Sunday, May 19, 2024
Homeথ্রিলার গল্পরহস্য গল্পছবি (মিসির আলি) - হুমায়ূন আহমেদ

ছবি (মিসির আলি) – হুমায়ূন আহমেদ

তখন আমি উত্তরায় আস্ত একটা দোতলা বাড়ি ভাড়া করে একা থাকি। ব্যক্তিগত কারণে স্বেচ্ছা নির্বাসন বলা যেতে পারে। রান্নাবান্না করার জন্যে একজন বাবুর্চি রেখেছিলাম। তৃতীয় দিনে সে বাজার করার টাকা-পয়সা নিয়ে বের হলো, আর ফিরল না। চাল-ডাল-তেল অনেক কিছু কিনতে হবে বলে সে পনেরোশ’ টাকা নিয়েছিল। পরে দেখা গেল সে এই টাকা ছাড়াও আমার হাতঘড়ি, চশমার খাপ এবং টেবিলে রাখা রাজশেখর বসুর চলন্তিকা ডিকশনারিটাও নিয়ে গেছে। ডিকশনারি নেবার কারণ কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছে না। যে বাজারের ফর্দে কাচামরিচের বানান লেখে কাছা মরিচ, চলন্তিকা ডিকশনারির তার প্রয়োজন থাকলেও কাজে আসার কথা না। আমি ঠিক করে রাখলাম, মিসির আলি সাহেবের সঙ্গে দেখা হলে প্রসঙ্গটা তুলব। চলন্তিক ডিকশনারি সে কেন নিয়েছে এই ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই দিতে পারবেন। এরপর দু’বার তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। দু’বারই ভুলে গিয়েছি। তৃতীয়বার যেন এই ভুল না হয় তার জন্যে লেখার টেবিলে রাখা নোটবইতে লাল বলপয়েন্টে লিখে রেখেছি–

মিসির আলি
চলন্তিকা চুরি রহস্য

বর্ষার এক সন্ধ্যায় মিসির আলি উপস্থিত। তাঁর সঙ্গে মাঝারি সাইজের টকটকে লাল রঙের একটা ফ্লাস্ক। তিনি বললেন, চা এনেছি। চা খাবার জন্যে তৈরি হন। বলেই তিনি পাঞ্জাবির পকেট থেকে দুটা ছোট ছোট গ্লাস বের করলেন। আমি বললাম, বাসায় কাপ ছিল, পকেটে করে গ্লাস অ্যানার দরকার ছিল না।

মিসির আলি বললেন, যে চা এনেছি তা দামি চায়ের কাপে খেলে চলবে না। রাস্তার পাশে যেসব টেম্পরারি চায়ের দোকান আছে তাদের কাপে করে খেতে হবে। এবং দাঁড়িয়ে খেতে হবে।

আমি বললাম, দাঁড়িয়ে খেতে হবে কেন?

মিসির আলি বললেন, ঐ সব দোকানে একটা মাত্র বেঞ্চ থাকে। সেই বেঞ্চে কখনো জায়গা পাওয়া যায় না। দাঁড়িয়ে চা খাওয়া ছাড়া গতি কী? আরাম করে যে চা-টা শেষ করবেন। সেই উপায়ও নেই। ব্যস্ততার মধ্যে চা-পান শেষ করতে হবে। কারণ গ্রাসের সংখ্যা সীমিত। অন্য কাস্টমাররা অপেক্ষা করছে।

শিশুর পিতা শিশুর অন্তরে লুকিয়ে থাকে- কথাটা যেমন সত্যি তেমনি সব বড় মানুষের মধ্যে একজন শিশু লুকিয়ে থাকে তাও সত্যি। মিসির আলির মধ্যে লুকিয়ে থাকা শিশুটির কারণে আমাকে ফ্লাস্কের চা দাঁড়িয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে খেয়ে শেষ করতে হলো। মিসির আলি বললেন, প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যের জন্যে পরিবেশ আলাদা করা। ভাপা পিঠা খেতে হয় উঠানে, চুলার পাশে বসে। চিনাবাদাম খেতে হয়। খোলা মাঠে, পা ছড়িয়ে অলস ভঙ্গিতে। মদ খেতে হয় কবিতার বই হাতে নিয়ে।

তাই না-কি?

মিসির আলি বললেন, আপনাদের কবি ওমর খৈয়াম সেই রকমই বলেছেন।

অল্প কিছু আহার মাত্র আরেকখানি ছন্দমধুর কাব্য হাতে নিয়ে। মিসির আলিকে নিয়ে বারান্দায় বসলাম। ভালো বর্ষণ শুরু হয়েছে। বারান্দা থেকে উত্তরা লেকের খানিকটা চোখে পড়ছে। হলুদ সোডিয়াম ল্যাম্পের কারণে

আপনাকে গল্প শোনাতে এসেছি।

আমি বললাম, নিজেই গল্প শুনাতে চলে এসেছেন, ব্যাপারটা বুঝলাম না। আপনার গল্প শোনার জন্যে তো অনেক ঝোলাকুলি করতে হয়।

মিসির আলি বললেন, আপনি হঠাৎ একা হয়ে পড়েছেন। সারাজীবন আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব আপনাকে ঘিরে ছিল। এখন কেউ নেই। আমি নিজে নিঃসঙ্গ মানুষ। নিঃসঙ্গতা আমার ভালোই লাগে। আপনার লাগার কথা না। গল্প বলে আপনাকে খানিকটা আনন্দ দেব। কোনো এক সময় গল্পটা। আপনি লিখেও ফেলতে পারেন।

আমি বললাম, Unsolved মিসির আলি?

হ্যাঁ। যে গল্পটা বলব। তার ব্যাখ্যা বের করতে পারি নি।

আমি বললাম, শুরু করুন। মিসির আলি বললেন, এখানে গল্প বলব না। ঘরের ভেতরে চলুন। আপনার দৃষ্টি বৃষ্টির দিকে। একজন কথক শ্ৰোতার কাছে পূর্ণ Attention দাবি করে। আমি গল্প বলব। আর আপনি বৃষ্টি দেখবেন তা হবে না।

গল্পের সঙ্গে আর কিছু লাগবে?

মিসির আলি বললেন, চা এবং সিগারেট লাগবে। ফ্লাঙ্কে চা আছে। সিগারেট আছে আমার পকেটে। ভালো কথা আমি আপনার জন্যে একটা বই নিয়ে এসেছি। স্যার্জ ব্রেসলি’র লেখা লিওনার্দো দা ভিঞ্চি।

বিশেষ করে এই বইটি আনার কোনো কারণ আছে কি?

মিসির আলি বললেন, আছে। কিছু বই আছে নিঃসঙ্গ অবস্থায় পড়তে অসাধারণ লাগে। এটা সে রকম একটা বই।

আমরা দু’জন শোবার ঘরে ঢুকলাম। মিসির আলি বিছানায় পা তুলে আয়োজন করে গল্প শুরু করলেন। এত আয়োজন করে তাকে কখনো গল্প বলতে শুনি নি।

আমি যে খুব চা-প্রেমিক লোক তা না। তবে রাস্তার পাশে অস্থায়ী চায়ের দোকানে চা খেতে ভালো লাগে। কেন ভালো লাগে তা বলতে পারছি না। এটা নিয়ে কখনো ভাবি নি।

শীতকালের দুপুর। বাসায় ফিরছি। পথে চায়ের দোকান দেখে রিকশা দাঁড় করিয়ে চা খেতে গেলাম। অনেকদিন এত ভালো চা খাই নি। চমৎকার গন্ধ। মিষ্টি পরিমাণ মতো। ঘন লিকার। চা শেষ করে দাম দিতে গেছি, দোকানি হাই তুলতে তুলতে বলল, দাম দিতে হবে না।

আমি বললাম, দাম দিতে হবে না কেন?

আপনে আজ ফ্রি।

ফ্রি মানে?

দোকানি বিরক্ত মুখে বলল, প্রত্যেক দিন পাঁচজন ফ্রি চা খায়। আইজ আপনে পাঁচজনের মধ্যে পড়ছেন। আর প্যাচাল পারতে পারব না। বিদায় হন।

ফ্রি চা খেয়ে বিদায় হয়ে যাবার প্রশ্নই আসে না। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানলাম জনৈক ‘প্রবেচার স্যার দোকানিকে প্রতি মাসে শুরুতে ৪৫০ টাকা দেন। যাতে প্ৰতিদিন পাঁচজন কাস্টমারকে সে ফ্রি চা খাওয়াতে পারে। তিন টাকা করে কাপ। দিনে পনেরো টাকা। ত্রিশ দিনে ৪৫০ টাকা।

আমি বললাম, প্রফেসর সাহেবের নাম কী?

নাম জানি না। কুদ্দুস জানে, কুদ্দুসারে জিগান।

কুদ্দুস কে?

রুটি বেচে। সামনের গলির ভিতর ঢুকেন। চার-পাঁচটা বাড়ির পরে কুদ্দুসের ছাপড়া পাইবেন।

কুদ্দুসও কি পাঁচজনকে ফ্রি রুটি খাওয়ায়?

জে। হে লাভ করে মেলা। ডেইলি সত্ত্বর টেকা পায়। এক দুইজনারে ফ্রি খাওয়ায়। বাকি টেকা মাইরা দেয়। প্রবেচার স্যাররে ঘটনা বলেছি। উনি কোনো ব্যবস্থা নেন নাই।

উনি থাকেন কোথায়?

জানি না। কুদ্দুস জানতে পারে। তারে জিগান গিয়া।

আমি কুদ্দুসের সন্ধানে বের হলাম। সে রাস্তার পাশে ছাপড়া ঘর তুলে রুটি, ডাল এবং সবজি বিক্রি করে। শুকনা মরিচের ভর্তা ফ্রি। দেখা গেল। সে প্রফেসার স্যারের নাম ছাড়া অন্য কিছুই জানে না। প্রফেসার স্যারের নাম জামাল। কুদ্দুসকে জামাল স্যারের ওপর অত্যন্ত বিরক্ত মনে হলো। সে বলল, এমন ঝামেলার মধ্যে আছি। দুনিয়ার না খাওয়া মানুষ ভিড় কইরা থাকে ফ্রি খানার জন্য। পাঁচজনের বেশি খাওয়াইতে পারি না। এরা বুঝে না।

আমি বললাম, জামাল সাহেব কোথায় থাকেন জানো?

জানি না।

এই এলাকাতেই কি থাকেন?

বললাম তো জানি না।

উনার বয়স কত? চেহারা কেমন?

রোগা-পাতলা। মাথায় চুল কম। গায়ের রঙ ময়লা। চশমা আছে। বয়স কত বলতে পারব না। এখন যান। ত্যক্ত কইরেন না। ঝামেলায় আছি।

আমার জন্যে জামাল সাহেবকে খুঁজে বের করা কোনো সমস্যা না। বাসার ঠিকানা বের করে এক ছুটির দিনে সকাল এগারোটার দিকে উপস্থিত হলাম। একতলা বাড়ি। সামনে বাগান। বাগানে দেশি ফুলের গাছ। ক্যামিনি, হাসনাহেনা এইসব। বিশাল একটা কেয়া গাছের ঝোপ দেখলাম। বাড়ির সামনে কেউ সাপের ভয়ে কেয়া গাছ লাগায় না। উনি লাগিয়েছেন। বাঁশের একটা গেটের মতো আছে! গোটে বিখ্যাত নীলমণি লতা। বিখ্যাত কারণ নীলমণি লতা নাম রবীন্দ্রনাথের দেয়া। বড় গাছের মধ্যে একটা কদম গাছ এবং একটা বকুল গাছ। অচেনা একটা বিশাল গাছ দেখলাম।

কলিংবেল চাপ দিতেই দশ-এগারো বছরের এক কিশোরী দরজা খুলে দিল। আমি অবাক হয়ে কিশোরীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। অবাক হবার কারণএমন মিষ্টি চেহারা! আমার প্রথমেই জিজ্ঞেস করা উচিত, এটা কি জামাল সাহেবের বাড়ি? তা না করে আমি বললাম, কেমন আছ মা?

মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল, চাচা, আমি ভালো আছি।

এই গাছটার নাম কী?

ছাতিম গাছ। অনেকে বলে ছাতিয়ান।

জামাল সাহেব তোমার কে হন?

বাবা।

উনি বাড়িতে আছেন?

বাজার করতে গেছেন। চাচা, ভেতরে এসে বসুন। বাবা চলে আসবেন।

মা, তোমার নাম কী?

আমার নাম ইথেন। বাবা কেমিস্ট্রির টিচার তো, এইজন্যে আমার নাম। রেখেছেন ইথেন। চাচা, ভেতরে আসুন তো।

আমি ভেতরে ঢুকলাম। বসার ঘরে শীতলপাটি বিছানো। শীতলপাটির ওপর বেতের চেয়ার। দেয়ালে একটাই ছবি। জলরঙে আঁকা ঢাকা শহরে বৃষ্টি। এই একটা ছবিই ঘরটাকে বদলে ফেলেছে। ঘরটায় মিষ্টি স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে। আমি নিজেও এই ঘরের স্বপ্নের অংশ হয়ে গেছি।

ইথেন আমাকে লেবুর শরবত বানিয়ে খাওয়াল এবং মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গল্প করতে লাগল–

আমাদের কাজের মেয়েটার নাম শুনলে আপনি চমকে উঠবেন। নাম বলব চাচা?

বলো।

ওর নাম সুধারানী।

সুধারানী নাম শুনে চমকাব কেন?

কারণ নামটা হিন্দু, কিন্তু সে মুসলমান। সপ্তাহে সে একদিন ছুটি পায়। আজ তাঁর ছুটি। সে ঘরেই আছে, কিন্তু কোনো কাজ করবে না। এক কাপ চ পর্যন্ত নিজে বানিয়ে খাবে না। আমাকে বলবে, ইথু, এক কাপ চা দাও। আমাকে সে ডাকে ইথু।

ছুটির দিনে রান্না কে করে? তোমার বাবা?

হুঁ। আমি বাবাকে সাহায্য করি। বাবা লবণের আন্দাজ করতে পাৱে না। আমি লবণ চেখে দেই। আজ আমি একটা আইটেম রান্না করব।

কোন আইটেম?

আগে বলব না। আপনি খেয়ে তারপর বলবেন কোনটা আমি রোধেছি। আমি বললাম, মা, তুমি আমাকে চেনো না। আজ প্রথম দেখলে। আমি কী জন্যে এসেছি তাও জানো না। আমাকে দুপুরের খাবার দাওয়াত দিয়ে বসে আছ?

হ্যাঁ। কারণটা বলব?

বল।

আমার মা তখন খুবই অসুস্থ। বাবা মা’কে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে এসেছেন। যেন মা’র মৃত্যুর সময় আমি এবং বাবা মা’র দুই পাশে থাকতে পারি। কাঁদতে ইচ্ছা হলে আমি যেন চিৎকার করে কাঁদতে পারি। হাসপাতালে তো চিৎকার করে কাঁদতে পারব না। অন্য রোগীরা বিরক্ত হবে। তাই না চাচা?

হ্যাঁ।

এক রাতে মা’র অবস্থা খুব খারাপ হলো। আমি ঘুমাচ্ছিলাম, বাবা আমাকে ঘুম থেকে তুলে মা’র কাছে নিয়ে গেলেন। মা বললেন, আমার ময়না সোনা চাঁদের কণা ইথেন বাবু কেমন আছ?

আমি বললাম, ভালো আছি মা।

মা বলল, মাগো! আমি তো চলে যাব, মন খারাপ করো না।

আমি বললাম, আচ্ছা।

মা বলল, আমি থাকব না। তুমি তোমার বাবার সঙ্গে থাকবে, বড় হবে। অনেকের সঙ্গে তোমার পরিচয়ও হবে। যেসব পুরুষমানুষ তোমাকে প্রথমেই মা ডেকে কথা শুরু করবে ধরে নিবে এরা ভালো মানুষ। কারণ তুমি খুব রূপবতী হবে। অতি অল্প পুরুষমানুষই অতি রূপবতীদের মা ডাকতে পারে। এই বিষয়টা আমি জানি, কারণ আমিও অতি রূপবতীদের দলের।

আমি বললাম, এই গল্পটা থাকুক মা। তুমি কাঁদতে শুরু করেছ। আমি কান্না সহ্য করতে পারি না।

ইথেন চোখ মুছতে মুছতে বলল, গল্পটা তো শেষ হয়ে গেছে। আর নাই। আপনি আমাকে মা ডেকে কথা শুরু করেছেন তো, এইজন্যে আমি জানি আপনি আমার আপনজন। চাচা ম্যাজিক দেখবেন?

তুমি ম্যাজিক জানো না-কি?

অনেক ম্যাজিক জানি। দড়ি কেটে জোড়া দেবার ম্যাজিক। কয়েন অদৃশ্য করার ম্যাজিক, অংকের ম্যাজিক।

কার কাছে শিখেছ?

বই পড়ে শিখেছি। আমার জন্মদিনে বাবা আমাকে একটা বই দিয়েছেন। বই-এর নাম- ছোটদের ম্যাজিক শিক্ষা। সেখান থেকে শিখেছি। আমি ঠিক করেছি। বড় হয়ে আমি জুয়েল আইচ আংকেলের কাছে ম্যাজিক শিখব। আচ্ছা! চাচা উনি কি আমাকে শেখাবেন?

শিখানোর তো কথা। আমি যতদূর জানি উনি খুব ভালো মানুষ।

ইথেন আয়োজন করে ম্যাজিক দেখাল। দড়ি কাঁটার ম্যাজিকে প্রথমবার কি যেন একটা ভুল করল। কাটা দড়ি জোড়া লাগল না। দ্বিতীয়বারে লাগল। আমি বললাম, এত সুন্দর ম্যাজিক আমি আমার জীবনে কম দেখেছি মা।

সত্যি বলছেন চাচা?

আমি বললাম, অবশ্যই সত্যি বলছি। ম্যাজিক দেখানোর সময় ম্যাজিশিয়ানের মুখ হাসি হাসি থাকলেও তাদের চোখে কুটিলতা থাকে। দর্শকদের তারা প্রতারিত করছে এই কারণে কুটিলতা। ম্যাজিকের বিস্ময়টাও তাদের কাছে থাকে না। কারণ কৌশলটা তারা জানে। তোমার চোখে কুটিলতা ছিল না। ছিল আনন্দ এবং বিস্ময় বোধ।

জামাল সাহেব বাজার নিয়ে ফিরলেন। আমাকে তাঁর মেয়ের সঙ্গে ঘরোয়া ভঙ্গিতে গল্প করতে দেখে মোটেই অবাক হলেন না। যেন আমি তার দীর্ঘদিনের পরিচিত কেউ। ভদ্রলোক স্বল্পভাষী এবং মৃদুভাষী। সারাক্ষণই তাঁর ঠোঁটের কোণায় হাসি লেগে থাকতে দেখলাম। ফোন সারাক্ষণই তার চোখের সামনে আনন্দময় কিছু ঘটছে এবং তিনি আনন্দ পাচ্ছেন।

পাঁচজনকে রুটি খাওয়ানো এবং চা খাওয়ানো প্রসঙ্গে বললেন, খেয়াল আর কিছু না। খেয়ালের বশে মানুষ কত কী করে।

আমি বললাম, পাঁচ সংখ্যাটি কি বিশেষ কিছু?

তিনি বললেন, না রে ভাই। আমি পিথাগোরাস না যে সংখ্যা নিয়ে মাথা ঘামাব। আমি সামান্য কেমিস্ট।

বিদায় নিতে গেলাম, তিনি খপ করে আমার হাত ধরে বললেন, পাগল হয়েছেন! দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে তবে যাবেন। আমার মেয়ের আপনি অতিথি।

আমি বললাম, ঐ ছড়াটা জানেন? আমি আসছি আৎকা। আমারে বলে ভাত খা।

ভদ্রলোক হাসতে হাসতে ভেঙে পড়লেন, যেন এমন মজার ছড়া তিনি তার জীবনে শোনেন নি। তিনি মেয়েকে ডেকে বললেন, ইথেন, তোর চাচু কী বলে শুনে যা! তোর চাচু বলছে- আমি আসছি আৎকা। আমারে বলে ভাত খা। হা হা হা।

আমি পুরোপুরি ঘরের মানুষ হয়ে দুপুরে তাদের সঙ্গে খাবার খেলাম। খাবারের আগে আমাকে টাওয়েল-লুঙ্গি দেয়া হলো। নতুন সাবানের মোড়ক খুলে দেয়া হলো। আমাকে গোসল করতে হলো। আমি দীর্ঘ জীবন পার করেছি। এই দীর্ঘ জীবনে বেশ কয়েকবার নিতান্তই অপরিচিতজনদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। ঐ যে গানটা আছে না- আমাকে তুমি অশেষ করেছ, এ কি এ লীলা তব।

খাবার টেবিলে ইথেন বলতে লাগল, বাবা, তুমি চাচুকে মা’র গল্পটা বিলো। কীভাবে তোমাদের বিয়ে হয়েছে সেটা বলে।

জামাল সাহেব বললেন, আরেকদিন বলি মা?

ইথেন বলল, আজই বলতে হবে কারণ চাচু আর আসবে না।

কি করে জানো উনি আর আসবেন না।

ইথেন বলল, আমার মন বলছে। আমার মন যা বলে তাই হয়।

জামাল সাহেব গল্প শুরু করলেন। অস্বস্তি নিয়েই শুরু করলেন। জামাল

সাহেবের জবানিতে গল্পটা এই—

আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। বৃত্তি পরীক্ষা দেব। মন দিয়ে পড়ছি। বৃত্তি পেলে বাবা আমাকে একটা সাইকেল কিনে দেবেন বলেছেন। নতুন সাইকেলের লোভে পড়াশোনা। বৃত্তি পাওয়ার লোভে না।

একদিন অংক করছি, হঠাৎ অংক বইয়ের ভেতর থেকে একটা মেয়ের পাসপোর্ট সাইজ ছবি বের হয়ে এলো। ছয়-সাত বছর বয়েসি মেয়ের ছবি। ছবির পেছনে লেখা জেসমিন। একজন সেই ছবি সত্যায়িত করেছেন। যিনি সত্যায়িত করেছেন তাঁর নাম এস রহমান। জেলা জজ। আমি কিছুতেই ভেবে পেলাম না এই ছবি কোথেকে এলো। আমার অংক বই কে ঘাটাঘাটি করবে? বাবাকে ছবিটা, দেখলাম। বাবা বললেন, কে এই মেয়ে? আশ্চর্ষ তো! আচ্ছা যা খুঁজে বের করছি। এটা কোনো ব্যাপারই না। জেলা জজ রহমান সাহেবের পাত্ত লাগালেই হবে। ছবিটা রেখে দে, চাইলে দিবি।

আমি আমার সুটকেসে ছবিটা রেখে দিলাম। বাবা কখনো ছবি চাইলেন না। বাবার স্বভাবই এ রকম, যে কোনো ঘটনা শুরুতে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে ঘটনা সব গুরুত্ব হারাবে।

তার প্রায় আড়াই বছর পরের কথা। ঢাকা কলেজে ভর্তি হতে গিয়েছি। ফর্ম, এটেক্টেড ছবি হেড ক্লার্ক সাহেবকে দিলাম। তিনি সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে বললেন–দুই কপি ছবি দিতে হবে। তিনি কপি কেন? এটা তো তোমার ছবিও না।

তিনি যে ছবি ফেরত দিলেন, সেটা ঐ জেসমিন মেয়েটার ছবি। তবে আগের ছবিটা না। অন্য ছবি। এতই সুন্দর ছবি যে একবার তাকালে চোখ ফেরানো অসম্ভব ব্যাপার।

আমি জেসমিনের তৃতীয় ছবিটা পেলাম তার দুই বছর পর। রিকশা থেকে নামার পর রিকশাওয়ালাকে মানিব্যাগ বের করে ভাড়া দিচ্ছি। রিকশাওয়ালা বলল, স্যার মানিব্যাগ থাইকা কী যেন নিচে পড়ছে।

তাকিয়ে দেখি একটা ছবি। জেসমিন নামের মেয়েটির ছবি। মেয়েটা এখন তরুণী। সৌন্দর্যে-লাবণ্যে ঝলমল করছে।

ছবিগুলি কোথেকে আমার কাছে আসছে তার কোনো হদিস বের করতে পারলাম না। একধরনের ভয় এবং দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে গেলাম। সবচেয়ে ভয় পেলেন আমার মা। তিনি পীর সাহেবের কাছ থেকে তাবিজ এনে গলায় এবং কোমরে প্রালেন।

জামাল সাহেব দিম নেবার জন্যে থামলেন।

আমি বললাম, ছবিগুলি যে একই মেয়ের সেই বিষয়ে আপনি নিশ্চিত?

জি। জেসমিনের ঠোঁটের নিচে বা দিকে একটা লাল তিল ছিল। একই রকম তিল আমার মেয়ে ইথেনের ঠোঁটের নিচেও আছে। জেনেটিক ব্যাপার। যাই হোক, সব মিলিয়ে আমি পাঁচবার মেয়েটিয়া ছবি পাই। আমি যে পাঁচজনকে চা এবং রুটি খাওয়াই তার পেছনে হয়তো অবচেতনভাবে পাঁচ সংখ্যাটি কাজ করেছে।

তিনবার ছবি পাওয়ার ঘটনা শুনলাম। বাকি দু’বার কীভাবে পেলেন বলুন।

জামাল সাহেব বললেন, শেষবারেরটা শুধু বলি- শেষবার যখন ছবি পাই, তখন আমি আমেরিকায়। মোরহেড স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এলাকালয়েডের ওপর পিএইচডি ডিগ্রির জন্যে কাজ করছি। জায়গাটা নৰ্থ ডাকোটায়, কানাডার কাছাকাছি। শীতের সময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ে। টেম্পরেচার শূন্যের অনেক নিচ পর্যন্ত নামে। আমি গরম একটা ওভারকোট কিনেছি। তাতেও শীত আটকায় না। একদিন লাইব্রেরিতে গিয়েছি। লাইব্রেরিয়ানের হাতে ওভারকেটের পকেটে রাখা লাইব্রেরি কার্ড দিলাম। লাইব্রেরিয়ান কার্ড হাতে নিয়ে বলল, Your wife? very pretty, আমি অবাক হয়ে দেখলাম লাইব্রেরি কার্ডের পকেটে জেসমিনের ছবি। এই ছবি কোনো একটা পুরনো বাড়ির ছাদে তোলা। ছাদের রেলিং দেখা যাচ্ছে। রেলিং-এ কিছু কাপড় শুকাতে দেয়া হয়েছে। জেসমিন বসা আছে একটা বেতের মোড়ায়। তার হাতে একটা পিরিচ। মনে হয় পিরিচে আচার। কারণ জেসমিনের চারদিকে অনেকগুলি আচারের শিশি। রোদে শুকাতে দেয়া হয়েছে।

ছবির মেয়েটির সঙ্গে কোনোদিন দেখা হবে ভাবি নি। দেখা হয়ে গেল। দেশে ফিরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর হিসেবে জয়েন করেছি। একদিন নিউমার্কেটে গিয়েছি ষ্টেশনারি কিছু জিনিসপত্র কিনতে। হঠাৎ একটা বইয়ের দোকানের সামনে মেয়েটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। মনে হলো এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব। কীভাবে নিজেকে সামলালাম জানি না। আমি লাজুক প্রকৃতির মানুষ। সব লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে ছুটে গেলাম! মেয়েটির পাশে দাঁড়ালাম। সে চমকে তাকাল। আমি বললাম, আপনার নাম কি জেসমিন?

মেয়েটি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

আপনি কি কোনো কারণে আমাকে চেনেন?

সে না-সূচক মাথা নাড়ল। আমি বললাম, আপনার কিছু ছবি আমার কাছে আছে।

আমার ছবি?

হ্যাঁ বিভিন্ন বয়সের আপনার পাঁচটা ছবি।

বলেই দেরি করলাম না। পকেট থেকে মানিব্যাপ বের করলাম। তখন আমি পাঁচটা ছবিই সবসময় সঙ্গে রাখতাম। আমি বললাম, এইগুলি কি আপনার ছবি?

জেসমিন হ্যা-সূচক মাথা নাড়ল। আমার কাছে মনে হলো, তাঁর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা। আমি বললাম, এই ছবিগুলি আমার কাছে কীভাবে এসেছে আমি জানি না। আপনার কি কোনো ধারণা আছে?

জেসমিন জবাব দিল না।

আমি কি আপনার সঙ্গে কোথাও বসে এক কাপ চা খেতে পারি?

আমি চা খাই না।

তাহলে আসুন আইসক্রিম খাই। এখানে ইগলু আইসক্রিমের একটা দোকান আছে।

আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে না।

আমি বললাম, আপনাকে আইসক্রিম খেতে হবে না। আপনি আইসক্রিম সামনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাককেন। প্লিজ, প্লিজ প্লিজ।

জেসমিন বলল, চলুন।

সাতদিনের মাথায় জেসমিনকে বিয়ে করলাম। বাসররাতে সে বলল, ছবিগুলি কীভাবে তোমার কাছে গিয়েছে আমি জানি। কিন্তু তোমাকে বলব না। তুমি জানতে চেও না।

আমি জানতে চাই নি। এই গ্রহের সর্বশ্রেষ্ঠ মেয়েটিকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছি, আর কিছুর আমার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া কম জানার ব্যাপারটায় সুখ আছে। Ignorence is bliss. আপনি কি জেসমিনের পাঁচটা ছবি দেখতে চান?

চাই।

ছবি দেখে আপনি চমকবেন।

আমি ছবি দেখলাম এবং চমকালাম। অবিকল ইথেন। দু’জনকে আলাদা করা অসম্ভব বলেই মনে হলো। জামাল সাহেব বললেন, আমি পড়াই বিজ্ঞান। যে বিজ্ঞান রহস্য পছন্দ করে না। কিন্তু আমার জীবন কাটছে রহস্যের মধ্যে। অদ্ভুত না?

অদ্ভুত তো বটেই। আচ্ছা ছাদে জেসমিনের যে ছবিটা তোলা হয়েছে। চারদিকে আচারের বোতল। সেই বাড়িটা কি দেখেছেন।

জামাল সাহেব বললেন, সে রকম কোনো বাড়িতে জেসমিনরা কখনো ছিল না। ছবি বিষয়ে এইটুকুই শুধু জেসমিন বলেছে।

আমি বিদায় নিয়ে ফিরছি। জামাল সাহেব আমাকে গোট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। শেষ মুহুর্তে বললেন, আমার মেয়ে ইথেন কিছুদিন আগে হঠাৎ করে বলল, তার মা’র ছবি কীভাবে আমার কাছে এসেছে তা সে জানে। তবে আমাকে কখনো বলবে না। আমি বলেছি, ঠিক আছে মা, বলতে হবে না।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments