এক বৃদ্ধার মেহমানদারীর ইসলামিক ঘটনা

এক বৃদ্ধার মেহমানদারীর ইসলামিক ঘটনা

হযরত বড় পীর সাহেব বলিয়াছেন, একবার আমি বাগদাদ হইতে একাকী হজ্জ করার উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হইলাম। কিছুদূর গমন করার পর রাস্তায় আদী। ইবনে মুসার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। তিনি হজ্জ করিতেই যাইতেছিলেন,কাজেই উভয়ে একসাথে পথ চলিতে লাগিলাম। আরও কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর বােরখা। পরিহিতা জনৈক বৃদ্ধার সহিত আমাদের সাক্ষাৎ হইল।

বৃদ্ধা আমার প্রতি তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিল—তুমি কে এবং কোথা হইতে আসিয়াছ? আমি উত্তর করিলাম—আমি আযমী, বাগদাদ হইতে মক্কায় চলিয়াছি। তখন সেই বৃদ্ধা আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল—তুমি আমাকে বড়ই পরিশ্রম করাইলে। বৃদ্ধার কথায় আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিলাম—তাহার মানে? আমি।

কিরূপে আপনাকে পরিশ্রম কইলাম?

বৃদ্ধা উত্তর করিলেন—পরিশ্রম নহে তাে কি? আমাকে সেই সুদূর আবিসিনিয়া হইতে এত রাস্তা অতিক্রম করিয়া ছুটিয়া আসিতে হইল—ইহাতে কি পরিশ্রম হয় না? তােমরা নাহয় যুবক মানুষ,পথশ্রমে ক্লান্ত। হওনা,তাই বলিয়া আমার মত বৃদ্ধার পক্ষে কি তােমাদের মত পরিশ্রম করা সম্ভব? আমি বলিলাম—তাহাতাে সত্য কথাই, কিন্তু সেইটাতাে আপনি নিজে ইচ্ছা করিয়াই করিলেন, আমি আপনাকে পরিশ্রম করাইলাম কিরূপে?

বৃদ্ধা উত্তর করিলেন—তুমিই তাে করাইলে, নতুবা আমি সেই সুদূর আবিসিনিয়া হইতে আসিব কেন? আল্লাহর মেহেরবানীতে তােমার গুণের কথা সবই আমি অবগত আছি এবং অনেক দিন হইতেই মনে আশা পােষণ করিয়া আসিতেছিলাম যে, তােমাকে একবার দেখিব। এদিকে তাে আমার বৃদ্ধ কাল, কখন যে মরিয়া যাইব, তাহার ঠিক নাই।

যখন জানিতে পারিলাম যে, তুমি বাগদাদ হইতে মক্কার দিকে রওয়ানা হইয়াছ তখন মনে করিলাম যে, এই সুযােগে তােমার সহিত একবার সাক্ষাৎ না করিলে হয়তাে আমার মনের আশা আর কোনদিনই পূর্ণ হইবে না, সেই জন্যই তাড়াতাড়ি রওয়ানা হইয়া আসিলাম। চল একত্রই পথ চলিতে থাকি এবং আজ আমি তােমাদের সহিত একত্র ইফতার করিব।

আমরা তিন জন একত্র পথ চলিতে লাগিলাম এবং সন্ধ্যার একটু পূর্বেই একস্থানে আশ্রয় লইয়া ইফতারের সময় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। ইতিমধ্যে শূন্য পথে একটি খাঞ্চা নামিয়া আসিয়া সম্মুখে স্থাপিত হইল, উহাতে ছয়খানা গরম রুটি ও কিছু ভূনা গােশত ছিল। বৃদ্ধা আনন্দিতা হইয়া বলিলেন—বেশ হইয়াছে, আজ আল্লাহ তাআলা আমার মেহমানদের জন্য অতিরিক্ত দয়া বর্ষণ করিয়াছেন। প্রত্যহ আমি ইফতারের জন্য দুইখানা রুটি পাইয়া থাকি। ইহার একটু পরেই তিনগ্লাস পানি আমাদের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল।

উক্ত পানি এত মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত যে, দুনিয়ার কোন পানি বা শরবতের সহিত উহার তুলনা হয় না। আমরা তিনজন একত্রে ইফতার করিয়া নামায পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বৃদ্ধা অদৃশ্য হইয়া গেলেন। অতঃপর আমরা দুই বন্ধু মক্কার দিকে অগ্রসর হইলাম। পবিত্র কাবাগৃহ তওয়াফ করিবার সময় আমার বন্ধু আদী ইবনে মুসার উপরে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি নিক্ষিপ্ত হওয়ায় তিনি অজ্ঞান হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেলেন।

আমি তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া বুঝিতে পারিলাম—তাহার মৃত্যু ঘটিয়াছে! ঠিক এমন বােরখা পরিহিতা সেই হাবসী বৃদ্ধা আসিয়া তাহার শিয়রে দণ্ডায়মান হইয়া বলিতে লাগিলেন—“যিনি তােমাকে মৃত্যুদান করিয়াছেন, তিনিই তােমাকে পুনরায় জীবন দান করুন। বৃদ্ধার কথা শেষ হইতে না হইতেই আমার বন্ধু আদি ইবনে মুসা।

জীবিত হইয়া উঠিয়া বসিলেন।

তৎপর বৃদ্ধা আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন-হে আবদুল কাদের! আজ তােমার অবস্থা কিরূপ, তাহা আমি বুঝিতে পারিতেছি না। তােমার উপরে একটা নূরের তাঁবু নাযিল হইয়াছে, ফেরেশতাগণ জমীন হইতে আসমান পর্যন্ত তােমার চর্তুদিকে বেষ্টন। করিয়া রহিয়াছে, দুনিয়ার যাবতীয় আওলিয়া আপনাপন স্থানে অবস্থান করিয়া তােমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকাইয়া রহিয়াছে, আর তুমি যে উন্নত দরজা লাভ করিয়াছ, তাহার প্রভাব আমাকেও বেষ্টন করিয়াছে এই কথা বলার পরেই বৃদ্ধা পুনরায় অদৃশ্য হইয়া গেলেন। আমার বুঝিতে বাকি রহিল না যে, এই হাবসী বৃদ্ধা মহিলা কতবড় উন্নত দরজার ওলী।

Facebook Comment

You May Also Like