Sunday, May 17, 2026
Homeকিশোর গল্পবড়মামা ও নরনারায়ণ - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বড়মামা ও নরনারায়ণ – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বড়মামা ও নরনারায়ণ – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বড়মামা খেতে খেতে বললেন, ‘আমি একটা গাধা।’

মেজমামার বাঁ হাতে একটা বই, ডান হাতে ঝোলে ডোবানো রুটির টুকরো। এইটাই তাঁর অভ্যাস। সামান্য সময়ও নষ্ট করা চলবে না। অগাধ জ্ঞানসমুদ্র, আয়ু অল্প, বহুবিঘ্ন। সব সময় পড়ে যাও, সকালের কাগজ বাথরুমে বসে বসেই পড়েন। এখন যে বইটা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পড়ছেন, সেটা কাক সম্বন্ধে। কাকের স্বভাব, কাকের নিয়মনিষ্ঠা। পড়তে পড়তে বললেন, ‘কী। করে বুঝলে! তোমার কান দুটো অবশ্য একটু বড়ই, ঝোলা ঝোলা, সাধারণ মানুষের কান অত বড় হয় না। প্রকৃতির ব্যাপার। বোঝা শক্ত। কে যে কীভাবে জন্মায়! চিনে মেয়েদের শিং বেরোচ্ছে। কলকাতায় ছেলেদের ন্যাজ বেরোচ্ছে।’

রুটির টুকরোটা মুখে ঢোকালেন। কোলের ওপর এক ফোঁটা ঝোল পড়ল। আগেও দু-এক ফোঁটা পড়েছে। দৃকপাত নেই। জ্ঞানতপস্বী।

বড়মামা বললেন, ‘আমি গাধা, তার প্রমাণ আমার গরু। আমার মতো গাধা না হলে কেউ ওরকম তিনটে গরু পোষে না। তোরাই বল, ওই গরু তিনটে আজ পর্যন্ত ক’ছটাক দুধ দিয়েছে?’

মাসিমা যেন বেশ খুশিই হলেন, ‘ঠিক বলেছ বড়দা! গরু দিয়েই প্রমাণ করা যায় তুমি একটা গাধা।’

মেজমামা সব সময় বাঁকা পথ ধরেন। প্রতিবাদ করার জন্যে মুখিয়ে আছেন। বড়মামা বলেন, প্রোটেস্টান্ট। মেজোমামার উচিত ছিল চুপ করে শুনে যাওয়া। তা আর হল কই! হঠাৎ বলে। বসলেন, ‘কেন? ওয়ান্স আপন এ টাইম তোমার কালো গরুটা হঠাৎ দিন তিনেক দুধ দিয়ে। ফেলেছিল। তুমি সেই দুধ দেখে কলকাতায় রবারের জুতো পায়ে দিয়ে নাচতে নাচতে পিছলে। পড়ে গিয়েছিলে। একদিন গরুর অনারে সত্যনারায়ণ পুজো হয়েছিল। তুমি বলেছিলে সিন্নি খেয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, দুধে এতই নাকি ফ্যাট। একদিন মেজারিং গ্লাসে করে প্রত্যেককে এক আউন্স করে দুধ খাইয়েছিলে। সেই খাঁটি দুধ খেয়ে আমাদের সব পেট খারাপ হয়ে গেল।

গরুর ভাষা নেই। প্রতিবাদ করতে জানে না বলে যা খুশি তাই বলে যাবে?’

‘হ্যাঁ, দিয়েছিল ঠিকই। তারপর? তারপর আর দিয়েছে কি?’

‘কেন দেয়নি?’

‘তোর মতো একগুঁয়ে স্বভাব বলে দেয়নি। দিতে পারি তবু দোব না। কী করতে পারো করো।’

মেজোমামা এবার সশব্দে চেয়ার ঠেলে উঠে পড়লেন, ‘আমি আর তোমার ভুলো কালো গরু এক শ্রেণিতে পড়লুম! অসম্ভব। আর সহ্য করা যায় না।’ মেজোমামা বিদ্যাসাগরী চটির ফটাস ফটাস শব্দ তুলে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। খুব রেগে গেছেন! যাক বাবা পুডিংটা শেষ করে গেছেন।

মাসিমা বললেন, ‘তোমার বড়দার ভীষণ পেছনে লাগা স্বভাব!’

বড়মামা বললেন, ‘গাধার ভাই গরুই হয়। আমাদের ভায়ে ভায়ে হচ্ছে, তুই এর মধ্যে নাক গলাতে আসিসনি।’

‘ঠিক আছে।’

মাসিমাও রাগ করে উঠে গেলেন। বড়মামা আমাকে বললেন, ‘এদের আজ কী হয়েছে বল তো? কথায় কথায় রেগে যাচ্ছে! সব ব্লাডপ্রেসারের রুগি। গরু তিনটেরও প্রেসার। আমার যেমন বরাত!’

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর আমার চোখ ঘুমে জুড়ে আসে। ধপাস করে শুয়ে পড়তে পারলে আর কিছুই চাইনা। আজও সেই তালেই ছিলুম। পরিষ্কার বিছানা। নরম মাথার বালিশ, কোলবালিশ। মৃদু পাখার বাতাস। জানালার বাইরে সাদা ফুলে ফুটফুটে কামিনী গাছ। থমথম করছে মিষ্টি গন্ধ। কোণের দিকে বড়মামার আরামকেদারার কাছে তে-ঠ্যাঙা বড় টেবিল ল্যাম্পের মাথার ওপর হালকা-সবুজ রঙের শেড স্বপ্নের মতো আলো ছড়িয়ে রেখেছে। ঘুম আয়, ঘুম আয় বলতে হয় না, ঘুম যেন ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

বিছানায় পা দুটো তুলে সবে শুতে যাচ্ছি, বড়মামা, ‘হাঁ হাঁ করে উঠলেন, ‘এর মধ্যে শুবি কী রে! একটা ফিউচার প্ল্যান তৈরি করতে হবে না?’

