Monday, May 27, 2024
Homeরম্য গল্পহাসির গল্পডাক্তার ডাকলেন হর্ষবর্ধন - শিবরাম চক্রবর্তী

ডাক্তার ডাকলেন হর্ষবর্ধন – শিবরাম চক্রবর্তী

বউয়ের ভারী অসুখ মশাই। কোন ডাক্তারকে ডাকা যায় বলুন তো? হর্ষবর্ধন এসে শুধোলেন আমায়।

কেন, আমাদের রাম ডাক্তারকে? বললাম আমি। তারপর তাঁর ভারী ফিজ –এর কথা ভেবে নিয়ে বলি আবার : রাম ডাক্তারকে আনার ব্যয় অনেক, কিন্তু ব্যায়রাম সারাতে তাঁর মতন আর হয় না।

বলে বৌয়ের আমার প্রাণ নিয়ে টানাটানি, আমি কি এখন টাকার ভাবছি নাকি। তিনি জানান- বউয়ের আমার আরাম হওয়া নিয়ে কথা।

কি হয়েছে তার? আমি জানতে চাই।

কী যে হয়েছে তাই তো বোঝা যাচ্ছে না সঠিক। এই বলছে মাথা ধরেছে, এই বলছে দাঁত কনকন, এই বলছে পেট কামড়াচ্ছে…..

এসব তো ছেলেপিলের অসুখ, ইস্কুলে যাবার সময় হয়। আমি বলি–তবে মেয়েদের পেটের খবর কে রাখে। বলতে পারে কেউ?

বউদির পেটে কিছু হয়নি তো দাদা। জিজ্ঞেস করে গোবরা। দাদার সাথে সাথেই সে এসেছিল।

পেটে আবার কি হবে শুনি? ভায়ের প্রশ্নে দাদা কুঞ্চিত করেন : পেটে তো লিভার পিলে হয়ে থাকে। তুই কি লিভার পিলের ব্যামো হয়েছে, তাই বলছিস?

আমি ছেলেপিলের কথা বলছিলাম।

ছেলেপিলে হওয়াটা কি একটা ব্যামো নাকি আবার?

হর্ষবর্ধন ভায়ের কথায় আরো বেশি খাপপা হন : সে হওয়া তো ভাগ্যের কথা রে। তেমন ভাগ্য কি আমাদের হবে? বলে তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন।

হতে পারে মশাই। গোবরা ভায়া ঠিক আন্দাজ করেছে হয়ত। ওর সমর্থনে দাঁড়াই : পেটে ছেলে হলে শুনেছি অমনটাই নাকি হয় মাথা ধরে, গা বামি করে, পেট কমড়ায়…ছেলেটাই কামড়ায় কি না কে জানে।

ছেলের কামড়ের কথায় কথাটা মনে পড়ে গেল আমার…

হর্ষবর্ধনের এক আধুনিকা শ্যালিকা একবার বেড়াতে এসেছিলেন ওঁদের বাড়ি একটা বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়ে।

ফুটফুটে ছেলেটিকে দেখে কোলে করে একটু আদর করার জন্য নিয়েছিলাম, তারপরে দাঁত গজিয়েছে কিনা দেখবার জন্যে যেই না ওর মুখের মধ্যে আঙুল দিয়েছি উফ। লাফিয়ে উঠতে হয়েছে আমায়।

কি হলো কি হলো? ব্যস্ত হয়ে উঠলেন হর্ষবর্ধনের বউ।

কিছু হয়নি। আমি বললাম : একটু দন্তস্ফুট হল মাত্র। হাতে হাতে দাঁত দেখিয়েছে ছেলেটা।

ছেলের মুখে আঙুল দিলেন যে বড়? রাগ করলেন হর্ষবর্ধনের শালী ও আঙুলটা আপনার অ্যান্টিসেপটিক করে নিয়েছিলেন?

অ্যান্টিসেপকি? ও কথাটায় অবাক হই। সে আবার কি?

লেখক নাকি আপনি? হাইজীনের জ্ঞান নেই আপনার? বলে একখানা টেকসট বই এনে আমার নাকের সামনে তিনি খাড়া করেন। তারপরে আমি চোখ দিচ্ছি না দেখে খানিকটা তার তিনি নিজেই আমায় পড়ে শোনান :

শিশুদের মুখে কোন খাদ্য দেবার আগে সেটা গরম জলে ফুটিয়ে নিতে হবে…

আঙুল কি একটা খাদ্য না কি? বাধা দিয়ে মুধান হর্ষবর্ধন পত্নী।

একদম অখাদ্য। অন্ততঃ পরের আঙুল তো বটেই। গোবরভায়া মখু গোমড়া করে বলে?

নিজের আঙুল কেউ কেউ খায় বটে দেখেছি, কিন্তু পরের আঙুল খেতে কখনো কাউকে দেখা যায় নি।

আঙুল আমি ফুটিয়ে নিইনি সে কথা ঠিক, আমতা আমতা করে আমরা সাফাই গাই : তবে আপনার ছেলেই আঙুলটা আমায় ফুটিয়ে নিয়েছে। কিম্বা ফুটিয়ে দিয়েছে…যাই বলুন। এই দেখুন না।

বলে খোকার দাঁত বসানোর দগদমে দাগ তার মাকে দেখাই। ফুটফুটে বলে কোলে নিয়েছিলাম কিন্তু এতটাই যে ফুটবে তা আমার ধারণা ছিল না সত্যি।

রাম ডাক্তারকে আনবার ব্যবস্থা করুন তাহলে। বললাম হর্ষবর্ধন বাবুকে?

কল দিন তাঁকে এক্ষুনি। ডাকান কাউকে পাঠিয়ে।

ডাকলে কি তিনি আসবেন? তাঁর সংশয় দেখা যায়।

সে কি। বল পেলেই শুনেছি ডাক্তাররা বিকল হয়ে পড়ে না এসে পারে কখনো? উপযুক্ত ফী দিলে কোন ডাক্তার আসে না? কী যে বলেন আপনি।

ডেকেছিলাম একবার। এসেও ছিলেন তিনি। কিন্তু জানেন তো, আমার হাঁস মুর্গি পোর বাতিক। বাড়ির পেছনে ফাঁকা জায়গাটায় আমার কাঠ চেরাই কারখানার পাশেই পোলট্রির মতন একটুখানি করেছি। তা হাঁসগুলো আমার এমন বেয়াড়া যে বাড়ির সামনেও এসে পড়ে এক এক সময়। রাম ডাক্তারকে দেখেই না সেদিন তারা এমন হাঁক ডাক লাগিয়ে দিল যে….

ডাক্তারকেই ডাকছিল বুঝি?

কে জানে। তাদের আবার ডাক্তার ডাকার দরকর কি মশাই? তারা কি চিকিচ্চের কিছু বোঝে? মনে তো হয় না। হয়ত তার বিরাট ব্যাগ দেখেই ভয় খেয়ে ডাকাডাকি লাগিয়েছিল তারা, কিন্তু হাঁসদের সেই ডাক শুনেই না, গেট থেকেই ডাক্তারবাবু বিদায় নিলেন, বাড়ির ভেতরে এলেনই না আর। রেগে টং হয়ে চলে গেলেন একেবারে।

বলেন কি? শুনে আমি অবাক হই।

হ্যাঁ মশাই। তারপর আরো কতবার তাঁকে কল দেয়া হয়েছে মোটা ফীয়ের লোভ দেখিয়েছি। কিন্তু এ বাড়ির ছায়া মাড়াতেও তিনি নারাজ।

আশ্চর্য তো। কিন্তু এ পাড়ায় ভাল ডাক্তার বলতে তো উনিই। রাম ডাক্তার ছাড়া তো কেউ নেই এখানে আর…

দেখুন, যদি বুঝিয়ে সুঝিয়ে কোনো রকমে আপনি আপতে পারেন তাঁকে… হর্ষবর্ধন আমার অনুনয় করেন।

দেখি চেষ্টা চরিত্র করে, বলে আমি রাম ডাক্তারের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সত্যি একেকটা ডাক্তার এমন অবুঝ হয়। এই রাম ডাক্তারের কথাই ধরা যাক না।

সেবার পড়ে গিয়ে বিনির একটু ছড়ে যেতেই বাড়িতে এসে দেখবার জন্যে তাঁকে ডাকতে গেছি, কিন্তু যেই না বলছি, ডাক্তারবাবু, পড়ে গিয়ে ছড়ে গেছে যদি এসে একটু দয়া করে…

ছড়ে গেছে? রক্ত পড়ছে?

তা একটু রক্তপাত হয়েছে বই কি।

সর্বনাশ। এই কলকাতা শহরে পড়ে গিয়ে ছড়ে যাওয়া আর রক্তপাত হওয়া ভারি ভয়ংকর কথা, দেখি তো…

বলেই তিনি তার ডাক্তারি ব্যাগের ভেতরে থেকে থার্মেমিটারটা বার করে আমার মুখের মধ্যে গুঁজে দিলেন।

এবার শুয়ে পুড়ন তো চট করে। বলে আমার একটি কথাও আর কইতে না দিয়ে ঘাড় ধরে শুইয়ে দিলেন তার টেবিলের ওপরে।

শুয়ে পড়ুন। শুয়ে পড়ুন চট করে। আর একটি কথাও নয়।

মুখগহ্বরে থার্মোমিটার নিয়ে কথা বলব তার উপায় কি। প্রতিবাদ করার যো-ই পেলাম না। আর তিনি সেই ফাঁকে পেল্লায় একটা সিরিঞ্জ দিয়ে একখানা ইনজেকশন ঠুকে দিলেন আমায়।

ব্যাস। আর কোন ভয় নেই। অ্যানটি টিটেনাস ইনজেকশন দিয়ে দিলাম। ধনুষ্টঙ্কারের ভয় রইল না আর। বলে আমার মুখের থেকে থার্মোমিটার বার করলেন, করে দেখে বললেন জ্বরটরও হয়নি তো। নাঃ। ভয় নেই কোন আর। বেঁটে গেলেন এ যাত্রা।

মুখ ভোলা পেতে তখন আমি বলবার ফুরসত পেলাম–ডাক্তারবাবু; আমার তো কিছু হয়নি। আমি পড়ে যাইনি, ছড়ে যায়নি আমার। আমার বোন বিনিই পড়ে গিয়ে ছড়ে গেছে। কথাটা আপনি না বুঝেই…

ওঃ তাই নাকি? তা বলতে হয় আগে। যাক, যা হবার হয়ে গেছে। চলুন তাকেও একটা ইনজেকশন দিয়ে আসি তাহলে। ছড়ে যাবার পর ডেটল দেওয়া হয়েছিল? ডেটল কি আইডিন?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

তবে তো হয়েইছে। তবু চলুন, ইনজেকশনটা দিয়ে আসি গে। সাবধানের মার নেই, বলে কথায়।

বিবেচনা করে বিনির ইনজেকেশনের বিনিময়ে তিনি আর কিছু নিলেন না, আমারটার দাম দিতে হলো অবিশ্যি। প্লাস তার কলের দরুণ ভিজিট।

সেই অবুঝ রাম ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে আজ। বেশ ভয়ে ভয়েই আমি এগোই…বলতে কি।

বুঝে সুঝে পাড়তে হবে কথাটা, বেশ বুঝিয়ে সুঝিয়ে…যা অবুঝ ডাক্তার বাবা।

চেম্বারে ঢুকে দূর থেকেই তাঁকে নমস্কার জানাই।

ডাক্তারবাবু। আপনাকে কল দিতে এসেছি। কিন্তু নিজের জন্য নয়। আমার কোন অসুখ করেনি, কিছু হয়নি আমার। পড়ে যাইনি, ছড়ে যায়নি। আমাকে ধরে আবার ছুঁড়ে টুড়ে দেবেন না যেন সেই সেবারের মতন…।

বলে হর্ষবর্ধন বাবুর কথাটা পাড়লাম।

শুনেই না তিনি, আমাকে তেড়ে এসে ছুঁড়ে না দিলেও এমন তেড়ে খুঁড়ে উঠলেন যে আর বলবার নয়।

নাঃ, ওদের বাড়ি আমি যাব না। প্রাণ থাকতে নয়, এ জন্মে না। ওরা ভারি অভদ্দর

হর্ষবর্ধনবাবু অভদ্র। এমন কথা বলবেন না। ওঁর শত্রুতেও এমন কথা বলে না বলতে পারে ।

অভদ্র না তো কি? বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে অপমান করাটা কি দ্ৰতা না কি তাহলে?

আপনাকে বাড়িতে ডেকে এনে অপমান করেছেন উনি? বিশ্বাস হয় না, মশাই। আপনি ভুল বুঝেছেন। আপনি যা অ-বলতে গিয়ে অবুঝ কথাটা আমি চেপে যাই একেবারে।

উনি নিজে না করলেও ওঁর পোষা হাঁসদের দিয়ে করিয়েছেন। সে একই কথা হলো।

হাঁসদের দিয়ে অপমান? আমার বিশ্বাস হয় না।

হা মশাই। মিথ্যে বলছি আপনাকে? আমাকে দেখেই না তার সেই পাজী হাঁসগুলো এমন গালাগালি শুরু করল যে কহতব্য নয়।

হাঁসেরা গাল দিল আপনাকে? আরে মশাই, হাঁসকেই তো লোকে গাল দেয়। আমার বোন পুতুল এমন চমৎকার ডাক-রোস্ট রাধে যে কী বলব। গালে দিলে হাতে স্বর্গ পাই।

সে যাই বলুন, হর্ষবর্ধনবাবুর হাঁসগুলো তেমন উপাদেয় নয়। বিলকুল বিষতুল্য। আমাকে দেখেই না তারা কোয়াক কোয়াক বলে এমন গাল পাড়তে শুরু করল যে– বলতে বলতে তিনি রাঙা হয়ে উঠলেন ও কেন, আমি–আমি কি কোয়াক? আমি কি হাতুড়ে ডাক্তার নাকি? লোকে বললেই হলো?

ও। এই কথা। আমি ওঁকে আশ্বাস দিই? না মশাই না, হাঁসগুলো আপনার কোন গুপ্ত কথা ফাস করেনি, এমনিই ওরা হাঁসফাঁস করছিল। হর্ষবর্ধনবাবুর ওগুলো বিলিতি হাঁস কিনা, তাই ওই রকম ইংরেজী ভাষায় কথা বলে। ইংরেজীতে কোয়াক বলতে যা বোঝায় তা ঠিক ওর অর্থ নয়, বাঙালী হাঁস বলে ওই কথাটার মানে হতো মানে, বঙ্গ ভাষায় ওর অনুবাত করলে হবে, প্যাক, প্যাক।

প্যাঁক প্যাঁক? ঠিক বলছেন? তাহলে আর কোন কথা নেই। চলুন তবে।

বলে তিনি রাজি হলেন যেতে। দাঁড়ান, আমার ব্যাগটা গুছিয়ে নিই আগে এই ব্যাগ নিয়েই হয়েছে আমার যত হাঙ্গামা। এটাকে ব্যাগে নেওয়াই দায়। একেক সময় এমন মুশকিলে পড়তে হয় মশাই–

ব্যাগাড়ম্বর বেশি না করে–আমি বলতে যাই, বাধা দিয়ে তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন ও ব্যাগাড়ম্বর? বৃথা ব্যাগাড়ম্বর করছি আমি?

না না, সে কথা না। বলছিলাম যে—

কি বলছিলেন?

বলছিলাম, একটু ব্যগ্র হবেন দয়া করে। রোগীণীর অবস্থা ভারী কাহিল ছিল কিনা।

ব্যগ্রই হচ্ছি তো। ব্যাগ না হলে কি ব্যগ্র হই? এই ব্যাগের মধ্যেই তো আমার থামোমিটার, স্টেথিস্কোপ, রক্তচাপ মাপার যন্তর, ওষুধপত্তর যাবতীয় কিছু।

বলে সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে সব্যাগ হয়ে তিনি সবেগে আমার সাথে বেরিয়ে পড়লেন।

কিন্তু এক কদম না যেতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন একদম। পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে বকতে লাগলেন আমায় :

নাঃ, আমি যাব না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি যে আপনার ঐ কোয়াক কোয়াকই হোক আর পেঁক কেই হো, ওই হাঁসরা থাকতে ও বাড়িতে আমি পা দেব না প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। আমার শপথ আমি ভাঙতে পারব না। মাপ করবেন আমায়।

বলে তিনি বেঁকে দাঁড়ালেন।

এবং আর দাঁড়ালেন না। তারপর আর না এঁকে বেঁকে সোজা তিনি এগুলেন নিজের বাড়ির দিকে।

রাম ডাক্তার এমন অবুঝ, সত্যি।

অগত্যা, কী আর করা? সব গিয়ে খোলসা করে বললাম হর্ষবর্ধনকে। বললাম বউকে যদি বাঁচাতে চান তো বিদেয় করে দিন আপনার হাঁসদের। শুনে হর্ষবর্ধন খানিকক্ষণ গুম হয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেলেন ।

কাতব কান্তা কস্তে পুত্র। দারা পুত্র পরিবার তুমি কার কে তোমার-এ কে কার?…হাঁস কি আমার? হাঁসের কি আমি? হাঁস কি আমার সঙ্গে যাবে? দুনিয়ায় হাঁস নিয়ে কেউ আসে না, যদিও সবাই হাঁস ফাস করে মরে। হাঁস নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাবো? যাক গে হাঁস। রাখে রাম মারে কে? মারে রাম রাখে কে কার হাঁস কে পোষে। বলতে বলতে তিনি যেন পরমহংসের পরিহাস হয়ে উঠলেনঃ টাকা মাটি, মাটি টাকা যাক গে হাঁস। যেতে দাও। বিস্তর টাকায় কেনা হাঁসগুলো। বহুৎ টাকা মাটি হলো এই যা।

বলে খানিকক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে কী যেন ভাবলেন, তারপর ককিয়ে উঠলেন আবার : নাঃ বৌকে আমি হাসপাতালে পাঠাতে পারব না। তার চেয়ে হাঁসগুলোই বরং রসাতলে যাক।

তারপর গিয়ে তিনি পোলট্রির আগল খুলে দিয়ে খেদিয়ে দিলেন হাসদের। পাড়ার ছেলেদের সমবেত উল্লাসের মধ্যে তারা ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে চলে গেল।

হংসবিদায়ের খবরটা চেম্বারে গিয়ে জানাতে তারপরে ব্যাগ হস্তে ব্যগ্র হয়ে বেরুলেন আবার রাম ডাক্তার।

এলেন রাম ডাক্তার।

আসতেই হর্ষবর্ধন তার হাতে ভিজিট হিসেবে করকরে দুখানা একশ টাকার নোট ধরে দিয়ে তাকে নিয়ে গৃহিনীর ঘরে গেলেন। আমরাও গেলাম সাথে সাথে।

কি কষ্ট হচ্ছে আপনার বলুন তো? রোগীণীর শয্যাপার্শ্বে দাঁড়িয়ে শুধালেন রাম ডাক্তার।

মাথটা টনটন করেছ, দাঁত কনকন করছে, গা শিরশির করছে, তার ওপর পেট কামড়াচ্ছে আবার। জানালেন গিন্নি।

বটে? বলে রাম ডাক্তার মুখ ভার করে কী যেন ভাবলেন খানিক, তারপরে হর্ষবর্ধনকে টেনে নিয়ে বাইরে এলেন।

কেস খুব কঠিন মনে হচ্ছে আমার। গম্ভীর মুখ করে বললেন রাম ডাক্তার।

বউ আমার বাঁচাবে তো?

না না, ভয়ের কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে মারাত্মক কিছু ঘটনার আশঙ্কা করিনে। তবে এসব রোগী সাধারণতঃ দশজন রোগীর ন জনাই মারা যায়। একজন মাত্র বাঁচে কেবল।

তাহলে? হর্ষবর্ধনের আতঙ্ক এবার বেড়ে আরো যেন দশগুণ বেড়ে যায়।

অ্যাঁ, বলেন কি মশাই? তবে তো বউদির বাঁচানোর আর কোনই আশা নাই। গোবরা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে। বলে কাঁদতে থাকে।

ইনি বাঁচবেন। ভরসা দেন ডাক্তারবাবু ও এর আগে এই রোগে ন জন আমার হাতে মারা গেছে। ইনিই দশম। এঁকে মারে কে!..যাক আপনারা আমায় রুগীকে দেখতে দিন তো দয় করে এবার। ভাল করে পরীক্ষা করে দেখি আগে, বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন আপনারা। রুগীর ঘরে আসবেন না যেন এখন। বলে আমাদের ভাগিয়ে দিয়ে তিনি ভেতরে রইলেন।

আমরা তিনজন পাশের ঘরে এসে বসলাম। হর্ষবর্ধনের মুক ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আর গোবরার মুখ শুকিয়ে হয়েছে ঠিক নারকেলের ছোবড়ার মতই।

মাথা টনটন, দাঁত কনকন, পেট চনচন–শক্ত অসুখ বই কি। আমি বলি। আবহাওয়ার গুমোটটা কাটাবার জন্যই একটা কথা বলি আমি মোটের ওপর সেই গুমোটের ওপর। এর একটা হলেই রক্ষে নেই একসঙ্গে তিনটে।

ব্যামোটা বউদির শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে পড়েছে দাদা। গোবরা মন্তব্য করে : সারা গা শির শির করছে বলল না বৌদি?

শীরঃপীড়াই হয়েছে তো। আমিও একটু ডাক্তারি বিদ্যা ফলাই। মাতা টনটন করছে বললেন না?

রাম ডাক্তার দরজার গোড়ায় দাঁড়ালেন এসে উকো দিতে পারেন একটা আমায়? নিদেন একটা ছেনি?

হর্ষবর্ধন একটা উকো এনে দিলেন। ছেনিও।

উকো দিয়ে কি করবে দাদা? বউদির মাথায় উকুন হয়েছে নাকি? গোবরা শুধোয়ঃ উকো ঘষে ঘষে উকুনগুলো মারবে বলে বোধ হচ্ছে।

হতে পারে। আমার সায় তার কথায় ও তারাই হয়ত মাথায় কামড়াচ্ছে সেইজন্যই এই শিরঃপীড়াটা হয়েছে বোধ হয়।

হর্ষবর্ধন চুপ করে বসে রইলেন মাথায় হাত দিয়ে।

কিম্বা দাঁতের জন্যেও লাগতে পারে উকো। আমার পুনরুক্তি ও দাঁতে কেরিজ হয়ে থাকলে তাতেও দাঁতের যন্ত্রণা হয়। উকো দিয়ে ঘষেই সেই কেরিজ তুলবেন হয়ত উনি। দাঁত নেহাত ফ্যালনা জিনিস না মশাই। দাঁত ফেলবার পর তবেই দাঁতের মর্যাদা বুঝতে পারে মানুষ। খারাপ দাঁত থেকে হাজার ব্যাধি আসে। মাথা ব্যাথা, পেট ব্যথা, বকের ব্যামো, হজমের গোলমাল, এমনকি বাতের দোষও আসতে পারে ঐ দাঁতের দোষ থেকে।

রাম ডাক্তার আবার এসে উঁকি মারলেন দরজায়।

হাতুড়ি কিম্বা বাটালি জাতীয় কিছু আছে আপনাদের কাছে?

হর্ষবর্ধন হাতুড়ি এনে ডাক্তারের হাতে তুলে দেন।

হাতুড়ি নিয়ে কি করবে দাদা? আঁতকে ওঠে গোবরাঃ দাঁতের গোড়ায় ঠুকবে নাকি গো? দাঁতের ব্যথা সারতে দাঁতগুলোই সব না তুলে না ফ্যালে বউদির?

কি জানি ভাই? দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন দাদা?

লোকে রাম ডাক্তারকে কেন হাতুড়ে বলে থাকে কে জানে।

তার মানে তো পাওয়া যাচ্ছে হাতে হাতেই গোবরা হাতুড়ির সঙ্গে হাতুড়ের একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে চায়।

দাঁত না হয়ে মাথাতেও পিটতে পারে হাতুড়ি…বাধা দিয়ে আমি বলি ও শকট্রিটমেন্ট বলে একটা জিনিস আছে না?

দাদার শক যেমন। আপনার মতন হাতুড়ে লেখকের পরামর্শ শুনে হাতুড়ে ডাক্তার এনে নিজের শখ মেটান উনি এবার। গোবরা আমার কথার ওপর কথা কয় : বউদির মধুর হাসি আর দেখতে হচ্ছে না দাদাকে এ জন্মে নয়। হায় হায়, এই ফোকলা বউদি ছিল আমার বরাতে শেষটায় কি করব তার। সে হায় হায় করতে থাকে।

মাথায় হাতুড়ি ঠুকলে শিরঃপীড়া সারে বলে শুনেছি। তবুও আমি ভরসা দিয়ে বলতে যাই।

মাথা না থাকলে তো মাথা ব্যথাই থাকে না মশাই। হর্ষবর্ধন বলেন : শকট্রিটমেন্ট মানে হচ্ছে হঠাৎ একটা ঘা মেরে শক দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রোগ সারিয়ে দেওয়া। শক্ত রোগ যা তা নাকি।

তাতেই সেরে যায়। আমার বক্তব্য রাখি : রাম ডাক্তারের কোন কসুর নেই মশাই। যথাশক্তি করেছে বেচারা। তা যদি হয় তো আমার বলার কিছু নেই। হাল ছেড়ে দেন হর্ষবর্ধন। যথাসাধ্য করতে দিন ডাক্তারকে বাধা দেবেন না আপনারা। আমার কথাটর শেষে পুনশ্চ যোগ করি।

একটা করাত দিতে পারেন আমায়? ছোটখাট হলেও চলবে। দরজার সামনে আবার রাম ডাক্তারের আবির্ভার। হর্ষবর্ধনের কাঠ চেরাই করাতী কারখানায় করাতের অভাব ছিল না। এনে দিলেন একখানা। তারপরে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন তিনি? কি সর্বনাশ হবে কে জানে।

বউদির পেট কেটে ছেলেটাকে বার করবে বোধ হচ্ছে। গোবর্ধন পরিস্কার বলে?

বউদি কাটা পড়বে আর ছেলেটা মারা পড়বে, ডাক্তারের করাতে আমাদের বরাতে এই ছিল, যা বুঝতে পারছি।

বেঁচে যাবে আপনার বউ। আমি তাকে ভরসা দিই ও বড়ো বড়ো যাদুকর দেখেননি, করাত দিয়ে একটা মেয়েকে দু আধখানা করে কেটে ফ্যালে, তারপর সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দেয় আবার দ্যাখেননি কি? কেন, আমাদের পি সি সরকারের ম্যাজিকেই তো তা দেখা যায়। তেমনি ভেলকি দেখাতে পারেন বড় বড় ডাক্তাররাও তারাও কেটে জোড়া দিতে পারেন।

কিন্তু হর্ষবর্ধন আর চুপ করে ব েথাকতে পারেন না, লাফিয়ে ওঠেন হঠাৎ আমার চোখের সামনে বউটাকে করাতচেরা করবে আর আমি বসে বসে তাই দেখব। লোকটা পেয়েছে কি? বলে তিনি ঝড়ের বেগে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেন। গোবর্ধনও সাথে সাথে যায়। চকরবরতি আমি তাদের পশ্চাদ্বর্তী হই।

কি পেয়েছেন আপনি? ঝাঁঝিয়ে ওঠেন তিনি ডাক্তারের ওপর : করাত দিয়ে আমার বউকে কাঠবেন যে? কেটে দু-কুটরো করবেন আপনি? কেন? কেন? যতই কাঠের ব্যবসা করি মশাই, এতটা আকাট হইনি এখনো কেন, কি হয়েছে আমার বউয়ের যে করাত দিতে তার

কিসের বউ! বাধা দেন ডাক্তার ও আমি পড়েছি আমার ব্যাগ নিয়ে। বউকে আপনার দেখলাম কোথায়। হতভাগা ব্যাগটা একেক সময় এমন বিঘড়ে যায়। হাতুড়ি পিটে, ছেনি দিয়ে উকো ঘষে কিছুতেই এটাকে খুলতে পারছি না। করাত দিয়ে কাটতে লেগেছি এবার। এর মধ্যেই তো আমার যন্তরপাতি, ওষুধপত্র, এমনকি থার্মোমিটারটি পর্যন্ত। আগে এসব বার করলে তবে তো দেখব আপনার বউকে। রাজ্যের রোগ সারাই আমি কিন্তু নিজের ব্যাগ সারাতে পারি না। এই ব্যাগটাই হয়েছে আমার ব্যায়াম।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments