ফুলকুমারী – তারাপদ রায়

ফুলকুমারী - তারাপদ রায়

বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতে এসে শ্রীলতার দিন আর কাটতে চায় না।

শ্বশুরবাড়ি কথাটা অবশ্য ঠিক হল না, বলা উচিত বরের বাড়ি, কলকাতার শহরতলিতে দুঘরের সরকারি কোয়ার্টার্স শ্ৰীলতার বরের। শ্বশুরবাড়ি কাটোয়ায়, সেখানে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর ননদ, ঝি-চাকর, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বাড়ি ভর্তি লোক। উকিলের বাড়ি, সারাদিন কাকডাকা ভোর থেকে। প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত মক্কেল-মুহুরিতে বাড়ি সরগরম। ছুটির দিনে আত্মীয় কুটুমে হইচই আরও বেশি।

বিয়ের পর দু-তিন মাস শ্ৰীলতা কাটোয়ার সেই বাড়িতে ছিল। সে পাড়াগাঁর ইস্কুলের হেডমাস্টারের মেয়ে। শ্বশুরবাড়ির হই হট্টগোলে প্রথম প্রথম তার হাঁফ ধরে গিয়েছিল। তা ছাড়া বিয়ের পনেরো দিনের মধ্যেই অষ্টমঙ্গলার পরে পরেই শ্রীলতার স্বামী জ্যোতিষ কলকাতায় সরকারি চাকরিতে ফিরে আসে। হাফ লাগার সেটাও একটা কারণ।

শ্ৰীলতার বিয়ে হয়েছিল শ্রাবণের শেষে। এর মধ্যে অষ্টমঙ্গলা, পূজো এই সব ধরে কয়েক সপ্তাহ বাপের বাড়িতে কাটিয়ে কার্তিক বাদ দিয়ে, অঘ্রানের প্রথম সপ্তাহে শ্ৰীলতা কলকাতায় স্বামীর ঘরে এসে পৌঁছল।

ঘরে মানে দশ ফুট বাই আট ফুট দুটো কামরা, সাবানের বাক্সের মতো খাওয়ার জায়গা, রান্নাঘর, এক চিলতে বারান্দা। তবু এই দুর্দিনের বাজারে শ্রীলতার স্বামী জ্যোতিষ কী করে এই ফ্ল্যাট পেল তা জানতে গেলে আরেকটা ঠক্কর কমিশন বসাতে হয়।

সে যা হোক স্বামীর ঘর করতে এসে শ্রীলতা প্রায় গৃহবন্দিনী হয়ে পড়েছে। স্বামী সাড়ে নয়টার মধ্যে অফিস পেরিয়ে যায়, তারপর থেকে সারাদিন সেই সন্ধ্যা ঘোর হওয়া পর্যন্ত সে একা, বাড়িতে আর কোনও লোক নেই।

একটা ঠিকে ঝি আছে, সেও শ্রীলতার স্বামী অফিস চলে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘর মোছা, বাসন মাজা শেষ করে চলে যায়। নতুন সরকারি ফ্ল্যাট বাড়ি, পাশের ফ্ল্যাটে এখনও লোক আসেনি। এ বাড়িটা হাউসিং এস্টেটের একেবারে শেষ প্রান্তে, এখান থেকে কোনও রাস্তা চোখে পড়ে না। মাঝে মধ্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শ্রীলতা উলটোদিকের উঠোনে ছোট ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখে তাতে খেলার চেয়ে ঝগড়াই বেশি।

এত বড় কলকাতা শহরে শ্রীলতার আত্মীয়স্বজন বলতে প্রায় কিছু নেই। এক দূর সম্পর্কের পিসি থাকে অনেক দূরে গড়িয়ায়। সেখানে শ্রীলতার একা একা যাতায়াত করার সাহস নেই। আর কোথাও যাওয়ার নেই তার, এ শহরে কোনও বন্ধুবান্ধবীও থাকার কথা নয় শ্রীলতার মতো নিতান্ত মফসসলি মেয়ের।

মোট কথা শ্ৰীলতার সময় আর কাটতে চায় না। জ্যোতিষ অফিস চলে যাওয়ার পরে সদর দরজায় শক্ত করে ছিটকিনি দিয়ে সে এসে একটু বারান্দায় দাঁড়ায়, জ্যোতিষের যাওয়া দেখে, প্রায় প্রতিদিনই কোয়ার্টার্স থেকে বেরুনোর পথে বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হওয়ার আগে জ্যোতিষ একবার ঘুরে সোহাগভরা দৃষ্টিতে নবপরিণীতা বউয়ের দিকে তাকায়।

এর পরে সব ফাঁকা। সারাদিন দরজা বন্ধ ঘরের মধ্যে শ্রীলতার একা একা অসহ্য লাগে। দুটো কুমিরের মতো আকারের কালো ডোরাকাটা টিকটিকি আছে ঘরের মধ্যে, একেকদিন তারা নিজেদের মধ্যে খুব লড়াই করে। শ্রীলতার মন খুব নরম, ঝগড়া-লড়াই এসব তার একদম পছন্দ নয়। সে একটা হাতপাখা তুলে দূর থেকে ওদের ভয় দেখায়, শাসায়। টিকটিকিরা যে খুব ভয় পায় তা নয় তবে শ্ৰীলতার সময় কিছুটা কাটে।

এ ছাড়া কয়েকটা চড়ুই পাখি আছে। তারা মাঝে মধ্যে শ্রীলতাদের ফ্ল্যাটে দল বেঁধে বেড়াতে আসে। কিচির-মিচির করে শ্রীলতাকে অনেক কিছু বলে। শ্রীলতা সব বুঝতে পারে না, তবে চালের কৌটো খুলে কয়েকটা দানা বার করে মেঝেতে ছড়িয়ে দেয়, চড়ুইগুলো খুট খুট করে খায়।

বিয়েতে উপহার পাওয়া কয়েকটা গল্প-উপন্যাসের বই আছে। অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসে খুব বেশি প্যাঁচ, সেসব পড়তে শ্রীলতার মোটেই ভাল লাগে না। তবু নিতান্ত বাধ্য হয়ে শ্রীলতা এসব বই-ই, সময় কাটানোর অজুহাতেই পড়ে ফেলেছে, এগুলো এমন বই নয় যে দুবার পড়া যায়। তবে খবরের কাগজ আছে। সেটা আবার ইংরেজি কাগজ। জ্যোতিষ ইংরেজি কাগজ পড়ে, শ্ৰীলতা স্বামীকে বলতে সাহস পায়নি বাংলা কাগজ রাখতে, কী জানি, সে হয়তো তাকে পাড়াগেঁয়ে, অশিক্ষিত, মূর্খ ভাববে। এখন আস্তে আস্তে ইংরেজি কাগজ পড়ার অভ্যেস করছে শ্রীলতা। তবে বড় খটমট, অনুমানে অর্থ বুঝে খবর পড়তে কারই বা ভাল লাগে? শ্রীলতারও লাগে না। তবু দুপুর জুড়ে বেশ কয়েকবার সে সমস্ত কাগজটা আগাগোড়া ওলটায়।

ধীরে ধীরে জ্যোতিষ সমস্ত টের পায়। শ্রীলতার মধ্যাহ্নকালীন নিঃসঙ্গতার সমস্যা সে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে এবং অল্প অল্প ব্যবস্থা নিতে থাকে।

জ্যোতিষ মাঝে মধ্যে অফিস কামাই করতে লাগল স্ত্রীকে সঙ্গ দেওয়ার জন্যে। কিন্তু খুব বেশি অফিস কামাই করা যায় না, তাহলে চাকরি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া অফিসে সহকর্মীদের মধ্যে এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট হাসাহাসি ও ঠাট্টা হয়।

শ্ৰীলতার একঘেয়েমি দূর করার জন্য অতঃপর জ্যোতিষ ইংরেজি খবরের কাগজ ছেড়ে দিয়ে বাংলা খবরের কাগজ রাখতে লাগল। ইংরেজি কাগজ ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে পড়া জ্যোতিষের বহুদিনের অভ্যেস, সে অভ্যেস ছেড়ে তার খুব কষ্ট হল কিন্তু শ্ৰীলতার জন্যে এইরকম কষ্ট করতে তার ভালই লাগল।

এতেও কিন্তু পোষাল না। তখন জ্যোতিষ অফিস থেকে গল্পের বই, ম্যাগাজিন স্টল থেকে সিনেমার অথবা মেয়েদের রঙিন কাগজ এইসব নিয়ে আসতে লাগল।

কিন্তু এতে আর কতটুকু সময় কাটে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ দীর্ঘ দ্বিপ্রহর শুধু ম্যাগাজিন বা গল্পের বই পড়ে কাটানো যায় না। শ্ৰীলতার হঠাৎ যে ছেলেপিলে হবে তারও আপাতত কোনও সম্ভাবনা নেই।

অবশেষে অনেক রকম চিন্তা করে, অনেক কথা বিবেচনা করে এক রবিবার সকালে জ্যোতিষ শ্ৰীলতাকে নিয়ে হাতিবাগান বাজারের ওখানে গেল। সেখানে নানারকম পশুপাখির মেলা। কুকুর, খরগোশ, টিয়া, চন্দনা, ময়না মানুষ পুষবার জন্যে কিনে আনে ওখান থেকে।

শ্ৰীলতার কুকুর পছন্দের নয়। বাড়িতে উঠোন না থাকলে কুকুর পোষা খুব হাঙ্গামা। খরগোশও ঘরদোর নোংরা করে, বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। অনেক দেখেশুনে একটা পাখি কেনাই ঠিক হল, একটা টিয়া পাখি। উজ্জ্বল সবুজ রং, লাল ঠোঁট, ঝলমলে চোখ একটা টিয়া খাঁচাসুদ্ধ কেনা হল।

দুদিনের মধ্যে টিয়াপাখিটির সঙ্গে শ্ৰীলতার খুবই ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠল। পাখির খাবার দেয়, স্নান করায়, খাঁচা পরিষ্কার করে–পাখিকে ঘিরে ভালই সময় কাটতে লাগল শ্রীলতার। সে ভালবেসে পাখিটির নাম দিল ফুলকুমারী।

এই নামকরণে জ্যোতিষের সামান্য আপত্তি ছিল। এই টিয়াটি কুমারী কিনা, এমনকী মেয়েপাখি কিনা সে বিষয়ে জ্যোতিষ নিঃসন্দেহনয়। সে চেনাশোনা দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করে খোঁজখবর করল কী করে ছেলেপাখি মেয়েপাখির পার্থক্য ধরা যায়। বিজ্ঞজনেরা বললেন, দুটোর মধ্যে যেটা বড়সড় আর সুন্দর দেখতে সেটাই ছেলেপাখি। মেয়েপাখিগুলো একটু নিরেস দেখতে হয়, যেমন মুরগি আর মোরগ, ময়ূরী আর ময়ূর।

জ্যোতিষ এসব শুনে যখন বলল, আমার তো দুটো পাখি নয় একটা পাখি, আমি কী করে বুঝব এটা নিরেস না সরেস, ছেলে না মেয়ে, মেলাব কী করে?

সবাই ঘাড় নেড়ে বলল, তাহলে অসম্ভব। তবে অপেক্ষা করে দ্যাখ ডিম পাড়ে কিনা। যদি ডিম পাড়ে তা হলে মেয়েপাখিই হবে।

জ্যোতিষ এ কথার কোনও জবাব দিল না, সে ভাল করেই জানে মেয়েই হোক আর ছেলেই তোক খাঁচায় আটকানো নিঃসঙ্গ পাখির ডিম পাড়ার সম্ভাবনা শূন্য। আর তা ছাড়া গাছের ডালে যদি একজোড়া পাখি বাসা বাঁধে তবে তার মধ্যে কোন পাখিটা ডিম পেড়েছে সেটা বলাও খুবই কঠিন। সুতরাং জ্যোতিষ বিশেষ আপত্তি বা প্রতিবাদ করতে পারল না। শ্ৰীলতার টিয়াপাখির ফুলকুমারী নামই বহাল রইল। দিনে দিনে শ্রীলতার আদরযত্নে, সোহাগে ফুলকুমারীর ঔজ্জ্বল্য বাড়তে লাগল। ফুলকুমারীর জন্যে জ্যোতিষকে বাজার থেকে সাদা কাবুলি ছোলা কিনে আনতে হয়। লাল রঙের পাকা কাঁচালঙ্কা ফুলকুমারীর খুবই পছন্দ, বাজার থেকে খুঁজে পেতে, বাছাই করে শ্রীলতার আদেশে সেইরকম লঙ্কা জ্যোতিষ নিয়ে আসে।

ফুলকুমারীর সঙ্গে সারাদিন কতরকম গল্প করে শ্রীলতা। ফু, ফুলু, ফুলকুমারী…কত রকম ভাবে আদর করে ডাকে পাখিকে।

একেক সময় জ্যোতিষের রাগ হয়, খুব হিংসেও হয়, কিন্তু পাখির সঙ্গে তো আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা চলে না, সে চুপ করে থাকে।

কিছুটা স্বামীর সঙ্গে, অনেকটা পাখির সঙ্গে শ্রীলতার দিনরাত এখন ভালই কাটছে। স্বামীর প্রতি তার কর্তব্য সে নিশ্চয়ই করছে কিন্তু জ্যোতিষের একেক সময় সন্দেহ হয় সে নিতান্তই দায়সারা।

কথাটা হয়তো কিছুটা সত্যিও, ক্রমশ ক্রমশ ফুলকুমারী অন্ত প্রাণ হয়ে উঠল শ্রীলতা। শীলতার ধ্যান, জ্ঞান, সারাক্ষণ ফুলকুমারী। খাঁচার ভেতর থেকে ঠোঁট বাড়িয়ে যাতায়াতের পথে শ্ৰীলতার আঁচল ধরে টানে ফুলকুমারী। তার খাঁচা টাঙানো হয়েছে শোয়ার ঘর থেকে রান্নাঘরের মধ্যে ছোট চিলতে খাওয়ার জায়গায়। শ্রীলতাকে দেখতে না পেয়ে খাঁচায় বসেই চেঁচায়। ফুলকুমারীর কিন্তু খুব রাগ জ্যোতিষের ওপরে। সে প্রায়ই চেষ্টা করে কোনও অসতর্ক মুহূর্তে জ্যোতিষ খাঁচার কাছে চলে এলে তাকে ঠুকরিয়ে দিতে। একদিন ঘাড়ের ওপরে ধারালো ঠোঁটে ঠুকরিয়ে সে রক্ত বার করে দিয়েছিল। কিন্তু প্রেয়সীর পাখিকে কিছু বলেনি জ্যোতিষ।

এর মধ্যে শীত শেষ হয়ে এল। প্রতি বছর ফাল্গুনের গোড়ায় শ্রীলতাদের গ্রামে কানা ভৈরবীর মেলা বসে। খুব বড়, অনেক পুরনো মেলা। সারা গ্রামে উৎসব লেগে যায়।

শ্ৰীলতার বাবা আগেই চিঠি লিখেছিলেন। মেলার আগে শ্রীলতাকে নিয়ে যেতে শ্রীলতার এক জ্ঞাতি কাকা এল। স্ত্রীর বাপের বাড়ি যাওয়া নিয়ে আপত্তি করার মতো ছোটলোক নয় জ্যোতিষ। কিন্তু আপত্তি দেখা দিল শ্রীলতার দিক থেকেই। সে ফুলকুমারীকে ছেড়ে কী করে যাবে?

বিয়ের বছরেই বাপের বাড়ি যেতে চায় না এমন মেয়ে দুর্লভ। স্তম্ভিত খুল্লতাত এবং হতচকিত স্বামী অনেক বোঝানোর পরে শ্রীলতা তিনদিনের জন্যে পিত্রালয়ে যেতে রাজি হল শুধু এক শর্তে ফুলকুমারীর দেখাশোনা, স্নান করানো, খাওয়ানো সব কিছু জ্যোতিষকে ঠিকমতো করতে হবে।

জ্যোতিষ অবশ্যই রাজি হল এবং মাত্র তিনদিনের মধ্যে শ্রীলতা বাপের বাড়ি থেকে ফিরবে শুনে খুশি হল, তার তো আর ফুলকুমারীকে নিয়ে সময় কাটবে না। শ্রীলতা যত তাড়াতাড়ি ফেরে ততই মঙ্গল।

এক শুক্রবার শ্রীলতা বাপের বাড়ি গেল, পরের মঙ্গলবার ফিরবে। বন্দোবস্তটা ভালই, শনি-রবিবার জ্যোতিষের ছুটি, সোমবারও ছুটি নেবে, ফলে ফুলকুমারীকে কোনওদিনই অরক্ষিত থাকতে হবে না।

ফুলকুমারীকে কীভাবে স্নান করাতে হয়, কীভাবে খাওয়াতে হয়, কীভাবে ফুলকুমারীর খাঁচা পরিষ্কার করতে হয় সমস্তই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জ্যোতিষকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল শ্রীলতা।

অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই ফুলকুমারীর দেখাশোনার ভার গ্রহণ করল জ্যোতিষ। কিন্তু সে এ কাজের মোটেই যোগ্য নয়। শনিবার সকালেই এক ভয়াবহ অঘটন ঘটল। সে অঘটনের কথা এখানে। নয়, যথাস্থানে বলা যাবে, না হলে গল্পটা মারা পড়বে।

যথা নির্দিষ্ট মঙ্গলবার দিন শীলতা ফিরল যথেষ্ট উৎকণ্ঠা নিয়ে কিন্তু তার উৎকণ্ঠার কোনও কারণ ছিল না। সে ভেবেছিল তার অদর্শনে ফুলকুমারীর মন খারাপ, শরীর খারাপ হবে।

কিন্তু শ্রীলতা এসে দেখল ফুলকুমারী আরও টগবগে, আরও উজ্জ্বল। ফলে জ্যোতিষকে এ জন্যে। যথাসাধ্য কৃতজ্ঞতা নিবেদন করতে সে ভুলল না।

আবার দিন কাটতে লাগল। শ্রীলতা, জ্যোতিষ আর ফুলকুমারীর সময় চমৎকার কাটতে লাগল। বাজার থেকে প্রচুর সাদা ছোলা আর রাঙামরিচ কিনে আনতে লাগল জ্যোতিষ ব্যাগ ভর্তি করে। ভালই চলছিল সবকিছু কিন্তু হঠাৎ একদিন, মাসখানেক পরে শ্রীলতা লক্ষ করল ফুলকুমারীর চাঞ্চল্য আর উজ্জ্বলতা কেমন কমে এসেছে। সে কেমন নেতিয়ে পড়েছে। সাদা ছোলায়, রাঙামরিচে তার আর রুচি নেই। খাঁচার মধ্যে নীল-লাল প্লাস্টিকের বাটিতে সেসব পড়ে থাকে। স্নান করাতে গেলে ফুলকুমারী আর আগের মতো উল্লসিত হয় না।

অফিস থেকে জ্যোতিষ শুনে এল টিয়াপাখির এরকম অসুখ হয়, এরকম নেতিয়ে পড়ে, খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়, গরম পড়লে টিয়াপাখির মাথায় একরকম গ্যাঁজ বেরোয়। কতকগুলো সামলে ওঠে, কতকগুলো মারা পড়ে।

এসব কথা শ্ৰীলতাকে কিছু বলল না জ্যোতিষ কিন্তু পরদিন ভোরবেলা বারান্দায় শ্রীলতার আর্ত চিৎকারে আচমকা ঘুম ভেঙে গেল জ্যোতিষের। সে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখে খাঁচার মধ্যে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে পাখিটা আর শ্রীলতা ডুকরে ডুকরে কঁদছে, ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে, আমার ফুলকুমারী আমাকে ছেড়ে চলে গেল।.

অনেকক্ষণ কাদাকাটি শোনার পর জ্যোতিষ শ্ৰীলতার মাথায় হাত রেখে বলল, তুমি এত কাদাকাটি কোরো না। আমি তোমাকে সামনের রবিবার সকালেই হাতিবাগান বাজার থেকে আরেকটা ভাল টিয়াপাখি এনে দেব।

এই কথা শুনে শ্রীলতা কপাল চাপড়িয়ে, চিৎকার করে কেঁদে উঠল, বলতে লাগল, আমি ভাল টিয়াপাখি দিয়ে কী করব? ফুলকুমারীকে ছাড়া আমি বাঁচব না। অন্য পাখি আর ফুলকুমারী কি এক হল? দুরন্ত কান্নার সঙ্গে রাগারাগি করতে লাগল শ্রীলতা।

এই সময় জ্যোতিষ বলল, কিন্তু এই পাখিটা তো তোমার ফুলকুমারী নয়। এ কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল শ্রীলতা, শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল, এ আমার ফুলকুমারী নয়তো কার ফুলকুমারী?

তখন জ্যোতিষ বলল, তুমি সেই যে বাপের বাড়ি গেলে, বাপের বাড়ি যাওয়ার পরদিন সকালে খাঁচা পরিষ্কার করে স্নান করাতে গিয়ে হঠাৎ তোমার ফুলকুমারী তো উড়ে পালিয়ে গেল। আমি আর কী করব পরের দিন রবিবার ছিল, হাতিবাগান গিয়ে ওইরকম আরেকটা পাখি কিনে আনলাম। এটাই সেই পাখিটা। না হয় আরেকটা এরকম পাখি নিয়ে আসব। সেটাকেও ফুলকুমারী নাম দিও।

জ্যোতিষের কথা শুনে শ্রীলতা স্তম্ভিত হয়ে গেল। এত বড় প্রবঞ্চনা তার সঙ্গে জীবনে কেউ করেনি। সে আরও অঝোরে কাঁদতে লাগল। শোয়ার ঘরে ছুটে গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে বালিশে মুখ। গুঁজে ফোঁপাতে লাগল।

শ্ৰীলতার শোক আর অভিমান কীভাবে দূর করতে পেরেছিল জ্যোতিষ সে কাহিনি এখানে অবান্তর। তবে শ্রীলতা আর পাখি পোষেনি। জ্যোতিষ শেয়ালদার মোড় থেকে কয়েকটা বেলফুল গাছ নিয়ে এসেছে। সেগুলো সামনের ছোট বারান্দায় টবে সুন্দর লেগেছে। দুবেলা সে গাছগুলোয় জল দেয় শ্রীলতা।

ভরা গ্রীষ্মে গাছগুলোয় দুয়েকটা করে সুগন্ধময় ছোট ফুল ফোঁটা শুরু হয়েছে। সেগুলো তুলে নিয়ে শ্ৰীলতা সন্ধ্যাবেলা খোঁপায় গোঁজে।

আজকাল জ্যোতিষ শ্রীলতাকে প্রায়ই ফুলকুমারী বলে ডাকে।

Facebook Comment

You May Also Like