Read free bangla books online

রুপালি চুলের জাদুকর – সানজিদা সামরিন

রুপালি চুলের জাদুকর - সানজিদা সামরিন

ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল উষার। হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসলো সে। হৃৎপিণ্ডটা যেন বের হয়ে আসছে বুকের ভেতর থেকে। শুনশান। টু শব্দটি নেই।

বিছানা থেকে নেমে এগোলো উষা। মায়ের ঘরে কেউ নেই, ডাইনিংয়েও কেউ নেই। লাইট বন্ধ। বাইরে কি বৃষ্টি হয়েছে? না, এখন তো শীতকাল, সোয়েটার পরে আছে সে। বাড়ির সবাইকে খুঁজতে খুঁজতে সে বাগানে নেমে এলো।

চারদিক কুয়াশা। এখন কি অনেক ভোর? কিন্তু সবাই এখন কী করছে? উষা দেখলো বাগানের সবুজ ঘাসের ওপর মা, বাবা, বড় ভাই আর তার কেমিস্ট্রি স্যার দাঁড়িয়ে। কেমিস্ট্রি স্যার ছাড়া সবার সামনে একটি করে বাক্স রাখা। তারা এমনভাবে দাঁড়িয়ে, যেন প্রত্যেকে উষার অপেক্ষাতেই ছিল।

উষা খানিকটা অবাক হলো। সবাই নিজ নিজ সামনে রাখা বাক্সটা ধরে উষাকে চোখ দিয়ে কী বলতে চাইছে? চোখের এই ভাষা উষা পড়তে পারছে না। সে প্রথমে মায়ের কাছে গেল। ‘মা কী করছো এখানে, এটা কীসের বাক্স?’ মা ঝলমল চোখে উত্তর দিলেন, ‘এই বাক্সটা তোমার জন্য বানিয়েছি। এখানেই তুমি থাকবে। আমি আমার মনের মতো করে সাজিয়েছি।’

উষা অবাক হয়ে উত্তর দিলো, ‘মানে? কী আছে এতে? আর এটা তো অনেক ছোট একটা বাক্স। এর ভেতর আমি ঢুকবো কী করে?’ মা বললেন, ‘ঢুকবে কী করে মানে? মানিয়ে নিতে হবে তোমাকে! জানো না মেয়েদের অ্যাডজাস্ট করতে হয়!’

টুকুন বাক্স এগিয়ে দিলো। এই বাক্সটা বেশ বড়। উষা অনায়েসেই জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু বাক্সটা লোহার শেকলে জড়ানো। আবার একটা তালাও ঝুলছে তাতে।

উষা বাক্সে পা গলিয়ে ঢুকলো। ওমা, হাঁটু ভাঁজ করেও বসা যাচ্ছে না। মা বাক্সের ঢাকনা চেপে চেপে চেষ্টা করছেন। কোনোভাবেই বাক্স আটকানো যাচ্ছে না। মা আরও জোরে জোরে চাপ দিচ্ছেন। উষার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করছে, ‘মা প্লিজ, ছেড়ে দাও, এই বাক্সে আমি বাঁচতে পারবো না। আমি সত্যি বাঁচবো না!’ ওদিকে মা বলে যাচ্ছেন, ‘তোমাকে মানিয়ে নিতে হবে!’

এমন সময় বাবা বাক্সের ঢাকনা খুলে উষাকে বললেন, ‘তুমি আমার এই বাক্সটা দেখবে নাকি?’ বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে উষা মাথা তুলে বললো, ‘এতে কী আছে?’ বাবা বাক্সটা এগিয়ে দিলেন। ‘বাবা, এই বাক্সে তো আমার খেলনা পুতুলেরও জায়গা হবে না, তুমি আমাকে ঢুকতে বলছো?’ আঁতকে গিয়ে উষা বললো।

বাবা বাঁকা হাসি হেসে বললেন, ‘তোমার মাকে এর চেয়েও ছোট বাক্সে করে পাঠিয়েছিলেন তোমার নানুভাই। আরও বড় বাক্স চাও? তোমার তো সাহসের বলিহারি!’ উষার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। সে নিজ থেকে এগিয়ে গেলো বড় ভাই টুকুনের কাছে। ‘দাদাভাই, তোর বাক্সটা দেখি? কী আছে এতে?’

টুকুন বাক্স এগিয়ে দিলো। এই বাক্সটা বেশ বড়। উষা অনায়েসেই জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু বাক্সটা লোহার শেকলে জড়ানো। আবার একটা তালাও ঝুলছে তাতে। টুকুন বললো, ‘অমন করে কী দেখছিস? এই বাক্সটাতো বড়! তোর আপত্তি কোথায়?’ উষা শ্বাস নিতে নিতে বললো, ‘না না! আমি পারব না। আমাকে ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও। আমি বিশ্বাস করি- জীবন সুন্দর, জীবন আনন্দের। আমি সুখী হতে চাই, সৎভাবে পৃথিবীর সব সুন্দর দেখতে চাই। এতে ক্ষতি কী!’

মা বললেন- ‘না, জীবন মানে মানিয়ে নেওয়া। জীবন মানে বড়রা যা বলে তার বিরুদ্ধে না যাওয়া। পিরিয়ডের সময় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে চিৎকার করে কাঁদা কেন? মেয়েদের মানিয়ে নিতে হয়।’ বাবা বললেন, ‘এইসব উশৃঙ্খল মেয়েদের কথা! তুমি কোচিং শেষে সরাসরি বাড়ি ফিরবে, বন্ধুরা ফুচকা ঝালমুড়ি খায় বলে তোমাকেও খেতে হবে! আমাদের বাড়ির মেয়েরা বাইরে ফুচকা খায় না! অবাধ্য মেয়ে!’

টুকুন বললো, ‘শুনলাম তুই নাকি সাইকেল চালানো শিখছিস। আবার কারাতে শিখবি টিয়ার সঙ্গে! ওই টিয়ার সঙ্গে যেন আর না দেখি তোকে। এইসব বিপমগামী মেয়েদের কাজ। তুই ভদ্র মেয়ে!’

উষা হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লো। চিৎকার করে কাঁদতে গিয়ে মনে পড়লো, ‘এ বাড়ির মেয়েরা জোরে কাঁদে না!’ ও হ্যাঁ কেমিস্ট্রি স্যারও যে আছেন! তিনি উষার খুব প্রিয় শিক্ষক। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার কথা শোনে উষা। যেন রুপালি চুলের এক শুভ্র জাদুকর তিনি।

পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরের সবুজ এরিকা পাম গাছটা দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ওর চোখে জল চলে এলো। মনে হলো, এই পৃথিবীতে সে ছাড়া যেন কোনো প্রাণী নেই।

উষা হাঁটুতে ভর করে এগিয়ে গেলো তার দিকে। পেছনে বাবা, মা আর ভাই তাকে বারণ করছে! ‘উষা যাস না! উষা পরিবারের মানুষ ছাড়া জগতের সবাই জুজু, তুই জগতের আর কোথাও নিরাপদ নয়। সবাই স্বার্থপর, তোকে বিপদে ফেলবে। উষা তবুও এগিয়ে গেল। আসলে সে পা থামাতে পারছে না। চশমার মোটা ফ্রেমের ভেতর দিয়ে কেমিস্ট্রি স্যারের চোখের দিকে তাকালেই সম্মোহিত হতে হয়। চোখের পলক ফেলা যায় না, চোখ নামানো যায় না। মনে হয় তিনি যা বলেন সব শুনি। উষা এসে থামলো তার সামনে। প্রশ্ন করলো- ‘স্যার, আপনি আমার জন্য বাক্স বানাননি?’ স্যার হেসে বললেন, ‘বাক্স? সে আবার কী? বাক্স বানাবো কেন?’

উষা পেছন ফিরে বাবা, মা আর ভাইয়ের দিকে আঙ্গুল তুলে বললো, ‘ওই যে সবাই আমার জন্য বাক্স বানিয়েছে। আপনি বানাননি? তাহলে কেন এসেছেন? আমি সুখী হয়ে বাঁচতে চাই। আমি কারও ক্ষতি করিনি।’ দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললো সে। কেমিস্ট্রি স্যার বললেন, ‘কেঁদো না। তুমি তো অনেক পড়ো তাই না? আচ্ছা বলোতো, সরস্বতীর বাহন হাঁস কেন?’

উষা টকটকে লাল দুটো চোখ তুলে বললো, ‘জানি না, কেন..?’ শান্ত চোখে স্থিরদৃষ্টি রেখে রুপালি চুলের জাদুকর বললেন, ‘হাঁসের যাত্রাই কাদার মধ্য দিয়ে। কিন্তু হাঁসের গায়ে কখনও কাদা লাগে না। এ কথা মনে রাখবে। তোমার জীবন সৃজনশীল কাজেই কাটুক। আনন্দে বাঁচো।’ উষা তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটে হাসি লেগে আছে। সে হাসি শুভ্র, সুন্দর।

চট করে ঘোর কেটে গেল, ঘুম ভেঙেছে উষার। মাথাটা ধরে আছে। গা থেকে লেপ সরিয়ে উঠে বসলো সে। এটা কী স্বপ্ন ছিল? খাটের সঙ্গে লাগোয়া একটা পড়ার টেবিল। টেবিলের সামনেই জানালা। জানালায় সুন্দর নেটের পর্দা লাগানো। টিউশনি শুরুর পর প্রথম বেতন দিয়ে এই সুন্দর পর্দা বানিয়ে নিয়েছে সে। এসএসসি পরীক্ষা দেবে উষা, কিন্তু নবম শ্রেণির গণিত শেখার জন্য অনেক ছাত্র-ছাত্রীই জুটেছে তার।

পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরের সবুজ এরিকা পাম গাছটা দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ওর চোখে জল চলে এলো। মনে হলো, এই পৃথিবীতে সে ছাড়া যেন কোনো প্রাণী নেই। এমন কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে যিনি মায়ের মতো, যিনি বাবার মতো। মা-বাবা ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে ধরলে যেমন ভালো লাগে তেমন। স্নেহের প্রথম স্পর্শ পেলে যেমন অনুভূত হয় তেমন এক ভালোবাসার বাষ্প বুকে নিয়ে ফের ঘুমোতে যেতে ইচ্ছে করছে। মগজের ভেতর থেকে কে যেন বারবার বলে উঠছে- ‘আমি আছি। আছি তো।’ রুপালি চুলের এক জাদুকর।

Facebook Comment

You May Also Like

x