভয়?

আমি এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম অম্বুজার ঘরের সামনে। দরজা বাইরে থেকে তালা বন্ধ। আমি দরজায় কান পেতে শুনলাম ঘরের ভেতরে একটা মৃদু শব্দ হচ্ছে–ধূপ ধুপ ধুপ

এত রাতে অম্বুজা একা কী করছে?

আমি তখনই এদিকের সেই শেকলবাঁধা জানলাটার কাছে চলে এলাম। একটা খড়খড়ি সামান্য একটু ফাঁক করে দেখতে লাগলাম। ঘরের মধ্যে একটা পিলসুজের ওপরে মস্ত একটা পেতলের প্রদীপ জ্বলছে। আর একটা লম্বা ধূপ নিঃশব্দে পুড়ছে। অম্বুজা মাতালের মতো নাচছে।

তার সেই অদ্ভুত নাচ দেখতে দেখতে আমার চোখ পড়ল ধূপকাঠিটার দিকে। ওটা সাধারণ ধূপকাঠি নয়। গলগল করে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে। আর আশ্চর্য-সেই ধোঁওয়া অম্বুজার নাচের তালে তালে একটা অস্পষ্ট মূর্তি ধরে কেঁপে কেঁপে নাচছে। সে মূর্তি কোনো মেয়ের কি ছেলের, মানুষের কি দানবের বোঝা গেল না।

আমি বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে সেই ধূপের ধোঁওয়ার অলৌকিক নাচ দেখছিলাম। কতক্ষণ ঐভাবে আচ্ছন্নের মতো কেটেছে জানি না। একসময়ে ধূপটা নিঃশেষ হয়ে গেল। একগাদা ছাই মেঝের ওপর পড়ে রইল। অম্বুজা সেই ছাই কপালে মেখে হঠাৎ মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে তিনবার কাকে যেন প্রণাম করল। আমি তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছি।

হঠাৎ এ কী……এ কী!

অম্বুজা ছুটে গেল খোলা জানলাটার দিকে। তারপর মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপ দিল দুহাত তুলে। এদিকে ওর ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে।

অম্বুজাকে ধরবার এই মস্ত সুযোগ মনে করে আমি তখনই সিঁড়ির দিকে ছুটে গেলাম। কিন্তু–এ আবার কী!

গোটা কুড়ি বিদকুটে দেখতে কাক লাইন করে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে।

কি করব–কোন দিক দিয়ে পালাব ভাবছি, কাকগুলো সার বেঁধে তাদের লম্বা লম্বা ঠোঁট ফাঁক করে আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। বুঝলাম এখনি ওরা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমায় খুবলে খুবলে শেষ করে দেবে। অগত্যা আমি আমার একটি মাত্র অস্ত্র টর্চটাকে সহায় করলাম। বোতাম টিপলাম। টর্চের জোরালো আলো ওদের চোখে পড়তেই ওরা যেন একটু ঘাবড়ে গেল। সেই সুযোগে দালান থেকে সিঁড়ির ধাপ লক্ষ্য করে জোরে লাফ মারলাম। ওই কাকগুলোকে ডিঙিয়ে একটা চওড়া সিঁড়ির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। কাঠের সিঁড়ি। জোর শব্দ হলো। ভাবলাম এখনি বুঝি লোকজন ছুটে আসবে। কিন্তু কেউ এল না। ভয়ে সবাই দরজায় খিল এঁটে শুয়ে রইল।

আমি উঠে নিচের তলায় আসার আগেই কাকগুলো আক্রমণ করল। মাথার ওপর, কাঁধে, পিঠে কালো কালো ডানার ঝাঁপটা–উঃ কী দুর্গন্ধ ওদের পাখায়! আমি টর্চটা হাতের মুঠোয় ধরে এলোপাথাড়ি ওদের পিটোতে পিটোতে কোনোরকমে নিচে নেমে ছুটে ঘরে ঢুকে খিল বন্ধ করে দিলাম।

খিল বন্ধ করেও নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। সারারাত কাকগুলো আমার দরজা ঠুকরেছে।

.

পরের দিন সকালবেলায় চা খাবার সময়ে নিশীথ এল। তার প্রথম কথাই হলো, কবে যাচ্ছ?

হেসে বললাম, আর দুএকটা দিন।

ও খুশি হলো না। বলল, যে জন্যে তোমাকে আনালাম তার তো কিছুই হলো না।

বললাম, রোগীকে ভালো করে দেখতেই পেলাম না তো চিকিৎসা করব কী?

তা শুধু শুধু এখানে বসে করছটা কি?

বললাম, তোমাদের অম্বুজার রহস্য ভেদ করবার চেষ্টা করছি।

নিশীথ অবাক হয়ে বললে, এ কি খুন-খারাপির ব্যাপার যে রহস্যভেদ করবে?

বললাম, খুন-খারাপি হয়নি? রানীমার মৃত্যু হলো কিসে? রাত্তিরে ওর পাশে যে-ই শোয় তার মৃত্যু হয় কেন? কেন ওদের ঠোঁট বিষে নীল হয়ে যায়? কেন প্রহরীটা মরল? কেন ডাক্তার বললে, বিষক্রিয়ায় ওর মৃত্যু হয়েছে? রাজবাড়ির কেউ একবারও ভাবল না কেন– কোথা থেকে এই বিষ এল? একবারও তোমরা চিন্তা করে দেখলে না কেন-কেমন করে একটা দশ-এগারো বছরের মেয়ের গলার স্বর পুরুষের মতো হতে পারে? কেমন করে তার বাঁ হাতের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক মোটা মোটা হয়? শুধু ঐ হাতটাই বা কেন বনমানুষের মতো লোমশ? কেন তোমরা কেউ তলিয়ে দেখলে না ঘর থেকে পালিয়ে কোথায় যেতে চায় অম্বুজা? ঘরের ভেতরে একা ও কী করে তারও কি খোঁজ রাখ? রাখ না। তা যদি রাখতে তা হলে বুঝতে মেয়েটা সামান্য একটা রোগী নয়। সে আরও ভয়ংকর। একটা বাচ্চা নিষ্পাপ মেয়ের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে একটা দানবশক্তি। সেই দানবের আমি তল্লাশ করব। দেখব কোথা থেকে সে এল, কেন এল?

নিশীথ হাঁ করে আমার কথাগুলো শুনে গেল–যেন কথাগুলো বিশ্বাস করবে কি করবে না বুঝতে পারছিল না। হঠাৎ ও বললে, কাল অনেক রাতে দোতলায় সিঁড়িতে একটা জোর শব্দ পেয়েছিলে?

মনে মনে হেসে বললাম, কই না তো।

ওরে বাপরে! মনে হলো কেউ যেন কাউকে সিঁড়ির ওপর আছড়ে ফেলল।

তুমি বেরিয়েছিলে নাকি দেখতে?

নিশীথ শুধু একটা কথাই বলল, পাগল!

বললাম, অম্বুজা কি জানে আমি এখনও এ বাড়িতে আছি?

বোধহয় না। জানলে কি আর তোমার রক্ষে ছিল?

জানলে কি করতে পারত?

নিশীথ অন্যমনস্কভাবে বলল–ঠিক বলতে পারি না। তবে কিছু ক্ষতি ও করতে পারেই। নইলে বাড়িসুষ্ঠু লোক কি আর এমনি এমনি একটা দশ-এগারো বছরের মেয়েকে ভয় পায়!

এক সময়ে নিশীথ চলে গেল। আমি ঘর থেকে আর বেরোলাম না। বসে বসে একটা খাতায় অম্বুজার ব্যাপারটা লিখতে লাগলাম। শেষে লিখলাম–আমি জানি আজ রাত্তিরেই ঘটবে সেই চরম ঘটনাটা যা এখনও আমি কল্পনা করতে পারছি না। আপনা-আপনি ঘটবে না। ঘটাব আমিই।

.

বিপদের মুখে

রাত একটা।

শুধুমাত্র টর্চটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গোটা বাড়িটা নিঝুম। সব ঘরের জানলাগুলো পর্যন্ত বন্ধ। আমি ধীরে ধীরে উঠোন পেরিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। এবার যেতে হবে বাঁয়ে রাজবাড়ির পিছন দিকে। খুব সাবধানে পা ফেলে গোড়ালি-ডোবা ঘাসের ওপর দিয়ে এগিয়ে চললাম। নিজের সামান্য পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার পিছনে যেন কেউ আমারই মতো পা টিপে টিপে আসছে। এ কথা মনে হতেই বুক কেঁপে উঠছিল। একবার ভাবলাম ফিরে যাই। কী দরকার এভাবে গিয়ে? কিন্তু তখন আর ফেরবার উপায় নেই। অম্বুজার ঘরের ঠিক নিচে এসে দাঁড়িয়েছি। পায়ে কী একটা নরম নরম লাগল। চমকে তাকিয়ে দেখলাম সাদা মতো কি একটা পড়ে আছে। সাবধানে হাতের আড়ালে টর্চটা জ্বালোম। একটা মড়া বেড়াল, গলার কাছে রক্ত জমে কালো হয়ে আছে।

শিউরে উঠলাম। বুঝতে পারলাম হতভাগ্য বেড়ালটা বোধহয় কাল রাতে অম্বুজার ঘরে ঢুকে পড়েছিল।

ঘড়িটা দেখলাম। একটা বেজে কুড়ি মিনিট। গতকাল অম্বুজা যখন জানলা থেকে লাফিয়ে পড়েছিল রাত তখন পৌনে দুটো। তাহলে এখনও প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মতো সময় আছে। অবশ্য রোজই যে একই সময়ে লাফিয়ে পড়বে তার কোনো মানে নেই। আমি একটা বেশ ঘন ঝোপ দেখে তার আড়ালে লুকিয়ে রইলাম।

মশার কামড় থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্যে মাথা ঘিরে রঙিন বিছানার চাদরটা জড়িয়ে নিয়েছি। টর্চটা হাতের ঘামে ভিজে গেছে।

কতক্ষণ এইভাবে কেটে গেল। ঘড়ি দেখবার জন্যে টর্চ জ্বালতেও সাহস পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ দোতলার ঠিক সামনের ঘরে খুট করে শব্দ হলো। দেখলাম অন্ধকারের মধ্যেই এদিকের জানলাটা খুলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে দুটো লম্বা পা বেরিয়ে এল।

জানি অম্বুজা এখনি লাফিয়ে পড়বে–কিন্তু ঐটুকু মেয়ের অত বড়ো পা!

লাফিয়ে পড়ল তবে এতটুকু শব্দ হলো না।

ও মাটিতে পড়ার আগেই আর একটা কাণ্ড ঘটল। আমি যে ঝোপটার মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম, ঠিক তার পিছনেই ছিল একটা লম্বা দেবদারু গাছ। হঠাৎ সেই গাছের সমস্ত পাতা কাঁপিয়ে শোঁ শোঁ করে একটা শব্দ। ওপর দিকে তাকিয়ে দেখি সেদিনের সেই উড়ন্ত বিরাট কাকের মতো জন্তুটা ডানা নাড়তে নাড়তে পশ্চিম দিকে চলেছে। আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো পিছনে পিছনে ছুটছে অম্বুজা বনের মধ্যে দিয়ে। তারপরেই দেখি রাজবাড়ির আনাচে-কানাচে থেকে এক ঝক কাক উড়ে চলল অম্বুজার পিছু পিছু। আমার মনে হলো আগের বড়ো প্রাণীটা অম্বুজাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর বাকি কাকগুলো অম্বুজাকে পাহারা দিতে দিতে চলেছে। আশ্চর্য এই কাকগুলো কি রাতেও দেখতে পায়? আমি আর এতটুকু দেরি না করে ঝোপ থেকে বেরিয়ে যতটা সম্ভব নিচু হয়ে দূর থেকে অম্বুজাকে লক্ষ্য করে ছুটতে লাগলাম।

কিন্তু অম্বুজার সঙ্গে ছুটে পারি সাধ্য কী! ও তো ছুটছে না, যেন উড়ে যাচ্ছে। তার অস্বাভাবিক লম্বা লম্বা পাগুলো (যা কখনোই ওর পা হতে পারে না) হিলহিল করে নড়ছিল। তার পরনের কাপড়খানা বাতাসে ভাসছে। মাথার উপর কাকের ঝক–সামনে সেই বিরাট কাকটা…

আমি আর নিচু হয়ে ছুটতে পারছি না। এখন আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছুটছি। অম্বুজাকে ধরতেই হবে। আর ধরতে গিয়ে আমার কী পরিণতি হবে তা ইচ্ছে করেই ভাবতে চাইছি না। বোধহয় একেই বলে নিয়তির ডাক।

কখনও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, কখনো জলার ওপর দিয়ে, কখনো এবড়ো-খেবড়ো জমির ওপর দিয়ে ছুটছি.অম্বুজাকে কিছুতেই চোখের আড়াল করা চলবে না।

কতদূর চলে এসেছি তার হিসেব নেই। এইটুকু জানি চলেছি সোজা পশ্চিম দিকে। একবার যেন মনে হলো দূরে সাদা মতো কি চকচক করছে। তবে কি সেই ভয়ংকর চরের কাছে এসে পড়েছি?

সেই তিনশ বছর আগে এই জায়গার সবটাই তো চর ছিল। তারপর একদিন চাঁদ রায় এসে এই চরে বসবাস শুরু করেছিলেন। এই রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু তিনিও সব চরটা দখল করে নিতে পারেননি। খানিকটা বাদ ছিল। সেখানে নিষেধ ছিল কেউ যেন না যায়। এমনকি রাজা নিজেই রাজপ্রাসাদের পশ্চিম দিকের জানলাগুলো খুলতেন না। কেন খুলতেন না তার উত্তর কারো জানা নেই।

তবে কি অম্বুজাকে অনুসরণ করতে করতে সেই পশ্চিমের চরের কাছে এসে পড়েছি? সর্বনাশ! কিন্তু তখন আর থামবার উপায় নেই। আমি বুঝতে পারছিলাম কোন এক অশুভ শক্তি যেন আমায় টেনে নিয়ে চলেছে।

আমার গায়ে জড়ানো সেই চাদর কখন উড়ে গেছে, জামার বোতাম খোলা, চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে। বুকটা এমন ওঠানামা করছে যেন মনে হচ্ছে বুকের মধ্যে ভূমিকম্প হচ্ছে। কেন জানি না চোখ দুটোও যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

একটা ছোটোখাটো ঝোপের মধ্যে দিয়ে ছুটছিলাম। গায়ে আর জোর নেই। হঠাৎ কিসে পা জড়িয়ে পড়ে গেলাম। তখনই ভয়ংকর ব্যাপারটা ঘটে গেল।

একটা কাক দলছুট হয়ে পিছিয়ে পড়েছিল। লক্ষ্য করিনি কখন সেটা আমার মাথার ওপরে ঘুরছিল। আমাকে পড়তে দেখে হঠাৎ তীক্ষ্ণ গলায় কা-কা-করে ডেকে উঠল।

আমি পালাবার জন্যে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালাম। সেটাই হলো আমার মারাত্মক ভুল। অমনি অম্বুজা ছোটা বন্ধ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমায় দেখে ঘুরে দাঁড়াল। লক্ষ্য করলাম মুহূর্তমধ্যে অম্বুজার শরীরটা যেন বদলে যাচ্ছে। প্রথমে তার চোখ দুটো জুলতে লাগল। তারপর তার শরীর থেকে বেরিয়ে এল লম্বা একটা কী! কঙ্কালসার দুখানা হাত বের করে আমার দিকে সেটা এগিয়ে আসতে লাগল। ঐ হাড্ডিসার হাত দুটো ছাড়া তার সর্বাঙ্গ যেন কালো কাপড়ে মোড়া। মুখটাও দেখা যাচ্ছে না। শুধু দুটো জ্বলন্ত চোখ। সেই চোখ দুটো যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে আমার দিকে ছুটে আসছে।

আমি প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম। কোনদিকে যাচ্ছি তাও জানি না। শুধু একটাই চেষ্টা যেন চরটার দিকে না যাই। কিন্তু কি আশ্চর্য কাকগুলো আর নেই। কঙ্কালটা অম্বুজার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসামাত্র সেই অলৌকিক কাকগুলো উধাও।

আমি ছুটছি–আর পিছনে একটা হু হু করে শব্দ। শব্দটা যে ঐ ভয়ংকর মূর্তিটার কাছ থেকেই আসছে তাতে সন্দেহমাত্র নেই–ধরে ফেলল বলে…মৃত্যু নিশ্চিত…

হঠাৎ দেখলাম সেই নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে যেন একটা কুঁড়ে ঘরের মতো। আমি শুধু কে আছ বাঁচাও বলে আর্তনাদ করে আছড়ে পড়লাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।

.

জ্ঞান যখন ফিরল তখন দেখলাম কতকগুলো শুকনো খড়ের ওপর আমি শুয়ে আছি। মাটির ঘর, মেঝেটাও মাটির। ঘরের মধ্যে একটা পিদিম জ্বলছে টিমটিম করে।

আমার কোনো চোট লাগেনি বলে বেশিক্ষণ অজ্ঞান হয়ে থাকিনি। এদিক-ওদিক তাকাতে দেখলাম একটু থুথুড়ে বুড়ি কতকগুলো শেকড়-বাকড় দরজার বাইরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে আর ঘরের কোণে একটা ধুনুচি থেকে ক্রমাগত ধোঁওয়া উড়ছে। ঐ ধোঁওয়ায় আমার শরীরটা যেন তাজা হয়ে উঠল।

আমার জ্ঞান ফিরতে দেখে বুড়ি কাছে এল। পিদিমের আলোয় আমি তাকে চিনতে পারলাম। এখানে আসবার সময়ে একেই দেখেছিলাম। কতকগুলো ছেলে একে ইট মারছিল। পাল্কি থেকে নেমে আমি ছেলেগুলোকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম।

বুড়ি একবার বেরিয়ে গিয়ে একটু পরেই একটা মাটির ভাঁড়ে খানিকটা দুধ নিয়ে এল। একটা কথাও না বলে বুড়ি ভাড়টা আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি ভড়টা নিয়ে দুধটুকু খেয়ে ফেললাম। কেমন একটু বোটকা বোটকা গন্ধ লাগল। বোধহয় ছাগলের দুধ। কিন্তু বেশ গরম। দুধ কখন কি করে গরম করল কে জানে।

এবার বুড়ি আমার কাছে এসে বসল। বললাম, আমি কোথায়?

বুড়ি খোনা খোনা স্বরে বলল, আমার ঘরে।

যে আমাকে তাড়া করে আসছিল সে কোথায়?

বুড়ি তিনটে দাঁত বের করে বোধহয় একটু হাসল। বলল, ভঁয় নেই। ওঁরা চঁলে গেছে।

কোথায় গেছে?

যে যাঁর নিজের জায়গায়।

সেটা কোথায়?

এর উত্তরে বুড়ি ধীরে ধীরে সমস্ত কাহিনী আমায় জানাল।

.

অম্বুজা রহস্য

কলকাতায় ফিরে এসেছি। আবার চলছে আমার ডাক্তারি, মানে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা। নিশীথ আমাকে যে কারণে বাগআঁচড়ার রাজবাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল তা সফল হয়েছে। নিশীথ নিয়ে গিয়েছিল রাজকন্যা অম্বুজার রোগ সারিয়ে দেবার জন্যে। কিন্তু তার যা ব্যাপার দেখলাম সেটা রোগ নয়, আরও ভয়ংকর কিছু। আমি তার কাছেই ঘেঁষতে পারিনি তো তার চিকিৎসা করব কী! তবে অম্বুজার রহস্য আমি ধরে দিতে পেরেছি। আর এই রহস্যর জাল খোলবার জন্য আমাকে যা-যা করতে হয়েছিল তা কলকাতায় ফিরে এসেও ভুলতে পারি না।

কলকাতায় আমার চেম্বারে বসে এক-এক সময়ে আমি যখন বাগআঁচড়ার সেই ভাঙাচোরা রাজবাড়িটার কথা ভাবি তখন মনে হয় সেসব যেন একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। কোথায় গেল রাজা চন্দ্রভানু রায়–তার পরিবারের সেইসব মমির মতো বোবা মানুষগুলো, কোথায় গেল অম্বুজা আর সেই ভয়ংকর কাকগুলো?

সেদিন শেষ রাত্রে সেই থুখুড়ে বুড়ির দয়ায় আমি বেঁচে গিয়েছিলাম। কেন ও আমায় বাঁচাল? আমার মনে হয় ওকে সেইসব দুষ্টু ছেলেদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলাম বলেই। একথা তো চিরসত্য–সংসারে কিছু কিছু অকৃতজ্ঞ লোক থাকলেও তুমি যদি কোনো দিন কারোর উপকার কর তা হলে হয়তো তার কাছ থেকেও বিপদের সময়ে উপকার পেতে পার।

যাই হোক সেদিন রাতে বুড়ির দেওয়া গরম ছাগলের দুধ খাওয়ার পর যখন আমি বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম তখন তার মুখে থেকেই অম্বুজার কাহিনী শুনেছিলাম। সে কাহিনী হয় তো আজ অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে তবু তা বর্ণে বর্ণে সত্যি।

সেদিন ফোকলা দাঁতের ফাঁক দিয়ে খোনা খোনা গলায় ধীরে ধীরে কেটে কেটে অস্পষ্ট উচ্চারণে বৃদ্ধা যা বলেছিল আমি কলকাতায় ফিরে এসে একটা ডায়রিতে তা নিজের ভাষায় লিখে রেখেছিলাম। ঘটনাগুলো বৃদ্ধা বেশ গুছিয়ে বলতে পারেনি। তাই আমিও যা লিখে রেখেছি তার মধ্যে অনেক ফাঁক থেকে গেছে। আসলে তিনশো বছর আগের কাহিনী তো– কেউ প্রত্যক্ষদর্শী নেই। এ মুখ থেকে অন্য মুখ, এ কান থেকে অন্য কান এইভাবেই কিংবদন্তীর জন্ম হয়। ষাট বছর আগে আমার দেখা অম্বুজাও সেই কিংবদন্তীর একটি অস্পষ্ট নায়িকা হয়ে গেছে।

একদিন গঙ্গার স্রোত বইতে বইতে অন্য দিকে সরে গেলে এই বাগআঁচড়ার কাছে কয়েক মাইলব্যাপী চর পড়েছিল। আগে কাছেপিঠের গ্রাম থেকে মৃতদেহ সৎকারের জন্যে গঙ্গায় নিয়ে আসা হতো। কিন্তু গঙ্গা দূরে সরে যেতে তাদের অনেকেই মৃতদেহ ঐ চরে পুঁতে দিয়ে যেত। ভাল করে চাপাও দিত না, কোনোরকমে কাজ সেরে সরে পড়ত। তারপর শেয়াল-শকুনে সেইসব মৃতদেহ টেনে বের করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। তাই ঐ চরের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকত মড়ার খুলি, কঙ্কাল। এইরকম দৃশ্য চোখে পড়ার ভয়ে দিনের বেলাতেও কেউ ওদিকে যেত না। আর রাত হলে ঐ চরে নেমে আসত বিভীষিকা। কত রকমের শব্দ শোনা যেত–কখনও নিঃশব্দ চরের বুকে জেগে উঠত হু হু শব্দ, কখনও ঝড়ের গোঙানি। সময়ে সময়ে নাকি দেখা যেত চরের এখানে-ওখানে আগুন জ্বলছে। লোকে বলত ঐ চড়াটা হচ্ছে। প্রেতাত্মাদের অবাধে ঘুরে বেড়াবার জায়গা। আশপাশের গ্রামে একটা চলতি ছড়াই আছে–

ভুলে কভু যেও নাকো চরে
ভূতে এসে টুটি টিপে ধরে।

তা কথাটা সত্যি। রাতের বেলায় মানুষ তো দূরের কথা–কোনো পাখি, কিংবা শেয়াল কিংবা কুকুরও যদি ঐ চরে যায়, পরের দিন পাওয়া যেত তার মৃতদেহ। চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে–জিভটা ঝুলছে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে।

এই ভয়ংকর চরেই একদিন নদীয়া থেকে এল এক দুঃসাহসী জমিদার নাম চাঁদ রায়। তিনি শুরু করলেন চাষ। গড়ে তুললেন রাজপ্রাসাদ। হলেন এক মহাশক্তিধর রাজা। যত শক্তিধরই হন গোটা চরটা দখল করতে পারলেন না। পশ্চিম দিকে প্রায় আধ মাইলের মতো চর পড়ে রইল তার সীমানার বাইরে।

রাজা চাঁদ রায় দোতলার পশ্চিম দিকের সবচেয়ে সুন্দর ঘরটি নিজের জন্যে রাখলেন। ঘরে খাট-পালংক সাজিয়ে সবেমাত্র ঢুকেছেন তখনই ঘটল একটা ঘটনা।

গরমের জন্য তিনি সেদিন সব জানলা খুলে রেখে দিয়েছিলেন। হঠাৎ মাঝরাত্তিরে মনে হলো যেন ঝড় উঠেছে। তিনি জানলা বন্ধ করবার জন্যে ধড়মড় করে উঠলেন। কিন্তু কোথাও ঝড়ের কোনো লক্ষণ দেখতে পেলেন না। হঠাৎ পশ্চিম দিকের জানলার ওপর চোখ পড়তেই তিনি থমকে গেলেন। দেখলেন দূরে চড়ার বুকে বালির ঝড় উঠেছে। মাঝে মাঝে আগুনের ঝলক। এরকম অদ্ভুত দৃশ্য দেখে তিনি হতভম্ব। তিনি হয়তো আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখতেন কিন্তু মনে হলো সেই ধূলিঝড় যেন এইদিকে ধেয়ে আসছে। চাঁদ রায় তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে দিয়ে শুয়ে পড়লেন।

আবার একদিন রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে দেখলেন পশ্চিম দিকের ঐ চড়ার বুকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তিনি তো অবাক। বালির চড়ায় আগুন কি করে সম্ভব? তিনি তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে দিলেন।

পরের দিন রাজসভাপণ্ডিতকে সব কথা বললেন চাঁদ রায়। রাজসভাপণ্ডিত রাজজ্যোতিষীকে ডেকে পাঠালেন। তিনি ছক কেটে অঙ্ক কষে জানালেন, বড়োই অশুভ লক্ষণ। মহারাজ, পশ্চিম দিকের জানলা অন্তত রাতের বেলায় খুলবেন না।

তাই হলো। রাত্তিরে চাঁদ রায় আর ওদিকের জানলা খুলতেন না।

তারপর আবার একদিন–অনেক রাতে চাঁদ রায়ের ঘুম ভেঙে গেল। শুনতে পেলেন একটা ঠকঠক শব্দ। ধড়মড় করে উঠে বসলেন। শব্দটা আসছে মাথার কাছে পশ্চিম দিকের জানলায়। তিনি জানলার কাছে উঠে গিয়ে দাঁড়ালেন। তখনও জানলার কপাটে শব্দ হচ্ছে ঠক-ঠক-ঠক।

জানলা খুলবেন কিনা ভাবতে লাগলেন। তিনি ছিলেন দুর্দান্ত সাহসী। তাই মনে জোর সঞ্চয় করে জানলাটা খুলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে লাফ মেরে পাঁচ পা পিছিয়ে এলেন। দেখলেন একটা বিশাল কাক জানলার ওপর বসে রয়েছে। তার ডানা দুটো এতই বড়ো যে গোটা জানলাটা ঢেকে গেছে। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ। যেন জ্বলছে। বড়ো বড়ো বাঁকানো ঠোঁট দুটো ফাঁক করে কর্কশ স্বরে সেটা তিনবার শব্দ করল কাঁক–কোকাঁক, তারপরেই ঠোঁট দিয়ে জানলার শিকগুলো কামড়াতে লাগল।

চাঁদ রায়ের মতো দুর্ধর্ষ রাজাও ঐরকম কাক দেখে আর ঐ ডাক শুনে ভয় পেয়ে গেলেন। দুবার হুশ হুশ শব্দ করে কাকটাকে তাড়াবার চেষ্টা করলেন কিন্তু কাকটা নড়ল না। সে ঠোঁট দিয়ে শিকটা ভাঙবার চেষ্টা করতে লাগল। তখন চাঁদ রায় দেওয়ালের কোণ থেকে তার বর্শাটা নিয়ে এসে কাকটার দিকে ছুঁড়ে মারলেন।

অব্যর্থ লক্ষ্য।

বর্শাটা কাকের বুকে গিয়ে বিধল। সঙ্গে সঙ্গে পাখা ঝটপট করতে করতে কাটা নিচে পড়ে গেল।

পরক্ষণেই সেই কাকের দেহ থেকে একটা কঙ্কাল দুলতে দুলতে জানলার দিকে এগিয়ে এল। ভয়ে চাঁদ রায় তখনই জানলা বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু পরের দিন আহত বা নিহত কোনো অবস্থাতেই কাকটাকে দেখা গেল না।

চাঁদ রায় আবার সভাপণ্ডিত, রাজজ্যোতিষীকে ডেকে সব কথা বললেন। তাঁরা অনেক চিন্তা করে বললেন কাক যে তিনটে শব্দ উচ্চারণ করেছিল সেটার অর্থ কী আগে জানা দরকার।

কিন্তু কাকের ভাষা কে বুঝবে?

সে সময়ে দেশে কাকচরিত্রজ্ঞ কিছু অসাধারণ গুণী লোক থাকত। তারা অন্য পশুপাখির ভাষা বুঝতে না পারলেও কাকের ভাষা বুঝত। কেননা কাক যখন ডাকে তখন অনেকটা বুঝতে পারা যায় কি বলতে চাইছে। অন্য পাখিদের চেয়ে কাকের ডাক অনেক স্পষ্ট। একটু চেষ্টা করলেই বোঝা যায় কি বলতে চায়।

বাগআঁচড়ায় সে সময়ে একজন কাকচরিত্র বিশেষজ্ঞ ছিল। তাকে ডেকে আনা হলো। সে নিজে কাকটার ডাক শোনেনি। কিন্তু স্বয়ং রাজা যা শুনেছিলেন সেই তিনটে শব্দ কাঁক–কো-কাক শুনে আর কাকের বর্ণনা জেনে লোকটি বললে, মহারাজ, এই কাক আসলে একটা অশুভ আত্মা। সে আপনার ওপরে খুবই ক্রুদ্ধ। ঐ তিনটে শব্দের মধ্যে দিয়ে সে বলতে চেয়েছিল এই চর দখল করে মহারাজ যে ঘোরতর অন্যায় করেছেন তার প্রতিফল শীঘ্রই পাবেন।

মহারাজের মুখ শুকিয়ে গেল। কিন্তু দুর্বল হলেন না। বললেন, আমি অন্যায় করিনি। ঐ চরে চাষ করে, লোকবসতি তৈরি করে আমি জনসাধারণের উপকারই করেছি। প্রেতাত্মাদের জন্যে তো খানিকটা চর ছেড়ে রেখেছি। ওখানে ওরা যা খুশি তাই করুক। কাজেই আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমি রাজপ্রাসাদ ভেঙে সমস্ত বসতি তুলে দিয়ে আবার চর করে দিতে পারব না।

এ যেন প্রেতাত্মাদের দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করা। তার ফল ফলতেও দেরি হলো না। দিন সাতেকের মধ্যেই একজন প্রজা কাঁদতে কাঁদতে এসে বলল, মহারাজ, আমার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এই রকম পরপর খবর আসতে লাগল। মহারাজ ভেবে পান না ছেলেগুলো কীভাবে কোথায় গেল। যারা হারিয়ে গেল তারা কিন্তু আর ফিরল না।

তারপর একদিন একজন এসে বলল সে গতকাল গভীর রাতে হরিহর মণ্ডলের ছেলেকে একা একা বেরিয়ে যেতে দেখেছে। আর তার আগে আগে উড়ে যাচ্ছিল মস্ত একটা কাক।

আবার কাক! চাঁদ রায় চমকে উঠলেন।

হা, মহারাজ! মস্ত বড়ড়া কাক। সে যখন উড়ছিল তখন তার ডানায় শব্দ হচ্ছিল গোঁ গোঁ করে।

কোন দিকে গেল?

ঐ চরের দিকে।

হরিহর মণ্ডলের ছেলে আর ফেরেনি।

রাজা চাঁদ রায় নিরুপায় হয়ে ব্রহ্মশাসন, যেখানে ব্রাহ্মণদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, সেখান থেকে সব ব্রাহ্মণদের ডেকে পাঠালেন। বললেন, মহাযজ্ঞ করুন, শান্তি স্বস্ত্যয়ন করুন। যত খরচ হয় হোক।

শুধু ব্রহ্মশাসনের ব্রাহ্মণরাই নয়, নদীয়া, ভাটপাড়া থেকেও নামকরা পুরোহিতদের আনালেন। তা ছাড়াও কাছে-পিঠে যত ওঝা, গুণিন আছে সবাইকে ডাকালেন। যেমন করে হোক প্রেতের কবল থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে হবেই।

.

রাজকন্যা সুভদ্রা সকাল দশটার সময়ে স্নান সেরে নিরমু উপবাস করে খড়গ পুজো করছিল। এটা তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। যে খাঁড়াটা সে পুজো করে তার একটা ইতিহাস আছে। রাজা চাঁদ রায় প্রতি বছর কালীপুজোর রাতে ছিন্নমস্তার পুজো করতেন। এ পুজো বড় সাংঘাতিক। একটু খুঁত থাকলে আর রক্ষে নেই। তা সেবার ঠাকুর বিসর্জন দিতে যাবার সময়ে খাঁড়াটা কেমন করে জানি পড়ে যায়। সকলে হায় হায় করে ওঠে। এ খুবই দুর্লক্ষণ। না জানি কী হয়।

ব্রহ্মশাসনের ব্রাহ্মণেরা বিচার করে বললেন, এ প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া এখন যাবে না। নতুন ঠাকুর গড়ে নতুন খাঁড়া দিয়ে আবার পুজো করতে হবে।

দ্বিতীয়বার পুজোর পর প্রতিমা বিসর্জন দেবার সময়ে আগের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলো। সেইসঙ্গে আগের খাঁড়াটাও বিসর্জন দেওয়া উচিত ছিল। সেটা কারো আর খেয়াল ছিল না। তখন সুভদ্রা সেই খাঁড়াটা নিজের ঘরে এনে রোজ পুজো করতে লাগল।

কেন সে পুজো করত তা সে কাউকে বলেনি। অনুমান করা যায় খাঁড়া নিয়ে যে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি হয়ে গেছে, এই পরিবারের মেয়ে হয়ে তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করত।

এই পরিবারের মেয়ে কিন্তু তার শরীরে এ বংশের রক্ত ছিল না। খুব ছোটবেলায় মহারাজ তাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, সেই থেকে সুভদ্রা রাজার দুলালীর মতো মানুষ হয়ে আসছে। এখন তার বয়স এগারো।

এগারো বছরের মেয়ে হলে কি হবে, তার বুদ্ধি, অনুভূতি একটা বড়ো মেয়ের মতোই। প্রতিদিনই সে শুনছে একটা করে লোক নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে তার মুখ শুকনো। তার বাবাকেও একটা বিরাট কাক আক্রমণ করতে এসেছিল। ক্ষতি করতে পারেনি। এবার কি তবে তার পালা?

এদিকে যাগ-যজ্ঞ শুরু হয়েছে। সাত দিন পূর্ণ হলে তবেই প্রেতেদের উৎখাত করা যাবে। সবে চার দিন যজ্ঞ চলছে। লোকে লোকারণ্য। সবাই সেই অভূতপূর্ব যজ্ঞ দেখছে। কত মণ ঘি যে পুড়ল তার হিসেব নেই। সেই ঘৃতাহুতির সঙ্গে সঙ্গে চলছে মিলিত কণ্ঠের গম্ভীর মন্ত্র উচ্চারণ।

তারই মধ্যে একদিন—

সুভদ্রা তার নিজের ঘরে একাই শুত। কারো সঙ্গে শুতে তার ইচ্ছে করে না–

এই পর্যন্ত বলে বুড়ি তার ঠাণ্ডা কনকনে হাত দিয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে বলল, তিনশো বছর আঁগে এই সুভদ্রার সঙ্গে চঁন্দ্রভানু রায়ের মেয়ে অম্বুজার মিলটা দেখছ? দু জনেই ঐকলা শুতে চাইত। দুজনেই কুঁড়িয়ে পাওয়া গেঁয়ে। দুজনেই সঁমান বয়সী।

বললাম, হুঁ, তাই তো দেখছি। তারপর?

সেদিনও সুভদ্রা বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল। তার ঘরের সামনেই একটা ছোটো ছাদ। তার মনে হলো কেউ যেন ছাদের ওপর নিঃশব্দ পায়ে চলে বেড়াচ্ছে। নিঃশব্দ কিন্তু তার পায়ের ভারে ঘরটা কাঁপছে।

সুভদ্রা কিছুক্ষণ কান পেতে চুপ করে পড়ে রইল। না, ভুল শোনেনি। আবার সেই ভারী ভারী পা ফেলার শব্দ। এবার আরও স্পষ্ট। সুভদ্রা উঠে পড়ল। একটা পিদিম জ্বালল। তারপর সাবধানে দরজার খিল খুলে ছাদে বেরিয়ে পড়ল। পিদিম হাতে সুভদ্রা এক পা করে এগোয় আর পিছু ফিরে তাকায়। এমনি করে গোটা ছাদটা দেখল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। তখন ও নিশ্চিন্ত হলো শব্দটব্দ কিছুই না। তার শোনারই ভুল।

তবু যেন তার কিরকম মনে হতে লাগল। কাছেপিঠে কেউ যেন আছে। যে কোনো মুহূর্তে পেছন থেকে লাফিয়ে পড়বে ঘাড়ে।

সুভদ্রা আর বাইরে থাকতে চাইল না। তাড়াতাড়ি খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। আর তখনই ভয়ে আঁৎকে উঠল সে। পিদিমের আলোয় দেখল এতক্ষণ যাকে ছাদে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সে বিরাট দুটো ডানা ছড়িয়ে বসে আছে তারই বিছানার ওপর।

সুভদ্রার হাত থেকে পিদিমটা পড়ে নিভে গেল।

সেই মুহূর্তে ঘরের মধ্যে মৃত্যুর দূত কাকরূপী প্রেত আর মাত্র পাঁচ হাত তফাতে দাঁড়িয়ে সে। কাকটা গোল গোল লাল চোখ ঘুরিয়ে তাকে দেখছে আর তার বড়ো বড়ো ঠোঁট দুটো ফাঁক করছে।

সুভদ্রা বুঝতে পারল এই ভয়টাই সে করছিল। একদিন তার বাবাকে মারবার জন্যেই কাকটা এসেছিল। কিন্তু মারতে পারেনি। এবার তার পালা।

কাকটা বসে বসেই তার ডানা দুটো তিনবার নাড়ল। খাট থেকে নামল। বড়ো বড়ো নখওলা দুটো পায়ে ভর করে এগিয়ে আসতে লাগল।

আর রক্ষে নেই। সুভদ্রা চিৎকার করে উঠল। কিন্তু এত বড়ো রাজপ্রাসাদের ছাদ, দেওয়াল, সিঁড়ি ডিঙিয়ে সে চিৎকার তার বাবার কানে পৌঁছল না।

নিজেকে লুকোতে সুভদ্রা অন্ধকার ঘরের এক কোণে গিয়ে গুঁড়ি মেরে বসে পড়ল। কিন্তু কাকটার জ্বলন্ত দৃষ্টি এড়াতে পারল না। কাকটা সেই দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল। সুভদ্রা সরে আর একটা কোণে গিয়ে দাঁড়াল। তার গায়ে লেগে কি একটা ঠক করে মাটিতে পড়ল। ছিন্নমস্তার সেই খাঁড়াটা। কাকটা তখন তার ওপর ঝাঁপ দিয়েছে। মুহূর্তে সুভদ্রা খাড়াটা দুহাতে তুলে নিয়ে জোরে এক কোপ বাসিয়ে দিল। অন্ধকারে কোপটা কাকটার মাথায় লাগল না। লাগল একটা ডানায়। ডানাটা কেটে মাটিতে পড়ে লাফাতে লাগল। আর কাকটা এই প্রথম বিকট একটা শব্দ করে একটা ডানায় ভরে দিয়ে এঁকেবেঁকে বেরিয়ে গেল। সুভদ্রা মনের সমস্ত শক্তি একত্র করে খাঁড়াটা হাতে নিয়ে তার পিছু পিছু ছুটল। ওটাকে মারতেই হবে।

কিন্তু কাকটাকে আর দেখতে পেল না। এদিক-ওদিক তাকাল। হঠাৎ

ওটা কি?

দেখল রাজবাড়ির বাগানে একটা আমগাছের ডালে ঝুলছে একটা কঙ্কাল। তার একটা হাত কাটা।

বুড়ি এই পর্যন্ত বলে তার বক্তব্য শেষ করল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, সুভদ্রার কি হলো?

বুড়ি একটু থেমে মনে করবার চেষ্টা করে যা বলল তা এই–পরের দিন থেকে বেচারি মেয়েটা পাগল হয়ে গেল। এদিকে যাগ-যজ্ঞও শেষ। চরে আর ভূতের উপদ্রব নেই। আর কোনো মানুষ রাতে নিশির ডাক শুনে চরের দিকে গিয়ে প্রাণ হারায় না। কিন্তু

বুড়ি আবার একটু থেমেছিল। তারপর বলেছিল, কিন্তু সুভদ্রা পাগল হয়ে আর রাজবাড়িতে থাকত না। ঘুরতে ঘুরতে একদিন সে কোথায় হারিয়ে গেল। আর তাকে পাওয়া গেল না।

হারিয়ে গেল!

আমি সেই তিনশো বছর আগের এক না দেখা রাজকন্যার জন্যে দুঃখ পেলাম।

আমরা দুজনেই চুপ করে আছি। বুড়ির ঘরের কোণে পিদিমটা তখনও জ্বলছে। বললাম, সেই সুভদ্রার সঙ্গে আজকের এই অম্বুজার কি কোনো সম্পর্ক আছে?

বুড়ি তার তিনখানা মাত্র দাঁত নাড়িয়ে একটু হাসল। বললে, কি মনে হয়?

বললাম, মনে হয় যেন আছে।

তঁবে আবার জিজ্ঞেস করছ কেন? এক জন্মের সুভদ্রা আঁর এক জঁন্মেতে অঁম্বুজা। সব নিয়তির খেলা।

এবার বুড়ি আরও একটু পরিষ্কার করে যা জানালো তা এইরকম–

চন্দ্রভানু নিজেকে চাঁদ রায়ের বংশধর বলে মিথ্যে পরিচয় দিয়ে আসছিল বলেই এমন একটি মেয়েকে কুড়িয়ে পেয়েছিল যাকে নিয়ে তার অশান্তির শেষ ছিল না। তার মিথ্যে রাজপুরী মৃত্যুপুরী হয়ে উঠেছিল। মিথ্যে কথার এই শাস্তি। তবু যেহেতু তিনি বেশ কয়েকটা দেব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারই পুণ্যে তিনি কিছুটা শাপমুক্ত হয়েছিলেন পরে।

নিষ্পাপ মেয়ে অম্বুজার ওপর তার জন্মলগ্ন থেকেই ভর করে রইল চরের সেই কঙ্কালটা যে কাক হয়ে সুভদ্রার ক্ষতি করতে গিয়ে ছিন্নমস্তার খাঁড়ার আঘাতে একটা ডানা হারিয়েছিল। সেই রাগ পুষে রেখে এতকাল পর প্রতিশোধ নেবার সুযোগ পেল অম্বুজারূপী সুভদ্রার ওপর। সেই অপদেবতা তার ওপর ভর করে থাকার জন্যেই অম্বুজা অত নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল। সেই অম্বুজারূপী সুভদ্রা কাককে এতই ভয় পেয়েছিল যে প্রতি রাতে নাচের মধ্যে দিয়ে ধূপের ধোঁয়ায় তাকে পুজো করত। কিন্তু কাকরূপী শয়তান সেই পুজোয় ভুলত না। অম্বুজাকে সেই ভয়ংকর চরের দিকে টেনে নিয়ে যেত।

নিরুপায় অম্বুজা তখন দেখাতে চেষ্টা করল সে নিজেই কাকের কত ভক্ত। তাই সে নানা জায়গা থেকে কাক যোগাড় করে রাজপুরী ভরিয়ে ফেলল। লোকে ভাবত অম্বুজার এটা একটা উৎকট শখ। কিন্তু অম্বুজার আসল উদ্দেশ্য জানত না।

পোষা কাকগুলো তার এতই বাধ্য হয়ে উঠেছিল যে অম্বুজা যেভাবে তাদের চালাত সেই ভাবেই তারা চলত। তাকে পাহারাও দিত। অম্বুজার এমনও গোপন ইচ্ছে ছিল যে সুবিধে পেলে তার এই পোষা কাকগুলোকে দিয়ে ঐ শয়তান কাকটাকে শেষ করে দেবে।

কিন্তু পারেনি। পারবে কি করে? শয়তান কাকটা তো সাধারণ কাক নয়।

এই পর্যন্ত বলে বুড়ি আবার থেমেছিল।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিন্তু অম্বুজা তো পালিয়ে গিয়েও ফিরে আসত। শয়তান কাকটা কি চর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারত না?

বুড়ি হেসে বলল, কি করে পারবে? এইখানে এই বনের ধাঁরে আঁমি বসে আঁছি যে। আঁমাকে ডিঙিয়ে যাবে এমন সাধ্যি কোনো ভূত-প্রেতের নেই।

অবাক হয়ে গেলাম। বললাম, বুড়িমা, আর একটা কথা জিজ্ঞেস করব।

কঁরো। কঁরো। তাড়াতাড়ি করো। রাত ফুরিয়ে আসছে। আঁমি ঘুমুবো।

জিজ্ঞেস করলাম, আমায় যে তাড়া করে আসছিল সে কোথায়? অম্বুজার কি হলো?

বুড়িমা আবার হাসল। বলল, ওঁরা চঁলে গাছে যে যাঁর জায়গায়।

মানে?

বুড়িমা বলল, তুমি তো রাজকন্যাকে সরাতে এসেছিলে। তাই না?

বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু পারিনি।

বুড়িমা আবার ফিক করে হাসল। বললে, পেঁরেছ। পুঁরোপুরি সারিয়ে দিয়েছ।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

হা গোঁ। ভাগ্যি তুমি ভঁয় না পেয়ে ঐ গভীর রাতে পিছু নিয়েছিলে। ভাগ্যি তুমি পড়ে গিয়েছিলে। তঁবেই না তেঁতটা অম্বুজার ভিতর ঘেঁকে বেরিয়ে এসে তোমায় তাড়া করে আঁসছিল। আঁর যেই আঁম্বুজাকে একবার ছেড়েছে, আঁর ওঁর ভিতর ঢুকতে পারবে না।

বলে বুড়িমা তার শণের নুড়ির মতো মাথাটা দোলাতে লাগল।

ব্যাস! রাজকন্যে ভালো হয়ে গেল। আঁর প্ৰেতটাকে পাঠিয়ে দিলাম ওঁর স্থানে। বলে হলদেটে শুকনো আঙুল তুলে চরটা দেখিয়ে দিল।

অম্বুজা তা হলে এখন কোথায়?

যথাস্থানে।

যথাস্থানটা কোথায় তা জিজ্ঞেস করতে আর সাহস হলো না।

কিন্তু আঁর নয়। ওঁঠো। তোমায় রাজবাড়ির দিকে এগিয়ে দিই।

বুড়িমা ঘরের ঝপ বন্ধ করে আমায় নিয়ে বেরিয়ে এল।

রাজবাড়ির দিকে যেতে যেতে বুড়ি হঠাৎ অন্যদিকে পা বাড়াল।

এদিকে একটু এঁসো।

এটা সেই জায়গা যেখান থেকে প্রেতটা তাড়া করেছিল।

ঐ দ্যাখো। বলে বুড়ি দূরে মাটির দিকে আঙুল তুলে দেখাল।

দেখলাম মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে রাজকন্যা অম্বুজা। ঠিক যেন একগাদা ফুলের মালা।

ও কি মরে গেছে?

বুড়ি বললে–না। ওঁ একেবারে ভালো হয়ে গেছে। ঘুমোচ্ছে। তুমি ওঁকে কোলে তুলে নিয়ে রাজবাড়িতে লো।

আমি স্বচ্ছন্দে অম্বুজাকে কোলে নিয়ে রাজবাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম।

কিছুদূর গিয়ে বুড়িমা বলল, আঁর যেতে পারব না। রাজামশাই তো আঁমায় তাড়িয়ে দিয়েছেন।

আমি বুড়িমাকে প্রণাম করলাম। বললাম, আর একটা কথা। আপনি কে বলুন তো!

বুড়িমা হঠাৎ গলা চড়িয়ে উৎকট হাসি হেসে উঠল। বলল, আঁমি? তিনশো বছরেরও বেশি হলে আমি ঐ চঁরে বাস কঁরতাম। তারপর মানুষজন দেখব বলে রাজবাড়ির কাছে থাকতাম। লোকে বলে আমি উইনি। ছেলেরা টিল মরে। রাজা খেদিয়ে দিলে আঁমায়। উঁবু আঁমায় থাকতে হবে এখানে। নইলে পেঁতদের ঠ্যাকাবে কে?

বলে বুড়িমা হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। একটা ঝোড়ো বাতাসে তার পাকা চুলগুলো উড়তে লাগল। সেই ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে একরকম ভাসতে ভাসতে বুড়িমা চরের দিকে চলে গেল।

রাজবাড়িতে যখন ঘুমন্ত অম্বুজাকে কোলে নিয়ে পৌঁছলাম তখন ভোর হয়েছে।

আজ এই প্রথম আমি হাঁকডাক করে রাজবাড়িতে ঢুকলাম।

কোথায় নিশীথ! আর কত ঘুমোবে তোমরা! ওঠো, দ্যাখো কাকে নিয়ে এসেছি।

রাজবাড়ির ঘুম ভাঙল। দোতলার জানলাগুলো ফটাফট খুলে গেল। সবাই অবাক হয়ে দেখছে এত ভোরে কে হাঁকডাক করছে।

রাজামশাই যে রাজামশাই যাঁকে বড়ো একটা দেখাই যেত না তিনিও নেমে এসেছেন। চোখ রগড়াতে রগড়াতে নিশীথও এসে হাজির।

কী ব্যাপার! রাজকন্যাকে কোথায় পেলে?

আমি সব ঘটনা ওঁদের বললাম। শুনে ওঁরা অবাক।

রাজকুমারী অম্বুজার তখন ঘুম ভেঙেছে। একজন অপরিচিত লোকের কোলে রয়েছে দেখে সে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমায় চিনতে পারল না।

রাজকন্যাকে দেখিয়ে রাজামশাইকে বললাম, এই নিন মহারাজ আপনার কন্যাকে। আর ভয় নেই। ও এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।

অম্বুজা রাজামশাইকে চিনতে পারল। বহুকাল পর বাবা বলে রাজামশাইয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

রাজামশাই আমার দিকে তাকিয়ে আনন্দে কৃতজ্ঞতায় ঝরঝর করে কাঁদতে লাগলেন।

আমি বিদায় নিয়ে কলকাতায় ফিরে এলাম।

[শারদীয়া ১৪০৭]

Facebook Comment

You May Also Like