Sunday, July 12, 2026
Homeবাণী ও কথাসাধুর ঘর - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সাধুর ঘর – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সাধুর ঘর – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পাকুড় গাছের তলায় সাধুর ঘরে কে যেন আগুন দিয়েছে। উত্তরে বাতাস বইছে হুহু। দুপুরের রোদে আগুনের তেমন জলুস খোলে না। তবু সাধুর ঝোঁপড়াটা রোদ খেয়ে টনটনে হয়ে ছিল বলে আগুনটা ধরেছে ভালো। কয়েকটা হালকা পাকুড় গাছটার নীচু ডালপালা ধরে ফেলল, কয়েকটা লাফ দিয়ে গিয়ে ধরল নুলো সাতকড়ির চায়ের দোকানটা। দুপুরের খর রোদেও আগুনটার লাল হলুদ রংটা ছড়িয়ে গিয়ে খোলতাই হল। হপ্তা বাজারের রাস্তায় লোক জমে গেল খুব। কর্ড লাইনের ধারের পসারিরা ছুটে এল।

কে আগুন দিল? কে?

সাধু লোক ভালো না। কর্ড লাইনের ধারের বেওয়ারিশ পাকুড়তলার জমি তার বাপের নয়। সরকারের। সরকারের বাঁধুনি আলগা, তাঁর কোচা দিতে কাছা খুলে যায়। তাই গভর্নমেন্টকে ছোলাগাছি দেখিয়ে বছরখানেক সাধু তার ঝোঁপড়ায় গেঁজেল তেড়েলদের আড্ড খুলেছে। মুখোমুখি একঘর পাটকল ম জ্বরের বাস। তাদের ছানাপোনা আঁতুড় থেকেই ধুলোয় গড়ায়, ধুলোমাটিতে হামা টানে। কয়েক গজ দূর দিয়ে বুক কাঁপানো মেল ট্রেন যায়, আর যায় বাহারি রাজধানী এক্সপ্রেস, নিঃশব্দে সাপের মতো চলে লোকাল। ছানাপোনারা সেইসব ট্রেনের চাকা থেকে দু-তিন গজের মধ্যে খেলাধুলা করে পাথর কুড়োয়। মায়েরা ক্ষেপও করে না। বাপেরা ছেলেমেয়ের নামও ভুলে যায়। মানুষের এইসব উদাসীনতার ফাঁকে ফোঁকরে এক-আধজন লোক দুনিয়াতে বসে যায়। সাধুও বসে গিয়েছিল।

সাধুদের রাঙা পোশাক পরতে হয়, মুখ খারাপ করতে হয়, ত্রিশূল বইতে হয়–বোধহয় সেইজন্যই সাধু জটাজুট, রাঙা পোশাক, ত্রিশূল সবকিছুর জোগাড় রেখেছে। আর তার খারাপ মুখ। এমনই অনর্গল অবিরল সারাদিন সে মুখ ছোটায় যে, পাটকল মজুরদের ছানাপোনাদের মুখে প্রথম যে কথা ফোটে, তা হল সাধুর খারাপ কথা। কেউ রাগ করে না অবিশ্যি। শিখবেই তো বড় হয়ে, বাপ যখন মাকে বকবে, কি মাতাল হয়ে হল্লাচিল্লা করবে, কি পাওনাদার যখন এসে বাপকে নেবে একহাত, তখন শেখা হবেই। সাধু শুধু কাজটা এগিয়ে রাখছে। রাখুকগে। সাধু যখন চিল্লায়, তখন সকালবেলায় ছানাপোনার মা দূরের দিকে চেয়ে বসে মাথায় উকুন চুলকোয়, বাপ পাকুড়তলায় ছায়ায় খাঁটিয়ায় শুয়ে আগের রাতের খোঁয়ারি ভাঙে। কেউ সাধুর দিকে ফিরেও চায় না।

সবাই জানে–এ সাধুটো ঝুট আছে। সাট্টা সাধু মেকি। সেবার যখন শীতলবাড়ির পাশে মজুমদারদের নতুন ভাড়াটের বউটাকে রাত বারোটায় তেঁতুলবিছে কামড়াল, তখন অত রাতে উপায় না দেখে তারা এসে সাধুকে ডেকেছিল, যদি সাধু এসে ঝেড়ে ফুকে দেয়। সাধু বিপদ বুঝে তেড়ে গাল দিতে লাগল–বিছেটাকে মেরে ফেলেছ তোমরা? অ্যাঁ? মেরে ফেলে আবার আমাকে ডাকতে এসেছ? বলি, ঝাড়ব যে, তা বিষটা টানবে কে? বিছেটা মেরে ফেললে–তা বিষটা কি আমি মুখ দিয়ে টানব?

তখনই বোঝা গিয়েছিল যে, সাধুটা সাট্টা। মজুমদার ভাড়াটেরা তখন জি টি রোড থেকে বিখ্যাত ঝাড়ুনী বুড়িকে নিয়ে এসেছিল। বুড়ি এসে প্রথমটায় দুধ আর জল দিয়ে ঝাড়ল, তারপর ঝাঁটার কাঠি দিয়ে। ব্যাপারটা দেখতে জমকালো, কিন্তু কাজ হল না। কিন্তু সাধু পদ্ধতিটা দেখে রাখল মন দিয়ে। অন্য জায়গায় চালাবে। তাকেও করে খেতে হবে তো?

গোলবাজারে বুড়ো শেখ সাহেব বসতেন এক সময়ে। দারুণ গেঁজেল। তাঁকে ঘিরে ছিল সারা হপ্তা রেসুড়েদের ভিড়। শুক্রবারে ভিড় হত সবচেয়ে বেশি। শেখসাহেব ভ্রূক্ষেপ করতেন না। গাঁজা টানতেন, আর টানতেন। তারপর নিমীলিত চোখে কখনও হুঙ্কার দিয়ে বলতেন–এক লাঠি। তার মানে হচ্ছে এক। এক নম্বর ঘোড়া ধরো তো তোমরা। কখনও বলতেন–দো রোটি। তার মানে হচ্ছে–আট। কখনও বা–তিন কাঠি। তার মানে হচ্ছে–চার। এইরকম ঠারে ঠোরে টিপস দিতেন শেখসাহেব। ঘোড়া রেসের ময়দানে শেখ সায়েবের কথা মতো চলত।

সাট্টা সাধু কায়দাটা শিখে রেখেছিল। পাকুড়তলায় গাঁজা টানতে-টানতে সে-ও মাঝে-মাঝে চিৎকার দেয়–এক লাঠি। কিংবা–তিন কাঠি। কিংবা দো রোটি।

লোকে প্রথমটায় খেয়াল করেনি। রেলের গ্যাংম্যান চানুর বাহারি দাড়ি আছে বলে তার নামডাক দেড়েল চানু বলে। দেড়েল চানু সাধুর টিপস ধরে পয়লা বারে একশো আঠারো টাকা, দ্বিতীয় দফার শ’দেড়েক টেনে আনল তারপর দিশি মদ গিলে এসে সাধুর পায়ের ওপর বডি ফেলে কাঁদতে–কাঁদতে বলল –মন্তর দাও। আজ থেকে আমি তোমার চেলা।

তা দেড়েল চানুই সাধুর প্রথম শিষ্য। মন্তর বলে যে একটা ব্যাপার আছে, তা সাধু খেয়ালই। করেনি। স্বপ্নেও তার ভাবা ছিল না যে, তারও একদিন শিষ্য জুটবে। ছেলেবেলায় সে তার বাপকে দেখত, ঘুম থেকে উঠেই হাই তুলতে-তুলতে চেঁচাত–ওঁ তৎসৎ। সেই মন্তরটা জানা ছিল। দেড়েল চানুর কানে-কানে সেই মন্তরটা দিয়েছিল সে। আর ধরিয়ে দিল গাঁজার কলকে। বর্ষার পর দেড়েল চানু তার ঝোঁপড়াটা নতুন খড় দিয়ে ছেয়ে দিল, ভিতরে তৈরি করে দিল একটা বাঁশের মাচান, নতুন একটা লোমের কম্বল কিনে দিল। আরও গোটাকয় শিষ্যও দিল জুটিয়ে। কিন্তু চানু ছাড়া সবক’টা শিষ্যই হাড়হাভাতে। গুরুর পয়সায় গাঁজা টানে, তারই সঙ্গে সমানে বসে খিস্তিখাস্তা করে, ঝোঁপড়ায় বসে থুথু ছিটিয়ে ঘর নোংরা করে যায়। সাধু রাগ করে চেঁচায়, অশ্লীলতম কথা বলে গাল পাড়ে। কিন্তু চেলাগুলো তখন তার সঙ্গে ডাকটিকিটের মতো সেঁটে গেছে, মা-বাপ তোলা গালাগাল শুনে গোলাপি রঙের হাসি হাসে।

দেড়েল চানু সাট্টা সাধুটার পিছনে হকের পয়সা ঢালছে–এটা লোকের সহ্য হয় না। চানুকে এখানে সেখানে পাড়ার লোকে পাকড়াও করে তোমার সংসার ভেসে যাচ্ছে চানু হে। ফুটো নৌকোর সওয়ারি তুমি–ওই শালা জোচ্চোরটার পিছনে–ইত্যাদি। তখনই লোকের চোখ টাটায় সরকারি বেওয়ারিশ জমি, বেদখল করে শালা বসে গেছে পাকুড়তলায়, এত লোকের যাতায়াতের রাস্তার ধারে, কারো নজরেও পড়ে না নাকি! সরকারি জমি, সরকার বুঝবে, কার বাবার কী? কিন্তু তবু লোকের চোখ টাটায়। চানুটা চেলা হয়েই সাধুকে ঝোলালে।

পাটকল মজুরদের কুঠরিগুলোয় প্রায় দিনই হাঁড়ি ফাটে। রাত বিরেতে দিশি মদের ঝোঁকে মরদরা এসে বউয়ের ওপর খামোখা টং হয়, অন্ধকারে এধার ওধার লাথি চালায়। দু-চারটে বাচ্চা লাথি খেয়ে কোঁতকোঁত করে উঠে চেঁচায়, বউগুলো উড়োখুড়ো চুলে দৌড়ে বেরোয়, ছুটাছুটি করে। সেই হুড়–দৌড়ের মধ্যে পুরুষেরা ভাতের মেটে হাঁড়ি ভাঙে, উনুন ভাঙে, আরও কত কাণ্ড করে। সাধু দেখেশুনে তার ঝোঁপড়ায় একটা দোকান দিয়েছিল। মেটে হাঁড়ি কলসী মালসার দোকান। মাকালতলায় কুমোরদের ঘর থেকে বয়ে এনে পাটকলের মজুরদের ঘরে প্রায় দিনই হাঁড়ি কলসী বিকোয়।

শীতলাবাড়িতে রোজকার সকালের প্রণাম সেরে নিরাপদর দাদা হারু ঘোষ ফেরার পথে পাকুড়তলায় দাঁড়িয়ে চারধারটা চোখে-চোখে জরিপ করে নেয়কতটা জমি নিয়েছিস রে, অ্যাঁ?

সাধু তার হাঁড়ি কলসির মাঝখানে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে উদাস গলায় বলে–তা কাঠাদুয়েক হবে।

হারু ঘোষ হাসে-দূর ব্যাটা, দু-কাঠায় তিনতলা উঠে যায়! আধ কাঠা বড় জোর, তা জায়গাটা ভালোই। গেড়ে বসেছিস একেবারে। এ আবার কী–গাছ–টাছ রুয়েছিস নাকি?

সাধু তেমনি উদাস জবাব দেয়–আমি রুইব কেন? জমি আমার বাবার নয়, যখন তুলে দেবে উঠে যাব। গাছ–গাছালি যার–যার মনমতো উঠছে।

–দেখিস বাপু।

কী দেখব, তা সাধু ভেবে পায় না। থুথু ফেলে সে খুব ভাবে। রাতারাতি একটা মন্দির তুলে ফেলতে পারলে পাকাঁপাকিভাবে বেওয়ারিশ জমিটাতে শেকড় চালানো যেত। সিমেন্ট না জোটে চুনসুরকি দিয়ে হাতদশেক উঁচু একটা মন্দির, ওপরে লাল নিশেন উড়ছে-এরকম একটা স্বপ্নের ছবি সে দিন–দুপুরেই দেখে। কিন্তু সকলেই চোখ পেতে আছে–মন্দির ওঠাতে গেলেই খিচাং বেঁধে যাবে। শিষ্য–সাবুদরাও কেউ মানুষ না। দিনদুপুরেই হল্লা–চিল্লা করে গাঁজা খায় ঝোঁপড়ায় বসে। সাধু লাথি মেরে বের করার চেষ্টা করে দেখেছে। নড়ে না। শালখুঁটির মতো শক্ত হয়ে গেড়ে গেছে শালারা। এদের দিয়ে মন্দির? সাধু আবার থুথু ফেলে।

যেমন করেই হোক, মানুষকে দাঁড়াতে হয়। ওই যে নিরাপদ–ছ’মাস আগেও জ্ঞাতিদাদা হারু ঘোষের আটাকলের পার্টনার ছিল। চালের আড়ৎ, আটাকল একা সামলাত। সারা শরীরে, চুলে, লোমে, জ্বতে আটা মেখে দাদা হারু ঘোষ তাকে একদিন ডেকে বলল –এবার থেকে মাইনে নিয়ে থাক, পার্টনারশিপ আর নয়। নিরাপদর বড় লেগে গেল কথাটা। দাদার কারবার থেকে তার সামান্য পুঁজি তুলে দেড়শো গজের মধ্যে আবার দোকানঘর ভাড়া নিল, কিনল আটাকল, খুলল চালের কারবার। পাকুড়তলায় বসে ওই দেখা যায় নিরাপদকে–পিছনে গোঙাচ্ছে চাকি, ফিতে ঘুরছে, ধুলোর মতো উড়ছে আটা ময়দা, কালো নিরাপদ সাদা হয়ে খাটছে, মাপছে, দিচ্ছে, নিচ্ছে, এক মুহূর্তের অবসর নেই। দাঁড়িয়ে গেল মানুষটা। বসে না থাকলে মানুষ দাঁড়ায় ঠিক।

পাকুড়তলায় বসে সাধু এইরকম তার ভবিষ্যৎ ভাবত। নুলো সাতকড়ির ডানহাতে সাড় নেই। হাতটা শরীরের সঙ্গে লেগে থেকে লাঠির মতো ঝোলে। অমন হাত ফেলে দিলেই হয়, তবু সাতকড়ি রেখেছে। হাঁটতে চলতে হাতটা লটরপটর করে, বাজারে হাটে লোকের সঙ্গে ধাক্কা খায়। হাতটা। আর একটা হাতে সাতকড়ি রেল ইঞ্জিনের মতো গেলাসে চামচ নেড়ে চা বানায়। তার ছোঁকরা নেই, একার দোকান। পাটকল মজুর, স্টার সেলুনের আড্ডাবাজ আর ইটের কাজের। জোগানিরা দশ পয়সায় চা মারে। একটুখানি ছাপরার দোকান, গোটা দুই বেঞ্চ, একটা চায়ের টেবিল, দু-চারটে কৌটোবাউটো–ব্যস। গুড় মেরে রস করে রাখে সাতকড়ি–গুড়ের চা সাত পয়সা। সাধুর ঝোঁপড়ার চার হাতের মধ্যে একহেতে সাতকড়িও দাঁড়িয়ে গেল বুঝি! মানুষ দাঁড়ায় বসে না থাকলে।

কথাটা সে তার চেলাদেরও বলে। কিন্তু চেলারা ভঙ্গি বদলায় না। দিনকাল ভালো যায় না সাধুর। দেড়েল চানু ছাড়া তার আর কোনও চেলা হাত উপুড় করে না। মেটে হাঁড়ি কলসি বেচে দিন যায়।

নেশাখোর নানকুর দোকানটা বিলেৎ বাকি পড়ে উঠে গেল গত বছর। সাহেব বাগানের জমিটা দর পেয়ে বেচে দিল। উঠে গেল ইটখোলার দিকে। ওয়াগন ভাঙিয়েদের দলে ভিড়ল কিছুদিন। তারপর পোষাল না বলে সব ছেড়ে  ছুঁড়ে এখন মাল টেনে পড়ে থাকে। জ্ঞান ফিরলে নিখরচার হাট করতে বেরোয় থলি হাতে। একটা বউ দুটো বাচ্চা তার। হাটবাজার না করলে চলে কী করে? তাই আর পাঁচজন লোকের মতোই সে যায় হপ্তা বাজারে। দোকান থেকে আনাজপত্র। তুলে নেয় খুশি মতো, পয়সা দেয় না। দোকানিরা ব্যাজার মুখে চুপ করে থাকে। ফেরার পথে ঝন্টুর দোকান থেকে চা খায়, স্টার সেলুনে দাড়ি কামিয়ে ফিটফাট হয়ে নেয়, শুটকের দোকান থেকে ভালো জর্দা দেওয়া পান খায়, এক প্যাকেট পছন্দসই সিগারেট পকেটে পোরে, ঘোষের দোকান থেকে চাল তোলে, মুদির দোকান থেকে সওদা নেয়–এমন অনায়াসে সব তুলে নেয় যেন অদৃশ্য পয়সা গুনে দিচ্ছে। নিখরচায় সব সেরে ফেরার পথে–পাকুড়তলায় সাধুর ঝোঁপড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ে–সাধে, এই শালা সাধো–

পুরো একটা ছিলিম টেনে নেয় শালা। তারপর অনেকক্ষণ ঝিম মেরে থাকে। উঠবার সময় হলে আবার সাধুকে ডেকে সামনে দাঁড় করায়। পাছায় একটা লাথি কষিয়ে বলে–পাকুড়তলাটা কি বাপের জমিদারি? সরকারি খাজনা লাগে না?

খাজনাটা নানকুই নেয়। তারপর পথে নামে। গান গায়। সাধু বিড়বিড় করে বকে-ইটখোলার দিকে অন্ধকারে মা গোখরো যেন দেয় ঠুকে, হেই ভগবান, ভগবান হে!

এই হচ্ছে সাধু। এইমতো তার দিন যায়।

.

এখন উত্তরে বাতাসে সাধুর ঝোঁপড়াটা ওই জ্বলছে। আগুনটা ধরেছে ভালো। পাকুড়তলা থেকে হাত বাড়িয়ে নুলো সাতকড়ির দোকানটা নিয়ে বাহার খুলেছে আগুনটার। পাটকল মজুরদের ছানাপোনারা নাকে আঙুল পুরে দাঁড়িয়ে গেছে, কাজের লোক নিরাপদ চাকি বন্ধ করে চলে এসেছে, স্টার সেলুনের আড্ডাবাজরা লাফিয়ে পথে নামল, কর্ড লাইনের ধারের ছোট্ট বেআইনি বাজারের খুদে পসারিরা দু-চারজন দৌড়ে আসছে। সাধুর দুই চেলা দুটো শুখো হাঁড়ি জল ছিটিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে দোলাচ্ছে, তাদের চোখেমুখে এখনও ভ্যাবলা ভাব। গাঁজার নেশা এখনও কাটেনি। একটু দূরেই ধুলোয় বসে সাধু বিড়ি ধরিয়েছে, তার মুখচোখ জুলজুল করছে।

কে আগুন দিল? কে?

সাধু দেশলাইয়ের কাঠিটা  ছুঁড়ে ফেলে বলে, আমি।

সবাই বোকা। বলে–কেন?

–আমার ইচ্ছে। সব জ্বলে যাক শালা।

একটু ব্যোমকে থাকে ভিড়টা। তারপরই হঠাৎ সাধুর যে দুই চেলা শুকনো হাঁড়ি থেকে অদৃশ্য জল আগুনে ঢালছিল তাদের একজন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হাঁউরে মাউরে করে চেঁচিয়ে বলল –যখন আগুন দেয়, তখন আমরা মাইরি ঘিরে ছিলাম।

পোড়েলবাড়ির বেঁটে ছেলেটা এগিয়ে সামনে এসে জিগ্যেস করে–নিজের ঘরে আগুন দিয়েছ। বেশ। কিন্তু নুলো সাতকড়ির দোকানটা যে গেল–গরিব মানুষ–তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

সাধু বেঁঝে উঠে বলে–তা আমি কী করব? আগুন কি আমার বাপের? নিজের ঘরে আগুন দিয়েছি আমি, সে আগুন যদি বাতাস বেয়ে–

বালির বাজারে মাল তুলতে গিয়েছিল সাতকড়ি। চটের থলিতে গুঁড়ো চা, আক্রার চিনি, গুড়। ফেরার পথে দূর থেকে আগুন দেখে দৌড়োচ্ছে। একহাতে ব্যাগ, নুলো হাতটা লটপট করে এধার-ওধার বেমক্কা দোল খাচ্ছে। পরনে খাকি হাফ প্যান্ট, গায়ে ময়লা তেলচিটে গেঞ্জি, গেঞ্জি কুঁড়ে বুকের হাড়গোড় কাঠকুটোর মতো ফুটে উঠেছে। সে চেঁচিয়ে বলছে–আমার একশো টাকার মাল–একশো টাকার-

–ওই তো সাতকড়ি।

সাতকড়ির দৌড়োনোর দৃশ্যটা খুবই করুণ। সবাই ঘাড় ফিরিয়ে দেখল। ঘামে তেলতেলে মুখ, গালে বিজবিজে দাড়ি, জতে পাকা চুল, লটপটে নুলো হাতটা,  ছেঁড়া গেঞ্জি, বুকের হাড়গোড়–সব মিলিয়ে ক্ষয়াভাব চেহারাতে। ভিড়টা সেই দৃশ্য দেখে খেপে গেল।

–নুলো সাতকড়ির ঘর কে বানিয়ে দেবে?

–দুটো লোক ঘরে ছিল, তুমি তাদের সুদু আগুন দিয়েছিলে। শালা খুনে।

–গভর্নমেন্টের জমি, বেদখল করে—মামাদোবাজি—

সাধু বিড়িটা ফেলে উঠে দাঁড়ায়। বিপদ। উত্তুরে হাওয়া টেনে দিয়েছে আগুনটাকে, কিন্তু হক কথা, সে সাতকড়ির দোকানে আগুনটা যাক–তা চায়নি, সে কথাটা ভালোভাবে বলবার আগেই পোড়েলদের বেঁটে ছেলেটা চড় কষাল।

পেটে ভালো খাবার পড়ে না বহুকাল, তার ওপর নেশাভাঙ। সাধু ঝিম হয়ে আবার বসে পড়ে। তারপর বেজায়গায় এক লাথি খেয়ে জমি নিল কোলবালিশের মতো। ধুলোয় গড়িয়ে চিৎকার করে বলল –মেরে ফেল, কেটে ফেলে দাও আগুনে–

–তাই দিচ্ছি। তার আগে বল, কেন আগুন দিয়েছিস—

সাধু ধুলোয় গড়ায়, আর লাথি খায়, আর বলে–নিজের ঘরে দিয়েছি, তাতে কার কী? আমার আগুন–

–তোর আগুন অন্যের ঘরে যায় কেন?

জটিল প্রশ্ন। যন্ত্রণার মধ্যে প্রশ্নটার জুতসই জবাব ভেবে পায় না সে। তবু মুখে রক্ত তুলে বলে –ওই শালারা কেন চানুকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে? কেন দুখন, মোধে, নিধে আমার ঘরে গেড়ে বসে গাঁজা খায়, কেন নানকু আমাকে রোজ সাঁঝের বেলায় লাথি মারবে, কেন হারু ঘোষ–

সবটা বলা হয় না। দাড়ি মুঠো করে ধরে কে যেন তাকে তোলে। সে বুঝতে পারে, তার সঙ্গে পাবলিকের কোনও খানাপিনা নেই। তার কথার উত্তরে তখন পাবলিক বলতে থাকে–

–তুমি যে দেড়েল চানুকে শুষে নিচ্ছ হারামজাদা—

–ভদ্রলোকের যাতায়াতের পথে তেড়েল গেজেলের আড্ডা বসিয়েছ—

–গভর্নমেন্টের জমি মেরেছ শালা।

ঝাড়ফুঁক মন্তর জানে না, গুল-চাল মেরে মানুষের মাথা খাচ্ছে—

–সাতকড়ির দোকানে যে তোমার আগুন গিয়ে লাগল—

সাধুর ঝোঁপড়া আর সাতকড়ির দোকান জুড়ে দপ করে যেমন আগুনটা ধরেছিল তেমনি কয়েক মিনিটেই নেতিয়ে গেল আবার। দু-চারটে ছাঁচ বেড়া, মাচান, দুটো টুলবেঞ্চি তো আর আগুনের বেশিক্ষণের খোরাক নয়। কিন্তু আগুনটা নিভতে–নিভতেই সাধুর মুখ ফুলে ঢোল, টসটস করে রক্ত ঝরছে নাকে, কপাল বেয়ে। দাড়ি ছিঁড়ে হাওয়ায় ওড়ে,  ছেঁড়া জটার চুল মুঠো থেকে রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে মারকুটেরা। কে যে মারছে শালা কে জানে। সবাই এখন পাবলিক। সে একা। সাধু। বিড়বিড় করে কেবল বলে–মার শালা, মেরে ফেল। কেটে ফেলে দে আগুনে, দুনিয়া থেকে পাতলা হয়ে যাই।

মারধোরে আর হিসেব রাখে না সাধু। অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা চলে। অনেক হাত, অনেক পা। শেষটায় আর ব্যথা লাগে না তেমন। কেমন যেন নেশাড়ু ঘুম–ঘুম ভাব পেয়ে বসে। টের পায়। ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে কারা যেন বাঁধছে তাকে।

–এইখানে থাক শালা, যে যাবে একটা করে লাথি মেরে যাবে।

–মার না শালা। তোরা পারবি নিজের ঘরে আগুন দিতে? বুকের পাটা আছে? সাধু বিড়বিড় করে বলে।

সেই বিড়বিড় কারও কানে পৌঁছোয় না। পৌঁছালে বিপদ ছিল। ঝিমুনির নেশাটা যখন জমে এসেছে, তখন আস্তে-আস্তে পাবলিক ফোটে। চারদিকে কালো ছাই ওড়ে। শ্মশানের কলসির মতো ছাইয়ের মাঝখানে সাধুর কলসি হাঁড়ির স্থূপ পড়ে থাকে। উত্তর দিক থেকে টেনে হাওয়া দেয়। সাধুর ঝোঁপড়ার ছাই চারদিকে ছড়ায়। ল্যাম্পপোস্টের হাতবাঁধা সাধু ত্রিভঙ্গ হয়ে মাথা রেখেছিল ধুলোর ওপর, সেখান থেকেই পিটিপিটির চেয়ে দেখে নুলো সাতকড়ি একা পাকুড়তলায় বসে কাঁদছে, পাশে তার পাঁচ বছর বয়সের ছেলেটা পিলে বের করে দাঁড়িয়ে।

কারও জন্য এই প্রথম সাধুর মায়া হয়। মায়া মানেই বন্ধন। সাধুদের মায়া থাকতে নেই, তবু মাথায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে বসে সাধু। মাথাটা হালকা লাগছে, মাথার জটটা পরচুলার মতো পড়ে আছে ধুলোয়। সাধু ভ্রূক্ষেপ করে না। নুলো হাত বলেই কি না কে জানে, সাতকড়ি তাকে মারেনি। দূরে বসে কাঁদছে। সে উঠে বসতেই সাতকড়ি মুখ তোলে। আবার নববধূর মতো মুখ। নামিয়ে কাঁদে।

সাধু বলে–কাঁদছ কেন মেয়েমানুষের মতো? বিড়ি থাকে তো দাও।

সাতকড়ি উঠে আসে? মুখে বিড়ি খুঁজে ধরিয়ে দেয়। তারপর বলে–কিন্তু আমার দোষটা কী বলো তো? আমার ঘরটা কেন নিলে আগুনে?

সাধু দাঁতে দাঁত চেপে বলে–আগুনটা আমার বাবার কিনা, তাই–

–তা আমার কী হবে এবারে?

–কী আর হবে? আমার তো মালকড়ি নেই, গতরে খেটে ঘর তুলে দিব। চানুকে বলি, যদি দু-দশ টাকা দেয় তো সে তোমার—

.

ঘর বাঁধতে–বাঁধতে শীত গিয়ে গরম চলে আসে। রোদের হলকা দুপুরের চরাচর চেটে যায়। রাস্তার কুকুরটাও ছায়া ঘেঁষে বসে। সাধু আর নুলো সাতকড়ি মিলে সাতকড়ির দোকানঘর বাঁধে। জটা দাড়ি- ছেঁড়া সাধুর দুই হাত, নুলো সাতকড়ির এক। বাঁশ–বাঁখারি–খুঁটি যত্নে বাঁধে সাধু, সাতকড়ি তার এগিয়ে দেয়, দড়ি ফেরায়। দুজনে কত কথা হয় ভরদুপুর, সারা দিনমান।

সাতকড়ি বলে–তুমি লোকটা সাধুই বটে হে।

সাধু অনাবিল একটু হাসে, বলে–বুঝলে সাতকড়ি, পাকুড়তলায় ঘরটায় যখন তেড়েল গেঁজেদের আড্ডা বসল, লোকের চোখ টাটাল, আমার সুখ ছিল না; নানকু শালা এসে রোজ লাথি মেরে যায়; তখন মাঝে-মাঝে ভাবতাম, মরি যদি তো আরবার গুন্ডা হব। ভাবতে-ভাবতে মনে হল, কিন্তু এ জন্মটায় শালা কেন আমি সাট্টা সাধু? একবার ঝাঁকি মেরে উঠে দেখি না কী হয়! তখন ঠিক করলাম, মরদের মতো কিছু একটা করি।

সাতকড়ি চুপ করে থাকে।

সাধুর চোখ জুলজুল করে–মাইরি, নিজের ঘরে আগুন দিলাম তবু কেউ বললে না, কাজটা মরদের মতো করেছে সাধু। একজনও তো বলবে!

–তুমি পাগলা আছ। নিজের ঘরে আগুন দিলে কী আর হাতিঘোড়া হয়!

–হয় সাতকড়ি হে, হয়। এই যে আমি নিজের ঘরে আগুন দিলাম, তার জন্যই এখন তোমার ঘর আমাকে বেঁধে দিতে হচ্ছে। আর তুমি বলছ, আমি সাধু বটে।

–বলছি। তোমার মনটা ভালো।

–এইরকম কত লোকের ঘর আমি এবার থেকে বেঁধে দিব। আর লোকে বলবে, লোকটা সাধু বটে। বুঝলে সাতকড়ি হে, যে লোকটা বসে থাকে না, সে দাঁড়ায়। দেখো, পরের ঘর বাঁধতে–বাঁধতে আমি একদিন ঠিক সাচ্চা সাধু হয়ে যাব।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot dana
  • hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • slot gacor
  • desa bet
  • desabet
  • Kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot resmi
  • situs hk pools
  • desabet
  • slot gacor
  • slot hoki
  • desabet
  • desabet
  • ayamjp
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • situs judi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • situs togel
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • kudahoki
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • kudahoki
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • togel
  • kuda hoki
  • desabet