রম্য গল্প: ‘পাত্রী দেখা’

বাংলা লিরিক্স নিলাঞ্জনা

” আপনার সাথে কিছু কথা আছে । একটু নিচে আসুন । চা খেতে খেতে কথা হবে । ” অফিসে আমার ডেস্কের ধারে এসে শরীফ ভাই চুপি চুপি বললেন কথাটা । পাশের ডেস্কের বসা শরীফ ভাইয়ের খাস বন্ধু রতন বিশ্বাস কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলেন । কিন্তু শরীফ ভাই এতটাই দ্রুত কথাটা বলে ফেললেন যে রতন দা কোনো কিছু ঠাওর করতে পারলেন না ।

আমি শরীফ ভাইকে বললাম , ” আপনি যেতে থাকুন । আমি হাতের কাজটা সেরে আসছি। ”

হাতের কাজটা সেরেই দ্রুত নিচে নামছি । সিড়িতে দেখি শরীফ ভাই দাড়িয়ে আছে। মুখে চওড়া হাসি এনে বললেন , ” চলুন ।” অফিসের নিচে ক্যান্টিন । সামনেই সার দিয়ে পাতা টেবিল । ক্যান্টিনের ছেলেটা চা দিয়ে গেলো এইমাত্র ।

চা হাতে নিয়েই একটা চুমুক দিয়েই বললাম , ” ছেলেটা বেশ ভালো চা বানায় ।”
শরীফ সাহেব মাথা নাড়লেন ।

টেবিলে কাপ টা রেখে চশমা টা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম , ” কি যেনো একটা জরুরী কথা বলবেন বলছিলেন ?”
শরীফ ভাই চায়ের কাপ টা হাতে রেখেই বললেন , ” আপনি তো বিবাহিত .? তাই না .?”

হ্যাঁ । কেনো বলুন তো .??

শরীফ ভাইয়ের কাছ থেকে এমন এক অদ্ভুত প্রশ্ন শুনতে হবে এটা আমার ধারণার বাইরে ছিল।

জরুরী কথা বলতে এসে উনি এমন একটা সাধারণ কথা বলবেন সেটা ভেবেই হাসি পেল। এমনিতেই আমার অফিসের সবাই জানে আমি বিবাহিত । শরীফ ভাইও জানে ।নতুন করে জিজ্ঞাসা করার মানে টা কি.??

” আপনাকে দিয়েই হবে তাহলে । ” শরীফ ভাই রহস্য মিশিয়ে বললেন।
আমাকে দিয়ে হবে মানে .?

শরীফ ভাই আসলে কি বোঝাতে চাইছে .??

কি এমন কাজ যেটা অফিসের অন্য কারো দ্বারা হবে না এমনকি শরীফ ভাইয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড রতন দা কে দিয়েও হবে না কিন্তু আমাকে দিয়ে হবে .!

ভাবতে ভাবতে চায়ের কাপে শেষ চুমুক টা দিয়ে বললাম ,” ভাই বুঝতে পারিনি । বুঝিয়ে বলেন ।”

শরীফ ভাই বিলম্ব না করে বললেন , ” ভাই আমি জানি আপনি বিবাহিত । আপনার বউ মানে আমাদের ভাবির সাথেও পরিচয় হয়েছিল রিসেপশনের দিন । আপনার বউটা আসলেই সুন্দর । অনেক গুনবতী । দেখতে তো মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর , ব্যবহার না জানি আরো করো সুন্দর ।

আমি যতদূর জানি আপনি নিজে নিজেই দেখে শুনে বিয়েটা করেছিলেন । আমার বিয়ের পাত্রী নির্বাচনেও আপনাকে সাহায্য করতে হবে । আপনিই একদম পারফেক্ট লোক এ ব্যাপারে । ”

শরীফ ভাই আমাকে তো একেবারে গাছে তুলে দিলেন । শরীফ ভাই ভাবছে আমি পাক্কা জুহরি । সোনা চিনতে আমার জুড়ি মেলা ভার। নিজের প্রতি নিজের সন্মান টা বেড়ে গেলো ।

কিন্তু শরীফ ভাই যেটা ভাবছে সেটা তো মোটেও সত্যি নয়। আমি নিজে দেখেশুনে বিয়ে করে খাল কেটে কুমির এনেছি ।
বিয়ের আগে যে বৈশিষ্ট গুলো রিমির মধ্যে দেখেছিলাম বিয়ের পর সবগুলোই বিপরীত হয়ে গেছে।

সুন্দর সুন্দর রেসিপি বানিয়ে ছবি তুলে আমাকে হোয়াটস অ্যাপ এ পাঠাতো । আমি ভাবতাম হবু বউ আমার না জানি কত স্বাদের রান্না জানে। এখন এসে শুনি জিবনে সে কখনো ওভেনের ধারে কাছেও যায়নি ।

ওর মা রান্না করতো সেটা শুধুমাত্র ছবি তুলেই আমাকে পাঠিয়ে বলতো , ” আমি রান্না করছি , দেখোতো কেমন হয়েছে।”
এমন অনেক বৈশিষ্ট আছে যেগুলো আগে বিয়ের পরে সম্পূর্ণ বিপরীত বৈশিষ্ট্য তে রূপান্তরিত হয়েছে ।
আমি তো জানি আমার বউ কি ..!!

পাত্রী নির্বাচনে আমি যে ব্যর্থ জুহরি সেটা শরীফ ভাইকে বুঝতে না দিয়েই বললাম , ” ঠিক আছে ভাই । কোনো চিন্তা নেই । আমি আপনার পাশে আছি । ”

আশ্বাস দিতেই শরীফ ভাই হাসতে হাসতে যাওয়ার সময় বললেন , ” ভাইজান চায়ের বিল টা আমিই দিয়ে দিচ্ছি ।”

চায়ের কাপ টা হাতে ধরে চেয়ারে বসে বসে ভাবছি, ” কথা তো দিয়েই দিলাম । পাত্রী নির্বাচনেও না হয় সাহায্য করলাম । কিন্তু এই আধবুড়ো দামড়াকে কে বিয়ে করবে .??”

মাথার চুল যতটা কাচা তার থেকে বেশি পেকে গেছে । কেউ চুল পাকার কথা বললে বলে এটা নাকি নতুন ফ্যাশন। এটাকে হাইলাইট বলে ।

ওনার বয়সি একটাও গাছপালা বেঁচে আছে কিনা সন্দেহ আছে ।
সঠিক সময়ে বিয়ে করলে ওনার একটা বিবাহযোগ্য মেয়ে থাকতো ।

সঠিক সময়ে বিয়ের চেষ্টা যে উনি করেন নি তা না । চাকরিহীন ছেলের সাথে কে মেয়ের বিয়ে দেবে .?? কয়েক শত ফ্যামিলি থেকে ওনাকে রিজেক্ট করা হয়েছিল।

সেই দুঃখে উনি পন করেছিলেন চাকরি না পেলে বিবাহ করবেন না।

চাকরি উনি পেলেন কিন্তু চাকরি পেতে পেতে ওনার কালো চুল সাদা হয়ে গেল।

বাড়িতে বসে নিজের দেখেশুনে আনা বউয়ের হাতে পোড়া রুটি খাচ্ছি । রুটি পোড়া কেনো এটা নিয়ে প্রশ্ন করার সাথে সাথে বন্দুকের গুলির মত জবাব ভেসে আসে , ” শুধু আমি বলেই তোমাকে রান্না করে খাওয়াচ্ছি , অন্য কেউ হলে পায়ের উপর পা তুলে আয়েস করতো । যা দিচ্ছি সেটাই অমৃত বলে খেয়ে নাও । ”

জলে থেকে কুমিরের সাথে বিবাদ করে লাভ নেই । এমনিতেই মা অসুস্থ । তার পরে বেশি কিছু বললে না খেয়ে থাকা লাগবে ।

খাওয়া প্রায় শেষের পথে । এমন সময় শরীফ ভাই ফোন করে বললেন কালকেই একটা মেয়ে দেখতে যেতে হবে। গ্রামের ঘটক ফকির চাঁদ পাত্রী পক্ষের সাথে কথা বলে সব কিছুই ঠিক করে রেখেছেন ।

শরীফ ভাই পাকা চুল গুলো কায়দা করে কলপ করে কাচা বানিয়ে ফেলেছেন ইতিমধ্যে । আমি দেখে প্রথমেই তো চিনতেই পারিনি । কাছে এসেই খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন , ” কেমন লাগছে ?”

আমি দুই হাতের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বললাম , ” লা জবাব ।”
শেষমেষ নারায়ে তাকবীর বলে রওনা দিলাম পাত্রীর বাড়ির উদ্দেশে ।
পাত্রী মানে সোনিয়ার বাবা উঠতি বড়োলোক ।

হাইব্রিড মাগুর মাছের চাষ করে সদ্য লাখপতি। একমাত্র কন্যার জন্য চাকুরীজীবী পাত্র খুঁজছেন ।
এমনিতেই চাকরির বাজারে মন্দা তার উপর চাকরিওয়ালা ছাড়া মেয়ের বিয়ে দেবেন না।
জ্বালা খুব ।

বেকার ছেলে গুলোর বিয়ে হবে না এমন চলতে থাকলে।

সোফাতে বসে আমি আর শরীফ ভাই । সামনে প্লেটে সাজানো ফল , মিষ্টি ।
শরীফ ভাইয়ের মন ফল , মিষ্টিতে পড়ে নেই । উনি অপেক্ষা করছেন মেয়ে কখন আসবে ।

কিছুক্ষণ পরে মেয়ের এক বান্ধবী মেয়েটাকে হাত ধরে এনে বসিয়ে দিলেন আমাদের সামনে ।
শাড়িতে সোনিয়াকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল । মেয়ে টা এমনিতেই সুন্দর । পরনের কমলা শাড়ি সৌন্দর্যের মান আরো কয়েক গুন বাড়িয়ে দিয়েছে।

শরীফ ভাই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে।

চোখে মুখে খুশির ছাপ স্পষ্ট ।
আমার দিকে তাকাতেই আমি হাত দিয়ে ওকে দেখিয়ে দিলাম ।

বেচারা এমনিতেই খুশিতে নাচবে এমন অবস্থায় , আমার ওকে দেখানোর পর মুখের মৃদু হাসি আর থামে না ।
শরীফ ভাই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে । মেয়ে টি মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে টাইলস সজ্জিত মেঝের দিকে ।
আমি ঘরের এদিক সেদিক তাকাচ্ছি মাঝে মাঝে । মেয়ে টির পাশে দাড়ানো বান্ধবী টির দিকে তাকাতেই মেয়ে টি ফিক করে হেসে দিল ।

বউয়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠাতে আবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছি ।

হটাৎ করে চোখ পড়লো পাশের ঘরের জানালার দিকে ।
মধ্য বয়স্কা কয়েকটি মহিলা উকিঝুকি মারছে আমাদের দিকে । বাড়ির হবু জামাই কে লুকিয়ে দেখছে হয়ত ।

বেশ কিছুক্ষণ পরে জানালার পাস থেকে একটা মধ্য বয়সি মহিলা, খুব সম্ভবত পাত্রীর মা দরজার কাছে এসে মেয়েটির উদ্দেশে বেশ জোরেই বললেন , ” কচি উঠে আয় । এই বুড়ো ভাম আমাকেও দেখতে এসেছিল ।”

– বুরহানউদ্দীন শামস

What’s your Reaction?
+1
0
+1
1
+1
1
+1
31
+1
2
+1
0
+1
2

You May Also Like

About the Author: মোঃ আসাদুজ্জামান

Anuprerona is a motivational blog site. This blog cover motivational thought inspirational best quotes about life and success for your personal development.