দাম্পত্য – সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

দাম্পত্য – সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

বাচ্চা ছেলেটা ঘুড়িটা ঠিক সামলাতে পারছে না। একটু উঠে লতপত করে নেমে আসছে। বেশ বড় ঘুড়ি। হলুদ গেঞ্জি নীল শর্টস পরা সিনেমার নায়কের মত সুদর্শন একজন বারবার ঘুড়িটা তুলে ধরতাই দিচ্ছে। দু-একবার ফরফর করেই গোত খেয়ে নেমে আসছিল ওটা। ভদ্রলোক তুলে আবার … ওপাশে ফুটবল ক্রিকেট চলছে। ফ্লাইং সসার ছুঁড়ে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে কেউ কেউ। শীতের নরম রোদ মিঠে আমেজ ছড়িয়ে দিচ্ছে। নীল আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘের উদাস ঘোরাফেরা। একপাশে রাখা জেন থেকে হর্ন বাজে আর তা শুনে সচকিত ভদ্রলোক তাড়াহুড়োয় ঘুড়ির কোণ বোধহয় ছিঁড়ে ফেললেন। বাচ্চাটা কান্না জুড়েছে। ওর বাবা, বাবাই মনে হয়, ভোলাবার জন্য বলে, আবার ঘুড়ি কিনে দেব, … আজই।

—ঠিক? ঠকাবে না কিন্তু, প্রমিস?

—প্রমিস। ভদ্রলোক ছেলেকে নিয়ে গাড়ির দিকে এগোল। সেদিকে চেয়ে থাকা জয়ন্তর মুখ ধার থেকে দেখে নন্দিনী বলে, অ্যাই তোমার সাইড প্রোফাইলটা ঠিক শুভেন্দুর মত। চৌরঙ্গী সিনেমায় যেন এমনি …

—আর তোমার মুখটা? জয়ন্ত মুচকি হাসছে।

–না আমারটা মোটেও তেমন সুন্দর নয় যে কারো সঙ্গে মেলানো যাবে।

—মানে তোমারটা ঠিক নন্দিনী রায়ের মত।

একথায় শব্দ করে হাসে দুজনে। নন্দিনী বলে, তুমি ভীষণ চালাক। শেষ মুহূর্তে শেন ওয়ার্নের মত ডেলিভারি বদলে দাও। কী দিয়ে শুরু করে কোথায় যে শেষ কর!

তাহলে তোমাতে শেষ নয় বলছ। আরো কেউ আছে কপালে। কে সে তাকে তো কখনো দেখিনি।

—অ্যাই না, কথা অন্যদিকে ঘোরানো যাবে না। অন দ্য ট্র্যাক প্লিজ ….

ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে ব্রিগেড়ে বসে কথা বলছিল জয়ন্ত নন্দিনী। এক অফিসে কাজ করে। ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্কে। দুপুরে টিফিনের সময় অফিসে সবুজ একটা শাড়ি দেখাচ্ছিল নন্দিনী। দিন দুই আগে ময়দানের টেক্সটাইল ফেয়ার থেকে কিনেছে। পছন্দ করেই কিনেছে এবার অপরের চোখ দিয়ে যাচাই করে নিচ্ছে কেমন হয়েছে। দু-চারজন তারমধ্যে বেশিরভাগ মহিলা জড়ো হয়ে মতামত জানিয়ে যাচ্ছে। ভিড় একটু পাতলা হতে জয়ন্ত শাড়িটা হাতে নেয়। তারপর চারপাশ দেখে নিয়ে বলে, কাকে প্রশংসা করব শাড়ি না যে কিনেছে তাকে বুঝতে পারছি না।

—আহা তেমন ভালো হয়নি বুঝি?

—এক্সসেলেন্ট। তাই তো বলছি এ জিনিস যে সে কিনতে পারে না। নন্দিনীকে ভালো করে দেখে নিয়ে যোগ করে, আজ খানিক খোশগল্প হবে নাকি?

—আজ আবার? নন্দিনী প্রথম বলাতেই রাজি হয় না। একটু অনুরোধ উপরোধ না হলে ….. আবার জোরও দিচ্ছে না যদি একদম কেটে যায়।

—থাক তাহলে। আর একদিন না হয়, যখন অসুবিধে আছে, জয়ন্ত আস্তে বলে।

–অসুবিধে তেমন নেই। তাহলে কখন?

—যেমন হয়। ওই চারটে নাগাদ।

—অ্যাই আজ মনে আছে তো? সাড়ে পাঁচের মধ্যে বাড়ি আসা চাই-ই।

—কি বলেছিলে যেন ….. এখুনি ঠিক মনে পড়ছে না … আসলে এত কিছুর ভিড় মাথায় ….. কোনটা ছেড়ে কোনটা যে ধরি ….. জয়ন্ত মনে করার চেষ্টায় দিশেহারা।

—ওহো ডিসগাসটিং। কবে থেকে বলছি আজ আনন্দদার ম্যারেজ অ্যানিভারসারি। সেদিন বাড়ি এসে বলে গেছে, তমালিকা খুব বলেছে, এরপরও মিস হলে ওরা …..

—ঠিক আছে, চলে আসব সময়ে, জয়ন্ত প্রসঙ্গ এড়াতে চায়।

সুতপা চোখ বড় করে, উহঁ অত ক্যাজুয়াল হলে হবে না। দুদিন পরই চলে যাবে আনন্দদা মেরিল্যান্ডে। এরপর কবে আবার …..

–এটা ঠিক যাবই যাব, তুমি দেখে নিও। জয়ন্ত বউয়ের গালে ঠোনা মারে। সুতপা খুশি হয়, মনে করে এসো কিন্তু। নইলে আমার প্রেস্টিজ পাংচার।

তা এভাবেই চলতে থাকে। আজ অ্যানিভারসারি, কাল অন্নপ্রাশন, পরশু গেটটুগেদার ….. এখানে যাওয়া সেখানে যাওয়া। চোখের পলকে দিন ফুরিয়ে যায়, রাত কেটে যায় ঝড়ো হাওয়ায় …. দামাল হলেও ভেসে যাওয়া যায় না, কোথায় আবার কী বেঁধে যায়! কত কিছু ঝামেলা এই জীবনে। সুতপার নাচের প্রোগ্রাম, স্কুলের চাকরি ….. জয় অফিসের চাপ, প্রমোশন, এর মাঝে আবার পাহাড় হাতছানি দেয় তাকে। এত সবের উপর আবার নতুন কোনও ঝামেলা এলে সামলাবে কী করে? তা কেমন করে হয়? তবু কি করে যেন হয়ে যায়। সব জিনিস তো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না। হয়তো দামাল হওয়ার প্রম আবেগে ভেসে গেছে তারা ….. হয়তো কিছুই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেয় না। যে করেই হোক ছোট নবীন প্রাণ আভাস দেয় তার সলাজ উপস্থিতির। কিন্তু সে তো এক চরম ক্ষণ দুজনেরই জীবনে! জয়ন্তর সামনে রুরাল অ্যাসাইনমেন্ট, ঠিকঠাক সেরে আসতে পারলে চারদাঁড়ির ভারি চেয়ার, সুতপার ঠাসা প্রোগ্রাম নাচের। এসবের মাঝে অনাগত সেই নবীন মুকুলিত প্রাণ বড়ই অবাঞ্ছিত। তড়তড়ে এগোনোর পথে ভীষণ বাধা। ঝরঝরে হয়ে নাও, ফরফরে জীবন ডাকছে। সবে তো সন্ধে, সারা জীবন পড়ে আছে সংসারে জড়ানোর জন্য। সাত তাড়াতাড়ি জড়িয়ে পড়ার নেই প্রয়োজন। ফলে সেই বীজ জরায়ুর অন্ধকার থেকে চলে যায় গাঢ় অন্ধকারে, হিম শীতলতার জমাট আস্তরণে। ডাক্তারবাবু রাজি ছিলেন না। প্রথমবার এটা, ভালয় ভালয় হয়ে যাক, তিনি বলেছিলেন।

তা হয় না … এটা ঠিক হলে কত কিছু বেঠিক হয়ে যাবে যে! ঝরঝরে হয়ে যায় সুতপা। তারপর দুজনেই চলেছে নিজ কক্ষপথে। আবর্তিত হতে হতে কখনও সখনও কাছে এসেছে, কিন্তু ক্রমাগত ঘূর্ণনে খুব কাছে আসা যায় না। সংঘাতের ভয় দুজনকে ছিটকে দিয়েছে। এখন বিয়ের সাত বস্ত্র পর নিজের নিজের কাজ নিয়ে তারা আছে। পারিবারিক, সামাজিক নানা উৎসবে একসঙ্গে যাওয়া আসা, কথাবার্তা, হালকা লোক-দেখানো সোহাগ বিবাগ এই পর্যন্ত। ভেতরে ভেতরে মাটি আলগা হয়ে গেছে। এখন চাইলেও কোনও নবীন প্রাণ মুকুলিত হবে না এই শুষ্ক, উষর বাগানে। চরম উৎকণ্ঠা, চাপা টেনশনে অতিবাহিত রাত্রিদিন কখন কেড়ে নিয়ে গেছে সেই সব সজীব, সক্ষম ডিম্বাণু শুক্রাণুদের কে জানে!

নন্দিনীর মাঝে মাঝে নিজেকে খুব ক্লান্ত, একা মনে হয়। তিরিশটা বসন্ত চলে গেল বু সে যে সেই কাঙাল রয়ে গেল। কোন অশুভ ক্ষণে যে বড় সন্তান হয়ে জন্মেছিল! সাপ যেমন করে জড়ায় সেইরকম পাকে পাকে জড়িয়ে গেল এই সংসারে। এখন যে এখান থেকে সটকে পড়বে উপায় নেই। ভালো না লাগলেও, মনের বিন্দুমাত্র সায় না থাকলেও টেনে যেতে হচ্ছে এই ভীষণ ভার। যবে থেকে বাবার চাকরিতে যোগ দিল তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মুছে গিয়ে নতুন পরিচয় স্থান করে নিল সেখানে। সে এখন আর কোনও তিরিশ বছরের প্রত্যাশামুখী নারী নয়, সংসারের ছেঁড়া সুতো জোড় লাগানোর যন্ত্ৰী মাত্র। চাহিদার জোগানদারের জীবনে পযুদস্ত তার জীবন মনন। সংসারের তার উপর এই কঠিন দাবির কারণও রয়েছে অবশ্য। চাকরি করতে করতে বাবার হঠাৎ দুর্ঘটনা ….. সেই জায়গায় সে বহাল হয়েছে। মা সরাসরি

বললেও চাপা থাকে না যে বাবার চাকরি যখন তুমি নিয়েছ তার দায়িত্ব সমানভাবে পালন করতে হবে। এই দায়িত্ব পালন সে করেছে সাবলীল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে যতদিন পর্যন্ত তার বোন জয়িতা স্বাবলম্বী না হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা সময়ে সে বিস্মিত ও মর্মাহত হয় যখন জয়িতার বিয়ের জন্য মা প্রাণপণ চেষ্টা করে। তার জন্য কিছু করা তো দুরের কথা, সামান্য সম্মতির শিষ্টাচারটুকু কেউ দেখায়নি। সংসার বড় বিচিত্র, মাঝে মাঝে হিংস্রভাবে স্বার্থপর। নন্দিনী যে রোজগারের টাকা, ভিত্রে মাটি, সেটা আলগা করার মত মুখামি কেউ করে? বু যেদিন মা তাকে জানায় জয়িতার বিয়ে স্থির, সেদিন মুখে কিছু না বললেও দৃষ্টি, চোখের সেই চাহনি বোধহয় অনেক বার্তা পৌঁছে দিয়ে থাকবে। মা মিষ্টি হেসে গাল টিপে বলেছিল, তোর জন্য কোনও ভাবনা নেই। এত গুণ যে পাবে বর্তে যাবে। শুধু ভাই দাঁড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা কর।

সবাই বড় হবে, দাঁড়াবে। শুধু নন্দিনীর জন্য থাকবে চিরকালীন অপেক্ষা। আর সংসার টানা ….

ভাই একটু বড় হতে নন্দিনী নিজেই মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে। জয়ন্ত প্রথম যখন তাদের ব্রাঞ্চে আসে তার স্মার্টনেস নন্দিনীকে টানে। চেহারার জৌলুসে মোহাবিষ্ট সে তলিয়ে ভাবেনি বিবাহিত কিনা। যখন বুঝেছে তখনও সরে আসেনি। কেনই বা আসবে? জীবন কি দিয়েছে তাকে? তবু এই সাহচর্য, এই আদানপ্রদান খুব। উপভোগ্য মনে হয়। মাঝে মধ্যে জয়ন্তর সঙ্গে সিনেমা চলে যায়। ইংরিজি সিনেমা বেশি থাকে তালিকায়। অন্ধকার হলে পর্দার সাহসী দৃশ্য হয়তো তাদের মাতিয়ে। তোলে। জয়ন্ত আলিঙ্গনে জড়ায় তাকে। চুম্বনেও আপত্তি করে না নন্দিনী। বরং বেশ উপভোগ করে। এই জীবন কিছুই দেয়নি তাকে ….. পুরুষের স্বাদ এই সহকর্মীই নিয়ে এসেছে তার কাছে, একে কী করে ঠেলে সরিয়ে রাখবে। আজকাল সিনেমা হলে ভিড় হয় না। বেশি দামের সিট ফাঁকা থাকে। সেখানে সিনেমা দেখে বা না দেখে বেশ কিছুক্ষণ অন্তরঙ্গ হবার সুযোগ অনেকে নিচ্ছে তাদের মত।

মুশকিল হচ্ছে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মা মুচকি হেসে বলে, সিনেমা দেখলি বুঝি? তখন এত রাগ আসে সারা শরীর জুড়ে! উত্তর না দিয়ে গটগট করে সরে যায়। এই প্রশ্নের উৎস কোথায় তাও জানে। একবার হল থেকে বেরুচ্ছে জয়ন্তর সঙ্গে, মুখোমুখি পড়ে যায় জয়িতার। সেই বোধহয় রাষ্ট্র করেছে ব্যাপারটা, হয়তো বা রং চড়িয়ে। তাই প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় এই নিঃসঙ্গ একাকি তরুণীকে। কেউ তাকে বোঝার চেষ্টা করে না, কেউ তার ব্যথার কথা জানতে চায় না।

—অ্যাই তোমাকে অফিসে পাওয়া যায় না কেন বল তো?

–কবে আবার পেলে না? জয়ন্ত সতর্ক ভঙ্গীতে বলে।

—এই তো গতকাল। স্কুলে চন্দনাদি মাস্টার ডিগ্রি পাওয়ায় তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল। কী করা যায় ভাবছি মনে এল হ্যান্ডিক্রাফটস ফেয়ারের কথা। তখন ফোন করলাম, যদি এসে যাও তবে একসঙ্গে … তা অফিসে বলে দিল উনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেছেন।

—ওহ্ হ্যাঁ, মনে করার ভঙ্গীতে বলে জয়ন্ত, আসলে হেড অফিসে গেছিলাম মান্থলি রিটার্ন দিতে। বেমালুম মিথ্যেটা মাথায় জোগাতে আত্মবিশ্বাস আসে তার, জানই তো ব্যাঙ্কের চাকরিতে হাজার হ্যাপা। মনে মনে বলে, দারুণ ঝামেলা, সুন্দরী কলিগের সঙ্গে বৈকালিক আল্ডার ঝামেলা।

—তা হ্যাপা পোহাতে কে বলেছে? বদলে নিলে তো হ্যাপি হয়ে যাও।

-ওরেব্বাস এই বয়সে বদলানো? তাছাড়া এই সিকিউরিটি, এই পারকুইজিট কে দেবে বল?

—তাহলে? এত সব পেতে গেলে তো হ্যাপা হয়ই মশাই। জয়ন্ত খুশিতে সুতপার নাক নেড়ে দেয়।

.

ধাতব বিশ্রি শব্দে তন্দ্রা থেকে উঠে বসে সুতপা কয়েক মুহূর্ত সময় লাগে বুঝতে শব্দের উৎস বের করতে। তারপর বোধে আসে কলিং বেল টিপছে কেউ। মর্নিং স্কুল ফিরে একটু গড়িয়ে নেওয়া বরাবরের অভ্যেস। আজ ঘুম হয়েছে গাঢ়। দরজার আই হোলে চোখ রাখে দীর্ঘদেহী, ফর্সা রং পুড়ে তামাটে হয়ে যাওয়া এক পুরুষ। একটু থমকে মনে পড়ে যায় পরিচয়—তমাল সেন। দরজা খোলে। এই সেই তমাল আর একটু হলেই যে সুতপার জীবনে প্রথম পুরুষ হয়ে যাচ্ছিল। একসঙ্গে পড়ত আশুতোষ কলেজে বটানি অনার্স নিয়ে। তমালের লম্বা কাঠামো, রুখুসুখু হাবভাব, চেতানো বুক আর দৃঢ় চিবুকে কেমন এক বন্য আদিমতা ছেয়ে থাকত। সবচেয়ে টানত ওর চোখ দুটো। বড়, ভাসা ভাসা কিন্তু ঠিক ভাবালু নয়, অনেকটা ঝিন্দের বন্দীর ময়ূরবাহনবেশে সৌমিত্রকে মনে পড়ায়। ঝুঁকে ছিল সুতপা। এক্সকারশনে গিয়ে আলাদা হয়ে হারিয়ে ছিল লতাপাতার জঙ্গলে। তমালের দৃঢ়। হাতের বলিষ্ঠ আলিঙ্গনে পিষ্ট হতে হতে ভেবেছিল পৌরুষ বুঝি এরই নাম। তবে ওই পর্যন্ত। কিছুদিন যেতে সুতপা রাশ গুটিয়ে নেয়। তমালের সব কিছু কেমন খাপছাড়া, অসংলগ্ন ….. ওর সঙ্গে হয়তো দামাল হওয়া যায়, কিন্তু নোঙর ফেলা যাওয়া যায় না। বড় নরম মাটি ….. নোঙরের টান এ নেবে না। তার চেয়ে বাবা মায়ের পছন্দকরা জয়ন্ত অনেক নিশ্চিত স্থল ….. ঢেউয়ে, ঝড়ে এ ধোবে কিন্তু মুছবে না, ভাসবে কিন্তু ভাসাবে না

তমাল কিন্তু বেশ স্পোর্টিংলি নিয়েছিল ব্যাপারটা বা নেবার ভান করেছে। এমনকি বিয়েতে পর্যন্ত এসেছিল।

–কি দরজায় দাঁড় করিয়েই রাখবে? ভেতরে যাব না?

—ওহ্ তোমাকে কি ডাকলে তবে আসবে? সুতপা সাড়ে ফিরে সচকিত। একপাশে সরে ভেতরে আসার জায়গা করে দেয়।

বসার ঘরে সিগারেট টানতে টানতে তমাল বলে, এত বড় ফ্ল্যাটে তুমি একা?

–একা কেন? আমরা দুজন আছি।

—কোনও ইস্যু নেই?

–না।

–বাহ্ বেশ আছো–নিরালা বাসা, দুজনে ভালবাসা।

তোমায় খারাপ থাকতে কে বলেছে। দোকা হয়েছ নিশ্চয়।

-না তা আর হতে পারলাম কই? আমার দোকা ….. বাক্যটা শেষ না করে চুপ করে যায় তমাল। সুতপাও এগোয় না ওই পথে। ক্ষণিক বিরতি দিয়ে বলে, বস চা করে আনি।

জলে চা পাতা দেবে কৌটৌ খুলেছে তামাকের তীব্র গন্ধে পাশ ফিরে তমালকে দ্যাখে সুতপা। তমাল উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়ায় তাকে। তামাকের ঝাঝালো গন্ধে ঝিমধরা মাদকতা মাখানো ….. সেই বন্য আদিমতা ….. কঠিন নিষ্পেষণ …. হারিয়ে যেতে জলপ্রপাতের গর্জন কানে আসে ….

ঠিক পঁচিশ মিনিটের মাথায় সুতপা বলে, কিছু হবে না তো? হো হো হাসে তমাল, কেন তুমি হওয়ার ভয় পাও নাকি?

জবাব না দিয়ে নীরবে আনমনা সুতপা। সময় গড়ায়।

.

অফিস থেকে ফিরে চা খেতে খেতে কথা বলছিল জয়রা। বসার ঘরে যামিনী রায়ের গণেশ জননী ছবির সঙ্গে দেয়ালের ডিপ গ্রিন রঙের বৈপরীত্যে খুলেছে চমৎকার। ছবির নিচে সোফায় কেউ বসলে হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন মা দুর্গার কোলেই বসেছে। জয়ন্তকে এখন প্রায় সেরকম লাগছে। তার দিকে সুতপার ওই নিবিষ্ট দৃষ্টিতে জয়ন্তর অস্বস্তি হয়। সে বলে, কী দেখছ, মুখটা অন্যরকম লাগছে? চুল কেটেছি বলে। হাত দিয়ে অদৃশ্য ছোট চুল সরাতে ব্যস্ত হয় সৈ। তখন চোখে পড়ে টেবিলে ছাইদানে পোড়া সিগারেট ভর্তি। কি ব্যাপার শ্বশুরমশাই এসেছিল নাকি রায়গঞ্জ থেকে? ভাবনার ঝিলিক আসে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় স্ত্রীর দিকে, পোড়া সিগারেট, কি ব্যাপার?

সুতপা থমকায় মুহূর্তমাত্র। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বলে, আমি খেয়েছি। ভীষণ ইচ্ছে করছিল। মনে নেই সেই গ্যাংটকে? হানিমুনে ….

তাই? বিস্মিত চোখে তাকে দেখতে থাকে জয়ন্ত। বিয়ের এত বছর বাদেও এমন অবাক করে দেবার ক্ষমতা আছে সুতপার!

Facebook Comment

You May Also Like