Sunday, March 3, 2024
Homeকিশোর গল্পরূপকথার গল্পরাশিয়ার রূপকথা: সিভ্‌কা–বুর্কা

রাশিয়ার রূপকথা: সিভ্‌কা–বুর্কা

রাশিয়ার রূপকথা: সিভ্‌কা–বুর্কা

এক যে ছিল বুড়ো, তার তিন ছেলে। বড় দুই ছেলে চাষবাস দেখত, মাথা উঁচিয়ে চলত, বেশভূষা করত। ছোট ছেলে বোকা ইভান তেমন কিছু নয়। সারা দিন সে বাড়িতে চুল্লির ওপরের তাকে বসে কাটাত। আর মাঝেমধ্যে বনে যেত ব্যাঙের ছাতা তুলতে।

বুড়োর যখন মরার সময়, তখন একদিন তিন ছেলেকে ডেকে বলল, ‘আমি মরে গেলে পরপর তিন রাত আমার কবরে রুটি নিয়ে আসিস।’ মরে গেল বুড়ো। কবর দেওয়া হলো তাকে। সেই রাতে বড় ভাইয়ের কবরে যাওয়ার পালা। কিন্তু বড় ভাইয়ের আলসেমি লাগে, নাকি ভয় পায়। ছোট ভাই বোকা ইভানকে বলে, ‘ইভান, আজ যদি তুই আমার বদলে বাবার কবরে যাস, তবে তোকে একটা পিঠা কিনে দেব।’

ইভান তক্ষুনি রাজি। রুটি নিয়ে চলে গেল বাবার কবরে। বসে বসে অপেক্ষা করে। ঠিক রাতদুপুরে কবরের মাটিটা দুই ফাঁক হয়ে বুড়ো বাবা বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘কে ওখানে? আমার বড় ছেলে নাকি? বল তো শুনি রুশদেশের খবর? কুকুরেরা কি ডাকছে, নেকড়েরা গজরাচ্ছে, নাকি আমার বাছা কাঁদছে?’

ইভান বলল, ‘বাবা, এই যে আমি, তোমার ছেলে। রুশদেশ শান্তিতে আছে।’ বাবা বুড়ো তখন পেট ভরে রুটি খেয়ে আবার কবরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। আর ইভান পথে থামতে থামতে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে বাড়ি ফিরল।

বাড়ি ফিরতে বড় ভাই জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যাঁ রে, বাবাকে দেখলি?’

ইভান বলল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি।’

‘রুটি খেল?’

‘হ্যাঁ খেল, পেট পুরে।’

আরেকটা দিন কেটে গেল। সেদিন মেজ ভাইয়ের যাওয়ার পালা। আলসেমি করেই হোক বা ভয় পেয়েই হোক, মেজ ভাই বলে, ‘ইভান, তুই বরং আজ আমার বদলে যা, তোকে এক জোড়া লাপ্‌তি বানিয়ে দেব।’

ইভান বলল, ‘বেশ’।

রুটি নিয়ে ইভান আবার গেল কবরের কাছে। অপেক্ষা করে বসে রইল। ঠিক রাতদুপুরে কবরের মাটিটা দুই ফাঁক হয়ে ইভানের বুড়ো বাবা বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল—

‘কে ওখানে? আমার মেজ ছেলে নাকি? বল তো শুনি রুশদেশের খবর? কুকুরেরা কি ডাকছে, নেকড়েরা গজরাচ্ছে, নাকি আমার বাছা কাঁদছে?’ ইভান জবাব দিল, ‘আমি তোমার ছেলে, বাবা। রুশদেশ বেশ শান্তিতেই আছে।’

বুড়ো তখন পেট ভরে রুটি খেয়ে কবরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। পথে থেমে থেমে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে কুড়িয়ে বাড়ি ফিরল ইভান। বাড়ি ফিরতে মেজ ভাই জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যাঁ রে, রুটি খেল বাবা?’

