Saturday, March 2, 2024
Homeথ্রিলার গল্পরহস্য গল্পতন্দ্রাবিলাস (মিসির আলি) - হুমায়ূন আহমেদ

তন্দ্রাবিলাস (মিসির আলি) – হুমায়ূন আহমেদ

তন্দ্রাবিলাস (মিসির আলি) - হুমায়ূন আহমেদ

তন্দ্রাবিলাস | মিসির আলি || Tondrabilash by Humayun Ahmed

ভোরবেলায় মানুষের মেজাজ

ভোরবেলায় মানুষের মেজাজ মোটামুটি ভালো থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হতে থাকে, বিকালবেলায় মেজাজ সবচে বেশি খারাপ হয়, সন্ধ্যার পর আবার ভালো হতে থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম।

এখন সকাল এগারটা, মেজাজের সাধারণ সূত্র মতে মিসির আলির মেজাজ ভালো থাকার কথা। কিন্তু মিসির আলির মন এই মুহুর্তে যথেষ্টই খারাপ। তিনি বসার ঘরে বেতের চেয়ারে পা তুলে বসে আছেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে। তাঁর মেজাজ খারাপের দুটি কারণের প্রথমটা হল–একটা মাছি। অনেকক্ষণ থেকেই মাছিটা তার গায়ে বসার চেষ্টা করছে। সাধারণ মাছি না-নীল রঙের স্বাস্থ্যবান ডুমে মাছি। আম-কঁঠালের সময় এই মাছিগুলিকে দেখা যায়। এখন শীতকাল-এই মাছি এল কেথেকে? মাছিটা তার গায়েই বারবার বসতে চাচ্ছে কেন? তার সামনে বসে থাকা মেয়েটির গায়ে কেন বসছে না?

মিসির আলির মেজাজ খারাপের দ্বিতীয় কারণ এই মেয়েটি। তার ইচ্ছা করছে। মেয়েটিকে একটা ধমক দেন। যদিও ধমক দেবার মতো কোনো কারণ ঘটেনি। মেয়েটি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। দেখা করতে আসার অপরাধে কাউকে ধমক দেয়া যায়। না। ধমক দেয়ার বদলে মিসির আলি শব্দ করে কাশলেন। প্রচণ্ড শব্দে কাশলে, কিংবা কুৎসিত শব্দে নাক ঝাড়লে মনের রাগ অনেকখানি কমে। মিসির আলির কমল না। বরং আরো যেন বাড়ল। মাছিটাও মনে হচ্ছে এই শব্দে উৎসাহ পেয়েছে। এতক্ষণ গায়ে বসতে চাচ্ছিল এখন উড়ে ঠোঁটে বসতে চাচ্ছে। কী যন্ত্রণা!

স্যার, আমার নাম সায়রা বানু। সায়রা বানু নামটা কি আপনার মনে থাকবে?

মিসির আলি বললেন, মনে থাকার প্রয়োজন কি আছে?

অবশ্যই আছে; আমি এত আগ্রহ করে আমার নামটা আপনাকে কেন বলছি, যাতে মনে থাকে সেই জন্যেই তো বলছি।

মিসির আলি রোবটের গলায় বললেন, মানুষের নাম আমার মনে থাকে না।

মেয়েটি তার রোবট গলা অগ্রাহ্য করে হাসিমুখে বলল, আমারটা মনে থাকবে। কারণ একজন বিখ্যাত সিনেমা অভিনেত্রীর নাম সায়রা বানু।

মিসির আলি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। এখন তাঁর মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। অর্থহীন কথা শুনতে ভালো লাগছে না। তা ছাড়া শীতও লাগছে। চেয়ারটা টেনে রোদে নিয়ে গেলে হয়। তাতে কিছুক্ষণ আরাম লাগবে তারপর আবার রোদে গা চিড়বিড় করতে থাকবে। শীতকালের এই এক যন্ত্রণা। ছায়া বা রোদ কোনোটাই ভালো লাগে। না। মিসির আলি মাছিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাছিটার কারণে নিজেকে এখন কাঁঠাল মনে হচ্ছে।

মেয়েটি খানিকটা মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, আপনি দিলীপ কুমার, সায়রা বানু এদের নাম শোনেন নি?

দিলীপ কুমারের নাম শুনেছি।

সায়রা বানু হচ্ছে দিলীপ কুমারের বউ; আমার বন্ধুরা অবিশ্যি আমাকে সায়রা বানু। ডাকে না, তারা ডাকে এস বি। সায়রার এস, বানুর বি-এস বি! এস বি-তে আর কী হয় বলুন তো?

বলতে পারছি না।।

এস বি হচ্ছে স্পেশাল ব্রাঞ্চ। আমার বন্ধুদের ধারণা আমার চেহারায় একটা স্পাই স্পাই ভাব আছে। এই জন্যেই তারা আমাকে এস বি ডাকে। আচ্ছা আপনারও কি ধারণা আমার চেহারায় স্পাই স্পাই ভাব? ভালো করে একটু আমার দিকে তাকান না। আপনি সারাক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন কেন?

মিসির আলি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন না। মাছিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মাছিটা এদিক-ওদিক করছে বলেই এদিক-ওদিক তাকাতে হচ্ছে। আচ্ছা পৃথিবীতে মোট কত প্ৰজাতির মাছি আছে?

এই যে শুনুন। তোকান আমার দিকে।

মিসির আলি মেয়েটির দিকে তাকালেন। অতিরিক্ত ফর্সা একটি মেয়ে। বাঙালি মেয়েদের গায়ের রঙের একটা মাত্রা আছে। কোনো মেয়ে যদি সেই মাত্রা অতিক্রম করে। যায়। তখন আর ভালো লাগে না। তার মধ্যে বিদেশী বিদেশী ভাব চলে আসে। তাকে তখন আর আপন মনে হয় না। সায়রা বানুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাকে পর পর লাগছে। মেয়েটির মাথা ভরতি চুল। সেই চুলেও লালচে ভাৰ আছে। অতিরিক্ত ফর্সা মেয়েদের ক্ষেত্রে তাই হয়। তাদের গায়ের রঙের খানিকটা এসে চুলে লেগে যায়। চুল লালচে দেখায়-খানিকটা এসে লাগে চোখে। চোখ তখন আর কালো মনে হয় না। মেয়েটির মুখ লম্বাটে। একটু বেচা ধরনের নাক। বেঁচো নাক থাকায় রক্ষা-বেঁচো নাকের কারণেই মেয়েটিকে বাঙালি মনে হচ্ছে। খাড়া নাকি হলে মেডিটেরিনিয়ান সমুদ্রের পাশের গ্রিক কন্যা বলে মনে হত। বয়স কত হবে? উনিশ থেকে পঁচিশের তেতর। মানুষের বয়স চট করে ধরতে পারার কোনো পদ্ধতি থাকলে ভালো হত। গাছের রিং গুনে বয়স বলা যায়। মানুষের তেমন কিছু নেই। মানুষের বয়স তার মনে বলেই বোধ হয়। আচ্ছা, একটা মাছি কতদিন বাঁচে?

স্যার কথা বলছেন না কেন? আমাকে কি স্পাই মেয়ে বলে মনে হচ্ছে?

স্পাই মেয়েদের চেহারা আলাদা হয় বলে আমি জানি না।

একটু আলাদা হয়। স্পাই মেয়েদের মুখ দেখে এদের মনের ভাব বোঝা যায় না। এদের মুখে এক রকম ভাব মনের ভেতর আরেক রকম।

তোমারও কি তাই?

জি। ও আপনাকে বলতে ভুলে গেছি। এস বি ছাড়াও আমার আরেকটা নাম আছে! নাম ঠিক না খেতাব। নববর্ষে পাওয়া খেতাব। আমাদের কলেজে পহেলা বৈশাখে খেতাব দেয়া হয়। আমার খেতাবটা হচ্ছে সাদা বাঘিনী। এস বি-তে সাদা বাঘিনীও হয়। সাদা বাঘিনী টাইটেল কেন পেয়েছিলাম শুনতে চান? খুবই মজার গল্প।

মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। তাঁর কিছুই শুনতে ইচ্ছা করছে না। মাথার যন্ত্রণা এবং শীত ভাব দুইই বাড়ছে। গায়ে পাতলা একটা চাদর দিয়ে শীত ভাবটা কমানো যেত। চাদরটা ধুপিখানায় দিয়েছেন। ধোয়া নিশ্চয়ই হয়ে গেছে, ক্লিপের অভাবে আনতে পারছেন না। ক্লিপটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। কড়া এক কাপ চা খেলেও শীতটা কমত। ঘরে চায়ের পাতা আছে, চিনি, দুধও আছে। গতকালই কিনে এনেছেন। কিন্তু গ্যাসের চুলায় কী একটা সমস্যা হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগুন জ্বলেই হস করে নিভে যায়। মিন্ত্রি ডাকিয়ে চুলা ঠিক করা দরকার। গ্যাস মিস্ত্রিরা কোথায় থাকে কে জানে?

সায়রা বানু মেয়েটি হড়বড় করে কথা বলে যাচ্ছে, তার কথা তিনি মন দিয়ে শুনছেন না। মাথায় দুশ্চিন্তা নিয়ে অন্য কিছুতে মন বসানো বেশ কঠিন। তবে মাছিটা এখন শান্ত হয়েছে। টেবিলের উপর চুপ করে বসে আছে। ডিম পাড়ছে না তো?

আমার সাদা বাঘিনী টাইটেল পাওয়ার ঘটনাটা খুব ইন্টারেস্ট্রিং। শুনলে আপনি খুব মজা পাবেন! বলব?

মিসির আলি কিছুই বললেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন মেয়েটি তার গল্প বলবেই। তিনি বলতে বললেও বলবে, বলতে না বললেও বলবে।

হয়েছে কী শুনুন-সায়েন্স ল্যাবরেটরির সামনে দিয়ে আমি যাচ্ছি। আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধু, রাকা। রাকা হচ্ছে বোরকাওয়ালী। বোরকা পরে। সউদি বোরকা। বেশ কয়েক টাইপ বোরকা পাওয়া যায় তা কি আপনি জানেন? সউদি বোরকা, পাকিস্তানি বোরকা। সউদি বোরকা ভয়াবহ, শুধু চোখ দুটো বের হয়ে থাকে। এমনিতে সে অবিশ্যি খুব স্ট্রাইলিস্ট। বোরকার নিচে ক্লিভলেস ব্লাউজ পরে। যাই হোক বোরকাওয়ালী রাকা হঠাৎ বলল, সে একটা পেনসিল কিনবে। আমি তাকে নিয়ে একটা দোকানে ঢুকলাম পেনসিল কিনতে। স্টেশনারির দোকান তবে তার সঙ্গে কনফেকশনারিও আছে। চা বিক্রী হচ্ছে। কেক বিক্রি হচ্ছে। দোকানটায় বেশ ভিড়। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে এক লোক করল কী বোরকাওয়ালীর গায়ে হাত দিল। গায়ে মানে কোথায় তা আপনাকে বলতে পারব না। আমার লজ্জা লাগবে। বোরকাওয়ালী এমন ভয় পেল যে প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। আমি বোরকাওয়ালীকে ধরে ফেললাম। তারপর বদমাশ লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি ওর গায়ে হাত দিলেন কেন? ষণ্ডাগণ্ডা টাইপের লোক। লাল চোখ। গরিলাদের মতো লোম ভরতি হাত। সে এমন ভাব করল যে আমার কথাই শুনতে পায় নি। দোকানদারের দিকে তাকিয়ে হাই তুলতে তুলতে বলল—দেখি একটা লেবু চা। তখন আমি খপ করে তার হাত ধরে ফেললাম। সে ঝটিকা দিয়ে তার হাত ছড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল। কিন্তু তার আগেই আমি তার হাত কামড়ে ধরলাম। যাকে বলে কচ্ছপের কামড়। কচ্ছপের কামড় কী তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। কচ্ছপ একবার কামড়ে ধরলে আর ছাড়ে না, আমিও ছাড়লাম না। আমার মুখ রক্তে ভরে গেল। লোকটা বিকট চিৎকার শুরু করল। ব্যাপারস্যাপার দেখে বোরকাওয়ালী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এর পর থেকে আমার টাইটেল হয়েছে সাদা বাঘিনী।

গল্প শেষ করে সায়রা বানু খিলখিল করে হাসছে। মিসির আলি মেয়েটির হাসির মাঝখানেই বললেন, তুমি আমার কাছে কেন এসেছ?

গল্প করার জন্যে এসেছি। বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে গল্প করতে আমার খুব ভালো লাগে।

আমি বিখ্যাত মানুষ?

অবশ্যই বিখ্যাত। আপনাকে নিয়ে কত বই লেখা হয়েছে। আমি অবিশ্যি একটা মাত্র বই পড়েছি। ওই যে সুধাকান্ত বাবুর গল্প। একটা মেয়ে খুন হল আর আপনি কেমন শার্লক হোমসের মতো বের করে ফেললেন–সুধাকান্ত বাবুই খুনটা করেছেন। বই পড়ে মনে হচ্ছিল। আপনার খুব বুদ্ধি কিন্তু আপনাকে দেখে সেরকম মনে হচ্ছে না।

আমাকে দেখে কেমন মনে হচ্ছে?

খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। আপনার মধ্যে একটা গৃহশিক্ষক গৃহশিক্ষক ব্যাপার আছে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি নিয়মিত বেতন পান মা এমন একজন অংকের স্যার। আপনি রোজ ভাবেন আজ বেতনের কথাটা বলবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলতে পারেন না। আচ্ছা। আপনি এমন গভীর মুখে বসে আছেন কেন? মনে হচ্ছে আপনি আমার কথা শুনে মজা তো পাচ্ছেনই না উল্টো বিরক্ত হচ্ছেন! সত্যি করে বলুন আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন?

কিছুটা হচ্ছি।

মাছিটা তো এখন আর বিরক্ত করছে না। কেমন শান্ত হয়ে টেবিলে বসে আছে। তারপরেও আপনি এত বিরক্ত কেন বলুন তো?

তুমি অকারণে কথা বলছ এই জন্যে বিরক্ত হচ্ছি। অকারণ কথা আমি নিজেও বলতে পারি না অন্যের অকারণ কথা শুনতেও ভালো লাগে না।

আপনার সঙ্গে কথা বলতে হলে সব সময় একটা কারণ লাগবে? তা হলে তো আপনি খুবই বোরিং একটা মানুষ। এত কারণ আমি পাব কোথায় যে আমি রোজ রোজ আপনার সঙ্গে কথা বলব?

মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি রোজ রোজ আমার সঙ্গে কথা বলবে?

হুঁ।

সে কী, কেন?

সায়রা বানু খুব সহজ ভঙ্গিতে হাই তুলতে তুলতে বলল, এক বাড়িতে থাকতে হলে কথা বলতে হবে না?

এক বাড়িতে থাকবে মানে? আমি বুঝতে পারছি না।

আমি আপনার সঙ্গে কয়েকটা দিন থাকব। কদিন এখনো বলতে পারছি না। দু দিনও হতে পারে আবার দু মাসও হতে পারে। আবার দু বছরও হতে পারে। সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার উপর।

মিসির আলি চেয়ার থেকে পা নামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকালেন। হচ্ছেটা কী? এই যুগের টিনএজার মেয়েদের ভাবভঙ্গি, কাণ্ডকারখানা বোঝা মুশকিল। তারা যে কোনো উদ্ভট কিছু হাসিমুখে করে ফেলতে পারে। মেয়েটি হয়তো অতি তুচ্ছ কারণে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। কিংবা তাকে ভড়কে দেবার জন্যে গল্প ফেঁদেছে। পরে কলেজে বন্ধুদের কাছে এই গল্প করবে। বন্ধুরা মজা পেয়ে একে অন্যের গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়বে।–ও মাগো বুড়োটাকে কী বোকা বানিয়েছি! সে বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে আমি থাকতে এসেছি।

মিসির আলি নিজের বিস্ময় গোপন করে সহজভাবে বললেন, তুমি এ বাড়িতে থাকবে?

জি।

বিছানা বালিশ নিয়ে এসেছ?

বিছানা বালিশ আনি নি। আজকাল তো আর বিছানা বালিশ নিয়ে কেউ অন্যের বাড়িতে থাকতে যায় না। শুধু একটা সুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ এনেছি। আর একটা পানির বোতল।

সুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ কোথায়?

বারান্দায় রেখে এসেছি। শুরুতেই আপনি আমার সুটকেস দেখে ফেললে ঢুকতে দিতেন না। যাই হোক আমি এখন আমার সুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে আসছি। আচ্ছা! আপনি এমন ভাব করছেন যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। আকাশ থেকে পড়ার মতো কিছু হয় নি। বিপদগ্ৰস্ত একজন তরুণীকে কয়েকদিনের জন্যে আশ্রয় দেয়া এমন কোনো বড় অন্যায় না। আমি নিশ্চিত এরচে অনেক বড় বড় অন্যায় আপনি করেছেন।

তুমি সত্যি সত্যি আমার এখানে থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছ?

জি।

মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। এই মুহুর্তে তাঁর ঠিক কী করা উচিত তা মাথায় আসছে না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে মেয়েটির কোণ্ডকারখানা, দৈখাই মনে হয়। সবচে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মেয়েটি বুদ্ধিমতী। এই পরিস্থিতিতে তিনি কী করবেন বা করতে পারেন। সেই সম্পর্কে চিন্তাভাবনা সে নিশ্চয়ই করেছে। নিজেকে সম্ভাব্য সব রকম পরিস্থিতির জন্যে সে প্রস্তুত করে রেখেছে। মিসির আলির এমন কিছু করতে হবে যার সম্পর্কে মেয়েটির প্রস্তুতি নেই। সে কেন বাড়ি ছেড়ে এসেছে এই মুহুর্তে তা তাকে জিজ্ঞেস করা যাবে না। কারণ এই প্রশ্নটি স্বাভাবিক এবং সঙ্গত প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর মেয়েটি তৈরি করে রেখেছে। তাঁর বিস্মিত হওয়াও ঠিক হবে না। তাঁকে খুব সহজ এবং স্বাভাবিক থাকতে হবে। যেন এমন ঘটনা প্রতি সপ্তাহেই দুটা-একটা করে ঘটছে।

সায়রা বানু সুটকেস, হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে ঘরে ঢুকল। মিসির আলি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন সে গুনগুন করে কী একটা গানের সুরও যেন ভাজছে। কত সহজ স্বাভাবিক তার আচরণ।

কেক খাবেন?

কেক?

হুঁ। আমার নিজের বেক করা, ডিমের পরিমাণ বেশি হয়েছে বলে একটু ডিম ডিম গন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে ডিমের গন্ধ একেবারে সহ্য করতে পারে না। আমার কাছে অবিশ্যি খারাপ লাগে না। দেব আপনাকে এক পিস কেক?

না।

আপনাকে একটু বাজারে যেতে হবে, কয়েকটা জিনিস কিনতে হবে। আমি অতি দ্রুত চলে এসুেছি তো কাজেই অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস আনা হয় নি। টুথপেষ্ট এনেছি, টুথব্রাশ আনি নি। আমার অভ্যাস হচ্ছে রাতে শোবার সময় কুটকুট করে কয়েকটা লবঙ্গ খাওয়া। লবঙ্গ খেলে শরীরের রক্ত পরিষ্কার থাকে, কখনো হার্টের অসুখ হয় না। সেই লবঙ্গ আনা হয় নি। আপনাকে লবঙ্গ আনতে হবে। পারবেন? আমি আপনাকে টাকা দিয়ে দেব। আমি সঙ্গে করে অনেক টাকা নিয়ে এসেছি। বলুন তো কত এনেছি?

বলতে পারছি না।

অনুমান করুন। আপনি হচ্ছেন বিখ্যাত মিসির আলি। আপনার অনুমান হবে পৃথিবীর শ্ৰেষ্ঠ অনুমান। বলুন আমার সঙ্গে কত টাকা আছে।

পাঁচ হাজার টাকা।

হয় নি। আমার সঙ্গে আছে মোট একান্ন হাজার টাকা। পাঁচ শ টাকার একটা বান্ডিল এনেছি আর এনেছি। দশ টাকার একটা বান্ডিল। সেখান থেকে কিছু খরচ করেছি। বেবিট্যাক্সি ভাড়া দিয়েছি তিরিশ টাকা। ঠিক এই মুহূর্তে আমার কাছে আছে পঞ্চাশ হাজার নয় শ সত্তর টাকা। আপনাকে টুকটাক বাজারের জন্যে পাঁচ শ টাকা দিচ্ছি, যা লাগে খরচ করবেন বাকিটা ফেরত দেবেন। এই নিন।

সায়রা বানু তার কাঁধে ঝুলানো কালো ব্যাগ খুলে টাকা বের করল। মিসির আলি টাকাটা নিলেন। মেয়েটি এক ধরনের খেলা শুরু করেছে। মিসির আলির মনে হল মেয়েটিকে সেই খেলা তার মতোই খেলতে দেয়া উচিত। এই মুহূর্তে এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে খেলা বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি মেয়েটিকে আগ্রহ নিয়ে দেখতে শুরু করেছেন—তার তাকানোর ভঙ্গি, হাঁটার ভঙ্গি, বসার ভঙ্গি। আপাতদৃষ্টিতে এইসব খুবই ছোটখাটো ব্যাপার থেকে অনেক কিছু জানা যায়।

সায়রা বানু চেয়ারে বসতে বসতে বলল, আমার খাওয়া নিয়ে আপনি মোটেই চিন্তা করবেন না। যা খাওয়াবেন আমি তাই খাব। শুধু মাছ ছাড়া। মাছ আমি খেতে পারি না-গন্ধ লাগে। অবিশ্যি চিংড়ি মাছ খাই। চিংড়ি মাছ কেন খাই বলুন তো?

বলতে পারছি না।

চিংড়ি মাছ খাই কারণ চিংড়ি মাছ হচ্ছে আসলে এক ধরনের পোকা। পোকা বলেই চিংড়ি মাছে আঁশটে গন্ধ নেই। ও আচ্ছা বলতে ভুলে গেছি। আরেকটা জিনিস খুব পছন্দ করে খাই। ইলিশ মাছের ডিম।

মাছের ডিমেরও তো আঁশটে গন্ধ থাকে।

ইলিশ মাছের ডিমে থাকে না। আপনি কেভিয়ার খেয়েছেন?

না।

কেভিয়ার হচ্ছে পৃথিবীর সবচে দামি খাবার। কালো রঙের মাছের ডিম। স্বাদ কী রকম জানেন?

যেহেতু খাই নি স্বাদ কেমন তা তো জানার কথা না।

স্বাদ কেমন আপনি জানেন। অনেকটা আমাদের শিং, মাছের ডিমের মতো। তবে আঁশটে গন্ধ অনেক বেশি। মাক চেপে ধরে আমি একবার খানিকট খেয়েছিলাম। তারপর বমিটমি করে একাকার।

মিসির আলি পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন। সঙ্গে দেয়াশলাই নেই। দেয়াশলাইয়ের খোঁজে রান্নাঘরে যেতে হবে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে। না। মেয়েটাকে কি বলবেন দেয়াশলাই এনে দিতে? মিসির আলিকে কিছু বলতে হল না। তার আগেই সায়রা বানু বলল, আপনার লাইটার লাগবে?

আছে তোমার কাছে?

আছে। আপনি সিগারেট মুখে দিন আমি ধরিয়ে দিচ্ছি।

মেয়েটা যে ভঙ্গিতে লাইটার ধরাল তাতে মনে হল সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে তার অভ্যাস আছে। সে নিজে সিগারেট খায় না তো? না খায় না, সিগারেটের ধোয়ায় সে নাক কুঁচকাচ্ছে।

এই লাইটারটা আপনি রেখে দিন। লাইটারটা আমি আপনার জন্যে এনেছি।

থ্যাংক য়্যু।

আর এক প্যাকেট সিগারেটও এনেছি। আপনার একটা বইয়ে পড়েছিলাম। একজন কে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসত। যেদিনই আসত আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসত।

মিসির আলি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, একটু আগে বলেছিলে তুমি আমার একটা বইই পড়েছি।

মিথ্যা কথা বলেছিলাম। অনেকগুলি বই পড়েছি। সুধাকান্ত বাবুর উপর লেখা বইটা সবচে ভালো লেগেছে। বইটা আমি পড়েছি তিনবার। না তিনবার না। আড়াইবার পড়েছি। দুবার পড়েছি পুরোটা। শেষ বার পড়েছি শুধু শেষের কুড়ি পাতা।

ভালো।

মিথ্যা কথা বললে কি আপনি রেগে যান?

না।

আমাকে কেউ মিথ্যা কথা বললে আমি অবিশ্যি খুব রেগে যাই। আর আমার এমনই কপাল যে সবাই শুধু আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে। তবে আপনি বলবেন না সেটা আমি জানি। আপনার চেহারা দেখেই বোঝা যায় আপনি মিথ্যা কথা বলতে পারেন না! আপনি কি জানেন যারা সব সময় মিথ্যা কথা বলে তাদের চেহারায় একটা মাইডিয়ার ভাব থাকে।

তাই নাকি?

জি।

যেসব মেয়েকে দেখবেন খুব মায়া মায়া চেহারা, আপনি ধরেই নিতে পারেন তারা প্রচুর মিথ্যা কথা বলে।

এই তথ্য জানতাম না।

আপনি মিসির আলি আর আপনি এই সাধারণ তথ্য জানেন না? অথচ বইয়ে কত আশ্চৰ্য আশ্চৰ্য কথা যে আপনার সম্পর্কে লেখা হয়। যেমন কাউকে এক পলক দেখেই আপনি তার সম্পর্কে হড়বড় অনেক কথা বলে দিতে পারেন। আসলেই কি পারেন?

না। পারি না।

আচ্ছা চেষ্টা করে দেখুন না। আমার সম্পর্কে বলুন।

কী বলব?

আমাকে দেখে কী মনে হচ্ছে। এইসব। দেখি আপনার পাওয়ার অব অবজারভেশন।

দেখ সায়রা বানু, আমি পরীক্ষা দেই না।

পরীক্ষা ভাবছেন কেন? ভাবেন একটা খেলা। বলুন আমার সম্পর্কে বলুন।

মিসির আলি হাতের সিগারেট ফেলে দিলেন। আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা! করছে। তিনি নিজের ওপর একটু বিরক্ত হচ্ছেন কারণ তাঁর টেনশন হচ্ছে। টেনশন হলেই একটা সিগারেট শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা সিগারেট ধরতে ইচ্ছা করে। তাঁর শরীর ভালো না! এখন কিছুদিন টেনশন ফ্রি জীবন যাপন করতে চান। অজানা-অচেনা একটা মেয়ে হুট করে উপস্থিত হয়ে তাতে বাধা দিচ্ছে।

মেয়েটি আগ্রহ নিয়ে বলল, কী হল কিছু বলছেন না কেন?

মিসির আলি খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, তোমার সম্পর্কে আমার প্রথম অবজারভেশন হচ্ছে তোমার নাম সায়রা বানু নয়।

এরকম মনে হবার কারণ কী?

মনে হবার কারণ হচ্ছে–সায়রা বানু যদি তোমার নাম হত তা হলে সায়রা বানু। ডাকলে তুমি সহজ ভাবে রেসপন্স করতে। একটু আগে আমি বললাম, দেখ সায়রা বানু। পরীক্ষা আমি দেই না। বাক্যটা আমি একবারে বলি নি। দেখ সায়রা বানু, বলে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করেছি। যখন দেখলাম তুমি হঠাৎ চমকে উঠলে তখনই আমি বাক্যটা শেষ করলাম। তোমার চমকে ওঠার কারণ হচ্ছে সায়রা বানু বলে যে তোমাকে সম্বোধন করা হচ্ছে তা তুমি শুরুতে বুঝতে পার নি। যখন বুঝতে পেরেছ তখনই চমকে উঠেছ। তোমার নাম কী?

আমার নাম চিত্ৰা।

আটকে রাখা হয়েছিল। সেই ঘরের জানাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। আলোহীন একটা ঘরে দীর্ঘদিন থাকলে গায়ের চামড়া ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তোমার তাই হয়েছে। তুমি আলোর দিকে ঠিকমতো তাকাতেও পারছি না। যতবার তাকাচ্ছ ততবার চোখের মণি ছোট হয়ে আসছে। ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে। আবার জানালা থেকে তুমি চোখ ফিরিয়েও নিতে পারছি না। বারবার বিস্মিত চোখে জানোলা দিয়ে তাকাচ্ছ। কারণ অনেকদিন পরে তুমি জানালায় খোলা আকাশ দেখছি।

আরো কিছু বলবেন?

দীর্ঘদিন ধরে তুমি ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছ। যে কোনো কারণেই হোক তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে। স্টোরি তৈরি করতে হচ্ছে। মিথ্যা বলাটা তোমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি কি ঠিক বলেছি?

হ্যাঁ।

তোমার হাত বাঁধা ছিল। মণিবন্ধে কালো দাগ পড়ে গেছে।

হুঁ।

তোমার ঘ্রাণশক্তি অতি প্রবল। তুমি কিছুক্ষণ পরপরই নাক কুঁচকাচ্ছ। এবং তাকাচ্ছ ঘরের দক্ষিণ দিকে। দক্ষিণ দিক থেকে নর্দমার দুৰ্গন্ধ আসছে। সেটা এত প্রবল না যে এমনভাবে নাক কুঁচকাতে হবে। এর থেকে মনে হয়-হয় তোমার ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রবল আর নয়তো তোমাকে অনেক উঁচু কোনো ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, ছ তলা-সাত তলায় যেখানে রাস্তার নর্দমার গন্ধ পৌঁছে না।

চিত্ৰ চুপ করে রইল। সে খুব একটা বিস্মিত হল বলে মনে হল না। মিসির আলি বললেন, এখন বল, তোমার ব্যাপারটা কী?

আপনি তো কিছু না জেনেই অনেক কিছু বলতে পারেন। আপনি নিজেই বলুন।

না। আমি বলতে পারছি না।

অনুমান করুন। দেখি আপনার অনুমানশক্তি আমার ঘ্রাণশক্তির মতো কি না।

আমার ধারণা তুমি অসুস্থ। অসুস্থতাটা এমন যে রোগীকে ঘরে আটকে রাখতে হয়। তুমি কোনোক্ৰমে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে এসেছি।

আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে আমি পাগল তাই আমাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল? না আমি পাগল না। সুস্থ। ছিটেফোঁটা পাগলামি যা অন্যদের মধ্যে থাকে আমার তাও নেই। তবে আমাকে ঘিরে আটকে রাখা হচ্ছিল তা ঠিক। ছবিশ দিন হল ঘরে তালাবন্ধ। আমাকে সবাই মিলে ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছে। কারণটাও খুব সাধারণ এবং আপনার মতো বুড়োর কাছে হয়তো বা হাস্যকর। কারণটা বলব?

মিসির আলি হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। মেয়েটির স্বভাব যা তাতে তিনি যদি বলেন- হ্যাঁ বল–তা হলে সে নিশ্চিতভাবেই বলবে–না বলব না। তারচে চুপ করে থাকাই ভালো।

ব্যাপারটা প্রেমঘটিত। আমি একটা ছেলেকে বিয়ে করতে চাই। দরিদ্র ফালতু টাইপ ছেলে। কিছুই করে না। তার প্রেমে পড়ার কারণ নেই। তারপরেও আমি পড়ে গেছি এবং এবং …

এবং কী?

গোপনে বিয়ে করার জন্যে তার সঙ্গে পালিয়েও গিয়েছিলাম। আমাকে ধরে আনা হয়। আমি তো খুব জেদি মেয়ে, কাজেই আমি সবাইকে বলি–আমি আবারো পালিয়ে যাব। তোমাদের কোনো সাধ্য নেই আমাকে ধরে রাখার।

ছেলেটার নাম কী?

ছেলেটার নাম দিয়ে আপনার দরকার কী?

কোনো দরকার নেই। কৌতুহল বলতে পার।

উনার নাম ফরহাদ।

শুধুই ফরহাদ?

ফরহাদ খান।

তারপর?

তারপর আবার কী?

তোমার কাছ থেকে এই কথা শোনার পর তারা তোমাকে তালাবন্ধ করে রাখল?

তই তো রাখবে। যে মেয়ে এ জাতীয় কথা বলে তাকে নিশ্চয়ই কেউ কোলে করে ঘুরে বেড়াবে না। ঘুমপাড়ানি গান গাইয়ে ঘুম পাড়াবে না।

আজ তুমি ছাড়া পেয়েছ, আমার কাছে না এসে ওই ছেলেটির কাছে চলে যাচ্ছ না। কেন?

যাব তো বটেই। আপনার কি ধারণা আমি চিরকালের জন্যে আপনার সঙ্গে থাকব?

মিসির আলি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, চিত্ৰা তুমি আবারো মিথ্যা কথা বলছ।

বুঝলেন কী করে?

ছেলেটার নাম কী বল জিজ্ঞেস করার পর–থতামত খেয়ে গেলে। চট করে বলতে পারলে না। একটা কোনো নাম ভাবার জন্যে সময় নিলে। তারপর বললে উনার নাম ফরহাদ। উনি বললে-যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছ তার প্রসঙ্গে উনি বলবে কেন? বলবে ওর নাম ফরহাদ ।

তা হলে কি সত্যি কথা শুনতে চান?

আমি এখন সত্যি-মিথ্যা কোনো কথাই শুনতে চাই না। তুমি আমার সাহায্য চাচ্ছ। যদি সত্যি চাও আমি তোমাকে সাহায্য করি, তা হলে তোমাকে সত্যি কথা বলতে হবে। তা তুমি পারবে না। মিথ্যা বলাটা তোমার রক্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। কিছুক্ষণ সত্যি বলার পর আবার মিথ্যা শুরু করবে।

তাতে অসুবিধা কী? যেই মুহুর্তে আমি মিথ্যা বলব। আপনি ধরে ফেলবেন। আপনার তো সেই ক্ষমতা আছে।

মিসির আলি আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন–চিত্রা শোন আমার পক্ষে তোমাকে এ বাড়িতে রাখা সম্ভব না। তোমাকে চলে যেতে হবে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যেতে হবে।

আমার সমস্যা আপনি সমাধান করবেন না?

মানুষের বেশিরভাগ সমস্যাই এরকম যে তা তারা নিজেরাই সমাধান করতে পারে। আমার ধারণা তোমার সমস্যার সমাধান তুমিই করতে পারবে।

আমি আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছি বলে কি আপনি রাগ করেছেন?

রাগ করার প্রশ্ন আসছে না। মিথ্যা কথা বলাটাকে সবাই যতবড় অন্যায় মনে করে আমি তা করি না। আমার কাছে মনে হয় মানুষের অনেক অদ্ভূত ক্ষমতার একটি হচ্ছে মিথ্যা বলার ক্ষমতা। কল্পনাশক্তি আছে বলেই সে মিথ্যা বলতে পারে। যে মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না সে সৃষ্টিশীল মানুষ না–রোবট টাইপ মানুষ।

আপনি কি মিথ্যা বলেন?

না বলি না। মানুষ হিসেবে আমি রোবট টাইপের। শোনচিত্রা, তুমি এখন চলে যাও।

চিত্রা বিশিত গলায় বলল, চলে যাব?

হ্যাঁ চলে যাবে।

আপনি আমাকে খুব অপছন্দ করেছেন তাই না?

আমি তোমাকে অপছন্দও করি নি। আবার পছন্দও করি নি।

আমার বিষয়ে আপনার কোনো কৌতূহলও হচ্ছে না?

লোকজনের ধারণা আমার কৌতুহল খুব বেশি, আসলে তা না। আমার কৌতুহল কম। অনেক কম।

নীল রঙের মাছটার দিকে আপনি যতটা কৌতুহল নিয়ে তাকিয়েছেন আমার দিকে তাও তাকান নি। আমি কি মাছির চেয়েও তুচ্ছ?

মিসির আলি চুপ করে রইলেন।

চিত্রা ক্লান্ত গলায় বলল, আচ্ছা। আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু আপনি দয়া করে গম্ভীর হয়ে থাকবেন না। যাবার আগে হাসিমুখে থাকুন। আপনার হাসিমুখ দেখে যাই।

মিসির আলি হাসলেন। চিত্রা বলল, বাহ আপনার হাসি তো সুন্দর। যারা গভীর ধরনের মানুষ তাদের হাসি খুব সুন্দর হয়। এরা হঠাৎ হঠাৎ হাসে তো এই জন্যে। আর যারা সব সময় হাসিমুখে থাকে তাদের হাসি হয় খুব বিরক্তিকর। তাদের কান্না হয় সুন্দর। আচ্ছা আমি তা হলে এখন উঠি।

চিত্ৰ উঠে দাঁড়াল। মেয়েটা এত সহজে চলে যেতে রাজি হবে তা মিসির আলি তাবেন নি। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

আচ্ছা শুনুন, আমি আমার ব্যাগগুলি রেখে যাই। ব্যাগ হাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশ্ৰয় খোঁজার তো কোনো মানে হয় না, তাই না?

বিছানা বালিশ নিয়ে যাওয়াই তো ভালো, সবাই ভাববে এই মেয়ের আসলেই আশ্ৰয় প্রয়োজন।

আপনি কিন্তু সেরকম ভাবেন নি। আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। যাই হোক আমি জিনিসপত্র রেখে যাচ্ছি। একসময় এসে নিয়ে যাব।

আচ্ছা।

আপনি আসলেই রোবট টাইপ মানুষ। যাই কেমন?

তুমি কি তোমার বাড়ির টেলিফোন নাম্বারটি দিয়ে যাবে?

কেন? আচ্ছা দিচ্ছি। কাগজে লিখে দিচ্ছি। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে টেলিফোন করবেন না। আর যদি করেন। আপনি ভয়াবহ বিপদে পড়ে যাবেন। এইবার কিন্তু আমি সত্যি কথা বলছি–কি বলছি না?

মনে হচ্ছে বলছ।

চিত্রা তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে কাগজ নিয়ে টেলিফোন নাম্বার লিখল। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, এই নিন নাম্বার। আবারো বলছি নিতান্ত প্রয়োজন না হলে টেলিফোন করবেন না।

নিতান্ত প্রয়োজন বলতে তুমি কী বুঝাচ্ছ?

ধরুন আমি আপনার ঘর থেকে বের হলাম। আর হঠাৎ একটা ট্রাক এসে আমার গায়ের উপর দিয়ে চলে গেল তখন আপনি বাসায় টেলিফোন করে বলবেন–চিত্রা মারা গেছে।

আচ্ছা ঠিক আছে।

চিত্রা বেশ সহজ ভঙ্গিতেই বের হল। মিসির আলি উঠে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তিনি আজ আর ঘর থেকে বের হবেন না। তিনি জানেন ঘণ্টা দু-একের ভেতর চিত্রা ফিরে আসবে, তার জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। মেয়েরা তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কোথাও রেখে স্বস্তি পায় না। কাজেই অপেক্ষা করাই ভালো।

খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার মেয়েটি চলে যাবার পর মিসির আলির একটু মন খারাপ হয়ে গেল। পাখি উড়ে যাবার পর পাখির পালক পড়ে থাকে। মেয়েটা চলে গেছে তার পরেও কিছু যেন রেখে গেছে। সুটকেস এবং হ্যান্ডব্যাগ নয়, অন্য কিছু।

মেয়েটির রেখে যাওয়া ৫০০ টাকার নোটটা পকেটে। টাকাটা ফেরত দিতে ভুলে গেছেন। আশ্চৰ্য কাণ্ড-মেয়েটি তার কালো ব্যাগও ফেলে গেছে। তার সব টাকা তো ওই ব্যাগে। বেবিট্যাক্সি নিয়ে যদি কোথাও যায় ভাড়া দিতে পারবে না।

মিসির আলি অস্বস্তি বোধ করছেন। মেয়েটাকে মাথা থেকে তাড়াতে পারছেন না। মাছিটা এখনো টেবিলে বসে আছে। মারা গেছে নাকি? না মারা যায় নি। কীট এবং পতঙ্গ জগতের নিয়ম হল মৃত্যুর পর উল্টো হয়ে থাকা। পিিঠ থাকবে মাটিতে পা থাকবে শূন্যে। মাছির বেলাতেও নিশ্চয়ই সেই নিয়ম। মিসির আলি তার লাইব্রেরির দিকে এগুলেন-মাছি সম্পর্কে জানার জন্যে কোনো বই কি আছে লাইব্রেরিতে? থাকার তো কথা।

মাছি সম্পর্কে মিসির আলি তেমন কোনো তথ্য যোগাড় করতে পারলেন না। শুধু জানলেন পৃথিবীতে মোট ৮৫,০০০ প্রজাতির মাছি আছে। মৌমাছি যেমন মাছি, ড্রাগন ফ্লাইও মাছি। সবচে ছোট মাছি প্রায় অদৃশ্য আর সবচে বড় মাছি চড়ুই পাখি সাইজের। এদের সবারই দু জোড়া পাখা থাকে। এক জোড়া তারা ওড়ার কাজে ব্যবহার করে, অন্য জোড়া ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যবহার করে। বেশিরভাগ প্রজাতির মাছিই মানুষের পরম বন্ধু–শুধু হাউস ফ্লাই নয়। এদের প্রধান কাজ অসুখ ছড়ানো।

চিত্রা দু ঘণ্টার ভেতর ফিরে আসবে

চিত্রা দু ঘণ্টার ভেতর ফিরে আসবে। এ ব্যাপারে মিসির আলি নিশ্চিত ছিলেন। নিশ্চিত ব্যাপারগুলি মানুষের জীবনে প্রায় কখনো ঘটে না। চিত্রা দু ঘণ্টা কেন দশ দিনের মাথাতেও ফিরে এল না। তার হ্যান্ডব্যাগ এবং সুটকেসে ধূলা জমতে লাগল। সে একটা টেলিফোন নাম্বার দিয়ে গিয়েছিল। টেলিফোন নাম্বার লেখা চিরকুট তিনি ড্রয়ারে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। অযত্নে অবহেলায় রাখা কাগজপত্র সব সময় পাওয়া যায়। যত্নে রাখা কাগজ কখনো পাওয়া যায় না। মারফির এই সূত্র ভুল প্রমাণিত হল। মিসির আলি ড্রয়ার খুলেই চিরকুটটি পেলেন এবং সেই চিরকুট দেখে তিনি ছোটখাটো একটা চমক খেলেন। চিরকুটে টেলিফোন নাম্বার লেখা নেই। শুধু সুন্দর অক্ষরে লেখা Help me!

মিসির আলির একটু মন খারাপ হল। মেয়েটির সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনলেই হত। তিনি এতটা অধৈৰ্য হলেন কেন? বাড়িঘর ছেড়ে নিতান্ত অকারণে এই বয়সের একটা মেয়ে চলে আসে না। এই বয়সের মেয়েদের মাথায় নানান উদ্ভট ব্যাপার খেলা করে তারপরেও বাড়িঘর ছাড়ার ব্যাপারে তারা খুব সাবধানী হয়। আশ্রয় মেয়েদের কাছে অনেক বড় ব্যাপার। প্রকৃতি মেয়েদের সেই ভাবেই তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে এরা সন্তানের জন্ম দেবে। সেই জন্যে তাদের নিরাপদ আশ্ৰয় দরকার। কাজেই হে মাতৃজাতি তোমরা আশ্রয় কখনো ছাড়বে না। এই হল ডি এন এর অনুশাসন। ডি এন এ অনুশাসনের বাইরে যাবার ক্ষমতা তাদের নেই।

মেয়েটি তার সঙ্গে যোগাযোগের কোনো পথ রাখে নি। পথ রাখলে তিনি বলতেনহ্যাঁ আমি এখন তোমার কথা শুনব। সত্যি-মিথ্যা সব কথাই শুনব। আগের বারে তোমার কথা শুনতে চাই নি। তোমার হাত থেকে রক্ষা পাবার ব্যাপারটাই আমার মাথায় প্রবলভাবে ছিল। তার জন্যে আমি দুঃখিত।

মেয়েটি তার হ্যান্ডব্যাগ বা সুটকেসে কোনো ঠিকানা কি রেখে গেছে?

সুটকেস খুললে কোনো গল্পের বই কি পাওয়া যাবে যেখানে তার নাম এবং বাড়ির ঠিকানা লেখা? বই পেলেও লাভ হবে না। এখনকার মেয়েরা বই-এ নিজের নাম লিখলেও বাড়ির ঠিকানা লেখে না। বাড়ির ঠিকানা লেখাটাকে গ্ৰাম্যতা বলে ধরা হয়। ডায়েরি পেলে সবচে ভালো হত। ডায়েরিতে নাম ঠিকানা থাকে। তবে ডায়েরি পাবার সম্ভাবনা অতি সামান্য। আজকালকার মেয়েদের ডায়েরি লেখার মতো সময় নেই। নিজেদের কথা তারা শুধু গোপন করতে চায়। লিখতে চায় না।

মিসির আলি মেয়েটির সুটকেস খুললেন। কয়েকটা শাড়ি, পলিথিনে মোড়া দু জোড়া স্যাণ্ডেল, হেয়ার ড্রায়ার, ট্রাভেলার্স, আয়রন, কিছু কসমেটিকস, এক বোতল পানি, সুন্দর একটা চায়ের কাপ। একটা ফুলতোলা বেডশিট।

বই এবং ডায়েরি পাওয়া গেল না। তবে বেডশিটের নিচে একগাদা কাগজ পাওয়া গেল। দামি ওনিয়ন স্কিন পেপার। কাগজে চিকন নিকের কালির কলমে গুটিগুটি করে। ঠাসবুনন লেখা। যত্ন করে কেউ অনেক দিন ধরে লিখেছে। মনে হচ্ছে দীর্ঘ কোনো চিঠি। কাকে লেখা? মিসির আলি ভুরু কুঁচকে সম্বোধন পড়লেন–

শ্ৰদ্ধাস্পদেষু
জনাব মিসির আলি সাহেব।
চিঠিতে তারিখ নেই। যে লিখছে তার নামও নেই। এর হাতের লেখা এবং চিত্রার হাতের লেখা কি এক? ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্ট ছাড়া বলা যাবে না। চিত্রা ইংরেজিতে লিখেছে হেল্প মি, আর এই দীর্ঘ চিঠি লেখা বাংলায়। ইংরেজি এবং বাংলা হাতের লেখায় মিল-অমিল চট করে চোখে পড়ে না। তার পরেও মিসির আলির মনে হল দীর্ঘ এই চিঠির লেখিকা এবং চিত্ৰ এক মেয়ে নয়।

মেয়েটি বাইরে যাবার প্রভৃতি নিয়ে তার ব্যাগ গোছায় নি। মেয়েরা ব্যাগ গুছানোর সময় অবশ্যই প্রথম নেবে। আন্ডার গার্মেন্টস, পেটিকেট, ব্লাউজ, ব্ৰা, প্যান্টি। এইসব কাপড়ের ব্যাপারে তারা অতিরিক্ত সেনসেটিভ। ব্যাগে আগে এইসব গুছানো হবে তারপর অন্য কিছু। কিন্তু মেয়েটির সুটকেস বা হ্যান্ডব্যাগে এইসব কিছু নেই। টীওয়েলও নেই। মেয়েটি ঘর ছাড়ার জন্যে ব্যাগ গোছায় নি। তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য কি তাকে দীর্ঘ চিঠিটা নাটকীয় ভঙ্গিতে দেয়া?

শ্রদ্ধাষ্পদেষু

শ্ৰদ্ধাষ্পদেষু
জনাব আপনাকে কেমন ভড়কে দিলাম। সরাসরি চিঠিটা আপনার কাছে দিলে আপনি এত আগ্রহ নিয়ে পড়তেন না। কাজেই সামান্য নাটক করতে হল। আশা করি আমার এই ছেলেমানুষ নাটকে আপনি বিরক্ত হন নি।

আমি আপনাকে চিনি না। আপনার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয় নি। আপনার সম্পর্কে যা জানি বই পড়ে জানি! বইয়ে লেখকরা সবকিছু ঠিকঠাক লিখতে পারেন না। মূল চরিত্রগুলিকে তারা মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেন। আমি ধরেই নিয়েছি আপনার বেলাতেও তাই হয়েছে। বইয়ের মিসির আলি এবং ব্যক্তি মিসির আলি এক নন। কে জানে আপনি হয়তো বইয়ের মিসির আলির চেয়েও ভালো মানুষ।

আমি আপনার সম্পর্কে মনে মনে একটা ছবি দাড় করিয়েছি-আচ্ছা দেখুন তো সেই ছবিটার সঙ্গে কতটুকু মেলে। তারও আগে একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে নেই। আমার ধারণা। আপনি এখন তুরু কুঁচকে ভাবছেন, চিঠির মেয়ে এবং চিত্রা কি এক? ব্যাপারটা আমি ধীরে ধীরে পরিষ্কার করুব। আপাতত আপনি এটা নিয়ে চিন্তা করবেন। না। আপনাকে লেখা চিঠিটা মন দিয়ে পড়ুন। এই চিঠি আমি দু বছর ধরে রাত জেগে লিখেছি। অসংখ্য বার কাটাকুটি করেছি। বানান ঠিক করেছি। যেন চিঠি পড়ে। আপনি কখনো বিরক্ত হয়ে না। ভাবেন-মেয়েটা এই সহজ বানানও জানে না। আশ্চর্য তো!

ভালো কথা আপনার সম্পর্কে আমার ধারণা কী এখন বলি, দেখুন তো মেলে কি না। আমার ধারণা। আপনি হাসিখুশি ধরনের মানুষ। বইয়ে আপনার যে গভীর প্রকৃতির কথা লেখা হয় সেটা ঠিক না। আপনার চেহারার যে বর্ণনা বইয়ে থাকে সেটাও ঠিক না। আপনার বিশেষত্বহীন চেহারার কথা লেখা হলেও আমি জানি আপনার চেহারা মোটেও বিশেষত্বহীন নয়। আপনার চোখ ধারালো ও তীব্র সার্চ লাইটের মতো। তবে সেই ধারালো চোখেও একটা শান্তি শান্তি ভাব আছে। আমার খুব ইচ্ছা কোনো একদিন আপনাকে এসে দেখে যাব। শান্ত ভঙ্গিতে আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকব। একসময় আপনাকে বলব, আমাকে একটা হাসির গল্প বলুন তো। আমার কেন জানি মনে হয়। কেউ আপনার কাছে গল্প শুনতে আসে না। সবাই আসে ভয়ঙ্কর সব সমস্যা নিয়ে। দিনের পর দিন এইসব সমস্যা শুনতে কি আপনার ভালো লাগে? মাঝে মাঝে আপনার কি ইচ্ছা করে না সহজ স্বাভাবিক গল্প শুনতে এবং বলতে? যেমন আপনি একটা ভূতের গল্প শুনে ভয় পাবেন। ভুরু কুঁচকে ভাববেন-না, ভূত বলে কিছু নেই।

আমাদের চারপাশের জগৎটা সহজ স্বাভাবিক জগৎ, এই জগতে মাঝে মাঝে বিচিত্র এবং ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে! আমার নিজের জীবনেই ঘটে গেল। এবং আমি আপনাকে সেই গল্পই শুনাতে বসেছি। না শুনালেও চলত। কারণ আমি আপনার কাছ থেকে কোনো সাহায্য চাচ্ছি না। বা আপনাকে বলছি না। আপনি আমার সমস্যার সমাধান করে দিন। তারপরেও সব মানুষেরই বোধহয় ইচ্ছা করে নিজের কথা কাউকে না কাউকে শুনাতে। আমার চারপাশে তেমন কেউ নেই।

এখন আমি আপনার একটা অস্বস্তি দূর করি। চিত্রা নামের যে মেয়েটি আপনার কাছে এসেছিল আমি সেই মেয়ে। কাজেই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। চিত্রার সেদিন আপনাকে কেমন লেগেছিল তা আর আপনাকে কোনোদিন জানানো হবে না। কারণ চিত্রার সঙ্গে আপনার আর কোনোদিন দেখা হবে না। আপনাকে খানিকটা ধাধায় ফেলে চিত্রা বিদেয় নিয়েছে! আমিও বিদায় নেব। আমার দীর্ঘ চিঠি শেষ করার পর আপনি ভাববেন-আচ্ছা মেয়েটার কি মাথা খারাপ? সে এইসব কী লিখেছে? কেনই বা লিখেছে? দীর্ঘ লেখা পড়তে আপনার যেন ক্লান্তি না লাগে সে জন্যে আমি খুব চেষ্টা করেছি। চেষ্টা কতটুকু সফল হল কে জানে। চ্যাপ্টার দিয়ে দিয়ে লিখলাম। চ্যাপ্টারের প্ৰথম কয়েক লাইন পড়ে। আপনি ঠিক করবেন। আপনি পড়বেন কি পড়বেন না। সব চ্যাপ্টার যে পড়তেই হবে তা না।

পরিচয়

নাম : চিত্রা (নকল নাম)

বয়স : ২৩ বছর। (যখন লেখা শুরু করেছিলাম। তখন বয়স ছিল ২০ বছর তিন মাস)।

উচ্চতা : পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি।

আমার প্রিয় রঙ : চাঁপা!

আমার দেখতে ভালো লাগে। চাঁদ এবং পানি।

পড়াশোনা : এস. এস. সি. পাস করার পর আর পড়াশোনা করতে পারি নি। তবে আমি খুব পড়ুয়া মেয়ে। শত শত বই পড়ে ফেলেছি। শুধু গল্পের বই না। সব ধরনের বই। বাড়িতে আমি যেন পড়তে পারি। সে জন্যে আমার একজন শিক্ষক আছেন। দর্শনবিদ্যার শিক্ষক। তবে দৰ্শন আমার প্রিয় বিষয় নয়।

আমি কেমন মেয়ে? ভালো মেয়ে। খুব ভালো মেয়ে। আপনি নিশ্চয়ই মনে মনে হাসছেন। ভাবছেন এই মেয়েটা এমন ছেলেমানুষ করছে কেন? আমি তো আসলে ছেলে মানুষই। ২৩ বছর তো এমন কোনো বয়স না। তাই না? তবে আমি কিন্তু আসলেই ভালো

দূর ছাই লেখার এই ধরনটা আমার ভালো লাগছে না। আমি বরং ধারাবাহিকভাবে শুরু করি। পড়তে পড়তে আমার সম্পর্কে আপনার ধীরে ধীরে একটা ধারণা তৈরি হবে। তখন আর আমাকে বলতে হবে না যে আমি ভালো মেয়ে। আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।

খুব অল্প বয়সে রোড অ্যাকসিডেন্টে আমার মা মারা যান। বান্দরবান থেকে একটা ঞ্জিপে করে আমরা আসছিলাম। আমার বাবা গাড়ি চালাচ্ছিলেন। বাবার পাশে মা বসেছিলেন। মার কোলে আমি। হঠাৎ গাড়ির সামনে একটা ছাগল পড়ল। বাবা সেই ছাগল বাঁচাতে গিয়ে গাড়ি নিয়ে খাদে পড়ে গেলেন। মা তৎক্ষণাৎ মারা গেলেন। আমার এবং বাবার কিছু হল না। বান্দরবানের রাস্তাগুলি খুব নির্জন থাকে। অ্যাকসিডেন্টের অনেক পরে লোকজন এসে আমাদের উদ্ধার করল। আমার তখন বয়স মাত্র দেড় বছর। আমার কিছু মনে নেই।

আমার বাবা পরে আবার বিয়ে করেন। সেই বিয়ে সুখের হয় নি। ছোট মার মেজাজ খুব খারাপ ছিল। তিনি অল্পতেই রেগে যেতেন। তাঁর আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল। বাবার সঙ্গে রাগারগি হলেই বলতেন, সুইসাইড করব। শেষ পর্যন্ত মা সুইসাইড করেন। এই নিয়ে খুব ঝামেলা হয়। মা পক্ষের লোকজন মামলা করেন। তারা বলার চেষ্টা করেন মাকে মেরে ফেলা হয়েছে। যাই হোক মামলায় প্রমাণিত হয়, মা মানসিক রোগী ছিলেন। ছোট মা দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। গায়ের রঙ অবিশ্যি শ্যামলা ছিল। কিন্তু তার চেহারা এতই মিষ্টি ছিল—শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করত।

আপনি বুঝতেই পারছেন আমার শৈশবটা সুখের ছিল না। একটা বিরাট বাড়িতে আমি প্রায় একা একাই মানুষ হই। আমাদের বাড়িটা ছিল টু ইউনিট। একতলায় রান্নাঘর, খাবার ঘর, বসার ঘর, স্টাডি আর দোতলায় শুধুই শোবার ঘর আর ফ্যামিলি লাউঞ্জ। কাজের লোকদের দোতলায় ওঠা নিষেধ ছিল। তারা সবাই বাবাকে ভয় পেত বলে দোতলায় উঠত না। আমি স্কুল থেকে ফিরে একা একাই দোতলায় খেলতাম। আমার মতো বাচ্চারা মনে মনে একজন খেলার সাখী তৈরি করে নেয়, তার সঙ্গেই খেলে। আমিও তাই করলাম। একজন খেলার সাখী বানিয়ে নিলাম। সেই খেলার সাখী হল আমার মা। আমার ছোট মা। আমার আসল মাকে তো আমি দেখি নি, কাজেই তার সম্পর্কে আমার কোনো মমতা বা ভালবাসা কিছুই ছিল না। ছোট মা আমাকে খুবই আদর করতেন। সেই আদরের একটা ছোট্ট নমুনা দিলেই আপনি বুঝবেন। যেমন মনে করুন। তিনি আমাকে ডাকছেন-চিত্রা খেতে এস। চিত্রা কলার আগে তিনি একগাদা আদরের নাম অতি দ্রুত বলে যাবেন। তারপর বলবেন খেতে এস। তাঁর আদরের নামগুলি হল

ভিটভিটি খিটখিটি,
মিটমিটি ফিটফিটি
ভুতুন খুনখুন
সুনসুন ঝুনঝুন।
এ্যাং বেঙ ঝেং, টেঙা টেঙ।

আদরের নাম ছাড়াও তাঁর নিজের কিছু কিছু বিচিত্র ছাড়াও ছিল। ননসেন্স রাইমের মতো কোনো অর্থ নেই, কোনো মানে নেই। সেই সব ছড়া তিনি গানের সুরে বলতেন। সব সুর এক রকম। যেমন ধরুন–

ফানিম্যান হাসে তার
রং ঢং হাসি।
জানা কথা যে জানে না
না শুনে সে বাঁশি।

এইসব বিচিত্র ছড়া বলে তিনি খিলখিল করে হাসতেন। আমার খুবই মজা লাগত। মনে হত আহ। কী আনন্দময় আমার জীবন।

অতি আদরের একজন মানুষ আমার খেলার সাথী হবে এটাই স্বাভাবিক। আমি নিজের মনে পুতুল খেলতাম, রান্নাবাটি খেলতাম এবং ক্রমাগত ছোট মায়ের সাথে কথা বলতাম, প্রশ্ন করতাম, ছোট মা উত্তর দিতেন। উত্তর তো আসলে দিতেন না। আমি উত্তরটা কল্পনা করে নিতাম। তখন আমার বয়স সাত। সাত বছরের বাচ্চারা এই ধরনের খেলা খেলে। এটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু একদিন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটল। সেদিন স্কুল ছুটি ছিল। বাবা গেছেন ঢাকার বাইরে। আমি সারা দিন একা একা খেলেছি।

সন্ধ্যাবেলা আমার শরীর খারাপ করল? গা কেঁপে জ্বর এল। আমি চাদর গায়ে বিছানায় শুয়ে আছি। কিছু ভালো লাগছে না। খাট থেকে একটু দূরে আমার পড়ার টেবিল। টেবিলে বাবার এনে দেয়া মোটা একটা ইংরেজি ছবির বই। শুয়ে শুয়ে ছবি দেখতে ইচ্ছা করল। বিছানা থেকে নেমে যে ছবির বইটা আনব সেই ইচ্ছা করছে না। আমি অভ্যাসমতো বললাম, ছোট মা বইটা এনে দাও। কল্পনার খেলার সাখী মাকে এই জাতীয় অনুরোধ আমি প্রায়ই করি। সেই অনুরোধ আমি নিজেই পালন করি। তারপর বলি, থ্যাংক ইউ ছোট মা। ছোট মারি হয়ে আমি প্রায়ই বলি, ইউ আর ওয়েলকাম।

সেদিন সন্ধ্যায় অন্য ব্যাপার হল। অবাক হয়ে দেখলাম ছোট মা টেবিলের দিকে যাচ্ছেন। বইটা হাতে নিয়ে বিছানার দিকে ফিরছেন। বইটা আমার দিকে ধরে আছেন। আমি এতই অবাক হয়েছি যে হাত বাড়িয়ে বইটা নিতে পর্যন্ত ভুলে গেছি। ছোট মা আমার বিছানার পাশে বইটা রেখে নিঃশব্দে বের হয়ে গেলেন। খোলা দরজাটা হাত দিয়ে ভিড়িয়ে দিয়ে গেলেন। ভয়ে আমার চিৎকার করে ওঠা উচিত ছিল। আমি চিৎকার করলাম না। ভয়ের চেয়ে বিস্ময়বোধই আমার প্রবল ছিল। চোখে ভুল দেখেছি। এই জাতীয় চিন্তা আমার একবারও মনে আসে নি। বরং মনে হয়েছে আমি যা দেখছি ঠিকই দেখছি। ছোট মা আমাকে দেখতে এসেছেন। আমার শরীর ভালো না তো এই জন্যে আমাকে দেখতে এসেছেন।

নিঃসঙ্গ শিশুরা তার চারপাশের জগৎ সম্পর্কে অনেক ব্যাখ্যা নিজেরা দাড় করায়। আমিও একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেললাম। এই ব্যাখ্যায় অসুস্থ শিশুঁকে দেখতে মৃত মানুষ ফিরে আসতে পারেন।

যদিও আমি নিজেই একটা ব্যাখ্যা দাড় করালাম তারপরেও আমার মনে হল এই ব্যাখ্যায় কিছু ফাকি আছে। ফাঁকির ব্যাপারটা আমি নিজে জানতে চাচ্ছিলাম না। কাজেই মাকে দেখতে পাওয়ার কথাটা কাউকে বললাম না। আমার মনে হল পুরো ব্যাপারটায় এক ধরনের গোপনীয়তা আছে। কেউ জেনে ফেললে মা রাগ করবেন, তিনি আর আসবেন না।

সেই রাতে আমার জ্বর খুব বাড়ল। মাথায় পানি দেয়া হল। তাতে কাজ হল না। বাথটাবে বরফ মেশানো ঠাণ্ডা পানিতে আমাকে ড়ুবিয়ে রাখা হল। ডাক্তার ডাকা হল। চিটাগাং-এ আমার বাবাকে জরুরি খবর পাঠানো হল। আমার খুব ভালো লাগতে লাগল এই ভেবে যে, যেহেতু আমার শরীর খুব খারাপ করেছে আমার ছোট মা নিশ্চয়ই আবারো আমাকে দেখতে আসবেন। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ছোট মা অবিশ্যি এলেন না।

আমার এই ঘটনা শুনে আপনি কী ভাবছেন তা আমি জানি। আপনি ভাবছেন হেলুসিনেশন। একটি নিঃসঙ্গ শিশু তার নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্যে নিজের মধ্যে একটি জগৎ সৃষ্টি করেছে। হেলুসিনেশনের জন্ম সেই জগতে। আপনারা সাইকিয়াট্রিস্টরা খুব সহজেই সবকিছু ব্যাখ্যা করে ফেলেন। আপনাদের কাছে রহস্য বলে কিছু নেই। আইনষ্টাইন যখন বলেন সৃষ্টি রহস্যময়, সব রহস্যের জট এই মুহুর্তে খোলা সম্ভব না। তখন আপনারা বলেন, ব্যাখ্যাতীত বলে কিছু নেই। সবকিছু ব্যাখ্যা করা যায়। আমার এক জীবনে আমাকে অনেক সাইকো এনালিসিসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি এই সব ব্যাপার খুব ভালো জানি। আপনাদের মতো মনোবিদ্যা বিশারদদের দেখলে আমার সত্যিকার অর্থেই হাসি পায়। আপনারা একেকজন কী গভীর ভঙ্গিতে কথা বলেন, যেন পৃথিবীর সবকিছু জেনে বসে আছেন। অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্কর হয়। আপনাদের বিদ্যা শুধু যে অল্প তাই না, শূন্য বিদ্যা।

আপনি কি রাগ করছেন?

দয়া করে রাগ করবেন না। আমি জানি আপনি অন্যদের মতো না। আপনি আপনার সীমারেখা জানেন। প্রকৃতি মানুষের চারদিকে একটা গণ্ডি এঁকে দিয়ে বলে দেয়-এর বাইরে তুমি যেতে পারবে না। তোমার অতি উন্নত জ্ঞানবিজ্ঞান নিয়েও তোমাকে থাকতে হবে এই গণ্ডির ভেতর। এই সত্য আপনার জানা আছে। আপনি গণ্ডির ভেতর থেকেও গণ্ডি অতিক্রম করতে চেষ্টা করেন। এইখানেই আপনার বাহাদুরি। বড় বড় কথা বলছি? হয়তো বলছি। তবে এগুলি আমার নিজের কথা না। অন্য একজনের কথা। সেই অন্য একজন প্রচুর জ্ঞানের কথা বলেন এবং খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন। তিনি যে জ্ঞানের কথা বলছেন তা তখন মনে হয় না। একটু চিন্তা করলেই মনে হয় ওরে বাবারে-এ তো অসম্ভব জ্ঞানের কথা। এই প্রসঙ্গে আমি পরে বলব। তবে আপনি হচ্ছেন মিসির আলি, কে জানে ইতিমধ্যে হয়তো অনেক কিছু বুঝে ফেলেছেন।

আপনি কীভাবে চিন্তাভাবনা করে একটা সমস্যা সমাধানের দিকে এগোন তা আমার জানতে ইচ্ছা করে। চিন্তাশক্তি আমার নিজের খুবই কম। সহজ রহস্যই ধরতে পারি না। আমাদের স্কুলে একবার একজন ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক দেখাতে এসেছিলেন। বেচারি খুবই আনাড়ি ধরনের। যে ম্যাজিকই দেখান সবাই ধরে ফেলে। একমাত্র আমিই ধরতে পারি না। তিনি যা দেখান তাতেই আমি মুগ্ধ হই। আপনার সমস্যা সমাধানের পদ্ধতিও হয়তো ম্যাজিকের মতো। সেই ম্যাজিক দেখে মুগ্ধ হতে ইচ্ছা করে। আচ্ছা এই এতগুলি পাতা যে পড়লেন এর মধ্যে আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ইনফরমেশন দিয়ে দিয়েছি। বলুন তো ইনফরমেশনটা কী? যদি বলতে পারেন তা হলে বুঝব আপনার সত্যি বুদ্ধি আছে। বলতে না পারলে তেত্রিশ পৃষ্ঠায় দেখুন।

মিসির আলি পড়া বন্ধ করলেন। তেত্রিশ পৃষ্ঠা না দেখে মেয়েটির সম্পর্কে বিশেষ কী বলা হয়েছে বের করার চেষ্টা করলেন। যা বলা হয়েছে তার বাইরে কি কিছু আছে? হ্যাঁ আছে, মেয়েটা তার আসল নাম বলেছে। তার আসল নাম ফারজানা। ফানিম্যান ছড়াটির প্রতি লাইনের প্রথম অক্ষর নিলে ফারজানা নামটা পাওয়া যায়। এমন জটিল কোনো ধাধা না। এ ছাড়া আর কিছু কি আছে? আরেকবার পড়তে হবে। তবে যা পড়েছেন তাতে মেয়েটিকে খুঁজে বের করে ফেলার মতো তথ্য আছে। ফারজানা মেয়েটি বোধ হয় তা জানে না। যেমন মেয়েটির বাবার নামে একটি হত্যা মামলা হয়েছিল। সেই মামলা ডিসমিস হয়ে যায়। আদালতের নথিপত্র ঘাটলেই বের হয়ে পড়বে। ডেড বিডির পোস্টমর্টেম হয়েছিল। হাসপাতাল থেকেও সেই সম্পর্কিত কাগজপত্র পাওয়া যাবে। একটু সময়সাপেক্ষ, তবে সহজ।

সেই সময়কার পুরোনো কাগজ ঘাটলেও অনেক খবর পাওয়া যাওয়ার কথা। পাষণ্ড খামীর হাতে স্ত্রী খুন জাতীয় খবর পাঠক-পাঠিকারা খুব মজা করে পাঠ করেন। পত্রিকাওয়ালারা গুরুত্বের সঙ্গে সেইসব খবর ছাপেন। প্রথম পাতাতেই ছবিসহ খবর আসার কথা। তারপরের কয়েকদিন খবরের ফলে আপ।

অবিশ্যি বাংলাদেশে পুরোনো কাগজ ঘাটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। যে কবার তিনি পুরোনো কাগজ ঘাটতে গেছেন সে কবারই তার মাথা খারাপ হবার যোগাড় হয়েছে। বিদেশের মতো ব্যবস্থা থাকলে ভালো হত। সবকিছু কম্পিউটারে ঢুকানো, বোতাম টিপে বের করে নেয়া।

মিসির আলি তার খাতা বের করলেন। কেইস নাম্বার দিয়ে ফারজানার নামে একটা ফাইল খোলা যেতে পারে। খাতার পাতায় ফারজানা নাম লিখতে গিয়ে মিসির আলি ইতস্তত করতে লাগলেন। ফাইল খোলার দরকার আছে কি? এখনো বোঝা যাচ্ছে না, ফারজানার লেখা সব কটা পাতা না পড়লে বোঝা যাবেও না। মিসির আলি পেনসিলে গোটা গোটা করে লিখলেন,

নাম। ফারজান।

বয়স : ২৩

রোগ : স্কিজোফ্ৰেনিয়া???

স্কিজোফ্ৰেনিয়া লিখে তিনবার প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিলেন। ফারজানার লেখা যে কটি পাতা এখন পর্যন্ত পড়েছেন তা তিনি আরো তিনবার পড়বেন। তারপর ঠিক করবেন। প্ৰশ্নবোধক চিহ্নগুলি রাখবেন, কি রাখবেন না। সে যা লিখেছে তা সত্যি কি না তাও দেখার ব্যাপার আছে। সত্যি কথা না লিখলে তথ্যে ভুল থাকবে। প্রথম পাঠে তা ধরা পড়বে না। যত বেশি বার পড়া হবে ততই ধরা পড়তে থাকবে। তার নিজের নামটা সে যেমন কায়দা করে ঢুকিয়ে দিয়েছে তার থেকে মনে হয় আরো অনেক নাম লেখার ভেতর লুকিয়ে আছে। সেগুলিও খুঁজে বের করতে হবে। তার মায়ের নাম কি চাপা? প্রিয় রঙ বলছে চাপা। আবার প্রিয় দুটি জিনিস চাঁদ এবং পানির প্রথম অক্ষর নিলেও চাপা হচ্ছে। এটা কাকতালীয়ও হতে পারে। যদি কাকতালীয় না হয় তা হলে মেয়েটি তার সঙ্গে রহস্য করছে কেন? এই রহস্য করার জন্য তাকে প্রচুর সময় দিতে হয়েছে। চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে। এটা সে কেন করছে? ব্যাপারটা ছেলেমানুষি তো বটেই। ফাইভ সিক্সে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা এইসব করতে পারে। ২৩ বছরের একটা মেয়ে তুচ্ছ ধাঁধা তৈরি করার জন্য সময় নষ্ট করবে: কেন? ব্যাপার কী এমন যে মেয়েটার কিছু করার নেই। দিনের পর দিন যারা বিছানায় শুয়ে থাকে তারা ক্রসওয়ার্ড পাজল, বা ব্রেইন টিজলার জাতীয় খেলায় আনন্দ পেতে পারে। এমনকি হতে পারে যে মেয়েটিকে দিনের পর দিন শুয়ে থাকতে হচ্ছে। চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে হাতে পাতার পর পাতা লেখা কষ্টকর। সে লিখেছে ১০০ পৃষ্ঠা, লিখতে তার সময় লেগেছে ২ বছর। একটা পৃষ্ঠা লিখতে তার গড়পড়তা সময় লেগেছে সাতদিনের কিছু বেশি। লেখাগুলি লেখা হয়েছে কালির কলমে। চিৎ হয়ে শুয়ে কালির কলমে লেখা যায় না। তাকে লিখতে হয়েছে উপুড় হয়ে। উপুড় হয়ে যে লিখতে পারে সে বিছানায় পড়ে থাকার মতো অসুস্থ না। কাজেই সে শয্যাশায়ী একজন রোগী এই হাইপোথিসিস বাতিল।

মিসির তার খাতায় গুটিগুটি করে লিখলেন-ফারজানা মেয়েটি শারীরিকভাবে সুস্থ।

তিনি আরেকটি কাজও করলেন-ফারজানার এক শ পৃষ্ঠার কোন অংশগুলি দিনে লেখা হয়েছে-কোন অংশগুলি রাতে লেখা হয়েছে–তা হলুদ মার্কার দিয়ে আলাদা করলেন। কাজটা জটিল মনে হলেও আসলে সহজ। ব্লাতে আলো কমে যায় বলে রাতের লেখায় অক্ষরগুলি সামান্য বড় হয়। এবং লেখা স্পষ্ট করার জন্যে কলমে চাপ দিয়ে লেখা হয়। দিনের লেখা এবং রাতের লেখা আলাদা করার তেমন কোনো কারণ নেই। তারপরেও করে রাখা-হঠাৎ যদি এর ভেতর থেকে কিছু বের হয়ে আসে। খড়ের গাদায় হারিয়ে যাওয়া সুচও পাওয়া যায়। যদি ধৈর্য ধরে প্রতিটি খড়ু-একটি একটি করে আলাদা করা হয়। মিসির আলি তাঁর অনুসন্ধানে ইনটিউশন যত না ব্যবহার করেন-পরিশ্রম তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহার করেন।

ছোট মা

ছোট মাকে আমি দেখতে শুরু করলাম। প্রথম প্রথম দু দিন, তিন দিন পরপর হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্যে দেখা যেত। তারপর রোজা-ই দেখতে পেতাম।

শুরুতে তিনি আমার সঙ্গে কোনো কথা বলতেন না। আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে চুপচাপ শুনতেন। তারপর কথা বলা শুরু করলেন। কথা বলতেন। ফিসফিস করে। কোথাও কোনো শব্দ হলে দারুণ চমকে উঠতেন।

হয়তো বাতাসে দরজা নড়ে উঠল-সেই শব্দে মা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ছুটে চলে গেলেন পর্দার আড়ালে। ছোট মারা দেখা পাওয়াটা ঠিক স্বাভাবিক ধ্যাপার না এটা আমার বোধের ভেতর ছিল। আমি এর বাইরেও কিছু কিছু ব্যাপার লক্ষ করলাম। যেমন ছোট মা কখনো কিছু খান না। আমি কমলা সেধেছি। প্লেট থেকে কেক তুলে দিয়েছি। তিনি কখনো কিছুমুখে দেন নি। তিনি যখন আশপাশে থাকতেন তখন আমি এক ধরনের গন্ধ পেতাম। মিষ্টি গন্ধ, তবে ফুলের গন্ধ না। ওষুধ ওষুধ গন্ধ!

আসল ছোট মার সঙ্গে এই মায়ের কিছু অমিলও ছিল। যেমন ছোট মা আমাকে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত নামে ডাকতেন। ইনি ডাকতেন না। একদিন আমি নিজেই বললাম, তুমি ওই নামগুলি বল না। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, কোন নাম? তা থেকে বুঝলাম নামগুলি তিনি জানেন না।

ছোটরাও নিজেদের মতো করে কিছু পরীক্ষাটরীক্ষা করে। আমিও ছোট মাকে নিয়ে কিছু পরীক্ষা করলাম-যেমন একদিন জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী?

ছোট মা বললেন, জানি না তো।

আমি বললাম, সত্যি জান না?

তিনি বললেন, না। আমার কী নাম?

আমি বললাম, তোমার নাম চাপা।

তিনি খুবই অবাক হয়ে বললেন, তাই নাকি? আমার সামান্য খটকা লাগলেও আমি নিৰ্বিকার ছিলাম। একজন খেলার সাখী পেয়েছি, এই আমার জন্যে যথেষ্ট ছিল।

ছোট মা খেলার সঙ্গী হিসেবে চমৎকার ছিলেন। যা বলা হত। তাই ক্লোবটের মতো করতেন। কোনো প্রশ্ন করতেন না! মাদের ভেতর খবরদারির একটা ব্যাপার থাকে। ওনার ভেতর তা ছিল না।

পায়ে মোজা নেই কেন?
ঘর নোংরা করছি কেন?
ঘুমাতে যাচ্ছ না কেন?

এ জাতীয় প্রশ্ন করে তিনি আমাকে কখনো বিব্রত করতেন না। আমার বেশ কজন টিচার ছিলেন। পড়ার টিচার, গানের টিচার, নাচের টিচার। তাঁরা যখন আসতেন–নিচ থেকে ইন্টারকমে আমাকে বলা হত। আমি নিচে যাবার জন্যে তৈরি হতাম। মাকে সেই সময় খুব বিব্রত মনে হত। তিনি যেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। কী করবেন। তাঁকে খুব কাঁদতেও দেখতাম। দু হাতে মুখ ঢেকে খুনখুন করে কাঁদতেন। চোখ দিয়ে তখন অবিশ্যি পানি পড়ত না। তাঁর কান্না সব সময় ছিল অশ্রুবিহীন!

মিসির আলি সাহেব। আপনি আমার সামনে নেই বলে আপনার নিশ্চয়ই অসুবিধা হচ্ছে। হয়তো আপনার মনে অনেক প্রশ্ন উঠে আসছে, কিন্তু আপনি প্রশ্নগুলি করতে পারছেন না। সামনাসামনি থাকলে প্রশ্ন করতে পারতেন। আর আমি নিজেও ঠিক বুঝতে পারছি না…-কোনো ডিটেল বাদ পড়ে যাচ্ছে কি না। গুরুত্বহীন মনে করে আমি হয়তো অনেক কিছু লিখছি না-যা আপনার কাছে মোটেই গুরুত্বহীন না। তবু আপনার মনে সম্ভাব্য যেসব প্রশ্ন আসছে বলে আমার ধারণা-আমি তার জবাব দিচ্ছি।

প্রশ্ন : উনার গায়ে কী পোশাক থাকত?

উত্তর : সাধারণ পোশাক শাড়ি। যেসব শাড়ি আগে পরতেন। সেইসব শাড়ি।

প্রশ্ন। উনি কি হঠাৎ উপস্থিত হতেন এবং পরে বাতাসে মিলিয়ে যেতেন?

উত্তর : না। কখনো হঠাৎ উদয় হতেন না। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেন। বের হয়ে যাবার সময়ও দরজা খুলে বের হয়ে যেতেন। তাঁর পুরো ব্যাপারটাই খুব স্বাভাবিক ছিল। আঁকে আমি কখনো শূন্যে ভাসতে দেখি নি–কিংবা লম্বা একটা হাত বের করে দূর থেকে কিছু আনতে দেখি নি।

প্রশ্ন। তুমি নিশ্চিত যে উনি তোমার ছোট মা?

উত্তর : জি নিশ্চিত। তবে আগেই তো বলেছি–আমার চেনা ছোট মারি সঙ্গে তার কিছু অমিল ছিল-যেমন তিনি পড়তে পারতেন না। অথচ ছোট মা আমাকে রোজ রাতে গল্পের বই পড়ে শুনাতেন। কাজেই আমি একদিন উনাকে গল্পের বই পড়ে শুনাতে বললাম। তিনি লজ্জিত গলায় বললেন যে তিনি বই পড়তে জানেন না। তিনি আমাকে বই পড়া শেখাতে বললেন।

প্রশ্ন : তুমি তাকে বই পড়া শেখালে?

উত্তর : জি। উনি খুব দ্রুত শিখে গেলেন।

প্রশ্ন : উনি কি তোমার জন্যে কখনো কোনো উপহার নিয়ে এসেছেন?

উত্তর : জি এনেছেন।

প্রশ্ন : কী উপহার?

উত্তর : সেটা আমি আপনাকে বলব না।

প্রশ্ন : তুমি ছাড়া আর কেউ কি উনাকে দেখেছে?

উত্তর : জি না।

প্রশ্ন : তাকে দিনে বেশি দেখা যেত, না রাতে?

উত্তর : দিন রাত কোনো ব্যাপার ছিল না।

প্রশ্ন : সব সময়ই কি একই কাপড় পরা থাকতেন?

উত্তর : জি না। একেক সময় একেক কাপড় পরা থাকত।

প্রশ্ন : তিনি তোমার গায়ে হাত দিয়ে আদর করতেন?

উত্তর : জি করতেন। মাঝে মাঝে আমি তার কোলে উঠে বসে থাকতাম।

যেসব প্রশ্ন আমার মাথায় এসেছে তার উত্তর দিলাম। অনেক চিন্তা করেও আর কোনো প্রশ্ন পাচ্ছি না। আপনারা যারা সাইকিয়াট্রিস্ট তাঁরা তো রাজ্যের প্রশ্ন করেন। উদ্ভট সব প্রশ্ন। আপনার মাথাতেও নিশ্চয়ই উদ্ভট সব প্রশ্ন আসছে। ও না ভুল করলামআপনি তো আবার অন্যদের মতো না। আপনি প্রশ্ন করেন না। শুধু শুনে যান। একই গল্প বারবার শোনেন। শুনতে শুনতে হঠাৎ এক জায়গায় খটকা লাগে। সেখান থেকে আপনার যাত্রা শুরু হয়। আমার গল্পে কোথাও কি কোনো খটকা লেগেছে? নাকি পুরো গল্পই খটকাময়? পুরো গল্প খটকাময় হলে তো। আপনি কাগজগুলি ছুঁড়ে ফেলে বলবেন-আরে দূর দূর।

প্লিজ তা করবেন না। আমার অনেক কিছু বলার আছে। Please Help Me, আপনি নিশ্চয়ই এখন বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকাচ্ছেন। ভাবছেন মেয়েটার কী কনট্রাডিকশানসাহায্য চাচ্ছে, আবার কোনো ঠিকানা দিচ্ছে না। যোগাযোগ করছে না। নিজের পরিচয় গোপন করছে। আসল নাম না বলে, বলছে নাম চিত্রা। তা হলে সাহায্যটা করা হবে কীভাবে? আসলে আমি সাহায্য চাই না। কারণ আমি ভালোই আছি। আমার বিচিত্র জীবন সম্পর্কে আমি আপনাকে বলব। আপনি শুনবেন। আমার সমস্যার সমাধান করবেন। তার উপর একটা বই লেখা হবে। সেই বই কিনে আমি পড়ব। আমার এতেই হবে। এর বেশি সাহায্যের আমার প্রয়োজন নেই।

আরেকটা কথা-আপনি আবার ভাবছেন না তো আমার এই গল্প বানোয়াট গল্পী? আপনাকে বিভ্ৰান্ত করার জন্যে উদ্ভট একটা গল্প কেঁদেছি? একবার আপনার মাথায় এই ব্যাপারটা ঢুকে গেলে আপনি মনোযোগ দিয়ে আমার লেখা পড়বেন না। এমনও হতে পারে যে কাগজগুলি ডাক্টবিনে ফেলে দেবেন। আমার প্রধান দায়িত্ব আপনাকে বিশ্বাস করানো-আমি যা বলছি, সত্যি বলছি। আমার কাছে যা সত্যি অন্যের কাছে হয়তো নয়। সত্য একেক জনের কাছে একেক রকম। Truth has many faces. তাই না?

আমি যে সত্যি বলছি সেটা কী করে প্রমাণ করব? আমি জানি না। আমি আপনার হৃদয়ের মহত্ত্বের কাছে সমৰ্পণ করছি এবং আশা করছি আমাকে বিশ্বাস করবেন। আজ এই পর্যন্তই লিখলাম। মাথা ধরেছে—এখন আর লিখতে পারছি না। আপনার ঠোঁটে কি এখন মৃদু একটা হাসির রেখা? সাইকিয়াট্রিস্টরা মাথা ধরেছে বাক্যটা শুনলেই নড়েচড়ে বসেন। তাদের ভাবটা হচ্ছে–এইবার পাওয়া গেছে মাথায় সমস্যা বলেই মাথা ধরা।

আমেরিকার একজন সাইকিয়াট্রিস্টর কাছে গিয়েছিলাম। আমি যাই নি–আমার যাবা। আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ কথা বলার পরই গম্ভীর গলায় ফললেন, ইয়াং লেডি, তোমার কি প্রায়ই মাথা ধরে?

আমি বললাম–হ্যাঁ।

ভদ্রমহিলার ঠোঁটে আনন্দের হাসি দেখা গেল। ভাবটা হচ্ছে-I got you at last.

তারপর অসংখ্য প্রশ্ন, সবই মাথা ধরা নিয়ে।

কখন মাথা ধরে? রাতে বেশি, না দিনে?

মাথা ধরার সময় কি চোখ জ্বালা করে?

কান লাল হয়ে যায়?

মাথা ধরার তীব্ৰতা কেমন?

কতক্ষণ থাকে?

তখন কি পানির পিপাসা হয়?

আমি যখন বললাম, ম্যাডাম আমার মাথা ধরাটা খুবই স্বাভাবিক ধরনের। মাঝে মধ্যে মাথা ধরে-প্যারাসিটামল খাই, কিংবা গরম চা খাই। মাথা ধরা সেরে যায়। অদ্রমহিলা তাতে খুব হতাশ হলেন।

আপনিও কি হতাশ হচ্ছেন?

এমনিতে আমি কিন্তু খুব স্বাভাবিক মানুষ। আমি আমার মৃত মাকে দেখতে পেতাম এই অস্বাভাবিকতাটা ছোটবেলায় ছিল-বেশি দিনের জন্যে কিন্তু না। খুব বেশি হলে সাত কিংবা অ্যাট মাস। হঠাৎ একদিন সব আগের মতো হয়ে গেল। ছোট মার আসা বন্ধ হল। আমি কিছুদিন প্রবল হতাশায় কাটালাম। ছোটদের হতাশা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। তবে তার স্থায়িত্বও কম হয়। শিশুদের প্রবল শোক এবং প্রবল হতাশা কাটিয়ে ওঠার সহজাত ক্ষমতা থাকে। আমিও হতাশ কাটিয়ে উঠলাম। ধীরে ধীরে সব আগের মতো হয়ে গেল। অবিশ্যি ছোট মা আসা পুরোপুরি বন্ধ করলেন তাও না। তিনচার মাস পরপর হঠাৎ চলে আসতেন। আমি তখন বলতাম, এতদিন আস নি কেন? তিনি বলতেন-আসার পথ ভুলে যাই। মনে থাকে না। আমার জীবন যাপন স্বাভাবিক হলেও আমি বড় হচ্ছিলাম নিঃসঙ্গতায়। আমার চারপাশে কেউ ছিল না। আমার নিঃসঙ্গতা দূর করলেন নীতু আন্টি। তিনি আমাদের বাড়িতে থাকতে এলেন। আরো পরিষ্কার করে বলি-বাবা তাকে বিয়ে করলেন। আচ্ছা। আপনি কি বাবার ওপর বিরক্ত হচ্ছেন? কেমন মানুষ, একের পর এক বিয়ে করে যাচ্ছে! দয়া করে বিরক্ত হবেন না। আমার বাবা অসাধারণ একজন মানুষ।

এই যা মাথা ধরা নিয়ে অনেকক্ষণ লিখে ফেললাম। আচ্ছা আপনার কি এখন মাথা ধরেছে? কেন জিজ্ঞেস করলাম জানেন। ধরুন। আপনি একজনের সঙ্গে কথা বলছেন! যার সঙ্গে কথা বলছেন তার প্রচণ্ড মাথায় যন্ত্রণা। কিছুক্ষণ কথা বলার পরই দেখবেন আপনারও মাথা ধরেছে। কোনো কারণ ছাড়াই ধরেছে। এটা বহুল পরীক্ষিত একটা ব্যাপার। আমি অনেকবার পরীক্ষা করে দেখেছি! আপনিও করে দেখতে পারেন। এবার আপনাকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করছি। বলুন তো কোন প্রাণীর দুটা লেজ? খুব সহজ! একটু চিন্তা করলেই পেয়ে যাবেন।

মিসির আলি পড়া বন্ধ করলেন। তিনি অনেক ভেবেও বের করতে পারলেন নাকোন প্রাণীর দুটা লেজ। একবার টিকটিকির কথা মনে হয়েছিল। টিকটিকির একটা লেজ খসে গেলে আরেকটা গজায় সেই অর্থে টিকটিকিকে দুই লেজের প্রাণী কি বলা যায়? না-টিকটিকি হবে না।

উত্তরও কোথাও দেয়া নেই। মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলেই উত্তরটা জানা যাবে। দেখা হবার সম্ভাবনা কতটুকু? এখনো তেমন কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। কারণ মেয়েটিকে খুঁজে বের করার কোনো চেষ্টা তিনি করছেন না। বয়সের কারণে তাঁর ভেতর এক ধরনের আলস্য কাজ করা শুরু করেছে। আশপাশের জগৎ সম্পর্কে উৎসাহ কমে যাচ্ছে। লক্ষণ খুব খারাপ।

আত্মার মৃত্যু হলেই এ জাতীয় ঘটনা ঘটে। কোনো কিছুই মনকে আকৃষ্ট করে না। আত্মার মৃত্যু হয়েছে কি হয় নি তা বের করার একটা সহজ পদ্ধতির কথা তিনি জানেন। বৃষ্টি কেটে যাবার পর আকাশে যখন রঙধনু ওঠে সেই রঙধনুর দিকে তাকিয়ে যে চোখ নামিয়ে নেয় এবং দ্বিতীয়বার তাকায় না, তার আত্মার মৃত্যু হয়েছে। আকাশে রঙধনু না উঠলে তিনি তাঁর আত্মার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না।

মৃত আত্মাকে জীবনদান করারও কিছু পদ্ধতি আছে। সবচে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে শিশুদের সঙ্গে মেশা। শিশুরা সব সময় তাদের আশপাশের মানুষদের তাদের আত্মা থেকে খানিকটা ধার দেয়।

সমস্যা হচ্ছে শিশুদের মিসির আলি তেমন পছন্দ করেন না। এদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতেই তাঁর ভালো লাগে। শিশুরা সুন্দর-অসম্ভব সুন্দর। যে কোনো বড় সৌন্দর্যকে দেখতে হয় দূর থেকে। যত দূর থেকে দেখা যায় ততই ভালো। কুৎসিত জিনিস দেখতে হয় কাছ থেকে, সুন্দর জিনিস দূর থেকে। এটা যেন কার কথা? মিসির আলি মনে করতে পারলেন না। তাঁর স্মৃতিশক্তি কি দুর্বল হতে শুরু করেছে?

ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মস্তিষ্ক তার মেমোরি সেলে জমিয়ে রাখা স্মৃতি ফেলে দিয়ে সেলগুলি খালি করছে। মৃত্যুর ঠিক আগে আগে মেমোরি সেলে কোনো মেমোরি থাকে না। মস্তিষ্ক সব ফেলে দিয়ে ঘর খালি করে দেয়।

মিসির আলি ঘুমাতে গেলেন রাত দশটায়। ইদানীং তিনি খুব নিয়মকানুন মেনে চলার চেষ্টা করছেন। যেমন রাত দশটা বাজতেই ঘুমাতে যাওয়া। সকালবেলা মর্নিং ওয়াক। ঘড়ি ধরে কাজ করার চেষ্টা। রাত দশটায় ঘুমাতে গেলেও লাভ হচ্ছে না-ঘুম আসতে আসতে তিনটা বেজে যাচ্ছে। দশটা থেকে রাত তিনটা এই পাঁচ ঘণ্টা মস্তিষ্ককে পুরোপুরি নিস্ক্রিয় রাখা সম্ভব না। মিসির আলি সেই চেষ্টা করেনও না। তিনি শুয়ে শুয়ে ফারজানা মেয়েটিকে নিয়েই ভাবেন।

মেয়েটি স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগী! সে তা জানে না। অধিকাংশ স্কিজোফ্ৰেনিয়াকই তা জানে না। তারা ভেবে নেয়—তাদের দেখা জগৎই সত্যি জগৎ। অন্যদের জগৎ ভ্রান্তিময়। তাদের একটা যুক্তি অবশ্যই আছে। কালার ব্লাইন্ড একজন মানুষ সবুজ রঙ দেখতে পায় না। তার জগতে সবুজের অস্তিত্ব নেই। সে বলবে পৃথিবীতে সবুজ রঙ নেই। তার কাছে এটাই সত্যি। তার সেই জগৎ মিথ্যা নয়।

মিসির আলি জেগে আছেন–তাঁর মাথায় ফারজানা মেয়েটি নেই। তাঁর মাথায় ঘুরছে। কোন প্রাণীর লেজের সংখ্যা দুই। তার হঠাৎ মনে হল ফারজানা মেয়েটি ইচ্ছে করে তাঁর মাথায় এই ধাঁধাটি ঢুকিয়ে দিয়েছে। ধাঁধার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এটা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকবে। মেয়েটি এই ব্যাপার জানে। স্কিজোফ্রেনিয়াকরা খুব বুদ্ধিমান হয়ে থাকে। তারা নিজেরা বিভ্ৰান্তির জগতে বাস করে বলেই হয়তো অন্যদের বিভ্ৰান্তিতে ফেলে আনন্দ পায়। মিসির আলির মাথা দপদপ করছে। রেলগাড়িতে চড়লে যেমন কিছুক্ষণ পরপর শব্দ হয়—তাঁর মাথার ভিতর ঠিক সেরকম খানিকক্ষণ পরপর প্রশ্ন উঠছে–

কোন প্রাণীর দুটা লেজ?

কোন প্রাণীর দুটা লেজ?

নাস্তা খেয়ে লিখতে বসেছি

এখন বাজছে সকাল ১১টা। কিছুক্ষণ আগে আমি নাস্তা খেয়ে লিখতে বসেছি। সকালের চা এখনো খাওয়া হয় নি। চা দিয়ে গেছে। চায়ের কাপ থেকে ধোয়া উড়ছে। আমার চায়ের কাপের ধোঁয়া দেখতে খুব ভালো লাগে। মিসির আলি সাহেব আপনার কি চায়ের কাপের ধোঁয়া দেখতে ভালো লাগে? মানুষের ভালোলাগাগুলি একরকম হয় না কেন বলুন তো? মানুষকে তো নানান ভাবে ভাগ করা হয়। তাদের ভালোলাগা, মন্দলাগা নিয়ে তাদের ভাগ করা হয় না কেন? আপনারা সাইকিয়াট্রিস্টরা সেরকম ভাগ করতে পারেন না?

যেমন ধরুন যেসব মানুষ–

ক) চায়ের কাপের ধোঁয়া ভালবাসেন।

খ) বেলি ফুলের গন্ধ ভালবাসেন।

গ) চাপা রঙ ভালবাসেন।

তাদের মানসিকতা এক ধরনের। (আমার মত।) তাদের চিন্তাভাবনায় খুব মিল থাকবে।

আচ্ছা আপনি কি আমার জ্ঞানী টাইপ কথা শুনে বিরক্ত হচ্ছেন?

থাক। আর বিরক্ত হতে হবে না, এখন আমি মূল গল্পে ফিরে যাই। এখন যে চ্যাপ্টারটা বলব। সেই চ্যাপ্টারের নাম—নীতু আন্টি।

আমি ঘুমাচ্ছিলাম-রাত দশটাটশটা হবে। আমার ঘরের দরজা খোলা। ছোট মানুষ তো। কাজেই দরজা খোলা থাকত। যাতে রাতে-বিরাতে বাবা এসে আমাকে দেখে যেতে পারতেন। এই কাজটা বাবা করতেন-রাতে খুব কম করে হলেও দুবার এসে দেখে যেতেন। তখন ঘুম ভেঙে গেলেও আমি ঘুমিয়ে থাকার ভান করতাম। কারণ কী জানেন? কারণ হচ্ছে আমি যখন জেগে থাকতাম তখন বাবা আমাকে আদর করতেন না। ঘুমন্ত অবস্থাতেই শুধু আদর করতেন। মাথার চুলে বিলি কেটে দিতেন। হাতের আঙুল নিয়ে খেলা করতেন। এমনকি মাঝে মাঝে ঘুমপাড়ানি গানও গাইতেন। যদিও আমি তখন বড় হয়ে গেছি। ঘুমপাড়ানি গান শোনার কাল শেষ হয়েছে। ঘুমন্ত মানুষকে গান শুনানোখুব মজার ব্যাপার না? আমার বাবা আসলেই বেশ মজার মানুষ। ভালবাসার প্রকাশকে তিনি দুর্বলতা বলে ভাবেন। (আরেকটা ব্যাপারও হতে পারে, বাবা হয়তো আমাকে ভালবাসতেন না। ভালবাসার ভান করতেন। মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে ভান করা যায় না বলেই আমি যখন ঘুমাতাম তখন ভান করতেন।)

নীতু আন্টির মধ্যেও এই ব্যাপার ছিল। ভালবাসার প্রকাশকে তিনিও দুর্বলতা মনে করতেন। তার প্রধান চেষ্টা ছিল কেউ যেন তাঁর দুর্বলতা ধরে না ফেলে। তিনি শুরু থেকেই আমাকে পছন্দ করতেন। কিন্তু তাঁর দুর্বলতা আমি যেন ধরতে না পারি এটা নিয়ে সব সময় অস্থির থাকতেন।

আঁর সঙ্গে প্রথম দেখার গল্পটা শুনুন। আমি শুয়ে আছি। ঘুমাচ্ছি। হঠাৎ ঘুম ভাঙল। দেখি কে একজন আমার চুলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রথম তাকলাম ছোট মা। তারপরই মনে হল, না ছোট মা না-ইনার গায়ের গন্ধ অন্যরকম। বেলি ফুলের গন্ধের মতো গান্ধ! আমি চোখ মেললাম। তিনি হাত সরিয়ে নিয়ে শুকনো গলায় বললেন, ঘুম ভাঙিয়ে ফেললাম?

আমি বিছানায় উঠে বসলাম। তিনি আমার পাশে বসতে বসতে বললেন, শোন মেয়ে আমি এখন থেকে তোমাদের বাড়িতে থাকব। তোমার বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি তাকিয়ে রইলাম। কিছু বললাম না। তিনি আগের মতোই শুকনো গলায় বললেন, তুমি তো ইতিমধ্যে দুজনকে মা ডেকে ফেলছি। আমাকে মা ডাকার দরকার নেই। আমাকে আন্টি ডাকতে পার। অসুবিধা নেই। আমার নাম নীতা। তুমি ইচ্ছে করলে নীতু আন্টিও ডাকতে পার।

জি আচ্ছা।

ঘর এত নোংরা কেন? চারদিকে খেলনা। কাল সকালেই ঘর পরিষ্কার করবে।

জি আচ্ছা।

শোবার ঘরে স্যান্ডেল কেন? স্যান্ডেল থাকবে শোবার ঘরের বাইরে। শোবার ঘরটা থাকবে ঝকঝকে তকতকে, একদানা বালিও সেখানে থাকবে না। বুঝতে পারছ?

জি।

এখন থেকে শোবার আগে চুল বেঁধে শোবে। এতদিন তো চুল বাঁধার কেউ ছিল না। এখন থেকে আমি বেঁধে দেব। আরেকটা কথা শুনে রাখ-আমি কিন্তু আহাদ পছন্দ করি না। আমার সাথে কখনো আহ্লাদী করবে না। না ডাকলে আমাকে এসে বিরক্ত করবে না। মনে থাকবে?

থাকবে।

বাহ্, তোমার চুল তো খুব সুন্দর। সিল্কি চুল।

এই বলে তিনি আমার মাথার চুল নিয়ে খেলা করতে লাগলেন। আমি তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেললাম-ইনি চমৎকার একজন মহিলা। ইনার সঙ্গে সব রকম আহাদ করা যাবে। এবং আহ্বাদ করলেও তিনি রাগ করবেন না। আমি আরো বুঝলাম। এই মহিলার ভেতরও অনেক ধরনের আহ্রদীপনা আছে।

নীতু আন্টি খুব সুন্দর ছিলেন। তাঁর মুখ ছিল গোলাকার। চোখ বড় বড়। তবে বেশিরভাগ সময়ই চোখ ছোট করে ভুরু কুঁচকে তাকাতেন। ভাবটা এরকম যে তিনি খুব বিরক্ত হচ্ছেন।

তিনি বাড়িতে এসেই বাড়ির কিছু নিয়মকানুন পাল্টে দিলেন-যেমন আগে একতলা থেকে কাজের মানুষরা কেউ দোতলায় আসতে পারত না! এখন থেকে পারবে। শুধু যে পারবে তাই না–একটা কাজের মেয়ে রাখা হল, যার একমাত্র কাজ আমার ঘর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা এবং রাতে আমার ঘরেই ঘুমানো। তার জন্যে একটা ক্যাম্প খাটের ব্যবস্থা করা হল। সে ঘুমাতে যাবার আগে আগে আমার শোবার ঘরে সেই ক্যাম্প খাট পাতা হত। কাজের মেয়েটার নাম শরিফ। পনের-ষোল বছর বয়স। ভারী শরীর। দেখতে খুব মায়া-কাড়া। তার ছিল কথা বলা রোগ। অন্যদের সামনে সে চুপ করে থাকত। রাতে ঘুমাতে যাবার সময় যখন আমি ছাড়া আর কেউ থাকত না তখন সে শুরু করত। গল্প। ভয়ঙ্কর সব গল্প সে অবলীলায় বলত। গল্প শেষ করে সে নিৰ্বিকার ভঙ্গিতে ঘুমাতে যেত। বাকি রাতটা আমার ঘুম হত না।

ভয়ঙ্কর গল্পগুলি কী আপনি নিশ্চয়ই জানতে চাচ্ছেন। আপনার ধারণা ভয়ঙ্কর গল্প মানে ভূতপ্রেতের গল্প। আসলে তা না। ভয়ঙ্কর গল্প মানে নারী-পুরুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের গল্প। আমার কাছে ভয়ঙ্কর লাগত। কারণ এই ব্যাপারটা অস্পষ্টভাবে জানতাম। আমার কাছে তা নোংরা, অরুচিকর এবং কুৎসিত মনে হত। আমি শরিফার গল্পের একটা নমুনা দিচ্ছি। আপনি আমার মানসিক অবস্থা ধরার চেষ্টা করছেন বলেই দিচ্ছি। অন্য কাউকে এ ধরনের গল্প আমি কখনো বলব না। আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। শরিফার যে গল্পটি আমি বলছি তা হচ্ছে তার কাছ থেকে শোনা সবচে ভদ্র গল্প। আমি শরিফার ভাষাতেই ঘলার চেষ্টা করি।

বুঝছেন আফা–আমরা তো গরিব মানুষ-আমরার গোরামের বাড়িত টাট্টিখানা নাই। টাট্টিখানা বুঝেন আফা? পাইখানারে আমরা কই টাট্টিখানা। উজান দেশে কয় টাট্টি কয়। তখন সইন্ধ্যা রাইত–আমার ধরছে পেসাব। বাড়ির পিছনে রওনা হইছি। হঠাৎ কে জানি আমার মুখ চাইপ্যা ধরছে। চিকুর দিমু হেই উপায় নাই। আন্ধাইরে পরিষ্কার কিছু দেখা যায় না। খালি বুজতাছি দুইটা গুণ্ডা কিসিমের লোক আমারে টাইন্যা লইয়া যাইতাছে। আমি ছাড়া পাওনের জন্যে হাত পাও মুচড়াইতাছি। কোনো লাভ নাই। এরা আমারে নিয়া গেল ইস্কুল ঘরে। এরার মতলবটা তো আফা, আমি বুঝতে পারতাছি। আমার কইলজা গেছে শুকাইয়া। এক মনে দোয়া ইউনুস পড়তাছি। এর মধ্যে ওরা আমারে শুয়াইয়া ফেলছে। একজনে টান দিয়া শাড়ি খুইল্যা ফেলছে ……….

গল্পের বাকি অংশ আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। আপনি অনুমান করে নিন। এ জাতীয় গল্প রোজ রাতে আমি শুনতাম। আমার শরীর ঝিমঝিম করত। সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অনুভূতি। যার সঙ্গে আমি পরিচিত না। তখন আমার বয়স-মাত্র তের।

মিসির আলি সাহেব, শরিফার গল্প শোনার জন্যে আমি অপেক্ষা করতাম। ভয়ঙ্কর ভালো লাগত। আপনি লক্ষ করুন আমি ভালো শব্দের আগে ভয়ঙ্কর বিশেষণ ব্যবহার করেছি।

নীতু আন্টিও আমাকে গল্প বলতেন। সুন্দর সুন্দর সব গল্প। তার কিশোরী বয়সের সব গল্প। একান্নবর্তী পরিবারে মানুষ হয়েছেন। চাচাতো বোন ভাই সব মিলিয়ে বাড়িতে অনেকগুলি মানুষ। সারা দিন কোথাও না কোথাও মজার কিছু হচ্ছে। নীতু আন্টির এক বোন আবার প্ল্যানচেট করা জানত। সে রোজই আত্মা নিয়ে আসত। বিখ্যাত ব্যক্তিদের আত্মা-রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্ৰ, শেকসপীয়র, আইনষ্টাইন, এদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ আসতেন খুব ঘন ঘন। প্ল্যানচেট করলেই তিনি চলে আসতেন। দু লাইন, চার লাইনের কবিতা লিখে যেতেন। সেসব কবিতা খুব উচ্চমানের হত না। কে জানে কবিরা হয়তো মৃত্যুর পর তাদের কাব্যশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ওনার লেখা একটা কবিতার নমুনা

আকাশে মেঘমালা
বাতাসে মধু
নীতু নব সাজে সেজে
নবীনা বধূ

একবার নীতু আন্টির বিয়ের কথা হচ্ছিল তখন রবীন্দ্রনাথ প্লানচেটে এই কবিতা লিখে যান। সেই বিয়ে অবশ্য হয় নি।

আমি নীতু আন্টিকে খুব করে ধরলাম। আমাকে প্ল্যানচেট শিখিয়ে দিতে। তিনি শিখিয়ে দিলেন। খুব সহজ, একটা কাগজে এ বি সি ডি লেখা থাকে। একটা বোতামে আঙুল রেখে বসতে হয়। মুখোমুখি দুজন বসতে হয়। মুখে বলতে হয়-If any good soul passes by, please come. তখন মৃত আত্মা চলে আসেন এবং বোতামে আশ্রয় নেন। এবং বোতাম নড়তে শুরু করে। আত্মাকে প্রশ্ন করলে অদ্ভুত ভঙ্গিতে সেই প্রশ্নের জবাব আসে। এক অক্ষর থেকে আরেক অক্ষরে গিয়ে পুরো বাক্য তৈরি হয়। এ বি সি ডি না লিখে অ, আ, লিখেও হয়। তবে A B C D লেখাই সহজ।

নীতু আন্টির কাছ থেকে শিখে আমি খুব আত্মা আনা শুরু করলাম। বেশিরভাগ সময়ই রবীন্দ্রনাথ আসেন। মনে হয় তাঁর অবসরই সবচেয়ে বেশি।

এক রাতে ছোট মা চলে এলেন। সে রাতে বাসায় কেউ ছিল না। বাবা এবং নীতু আন্টি গিয়েছেন বিয়েতে। ফিরতে রাত হবে। শরিফা গিয়েছে দেশের বাড়িতে। তার মামা এসে তাকে নিয়ে গেছে। তার বিয়ের কথা হচ্ছে। বিয়ে হয়ে গেলে সে আর ফিরবে না। একা একা প্ল্যানচেট নিয়ে বসেছি। বোতামে আঙুল রাখতেই বোতাম নড়তে শুরু করল। আমি বললাম, আপনি কি এসেছেন?

বোতাম চলে গেল Yes লেখা ঘরে। অর্থাৎ তিনি এসেছেন।

আমি বললাম, আপনি কে?

বোতাম চলে গেল R অক্ষরে। অর্থাৎ যিনি এসেছেন তাঁর নামের প্রথম অক্ষর R খুব সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ আবার এসেছেন। আমি বললাম, আপনার নামের শেষ অক্ষরও কি R বোতাম চলে গেল Yes এ। রবীন্দ্রনাথ যে এসেছেন তাতে আর সন্দেহ নেই। আমি বললাম। আমার মতো ছোট্ট একটা মেয়ের ড্রাকে যে আপনি এসেছেন। তাতে আমি খুব খুশি হয়েছি। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি আমার অভিনন্দন গ্ৰহণ করুন। এই সব হচ্ছে গৎ বাধা কথা। মৃত আত্মাকে সম্মান দেখানোর জন্য এইসব বলতে হয়। তবে শুধু ভালো আত্মাদের বেলায় বলতে হয়। খারাপ আত্মাদের বেলায় কিছু বলতে হয় না। খারাপ আত্মাদের অতি দ্রুত বিদেয় করার ব্যবস্থা করতে হয়।

আমি ধন্যবাদ দেয়া শেষ করার পরপর এক কাণ্ড হল। দরজার পর্যাদা সরিয়ে ছোট মা ঘরে ঢুকলেন। অনেক অনেক দিন পর তার দেখা পেলাম। আগে ছোট মাকে দেখে কখনো ভয় পাই নি—সে রাতে হঠাৎ বুক ধক করে উঠল। ভয় পাবার প্রধান কারণ খাইরে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল, আমার ভয় হচ্ছিল–এই বুঝি ইলেকট্রসিটি চলে যাবে। আমার ঘয়ে একটা চার্জর আছে। ইলেকট্রসিটি চলে গেলে চার্জার জ্বলে ওঠার কথা। আমার ঘরের চার্জরটা নষ্ট। মাঝে মাঝে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। কিন্তু চার্জার জ্বলে না। টেবিলের দুয়ারে অবিশ্যি মোমবাতি আছে। দেয়াশলাই আছে কি না জানি না। মনে হয়। নেই। ভয়ে আমার বুক ধকধক করছে–আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ছোট মার দিকে। তিনি বললেন, ফারজানা কেমন আছ?

এইরে আমার আসল নাম বলে ফেললাম। যাই হোক আমার ধারণা ইতিমধ্যে আপনি আমার নাম জেনে ফেলেছেন। ভালো কথা চিত্রাও কিন্তু আমার নাম। আমার আসল মা আমার নাম রেখেছিলেন চিত্রা। মার মৃত্যুর পর কেন জানি এই নামটা আর তাকা হত না। আমার আরো দুটা ডাকনাম আছে-বিবি, বাবা এই নামে আমাকে তাকেন। আরেকটা হল–নিশি। বাবা ছাড়া বাকি সবাই আমাকে নিশি নামে ডাকে। ঘাকি সবাই বলতে আমি স্কুলের বন্ধুদের কথা বলছি।

যে কথা বলছিলাম, ছোট মা বললেন, ফারজানা কেমন আছ?

আমি বললাম, ভালো।

তুমি, একা, তাই না?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

অনেক দিন পর তোমাকে দেখতে এসেছি! তোমার স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। চুল খুব সুন্দর করে কেটেছে। কে কেটে দিয়েছে?

নীতু আন্টি।

তিনি তোমাকে খুব ভালবাসেন?

হুঁ।

তাঁকে কি তুমি আমার কথা বলেছি?

না।

খুব ভালো করেছ। শরিফাকে আমার কথা বলেছ?

হ্যাঁ।

শরিফা মেয়েটা খুব খারাপ তুমি কি তা জান?

না।

মেয়েটা তোমাকে খারাপ করে দিচ্ছে তা কি বুঝতে পারছ? মেয়েটাকে তুমি পছন্দ কর। তাই না?

হ্যাঁ।

তুমি আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছ কেন? তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছ?

হ্যাঁ।

ভয় পেও না।

আচ্ছা।

ভূত নামানোর খেলা কেন খেলছ? এইগুলি ভালো না। আর কখনো খেলবে না।

আচ্ছা।

নীতু আন্টিকে তুমি খুব পছন্দ করা?

হ্যাঁ।

তাকে আমার কথা কখনো বলবে না।

আচ্ছা।

আমি এখন চলে যাব।

আর আসবেন না?

আসব। শরিফাকে শাস্তি দেবার জন্য অ্যাসিব। ওকে আমি কঠিন শাস্তি দেব।

একটা ব্যাপার। আপনাকে বলি যে ছোট মা আমার কাছে আসতেন এই ছোট মা সেরকম নন। তার চোখের দৃষ্টি কঠিন, গলার স্বর কঠিন। অথচ আগে যিনি আসতেনতিনি ছিলেন আলাভোলা ধরনের। তাঁর মধ্যে ছিল অস্বাভাবিক মমতা। তিনি এসেই আমার মাথায় হাত দিতেন—অথচ ইনি দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। একবারও মাথায় হাত দিলেন না বা কাছেও এলেন না।

নিচে গাড়ির শব্দ হল। ছোট মা পরদা সরিয়ে বের হয়ে গেলেন। নীতু আন্টি তার কিছুক্ষণ পরই ঘরে ঢুকলেন। আমি জানি তিনি এখন কী করবেন-বিয়েবাড়িতে মজার ঘটনা কী কী ঘটল তা বলবেন। বলতে বলতে হেসে ভেঙে পড়বেন। যেসব ঘটনা বলতে বলতে তিনি হেসে গড়িয়ে পড়েন সাধারণত সেসব ঘটনা তেমন হাসির হয় না। তবু আমি তীকে খুশি করার জন্যে হাসি। আজ অন্যান্য দিনের মতো হল না। ঘরে ঢুকেই তিনি ভুরু কুঁচকে ফেললেন–তার হাসি হাসি মুখ হঠাৎ করে গভীর হয়ে গেল। তিনি শীতল গলায় বললেন, এই মেয়ে কেউ কি এসেছিল?

আমি থিতামত খেয়ে বললাম, না তো।

ঘরে বিশ্ৰী গন্ধ কেন?

বিশ্ৰী গন্ধ?

অবশ্যই বিশ্ৰী গন্ধ। মনে হচ্ছে নর্দমা থেকে কেউ উঠে এসে ঘরে হাঁটাইটি করেছে।

আমি কথা ঘুরাবার জন্য বললাম, আন্টি বিয়েবাড়িতে আজ কী হল?

আন্টি বললেন, তোমার ঘরে কোনো কোনায় ইঁদুর মরে নেই তো? মরা মরা গন্ধ পাচ্ছি। তুমি পাচ্ছ না?

না।

দাঁড়াও। ঘর ঝাড় দেবার ব্যবস্থা করি।

নীতু আন্টি উপস্থিত থেকে ঘর ঝাঁট দেয়ালেন। স্যাভলন। পানি দিয়ে মেঝে মুছালেন-তারপরও তার নাকে মরা মরা গন্ধ লেগে রইল। তিনি বাবাকে ডেকে নিয়ে এসে বললেন, তুমি কি কোনো গন্ধ পাচ্ছ?

বাবা বললেন, পাচ্ছি।

কিসের গন্ধ?

স্যাভলনের গন্ধ।

পচা-কটু কোনো গন্ধ পাচ্ছ না?

না তো।

আমি পাচ্ছি।

বাবা হাসতে হাসতে বললেন, তোমার সুপার সেনসেটিভ নাক তুমি তো পাবেই। আমাদের পূর্বপুরুষ বানর ছিলেন। তোমার পূর্বপুরুষ সম্ভবত কুকুর।

রসিকতা করবে না।

নীতু আন্টি চিন্তিত মুখে বের হয়ে গেলেন। রাতে আমার ঘরে ঘুমাতে এলেন। এটা নতুন কিছু না। তিনি প্রায়ই রাতে আমার ঘরে ঘুমাতেন। না, প্রায়ই বলাটা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না। সপ্তাহে একদিন বলাটা যুক্তিযুক্ত হবে। স্কুলের সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন তিনি গভীর রাত পর্যন্ত গুটুর গুটুর করে গল্প করতেন। আমার জন্য সেই রাতগুলি খুব আনন্দময় হত। শরিফার ভয়ঙ্কর গল্পগুলি শুনতে পেতাম না, তার জন্যে অবিশ্যি একটু খারাপ লাগত।

নীতু আন্টি আমার ঘরে ঘুমাতে এসেছেন। আমার এত ভালো লাগল। আন্টি বললেন-আজ শরিফা নেই তো তাই তোমার সঙ্গে ঘুমাতে এসেছি। ঝড়বৃষ্টি হচ্ছেএকা ঘুমাতে ভয়ও পেতে পার। আজ কিন্তু গল্প হবে না। কাল তোমার স্কুল আছে। আমি ঘললাম, আন্টি খারাপ গন্ধটা কি এখনো পাচ্ছেন?

হ্যাঁ পাচ্ছি।

আন্টি বাতি নিভিয়ে আমাকে কাছে টেনে শুতে গেলেন। আমি হঠাৎ বললাম, আন্টি আপনাকে একটা কথা বলি-তিনি হাই তুলতে তুলতে বললেন, বল। লম্বা-চওড়া কথা না তো? রাত জেগে গল্প শুনতে পারব না। আমার ঘুম পাচ্ছে।

আমি চাপা গলায় বললাম, আন্টি মৃত মানুষ কি আসতে পারে?

তার মানে?

না, কিছু না।

আন্টি বিছানায় উঠে বসলেন। হাত বের করে টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে বললেন, কী বলতে চাও ভালো করে বল। অর্ধেক কথা বলবে, অর্ধেক পেটে রাখবে তা হবে না।

আমি চুপ করে রইলাম। নীতু আন্টি কঠিন গলায় বললেন, উঠে বস।

আমি উঠে বসলাম।

এখন বল মৃত মানুষের আসার কথা আসছে কেন? তুমি কি কোনো মৃত মানুষকে আসতে দেখেছ?

হ্যাঁ।

সে কি আজ এসেছিল?

হ্যাঁ।

মৃত মানুষটা কি তোমার মা?

না, আমার ছোট মা।

পুরো ঘটনাটা আমাকে বল। কিছু বাদ দেবে না।

বলতে ইচ্ছা করছে না।

ইচ্ছে না করলেও বল। পুরো ব্যাপারটা আমাকে তুমি তোমার ভালোর জন্যে বলবে।

এটা বললে আমার ভালো হবে না।

তুমি বাচ্চা একটা মেয়ে-কিসে তোমার মঙ্গল, কিসে তোমার অমঙ্গল তা বোঝার ক্ষমতা তোমার হয় নি। বল ব্যাপারটা কী?

আরেক দিন বলব।

আরেক দিন না। আজই বলবে। এখনই বলবে।

আমি বলতে শুরু করলাম। কিছুই বাদ দিলাম না। নীতু আন্টি চুপ করে শুনে গেলেন। কথার মাঝখানে একবারও বললেন না–তুমি এসব কী বলছ!

গল্প বলা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝলাম-আমি কী বলছি না বলছি সবই ছোট মা শুনছেন। তিনি ঘরের ভেতর নেই-কিন্তু কাছেই আছেন। পরদার ওপাশেই আছেন। পরদার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যে নিশ্বাস ফেলছেন আমি তাও শুনতে পাচ্ছিলাম। গল্প শেষ করার পরপর নীতু আন্টি বললেন, ঘুমিয়ে পড়। বলেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি সারা রাত জেগে রইলাম। এক ফোটা ঘুম হল না। শুরু হল আমার রাত জাগার কাল।

ছোটদের উদ্ভট অস্বাভাবিক কথা বড়রা সব সময় হেসে উড়িয়ে দেন। সেটাই স্বাভাবিক। ছোটদের উদ্ভট গল্প গুরুত্বের সঙ্গে কখনো গ্ৰহণ করা হয় না। গ্রহণ করা হয়তো ঠিকও নয়। আন্টি আমার গল্প কীভাবে গ্রহণ করলেন কিছুদিন আমি তা বুঝতেই পারলাম না। ছোট মার প্রসঙ্গ তিনি আমার সঙ্গে দ্বিতীয়বার তুললেন না। যেন কিছু শোনেন নি। পুরোপুরি স্বাভাবিক আচার আচরণ। শুধু রাতে আমার সঙ্গে ঘুমাতে আসেন। তখন অনেক গল্পটল্প হয়-ছোট মার প্রসঙ্গ কখনো আসে না।

আপনাকে তো আগেই বলেছি আমার ইনসমনিয়ার মতো হয়ে গিয়েছিল। শেষ রাতের দিকে ঘুম আসত। রাত একটার দিকে বাড়ি পুরোপুরি নিঃশব্দ হয়ে যেত তখন বিচিত্র সব শব্দ শুনতে পেতাম। যেমন খাটের চারপাশে কে যেন হাঁটত। সে কে তা আমার কাছে পরিষ্কার না। ছোট মা হতে পারেন। –অন্য কেউও হতে পারে। প্ৰচণ্ড ভয়ে আমি অস্থির হয়ে থাকতাম। যেহেতু রাতে ঘুম আসত না-দিনটা কাটত ঝিমুনিতে। ক্লাসে বসে আছি, স্যার অংক করাচ্ছেন। আমার তন্দ্রার মতো চলে এল। আধো ঘুম আধো জাগরণে চলে গেলাম। স্যারের দিকে তাকিয়ে থেকেই স্বপ্ন পর্যন্ত দেখতে শুরু করতাম। এই স্বপ্নগুলি খুব অদ্ভুত। অদ্ভুত এই কারণে যে আমি তন্দ্রীয় যেসব স্বপ্ন দেখতাম তার প্রতিটি সত্য হয়েছে। আমি তন্দ্রীয় যা দেখতাম তাই ঘটত। তারচেয়ে মজার ব্যাপার, স্বপ্নগুলিকে আমি ইচ্ছামতো বদলাতে পারতাম। তবে আমি যে স্বপ্ন বদলাতেও পারি এটা বুঝতে সময় লেগেছিল। আগে বুঝতে পারলে খুব ভালো হত। আমি বোধহয় ব্যাপারটা আপনাকে বুঝাতে পারছি না। উদাহরণ দিয়ে বুঝাই।

ধরুন আমি স্বপ্নে দেখলাম। বাবা চেয়ারে বসে লিখছেন। তিনি বসেছেন সিলিং ফ্যানের নিচে, হঠাৎ সিলিং ফ্যানটা খুলে তার মাথায় পড়ে গেল। রক্তে চারদিক ভেসে যাচ্ছে। আমার তন্দ্ৰা ভেঙে গেল। আমার এই স্বপ্ন দেখা মানে-ব্যাপারটা ঘটবে। আমি তৎক্ষণাৎ ঠিক করলাম-না ব্যাপারটা এরকম হবে না। স্বপ্নটা যেভাবেই হোক বদলে দিতে হবে তখন নতুন স্বপ্নের কথা ভাবলাম। যেমন ধরুন আমি ভাবলাম-বাবা লেখার টেবিলে বসেছেন। কী মনে করে হঠাৎ সিলিং ফ্যানের দিকে তাকালেন। তারপর সরে দীড়ালেন–অমনি ঝপাং শব্দ করে ফ্যান পড়ে গেল। বাবার কিছু হল না। পুরো ব্যাপারটা ভেবে রাখার পর-অবিকল যেমন ভেবে রেখেছি তেমনি স্বপ্ন দেখতাম। আপনি এটাকে কি বলবেন, কোনো ক্ষমতা?

না। আপনি তা বলবেন না। মানুষের যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা থাকতে পারে এইসব আপনি বিশ্বাস করেন না। আপনার কাছে মানুষ যন্ত্রের মতো। একটা ছেলে যদি একটা মেয়েকে ভালবাসে তা হলে আপনি ধরেই নেবেন–ব্যাপারটা আর কিছুই না। একজন আরেকজনের প্রতি শারীরিক আকর্ষণ বোধ করছে। শারীরিক আকর্ষণ যেহেতু নোংরা। একটা ব্যাপার কাজেই ভালবাসা নামক মিষ্টি একটা শব্দ ব্যবহার করছে। কুইনাইনকে সুগার কোটেড করা হচ্ছে। আমি কি ভুল বললাম?

আমি ভুল বলি নি। আপনি যাই ভাবেন-কিন্তু শুনুন স্বপ্ন তৈরি করার ক্ষমতা আমার আছে। এবং আমি এখনো পারি। ঘটনা বলি। ঘটনা বললেই আপনি বুঝবেন।

শরিফা তো বাড়ি থেকে চলে গেল। ওর বিয়ে হবার কথা। বিয়ে হলে আর ফিরবে: না। আমি একদিন স্বপ্ন দেখলাম ওর বিয়ে হচ্ছে। চেংড়া টাইপের ছেলে। পান খেয়ে দাত লাল করে আছে–আর ভ্যাক ভ্যাক করে হাসছে। স্বপ্ন দেখে খুব মেজাজ খারাপ হল। তখন ভাবলাম, বিয়ে হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু বরের সঙ্গে ওর খুব ঝগড়া হয়েছে, ও চলে এসেছে আমাদের বাড়িতে। যেরকম ভাবলাম অবিকল সেরকম স্বপ্ন দেখলাম! হলেও তাই। এক সন্ধ্যাবেলা শরিফা উপস্থিত। তার বিয়ে হয়ে গেছে কিন্তু বর তাকে নিচ্ছে না। বিয়ের সময় কথা হয়েছিল বরকে একটা সাইকেল এবং নগদ পোচ হাজার এক টাকা দেয়া হবে। কোনোটাই দেয়া হয় নি বলে তারা কিনে উঠিয়ে নেবে না। যেদিন সাইকেল এবং টাকা দেয়া হবে সেদিনই মেয়ে তুলে নেবে। আমি শরিফাকে বললাম, তোমার কি মন খারাপ?

শরিফা বলল, মন খারাপ কইরা লাভ আছে আফা?

তোমাকে যে তুলে নিচ্ছে না তোমার রাগ লাগছে না?

না। সাইকেল আর টেকা দিব বইল্যা দেয় নাই। তারার তো আফা কোনো দোষ নাই। একটা জিনিস দিবেন বলবেন, তারপরে দিবেন না—এইটা কেমন কথা?

তোমার বর পছন্দ হয়েছে?

হুঁ।

তোমার সঙ্গে তোমার বরের কথা হয়েছে?

ওমা কথা আবার হয় নাই? এক রাইত তার লগে ছিলাম না?

রাতে তোমরা কী করলে?

কওন যাইব না আফা। বড়ই শরমের কথা। লোকটার কোনো লজ্জা নাই। এমন বেহায়া মানুষ জন্মে দেখি নাই। ছিঃ ছিঃ ছিঃ।

না, বল আমি শুনব।

অসাম্ভাব কথা আফা। ছিঃ!

তুমি বলবে না?

জীবন থাকতে না।

আমি নিষিদ্ধ কথা শোনার জন্যে ছটফট করছিলাম। এবং আমি জানি শরিফাও নিষিদ্ধ কথাগুলি কলার জন্যে ছটফট করছিল।

দেখলেন তো স্বপ্ন পাল্টে কীভাবে শরিফাকে বাড়িতে নিয়ে এলাম? আপনি বলবেন, কাকতালীয়। মোটেই না, শরিফার বরকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করল, কাজেই একদিন খুব ভাবলাম, শরিফার বর এসেছে। যেমন ভাবলাম, ঠিক সেরকম স্বপ্ন দেখলাম। শরিফার বর চলে এল। নীল রঙের একটা লুঙ্গি। রবারের জুতা। সিঙ্কের চক্রবক্র একটা শার্ট। এসেই বাসার সবাইকে পা ছুঁয়ে সালাম করে ফেলল। এমনকি আমাকেও। শরিফার বরের নাম সিরাজ মিয়া। সে নারায়ণগঞ্জে একটা লেদ মেশিনের হেল্পার।

আন্টি তাকে খুব বকা দিলেন। কঠিন গলায় বললেন, তুমি পেয়েছ কী? যৌতুক পাও নি বলে বউ ঘরে নেবে না। তুমি কি জান পুলিশে খবর দিলে তোমার পাঁচ বছরের জেলা হয়ে যাবে। বাংলাদেশে যৌতুক নিবারণী আইন পাস হয়েছে। দেব পুলিশে খবর?

সিরাজ মিয়া বলল, ইচ্ছা হইলে দেন। আফনেরা বড়লোক। আফনেরা যা বলবেন। সেইটাই ন্যায়।

আন্টি আরো রেগে গেলেন। তাঁর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল এখনই তিনি ধানমন্ডি থানার ওসিকে খবর দেবেন। আমাকে বললেন, ফারজানা দাও তো টেলিফোনটা। ওসি সাহেবকে আসতে বলি।

আমি টেলিফোন এনে দিলাম। আমার একটু ভয় ভয় করছিল, কিন্তু সিরাজ মিয়া নির্বিকার। তাকে চা আর কেক খেতে দেয়া হয়েছে। সে চায়ে কেক ড়ুবিয়ে বেশ মজা করে খাচ্ছে।

আন্টি ধানমন্ডি থানার ওসিকে খবর দিলেন না। কাকে যেন টেলিফোন করে। বললেন, একটা নতুন সাইকেল কিনে বাসায় নিয়ে আসতে।

সিরাজ মিয়া নির্লজের মতো বলল, আমারে টেকা দেন। আমি দেইখ্যা শুইন্যা কিনিব। বাজারে নানান পদের সাইকেল–সব সাইকেল ভালো না।

আন্টি বললেন, তোমাকে দেখেশুনে কিছুই কিনতে হবে না। তুমি তোমার আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে আসা। আমি তোমাকে সাইকেল আর পাঁচ হাজার এক টাকা দিয়ে দেব। তুমি শরিফাকে নিয়ে যাবে। যদি শুনি এই মেয়ের উপর কোনো অত্যাচার হয়েছে আমি তোমার চামড়া খুলে ফেলব। গরুর চামড়া যেভাবে খোলে ঠিক সেইভাবে খোলা হবে।

সিরাজ মিয়া চা কেক খেয়ে হাসিমুখে চলে গেল। বলে গেল। আগামী বুধবার সে তার বাবাকে নিয়ে আসবে। এবং সেদিনই বউ নিয়ে চলে যাবে।

আন্টির এই ব্যাপারটা আমার কী যে ভালো লাগল। আনন্দে আমার চোখে প্রায় পানি এসে গেল। আর শরিফা যে কী খুশি হল। এক্কেবারে পাগলের মতো আচরণ। এই হাসছে। এই কাঁদছে।

বুধবার সকালে শরিফাকে নিয়ে যাবে। আন্টি তার বরের জন্যে শুধু যে সাইকেল আনালেন তা না-একটা নতুন শার্ট কেনালেন। শরিফাকে দিলেন দুটা শাড়ি—কানের দুল। শরিফা নিজেই দোকান থেকে রুপার নূপুর কিনে এনে পায়ে পরেছে। যখন হাঁটে ঝমোঝম শব্দ হয়। খুব হাস্যকর ব্যাপার।

মঙ্গলবার আমাদের স্কুল ছুটি ছিল। বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছুটি। আমি দুপুরে শুয়ে আছি— হঠাৎ স্বপ্নে দেখি–ছোট মা এসে আমাকে বলছেন, ফারজানা আমি বলেছিলাম না। এই মেয়েটাকে শাস্তি দেব? ও চলে যাচ্ছে—যাবার অ্যাগে শাস্তি দিয়ে দেয়া দরকার তাই না? আমি চুপ করে রইলাম। ছোট মা বললেন—কথা বলছি না কেন? কী ধরনের শাস্তি দেয়া যায় বল তো। তুমি যেরকম শাস্তির কথা বলবে আমি ঠিক সেরকম শাস্তি দেব।

আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন।

না। আমি ক্ষমা করব না। ওকে শাস্তি পেতেই হবে। ওর চোখ দুটা গেলে দি-কী ঘল? উলের কাটা দিয়ে চোখ গেলে দি?

আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। তবে খুব চিন্তিত হলাম না। কারণ আমি স্বপ্ন বদলাতে পারি। আমি স্বপ্নটা বদলে ফেলব। কীভাবে বদলাব সেটাও ঠিক করে ফেললাম। বিকেলে গানের টিচার চলে যাবার পর দরজা বন্ধ করে। আমি স্বপ্নটা বদলাব। গানের টিচার গেলেন সন্ধ্যাবেলা। আমি আমার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই শরিফার গলা শুনতে পেলাম। সে ফিসফিস করে ডাকছে-আফা। ও আফা।

শব্দটা আসছে খাটের নিচ থেকে। আমি নিচু হয়ে দেখি শরিফা হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নিচে বসে আছে। কুকুর যেভাবে বসে থাকে ঠিক সেভাবে শরিফা বসে আছে। কুকুরের মতো জিভ বের করে খানিকটা হাঁপাচ্ছেও। তাকে কেমন যেন ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। আমি বললাম, তুমি এখানে কী করছ? বের হয়ে আসা। খাটের নিচ থেকে বের হয়ে আস।

সে বলল, আফাগো আমি বাঁইচা নাই। আমারে মাইরা ফেলছে। ছাদে কাপড় আনতে গেছিলাম আমারে ধাক্কা দিয়া ফেলছে। আমি অনেক দূর চইল্যা যাব। যাওনের আগে আফনেরে শেষ দেখা দেখতে আইছি গো।

এই বলেই সে হামাগুড়ি দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে গেল। আমি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম! সবাই ছুটে এলেও তখনই আমার ঘরে ঢুকতে পারল না। আমি ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তাদের ঢুকতে হল দরজা ভেঙে।

আমি বলছি সন্ধ্যাবেলার ঘটনা। শরিফা যে সত্যি সত্যি মারা গেছে। এই খবর জানা গোল রাত আটটার দিকে। আমাদের বাড়ির পেছনের দেয়ালে পড়ে তার মাথা থেঁতলে। গিয়েছিল। কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে। প্ৰচণ্ড শক্তিশালী কেউ–কারণ দেয়ালটা বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে–ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে এত দূরে ফেলতে অনেক শক্তি দরকার।

আমার মাথা ধরছে। আমি আপাতত লেখা বন্ধ করলাম।

এই মুহুর্তে আপনি আমার সম্পর্কে কী ভাবছেন বলব?

আমি অন্তৰ্যামী নই। অন্য একজনের মনের খবর আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু আপনি কী ভাবছেন তা আমি বলতে পারব। কারণ আপনার চিন্তার পদ্ধতি আমি জানি।

আপনি আমার লেখা পড়ছেন। যতই পড়ছেন আমার সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে উঠছে। ধারণাগুলি করছেন যুক্তির ভেতর দিয়ে। পুরোপুরি অংক কষা হচ্ছে দুই যোগ তিন হচ্ছে পাঁচ, কখনো ছয় বা সাত নয়। এ জাতীয় মানুষের মনের ভাব আঁচ করা মোটেই কঠিন না।

অতিপ্রাকৃত কোনো ব্যাপারে আপনার সামান্যতম বিশ্বাসও নেই। যেই আমি ছোট মাকে দেখার কথা বলেছি আমনি আপনি ভুরু কুঁচকেছেন। কঠিন কিছু শব্দ মনে মনে আওড়েছেন, যেমন স্কিজোফ্রেনিক, সাইকোপ্যাথ …….তাই না?

শরিফার মৃত্যুর খবর শুনে আপনি খানিকক্ষণ ঝিম মেরে ছিলেন। তারপর সিগারেট ধরলেন। ধূমপায়ী মানুষরা সামান্যতম সমস্যার মুখোমুখি হলেই ফন্স করে সিগারেট ধরায়। ভাবটা এমন যে নিকোটিনের ধোয়া সব সমস্যা উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সিগারেট ধরিয়ে মনে মনে বলেছেন—খুনটা কে করেছে? কারণ আপনার কাছে অতিপ্রাকৃত ব্যাপার বলে কিছু নেই। একটা মেয়ে খুন হয়েছে। ভূতপ্রেতি তাকে খুন করবে না। মানুষ খুন। করবে। সেই মানুষটা কে?

ডিটেকটিভ গল্পে কী থাকে? একটা খুন হয়-আশপাশের সবাইকে সন্দেহ করা হয়। সবচে কম সন্দেহ যাকে করা হয় দেখা যায় সে-ই খুন করেছে। গল্প-উপন্যাসের ডিটেকটিভদের মতো। আপনি যদি খুন রহস্যের সমাধান করতে চান তা হলে প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি হচ্ছি। আমি। এখন আপনি ভাবছেন মেয়েটা যে খুন করল তার মোটিভ কী? একটু চিন্তা করলে আপনি মোটিভও পেয়ে যাবেন। আমি আপনাকে সাহায্য করি?

ক) মেয়েটি মানসিকভাবে অসুস্থ। ঙ্কিজোফ্রেনিক এবং সাইকোপ্যাথ। একজন অসুস্থ মানুষ যে কোনো অপরাধ করতে পারে। অসুস্থতাই তার মোটিভ।

খ) শরিফা মেয়েটি তার স্বামীর কাছে বুধবার চলে যাবে। সে ছিল ফারজানার সঙ্গিনী। ফারজানা চাচ্ছিল মেয়েটিকে রেখে দিতে। খুন করা হয়েছে সে কারণে। অসুস্থ মেয়েটি ভাবছে শরিফা খুন হয়েছে ঠিকই কিন্তু চলে যায় নি–এই তো সে বাস করছে খাটের নিচে। কুকুরের মতো হাঁটু গেড়ে বসে আছে।

মিসির আলি সাহেব। আপনি কি তাই ভাবছেন? না। আপনি তা ভাবছেন না। মানুষের মনের ভেতরে যে আরেকটি মন বাস করে আপনি সেই মন নিয়ে কাজ করেন। যুক্তির ক্ষমতা আপনি যেমন জানেন যুক্তির অসারতাও আপনি জানেন। দুই যোগ তিন পাঁচ হয় এটা আপনি যেমন জানেন ঠিক তেমনি জানেন মাঝে মাঝে সংখ্যাকে যুক্ত করা যায় না। যোগ চিহ্ন কোনো কাজে আসে না। এই তথ্য জানেন বলেই—আমি আমার জীবনের বইটি আপনার সামনে খুলে দিয়েছি। আপনাকে পড়তে দিয়েছি।

আপনি হয়তো ভাবছেন-এতে লাভ কী? মেয়েটির সঙ্গে তো আমার কখনো দেখা হবে না। সে তার ঠিকানা দেয় নি। ঠিকানা দেই নি এটা ঠিক না। ব্যাখ্যা এবং বর্ণনা এমনভাবে দিয়েছি যেন ইচ্ছা করলেই আপনি বের করতে পারেন আমাদের বাড়িটা কোথায়! ধানমন্ডি থানার ওসিকে আন্টি টেলিফোন করতে চাচ্ছে তা থেকে আপনি কি অনুমান করতে পারছেন না। আমাদের বাড়ি ধানমন্ডিতে। টু ইউনিট বাড়ি এটিও বলেছি। আরো অনেক কিছু বলেছি। থাক এখন টেলিফোন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। যদি মনে করেন আমার সঙ্গে কথা বলা দরকার টেলিফোন করবেন। নাম্বারটা হচ্ছে ষষ্ঠ মৌলিক সংখ্যা, পঞ্চম মৌলিক সংখ্যা, চতুর্থ মৌলিক সংখ্যা, তৃতীয় মৌলিক সংখ্যা। সংখ্যাগুলির আগে আট বসাবেন।

সরাসরি টেলিফোন নাম্বার লিখে দিলে হত। সেটা আপনার মনে থাকত না। এইভাবে বলায় আর কখনো ভুলবেন না।

৮, (ষষ্ঠ মৌলিক সংখ্যা=১১), (পঞ্চম মৌলিক সংখ্যা=৭), (চতুর্থ মৌলিক সংখ্যা=৫), (তৃতীয় মৌলিক সংখ্যা=৩)

অর্থাৎ আমার টেলিফোন নাম্বারা হচ্ছে–৮১১৭৫৩

আমাদের টেলিফোন নাম্বারটা রহস্যময় না? আমাদের বাসায় তিনটা টেলিফোন আছে। সবচে রহস্যময় নাম্বারটা আপনাকে দিলাম। এই টেলিফোন বাবা আমাকে দিয়েছেন। নাম্বারটা আমি কাউকে দেই নি। কাজেই আমার টেলিফোনে কেউ আমাকে পায় না। অথচ আমি অন্যদের পাই। ব্যাপারটা মজার না? তোমরা আমাকে খুঁজে পাবে। না-কিন্তু আমি ইচ্ছা করলেই তোমাদের পেয়ে যাব।

মাঝে মাঝে আমার যখন ইনসমনিয়ার মতো হয়—আমি এলোমেলোভাবে টেলিফোনের ডায়াল ঘুরাতে থাকি। অচেনা কোনো একটা জায়গায় রিং বেজে ওঠে। সদ্য ঘুম ভাঙা গলায় কেউ একজন ভারী গলায় বলে-কে?

আমি করুণ গলায় বলি, আমার নাম ফারজানা।

কাকে চাই?

কাউকে চাই না। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব, প্লিজ টেলিফোন রেখে দেবেন না। প্লিজ! প্লিজ!

এই সময় পুরুষ মানুষরা যে কী অদ্ভুত আচরণ করে আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না। শতকরা সত্তর ভাগ পুরুষ প্রেম করার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অতি মিষ্টি গলায় উত্তর দিতে থাকে। শতকরা দশ ভাগ কুৎসিত সব কথা বলে। অতি নোংরা, অতি কুৎসিত সব বাক্য। গলার স্বর থেকে মনে হয় মধ্যবয়স্ক পুরুষরা এই নোংরামিগুলি বেশি করেন। এই পুরুষরাই হয়তো স্নেহময় পিতা, প্ৰেমময় স্বামী। অফিসে আদর্শ অফিসার। কী অদ্ভুত বৈচিত্র্যের ভেতরই না আমাদের জীবনটা কাটে।

আমরা সবাই ড. জেকিল এবং মিষ্টার হাইড। আপনিও কিন্তু তাই-একদিকে অসম্ভব যুক্তিবাদী মানুষ অন্যদিকে….যুক্তিহীন জগতেও চরম আস্থা আছে এমন একজন। তাই না? খুব ভুল কি বলেছি?

একটি তরুণী মেয়ে

একটি তরুণী মেয়ে বাড়ির ছাদ থেকে পা ফসকে পড়ে গিয়ে মরে গেছে। ঘটনা খুব বিশ্বাসযোগ্য নয়। বয়স্ক মহিলা পা ফসকে পড়ে গেছেন-বিশ্বাসযোগ্য, অল্প বয়েসী। মেয়ে পড়ে গেছে এটিও বিশ্বাসযোগ্য। তরুণী মেয়ের অপঘাতে মৃত্যু মানেই নানান প্রশ্ন। বিশেষ করে সেই মেয়ে যদি কাজের মেয়ে হয়।

আমার বাবাকে নিশ্চয়ই এইসব ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিছুদিন তাকে খুব চিন্তিত দেখেছি। তারপর একসময় তিনি চিন্তামুক্ত হয়েছেন। বিত্তবানরা খুব সহজেই চিন্তামুক্ত হতে পারেন। তাদের সামান্য অর্থ ব্যয় হয়-এই যা।

শরিফার বাবাকে কিছু টাকা দেয়া হল-কত আমি জানি না। নিশ্চয়ই সে যত আশা করেছিল তারচে বেশি। কারণ সেই বেচারা টাকা হাতে নিয়ে আমাদের সবার মঙ্গল কামনা করে দীর্ঘ মোনাজাত শুরু করল। মোনাজাতের বিষয়বস্তু হচ্ছে–

আমাদের মতো ভালোমানুষ সে তার জীবনে দেখে নি। আমাদের কাছে তার মেয়ে খুব সুখে ছিল। কপালে সুখ সইল না।

শরিফার স্বামীও বেশ কিছুদিন ঘোরাঘুরি করল। বেচারার দাবি সামান্য। যে সাইকেলটা তার জন্যে কেনা হয়েছিল। সেই সাইকেল যেন তাকে দিয়ে দেয়া হয়। সম্ভব। হলে পাঁচ হাজার এক টাকা। এই টাকাটা তো আইনত তারই প্ৰাপ্য-ইত্যাদি।

অ্যান্টি তাকে ভাগিয়ে দিলেন এবং বলে দিলেন-কখনো যেন তাকে গেটের ভেতর ঢুকতে না দেয়া হয়।

সব ঋামেলা মিটে যাবার পর বাবা এক সন্ধ্যায় আমাকে ডাকলেন। বাবার পরিচয় আপনাকে দেয়া হয় নি—এখন দিচ্ছি। তিনি মোটামুটি কঠিন ধরনের মানুষ। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি। শান্ত-ধীর, স্থির। তিনি খুব রেগে গেলেও সহজ ভঙ্গিতে কথা বলতে পারেন। পেশায় তিনি পাইলট। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আছেন। আমার সব সময় মনে হয়েছে পাইলট না হয়ে বাবা যদি ইউনিভার্সিটির অংকের টিচার হতেন তাঁকে খুব মানাত। বই পড়া তার প্রধান শখ। বেশিরভাগ সময় আমি তার হাতে বই দেখেছি। হালকা ধরনের বই না–বেশ সিরিয়াস ধরনের বই।

বাবা তাঁর স্টাডিতে একা বসেছিলেন। তার সামনে একটা বাটিতে খেজুর গুড টুকরো করা। শীতকালে খেজুর গুড তাঁর প্রিয় একটা খাবার। প্রায়ই দেখেছি গল্পের বই পড়তে পড়তে তিনি খেজুর গুড়ের টুকরো মুখে দিচ্ছেন। আমি ঘরে ঢুকতেই বাবা বললেন -মা বাস।

আমি তাঁর সামনে বসলাম।

কেমন আছ মা?

আমি বললাম, ভালো।

শরিফা মেয়েটি এইভাবে মারা গেল নিশ্চয়ই তোমার মন খুব খারাপ?

আমি বললাম, হ্যাঁ মন খারাপ।

বাবা ইতস্তত করে বললেন, তোমাকে কিন্তু কান্নাকাটি করতে দেখি নি। আমার কাছে তোমাকে বেশ স্বাভাবিকই মনে হয়েছে।

আমি বুঝতে পারলাম না বাবা ঠিক কী বলতে চাচ্ছেন! তাঁর কথা বলার মধ্যে জেরা করার ভাবটা প্রবল। যেন আমি কিছু গোপন করার চেষ্টা করছি বাবা তা বের করে ফেলতে চাচ্ছেন।

শরিফা যে সন্ধ্যায় মারা গেল-সেই সন্ধ্যায় তুমি কি ছাদে গিয়েছিলে?

না।

সেদিন ছাদে যাও নি?

না।

আমি যতদূর জানি-ছাদ তোমার খুব প্রিয় জায়গা। বেছে বেছে ওই দিনই ছাদে যাও নি কেন?

ওই দিন যেতে ইচ্ছে করে নি।

তুমি ঘরের দরজা বন্ধ করে চিৎকার করে কাঁদছিলে। দরজা ভেঙে তোমাকে বের করা হয়। তুমি প্রথম যে কথাটি তখন বল তা হচ্ছে শরিফা মারা গেছে। তাই না?

হ্যাঁ।

সে যে মারা গেছে তোমার তা জানার কথা না। কারণ কেউই জানে না। তুমি জানলে কীভাবে?

আমি চুপ করে রইলাম। বাবা বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন—নাও গুড় খাও। আমি এক টুকরো গুড় নিয়ে মুখে দিলাম। বাবা শান্ত গলায় বললেন, তুমি রাগ করে, কিংবা নিজের অজান্তে ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দাও নি তো?

না।

অনেক সময় খেলতে গিয়েও এরকম হয়। হয়তো হাসতে হাসতে ধাক্কা দিয়েছসে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেছে। তোমার কোনো দোষ ছিল না।

না।

আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?

ভালো।

গান কেমন হচ্ছে?

ভালো।

গান কি তুলেছি না এখনো সারে গামা করে যাচ্ছ?

একটা গান তুলেছি।

কি গান?

নজরুল গীতি।

গানের লাইনগুলি কী?

পথ চলিতে যদি চকিতে-গাইব?

না থাক। আরেকদিন শুনব।

আমি কি এখন চলে যাব?

আচ্ছা যাও।

আমি উঠে চলে এলাম। বাবা ভুরু কুঁচকে বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলেন। তিনি আমাকে বিশ্বাস করেন নি এটা বোঝা যাচ্ছে। তিনি যে আমাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাও বুঝতে পারছি। খুব অল্প বয়সেই আমি আসলে বেশি বেশি বুঝতে শিখেছিলাম। বেশি বুঝতে পারাটা এক ধরনের দুর্ভাগ্য। যারা কম বুঝতে পারে–এই পৃথিবীতে তারাই সবচে সুখী। বোকা মানুষরা কখনো আত্মহত্যা করে না।

বাবা আমার কথা বিশ্বাস না করলেও আন্টি করলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে নিজ থেকে তাকে আমার কিছু বলতে হল না। তিনি আপনাতেই সব বুঝতে পারলেন। ঘটনাটা এরকম-রাতে তিনি আমার সঙ্গে ঘুমাতে এসেছেন (শরিফার মৃত্যুর পর তিনি প্রতি রাতেই আমার সঙ্গে ঘুমাতেন।) বাতি নিভিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে মৃদু গলায় গল্প শুরু করলেন—তাদের গ্রামের বাড়ির গল্প। বাড়ির পেছনে একটা পেয়ারা গাছ ছিল। তিনি পাকা পেয়ারার খোঁজে। গাছে উঠেছেন। হঠাৎ দেখলেন গাছের ডাল পেঁচিয়ে একটা সাপ। সাপটার গায়ের রঙ অবিকল পেয়ারা গাছের ডালের মতো। সাপটা তাকে দেখে পালিয়ে গেল না–উলটো তার দিকে আসতে শুরু করল ….

এই পর্যায়ে আন্টি গল্প থামিয়ে দিলেন। আমি বললাম, কী হয়েছে?

আন্টি বললেন, ফোঁপাচ্ছে কে? আমি ফোঁপানির শব্দ শুনছি। তুমি কি শুনছ?

শব্দ আমিও শুনছিলাম। কেঁপাচ্ছে শরিফা। খাটের নিচে বসে মাঝে মধ্যেই সে ফোঁপানির মতো শব্দ করে। আমি আন্টির প্রশ্নের জবাব দিলাম না। চুপ করে রইলাম! আন্টি বললেন, মনে হচ্ছে খাটের নিচে কেউ বসে আছে। ফোঁপাচ্ছে। তুমি শুনতে পাচ্ছ না?

না।

আমি পরিষ্কার শুনছি—পচা গন্ধও পাচ্ছি। তুমি গন্ধ পাচ্ছ না?

না।

আন্টি উঠে বসলেন। টেবিলল্যাম্প জ্বালালেন। বিছানা থেকে নেমে তাকালেন। খাটের নিচে। আমি তাকিয়ে রইলাম আন্টির মুখের দিকে। আমি দেখলাম ভয়ে এবং আতঙ্কে হঠাৎ আন্টির মুখ ছোট হয়ে গেল। তিনি বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। কী বললেন, আমি বুঝতে পারলাম না। আন্টি ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছিলেন। তার ফর্সা গাল হয়েছে টকটকে লাল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আন্টিকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন! আন্টি চাপা গলায় বললেন–কে কে?

আম্মা আমি শরিফা।

শরিফা!

জে আম্মা। আমি এইখানে থাকি!

শরিফা!

জে আম্মা। আমি হাঁটাচলা করতে পারি না–এইখানে থাকি। আমারে বিদায় দিয়েন না আম্মা। আমার যাওনের জায়গা নাই… ।

আন্টি উঠে দাঁড়ালেন। টলতে টলতে খাটের কাছে এসে খাটে উঠলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে তৎক্ষণাৎ শুয়ে পড়লেন। আমি বললাম, কী হয়েছে?

আন্টি জড়ানো গলায় বললেন, কিছু না। তুমি ঘুমাও।

আমি বললাম, খাটের নিচে কিছু দেখেছেন আন্টি?

তিনি বললেন, না। তুমি ঘুমাও। আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম। আন্টি সম্ভবত সারা রাতই জেগে রইলেন। পরদিন ভোরে জেগে উঠে দেখি আন্টি হাঁটু মুড়ে বসে আছেন। ঘরে তখনো টেবিলল্যাম্প জুলছে। আন্টির চোখ জ্বলজ্বল করছে! এক রাতেই তাঁর চোখের নিচে গাঢ় হয়ে কালি পড়েছে! আন্টি ক্লান্ত গলায় বললেন, ফারজানা তুমি কি রান্নাঘরে গিয়ে বলে আসবে আমাকে এক কাপ চা দিতে?

আমি বললাম, আন্টি আপনার কি শরীর খারাপ করেছে? তিনি বললেন, না। শরীর ভালো আছে।

আন্টি বিছানায় বসে চা খেলেন। তাঁকে খুব চিন্তিত মনে হল। আমাকে অবিশ্যি তিনি কিছুই বললেন না। আমি সহজ স্বাভাবিকভাবেই হাত-মুখ ধুয়ে নাস্তা করলাম। স্কুলে চলে গেলাম। আন্টি সারা দিন আমার ঘরেই থাকলেন। ঘর থেকে বেরুলেন না।

বাবা সে সময় দেশে ছিলেন না। বছরে একবার পাইলটদের নতুন করে কী সব শেখায়। রিভিয়্যু হয়। বাবা সেই ট্রেনিঙে তখন আমষ্টারডামে। বাড়িতে আমি আর আন্টি। আন্টি আমার ঘরেই থাকেন। তিনি রাতে একেবারেই ঘুমান না। আমার কিন্তু ঘুম পায়। আগের অনিদ্রা রোগ তখন সেরে গেছে। বিছানায় যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি। মাঝে মাঝে বাথরুম পেলে কিংবা পানির পিপাসা পেলে ঘুম ভাঙে। আমি দেখি আন্টি মেঝেতে বসে আছেন। তার বসার ভঙ্গি শরিফার বসার ভঙ্গির মতোই। তিনি মৃদু স্বরে শরিফার সঙ্গে কথা বলেন।

শরিফা!

জে আম্মা?

কী করছ?

কিছু করনের নাই আম্মা। বইসা আছি।

এখান থেকে চলে যাও।

কই যামু? যাওনের জায়গা নাই। পথঘাটও চিনি না।

চাও কী তুমি?

কিছু চাই না! কী চামু?

দিনের বেলা তোমাকে দেখি না কেন? দিনে তুমি কোথায় যাও?

জানি না আম্মা। কী হইতেছে আমি কিছুই বুঝি না। দিশা পাই না।

তোমার ক্ষুধা হয়?

জে হয়। জবর ভুখ লাগে-কিন্তু আম্মা খাওন নাই। আমারে কে খাওনা দিব?

এখন ক্ষুধা হয়েছে?

জে হয়েছে।

বিস্কুট আছে খাবে? বিস্কুট দেব?

জে না। অ্যাফনাগো খাওন আমি খাইতে পারি না।

তুমি কি খুব কষ্টে আছ?

বুঝি না। আম্মা। কিছু বুঝি না। দিশ পাই না।

তুমি যে মারা গেছ তা কি জান?

জে জানি।

কেউ কি তোমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে?

জে।

কে ফেলেছে?

ছোট আফা ফেলছে। ছোট মানুষ বুঝে নাই। তার ওপরে রাগ হইয়েন না আম্মা।

ফারজানা তোমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে?

জে।

তুমি কি তাকে দেখেছ ধাক্কা দিয়ে ফেলতে?

জে না। পিছনে থাইক্যা ধাক্কা দিছে। অন্য কেউও হইতে পারে।

অতিদ্রুত আন্টির শরীর খুব খারাপ করল। তিনি একেবারেই ঘুমাতে পারেন না। গাদা গাদা ঘুমের ওষুধ খান-তারপরেও জেগে থাকেন। সারাক্ষণ নিজের মনে বিড়বিড় করে কথা বলেন। অর্থহীন এলোমেলো সব কথা! হঠাৎ হাসতে শুরু করেন। সেই হাসি কিছুতেই থামে না। আবার যখন কাঁদতে থাকেন-সেই কান্নাও চলতে থাকে।

বাবা যখন দেশে ফিরলেন তখন আন্টি পুরোপুরি উন্মাদ। কাউকেই চিনতে পারেন না। আমাকেও না। আন্টির চেহারাও খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মুখ শুকিয়ে মিসরের মমিদের মতো হয়ে গেছে। দাত বের হয়ে এসেছে। সারা শরীরে বিকট গন্ধ। বাবা হতভম্ব হয়ে গেলেন। আন্টির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল। চিকিৎসায় কোনো লাভ হল না। ক্ৰমে ক্ৰমে তার পাগলামি বাড়তে থাকল। বাবাকে দেখলেই তিনি ক্ষেপে উঠতেন। একদিন সকালে পাউরুটি কাটার ছুরি নিয়ে তিনি বাবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যেতে পারত। ভাগ্যক্রমে ঘটে নি—শুধু বাবার পিঠ কেটে রক্তারক্তি হয়ে গেল।

আন্টিকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হল। আন্টির বাবা এসে তাকে নিয়ে গেলেন। সেখানে থেকে তিনি কিছুটা সুস্থ হলেন। তখন তাঁকে আবার আমাদের এখানে আনা হল। তিনি আবারো অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হল।

মাঝে মধ্যে আমি ওনাকে দেখতে যেতাম। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতেন না। কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকতেন। আন্টিদের বাড়ির কেউ চাইত না যে আমি যাই। আমি যাওয়া ছেড়ে দিলাম।

শরিফার প্রসঙ্গে আসি। শরিফার হাত থেকে আমি খুব সহজে মুক্তি পেয়ে যাই। শরিফাকে আমি এক রাতে বলি-শরিফা তোমার কি উচিত না তোমার স্বামীর সঙ্গে গিয়ে থাকা?

শরিফা বলল, জে উচিত।

তুমি তার কাছে চলে যাও।

হে কই থাকে জানি না আফা!

আমি তাকে এনে দেব?

জে আফা।

আমি শরিফার স্বামীকে খবর পাঠালাম সে যেন এসে তার সাইকেল নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর যেন আসে।

সে খুশি মনে সাইকেল নিতে এল। সাইকেলের সঙ্গে সে অন্য কিছুও নিয়ে গেল। মিসির আলি সাহেব-আপনার জন্যে বিস্ময়কর খবর হল-মাসখানেক পরে আমি খবর নিয়ে জানতে পারি শরিফার স্বামীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তার আত্মীয়স্বজনরা তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিল। ভর্তি করাতে না পেরে শহরেই তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছে।

সম্বোধন কুৎসিত লাগছে

মিসির আলি সাহেব,

এই সম্বোধন বারবার করতে আমার কুৎসিত লাগছে। নামের শেষে সাহেব। আবার কী? নামের শেষে সাহেব লাগালেই মানুষটাকে অনেক দূরের মনে হয়। দূরের মানুষের কাছে কি এমন অন্তরঙ্গ চিঠি লেখা যায়? একবার ভেবেছিলাম স্যার লিখি। তারপর মনে হল-স্যার তো সাহেবের মতোই দূরের ব্যাপার। মিসির আলি চাচা লিখব? না তাও সম্ভব না। মিসির আলি এমনই এক চরিত্র যাকে চাচা বা মামা ডাকা যায় না। গৃহী কোনো সম্বোধন তাকে মানায় না। দেখলেন আপনাকে আমি কত শ্ৰদ্ধা করি? না দেখেই কোনো মানুষকে এতটা শ্রদ্ধা করা কি ঠিক?

থাকুক তত্ত্বকথা-নিজের গল্পটা বলে শেষ করি। অনেকদূর তো বলেছি—আপনি কি বুঝতে পারছেন যা বলছি সব সত্যি বলছি? অর্থাৎ আমি যা সত্যি বলে বিশ্বাস করছি তাই বলছি।

যতটুকু পড়েছেন সেখান থেকে কি বুঝতে পারছেন যে বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো না।

বাবা আমাকে পছন্দ করেন না।

কেন করেন না, আমি জানি না। আমি কখনো জিজ্ঞেস করি নি। কিন্তু বুঝতে পেরেছি। পছন্দ করেন না মানে এই না যে তিনি সারাক্ষণ ধমকাধমকি করেন। এইসব কিছুই না। মাঝে মাঝে গল্প করেন। লেজার ডিস্কে ভালো ছবি আনলে হঠাৎ বলেন, মা এস ছবি দেখি। জন্মদিনে খুব দামি গিফট দেন। যতবারই বাইরে যান আমার জন্যে কিছু না কিছু নিয়ে আসেন। তারপরেও আমি বুঝতে পারি বাবা আমাকে তেমন পছন্দ করেন না। মেয়েরা এইসব ব্যাপার খুব সহজে ধরতে পারে। কে তাকে পছন্দ করছে কে করছে না–এই পর্যবেক্ষণশক্তি মেয়েদের সহজাত! এই বিদ্যা তাকে কখনো শিখতে হয় না। সে জন্মসূত্রে নিয়ে আসে। ওই যে কবিতা–

“এ বিদ্যা শিখে না নারী আসে আপনাতে”

আন্টি অসুস্থ হয়ে যাবার পর বাবা যেন কেমন কেমন চোখে আমাকে দেখতে লাগলেন। যেন আমিই আন্টিকে অসুস্থ করেছি। আমি যেন ভয়ঙ্কর কোনো মেয়ে–আমার সংস্পর্শে যে আসবে সেই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে।

বাবার দুশ্চিন্তার কারণও আছে। ছোট মা অসুস্থ হবার পর আমার ঘরেই বেশিরভাগ সময় থাকতেন। তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আমার বিছানাতে শুয়ে মারা যান। যে রাতে তিনি মারা যান সে রাতে অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে গল্প করেন। আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর তিনি ঘুমের ওষুধ খান-একটা চিঠি লেখেন। তারপর আমার সঙ্গে ঘুমাতে আসেন। আমি ভোরবেলা জেগে উঠে দেখি তিনি কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে শুয়ে আছেন-চোখ আধা খোলা। চোখের সাদা অংশ চকচক করছে। মুখ খানিকটা হাঁ করা। হাত-পা হিম হয়ে আছে। আমার তখন খুব কম বয়স। তারপরেও আমি বুঝলাম তিনি মারা গেছেন। আমি ভয় পেলাম না। চিৎকার দিলাম না। শান্ত ভঙ্গিতেই বিছানা থেকে নামালাম। দরজা ভেতর থেকে ছিটিকিনি দেয়া। আমি চেয়ারে দাঁড়িয়ে ছিটিকিনি খুলে বাবার ঘরে গিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাবাকে বললাম, ছোট মা মারা গেছেন।

বাবা তখন কফি খাচ্ছিলেন। তিনি খুব ভোরবেলা ওঠেন। নিজেই কফি বানিয়ে খান। তিনি মনে হল আমার কথা বুঝতে পারলেন না, কাপ নামিয়ে রেখে বললেন-মা কী বললে?

আমি আবারো বললাম, ছোট মা মারা গেছেন।

বাবা দ্বিতীয় শব্দ উচ্চারণ করলেন না।

আমার ঘরে এসে ঢুকলেন। এক পলক ছোট মাকে দেখলেন।

তাঁর কপালে হাত রাখলেন। তারপর রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে।

ছোট মার পর শরিফা মারা গেল। সেও থাকত আমার ঘরে। সেও কি মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল? আমরা যদি ধরে নেই কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে নি, তা হলে বুঝতে হবে শরিফা নিজেই ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে। যে মেয়ে পরদিন স্বামীর কাছে যাবে সে এই কাণ্ড কখন করবে? মানসিকভাবে অসুস্থ হলেই করবে। শরিফাও তা হলে অসুস্থ ছিল।

আন্টির অসুস্থতাতো চোখের সামনে ঘটল। আমার ঘরেই তার শুরু। কাজেই বাবা যদি ভেবে থাকেন প্রতিটি অসুস্থতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে তা হলে বাবাকে খুব একটা দোষ দেয়া যায় না।

এক রাতে, খাবার টেবিলে তিনি বললেন-নিশি, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। আমি বললাম, বল।

বাবা বললেন, খাবার টেবিলে বলতে চাচ্ছি না, খাওয়া শেষ করে আমার ঘরে আসা। দুজন কথা বলি।

আমি বললাম, আচ্ছা!

তোমার বয়স এখন কত?

আমি বললাম, অক্টোবরে পনের হবে।

তা হলে তো তুমি অনেক বড় মেয়ে! তোমার বয়স পনের হতে যাচ্ছে তা বুঝতে পারি নি।

আমি হাসলাম। বাবা বললেন, তুমি যে খুব সুন্দর হয়েছ তা কি তুমি জান?

না।

কেউ তোমাকে বলে নি? তোমার বন্ধুবান্ধবরা?

না। আমার কোনো বন্ধুও নেই!

নেই কেন?

কারো সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয় না।

হয় না কেন?

আমি তো জানি না কেন হয় না। মনে হয়। আমাকে কেউ পছন্দ করে না।

তোমাকে পছন্দ না করার তো কোনো কারণ নেই।

তুমি নিজেই আমাকে পছন্দ কর না। অন্যদের দোষ দিয়ে কী হবে?

আমি তোমাকে পছন্দ করি না?

তোমার এই ধারণা হল কেন?

আমি চুপ করে রইলাম। বাবাও চুপ করে গেলেন। মনে হচ্ছে তিনি খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। অস্বস্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিস্ময়বোধ। অতি কাছের একজনকে নতুন করে আবিষ্কারের বিস্ময়।

রাত দশটার দিকে বাবার ঘরে গেলাম। ইচ্ছে করে খুব সেজোগুজে গেলাম। লাল পাড়ের হালকা সবুজ একটা শাড়ি পারলাম। কপালে টিপ দিলাম। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই চমকে গেলাম-কী সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে বিয়েবাড়ির মেয়ে। কনের ছোট বোন।

বাবা আমার সাজগোজ দেখে আরো ভড়কে গেলেন। বিব্রত গলায় বললেন, মা বোস। তোমাকে তো চেনা যাচ্ছে না।

আমি বসতে বসতে বললাম, তোমার জরুরি কথা শুনতে এসেছি।

বাবা বললেন, এত সেজেছ কেন?

এমনি সজলাম। মাঝে মাঝে আমার সাজতে ইচ্ছা করে।

আমি আগে কখনো তোমাকে সাজতে দেখি নি।

আমাকে কি সুন্দর লাগছে না বাবা?

অবশ্যই সুন্দর লাগছে। কপালের টিপটা কি নিজেই এঁকেছ?

আমি বললাম, বাবা তুমি নানান কথা বলে সময় নষ্ট করছ। কী বলবে সরাসরি থলে ফেল। অস্বস্তি বোধ করার কিছু নেই।

অস্বস্তি বোধ করার কথা আসছে কেন?

তোমার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তুমি অস্বস্তি বোধ করছ। তুমি বরং এক কাজ কর, দুই পেগ হুইস্কি খেয়ে নাও-এতে তোমার ইনহিবিশন কাটবে। যা বলতে চাচ্ছ সরাসরি বলে ফেলতে পারবে।

হুইঙ্কি খেলে ইনহিবিশন কাটে এই তথ্য জানলে কোত্থেকে?

গল্পের বই পড়ে। তোমার কাছ থেকে আমার গল্পের বই পড়ার অভ্যাস হয়েছে। আমিও দিনরাত বই পড়ি।

এটা একটা ভালো অভ্যাস।

বাবা তোমার কথাটা কী?

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ দুম করে বললেন, তোমার ভেতর কিছু রহস্য আছে। রহস্যটা কী?

আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না। বাবা। তুমি কোন রহস্যের কথা বলছি? সব মানুষের মধ্যেই তো রহস্য আছে।

বাবা বললেন, সব মানুষের মধ্যে রহস্য আছে ঠিকই। তবে সেই সব রহস্য ব্যাখ্যা করা যায়। তোমার রহস্য ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। আমি সেটাই জানতে চাচ্ছি।

আমি এখনো তোমার কথা বুঝতে পারছি না।

বাবা উঠে দাঁড়ালেন। আলমারি খুলে হুইঙ্কির বোতল বের করলেন।

মিসির আলি সাহেব আপনাকে এতক্ষণ একটা কথা বলা হয় নি। লজ্জা লাগছিল বলেই বলতে পারি নি—আমার বাবা প্রচুর মদ্যপান করেন। এটা তাঁর অনেক দিনের অভ্যাস। আমার ধারণা মা যে মোটর অ্যাকসিডেন্টে মারা যান। তার কারণ মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে বাবা অ্যাকসিডেন্ট করেন। আমি অবিশ্যি এসব নিয়ে বাবাকে কখনো কোনো প্রশ্ন করি নি। আরেকটা কথা আপনাকে বলা হয় নি-ছোট মা বাবার কাছ থেকে মদ্যপানের অভ্যাস করেছিলেন। এই অংশটি এতক্ষণ গোপন রাখার জন্যে আপনি দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন।

বাবা বললেন, নিশি শোন। নিজের সম্পর্কে তোমার কী ধারণা? তুমি নিজে কি মনে করা তোমার চরিত্রে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে?

না।

তুমি নিশ্চিত যে তোমার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।

আমি নিশ্চিত।

তোমার আশপাশে যারা থাকে তারা অস্বাভাবিক আচরণ করে কেন?

আমি জানি না। তুমিও তো আমার আশপাশেই থাক–তুমি তো অস্বাভাবিক আচরণ কর না।

তুমি আমার সঙ্গে তর্ক করছ কেন?

তৰ্ক করছি না। তুমি প্রশ্ন করছি আমি তার জবাব দিচ্ছি।

আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে দিয়ে তোমাকে দেখাতে চাই।

বেশ তো দেখাও।

আগামী সপ্তাহে আমি মেরিল্যান্ডে যাচ্ছি। আমাদের সুপারসনিকের ওপর শর্ট ট্রেনিং হবে। তুমিও চল। সাইকিয়াট্রিস্ট তোমাকে দেখবে।

আচ্ছা।

মা ঠিক করে বল, তোমার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই?

না।

তুমি তোমার ছোট মাকে মাঝে মাঝে দেখতে পাও এটা কি সত্যি? তোমার আন্টি আমাকে বলেছিল।

হ্যাঁ সত্যি।

তুমি শরিফা মেয়েটিকেও দেখতে পাও।

আগে পেতাম। এখন পাই না।

তোমার কাছে কি মনে হয় না–এই ব্যাপারগুলি অস্বাভাবিক?

না। কারণ শরিফাকে নীতু আন্টিও দেখেছেন।

হ্যাঁ সে আমাকে বলেছে। শরিফাকে এখন আর তুমি দেখতে পাও না?

না সে তার স্বামীর কাছে চলে গেছে। তবে আমি চাইলে সে আবার চলে আসবে।

বুঝিয়ে বল।

আমি স্বপ্নে যা দেখি তাই হয়। স্বপ্নে কী দেখতে চাই এটাও আমি ঠিক করতে পারি। কাজেই আমি যদি ভাবি স্বপ্নে দেখছি শরিফা চলে এসেছে তা হলে সে চলে আসবে। এবং তখন তুমি চাইলে তুমিও তাকে দেখতে পাবে।

এ ব্যাপারটাও তোমার কাছে নরমাল মনে হয়? অস্বাভাবিক মনে হয় না?

না, আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় না। আমার মনে হয় সব মানুষেরই ইচ্ছাপূরণ ধরনের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা আছে। কী করে সেই স্বপ্নটা দেখতে হয় তা তারা জানে না বলে স্বপ্ন দেখতে পারে না।

নিশি!

জি।

তুমি এক কাজ কর। শরিফা মেয়েটিকে নিয়ে এস আমি তাকে দেখতে চাই।

আচ্ছা।

কদিন লাগবে তাকে আনতে?

বেশি দিন লাগবে না। স্বপ্নটা দেখতে পেলেই সে চলে আসবে।

যত তাড়াতাড়ি পার তাকে নিয়ে এস কারণ মেরিল্যান্ড যাবার আগে আমি তাকে দেখতে চাই।

আচ্ছা।

তোমার পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?

খুব ভালো হচ্ছে।

গান শেখা কেমন হচ্ছে?

গান শেখাও ভালো হচ্ছে। তোমার গানের স্যারের সঙ্গে কদিন আগে কথা হল। তিনি তোমার গানের গলার খুব প্রশংসা করলেন। তোমার নাকি কিন্নর কণ্ঠ।

সব গানের স্যাররাই তাদের ছাত্রছাত্রীদের গানের গলা সম্পর্কে এ জাতীয় কথা থলে। আমার গানের গলা ভালো না।

আমি তোমার গান একদিন শুনতে চাই।

এখন গাইব?

এখন গাইতে হবে না।

তোমার জরুরি কথা বলা কি শেষ হয়েছে বাবা?

হুঁ।

আমি চলে যাব?

হ্যাঁ যাও। শরিফা মেয়েটি এলে আমাকে খবর দিও।

আচ্ছা।

আমি আমার ঘরে এসে ঘড়ি দেখলাম, এগারটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। আমি য়াত সাড়ে এগারটার সময় আবার বাবার ঘরে গেলাম। তিনি সম্ভবত ক্ৰমাগতই মদ্যপান করে যাচ্ছেন। তাঁর চোখ খানিকটা লাল। মুখে বিবৰ্ণ ভাব। এমনিতে তিনি সিগারেট খান না-আজ খুব সিগারেট খাচ্ছেন। ঘর ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে। বাবা আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, কী ব্যাপার মা?

আমার ঘরে এস।

কেন?

শরিফাকে দেখতে চেয়েছিলে শরিফ এসেছে।

তুমি না ডাকতেই চলে এসেছে? আমি চুপ করে রইলাম।

বাবা বললেন, শরিফা সত্যি এসেছে?

হ্যাঁ।

কী করছে?

আমার খাটের নিচে বসে আছে।

বাবা হাসলেন। অবিশ্বাসী মানুষের হাসি। বাবা বললেন, তুমি কি তার সঙ্গে কথাও বল?

হ্যাঁ বলি।

সে কি আমার সঙ্গে কথা বলবে?

জানি না। বলতেও পারে।

আমার ধারণা সে আমার সঙ্গে কথা বলবে না। আমি তাকে দেখতেও পাব না। কারণ শরিফা নামের মেয়েটি খাটের নিচে বসে নেই। তোমার মাথার ভেতর একটা ঘর আছে, যে ঘর অবিকল তোমার শোবার ঘরের মতো। সেই ঘরের খাটের নিচে সে বসে আছে। কাজেই তাকে দেখতে পাবার কোনো কারণ নেই। বুঝতে পারছ?

পারছি।

কাজেই মেয়েটিকে দেখতে যাওয়া অর্থহীন।

তুমি যাচ্ছ না?

না।

আমি ফিরে আসছি। বাবা পেছন থেকে ডাকলেন–নিশি দাঁড়াও আসছি। আমি দাঁড়ালাম। বাবার মদ্যপান আজ মনে হয় একটু বেশিই হয়েছে। তিনি সহজভাবে হাঁটতেও পারছেন না। সামান্য টলছেন। আমি বললাম, বাবা তোমার হাত ধরব? তিনি বললেন, না। আই অ্যাম জাস্ট ফাইন।

বাবা আমার ঘরে ঢুকলেন। ঘরে টেবিলল্যাম্প জ্বলছে-মোটামুটি আলো আছে। বাবা নিচু হয়ে খাটের নিচে তাকালেন। আমি তাকিয়ে রইলাম। বাবার দিকে। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম–বাবার শান্ত ভঙ্গি বদলে যাচ্ছে–তার চোখে ভয়ের ছায়া। সেই ছায়া গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। তিনি হতভম্ব চোখে আমার দিকে তাকালেন। তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন খাটের নিচে। তার চোখে পলক পড়ছে না। আমি বললাম, বাবা কিছু দেখতে পাচ্ছ?

তিনি হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ করতে লাগলেন। যেন তার বুকে বাতাস আটকে গেছে তিনি তা বের করতে পারছেন না। খুব যারা বুড়ো মানুষ তারা এ ধরনের শব্দ করে। তবে নিজেরা সেই শব্দ শুনতে পায় না। অন্যরা শুনতে পায়।

আমি বাবাকে হাত ধরে টেনে তুললাম। তাঁকে ধরে ধরে তার ঘরে নিয়ে গেলাম। তিনি প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বললেন—প্রচুর মদ্যপান করেছি। আমার আবার লিমিট পাঁচ পেগ সেখানে আট পেগ খেয়েছি তো-তাই হেলুসিনেশন হচ্ছে। খাটের নিচে কিছুই ছিল না। কিছুই না। অন্ধকার তো, আলো-ছায়াতে মানুষের মতো দেখাচ্ছে। টর্চ লাইট নিয়ে গেলে কিছুই দেখব না।

টর্চ লাইট নিয়ে দেখতে চাও বাবা?

তিনি ক্লান্ত গলায় বললেন—না।

পরের সপ্তাহে আমি বাবার সঙ্গে মেরিল্যান্ড চলে গেলাম। মিসেস জেন ওয়ারেন। নামের এক মহিলা সাইকিয়াট্রিস্ট আমার চিকিৎসা শুরু করলেন। মিসেস জেন ওয়ারেন এম ডি-র বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। আমেরিকান বৃদ্ধ মহিলারা খুব সাজগোজ করেন। ঠোটো কড়া করে লিপস্টিক দেন, চুল পার্ম করেন, কানে রঙচঙে প্লাস্টিকের দুল। পরেন। হাঁটুর উপরে খুব রঙিন—ঝলমলে স্কার্ট পরেন। তাঁদের দেখেই মনে হয় তাঁরা খুব সুখে আছেন।

মিসেস জেন ওয়ারেনও তার ব্যতিক্রম নন। এত নাম করা মানুষ কিন্তু কেমন খুকি সেজে ছটফট করছেন। আহ্লাদী ভঙ্গিতে কথা বলছেন।

সাইকিয়াট্রিস্টদের অনেক ব্যাপার। আমি লক্ষ করেছি। তারা প্রথম যে কাজটি করেন। তা হচ্ছে রোপীর সঙ্গে অত্যন্ত পরিচিত ভঙ্গিতে কথা বলেন। যেন রোগী তার অনেক দিনের চেনা প্রায় বন্ধু স্থানীয়। মিসেস জেন ওয়ারেন এই কাজটা ভালোই করেন। আমাকে দেখে প্রায় চেঁচিয়ে যে কথাটা বললেন তা হল-ও ডিয়ার, তোমাকে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন? ভাবটা এরকম যেন তিনি আমাকে আগেও দেখেছেন তখন এত সুন্দর লাগে নি। বিদেশীরা গায়ে হাত দিয়ে কথা বলে না-ইনি প্রথমবারেই গায়ে হাত রাখলেন।

তোমার নাম হল নিশি। আমার উচ্চারণ ঠিক হয়েছে?

হয়েছে।

নিশি অর্থ হল Night

হ্যাঁ।

মুন লিট নাইট?

জানি না!

অফকোর্স মুন লিট নাইট। তোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে তোমার জীবন আলোময়।

থ্যাংক য়্যু।

তোমার বয় ফ্রেন্ডের নাম কী?

আমার কোনো বয় ফ্রেন্ড নেই।

এমন রূপবতী কন্যার বয় ফ্রেন্ড থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে। তুমি বলতে চাচ্ছ না? এইসব চলবে না-তোমার বয় ফ্রেন্ডের নাম বল, তার ছবি দেখাও।

ভদ্রমহিলা আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছেন, আমিও কিন্তু তাঁকে বুঝতে চেষ্টা করছি। আমি যে তাকে বুঝতে চেষ্টা করছি সেটা মনে হয় তিনি ধরতে পারছেন না। বেশিরভাগ মানুষ নিজেদেরকে অন্যের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান মনে করে। মিসেস জেনও তাই করছেন। আমাকে কিশোরী একটা মেয়ে ভেবে কথা বলছেন, মন জয় করার চেষ্টা করছেন। আমি এমন ভাব করছি যেন ভদ্রমহিলার কথাবার্তায় অভিভূত। আমি তাঁর প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। ঠিক যে জবাবগুলি তিনি শুনতে চাচ্ছেন—সেই জবাবগুলিই দিচ্ছি! কোনো মানুষ যখন প্রশ্ন করে তখন সে যে জবাব শুনতে চায় সেই জবাবটা কিন্তু প্রশ্নের মধ্যেই থাকে।

জেন ওয়ারেন বললেন, আচ্ছা নিশি বাবাকে কি তুমি খুব ভালবাস?

প্রশ্ন করার মধ্যেই কিন্তু যে জবাবটা তিনি শুনতে চাচ্ছেন সেটা আছে। তিনি শুনতে চাচ্ছেন যে বাবাকে আমি মোটেই ভালবাসি না। এই জবাব শুনলে হয়তো তার রোগ ডায়াগনেসিসে সুবিধা হয়। কাজেই তাঁর এই প্রশ্নের জবাবে আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম এবং খুব অনিচ্ছার ভঙ্গিতে হাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম।

ভদ্রমহিলা দারুণ খুশি হয়ে গেলেন।

শোন নিশি-ইয়াং লেড়ি। যদিও তুমি এফারমেটিভ ভঙ্গিতে মাথা নেড়েছ তারপরে মনে হয় তুমি সত্যি কথা বলছি না। আমরা বন্ধু-একজন বন্ধু অন্য বন্ধুকে অবশ্যই সত্যি কথা বলবে তাই না! এখন বল-ভূমি কি তোমার বাবাকে খুব ভালবাস?

আমি হ্যাঁ-না কিছুই বললাম না।

ভদ্রমহিলা আমার আরো কাছে ঘেঁষে এসে বললেন, তুমি কি বাবাকে পছন্দ কর না?

আমি আবারো চুপ করে রইলাম। ভদ্রমহিলা এবার প্রায় ফিসফিস করে বললেনতুমি কি তোমার বাবাকে ঘৃণা করা? আচ্ছা ঠিক আছে মুখে বলতে না চাইলে এখানে দুটা কাগজ আছে একটাতে লেখা Yes এবং একটাতে No, যে কোনো একটা কাগজ তুলে নাও। প্রশ্নটা মন দিয়ে শোন—

তুমি কি তোমার বাবাকে ঘৃণা কর?

আমি Yes লেখা কাগজটা তুললাম। এবং এমন ভাব করলাম যে লজ্জায় দুঃখে। আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। আমার চোখে পানি চলে এল। আমি এমন ভাব করছি যেন চোখের জল সামলাতে আমার কষ্ট হচ্ছে। একসময় হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। বিদেশীরা চোখের পানি কম দেখে বলে চোখের পানিকে তারা খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। বাঙালি মেয়েরা যে অতি সহজে চোখের পানি নিয়ে আসতে পারে এই তথ্য তারা জানে না। তা ছাড়া আমি যে কত বড় অভিনেত্রী তাও তিনি জানেন না। তিনি ছুটে গিয়ে টিসু পেপার নিয়ে এলেন। নিজেই চোখ মুছিয়ে দিলেন। করুণা বিগলিত গলায় বললেন, শোন মেয়ে তোমার লজ্জিত বা দুঃখিত হবার কিছু নেই। আমেরিকান স্ট্যাটিসটিকস বলছে শতকরা ২৮.৬০ ভাগ আমেরিকান পুত্ৰ-কন্যারা তাদের বাবাকে ঘৃণা করে। তুমি আমাকে যা বলেছ তোমার বাবা তা কোনো দিন জানবেন না। এই বিষয়ে তোমাকে আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এখন একটু শান্ত হও। কফি খাবে?

আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম, খাব।

আমরা কফি খেলাম। ভদ্রমহিলা আনন্দিত গলায় বললেন–আমার ধারণা তোমার সমস্যা আমি ধরতে পারছি। সেই সমস্যার সমাধান করা এখন আর কঠিন হবে না। অবিশ্যি তুমি যদি আমাকে সাহায্য কর। তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?

ভেরি গুড। আমরা দুজনে মিলে তোমার সমস্যা সমাধান করব। কেমন?

আচ্ছা।

তোমার বাবাকে তুমি কেন ঘৃণা কর?

বাবা মদ খায়।

শুধু মদ্যপান করে বলেই ঘৃণা কর?

মাতাল হয়ে তিনি একদিন পাড়ি চালাচ্ছিলেন তখন অ্যাকসিডেন্ট হয়। সেই অ্যাকসিডেন্টে আমার মা মারা যান।

তোমার বাবা আমাকে তোমার মার মৃত্যুর কথা বলেছেন। কিন্তু কীভাবে মারা গেছেন তা বলেন নি। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

জেন ওয়ারেন সিগারেট ধরালেন। তিনি বেশ কায়দা করে সিগারেট টানছেন।

নিশি, সিগারেটের ধোঁয়ায় তোমার অসুবিধা হচ্ছে না তো?

জি না।

আমি সিগারেট ছাড়ার চেষ্টা করছি পারছি না। যে কোনো ভালো অভ্যাস সামান্য চেষ্টাতেই ছেড়ে দেয়া যায়–খারাপ অভ্যাস হাজার চেষ্টাতেও ছাড়া যায় না। ঠিক না?

ঠিক।

এখন বল তুমি নাকি তোমার মাকে দেখতে পাও এটা কি সত্যি?

না, সত্যি না।

তা হলে বল এই মিথ্যা কথাটা কেন বলতে?

বাবাকে ভয় দেখাবার জন্যে বলতাম।

বাবাকে ভয় দেখানোর জন্যে তুমি তা হলে বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথাই বলেছি?

জি।

যা বলেছ তোমার বাবা তাই বিশ্বাস করেছেন?

জি।

আচ্ছা আজকের মতো তোমার সঙ্গে আমার কথা শেষ। কাল আবারো আমরা বসব। কেমন?

জি আচ্ছা।

মেরিল্যান্ডে দেখার মতো সুন্দর সুন্দর জিনিস অনেক আছে। তুমি কি দেখেছ?

জি না।

কাল আমি তোমাকে লিস্ট করে দেব। দেশে যাবার আগে তুমি দেখে যাবে।

আচ্ছা।

তুমি কি জান যে তুমি খুব ভালো মেয়ে?

জানি।

ভদ্রমহিলা আমার সঙ্গে আরো তিন দিন সিটিং দিলেন। আমি তাঁকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করলাম। তাঁকে যা বিশ্বাস করাতে চাইলাম তিনি তাই বিশ্বাস করলেন এবং খুব আনন্দিত হলেন এই ভেবে যে তিনি বিদেশিনী এক কিশোরী মেয়ের জীবনের সমস্ত জটিলতা দূর করে ফেলেছেন। তার অন্ধকার ঘরে এক হাজার ওয়াটের বাতি জ্বেলে দিয়েছেন।

আমার সম্পর্কে তিনি যা ধারণা করলেন তা হচ্ছে—

১) আমি খুব ভালো একটা মেয়ে, সরল, বুদ্ধি কম, জগতের জটিলতা কিছু জানি না। (খুব ভুল ধারণা।)

২) আমি নিঃসঙ্গ একটি মেয়ে। আমার সবচে বড় শত্রু আমার নিঃসঙ্গতা। (ভুল ধারণা। আমি নিঃসঙ্গ নই। আমি কখনো একা থাকি না। নিজের বন্ধুবান্ধব নিজে কল্পনা করে নেই। কল্পনাশক্তিসম্পন্ন মানুষ কখনো নিঃসঙ্গ হতে পারে না।)

৩) আমি খুব ভীতু ধরনের মেয়ে। (আবারো ভুল। আমার মধ্যে আর যাই থাকুক ভয় নেই। যখন আমার সাত আট বছর বয়স তখনো রাতে ঘুম না এলে আমি একা এক ছাদে চলে যেতাম।)

৪) বাবাকে আমি অসম্ভব ঘৃণা করি। (খুব ভুল কথা। বাবা চমৎকার মানুষ। আমার ক্ষুদ্র জীবনে যে কজন ভালো মানুষ দেখেছি তিনি তাদের একজন।)

আমি ভদ্রমহিলার মাথায় এইসব ভুল ঢুকিয়ে দিয়েছি। তিনি খুশি মনে ভুলগুলি গ্ৰহণ করেছেন।

মানুষ কী অদ্ভুত দেখেছেন? মানুষ কত সহজেই না ‘ভুল’—সত্যি ভেবে গ্ৰহণ করে।

আমেরিকান মহিলা মনস্তত্ত্ববিদ

আমেরিকান মহিলা মনস্তত্ত্ববিদ বাবাকে কী বলেছিলেন আমি জানি না। বাবাকে আমি জিজ্ঞেস করি নি। তবে অনুমান করতে পারি যে তিনি বাবাকে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। বাবা দেশে ফিরেই সেই উপদেশমতো চলতে শুরু করলেন। প্রথমেই আমার শোবার ঘর বদলে দিলেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন শোবার ঘর বদলানোর ব্যাপারে। আমি খুব। আপত্তি করব। নানান ভণিতা করে তিনি বললেন-মা তোমার এই ঘরটা খুব ছোট। তুমি বড় হয়েছ তোমার আরো বড় ঘর দরকার। তা ছাড়া আমি ভাবছি তোমাকে একটা কম্পিউটার কিনে দেব…কম্পিউটার টেবিল সেট করার জন্যেও জায়গা লাগবে……

আমি তাঁকে কথা শেষ করতে দিলাম না, তার আগেই বললাম-বাবা আমাকে তুমি একটা বড় ঘর দাও! এই ঘরটা আসলেই ছোট।

তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, নতুন ঘরে যখন যাচ্ছ তখন এক কাজ করা যাক। নতুন ঘরের জন্যে আলাদা করে ফার্নিচার কেনা যাক।

আমি বললাম, আচ্ছা। বাবা বললেন, আমার পাশের ঘরটা তুমি নিয়ে নাও। বাবা-মেয়ে পাশাপাশি থাকব, কী বল? ভালো হবে না?

খুব ভালো হবে বাবা।

আমার ঘর বদল হল। নতুন ফার্নিচার এল। যা ভেবেছিলাম। তাই হল, পুরোনো খাট বদলে কেনা হল আধুনিক বক্স খাট। যার নিচে বসার উপায় নেই। সাইকিয়াট্রিস্ট নিশ্চয়ই বাবাকে এই বুদ্ধি দিয়ে দিয়েছিলেন। একদিন কলেজ থেকে ফিরে দেখিআমার আগের শোবার ঘরের কোনো ফার্নিচার নেই। সব ফার্নিচার কোথায় যেন পাচার করা হয়ে গেছে। বাবার পাশের ঘরটা সুন্দর করে সাজানো। নতুন ফার্নিচার। একটা টেবিলে ঝকঝকে কম্পিউটার।

কম্পিউটার কিনে দেবার কথাও হয়তো সাইকিয়াট্রিস্ট বাবাকে বলে দিয়েছিলেন। কম্পিউটারে নানা ধরনের খেলা নিয়ে আমি ব্যস্ত থাকব। খাটের নিচে কে বসে আছে তা নিয়ে মাথা ঘামাব না।

নতুন ঘরে থাকতে এলাম। বাবা আমার ঘরের দরজায় লাল ফিতা দিয়ে রেখেছেন। ফিতা কেটে ঢুকতে হবে। গৃহ-প্রবেশের মতো ঘর-প্রবেশ অনুষ্ঠান।

বাবা বললেন, এসএসসিতে তুমি খুব ভালো রেজাল্ট করেছ বলে এই কম্পিউটার। আমি বললাম, থ্যাংক য়্যু।

নতুন যুগের কম্পিউটার—খুব পাওয়ারফুল। টু গিগা বাইট মেমোরি। এই কম্পিউটার দিয়ে তুমি অনেক কিছু করতে পারবে।

অনেক কিছু মানে কী?

কম্পিউটার গ্রাফিকাস করা যাবে। এনিমেশন করা যাবে। ইচ্ছে করলে ডিজনীর মতো–লিটল মারমেইড জাতীয় কার্টুন ছবিও বানিয়ে ফেলতে পার। তোমার যা বুদ্ধি, ভালো কম্পিউটার পেলে তুমি অনেক কিছু করতে পারবে।

আমার যে খুব বুদ্ধি তা তুমি বুঝলে কী করে?

তোমার রেজাল্ট দেখে বুঝেছি! আমি তো কল্পনাও করি নি তুমি এত ভালো রেজাল্ট করবে।

মিসির আলি সাহেব, প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা নিয়েও আমি খুব ভালো রেজাল্ট করি। কেমন ভালো জানেন? সব পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হয়। আমার প্রিয় লেখক কে, প্রিয় গায়ক কে, প্রিয় খেলোয়াড় কে এইসবও ছাপা হয়।

ওই প্রসঙ্গ থাক। কম্পিউটার প্রসঙ্গে চলে আসি। বাবা শুধু যে আমাকে কম্পিউটার কিনে দিলেন তাই না-আমাকে সবকিছু শেখানোর জন্যে একজন ইন্সট্রাকটার রেখে দিলেন। ইন্সট্রাকটারের নাম-হাসিবুর রহমান। লোকটা লম্বা, রোগী। ইটে চাপা পড়ে থাকা ