Thursday, February 22, 2024
Homeকিশোর গল্পরূপকথার গল্পইতালির রূপকথা: আরও চাই, আরও

ইতালির রূপকথা: আরও চাই, আরও

ইতালির রূপকথা: আরও চাই, আরও

এক যে ছিলেন রাজা। পাশের রাজ্যে একবার বেড়াতে গেছেন তিনি। গিয়ে দেখলেন, এই রাজ্যের মাটি খুবই উর্বর। চারদিকে রকমারি ফসলের ছড়াছড়ি। ফলেছেও বেশুমার। আহ্‌, কী সুন্দর। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। রাজা মনে মনে আফসোস করেন, ইশ্‌, রাজ্যটাও যদি আমার হতো, দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী রাজা তাহলে আমি হতে পারতাম। এমন ভাগ্য কি কখনো কোনো দিন হবে আমার?

ওই দেশেরই এক ব্যবসায়ী। অনেক অনেক ধনসম্পদ তার। কত যে ধনরত্ন, তার হিসাব করা মুশকিল। বিশাল, চোখধাঁধানো বাড়ি এই ব্যবসায়ীর। সেই বাড়িতে অনেক চাকরবাকর। তিনি গেছেন অন্য এক রাজ্যে। চমৎকার এক রাজপ্রাসাদের কাছ ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি ভাবলেন, জমকালো প্রাসাদটা যদি আমার হতো।

রূপবতী একটি মেয়ে ওই প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেল সুদর্শন ব্যবসায়ীকে। কত না সুন্দর এই ঘোড়সওয়ার মানুষটি। রাজকন্যা ভাবল, আহ্‌, একে যদি বিয়ে করতে পারতাম আমি। তাহলে জীবন ধন্য হয়ে যেত।

ওই রাজপ্রাসাদেই নাদুসনুদুস একটি কুকুরের বাস। এখানে বন্দিজীবন তার। প্রাসাদ থেকে সে দেখত, রাস্তায় চরে বেড়ানো অন্য কুকুরগুলো। ওহো। ওরা কতই না মুক্ত জীবনে রয়েছে। যখন ইচ্ছা, যেখানে খুশি যেতে পারে। কেউ বাধা দেয় না। আহ্‌। আমারও যদি এমন একটা স্বাধীন জীবন হতো, তাহলে বেশ হতো। এমন একঘেয়ে বিচ্ছিরি জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতাম। হায়! তা কি আর কোনো দিন হবে!

সেই প্রাসাদেরই আরেক বাসিন্দা বিড়াল। শীতে রোদ পোহাচ্ছিল সে, বারান্দায়। দেখতে পেল, একটা নেংটি ইঁদুর আপনমনে ছোটাছুটি করছে। একে তো ধরতে হয়। বিড়াল ইঁদুর ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু হলো না। ইঁদুর এমনই চালাক যে সুড়ুৎ করে সে ঢুকে পড়ল ছোট্ট একটা ফোকরে। তাকে ধরে এমন সাধ্য কার! বিফল হয়ে মনমরা বিড়ালের সে কী আফসোস! আহা, হা। চকচকে ইঁদুরটাকে ধরতে পারলে আরামসে খাওয়া যেত।

একটু পর ইঁদুর গেল রান্নাঘরে। সেখানে থরে থরে সুখাদ্য সাজানো। কত যে মিষ্টি। নানা স্বাদের ফল। সবই আলমারিতে আটকানো। ধরাছোঁয়ার উপায় নেই। নেংটি ইঁদুরের জিব চুলবুল করে। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে সে, নাহ্‌। আমার পোড়া কপালে এসব নেই গো। এত সব মজার খাবার! এই জন্মে কখনো কি এগুলো চেখে দেখতে পারব না? যদি কোনো না কোনোভাবে পারতাম! মনে কোনো খেদ আক্ষেপ থাকত না তাহলে।

ওই সময়ে ওখান দিয়ে পরীরাজ্যের রানি উড়ে যাচ্ছিলেন। সবার মনের নিভৃত গোপন ইচ্ছাগুলো তিনি জানতে পারলেন। জেনে থামলেন একটু। কেমন যেন মায়া হলো তার। দরদি মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল। ভাবলেন, আচ্ছা, এদের সবার মনের ইচ্ছাগুলো পূরণ করে দিলে কেমন হয়? সবাই এমন ব্যাকুল হয়ে চাইছে। আমি তো চাইলেই সেটা পারি। বেশ, বেশ। তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে দেখিই না কী ঘটে!

পরীরানি তা–ই করলেন। যার মনে যে ইচ্ছা রয়েছে, তা পূরণ হয়ে যাক। সবাই তাহলে খুব সুখী হয়। যেমনটি ভাবা সেই মতো কাজ। সব কটা আকাঙ্ক্ষারই বাস্তব রূপ দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন তিনি। কাজটা করতে পেরে মনটা বেশ ভালো লাগছে।

০২

কয়েক দিন পরের ঘটনা। পরীরানির মনে হলো, আচ্ছা, দেখে আসি তো ওরা ছয়জন এখন কেমন আছে? কে কতটা সুখী? কে কতখানি তৃপ্ত? সবার জীবন সফল–সার্থক কি হতে পারল শেষ অবধি? এই ছজন হলো রাজা, ব্যবসায়ী, রাজকন্যা, কুকুর, বিড়াল ও নেংটি ইঁদুর।

পরীরানি যা দেখলেন এবং জানলেন, তাতে অবাক হলেন ভীষণ। মনটা দমে গেল তার। ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে। সবার ইচ্ছাপূরণের পরের ঘটনাবলি মোটেও সুখকর হয়নি।

রাজা আরও আরও রাজ্য চান। সম্ভব হলে পুরো দুনিয়ারই রাজা হওয়ার খায়েশ প্রবল হয়ে উঠেছে তার। মাত্র একটা দেশ পেয়ে মন একটুও ভরেনি। তৃষ্ণা আরও বেড়ে গেছে।

ব্যবসায়ীর কী হাল–অবস্থা? তার আকাঙ্ক্ষাও কম নয় কিছুতেই। চাই চাই, আরও চাই। আরও বাড়ি, আরও ধন, আরও দাস-দাসী। দিন–রাত এই একটাই চিন্তা। একটাই চাওয়া। এই চিন্তাভাবনায় তার চোখে ঘুম নেই। আরাম হারাম হয়ে গেছে।

রাজকন্যার বিয়ে তো হয়েছে ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তার তৃষ্ণার পরিধিও বেড়ে গেছে বহুগুণ। আগেকার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। নিজের জন্য চাই দামি দামি গয়না, পোশাক, টাকাপয়সা। সন্তানদের জন্য চাই আরও আরও বিত্ত, জমকালো বাড়ি। চাই আরও চাকরবাকর।

কুকুর আছে কেমন? রাস্তায় বেরিয়ে স্বাধীনতা পেলে কী হবে? মনটা উসখুস করে। রাজপ্রাসাদের মতো আরাম–আয়েশ, খানাপিনার বন্দোবস্ত নেই। বহু মেহনত করে, সময় খরচ করে খানাখাদ্য খুঁজে নেওয়া লাগে। বড্ড ঝকমারি ও সমস্যা সেই বিশ্রী কাজে। অন্য কুকুরদের সঙ্গে কামড়াকামড়ি, ঝগড়াঝাঁটিও করতে হয় অনেক সময়। সে মোটেও সুখী নয়। এই জীবন আর ভালো লাগছে না তার। আহা রে। আবার যদি রাজপ্রাসাদে ফিরে যাওয়া যেত। সেখানেই সব সুখ।

এবার খোঁজ নেওয়া যাক, বিল্লিটা কেমন আছে? সে চায় আরও আরও ইঁদুর মারতে। কিন্তু রাজপ্রাসাদে এখন ইঁদুর আর আগের মতো নেই। বেশির ভাগই তার পেটে চালান হয়ে গেছে। দিনভর সে থাকে মনমরা হয়ে। বারান্দার এক কোণে ঘাপটি মেরে চুপচাপ বসে থাকে। ভাল্লাগে না। কিচ্ছু ভাল্লাগে না তার।

ইঁদুরের কী হালচাল? আর লোভী হওয়ার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই তার। মরণের পর কিছুই থাকে না আর। বেঁচে থাকতে আলমারির ভেতরের খানাখাদ্য সে খেয়েছে। ইচ্ছেমতো। ভরপেট। ইচ্ছা পূরণ হয়েছে পুঁচকে নেংটি ইঁদুরের। তারপর? সব ফকফকা। না ফেরার দেশে হয়েছে তার নতুন ঠিকানা। তাকে সোজা চলে যেতে হয়েছে লোভী বিড়ালের পেটে। দস্যি শত্তুরটার খায়েশ পুরা হয়েছে তাতে।

পরীরানি সব দেখলেন। সব জানলেন। তিনি পষ্ট বুঝতে পারলেন পুরো ব্যাপারটা। কী বুঝলেন? জীবিত প্রাণীগুলোর লোভ-লালসা, চাওয়ার কোনো সীমা শেষ নেই। এর কখনো অন্তও হয় না। কেবল বাড়তেই থাকে চাহিদা। মনে মনে ঠিক করেন, আর কখনো কারও ইচ্ছা পূরণ করবেন না। তার কোনো প্রয়োজনই নেই।

পরীরানি তার আপন গন্তব্যের দিকে ডানা মেলে দেন।

অনুবাদ: হাসান হাফিজ

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments