কালো পাথর – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

কালো পাথর - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

প্রেতাত্মা নিয়ে আসর বসানো অরুণেন্দুর হবি। এই আসরে মৃত মানুষের আত্মার আবির্ভাব হয় কোনো জীবিত মানুষের মাধ্যমে, যাকে বলা হয় মিডিয়াম। অরুণেন্দু নিজে কিন্তু মিডিয়াম নয়, নিছক উদ্যোক্তা। মিডিয়াম সবাই হতে পারে না। অরুণেন্দুর মতে সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের অধিকারী এবং খুব অনুভূতিপ্রবণ মানুষই মিডিয়াম হবার যোগ্য। পুরুষের তুলনায় এ ক্ষমতাটি মেয়েদের বেশি। তাই মেয়েদের মধ্যেই সে মিডিয়াম খোঁজে। পেয়েও যায়। অশরীরী আত্মা আনতে দেরি করে না। অরুণেন্দু দাবি করে, শতকরা নব্বইটি আসরে তার সাফল্যের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই আসরকে ইংরেজীতে বলা হয় Seance-এর আসর। ..

আসর যখন তখন যেখানে বসানো যায় না। পরিবেশ নির্জন এবং স্তব্ধ হওয়া চাই। আসরের লোকগুলোরও বিশ্বাস থাকা চাই দেহাতীত সত্তায়। তবে আত্মার আবির্ভাবের গ্যারান্টি দিতে অরুণেন্দু রাজি, যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের রাতে কোনো নিরিবিলি বাড়িতে আসর বসানো যায়।

সেদিন এই রকম একটা অবস্থা দেখা দিয়েছিল চব্বিশে অক্টোবর রাত দশটায়, বঙ্গ-বিহার সীমান্তে খনি এলাকায় বারাহিয়া টাউনশিপে, ডঃ কুসুমবিহারী রায়ের বাড়িতে। ডঃ রায় খনি ও ধাতুবিশেষজ্ঞ সরকারি অফিসার। অরুণেন্দু সম্পর্কে তার ভাগ্নে। যখনই বেড়াতে আসে, প্রেততত্ব নিয়ে বকবক করে সারাক্ষণ।

রাতের খাওয়ার পর বাইরের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন ডঃ রায়, তার স্ত্রী মীনাক্ষী, একমাত্র সন্তান মঞ্জুশ্রী, তার হবু বর সুমন আর অরুণেন্দু। সেই সময় হঠাৎ বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি এসে গেল। তার মধ্যে লনের ওধারে গেট খুলে দৌড়ে এল দুটি মেয়ে, অনুরাধা আর ভাবনা দুই বন্ধু। মঞ্জুশ্রীরও বন্ধু। বেড়াতে বেরিয়ে আচমকা প্রকৃতির তাড়া খেয়ে আশ্রয় নিতে এল।

ভাবনা গুজরাটি মেয়ে। তার বাবা কেশবলাল শান্তপ্রসাদ স্থানীয় ব্যবসায়ী। ভাবনার জন্ম বারাহিয়ায়। তাই সে বাংলাও বলে মাতৃভাষার মতো।

বৃষ্টির ছাঁট এসে সবাইকে বিব্রত করছিল। তাই ডাইনিং-কাম-ড্রয়িংরুমে যাওয়া হল। অনুরাধা ও ভাবনা যে-যার বাড়িতে ফোনে জানিয়ে দিল মঞ্জুশ্রীদের বাড়িতে আটকে পড়েছে। চিন্তার কারণ নেই। ডঃ রায় গাড়ি করে পৌঁছে দেবেন তাদের।

কফির আসর বসল এবার। অরুণেন্দু কিছুক্ষণ আগে সিয়াস (Seance) নিয়ে আলোচনা করছিল। ডঃ রায় ওসব বিশ্বাস করেন না। কিন্তু মা ও মেয়ে করে। তারা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। সুমন হা বা না কিছুই বলছিল না। সে বরাবর মধ্যপন্থী সব ব্যাপারে। কফির আসরে আরও দুজনকে পেয়ে অরুণেন্দু আগের কথাটার জের টেনে আনল। অনুরাধা ও ভাবনার চোখে ফুটে উঠল চাপা ভয় ও বিস্ময়। বাইরে ঝড় বৃষ্টি, মেঘের গর্জন যেন অশরীরী আত্মারা আত্মপ্রকাশের জন্য অস্থির হয়ে, জীবিত মানুষের আনাচেকানাচে ছোঁক ছোঁক করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মঞ্জুশ্রী বলল, তাহলে অরুদা, এই তো তোমার মতে উপযুক্ত সময়।

তার মা মীনাক্ষী হাসতে হাসতে বললেন, খুব হয়েছে, আত্মাটাত্মা ডেকে, এখন কাজ নেই। মুখেই বলল অরু, শুনতে বেশ লাগছে।

ভাবনা একটু হাসল হঠাৎ। না মাসিমা। আমরা পরীক্ষা করে দেখি না, যদি সত্যি আত্মা আসে।

ডঃ রায় হাই তুলে বললেন, ও কে! তোমরা আজ্ঞা দাও। আমি একটু পড়াশোনায় বসি এবার। অনু, ভাবনা-চিন্তা কোরো না। পৌঁছে দেবখন, যত রাতই হোক।

তার পেছন-পেছন মীনাক্ষীও চলে গেলেন। ছেলেমেয়েদের মধ্যে আর আড্ডা দেওয়া শোভন নয়। ওরা হয়তো মন খুলে কথা বলতে পারছে না। বিশেষ করে। সুমন ও মঞ্জুশ্রীর কথা ভেবেই উঠে গেলেন মীনাক্ষী।

সুমন চোখ নাচিয়ে বলল, কী অরুদা, হবে নাকি?

অরুণেন্দু পা বাড়িয়েই ছিল। অনুরাধার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার আপত্তি নেই তো?

অনুরাধা আস্তে মাথাটা দোলাল।

অরুণেন্দু তার দিকে তাকিয়েই রইল মিনিট-খানেক। তারপর রহস্যময় হেসে বলল, আমার বিশ্বাস, মিডিয়াম, হবার যোগ্যতা এখানে একমাত্র আপনারই আছে।

ভাবনা বলল, কি করে বুঝলেন বলুন তো?

অরুণেন্দু বলল, ওটা আমার ইনটুইশান বলতে পারেন। দশবছর ধরে এসব নিয়ে আছি। দেখামাত্র বুঝতে পারি কে ভাল মিডিয়াম হতে পারে। অনুরাধা প্লিজ আপত্তি করবেন না কিন্তু।

অনুরাধা মৃদুস্বরে বলল, আমাকে কী করতে হবে?

অরুণেন্দু উঠে দাঁড়িয়ে বল্ল, ডাইনিং টেবিলে চলুন সবাই বলছি। আর মঞ্জু একটা হাল্কা পেন্সিল আর একটা কাগজ চাই। ঝটপট! সময় চলে যাচ্ছে। আর একটা মোম চাই।

সঙ্গে সঙ্গে জোগাড় হয়ে গেল। কিচেন বন্ধ করে ফেলু ঠাকুর আর পরিচারিকা সুশীলাকে নিজেদের ঘরে পাঠানো হল। দরজা ও জানালাগুলো বন্ধ করে, অরুণেন্দু মোমবাতি জ্বেলে টেবিলে রাখল। বাইরের প্রাকৃতিক আলোড়ন খুব চাপা শোনাচ্ছিল এবার। ফ্যান বন্ধ করলে ঘরের ভেতরটা গুমোট হয়ে উঠল। কিন্তু উপায় নেই।

সে অনুরাধাকে টেবিলের একদিকে একা বসাল। অন্যদিকে পাশাপাশি বসল সুমন, ভাবনা, মঞ্জুশ্রী আর সে। অনুরাধার হাতে পেন্সিল ও কাগজটা দিয়ে সে বলল, পেন্সিলটা কাগজের ওপর আলতো ভাবে রাখুন। তারপর কী করতে হবে বলছি।

অরুণেন্দু খুব চাপা গলায় বলতে থাকল, এবার আমরা সবাই মিলে এমন একজন মৃত মানুষের কথা, চিন্তা করব, যাকে আমরা প্রত্যেকে চিনি। চিনি মানে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও পরোক্ষ ভাবে চিনি। অর্থাৎ জানি। যেমন রবীন্দ্রনাথ। আমি টেবিলে সংকেত করব। সঙ্গে সঙ্গে গভীর মনোযোগে রবীন্দ্রনাথের কথা চিন্তা করতে হবে। অনুরাধা আমাদের আসরের মিডিয়াম। রবীন্দ্রনাথের আত্মা তার মধ্যে আসবেন। অনুরাধা, প্লিজ বি ভেরি কেয়ারফুল। তিনি এলে আপনার পেন্সিল কেঁপে উঠবে কিংবা অন্য কোনো ভবে টের প্রানে সেটা। আপনার আঙুল যদি লিখতে চায় জোর করে বাধা দেবেন না কিন্তু। এটা একটা সিরিয়াস এবং কঠিন ব্যাপার-মানে, আপনার সচেতন মন অন্যের অনুভূতি-চিন্তা কাজকে বাধা দিতে চাইবে। আপনি নিষ্ক্রিয় থাকার চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, আপনার এই মানসিক অবস্থার ওপর আসরের সাফল্য নির্ভর করছে। কেমন?

অনুরাধা তাকিয়ে রইল নিষ্পলক চোখে। মোমের আলোয় তাকে যেন দূরের মানুষ মনে হচ্ছিল অন্যদের। সুমনের ঠোঁটের কোণায় সুক্ষ্ম হাসি ছিল এতক্ষণ। সেটা মিলিয়ে গেল। ভাবনাও গম্ভীর হয়ে পড়ল। মঞ্জুশ্রীর মুখে ভয় ও বিস্ময় ছিল। তাকেও এবার শান্ত দেখাল।

— অরুণেন্দু বলল, রেডি। আমরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রতীক্ষা করছি। বলে সে টেবিলে আঙুলের শব্দ করল।

বাইরে মেঘ ডাকল সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটা কেঁপে উঠল। মোমের শিখা স্থির জ্বলছে। ঘরে স্তব্ধতা ও ভ্যাপসা গরম। আবছা শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ক্রমশ শোনা যেতে থাকল। দুমিনিট পরে দেখা গেল অনুরাধার হাতের পেন্সিল কঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে কাগজের ওপর কিছু লেখা হল।

পেন্সিল থামলে অরুণেন্দু আস্তে কাগজ আর পেন্সিলটা অনুরাধাকে না ছুঁয়ে তুলে নিল। কিছু লেখা নেই। আঁকাবাঁকা একটা রেখা মাত্র।

অরুণেন্দু লিখল : আপনি কে? তারপর কাগজটা আস্তে এগিয়ে পেন্সিলটা অনুরাধার হাতে গুঁজে দিল। অনুরাধার হাত তেমনি পেন্সিল ধরার ভঙ্গিতে টেবিলে রাখা আছে।

আবার পেন্সিলটা কাঁপল। তারপর লেখা হতে থাকল। পেন্সিল থামলে অরুণেন্দু কাগজ ও পেন্সিলটা তেমনি আস্তে তুলে নিল। লেখা হয়েছে : আমি সুদীপ্ত।

অরুণেন্দু লেখাটা নিঃশব্দে দেখাল অন্যদের। অনুরাধা ছাড়া সবারই মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের কথা ভেবেছিল সবাই। সুদীপ্ত এসে গেল!

এর পর অরুণেন্দুর প্রশ্ন এবং অনুরাধার জবাব লেখা হতে থাকল পালাক্রমে।

তা হল এই :

আপনাকে আমরা ডাকিনি।

আমার কথা আছে।

বলুন।

থাক। আমি যাই।

কেন?

পিট নং ৩৪৭ ..

তার মানে?

কালো পাথর।

কিছু বুঝলাম না।

মোহান্তজী।

এসব কী বলছেন?

যাচ্ছি।

অনুরাধার আঙুল থেকে কাগজ-কলম টেনে নিতে হাত বাড়াল অরুণেন্দু, সেই সময় হঠাৎ টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল অনুরাধা। ভাবনা আতঙ্কে অস্ফুট চীৎকার করে উঠল। অরুণেন্দু ডাকল, অনুরাধা! অনুরাধা!

অনুরাধা অজ্ঞান হয়ে গেছে। সবাই উঠে দাঁড়াল। সুমন ঝটপট সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল। মঞ্জুশ্রী কিচেন থেকে জল নিয়ে এল গ্লাসে। অরুণেন্দু অনুরাধার মুখে জল ছিটিয়ে দিল। ভাবনা তাকে ধরে সোজা করে বসিয়ে দিয়েছে ততক্ষণে।

তারপর অনুরাধা চোখ খুলল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

গণ্ডগোল শুনে ডঃ রায় এবং মীনাক্ষীদেবী পাশের ঘর থেকে ছুটে এলেন। অরুণেন্দুকে একটু বকাবকি করলেন। ভাবনা বলল, অনু, তোমরা কি হয়েছিল?

অনুরাধা আস্তে বলল, জানি না। হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠল।

সুমন জানালাগুলো খুলে দিলে ঘরের ভেতরকার গুমোটভাবটা চলে গেল। বাইরে ঝড়ের প্রকোপ লেগেছে। কিন্তু বৃষ্টি পড়ছে সমানে। অরুণেন্দু কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে অদ্ভুত হাসি। সে বলল, সিয়াসের আসরে অনেক সময় এমন হয়েই থাকে অবশ্য। মিডিয়াম নিজেও ভয় পেয়ে যায়। তার একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও আমি দিতে পারি। তবে

ডঃ রায় কপট ধমক দিয়ে বললেন, থাক। তারপর হো হো করে হাসলেন। কবে অশরীরী এসে তোমারই ঘাড় মটকাবে দেখবে।

মীনাক্ষী বললেন, মনু, সুস্থবোধ করছ তো?

অনুরাধা একটু হাসল। আমি ঠিক আছি, মাসিমা।

বাইরের বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখে এসে ডঃ রায় বললেন, এখন বেরুনো যায়। অনু ভাবনা, এস–গ্যারাজ থেকে গাড়ি বের করি।

ভাবনা বলল, এক মিনিট। মেসোমশাই, সিয়াসের আসরে কে এসেছিল জানেন? সুদীপ্ত।

ডঃ রায় চমকে উঠলেন। সুদীপ্ত!

ধাতু গবেষণা কেন্দ্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট রিসার্চ অফিসার ছিল সুদীপ্ত। কিছুদিন আগে সে খুন হয়ে গেছে। তাই সকলের অবাক হবারই কথা।

ডঃ রায় অরুণেন্দুর হাত থেকে কাগজটা নিলেন। অরুণেন্দু কাগজটার দিকে তাকিয়ে ছিল। কাগজটা নিয়ে চোখ বুলোতে ডঃ রায়ের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছিল। পড়া শেষ হলে গম্ভীর মুখে বললেন, এটা আমার কাছে থাক, অরু! ভাবনা এস। অনু তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।

সুমন বলল, আমি ওদের পৌঁছে দিতে পারতাম। বৃষ্টির মধ্যে আপনি কষ্ট করে–

ডঃ রায় বললেন, তুমি তো উল্টোদিকে যাবে। তাছাড়া রাত হয়ে গেছে। অতখানি পথ তোমাকে ফিরতে হবে।

ডঃ রায় বেরিয়ে গেলেন। তাদের বিদায় দিতে গেল মঞ্জুশ্রী আর তার মা। মা ও মেয়ের মুখে আতঙ্ক ও উদ্বেগের ছাপ লেগে রয়েছে।

অরুণেন্দু গুম হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সুমন একটু হেসে বলল, কী অরুদা? কী ভাবছ?

অরুণেন্দু হাসল। চাপা গলায় বলল, ব্যাপারটা আমার নিজেরই খটকা লাগছে।

কেন বলো তো?

আমার অভিজ্ঞতায় কখনও সিয়াসের আসরে সদ্যমৃত কেউ আসেনি। তার চেয়ে বড় কথা অপঘাতে মৃত কোনো মানুষের আত্মা আসে বলেও জানি না। প্রেততত্ত্বের বহু বই পড়েছি। কোথাও পড়িনি, অপঘাতে মৃতরা আসে। কারণ কী জানো? অরুণেন্দু চাপা গলায় বলতে লাগল। তার মুখে উত্তেজনা থমথম করছে।..কারণ যারা অপঘাতে মারা পড়ে, তারা ভীষণ যন্ত্রণায় ভোগে অনন্ত কাল। মৃতদের জগতে কয়েকটা স্তর আছে। অপঘাতে মৃতরা সেই সব স্তরের বাইরে কোথাও স্থান পায়। সেখান থেকে যদি বা কেউ বস্তুজগতে এসে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠে। তাই ভগবান বা প্রকৃতি, যিনিই হোন, তাদের স্বাভাবিক পারলৌকিক স্তরগুলোতে রাখার ব্যবস্থা করেননি। ..

সুমন বলল, বাপস্। মাথাটা আর বিগড়ে দিও না অরুদা! তাছাড়া এসব শুনলে এ রাতে আর বাড়ি ফেরা কঠিন হবে। মাইণ্ড দ্যাট, পাঁচ কিলোমিটার দূরে থাকি।

অরুণেন্দু বলল, সুদীপ্তকে তুমি চিনতে, সুমন?

সুমন উঠে দাঁড়াল। অল্পস্বল্প। তবে ওর কথা আর নয়। দেখি বৃষ্টি কমল নাকি।…

.

০২.

বারাহিয়া টাউনশিপে জল সরবরাহ করা হয় ফুলঝরিয়া লেক থেকে। লেকের প্রাকৃতিক দৃশ্য অপূর্ব। চারিদিকে টিলাপাহাড় আর জঙ্গল। এক দিকটায় সুন্দর পার্ক করা হয়েছে সমতল জমির ওপর। পার্কে বিকালের দিকে অনেকে বেড়াতে আসে। ছাব্বিশে অক্টোবর বিকেলে পার্কের দক্ষিণপূর্ব কোণে বিশাল ম্যাকটামের মেঝের পাশে একটা বেঞ্চে বসে কথা বলছিল সুমন আর মঞ্জুশ্রী। সুমনের গাড়ি পার্কের উত্তরে ওয়াটার পাম্পিং সেন্টারের পেছনে রাখা ছিল। পার্কটা লেকের দক্ষিণে। ওরা সেখানে বসে ছিল, সেখান থেকে বাঁদিকে একটা ন্যাড়া টিলা লেকের কিনারা থেকে উঠে গেছে। টিলাটার গায়ে বড় বড় পাথর। কথা বলতে বলতে মঞ্জুশ্রী হঠাৎ সেদিকে তাকাল। তারপর বলল, আরে! অনু ওখানে কী করছে?

সুমন ঘুরে দেখে বলল, বেড়াতে এসেছে কারুর সঙ্গে! ছেড়ে দাও।

না, না একা।

সুমন হাসল। একা নয়। বাজি রাখছি, ওর প্রেমিক আড়ালে বসে আছে।

অনু ওদিকে কোথায় যাচ্ছে?

প্রেমিকের কাছে।

মঞ্জুশ্রী বলল, ভ্যাট! খালি প্রেমিক আর প্রেমিক!

তাছাড়া আর কে থাকবে মঞ্জু, এই সুন্দর দিন শেষে নিরিবিলি ফুলঝরিয়া লেকের ধারে- সুমন খুব আবেগে হবু স্ত্রীকে চুম খাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না।

মঞ্জুশ্রী নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, তুমি বড়বেশি সাহসী হয়ে উঠেছ অশকারা পেয়ে।

সুমন মুখ এগিয়ে দিয়ে বলল, প্লিজ মঞ্জু! ফুলঝরিয়া একটা চুমুর প্রত্যাশা করে! তার খাতিরে।

মঞ্জুশ্রী হেসে ফেলল তার কথাবলার ভঙ্গি দেখে। দ্রুত এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে সুমন অথবা এই সুন্দর লেকের প্রত্যাশা পূর্ণ করতে গিয়ে হঠাৎ চমক খাওয়া গলায় সে বলল, এই, এই, অনু দৌড়ে যাচ্ছে কে-দেখ, দেখ!

আঃ! বলে সুমন ঘুরল ওদিকে। তারপর সেও অবাক হল।

অনুরাধাকে খুব স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে। টিলাটার ওপর শেষ বেলার রোদ ঝকমক করছে। সে টিলার ওদিকে নেমে গেল। মিনিট দুয়ের মধ্যে তার দৌড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে অস্বাভারিকতা ছিল।

সুমন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, একটু বসবে তুমি? আমি দেখে আসি কী ব্যাপার।

চলো আমিও যাই।

পারবে না। দেখছ না ভীষণ চড়াই, আর পাথরে ভর্তি?

শীগগির ফিরে আসবে কিন্তু। আমার একা থাকতে ভয় করবে।

তুমি বরং গাড়িতে গিয়ে বসো, এই নাও চাবি।

গাড়ির চাবি দিয়ে সুমন হন্তদন্ত এগিয়ে গেল। মঞ্জুশ্রী পার্কের গেটের দিকে হাঁটতে থাকল। পার্কে আজ তত লোক নেই তাদের মতো জোড়ায়-জোড়ায় কিছু প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রবীণ দম্পতি, আর কিছু নিঃসঙ্গ লোক চুপচাপ বসে আছে। ছড়িয়ে-ছাটিয়ে।

সুমন টিলার পাথর বেয়ে সোজা উঠে যাচ্ছিল। তার মাউন্টেনিয়ারিং ট্রেনিং নেওয়া আছে। আগের অক্টোবরে সে কামেট শৃঙ্গ অভিযানে গিয়েছিল। দুর্যোগের জন্য দলটাকে ফিরে আসতে হয়। এবার আবার গেছে। কিন্তু সুমনকে যেতে দেননি ওর মা। মায়ের একমাত্র ছেলে। বাবা বেঁচে নেই। কিন্তু প্রচুর পয়সা রেখে গেছেন ছেলের জন্য। গোটা তিনেক অভ্র খনির মালিক ছিলেন সুমনের বাবা। এখন খনিগুলো পরিত্যক্ত। তবে সুমন নিষ্কর্মা নয়। সে চাটার্ড অ্যাকাউন্টাষ্ট। বারাহিয়ার্স ইস্পাত কারখানার ম্যানেজমেন্ট দপ্তরের অ্যাকাউন্টস অফিসার।

সুমন অনুরাধাকে ডেকে সাড়া পাচ্ছিল না। টিলার দক্ষিণপূর্বে দিকে নেমে যেতে দেখেছে তাকে। নিচে ওদিকেও প্রকাণ্ড সব পাথর পড়ে রয়েছে। তার ফাঁকে ঝোপ ঝাড় সাজিয়েছে। একটা জলের ধারা মোটামুটি সমতল উপত্যকার মতো মাঠ ঘিরে ঝর্ণার আকারে লেকের পূর্ব দিকে মিশেছে। তার বুক জুড়ে পাথর। সড় সড় শব্দে জল ঝরে পড়ছে নিচের ডোবামতো একটা জায়গায় এবং ডোবাটা লেকেরই একটা অংশ হয়েছে।

একজন অচেনা লোক ডোবাটায় ছিপ ফেলে বসে আছে। মাথায় টুপি। পরনে। ধূসর জ্যাকেট, আর প্যান্ট। সুমন আবার অনুরাধা বলে ডাকতেই সে মুখ ফেরাল। মাথার টুপিটা পড়ে গিয়ে টাক চকচক করে উঠল। টুপিটা কুড়িয়ে নিল সে।

এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। মুখে সাদা ঋষিসুলভ দাড়ি। টকটকে ফর্সা রঙ। যেন আশু সান্তাক্লজ। গলায় একটা বাইনোকুলার ঝুলছে। পাশে পাথরের ওপর পড়ে আছে। একটা ক্যামেরা কিটব্যাগ, আর ছড়ির মতো দেখতে একটা সবুজ রঙের মাথায় পরানো ছোট্ট জাল।

সুমন বলল, এদিকে একটা মেয়েকে আসতে দেখেছে।

শান্তা ক্লজ বললেন, কৈ, না তো!

সুমন এদিক-ওদিক তাকিয়ে অনুরাধাকে খুঁজতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ গেল খানিকটা দূরে পাথরের আড়ালে কী একটা রঙীন জিনিস যেন। সে সেদিকে দৌড়ে গেল।

ঝর্ণার ডোবা থেকে আন্দাজ একশো মিটার দুরে কয়েকটা পাথর আর ঝোপের ভিত্র একটা বড় গর্ত। গর্তে জল জমে আছে। আগের রাতের বৃষ্টিটাই এই জল জমার কারণ। সুমন যে রঙিন জিনিসটা দেখতে পেয়েছিল, সেটা অনুরাধার শাড়ির আঁচলের একটা অংশ। গর্তে জলের ভেতর মুখ গুঁজে পড়ে আছে অনুরাধা। তার পিঠের ডানদিকে চাপচাপ টাটকা রক্ত। রক্তে গর্তের জল লাল হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

সুমন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বোধ বুদ্ধি ফিরে আসতে লাগল। তারপর সে পিছিয়ে এল কয়েক পা। তার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল–সে আর ওদিকে তাকাতে পারছিল না।

মৎস্যশিকারী বৃদ্ধ এদিকে তাকিয়ে ছিলেন। এবার উঠে দাঁড়ালেন। তার পা ফেলার ভঙ্গিতে সুমন বুঝতে পারছিল ভদ্রলোককে যতটা বৃদ্ধ মনে করেছিল, ততটা হয়তো নন। যুবকের মতো শক্তসমর্থ যেন। কাছে এসে বললেন, সামথিং হ্যাড ইয়ং ম্যান?

সুমন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল অনুরাধাকে।

বৃদ্ধ ভদ্রলোক চমকে উঠে দ্রুত এগিয়ে গেলেন গর্তটার দিকে। তারপরে অস্ফুটস্বরে বললেন, মাই গুডনেস! আমার মাত্র একশো মিটার পেছনে।

তারপর ঘুরে সুমনকে বললেন, এরই খোঁজেই আসছিলেন কি?

আজ্ঞে হ্যাঁ। সুমন আড়ষ্টভাবে জবাব দিল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

আপনার কি নাম! কোথায় থাকেন? এই মেয়েটি কে?

সুমন ব্যানার্জি। থাকি বারাহিয়ার নিউ কলোনিতে। সুমন ঢোক গিলে বলল, এ অনুরাধা।

কুইক। এখনই বারাহিয়া থানায় গিয়ে খবর দিন। আমি থাকছি এখানে। ইন্সপেক্টর মিঃ মোহন শর্মা থাকলে তাকে বলবেন, কর্নেল আছে ডেডবডির কাছে।

সুমন একটু অবাক হল। কর্নেল? কর্নেল কী…মানে আপনার পুরো নামটা…

বৃদ্ধ একটু হাসলেন। আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

সুমন হন্তদন্ত এগিয়ে গেল। এবার টিলার দিকে নয়, উত্তরদিকটা ঘুরে সহজ পথে।…

.

০৩.

এই শরৎকালে বারাহিয়া এলাকায় বেড়াতে এসে হত্যারহস্য নিয়ে মাথা ঘামানোর ইচ্ছে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের এতটুকু ছিল না। কিন্তু চেঁকি স্বর্গে গেলেও তাকে ধান ভানতে হয় এটাই চেঁকির নিয়তি। ফুলঝরিয়া লেকের আশেপাশে সকালে একজাতের প্রজাপতি দেখেছিলেন। তাছাড়া লেকের পূর্বপ্রান্তে ঝর্ণার মোহানায় ছোট্ট জলাশয়ে ছিপ ফেলে বিকেলটা কাটানো লোভনীয় মনে হয়েছিল। কল্পনাও করেননি, তাঁর মাত্র একশো মিটার পেছনে এইভাবে একটা সাংঘাতিক হত্যাকাণ্ড ঘটে যাবে–নিয়তি যেন তার সঙ্গে একটা কদর্য পরিহাস করে বসল।

নিহত মেয়েটির নাম অনুরাধা সান্যাল। তার বাবা পরিতোষ সান্যাল স্থানীয় সরকারি শিল্পসংস্থার কর্মিদফতরের অফিস সুপারিন্টেন্টে। আর এক বছর পরে রিটায়ার করবেন। তার কাছে পুলিশ এমন কোনও সূত্র পায়নি, যাতে অনুরাধার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রণয়-প্রতিহিংসা বা এধরনের কোনও ব্যাপার আছে বলে মনে হবে। অনুরাধা নাকি সাদাসিধে আর মুখচোরা স্বভাবের মেয়ে ছিল। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে ডঃ কুসুমবিহারী রায়ের মেয়ে মঞ্জুশ্রী আর শান্তপ্রসাদজীর মেয়ে ভাবনা। তারাও পুলিশকে কোনও সূত্র দিতে পারেনি। মঞ্জুশ্রী যা বলেছে, তাতে সুমন ব্যানার্জীর অ্যালিবাই সঠিক সাব্যস্ত হয়েছে। তারা দুজনেই দেখেছিল, অনুরাধা দৌড়ে টিলা বেয়ে ওপাশে নেমে যাচ্ছে। শুধু এটুকু বোঝা যায়, কেউ তাকে তাড়া করে গিয়ে ছুরি মেরেছে। সুমনের বক্তব্য হল অনুরাধার ওভাবে দৌড়ানোটা তার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। তাই সে খোঁজ নিতে গিয়েছিল হন্তদন্ত হয়ে।

যে গর্তে অনুরাধার বডি পড়ে ছিল, তার চারপাশে মাটিতে ঘন ঘাস। তাই তাদের ছাপ পাওয়া অসম্ভব। টিলাটার ঢালু অংশে মাটি পাথুরে। আগের রাতে বৃষ্টি হলেও পায়ের বা জুতোর ছাপ পড়ার মতো নরম হয়নি মাটিটা। অন্তত পুলিসের চোখে পড়েনি কোনো ছাপ।

ইন্সপেক্টর শর্মাজী সকালে সেচ দপ্তরের বাংলোয় এসে কর্নেলকে এইসব কথা জানিয়ে গেছেন। তার সিদ্ধান্ত হল ফুলঝরিয়া লেকের ওদিকে খুনোখুনি না হলেও মেয়েদের প্রতি মস্তানদের দৌরাত্মের অভিযোগ ইতিপূর্বে পাওয়া গেছে। অনুরাধাকে সম্ভবত কোনো মস্তানই রেপ করার জন্য তাড়া করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে রাগের চোটে ছুরি মেরে পালিয়ে গেছে। ইণ্ডাস্ট্রিয়াল এলাকার দুবৃত্তরা খুব সহজেই ছুরি চালাতে ওস্তাদ।

সিদ্ধান্তটা তত টেকসই অবশ্য নয়। তবু পুলিশের নিজস্ব কিছু প্রবণতা ও পদ্ধতি আছে এসব কেসে। তাছাড়া আজকাল যথেষ্ট খুনোখুনির দরুন পুলিশ আগের মতো মাথা ঘামাতে চায় না। রুটিন ডিউটি সেরে নেয় মাত্র।

কর্নেলেরও মাথা ঘামাবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু তার মাত্র একশো মিটার দূরত্বে একটা হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে, ওটাই তার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সারারাত ভাল ঘুমোত পারেননি। বারবার মনে হয়েছে, এ যেন একটা সাংঘাতিক ধৃষ্টতার সামিল। সামরিক জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হিসেবে তার অভিজ্ঞতাটি বিরাট। ইদানিং তিনি হত্যারহস্য ছেড়ে প্রকৃতি রহস্যে মন দিয়েছিলেন। অথচ নিয়তি প্রতি পদক্ষেপে তার সামনে একটা রক্তাক্ত মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলে তার সঙ্গে কুৎসিৎ রসিকতা করে চলেছে।

কর্নেল বাংলোর বারান্দায় বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলেন, কোন পথ ধরে এগিয়ে যাবেন, অনুরাধার জীবনের ব্যাকগ্রাউণ্ড জানার জন্য কি তাদের বাড়িতে যাবেন, নাকি সেই টিলার কাছে গিয়ে আততায়ীর কোনও চিহ্ন খুঁজে বের করবেন। আজ সকালে ছুরিটা অবশ্য গর্তের জলের খুঁজে পেয়েছে পুলিস। কিন্তু জলে ধুয়ে গৈছে ছুরির বাঁটে আততায়ীর হাতের ছাপ এবং গন্ধ। তবে অন্য কোনও চিহ্ন কি মিলবে না যা আততায়ী সম্পর্কে একটু অন্তত আভাস দেয়!

বাংলোর গেট দিয়ে এক যুবতীকে আসতে দেখে কর্নেল তাকিয়ে রইলেন। যুবতীর মুখে অবাঙালী আদল। কোথায় দেখেছেন যেন। খুব সম্প্রতি দেখেছেন যুবতীটি বারান্দায় উঠে নমস্কার করে চমৎকার বাংলায় বলে উঠল, আপনিই কি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার?

কর্নেলের মনে পড়ল। কাল রাতে হাসপাতালের মর্গে অনুরাধার বাবা-মায়ের সঙ্গে ওকে দেখেছিলেন। ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। অনুরাধর মা ওকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। ওই মেয়েটিই তাহলে অনুরাধার বন্ধু ভাবনা।

কর্নেল বললেন, বসুন। আশা করি, আপনি অনুরাধার বন্ধু ভাবনা। আমাকে আপনি বলবেন না প্লিজ। মুখোমুখি বসে বলল। কাল রাতে অফিসারদের সঙ্গে আপনাকে দেখেছিলুম। একটু আগে ইন্সপেক্টর মিঃ শর্মার কাছে গিয়েছিলুম কিছু কথা বলতে। কিন্তু উনি আমার কথার গুরুত্ব দিলেন না। হাসতে হাসতে বললেন, সিয়াসেটিয়াসে আমি বুঝি না। এ কেসের সঙ্গে ওসবের কী সম্পর্ক? বরং আপনি সেচবাংলোয় কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গে দেখা করুন। উনি ওইসব ব্যাপার বুঝবেন।

কর্নেল হাসছিলেন। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন, সিয়াসে?

ভাবনা বলল, তার আগে প্লিজ বলুন, আপনি কি সেই বিখ্যাত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর কর্নেলসায়েব? কমাস আগে টাইমস অফ ইণ্ডিয়ায় আপনার একটা হিস্ট্রি পড়েছিলুম। শৰ্মাজী আপনার নাম বলার পর তা মনে পড়েছে। সেজন্য ছুটে আসছি।

ভাবনা, সিয়াসের ব্যাপারটা কি?

আমার গুড লাক, কর্নেল! ভাবনা একটু হাসবার চেষ্টা করল। আপনাকে মুখোমুখি দেখব এবং কথা বলব, স্বপ্নেও ভাবিনি! এখন আমার মনে হচ্ছে, সুদীপ্ত আর অনুরাধার খুনী শীগগির ধরা পড়বেই পড়বে। সব রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে।

কিন্তু…..কর্নেল হাসলেন। তুমি রহস্যের জট আরও পাকিয়ে তুলছ, ভাবনা!

ভাবনা চারপাশ দেখে নিল। বাংলো নির্জন। কিচেনের দিকে চৌকিদারের বউ কাজে ব্যস্ত। তার এদিকে চোখ নেই। ভাবনা চাপা গলায় বলল, আজ সাতাশে অক্টোবর, চব্বিশে অক্টোবর সন্ধ্যায় আমি আর অনুরাধা সুদীপ্তের দিদির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম। সুদীপ্তের ওই বিধবা দিদি ছাড়া এক কেউ নেই। মাঝে মাঝে ওঁকে সাহায্য করতে যাই। সুদীপ্ত ওমাসে হঠাৎ মার্ডার হওয়ার

কে সুদীপ্ত?

ধাতু গবেষণা কেন্দ্রে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল। একুশে সেপ্টেম্বর সকালে ওর ডেডবডি পাওয়া যায় পোডড়া খনি এলাকয়। পুলিশ এ পর্যন্ত কোনও কিনারা করতে পারেনি সে-কেসের।

তোমাদের সঙ্গে আলাপ ছিল তাঁর।

হ্যাঁ, অনুরাধার সঙ্গে সুদীপ্তের গোপন সম্পর্ক ছিল। সেটা শুধু আমিই জানতুম। অনুরাধার সঙ্গে ওর বিয়েও হয়ে যেত এতদিনে।

হুঁ, তারপর?

সুদীপ্তের দিদি বিশাখাদির সঙ্গে দেখা করে সাইকেলরিকশোয় ফিরে এসেছিলুম। পার্বতীতলার মোড়ে রিকশো ছেড়ে ভাবলুম, বাকি রাস্তা হেঁটে যাব। হাঁটতে, আমার ভাল লাগে। তখন অবশ্য রাত দশটা বেজে গেছে। অনুরাধা আমাদের বাড়ির কাছাকাছি থাকে। পার্বতীতলা থেকে একটুখানি পথ মাত্র। কিন্তু হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি এসে গেল। তখন দৌড়ে মঞ্জুশ্রীদের বাড়ি ঢুকলাম। মঞ্জুশ্রী মানে–

বুঝতে পেরেছি। বলো।

মঞ্জুশ্রীর পিসতুতো দাদা অরুণেন্দুর সঙ্গে আলাপ হল ওদের বাড়িতে। সে সিয়াসের আসর করতে চাইল। ব্যাপারটা আমার জানার আগ্রহ ছিল। ওদের ডাইনিং টেবিলে আসর বসানো হল। অরুণেন্দু কেন জানি অনুরাধাকেই মিডিয়াম হতে রাজি করাল। আমাকে অবাক করে অনুরাধা রাজি হয়ে গেল। সিয়াসের আসর কীভাবে হয় জানতুম না। অরুণেন্দু বুঝিয়ে দিল।

ভাবনা সে রাতের ব্যাপারটা বর্ণনা করলে কর্নেল বললেন, অনুরাধা সুদীপ্তের নাম লিখেছিল?

লিখেছিল–মানে সুদীপ্তের আত্মা ভর করেছিল ওর মধ্যে। সেই লিখেছিল।

আর কী লিখেছিল?

অরুণেন্দু প্রশ্ন লিখছিল আর সুদীপ্তের আত্মা তার জবাব লিখছিল। একটু পরে হঠাৎ অনুরাধা অজ্ঞান হয়ে গেল। আসর ভেঙে গেল। কী লিখেছিল ওরা, আর দেখিনি। কাগজটা অরুণেন্দুর হাতেই ছিল। সে একটু পরে ওটা ওর মামা ডঃ রায়কে দিল। উনি রেখে দিলেন কাগজটা।

কাগজটা তাহলে তুমি দেখনি?

না।

বাড়ি ফেরার পর কোনও সময় অনুরাধাকে জিগ্যাসা করোনি কিছু?

করেছিলুম। ও বলেছিল, কিছু জানে না। কী লিখেছিল ওর মনে নেই।

সুদীপ্তের মৃত্যুর পর অনুরাধা ওর সম্পর্কে এমন কিছু কি বলেছিল তোমাকে, যাতে তোমার ধারণা হয়েছিল যে সে কিছু জানত?

ভাবনা একটু ভেবে বলল, না তো। এমন কী কাকে ওর সন্দেহ হয় তাও বলেনি। কিন্তু ….

কিন্তু?

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, অনুরাধা হয়তো কিছু জানত। আমাকে বলেনি।

কেন মনে হচ্ছে?

কাল দুপুরে অনুরাধা আমাকে ফোন করে বলেছিল, বিকেলে ফুলঝরিয়া লেকে বেড়াতে যাবে। আমি ওর সঙ্গে যাব কি না। আমি বললুম– গাড়ি ছাড়া যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাবাকে গাড়ির কথা বললে জিগ্যেস করবেন কোথায় যাচ্ছি। ফুলঝরিয়ার নাম শুনলে কিছুতেই যেতে দেবেন না। ট্যাক্সি করে যাওয়া যায়। কিন্তু ফেরার সময় ট্যাক্সি পাব না। রিকশোও পাব না। হাঁটতে হবে। তাই ওকে বারণ করলুম। অনুরাধা ঠিক আছে বলে ফোন ছেড়ে দিল। তো ওদের বাড়ি আমাদের বাড়ির কাছাকাছি। কিছুক্ষণ পরে ওদের বাড়ি গিয়ে শুনলুম ও এইমাত্র বেরিয়ে গেছে। আমি ভাবতেই ও একা ফুলঝরিয়া চলে গেছে। কিন্তু এখন অবাক লাগছে, কেন ফুলঝরিয়া যেতে চেয়েছিল অনুরাধা?

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে চোখ বুজে হেলান দিলেন। তারপর বললেন, সিয়াসের আসরের ব্যাপারটা তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, বুঝতে পারছি। কেন তা তুমি ওই ব্যাপারটাই বলতে গিয়েছিলে শৰ্মাজীর কাছে। অথচ তুমি বলছ, সুদীপ্তের আত্মাই অনুরাধার শরীরে ভর করেছিল।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কর্নেল! একবার মনে হচ্ছে, অনুরাধা ইচ্ছে করেই দুষ্টুমি করেছিল। আবার মনে হচ্ছে, তাহলে ও হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেল কেন? অথচ খালি সন্দেহ হচ্ছে, ওর খুন হয়ে যাওয়ার পেছনে যেন সিয়াসের ব্যিাপারটার কোনও যোগাযোগ আছে।

কী যোগাযোগ থাকতে পারে ভাবছো?

এক হতে পারে, অনুরাধার হাত দিয়ে সুদীপ্তের আত্মা এমন কিছু লিখেছিল, যা তার খুনীকে ধরিয়ে দেবে। আর এক হতে পারে, অনুরাধা দুষ্টুমি করে–তার মানে, অভিনয় করে আসরের কাউকে কোনও হিন্ট দিতে চাইছিল।

অর্থাৎ সে জানত কে খুন করেছে সুদীপ্তকে?

ধরুন, তাই।

তাহলে তো বলতে হয়, খুনী ওই আসরেই উপস্থিত ছিল?

ভাবনা চমকে উঠল। আসরে তো ছিল সুমন ব্যানার্জি, অরুণেন্দু, মঞ্জুশ্রী আর আমি। অরুণেন্দু কলকাতায় থাকে। বেড়াতে এসেছে। আমি সুদীপ্তকে খুন করি নি। আমার পক্ষে সম্ভবও নয়। মঞ্জুশ্রীও তাই। বাকি রইল সুমন। কিন্তু সুমন কেন সুদীপ্তকে খুন করবে? তাছাড়া সুমন অত্যন্ত নিরীহ ছেলে। খুব ভদ্র।

কাগজটা ডঃ রায় নিয়েছিলেন?

হ্যাঁ। ভাবনা জোরের সঙ্গে বলল। কিন্তু উনিই বা কেন সুদীপ্তকে খুন করবেন? সুদীপ্ত তো ওঁরই অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল। মঞ্জুর সঙ্গে প্রথমে সুদীপ্তেরই বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সুদীপ্ত রাজি হয়নি। কিন্তু তাই বলে তাকে মেরে ফেলবেন? এ একেবারে অসম্ভব।

তাহলে স্বীকার করতে হয়, সত্যি সুদীপ্তের আত্মা এসেছিল। কিন্তু খুনীকে ধরিয়ে দেবে এমন কোনও সূত্র লিখেছিল সেই কাগজটাতে–এর প্রমাণ কী? তুমি তো দেখনি ওটা। কাজেই ওতে কী ছিল না দেখা পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে আসা যায় কি?

ভাবনা আস্তে বলল, আমার সন্দেহ যাচ্ছে না। আপনি একবার যাবেন আমার সঙ্গে ডঃ রায়ের কাছে?

কর্নেল, বললেন, চলো, যাই।…

ডঃ কুসুমবিহারী রায় কর্নেলের পরিচয় পেয়ে খুব আগ্রহের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাইলেন। কাগজটা তক্ষুনি এনে দিলেন কর্নেলকে। বললেন, ভাবনা খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। ওর সঙ্গে আমি একমত। আমিও ঠিক একই সন্দেহে ভুগছি। কিন্তু পুলিশকে আগ বাড়িয়ে এ ব্যাপারটা জানাতে যাইনি। কারণ আশা করি, বুঝতেই পারছেন। পুলিশ বড় আনপ্রেডিক্টেবল! উল্টে আমাদের কাউকে জড়িয়ে বসবে হয়তো। তবে ব্যাপারটা নিয়ে আমি খুব চিন্তাভাবনা করেছি। এর একটা আশকারা হওয়া দরকার। দীপ্তেন্দু আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিল–অনুরাধাও।

কর্নেল কাগজটা দেখছিলেন। পেন্সিলে লেখা। ৩৪৭ নং পিট, কালো পাথর, মোহান্তজী। বললেন, এই কথাগুলো অর্থ উদ্ধার করতে পেরেছিলেন কি!

ডঃ রায় চিন্তিতমুখে বললেন, খনি এরিয়ার ম্যাপ দেখে বুঝতে পেরেছি, ওটা একটা ডেড মাইন। জায়গাটা আট কিলোমিটার দূরে ফুলঝরিয়া লেকের পশ্চিম দিক দিয়ে যে হাইওয়ে গেছে, সেই রাস্তায় ডেড মাইন এলাকায় যাওয়া যায়। সবই অ্যাবাণ্ডাণ্ড মাইন। মুখ সিল করা আছে। দেখাচ্ছি আপনাকে।

বলে উনি ভেতরের ঘর থেকে একটা ম্যাপ নিয়ে এলেন। সেটা টেবিলে ছড়িয়ে এলাকাটা দেখিয়ে দিলেন। এই হল পিট নং ৩৪৭। এই দেখুন, লেখাই আছে। মুখটা পাথর আর কংক্রিটের চামড়া দিয়ে সিল করা আছে। এটা ছিল অভ্রের খনি।

কর্নেল বললেন, আর কালো পাথর?

কালোপাথর তো বারাহিয়া ব্লকের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এর অর্থ কী বুঝতে পারিনি।

মোহান্তজী?

ডঃ রায় বলার আগেই ভাবনা বলে উঠল, কেন? পার্বতীমন্দিরের মোহান্তজী!

ডঃ রায় বললেন, হ্যামন্দিরের সেবায়েত উনি। উনি ছাড়া আর এ এরিয়ার তো কোনো মোহান্তজী নেই। কিন্তু মোহান্তজী তো বুড়ো মানুষ। মন্দিরেই থাকেন প্রায় সারাক্ষণ। ওঁর নাম কেন লিখল–অনুরাধা লিখুক অথবা দীপ্তরে আত্মাই লিখুক–কিছুতেই মাথায় আসছে না।

আপনার ভাগ্নে অরুণেন্দু আছেন কি?

মঞ্জুশ্রী বলল, অরুদা একটু আগে বেরিয়েছে। কোথায় গেছে বলে যায়নি।

ডঃ রায় একটু হাসলেন। ওঁর ওই অভ্যাস! টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো। এখানে এসে একদণ্ড ঘরে বসে থাকতে চায় না। ভূতপ্রেতের খোঁজেই হয়তো ঘুরে বেড়ায়।

মীনাক্ষী বললেন, নিশ্চয় মোহান্তজীর কাছে গিয়ে বসে আছে। মোহান্তজীও যে ওর দোসরা ভূতের ওঝা!

ডঃ রায় হাসতে হাসতে বললেন, হ্যাঁ–মোহান্তজী বস্ত এরিয়ার সব ভূতপ্রেতের একচেটিয়া মালিক। বস্তর মেয়েদের নাকি প্রায়ই ভূতে ধতে। ওঁর পোষা প্রেত কিংবা পিশাচ ভূতটাকে তাড়িয়ে দেয়।

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কাগজটা আর এই ম্যাপটা আমি একদিনের জন্য রাখতে চাই, ডঃ রায়। আপত্তি আছে কি?

না, না। রাখুন। ডঃ রায় ঘড়ি দেখে বললেন, আমাকেও এখনই অফিসে যেতে হবে। আবার দেখা হবে। এ বাড়িতে আপনার অবারিত দ্বার। তাছাড়া আমি চাই, সুদীপ্ত আর অনুরাধার খুনী ধরা পড়ুক। পুলিস হোপলেস! আপনি আমার কাছে সর্বপ্রকার সহযোগিতা পাবেন–আই অ্যাসিওর ইউ।…

রাস্তায় গিয়ে ভাবনা বলল, কর্নেল মোহান্তজীর কাছে যাবেন একবার?

চলো, যাই।

ভাবনা পা বাড়িয়ে বলল, ওই দেখা যাচ্ছে বটগাছের ভেতর মন্দিরের চুড়ো। কাছেই।

মন্দির এলাকা বেশ বড়। পাঁচিল ঘেরা প্রাঙ্গণ। একটা আটচালা আছে প্রাঙ্গণে। ওপাশে কয়েকটা একতলা ঘর। জরাজীর্ণ অবস্থা। মন্দিরটার চেহারা বেশ পরিচ্ছন্ন। পেছনে বিশাল বটগাছ আছে। মন্দিরের ভেতর একাদশ শতাব্দীর পার্বতীমূর্তি। পাশের একতলা ঘরের বারান্দায় খাটিয়া পেতে দাড়িজটাজুটধারী এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তিনিই মোহান্তজী। ভাবনাকে দেখে বললেন, আয় বেটি আয়।

ভাবনা প্রণাম করে শুধু কর্নেলের নাম জানিয়ে বলল, ইনি আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছেন মোহান্তজী!

কর্নেল নমস্কার করলেন। মোহান্তজী খাটিয়ার ওধারে একটা চারপায়া দেখিয়ে বললেন, বৈঠিয়ে জী! বৈঠিয়ে!

কর্নেল বসে বললেন, আপনি কত বছর এ মন্দিরে আছেন মোহান্তজী?

এ মন্দিরে আমরা পুরুষানুক্রমে সেবাইত।

আপনার বয়স কত হল?

আশি-পঁচাশি হবে। মালুম নেই।

আচ্ছা মোহান্তজী, সত্যিই কি ভূতপ্রেত বলে কিছু আছে?

মোহান্তজী একটু অবাক হলেন যেন। বললেন, মনুষ্যাত্মা অমর কর্নেলসাব। যতদিন না জীবাত্মা ব্রহ্মলোকে পরমাত্মার সঙ্গে বিলীন হচ্ছে, ততদিন তার মুক্তি নেই। মানুষের মৃত্যু হওয়ার পর কিছুদিন তার জীবাত্মার মধ্যে ইহলোকের সব সংস্কার থেকে যায়। যতদিন সেটা থাকে, ততদিন সে প্রেত। ততদিন মায়া কাটাতে পারে না আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের। তাদের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়।

আপনি দীপ্তেন্দু মিত্রকে নিশ্চয় চিনতেন?

মোহান্তজী ভুরু কুঁচকে বললেন, কে?

দীপ্তেন্দু মিত্র–যে গতমাসে খুন হয়ে গেছে!

মোহান্তজী তীক্ষ্ণ দৃষ্টে কর্নেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বললেন, সে আপনার আত্মীয়?

হ্যাঁ। কর্নেল কপট গাম্ভীর্যে বললেন। কিছুদিন যাবৎ দীপ্তেন্দুকে খুব স্বপ্নে দেখছি।

হুঁ, স্বপ্নেও মনুষ্যাত্মা দেখা দেয় আত্মীয় স্বজনকে।

দীপ্তেন্দু স্বপ্নে আমাকে একটা অদ্ভুত কথা বলেছে। বুঝতে পারছি না। তাই আপনার কাছে এলাম।

ঝুট! প্রায় গর্জন করলেন মোহান্তজী। নড়ে বসলেন। খাঁটিয় মচমচ করে কেঁপে উঠল। ফের বললেন, সব ঝুট! ডাহা মিথ্যা! আপনি পুলিসের গোয়েন্দা। বেটি ভাবনা, এ কাকে আমার কাছে এনেছিস?

ভাবনার দিকে রক্তরাঙা চোখে মোহান্তজী তাকালে। ভাবনা বিব্রতভাবে বলল, না না। ইনি পুলিসের গোয়েন্দা নন, মোহান্তজী!

আলবত গোয়েন্দা। বলে মোহান্তজী কর্নেলের দিকে ঘুরলেন। আপনি চলে যান এখান থেকে। আপনার কোনও কথার জবাব দেব না আমি।

কর্নেল অবাক হবার ভঙ্গি করে বললেন, এ কী বলছেন মোহান্তজী? আমি গোয়েন্দা হতে যাব কোন দুঃখে? সুদীপ্ত প্রায়ই আমাকে কালো পাথরের কথা বলে। আমি শুনলুম, আপনি প্রেসিদ্ধ। তাই আপনার সাহায্য চাইতে এসেছি।

মোহান্তজী আরও আগুন হয়ে বললে, নিকাল যাইয়ে আপলোগ! তারপর পেছন ফিরে ডাকলেন, এ ভোলা! এ রামু! জলদি ইধার আ তো!

ভাবনা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কর্নেল! মিছিমিছি অপমানিত হয়ে লাভ নেই। চলুন।

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন মোহান্তজী, চলি চাহলে, আবার দেখা হবে।

মোহান্তজী গর্জন করে আবার ভোলা ও রামুকে ডাকতে লাগলেন। মন্দিরের পেছনথেকে দুট ষণ্ডামার্কা লোক উঁকি দিচ্ছিল। ভাবনা ফিসফিস বলে উঠল, ওরা খুব খারাপ লোক। চলে আসুন, কর্নেল।

বাইরের রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল একবার ঘুরলেন। মোহান্তজী তাঁদের দিকে আঙুল তুলে সেই ভোলা ও রামুকে কিছু বলছেন। লোকদুটোর চেহারা দেখে বোঝা যায়, ওরা গুণ্ডা প্রকৃতির। কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, কী বুঝলে ভাবনা?

ভাবনা একটু হাসল। মোহান্তজী কালোথর শুনে এমন সাংঘাতিক রেগে গেলেন কেন, কে জানে!

অনুরাধা এ রহস্যের সঠিক চাবিকাঠিটা রেখে গেছে। শুধু এটুকুই বলতে পারি।

ঠিক বলেছেন, কর্নেল! কালোপাথর জিনিসটা যাই হোক, সুদীপ্ত আর অনুরাধা খুন হওয়ার সঙ্গে তার সল্ট আছে। ওকে অ্যারেস্ট করলে সব বেরিয়ে পড়বে।

আপনি শৰ্মাজীকে বলুন ব্যাপারটা।

বলব। আরও একটু এসে কর্নেল বললে, কি আছে। আমি এবার চলি, ভাবনা। আপাতত এ নিয়ে তুমি কারুর সঙ্গে আলোচনা কোরো না। আর শোনো, সাবধানে থেকো। যথাসময়ে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

ভাবনা তাদের বাড়ির রাস্তা ধরল। কর্নেল চললেন বাংলার পথে ….

.

০৪.

কিছুক্ষণ পরে বাংলো থেকে সিধে নাক বরাবর হাঁটছিলেন কর্নেল। কাঁধে কিটব্যাগ, হাতে ছিপ আর প্রজাপতি ধরা জাল। ক্যামেরা আর বাইনোকুলার যথারীতি দুপাশে ঝুলছে। বাঁজা ডাঙা, ঝোপঝাড় পেরিয়ে একটা ক্যানেল। তারপর ভুট্টা অড়হরের ক্ষেত কিছুদূর। তারপর আবার টাড় জমি, পাথুরে মাটি, মাটি, টিলা। ফরেস্ট দফতরের লালিত শালবন। মাঝে মাঝে বাইনোকুলারে চোখ রেখে পাখি দেখছিলেন। কোনও প্রজাপতি দেখলেই থমকে দাঁড়াচ্ছিলেন। কিন্তু বড্ড ছটফটে ওরা। তাছাড়া এখন লেকের পূর্বপ্রান্তে ঝর্ণার কাছে পৌঁছনোর তাড়া আছে।

ডোবাটার কাছে পৌঁছে কাল যে পাথরে বসে ছিপ ফেলে ছিলেন, সেখানে ছিপ, কিটব্যাগ ইত্যাদি রাখলেন। জলে চার ফেলে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলেন। কালকের মতই নির্জন।

যে গর্তে অনুরাধা পড়েছিল, প্রথমে গেলেন সেখানে। জলটা এখনও লাল হয়ে আছে। মন খারাপ হয়ে গেল কর্নেলের। কাল একটাও মাঝ ধরতে পারেনি। কিন্তু বঁড়শির টোপ ধরে অনবরত টানাটানি করছিল এবং মনটা ওইদিকেই আটকে ছিল সারাটা সময়। সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে। এতটুকু টের পান নি।

উজ্জ্বল রোদে ঝলমল করছে প্রকৃতি। গর্তটার চারপাশে ঘন ঘাস। মাটিটা সে রাতের বৃষ্টিতে নরম হয়ে আছে এখনও। কাল সন্ধ্যার মুখে আলো ছিল যথেষ্ট কম। একদফা চারপাশটায় খুঁজছিলেন, পায়ের ছাপ অথবা কোনও চিহ্ন যদি পাওয়া যায়। আলোর অভাবে খুঁজে পাননি। এখন প্রায় এগারোটা বাজে। ঘাসের তলায় একখানে এবং গর্তের ধারে কতকগুলো জুতোর ছাপ দেখা যাচ্ছিল। পরীক্ষা করে বুঝলেন, সবই পুলিসের জুতোর ছাপ। দুজনের পায়ে হাল্কা স্যান্ডেল ছিল লক্ষ্য করলেন। সে এখানে এসেছিল দক্ষিণ দিক থেকে–যেখানে কর্নেল বসে মাছ। ধরছিলেন। অনুরাধা এসেছিল কোন দিক থেকে? খুঁজতে খুঁজতে একখানে চোখ গেল। ঘাস দেবে গেছে এবং উপড়ে গেছে শেকড়সুদ্ধ। ধস্তাধস্তির চিহ্ন পরিষ্কার! এখানে হাঁটু সমান উঁচু গুল্মজাতীয় ঝোপগুলো হেলে আছে। ডাল ভেঙে গেছে। তারপর খানিকটা রক্তও দেখতে পেলেন। গর্ত থেকে দুমিটার তফাতে ছুরি মেরেছিল আততায়ী।

এখান থেকেই অনুরাধার গতিপথ খুঁজে পেলেন। দৌড়ে এলে ঘাস ছিঁড়ে ও উপড়ে যাবার কথা। ওর জুতো দুটো এখানেই কোথাও কুড়িয়ে পেয়েছে পুলিশ। শৰ্মাজী বলছিলেন, গর্তটার কাছাকাছি পাওয়া গেছে।

তার মানে অনুরাধা জুতো খুলে দৌড়ত শুরু করেছিল। কিংবা তার মতলব টের পেয়ে প্রাণভয়ে ছুটে পালাচ্ছিল।

ঘাস ছাড়িয়ে পশ্চিমে টিলার দিকে এগোতেই অনুরাধার দৌড়ে আসার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেল। মাটিটা পাথুরে এবং টিলার ঢাল থেকে বৃষ্টির জল গড়িয়ে এসে একখানে নালা মতো হয়েছে। তাতে জল নেই। বালি জমে রয়েছে। বালির ওপর ডেবে যাওয়া জুতোর ছাপ অনেকগুলো। ছাপগুলো পরিষ্কার নয়। তবে কিছু ছাপ বেশি গভীর। কিছু কম। কম গভীরগুলো অনুরাধার, তাতে ভুল নেই। বেশি গভীরগুলো নিশ্চয় আততায়ীর।

কর্নেল বালির ওপর দিয়ে এলেন একবার। তারপর নিজের জুতোর ছাপ পরীক্ষা করলেন। আততায়ীর দেহের ওজন তার চেয়ে কিছু কম। লোকটা তার চেয়ে বেঁটে। জুতোর দৈর্ঘ্য দেখে মনে হয় তার উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুটের বেশি হতে পারে না। কর্নেলের উচ্চতা সওয়া ছফুট।

কোথাও-কোথাও টিলার ঢালের ওপর অনুরাধার জুতোর ছাপের ওপর আততায়ীর জুতোর ছাপ পড়েছে। সেই ছাপগুলো কোথাও স্পষ্ট, কোথাও অস্পষ্ট। একটা প্রকাণ্ড পাথর ঘুরে ছাপগুলো ওপরে উঠেছে। পাথরটার কাছে গিয়ে কর্নেল থমকে দাঁড়লেন। পাথরটার কোণার দিকে টাটকা গর্ত খোঁড়ার চিহ্ন। এমন কী, একটা ছোট্ট খুরপিও পড়ে আছে।

দেখামাত্র মনে হল, এইমাত্র কেউ গর্তটা খুঁড়ছিল। তাকে আসতে দেখে পালিয়ে গেছে।

কর্নেল ব্যস্তভাবে ওপরে উঠতে থাকলেন। ফুট দশেক ওঠার পর চ্যাটালোত একটা জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে ওধারের ঢাল ও নিচের লেকের দিকে তাকালেন। কাছাকাছি কাউকে দেখতে পেলেন না। দূরে পার্কে এবং ওয়াটার পাম্পিং স্টেশনের ওখানে কিছু লোক আছে। যে গর্ত খুঁড়ছিল, সে সম্ভবত নিচের বড় বড় পাথরের আড়ালে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। মিনিট দশেক চোখে বাইনোকুলার রেখে তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। তারপর গর্তটার কাছে নেমে এলেন।

আবার থমকে দাঁড়ালেন। গর্তের ওপর এবং এই ঢালে আরও নানা সাইজের কালোপাথর পড়ে আছে। কিন্তু কোনটাই এত কালো নয়।

তাহলে কি এটাই সেই কালোপাথর?

গর্তের কাছে হুমড়ি খেয়ে বসলেন কর্নেল। খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে এতক্ষণে চোখে পড়ল, যে গর্ত খুঁড়ছিল, সে তাকে দেখে পালিয়ে যেতেও পারে বটে, কিন্তু যে জন্য খুঁড়ছিল, তা পেয়ে গেছে। কারণ গর্তটার তলায় আন্দাজ আট ইঞ্চি লম্বা এবং ইঞ্চি ছয়েক চওড়া কী একটা জিনিস ছিল। তার তলার ছাপটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। মাটিটা বৃষ্টিতে যথেষ্ট নরম। কারণ সে রাতের বৃষ্টির জল টিলার ওপর দিকে থেকে গড়িয়ে এসে এই কালো পাথরে বাধা পেয়ে মাটিটাকে গভীর ভাবে ভিজিয়ে দিতে পেরেছিল।

কোনও চৌকো জিনিস এখানে পোঁতা ছিল। ছোট্ট বাক্সের মতো কোনও জিনিস।

খুরপিটার বাঁটে হাতের ছাপ পাওয়া যাবে। সেটা সাবধানে মাথার দিকে ধরে তুলে নিলেন কর্নেল। তারপর ঢাল বেয়ে নেমে ঝর্ণার ডোবাটার ধারে ফিরলেন।

কিন্তু ছিপ ফেলার চেয়ে যা দেখে এলেন, সেটাই জরুরী হয়ে উঠেছে। কর্নেল সব গুটিয়ে নিয়ে ফিরে চললেন বাংলোয়। ইন্সপেক্টর শর্মার সঙ্গে শীগগির আলোচনা করা দরকার।

আধঘণ্টার মধ্যে বাংলোয় ফিরে গেটের মুখে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল। তিনি তাকে দেখে নমস্কার করে বললেন, আপনিই কি কর্নেলসায়েব? ভাবনা আমাকে আপনার কাছে আসতে বলল। আমি অনুরাধার বাবা।

.

০৫.

পরিতোষবাবু বললেন, আপনি বেরিয়েছেন শুনে চলে যাচ্ছিলুম। পরম সৌভাগ্য যে দেখা হল। সকালে অনুর বডি মর্গ থেকে ডেলিভারি দিয়েছিল। দাহক্রিয়া করে বাড়ি ফিরে ওর জিনিসপত্র ঘাঁটতে বসেছিলুম। আমার ছেলে মনীশ বছর দুই আগে বাস অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়। তারপর অনুও এভাবে গেল। কী পাপে ভগবান এমন শাস্তি দিলেন জানি না। তো যে জন্য এসেছি বলি–

পরিতোষবাবু পকেট থেকে একটা ভাজকরা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিয়ে বললেন, কিছুক্ষণ আগে অনুর ড্রয়ারে এটা পেয়েছি। এ চিঠি কে তাকে লিখেছে, জানি না। পুলিসের কাছে যাব ভাবছিলুম, হঠাৎ অনুর বন্ধু এল। তাকে তো আপনি চেনেন। সে বলল আগে আপনার কাছে যেতে। কারণ ভাবনার সন্দেহ, এর পেছনে প্রভাবশালী লোক আছে। তাই পুলিশ সুদীপ্তের কেসের মতো এই কেসটাও চেপে দেবে।

কর্নেল চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে চমকে উঠলেন। ইংরেজিতে টাইপ করা ছোট্ট চিঠি। সরলার্থ করলে দাঁড়ায় :

২৬ অক্টোবর বিকেল পাঁচটায় ফুলঝরিয়া লেকের পূর্বদিকে টিলায় গোর্পনে : গিয়ে অপেক্ষা করবে। সুদীপ্তের হারানো জিনিসটার খোঁজ দেব। ইতি, তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী।

কর্নেল বললেন, খুনী ওকে ফাঁদে ফেলেছিল। কিন্তু সুদীপ্তের হারানো জিনিস কী, সে সম্পর্কে আপনি কি কিছু জানেন?

পরিতোষবাবু বললেন, অনুর কাছে শুনেছিলুম মনে পড়ছে। সুদীপ্ত কী একটা নতুন মিশ্ৰধাতু আবিষ্কার করেছিল নাকি। একটা ফর্মুলার আকারে সেটা লিখে ব্রিফ কেসে রেখেছিল। ওর ল্যাবরেটরি থেকেই সেটা চুরি যায়।

এটা কতদিন আগের ঘটনা, জানেন?

এই তো গতমাসের। সুদীপ্ত যেদিন খুন হল, তার পরদিন অনু ওর মাকে বলছিল। আমার কানে এসেছিল কথাটা। তাই ওকে জিজ্ঞেস করলুম। অনু বলল, যে মিশ্ৰধাতু সুদীপ্ত আবিষ্কার করেছিল, তা নাকি যুগান্তকারী। অসম্ভব হালকা, অথচ ভীষণ শক্তিশালী। ওই দিয়ে মহাকাশযান তৈরি করা যাবে ভবিষ্যতে। সুদীপ্ত ওকে কথাটা গোপন রাখতে বলেছিল।

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, আর কিছু বলছিল মনে পড়ছে কি?

পরিতোষবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ–অনু বলেছিল, মিশ্ৰধাতুর একটা নমুনা তাকে দেখিয়েছে সুদীপ্ত। জিনিসটা দেখতে কালো পাথরের মতো! ওটার কোডনাম দিয়েছিল নাকি ব্ল্যাকস্টোনকালো পাথর!

কালো পাথর? কর্নেল চমকে উঠলেন এবার।

আজ্ঞে হ্যাঁ। তাই বলেছিল মনে পড়ছে। ব্ল্যাকস্টোন।

ঠিক আছে পরিতোষবাবু! আপনি তাহলে আসুন। আমি দেখছি, কী করা যায়। আর একটা কথা, এসব কথা আর কাউকে বলবেন না যেন। পুলিসকে যা বলার আমিই বলব।

পরিতোষবাবু কর্নেলের হাত ধরে বললেন, আমার বংশে বাতি দিতে কেউ রইল কর্নেল! এই অভিশপ্ত জীবনে অন্তত একটা সান্ত্বনা পাব, যদি অনুর খুনী ধরা পড়ে এবং শাস্তি পায়।

কর্নেল তাকে আশ্বাস দিয়ে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলেন।

তাহলে কালো পাথর-এর প্রকৃত রহস্য এটাই। ফুলঝরিয়া লেকের পূর্বদিকের টিলায় যে কালো পাথরটা দেখে এলেন, সেটার কোনো তাই রইল না। কিন্তু ওখানে যে জিনিসটা পোঁতা ছিল, সেটাই বা কি? কে তুলে নিয়ে গেল ওটা?

কিছুক্ষণ পরে জিপের শব্দে কর্নেল দেখলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর শর্মাজী আসছেন।

মিঃ শর্মা এসে হাসতে হাসতে বললেন, পার্বতীমন্দিরের মোহান্তজী আমার কাছে নালিশ করতে গিয়েছিল একটু আগে। আমাদের গোয়েন্দা নাকি ওকে উত্যক্ত করতে গিয়েছিল। যে বর্ণনা দিল, বুঝলুম আপনি ছাড়া আর কেউ নন। বিশেষ করে কেশরলাল শান্তপ্রসাদজীর মেয়ে ভাবনাও যখন সঙ্গে ছিল।

কর্নেল অবাক হয়ে বললেন, মোহান্তজীর কী ব্যাপার বলুন তো মিঃ শর্মা?

পার্বতীমন্দিরের ভেতরে যে মূর্তিটি আছে তার তলায় একটা ছোট্ট বেদী ছিল। ওটা নাকি উল্কা পাথর, নিশ্চয় খুব দামী জিনিস। মোহান্তজীর দুই ষণ্ডামার্কা চ্যালা আছে ভোলা আর রামু। স্বভাবত তাদের সন্দেহ করে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তারা জেরার চাপে বলেছিল, পাথরের বেদীটা নাকি রিসার্চ সেন্টারের সুদীপ্ত মিত্রকে বেচেছে। সুদীপ্ত মিত্র তার কদিন আগে খুন হয়ে গেছেন। ডেড মাইন এলাকায় ওঁর বডি পাওয়া গিয়েছিল। পেছন থেকে কেউ ছুরি মেরেছিল। যাইহোক, তার বাড়ি সার্চ করে পাথরের বেদীটা আমরা পাইনি।

কিন্তু কালো পাথরের কথা শুনে মোহান্তজী ক্ষেপে যান কেন?

রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে মাঝে মাঝে আমাদের লোক গিয়ে ওঁকে জেরা করে। প্রথম প্রথম অত চটতেন না। পরে ভীষণ চটে যান। বারাহিয়ার প্রভাবশালী লোকেদের ধরে উনি পুলিশের জেরা করতে যাওয়া ঠেকিয়েছেন।

হাসতে লাগলেন মিঃ শর্মা। কর্নেল বললেন, তার মানে মোহান্তজীর প্রতি আপনাদের সন্দেহ আছে বেদী চুরির ব্যাপারে?

নিশ্চয় আছে। আমার অন্তত দৃঢ় বিশ্বাস, মোহান্তজীই ওটা কাউকে বেচেছেন।

আপনি কি জানেন, সুদীপ্তবাবু একটা আশ্চর্য মিশ্ৰধাতু আবিষ্কার করেছিলেন?

মিঃ শর্মা অবাক হয়ে বললেন, না তো। কে বলল আপনাকে?

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট আবার জ্বেলে ধোঁয়ার ভেতর বললেন, তাহলে সবটাই এবার বলা দরকার আপনাকে। মন দিয়ে শুনুন।…

আগাগোড়া সবটা শোনার পর মিঃ শর্মা গম্ভীর মুখে বললেন, আমি ভেবেছিলাম সাধারণ কেস–এই শিল্প এলাকায় যা আকছার হয়। আসলে আপনার পথে কতকগুলো সুবিধে আছে–অন্তত যে দুটো কেস প্রতাপগড়ে থাকার সময় দেখেছি। আপনার পদ্ধতিও অবশ্য আলাদা। তাছাড়া আজকাল লোকে বিশ্বাস করে পুলিসের কাছে মুখ খুলতে চায় না। লোকের দোষ কী? রাজনীতির চাপে পুলিসও তেমনি বিপর্যস্ত।

কর্নেল বললেন, খুরপির বাঁটে হাতের ছাপটা তুলতে ফরেন্সিক ডিপার্টমেন্টে আজই পাঠিয়ে দিন। একটু তাগিদ দিয়ে কাজটা করতে হবে। আর আজই ডেড মাইন এলাকায় ৩৪৭ নং পিটের ওখানে যাওয়া যাক। বিকেল তিনটেয় বেরুব। আপনি তার আগে আগেই আসুন।

মিঃ শর্মা চিন্তিত মুখে বললেন, ঠিক সময়ে এসে আপনাকে নিয়ে যাব। কিন্তু একটা কথা আমার মাথায় এল এই মাত্র। ফুলঝরিয়ার টিলায় যে গর্তটা দেখেছেন, সেই উল্কাপাথরের বেদীটা লুকোনো ছিল না তো? গর্তের তলায় যে ঘাটের কথা বললেন, তার সঙ্গে চুরি যাওয়া বেদীর মাপটা কিন্তু মিলে যাচ্ছে।

তাহলে এখানে বেদীটাই লুকোনো ছিল!

মিঃ শর্মা উঠলেন। নাঃ! আর ভাবলে মাথা ঘুলিয়ে যাবে। হাসতে হাসতে বললেন আপনি লাঞ্চ সেরে নিন। দুটো বাজে প্রায়। আমি পৌনে তিনটের মধ্যে এসে পড়ছি। তারপর উনি খবরের কাগজে জড়ানো খুরপিটা সাবধানে তুলে নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।…

.

০৬.

ডেড মাইন এলাকা ঢিবি খানাখন্দ আর জঙ্গল গজিয়ে দুর্গম হয়ে আছে। জিপ এখানে রেখে কর্নেল ইন্সপেক্টর শর্মাজী আর দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল ৩৪৭ নং পিটের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের আমলেই এইসব খনি পরিত্যক্ত হয়ে ছিল। তারপর থেকে আর মানুষজন এদিকে চলাফেরা করে না। শৰ্মাজী গত মাসে একবার মাত্র এসেছিলেন এখানে। সুদীপ্তের লাশ পড়েছিল যেখানে, সেই জায়গাটা দেখিয়ে বললেন, এখান থেকে ৩৪৭ নং পিট সম্ভবত বেশি দূরে নয়। কর্নেল ম্যাপটা আবার দেখা যাক। না হলে খুঁজে বের করা কঠিন হবে।

ম্যাপ খুলে দেখা গেল, তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন–এ জোনের ৩০০ একর খনি সেটা, আর একটু ডাইনে এগোতে হবে। কিছুটা গিয়ে ঘন কাঁটাবন পড়ল। পাশ কাটিয়ে বাঁদিকে ঘুরে কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। শৰ্মাজী ছিলেন পেছনে। বললেন, কী হল কর্নেল?

কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, চুপ!

একটা ঢিবির সামনে কয়েকটা পাথরের চাঁই পড়ে আছে। তার আড়ালে হুমড়ি খেয়ে বসে কেউ কিছু করছে। তার মাথাটা শুধু দেখা যাচ্ছে। চাপা খস্ খস্ ঠং ঠং শব্দও কানে এল। কেউ খোঁড়াখুঁড়ি করছে।

কর্নেলের ইশারায় শৰ্মাজী আর কনস্টেবল দুজন তিনদিক থেকে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেল। কর্নেল একটু অপেক্ষা করছিলেন। ডাইনে ও বাঁয়ে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে ঘুরে পুলিশের ছোট্ট দলটি ঢিবির পেছনে গেলে কর্নেল সোজা এগিয়ে গেলেন। তারপর পাথরের চাঁইগুলোর ওপর এক লাফে উঠে একটু কাশলেন।

একটা প্রকাণ্ড গর্তে জলকাদা আর ঘাসের ভেতর বসে একটা বেলচা দিয়ে খোঁড়াখুড়ি করছিল যে, তার জামাকাপড়ে যথেষ্ট কাদা লেগেছে। সে চমকে গিয়ে ঘুরল। তারপর কাঁচুমাচু হেসে উঠে দাঁড়াল।

অত্যন্ত ভদ্র চেহারার এক যুবক। কর্নেল অবাক হয়ে বললেন, কে আপনি! এখানে কী করছেন?

যুবকটি এবার পুলিশদেরও দেখতে পেয়ে আরও হকচকিয়ে গেল। শৰ্মাজী তার দিকে রিভলভার তাক করে গর্জে বললেন, উঠে এস! ওঠো বলছি।

যুবকটি বলল, কী দোষ করেছি আমি? আপনারা আমাকে মিছিমিছি–

কর্নেল ভুরু কুঁচকে তাকে দেখছিলনে। তার কথায় বাধা দিয়ে বললেন, কী নাম আপনার?

অরুণেন্দু মুখার্জি। ডঃ কুসুমবিহারী রায় আমার মামা হন।

শর্মজী ধমক দিয়ে বললেন, বিপদে পড়লে অনেকেই অনেকের ভাগ্নে হয়ে যায়! উঠে না এলে ঠ্যাং ভেঙে দেব গুলি করে।

অরুণেন্দু বিরক্তমুখে বেলচাটা নিয়ে গর্ত থেকে উঠে এল। তারপর বলল, অন্যায়টা কী করেছি, বুঝতে পারছি না, আমি যা করছিলুম, তাতে গভর্নমেন্টেরই লাভ হতো।

মিঃ শর্মাকে ইশারায় থামতে বলে কর্নেল জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার অরুণেন্দুবাবু? আপনি ভূতপ্রেত ছেড়ে হঠাৎ এখানে এসে জলকাদা ঘাঁটছেন কেন?

অরুণেন্দু কর্নেলকে দেখে নিয়ে বলল, ও! আপনিই তাহলে সেই কর্নেলসায়েব? ভাবনা আমাকে আপনার কথা বলছিল কিছুক্ষণ আগে। দাঁড়ান ওকে ডাকি আগে।

সে পাথরের চাঁইগুলোর উপর উঠে চেঁচিয়ে ডাকল, ভাবনা! ভাবনা!

একটু দূরে জঙ্গলের ভেতর থেকে সাড়া এল, যাচ্ছি!

ছেড়ে দাও! চলে এস এখানে!

ডানদিকের ঘন ঝোপজঙ্গল থেকে জলকাদা মাখা ভাবনাকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। তার হাতেও একটা খন্তা এবং কোমরে আঁচল জড়ানো। চুলেও যথেষ্ট কাদা লেগেছে। সে কর্নেলদের দেখেই অপ্রস্তুত হেসে থমকে দাঁড়াল।

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, এস ভাবনা! বুঝতে পারছি, তুমি এ বুড়োর ওপর ভরসা না করে নিজেই গোয়েন্দাগিরি করতে নেমেছে।

ভাবনা এসে ক্লান্তভাবে বসে পড়ল পাথরে। তারপর বলল, অরুদা, তুমিই বলল ব্যাপারটা। আমি হাঁপিয়ে গেছি।

অরুণেন্দু বলল, আপনি আর ভাবনা সকালে যখন মোহান্তজীর কাছে গেলেন, তখন আমি বটগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলুম। সিয়াসের আসরে সুদীপ্তের আত্মা মোহান্তজী কথাটা লিখেছিল। সেই থেকে মোহান্তজীর ওপর চোখ রেখেছিলুম। আমার সঙ্গে তো ওঁর বহুদিনের আলাপ। যাই হোক, আপনারা চলে গেলেন মোহান্তজীর তাড়া খেয়ে, তার একটু পরে দেখি, মোহান্তজী ওঁর চ্যালা দুটোকে কী বলছেন। বলার পর ভোলা নামে চ্যালাটা একটা খুরপি নিয়ে বেরিয়ে গেল মন্দিরের পেছন দিকে। ভোলাকে ফলো করলুম। ফুলঝরিয়া লেকের পূর্বদিকে টিলার ঢালে একটা মস্তবড় কালোপাথর আছে। সেখানে ভোলা খোঁড়াখুঁড়ি করে কী একটা জিনিস বের করল। তারপর সেটা লাল একটা কাপড়ে বাঁধছে, এমন সময় দেখি আপনি টিলার নিচে লাফালাফি করছেন। তখন তো চিনি না আপনাকে। তাই

কর্নেল হাসলেন। হ্যাঁ–পরীক্ষা করছিলুম বালিতে দৌঁডুলে কতটা পা দেবে যায়।

আমি ভেবেছিলুম পাগলটাগল হবে। অরুণেন্দু হাসল।তো আপনাকে দেখতে পেয়েই ভোলা পালিয়ে গেল। ওকে ফলো করে আবার মন্দিরে চলে এলুম। আড়াল থেকে দেখলুম, মোহান্তজী ভোলাকে আবার কী নির্দেশ দিচ্ছে। এবার ভোলা আর রামু দুজনেই বেরুল মন্দিরের পেছন দিয়ে। ভোলার হাতে লাল কাপড়ে বাঁধা সেই জিনিসটা। ওদের ফলো করে দেড় মাইল এলাকায় এলুম। কিন্তু এখানে এসে ওদের হারিয়ে ফললুম। ঝোপের আড়ালে গুঁড়ি মেরে অনেক খুঁজলুম ওদের। কিছুক্ষণ পরে দেখি, দুজনে জলকাদা মেখে ভূত হয়ে বেরুচ্ছে এই ঢিবির কাছ থেকে। ওরা চলে যাওয়ার পর খুব খোঁজাখুঁজি করেও জিনিসটা কোথায় পুঁতে রেখে গেল বুঝতে পারি নি। বাড়ি ফিরলুম তখন প্রায় বারোটা বাজে। স্নান-খাওয়া সেরে আমার মামাতো বোন মঞ্জুশ্রীকে বললুম– ব্যাপারটা। তারপর বললুম– তুমি যদি ঢিবির ওপর উঠে চারদিকে নজর রাখো, আমি আশেপাশে গর্তগুলো খুঁজে দেখব। মঞ্জুশ্রী ভীষণ ভীতু। ও যাবে না। শেষে বলল, দাঁড়াও, তাহলে ভাবনাকে ডেকে দিই। ও খুব সাহসী মেয়ে। একটু পরে ভাবনাকে ও ডেকে নিয়ে এল। ভাবনা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হল। অরুণেন্দু একটু দম নিয়ে ফের বলল, আসার পথে এই হাল্কা বস্তাদুটো একটা বস্তি থেকে ভাড়া করে আনলুম। কারণ ভাবনা বলল, তুমি একদিকে আমি আরেক দিকে খোঁজখুঁজি করব। মাঝে-মাঝে ঢিবিতে উঠে গিয়ে লক্ষ রাখব। আমার এতে আপত্তি ছিল কিন্তু। দেখলে তো ভাবনা, যদি কর্নেলসায়েবদের বদলে মোহান্তজীর চ্যালারা এসে হাজির হতো, কী সাংঘাতিক বিপদে না পড়তুম।

— ভাবনা বলল, আমি ঝোপের আড়ালে ছিলুম। আমাকে দেখতে পেত না। আমি আড়াল থেকে ঢিল ছুঁড়ে ওদের ভয় পাইয়ে দিতুম দেখতে। ওদের ভূতের ভয় কি আর নেই?

সে খিলখিল করে হেসে উঠল। মিঃ শর্মা এদিক ওদিক ঘুরে কী দেখছিলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, আরে। এটাই তো দেখছি পিট নম্বর ৩৪৭। ওই তো ঢিবির তলায় কাঠের ফলকে লেখা আছে।

ফলকের ওপর ঘাস হাত বাড়িয়ে আছে। তবু পড়া যায়। অরুণেন্দু বলল, ফলকটা চোখে পড়েনি আমার। তবে অনুমান করেছিলুম এটাই ৩৪৭ নম্বর পিট।

কর্নেল গর্তটা ঘুরে ঢিবির নিচে ফলকটার কাছে গেলেন। তারপর জায়গাটা পরীক্ষা করে বললেন, কংক্রিটের স্ল্যাব দিয়ে সিল করা ছিল বটে কিন্তু স্ল্যাবটা উপড়েছিল মনে হচ্ছে। মিঃ শর্মা, আসুন তো। খন্তা দিয়ে স্ল্যাবটা ওপড়ানো যায় নাকি দেখি। ওপরের দিকটায় সূক্ষ্ম ফাটল দেখতে পাচ্ছি।

কনস্টেবল দুজন রাইফেল রেখে এগিয়ে গেল মিঃ শর্মার নির্দেশে। দুজনে খস্তাদুটো দিয়ে চাড় দিতেই বিরাট কংক্রিটের চাবড়া সরে কাত হয়ে পড়ল। ভেতড়ে সুড়ঙ্গের মতো প্রকাণ্ড হ। কর্নেল কিটব্যাগ থেকে টর্চ বের করে ঝুঁকে গেলেন সুড়ঙ্গের ভেতরে। তারপর টর্চ জ্বেলে বললেন, হু লালকাপড় বাঁধা জিনিসটা দেখতে পাচ্ছি। আরও একটা কী দেখা যাচ্ছে যেন।

কর্নেল গুঁড়ি মেরে ভেতরে ঢুকে গেলেন। একটু পরে সুড়ঙ্গের মুখে ফিরে এসে বললেন, মিঃ শর্মা। ধরুন।

প্রথমে লালকাপড়ে বাঁধা জিনিসটা, তারপর একটা ব্রিফকেস–পুরনো, ইষৎ তোবড়ানো।

কর্নেল বেরিয়ে এলেন। লালকাপড়ের গিঁট খুললে বেরিয়ে পড়ল কাদামাখা একটা কালো চৌকো পাথর–অত্যন্ত হাল্কা ওজন। আন্দাজ আটইঞ্চি চওড়া এবং চার ইঞ্চি মতো পুরু। পার্বতীমন্দিরের চুরি যাওয়া সেই উল্কাপাথরের বেদীটাই বটে।

ব্রিফকেসটা অনেক চেষ্টায় খোলা হল। তার ভেতর প্যাকেট করা একগাদা কাগজ–দুর্বোধ্য সব আঁকজোক, নকশা, অঙ্ক, জ্যামিতি। একটা মোড়ক থেকে বেরুলো কয়েক টুকরো কালো অসম্ভব হাল্কা চাকতির মতো জিনিস। অরুণেন্দু ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলছিল উত্তেজনায়। বলল, এসব কী?

কর্নেল বললেন, দীপ্তেন্দু মিত্রের ব্রিফকেস। সম্ভবত তার আবিষ্কৃত সেই আশ্চর্য মিশ্র ধাতুর ফর্মুলা আর নমুনা আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি। এই ব্রিফকেসটা চুরি গিয়েছিল তার ল্যাবরেটরি থেকে।

মিঃ শর্মা বললেন, আর এখানে নয়। এখনই মোহান্তজীকে গ্রেফতার করতে হবে।…

.

০৭.

পরদিন সকালে পুলিশ ইন্সপেক্টর শর্মাজী এলেন সেচবাংলোয়। কর্নেল তখন ছিপ আর প্রজাপতি ধরা জাল নিয়ে বেরোবেন বলে তৈরি হচ্ছেন। বললেন, কী মিঃ শর্মা? আসামী কবুল করল কিছু।

শৰ্মাজী বললেন, মোহান্তজী ভীষণ ধূর্ত লোক। পেট থেকে কথা আদায় করা গেল না। তার ওপর প্রভাবশালী মহল থেকে ভীষণ চাপ শুরু হয়েছে। ওঁকে ছেড়ে দিতে হবে বলে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

ভোলা আর রামুকে পাওয়া যায়নি এখনও?

নাঃ। বেমালুম গা ঢেকে দিয়েছে। শৰ্মাজী হতাশভঙ্গিতে বললেন, তবে মোহান্তজীর পেছনের লোকটি কে, সেটা যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ কালোপাথর ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে না। বেদীর পাথরটা আর বিজ্ঞানী দীপ্তেন্দু। মিত্রের উদ্ভাবিত মিশ্র ধাতু–যার কোড নেম দিয়েছিলেন ব্ল্যাকস্টোন–উভয়ের মধ্যে সম্পর্কটা বোঝা যাচ্ছে না।

কর্নেল একটু হাসলেন। বোঝা গেছে খানিকটা। কাল রাত্রে দীপ্তেন্দুবাবুর ব্রিফকেসের গবেষণাপত্র ওল্টাচ্ছিলুম। আমি বিজ্ঞানী নই ঠিকই, কিন্তু প্রাথমিক কতকগুলো ব্যাপার আমার জানা আছে। পল্লবগ্রাহিতা বলতে পারেন।

বিলক্ষণ জানি। আপনি সর্বশাস্ত্রবিদ, পণ্ডিত মানুষ!

কর্নেল হো হো করে হেসে ফেললেন। দেখুন মিঃ শর্মা। পণ্ডিত এবং শিং ওয়ালা প্রাণীর কাছ থেকে আমি সব সময় একশো হাত দূরে থাকি। যাইহোক, দীপ্তেন্দুবাবুর নোটগুলোতে দেখছিলুম, একখানে মন্তব্য লেখা আছে : এক ধরনের কালো উল্কাপাথর পাওয়া গেছে বহু জায়গায়। বারাহিয়ার পার্বতীমন্দিরের ভেতর একটা বেদী আছে। সেটাও ওই শ্রেণীর পাথর। এ আসলে পাথরই নয়। একজাতের। মিশ্র ধাতু। খুব হাল্কা এবং শক্তিশালী।.কর্নেল উঠে গিয়ে ব্রিফকেসটা নিয়ে এলেন। এটা আর কাছে রাখা নিরাপদ নয়। আমার পরীক্ষা শেষ। আপনি নিয়ে যান এবার। তাছাড়া এটা কোর্ট এভিডেন্স।

শৰ্মাজী ব্রিফকেসটা নিয়ে বললেন, কিন্তু ব্যাপারটা এখনও পরিষ্কার হল না কর্নেল!

বেদীর পাথরটা দেখেই দীপ্তেন্দু মৈত্র ওইরকম ধাতু কৃত্রিম উপায়ে তৈরির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এটুকু অনুমান করতে পেরেছি। এবার বুঝতে আশা করি অসুবিধে হবে না মিঃ শর্মা, যিনি দীপ্তেন্দুবাবুর এই ব্রিফকেস চুরি, তাকে হত্যা এবং পরে অনুরাধাকে হত্যা–এতসব কাণ্ড করিয়েছেন, তাঁরই ওই বেদীটা হাতানোর চেষ্টা করা স্বাভাবিক। মোহান্তজীর পেছনের যে লোকটির কথা আপনি বলছিলেন, তিনি মূল অপরাধী। মেহান্তজী টাকার লোভে চেলাদের সাহায্যে তাঁরই হুকুম তামিল করেছেন।

মোহান্তজীকে কবুল করানো প্রায় অসম্ভব কর্নেল।

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে একটু ভেবে নিয়ে বললেন, একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে দীপ্তেন্দু যেভাবে হোক, টের পেয়েছিল তার ব্রিফকেস চুরি করে ডেড মাইনের ৩৪৭ নং পিটে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। হা–মোহান্তজীই লুকিয়ে রেখেছিলেন ভোলা ও রামুর সাহায্যে। নিশ্চয় দরাদরি চলছিল। তাই ওই ব্যবস্থা।

বেশি টাকা চেয়েছিলেন হয়তো।

তাই মনে হচ্ছে। তবে একজায়গায় ব্রিফকেস, অন্য জায়গায় বেদীর পাথর লুকিয়ে রাখার অতিরিক্ত সতর্কতা। দীপ্তেন্দুবাবু রাত্রে পিট নং ৩৪৭-এ ব্রিফকেস উদ্ধার করতে গিয়ে খুন হলেন। তার আগে ব্যাপারটা তার প্রেমিকা অনুরাধাকে বলে থাকবেন। তা না হলে অনুরাধা জানবে কেমন করে?

ঠিক, ঠিক। শৰ্মাজী বললেন। এ-ও বোঝা যাচ্ছে আপনি মোহান্তজীকে কাল সকালে কালোপাথরের কথা বলার পর উনি ভয় পেয়েছিলেন তাই ওটা ফুলঝরিয়ার টিলা থেকে সরিয়ে পিট নং ৩৪৭-এ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। এ পর্যন্ত সব স্বচ্ছ।

এই সময় একজন পুলিশ অফিসার সঙ্গে কনস্টেবল সহ হন্তদন্ত হাজির হলেন। শৰ্মাজী বললেন, কী ব্যাপার মিঃ সিং?

সাব ইন্সপেক্টর সুরেশ সিং বললেন, স্যার! ভোলা আর রামুর ডেড বডি পাওয়া গেছে রেল লাইনের ধারে। গুলি করে মারা হয়েছে দুজনকে। দুজনেরই মাথার পেছনে দিকে গুলি লেগেছিল।

শৰ্মাজী লাফিয়ে উঠলেন। কী সাংঘাতিক কাণ্ড!

কর্নেল বললেন, লোকটা এবার মরিয়া হয়ে উঠেছে, মিঃ শর্মা! ভোলা আর রামুর মুখ চিরকালের মতো বন্ধ করে দিয়েছে।

কিন্তু কে সে?

এখন জানি না আমরা। শুধু এটুকু জানি, দীপ্তেন্দুর উদ্ভাবিত মিশ্ৰধাতুর ফর্মুলা আর কালো বেদীটা সে হাতাতে চেয়েছিল। ভেবে দেখুন মিঃ শৰ্মা, এ দুটো জিনিস যে-কোনও ধনী দেশকে বিক্রি করতে পারলে কোটিপতি হয়ে যেত।

মোহন্তজীকে কবুল করাতেই হবে তাতে আমার ভাগ্যে যা ঘটে ঘটুক। বলে শর্মজী সদলবলে বেরিয়ে গেলেন বাংলো থেকে। ওঁদের জিপ দুটো সবেগে নেমে গেল উতরাইয়ের রাস্তায়।…

সন্ধ্যায় ডঃ রায় তার কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে। একটু পরে সুমন এসে গেল। তারপর এল ভাবনা। আড্ডা জমে উঠল। অরুণেন্দু নেই। ওর টো টো করে ঘোরা স্বভাব। মঞ্জুশ্রী পরিহাস করে বলল, অরুদা ভূত খুঁজতে গেছে। ভূত সঙ্গে নিয়ে তবে ফিরবে দেখে নিও।

গেটের কাছে লম্বা চওড়া একটা মূর্তি ভেসে উঠল আবছা আলোয়। ডঃ রায় বললেন, কে ওখানে? গম্ভীর গলায় সাড়া এল–আসতে পারি ডঃ রায়?

আরে! কর্নেল সাহেব! আসুন, আসুন! ডঃ রায় উঠে গিয়ে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এলেন কর্নেলকে।

কর্নেলকে দেখে ভাবনা মুখ টিপে হেসে বলল, আজ মাছ ধরতে যাননি কর্নেল?

গিয়েছিলুম। আজ দুটো মাছ ধরেছি। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন। ইয়ে–একটা প্রয়োজনে এলুম ডঃ রায়। সকালে আপনার ঘরে টাইপরাইটার দেখেছিলুম। একটা জরুরী চিঠি টাইপ করা দরকার। প্লিজ যদি

ডঃ রায় বললেন, স্বচ্ছন্দে! আসুন, ভেতরে আসুন।

ডাইনিং-কাম-ড্রয়িংরুমের একপাশে টেবিলের উপর ছোট্ট টাইপরাইটার। কর্নেল চিঠি টাইপ করতে বসলেন। ডঃ রায় বললেন, আপনি কাজ সেরে নিন। আমরা বাইরে আড্ডা দিই।

কিছুক্ষণ পরে চিঠি টাইপ করে বেরিয়ে এলেন কর্নেল। ততক্ষণে পটভর্তি কফি আর স্ন্যাক্স এসে গেছে। মীনাক্ষীদেবী সবাইকে কফি পরিবেশন করলেন। কর্নেল বললেন, অরুণেন্দুবাবুকে দেখছি না!

মঞ্জুশ্রী হেসে উঠল। অরুদা ভূত ধরে আনতে গেছে। এখনই এসে পড়বে দেখবেন।

কথায় কথায় মোহান্তজীকে গ্রেফতারের প্রসঙ্গ এল। তারপর দীপ্তেন্দুর ফর্মুলার কথা। ডঃ রায় বললেন, দীপ্তেন্দু গোপনে কী একটা রিসার্চ করছে, আভাস পেয়েছিলাম। কিন্তু খুলে কিছু বলেনি। ওর প্রতিভার পরিচয় পেয়েছি বহুবার। আমাকে যদি ব্যাপারটা বলত, গভমেন্ট থেকে ওর সেফটির ব্যবস্থা করতে পারতুম। বোকামি করে নিজের প্রাণটা খোয়ালো।

মীনাক্ষী বললেন, আর একটা প্রাণও গেল বোকামি করে। অরু কেন চেপে রেখেছিল, বুঝতে পারি না। তোমাকে জানিয়ে দিলেও তো পারত!

সুমন বলল, প্রেতশক্তিতে বিশ্বাস করতুম না। কিন্তু এখন করি। আমার ধারণা, অনুরাধা জানত, না কিছু। দীপ্তেন্দুর আত্মাই ওর হাত দিয়ে

মঞ্জুশ্রী বাধা দিয়ে বলল, শাট আপ! আবার আত্মা-টাত্মা আনা হচ্ছে? আবার কী সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে যাবে, দেখবে।

এইসব আলোচনা হতে হতে অরুণেন্দু এসে গেল। কর্নেলকে দেখে সে বলল, আরে আপনি! কতক্ষণ?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, অরণেন্দুবাবু মঞ্জুশ্রীর যদি আপত্তি হবে, আমি কিন্তু সিয়াসের ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী। আজ রাতে যদিও আকাশ পরিষ্কার! তবুও তিথিটা অমাবস্যার।

সুমন বলল, ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া! শুরু হোক তাহলে।

ডঃ রায় হাসতে হাসতে বললেন, আজ আমিও আসরে যোগ দিতে রাজি।

মঞ্জুশ্রী বলল, বাবা যদি পার্টিসিপেট করেন, আমার আপত্তি নেই।

অরুণেন্দু কঁচুমাচু মুখে বলল, কিন্তু মিডিয়াম কে হবে; তেমন কাউকে তো দেখছি না।

ভাবনা বলল, আমি হবো।

তুমি–

ভাবনা জোর দিয়ে বলল, দেখ না বাবা মিডিয়ামের উপযুক্ত কি না আমি। পরীক্ষা করে দেখতে দোষ কী? না হলে মঞ্জু তো আছেই।

মঞ্জুশ্রী আপত্তি করে বলল, আমি ওসবে নেই।

অরুণেন্দু একটু ভেবে বলল, ঠিক আছে। দেখা যাক।

সেদিনকার মতো ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল সবাই। দরজা জানালা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে মোম জ্বালানো হল। ভাবনা বসল একদিকে, অন্যদিকে অরুণেন্দু, কর্নেল, ডঃ রায় মঞ্জুশ্রী, মীনাক্ষী ও সুমন।

অরুণেন্দু তার অভ্যাসমতো বক্তৃতা দিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে কলম ও কাগজ দিল ভাবনাকে। তারপর বলল, আজকের আসরে আমরা গান্ধীজীর আত্মাকে চাইব। রেডি!

সে টেবিলে সংকেত করলে সবাই চুপচাপ গান্ধিজীর সম্পর্কে চিন্তা করতে থাকলেন। মিনিট দুয়েক পরে ভাবনার কলম কেঁপে উঠল। অরুণেন্দু আলতোভাবে কাগজটা টেনে নিয়ে লিখল, আপনি কি গান্ধীজী?

এরপর সে রাতের মতো প্রশ্ন ও জবাব যা লেখা হল, তা এই :

আমি অনুরাধা।

তোমাকে ডাকিনি। তুমি যাও।

আমার বলার আছে।

কী?

কালো পাথর।

আবার এসব কী?

মোহান্তজী।

অরুণেন্দু মুখার্জী।

আমার নাম লিখছ কেন?

অনুরাধা, তামাশা কোরো না।

অরুণেন্দু মুখার্জী।

অরুণেন্দু কাগজটা নিয়ে খাপ্পা হয়ে বলল, নিকুচি করেছে! বললুম– ভাবনাকে দিয়ে হবে না। ভাবনা দুষ্টুমি করছে। সে কাগজটা ফেলে দিতে যাচ্ছিল রাগ করে। কর্নেল তার হাত থেকে ওটা টেনে নিলেন। সবাই হেসে উঠল। অরুণেন্দু উঠে গিয়ে আলো জ্বেলে দিল।

সেই সময় ভাবনা হঠাৎ টেবিলের ওপর মাথা খুঁজে পড়ে গেল–অনুরাধার যেমনটি হয়েছিল। অবাক হয়ে মীনাক্ষী বললেন, ও কী! অজ্ঞান হয়ে গেছে নাকি ভাবনা? মঞ্জু, শীগগির জল নিয়ে আয়!

জল আনবার আগেই ভাবনা মাথা তুলে একটু হাসল। আস্তে হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠেছিল যেন।

অরুণেন্দু বিস্মিত দৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে বলল, সত্যি বলছ?

সত্যি!

কিন্তু

কিন্তু কি?

তাহলে আমার নাম বারবার লেখার মানে কি? অরুণেন্দু ক্রুদ্ধস্বরে বলল।

আমি তো জানি না, কী লিখেছি!

অরুণেন্দু গুম হয়ে ভেতরে চলে গেল। মঞ্জুশ্রী হাসতে হাসতে বলল, অরুদা খুব চটে গেছে। কর্নেল, কাগজে কী লেখা হয়েছে, পড়ুন না আমরা শুনি?

কর্নেল প্রশ্নোত্তর গুলো পড়লেন। খুব হাসাহাসি পড়ে গেল। ডঃ রায় বললেন, অরুর চটে যাওয়ার কারণ আছে। ভাবনা তুমি নিশ্চয় দুষ্টুমি করছিলে।

ভাবনা সিরিয়াস হয়ে বলল, না মেসোমশাই! সত্যি বলছি, আমি জানি না কী লিখেছি। আমার হাত দিয়ে আপনা আপনি লেখা হয়ে গেছে।

সুমন বলল, যদি সত্যি অনুরাধার আত্মা এসে থাকে, তাহলে একটা ব্যাখ্যা দওয়া যায়।

মীনাক্ষী বললেন, কী ব্যাখ্যা?

অরুণেন্দু মোহান্তজীর চেলা। মোহান্তজীর নামের সঙ্গে তাই ওর নামটাও এসে যায়। অরুণেন্দু আর একটু ধৈর্য ধরলে পারতো। তারপর কী লেখা হচ্ছে বোঝা যেত কোথায় গড়াচ্ছে ব্যাপারটা।

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। এবার ওঠা যাক, ডঃ রায়। প্রায় নটা বাজে।

ভাবনাও উঠল। মীনাক্ষী বললেন, একটু দাঁড়াও, ভাবনা। তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে সুশীলা।

ভাবনা বলল, থাক! আমি একা যেতে পারব।

কর্নেল বললেন, বরং আমি তোমাকে পৌঁছে দিতে পারি, ভাবনা।

বেশ তো! ভাবনা পা বাড়াল।

কর্নেল দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে বললেন, একটা কথা, ডঃ রায়! আপনার কি রিভলভার আছে?

ডঃ রায় চমকে গেলেন। কেন বলুন তো?

এমনি জানতে টাইছি।

ডঃ রায় বললেন, আছে। লাইসেন্সড আর্ম। ইণ্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় গুণ্ডা ডাকাতদের খুব প্রতাপ। তাই রাখতে হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ একথা জানতে চাইছেন কেন?

প্লিজ! অন্যভাবে নেবেন না। কর্নেল দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে বললেন। যদি কিছু মনে করেন, অস্ত্রটা একটু দেখতে চাই। দেখার অধিকার আইনত আমার নেই। তবু জাস্ট এ রিকোয়েস্ট।

ডঃ রায় অবাক হয়ে দ্রুত ভেতরে গেলেন। মীনাক্ষী, মঞ্জুশ্রী সুমন উদ্বিগ্নমুখে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইল। ভাবনা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

একটু পরেই ডাঃ রায় হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। স্ত্রীকে বললেন, মিনু রিভলভারটা অন্য কোথাও রেখেছ নাকি? আমার ড্রয়ারে তো নেই ওটা। আলমারির লকারেও নেই।

মীনাক্ষী উদ্বিগ্নমুখে বললেন, সে কী! আমি তো কোথাও রাখিনি।

এস তো, ভাল করে খুঁজে দেখি। আশ্চর্য! ওটা যাবে কোথায়?

কর্নেল বললেন, ঠিক আছে! চলি ডঃ রায়। আমার ধারণা, আপনার রিভলভারটা চুরি গেছে। আপনি এখনই পুলিশে ফোন করে জানান।

বলে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। রাস্তায় পৌঁছে মৃদুস্বরে বললেন, ভাবনা, ওদিকে নয়। এদিকে এস।

ভাবনার মুখে হাসি ঝিলিক দিচ্ছিল। বলল, ওদিকে কেন? আমাদের বাড়ি তো উল্টোদিকে।

ওই গাছের পেছনে পুলিসের গাড়ি আছে। ওরা তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে।

ভাবনা বলল, এক সাহস হবে না করুর, আমি অনুরাধার মতো বোকা নই।

বোকা বুদ্ধিমানের ব্যাপার নয়, ডার্লিং! আজ সকাল থেকে অনুরাধার খুনীর হাতে একটা রিভলভার এসে গেছে। মরিয়া হয়েই এবার সে রিভলভার জোগাড় করেছে। ভোলা ও রামু তোরবেলা পুলিশের ভয়ে ট্রেনে চেপে কোথাও পালাবে। ভেবেছিল। সে ওদের গুলি করে মেরেছে।

গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টার মিঃ সিং কর্নেলকে নমস্কার করলেন। কর্নেল ভাবনাকে বললেন, যাও ডার্লিং! মিঃ সিং তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন। সাবধানে থেক কিন্তু!

.

০৮.

বাংলোয় ফিরে কর্নেল ডিনারে বসেছেন, ডঃ কুসুমবিহারী রায় হন্তদন্ত এসে পৌঁছুলেন। মুখে স্বস্তির হাসি। বললেন, কি ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলুম বলার নয়। আসলে হয়েছিল কী, রিভলভারটা সবদিন সঙ্গে নিয়ে ঘুরি না। আমার টেবিলের ড্রয়ারেই থাকে। পরশুদিন অফিস থেকে ফিরে ওটা অন্যমনস্কভাবে টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিলুম। আমার গিন্নি সেটা কখন তুলে আমার কোটের পকেটে রেখে দিয়েছিলেন। আর বলবেন না! ওঁর যা ভুলো মন!

কোটের পকেটে পাওয়া গেছে তাহলে?

হ্যাঁ, কোট তো সবদিন পরি না। হ্যাঁঙ্গারে ভোলা থাকে। গিন্নি

ঠিক আছে। পাওয়া গেছে যখন, আর কথা কী?

ডঃ রায় একটু ইতস্তত করে বললেন, কিন্তু হঠাৎ আপনি আবার রিভলভার চুরি যাওয়ার কথা ভাবলেন কেন, প্লিজ যদি সেটা বলেন ধাঁধা কেটে যায়?

কর্নেল একটু হাসলেন। আচ্ছা ডঃ রায়, আপনার রিভলভারে গুলি পোরা ছিল কি?

গুলি বের করে ড্রয়ারে রাখি। তবে পরশু গুলি বের করে রাখতেও ভুলে গিয়েছিলুম।

আশা করি গুলিভরা রিভলভারই পেয়েছেন কোটের পকেটে!

ডঃ রায় ঢোক গিলে বললেন, হ্যাঁ।

আপনার রিভলভারটা কত ক্যালিবারের?

পয়েন্ট থার্টি এইট। কোল্ট।

পরপর ছটা গুলি ছোঁড়া যায় তাহলে?

হ্যাঁ।

ছটা গুলিই পেয়েছেন?

ডঃ রায় ঠোঁট ফাঁক করে রইলেন এবার। কর্নেলের খাওয়া ততক্ষণে শেষ হয়েছে। বেসিনে হাত ধুয়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন ডঃ রায়ের। ডঃ রায় ওঁর দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট বের করে আস্তে বললেন, দুটো গুলি নেই চেম্বারে।

কর্নেল বললেন, অরুণেন্দু কোথায় এখন, ডঃ রায়?

ডঃ রায় ফেটে পড়লেন এবার। ওই শুওরের বাচ্চার মতলব আমি আঁচ করেছিলুম ইদানিং ঘন-ঘন আসা এবং মোহান্তজীর আড্ডায় যাওয়া দেখে। ওঃ! শেষে আমাকেও ফাঁসিয়ে ছাড়ল! কর্নেল! বিশ্বাস করুন–আমি ভাবতেও পারিনে যে ও এতদূর এগোবে!

অরুণেন্দু কি এখনও আছে আপনারা কোয়ার্টারে?

না। তখনই কেটে পড়েছে। ওকে সামনে পেলে তো গুলি করে মারতুম।

উত্তেজিত হয়ে আর লাভ নেই, উঃ রায়! কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে চুরুট বের করলেন। লাইটার জ্বেলে প্রথমে ডঃ রায়ের সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে নিজের চুরুট ধরালেন। কাল ডেড মাইন এলাকায় ৩৪৭ নং পিটের কাছে অরুণেন্দু যখন গর্তে জলকাদার ভেতর খন্তা চালাচ্ছিল, গর্তের ধারে নরম মাটিতে ওর জুতোর স্পষ্ট ছাপ পড়েছিল। ফুলঝরিয়া লেকের টিলার নিচে বালির ওপর যে জুতোর ছাপ দেখেছিলুম, তার সঙ্গে হুবহু এক। এ বয়সেও আমার স্মৃতি প্রখর, ডঃ রায়। জুতোর ছাপের মিলটা না দেখা পর্যন্ত আমার অরুণেন্দুকে সন্দেহ হয়নি, তা নয়। মোহান্তজীর সঙ্গে ওঠাবাসা করে জানার পর থেকে সন্দেহ অবশ্যই হয়েছিল। তবে জুতোর ছাপ দেখে নিঃসংশয় হয়ে বুঝলুম কে অনুরাধার খুনী।

একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে কর্নেল ফের বললেন, কাল বিকেলে আমরা না গিয়ে পৌঁছলে ভাবনার দশাও অনুরাধার মতো হতো। অরুণেন্দু জানত মঞ্জুশ্রীকে তার সঙ্গে ডেড মাইন এলাকায় যেতে বললেও সে যাবে না। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল ভাবনাকে ডেকে পাঠানো মঞ্জুশ্রীর মারফত। ভাবনাকে খুন করাটা ভোলা ও রামুর ওপর চাপানো সহজ ছিল।

ডঃ রায় বললেন, ভাবনাকে খুন করার উদ্দেশ্য কী?

ভাবনা তার বন্ধুর মৃত্যুতে আঘাত পেয়ে বড্ড বেশি নাক গলাতে শুরু করেছিল। আমার কাছে তার যাতায়াত, আমাকে সঙ্গে নিয়ে মোহান্তজীর কাছে যাওয়া–সবই সে লক্ষ করে থাকবে। তার চেয়ে বড় কথা, অরুণেন্দুর সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে, অনুরাধা ভাবনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অতএব যা জানে, তা ভাবনারও জানার কথা। তাই ভাবনাকে খুন করার জন্য একটা মিথ্যা গল্প ফেঁদেছিল। ফুলঝরিয়া লেকের টিলা থেকে ভোলা বেদীর পাথর আনতে যায়নি–আসলে অরুণেন্দুই ওটা চুরি করে ওখানে পুঁতে রেখে এসেছিল। বেগতিক দেখে সরিয়ে এনে পিট নং ৩৪৭-এ ঢুকিয়ে রেখেছিল। তার চোখের সামনে পিট নং ৩৪৭ এর ফলক। অথচ সে ন্যাকা সেজে খোঁড়াখুঁড়ির ভান করছিল। ভাগ্যিস, ভাবনা অন্য জায়গা খুঁড়তে গিয়েছিল এবং দৈবাৎ আমরা গিয়ে পড়লাম ওখানে।

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ভোলা ও রামুর মুখ বন্ধ করতে আপনার রিভলভার চুরি করেছিল অরুণেন্দু। তাদের সঙ্গে তার এঁটে ওঠা অসম্ভব। কিন্তু রিভলভার পেলে আর চিন্তা থাকে না।

কিন্তু ওদের মুখ বন্ধ করার দরকার হল কেন?

বেদীটা ওদের সাহায্যেই চুরি করেছিল বলে। ওরা পুলিশের জেরার চোটে কবুল করত। সেই ভয়ে সম্ভবত ওদের পালাতে পরামর্শ দিয়েছিল এবং ট্রেনে চাপিয়ে দেবার ছুতো করে এসে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরেছিল। খাটালের একজন লোক দেখেছে অরুণেন্দু, ভোলা ও রামু একসঙ্গে রেললাইনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। পুলিশকে বলেছে সেই লোকটা।

মোহান্তজী কিছু জানতেন না?

জানলেও অক্ষম স্থবির মানুষ। ভোলা ও রামুর বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা তার নেই।

ডঃ রায় শ্বাস ছেড়ে বললেন, একটা কথা বুঝতে পারছি না। সুদীপ্ত খুন হবার সময় অরুণেন্দু এখানে ছিল। ওই সময় বেদীটাও চুরি যায়। বুঝতে পারছি, তার আগে সুদীপ্তের ফর্মুলাও সে হাতিয়ে নিয়েছে–

এবং ৩২৭ নং পিটে লুকিয়ে রেখেছে।

হ্যাঁ। কিন্তু ওগুলো নিয়ে চলে যায়নি কেন? কেন ও এতদিন অপেক্ষা করছিল। কলকাতা ফিরে গিয়েছিল গত ৩০ সেপ্টেম্বর। এল আবার ২৪ অক্টোবর বিকেলে।

কর্নেল হাসলেন। খদ্দের ঠিক করতে গিয়েছি। তাছাড়া আর কোনও কারণ থাকতে পারে না। কোনও বিদেশী রাষ্ট্রের এজেন্ট ঠিক করে সে আবার এসেছিল। যাই হোক, এজেন্ট ভদ্রলোক বেগতিক দেখে আজ বিকেলের ট্রেনে কেটে পড়েছেন।

ডঃ রায় চমকে উঠলেন। বলেন কি? পুলিশ তাকে গ্রেফতার করল না কেন?

প্রমাণ করা যাবে না কিছু। কর্নেল জোরালো হেসে বললেন। আমার পাশের ঘরেই ছিলেন ভদ্রলোক।

বিদেশী?

মোটেও না এসব ক্ষেত্রে অত বোকামি করা হয় না।

আলাপ হয়েছিল আপনার সঙ্গে?

না। আলাপের সুযোগ পেলুম কই?

আবার গাড়ির গরগর শব্দ হল বাইরে। তারপর পুলিশ ইন্সপেক্টর মোহন শর্মা এলেন হাসিমুখে। ডঃ রায়কে দেখে ভুরু কুঁচকে তাকালেন। কর্নেল পরিচয় করিয়ে দেবার আগেই শৰ্মাজী বললেন, ডঃ রায়কে আমি চিনি। দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ডঃ রায়ের ভাগ্নে অরুণেন্দুকে একটু আগে আমরা রেলস্টেশনে গ্রেফতার করেছি।

ডঃ রায় গম্ভীর মুখে বললেন, আমার কোনও দুঃখ নেই। ওর শাস্তি হোক।

কর্নেল পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বললেন, এই নিন মিঃ শর্মা! টাইপ করা চার ছত্র কবিতা আছে এতে। আমি নিজে টাইপ করেছি। তবে টাইপরাইটার ডঃ রায়ের। এবার অনুরাধাকে যে টাইপ করা চিঠি লিখে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল, তার টাইপ কেসের সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন। দুটো একই টাইপরাইটারে টাইপ করা। অরুণেন্দু আমার টাইপরাইটারটাই ব্যবহার করেছিল।

ডঃ রায় রাগে দুঃখে অস্থির হয়ে বললেন, শুওরের বাচ্চা! ওর ফাঁসি হোক।

শর্মাজী হাসতে হাসতে বললেন, সে কী ডঃ রায়! নিজের ভাগ্নেকে শুওরের বাচ্চা বলছেন?

ডঃ রায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কে নিজের ভাগ্নে? কোনও রক্তের সম্পর্ক আছে ভাবছেন নাকি? কলকাতায় আমার দিদির পাড়ায় থাকে। তাকে মাসি বলে সেই পাতানোর সম্পর্কে আমাকে মামা বলেছে। দিদির বয়স হয়েছে। একা মানুষ। ওই হতচ্ছাড়াকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল একবার। সেই থেকে আমি ওর মামা হয়ে গেলুম। মামা!

ডঃ রায় রেগেমেগে বেরিয়ে গেলেন।

শৰ্মাজী বললেন, কাল আপনার প্রোগ্রাম কী, কর্নেল?

ফুলঝরিয়া লেকে ছিপ ফেলা এবং বাগে পেলে দুটো অন্তত প্রজাপতি ধরা। বলে কর্নেল বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।

শৰ্মাজী বেরিয়ে বললেন, খামোকা বুড়ো-মানুষ মোহান্তজীকে টানাটানি করা হল। পরিণামে হয়তো বরাতে বদলি আছে। ওঁর মুরুব্বিরা প্রভাবশালী। তবে বারাহিয়া আর আমার সহ্য হচ্ছে না, কর্নেল! বদলিটা প্রয়োজন বলেই মনে করব। এমন হুজ্জুতে জায়গা আর কোথাও দেখিনি।

কর্নেল বললেন, আমার অবশ্য বারাহিয়াকে ভালই লাগে।

পুলিশ হলে ভাল লাগত না। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, সেজন্যই পুলিশ হইনি। মিলিটারিতে ঢুকেছিলুম।

Facebook Comment

You May Also Like