দু’টুকরো মাংস – মুহাম্মদ বরকত আলী

'দু’টুকরো মাংস' - মুহাম্মদ বরকত আলী

আজ কুরবানির ঈদ। দীপু ঈদগাহ্ থেকে বাড়ি ফিরেই তার পূর্বের গুছিয়ে রাখা ব্যাগটি হাতে নিয়ে দেয় ছুট। দীপুর মা আবেদা হাঁক ছাড়ল, ‘এই দীপু, কিছু মুখে দিয়ে যা।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা? আবেদার কথার কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে দৌঁড় দিলো চৌধুরীদের বাগানবাড়ির দিকে। আপাতত তার পেটে এখন খিদে নেই। ঈদগাহে নামাজে যাওয়ার পূর্বে সেমাই রুটি খেয়েছিল। ওটুকুতেই এখন চলবে। দীপুর পাড়াতো বড় ভাইয়েরা নতুন একটি সংগঠন করেছে। ওরাই গত রাতে একটি প্যাকেট দিয়ে গিয়েছিল দীপুদের বাড়ি।

এক প্যাকেট আটা, এক প্যাকেট সেমাই, কিছুটা চিনি, তেলের বোতল ও একটি গন্ধযুক্ত সাবান ছিল তাতে। সকালের নাস্তাটা ওখান থেকেই হয়েছে। তা-না-হলে সকালের সেমাই রুটি জুটতো না। চৌধুরী বাড়িতে একটি কুরবানি গরু আছে। ইয়া বড় গরু। ইমাম সাহেবকে যেতে দেখেছে সে। এতক্ষণ নিশ্চয় গরুটি কুরবানি দেওয়া হয়ে গেছে? আর এজন্যই দীপুর এত তাড়া। সে অন্য সবার আগে পৌঁঁছাতে চায়। গ্রামে প্রভাবশালী দুয়েক ঘর গরু কিংবা ছাগল কুরবানি দেয়। সবার তো আর সামর্থ্য নেই। দীপু চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। পড়ালেখায় ভালো সে। খুব মেধাবী ছাত্র। স্কুলের শিক্ষকদের সবার মন জয় করেছে দীপু। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে পৌঁছালো সেই কাক্সিক্ষত স্থানে। সে যেটা মনে করেছিল ঠিক সেটাই হয়েছে। গরুটি এই কিছুক্ষণ আগেই ইমাম সাহেব কুরবানি করে গেছেন। এখনো ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। দুজন কসাই ভাড়া করেছে চৌধুরী সাহেব। চামড়া ছিলা থেকে শুরু করে মাংসগুলো টুকরো টুকরো করে কেটে ভাগ করে দিবে। দীপু ছাড়া এই মুহূর্তে আর কেউ মাংস চাইতে আসেনি। এখন কেউ আসার কথাও না। সবাই আসবে বিকেলবেলা। সে এসেছে এই জন্য যে, সে যদি কসাইয়ের খুঁটিনাটি কিছু কাজ করে দেয় তবে নিশ্চয় মাংস বিলির সময় অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই পাবে।

দীপু কিছুটা দুরত্ব বজায় রেখে বসে পড়লো। মুখে কোনো কথা নেই। চুপচাপ হাঁটু খাড়া করে বসে আছে সে। মনে হচ্ছে এ যেন তেমাথা কোনো এক প্রাণী। দুই হাঁটুর নিচে মাথাটা গুঁজে রেখে চোখ দুটো পিটপিট করে তাকিয়ে দেখছে কীভাবে চামড়া ছিলা হয়। বেশ কদিন হলো দীপুর বাবা কাসেম আলী অসুস্থ হয়ে বিছানারত। কাসেম প্রতিদিন সকালবেলা বাসি পান্তা খেয়ে বের হতেন জেলা শহরের উদ্দেশ্যে। একটি ঝুড়ি, একটা নিড়ানি, আর একটি কোদাল নিয়ে রাস্তার পাশে বসে থাকেন। কারো প্রয়োজন হলে ডেকে নেয় কাজের জন্য। কাজ করিয়ে তারপর হাতে কিছু মজুরি দিয়ে বিদায় করে। বাড়ি ফেরার পথে কিছু চাল-ডাল কিনে নিয়ে আসে। আবার কোনো কোনো দিন চুপচাপ রাস্তার পাশে বসেই কাটাতে হয়। যেদিন কারো ডাক পড়ে না। সেদিন খালি হাতে ফিরতে হয় বাড়ি।

এভাবেই চলে যায় সংসার। কিন্তু এই কয়েক দিন হলো জ্বরে পড়েছেন। ঈদের আগ মুহূর্তে হঠাৎ জ্বরটা এসে হাজির। এ কদিন বের হতে না পারাই বাড়িতে এখন প্রায় অন্ন শূন্য। আজ ঈদের দিন হওয়া সত্ত্বেও মাংস কিনতে পারেননি। এজন্যই দীপু এসেছে কুরবানির দু’টুকরো মাংস পাওয়ার আশায়।

গরুর রানের বড় বড় অংশগুলো রাখা হচ্ছে স্তুপাকারে। হলুদের গুঁড়া ছিটিয়ে দিচ্ছে মাংসের উপর, যেন মাছি না বসে। দীপু চুপচাপ বসে দেখে যাচ্ছে এই কেরামতি। ঘাপটি মেরে বসে তাকিয়ে আছে মাংসের দিকে। মাংসের বড় বড় প্রতিটি রান ছুঁয়ে যাচ্ছে তার চোখের আশাভরা দৃষ্টি। একজন কসাইয়ের ডাকে দীপুর দৃষ্টি ফিরে আসে মাংসের স্তুপ থেকে। লোকটি বলল, ‘কয়েকটা কলার পাতা কেটে নিয়ে আসতে পারবি?’ দীপু ওদের দৃষ্টি কাড়ার জন্য একটি ছুরি নিয়ে ছুটে যায় কলাপাতার খোঁজে। কোথায় থেকে যেন কলার পাতা কেটে নিয়ে আসে সে। পুনরায় বসে যায় পূর্বের স্থানে। দুটি কুকুরের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে কুকুরগুলো তাড়িয়ে দিয়ে আবার বসে দীপু। ঘেউ ঘেউ করে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণপর আবার ফিরে আসে। সে আবার তেড়ে যায়। গালি ছোঁড়ে, ইটের কুচি ছুঁড়ে মারে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসে, এই বুঝি হয়ে এলো। মাংসগুলো টুকরো টুকরো করা হয়েছে। চৌধুরি সাহেব বড় বড় দুটো গামলা হাতে নিয়ে হাজির হলেন।

একটা চেয়ার নিয়ে বসলেন। হুকুম দিলেন ভাগাভাগি করতে। তিন জায়গায় স্তুপাকারে রাখা হলো মাংসের টুকরো। নির্দেশ দিলেন কলিজাটা, মেটেটা আর ভালো কিছু অংশ তার ভাগে রাখতে। ভাগাভাগি শেষে ফকির মিসকিনের ভাগ থেকে দুজন কসাইকে কিছু মাংস উঠিয়ে দিলেন। চৌধুরী সাহেবের নিজের ভাগের অংশ আর আত্মীয়র ভাগের অংশটুকু বাড়ির ভিতর পাঠিয়ে দিলেন। ব্যাগ হাতে আসতে শুরু করেছে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ও বৃদ্ধের দল। দীপু তার ব্যাগটি পকেট থেকে বের করে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে অন্যদের মাঝে। ফকির মিসকিনের অংশটুকু বিলিয়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়েই চলে গেলেন চৌধুরী সাহেব। কসাই দুজন ফিসফিস করে একে অপরকে কি যেন বলল। তারপর দুজনের ব্যাগে আরও কিছু মাংস নিয়ে রাখল নিজেদের জন্য। মাংস দেওয়া শুরু হতেই হৈহুল্লোড় বেঁধে গেল। যে যার মতো ব্যাগ অথবা হাত বাড়িয়ে নিচ্ছে দু এক টুকরো মাংস। দুয়েক টুকরা হাতে পড়তেই আনন্দে অন্যের বাড়ি ছুটল। দীপু ওদের ভিড়ে সবার পিছনে পড়ে রইল। পেরে উঠল না অন্যদের সাথে। সামনে দিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এখনও বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে দীপুর সামনে। দুই হাত দিয়ে ঠেলেও যেতে পারলো না কসাইয়ের নিকটে। হঠাৎ কানে এলো, আর নেই ফুরিয়ে গেছে। এবার তোরা যা। কেউ কেউ দুয়েক টুকরা মাংস না পেয়ে খালি হাতে বিদেয় হলো। সবাই চলে গেছে। কসাই দুজনও চলে গেল। একবারও দীপুকে জিজ্ঞেস করল না সে মাংস পেয়েছে কিনা। দীপু গো ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

যেখানে কিছুক্ষণ আগে মাংসের স্তুপ ছিলো এখন সেখানে পড়ে আছে তার নিয়ে আসা রক্তাক্ত কয়েকটি কলার পাতা। কুকুরগুলো কোথায় থেকে যেন আবার হাজির। কুই কুই করে খুঁজে বেড়াচ্ছে কসাইয়ের ফেলে দেওয়া অপ্রয়োজনীও মাংসের টুকরো। কলার পাতায় লেগে থাকা অংশটুকু খাচ্ছে আর লেজ দোলাচ্ছে। দীপু আস্তে আস্তে ফোপাতে শুরু করল। এবার শুরু করল কান্না। ওর কান্না দেখে কুকুর দুটো দুয়েকবার ঘেউ ঘেউ করে আবার থেমে গেল। কুকুরগুলো হয়তো বলতে চাচ্ছে, কিছুক্ষণ আগে ওদের হয়ে তুই আমাদের তাড়িয়েছিস এখন ওরা তোকে কিছুই দিলো না। মজাটা বুঝ এবার।

দীপুর কান্না শুনে বেরিয়ে এলো চৌধুরী সাহেব।

‘এই ছেলে, কাঁদছিস কেনো?’

দীপু হাতের ব্যাগটি ঝুলিয়ে ফোপাতে ফোপাতে বলল, ‘আমি গোস্ত পাইনি। সেই সকাল থেকে বসে আছি।’

চৌধুরী সাহেব বললেন, ‘ফকির-মিসকিনের গোস্ত ফুরিয়ে গেছে। আচ্ছা, তুই দাঁড়া আমি আসছি।’ এই বলে বাড়ির ভিতরে চলে গেল তিনি। দীপুর মুখে কিছুটা হাসি ফুটল। চোখ মুছে বসে রইল। চৌধুরী সাহেব হাতে করে দু’টুকরো মাংস এনে দীপুর ব্যাগের ভিতর ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, ‘হলো তো এবার, যা বিদেয় হ।’

ব্যাগের ভিতর চৌধুরীর দেওয়া সদ্য মাংসের টুকরো দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল দীপু। কুকুর দুটো এখনও কুই কুই করে চেটে বেড়াচ্ছে কলাপাতা। সে একবার কুকুর দুটোর দিকে তাকায় আর একবার ব্যাগের তলায় পড়ে থাকা দু’টুকরো মাংসের দিকে তাকায়। হঠাৎ কী মনে করে যেন মাংসের টুকরো দুটো বের করে কুকুরদের দিকে ছুঁড়ে দিলো দীপু। কুকুর দুটি মাংসের টুকরা পেয়ে লেজ দুলিয়ে দুলিয়ে চিবুতে লাগল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের খাওয়া দেখলো সে। বিকেলের শেষ প্রহরে এসে ঠেকেছে। পেটে টান ধরেছে দীপুর। এতক্ষণ মাংসের লোভে খিদের কথা মনেই ছিলো না তার। দীপু হাতের ব্যাগটি ফেলে দিয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দিলো।

(সমাপ্ত)

You May Also Like