কোথাও একফোঁটা জল নেই – ফয়সল সৈয়দ

কোথাও একফোঁটা জল নেই - ফয়সল সৈয়দ

গ্রামে মিলিটারি এসেছে তো কি হয়েছে, মিলিটারি বাঘ না ভাল্লুক নাকি সাক্ষাৎ আজরাইল? মিলিটারি কাজ মিলিটারি করবে আমাদের দৈনন্দিন কাজ আমরা করবো। এটা শেখ সাহেব আর ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা দ্বন্দ্ব, এখানে আমাদের নাক গলানো মানে-স্বখাত সলিল। মাওলানা আবু বকর গ্রামবাসীকে বুঝাতে চেষ্টা করে। মিলিটারির মেজরের সাথে কথা হয়েছে ওরা আমাদের কোন ক্ষতি করবে না। ভারতের উস্কানি দিচ্ছে তাই হিন্দুদের উপর একটু ক্ষেভে আছে। হিন্দু ভাইরা আপনারা সাবধানে থাকবেন। মিলিটারিরা সব সহ্য করতে পারে, হিন্দু সহ্য করতে পারে না। মাওলানার কথায় নির্মল সেন স্খলিত কন্ঠে বলে, তাহলে আমাদের উপায়। বাপ-দাদা ভিটা ছেড়ে আমরা এখন কোথায় যাবো।

মাওলানা বলে, এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি মেজর সাহেবের বলেছি আপনাদের কথা। আমাদের গ্রামে হিন্দুরা নীরহ। অখন্ড পাকিস্তান জন্য ওরা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না।
-তার প্রত্যুত্তরে মেজর সাহেব কি বল্ল? ব্যগ্রভাবে বলে নির্মল সেন।
-একটু ধের্য ধরুণ অল্প কিছুদিনের মধো সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সপ্রতিভ মাওলানার মুখ।

হিংসা,মারামারি,কাটাকাটি সেই বাবা আদম যুগ থেকে চলে আসছে। আলাউদ্দীন খিলজির মতোন শাসক ক্ষমতার জন্য পিতৃতুল্য শ্বশুর হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। মুঘল সাম্রাজ্য তো ভ্রাতৃযুদ্ধ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। মাওলানা বাড়ী বাড়ী গিয়ে সবাইকে বুঝায়, ভাইরা তোমরা কেউ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিও না আর তোমাদের ছেলেদের চোখে চোখে রাখবে যেন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে না পারে,জয় বাংলা স্লোগান না দিতে পারে। মেজরে চোখে যে ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ দেখেছি তা পুরা গ্রাম ছারখার করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যেসব বাড়ী ছেলে ইতোমধো মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে তাদের পরিবারকে শাসায় মাওলানা। তিরস্কার করে বলে, যত শীঘ্র পার ওদের ফিরিয়ে আন। গ্রামে গ্রামে রাজাকার বাহিনী গঠন করেছে মিলিটারিরা। আল-বদর মিলিটারি তদারকিতে আর রাজাকার তদারকি করছে পুলিশ।

রাতে একটি দুঃস্বপ্ন দেখে মাওলানার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তার লাশ পড়ে আছে বাড়ীর উঠানে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়,দুপুর শেষে বিকাল, বিকাল গিয়ে সন্ধ্যা নামে। কেউ তার লাশ কবর দিতে আসে না। রাত গভীর হলে একদল বেওয়ারিশ কুকুর তার লাশ নিয়ে টানাটানি করতে থাকে, ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করতে থাকে। কার আগে কে খাবে। একটি কুকুর তার কান বরাবর কামড় দিতে চাইলে, লাফিয়ে উঠে সে। অন্ধকারে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে মাওলানা ; এ ধরণের স্বপ্ন দেখার ব্যাখা খুঁজার চেষ্টা করে।

ফজর নামাজ পড়ে মুসল্লি যখন একে একে ঘরে ফিরছে। তখন মাওলানা মিম্বারের পাশে বসে থাকে। আল্লাহ কাছে হাত তুলে অখন্ড পাকিস্তান ভিক্ষা চায়। ভ্রাতৃসংঘাতের সমাপ্তি চায়। শিশুর মতোন চোখে পানি ফেলতে থাকে। নীরবে কাঁদে। শোকে কাঁদে।

দিন যত যায় পরিস্হিতি তত অবনতি দিকে যেতে থাকে । রাজাকার মোসলেহ উদ্দিন প্ররোচণায় গ্রামে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। গ্রামে হিন্দু বলতে গেলে নেই এখন, যে কয়েকজন মাটি কামড়ে পড়ে আছে, তারা বাপ-দাদা ভিটা ছেড়ে কোথায় যাবে বুঝে উঠতে পারছে না। মোসলেহ উদ্দিন হিন্দুদের কলেমা শিখাচ্ছে। মাথায় টুপি পরা শিখাচ্ছে। পথে দেখা হলে চার খলিফার নাম জিজ্ঞেস করে, জিজ্ঞেস করে পাঁচ কলেমা। মিলিটারি তো কয়েকধাপ এগিয়ে লুঙ্গি খুলে পরখ করে দেখছে হিন্দু না মুসলমান। মাওলানার সিরাজ মাস্টারকে বলে,মাস্টার সাব পাকিস্তান মনে হয় আর টিকে রাখা যাবে না। ধবংস অনির্বায। মাস্টার মুচকি হেসে বলে, আপনি তাহলে লাইনে আসছেন এতদিনে। শুয়োরের বাচ্চারা ধর্ম নিয়ে যা শুরু করে দিয়েছে , ওরা মনে করে ইসলাম মানে পাকিস্তান। মাওলানা বলে, সবাই মুসলমান,এজিদ দল যখন ইমাম হোসনকে হত্যা করছিল, তখন ওরা ওয়াক্তি সালাত ( আছরের নামাজ ) আদায় করছিল। হায় হোসেন ,হায় কারবালা। উমাইয়ারা তো অনারবদের তিরস্কার করে মাওয়ালি ডাকত। কোথায় আজ সেই উমাইয়া শাসন! সব ঠিক আছে শুধু মানুষ বদলে গেছে। আজ পাকিস্তানিরা বলে আমরা অর্ধেক মুসলামান অর্ধেক হিন্দু। ওরা সাচ্চা মুসলমান। সিরাজ মাস্টার বলে,মাওলানা শুনছেন গ্রামে নাকি মুক্তিবাহিনী ডুকেছে। ম্লান চোখে মাওলানা বলে, শুনছি। দেশে মনে হচ্ছে বড় ধরনের যুদ্ধ বাঁধবে।

রাজাকারের উৎপাত, মিলিটারিদের অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে পড়ে গ্রামের মানুষগুলো। যে যেদিকে পারছে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। মাদারাসা মাঠে মিলিটারিরা গ্রামের কয়েকজন হিন্দুকে জড়ো করে গরু মাংস খাওয়ায়। উদ্দেশ্য তাদের হিন্দুত্ব ধবংস করে ফেলা, শরীরের ঈমানি বপণ করা। গরু গোশত খেতে খেতে কয়েকজন হিন্দু বেহুশ হয়ে পড়ে, কয়েকজন বমি করে ফেলে। মিলিটারিরা বমি করা গোশত তাদেরকে আবার চেটে খেতে বাধ্য করল।

লজ্জায়, ঘৃণায়,অপমানে সেদিন পর গ্রামের সব হিন্দু পালালো। তাদের ভাষ্য একটি গরুতে তেত্রিশ কোটি দেবতা থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্পেশাল আর্শিবাদ। আর সেই গরু ভক্ষণ। না, এখানে আর নয়। এর চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল। এই দেশ, এই মাটি তাদের জন্য আর নিরাপদ নয়।

দুপুরে খবর এল। রাজাকার মোসলেহ উদ্দিন মিলিটারি ক্যাম্পে ষাট বছরের বৃদ্ধা কল্পণা দেবীর মেয়েকে না পেয়ে তাকে ধরে নিয়ে গেছে। সিরাজ মাস্টারই খবরটা দিল মাওলানাকে। আর অনুরোধ করল মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে বৃদ্ধা কাছে গিয়ে জেনে আসতে কোথায় আছে তার মেয়ে। মাস্টারের কথা রাজি হয় না সে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা জড়াতে চায় না নিজেকে। সিরাজ মাস্টার বলে, মাওলানা আপনার একটি ইনফরমেশনে বেঁচে যেতে পারে একটি ফুটফুটে মেয়ে। আপনি বৃদ্ধা থেকে খবরটা এনে আমাকে দিবেন বাকী কাজ আমি আর আমার মুক্তিবাহিনী করবে। আপনি মুক্তি। বিস্ময় মাওলানা নড়ে চড়ে বসে। ভয় কিছু নেই আপনার কোন ক্ষতি করবো না। সিরাজ মাস্টার বলে।

একই বয়সী , ছোটবেলা মাওলানা আর সিরাজ মাস্টার পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত একই মাদরাসায় পড়ালেখা করে যষ্ঠ শ্রেনী থেকে সিরাজ মাস্টার হাই স্কুলে চলে যায়। ছোটবেলার সেই বন্ধুত্বের দোহায় দিয়ে মাওলানার দু’হাত ধরে ফেলে বলে, আবু বকর আমাকে কথা দাও তুমি। তোমাকে মিলিটারি সন্দেহ করবে না। মাওলানা থেকে হঠাৎ বকর শব্দটি সিরাজ মাস্টারের মুখে থেকে কিছুটা অবাক হয়ে যায় সে। মাস্টারের হাতের হাত রেখে বলে; অবশ্য। দোস্ত আমি যাবো।

মিলিটারি ক্যাম্পে মাওলানা দেখে পিছনে হাত বাঁধা অবস্হায় বসে আছে কল্পণা দেবী। এবড়ো খেবড়ো, বিধস্ত শরীর দেখে বুঝা যাচ্ছে কি ঝড় গেছে তার উপর দিয়ে। তবু নিলির্প্ত বৃদ্ধা। মাওলানাকে দেখে অট্টহাসি হেসে মেজর বলে, আয় মাওলানা দেখিয়ে বুড়ি কি পেট সে কুছ নিকাল সেকতা হায়, বুড়ি কি এক খুব ছুরত লাড়কি হায় না? মাওলানা মনে মনে গালি দেয়, শুয়োরের বাচ্চা তোরা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবি! তোদের পতন অনির্বায। মেজর সাথে কথা বলে বৃদ্ধা কাছে যায় সে। বৃদ্ধা তাকে দেখে আগের মতোন নিলির্প্ত থাকে। সে বলে, বুড়ি মা আমাকে বলতে পারেন আপনি। কোথায় আছে আপনার মেয়ে। তার কথায় তীব্র ঘৃণা ছুঁড়ে বলে সে। মেজরের দালালি করতে আসছেন। মাওলানা বৃদ্ধাকে সিরাজ মাস্টারের কথা বলতে বৃদ্ধা ঘোর অন্ধকারে আলো খুঁজে পায়। এবং বলে, হুজুর আপনার সাথে আমার ধর্মের সম্পর্ক নেই, রক্তের সম্পর্ক নেই। কিন্তু আপনিও মানুষ আমিও মানুষ। মনুষ্যত্বের দোহায় দিয়ে বৃদ্ধা মাওলানার বিবেকের দরজায় টোকা মারে, কশাঘাত করে।

মাওলানা বৃদ্ধার বাড়ীতে যেতে যেতে শুনে সিরাজ মাস্টারকে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গেছে। সে নাকি মুক্তি, জয় বাংলার লোক। সে জানে বৃদ্ধা মেয়ে কোথায় আছে। মাস্টারের গ্রেপ্তারের খবরে হোঁচট খায় সে। বুঝে উঠতে পারে না কি করবে। নাকি ফিরে যাবেন। মাস্টার কি তার কথা মুক্তিদেরকে বলেছে। না বললে যাতাঁকলে পড়েছে সে তবে। ভাবতে ভাবতে বৃদ্ধার বাড়ীর জঙ্গলে ঝোপ থেকে বৃদ্ধার মেয়েকে উদ্ধার করে বোরকা পরিয়ে বৃদ্ধার উঠানে পা দিতেই একদল মুক্তিবাহিনী মাওলানাকে ঘিরে ধরে। জয় বাংলা বলে তিন যুবক রিভলবার বের করে গুলি ছোঁড়ে ঝাঁঝরা করে দেয় মাওলানার বুক। বৃদ্ধার মেয়েকে নিয়ে দ্রুত সিটকে পড়ে।

চিৎ হয়ে পড়ে থাকে মাওলানার নিথর দেহ।

ঘন্টা খানিক পর মিলিটারির একটি ছিপ পিছনে হাত বাঁধা সিরাজ মাস্টারকে নিয়ে নামে। স্তব্ধ মাস্টার মাথা নিচু করে নিবার্ক চেয়ে থাকে বাল্যবন্ধু নিথর শরীররে দিকে। বিবেকের দংশনে।

প্রগলভ মেজর মাওলানার বুকের উপর পা রেখে বলে, বেঈমান কা সাজা আল্লাহ দেয় গা। পাকিস্তান কো আল্লাহ ছি হেফাজত করে গা।

Facebook Comment

You May Also Like