‘কীসের প্ল্যান?’

‘গরু ছেড়ে দিলুম। আর একটা কিছু ধরতে হবে তো।’

‘কেন? কুকুর রয়েছে গোটা ছয়েক, পাখি রয়েছে খাঁচায় খাঁচায়, দুটো বেড়াল।

‘ধ্যার! ওদের কী ধরব! বড় একটা কিছু ধরতে হবে। মহান, মহৎ, অসীম, অনন্ত।’

‘সে আবার কী?’

‘আমি একটা লঙ্গরখানা খুলব।’

‘লঙ্গরখানা?

‘কিছুই জানিস না? রোজ হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি তৈরি করে দুপুরবেলা দরিদ্র মানুষদের খাওয়াব। রাজা রাজেন মল্লিকের মতো। দাতব্য চিকিৎসালয় খুলে ফ্রি চিকিৎসা চালাব। একটু একটু করে আমার এই সমাজসেবা এমন চেহারা নেবে—হেঁ হেঁ।’

‘হেঁ হেঁ মানে?’

‘হেঁ হেঁ মানে মাদার টেরেসা! তোর মেজোকে বলে আয় মনের জোর, ইচ্ছাশক্তি, তেজ আর ত্যাগ থাকলে নোবেল পুরস্কার পাওয়াটা এমন কিছু শক্ত কাজ নয়। শুধু পুডিং খেলেই হয় না, পুডিং খাওয়াতেও হয়। আমি আমি করলে নিজের ভুঁড়িটাই বাড়ে। তুমি তুমি করলে আমিটা পেল্লায় বড় হয়ে বিশ্ব-আমি হয়। বিশ্বামি ভবেৎ?’

‘বিশ্বামি?’

‘হ্যাঁ স্বরসন্ধি। আকারের পর আকার থাকিলে উভয় মিলিয়া দীর্ঘাকার হয়। এখুনি জিগ্যেস করবি দীর্ঘাকার কী? দীর্ঘ প্লাস আকার। এও স্বরসন্ধি!’

‘মেজোমামাকে এখুনি বলে আসব?’

শিয়োর! নাকের ডগায় রাসেল নিয়ে বসে আছে, বার্ট্রান্ড বানান জানে না।’ যাক বাবা, বড়মামার হাত থেকে ছাড়া পাওয়া গেছে। মেজোমামার ঘরে গিয়ে ঘুম লাগাই।।

সকালবেলা বড়মামাকে ঘরে পেলুম না। অথচ এই সময়ে ঘরে থাকারই কথা। লাল টকটকে সিল্কের লুঙ্গি। খোলা গা। পিঠের ওপর ইয়া মোটা সাদা পইতে। তাতে আবার একটা আঙটি বাঁধা। হাতের আঙুলে জায়গা নেই। আঙটি কোমরের কাছে ঝুলছে। চেয়ারে বাবু হয়ে বসা। ছ’টা কুকুর ঘরময় হ্যা হ্যা করছে। এক-একটা পালা করে লাফিয়ে উঠে বড়মামার হাত থেকে বিস্কুট ছিনিয়ে নিচ্ছে। মনে মনে হিসেব করে এক-একটা বদমাইশকে ধরে ফেলেছেন, ‘উঁহু উঁহু, তোর দুটো হয়ে গেছে এইবার ওইটার পালা।’ কে কার কথা শোনে, সবক’টাই ঘাড়ে ঘাড়ে লাফাচ্ছে। মাঝে-মাঝে পইতেতে পা আটকে যাচ্ছে। বড়মামা ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলছেন, ‘এইবার। সবক’টাকে দূর করে দোব। ইনডিসিপ্লিনড জানোয়ার।’ বলেই পইতের ঝোলা অংশ তুলে কপালে ঠেকাচ্ছেন।

কোথায় সেই পরিচিত দৃশ্য! ঘরময় কুকুরের ছড়াছড়ি! প্রভু বেপাত্তা।

দক্ষিণের জানালায় উঁকি মেরে দেখি বড়মামা বাগানের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখের চেহারায় ভীষণ ভাবনা। কী হল কে জানে? হঠাৎ চোখাচোখি হতেই ইশারায় ডাকলেন। বাগানে নামতেই আমাকে বললেন, ‘বুঝলি এইখানেই হবে।’

‘কী হবে বড়মামা? নারকেল গাছ?’

‘আরে না রে না। তোর কেবল খাবার চিন্তা।’

‘তবে?

‘এইখানে হবে সেই লঙ্গরখানা। একপাশে বিশাল উনুন। আর একপাশে সারি সারি টেবিল আর ফোল্ডিং চেয়ার। ওই কোণে কল আর জল। এইখানটায় একটা পেটা ঘড়ি। ঢ্যাং করে যেই একটা বাজবে, খাওয়া স্টার্ট। দুটোর মধ্যে যারা যারা আসবে তারাই খেতে পাবে। একটা থেকে দুটো। কড়া নিয়ম।

‘টেবিল, চেয়ার?’

‘তবে না তো কী? দরিদ্র নারায়ণ সেবা। ভেজিটেবল খিচুড়ি আর যে-কোনও একটা ভাজা। সপ্তাহে একদিন চাটনি। চল এইবার চট করে হিসেবটা করে ফেলি।’

বড়মামা ঘরে ঢুকতেই কুকুরগুলো মুখিয়ে ছিল; সকালের বিস্কুট পায়নি। চারপাশ থেকে হেঁকে ধরল। একটা পায়ের কাছে। একটা পেছনের দিকে পিঠের ওপর দুটো পা রেখে দাঁড়িয়ে উঠেছে। একটা সামনের দিকে ক্রমান্বয়ে লাফাচ্ছে। বড়মামা বললেন, ‘উঃ, পাওনাদারদের জ্বালায় জীবন। গেল।’

বিস্কুট পর্ব শেষ হতে না হতেই মাসিমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। সবক’টা কুকুরকে একজায়গায় দেখে বললেন, ‘পয়সার কী জ্বালা! কত মানুষ না খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে আর কারুর আধডজন কুকুর রোজ এক কেজি হরলিকস-বিস্কুট দিয়ে ব্রেকফাস্ট করছে। উৎপাতের ধন এই ভাবেই চিৎপাতে যায়!’

‘ঠিক বলেছিস কুসী।’

বড়মামার সমর্থন শুনে মাসিমা ভীষণ অবাক হলেন, ‘অ্যাঁ, ভূতের মুখে রাম নাম!’

বড়মামা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘এবারে অন্য রাস্তায় যাত্রা। কমপ্লিট বিবেকানন্দ! জীবে দয়া করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর! প্রথমে পঁচিশজন দিয়ে শুরু, ধীরে ধীরে একশো, দুশো, তিনশো, পাঁচশো, হাজার।’

মাসিমা চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘হাজার কুকুর! অত কুকুর পাবে কোথায়?

‘গবেট! কুকুর নয়, কুকুর নয়, মানুষ। দরিদ্র নারায়ণ সেবা!’

‘সে আবার কী? বারোয়ারি পুজো প্যান্ডেলে ফি-বছর একদিন নারায়ণ সেবা হয়। তুমি তার

প্রেসিডেন্ট হলে নাকি?’

‘আজ্ঞে না স্যার। এ হবে সুধাংশু মুখোপাধ্যায়ের ফ্রিকিচেন, জাস্ট লাইক রাজা রাজেন মল্লিক অফ মার্বেল প্যালেস। আজই নগেনকে ডেকে বাগানে একটা আটচালা তৈরির হুকুম দিচ্ছি। কালই খগেন এসে উনুন করে দেবে। পরশু আসবে চাল, ডাল, আলু, নুন, তেল, মশলা,। তেজপাতা। তরশু বেলা একটা। দেখবি সে কী কাণ্ড! গরমাগরম খিচুড়ি খেয়ে তোক দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করতে করতে চলেছে–লং লিভ রাজা, সরি, ডাক্তার সুধাংশু মুকুজ্যে।’

‘সর্বনাশ!’

‘সর্বনাশকী রে! বিবেকানন্দ বলে গেছেন, জন্মেছিস যখন দেয়ালের গায়ে একটা আঁচড় রেখে যা। তুই হবি এই নারায়ণ যজ্ঞের সুপারভাইজার। এক সেকেন্ড বোস তো। তোর পরামর্শে হিসেবটা সেরে নিই। ধর পঁচিশজন।’

মাসিমা ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন।

‘তুমি দেউলে হয়ে যাবে বড়দা! তুমি নিজে মরবে, আমাদেরও মারবে।’

‘আমি মরি মরব। জন্মিলে মরিতে হবে। তোরা মরবি কেন! বালাই ষাট। নে, বল, পঁচিশজনে ডেলি কত চাল খেতে পারে? পেট ভরে খাবে, হাফভরা নয়, ফুলভরা।’

মাসিমা বললেন, ‘পঁচিশ কেজি!’

বড়মামা অবাক হয়ে বললেন, ‘নার্ভাস করে দিচ্ছিস। বল, পঁচিশ পো, মিন্স ওই ছ’সের। মিনস ব্ল্যাকে কিনলে আঠারো টাকা। এইবার ডাল। ছ’সের চালে কত ডাল লাগে রে? ফর্মুলাটা কী?

‘চালের ডবল ডাল।’

‘ভাগ ভাঙচি দিচ্ছিস, হাফ ডাল। হাফ মিনস তিন কেজি, পনেরো টাকা। আঠারো প্লাস পনেরো ইজিকলটু তেত্রিশ। ইত্যাদি আরও সাত মানে চল্লিশ। কয়লা, রান্না ইত্যাদি দশ। রোজ পঞ্চাশ টাকা, নাথিং, নাথিং। চল ভাগনে লেগে পড়ি।’

বড়মামার সে কী উৎসাহ! তড়াং করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। মাসিমা বললেন, ‘ভাগনে কীভাবে লেগে পড়বে?’

‘যে ভাবে লাগাব সেইভাবে লাগবে। ওর মতো ছেলে লাখে একটা মেলে কিনা সন্দেহ!’

‘সে তো বুঝলুম; কিন্তু তোমার এই রাজসূয় যজ্ঞে ও কি ঘোড়া ধরতে বেরোবে!’

‘আমাদের এখন কত কাজ জানিস? আটচালা তৈরি। রাঁধবার লোক ঠিক করা। উনুন বসানো। চাল-ডাল কেনা। তারপর প্রচার।’

‘প্রচার মানে?’

‘প্রচার মানে?’ বড়মামা রেগে গেলেন। ‘প্রচার মানে প্রচার। লোকে জানবে কী করে? না জানতে পারলে তোক আসবে কী করে!’

‘অ। তা সেটা কীভাবে হবে, কাগজে বিজ্ঞাপন, বিবিধভারতী, দেওয়ালে পোস্টার, মাইক নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা, সিনেমায় স্লাইড। কোনটা?

‘ভ্যাক, ওর কোনওটাতেই কাজ হবে না। দুস্থ মানুষ যারা পড়তে জানে না, যাদের পয়সা নেই সিনেমা দেখে না, তাদের অন্যভাবে জানাতে হবে। ভোটের লিস্ট তৈরির মতো পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে প্রকৃত গরিব মানুষ খুঁজে বের করে হাত জোড় করে সবিনয়ে বৈষ্ণবদের মতো বলতে হবে, দয়া করে এই অধমের গরিবখানায় প্রসাদ গ্রহণ করবেন।’

মাসিমা বললেন, ‘ডাক্তারি তা হলে মাথায় উঠল!’

‘যে রাঁধে সে কি চুল বাঁধে না, ইডিয়েট। যা আর এক কাপ চা করে আন। বেরিয়ে পড়ি। তোদের মতো আলস্যযোগে জীবন ম্যাসাকার হতে দেব না। কর্মযোগ। কর্মযোগ। যোগ কর্মসু কৌশলম। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিল। গীতা পড়েছিস গবেট?’ মাসিমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বড়মামা প্যান্ট-জামা পরে তৈরি হওয়ার জন্যে পরদার আড়ালে অদৃশ্য হলেন।

মাসিমা ঠক করে চায়ের কাপ টেবিলে রাখলেন। বড়মামা চমকে মুখ তুলে তাকালেন। কাগজে দক্ষিণ পাড়ার ম্যাপ আঁকছিলেন। যে যে রাস্তা ধরে আমরা যাব তারই পরিকল্পনা।

‘খুব রেগে গেছিস মনে হচ্ছে!’

‘রাগলে তোমার আর কী? তুমি কারও পরোয়া করো? তবে তোমার এই সব ব্যাপার মেজদা জানে?’

‘হু ইজ মেজদা? তার দর্শনে জীবে দয়া নেই, জিভে দয়া আছে। ভগবান একটানা দুটো, না শূন্য,

ভগবান আমি না আমিই ভগবান, তিনি সাকার না নিরাকার, এই গোলকধাঁধাতেই বেচারা সারা জীবন বোকার মতো ঘুরতে ঘুরতে ম্যাড হয়ে গেল। তুই যা তুই যা। আমাদের এখন অনেক। কাজ। মেয়েদের সঙ্গে বকবক করার সময় নেই।’

মাসিমা বেশ বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন। আমি বললুম, ‘বড়মামা, হাওয়া খুব সুবিধের মনে হচ্ছে না।’

‘রাখ রাখ, ঝোড়ো হাওয়াতেই আমাদের নিশান উড়বে পতপত করে।’

মোটরসাইকেলে উঠতে উঠতে বড়মামা বললেন, ‘প্রথমে একবার চক্কর মেরে যাই। তুই শুধু। চোক-কান সজাগ রেখে দেখে যাবি। যেই মনে হবে এই লোক সেই লোক, সঙ্গে সঙ্গে আমার পিঠে খোঁচা। গাড়ি থামিয়ে তাকে যা বলার আমি বলব।’

বড়মামার মোটরসাইকেল। তার যেমন রং তেমন আওয়াজ। কানে তালা লেগে যাবার মতো অবস্থা। শক্ত করে ধরে বসে আছি। পকেটে সেই ম্যাপ। বীরেন শাসমল রোড দিয়ে ঢুকে, রাম ঢ্যাং রোডে পড়ে, শরৎচন্দ্র স্ট্রিট হয়ে, কালু শেখ রোড ধরে বিরাট একটা চক্কর মারা হবে। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই বড়মামার অন্নসত্রে আসতে পারবে। বড় বড় হরফে দমার গায়ে লেখা থাকবে, ‘শক, হ্ন, দল, মোগল পাঠান এক দেহে হল লীন।’

সবে সকাল হয়েছে। রাস্তায় বেশ লোক চলাচল। সকলেই যে যার কাজে চলেছেন। কেউ বাজারে। কেউ স্কুলে ছেলে-মেয়ে পৌঁছোতে। কেউ অফিসে। চারপাশের দোকানপাট খুলে গেছে। জমজমাট ব্যাপার। সাইকেলের সামনে কাগজ ডাঁই করে হকার চলেছেন বাড়ি বাড়ি কাগজ দিতে। চোখে এমন একজনও পড়ছে না যাকে মনে ধরে। বড়মামা বলে দিয়েছিলেন, ‘দেখবি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, জটপাকানো চুল, গর্তে বসা চোখ, শির বের করা হাত, সামনে কুঁজো হয়ে কুঁকতে ধুকতে চলেছে, কিংবা উদাস হয়ে রকে কি গাছতলায় বসে আছে, বিড়বিড় করে আপন মনে বকছে, দেখলেই বুঝবি এই সেই লোক, দি ম্যান।।

অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর বড়মামা একটা বটগাছ তলায় গাড়ি থামিয়ে বললেন, ‘দেশের কীরকম উন্নতি হয়েছে দেখছিস! গরিবি হাটাও তো সত্যিই গরিব হাটাও, সবাই ওয়েল-টু-ডু ম্যান। একটা লোকও চোখে পড়ল না!’

‘বুধবার তা হলে পাল-পাল ভিখিরি আসে কোথা থেকে?’

‘আরে দুর। বুধবার এ তল্লাটের মিল-ফিল বন্ধ থাকে, পালে পালে সব বেরিয়ে পড়ে উপরি রোজগারের ধান্দায়। ওরা কেউ রিয়েল ভিখিরি নয়।’

‘আমার কী মনে হয় জানেন?

‘কী?’

‘আমরা যাদের খুঁজছি তারা কেউ আর উঠে হেঁটে বেড়াতে পারছেনা। কোথাও না কোথাও ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে আছে।’

‘হতে পারে। কিন্তু কোথায় শুয়ে আছে?’

‘মনে হয় গঙ্গার ঘাটে, মোচ্ছবতলায়, শ্মশানে পাকুড়তলার বাঁধানো চাতালে।’

বড়মামা খুব তারিফ করলেন, ‘মন্দ বলিসনি। উঠতেই যদি পারবে তা হলে তো খেটে খাবে। না খেতে পেয়ে সব লটকে পড়ে আছে। ঠিক বলেছিস। বড় হয়ে তুই ব্যারিস্টার হবি। চল তা হলে মোচ্ছবতলাতেই আগে যাই।’

বড়মামা নেচে নেচে মোটরসাইকেল স্টার্ট করলেন। ভু, ভটভট শব্দে আকাশ ফেটে গেল। গাছের ডালপালা থেকে পাখি উড়ে পালাল ভয়ে। গঙ্গার দিকে রাস্তাটা যতই এগোচ্ছে ততই ঢালু হচ্ছে। ইটের গোলা, খড়ের গোলা, বাঁশের গোলা, খড়কাটা কল চলছে ঘসঘস করে।

মোচ্ছবতলাতেই আমাদের প্রথম বউনি হল। একটি লোক উদাস মুখে বসে আছে। যেন জীবনের সব কাজ শেষ। হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। মুখে অল্প অল্প কাঁচাপাকা দাড়ি। কোটরে বসা ঘোলাটে চোখ। শীর্ণ শীর্ণ হাত-পা। ভাঙা গাল। বকের মতো গলা!

‘বড়মামা-আ।’

‘দেখেছি।’

‘সব মিলছে। তবে নাকে তিলক সেবা করেছে।’

‘তা করুক। বৈষ্ণব, বুঝেছিস।’ বড়মামা গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে নেমে পড়লেন। এইবার কথাটা পাড়বেন। লোকটির কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। কে না কে। জগতে কোনও কিছুর পরোয়া করে না। এইরকম একটা ভাব। বড়মামা প্রথমে গঙ্গাদর্শন করলেন। তারপর মোচ্ছবতলায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। এইবার কী করেন দেখি।

লোকটির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নমস্কার হই।’

লোকটি বললে, ‘জয় নেতাই।’ বড়মামা বললেন, ‘জয় নিতাই।’

লোকটি বললে, ‘দেশলাই আছে?

‘দেশলাই তো নেই।’

সিগারেট আছে?

‘সিগারেট তো খাই না।’ বড়মামা যেন খুব লজ্জা পেলেন।

‘জয় নেতাই। পঞ্চাশটা পয়সা হবে?’

বড়মামার মুখের দিকে চেয়ে মনে হল আশার আলো ফুটেছে। এতক্ষণে লোকটি এমন একটা জিনিস চেয়েছে যা বড়মামার কাছে আছে। পকেট থেকে একটা গোল টাকা বের করে লোকটির হাতে হাসি হাসি মুখে দিলেন।

‘জয় নেতাই। পঞ্চাশটা পয়সা আবার ফেরত দিতে হবে না কি?’

‘না না, পুরোটাই আপনার। এইবার একটা কথা বলব?’

‘কী? কেউ মরেচে নাকি?’

বড়মামা চমকে উঠলেন, ‘কেউ মরবে কেন? ‘আমার সঙ্গে লোকের কথা মানেই তো, কেউ মরেছে, দুখী বোস্ট্রম চললা হে কেত্তন গাইতে হবে।’

‘না না ওসব নয়, ওসব নয়। অন্য কথা। আপনি খেতে পারবেন!

‘খেতে? কী খেতে? শ্রাদ্ধ!’

‘না নাশ্ৰাদ্ধট্রাদ্ধ নয়। এমনি খাওয়া। রোজের খাওয়া। ভোগ আর কি।’

‘কোন আশ্রম! আমি চরণদাস বাবাজির চেলা। অন্য ঘরে নাম লেখাতে পারব না। ধম্মে সইবে না।’

‘আশ্রম নয়। আমার বাড়িতে।’

‘কার পাচিত্তির! কী অসুখ?’

‘পাচিত্তির মানে? ও বুঝেছি। প্রায়শ্চিত্ত। নানা প্রায়শ্চিত্ত নয়। জাস্ট এমনি খাওয়া।’

‘বদলে কী করে দিতে হবে? বেড়া বাঁধা, ছুঁটে দেওয়া, চেলা কাঠ কাটা, খড় কাটা!

‘কিছু না, কিছু না, ওসব কিছুনা। রোজ একটা নাগাদ যাবেন, খাবেন-দাবেন, চলে আসবেন।’

‘কী খাওয়া!’

‘খিচুড়ি, ভাজাটাজা এই আর কী।’

‘কী ডাল? মুসুর ডাল চলবে না। মুগ হওয়া চাই।’

‘তাই হবে।’

‘কী চাল? আলো না সেদ্ধ।’

‘ধরুন সেদ্ধ।’

‘হ্যাঁ, সেদ্ধই ভালো। আলোতে পেট ছেড়ে দেবে। ও বেধবাদেরই চলে। রেশনের কাঁইবিচি চাল, না বাজারের চাল?’

‘বাজারের, খোলা বাজারের ভালো চাল।’

‘ঘি পড়বে, না খসখসে খেসকুটে? খিচুড়িতে ঘিনা পড়লে টেস্ট হয় না।’

‘হ্যাঁ, তা পড়বে।’

‘শালপাতায়, না কলাপাতায়, না চটা ওঠা এনামেলের থালায়!’

‘না না, ধরুন শালপাতায়।’

‘হ্যাঁ, এনামেল হলে খাব না। তা শেষ পাতে একটু মিষ্টি না থাকলে জল খাব কী করে? বোস্টম মানুষ। একটু পায়েস হলেই ভালো হয়।’

‘সপ্তাহে তিন দিন।’

‘রোজ হলেই ভালো হয়। যাক যাক মন্দের ভালো। হ্যাঁ একটা কথা, বোস্টমিকে নিয়ে আমরা সাতটি প্রাণী। সপরিবারে না আমি একলা?’

বড়মামার মুখ দেখে মনে হল আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছেন, ‘সাত জন? বলেন কী? এ দেখছি। মেঘ না চাইতে জল। না না, একা নয়, একা নয়। সপরিবারে।’

‘জয় নেতাই। তা হলে কবে থেকে?’

‘আজ হল গিয়ে রোববার। সোম, মঙ্গল, বুধ। হ্যাঁ বুধ ভালো বার।’

‘প্রভুর নিবাস?’

বাব্বা, বড়মামা প্রভু হয়ে গেলেন। মেজোমামা একবার শুনলে হয়। জ্বলে যাবেন। বড়মামা বাড়ির নির্দেশ দিতেই লোকটি বললে, ‘অ, আমাদের কেদারবাবুর বড় ছেলে। সেই ছিটেল ডাক্তার।’বড়মামার মুখটা কেমন হয়ে গেল, ‘ছিটেল বললেন!’

‘ছিটেলকে ছিটেল বলব না! সবাই জানে ডাক্তারটা খেয়ালি।’

আমিই সেই ডাক্তার।’

‘সে আগেই বুঝেছি। হক কথা বলব ভয়টা কীসের! উকিল আর ডাক্তার শেষ জীবনে পারের কড়ি কুড়োতে চায় ধম্মকম্ম করে। সারা জীবনের অধম্মের পয়সা। একজন মারে মক্কেল, আর। একজন মারে রুগি। দেখেন না, আজকাল মন্দিরে, আশ্রমে কত ভিড়! সব ওই ভেজালদার, কালোবাজারি, ডাক্তার, উকিল, এমএলএ, মন্ত্রী।’

ভটভট করে মোটরবাইকে আসতে আসতে বড়মামা বললেন, ‘কী রকম ট্যাঁকট্যাঁকে কথা শুনেছিস! এই জন্যে লোকের ভালো করতে নেই। নেহাত সেদিন বইয়ে পড়লুম, লিভ, লাভ। অ্যান্ড লাফ; তা না অ্যায়সা রাগ ধরেছিল। যাক বরাতটা খুব ভালো। এই বাজারে সাত-সাতটা লোক পাওয়া! বাকি রইল আঠারোটা।’

‘ভাববেন না বড়মামা। ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে। একবার খবরটা ছড়াতে দিন।’

আরও টহল মারা হল। এবার আর চারে মাছ পড়ল না, যাক সাতটা পড়েছে। ভালো ক্যাচ। বড়মামার বৃদ্ধ কম্পাউন্ডারের নাম সতুবাবু। ভার দেওয়া হল আরও আঠারোজন সংগ্রহ করার। ‘পারবেন তো!’

‘হ্যাঁ’ সতুবাবু অবজ্ঞার হাসি হাসলেন, ‘আঠারো কেন, আঠারোশো ধরে এনে দিতে পারি।’ বেলা বারোটা নাগাদ লোকলশকর নিয়ে বড়মামা নেপোলিয়নের মতো মার্চ করে বাড়ি ঢুকলেন। একজন বাগানের আগাছা পরিষ্কার করবে, বাঁশ বাঁধবে। একজন উনুন পাতবে। একজন দরমা ঘিরবে। মাসিমা সেই পল্টন দেখে হাঁ হয়ে গেলেন। এখনই হুকুম হবে, চা দে কুসী, চাল নে, সব ভাত খাবে।

হইহই ব্যাপার।

মেজোমামা এক ফাঁকে খুব গম্ভীর মুখে আমাকে ডাকলেন, ‘কী সব হচ্ছে হে! ভূতের নৃত্য!’

‘খুব মজা মেজোমামা। কত লোক আসবে। খাবে। দু-হাত তুলে খাবার সময় চিৎকার করে বলবে, জয় রাজা রাজেন মল্লিক।’

‘রাজা রাজেন মল্লিক! তোমার বড়মামা কি নাম পালটে ফেললে নাকি! নাম ভাঁড়িয়ে শেষে এই অসৎ কাজে নেমে পড়ল?’

‘আমি কী বলতে কী বলে ফেলেছি! আসলে বলবে, জয় রাজা সুধাংশু মুকুজ্যে।’

‘রাজা! কোথাকার রাজা? কাম্পুচিয়ার! ওই টাইমটেবিলটা আন তো।’

ড্রয়ারের ওপর থেকে টাইমটেবিলটা এনে মেজোমামার হাতে দিলুম। একটা পাতা খুলে বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম, রাত ন’টা চল্লিশ।’

‘কোথায় যাবেন মেজোমামা!’

‘যেদিকে দু-চোখ যায়।’

‘সে কী!’

‘হ্যাঁ, তাই। পাগলামি অনেক সহ্য করেছি। আর নয়।’

‘দরিদ্রসেবা পাগলামি? অসৎ কাজ?

‘পরে বুঝবে। এখন যেমন নাচ্ছ নেচে যাও। সবুরে মেওয়া ফলবে। তখন মেও সামলাতে পুলিশ ডাকতে হবে।’

বড়মামা জিগ্যেস করলেন, ‘প্রফেসার কী বলছিল রে?’

‘বলছিলেন, অসৎ কাজের ঠেলা পরে বুঝবে কাম্পুচিয়ার রাজা।’

‘অসৎ কাজ!’ বড়মামা হইহই করে হেসে উঠলেন, ‘হিংসে, বুঝলি, হিংসে। সারাজীবন ছেলে। ঠেঙিয়ে কিছুই করতে পারল না, আমি এক কথায় ফেমাস হয়ে গেলুম। এখন পরিচয় দিতে গেলে বলতে হবে, সুধাংশু মুকুজ্যের ভাই। কোন সুধাংশু? আরে সেই ডক্টর সুধাংশু, গরিবের মা-বাপ।’

‘মেজোমামা তো রাত নটা চল্লিশের ট্রেনে যে দিকে দু-চোখ যায় সেই দিকে চলে যাচ্ছেন।’

‘তাই নাকি? হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী। ভজা, ভজা।’

বড়মামার পার্শ্বচর ভজা। ‘যাই বড়বাবু।’

‘চাল?’

‘আ গিয়া।’

‘ডাল?

‘ও ভি আ গিয়া।’

‘বহুত আচ্ছা। চা বানাও।‘

ভজা গান গাইতে গাইতে চলে গেল। গোয়ালে গরু তিনটে ফ্যালফ্যাল করে প্রায় খালি ডাবরের দিকে তাকিয়ে আছে। কালোটা হাম্বা করে ডেকে উঠল। মানে, এবার দুধ দেবার চেষ্টা করো, নয়তো মালিক খুব খেপে যাবে। ন্যাজ মলে বিদায় করে দেবে।

মঙ্গলের উষা বুধে পা। সানাইটাই যা বাজল না। তা ছাড়া সবই হল। সকালে মন্ত্র পড়ে উনুন পুজো হল। বাঁশ থেকে ফুলের মালা ঝুলল ঝুলুর ঝুলুর করে। কাগজের রঙিন শিকলি চলে গেল এপাশ থেকে ওপাশে। শ্যামজেঠা বেলতলায় বসে সকাল থেকে চণ্ডীপাঠ করলেন। বড়মামা। মাসিমাকে ডেকে বললেন, ‘কুসী, সকালে আমি আর তোদের বাড়িতে খাব না। সকলের সাথে ভাগ করে নিতে হবে অন্নপান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। আমি হর্ষবর্ধন। সঙ্গমে স্নান করে নিজের পরনের কাপড়টা পর্যন্ত দান করে দোব…।’

‘তারপর নেংটি পরে কুয়োতলায় ধেই ধেই করে নাচব।’ মাসিমা রেগে চলে গেলেন। মেজোমামা দোতলার বারান্দা থেকে মাসিমাকে চিঙ্কার করে বললেন, ‘ভুলে যাসনি, আমার ট্রেন রাত নটা চল্লিশে।’

ওদিকে বেলতলায় শ্যাম জেঠার উদাত্ত গলা, ‘রূপং দেহি, ধনং দেহি যশো দেহি। জোড়া উনুনে আগুন পড়েছে। গলগল করে ধোঁয়া উঠছে আকাশের দিকে গাছের ডালপালা ভেদ করে।

মেজোমামা খুব উত্তেজিত হয়ে বারান্দায় পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘সেই সাত সকাল থেকে দেহি দেহি শুরু হয়েছে। যার অত দেহি দেহি সে হবে দাতা কর্ণ!’

ছ’টা কুকুর বাড়ি একেবারে মাথায় করে রেখেছে। যত অচেনা অচেনা লোক দেখছে ততই ঘেউ ঘেউ করছে। মাসিমা গ্লিসারিনে তুলো ভিজিয়ে কানে খুঁজে রেখেছেন। কোনও কথাই শুনতে পাচ্ছেন না। সে এক জ্বালা! জল চাইলে তেল এনে দিচ্ছেন।

পেয়ারা গাছের ডালে কাঁসার ঘড়ি বাঁধা হয়েছে। সাবেক কালের জিনিস। বেলা একটার সময় ঠ্যাং করে বাজিয়ে ঘোষণা করা হবে—শুরু হল। সবাই বসে পড়ো।

দেখতে দেখতে একটা বেজে গেল। ভজুয়া দাঁত-মুখ খিচিয়ে, চোখ বন্ধ করে, দু-হাতে একটা। লোহার রড ধরে ঘড়িতে ঘা মারল। সারা এলাকা কেঁপে উঠল ঠ্যাং শব্দে। আওয়াজ বটে। কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়।

সবার আগে এল জয় নিতাইয়ের দল। সপরিবারে, হইহই করে। সকলেরই নাকে নিখুঁত রসকলি। বোষ্টুম, বোস্টমি, গেঁড়ি পেঁড়ি ছেলেমেয়ে। এটা লাফায়, ওটা ছোটে। বড়টা ছোটটার মাথায় গাঁট্টা মারে। ছোটটা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। মা সবক’টাকে ধরে পাইকারি পিটিয়ে দেয়। ‘ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি’, শ্যাম জেঠার আর্তনাদ।

‘বসে পড়ো সব, বসে পড়ো সব।’

ফোল্ডিং চেয়ার উলটে চার বছরের ছেলেটা মাটিতে চিতপাত হল। বুকের ওপর চেয়ার। পায়ায় ঠ্যাং জড়িয়ে গেছে।

‘জয় নেতাই পড়ে গেছে রে বাপ। খেঁচকে তোল আপদটাকে।’

‘তুলসীগাছ কোন দিকে?’

‘তুলসীগাছ কী হবে গো?’ ভজুয়া জিগ্যেস করল।

‘দুর বেটা খোট্টা। তুলসীপাতা ছাড়া ভোগ হয়!’ বড়মামার তুলসীঝাড় ফাঁক। ‘পঁচিশ কোথায়? পিল পিল করে লোক আসছে।

বড়মামা আঁতকে উঠলেন, ‘মরেছে, এ যে রাজসূয় যজ্ঞ রে? হাঁড়ি নয়, ড্রাম ড্রাম খিচুড়ি লাগবে। স্টপ দেম। অ্যানাউনস করে দে, পঁচিশ জনের বেশি নয়। গেটটা বন্ধ করে দে রাসকেল ভজুয়া।’

‘গেট বন্ধ করে আটকানো যাবে না ডাগদারবাবু। গেট টপকে চলে আসবে।’

‘ধাক্কা মেরে বের করে দে।’

‘মেরে শেষ করে দেবে বাবু।’

বড়মামা গলা চড়িয়ে বললেন, ‘শুনুন, শুনুন আমাদের এই আয়োজন মাত্র পঁচিশ জনের জন্যে।’

প্রত্যেকেই চিৎকার করে উঠল, ‘আমি সেই পঁচিশ জনের একজন।’

‘তা কী করে হয়! এখানে অনেককেই দেখছি যাঁরা টেরিটের প্যান্টশার্ট পরে এসেছেন। বড় বড় চুল। দে আর নট গরিব।’

চিৎকার উঠল ‘আমরা মডার্ন গরিব। বেকার বসে আছি বছরের পর বছর।’

‘আমি মডেল গরিব বেছে নেব।’

‘বেছে নেব মানে? এটা কি স্টেট লটারি? কে বেছে নেবে?

বড়মামা খুব অসহায়ের মতো বললেন, ‘সে কী রে বাবা, এরা যে দেখছি তেড়িয়া হয়ে উঠছে বেশ, জোর যার মুলুক তার। আপনারা পঁচিশজন বাকি সকলকে ঠেকিয়ে রাখুন। তাজিয়া

কাজিয়া যা হয় নিজেরাই ফয়সালা করুন।’

মার, মার, হই, হই রই রই। হেরে রে রে করে লোক ঢুকছে। যেন দশ আনার টিকিটের সিনেমার কাউন্টার খোলা হয়েছে। ভজুয়া পালাতে পালাতে বললে, ‘আরও আসছে বাবু। নারায়ণকা জুলুস নিকলেছে আজ।’

শ্যামজেঠা পালাতে পালাতে বললেন, ‘সুধাংশু প্রাণে যদি বাঁচতে চাও পেছনের দরজা দিয়ে পালাও।’

বড়মামা ভয়ে পেছোতে পেছোতে বললেন, ‘য পলায়তি স জীবতি। ব্যাপারটা বুফে লাঞ্চের মতো হয়ে গেল। যে পারে সে নিয়ে খাক।’

চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে। বাঁশের খুঁটি উপড়ে ফেলেছে। একপাশের সামিয়ানা কেতরে গেছে। পেছনের দরজা দিয়ে রাস্তায় পড়ে বড়মামার লাল মোটরবাইক তিরবেগে পশ্চিমে ছুটছে। মেজোমামা কাঁপতে কাঁপতে টেলিফোন ডায়াল করছেন।

‘হ্যাঁলো থানা। নরনারায়ণে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে। বড় বড় থান ইট ছুড়ছে। ও সেভ আস, সেভ আস।’

ছ’টা কুকুর বাগানে নেমে পড়েছে খেপে গিয়ে। মাসিমার কানে অ্যায়সা তুলো ঢুকেছে কিছুতেই বের করতে পারছেন না। মাথার কাঁটা, দেয়াশলাই কাঠি যতই খোঁচাখুঁচি করছেন গ্লিসারিন তুলো ততই ভেতরে চলে যাচ্ছে। কেবল বলছেন, ‘এখনও চণ্ডীপাঠ হচ্ছে! শিলাবৃষ্টি হচ্ছে না কি রে?’

‘আর দাঁড়াতে পারছি না। আমার পা কাঁপছে। প্যান্ডিমোনিয়াম! আরে দুর মশাই, হারমোনিয়াম নয় প্যান্ডিমোনিয়াম।’

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot dana
  • hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • slot gacor
  • desa bet
  • desabet
  • Kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor