ভাঙা আয়নার রহস্য – অনিল ভৌমিক

ভাঙা আয়নার রহস্য - অনিল ভৌমিক

ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। বাতাসের তেমন জোর নেই। পালগুলো প্রায় নেতিয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া ছুটে আসছে। তখনই পালগুলো ফুলে উঠেছে। পরক্ষণেই আগের মতো।

বেশি কিছুক্ষণের আগে পশ্চিম দিগন্তে গভীর কমলা রঙের সূর্য অস্ত গেছে। আকাশে লাল আলো ছিল ছড়িয়ে। এখন সব অন্ধকার। আকাশে ভাঙা চাঁদ। জ্যোৎস্না খুব উজ্জ্বল নয়।

তীরভূমির কাছ দিয়ে জাহাজ চলেছে। ভাইকিংরা ডেক-এর এখানে-ওখানে শুয়ে। বসে ছিলে। জাহাজের গতি বেশ কমে গেছে। হ্যারি ডেক-এ উঠে এলো। দেখল জাহাজের শ্লথগতি। ও সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। চলল ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের দিকে। কেবিন ঘরের সামনে এসে হ্যারি দরজায় টোকা দিল। মারিয়া দরজা খুলে দাঁড়াল। বলল–কী ব্যাপার হ্যারি!

সমস্যায় পড়েছি। ফ্রান্সিস ডাকল–হ্যারি ভেতরে এসো। হ্যারি কেবিন ঘরে ঢুকল। বলল-বাতাস একেবারে পড়ে গেছে। সব পাল নেতিয়ে পড়েছে। জাহাজের গতি কমে গেছে। কী করবে বলো।

–আমি বিকেলে ডেক-এ গিয়েছিলাম। দেখেছি সব। হাওয়ার গতি না বেড়ে ওঠা পর্যন্ত এভাবেই যেতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

–থাক না। বন্ধুরা একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসুক। গল্পটল্প করুক। গভীর রাতের দিকে দেখো বাতাসের গতি বাড়বে। অনেকবারই এমন হতে দেখেছি। ফ্রান্সিস বলল।

– দাঁড় টানলে জাহাজের গতি বাড়তো। হ্যারি বলল।

–তাহলে দেখা যাক। হ্যারি বলল। ও ডাক-এ উঠে এলো। মাস্তুলে ঠেসান দিয়ে বসল। অপেক্ষা করতে লাগল কখন বাতাসের বেগ বাড়ে।

মাস্তুলের মাথায় বসেছিল নজরদার পেড্রো। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। তাই পেড্রোকে চোখ কুঁচকে চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হচ্ছিল।

হঠাৎ দেখল তীরভূমি দিয়ে মশাল হাতে কারা ছুটে আসছে। পেড্রো চোখ কুঁচকে স্থির তাকিয়ে রইল কিন্তু চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় ঠিক বুঝল না ওরা কারা।

পেড্রো গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব তীরভূমি দিয়ে একদল লোক ছুটে আসছে আমাদের জাহাজের দিকে। ফ্রান্সিসকে খবর দাও।

হঠাৎ তখনই মেঘ সরে গেল। চাঁদের আলো অনেকটা স্পষ্ট হল। পেড্রো দেখল। যারা মশাল হাতে ছুটে আসছে তারা সংখ্যায় পাঁচজন। সবাই সশস্ত্র যোদ্ধ।

ততক্ষণে ফ্রান্সিসদের কাছে খবর পৌঁছে গেছে। ফ্রান্সিস ও মরিয়া জাহাজের ডেক এ উঠে এলো। রেলিং ধরে তাকিয়ে রইল। সত্যি পাঁচজন সশস্ত্র সৈন্য আসছে। হাত নেড়ে কী বলছে। ওদের কথা ক্ষীণভাবে শোনা গেল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস ওরা পোর্তুগীজ ভাষায় কথা বলছে। জাহাজ থামাতে বলছে। কী করবে?

–তাই ভাবছি। তবে এটা বোঝা গেল যে আমরা পোর্তুগালে এসেছি। ফ্রন্সিসদের ঘিরে ভাইকিংরা দাঁড়িয়ে ছিল। শাঙ্কো বলল

–ফ্রান্সিস মাত্র তো পাঁচজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ওদের হারিয়ে দিতে পারবো। ..

না শাঙ্কো–আমি লড়াই চাই না। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যারি বলল–এক কাজ করো–ওদের জাহাজে উঠতে দাও। ওরা কী বলতে চায় শুনি। তারপর যা করার করবো।

–বেশ–ফ্লেজারকে বলো জাহাজ তীরভূমিতে নিতে। পাটাতনও পেতে দাও।

ফ্লেজার ফ্রান্সিসদের নির্দেশমতো জাহাজ তীরে ভেড়াল। পাটাতন ফেলা হল। সৈন্যরা পাটাতন দিয়ে জাহাজে উঠল। তার আগে বালিয়াড়িতে ওর মশাল পুঁতে রাখল।

পাঁচজন জাহাজে উঠতে ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। হ্যারিও সঙ্গে গেল। ওদের মধ্যে একজন সর্দার গোছের লোক ভাঙা ভাঙা পোর্তুগীজ ভাষায় বলল- তোমরা কারা? এখানে এসেছো কেন? তোমাদের দেখেই বুঝতে পারছি তোমরা বিদেশি। তোমাদের দেশ কেথায়?

একগাদা প্রশ্নের উত্তরে হ্যারি বলল–আমরা জাতিতে ভাইকিং। পশ্চিমে য়ুরোপের সমুদ্রতীরে আমাদের দেশ।

-তোমরা জলদস্যু হতে পারো। হ্যারি ক্রুদ্ধস্বরে বলল–কী দেখে আমাদের জলদস্যু বলে সন্দেহ করছো?

–তোমরা এতজন জোয়ান। একসঙ্গে জাহাজে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাহাজ লুঠ করা তোমাদের পক্ষে খুবই সহজ কাজ। লোকটা বলল।

তখনই মারিয়া ফ্রান্সিসদের কাছে এসে দাঁড়াল।হ্যারি আঙ্গুল তুলে মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। কোনো দেশের রাজকুমারী জলদস্যুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় শুনেছো কখনো?

–না–এরকম শুনিনি। লোকটা বলল।

তবে? হ্যারি বলল।

–তাহলে তোমরা রানি উরাকার গুপ্তচর।

–রানি উরাকার নাম আমরা জন্মেও শুনিনি। তাছাড়া তোমাদের রাজা-রানির কোনো ব্যাপারে আমরা নেই। আমরা দেশে দেশে দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়াই। সবার সঙ্গে সহৃদয় সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করি। যদি কোথাও গুপ্তধনের সংবাদ পাই আমরা বুদ্ধিখাঁটিয়ে তা উদ্ধার করি। তারপর সেখানকার শাসককে দিয়ে দিই। ফ্রান্সিস বলল।

–তোমরা তাতে ভাগ বসাও। সর্দারটা বলল।

-না। একটা তামার মুদ্রাও আমরা নিই নি। হ্যারি বলল।

সর্দার গোছের লোকটা দাঁত বের করে হেসে সঙ্গীদের দিকে তাকাল। সঙ্গীরাও হাসল। লোকটা বলল–তোমরা কত কষ্টে গুপ্তধন উদ্ধার করো আর তার এককণাও নাও না–এটা বিশ্বাস হচ্ছে না।

–খুবই স্বাভাবিক। আমরা চোর ডাকাত জোচ্চোরদেরই বেশি দেখি। মানুষ যে অন্যরকমও হয়–মানুষ যে সৎও হয়, হৃদয়বানও হয়, সত্যবাদীও হয় এটা আমরা সহজে বিশ্বাস করতে পারি না। হ্যারি বলল।

যাকগে। তোমাদের বন্দি করা হল। সর্দার বলল।

–কেন? আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি। হ্যারি বলল।

–সেসব বুঝি না। সর্দার বলল।

আমরা দেশে ফিরে যাচ্ছি। আমাদের বাধা দিও না। ফ্রান্সিস বলল।

–তোমরা কি আমাদের সঙ্গে লড়াই করবে? সর্দার বলল।

–না। লড়াই মৃত্যু রক্তপাত এসব আমরা চাই না। হ্যারি বলল।

কাপুরুষ। সর্দার বলল।

শাঙ্কো এগিয়ে এসে নিজেদের দেশের ভাষায় বলল–ফ্রান্সিস আমরা বিনাযুদ্ধে এভাবে বন্দি হবো না। আমরা লড়াই করবো। অন্য ভাইকিং বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল– ও-হো-হো।

সৈন্য কজন একটু ঘাবড়াল।

ফ্রান্সিস বলল–ভাইসব। শান্ত হও। সময় সুযোগমতো লড়াই করবো। এখানে ধারেকাছে সেনানিবেস থাকা অসম্ভব নয়। একবার লড়াইয়ে নামলে এরা দু-একজন মারা য়াবে দু-একজন পালাবে। সেনানিবাসে এই সংবাদ পৌঁছেলে কত না সৈন্য ছুটে আসবে কে জানে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–দেখো-বাতাস পড়ে গেছে। শুধু দাঁড় বেয়ে আমরা বেশিদূর যেতে পারবো না। ধরা পড়ে যাবো। তখন লড়াই মানেই আমাদের মৃত্যু। কাজেই আগে সব শুনি। হ্যারি ওদের কাছে শোনো তো এখানকার রাজা কে? রানি উরাকা কে? কী জন্যে ওরা আমাদের রানি উরাকার গুপ্তচর বলে ভাবছে?

হ্যারি জিজ্ঞেস করল–তোমাদের রাজার নাম কী?

–মহামান্য গঞ্জালেস। সর্দার বলল।

–রানি উরাকা কোথাকার রানি? হ্যারি জানতে চাইল।

আমরা যেখানে আছি এটা রানি উরাকার দেশের সীমা। এখান থেকে কিছু দূরে গেল রানি উরাকার দুর্গ দেখতে পাবে। যান তো–এসব বলে কী হবে। তোমার সব জেনেই এখানে এসেছো। রানি উরাকা তোমাদের পাঠিয়েছে। মহামান্য গঞ্জালেসের সৈন্যসংখ্যা কত? তার সেনানিবাস কোথায়? এসব খবর সংগ্রহের জন্যেই তোমাদের পাঠানো হয়েছে। এখন ধরা পড়ে অন্যরকম কথা বলছো যেন কিছুই জানো না। সর্দার বলল।

–আমরা আগেও বলেছি এখনও বলছি–রানি উরাকার নামও আমরা কোনোদিন শুনিনি। তোমাদের কাছেই প্রথম শুনলাম। ফ্রান্সিস বলল।

–যাক গে–তোমাদের বন্দি করা হল। সর্দার বলল।

ওদিকে শাঙ্কো বিস্কোরা দল বাঁধল। অস্ত্রঘর থেকে তলোয়ার সকলের অলক্ষ্যে এনে সিঁড়িঘরের পেছনে এসে দাঁড়াল। সৈন্যরা যখন ফ্রান্সিসদের বন্দি করতে এগিয়েএলো তখন শাঙ্কোরা সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অতর্কিত এই আক্রমণে সৈন্যরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ওরা কোমরের অসিকোষ থেকে তলোয়ার বের করল। ততক্ষণে দুজন সৈন্য শাঙ্কোদের তলোয়ারের মার খেয়ে ডেক-এ পড়ে গেছে। শুরু হল তলোয়ারের লড়াই। রাজা গঞ্জালেসের সৈন্যরা এলো উষ্ণীষ পরা। ভাইকিংদের তো সেসব নেই। সামনাসামনিই লড়াই চলল। কিছুক্ষণ লড়াই করেই সৈন্যরা বুঝল শাঙ্কোরা তলোয়ার চালাতে কত দক্ষ।

ফ্রান্সিস আর হ্যারি বাধা দেবার সময় পেল না। এখন দুজনেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লড়াই দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি–আমরা বিপদে পড়লাম। শাঙ্কোরা মাথা গরম করে আমাদের বিপদ ডেকে আনলো। দুজন ভাইকিং আহত হয়ে ডেক-এ পড়ে গেল।

ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব লড়াই করো না। লড়াই বন্ধ করো। নইলে আমরা বিপদে পড়বো। এখনও কেউ মারা যায় নি। আর কিছুক্ষণ লড়াই চালালে। উভয়পক্ষের কেউ না কেউ মারা যাবে। তার আগে লড়াই থামাও।

ভাইকিংরা লড়াই থামাল। সবাই অস্ত্র ত্যাগ করল। সৈন্যরাও অস্ত্র নামাল। সবাই হাঁপাচ্ছে তখন। শাঙ্কোরা রাজা গঞ্জালেসের দুজন সৈন্যকে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে জলে ছুঁড়ে ফেলল।

আহত সৈন্যদের নিয়ে রাজা গঞ্জালেসের সৈন্যরা জাহাজের পাটাতন দিয়ে তীরে নেমে এলো। জলে যে দুজন সৈন্যকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল তারাও দলের সঙ্গে জুটল। সর্দার গোছের সৈন্যটি তলোয়ার উঁচিয়ে বলল– এর ফল তোমাদের ভুগতে হবে।

তীরের বালিয়াড়ি পার হয়ে ঘাসের প্রান্তর পেরিয়ে ওরা দক্ষিনমুখো চলল। তখনই সূর্য উঠল। রোদ ছড়াল সমুদ্রে ফ্রান্সিসদের জাহাজ তীরভূমির গাছ গাছালির মাথায় সবুজ প্রান্তরে। দেখা গেল দূরে সৈন্যরা যচ্ছে। শাঙ্কো বলল- ফ্রান্সিস তুমি বলাতেই আমরা অস্ত্র ত্যাগ করলাম। আর কিছুক্ষণ সময় পেলে ওদের হারিয়ে দিতে পারতাম।

তা পারতে। লড়াইয়ের সময় মাথা উত্তেজিত থাকে। দু-একজন সৈন্য নিশ্চয়ই মারা পড়ত। আমাদের অপরাধ বেশি হত। ওরা আমাদের বন্দি করতে এসেছিল। আমাদের ওরা আক্রমণ করেনি।

হ্যারি বলল–যা হবার হয়ে গেছে। এখন ফ্রান্সিস কী করবেন?

–এক্ষুণি নোঙর তোলো। জাহাজ ছাড়ো। দাঁড় টানো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমদের এ তল্লাট ছেড়ে পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

ভাইকিংরা কাজে নেমে পড়ল। জাহাজের গুটিয়ে রাখা পালগুলো খুলে দিল। পালগুলো অল্প ফুলে উঠল। কারণ বাতাস এসে গেছে। নোঙর তোলা হল। একজন দাঁড়ঘরে চলে গেল। দাঁড়টানা শুরু হল। জাহাজ চলল।

মাস্তলের মাথায় বসা নজরদার পেড্রো গলা চড়িয়ে বলল–ফ্রান্সিস, ঘোড়ায় চড়ে কারা আসছে, ধুলো উড়িয়ে খুব দ্রুত আসছে।

–দক্ষিন দিক থেকে তাই না? ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। পেড্রো বলল।

–এখন কী করবে ফ্রান্সিস? হ্যারি বলল।

–ধরা দেব। উপায় নেই। ফ্রান্সিস বলল।

— একবারে লড়াই না করে? হ্যারি বলল।

–এখন তো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখো–কত সৈন্য আসছে। ঘোড়ায় চড়ে আসছে মাত্র কয়েকজন। পেছনে তাকিয়ে দেখো। পদাতিক সৈন্য কত! ফ্রান্সিস বলল।

–আবার বন্দিজীবন। হ্যারি বলল।

–বন্দিদশা মেনে নেব। সময় সুযোগমতো পালাবো। এছাড়া কোনো উপায় নেই। ফ্রান্সিস বলল।

অল্পক্ষণের মধ্যেই অশ্বারোহীরা কাছে এসে পড়ল। তাদের গলায় বর্মে উষ্ণীষে রোদ পড়েছে। চক্ করছে।

অশ্বারোহীরা তীরের কাছে নামল। একজন দীর্ঘদেহী যোদ্ধা ঘোড়া থেকে নেমে এগিয়ে এলো বালিয়াড়িতে। গলা চড়িয়ে বলল–জাহাজ থামাও।

–আমরা জাহাজ থামিয়েছি। নোঙর ফেলেছি। হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল।

–পাটাতন ফেলো। শাঙ্কোরা পাটাতন পেতে দিল। দীর্ঘদেহী পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে জাহাজে উঠল। চারদিকে তাকিয়ে ভাইকিংদের দেখল। তারপর বলল –তোমরা বলছো তোমরা ভাইকিং। দেশ ঘুরতে বেরিয়েছে। কিন্ত আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।

–কী করলে তবে বুঝবেন যে আমাদের বিশ্বাস করা চলে? হ্যারি বলল।

–সেসব পরে হবে। আমি এই দেশের সেনাপতি। মহামান্য রাজা গঞ্জালেস আসছেন। তিনি কী বলেন শোনো।

তখন দেখা গেল দাড়ি গোঁফওয়ালা একজন মোটা লোক ঘোড়া থেকে নামলেন। তীরের দিকে এগিয়ে এলেন। বালিয়াড়িতে নামলেন। কোনো কথা না বলে পাতা পাটাতন দিয়ে হেঁটে জাহাজে উঠে এলেন। তার পরনে কালো জোব্বামতো পোশাক। তাতে রুপোলি সুতোর সূক্ষ্ম কারুকাজ। মাথায় ঢেউ-খেলানো সোনার রাজমুকুষ্ট।সকালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে। কোমরে চামড়ার মোটা ফেট্রি। তাতে হাতির দাঁতের বাঁটওয়ালা তলোয়ার ঝুলছে। গঞ্জালেস জাহাজে উঠে তাকিয়ে তাকিয়ে জাহাজটা দেখলেন। ভাইকিংদের দেখলেন। একবার জোরে কাশলেন। তারপর বেশ ভারী গলায় বললেন- তোমরা আমার সৈন্যদের আহত করছে। আমার একজন সৈন্যও যদি মারা যেত তোমাদের সবকটাকে তাহলে কেটে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতাম। তোমরা নিজেদের ভাইকিং বলে পরিচয় দিয়েছে। পোশাক নয় তোমাদের চেহারা দেখে বুঝতে পারছি তোমরা বিদেশি। তোমরা ভাইকিং। কিন্তু গঞ্জালেস থামলেন। তারপর বলতে লাগলেন–এখন এখানে যুদ্ধের তোড়জোড় চলছে। রানি উরাকা আমাদের দেশ আক্রমণের জন্যে তৈরি হচ্ছে। আমরাও তৈরি হচ্ছি। যুদ্ধ হবেই। এই সময় তোমরা এখানে এসেছো কেন?

–আমরা ইচ্ছে করে এখানে আসিনি। আমরা আমাদের দেশে ফিরেযাচ্ছি।হ্যারি।বলল।

–কিন্তু আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। রানি উরাকা গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহের জন্যে তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। রাজা বললেন।

–কিন্ত আমরা একবারও জাহাজ থেকে নামিনি। তাহলে কী করে আমরা গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহ করবো। হ্যারি বলল।

–সেসব বুঝি না। তোমদের বন্দি করা হল। রাজা গঞ্জালেস বললেন।

–এটা অন্যায়। আপনারা কোনো প্রমাণ ছাড়াই আমাদের গুপ্তচর ভেবেছেন। সন্দেহের বশে আমাদের বন্দি করেছেন। আমরা এখানে এসে রানি উরাকা এবং আপনার নাম প্রথম জানলাম। হ্যারি থামল। এবার ফান্সিস ভাঙা ভাঙা পোর্তুগীজ ভাষায় বলল রানি উরাকার হয়ে আমরা কেন গুপ্তচরবৃওি করতে যাবো? তাতে আমাদের কী লাভ?

হয়তো সোনার চাকতি দেবে। রাজা হেসে কাশলেন। তারপর বললেন–হয়তো এমনি কোনো বন্দোবস্ত হয়েছে। তোমাদের যা হাল দেখছি। সোনার লোভ তোমরা সামলাতে পারোনি।

–আপনি আমাদের সঠিক পরিচয় জানেন না। অনেক মূল্যবান গুপ্তধন আমরা উদ্ধার করেছি। সেই গুপ্তধনের যিনি মালিক তাঁকেই আমরা গুপ্তধনের ভান্ডার দিয়ে দিয়েছি। এক টুকরো সোনা বা হীরে আমরা নিইনি। হ্যারি বলল।

–তোমরা বলছো কিন্ত আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। রাজা বললেন। তখনই মারিয়া মাস্তলের পেছন থেকে সামনে এলো। রাজা গঞ্জালেস মারিয়াকে দেখে বেশ অবাক হলেন। বললেন এ কে?

–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। ফ্রান্সিস বলল।

–রাজকুমারী এইভাবে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে? তোমাদের সঙ্গে? এর স্বামী কোথায়? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

আমিই রাজকুমারীর স্বামী। রাজকুমারী মারিয়াও আমাদের মতো অ্যাডভেঞ্চর অভিযান ভালোবাসেন। তাই আমাদের সঙ্গে এসেছেন।

অবাক কান্ড। চোখ বড়ো বড়ো করে রাজা গঞ্জালেস বললেন।

হ্যারি হেসে বলল–হ্যাঁ কিছু কিছু অবাক কান্ড তো সংসারে ঘটে।

যাক গে। রাজা গঞ্জালেস সেনাপতিকে ইসারায় ডাকলেন। সেনাপতি কাছে এগিয়ে এলো। রাজা বললেন– সবাইকে বন্দি করে নিয়ে চলো। রানি উরাকার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এরা বন্দি থাকবে।

–একটা অনুরোধ ছিল। হ্যারি বলল। রাজা হ্যারির মুখের দিকে তাকালেন। বললেন কী কথা?

আমাদের রাজকুমারীকে আপনার অন্দরমহলে রাখুন। আমাদের তো আপনার বন্দি নিবাসে রাখা হবে। রাজকুমারী অত কষ্ট সহ্য করতে পারবেন না। হ্যারি বলল।

–দেখি ভেবে। রাজা গঞ্জালেস জাহাজ থেকে নামলেন। চললেন নিজের ঘোড়াটার দিকে। ঘোড়াটায় উঠলেন। ঘোড়া ছোটালেন ঘাসে ঢাকা প্রান্তরের ওপর দিয়ে।

সেনাপতি এগিয়ে এলো। বলল- তোমাদের হাত বাঁধা হবে না। সেই সুবিধে নিয়ে কেউ পালাবার চেষ্টা করতে গেলে তাকে মরতে হবে। এবার চলো। ফ্রান্সিসরা জাহাজ থেকে নামতে লাগল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস –আমি পালাবো।

পারবে না। একে দিনের বেলা তার ওপর সেনাপতিকে লক্ষ্য করো চারিদিকে নজর রেখে চলেছে? ফ্রান্সিস বলল।

–আবার তো বন্দির জীবন। শাঙ্কো বলল।

–হা ফ্রান্সিস মাথা ওঠা-নামা করল।

–আমরা আর পালাতে পারবো না। শাঙ্কো বলল।

দাঁড়াও। কোথায় আমাদের রাখা হয়। পাহারার ব্যবস্থা কী হয় এসব দেখে। ভেবেচিন্তে পালাবার উপায় বের করা হবে। এক্ষুণি পালাবার সময় বা উপায় নয়। ফ্রান্সিস বলল।

পদাতিক সৈন্যদের মধ্যে তিরিশ চল্লিশজন রইল। বাকিরা চলে গেল। ঐ তিরিশ চল্লিশজন সৈন্য ফ্রান্সিসদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল।

ফ্রান্সিসরা যেতে যেতে দেখল জমিতে চাষিরা চাষ করছে। বাড়িঘর। কাঠের ওপর মাটি লেপা ছাত। বাড়িগুলো পাথরের। বাড়িগুলো থেকে লোকজন বেরিয়ে আসছে। বন্দি ফ্রান্সিসদের দেখছে। মেয়েরা মারিয়াকে হাঁ করে দেখছে। ওরা বুঝতে পেরেছে বন্দিরা বিদেশি।

এক-মানুষ উঁচু পাথরের দেয়ালঘেরা শহর। এটাই বোধহয় রাজধানী। রাস্তা দিয়ে চলেছে। দুপাশে দোকান টোকান। পথে খুব ভিড় নয়। এক ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলেছে। হাঁটতে হাঁটতে ফ্রান্সিসরা একটা লম্বাটে বড়ো বাড়ির সামনে এলো। সেনাপতি হাত তুলে সবাকে থামতে ইঙ্গিত করল। এত বাড়ি। নিশ্চয়ই রাজবাড়ি।

সেনাপতি বাড়িটার পুবকোণায় গেল। সেখানে একটা ঘরের সামনে এলো। দেখা গেল তিন-চারজন পাহারাদার সৈন্য। খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে। সেনাপতি কারারক্ষীদের ইশারা করল। একজন রক্ষী কোমরে গোঁজা একটা বড়ো চাবির রিং বের করল। লোহার দরজার সামনে গেল। দেখা গেল একটা বড়ো তালা ঝুলছে। পাহারাদার চাবি লাগিয়ে তালাটা খুলে ফেলল। ঢং ঢং শব্দে লোহার দরজাটা খুলল।

সেনাপতি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসদের ঘরটায় ঢোকার জন্যে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা ঢুকতে লাগল। হ্যারি সেনাপতিকে বলল–আমাদের মধ্যে দুজন আহত বন্ধু আছে। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।

ব্যবস্থাটা তোমরা করলেই পারতে। সেনাপতি বলল।

–সে সময় পাইনি। আর একটা কথা। হ্যারি বলল।

–কী? সেনাপতি বলল।

সকাল থেকে আমরা কিছু খাইনি। আমাদের তাড়াতাড়ি খেতে দিন।

হ্যারি বলল।

–ঠিক আছে দেখছি। সেনাপতি বলল।

হ্যারি ঘরটায় ঢুকল। বোঝাই গেল কয়েদঘর। বাইরের চড়া আলো থেকে বেশ অন্ধকার অন্ধকার ঘরটায় প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। একেবারে ওপরে দুপাশের দেয়ালের গায়ে জানালা। ওখানে দিয়ে যা একটু আলো আসছে। মেঝের পাতা গাছের ছাল দিয়ে তৈরি পাটির মতো। বসে আছে শুয়ে আছে বন্ধুরা। একপাশে ফ্রান্সিস দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে। পাশে মারিয়া। তার পাশে শাঙ্কেরা।

হ্যারি এসে সেখানে বসল। মারিয়া ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল তোমাদের জীবনের অর্ধেকটাই কেটে গেল কয়েদঘরে থেকে থেকে। হ্যারি হাসল। বলল–আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। ফ্রান্সিস বলল –হ্যারি দেখো তো ভেন ওর ওষুধপত্র এনেছে কিনা।

-কেন বলো তো। হ্যারি বলল।

দুই বন্ধু আহত। তাদের তো ওষুধ চাই। ফ্রান্সিস বলল।

–আমি সেনাপতিকে ওষুধের কথা বলেছি। হ্যারি বলল।

মনে হয় না ওরা দেবে। ওদের সৈন্যদের সঙ্গে লড়তে গিয়েই তো আমার বন্ধুরা আহত হয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।

–কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখা যাক। আমি খাবারও তাড়াতাড়ি দিতে বলেছি। হ্যারি বলল।

–ভালোই করেছে, সকাল থেকে কেউ কিছু খেতে পারেনি। ফ্রান্সিস বলল।

ঘন্টাখানেক কেটে গেল। ভাইকিংরা কেউ কথা বলছেনা। শুয়ে বসে আছে। অন্ধকার এখন সকলের চোখেই সয়ে এসেছে।

ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি?

হ্যারি বলল–বলো।

–ওরা ওষুধ দেবে না। ভেনকে ডাকো। হ্যারি উঠে দাঁড়াল। তাকিয়ে তাকিয়ে ভেনকে খুঁজল।দেখল ডান কোণায় ভেন বসে আছে। হ্যারি বন্ধুদের জন্যে ফিরে ভেন এর কাছে এলো। দেখল ভেন আসনসিঁড়ি হয়ে বসে আছে দুচোখ বন্ধ। হ্যারি ডাকল, ভেন। ভেন চোখ মেলে তাকাল। হ্যারি বলল–আমাদের দুই বন্ধু তো আহত। তুমি কি কিছু ওষুধ এনেছো? ভেন ফোকলা দাঁতে হেসে কোমরের ফেট্টি থেকে দুটো কাপড়ের থলে বের করল। হ্যারি হেসে বলল–সাবাস ভেন। ওদের ওষুধ দাও।

–এখানে আসতে বলো। এক পাত্র জল যেন নিয়ে আসে। ভেল বলল।

হ্যারি বন্ধুদের মধ্যে আহত বন্ধু দুজনকে খুঁজে বের করল। বলল –ভেন ওষুধ এনেছে। আমাদের জন্যে মাটির জালায় জল রাখা আছে আর একটা পাত্রও থাকতে পারে। ওটাতে জল ভরে নিয়ে যেও।

দুই বন্ধু উঠল। একজনের পায়ে তলোয়ারের ঘা লেগেছে অন্য জনের ঘা লেগেছে হাতে। দুজনে জলের পাত্র নিয়ে ভেন-এর কাছে চলল।

ভেন থলে থেকে কালো রঙের গুড়ো বের করল। সামান্য জল ঢেলে দুহাতের চেটোয় ঘষতে ঘষতে একটা বড়ির মতো করল। ঐভাবে আরো একটা বড়ি তৈরি করল। দুজনকে খেতে দিল। দুজনে খেল। এবার মে আর একটা থলে থেকে হলুদ রঙে র গুড়ো বের করল। দুজনের কাটা জায়গায় হলুদ রঙের গুঁড়ো আস্তে আস্তে ছড়িয়ে দিল। ক্ষত জ্বালা করে উঠল। তারপর এতক্ষণের যন্ত্রণা কমে আসতে লাগল। দুজনে নিজেদের জায়গায় ফিরে গেল।

তখনই ঢ্যাং ঢ্যাটাং শব্দে কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। দুজন পাহারাদার খোলা তলোয়ার হাতে ঢুকল। দরজার কাছে দুদিকে দুজন দাঁড়াল।

একজন লোক কাঠের বড়ো থালা নিয়ে ঢুকল। তাতে গোল কাটা রুটি আর একজন বড়ো ডেকচি নিয়ে ঢুকল। আর একজন একগাদা পাতা হাতে ঢুকল। সে দ্রুত হাতে পাতাগুলো সব বন্দিদের সামনে পেতে দিল। রুটি আর নানা সজির তরকারি। সঙ্গে অল্প ঝোল দেওয়া হল।

ভাইকিংরা সবাই বেশ ক্ষুধার্ত। গঙ্গপ করে সব নিয়ে খেয়ে নিল। অনেকেই দুবার চেয়ে নিয়ে খেল।

মারিয়ার শরীরটা ভালো লাগছিল না। বেশি খেতেও পারল না। ফ্রান্সিস সেটা লক্ষ্য করে বলল কী ব্যাপার? খাচ্ছো না?

–খিদে নেই। রাতে বেশি করে খাবো। মারিয়া বলল।

উঁহু। মনে হচ্ছে তোমার শরীর ভালো নেই। ফ্রান্সিস বলল।

–না না আমার শরীর ভালো আছে। মারিয়া বলল।

ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। খেতে লাগল। বন্দিদের খাওয়া শেষ হল। সবাই জল খেল। ফ্রান্সিস মারিয়ার জন্যে খাবার জল নিয়ে এলো। মারিয়া খেল। মারিয়া আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল।

সন্ধ্যাবেলা মারিয়া বুঝল জ্বর এসেছে। শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যথা। গা মোচড়াচ্ছে যেন।

রাতে মারিয়া কিছুই খেতে পারল না। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি মারিয়ার কপালে হাত রাখল। বেশ গরম। বলল–তোমার তো জ্বর হয়েছে।

–ও কিছু না। কালকে সকালেই দেখবে জ্বর ছেড়ে গেছে। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। মারিয়ার মাথা নিজের কোলে নিয়ে বসে রইল। মারিয়া ঝিম মেরে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে গুঙিয়ে উঠছে। মাথা ওপাশ-এপাশ করছে।

ফ্রান্সিস ডাকল হ্যারি। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল কী ব্যাপার?

–মারিয়ার জ্বর এসেছে। মনে হচ্ছে জ্বর বেড়েছে। তুমি ভেনকে ডাকো। একটু পরেই ভেন এলো। মারিয়ার কপালে হাত দিয়ে দেখল। চোখের নীচে দেখল। বলল– ফ্রান্সিস রাজকুমারীর বেশ জ্বর। মনে হয় রাতে বাড়তে পারে। যাতে জ্বর না বাড়ে তার জন্যে এই বড়িটা এখন আর ঘন্টা দুয়েক পরে আর একটা খাইয়ে দাও। ভেন ওখানেই বসে রইল। সেই আসনসিঁড়ি হয়ে। ফ্রান্সিস মারিয়াকে একটা বড়ি খাইয়ে দিল।

শেষ রাতের দিকে মারিয়া চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাল। ফ্রান্সিস তখনও মারিয়ার মাথা কোলে রেখেছে। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। বলল–মারিয়া মারিয়া। শরীর খারাপ লাগছে?মারিয়া এপাশ-ওপাশ কয়েকবার তাকাল। তারপর থেমে থেমে বলতে লাগল– ঘরটা এত অন্ধকার–ঐ তো সমুদ্র–আমি সমুদ্রে সাঁতার–সূর্য ডুবে যাচ্ছে টুপ করে বাতাস ভেজা ভেজা বৃষ্টি হয়েছে। ফ্রান্সিস মুখ নিচু করে ডাকল মারিয়া–মারিয়া কী বলছো এসব। হ্যারি দেয়ালের পাথরের খাঁজ থেকে মশাল তুলে এনে মারিয়ার কাছে দাঁড়াল। এবার মারিয়া মুখটা অনেকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস ভেনকে ডাকল। ভেন চোখ খুলে তাকাল। আবারমারিয়াকে ভালো করে দেখল। বলল– ফ্রান্সিস আর একটা ওষুধ দিচ্ছি। এতে জ্বর না কমলে কিছু করার নেই। সব ওষুধ তো আমি আনতে পারিনি।

ভেন অন্য একটা ছোটো থলে কোমরের ফেট্টি থেকে বের করল। একটা বড়ি বের করল। বড়িটা হাতে নিয়ে মারিয়ার মুখের ওপর ঝুঁকে বলল-রাজকুমারী, এই বড়িটা হাতে নিয়ে মারিয়ার মুখের ওপর ঝুঁকে বলল-রাজমারী,এই বড়িটা চুষে খেয়ে নিন। জ্বর কমবে। মারিয়া গোঙাতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল –বড়িটা আমাকে দাও। বড়িটা নিয়ে মারিয়াকে বলল–মারিয়া মুখ খোলো–ওষুধ মুখে নাও। মারিয়া চোখ বুজে গোঙাতে লাগল। মুখ হাঁ করল না।

ভেন বড়িটা নিল। তারপর মারিয়ার মুখের দাঁতের পাটি ডান হাতের আঙ্গুলের চাপে খুলে বড়িটা ফেলে দিল। মারিয়া হঠাৎ চোখ খুলে তাকাল। বড়ো বড়ো চোখ করে চারদিকে তাকিয়ে নিল। তারপর ভাঙা গলায় বলল তোমরা কারা? এ্যা? কারা সব? কী চাও তোমরা? কে আমাকে ডাকছে? কেকে-কে? নিস্তেজ হয়ে মারিয়া দু-চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। মারিয়ার রোগাৰ্ত ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস ফুঁপিয়ে উঠল। হ্যারি, শুনল সেটা। নিচু হয়ে ফ্রান্সিসের পিঠে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস অস্থির হয়ে পড়ো না।

ফ্রান্সিস ভেনকে মৃদুস্বরে বলল–ভেন আমাদের জাহাজে গেলে তুমি মারিয়াকে ওষুধ দিয়ে সুস্থ করে তুলতে পারবে?

–আমার মনে হয় পারবো। ভেন বলল।

ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। ছুটে গেল লোহার দরজার কাছে। চিৎকার করে ডাকল– পাহারাদার–পাহারাদার কাছে এসো। তখন দুজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছিল। ফ্রান্সিসের ডাক শুনলেও না শোনার ভান করে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগল। ফ্রান্সিস দুহাতে লোহার দরজা ঝাঁকাতে আঁকাতে চিৎকার করে বলল–এদিকে এসো। দরজায় জোর শব্দ উঠল–ঝন্ ঝন।

একজন পাহারাদার এগিয়ে এলো। বলল–কী ব্যাপার?

আমাদের রাজকুমারী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তোমাদের সেনাপতিকে ডাকো। ফ্রান্সিস বলল।

–সেনাপতি তোমার চাকর নাকি যে ডাকলেই আসবে। পাহারাদারটি বলল।

ফ্রান্সিস আবার লোহার দরজায় প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল– সেনাপতিকে ডাকো। রক্ষী দুজন তলোয়ার নির্বিকভাবে তলোয়ার উঁচিয়ে পাহারা দিয়ে গেল। লোহার দরজার শব্দে ফ্রান্সিসের চিৎকারে ভাইকিংদের ঘুম ভেঙে গেল। সকলে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ততক্ষণে ওরা জেনে গেছে মারিয়া গুরতর অসুস্থ। তখন ফ্রান্সিস একটু দুরে সরে এসে ছুটে গিয়ে লোহার দরজার ওপর পিঠ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দরজায় প্রচন্ড শব্দ উঠল। ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি দিল–ও-হো-হো। রক্ষীরা বেশ ঘাবড়ে গেল। লোকটা লোহার দরজা ভেঙে ফেলবে নাকি। একজন রক্ষী এলো। বলল–কী চাও তুমি?

সেনাপতিকে ডাকো। আমি কথা বলব। ফ্রান্সিস বলল।

–এত রাতে? ঘুমিয়ে পড়েছে। রক্ষী বলল।

–কোনো কথা শুনতে চাই না। ঘুম ভাঙিয়ে সেনাপতিকে নিয়ে এসো ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি কী চাও বলো তো? কারারক্ষীটি বলল।

–তোমাদের নয়–সেনাপতিকে বলবো। সেনাপতিকে নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।

–এখন ডাকাডাকি করলে সেনাপতি রেগে যাবেন। রক্ষীটি বলল।

–আমি কিছু শুনতে চাইনা। সেনাপতিকে এখানে নিয়ে এসো। কথাটা বলে ফ্রান্সিস আবার পিঠ এগিয়ে লোহার দরজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আবার প্রচন্ড শব্দ উঠল।

কারারক্ষী দুজন নিজেদের মধ্যে কথা বলল। তারপর একজন রক্ষী বলল–ঠিক আছে। যদি সেনাপতি না আসতে চান আমাদের তখন কিছু করার নেই।

গিয়ে বলবে-বন্দি ভাইকিংদের সঙ্গে যে রাজকুমরী রয়েছেন তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এক্ষুণি তার চিকিৎসার দরকার। সেনাপতি যেন আসে। ফ্রান্সিস বলল।

একজন রক্ষী চলে গেল। কিছুক্ষন পরে ফিরে এলো। সঙ্গে সেনাপতি লোহার দরজার ওপার থেকে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল কী ব্যাপার?

–আমাদের রাজকুমারী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমাদের বৈদ্য তাঁর চিকিৎসা করবেন। কিন্ত বৈদ্য প্রয়োজনীয় ওষুধ জাহাজে রেখে এসেছেন। রাজকুমারী আর বৈদ্যকে আমাদের জাহাজে যেতে দিতে হবে। ওখানেই রাজকুমারীর চিকিৎসা হবে।

–আমরা এখানে বৈদ্যকে ডেকে পাঠাচ্ছি। সেনাপতি বলল।

–না–আমাদের বৈদ্যই চিকিৎসা করবেন। ফ্রান্সিস বলল।

–ও। তাহলে তোমরা তিনজন জাহাজে যেতে চাও। সেনাপতি বলল।

–হ্যাঁ। রাজকুমারীর চিকিৎসার জন্য। ফ্রান্সিস বলল।

যদি এই সুযোগে তুমি জাহাজ চালিয়ে পালিয়ে যাও। সেনাপতি বলল।

–আমাদের পাহারা দিক আপনার সৈন্যরা। রাজকুমারী সুস্থ হলেই আমরা এখানে চলে আসবো। ফ্রান্সিস বলল।

সেনাপতি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবল। তারপর মুখ তুলে বলল– বেশ। আমি কিন্ত রাজার অনুমতি ছাড়াই তোমাদের যেতে দিচ্ছি। কালকে রাজসভায় এসে সব তোমাকে বলতে হবে। রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে আমি সম্মতি দিয়েছি–একথাও বলতে হবে।

–বেশ বলবো। ফ্রান্সিস বলল।

সেনাপতি কারারক্ষীর একজনকে বলল-দরজা খুলে দাও। দরজা খোলা হল। সেনাপতি বলল–তোমরা বেরিয়ে এসো।

ফ্রান্সিস রাজকুমারীর কাছে গেল। ভেনকে বলল–আমরা আমাদের জাহাজে রাজকুমারীকে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে। ভেন বলল–বেশ। তারপর উঠে দাঁড়াল।

ফ্রান্সিস মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে ফেলল। মারিয়াকে কি বাঁচানো যাবে? হ্যারি এতক্ষণ মশাল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার ফ্রান্সিসের কাছে এসে বলল ফ্রান্সিসভেঙে পড়ে না। বিপদের সময় তুমিই তো সাহস দাও। আজ তোমাকে নিজেরই মন শক্ত করতে হবে। ভেবোনা ফ্রান্সিস-রাজকুমারী ঠিক সুস্থ হবেন। তোমরা যাও।

ফ্রান্সিস আর একবার মারিয়ার মুখের দিকে তাকাল। তারপর মারিয়াকে দুহাতে তুলে পেটের কাছে নিয়ে এলো। পাঁজাকোলা করে দরজার কাছে নিয়ে এলো। খোলা দরজা দিয়ে বাইরে এলো। পেছনে ভেন। তিনজন কারারক্ষী খোলা তলোয়ার হাতে ফ্রান্সিস আর ভেন-এর পাশে দাঁড়াল। দুজন ফ্রান্সিসের দুপাশে। একজন ভেন-এর পাশে।

সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল– কোনরকম চালাকি করতে দেখলে তিনটেকেই মেরে ফেলবি।

ভেন সেনাপতিকে বলল–একটা শস্যটানা গাড়ি পেলে ভালো হতো। সেনাপতি বলল–এত রাতে গাড়ি পাওয়া যাবে না। তাহলে কাল সকালে যাও।

কিছু ভেবো না ভেন। আমি মারিয়াকে ঠিক নিয়ে যেতে পারবো। চলো। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিসরা চলল। আজকে জ্যোত্মা কিছুটা উজ্জ্বল। দুপাশে গাছগাছালিতে হাওয়া বয়ে যাওয়ার শব্দ। ফ্রান্সিস আর ভেন চলল।

হঠাৎ মারিয়ার মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে মারিয়াকে কাঁধে তুলে নিল। গোঙানি বন্ধ হল।

ওরা চলল। ফ্রান্সিসরা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এসে পড়ল। সমুদ্র কাছেই। মাঝে মাঝেই জোর হাওয়া ছুটে আসতে লাগল সমুদ্রের দিক থেকে। ঘর্মাক্ত ফ্রান্সিস একটু আরাম পেল। ফ্রান্সিসরা সমুদ্রতীরে পৌঁছল। বালিয়াড়িতে নামল। তারপর চলল জাহাজের দিকে ফেলা পাটাতনের ওপর দিয়ে সবাই জাহাজে উঠে এলো।ফ্রান্সিস রক্ষীদের বলল– তোমারা যেখানে খুশি দাঁড়িয়ে বসে পাহারা দিতে পারো। আমরা কেবিনঘরে আছি।

ফ্রান্সিস নিজের কেবিনঘরে ঢুকল। অন্ধকারে সাবধানে ঢুকতে হল। বিছানার কাছে এসে ফ্রান্সিস মারিয়াকে আস্তে আস্তে কাঁধ থেকে নামাল। তারপর বিছানায় শুইয়ে দিল আস্তে আস্তে। ভেন ততক্ষণে নিজের কেবিনে চলে গেছে।

অন্ধকারে ফ্রান্সিস মোটা মোমবাতিটা জ্বালল। মারিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখতেই চমকে উঠল। দেখল মারিয়া স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ফ্রান্সিস ছুটে মারিয়ার কাছে এলো। বলল–মারিয়া–এখন কেমন আছো? মারিয়া কোনো কথা না বলে একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে ডাকল–ভেন-তাড়াতাড়ি এসো। বিছানায় বসল। মারিয়ার মাথায় হাত বুলোতে লাগল।

ভেন ছুটে এলো। হাতে দুটো বোয়াম। কাপড়ের থলি থেকে বের করল মোটা নুড়ি। মেঝেয় বসল। ফ্রান্সিসকে বলল–কাঠের গ্লাসে জল দাও। তারপর মারিয়ার কাছে গেল। কপালে গলায় হাত রাখল। চোখে দেখল। মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস জ্বর একটু কমেছে।

ভেন মেঝেয় এসে বসল। একটা বোয়াম থেকে কিছু কালো গুঁড়ো বের করল। খলে ঢালল। ফ্রান্সিস কাঠের গ্লাসে জল দিয়ে গেল। ভেন খলটায় কয়েক ফোঁটা জল ঢালল। তারপর নুড়ি দিয়ে ঘষতে লাগল। কিছুক্ষণ ঘষার পর খলটা মারিয়ার কাছে নিয়ে গেল। মৃদুস্বরে বলল-রাজকুমারী–এই খলের ওষুধটা চেটে খেয়ে নিন। মারিয়ার কোনো সাড়াশব্দ নেই।

ভেন বিছানা থেকে নেমে এলো। পুঁটুলি থেকে একটা গাছের শেকড় বের করল। শেকড়টা মারিয়ার নাকের কাছে কয়েকবার ধরল। চোখ মুখ কুঁচকে মারিয়া চোখ মেলে তাকাল। ভেন আস্তে বলল।

–এই খলটা থেকে ওষুধটা চেটে খেয়ে নিন। মারিয়ার মুখের কাছে খলটা এগিয়ে ধরল ভেন। মারিয়া আস্তে আস্তে চেটে চেটে ওষুধটা খেয়ে নিল। তারপর চোখ বুজল।

তখন বাইরে ভোর হয়েছে। নিস্তেজ রোদ ছড়িয়েছে সমুদ্রে ফ্রান্সিসদের জাহাজে। সামুদ্রিক পাখির তীক্ষ্ণ ডাক কানে এলো।

ভেন বলল–ফ্রান্সিস–এখন তো কিছু খেতে হয়।

–আমার ক্ষুধাও পাচ্ছে না তেষ্টাও পাচ্ছে না। ফ্রান্সিস বলল।

–না ফ্রান্সিস-এ সময় তোমাকে সুস্থ থাকতেই হবে। দাঁড়াও–আমি রুটি ভেজে আনছি তুমি রাজকুমারীর কাছে থাকো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেন রুটি আলুসেদ্ধ নিয়ে এলো। একটা থালা ফ্রান্সিসকে দিল। অন্যটা নিজে নিল। ফ্রান্সিস থালার দিকে তাকিয়ে বলল– ভেন–মারিয়া এখনও কিছু খায়নি। আমি খাবো না।

ফ্রান্সিস–পাগলামি কোরো না। এই অসুখে তো উপোষ থাকতেই হবে। ভেবো না। আজকের দিনটা দেখি। মনে হয় কালকে সকালের মধ্যেই জ্বরটা ছেড়ে যাবে। তখন রাজকুমারীকে সহজপাচ্য কিছু খেতে দেব। নাও–খাও।

ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে খেতে লাগল। ভেন খেতে খেতে বলল–দুপুরে আর রাতে দুটো ওষুধ পড়বে। রাজকুমারী জ্বরের কষ্ট কমবে। জলটল খেয়ে ভেন বলল –ফ্রান্সিস তোমাকে অনেক ধকল পোহাতে হয়েছে। এখন একটু ঘুমিয়ে নাও।

–অসম্ভব। ঘুম আসবে না। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। চুপ করে চোখ বুজে শুয়ে থাকো। দেখবে ঘুম এসেছে। ভেন বলল।

–দেখি। তার আগে মারিয়াকে একবার দেখ। ফ্রান্সিস বলল।

ভেন মারিয়ার হাত দেখল। কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল। বলল–জ্বর অনেক কম। দেখবে রাতের দিকে জ্বর আরো কমে গেছে। রাতে অন্য দুটো ওষুধ খাওয়াতে হবে। তুমি ঘুমোও।

ফ্রান্সিস মারিয়ার পাশে শুয়ে পড়ল। চোখ বুজল। চোখ দুটো কেমন জ্বালাজ্বালা করছে। ভাবতে লাগল–মারিয়া সুস্থ হলে কয়েদঘর থেকে পালানোর ছক কষতে হবে। ও বুঝে উঠতে পারল না–রাজা গঞ্জালেস ওদের নিয়ে কী করতে চায়। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মারিয়ার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা। তারপরে অন্য ভাবনা।

হঠাৎ ফ্রান্সিসের মনে পড়ল সেনাপতি নিজের দায়িত্বে ওদের ছেড়ে দিয়েছিল। এখন রাজাকে সেই কথা বলে সেনাপতিকে দায়মুক্ত করতে হবে।

ফ্রান্সিস উঠে বসল। ভেন বলল- কী হল?

–আমার এখন শুয়ে থাকার উপায় নেই। আমাকে রাজা গঞ্জালেসের কাছে যেতে হবে। আমরা মারিয়াকে নিয়ে বিপদগ্রস্ত। তাই সেনাপতি আমাদের কারারক্ষীদের পাহারায়, জাহাজে আসতে দিয়েছিল। সেনাপতির কোনো দোষ নেই।

বিছানা থেকে নেমে ফ্রান্সিস মারিয়ার কপালে হাত দিল। জ্বরটা কমই মনে হচ্ছে। বলল–আমি যাচ্ছি ভেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবো। মারিয়াকে কিছু খেতে দেওয়া যায় কিনা দেখো।

ফ্রান্সিস সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। দু-জন কারারক্ষী ছুটে এলো। ফ্রান্সিস বলল–পালাচ্ছি না। তোমাদের রাজার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।

ফ্রান্সিস তীর পর্যন্ত পাতা কাঠের পাটাতন ওপর হেঁটে নামল। পেছনে দুজন। কারারক্ষীও এলো। ওদের তলোয়ার এখন কোষবদ্ধ।

অনেকটা পথ হেঁটে হেঁটে ওরা রাজধানী দামিলায় এসে পৌঁছল। ফ্রান্সিস প্রথমে কয়েদঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। বন্দি ভাইকিংরা ফ্রান্সিসকে দেখে দরজার কাছে ভিড় জমালো।

–ভাইসব–রাজকুমারী এখন ভালো আছেন। আমি এখন রাজসভায় যাচ্ছি। রাজা গঞ্জালেসকে কয়েকটা কথা বলার আছে। আমি তোমাদের কাছে আবার আসছি। রাজার সঙ্গে কী কথা জানিয়ে যাবো। তারপর জাহাজে ফিরে যাবো।

হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, রাজকুমারী কেমন আছেন?

–কিছুটা ভালো। তাই তো ভেনকে রেখে আমি এলাম।

ফ্রান্সিস এবার ফিরে দাঁড়িয়ে একজন কারারক্ষীকে বলল–আমাকে রাজা গঞ্জালেসের দরবারে নিয়ে চল।

তিনজনে চলল।কিছুটা যেতেই একটা বিরাট বাড়ি দেখা গেল।কারারক্ষী বলল– ওটাই রাজপ্রাসাদ। উওরদিকের দরজাটা দিয়ে রাজসভায় যেতে হবে।

তিনজনে ঐ দরজা দিয়ে ঢুকল। লম্বাটে বেশ বড়ো পাথর পর। গাশে গোটা কয়েক জানালার মতো। একেবারে শেষের দিকে পাথরের সিংহাসন। সিংহাসনে পাথর কুঁদে ফুল লতা পাতার নকশা। সিংহাসনে একটা লাল গদীমতো পাতা। রাজা গঞ্জালেস বসে আছেন। পরনে সার্টিনের জোব্বামতো। তাতে সোনারুপোর সুতোর কারুকাজ করা। মাথায় আজ অন্যরকম মুকুট। সোনার মুকুটে নানা দামি পাথরের মধ্যে মিনে করা। দুপাশে কয়েকজন বৃদ্ধ বসে আছেন। বোঝা গেল ওঁরা মন্ত্রী ও অমাত্যবর্গ।তাদের পরনেও দামি কাপড়ের জোব্বমতো। তারা পাথরের ছোটো ছোটো আসনে বসে আছেন।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিচারপ্রার্থীরা।

একটা বিচার চলছিল। রাজা গঞ্জালেস সব শুনে কাছেই বসা অমাত্যের সঙ্গে কী পরামর্শ করলেন। তারপর রায় দিলেন। বাদী বিবাদীরা চলে গেল।

ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে সেনাপতির কাছে এলো। মৃদুস্বরে বলল-মহামান্য রাজাকে আমি দু একটা কথা বলতে চাই।

–ঠিক আছে। সেনাপতি বলল।

তখন কোনো বিচার চলছিল না। সেনাপতি নিজের আসন থেকে উঠে রাজাকে মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল–মাননীয় রাজা–এই ভাইকিং যুবকটিকে কিছু বলতে চায়। কথাটা বলে সেনাপতি ফ্রান্সিসকে দেখাল।

ফ্রান্সিস মাথা একটু নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল–মহামান্য রাজা–অনুমতি দিলে আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই।

–হুঁ বলো। গম্ভীর গলায় রাজা গঞ্জালেস বললেন।

-প্রথমে বলি আমাদের বন্দিশালায় রাখা হয়েছে। আমাদের দেশের রাজকুমারীও আমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি গতকাল রাতে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমরা সেনাপতিকে অনুরোধ করতে তিনি অসুস্থ রাজকুমারীকে নিয়ে আমাদের জাহাজে যেতে অনুমতি দেন। অবশ্য তিনজন কারারক্ষী আমাদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের বৈদ্যের চিকিৎসায় রাজকুমারী এখন কিছুটা সুস্থ হয়েছেন। আপনার সেনাপতি এজন্যে কাল আপনার অনুমতি নিতে পারেন নি। কারণ তখন গভীর রাত। সেনাপতির এই উপকারের কথা আমরা জীবনেও ভুলবো না। ফ্রান্সিস থামল।

রাজা ডাকলেন সেনাপতি। সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

–এই ভাইকিং যুবকটি যা বলল–তা সত্যি? গঞ্জালেস বললেন।

–হ্যাঁ মহামান্য রাজা। সেনাপতি বলল।

বন্দিদের চিকিৎসার দায়িত্ব আমাদের নয়। ভবিষ্যতে কাউকে এই সুবিধে দেবেন না। গঞ্জালেস বললেন।

–যথা আজ্ঞা মহামান্য রাজা। সেনাপতি বলল।

ফ্রান্সিস বলল–আমাকে ক্ষমা করবেন–একটা কথা না বলে পারছি না।

–হুঁ। রাজা মুখে শব্দ করলেন।

-বন্দিরা অপরাধী হলেও মানুষ। বিচারের পরে যে শাস্তি দেবেন তা তাদের প্রাপ্য। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত তাদের অসুখ করলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা তো রাজার কর্তব্য।

আমি অন্যরকম রাজা। এসব মানি না। রাজা বললেন।

ফ্রান্সিস বুঝল–এই রাজাকে বলে লাভ নেই। এই অত্যাচারী নির্মম রাজা মানবিকতার কথা কানেই তুলবে না। সুতরাং এই নিয়ে কিছু বলতে যাওয়া কথার অপচয় মাত্র।

ফ্রান্সিস এবার বলল–মাননীয় রাজা– আমার আর একটা কথা বলার আছে।

-বলো। রাজা বললেন।

–আমাদের কেন বন্দি করে রাখা হয়েছে তা বুঝতে পারছি না। আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি। ফ্রান্সিস বলল।

-ওসব কোনো বলে লাভ নেই। তোমরা রানি উরাকার গুপ্তচর হয়ে এখানে এসেছে। খোঁজ খবর চলছে। যদি এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ না পাওয়া যায় তবে তোমরা ছাড়া পাবে। রাজা বললেন।

–বেশ। ফ্রান্সিস বলল।

–আর একটা কথা। তোমরা বলিষ্ঠদেহী অসি চালনায় দক্ষ এবং ভীষণ সাহসী। রানি উরাকার সঙ্গে যুদ্ধে তোমাদের দরকার পড়বে। রাজা বললেন।

–আমরা রানি উরাকার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধকরতে যাবো কেন? রানি উরাকা তোতা আমাদের শত্রু নয়। ফ্রান্সিস বলল।

–আমি ওসব বুঝি না। আমার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে মিশে যুদ্ধ করতে হবে রানি উরাকার বিরুদ্ধে। যদি তাতে সন্মত না হও তাহলে ঐ কয়েদখানায় পচে মরতে হবে। যুদ্ধের খুব বেশি দেরি নেই। রানি উরাকা যেকোনো মুহূর্তে আমাদের দেশ আক্রমণ করতে পারে। আমরা সেকথা ভেবেই সৈন্যবাহিনীকে তৈরি করছি। রাজা বললেন।

–এসব আপনাদের দেশের ব্যাপার। এর সঙ্গে আমাদের জড়াচ্ছেন কেন? ফ্রান্সিস বলল।

–সবই বলেছি। এবার তোমাদের সিদ্ধান্ত। অবশ্য তোমরা রানি উরাকার গুপ্তচর নও তার প্রমাণ পেলেই তোমাদের আমাদের সৈন্যবাহিনীতে নেব। রাজা বললেন।

ঠিক আছে। আপনারা খোঁজ খবর করুন। ফ্রান্সিস বলল।

মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে ফ্রান্সিস পিছিয়ে এলো।

রাজসভার কাজ চলল।

ফ্রান্সিস কয়েদঘরের কাছে এলো। লোহার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বন্ধুরা ছুটে এলো। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–আমরা খুবই বিপদে পড়েছি। রাজা গঞ্জালেস বলছেন–আমরা যে রানি উরাকার গুপ্তচর নই এ বিষয়ে তাঁরা খোঁজখবর করছেন। কিন্তু বিপদ এতেও কাটেনি। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে আমরা গুপ্তচর নই তাহলে আমাদের সৈন্যবাহিনীতে নেওয়া হবে। রানি উরাকার বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। ফ্রান্সিস থামল।

হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, রাজা গঞ্জালেস আমাদের কোনো যুক্তিই শুনবেন না–এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তাই আমাদের শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

–আমিও তাই বলছিলাম। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ডান হাতটা তুলে বলল –ভাইসব- আমি জাহাজে ফিরে যাচ্ছি। কালকে আবার আসবো। তোমরা রাজকুমারীর নিরাময় কামনা করো।

— ফ্রান্সিস কয়েদঘরের বারান্দা থেকে সামনের মাঠটায় নামল। চলল সমুদ্রতীরের দিকে। অজকে অন্য কারারক্ষী দুজন ফ্রান্সিসদের পাশে পাশে চলল।

কিছুদূর আসার পর ডানদিকে একটা জঙ্গলমতো পড়ল। ফ্রান্সিস ঐ দিকে যেতে লাগল। একজন রক্ষী বলল–ঐ দিকে কোথায় যাচ্ছো?

–এখান থেকে একটা ছোটো রাস্তা আছে। খুব তাড়াতাড়ি জাহাজঘাটে যাওয়া যাবে। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস একটা খাদের কাছে এলো। খাদ থেকে গজিয়ে ওঠা একটা বড়ো গাছ দেখল। ঐ গাছটার ডালপালা মাথা খাদের ওপরে উঠে এসেছে। পাহারাদার দুজন কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিস ঐ গাছের মগডাল লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল। মটা করে গাছটার ওপরের কটা ডাল ভেঙে গেল। ফান্সিস নীচে পড়তে লাগল। ডাল ভেঙে ভেঙে নীচে এসে পড়ল। বুক পিঠ কেটে গিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল রক্ষী দুজন নিচু হয়ে দেখছে। ওরা তো এই কান্ড দেখে হতবাক।

ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। তারপর খাদ দিয়ে ছুটল সমুদ্রতীরের দিকে। রক্ষী দুজন বেশ খাদটায় নামল। গাছটার কাছে এলো। এদিকে-ওদিকে ঝোপ জঙ্গলে ফ্রান্সিসকে খুঁজল। কিন্ত ফ্রান্সিসকে পেল না। ওরা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। দুজনে রাজবাড়ির দিকে ছুটল। ফ্রান্সিসের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা সেনাপতিকে বলতে হবে।

ফ্রান্সিস খাদের মধ্য দিয়ে গাছ ঝোঁপের আড়ালে আড়ালে বেশ দূরে চলে এলো। দেখল সামনেই সমুদ্র। ওদের জাহাজটা তীরের কাছেই ভাসছে। ফ্রান্সিস প্রথমেই জাহাজে উঠল না। একটা পাথরের আড়ালে বসল। প্রান্তরের দিকটা দেখতে লাগল।

একটু পরেই দেখল–প্রান্তর দিয়ে লাল ধুলো উড়িয়ে ঘোড়ায় চড়ে কে আসছে। একটুক্ষণ তাকিয়ে দেখতেই চিনল–সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে আসছে। তাহলে ফ্রান্সিস যে পালিয়েছে এই খবর সেনাপতি পেয়েছে।

সেনাপতি ঘোড়া থেকে নামল। কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে গিয়ে জাহাজে উঠল।

ওদিকে দুজন কারারক্ষী প্রান্তর দিয়ে ছুটে আসছে দেখা গেল। ওরা জাহাজের পাটাতনের কাছে দাঁড়িয়ে ভীষণ হাঁপাতে লাগল।

কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি জাহাজ থেকে নেমে এলো। রক্ষী দুজনকে বলল–ওদের সর্দার এখানে আসেনি। ওরা মাত্র দুজন জাহাজে রয়েছে। তোরা এখানে পাহারায় থাক। ওদের সর্দার এলেই পাকড়াবি।

সেনাপতি ঘোড়ায় উঠে ঘোড়া চালিয়ে চলে গেল।

পাতা পাটাতন দিয়ে দুই কারারক্ষী জাহাজে উঠল। ডেক-এ ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগল।

ফ্রান্সিস পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। কারারক্ষী দুজনের নজর এড়িয়ে সমুদ্রের ধারে এলো। তারপর কোনোরকম শব্দ না করে জলে নামল। এক ডুব সাঁতারে অনেক দূরে গিয়ে নিঃশব্দে ভেসে উঠল।মুখ হাঁ করে শ্বাস নিয়ে আবার ডুব দিল। উঠল জাহাজের গা ঘেঁষে। মুক্তোর সমুদ্র থেকে মুক্তো তোলার সময় ফ্রান্সিস ওদের দেশের মুক্তো শিকারীদের কাছ থেকে বেশিক্ষণ জলে ডুবে থাকার নিয়মটা শিখে নিয়েছিল। সেটা কাজে লাগল।

জাহাজে হালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে রেখে ও জাহাজে উঠে এলো। সিঁড়িঘরেবর আড়াল থেকে দেখল কারারক্ষী দুজন জাহাজের সামনের দিকে পাহারা দিচ্ছে।

ফ্রান্সিস সিঁড়ি ঘরের আড়ালে আড়ালে সিঁড়িঘরের মুখের কাছে এলো। তারপর অপেক্ষা করতে লাগল। দুই কারারক্ষী মাস্তুলের আড়ালে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস সেই সুযোগে সিঁড়িঘরে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নীচে নেমে এলো।

নিজেদের কেবিনঘরে ঢুকল। দেখল– ভেন চোখ বুজে আসনপিঁড়ি হয়ে মেঝেয় বসে আছে। বিছানায় মারিয়া শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস আস্তে ভেন-এর কাছে গেল। ফিসফিস্ করে বলল ভেন, রাজকুমারী কেমন আছেন? ভেন চমকে উঠে বলল- কে? কে? ফ্রান্সিস ভেন-এর মুখ চেপে ধরল। বলল–ভেন কোনো শব্দ করবেনা। আমি ফ্রান্সিস। ভেন বলল–ও–তাই বলো। রাজকুমারী এখন অনেকটা সুস্থ। বোধহয় ঘুমুচ্ছেন।

ফ্রান্সিস বলল–আমি জলে ভেজা পোশাক পাচ্ছি। ফ্রান্সিসের গলারশব্দ মারিয়ার কানে গেল। মারিয়া চোখ মেলে তাকাল। ফ্রান্সিসের আর পোশাক ছাড়া হল না। ও মারিয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বলল–মারিয়া–এখন কেমন আছো? মারিয়া শুকনো মুখে হেসে বলল অনেকটা ভালো। ভেন তো এখন আমাকে পাতলা সুজির ঝোল খেতে দেবে বলছে। ফ্রান্সিস হাসল–তবে তো বেশ ভালো আছো তুমি। মারিয়ার দুর্বল কণ্ঠস্বর শুনেই ফ্রান্সিস বুঝল মারিয়া এখনও দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

ফ্রান্সিস একটা শুকনো জামা বের করে ভেজা জামাটা ছাড়ল। তখনই মারিয়া দেখল ফ্রান্সিসের সারা শরীরে কাটাছড়ার দাগ। দু তিনটে বড়ো ক্ষত থেকে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। মারিয়া দুর্বল স্বরে বলে উঠল–তোমার সারা শরীরে এত কাটাছড়া কেন? ফ্রান্সিস হেসে ওর গাছের মাথায় ঝাঁপ দিয়ে পালাবার ঘটনাটা বলল। তারপর ভেনকে বলল–ভেন তোমার ওষুধপত্র আছে?

–আমি নিয়ে আসছি।

একটু পরেই ভেন ফিরে এলো। হাতে একটা বোয়াম। কাঠের কুঁজো থেকে জল নিয়ে হাতে অল্প একটু ঢালল। বোয়াম থেকে নীল রঙের গুঁড়ো নিল। জলে মেশাল। একটা আটা আটা জিনিস তৈরি হল। ভেন ফ্রান্সিসের কাটাছড়া জায়গায় আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিল। ওষুধ লাগাতেই ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। বলল–

–ভেন ভীষণ জ্বালা করছে।

একটু পরেই আর জ্বালা যন্ত্রণা থাকবে না। সত্যিই তাই। অল্পক্ষণের মধ্যেই জায়গাগুলো ঠান্ডা লাগল।

ফ্রান্সিস শুকনো পোশাক পরল। বলল–ভেন–সেনাপতি এসেছিল। কী বলল সে?

কী আর বলবে? এসে দেখে বুড়ো আর একটি মেয়ে। বলল–তোমাদের দলনেতা এখানে এসেছিল? আমি বললাম–এখানে কেউ আসেনি। বিশ্বাস করল না তবে আর কিছু বলল না। চলে গেল।

–হুঁ–আমার খোঁজ ঠিক চালিয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।

মারিয়া দুর্বল কণ্ঠে বলল এখন কী করবে?

–আমি বাইরেই থাকব। তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কিছু ভাবতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস এসে বিছানায় বসল। মারিয়ার মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মারিয়া চোখ বুজে শুয়ে রইল।

ভেন উঠে দাঁড়াল। বলল–বেলা হয়েছে। এখন খেয়ে নাও।

ভেন একটু পরে বাটি নিয়ে ঢুকল। মারিয়ার কাছে এসে বললনাও চুমুক দিয়ে খেয়ে নাও। মারিয়াকে ফ্রান্সিস ধরে ধরে বসিয়ে দিল। মারিয়া আস্তে আস্তে চুমুক দিয়ে খেয়ে নিল। ভেন কাঠের গ্লাসে জল ভরে এগিয়ে ধরল। মারিয়া জল খেল। হেসে বলল–ভেন–তুমি এত ভালো তৈরি করেছো। ভেন ফোকলা দাঁতে হাসল। বলল –জাহাজে কী বা থাকে যে ভালো রাঁধবো। সেই তো এক মাংসের ঝোল।

মারিয়া শুয়ে পড়ল। এবার ভেন আর ফ্রান্সিস চলল খাবার ঘরে বসে খেতে খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল–ভেন-মারিয়ার জ্বর তো সম্পূর্ণ সারেনি।

–ঠিকই ধরছো। কিন্তু রাজকুমারীকে কিছু বলল না। বলবে- জ্বর ছেড়ে গেছে। তুমি এখন সুস্থ। ভেন বলল।

–কিন্তু সত্যি সুস্থ হবে কবে? ফ্রান্সিস বলল।

–আর কয়েকটা দিন লাগবে। ওষুধে কাজ হয়েছে–এটাই সুলক্ষণ। এবার তুমি ভাবো কী করবে। ভেন বলল।

–হু–ওটাই ভাবছি এখন। ফ্রান্সিস বসল।

হঠাৎ সিঁড়িতে জুতোর শব্দ শোনা গেল। কারা আসছে। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নেমে কাঠের তক্তায় তৈরি বিছানার নীচে ঢুকে গেল। মারিয়া দেখল ঘরের কোণায় ফ্রান্সিসের ভেজা পোশাক রাখা। মারিয়া যত দ্রুত সম্ভব বিছানা থেকে নেমে পোশাকগুলো থেকে টিপে জল বের করতে লাগল।

কারারক্ষী দুজন ঢুকল। হাতে খোলা তলোয়ার। দুজনেই ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখল ভেজা পোশাক চিপছে। একজন বলল–একজন বলল–এই ভেজা পোশাক কার?

–আমার। ভেন হেসে বলল।

–এত বেলায় চান করলে? কারারক্ষী বলল।

–আমি অনেক সময় সন্ধেবেলাও চান করি। ভেন বলল।

–হু। একজন রক্ষী চলে গেল খাওয়ার ঘরে। ফিরে এসে বলল খাবার ঘরে দেখলাম দুটো এঁটো থালা। দুজন খেয়েছে।

–আমি আর ভেন খেয়েছি। মারিয়া ভেজা পোশাক নিয়ে বাইরে যেতে যেতে বলল।

যাক গে–তোমাদের দলনেতা কী নাম যেন ওর?

–ফ্রান্সিস। ভেন বলল।

–হ্যাঁ ফ্রান্সিস। ও এলেই আমাদের খবর দেবে।

নিশ্চয়ই। ভেন হেসে বলল।

–ওকে ধরতে পারলেই কয়েদঘরে ঢোকানো হবে। রক্ষী বলল।

–বটেই তো। ভেন আবার হেসে বলল।

বলা যায় না হয়তো রাজা গঞ্জালেস ওকে মৃত্যুগুহায় ঢুকিয়ে দেবে।

–মৃত্যুগুহা? সে আবার কী? ভেন জানতে চাইল।

–মৃত্যুগুহা কী জানো না। কারারক্ষী বলল।

–না। না শুনলে কী করে জানবো। ভেন বলল।

রক্ষীটি তলোয়ার কোষবদ্ধ করে বলল–তবে শোনো। কয়েদঘরের পেছনেই দেখবে বড়ো খাদ। প্রায় এখান অব্দি খাদটা রয়েছে। এই খাদের গায়েই একটা টিলা। সেই টিলায় আছে একটা গুহামতো। সেই গুহায় থাকে নররাক্ষস। মানুষ ওখানে গেলেই মেরে ফেলে। ঐ গুহার ধারে কাছে কেউ যায় না। কারারক্ষী বলল।

কিন্তু রাজা গঞ্জালেসের তো কত সৈন্য। নররাক্ষসকে মেরে ফেললেই হয়। ভেন বলল।

–নররাক্ষসকে মারা অত সোজা নয়। গুহাটায় একজনের বেশি কেউ ঢুকতে পারবে না। রক্ষী বলল।

–তাহলে দফায় দফায় ঢুকবে একজন করে। ভেন বলল।

–হ্যাঁ যা শুনেছি বলছি। গুহার ভেতরটা নাকি বড়ো।

কয়েকজন মানুষ দাঁড়াতে পারে। রক্ষী বলল।

–সেই কয়েকজন নররাক্ষসকে মেরে ফেলতে পারে। ভেন বলল।

–অত সহজ নয়। তোক ঢুকলেই নররাক্ষস একটা পাথরের ফাটালের মধ্যে ঢুকে, পড়ে। সেই ফাটলে ঢুকে আর নররাক্ষসকে আক্রমণ করা যায় না। কারারক্ষী বলল।

–কেন? তলোয়ার বা বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে নররাক্ষসকে মারা যায়। ভেন বলল।

–উঁহু। নররাক্ষস যেখানে ঢুকে পড়ে সেটা একটা লম্বা ফাটল। তরবারি তো নই। বর্শা অতদূর পর্যন্ত যায় না। তবে কথা হল রাজা গঞ্জালেস সেই নররাক্ষসকে মারতে চান না। বরং বাঁচিয়ে রাখতে চান। রক্ষী বলল।

–কেন বলো তো? ভেন জানতে চাইল।

–যে ফাটলের মধ্যে নররাক্ষস লুকিয়ে পড়ে তাতে আছেহীরেমণিমুক্তোর ভান্ডার। নররাক্ষস সেই ভান্ডার পাহারা দেয়। এই নররাক্ষসকে পাহারাদার হিসেবে রেখেছিল গঞ্জালেসের পিতা। পাশের রাজ্য সেতুবলের সঙ্গে এই দামিলা রাজ্যের লড়াই চলে আসছে অনেকদিন থেকে। তাই গঞ্জালেসের পিতা এইভাবে তার সঞ্চিত ধনভান্ডার লুকিয়ে রেখে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। গঞ্জালেসের তাই নররাক্ষসকে পাঁঠা ভেড়া খরগোস এসব প্রতিদিন সকালে গুহার মুখে রেখে আসার জন্য তোক রেখেছিল। রক্ষী বলল।

–তাহলে তো ঐ কাঁচা মাংসই নররাক্ষস খায়। ভেন বলল।

–হ্যাঁ। আর ধনভান্ডার পাহারা দেয়। রক্ষী বলল।

–এই গুপ্তধনের খবর কি সবাই জানে? ভেন জানতে চাইল।

–হ্যাঁ-টিলার ঢালের দিকে কেউ যায় না। রক্ষী বলল।

–কেউ কি নররাক্ষসকে দেখেছে? ভেন বলল।

–হ্যাঁ মাত্র কয়েকজন। তারাই এসে রটিয়েছে যে নররাক্ষস প্রচন্ড শক্তিমান — শূন্যে উড়তে পারে, হাতের ঘায়ে-বড়ো বড়ো পাথরের চাই ভাঙতে পারে। রক্ষী বলল।

–এসব বিশ্বাস করা যায় না। ভেন বলল।

–নানা লোকের নানা মতো। কারারক্ষী থামল।তারপর বলতে লাগল–তোমাদের দলনেতাকে বলো ও যেন রাজার কাছে ধরা দেয়। রাজা গঞ্জালেস তাহলে কঠিন শাস্তি দেবেন না। শুধু কয়েদঘরে বন্দি করে রাখবেন। কিন্তু যদি সে ধরা না দেয় আর হঠাৎ ধরা পড়ে যায় তবে মৃত্যুগুহায় তাকে ঢোকানো হবে। একবার ঢোকানো হলে জীবিত অবস্থায় আর ফিরে আসতে পারবে না। রক্ষী বলল।

–বুঝলাম–সাংঘাতিক শাস্তি। ভেন মাথা এপাশ-ওপাশ করতে করতে বলল।

–আচ্ছা–একটা কথা। ভেন বলল।

–বলো। রক্ষী বলল।

–রানি উরাকার সঙ্গে কি গঞ্জালেসের লড়াই হবে? ভেন জানতে চাইল।

–অবস্থা যা দেখতে পাচ্ছি–লড়াই হবেই। রক্ষী বলল।

–কে জিতবে? ভেন বলল।

–রানি উরাকার জেতার সম্ভবনা বেশি। রক্ষী বলল।

–কারণ? ভেন বলল।

–রানির অনেক সৈন্য।যুদ্ধজাহাজ আছে। আমাদের রাজা গঞ্জালেস লিসবনে গিয়ে জাহাজ বরাত দিয়ে এসেছেন। শুনলাম কয়েকদিনের মধ্যে সেই জাহাজ আসবে। রক্ষী বলল।

–তাহলে বেশ লড়াই টড়াই হবে। ভেন বলল।

–মনে তো হয়। যাক গে–চলি। আমরা ডেক-এ আছি। তোমাদের দলনেতা এলে আমার কথাগুলো বলো। রক্ষী বলল।

নিশ্চয়ই বলবো। ভেন বলল।

রক্ষীটি চলে গেল।

ফ্রান্সিস পাটাতনের নীচের থেকে বেরিয়ে এলো। ও সবই শুনেছে। বলল–ভেন মারিয়া তোমার কী বলো? ধরা দেব?

-দেখো ফ্রান্সিস-মারিয়া বলল–একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হবে রানি উরাকা আর গঞ্জালেসের মধ্যে। রাজা গঞ্জালেস চাইবে ওর পৈতৃক ধনসম্পদ যাতে ওর কাছেই থাকে। সেইজন্যে পাহারাদার নররাক্ষসের হাত থেকে ঐ ধনসম্পদ উদ্ধার করতে চাইবে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে এই কাজটা কেউই পারবে না। তুমি সেই কাজটা করে দেবে বলো তাহলে রাজা গঞ্জালেস সহজেই রাজি হবে। কারণ যুদ্ধের ফলাফল কী হবে তা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না। গঞ্জালেসের কারারক্ষী যা বলে গেল তাতে পরিষ্কার রাজা গঞ্জালেস যুদ্ধে হেরে যাবে। হেরে গেলে নিজের রাজত্ব যাবে পৈতৃক ধনভান্ডার হারাতে হবে। কজেই যুদ্ধের আগেই গঞ্জালেস পৈতৃক ধনভান্ডার উদ্ধার করে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে চাইবে। মারিয়া বলল।

–ঠিকই বলছো। ফ্রান্সিস বলল।

–রাজা গঞ্জালেস এখন পৈতৃক ধনভান্ডার উদ্ধার করতে চাইবে। তুমি রাজা গঞ্জালেসকে গিয়ে বলো যে তুমি নররাক্ষসকে কজা থেকে ধনভান্ডার উদ্ধার করে দিতে পারবে। মারিয়া বলল।

–হু–এই কাজটা করা খুবই কঠিন। ফ্রান্সিস বলল।

–অবশ্যই এই কাজে রাজি হওয়ার ঝুঁকি আছে। না পারলে কিন্তু আমাদের বিপদ বাড়বে। মারিয়া বলল।

–হ্যাঁ ঠিকই বলেছো। তারপর ফ্রান্সিস বলল–আমি একটু ঘুমিয়ে নিই। নইলে শরীরে জোর পাবো না।

ফ্রান্সিস হ্যারির ঘরে চলে গেল। বিছানা পাতাই ছিল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। বন্ধুদের কথা ভাবতে লাগল। কী করে সবাইকে মুক্ত করা যায়। মারিয়ার অসুখটা সেরে গেছে। দেখে ফ্রান্সিস অনেকটা নিশ্চিত হল। এসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।

তখন বিকেল। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও মারিয়ার কাছে এলো। দেখল মারিয়া ঘুমোচ্ছে। ভেন মেঝেয় আসনসিঁড়ি হয়ে বসে আছে।

ফ্রান্সিস ডাকল–ভেন মারিয়াকে ওষুধ দিয়েছে।

–হু

–ওর শরীর কেমন দেখলে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–জ্বর একবারে ছেড়ে গেছে। রাজকুমারী এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। ভেন বলল।

–বাঁচালে। ফ্রান্সিস হেসে বলল। ফ্রান্সিসদের কথাবার্তায় মারিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। ও আস্তে আস্তে উঠে বসল। বলল–ফ্রান্সিস–সূর্যাস্ত হয়ে গেছে?

–না। কিছুক্ষণ দেরি আছে। ফ্রান্সিস বলল।

–ভেন ফ্রান্সিস তো যেতে পারবে না। তুমি আমাকে ডেক-এ নিয়ে চলো। সূর্যাস্ত দেখবো। মারিয়া বলল।

ভেন উঠে দাঁড়াল–চলুন। তবে খুব সাবধানে হাঁটতে হবে। আমি বুড়ো মানুষ। আপনাকে শক্ত করে ধরে থাকতে পারবো না।

–ঠিক আছে। আমি শরীরে কিছু জোর পাচ্ছি। চলো। মারিয়া বলল।

মারিয়া উঠে বসল। তারপর বিছানা থেকে আস্তে আস্তে নেমে এলো।ফ্রান্সিস বলল– মারিয়া তোমার কষ্ট হবে। যেও না।

-না-না একনাগাড়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে কারো ইচ্ছে করে? আমার জন্যে ভেবো না। মারিয়া বলল।

ভেন মারিয়ার হাত ধরল। দুজন আস্তে আস্তে দরজার দিকে চলল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসে রইল।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে মারিয়া দু একবার সিঁড়ির ধাপ ভুল করল। ভেন কাঁধ ধরে মারিয়াকে ঠিক রাখল।

দুজনে যখন ডেক-এ উঠে এলো তখন সূর্য অস্ত যায়নি। দুজনে ডেক-এ উঠে রেলিঙের দিকে এগোতে লাগল। রক্ষীরা জাহাজের সামনের দিকে পাহারা দিচ্ছিল। ওরা মারিয়া আর ভেনকে দেখল। কিছু বলল না।

পশ্চিম আকাশটা তখন গোলাপি। সূর্যের রঙ গাঢ় গোলাপি। আস্তে আস্তে গোল সূর্য নীচে নামতে লাগল। পশ্চিম আকাশে তখন গোলাপি রঙের প্লাবন। জলের ঢেউগুলোও গোলাপি রঙীন।

আস্তে আস্তে সূর্য টুপ করে যেন সমুদ্রের জলে ডুবে গেল। পশ্চিম আকাশে অনেকক্ষণ লেগে রইল গোলাপি রং। তারপর আস্তে আস্তে আকাশ কালো হয়ে গেল। রুপোলি চঁদ দেখা গেল।

মারিয়া আর ভেন আস্তে আস্তে নীচে কেবিনঘরে নেমে এলো। মারিয়া তখন একটু হাঁপাচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল–শুয়ে পড়ো। মারিয়া বিছানায় বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। বোঝা গেল শরীরের দুর্বলতাটা আছে এখনও।

ফ্রান্সিস পোশাক পরে তৈরি হল। বলল–ভেন-একটা উপায় বের করো তো। এভাবে জলে নেমে ডুবসাঁতার দিয়ে যেতে হবে–এ তো পারা যায় না। ভেন বলল দাঁড়াও। আগে খেয়ে নাও। দুজনে খাবার ঘরে এলো। বিকেলের খাওয়া সেরে নিল।

দুজনে মারিয়ার কাছে এলো। মারিয়া অভিমানের সুরে বলল–ভেন আমার খিদে পেয়েছে।

–ঠিক আছে। আপনার খাবার তৈরি করছি। ভেন বলল। তারপর ফ্রান্সিসকে বলল তুমি কাঠের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি একটা মতলব ঠাউরেছি।

ভেন চলে গেল। একটু পরে সিঁড়িতে ভারি জুতোর শব্দ উঠল।কারারক্ষীরা আসছে। ফ্রান্সিস কাঠের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।

ভেন রক্ষীদের খাবার ঘরে নিয়ে গেল। তারপর নিজেদের ভাষায় গলা চড়িয়ে বলল–পলায়ন। ফ্রান্সিস আর মারিয়ার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসল। বোঝাই যাচ্ছে ভেন রক্ষী দুজনকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াচ্ছে। খাবার ঘর থেকে ভেন-এর জোর গলার শব্দ ভেসে আসছে–কী কান্ড! মাত্র এইটুকু খেলেন। খান–খান তৃপ্তি করে খান। আমার রান্নার হাত খুব খারাপ না।

ফ্রান্সিস এবার হেসে ফেলল। মারিয়াও হাসছে। ফ্রান্সিস আর মারিয়া দেরি করল না। পাটাতনের নীচে থেকে তলোয়ারটা বের করে কোমরে ঝোলাল। কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সিঁড়িতে কোনোরকম শব্দ না করে আস্তে আস্তে উঠতে লাগল। ডেক-এ উঠে এলো।

দ্রুতপায়ে পাতা পাটতনে নেমে জোরে হেঁটে বালিয়াড়িতে নেমে এলো। উঁচু পাড়ে উঠে চলল কয়েদঘরের দিকে।

তখন রাত হয়ে গেছে। কয়েদঘরের লোহার দরজার দুপাশে টানা পাথরের বারান্দায় মশাল জ্বলছে। ফ্রান্সিস কয়েদঘরের পেছনে এলো। কী করে হ্যারিদের জানাবে যে সে মুক্ত আর মারিয়াও অনেকটা সুস্থ।

জায়গাটা একটা মাঠের মতো। তারপরেই টানা খাদ। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। সেই আলোতেই দেখা যাচ্ছে খাদটা আর ওপাশের টিলাটা। ঐ টিলাতেই একটা গুহায় নাকি থাকে একা নররাক্ষস। ধনভান্ডার পাহারা দেয়। ওখানে যাবে বলেই ফ্রান্সিস তলোয়ার নিয়ে এসেছে। সেই নররাক্ষস কেমন শক্তিশালী সেটা একটু দেখতে হয়। আর হ্যাঁ এই রাতেই।

খোলা জায়গাটায় ফ্রান্সিস পায়চারি করতে লাগল। কীভাবে বন্দি বন্ধুদের কাছে। খবর পৌঁছানো যায়।

চাঁদের আলোয় দেখলে মাঠমতো জায়গাটায় নুড়ির ছোটো ছোটো নুড়ি পাথর ছড়ানো। একটা উপায় মনে এলো। ও নিচু হয়ে কয়েকটা নুড়ি তুলে নিল। তারপর কয়েদঘরের উঁচু জানালার ফোকরটা দেখল। নিশানা করে একটা নুড়ি ছুঁড়ল। নুড়িটা এক বন্ধুর পিঠে লাগল। ও জানালার ফোকরের দিকে তাকাল। কিন্তু ওখান থেকে নুড়ি খসে আসবে কী করে। ও কিছু বলল না। এবার আর একটা নুড়ি এক বন্ধুর মাথায় লাগল। বন্ধুটি চেঁচিয়ে উঠল-নুড়ি ছুঁড়ছে কে? আগের বন্ধুটিও বলল আমরাও পিঠে পড়েছে একটা। বন্ধুদের মধ্যে কথাটা শুরু হল।

ফ্রান্সিস আর একটা নুড়ি ছুঁড়ল। এবার লাগল হ্যারির কাঁধে। হ্যারি চিৎকার করে বলল–ভাইসব–ফ্রান্সিস ছুঁড়ছে এই নুড়িগুলো। ফ্রান্সিস মুক্ত। সবাই ধবনি তুলল– ও-হো-হো। ফ্রান্সিস হাসল–যাক বন্ধুরা বুঝতে পেরেছে যে ও মুক্ত।

হ্যারিশাঙ্কোকে বলল–ঐ জানালার দিকে মুখ বার করে বলল-রাজকুমারী কেমন আছেন? শাঙ্কো মুখের কাছে দুহাতের চেটো গোল করে ওদের দেশীয় ভাষায় বলল রাজকুমারী কেমন আছেন? ফ্রান্সিস বাইরে থেকে গলা চড়িয়ে বলল–ভালো। ভাইকিং বন্ধুরা নিশ্চিন্ত হল।

ফ্রান্সিসের উচ্চস্বরে বলা কথাটা শুনে কয়েদঘরের সামনে থেকে একজন কারারক্ষী ছুটে এলো।ফ্রান্সিস ততক্ষণে খাদের ধারে একটা গাছের গোড়া ধরে খাদে ঝুলে পড়েছে। কারারক্ষীটি এসে এদিক-ওদিক বার কয়েক তাকাল কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। ওর মনে হল ভুল শুনেছে। ও চলে গেল।

ফ্রান্সিস গাছের গোড়া ধরে উঠে এলো। দেখল খাদ যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে জংলা গাছপালা। ও ঐদিকেই চলল। জংলা গাছপালার কাছে এলো। গাছপালার মধ্যে দিয়ে খাদের ঢালটার কাছে এলো। ও ঢাল বেয়ে নামতে লাগল। ডানপাশে একটু দূরেই টিলাটা উঠে গেছে। টানা খাদের মধ্যে ছোটো ছোটো গাছ জংলা ঝোপ।

ঝোপ জঙ্গল ঠেলে ফ্রান্সিস চলল। চাঁদের আলোয় টিলার এবড়ো-খেবড়ো গা দেখতে দেখতে চলল।কয়েকটা ফাটল দেখল। দুটো বড়ো গুহার মুখ দেখল।কিন্তু রক্ষী বলেছিল ছোটো গুহার মধ্যে নররাক্ষস থাকে। হঠাৎ একটা ছোটো গুহা দেখল। হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকা যায় এমন।

ফ্রান্সিস কোমর থেকেতলোয়ার খুলল। তলোয়ার খুলে গুহাটার দিকে যাচ্ছে তখনই পেছনে শুকনো পাতা ভাঙার শব্দ কানে এলো। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। দেখল একটা মানুষের মতো কিছু ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত। চাঁদের আলোয় এক ঝলক দেখল–বড়ো বড়ো ধূসর রঙের চুল মাথায়। দাড়ি গোঁফে মুখ ঢাকা পড়ে গেছে। সারা শরীরে বড়ো বড়ো কালো লোম। চোখ দুটো বড়ো বড়ো। তাতে হিংস্রতা। বড়ো বড়ো দাঁত। বোধহয় হাসছে। ফ্রান্সিসের চিন্তায় খেলে গেল নররাক্ষস! ফ্রান্সিস কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নররাক্ষসের গলা লক্ষ্য করে তলোয়ার চালাল। কিন্তু নররাক্ষস দ্রুত ঘুরে যাওয়ায় তলোয়ারের ঘা লাগল না। নররাক্ষস মুখে শব্দ করল–ওঁ।নররাক্ষস সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারের ফলাটা দুহাতে চেপে ধরল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁচকা টান মারল। তলোয়ার খুলে এলো। নিম্মই নররাক্ষসের আঙ্গুল কাটা পড়েছে। নররাক্ষস হাত দুটো চোখের সামনে আনল। ফ্রান্সিস দেখল দুটো আঙুল কাটা পড়েছে। নররাক্ষস গোঙাতে গোঙাতে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটল। ফ্রান্সিস তলোয়ারটা মাটিতে বসিয়ে হাঁপাতে লাগল। সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে লাগল। . যদি নররাক্ষস ফিরে আসে। বেশ কিছুক্ষণ কাটল। নররাক্ষস আর ফিরে এলো না।

ফ্রান্সিস বুঝল সামনের ছোটো গুহাটিতেই নররাক্ষস থাকে। আহত নররাক্ষসটা বোধহয় গুহায় ঢোকেনি। অন্যদিকে চলে গেছে।

ফ্রান্সিস আর দাঁড়াল না। একটা গাছের গুঁড়ি কান্ড বেয়ে গাছের মাথায় উঠল। ওথন থেকে ডাল ধরে ঝুঁকে খাদের ওপাশের মাটিতে নেমে এলো। তলোয়ার কোমরে গুঁজল। চলল সমুদ্রতীরের দিকে।

সমুদ্রতীরে এসে চিন্তা হল জাহাজে ওঠা নিয়ে। আবার জলে নেমে ভিজে জাহাজে উঠতে ইচ্ছে হল না। একটা কাজ তো ওকেই করতেই হবে–সেটা হল রাজা গঞ্জালেসের সঙ্গে দেখা করে নররাক্ষসকে মেরে ধনসম্পদ উদ্ধার করবার কথা বলতে হবে। বিনিময়ে বন্ধুদের মুক্তি।

কাজেই এই দুই কারারক্ষীকে এখন তাড়াতে হবে।

ফ্রান্সিস সোজা বালিয়াড়ি পার হয়ে পাতা পাটাতনের কাছে এলো। দুই কারারক্ষী ফ্রান্সিসকে দেখেই চিনল। দুজন লাফিয়ে উঠল। কোমর থেকে তলোয়ার খুলল। ভাইকিংদের দলনেতাকে পাওয়া গেছে। একে বন্দি করতে পারলে সেনাপতি ওদের পিঠ চাপড়াবে।

ফ্রান্সিস জাহাজে উঠতেই দুজনে তলোয়ার উঁচিয়ে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওরা কাছাকাছি আসতেই বলল–তোমরা কি লড়াই চাও?

হা-লড়াই করে তোমাকে হারিয়ে তোমাকে বন্দি করে নিয়ে যাবো। একজন কারারক্ষী বলল।

–কী দরকার লড়াইয়ে। আমি নিজেই কাল সকালে রাজা গঞ্জালেসের রাজদরবারে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।

–ওসব বুঝি না। সেনাপতির হুকুম জীবিত বা মৃত তোমাকে তাঁর কাছে হাজির করতে হবে। রক্ষীরা বলল।

-বাবা–সেনাপতি দারুণ ফরমান দিয়েছে তো। ফ্রান্সিস হেসে বলল।

একজন রক্ষী তলোয়ার উঁচিয়ে ফ্রান্সিসের সামনে লাফিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বলল– আমাকে তলোয়ারটা খুলতে দাও ভাই।

–খোলো তলোয়ার। কারারক্ষীটি বলল।

–শেষবার বলছি–লড়াই বন্ধ রাখো। ফ্রান্সিস বলল।

–না-না আমরা তোমাকে লড়াইয়ে হারিয়ে বন্দি করে নিয়ে যাব। রক্ষী বলল।

–ও। বেশ তাহলে লড়াই-ই হোক। ফ্রান্সিস বলল। ওদিকে এখানকার জোরে জোরে কথাবার্তা শুনে ভেন ডেক-এ উঠে এলো। ও রক্ষীদের দিকে তাকিয়ে বলল– তোমরা কি পাগল–ফ্রান্সিসের সঙ্গে তলোয়ারের লড়াই করতে চাও?

-হা-হা চাই। রক্ষীরা বলল।

–ফ্রান্সিস মেরে ফেলো না। একটু রয়ে সয়ে তলোয়ার চালিও। ভেন ফ্রান্সিসকে বলল।

ফ্রান্সিস কোমর থেকে তলোয়ার খুলল। একজন রক্ষী ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর ফ্রান্সিসের ওপরে তলোয়ার চালাল। ফ্রান্সিস মারটা ঠেকাল। অন্যজনও তলোয়ার চালাল। ফ্রান্সিস ওর মারও ঠেকাল। ওরা লাফালাফি করে তলোয়ার চালাতে লাগল। ফ্রান্সিসও ওদের মার ঠেকিয়ে চলল। ওরা হাঁপাতে লাগল। এবার ফ্রান্সিস একজন রক্ষীর তলোয়ারে এমন ঘা মারল যে তলোয়ার ছিটকে নীচের বালিয়াড়িতে গিয়ে পড়ল। সেই রক্ষী হাঁ করে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস ওর গলায় তলোয়ার ঠেকিয়ে বলল–আরো লড়াই করার ইচ্ছে আছে।

অন্য রক্ষীটি এই দেখে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ফ্রান্সিস দ্রুত তলোয়ার চালাল। রক্ষীটি পিছিয়ে গেল। ফ্রান্সিস তলোয়ার চালিয়ে চালিয়ে ওকে রেলিঙের ধারে নিয়ে এলো। তারপর দ্রুত তলোয়ার চালিয়ে ওর পোশাকের বুকের দিকটা লম্বালম্বি কেটে দিল। কিছুটা কেটেও গেল। রক্ত পড়তে লাগল। রক্ষীটি হাঁপাতে লাগল।

–বাছাধনরা এবার বাড়ি যাও। ভেন বলল।

ফ্রান্সিস বুকের কাছে পোশাক কাটা রক্ষীটির হাত থেকে তলোয়ার খুলে নিয়ে জলে ফেলে দিল। তারপর ওকে দুহাতে তুলে ধরে জলে ফেলে দিল। বলল–যা তলোয়ার খোঁজ গে।

একটু হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিস বলল–ভেন-মারিয়া কেমন আছে?

খুব ভালো। রাতে ডিমসেদ্ধ খেতে চেয়েছে। ভেন বলল।

–না না কটা দিন খাওয়া দাওয়াটা মানে তোমরা যাকে সহজপাচ্য বল–তাই। খাওয়াও। ফ্রান্সিস বলল।

–এসব আমার হাতে ছেড়ে দাও। চলো। ভেন বলল।

জাহাজ থেকে ওরা দেখল দুই কারারক্ষী বালিয়াড়ি পার হয়ে তীরের প্রান্তরে উঠল। ফ্রান্সিস ভাবল– ওরা নিশ্চয়ই গিয়ে সেনাপতিকে সব বলবে। সেনাপতিও আমার খোঁজে এখানে আসবে। আবার ঝামেলা। যাকগে–যা হবার হবে। কালকে সকালে রাজা গঞ্জালেসের সঙ্গে দেখা করতেই হবে।

একটু অন্যমনস্কভাবেই ফ্রান্সিস খাওয়া-দাওয়া সারল। মারিয়া এখন অনেকটা সুস্থ। ভেন কিন্তু মারিয়াকে অল্পসেদ্ধডিম খেতে দিল। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। ভেন রাজবৈদ্যর শিষ্য ছিল। ও যা ভালো বোঝে করুক।

বেশ রাত তখন। হঠাৎ ডেক-এ অনেক পায়ের শব্দ। ভেনই প্রথম শব্দটা শুনতে পেল। ও উঠে পড়ল। নীচে নামার সিঁড়ির কাছে এলো। দেখল কিছু সশস্ত্র সৈন্যের সঙ্গে বোধহয় সেনাপতিই নামছে। ভেনকে দেখে জিজ্ঞেস করল–ফ্রান্সিস কোথায়?

ভেন বলল–আসুন। সবাই ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এসে দাঁড়াল। সেনাপতি দরজায় ধাক্কা দিল।

ফ্রান্সিসের কানেও শব্দ গেছে। ও উঠে পড়েছে ততক্ষণে। মারিয়ারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বলল কী ব্যাপার?

সেনাপতি এসেছে–আমায় বন্দি করবে বোধহয়? ফ্রন্সিস বলল।

–তুমি পালাও। মারিয়া বলল।

–দেরি হয়ে গেছে–পালানো যাবে না। ফ্রান্সিস বলল। দরজায় তখনও ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে ফ্রান্সিস বিছানা থেকে নেমে দরজায় দিকে এগোল। দরজা খুলে দাঁড়াল।

সেনাপতি বলল–তাহলে পালাওনি।

পালাবার তো কোনো কারণ ঘটেনি। ফ্রান্সিস বলল।

–আমার দুই কারারক্ষীকে তুমি আহত করেছে। সেনাপতি বলল।

–মেরে তো ফেলিনি। ফ্রান্সিস বলল।

–তাহলে আর দাঁড়িয়ে এতক্ষণ কথা বলতে পারতে না।

তার আগেই যাক গে–তুমি কি আমাদের সঙ্গে তলোয়ারের লড়াই চালাতে চাও। আমার দুজন তলোয়ার দক্ষ সৈন্যকে এনেছি। তুমি লড়বে?

ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–না।

–না লড়েই পরাজয় স্বীকার করলে। সেনাপতি বলল।

–হুঁ ফ্রান্সিস মাথা কাত করে বলল।

সেনাপতি হাসল। বলল–তবে যে শুনি ভাইকিংরা বীরদুঃসাহসী। তলোয়ার চালনায় দক্ষ।

–সেটা যথাসময়ে যথাস্থানে প্রমাণ পাবেন। ফ্রান্সিস বলল।

–থাক গে–তোমাকে বন্দি করা হল। সেনাপতি বলল।

–তাহলে তো আমাকে কয়েদঘরে গিয়ে থাকত হবে। ফ্রান্সিস বলল।

অবশ্যই। সেনাপতি বলল। তারপর মারিয়াকে আর ভেনকে দেখিয়ে বলল এরাও তো বন্দি ছিল।

হা–রাজকুমারী অসুস্থ হয়ে পরেছিলেন তাই তাঁকে চিকিৎসার জন্যে এখানে আনা হয়েছিল। ঐ বৃদ্ধ ভেন–আমাদের চিকিৎসক বৈদ্য। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। এরা এখানেই থাকুক তুমি চলো। সেনাপতি বলল।

–এখুনি? ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। কোনো ব্যাপারে দেরি করা আমি পছন্দ করি না। সেনাপতি বলল।

–ঠিক আছে। চলুন। ফ্রান্সিস বলল।

সেনাপতি দরজার দিকে এগোল। ফ্রান্সিস পেছনে। পিছু ফিরে ফ্রান্সিস মারিয়াকে বলল–দুশ্চিন্তা করো না। আমরা মুক্তি পাবোই। মারিয়া স্থির বিছানায় বসে রইল। সবাই চলে গেলে মারিয়া বালিশে মুখ চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

সেনাপতি ফ্রান্সিসকে নিয়ে জাহাজ থেকে নামল। সঙ্গের তিনজন ঘোড়সওয়ার সৈন্যও নামল।

বালিয়াড়ি পার হয়ে ঘাসের প্রান্তরে এলো। একজন সৈন্য তিনটি ঘোড়ার লাগাম ধরেছিল।

সবাই ঘোড়াগুলোর দিকে এলো। সেনাপতি নিজের ঘোড়ায় উঠল। সৈন দুজনও ঘোড়ায় উঠল। সেনাপতি ফ্রান্সিসকে বলল–তুমি একজনের পেছনে বসো। ফ্রান্সিস একজন সৈন্যের পেছনে বসল। তিনটি ঘোড়া ছুটল।

ফ্রান্সিস ওপরে তাকাল। আকাশ অনেকটা সাদাটে হয়ে এসেছে। ভোর হতে দেরি নেই। রাজধানী মিলা পৌঁছোবার আগেই সূর্য উঠল। রোদ ছড়াল বাঁপাশে জঙ্গলের মাথায় প্রান্তরে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা সকালে দামিলা পৌঁছল। সেনাপতি ঘোড়া চালিয়ে কয়েদুঘরের সামনে এলো। পাহারারত এক রক্ষীকে ডাকল। রক্ষী এগিয়ে এলো। ততক্ষণে ফ্রান্সিস ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়েছে। ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে সেনাপতি বলল– এটাকে কয়েদঘরে ঢোকা। রক্ষীটি একটা বড়ো চাবি নিয়ে কয়েদঘরের তালা খুলল। ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। নিজেই কয়েদঘরে ঢুকল।

ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে যারা জেগে উঠেছিল তারা ফ্রান্সিসকে ঢুকতে দেখে অবাক। ওরা তখন ভাবছিল ফ্রান্সিস মুক্ত থাকলে তবু পালাবার আশা ছিল। কিন্তু এখন তো সেই আশা আর রইল না। তবু ফ্রান্সিসকে দেখে ঘুম ভেঙে গেল। ওরাও ধ্বনি তুলল– ওহো-হো। বাকি বন্ধুদের ঘুম ভেঙে গেল। ওরাও ধ্বনি তুললও-হো-হো।

ফ্রান্সিস হেসে হ্যারির পাশে গিয়ে বসল। হ্যারি জিজ্ঞেস করল–ফ্রান্সিস, তুমি ধরা দিলে কেন? সব বন্ধুরা তখন বসে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসকে ঘিরে ধরেছে।

ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সব ঘটনা বলল। হ্যারি জিজ্ঞেস করল এখন কী করবে।

রাজা গঞ্জালেসের সঙ্গে দেখা করবো। বলবো যদি আমাকে আমার বন্ধুদের মুক্তি দেন তাহলে ঐ নররাক্ষসের হাত থেকে আপনার পৈতৃক ধনসম্পদ উদ্ধার করে দিতে পারি। দেখি রাজা গঞ্জালেস কী বলে। ফ্রান্সিস বলল।

কিছু পরেই ঢ্যাং ঢ্যাং শব্দে দরজা খুলে গেল। সকালের খাবার দিতে দুজন সৈন্য ঢুকল। প্রত্যেকের সামনে পাতা পেতে গোল রুটি আর তরকারির ঝোল দিল। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল।

খাওয়া শেষ হলে সৈন্য দুজন চলে গেল।শব্দ তুলে দরজা বন্ধ হল। ফ্রান্সিস লোহার দরজার সামনে গেল। একজন রক্ষীকে বলল–আমি সেনাপতির সঙ্গে কথা বলবো। সেনাপতিকে ডাকো।

উনি এখন বিশ্রাম করছেন। ডাকা যাবে না। রক্ষীটি বলল।

ফ্রান্সিস লোহার দরজা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল নিকুচি করেছে বিশ্রামের। তুমি ডাকো। ফ্রান্সিসের চড়া গলা শুনে বন্ধুরা এগিয়ে এলো। একসঙ্গে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো

রক্ষীটি বেশভীত হল। অন্য রক্ষীটি এগিয়ে এলো। সব শুনে বলল–দরজা ধাক্কানো বন্ধ করো। আমি সেনাপতিকে ডেকে আনছি।

রক্ষীটি চলে গেল। ফ্রান্সিসের বন্ধুরাও ফিরে গেল নিজের নিজের জায়গায়। কিছু বসল, কিছু শুয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি এলো। লোহার দরজার সামনে এসে বলল–কী ব্যাপার? তোমরা নাকি হৈ চৈ করছো। লোহার দরজা ভেঙে ফেলতে চাইছো?

ফ্রান্সিস উঠে এলো। বলল–আপনার সঙ্গে আমার খুবই প্রয়োজন। তাই একজন রক্ষীকে বললাম আপনাকে ডেকে দেওয়ার জন্য। ও শুনল না কথা। তাই আমার ক্রুদ্ধ বন্ধুরা ধ্বনি তুলেছে। দরজায় ধাক্কা দিয়েছে।

যাক গে–শান্ত হয়ে না থাকলে কিন্তু সবাইকে বেত মারা হবে। সেনাপতি বলল।

–খুব ভালো কথা–ফ্রান্সিস বলল–তারপর বলল–রাজসভা বসলে আমি রাজার সঙ্গে দেখা করতে চাই।

-কেন? সেনাপতি বলল।

–আমার কয়েকটা জরুরী কথা বলার আছে। ফ্রান্সিস বলল।

–রাজার সামনে আজেবাজে বকবে না। সেনাপতি বলল।

–আজেবাজে নয়। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। রাজসভা বসলে তোমাকে আমার সৈন্যরাই এসে নিয়ে যাবে। সেনাপতি বলল।

–অনেক ধন্যবাদ। ফ্রান্সিস বলল।

সেনাপতি চলে গেল। রক্ষীরা পাহারা দিতে লাগল।

একটু বেলায় দুজন সৈন্য কয়েদঘরের সামনে এলো। লোহার দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বলল–ফ্রান্সিস কে?

ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। বলল–আমি।

–সেনাপতি তোমাকে রাজদরবারে নিয়ে যেতে বলেছেন। একজন সৈন্য বলল।

–চলো ভাই। আমি তৈরি। ফ্রান্সিস বলল।

ঢং ঢং শব্দে দরজা খোলা হল। ফ্রান্সিস বেরিয়ে এলো। সৈন্য দুজনের সঙ্গে চলল রাজবাড়ির দিকে।

ফ্রান্সিস রাজসভায় এলো। তখন বিচার চলছে। সেনাপতির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বলল–আমাকে কথা বলার সুযোগ দেবেন।

দাঁড়াও–দেখছি। সেনাপতি বলল।

বিচারটা শেষ হল। সেনাপতি একটু এগিয়ে গিয়ে মাথা একটু নিচু করে সন্মান জানাল। তারপর বলল–একদল ভাইকিংকে আমরা কয়েদঘরে বন্দি করে রেখেছি। তাদের যে দলনেতা ফ্রান্সিস সে আপনাকে কিছু বলতে চায়।

–বেশ। এগিয়ে আসুক। রাজা গঞ্জালেস বললেন।

ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। মাথা একটু নিচু করে সন্মান জানিয়ে বলল–মহারাজ আমি শুনেছি–উত্তরের টিলার নীচে দিয়ে একটা শুকনো খাদ চলে গেছে। ওখানে একটা ছোটো গুহায় নররাক্ষস থাকে।

–হ্যাঁ থাকে। রাজা বললেন।

–আপনার পিতা মূল্যবান বেশ কিছু ধনসম্পদ–ঐ গুহায় রেখে নররাক্ষসকে পাহারাদার হিসেবে রেখেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। কিন্তু নররাক্ষস এখন আর ঐ ধনসম্পদের পাহারাদার হিসেবে থাকতে চাইছে না। ধনসম্পদের মালিক হতে চাইছে। রাজা বললেন।

নররাক্ষসকে হত্যা করে আপনার পৈতৃক ধনসম্পদ উদ্ধার করতে পারতেন। ফ্রান্সিস বলল।

–সেই চেষ্টা করেছি। অন্তত পাঁচজনকে নররাক্ষস হত্যা করেছে। তারপরে আর কেউ যেতে চাইছে না। রাজা বললেন।

–আমি গতকাল দুপুরে ঐ গুহার কাছে গিয়েছিলাম। নররাক্ষসকে দেখেছি। ও আক্রমণ করার আগেই তলোয়ার দিয়ে ওর দুটো আঙ্গুল কেটে ফেলেছি। ও তখন পালিয়ে যায়। ফ্রান্সিস বলল।

-সে কি! তোমার ভয় করল না? রাজা বললেন।

ভয়ের কী আছে। ও তো আমাদের মতোই মানুষ। ওকে দেখতে বীভৎস। কাঁচা মাংস খায়। ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি পারবে ঐ নররাক্ষসকে হত্যা করতে? আমার পৈতৃক সম্পদ উদ্ধার করতে? রাজা বললেন।

–হ্যাঁ পারবো। একা নয়। সঙ্গে দুই বন্ধুও থাকবে। ফ্রান্সিস বলল।

–চেষ্টা করে দেখো। রাজা বললেন।

–এবার আমার একটা শর্তের কথা বলি। ফ্রান্সিস বলল।

–বলো কী শর্ত? রাজা বললেন।

–আপনি এখন আমার বন্দি বন্ধুদের মুক্তি দিন। ফ্রান্সিস বলল।

রাজা একপাশে বসা বৃদ্ধ মন্ত্রীকে বললেন–মন্ত্রীমশাই আমি এই প্রস্তাবে রাজি হব?

–না। আগে ঐ যুবক নররাক্ষসকে হত্যা করে আপনার ধনসম্পদ উদ্ধার করে দিক। তারপর ওর বন্ধুদের মুক্তি দেওয়া হবে। মন্ত্রী বললেন।

ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে একটু ভাবল। তারপর মাথা তুলে বলল–বেশ তখনই মুক্তি দেবেন। তবে আমাকে আর আমার দুই বন্ধুকে মুক্তি দিতে হবে। অস্ত্র দিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

রাজা সেনাপতির দিকে তাকালেন। বললেন–এদের তিনজনকে মুক্তি দিন আর অস্ত্র বর্ম ওরা যা চায় দিন।

ফ্রান্সিস রাজা গঞ্জালেসকে মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজসভার বাইরে এলো। সেনাপতি ওর সঙ্গে এলো। দুজনে চলল কয়েদঘরের দিকে।

সেনাপতি কয়েদঘরের রক্ষীদের আদেশ করল–এই যুবক যে দুজন বন্ধুর মুক্তি চাইবে তাদের মুক্তি দাও। তারপরে অস্ত্রঘরে গিয়ে ওরা যা যা অস্ত্র চায়–দেবে।

সেনাপতি বলল–কবে যাবে নররাক্ষসের গুহায়?

–আজ দুপুরে খেয়েদেয়ে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।

-দেখো–নররাক্ষসদের সঙ্গে লড়তে পারো কিনা। ওকে মেরে ফেলার সাধ্য কারো নেই। খুব বেশি হলে ওকে আহত করতে পারো। কিন্তু সেটা করতে গিয়েও তোমাদের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সেনাপতি বলল।

–আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন–নররাক্ষসকে আমরা হত্যা করবো। রাজা গঞ্জালেসের পৈতৃক সম্পদ উদ্ধার করবো। ফ্রান্সিস বলল।

-বেশ–দেখা যাক। সেনাপতি বলল।

সেনাপতি চলে গেল। ফ্রান্সিস রক্ষীকে বলল–আমরা দুপুরে খেয়ে যাবো। তখন আমাদের মুক্তি দিয়ো। অস্ত্রঘরেও তখন যাবো।

রক্ষী দরজা খুলে দিল ফ্রান্সিস ঢুকল। বন্ধুরা এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস বসল। বলল– খাওয়া হয়ে গেলে আমি শাঙ্কো আর বিস্কোনররাক্ষসকে নিকেশ করতে যাবো। তোমরা আমাদের সাফাল্য কামনা করো। হ্যারি আস্তে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো-। বন্ধুরাও একসঙ্গে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো-।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিস বলল–আমি তোমাদের মুক্তি চেয়েছিলাম। কিন্তু বাদ সাধলেন মন্ত্রীমশাই। তিনি বললেন–নররাক্ষসকে হত্যা করতে পারলে আমার বন্ধুদের মুক্তি দেওয়া হবে।

ফ্রান্সিস রক্ষীকে ডাকল। রক্ষী দরজা খুলে দিল। ফ্রান্সিস শাঙ্কো বিস্কো বেরিয়ে এলো। রক্ষী ওদের নিয়ে চলল অস্ত্রাগারে।

অস্ত্রাগারের সামনেও রক্ষীদের পাহারা। কয়েদঘরের রক্ষী ওদের কাছে গেল। বলল–সেনাপতির হুকুম–এই তিনজনে যা যা চায় তা এদের দিতে হবে। রক্ষী অস্ত্রাগারের দরজা খুলে দিল। তিনজনে অস্ত্রাগারে ঢুকল। তিনজনেই তলোয়ার নিল। বর্ম শিরস্ত্রাণ নিল। পরল সেসব। একটা মশাল আর চকমকি পাথর নিল। তারপর তলোয়ার কোমরে গুঁজে বেরিয়ে এলো। অস্ত্রাগারের রক্ষী বলল–তোমরা কার সঙ্গে লড়াই করতে যাচ্ছো?

–নররাক্ষসের সঙ্গে। বিস্কো বলল।

-বলো কি। রক্ষী বলে উঠল। রক্ষীদের একজন বলল তোমাদের প্রাণটা বেঘোরে যাবে। আজ পর্যন্ত কেউ নররাক্ষসকে আহতও করতে পারেনি।

–আমি ওর দুটো আঙ্গুল কেটে দিয়েছি। গিয়ে দেখে আসতে পারো। ফ্রান্সিস বলল।

–এ অসম্ভব। রক্ষী বলল।

–আমরা অসম্ভবকেই সম্ভব করি। আমরা ভাইকিং। শাঙ্কো বলল। সব রক্ষীরা অবাক চোখে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে রইল।

তিনজনে চলল খাদের দিকে। খাদের একেবারে শেষে এসে ঢাল দিয়ে নামল। তারপর খাদ দিয়ে চলল। খাদে জংলা গাছ ঝোপ কয়েকটা বড়ো গাছ।

তিনজনে চলল। সামনে ফ্রান্সিস।

ফ্রান্সিস গতকালের দেখা ছোটো গুহাটার সামনে এলো। বলল–নররাক্ষস নিই। এই গুহাটায় থাকে। গুহা দেখে বিস্কো বলল–আমাদের তো শুয়ে পড়ে ঢুকতে হবে।

-হ্যাঁ। নররাক্ষসকে ডাকাডাকি করা যাক। বেরিয়ে এলে লড়াইটা এখানেই হতে পারে। শাঙ্কো বলল।

তিনজনে গুহার মুখে এসে ডাকতে লাগল–নররাক্ষস বেরিয়ে আয়। তোর সঙ্গে আমরা লড়তে এসেছি। সাহস থাকে তো গুহা থেকে বেরিয়ে আয়।

কিছুক্ষণ সময় গেল। নররাক্ষস বেরিয়ে এলো না। ফ্রান্সিস বলল–ও বেরিয়ে আসবে না। এটা বোঝা যাচ্ছে। যাকগে–আমাদেরই ঢুকতে হবে। তার আগে দুটো কাজ। একটা লম্বা গাছের ডাল চাই। আর মশালটা জ্বালাতে হবে।

ফ্রান্সিস দেখল কিছু দূরে একটা ওক গাছ। বলল–ভুলে কুড়ুলটা আনা হয়নি। তলোয়ারের কোপ দিয়ে ডালটা কাটাতে হবে। চলো।

ওক গাছটা থেকে একটা লম্বা ডাল বেছে নিল। তিনজনে গাছে বেয়ে বেয়ে উঠল। ডালটার কাছে এলো৷ তলোয়ারের ঘা মারতে লাগল ডালটার গোড়ায়। খুব মোটা ডাল নয়। তিনটি তলোয়ারের পরপর কয়েকটা কোপে কেটে গেল।নীচে ঝোপঝাড়ে পড়ল।

তিনজনে নেমে এলো। গুহার মুখের কাছে এলো। চমকি ঠুকেবিস্কো মশালটায় আগুন লাগাল। ফ্রান্সিস মশালটা হাতে নিয়ে বলল–চলো।

গুহার মুখে ফ্রান্সিস প্রায় শুয়ে পড়ল। তারপর গুহাটায় ঢুকে গেল। একটু যেতেই দেখল গুহাটা বেশ বড়ো। ফ্রান্সিস মশালের আলোয় চারপাশ দেখতে লাগল। এবড়ো খেবড়ো পাথরের গা। ফ্রান্সিস কাটা ডালটা টেনে নিল।

ততক্ষণে বিস্কো শাঙ্কো ঢুকে পড়েছে। এতক্ষণে দুর্গন্ধে তিনজনেরই গা গুলিয়ে উঠল।

হঠাৎ ওরা দেখল পাথুরে গায়ে একটা বড়ো ফাটলের মতো। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে নররাক্ষস। ফ্রান্সিস চিৎকার করে উঠল–সাবধান। গুহার পাথরে পাথরে কথাটা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।নররাক্ষসকে প্রথম দেখেছিল ফ্রান্সিসই। এবার শাঙ্কো দেখল। ফ্রান্সিস আগেই তলোয়ার কোমরের ফেট্টি থেকে খুলে বের করেছে। শাঙ্কো আরবিস্কোও এবার তলোয়ার খুলল।

নররাক্ষস হো হো করে হেসে উঠল। গুহাটায় সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

নররাক্ষস গুহার গায়ের একটা বড়ো ফাটল দিয়ে ছোটো গুহায় ঢুকে গেল। ফ্রান্সিস বলল–ঐ ছোটো গুহাটায় নররাক্ষস ঢুকে পড়ে বলেই কেউ ওকে সামনাসামনি লড়াইয়ে নামতে পারে না। ঐ গুহাটায় ঢুকতে গিয়েই বোধহয় এর আগে যারা নররাক্ষসকে হত্যা করতে এসেছিল তারা নিজেরাই মারা পড়েছে। ঐ গুহায় আমরা এখন ঢুকবো না।

ফ্রান্সিস গাছের লম্বা ডালটা টেনে নিল। ফ্রান্সিস বলল–হাত লাগাও। তিনজনে মিলে লম্বা ডালটা ছোটো গুহাটায় ঢোকাল। তারপর ডালটা ঘোরাতে লাগল। এই ডালটা তলোয়ার বা বর্শা নয়। অনেকদূর গেল ডালটা। ডালের খোঁচা দিয়ে উত্যক্ত করতে লাগল নররাক্ষসকে। নররাক্ষস তার লুকিয়ে আক্রমণ করতে পারল না। গুহা। থেকে কুঠারহাতে বেরিয়ে এলো। কুঠারটা বেশ বড়ো। অত্যন্ত ধারালো মুখটায় মশালের আলো পড়ে চক্ করছে।

নররাক্ষস কুঠার হাতে ফ্রান্সিদের সামনে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিস্কো সরে যেতে গিয়েও পারল না। কুঠারের মুখটা বিস্কোর কঁধ ছুঁয়ে গেল। অনেকটা কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল।

ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–বিস্কো পেছনে সরে যাও। বিস্কো পেছনে সরে গেল। এবার ফ্রান্সিস তলোয়ার চালাতে লাগল। শাঙ্কোও তলোয়ার উঁচিয়ে আঘাত করার সুযোগ খুঁজতে লাগল।

ওদিকে ফ্রান্সিস তলোয়ার চালিয়ে কুঠারের সঙ্গে লড়তে লাগল। অত্যন্ত শক্তিধর নররাক্ষস অনায়াসে ঐ ভারি কুঠারটা ঘোরাতে লাগল।ফ্রান্সিস বুঝতে পারল বেশিক্ষণ লড়াই চালাতে পারবে না।

ফ্রান্সিস হঠাৎ লাফ দিয়ে নররাক্ষসের সামনে গিয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে বসে পড়ল। নররাক্ষস কুঠার চালাল। কিন্তু কুঠার ঘুরে গেল ফ্রান্সিসের মাথার ওপর দিয়ে। এই সুযোগটাই পেতে চাইছিল ফ্রান্সিস। ও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে তলোয়ারের কোপ বসাল নররাক্ষসের ডান কাঁধে। তলোয়ারটা গেঁথে গেল যেন। রক্ত ছুটল। নররাক্ষস কুঠার চালানো থামল। ফ্রান্সিসদের মনে পড়ল নররাক্ষসের দুটো আঙ্গুলও কেটে দিয়েছিল। ও বুঝতে পারছিল নররাক্ষস কুঠারটা খুব শক্ত করে ধরতে পারছে না। শরীরে জোরটাও কমে এসেছে।

নররাক্ষসের গা রক্তাক্ত হয়ে গেল। ওদিকে শাঙ্কো তখন সুযোগ খুঁজছে। পেয়েও গেল সুযোগ। নররাক্ষস তখন কুঠার মাথার ওপর তুলে ধরেছে। শাঙ্কো বিদ্যুৎগতিতে দুপা এগিয়ে তলোয়ারের কোপ বসাল নারাক্ষসের পায়ে। পা কেটে রক্ত বেরিয়ে এলো।নররাক্ষস হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।ফ্রান্সির সঙ্গে সঙ্গে নররাক্ষসের মাথায় সজোরে তলোয়ারের কোপ বসাল। মাত্রা কেটে গেল। রক্ত বেরোলো। রক্তধারা নররাক্ষসের চোখে মুখে নেমে এলো।

নররাক্ষস চিৎকার করে উঠল। ঐ প্রচন্ড চিৎকারে গুহাটা যেন কেঁপে উঠল। এক মুহূর্ত বিস্কো ভাবল। তারপর ছুটে এসে নররাক্ষসের বুকে তলোয়ার প্রচন্ড জোরে ঢুকিয়ে দিল। তলোয়ারটা আর বের করল না। তলোয়ারটা বুকে বিঁধে রইল। নররাক্ষস গুহার মেঝেয় পড়ে গেল। এপাশ-ওপাশ গড়াতে লাগল। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল।

ফ্রন্সিস ও শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। দুজনেই ভীষণ হাঁপাতে লাগল।

নররাক্ষস গোঙাতে লাগল।নররাক্ষস মাথাটা এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। তারপর স্থির হয়ে গেল। নররাক্ষস মারা গেল।

ফ্রান্সিস একটা পাথরের চাঙের ওপর বসল। বিস্কো পাশে বসল। ফ্রান্সিস বিস্কোর কাটা জায়গাটা দেখল।তখনও রক্ত পড়ছে। ফ্রান্সিস কোমরের কাপড়ের ফেট্টিটা খুলল। লম্বা করে এক ফালি ছিঁড়ল। বিস্কোর আঘাতের জায়গটা ভালো করে বেঁধে দিল। ব্যথাটা কমল বিস্কোর।

শাঙ্কো তখন নররাক্ষসের গুহাটা দেখছিল। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–এই গুহাটায় একজন ঢুকতে পারবে?

ফ্রান্সিস বলল–ঐ গুহতেই রয়েছে রাজা গঞ্জালেসের পৈতৃক ধনভান্ডার। ওসব বের করে আনতে হবে। কিন্তু মশাল নিয়ে ঢোকা যাবে না।

ফ্রান্সিস তলোয়ারটা বিস্কোর হাতে দিল। ছোটো গুহার কাছে গেল। মাথা ঢুকিয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকতে লাগল। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা। অন্ধকারে আরো ঢুকল। অন্ধকারে হাতে কী যেন ঠেকল। আরো ঢুকে জিনিসটা হাত দিয়ে দেখে বুঝল একটা বাক্স। লম্বাটে।

ফ্রান্সিস বাক্সের কড়াটা ধরে টানতে টানতে অন্ধকারে নিয়ে চলল গুহার মুখের দিকে। গুহার মুখ দিয়ে ফ্রান্সিস শুয়ে শুয়ে বেরিয়ে এলো। বাক্স উঁচু করে ধরে নেমে এলো দেখা গেল একটা পেতলের বাক্স। বাক্সটা সারা গায়ে নীল সবুজ মিনে করা। তারই মধ্যে মধ্যে হীরের টুকরো বসানো ফ্রান্সিস বাক্সটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল কোনে

চাবির ফুটো নেই। তাহলে টানা আছে। ও একপিঠের ঢাকাটা ঠ্যালা দিল। টানা পরে খুলে গেল। মশালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল সোনার কত বিচিত্র গয়নাগাঁটি। সে সবের নীচে দেখল হীরে মণি-মাণিক্য। শাঙ্কো বিস্কোও দেখল। যাক্। রাজা গঞ্জালেসের পৈতৃক ধনরত্ন উদ্ধার করা গেছে। এবার মুক্তি।

ওরা একে একে গুহা থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে বেরিয়ে এলো। এবার ঝোপজঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলল যেখানে এই খাদটা শুরু হয়েছে সেইদিকে। ওদের গায়ের পোশাক গুহার লালচে ধূলোর আস্তরণ ওরা ঝাড়ল ধুলো উড়ল। কিন্তু পোশাক পরিষ্কার হল না। খাদের শেষে এসে ওরা যখন উঠে এলো দেখল রাজা গঞ্জালেস মন্ত্রী ও সেনাপতি দাঁড়িয়ে আছেন। ফ্রান্সিস রাজা গঞ্জালেসের কাছে গেল। বাক্সটা রাজাকে দিল। রাজা গঞ্জালেসের মুখে হাসি আর ধরে না। তাড়াতাড়ি টানা খুলল। দেখল গয়না গাঁটি মণি রত্ন।

ফ্রান্সিস বলল–মাননীয় রাজা এবার তাহলে আমার বন্ধুদের মুক্তি দিন। আমরা জাহাজে ফিরে যাবো। রাজা সেনাপতিকে বললেন–ওদের ছেড়ে দাও। এবার রাজা ফ্রান্সিসকে বলল–নররাক্ষসকে কি হত্যা করতে পেরেছো।

–হ্যাঁ। নররাক্ষস ঐ গুহাতেই মরে পড়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল।

সেনাপতির সঙ্গে ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরের সামনে এলো। সেনাপতি একজন রক্ষীকে বলল–সবাইকে মুক্তি দাও। কারারক্ষী দরজা খুলে দিল। ভাইকিংরা বেরিয়ে এলো। ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।

ফ্রান্সিসের তখন চিন্তা মারিয়া সুস্থ আছে তো? তাই ও আর দেরি করতে চাইল না। শাঙ্কো তখন বন্ধুদের বলছে নররাক্ষসকে কী করে ওরা হত্যা করল তার ঘটনা।

এবার সবাই রওনা হল জাহাজঘাটার দিকে।

সন্ধ্যার সময় ওরা জাহাজঘটায় এলো। জাহাজে উঠল সবাই। তখন সবাই আনন্দে মাতোয়ারা।

ফ্রান্সিস দেখল মারিয়া জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে আছে। কাছে এসে দেখল মারিয়া অনেকটা সুস্থ। ফ্রান্সিস বলল–সূর্যাস্ত তো দেখেছো?

-হ্যাঁ। মারিয়া হেসে বলল।

–এবার কেবিনে চলো। শুয়ে বিশ্রাম করবে। ফ্রান্সিস বলল।

–সারাদিন শুয়ে থাকতে ভালো লাগে নাকি। মারিয়া বলল।

–রাজা গঞ্জালেসের পৈতৃক ধনভান্ডার কী করে উদ্ধার করলাম সেই গল্প শুনবে এসো। ফ্রান্সিস বলল।

–বেশ চলো। মারিয়া বলল।

দুজনে কেবিনঘরে এলো। ফ্রান্সিস গায়ের পোশাকটা খুলে ফেলল। দেখল গায়েও লালচে ধুলো লেগেছে। বলল–দাঁড়াও–একটু গা ধুয়ে আসি।

ও বেরোতে যাবে তখনই ভেন ঢুকল। ফ্রান্সিস বলল–ভেন–মারিয়া এখন কেমন আছে?

–সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে শরীরের দুর্বলতাটা কাটতে একটু সময় লাগবে। ভেন বলল।

দুর্বলতা কাটাবার ওষুধ দিয়েছো তো? ফ্রান্সিস বলল।

–দিয়েছি। রাজকুমারী খান না। ভেন বলল।

–কেন? ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকাল। মারিয়া বিছানায় হাতের তোলা দিয়ে চাপড় মেরে বলে উঠল–হাঁ ভগবান। সে যে কী তেতো তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

–ঠিক আছে ঐ ওষুধ আমিও খাবো। তাহলে তো তোমার খেতে আপত্তি নেই? ফ্রান্সিস বলল।

–কিন্তু তুমি মানে মারিয়া কথটা শেষ করতে পারল না।

–হ্যাঁ। খাবো। ফ্রান্সিস বলল।

–বেশ। আমিও খাবো। মারিয়া বলল।

ভেন দুজনের কথা শুনছিল আর মৃদু মৃদু হাসছিল।

পরদিন ভোরে লোকজনের কথাবার্তায় ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখল– মারিয়া বসে আছে।

–কী ব্যপার বলো তো?

–রাজা গঞ্জালেসের নতুন জাহাজ এসে এখানে নোঙর করেছে। দামিলা থেকে লোক আসছে তো আসছেই। শুনে এলোম–রাজা গঞ্জালেস আর রানি নাকি জাহাজ দেখতে আসবেন।

ফ্রান্সিস হাত মুখ ধুয়ে ডেক-এ উঠে এলো। দেখল একটা ঝকঝকে নতুন জাহাজ ওদের জাহাজের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজটায় কামান আছে। ও এবার নিজেদের জাহাজটার দিকে তাকাল। কী বিশ্রী। জাহাজের রং বিবর্ণ। খোলটার কত জায়গায় যে রং চটে গেছে। পালগুলোয় কালো কালো ছোটো তালি মারা। ফ্রান্সিস পরেক্ষণেই ভাবলো–হোক হতচ্ছাড়া চেহারা। কত সুখদুঃখের স্মৃতি এই জাহাজের সঙ্গে জড়িত। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে গিয়ে মাস্তুলটা জড়িয়ে ধরল।

সকালের খাবার খাচ্ছে তখনই শোনা গেল লোকজনের উচ্চকণ্ঠে বলা কথা রাজা রাণি আসছেন–রাজারাণি আসছেন।

ভাইকিংরা ডেক-এ উঠে এলো। ফ্রান্সিস মারিয়াও এলো। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল–ফ্রান্সিস–যুদ্ধঅবধারিত। কয়েকদিন পরেও হতে পারে আবার আজকালের মধ্যেও শুরু হতে পারে। তার আগেই আমরা জাহাজ চালিয়ে চলে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।

দুই ঘোড়ায় টানা রাজার গাড়ি এসে দাঁড়াল। রাজা গঞ্জালেস ও রানি গাড়ি থেকে নামলেন। রাজা হাসিমুখে তাকিয়ে রইলেন নতুন জাহাজটার দিকে। রানিও জাহাজটা দেখে মুগ্ধ। মন্ত্রী ও সেনাপতি রাজার কাছে এলেন। মাননীয় রাজা–সেনাপতি বলল জাহাজটায় উঠে ভালো করে দেখুন।

কাঠের পাটাতন ফেলাই ছিল। রাজা বেশ সাবধানে পাটাতন পার হয়ে জাহাজে উঠলেন। রানি আর মন্ত্রী ঐ পাটাতনে পা ফেলে যেতে পারবে না এটা বোঝাই গেল। দুজনে তীরে রইলেন।

রাজা গঞ্জালেস জাহাজটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। খুব খুশি হলেন।

রাজা সেনাপতিকে বললেন–জাহাজে দুটো কামান রাখা হয়েছে। আমাদের এখন গোলন্দাজ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। গোলা বারুদ কিনতে হবে। সেনাপতি বলল–

হা মহারাজ এটা করতে হবে আর করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। কারণ রানি উরাকা যেকোনো সময় আপনার রাজ্য আক্রমণ করতে পারে। কথাটা শুনে রাজা মাথা ওঠানামা করলেন। বোঝা গেল–এই আশঙ্কার কথা তিনি বোঝেন।

জাহাজটার মাস্তল পাল দাঁড়টানা ঘর সবই দেখলেন রাজা। তারপর নেমে এলেন। প্রজাদের ভিড় থেকে ধ্বনি উঠল–রাজা রানি দীর্ঘজীবী হোন। রানি হাত তুলে হাসলেন।

রাজা রানি গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। গাড়ি চলল রাজপ্রাসাদের দিকে।

ভাইকিংরা জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে এসব দেখল।

এবার হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল

–এখন আমরা কী করবো?

–ফ্লেজারকে বলো দেশের দিকে জাহাজ চালাতে। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব–ফ্রান্সিস বলেছে এখন জাহাজ দেশের দিকে যাবে। ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো।হ্যারি বলল–পাল খুলে দাও। বাতাস পড়ে গেছে। দাঁড় টানতে যাও। নোঙর তোল।

ঘর ঘর শব্দে নোঙর তোলা হল। কয়েকজন ভাইকিং মাস্তুল বেয়ে কিছুটা উঠে পালের কাঠের ওপর দাঁড়াল। গোটানো পাল খুলে দড়ি দিয়ে বাঁধল। পালগুলো ফুলে উঠল। তবে হাওয়ার খুব জোর নেই।

সাত আটজন ভাইকিং তখন দাঁড়ঘরে গিয়ে দাঁড় টানতে লাগল। সমুদ্রের জলে শব্দ উঠল –ছপ ছপ ছপ্‌।

জাহাজ মোটামুটি জোরে সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে চলল।

বিকেল নাগাদ জোর বাতাস ছুটল। জাহাজ দ্রুত ছুটল। ভাইকিংরা খুব খুশি। আর দাঁড় টানতে হচ্ছেনা। নিজেদের দেশে ফিরে যাচ্ছে। সকলের মনেই প্রশ্ন–স্বদেশ আর কতদুর?

জাহাজ তীরের কাছ দিয়েই চলেছে। তীরের গাছপালা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সূর্যাস্ত দেখতে মারিয়া তখন ডেক-এ উঠে এসেছে। তাকিয়ে রয়েছে পশ্চিম আকাশের দিকে। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল–রাজকুমারী ফ্রান্সিসকে রাজি করান যাতে ও স্বদেশের দিকেই জাহাজ চালায়।

–আমি তো কতবার বলেছি–আর নয়। এবার স্বদেশে ফেরো। কিন্তু ও কোনো কথা শুনলে তো।

আস্তে আস্তে সূর্য পশ্চিম দিগন্তের জলের ঢেউয়ের মধ্যে যেন ডুবে গেল। পশ্চিম দিগন্তে লালচে আভা ছড়িয়ে রইল। তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেল। আকাশে চাঁদের আলো উজ্জ্বল হল। তারা দেখা গেল। মারিয়া নিজের কেবিনে চলে গেল।

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর হ্যারি ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এলো। দেখল–ফ্রান্সিস বিছানায় আধশোয়া। মারিয়া বিছানায় বসে ছেঁড়া কাপড় জামা সেলাই ফোঁড়াই করছে। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, এখন কী করবে?

–জাহাজ দেশের দিকে চলুক। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া বলল–তুমি তো আবার! কোনও গুপ্তধনের খোঁজ পাবে। ব্যস ছুটলে সেই গুপ্তধন উদ্ধার করতে।

ফ্রান্সিস হেসে বলল–ঐসব কাজের জন্যেই তো দেশ ছেড়ে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হ্যারি আর কোন কথা বলল না। নিজের কেবিনঘরে চলে এলো।

রাত গভীর তখন। কালো আকাশে ভাঙা চাঁদ। জ্যোৎস্না উজ্জ্বল নয়। অজস্র তারা। জ্বলজ্বল করছে। সমুদ্র আকাশ বেশ অন্ধকার।

মাস্তুলের মাথায় নীচের বসবার জায়গাটিতে নজরদার পেড্রো বসেছিল। চারদিকে নজর রাখছিল। তীরভূমি নজরে পড়ে কিনা। জলদস্যুদের জাহাজ আসছে কিনা। কিছুক্ষণ থেকেই পেড্রো দেখছিল প্রায় অন্ধকার সমুদ্রে ওদের জাহাজের কাছ দিয়ে একই গতিতে চলেছে ছায়ার মতো একটা জাহাজ। পেড্রো এবার ঝুঁকে পড়ে সেই জাহাজটা দেখল ভালো করে। জাহাজটার মাথায় একটা পতাকা উড়ছে। কিন্তু কোন্ দেশের পতাকা তা বোঝা গেল না। তবে এটা বুঝল যে ওটা জলদস্যুদের জাহাজ নয়। তাহলেই হল।

প্রথমে পেড্রোর একটু তন্দ্রামতো এলো। তারপর ঘুম। পেড্রো ঘুমিয়ে পড়ল।

আসলে ঐ জাহাজটা ছিল জলদস্যুদের জাহাজ। প্রায় অন্ধকার সমুদ্রে জলদস্যুরা নৌকা জলে নামাতে লাগল। নৌকায় চড়ে দলে দলে জলদস্যুরা ফ্রান্সিসদের জাহাজে এসে উঠতে লাগল নিঃশব্দে। পেড্রো তখন গভীর ঘুমে। জলদস্যুরা হালের কাছে জমায়েত হতে লাগল।

নিজেদের জাহাজ থেকে পাখি ডাকার সঙ্কেত ভেসে এলো। ওরা এবার খোলা তলোয়ার হাতে ডেক-এর ওপর উঠে আসতে লাগল। ডেক-এর ওপর নিঃশব্দে চলাফেরা করতে লাগল।

একজন জলদস্যু মাস্তুল বেয়ে ঘুমন্ত পেড্রোর কাছে এলো। পেড্রোর গলায় তলোয়ারের ডগা ঠেকিয়ে খোঁচা দিল। পেড্রো ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াতে গেল। তখনই দেখল ওর গলায় তলোয়ারের ডগা ঠেকিয়ে রয়েছে এক জলদস্যু। ইয়া গোঁফ ইয়া জুলপি। জলদস্যুটি আস্তে বলল–নেমে এসো। কোনো শব্দ নয়। পেড্রো আর কী করে। জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচতেই ওর নজরদারি। সেই ওর সামনেই খোলা তলোয়ার সাক্ষাৎ এক জলদস্যু। পেড্রো মাস্তুল বেয়ে নামতে লাগল। পেছনে খোলা তলোয়ারের হাতে জলদস্যুটিও নামতে লাগল।

ওদিকে অন্য জলদস্যুরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে কেবিনঘরের সামনে এলো। কয়েকজন ফ্রান্সিসদের অস্ত্রঘরের সামনে এলো। দেখল তলোয়ার হাতে একজন ভাইকিং অস্ত্রঘর পাহারা দিচ্ছে।

পাহারাদার ভাইকিংটি কিছু বোঝার আগেই আক্রান্ত হল। ডান হাতে তলোয়ারের কোপ পড়ল। হাদ থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। পাহারদারটি জলদস্যুদের হাতে বন্দি হল। দুজন জলদস্যু অস্ত্রঘরের পাহারায় দাঁড়িয়ে গেল।

ওদিকে অন্য জলদস্যুরা কেবিনঘরে ঢুকে ঢুকে ভাইকিংদের গায়ে আস্তে জোরে তলোয়ারের খোঁচা দিয়ে জাগাতে লাগল। ঘুম ভেঙে ভাইকিংরা দেখল–খোলা তলোয়ার হাতে জলদস্যুরা দাঁড়িয়ে। ওরই মধ্যে একজন ভাইকিং জলদস্যুদের নজর এড়িয়ে অস্ত্রঘরের সামনে এলো। দেখল–অস্ত্রঘরের সামনে পাহারা দিচ্ছে খোলা তলোয়ার হাতে দুজন জলদস্যু। ওরা হতাশা হল। খালি হাতে লড়াই করতে গেলে জীবন সংশয় হবে। ওরা জলদস্যুদের নজরে পড়ে গেল। বন্দি হল।

তখন ভোর হয়ে এসেছে। সূর্য ওঠেনি। ভাইকিংদের সবাইকে ডেক-এ নিয়ে এলো জলদস্যুরা। জলদস্যুরা ভাইকিংদের মধ্যে মারিয়াকে দেখে বেশ অবাকই হল। মারিয়াকে একপাশে দাঁড় করিয়ে রাখল।

সূর্য উঠল। রোদ ছড়াল। কালো আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল।

ফ্রান্সিস হ্যারিও বন্দি। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, আবার জলদস্যুদের পাল্লায় পড়লাম। পেড্রো আবার আমাদের বিপদে ফেলল। এখন এদের হাত থেকে কী করে উদ্ধর পাবো।

–হ্যারি, মন খারাপ করো না। উপায় একটা হবেই। আমাদের নিয়ে ওরা কী করবে সেটা আগে বুঝি। তারপর ফন্দি করে পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিসদের জাহাজ থামানো হল। জলদস্যুদের জাহাজ থামল।

এক সর্দারগোছের জলদস্যু ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এলো। বলল–তোমাদের মধ্যে সর্দার কে?

–আমি। ফ্রান্সিস বলল।

চলো–গ্যাব্রিয়েল-এর কাছে। জলদস্যুটি বলল।

–হ্যাঁ চলো–আমার এক বন্ধুও যাবে। ফ্রান্সিস বলল।

জলদস্যুটা একটু ভেবে বলল–বেশ আসুক।

ফ্রান্সিসরা ঢেউ-এর ধাক্কায় দোল খাওয়া দুটো জাহাজের মধ্যের ফাঁকটুকু সাবধানে পার হয়ে গ্যাব্রিয়েল-এর জাহাজে এলো।

সর্দার জলদস্যুটির নির্দেশে ফ্রান্সিসরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা কেবিনঘরের দরজার সামনে এলো। দরজা বন্ধ। সর্দারটি দরজায় টোকা দিল। ভেতর থেকে গম্ভীর গলা শোনা গেল–আয়। সর্দার দরজা খুলে ফ্রান্সিসদের ঢুকতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা ঢুকল। দেখল বিছানায় বসে আছে একটা মোটা লোক। মুখে দাড়ি গোঁফ। বিছানাটায় পরার কাপড়চোপড় সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বোধহয় লোকটার কোনো পোশাকই পছন্দ হয়নি। তাই ছুঁড়ে ফেলেছে। লোকটার খালি। বোঝা গেল এই লোকটাই দস্যুদলের নেতা–গ্যাব্রিয়েল।

গ্যাব্রিয়েল কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝে নিতে চাইছে। ফ্রান্সিসরা ভয় পেয়েছে কিনা। তারপর হো হো করে হেসে উঠল। বলল– আমি ভেবেছিলাম তোমাদের জাহাজ লুঠ করবো। তা একে তোমরা ভিনদেশী লোক আবার দরিদ্র। ছেঁড়াখোঁড়া কীসব পোশাক পরে আছে। দেখলেই ভিখিরি বলে মনে হয়।

–এজন্যে আমরা বিন্দুমাত্র লজ্জিত নই। হ্যারি বলল।

গ্যাব্রিয়েল আবার হেসে উঠল। বলল–থাকতো এসব-এসব তোমাদের ব্যাপার। কিন্তু আমার যে একটা জাহাজ খুবই দরকার–তার কী করবো?

–আপনি তো যথেষ্ট ধনী। একটা জাহাজ কিনে নিন। ফ্রান্সিস বলল।

উঁহু–আমি জাহাজ কিনবো না। তোমাদের শক্তপোক্ত জাহাজটা আমি নেব। আবার গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল।

হাসতে হাসতে বলল–ঐ একটা জিনিসই তোমাদের কাছে আছে যা কেড়ে নিয়ে আমাদের লাভ হবে। ফ্রান্সিস ও হ্যারি মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। হ্যারি বলল– আপানার কথাটা ঠিক বুঝলাম না।

গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল। বলল–এতো জলের মতো সোজা কথা। তোমাদের এখানে কোথাও নামিয়ে দেব। তারপর তোমাদের জাহাজটা আমরা নিয়ে চলে যাবো।এবার বুঝলে?

-বুঝলাম। কিন্তু তা অসম্ভব। আমরা জাহাজ দেব না। ফ্রান্সিস বলল।

গ্যাব্রিয়েল এবার আরও জোরে হেসে উঠল। বলল–তোমার কথা শুনে এত হাসি আসছে মানে–তাহলে তো তোসাদের খালি হাতে আমাদের সঙ্গে লড়তে হয়। লড়াই হলে তোমরা কেউ বেঁচে থাকবে? আঁ?

ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–পরোয়া করি না কতজন বাঁচবো কতজন মরবো। আমরা আমাদের জাহাজ নিতে দেব না।

হ্যারি মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস মাথা গরম করো না। তাতে আমাদের বিপদই বাড়বে। এবার গ্যাব্রিয়েল বলল–তাহলে তো উপায় নেই। তোমাদের সবাইকে খতম করে জাহাজ কেড়ে নিতে হবে।

হ্যারি বলল–তার দরকার নেই। আমরা এমনিতেই আপনাকে জাহাজ দিয়ে দেব।

–এই তো একটা বুদ্ধিমানের মতো কথা। গ্যাব্রিয়েল বলল।

ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–এ কী বলছেন?

–আমি ঠিকই বলেছি। পরে এই নিয়ে কথা হবে। এখন নয়। হ্যারি বলল।

ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। কত দুঃখকষ্ট কত আনন্দ উল্লাস জড়িয়ে আছে ওই জাহাজটার সঙ্গে। সেটা দিয়ে দেব? বিনা যুদ্ধে? কিন্তু এখন যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে জাহাজটা দিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ফ্রান্সিস মাথাটা আস্তে আঁকিয়ে বলল ঠিক আছে। আমরা কথা বলে নিই।

–বেশ তো–সব দিক ভেবেচিন্তে দেখবে আমার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে তোমাদের উপায় নেই। গ্যাব্রিয়েল বলল।

হ্যারি গ্যাব্রিয়েলকে জিজ্ঞেস করল–এ জায়গাটা কি পোর্তুগালের মধ্যে।

–হ্যাঁ। এখানে সেতুবল নামে একটা ছোটো বন্দর আছে। ওরই কাছাকাছি তোমাদের নামিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তোমাদের জাহাজ নিয়ে আমরা চলে যাবো। কথাটা বলে গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল।

ফ্রান্সিস আর হ্যারি কোনও কথা বলল না। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিজেদের জাহাজে ফিরে এলো। ডেক-এ এসে দাঁড়াল। মারিয়া এগিয়ে এলো। বলল–ফ্রান্সিস জলদস্যুদের নেতা কী বলল?

হ্যারি বলল–ওরা আমাদের এই জাহাজ থেকে কোথাও নামিয়ে দিয়ে এই জাহাজ নিয়ে চলে যাবে।

–বলল কি? মারিয়া বিস্ময়ে বলে উঠল। সারি দিয়ে দাঁড়ানো ভাইকিংরা মারিয়ার দিকে তাকাল। কিন্তু ঠিক বুঝল নাজলদুস্যদের নেতা কী বলেছে।

এবার হ্যারি ওদের দেশীয় ভাষায় গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, জলদস্যুদের নেতা গ্যাব্রিয়েল আমাদের এখানে এই পোর্তুগাল দেশের একটা অংশে সমুদ্রতীরে কোথাও নামিয়ে দিয়ে আমাদের জাহাজ নিয়ে চলে যাবে।

ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। ওরা বুঝল ওদের অস্ত্রহীন অসহায় অবস্থা। তবু দু একজন বলে উঠল–ফ্রান্সিস, তুমি বলো আমরা এক্ষুণি লড়াইয়ে নামবো। হ্যাঁ নিরস্ত্র অবস্থাতেই। জলদস্যুদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে আমরা লড়াই চালাবো।

ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল–ভাইসব, আমি সবদিক ভেবেছি। আমাদের জাহাজটা আমাদের কতটা প্রিয়, কতটা ভালোবাসার তোমরা জানো। কিন্তু আজ আমরা অসহায় দর্শকমাত্র। কিছু করার নেই। যে দুঃখজনক ঘটনাটা ঘটতে চলেছে সেটা মেনে নাও। এটা আমার অনুরোধ।

সবাই চুপ করে রইল। নিজেদের নিরুপায় অবস্থাটা সকলেই বুঝতে পারল।

দুপুরে রাঁধুনি বন্ধুরা রান্নাবান্না সারল। অবশ্য তিনজন জলদস্যু ওদের পাহারায় ছিল।

জাহাজের ডেক-এই ভাইকিংদের খেতে দেওয়া হল। হ্যারি কিছুই খেতে পারছিল না। একবার ফুঁপিয়ে উঠল। পাশে-বসা ফ্রান্সিস বাঁ হাতটা হ্যারির কাঁধে রাখল। বলল, হ্যারি এসব নিয়ে ভেবো না। পেট পুরে খাও। গায়ের জোর রাখো।

বিকেলের দিকে গ্যাব্রিয়েল ফ্রান্সিসদের জাহাজে এলো। সেই দরাজ হাসি হাসতে লাগল। হ্যারির মনে হল লোকটা বোধহয় হাসতে হাসতে নরহত্যা করতে পারে।

গ্যাব্রিয়েল গলা চড়িয়ে বলল–আজ রাতেই তোমাদের তীরে নামিয়ে দেওয়া হবে। মুক্তি! তাই না? গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল।

হ্যারি বলল–না–রাতের অন্ধকারে আমরা নামবো না। এটা আমাদের কাছে। অচেনা দেশ। কাল সকালে আমরা নামবো। গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল–বলছিলাম রাতে নামলে একটা রাত আগে মুক্তি পেতে। তাছাড়া এখানে দিন কয়েকের মধ্যেই রানি উরাকার সঙ্গে রাজা গঞ্জালেস-এর যুদ্ধশুরু হবে। এসময় দিনের বেলা আমাদের দেখলে রানি উরাকার সৈন্যরা আমাদের গুপ্তচর ভেবে বন্দি করতে পারে।

হ্যারি বলল–না–আমরা কাল সকলেই নামবো।

গ্যাব্রিয়েল হো হো করে হেসে উঠল। বলল–বেশ। তাই হবে। গ্যাব্রিয়েল গলা চড়িয়ে নিজের দলের যোদ্ধাদের বলল–খুব সাবধানে পাহারা দিবি। কেউ যেন পালাতে না পারে। কাউকে জলে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে দিবি না। আর একটা কথা–দুটো জাহাজই থামিয়ে রাখ। কাল সকালে চালাবি। যেখানে থামতে বলবো সেখানে থামাবি।

গ্যাব্রিয়েল চলে গেল নিজেদের জাহাজে।

পরদিন সকালে ফ্রান্সিসরা সকালের খাবার খেল। ওদিকে কয়েকজন জলদস্যু ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ওদের জাহাজের পেছনে কাছি দিয়ে বাঁধল। জলদস্যুরাই দাঁড় বেয়ে জাহাজ দুটো আস্তে আস্তে চালিয়ে নিয়ে চলল তীরভূমির দিকে।

তীরভূমির কাছাকাছি এসে ফ্রান্সিসদের জাহাজটা থামানো হল। কাঠের পাটাতন ফেলা হল। ফ্রান্সিসরা নামাবার জন্য তৈরি হল। ওরা নামছে তখন গ্যাব্রিয়েল নিজেদের জাহাজের ডেক-এ এসে দাঁড়াল। হাসতে হাসতে হাত নাড়তে থাকল। বলে উঠল– বন্ধুগণ–চিরবিদায়।

হ্যারি একটু চমকাল। গ্যাব্রিয়েল চিরবিদায় কথাটা বলল কেন? পরক্ষণেই ভাবল গ্যাব্রিয়েল একটা নরঘাতক জলদস্যু। ওর বিদ্যেবুদ্ধি মতোই কথাটা বলেছে।

মারিয়া অনেকক্ষণ থেকেই রুমালে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। পাটাতন দিয়ে নামার সময় জৈারে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস পেছনেই ছিল। কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিসের নিজের চোখও ভিজে উঠেছে তখন।

ভাইকিংরা সবাই তীরে নামতে লাগল। সবাই নামলে জলদস্যুরা কাঠের পাটাতন তুলে নিল। দুটো জাহাজই তীর থেকে দূরে ভেসে যেতে লাগল।

তীর থেকে উঠে ফ্রান্সিসরা দেখল চারদিকে কোনো জনবসতি নেই। কিছু জংলা গাছের এলাকা ছাড়িয়ে ওরা এলো। দেখল–ছাইরঙা মাটি। ওখানে আসতেই এক ভাইকিং বন্ধু পায়ের পাতায় হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল–ফ্রান্সিস–সাপ।

এতক্ষণ সবাই দেখল সেই সাপের আড্ড। কত বিচিত্র বর্ণের ছোটো বড়ো সাপ এই এবড়ো খেবড়ো ছাইরঙা মাটির ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। সকালের রোদ লেগে সাপগুলোর গায়ের আঁশ চক্ করছে। কিছু সাপ গর্তেও ঢুকে আছে। তখনই আবার আর এক ভাইকিং বন্ধু চিৎকার করে উঠল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। দুই বন্ধুকে কাঁধে নিয়ে ছুটে এলাকাটা পার হয়ে যাও।

ভাইকিংরা দুই বন্ধুকে কাঁধে তুলে নিয়ে এক ছুটে এলাকাটা পার হয়ে গেল। সবাই ততক্ষণে ছুটে ঐ সাপের আড্ড পার হয়ে ঘাসে-ঢাকা প্রান্তরে এসে দাঁড়াল। সবাই হাঁপাচ্ছে তখন।

সাপে কাটা দুই বন্ধুকে কাঁধ থেকে নামিয়ে প্রান্তরের ঘাসে বসিয়ে দেওয়া হল। শাঙ্কো এগিয়ে এলো। কোমর থেকে ছোরাটা বের করল। ঘাসের ওপর বসল। এক বন্ধুর সাপে কাটা পা-টা ধরল। তারপর কামড়ানোর জায়গাটা ছোরা দিয়ে একটু চিরে ধরল। তারপর ঐ জায়গাটায় মুখ দিয়ে চুষতে লাগল। চুষল আর থু থু করে রক্ত ফেলে দিল। বারতিনেক এরকম করে অন্য বন্ধুর কাছে গেল। একইভাবে কাটা জায়গাটা চিরে চুষতে লাগল। থুতু রক্ত ফেলতে লাগল। তারপর চোষা বন্ধ করল। শাঙ্কো ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। হাঁপাতে লাগল।

কিছুক্ষণ পরেদুই বন্ধু সুস্থ হল। বোঝা গেল শাঙ্কোর থুতুর সঙ্গে সাপের বিষ বেরিয়ে গেছে।

ঐ ঘাসের প্রান্তরে ভাইকিংরা বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস–ঐ জলদস্যু গ্যাব্রিয়েল আমাদের রাতে ওখানে নামিয়ে দিতে চেয়েছিল। রাতে ঐ সাপের আস্তানা পার হতে গেলে আমরা কেউ হয়তো বাঁচতাম না। গ্যাব্রিয়েল কেন আমাদের লক্ষ্য করে চিরবিদায়’ কথাটা বলেছিল এখন সেটা বুঝতে পারছি।

বেলা বাড়তে লাগল। দুপুর হল। এবার সবাই বুঝতে পারল খিদে পেয়েছে। খাদ্য চাই। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস কী করবে এখন? সকলেই তো তৃষ্ণার্ত ক্ষুধার্ত।

ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–এখানকার ছোটো বন্দরটা সেতুবল–সেখানে চলো। ঐদিকে লোকজনের বসতি আছে। একটা সরাইখানা হয়তো পাবো।

ভাইকিংরা সবাই উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস পুবমুখো হাঁটতে লাগল। পেছনে ভাইকিং বন্ধুরা।

কিছুদুর যেতেই ভাইকিংরা একটা রাস্তা পেল। সেই রাস্তা ধরেই ওরা চলল। সেতুবল জাহাজঘাটায় যখন পৌঁছাল তখন দুপুর সবাই কম-বেশি ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর।

সেতুবলের বসতি এলাকায় এলো ওরা। ফ্রান্সিস বলল–সবাই না গিয়ে আমি শুধু যাচ্ছি। একটা সরাইখানা পাই কিনা দেখি।

ফ্রান্সিস বন্দরের দিকে চলল। রাস্তার দুদিকেই বাড়িঘর দোর। ফ্রান্সিস সব দেখতে দেখতে চলল। তখনই দেখল একটা সরাইখানার মতো দোকান। ছোটো দোকান। ফ্রান্সিস দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াল। দোকানের মালিক এগিয়ে এলো। বলল–কিছু খাবেন? ফ্রান্সিস বলল–পঁচিশতিরিশজন লোকের জন্যে আপনি রুটি মাংস রান্না করতে পারবেন?

–তা পারবো। তবে একটু সময় লাগবে। দোকানি বলল।

লাগুক। আপনি সব জোগাড় টোগাড় করুন। আমি বন্ধুদের নিয়ে আসতে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস বন্ধুদের কাছে এলো। বলল–চলো সব। একটা সরাইখানা মতো পাওয়া গেছে। আমি রান্নার জোগাড় করতে বলে এসেছি। তোমরা চলো।

সবাই ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে চলল। ঐ সরাইখানায় এলো। দোকানি এসে ফ্রান্সিসকে বলল–যদি কিছু অগ্রিম দেন তাহলে বড়ো ভালো হয়।

ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। সব শুনেশাঙ্কো ওর কোমরের ফেট্টি থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা বের করে দিল। দোকালি স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে খুব খুশি।

ফ্রান্সিস বন্ধু রাঁধুনি দুজনকে বলল–তোমরাও একটু হাত লাগাও। ঐ রোগপটকা চেহারার দোকানি এতজনের রান্না একা পারবে না। রাঁধুনি বন্ধুরা দোকানিকে সাহায্য করতে গেল। রান্নার আয়োজন শুরু হল।

দোকানটা ছোটো। সকলের বসার জায়গা হল না। কিছু দোকানের ভেতরে বসল। কিছু পাশের মাঠমতো জায়গাটায় বসল।

সন্ধের মধ্যেই ফ্রান্সিসদের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেল। সবাই দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস দোকানির কাছে এলো। আর একটা স্বর্ণমুদ্রা দিল। দোকানি আরো খুশি হল। ফ্রান্সিস বলল–এখানে এখন কোন্ রাজা রাজত্ব করছেন?

রাজা নয়–রানি। রাজা আলফনসোর মেয়ে উরাকা এখন রানি। দোকানি বলল।

–জাহাজঘাটা কোনদিকে? হ্যারি জানতে চাইল। দোকানি দক্ষিণদিক দেখিয়ে বলল–ঐদিকে।

ফ্রান্সিসরা দিক ঠিক করে হাঁটতে লাগল। রাস্তার লোকজন ফ্রান্সিসদের দেখে বেশ অবাক হল। ছেঁড়াখোঁড়া ময়লা বিদেশি পোশাক-পরা লোকগুলো কোথা থেকে এলো? ময়লা ছেঁড়া পোশাক-পরা মারিয়াকে দেখেই লোকজন আশ্চর্য হল বেশি।

ফ্রান্সিসরা চলল জাহাজঘাটার দিকে। জাহাজঘাটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই হঠাৎ একদল সৈন্য ফ্রান্সিসদের ঘিরে ফেলল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–কেউ বাধা দিও না। ভাই কিংরা দাঁড়িয়ে পড়ল। তখনই ঘোড়ায় চড়ে একজন বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ এলো। সৈন্যরা মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। বোঝা গেল–অশ্বরোহী সেনাপতি।

রাস্তার লোকজনের মধ্যে তখন হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেছে। সেনাপতি ডান হাত তুলে গলা চড়িয়ে বলল–আপনারা দূরে চলে যান। কোনো ভয় নেই। লোকজনের ভয় এস একটু কমল। আস্তে আস্তে লোকজন চলে যেতে লাগল। কৌতূহলী কিছু লোক থেকে গেল। কী ব্যাপার দেখে যাবে।

বড়ো গোঁফওয়ালা সেনাপতি ঘোড়া থেকে নেমে ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। বলল তোমাদের দলনেতা কে?

–আমি। কথাটা বলে ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো।

–তোমরা কোন্ দেশের লোক? সেনাপতি জিজ্ঞেস করল।

–আমরা জাতিতে ভাইকিং। এখানে বেড়াতে এসেছি। হ্যারি বলল।

–ও। আমরা শুনেছি ভাইকিংরা খুব দুঃসাহসী জাতি। জাহাজ চালাতে ওস্তাদ। সেনাপতি বলল। ফ্রান্সিসরা চুপ করে রইল। কোনো কথা বলল না। সেনাপতি বলল কাল এখানে রানি উরাকা আসবেন। কাল এখানে তির ছোঁড়ার প্রতিযোগিতা হবে।

তোমরা বিদেশি। তোমাদের বিশ্বাস কী? কালকের প্রতিযোগিতা চলাকালীন তোমরা কী গন্ডগোল পাকাবে–কে জানে। তাই তোমাদের বন্দি করা হল। তোমাদের আজ ও কালকের দুই রাত বন্দি হয়ে থাকতে হবে। রানি উরাকা চলে গেলে তোমাদের মুক্তি দেওয়া হবে।

–কিন্তু আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি। হ্যারি বলল।

না-তা করোনি। কিন্তু রানির নিরাপত্তার জন্যেই এই ব্যবস্থা। সেনাপতি বলল।

–দেখুন আমরা কিছুদিন আগে রাজা গঞ্জালেস-এর রাজত্বের রাজধানী দামিল গিয়েছিলাম। জানতে গিয়েছিলাম আমরা কোথায় এসেছি। রাজা গঞ্জালেসের সৈন্যরা আমাদের বন্দি করল। ওরা বলল–তোমরা রানি উরাকার গুপ্তচর। আমরা বিদেশি। গুপ্তচরবৃত্তি করে আমাদের কী লাভ। তাদের সেনাপতিকে সেই কথা বোঝাবার চেষ্টা করেছি। কী রাজা গঞ্জালেস কী সেনাপতি কেউই আমাদের কথা বিশ্বাস করল না। কয়েকদিন কয়েদঘরে কাটাতে হল।

–মুক্তি পেলে কী করে? সেনাপতি জানতে চাইল।

–সে অনেক ব্যাপার। সংক্ষেপে বলি–রাজা গঞ্জালেস-এর পৈতৃক ধনভান্ডার লুকনো ছিল একটা গুহায়। গুহার পাহারাদার ছিল বীভৎস দেখতে এক নররাক্ষস। তাকে হত্যা করে আমরা সেই ধনভান্ডার উদ্ধার করে দিয়েছিলাম। তাই আমরা ছাড়া পেয়েছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। আমরা তোমাদের কয়েদখানায় রাখবো না! তবে দুরাত সৈন্যদের ঘরে থাকতে হবে। সেনাপতি বলল।

ফ্রান্সিস জিজ্ঞাসা করল–কালকে যে প্রতিযোগিতা হবে তাতে কী পুরস্কার দেওয়া হবে?

–সোনার তির-ধনুক। সেনাপতি বলল।

–আমরা কালকের প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে পারবো? ফ্রান্সিস বলল।

–তা পারবে। কিন্তু প্রতিযোগিতার জায়গা থেকে তোমরা তো পালিয়েও যেতে পারো। সেনাপতি বলল।

–এটা একটা কথা হল? আমার স্ত্রী আমার বন্ধুদের ফেলে রেখে পালিয়ে যাবো?

–ঠিক আছে, ঠিক আছে।তির তো গোল চাকতিতেই লাগাতে পারবেনা। মাঝখানে লাগানো তো দূরস্থান। ইচ্ছে হয়েছে ইচ্ছে মেটাও। তোমাদের একজনকে ছেড়ে দেওয়া হবে। সেনাপতি বলল।

–বেশ। ফ্রান্সিস বলল।

সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে বসল। তলোয়ার ঘুরিয়ে ডানদিকে যাওয়ার জন্যে নির্দেশ দিল। সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের চলবার ইঙ্গিত করল। সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের প্রায় ঘিরে নিয়ে চলল। দূর থেকে পাথরের ছোটো দুর্গা দেখা গেল।

সবাই যখন দুর্গদ্বারে পৌঁছাল তখন সন্ধে হয়ে এসেছে। সকলেই দুর্গে ঢুকল। সেনাপতি তলোয়ার তুলে একটা ঘর দেখাল। বলল–ঐ ঘরে এদের বন্দি করে রাখো। সেনাপতি ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।

ঘরটায় ঢুকল ফ্রান্সিসরা। দেখল কয়েকজন লোক ঘরের ঘাসপাতা বাঁধা বিছানায় শুয়ে বসে আছে। বোঝা গেল তারা সৈন্য। ফ্রান্সিসদের সৈন্যবাসেই রাখা হল।

ফ্রান্সিসরা বিছানায় বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল।

এতক্ষণে ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে ভালো করে তাকাল। মাথার চুল উসকোখুসকো। মুখ শুকিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। মারিয়াকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া যাক–এই ভেবে ফ্রান্সিস মারিয়ার কাছে গেল। বসল। বলল–মারিয়া তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?

মারিয়া হাসল। মাথা নাড়ল–না।

–তুমি যদি চাও তাহলে এখান থেকে বেরিয়ে তোমাকে আর হ্যারিকে আমাদের দেশের দিকে যাচ্ছে এমন কোনো জাহাজে তুলে দিতে পারি। আমাদের এত কষ্টের জীবন তুমি সহ্য করতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।

–না–আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকবো। এক সঙ্গে দেশে ফিরবো। আমার জন্যে ভেবো না। তুমি যেখানে যেভাবে থাকবে আমিও সেখানে সেইভাবেই থাকবো। মারিয়া বলল। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। বড়ো ক্লান্তি সারা শরীরে। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে চোখের ওপর হাত ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। উঠল–একবারে যখন খেতে দেওয়া হল।

পরের দিন ভোর থেকেই সাজো সাজো রব। এলাকার মানুষদের মধ্যে খুশির জোয়ার। রানি উরাকা আসছেন। সৈন্যরা যুদ্ধের সাজ পরল। রাস্তার দুপাশে সারি দিয়ে দাঁড়াল। সেনাপতি জবরজং পোশাকটা পরে ঘোড়ায় চড়ে সব দেখাশুনা করতে লাগল। এখন রানি উরাকার জন্যে প্রতীক্ষা।

কিছুক্ষণ পরে রানি উরাকা সাদা ধবধবে একটা ঘোড়ায় চড়ে এলেন। পেছনে পেছনে এলো রাজবাড়ির গাড়ি। তাতে কয়েকজন অমাত্য বসে আছেন।

রানির মাথায় হীরে বসানো সোনার মুকুট। গলায় বড়ো বড়ো মুক্তোর মালা। রোদ লেগে বিকিয়ে উঠছে। রানির সোনা-রুপোর সুতোয় কাজ করা পোশাক। জনতার ভিড়ের মধ্যে ধ্বনি উঠল-রানি উরাকার জয় হোক। রানি খুশি হয়ে হেসে হাত নাড়লেন।

প্রান্তরের একপাশে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। সামিয়ানার নীচে রানির বসবার আসন। আরো কয়েকটা আসন রাখা হয়েছে। অমাত্যরা সেখানে এসে বসলেন। রানি একটু পরে নিজের আসনে বসলেন। একটু বেলা হতেই দুর্গের পাশের প্রান্তরে লোক জড়ো হতে লাগল। এক প্রান্তে একটা কাঠের খুঁটিতে বাঁধা হল একটা গোল শক্ত কাগজের বৃত্ত। একটু পরপর বৃত্তগুলো ছোটো হতে হতে কেন্দ্রে এসে শেষ হয়েছে। তির ঐ গোলগুলির কেন্দ্রবিন্দুতে লাগাতে হবে।

ওদিকে সেনাপতি কথা রাখল। শাঙ্কোকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে অনুমতি দেওয়া হল। শাঙ্কো তির-ধনুক চাইল। পেলও।তখনই শাঙ্কোর চোখে প্রায় জল এলো। নিজেদের জাহাজে গুছিয়ে রাখা তিরধনুকের কথা মনে পড়ল।

প্রতিযোগিতা শুরু হল। একে একে পনেরোজন প্রতিযোগী তির ছুঁড়ল। কোন তিরই কেন্দ্রবিন্দুতে লাগল না। এবার এলো ঐ দেশের সেরা তিরন্দাজ। তার ছোঁড়া তির কেন্দ্রবিন্দুর কাছে লাগল। এবার শাঙ্কোর পালা। শাঙ্কো তির-ধনুক নিল। নিশানা ঠিক করে তির ছুঁড়ল।শাঙ্কোরতিরও কেন্দ্রবিন্দুতে লাগল না। সেরা তিরন্দাজের তিরের কাছে লাগল।

আর এক দফা তির ছোঁড়ার কথা সেনাপতি বলল। পনেরোজন তিরন্দাজী তির ছুঁড়ল। কোনোটাই কেন্দ্রবিন্দুতে লাগল না। এবার সের তিরন্দাজী এগিয়ে এলো। শাঙ্কোর। দিকে একবার তাকাল। তারপর ধনুকের ছিলায় তির বসাল। নিশানা দেখে তির ছুঁড়ল। তিরটি কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে বিধল। সমস্ত প্রান্তর ভরে উঠল দর্শকদের আনন্দধ্বনিতে।

এবার শাঙ্কো এগিয়ে এলো। ধনুক ধরে ছিলায় তির পরাল। হাওয়াটা আন্দাজ করল। তারপর আস্তে আস্তে ছিলাটা টেনে নিয়ে তির ছুঁড়ল। তিরটা আগের সেরা তিরন্দাজীর কেন্দ্রবিন্দুতে গেঁথে যাওয়াতিরটা দুফালি করে কেন্দ্রবিন্দুতে ঢুকে পড়ল। প্রথমে দর্শকরা বুঝল না। শাঙ্কো এগিয়ে গিয়ে প্রথমে ওরতিরটা খুলল। তারপর দোফালা হওয়া সেরা তিরন্দাজীর তিরটি তুলল। এবার সবাই বুঝল যে শাঙ্কোর তির সেরা তিরন্দাজীর তির ফালা করে কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছে। দর্শক জনতা আন্দধ্বনি করল।

এবার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। রানির সোনার তির-ধনুক হাতে নিলেন। শাঙ্কো গিয়ে রানির সামনে দাঁড়াল। রানি শাঙ্কোকে সোনার তির-ধনুক দিলেন। শাঙ্কো মাথা পেতে নিল।তারপর মৃদুস্বরে বলল–মাননীয় রানি–আপনার কাছে আমার একটা আর্জি ছিল।

রানি মৃদুস্বরে বললেন–পরে তোমার কথা শুনবো। অন্য পুরস্কার দেওয়া চলল। ঐ অনুষ্ঠানটা শেষ হলে রানি সেনাপতিকে ডেকে পাঠালেন। সেনাপতি এসে বললেন– যে যুবকটি তির চালনায় প্রথম হয়েছে তাকে ডেকে আনুন। সেনাপতি এগিয়ে গেল। লোকজনের ভিড় তখন অনেক কমে গেছে। শাঙ্কো চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। সেনাপতি কাছে এসে বলল–তুমি এসো। রানি ডাকছেন।

শাঙ্কো আস্তে আস্তে রানির সামনে এসে দাঁড়াল। রানি বললেন–তুমি কী কথা বলতে চেয়েছিলে?

শাঙ্কো বলল–মাননীয়া রানি–আমরা জাতিতে ভাইকিং। জাহাজে চড়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই আর গুপ্তধন খুঁজে বের করি। আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটাতে পারি এই আশঙ্কায় সেনাপতি মহাশয় আমাদের দুর্গে বন্দি করে রেখেছেন।

–কথাটা সত্যি? রানি সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বললেন। সেনাপতি বলল–

-হ্যাঁ মাননীয়া রানি–তবে হাত পা বেঁধে রাখিনি। ওদের বলেছি আপনি রাজধানীতে ফিরে গেলেই ওদের মুক্তি দেব। সেনাপতি বলল।

মাননীয়া রানি–আমরা এখনই মুক্তি চাই। শাঙ্কো বলল।

রানি বললেন–তোমার মতো একজন দুর্ধর্ষ তিরন্দাজের অনুরোধ আমি কি রক্ষা না করে পারি। রানি সেনাপতির দিকে তাকালেন। বললেন–ভাইকিংদের মুক্তি দিন। ওরা যেমন খুশি চলাফেরা করুক।

সেনাপতি মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চলে এলো। ঘোড়ায় চড়ল। দুর্গের দিকে। ঘোড়া ছোটোল।

দুর্গে এসে সেনাপতি ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢুকল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–মাননীয়া রানি তোমাদের মুক্তি দিয়েছেন। এখন তোমরা যেখানে খুশি যেতে পারো।

ফ্রান্সিস বলল–তিরন্দাজী প্রতিযোগিতায় কে প্রথম হল?

–তোমাদের যে বন্ধুটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল—ও হো হো।

সেনাপতি মৃদু হাসল। তারপর ঘরের বাইরে এসে ঘোড়ায় উঠল।

শাঙ্কো এলো। সবাই শাঙ্কোকে ঘিরে দাঁড়াল। আনন্দে ওরা হৈ হল্লা শুরু করল। শাঙ্কো সোনার তির-ধুনকটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে লাগল–এটা মনে হচ্ছে খাঁটি সোনার। এটা পাবে বলেই আমি শাঙ্কোকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পাঠিয়েছিলাম। এই তির-ধনুক বিক্রি করে জাহাজ কিনবো। তারপর ঐ জাহাজে চড়ে দেশে ফেরা।

ফ্রান্সিসরা যখন সেতুবল বন্দরে এলো তখন সন্ধে হয়ে গেছে। বন্দর এলাকায় একটা বড় সরাইখানা পেল। ফ্রান্সিস সরাইখানাটায় ঢুকল। মালিক একটা কাঠের আসনে বসেছিল। মালিক মাঝবয়সী। ঢোলাহাতা জোব্বামতো পরে আছে। ফ্রান্সিস মালিকের কাছে গেল। বলল–আমরা ভাইকিং। দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানো আমাদের ত্ব নেশা। আপনার সরাইখানায় আমরা আজ রাতে খাবো থাকবো।

–বেশ। মালিক বলল।

–ক’টা স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে? ফ্রান্সিস বলল।

–দুটো স্বর্ণমুদ্রা দেবেন। মালিক বলল।

ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। বলল–দুটো স্বর্ণমুদ্রা মালিককে দাও।শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে দুটো স্বর্ণমুদ্রা বের করে মালিককে দিল। তারপর সবাইকে সরাইখানায় আসতে বলল। কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু এসে কাঠের তক্তাপাতা বিছানায় বসল। কিছু ভাইকিং সরাইখানার ধারে একটু মাঠমতো জায়গায় গিয়ে বসল।

ফ্রান্সিস সরাইখানার মালিকের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগল।তখনই মালিক বলল বোঝাই যাচ্ছে আপনারা বিদেশি। আপনারা এখানে এলেন কী করে?

–জাহাজে চড়ে। ফ্রান্সিস বলল।

জাহাজটা কি বন্দরে রেখে এসেছেন? মালিক বলল।

-না–আমাদের জাহাজ চুরি হয়ে গেছে। একদল জলদস্যু এই কান্ড করেছে। ফ্রান্সিস বলল।

জলদস্যুদের নেতার নাম জানেন? মালিক বলল।

–হ্যাঁ–গ্যাব্রিয়েল। ফ্রান্সিস বলল।

–উরি বাবা–গ্যাব্রিয়েল তো সাংঘাতিক জলদস্যু। ও হাসতে হাসতে মানুষ খুন করতে পারে। আপনাদের খুব ভাগ্যি যে আপনারা প্রাণে বেঁচে আছেন। মালিক বলল।

হু। আমরা ওদের খুঁজে বের করবো। আমাদের জাহাজ উদ্ধার করবো। তাই একটা জাহাজ কিনবো স্থির করেছি। ফ্রান্সিস বলল।

–আপনারা তো আলফানের জাহাজ কিনতে পারেন। মালিক বলল।

আলফান কে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–আলফান একজন মূর ব্যবসায়ী। ওর বাড়ি এখানেই। ব্যবসা চালাতে জাহাজ নিয়ে এদেশ-ওদেশ ঘুরে বেড়ায়। ইদানিং আলফানের খুব অর্থকষ্ট যাচ্ছে। তাই জাহাজ বিক্রি করছে।

তাহলে তো আলফানের সঙ্গে কথা বলতে হয়। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস সরাইখানার বাইরে এলো।

এখন অন্ধকার হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকল–হ্যারি এদিকে এসো। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল

–কী ব্যাপার?

–শোনো–সোনার ধনুক-তিরটা তোমার কাছেই আছে তো?

হা। হ্যারি বলল।

–চলো জাহাজঘাটায় যাবো। ফ্রান্সিস বলল। –

-কেন বলল তো? হ্যারি বলল।

–সরাইখানার মালিক বলল–আলফান নামে একমুর ব্যবসায়ীতার একটি জাহাজ বু বিক্রি করবে। দেখা যাক জাহাজটা কেমন। কত দাম বলে। ফ্রান্সিস বলল।

–চলো। হ্যারি বলল।

জাহাজঘাটায় পৌঁছে দেখল বেশ কয়েকটা জাহাজ নোঙর করে আছে। জ্যোত্সা খুব উজ্জ্বল। সমুদ্রতীরের ঢাল বেয়ে নামল দুজনে।

পাতা পাটাতন দিয়ে প্রথম জাহাজটায় উঠল ওরা। একজন নাবিক রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল–আরফানের জাহাজ কোষ্টা? নাবিকটি আঙ্গুল দিয়ে দেখালো শেষ জাহাজটা।

ফ্রান্সিসরা শেষ জাহাজটায় উঠল। দেখল একজন বয়স্কলোক জাহাজের ডেক পার হয়ে এগিয়ে এলো। কাছে আসতে জ্যোৎস্নায় দেখা গেল তার মাথার চুল কোঁকড়ানো। থুতুনিতে দাড়ি। বেশ বলিষ্ঠ দেহ। বলল আপনারা কী চান?

আপনার নাম কি আলফান? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

আলফান মাথা ওঠানামা করল। ফ্রান্সিস বলল–একটু দুরে এক সরাইখানা-ওয়ালা আমাদের বলল যে আপনি নাকি একটা জাহাজ বিক্রি করবেন।

–হ্যাঁ–আলফান বলল।

–শুনুন–হ্যারি বলল–আমাদের জাহাজ চুরি হয়ে গেছে আর এই বিদেশে বিভূঁইয়ে বেশ কয়েকদিন কাটছে আমাদের।

বুঝতে পারছি আপনারা বিদেশি। আলফান বলল।

হ্যাঁ–হ্যারি বলল।

–আসুন–জাহাজটা দেখুন। আলফান বলল।

আলফান পাটাতন দিয়ে নেমে এলো। পেছনে ফ্রান্সিস আর হ্যারি। ফ্রান্সিসদের কানে এলো মারিয়ার ডাক ফ্রান্সিস–আমরাও এসেছি। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল মারিয়া আর শাঙ্কে আসছে। কাছে এসে মারিয়া হেসে বলল–তোমরা জাহাজঘাটায় এসেছো শুনে আমরাও এলাম। শাঙ্কে বলল–কী ব্যাপার ফ্রান্সিস?

–একটা জাহাজ কিনবো। সেটা দেখতে যাচ্ছি। চলো।

পাটাতন পাতা দিয়ে আলফান পাশের ছোটো জাহাজটার ডেক-এ উঠে এলো। ফ্রান্সিসরাও উঠল।

কেবিনে নামবার সিঁড়ির কাছে একটা কাঁচটকা আলো জ্বলছিল। আলফান আলোটা তুলে নিল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলো। ফ্রান্সিসরাও নামল। দুটো বেশি বড়ো কেবিনঘর। আলফান বলল–ডানদিকের ঘরটায় বাবা থাকতেন। বাঁদিকের ঘরটা ছিল শোবার আর সাজগোজ করার ঘর। বাবা বেশ শৌখিন ছিলেন। দেশ বিদেশের সুগন্ধি এঘরে রাখতেন। আমি সে-সব এখন আমার ঘরে রেখেছি। শুধু রয়ে গেছে আয়নাটা। আলফান সেই ঘরটায় ঢুকল। ফ্রান্সিসরাও ঢুকল। কাঠের দেওয়ালে টানা পাটাতন। সেই পাটাতনে আটকানো একটা বেশ বড়ো ডিম্বাকৃতির আয়না। আয়নাটার মাঝ বরাবর ফাটা।

–আপনার বাবা তো এই আয়না ব্যবহার করতেন? ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। দিনরাতের মধ্যে কতবার যে মাথার চুল আঁচড়াতেন। আলফান বলল। কাঁচঢাকা আলোয় সব দেখতে দেখতে হ্যারি বলল।

আপনি বোধহয় এই ছোটো জাহাজটা বেশি ব্যবহার করেন না।

–না। তবে মাঝে মাঝে রাতে থাকতে আসি। আলফান বলল।

এবার ফ্রান্সিসরা কাঠের তক্তাপাতা বিছানা রান্নাঘর আর একটা ছোটো কেবিনঘর সব দেখল। বোঝাই যাচ্ছে খুব শৌখিন ছিল এই ছোটো জাহাজটা।

সবাই ওপরের ডেক-এ উঠে এলো। মারিয়া ফ্রান্সিসকে ফিসফিস্ করে বলল– খুব সুন্দর জাহাজটা। এটা কেন।

ফ্রান্সিস হাসল। মৃদুস্বরে বলল–আগে দরদস্তুর হোক।

আলফান কাঁচঢাকা আলোটা টাঙিয়ে রাখল। হ্যারি বলল

–দেখুন আপনার এই জাহাজটা অপছন্দের কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমাদের আর্থিক ক্ষমতা বেশি নেই। আমরা বহুদিন দেশছাড়া। কাজেই জাহাজের উপযুক্ত মূল্য হিসেবে এই সোনার তির-ধনুক দিতে পারি। স্বর্ণমুদ্রা আমাদের কাছে বেশি নেই। কথাটা বলে হ্যারি কাপড়ে প্যাচানো সোনার তির-ধনুটা বের করে আলফানকে দিল।

আলফানতির ধনুকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল।বলল কতটা আসল সোনা আছে এটাতে?

তা কী করে বলবো। তাহলে কোনও স্বর্ণকারাকে দেখাতে হয়। হ্যারি বলল।

আলফান বলল–আমি বলি কি এটা আমার কাছে থাক। আপনারা কালকে আসুন। আমি এর মধ্যে আমার জানাশুনো এক স্বর্ণকারকে দেখিয়ে নেব।

–না। আমার এটা হাতছাড়া করবো না। ফ্রান্সিস বলল।

–তাহলে আমাকে বিশ্বাস করছেন না। আলফান বলল।

-ফ্রান্সিস বলল-দেখুন আমি কাউকেই অবিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু বিশ্বাস করে ঠকেছি। তবু আমি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাই নি। একটু থেমে বলল–আপনি তিরধনুক রাখলেন। কালকে এসে যখন চাইব তখন তো আপনি তিরধনুকের কথা অস্বীকার করতে পারেন। আমরা বিদেশি। আমাদের কথা কে বিশ্বাস করবে? আপনি এই অঞ্চলের ধনী ব্যবসায়ী। আপনার ক্ষমতা প্রতিপত্তি অনেক বেশি। এই সোনার তিরধনুক আপনার কাছে কিছুই না। কিন্তু আমাদের বাঁচা-মরা নির্ভর করছে এই মূল্যের ওপর। হ্যারি বলল–একটা কথা বলছি। আলফান–আপনি তো এই অঞ্চলের মানুষ। ব্যবসায়ী। নিশ্চয়ই আপনার পরিচিত কোন স্বর্ণকার এখানে আছে।

–তা আছে। আলফান বলল।

–তাহলে–এখন তো রাত বেশি হয়নি। চলুন না তার দোকানে। হ্যারি বলল। আলফান একটু ভাবল। পরে বলল–যাবেন–চলুন।

সবাই সমুদ্রতীর থেকে রাস্তায় উঠে এলো। একটা বাজার এলাকায় এলো। দোকানে দোকানে কাঁচকা বাতি জ্বলছে। লোকজনের তেমন ভিড় নেই। সবাই চলল।

বেশ কিছুটা এসে আলফান একটা দোকানে ঢুকল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। দোকানে বসার জায়গা কম। মারিয়া আর হ্যারিকে বসিয়ে ফ্রান্সিস শাঙ্কো দাঁড়িয়ে রইল।

দেখেই বোঝা যাচ্ছে স্বর্ণকারের দোকান। কাঠের অলমারিতে বেশকিছু গয়নাগাঁটি রাখা। কর্মচারীরা সোনার কাজ করছে প্রদীপ জ্বেলে।

মালিক একটা উঁচু জায়গায় বসেছিল।

আলফানকে দেখে দোকানের মালিক উঠে দাঁড়াল। হেসে বলল– আসুন আসুন। আপনি এলেন। খবর পাঠালে আমিই যেতাম। আলফান হ্যারির হাত থেকে সোনার তিরধনুকটা নিল। মালিকের হাতে দিয়ে বলল, দেখুন তো এটা আসল সোনার কিনা। মালিক হাত বাড়িয়ে নিল। হাত বাড়িয়ে একটা কালো পাথর বের করল। পাথরটা কষ্টিপাথর। প্রথমে তির পরে ধনুকটা কষ্টিপাথরে ঘষল। পাথরের গায়ে সোনালি দাগ দেখল। মাথা তুলে বলল–খাদ আছে তবে আসল সোনাই বেশি।

আলফান বলল–ধরুন এ দুটো গালিয়ে সোনার চাকতি করা হল। কটা চাকতি হবে? একটুক্ষণ ভাবল মালিক। তারপর বলল–সাত আটটা চাকতি হবে।

–ঠিক আছে। এই দুটো রেখে দাও। আমাকে চাকতি গড়ে দেবে। আরফান বলল।

ফেরার পথে আলফান বলল–আপনারা কালকেই জাহাজটা নিতে পারেন। দাম তো আমি পেয়ে গেলাম।

ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় ফিরে এলো। সব ভাইকিংরা ফ্রান্সিসদের ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিস সব ঘটনা বলল। ভাইকিংরা আনন্দে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।

মারিয়া হেসে বলল–কী সুন্দর জাহাজটা।

এবার দেশের দিকে–তাই না! ফ্রান্সিস হেসে বলল।

-বাঃ এটা কি আমি একা চাইছি? তোমার কি দেশে ফেরার ইচ্ছে নেই? মারিয়া বলল।

–আছে বৈদিক। কিন্তু ওখানে নিশ্চিন্ত অলস জীবনে যাওয়ার ইচ্ছে আমার একেবারেই নেই। ফ্রান্সিস বলল।

পরদিন সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস চললু, জাহাজঘাটার দিকে। সকলেই আনন্দে অধীর। যা-তোক একটা জাহাজ পাওয়া গেছে। এবার দেশে ফেরা।

আলফান ওর বড়ো জাহাজটার ডেক-এ দাঁড়িয়েছিল।

ফ্রান্সিস আনফানের কাছে গেল। আলফান বলল–এবার জাহাজটা বুঝে নিন। আপনারা। তবে জাহাজটার ডেক দেওয়াল কেবিনঘর সবকিছুই পরিষ্কার করতে হবে। তার জন্যে লোক লাগালে আমি দেব।

দরকার পড়বে না। আমরাই সাফটাফ করবো। তবে সাফটাফ করতে গেলে যেসব জিনিস লাগে সেসব আমাদের দেবেন, তা হলেই হবে। হ্যারি বলল।

আলফান সেসব নিজের জাহাজ থেকে এনে দিল। ভাইকিং বন্ধুরা আঁটা বুরুশ বালতি নিয়ে জাহাজটা পরিষ্কার করতে লেগে পড়ল। মারিয়ার নির্দেশেই কাজ হতে লাগল।

শাঙ্কো আর বিস্কো বন্দরের বাজারে গেল। আটা ময়দা চিনি এমনি সব খাওয়ার জিনিস বেশি করে কিনে নিয়ে এলো।

ফ্লেজার আর পেড্রো সঙ্গে আর কয়েকজনেক নিয়ে গেল বন্দরে। দুটো পিপে ভর্তি ফি করে খাবার জল নিয়ে এলো।

বিকেলের মধ্যেই জাহাজটার চেহারা ফিরে গেল।

পেড্রো জাহাজের কোণাখামচি থেকে তিনটে কাঁচটাকা আলো বের করল। তেল ভরে রাখল।

এ সময়ে আলফান ফ্রান্সিসদের জাহাজে এলো। চারদিক দেখেটেখে বলল–বাঃ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেছেন।

আলফান ওর খাবার সাজঘরে এলো। সঙ্গে ফ্রান্সিস। আলফান চারদিক তাকিয়ে নিয়ে বলল–এ ঘরটাও বেশ পরিষ্কার করেছেন। বাবার সাজঘর ছিল এটা। ফ্রান্সিস বলল

–একটা ব্যপার লক্ষ্য করলাম।

–কী ব্যাপার? আলফান বলল।

–আপনি এই ঘরটা এইভাবে রেখে দিয়েছেন।

-হ্যাঁ। শুধু সুগন্ধি তেল, সেন্ট, আতর এসব আমার কাছে রেখেছি। আলফান বলল।

–এই ঘরটা কি তাহলে আপনার বাবার আমলে যেমন ছিল তেমনি আছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

– হ্যাঁ। আলফান বলল।

–কেন বলুন তো? ফ্রান্সিস বলল।

একটু চুপ করে থেকে আলফান বলল বাবার সৃষ্টিটা আমি বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছি।

–আপনি আপনার বাবাকে খুব ভালোবাসতেন। ফ্রান্সিস বলল।

-হ্যাঁ। বাবার স্মৃতিবিজড়িত এই ঘরটায় মাঝে মাঝে আসি। বসি। বাবার কথা ভাবি। আলফান বলল।

ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। আয়নাটার কাছে গেল। আয়নাটা দেখল। বলল– আলফান, এই আয়নাটা যেভাবে লাগানো হয়েছে তাতে শুধু লম্বা চেহারার মানুষই এই আয়নায় মুখ দেখতে পারবে।

আলফান হেসে বলল–না, এই আয়নাটা নামনো ওঠানো যায়। আলফান এসে আয়নাটা ধরল। তারপর আস্তে আস্তে আয়নাটা অর্ধেকটা নামাল আবার অর্ধেকটা ওঠাল। আবার অর্ধেকটা সম্পূর্ন ঘোরাল না। বলল–এইবার আপনার মুখ দেখতে পারবেন। ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। দেখল ওর মুখ দেখা যাচ্ছে। ফাটা আয়না সত্ত্বেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সবকিছু। সন্দেহ নেই দামি কাঁচের আয়না।

–এই আয়নাটা কি আপনার বাবার আমলে যেমন ছিল তেমনই আছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–হ্যাঁ–একইভাবে আছে। আলফান বলল।

–এই ঘরের সবকিছুই তো এখান থেকে সরিয়েছেন। এই আয়নাটা সরাননি কেন? ফ্রান্সিস বলল।

–অন্তত একটা বাবার স্মৃতিচিহ্ন থাক এখানে। এজন্যে। আলফান বলল।

যাবার সময় আলফান বলল–আপনারা কবে জাহাজ ছাড়বেন।

কাল সকালেই। ফ্রান্সিস বলল।

জাহাজটার অনেককিছুই কিন্তু মেরামত করতে হবে। আলফান বলল।

–সেসব আমরা লিসবন বন্দরে করাবো। ফ্রান্সিস বলল।

সেদিন রাতে এই ছোটো জাহাজে শুতে অনেকেরই অসুবিধা হয়েছিল। কিন্তু কোনও ভাইকিং বন্ধু এই নিয়ে ফ্রান্সিসকে একটা কথাও বলল না। সব অসুবিধে মেনে নিল।

পরদিন সকালের খাবার খাওয়া হলে জাহাজ নোঙর তুলে ছাড়া হল। বেগবান বাতাস। পালগুলো ফুলে উঠল।

জাহাজ দ্রুতগতিতে চলল।

ফ্রান্সিস সেই সাজঘরটায় এলো। ওর কেমন মনে হল আলফান যে ঘরটা একই রকম রেখেছে তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। শুধু বাবার স্মৃতি নয়—

আলফান কিছু ভেঙে বলেনি। হ্যারি ঘরটায় ঢুকল। বলল–কী দেখেছো?

ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি–এই ঘরটায় নিম্মই গোপনীয় কিছু আছে।

–তোমার এরকম কথা মনে হল কেন? হ্যারি বলল।

–আলফান যে এই ঘরটার কিছুই পালটায় নি তার পেছনে কোনও একটা কারন আছে। ফ্রান্সিস বলল।

–সেটা কী? হ্যারি জানতে চাইল।

তা তো বুঝতে পারছি না। এই ঘরটা আলফান ওর বাবার আমলের মতোই রেখেছে। কারন এতে ওর পক্ষে সব খোঁজা সুবিধে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

-কী খুঁজবে? হ্যারি বলল।

–নিশ্চয়ই গোপনে রাখা এমন কিছু। ফ্রান্সিস বলল।

–তাহলে তো আলফান বহুদিন খুঁজেছে। কিছুই পায়নি। হ্যারি বলল।

–না পায়নি। তাই হতাশ হয়ে জাহাজটা বিক্রি করল। ফ্রান্সিস বলল।

হতে পারে। হ্যারি বলল।

–হ্যারি–চলো সবকিছু ভালো করে দেখি। ফ্রান্সিস বলল।

দুজনে ঘরটায় বোনাটোনা সব দেখল। লুকিয়ে রাখা কিছুই খুঁজে পেল না।

ফ্রান্সিস আয়নাটার সামনে এলো। আয়নাটা ঘুরিয়ে নিজের মুখ দেখল। আরও ঘোরাল। কাঠের দেওয়াল। কাঠের ছাত দেখল। আবার দেওয়াল। দেওয়ালের পরে মেঝে। ফ্রান্সিস আয়না ঘোরানো বন্ধ করে বলল–হ্যারি এই আয়নাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তখনকার মতো দুজনে চলে এলো।

একদিন কাটল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ ঢেউ ভেঙে চলেছে।

আকাশ নির্মেঘ। চারদিকে ঝলমল রোদ। পালে জোর হাওয়া। ভাইকিংদের দাঁড় টানতে হচ্ছে না। ডেক-এর এখানে-ওখানে ওরা শুয়ে বসে আছে। গল্প গুজব করেছে।

সেদিন দুপুরে ফ্রান্সিস সেই সাজঘরে এলো। এই কেবিনঘরে নিশ্চয়ই রহস্যময় কিছু আছে। আলফান সেটা বলেনি। ফ্রান্সিসের কেমন একটা বিশ্বাস এটা।

ফ্রান্সিস আয়নাটার কাছে এলো। আয়নাটা আস্তে আস্তে ঘোরাতে লাগল। সেই কাঠের ছাত, দেওয়াল মেঝে আয়নায় দেখা যাচ্ছে। দুচারবার ঘুরিয়ে থামতেই হঠাৎ ফ্রান্সিসের নজরে পড়ল আয়নায় দেখা যাচ্ছে ছাত আর দেওয়ালের জোড়ের কাছে একটা লম্বাটে কাঠের ছোটো তক্তামতো। ফ্রান্সিস আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই তক্তার গায়ে খুঁড়ে খুঁড়ে কিছু লেখা। ফ্রান্সিস পেছন ফিরল। সেই কাঠের তক্তার গায়ে কি লেখা? ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। লেখাটা কী বুঝতে পারল না। ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডাকতে গেল। হ্যারিকে নিয়ে এলো। ঐ লেখাটা দেখাল। হ্যারিও অবাক।

হ্যারি বলল–কাছে উঠে গেলে বোঝা যাবে কী লেখা।

ফ্রান্সিস ছুটল শাঙ্কো আর বিস্কোকে ডাকতে।

শাঙ্কো বিস্কো এলো। অন্য ভাইকিং বন্ধুরাও ঘরের দরজার কাছে ভিড় করল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল

খুঁজেপেতে দ্যাখো একটা মইটই পাও কি না। না পেলে জাহাজে যে কাঠ রাখা আছে তাই দিয়ে একটা মই বানাও।

শাঙ্কো আর বিস্কো চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ছোটো মই তৈরি করে আনল। মই পাতা হল। মই দিয়ে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে লেখাটার সামনে গেল। কোন্ ভাষায় লেখা কিছুই বুঝল না। ও নেমে এলো। হ্যারিকে উঠতে বলল। হ্যারি মই বেয়ে লেখাটার কাছে এলো। লেখাটা দেখতে দেখতে বলল–পোর্তুগীজ ভাষায় কিছু লেখা। তবে উল্টে করে লেখা। আয়নায় দ্যাখো, সোজা পড়া যাবে। বলো, আমি এখানে মিলিয়ে দিচ্ছি।

ফ্রান্সিস আয়নায় লেখাটা পড়ে পড়ে বলল–আয়না তোমার ভাগ্য গড়ে দেবে।

হ্যারি বলল–ঠিক এটাই লেখা আছে ঐ লম্বাটে কাঠের তক্তায়।

ফ্রান্সিস চোখ বুজল। ভাবল। চোখ খুলে বলে উঠল–এই তক্তাটা খুলতে হবে। খুলতে পারলে পাওয়া যাবে আলফানের বাবার ধনসম্পদ। হ্যারি ততক্ষণে নেমে এসেছ। ফ্রান্সিস মই বেয়ে উঠল। হাত বাড়িয়ে বলল–একটা পেরেক তোলা হাতুড়ি দাও। শাঙ্কো ছুটল। খুঁজে খুঁজে কাঠ রাখার ঘরে হাতুড়ি পেল। এনে ফ্রান্সিসকে দিল।

ফ্রান্সিস তক্তার গায়ে পোঁতা পেরেক খুলতে লাগল। একপাশের দুটো পেরেক খুলতেই তক্তাটা আলগা হল। সঙ্গে সঙ্গে ঝরঝর করে সোনার চাকতি পড়তে লাগল কাঠের মেঝের ওপর। টুং টাং শব্দ হত লাগল। ফ্রান্সিস বাকি দুটো পেরেকও খুলে ফেলল। সব সোনার চাকতি পড়ে গেল।

ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি তুললো– ও-হো-হো৷

ফ্রান্সিস নেমে এলো। বলল–একটা দড়ির বস্তা আনতে। আনা হল বস্তা। সব সোনার চাকতি ঐ বস্তাটায় রাখা হল। ভাইকিংরা আনন্দে হৈ হৈ শুরু করেছে তখন।

ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–এই সোনার দাবিদার আলফান। কিন্তু সে এখানে নেই। জাহাজ ঘুরিয়ে ফিরে গিয়ে আলফানকে ওর পৈতৃক সম্পদ দেব তাও সম্ভব নয়। কাজেই এই সোনার মালিক এখন আমরা। লিসবনে পৌঁছে দুটো কাজ করতে হবে এই সোনা দিয়ে। একটা ভালো জাহাজ কিনবো। তারপর লিসবন বন্দর শহরে নিজেদের পোশাক কিনবো। গ্যাব্রিয়েল ঠিকই বলেছিল–আমরা যেন ভিখিরি হয়ে গেছি। ফ্রান্সিস বলল।

দিন চারেক পরে ফ্রান্সিসরা পোর্তুগালের রাজধানী বন্দর শহরলিসবনে এসে পৌঁছাল।

সবে ভোর হয়েছে তখন। বেশ কুয়াশায় ঢাকা লিসবন শহর। বন্দরে কত জাহাজ। জাহাজগুলোর মাথায় কত দেশের পতাকা উড়েছে। কিন্তু জাহাজ জাহাজঘাটায় রয়েছে। আর কিছু জাহাজ বন্দরে থেকে একটু দূরে দূরে নোঙর ফেলে ভাসছিল।

হ্যারি ডেক-এ দাঁড়িয়ে দেখছিল। হঠাৎ কিছুদূরে দুটো জাহাজকে দেখল। একটা জাহাজ দেখতে ঠিক ওদের জাহাজের মতো। কতদিন যে ওদের ঐ জাহাজে কেটেছে। কুয়াশায় ঢেকে গেল জাহাজ দুটো। হ্যারি দ্রুত পায়ে ছুটে গেল জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে। বলল

–ফ্লেজার-জাহাজ থামাও। এক্ষুণি।

ফ্লেজার জাহাজ থামল। হ্যারি ছুটল ফ্রান্সিসকে ডাকতে। ফ্রান্সিসের সঙ্গে মারিয়াও ডেক-এ উঠে এলো।

হ্যারি হাত পঞ্চশেক দূরে জাহাজ দেখল। তখনই কুয়াশা কেটে গেল। স্পষ্ট দেখা গেল জাহাজ দুটো। নিজেদের জাহাজটা দেখেই ফ্রান্সিস চিনল। আনন্দে চিৎকার করে উঠতে গিয়ে থেমে গেল।

ততক্ষণে ওদের জাহাজটা যে দেখা সেটা সবভাইকিং বন্ধুরা জানাল।সবাই জাহাজের ডেক-এ এসে দাঁড়াল।

ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–ভাইসব–সামনের জাহাজটা গ্যাব্রিয়েলের। পেছনে বাঁধা জাহাজটা আমাদের। আমার দৃঢ় বিশ্বাস গ্যাব্রিয়েল আমাদের জাহাজ বিক্রি করতেই এখানে এসেছে। এখনও খদ্দের পায়নি। অপেক্ষা করেছে। কিন্তু আমরা অপেক্ষা করবো না। আজ রাতেই আমাদের অভিযান।

সেদিন রাতে ভাইকিংরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। রাত একটু গম্ভীর হতে সবাই ডেক-এ এসে দাঁড়াল। ভাইকিংরা নিরস্ত্র। জলদস্যুরা সশস্ত্র। একটা অসম লড়াই।

ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–আমরা ঐ জলদস্যুদের সঙ্গে খালি হাতে লড়াই করতে পারবো না।ওরা নরপশু।ওদের মনে দয়ামায়া বলে কিছু নেই। কাজেই আমরা মুখোমুখি লড়াইয়ে যাবো না। আমরা আমাদের জাহাজের পেছন দিয়ে উঠবো। পাহারাদার জলদস্যুদের বুদ্ধিবলে হারিয়ে জাহাজ উদ্ধার করবো। জাহাজ চালিয়ে পালাবো। ফ্রান্সিস থামলো।

ফ্লেজার বলল–আমি এই জাহাজটা আমাদের জাহাজের ঠিক পেছনে গিয়ে থামাবো। হালের খাঁজে পা রেখে শাঙ্কো জাহাজে উঠবে। দড়ির মই ফেলে দেবে আমরা সবাই উঠবো। তারপর লড়াই পাহারাদার জলদস্যুদের সঙ্গে।

ফ্লেজার জাহাজের হুইল ধরল। আস্তে আস্তে জাহাজ পেছোতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোটো জাহাজটা ফ্লেজার ওদের জাহাজের ঠিক পেছনে আনল।

শাঙ্কো ওদের জাহাজের ঝুলন্ত দড়িদড়া ধরে হালের খাঁজে পা রেখে রেখে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। ডেক-এ উঠে এলো। সিঁড়ি ঘরের আড়ালে দাঁড়াল। তার আগে দড়ির মইটা নামিয়ে দিল। মই বেয়ে ফ্রান্সিস হ্যারি উঠে এলো। ডেক এ গড়িয়ে গিয়ে ওরা সিঁড়িঘরের পেছনে চলে এলো। উঠে দাঁড়াল। সিঁড়িঘরের আড়াল থেকে ডেক এর দিকে মাস্তুলের দিকে তাকাল। কুয়াশায় অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখল চারজন জলদস্যু খোলা তলোয়ার হাতে ডেক-এ ঘোরাঘুরি করছে।

ওদিকে ফ্রান্সিসের দেখাদেখি চার-পাঁচজন ভাইকিং বন্ধু ডেক-এর পাটাতনে গড়িয়ে গিয়ে ফ্রান্সিসের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

ফ্রান্সিস আস্তে ডাকল–শাঙ্কো।শাঙ্কো এগিয়ে গেলো।ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল– ডেক-এর শেষের দিকে যে দুটো জলদস্যু খোলা তলোয়ার হাতে বসে আছে তার মধ্যে বাঁ দিকেরটা তোমার ডানদিকেরটা আমার। ফ্রান্সিস থামল। তারপর আস্তে বিস্কোকে ডাকল। বলল–যে দুটো জলদস্যু খোলা তলোয়ার। কানে বাতাসের শনশন্ শব্দ। ঢেউ ভেঙে পড়ার শব্দ।

ফ্রান্সিস চাপাম্বরে ডাকল–শাঙ্কো। তারপর ছুটে ডেক পার হয়ে গিয়ে ডানদিকের জলদস্যুটার ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। এই হঠাৎ আক্রমণে জলদস্যুটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। ও পেছনে উল্টে পড়ল। হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। ফ্রান্সিস তলোয়ারটা দ্রুত হাতে তুলে নিয়ে জলদস্যুটার বুকে ঢুকিয়ে দিল। ওদিকে শাঙ্কোও অন্য জলদস্যুটার বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে।

এবার অন্য জলদস্যু চারজন অন্য ভাইকিংদের হাতে মারা গেল।

শাঙ্কো দ্রুত পায়ে জাহাজের সামনে এলো। জলদস্যুদের জাহাজটার সঙ্গে মোটা কাছিতে বাঁধা ওদের জাহাজটা শাঙ্কো ছোরা বের করল। ছোরা দিয়ে ঘষে ঘষে কাছিটা কেটে ফেলল। ওদের জাহাজটা আস্তে আস্তে হাত কুড়ি-পঁচিশ সরে এলো।

ওদিকে নীচের অস্ত্রঘরে দুজন জলদস্যু অস্ত্রঘর পাহারা দিচ্ছিল। হাতে খোলা তলোয়ার। সেই দুটোকে বিস্কো আর অন্য দুইজন ভাইকিং মোকাবিলা করল।

অন্ধকার থেকে দ্রুত ছুটে গিয়ে বিস্কো একটা জলদস্যুর মাথায় ভাঙা দাঁড় দিয়ে ঘা মারল। ঐ জলদস্যু আর উঠল না। অন্য জলদস্যুটার হাতে ভাঙা দাঁড়ের ঘা মারতে হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। ওটাকে ধরে আর শুয়ে থাকা জলদস্যু দুটিকে বিস্কোরা জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

নিজেদের জাহাজটা বেশি দূরে সরে আসার পর ভাইকিংরা ধ্বনি দিল–ও-হো-হো।

পেড্রো ছুটে গিয়ে মাস্তলটাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করল। কয়েকজন ভাইকিং আনন্দে ডেক-এ গড়াগড়ি খেতে লাগল। একজন ভাইকিং বন্ধু ডেক-এর কাঠে জুতো ঠুকে ঠুকে তাল দিতে লাগল। আরও কয়েকজন ভাইকিং তালে তালে হাত-পা ছুঁড়ে নাচতে লাগল।

Facebook Comment

You May Also Like