একটি দুর্ধর্ষ অভিযান – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

একটি দুর্ধর্ষ অভিযান - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমি তখন দেওঘরে এক বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতা করি। শীত প্রায় আসব আসব করছে। সকাল সন্ধে হাওয়ায় একটু ঠান্ডার কামড়। শিক্ষক ছাত্র এখানকার নিয়ম অনুসারে সকলেই সকলকে দাদা সম্বোধন করে থাকেন। রবিবার দুপুরে বেশ ভুরিভোজ হয়েছে। এইবার একটু গড়াগড়ি দিতে পারলেই হয়। এমন সময় একটা টাঙা রোদ ঝলমলে মাঠ পেরিয়ে আমাদের শিক্ষকাবাসের সামনে এসে দাঁড়াল। সংগীতশিক্ষক তুলসীদা লম্বা ছিপছিপে গৌরবর্ণ মানুষ, একেবারে ধোপদুরস্ত হয়ে এসে আমাদের ঘাড় ধরেই প্রায় বিছানা থেকে তুলে দিলেন। আজ ত্রিকূট দর্শন করতেই হবে।

তুলসীদার কৃপায় আজ আমরা ত্রিকূটযাত্রী। সঙ্গে গেম টিচার বিদ্যুৎদা আর ইংরেজি শিক্ষক সুধাংশুদা। তুলসীদা আর সুধাংশুদা সমবয়সি। আমাদের দুজনের চেয়ে বয়সে বড়। তুলসীদার গলায় মাফলার। গাইয়েদের গলার অদৃশ্য শত্রু অনেক। বারোমাসই মাফলার দিয়ে প্যাক করে রাখতে হয়। নাদব্রহ্মে। তিনি নাভির কাছ থেকে বায়ু পিত্ত কফ ভেদ করে উঠে আসেন কণ্ঠে। তুলসীদার ডোল ডায়েটে স্টার্চ কম, প্রোটিন বেশি, এক কেজি বিদ্যাপীঠের বাগানের পেঁপে, দুটো মাঝারি সাইজের পেয়ারা আর সকালে আধহাত নিম দাঁতন কমপালসারি। চেহারাটি। একেবারে কঞ্চিকা মাফিক। বিদ্যুৎদা বারবেল সাধেন, বাইসেপ, ট্রাইসেপ, ডেলটয়েড সবই বেশ খেলে। খেলে না শুধু কোলন। ইসবগুল, দু-কেজি পালঙের সুরুয়া সবই ফেল করেছে। মাংসের জুসটি খান, মাংস ফেলে দিন—এই তাঁর উপদেশ। দুশ্চিন্তা একটাই, চুলে সাদা ছিট। ধরেছে আর উঠে যাচ্ছে। অন্যথায় স্বাস্থ্যবান। সুপুরুষ সুধাংশুদার সমস্যা একটাই। ভুঁড়িটা আর কত বাড়তে পারে তিনি দেখতে চান। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে প্রকৃতই উদার। বিদ্যুৎদার মতে এই উদারতা সব উদরে গিয়ে জমছে। সুধাংশুদার মস্ত বড় গুণ ধীর, স্থির, মেজাজটি অদ্ভুত ঠান্ডা এবং বেশিক্ষণ তিনি জেগে থাকতে পারেন না। এই তো কোলের উপর উঁড়িটি নিয়ে আয়েস করে বসে আছেন। মুদিত নয়ন। নাসিকায় গর্জন। আমাদের রসিকতা তাঁর শরীরের চর্বির স্তর ভেদ করতেই পারে না। তুলসীদা নাকি ৬৫ সালে একটা গন্ডারকে সুড়সুড়ি দিয়েছিলেন, রিপোর্ট, সেটা ৬৭ সালে হেসে উঠেছিল।

তিনটে নাগাদ আমরা ত্রিকূটের পাদদেশে। তুলসীদার ফ্লাস্কে চা। এক চুমুক করে হল। সুধাংশুদা ঘাড় বেঁকিয়ে পাহাড়ের মাথাটা একবার দেখবার চেষ্টা করে বললেন, ইমপসিবল, ওনলি এ গোট ক্যান ক্লাইম্ব দিস হিল। তুলসীদা বললেন, রাখুন মশাই আপনার ইংরেজি। ভাষাটা জানি না বলে যা খুশি তাই গালাগালি দেবেন! বিদ্যুৎদা বললেন, বিদ্যাপীঠের ডাক্তারবাবু কী বলেছেন মনে। নেই? পূর্ণকুম্ভের মতো আপনি এখন পূর্ণগর্ভ। আরোহণ এবং অবরোহণ আপনার একমাত্র ওষুধ। ওসব চালাকি চলবে না। চলুন।

সুধাংশুদার প্রতিবাদ, কাকুতি-মিনতি, কে শুনবে। পর্বতশীর্ষে সুধাংশুদাকে আমরা ভোলানাথের মতো প্রতিষ্ঠিত করবই। প্রতিজ্ঞা ইজ প্রতিজ্ঞা।

ত্রিকূট খুব সহজ পাহাড় নয়। উঠতে গিয়েই মালুম হল। কাঁকরে পা স্লিপ করে। আঁকড়ে ধরার মতো কিছুই নেই, একমাত্র নিজের প্রাণটি ছাড়া। পাশেই খাদ। পড়লে চিরশান্তি! পাহাড়েই প্রেতাত্মা হয়ে আটকে থাকতে হবে। ভ্যানগার্ড তুলসীদা, রিয়ারগার্ড বিদ্যুৎদা। মাঝে আমি আর সুধাংশুদা। সুধাংশুদা বললেন, এই প্রথম বুঝলুম ভুঁড়ির ওজন কত। বেশ ভারী মশাই। আগে। ভাবতুম মাস উইদাউট ওয়েট, এখন দেখছি উইথ ওয়েট।

একটা চাতাল মতো জায়গা পাওয়া গেল। একটু বসে, বাকি চা-টা শেষ করতে হয়। একটু প্রকৃতি দর্শন না করলে পর্বতপ্রেম আসে কী করে! সুধাংশুদা বললেন, ভাই, আমার উপর আর টর্চার। কোরো না, তোমরা আমার ছেলের মতো। আমি এখানে বসি, তোমরা নামার সময় আমাকে নিয়ে যেয়ো। একটা রফা হল। আর একটু উঠলেই রাবণ গুহা। গুহা দর্শন করে আমরা নেমে যাব। আরে মশাই শরীর আগে না মাইথোলজি আগে? রাবণের রেলিক্স না দেখে চলে যাবেন? তুলসীদার অনুপ্রেরণায় হাতের ওপর ভর দিয়ে সুধাংশুদা শরীরটাকে ওঠালেন। গুহা দেখলেই ভয় ভয় করে। গুহার অন্তর্নিহিত সত্য সহজে জানা যায় না। কী যে মালমশলা ঘাপটি মেরে ভেতরে বসে আছে একমাত্র ঋষিরাই বলতে পারেন। মুখটা বিশাল। দুদিকে পাথরের দেয়াল। একটু যেন টেপারি হয়ে গেছে। আমাদের কনভয়ের সেই আগের অর্ডার। প্রথমে তুলসীদা, পাথ ফাইন্ডার, হাতে টর্চ। নেকস্ট সুধাংশুদা, তারপর আমি, তারপর বিদ্যুৎদা। তুলসীদা বললেন, ব্যা যদি থাকে আগে আমাকে খাবে। সুধাংশুদা বললেন, অ্যাম নট শিওর! খাদ্যের ব্যাপারে ওরা ভীষণ সিলেকটিভ, বোনস ওরা চিবোয় ঠিকই তবে ফ্লেশটাই আগে চায়।কথা বলতে। বলতে বেশ কিছুটা ঢুকে গেছি। এইবার সেই জায়গাটা দুই পাথরের দেয়াল চেপে এসেছে। তুলসীদা কাত হয়ে এগিয়ে গেলেন। সুধাংশুদাও তাই করলেন! কেবল একটু মিস ক্যালকুলেশান। এ কী হল! সুধাংশুদার গলা! আর তো যাচ্ছে না, মরেছে! কী যাচ্ছে না? আমরা এপাশের দুজন সমস্যাটা বুঝতেই পারিনি। সুধাংশুদা বললেন, আমি যাচ্ছি না। দাঁড়িয়ে থাকলে যাবেন কী করে? চলার চেষ্টা করুন। সুধাংশুদা বললেন, প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে খুঁড়িটা আটকে গেছে ডাইসের মতো। আমরা চিৎকার করলুম, তুলসীদা। দূর থেকে উত্তর এল। সুধাংশুদার ভুঁড়ি আটকে গেছে!

শেওলা ধরা দেয়াল, ভুড়ি তার গেঞ্জি আর আদ্দির পাঞ্জাবির কভার নিয়ে দুটো পাথরের মাঝখানে জম্পেশ! প্রথমে কিছুক্ষণ কমনসেন্সের খেলা চলল—নিশ্বাস খালি করে পেট কমান। দেখা গেল, এ পেট সে পেট নয়। নিশ্বাসের সঙ্গে বাড়া-কমার কোনও সম্পর্ক নেই। সন্ধের মুখে আবার উদরে বায়ুর সঞ্চার হয়। আপনার নিজের পেট নিজের কন্ট্রোলে নেই? একটু নামাতে পারছেন না? তুলসীদা সুধাংশুদার অক্ষমতায় খুব অসন্তুষ্ট। কী করি বলুন, কমছেনা যে! সুধাংশুদা হেল্পলেস। বিদ্যুৎ, তোমরা ওদিক থেকে টেনে দেখো, আমিও এদিক থেকে ঠেলে দেখি। আউর থোড়া, হেঁইও, বয়লট ফাটে, হেঁইও। এক ইঞ্চিও নড়ানো গেল না। মোক্ষম আটকেছেন মশাই! কী করে আটকালেন একেবারে নিরেট থাম! আপনি কি রাবণের চেয়ে দশাসই। অতবড় একটা রাক্ষস স্যাঁট স্যাঁট করে গলে যেত। আর আপনি সামান্য একজন মানুষ আটকে গেলেন!

রাবণের ফিজিওলজি নিয়ে কিছুক্ষণ গবেষণা হল। সুধাংশুবাবু বললেন, তার মশাই নানারকম মায়া জানা ছিল। এইখানটায় এলে হয়তো মাছি হয়ে যেত। বিদ্যুৎদা বললেন, ধুর মশাই! তবু। নিজের দোষ স্বীকার করবেন না! ব্যায়াম, ব্যায়াম। রাবণ মুগুর ভাঁজতেন। পাঁচ হাজার ডন, দশ হাজার বৈঠক ডেলি। আর রাক্ষস হলেও রাক্ষুসে খাওয়া ছিল না আপনার মতো। কোনও ছবিতে রাবণের হুঁড়ি দেখেছেন? অন্য সময় হলে তর্কাতর্কি হত। বিপন্ন সুধাংশুদা রাবণের ওপর লেটেস্ট রিসার্চ অম্লানবদনে মেনে নিলেন।

আচ্ছা এখন তাহলে কাতুকুতু দিয়ে দেখা যাক। নিন হাত তুলুন। প্রথমে বিদ্যুৎদা! কোথায় কী? খ্যাত খ্যাত করে হেসে উঠলে উঁড়িটা হয়তো ধড়ফড় করে উঠত, সেই সময় মোক্ষম ঠ্যালা। আমি বললুম, দাঁড়ান, ওভাবে ডিরেক্ট কাতুকুতুতে হবে না। টেকনিক আছে। দেখি হাতের। তালুটা। এই নিন, ভাত দি, ডাল দি, তরকারি দি, মাছ দি, নিন মুঠো করুন, মুঠো খুলুন, যাঃ কে খেয়ে গেল অ্যাাঁ, ধর মিনিকে, কাতুকুতু। কোথায় হাসি? না মশাই হবে না। আপনি এখানেই থাকুন ফসিল হয়ে। অপঘাতে মৃত্যু লেখা আছে কে খণ্ডাবে! তুলসীদা বললেন, আহা! আমি কী শুনব সতী সাধ্বী স্ত্রী, যে সহমরণে যাবে? এই মালকে ক্লিয়ার না করলে, এ দিকে তো ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গেছে। আপনি হামাগুড়ি দিয়ে চলে আসুন। কাপড়ে শ্যাওলা লেগে যাবে যে! বিদ্যুৎদা বললেন, জীবন আগে না কাপড় আগে? তুলসীদা অবশেষে হামাগুড়ি দিয়ে চলে এলেন আমাদের দিকে।

বসার চেষ্টা করে দেখুন তো। সুধাংশুদাকে যা বলা হচ্ছে, প্রাণের দায়ে তাই তিনি বাধ্য ছেলের মতো করছেন। বসার চেষ্টা করলেন, হল না! আমরা বললুম, একটু জল ত্যাগ করুন তো, যদি পেটটা কমে। না, মরে গেলেও তিনি এই কাজটি করতে রাজি হলেন না। এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। তুলসীদা বললেন, টাঙ্গাওলা চলে গেলে ফেরার দফারফা। টর্চ জ্বেলে তুলসীদা একবার ভুড়িটার ইনসপেকশান করে বললেন, বিদ্যুৎ এদিকে এসো। ছুরি আছে? আমার পকেটে ছুরি ছিল। ছুরি কী হবে তুলসীদা? সুধাংশুদা একটু সিঁটিয়ে গেলেন। কাজ হয়েছে। তুলসীদা ফ্লাস্ক-এর ওপর থেকে খানিকটা চা ঢাললেন জয় বাবা বন্দি বিশালা। একটু লুব্রিকেট করে দিলুম। এবার মারো টান। আমরা চারজনেই জড়াজড়ি করে পড়লুম। সুধাংশুদার ভূঁড়ির ওপরে নুনছাল একটু উঠে গেছে। পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে। ভুঁড়িটা সম্পর্ণ অনাবৃত। চা আর শ্যাওলার পেস্ট মাখানো। বৃদ্ধ বয়সে গায়ে হলুদ।

টাঙ্গা যখন বিদ্যাপীঠে প্রবেশ করল, রাত হয়ে গেছে। নামার আগে পুনর্জীবনপ্রাপ্ত সুধাংশুদার একটিই খালি কাতর মিনতি—ভাই, দয়া করে ছাত্রদের বোলো না। বৃদ্ধ বয়সে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হবে। তবু এমন ঘটনা চেষ্টা করলেও চেপে রাখা যায় না। রাষ্ট্র হয়ে পড়বেই।

Facebook Comment

You May Also Like