‘খেল, পেট পুরে খেল।’

তৃতীয় রাত। সেদিন ইভানের যাওয়ার পালা। ইভান দাদাদের বলল, ‘দুই রাত আমি গেছি। আজ তোমরা কেউ যাও। আমি বাড়িতে ঘুমিয়ে নিই।’

দাদারা বলল, ‘সে কী রে ইভান, তোর তো বেশ জানাশোনা হয়ে গেছে, তুই বরং যা।’

‘তা বেশ, আমিই যাব।’ রুটি নিয়ে ইভান চলে গেল। ঠিক রাতদুপুরে কবরের মাটিটা দুই ফাঁক হয়ে ইভানের বুড়ো বাবা উঠে এল। জিজ্ঞাসা করল, ‘কে ওখানে? আমার ছোট ছেলে ইভান নাকি? বল শুনি রুশদেশের খবর? কুকুরেরা কি ডাকছে, নেকড়েরা গজরাচ্ছে, নাকি আমার বাছা কাঁদছে?’

ইভান জবাব দিল, ‘আমি ইভান, বাবা। তোমার ছেলে। রুশদেশ বেশ শান্তিতে আছে।’

বাপ তখন পেট ভরে রুটি খেয়ে বলল, ‘তুই একমাত্র আমার কথা শুনলি। পরপর তিন দিন তিন রাত আমার কবরে আসতে একটুও ভয় পাসনি। এবার এক কাজ কর, খোলা মাঠে গিয়ে চিৎকার করে ডাকবি, সিভ্‌কা-বুর্কা, যাদুকা লেড়কা, চেকনাই ঘোড়া, সামনে এসে দাঁড়া। ঘোড়াটা তোর সামনে আসবে, তুই ওর ডান কান দিয়ে ঢুকে বাঁ কান দিয়ে বেরিয়ে আসিস। দেখবি তোর রূপ খুলে যাবে। তারপর ঘোড়ায় চেপে যেথা ইচ্ছা তথা যাস।’

বুড়ো বাবা ইভানকে একটা লাগাম দিল। ইভান লাগামটা নিয়ে বাবাকে ধন্যবাদ দিয়ে পথে পথে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে বাড়ি ফিরল। বাড়ি ফিরতেই ভাইয়েরা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী রে, বাবার সঙ্গে দেখা হলো?’

ইভান বলল, ‘হলো’।

‘রুটি খেল?’

‘পেট পুরে খেল। বলল কবরে আর আসতে হবে না।’

এদিকে হয়েছে কী, রাজা তখন চারদিকে ঢেঁড়া পিটিয়ে দিয়েছেন—রাজ্যের যত রূপবান, আইবুড়ো, কুমারদের তার রাজদরবারে উপস্থিত হওয়া চাই। রাজকন্যা লাবণ্যবতীর জন্য ওকগাছের ১২ খুঁটির ওপর, ১২ কুঁদো দিয়ে এক কোঠা বানানো হয়েছে। সেই কোঠার একেবারে ওপরে রাজকন্যা বসে থাকবে। যে ঘোড়ার পিঠে বসে এক লাফে পৌঁছে রাজকন্যার ঠোঁটে চুমু খেতে পারবে, রাজা তাকেই অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা লাবণ্যবতীকে দেবেন। তা সে যে ঘরের ছেলেই হোক।

ইভানের ভাইদের কানেও এ কথা পৌঁছাতে দেরি হলো না। বলল, ‘দেখা যাক ভাগ্য পরীক্ষা করে।’

তেজি ঘোড়া দুটিকে ওরা বেশ করে যবের ছাতু খাওয়াল। তারপর নিজেরা ফিটফাট পোশাক পরে, বাবরি চুল আঁচড়ে তৈরি হলো। ইভান তখন চিমনির পেছনে চুল্লির তাকে বসে। বলল, ‘আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চল না দাদা, আমিও একবার ভাগ্য পরীক্ষা করে আসি।’

‘দূর হতভাগা, তুই বরং বনে ব্যাঙের ছাতা খুঁজে বেড়াগে যা, লোক হাসিয়ে দরকার নেই!’

বড় দুই ভাই তেজি ঘোড়ায় চড়ে টুপি বাঁকিয়ে, চাবুক চালিয়ে, শিস দিতেই একরাশ ধুলার মেঘ আকাশে। ইভান তখন বাবার দেওয়া লাগামটা নিয়ে চলে গেল খোলা মাঠে। তারপর বাবার কথামতো ডাকল, ‘সিভ্‌কা-বুর্কা, যাদুকা লেড়কা, চেকনাই ঘোড়া, সামনে এসে দাঁড়া!’

বুড়ো বাবা ইভানকে একটা লাগাম দিল। ইভান লাগামটা নিয়ে বাবাকে ধন্যবাদ দিয়ে পথে পথে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে বাড়ি ফিরল। বাড়ি ফিরতেই ভাইয়েরা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী রে, বাবার সঙ্গে দেখা হলো?’
কোত্থেকে কে জানে, ছুটে এল ঘোড়া। তার খুরের দাপে মাটি কাঁপে, নাক দিয়ে আগুন ছোটে, কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোয়। মাটিতে পা গেঁথে বলে, ‘বল, কী হুকুম!’ ইভান ঘোড়াটার গলা চাপড়ে নিয়ে তাকে লাগাম পরাল, তারপর তার ডান কান দিয়ে ঢুকে বাঁ কান দিয়ে বেরিয়ে এল। আর কী আশ্চর্য! অমনি সে হয়ে গেল এক সুন্দর তরুণ। কী তার রূপ! সে রূপ বলার নয়, শোনার নয়, কলম দিয়ে লেখার নয়। ঘোড়ার পিঠে চড়ে রাজপুরীর দিকে রওনা হলো ইভান। ছুটল জোড়া কদমে, কাঁপল মাটি সঘনে, পেরিয়ে গিরি কান্তার, মস্ত সে কী ঝাঁপ তার।

ইভান এসে পৌঁছাল রাজদরবারে, চারদিক লোকে লোকারণ্য। ১২ খুঁটির ওপর, ১২ কুঁদো দিয়ে এক কোঠা। তার চিলেকোঠায় জানালার পাশে বসে আছে রাজকন্যা লাবণ্যবতী। রাজা অলিন্দে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে তার ঘোড়ার পিঠে চড়ে লাফিয়ে উঠে আমার মেয়ের ঠোঁটে চুমু খেতে পারবে, তার সঙ্গেই আমার মেয়েকে বিয়ে দেব, আর দেব অর্ধেক রাজত্ব।’ কুমারেরা সবাই তখন একে একে এগিয়ে লাফাল, কিন্তু কোথায় কে, জানালার নাগাল কেউ ধরতে পারল না। ইভানের দুই ভাইও চেষ্টা করল, কিন্তু অর্ধেকটা পর্যন্ত গেল না। এবার এল ইভানের পালা।

সিভ্‌কা-বুর্কাকে সে কদমে ছুটিয়ে হাঁক পেড়ে, ডাক ছেড়ে লাফ মারল। কেবল দুটো কুঁদো বাদে সব কুঁদো সে ছাড়িয়ে গেল। আবার ঘোড়া ছোটাল সে। এবারকার লাফে বাকি রইল একটা কুঁদো। আবার ফিরল ইভান, পাক খাওয়াল ঘোড়াকে, গরম করে তুলল। তারপর আগুনের হল্কার মতো এক প্রচণ্ড লাফে জানালা পেরিয়ে রাজকন্যা লাবণ্যবতীর মধুঢালা ঠোঁটে চুমু খেয়ে গেল ইভান। আর রাজকন্যাও তার হাতের আংটি দিয়ে ইভানের কপালে ছাপ এঁকে দিল।

লোকজন সব ‘ধর, ধর’ করে চেঁচিয়ে উঠল। কিন্তু ইভান ততক্ষণে উধাও।

সিভ্‌কা-বুর্কাকে ছুটিয়ে ইভান এল সেই খোলা মাঠে। তারপর ঘোড়ার বাঁ কান বেয়ে উঠে ডান দিয়ে বেরিয়ে এল, আর অমনি সে আবার হয়ে গেল সেই বোকা ইভান। সিভ্‌কা-বুর্কাকে ছেড়ে দিয়ে সে রওনা হলো বাড়ির দিকে। যেতে যেতে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে নিল। বাড়ি এসে ন্যাকড়া দিয়ে কপালটা বেঁধে চুল্লির ওপরের তাকে উঠে শুয়ে রইল।

ভাইয়েরাও যথাসময়ে ফিরে এসে বলতে লাগল, কোথায় গিয়েছিল, কী দেখল। ‘খাসা খাসা সব জোয়ান, একজন কিন্তু সবার সেরা। ঘোড়ার পিঠে চড়ে এক লাফে উঠে রাজকন্যার ঠোঁটে চুমু খেয়ে গেছে। দেখলাম কোত্থেকে এল, দেখা গেল না কোথায় গেল।’

চিমনির পেছন থেকে ইভান বলে, ‘আমি নই তো?’

ভাইয়েরা সে কথা শুনে ভীষণ চটে গেল, ‘বাজে বকিস না, হাঁদা কোথাকার! তার চেয়ে চুল্লির ওপর বসে বসে ব্যাঙের ছাতা গেল।’

ইভান তখন কপালের পট্টিটা খুলে ফেলল, যেখানে রাজকন্যা ছাপ মেরেছিল আংটি দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে কুঁড়েঘরটা আলোয় আলোয় ভরে গেল। ভাইয়েরা ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী, করছিস কী, হাঁদা কোথাকার! ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিবি যে!’

পরদিন রাজবাড়িতে বিরাট ভোজ। পাত্রমিত্র, জমিদার, প্রজা, ধনী-গরিব, বুড়ো-বাচ্চা—সবার নেমন্তন্ন। ইভানের ভাই দুজনও ভোজ খেতে যাবে বলে তৈরি। ইভান বলল, ‘দাদা, আমাকেও তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো!’

‘কী বললি? তোকে নিয়ে যাব? লোকে হাসবে। তার চেয়ে তুই এখানে চুল্লির ওপরে বসে বসে ব্যাঙের ছাতা গেল।’ দুই ভাই তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে রাজবাড়ির দিকে চলে গেল। আর পায়ে হেঁটে ইভান গেল ওদের পেছন পেছন। রাজপুরীতে পৌঁছে দূরে এক কোণে বসে রইল ইভান।

রাজকন্যা লাবণ্যবতী তখন নিমন্ত্রিতদের প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেছে। হাতে তার মধুপাত্র। তা থেকে সে একেকজনকে মধু ঢেলে দেয় আর দেখে কপালে তার আংটির ছাপ আছে কি না।

সবাইকে প্রদক্ষিণ করে এল রাজকন্যা, বাদ রইল কেবল ইভান। ইভানের দিকে রাজকন্যা যত এগোয়, তত তার বুক দুরুদুরু করে। ইভানের সারা গায়ে কালি, মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল। রাজকন্যা লাবণ্যবতী জিজ্ঞাসা করে, ‘কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ? কপালে তোমার পট্টি বাঁধা কেন?’

ইভান বলল, ‘পড়ে গিয়ে কেটে গেছে।’ রাজকন্যা পট্টি খুলে ফেলতেই সারা রাজপুরী আলোয় আলোয় ভরে গেল। রাজকন্যা চেঁচিয়ে উঠল, ‘এ তো আমারই ছাপ, একেই তো আমি বরণ করেছি।’ রাজামশাই কাছে এসে বললেন, ‘কী যত বাজে কথা, এ যে একেবারে কালিঝুলি মাখা এক হাঁদা!’

ইভান রাজাকে বলল, ‘রাজামশাই, অনুমতি দিন একবার মুখ ধুয়ে আসি।’ রাজামশাই অনুমতি দিলেন। ইভান উঠানে গিয়ে বাবার কথামতো হাঁক দিল, ‘সিভ্‌কা-বুর্কা, যাদুকা লেড়কা, চেকনাই ঘোড়া, সামনে এসে দাঁড়া!’

অমনি কোত্থেকে কে জানে, ছুটে এল ঘোড়া। তার খুরের দাপে মাটি কাঁপে, নাক দিয়ে আগুন ছোটে, কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোয়। ইভান তার ডান কান দিয়ে ঢুকে বাঁ কান দিয়ে বেরিয়ে এল, আর অমনি সে হয়ে গেল সেই রূপবান তরুণ। সে রূপ বলার নয়, শোনার নয়, কলম দিয়ে লেখার নয়। সব লোক একেবারে আহামরি করে উঠল।

অমনি সব কথা মিটে গেল, বিয়ের ভোজ চলল ধুমধাম করে।

(রুশদেশের উপকথা বই থেকে)

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments