জাপানের ‘সুইসাইড ফরেস্ট’

সুইসাইড ফরেস্ট

বিশাল সবুজ গাছ, বন, লতাপাতায় আচ্ছাদিত,কোথাও কোনো আলো নেই, নিরব, প্রায় জনশূন্য এক জঙ্গলের অনুভূতি ভাবতেই স্নায়ুর উপর বেশ প্রভাব ফেলে দেয়। সেখানে রয়েছে মৃত মানুষের খুলি, হাড়, এমনকি পুরো কঙ্কাল। মৃতের ছন্নবিচ্ছন্ন পোশাক, সেই সাথে গাছের শোঁ শোঁ ছমছমে আওয়াজ।

কেমন লাগবে এমন একটি ঘোর অন্ধকার নিরব গভীর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার কল্পনা করতে? কল্পনা নয় সত্যি! বাস্তবেই রয়েছে এমন এক অদ্ভুত ভয়ানক জঙ্গল। নাম সুসাইড ফরেস্ট বা আত্মহত্যার জঙ্গল।

অওকিগাহারা জাপানের টোকিও শহর থেকে ১০০ মাইল পশ্চিমে ফুজি পর্বতমালার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ৩৫ বর্গ কিলোমিটারের একটি জঙ্গল। যেখানে মানুষ শুধু আত্মহত্যা করতেই যায়। এটি সি অব ট্রিজ অথবা গাছের সমুদ্র নামেও পরিচিত। তবে সুইসাইড ফরেস্ট বা আত্মহত্যার বন নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত। লাভা শিলায় সমৃদ্ধ এই জঙ্গল পৃথিবীর অন্যতম সুইসাইড স্পটগুলির একটি৷ এই বন থেকে প্রতিবছর গড়ে একশ জন মানুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী আত্মহত্যার সংখ্যার বিচারে অওকিগাহারা অরণ্য বিশ্বে দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন ব্রিজ। আত্মহত্যার ধারণা দেশবিশেষে পাল্টে যায়। নিজেকে শেষ করে দেওয়া কোনও দেশে পাপ, আবার কোথাও সেই ধারণা কার্যকর নয়। জাপান পড়ে এই দ্বিতীয় পর্যায়ে।

এ বনের প্রবেশ পথেই সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা আছে, “দয়া করে আরেকবার ভাবুন, যদি সত্যিই কোনো সমস্যায় বা ঝামেলায় থাকেন পুলিশের সাহায্য নিন, দয়া করে মৃত্যুর আগে নিজের কথা একবার ভাবুন।” এমন অসংখ্য সচেতনামূলক নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে স্বেচ্ছায় মানুষ যায় জীবনের ইতি টানতে। নোটিশ বোর্ডের দিকে তাকানোর প্রয়োজনই পড়ে না তাদের৷

কেন এমন অদ্ভুত ঘটনা? কেনইবা মানুষ এখানে যায় আত্মহত্যা করতে? এসব প্রশ্নের উত্তরে স্থানীয় নানান প্রচলিত গল্প রয়েছে।

কথিত আছে, ১৯৬০ সালে সেইকো মাটসুমোটো নামের এক জাপানি লেখকের দুটি উপন্যাস ‘লিট’ ও ‘টাওয়ার অফ ওয়েবস’ এতই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো যে পাঠকেরা সেই উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করে ফেলতে শুরু করে। এই উপন্যাসের প্রধান দুটি চরিত্রই অর্থাৎ প্রেমিক-প্রেমিকার বিচ্ছেদের করুণ কাহিনীর সমাপ্তি হয়েছিল এই বনে এসে আত্মহত্যার মাধ্যমে। এটি প্রকাশের পর থেকেই প্রেমিক-প্রেমিকাদের এখানে এসে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়।

শোনা যায়, উনবিংশ শতাব্দীতে এই এলাকায় ‘উবাসুতে নামে এক অদ্ভুত রীতি পালিত হত। এই রীতি অনুযায়ী মৃত্যু পথযাত্রী বৃদ্ধাদের এই জঙ্গলে এসে ছেড়ে চলে যেতেন তাদের পরিবারের লোকজন। এরপর এখানেই মৃত্যু হত তাদের। স্থানীয়দের মধ্যে এখনও অনেকে বিশ্বাস করেন, মৃত বৃদ্ধাদের আত্মারা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে এ বনে।

রহস্য গল্প

কেউ কেউ বলে থাকেন জাপানের অর্থনৈতিক মন্দার সময় অর্থ সংকটে পড়ে পরিবারের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়ে অনেক লোকজন এখানে এসে আত্মহত্যা করেছিলো। এরপর থেকেই যেকোনো সমস্যায় মানুষ তাদের জীবনের ইতি ঘটাতে চলে আসে এই বনে৷

১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫শ’র মতো জাপানি এখানে আত্মহত্যা করেছেন। ১৯৮৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর ১০০ জন এই জঙ্গলে এসে আত্মহত্যা করেছেন। ২০০২ সালে এই জঙ্গলে ৭৮টি মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০৩ সালের দিকে আত্মহত্যার হার বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ এরও বেশি। ২০০৪ সালে এই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৮ জনে। এরপর স্থানীয় প্রশাসন মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়।

অওকিগাহারায় স্বেচ্ছাসেবকরা মৃতদেহ উদ্ধারের সময় প্লাস্টিকের ফিতা বা টেপ দিয়ে রাস্তা চিহ্নিত করে রেখে যেতো। যাওয়ার সময় গাছে গাছে টেপ বেঁধে ভেতরে প্রবেশ করেন যেন আসার সময় রাস্তা চিনে বের হয়ে আসতে পারেন। নয়তো যে কেউ পথ হারিয়ে চিরতরে আটকে যেতে পারেন এই মৃত্যুপুরীতে।

অওকিগাহারার মাটিতে ম্যাগনেটিক আয়রনের পরিমাণ এতই বেশি যে মোটেও নেটওয়ার্ক কাজ করে না। আর জিপিএস সিস্টেম তো চিন্তার বাহিরে৷ এমনকি কম্পাসও এখানে অচল। এজন্যই টেপ বা প্লাস্টিকের ফিতা ব্যবহার করা ছাড়া অন্যকোনো উপায় নেই।

পড়ে থাকা থমথমে নিথর দেহ, কঙ্কাল বা নির্জন নিঃশব্দ বনের স্বাদ পেতে তবুও এডভেঞ্চার প্রিয় কিছু পর্যটকেরা এ বনে প্রায়ই ছুটে আসে। কেউ কেউ জীবিত ফিরতে পারেন আবার কেউবা চির সবুজে হারিয়ে যান চিরতরে।

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
1
+1
0
+1
0

You May Also Like