Sunday, May 17, 2026
Homeথ্রিলার গল্পরহস্য গল্পলিফট রহস্য - হুমায়ূন আহমেদ

লিফট রহস্য – হুমায়ূন আহমেদ

লিফট রহস্য – হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলি বললেন, লিফটে উঠে কখনো ভয় পেয়েছেন?

আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় মহসিন হলের লিফটে এক ঘণ্টার জন্যে আটকা পড়েছিলাম। আমার সঙ্গে জীবনে প্রথম লিফটে উঠেছেন এমন এক বৃদ্ধ ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। আমি নিজে ভয় পাই নি। দিনের বেলা বলেই লিফটে কিছু আলো ছিল। পুরোপুরি অন্ধকার ছিল না। আমি মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বললাম, না।

কেউ প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে এমন শুনেছেন?

এক বুড়ো মানুষকে নিজে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখেছি।

লিফটে ভয় পাওয়া নিয়ে কোনো গল্প শুনেছেন?

আমি বললাম, একটা গল্প শুনেছি। গল্পের সত্য-মিথ্যা জানি না। এক লোক সাত তলা থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে যাবে। লিফটের বোতাম টিপল। লিফটের দরজা খুলল। তিনি ভেতরে ঢুকে হুড়মুড় করে নিচে পড়ে গেলেন। কারণ লিফটের দরজা খুলেছে ঠিকই কিন্তু লিফট আসে নি। মেকানিক্যাল কোনো গণ্ডগোল হয়েছে।

লিফট নিয়ে কোনো ভূতের গল্প পড়েছেন?

স্টিফেন কিং-এর একটা গল্প পড়েছি। বেশ জমাট গল্প। সায়েন্স ফিকশন টাইপ।

মিসির আলি বললেন, আমি লিফট নিয়ে একটা গল্প বলব। এক তরুণী লিফটে উঠে এমনই ভয় পেল যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। সে এখন এক ক্লিনিকে আছে। তার চিকিৎসা চলছে।

কি দেখে ভয় পেয়েছে?

এখনো পুরোপুরি জানি না। চলুন যাই চেষ্টা করে দেখি মেয়েটার মুখ থেকে কিছু শোনা যায় কি-না। সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভয় পেয়ে যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সে ভয় কেন পেয়েছে সেই বিষয়ে মুখ খুলবে না। এটাই স্বাভাবিক।

আমি বললাম, মেয়েটার খোজ পেলেন কীভাবে?

মিসির আলি বললেন, ক্লিনিকের ডাক্তার আমাকে জানিয়েছেন। মেয়েটির ব্যাপারে সাহায্য চেয়েছেন। মেয়েটা তার আত্মীয়া। বোনের মেয়ে বা এই জাতীয় কিছু।

মেয়েটার নাম লিলি। বয়স ২৪/২৫ বা তারচে’ কিছু বেশি। গায়ে হাসপাতালের সবুজ পোশাক। সাধারণ বাঙালি মেয়ে যেমন হয় তেমন। রোগা, শ্যামলা। মেয়েটার চোখ সুন্দর। বিদেশে এই চোখকেই বলে Liquid eyes.

চাদর গায়ে সে জড়সড় হয়ে ক্লিনিকের খাটে বসে আছে। সে দুহাতে একজন বয়স্ক মহিলার হাত চেপে ধরে আছে। শব্দ করে নিশ্বাস ফেলছে। কিছুক্ষণ পর পর টোক গিলছে।

মিসির আলি বললেন, মা কেমন আছ?

লিলি তাকাল কিন্তু কোনো জবাব দিল না। বয়স্ক মহিলা বললেন, লিলি কারো প্রশ্নের জবাব দেয় না। শুধু বলে লিফটের ভিতর ভয় পেয়েছি। এর বেশি কিছু বলে না।

মিসির আলি বললেন, আপনি কি লিলির মা?

জি।

আপনাকেও বলে নি কি দেখে ভয় পেয়েছে?

না। বেশি কিছু জিজ্ঞেসও করি না। এই বিষয়ে জানতে বেশি জোরাজুরি করলে মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যায়।

মিসির আলি লিলির সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, মা শোনো! তুমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছ বুঝতে পারছি। এখন তুমি লিফটের ভেতরে নেই। লিফটের বাইরে। বাকি জীবন আর লিফটে না উঠলেও চলবে। চলবে না?

এই প্রথম লিলি কথা বলল। বিড়বিড় করে বলল, আমি আর কোনোদিন উঠবো না।

মিসির আলি বললেন, যে লিফটে উঠে তুমি ভয় পেয়েছ। সেখানে তুমি না। উঠলেও অন্যরা উঠবে। তারাও ভয় পেতে পারে। তাদের অবস্থাও তোমার মতো হতে পারে। পারে না?

পারে।

মিসির আলি বললেন, এই কারণেই তোমার ঘটনাটা বলা দরকার। একবার বলে ফেলতে পারলে তুমি নিজেও হালকা হবে। তুমি কি দেখে ভয় পেয়েছ তার একটা ব্যাখ্যাও আমি হয়তোবা দাঁড়া করিয়ে ফেলব।

লিলি স্পষ্ট গলায় বলল, আপনি পারবেন না।

মিসির আলি বললেন, পারব না বলে কোনো কাজে হাত দেব না। আমি সে রকম না। তুমি সে রকম। তুমি ধরেই নিয়েছ- লিফটে কি দেখেছ, তা বলতে গেলে প্ৰচণ্ড ভয় পাবে বলে বলছি না। তুমি না বললেও কি দেখেছি তা তোমার মাথার মধ্যে আছে। তাকে মুছে ফেলতে পারছি না।

লিলি বলল, আচ্ছা আমি বলব।

মিসির আলি বললেন, ভেরি গুড়। আগে এক কাপ চা খাও তারপর গল্প শুরু করো। কোনো খুঁটিনাটি বাদ দেবে না। লিফটে তুমি একা ছিলে?

আমি আর লিফটম্যান। আর কেউ ছিল না।

লিফটটা কোথায়?

মতিঝিলের এক অফিসে।

তুমি সেখানে কাজ করে?

লিলি বলল, আমি বিবিএ পড়ছি! এই জন্যে একটা ফার্মের সঙ্গে এফিলিয়েশন আছে। সেখানে সপ্তাহে একবার হলেও যেতে হয়। কাগজপত্র আনতে হয়।

মিসির আলি বললেন, গতকাল এই জন্যেই গিয়েছিলো?

মিসির আলি বললেন, গতকাল ছিল শুক্রবার। সব কিছু বন্ধ। বন্ধের দিন তুমি কাগজপত্র আনতে গেলে?

লিলি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। সে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াচ্ছে। তার ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। মিসির আলি বললেন, তুমি শুক্রবারে সেই অফিসে যাও?

আপনাকে কে বলেছে?

আমি অনুমান করছি। আমার অনুমান শক্তি ভালো। অফিসের ঠিকানাটা বলো।

আমি আপনাকে কিছুই বলব না।

মিসির আলি মেয়েটির মা’র দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার মেয়ে বাসায় ফিরেছে। কখন?

ভদ্রমহিলা বললেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে একজন ডাক্তার টেলিফোন করে লিলির কথা জানান। কে এসে না- কি লিলিকে হাসপাতালে দিয়ে গেছে।

আপনার মেয়ে কোথায় কোন অফিসে যায় আপনি জানেন?

না।

মেয়ের বাবা কোথায়?

বিদেশে। মালয়েশিয়ায় কাজ করেন।

মিসির আলি লিলির দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তাহলে কিছুই বলবে না?

লিলি কঠিন গলায় বলল, না।

মিসির আলি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, তাহলে যাই। তুমি ভালো থেকো। আরেকটা কথা, মা শোনো— যা করবে ভেবেচিন্তে করবে। হঠাৎ বিপদে পড়া এক কথা আর বিপদ ডেকে আনা অন্য কথা।

লিলি বলল, আপনি যাবেন না। বসুন। আমি সব বলব। মা, তুমি অন্য ঘরে যাও।

ভদ্রমহিলা বললেন, আমি থাকলে সমস্যা কি?

লিলি বলল, তোমার সামনে আমি সব কিছু বলতে পারব না।

মিসির আলি আমাকে দেখিয়ে বললেন, ইনি কি থাকতে পারবেন?

লিলি বলল, হ্যাঁ পারবেন। উনি লেখক। আমি উনাকে চিনি। আমি আপনাকেও চিনি। আপনাকে নিয়ে লেখা দুটা বই আমি পড়েছি। একটার নাম মনে আছে- মিসির আলির চশমা। সেখানে একটা ভুল আছে। ভুলটা আমি দাগ দিয়ে রেখেছি। এখন মনে নাই।

লিলি সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা শুরু করল। উচ্চারণ স্পষ্ট। বাচনভঙ্গি ভালো। কথা বলার সময় সামান্য মাথা দুলানোর অভ্যাস আছে।

ভালো মেয়ে বলতে আপনারা যা ভাবেন আমি তা-না। আমি খারাপ মেয়ে। যথেষ্ট খারাপ মেয়ে। মতিঝিলের ঐ অফিসে আমি একজন ভদ্রলোকের কাছে যাই। তাঁর নাম ফরহাদ। প্রেম-ভালোবাসা এইসব কিছু না। আমি নিরিবিলি কিছু সময় তার সঙ্গে কাটাই। তার বিনিময়ে টাকা নেই। উপহার দিলে উপহার নেই। আমার যে টাকা-পয়সার অভাব তাও না। বাবা মালয়েশিয়া থেকে ভালো টাকা পাঠান।

আমি শুধু যে ফরহাদ সাহেবের কাছেই যাই তা না, আরো লোকজনদের কাছে যাই। একটা নোংরা মেয়ে তো নোংরা পুরুষদের সঙ্গেই মিশবে। এই দেশে নোংরা পুরুষের কোনো অভাব নেই। বেশিরভাগ নোংরা পুরুষই বিবাহিত। স্ত্রীছেলে-মেয়ে নিয়ে সুখী জীবনযাপন করে। সুযোগ পেলেই আমার মতো নষ্ট মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে।

একবার এক লোকের সঙ্গে তার স্ত্রী সেজে কক্সবাজারে তিন দিন ছিলাম। মা’কে বলেছি। স্টাডি ট্যুরে যাচ্ছি।

আমি গায়ের চামড়া বিক্রি করলেও নেশা করি না। মদ, সিগারেট, ড্রাগস কিছুই না। পার্টি মাঝে মাঝে মদ খাওয়ার জন্যে খুব ঝুলাবুলি করে। তারা মনে করে নেশাগ্ৰস্ত মেয়ের সঙ্গে শোয়া ইন্টারেষ্টিং। তাদের পীড়াপীড়িতেও রাজি হই না। কক্সবাজারে যে লোকের সঙ্গে গিয়েছিলাম। সে বলেছিল প্রতি পেগী হুইঙ্কি খাবার জন্যে সে আমাকে এক হাজার করে টাকা দেবে। তখন শুধু সাত পেগ খেয়ে সাত হাজার টাকা নিয়েছি। এবং ঐ লোকের গায়ে বমি করেছি। তার শিক্ষা সফর হয়ে গেছে।

মিসির আলি আংকেল, এখন বলুন আমি কেমন মেয়ে?

মিসির আলি কিছু বললেন না। লিলি ঠোঁট বাঁকা করে হাসল। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম মেয়েটা তার চরিত্রের বিকারগ্রস্ত অংশটির কথা বলে আরাম পাচ্ছে।

লিলি বলল, যাই হোক আসল গল্প বলি। আমি ফরহাদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। শুক্রবারে অফিসে একেবারেই লোকজন থাকে না কথাটা ঠিক না, কিছু লোকজন থাকে। কেয়ারটেকার, মালী, ঝাড়ুদার। শুক্রবারে লিফট বন্ধ থাকে। ফরহাদ সাহেব বসেন ছয় তলায়। ছয় তলা পর্যন্ত হেঁটে উঠতে হয়। এই জন্যে শুক্রবারে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাই না। গতকাল গিয়েছিলাম, কারণ তিনি বলেছেন আমাকে একটা মোবাইল সেট দেবেন। আমার একটা দামি মোবাইল সেট ছিল, আই ফোন। সেটা চুরি হয়ে গেছে।

আমি অফিসে পৌঁছলাম। সকাল এগারোটায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাব, খাকি ড্রেস পরা একজন এসে বলল, আপা আপনি কি ফরহাদ সাহেবের কাছে যাবেন?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

সে বলল, লিফটে করে যান। এত দূর হেঁটে উঠবেন।

লিফট চালু আছে?

সে বলল, আজ চালু আছে। কমার্শিয়াল ব্যাংকে আজ সারাদিন কাজ হবে। তারা খবর দিয়ে একটা লিফট চালু রেখেছেন।

আপনি কি লিফটম্যান

জি আম্পা ৷

আপনি আমাকে চিনেন?

নামে চিনি না। আপনি ফরহাদ সাহেবের কাছে প্রায়ই যান এইটা জানি।

আমি বললাম, ইউনিভার্সিটির কাজে আসতে হয়। বিবিএ করছি তো। ফরহাদ সাহেব কোম্পানি-আইন বিষয়ে আমাকে পড়ান।

আমি লিফটম্যানকে নিয়ে লিফটে উঠলাম। সিক্সথ ফ্লোরে বোতাম চাপা। হয়েছে, লিফট কিন্তু থামল না। সাত-আট পার হয়ে নিয়ের দিকে যাচ্ছে। লিফটম্যান ব্যস্ত হয়ে বোতাম চাপাচাপি করছে। আট এবং নিয়ের মাঝখানে লিফট থেমে গেল। লিফটের ভিতরের বাতি নিভে গেল। মাথার উপরে যে ফ্যান ঘুরছিল সেটা বন্ধ হয়ে গেল। লিফটম্যান বলল, খাইছে আমারে, আবার ধরা খাইলাম।

কারেন্ট চলে গেছে না-কি?

বুঝতেছি না। তয় এই জায়গায় লিফট পেরায়ই আটকায়। একবার আটকাইছিল চাইর ঘন্টার জন্য।

সর্বনাশ।

আফা আপনার কাছে মোবাইল আছে না? একটা নাস্কিার দিতাছি মোবাইল দেন। লিফট চালুর ব্যবস্থা হইব।

আমার কাছে মোবাইল সেট নাই।

চিন্তার কিছু নাই। টুলের উপরে বসেন।

ঠিক হতে কতক্ষণ লাগবে?

বলা তো আফা মুশকিল। আইজ ছুটির দিন। লোকজন চইলা যাবে জুম্মার নামাজে।

এখন বাজে মাত্র এগারোটা, এখন কিসের জুম্মা?

একটা অজুহাতে আগেভাগে বাইর হওয়া। সবাই অজুহাত খুঁজে।

এ্যালার্ম বেল, এই জাতীয় কিছু নাই?

আছে। মনে হয় নষ্ট। রক্ষণাবেক্ষণ নাই। মাসে একবার সার্ভিসং করার কথা। তিন মাস হইছে সার্তিসিং নাই।

মনে হলো এক ঘণ্টা বসে আছি, ঘড়িতে দেখি মাত্ৰ সাত মিনিট পার হয়েছে। লিফটম্যানের সঙ্গে গল্প করা ছাড়া সময় কাটানোর কোনো বুদ্ধি নেই। আমি বললাম, আপনার নাম কি?

লিফটম্যান বলল, আমার নাম সালাম। আমার এক ছোটভাই আছে তার নাম কালাম। সেও লিফটম্যান। গুলশানের এক অফিসে কাজ করে। বেতন আমার চেয়ে বেশি পায়। চাইরিশ টাকা বেশি। ওভার টাইম পায়। আমাদের এইখানে ওভারটাইম নাই। ছুটির দিনে কাজে আসছি। একটা পয়সা মিলবে না।

আমি বললাম, লিফটম্যানের চাকরিটা মনে হয় খুব বোরিং, মানে ক্লান্তিকর।

সালাম বলল, উঠানামা, উঠা-নামা। এইটা কোনো চাকরির জাতই না। কি করব বলেন- লেখাপড়া শিখি নাই। তবে আমার ভাই কালাম ক্লাস সিক্স পাস।

আপনি বিয়ে করেছেন?

জে না। বেতন যা পাই তা দিয়া নিজেরই পেট চলে না, সংসার করব কি? তার উপর দেশে টাকা পাঠাইতে হয়। মা জীবিত। তয় আমার ভাই কালাম বিবাহ করেছে। মেয়ের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর। তাদের একটা কন্যা আছে। কন্যার নাম রেশমা।

বয়স কত?

ফেব্রুয়ারিতে তিন বছর হবে। মাশাল্লাহ সব কথা বলতে পারে। আমারে ডাকে হাওয়াই চাচু।

হাওয়াই চাচু ডাকে কেন?

তারে যখনই দেখতে যাই— হাওয়াই মিঠাই নিয়া যাই। দশ টাকা করে পিস। এই জন্যে হাওয়াই চাচু ডাকে।

দেখতে কেমন হয়েছে?

মাশাল্লাহ অত্যধিক সুন্দরী হয়েছে। আমি ভাইয়ের বৌরে বলেছি- সবসময় মেয়ের কপালে যেন ফোঁটা দিয়া রাখে। সুন্দরী মেয়ের উপর জ্বিন-ভুতের নজর লাগে। আবার খারাপ মানুষের নজর লাগে। মেয়েটা আপনাকে খুব পছন্দ করে? তার বাপ-মা’র চেয়ে বেশি পছন্দ আমারে করে, এই নিয়া একশ’ টেক বাজি রাখতে পারব। গত ঈদে তারে একটা জামা দিয়েছিলাম, নীল জামা। সামনেপিছনে লাল ফুল। এই জামা ছাড়া কিছু পরবে না। জামা খাটো হয়ে গেছে, তারপরেও এইটাই পারবে।

ভালো তো।

নিজে নিজেই ছড়া শিখেছে। তার বাপ-মা যদি বলে ছড়া বলে সে বলবে না। আমি যদি বলি, কইগো চান্সের মা বুড়ি ছড়া বলে। সঙ্গে সঙ্গে বলবে।

আপনি তাকে চান্দের মা বুড়ি ডাকেন?

জি আফা। তয় এখন আমার ভাইও তারে চান্দের মা বুড়ি ডাকে।

আমি ঘড়ি দেখলাম। মাত্ৰ ত্ৰিশ মিনিট পার হয়েছে। উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে না। সালামের ভ্যাতিজির গল্প কতক্ষণ শুনব। আমার এ্যাজমার মতো আছে। বন্ধ ঘরে এ্যাজমা’র টান ওঠে। বন্ধ লিফট। সামান্য আলো। বাতাস নেই! আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। আমার শ্বাস কষ্টের ধরনটা এমন যে একবার শুরু হলে দ্রুত বাড়তে থাকে। আমি হাঁ করে নিশ্বাস নিচ্ছি। বুকের ভেতর ঘর্ঘর শব্দ হচ্ছে।

সালাম ভীত গলায় বলল, আফা কি হইছে?

আমি বললাম, নিশ্বাস নিতে পারছি না। আমার শ্বাসকষ্ট আছে। লিফট কিছুক্ষণের মধ্যে চালু না হলে আমি মরে যাব।

তখনই ঘটনোটা ঘটল। দেখি লিফটে আমি একা আর কেউ নাই। আমি কয়েকবার ডাকলাম- সালাম সালাম, তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম। যখন জ্ঞান ফিরেছে তখন দেখি আমি আমার মায়ের বাসায়। এই আমার ভয় পাওয়ার ইতিহাস। মতিঝিল অফিসের ঠিকানা চান? এই নিন ফরহাদ সাহেবের কার্ড।

মিসির আলি বললেন, ঘটনার ব্যাখ্যাটা খুব সহজ। তুমি লিফটে আটকা পড়ে ভয়ে-আতংকে এক সময় অজ্ঞান হয়ে পড়েছি। লিফটম্যান অদৃশ্য হয়ে গেছে এটা তুমি দেখেছ স্বপ্নে। তুমি লিফটম্যানের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বললেই আমার ব্যাখ্যা গ্রহন করবে।

লিলি বিড়বিড় করে বলল, হতে পারে!

মিসির আলি বললেন, এখন কি ভয়টা দূর হয়েছে?

হুঁ।

মিসির আলি বললেন, ভয়টা পুরোপুরি দূর করে মা’র সঙ্গে বাসায় চলে যাও। আর চেষ্টা করো জীবন পদ্ধতিটা বদলাতে।

লিলি বলল, আমাকে উপদেশ দেবেন না। আমি উপদেশের ধার ধারি না।

মিসির আলি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই। মা উঠি।

লিলি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, এখনো মা ডাকছেন?

মিসির আলি বললেন, একবার যাকে মা ডেকেছি সে সব সময়ের জন্যেই মা।

রাস্তায় নেমেই মিসির আলি বললেন, চলুন লিফটম্যান সালামের সঙ্গে দেখা করে আসি।

আমি বললাম, তার সঙ্গে দেখা করার দরকার কি? আপনি তো সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। বদমেয়েটাও এখন স্বাভাবিক।

মিসির আলি বললেন, সামান্য খটকা আছে।

কি খটকা?

লিলি শক্ত মেয়ে। যখন তখন অজ্ঞান হবার মেয়ে না। তার চেয়েও বড় কথা অজ্ঞান অবস্থায় কেউ স্বপ্ন দেখে না। গভীর ঘুমেও মানুষ স্বপ্ন দেখে না। যখন হালকা ঘুমে থাকে তখন স্বপ্ন দেখে। তখন চোখের পাতা কাঁপতে থাকে। একে বলে REM অর্থাৎ Rapid Eye Movement.

আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?

আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কি বলতে চাচ্ছি। সালামের সঙ্গে দেখা হওয়া জরুরি এইটুকু বুঝতে পারছি।

রাত বাজে দশটা, এখন তাকে পাবেন?

আমার ধারণা সে অফিস বিল্ডিং-এ থাকে। তিন বছর বয়েসি মেয়ে বাচ্চার জন্যে কিছু ভালো জামা-কাপড় দরকার।

সালামকে অফিসেই পাওয়া গেল। সে অফিস ঘিরেই একটা কামরায় দারোয়ানদের সঙ্গে মোস করে থাকে। আমাদের দেখে সে ভীত চোখে তাকাতে লাগল। মধ্য বয়স্ক একজন মানুষ। তার উপর বয়ে যাওয়া ঝড়ে যে ক্লান্ত এবং হতাশ। যার জীবন ছোট্ট লিফট ঘরে আটকে গেছে।

মিসির আলি বললেন, সালাম কেমন আছেন?

সালাম বিড়বিড় করে বলল, জে ভালো আছি।

আপনার ভাই কালামের মেয়েটি কেমন আছে?

ভালো।

তার নাম তো চান্দের মা বুড়ি?

সালাম বলল, আপনারা আমার কাছে কি চান? কারো সাথে আমার কোনো বিবাদ নাই। আমি কোনো দোষ করি নাই।

মিসির আলি বললেন, আমরা খুব ভালো করে জানি আপনি কোনো দোষ করেন নাই। আমরা আপনার সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই।

আপনারা কি পুলিশের লোক?

মিসির আলি বললেন, আমরা পুলিশের লোক না। আপনি যেমন পুলিশ ভয় পান আমরাও ভয় পাই। আপনাকে দু’একটা কথা জিজ্ঞেস করাধ। ইচ্ছা হলে জবাব দিবেন, ইচ্ছা না হলে দিবেন না। আমরা চলে যাব।

সালাম ভীত গলায় বলল, যা বলার এইখানে বলেন। এইখানে তো আমি ছাড়া কেউ নাই। আমি আপনাদের সাথে যাব না। স্যার আমি গরিব মানুষ, আমি কোনো দোষ করি নাই। আল্লাহপাকের দোহাই।

মিসির আলি বললেন, শুধু শুধু ভয় পাচ্ছেন কেন? যে অপরাধ করে সে ভয় পায়।

সালাম বলল, গরিব মানুষ অপরাধ না করলেও ভয় পায়। সে গরিব হয়েছে এইটাই তার অপরাধ।

আপনার চান্দের মা’র বুড়ির জন্যে কিছু জামা-কাপড় এনেছি। দেখুন তো পছন্দ হয় কি-না।

সালাম আগ্রহ নিয়ে কাপড়গুলি দেখল। তার মুখের চামড়া শক্ত হয়ে গিয়েছিল এখন সহজ হতে শুরু করল। মিসির আলি বললেন, গত শুক্রবারে একটা মেয়ে আপনার সঙ্গে লিফটে আটকা পড়েছিল। আপনিও ছিলেন তার সঙ্গে, কি হয়েছিল বলুন তো?

সালাম বলল, স্যার আমি উনারে ছোটবোনের মতো দেখেছি। বেতালা কিছু করি নাই।

জানি আপনি বেতালা কিছু করেন নি। কিন্তু কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে যাতে মেয়েটা ভয় পেয়েছে। প্রচণ্ড ভয়। ঘটনাটা বলুন।

সালাম বলল, আমার চাকরি নট হবে না তো স্যার? চাকরি নট হইলে না খায়া মরব।

মিসির আলি হাসলেন। সালাম তার হাসি দেখে ভরসা পেল বলে মনে হলো। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে কথা বলা শুরু করল।

যে চাকরি আমার রুটি-রুজি তারে খারাপ বলা ঠিক না। আল্লাহপাক নারাজ হন। কিন্তু স্যার চাকরিটা খারাপ। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত লিফটে উঠা-নমা করি। মাঝখানে আধা ঘণ্টা লাঞ্চের ছুটি। লিফটে থাকি, আমার মনটা থাকে বাইরে।

একদিন লিফটে আমি একা। এগারো তলা থেকে একজন বোতাম টিপেছে। লিফট উঠা শুরু করেছে। আমার মনটা বলতেছে থাকব না। শালার লিফটের ভিতরে। সঙ্গে সঙ্গে দেখি আমি লিফটের বাইরে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে দাঁড়ায়ে আছি। কি যে একটা ভয় পাইলাম স্যার। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল! মনে হইল মাথা খারাপ হয়ে গেছে। লিফটের সামনে দাড়িয়ে আছি, এক সময় আমাকে ছাড়া লিফট নামল। এগারো তালার বড় সাহেব নামলেন। আমাকে দেখো ধমক দিলেন। বললেন, কোথায় ছিলো?

আমি বললাম, টয়লেটে।

স্যার এই হলো শুরু। আমি ইচ্ছা করলেই লিফটের বাইরে আসতে পারি। কীভাবে পারি জানি না। লোকজন থাকলে বাইর হই না। ঐ দিন আফার দমবন্ধ হয়ে আসছিল তখন বাইর হইছি। লিফট উপরে নিয়ে গেছি। আফা অজ্ঞান হয়ে ছিল। ফরহাদ স্যারকে খবর দিলাম। উনি আফরে নিয়া হাসপাতালে গেলেন।

আপনার এই ব্যাপারটা আর কেউ জানে?

আমার ছোটভাই কালামরে শুধু বলেছি। সে বলেছে আমার মাথা খারাপ হইছে। আর কিছু না। লিফটের চাকরি বেশিদিন করলে সবারই মাথা খারাপ হয়। স্যার এই আমার কথা। আর কোনো কথা নাই। আর কিছু জানতে চান?

মিসির আলি বললেন, না। আর কিছু জানতে চাই না।

আমরা দু’জন বাসায় ফিরছি। আমি বললাম, এই ঘটনাটা কি আপনার ‘Unsolved’ খাতায় উঠবে?

মিসির আলি বললেন, হ্যাঁ।

ঘটনাটা কি লিলি মেয়েটিকে জানানোর প্রয়োজন আছে?

মিসির আলি বললেন, না।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot dana
  • hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • slot gacor
  • desa bet
  • desabet
  • Kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor