রহস্য গল্প: ৯ পর্বতারোহীর রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনা

৯ পর্বতারাহীর রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনা
পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনাগুলোর একটি হলো Dyatlov Pass incident. কারণ ঘটনা ঘটার পর থেকে এখন পর্যন্ত এর কোন রহস্য বের করা যায়নি। ১৯৫৯ সালের কথা। তৎকালীন উরাল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের (বর্তমান উরাল স্টেট ইউনিভার্সিটি) ৮ জন ছাত্র ও ২ জন ছাত্রী ওটোর্টেন পর্বতারোহণের জন্য বের হলেন।

অভিযাত্রীদল প্রথমে ট্রেনে রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ Sverdlovsk Oblast এর একটি শহর ইভডেলে পৌঁছলেন জানুয়ারির ২৫ তারিখ। এরপর তাঁরা উত্তর দিকে ‘ভিজাই’তে গেলেন ট্রাকে করে। এখানেই মনুষ্যবসতির শেষ, এরপর পুরোই জনমানবহীন। জানুয়ারির ২৭ তারিখ অভিযাত্রীদল ওটোর্টেন পর্বতের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। পথে এক অভিযাত্রী অসুস্থতার কারণে ফিরে আসেন। এবার অভিযাত্রী দলের সদস্য হয়ে গেল নয় জন। পরে অভিযাত্রীরা যেখানে সর্বশেষ ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন, সেখানে তাঁদের ডায়রি ও ক্যামেরা পাওয়া যায়।

যেটি থেকে অভিযাত্রীদল কোন পথে এগিয়েছিলেন তার একটি ধারণা পাওয়া যায়। ৩১ জানুয়ারি অভিযাত্রীদল একটি উচ্চ স্থানের প্রান্তে এসে পৌঁছলেন ও পর্বতারোহণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।

ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ, তাঁরা গিরিপথের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করলেন। খুব সম্ভবত তাঁরা গিরিখাতের অন্য প্রান্তে ক্যাম্প স্থাপন করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু চরম খারাপ আবহাওয়া ও তীব্র তুষারপাতের কারণে অভিযাত্রীদলের দিক নির্ণয়ে ভুল হয়ে গিয়েছিল। যখন তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝতে পারেন, তখন তাঁরা তাঁদের অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করেন ও পর্বতের একটি ঢালু জায়গায় সেদিনের জন্য ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। অভিযাত্রীদলের নেতা ইগর এলেক্সেভিচ ডায়াটলোভ অভিযানের আগে তাঁর স্পোর্টস ক্লাবকে জানিয়েছিলেন কয়েক দিনের মাঝেই তাঁরা ভিজাই’তে ফিরে এসে টেলিগ্রাম করবেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ পেরিয়ে যাবার পরও যখন কোন টেলিগ্রাম এলো না, তখন অভিযাত্রী দলের সদস্যদের আত্মীয়স্বজন জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারকাজ শুরুর আহবান জানান। ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা বিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধার অভিযানে নামলেন।

ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখ, তদন্তকারী দল Kholat Syakhl এর কাছে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যাক্ত তাঁবুর সন্ধান পেলেন। এতে সেই ৯ জন পর্বতারোহীর ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র ও জুতো পাওয়া গেল। তাঁবু থেকে আট কিংবা নয় জোড়া পায়ের ছাপ পর্বতের ঢাল বেয়ে কাছেই এক বনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেল। পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করতে গিয়ে বনের প্রান্তে একটি সিডর গাছের নিচে আগুন জ্বলতে দেখতে পেল, আর কাছে গিয়ে দেখে ইউরি এলেক্সেভিচ ক্রিভোনিশ্চেঙ্কো ও ইউরি নিকেলোভিচ ডোরোশেঙ্কোর নামের দুই অভিযাত্রীর লাশ। তাদের পরনে ছিল শুধু অন্তর্বাস।গায়ের পোষাক কে যেন খুলে নিয়েছে। সিডর গাছটির ডাল পাঁচ মিটার উচ্চতায় ভেঙ্গে গিয়েছিল। খুব সম্ভবত তাঁরা কিছু একটা দেখার জন্য গাছের ঢালে উঠেছিলেন, তার পর ঢাল ভেঙ্গে পড়ে গেলো। এরপরেই পাওয়া গেল ইগর এলেক্সেভিচ ডায়াটলোভ, জিনাইডা এলেক্সেভনা কলমোগরভা ও রুস্টেম ভ্লাদিমিরোভিচ স্লোবোদিন নামের আরো তিন অভিযাত্রীর মৃতদেহ। সিডর গাছটি থেকে এঁদের দেহ যথাক্রমে ৩০০,৪৮০ ও ৬৩০ মিটার দূরত্বে পড়েছিল। কিন্তু বাকি চার অভিযাত্রীর লাশ আশেপাশে পাওয়া গেলো না।

মে মাসের ২ তারিখ বাকি ৪ জন পর্বতারোহীর মৃতদেহ উদ্ধার হলো। প্রথম ৫ টি মৃতদেহ উদ্ধারের সাথে সাথে ব্যপক তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসকরা জানান অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে তাঁদের মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু যখন শেষ চারটি মৃতদেহ উদ্ধার হলো তখন পুরো ঘটনা পাল্টে গেল। প্রতিটি মৃতদেহ ভয়াবহভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল।আর চিহারায় ছিলো আতঙ্কের চাপ। মনে হচ্ছিলো মৃত্যুর আগে তারা ভয়ংকর কিছুর মুখমুখী হয়েছিলো। অভিযাত্রী থিবাক্স- ব্রিগনোলেক্স এর মাথার খুলি ছিল ক্ষতিগ্রস্ত, ডুবিনিনা ও জোলোতারিওভের বুকে ছিলো কাটার চিহ্ন। এছাড়া চার অভিযাত্রীর জিহ্বা ছিল অনুপস্থিত অর্থাৎ কেউ তা কেটে ফেলেছিল। ধারণা করা হয়েছিল, স্থানীয় মানসী উপজাতীয়রা তাদেরকে আক্রমণ করে থাকতে পারে, কিন্তু সেটি যুক্তিতে টেকে না। এছাড়া -২৫ থেকে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কেন অভিযাত্রীদলের দেহে কোন ভারী গরম পোশাক ছিল না, সেটিও এক রহস্য। কি হয়েছিল অভিযাত্রীদলের ভাগ্যে? সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারি তদন্ত কর্মকর্তা লেভ ইভানভ কোন সুরাহা করতে পারেন নি। তাঁর মতে, এটি ভিন্ন গ্রহের প্রাণী বা এলিয়েনদের কাজ। কারণ অভিযাত্রীদের উদ্ধার হওয়া ডায়রীতে উল্লেখ্য আছে ঐ জায়গা যাওয়ার পর থেকে তারা প্রায় সময় অদ্ভুদ এক আওয়াজ শুনতে পেতেন। সেটি কোন মানুষ কিংবা পরিচিত প্রাণীর শব্দ নয়। কানপাটা সেই শব্দে ভারি হয়ে উঠত চারপাশ। সরকারিভাবে তদন্তকাজের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

জায়গাটি অবরুদ্ধ করে দেয়া হয় পরবর্তী চার বছরের জন্য। কিন্তু রহস্য আবার সামনে চলে আসে যখন ব্রিটিশ লেখক ও গবেষক কেইথ ম্যাককোলস্কি এই ঘটনা নিয়ে বই লিখেন। তাঁরা কি কোন প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়েছিল? কিন্তু সেরকম কোন কিছুর চিহ্ন তো পাওয়া যায় নি।এক সময় রহস্যময় তুষারমানব বা ইয়েতির না সামনে চলে আসে। মেরু অঞ্চলে এই প্রাণীর বসবাস বলে অনেকের ধারণা। কেউ কেউ শতাব্দী প্রাচীন ভয়াবহ কিংবদন্তী zolotaya baba বা সোনালী নারীর কথাও বলেছেন, যে এই অভিযাত্রীদলকে আক্রমণ করেছিল। এছাড়া অভিযাত্রীদলের ক্যামেরায় তোলা শেষ ছবিতে একটি উজ্জ্বল গোলাকার আলোর ছবি ধরা পড়ে। এটি কি অতিরিক্ত আলোতে এক্সপোজারের কারণে ফিল্ম জ্বলে গিয়েছিল? নাকি ছিল কোন ইউ এফ ও বা ভিন্ন গ্রহের যান? খুব সম্ভবত আমরা কখনোই আর তা জানতে পারবো না এই ৯ পর্বতারাহী রহস্যময় মৃত্যু এর গল্প ।

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
Content Protection by DMCA.com

You May Also Like

About the Author: মোঃ আসাদুজ্জামান

Inspirational quotes and motivational story sayings have an amazing ability to change the way we feel about life. This is why I find them so interesting to build this blog Anuprerona.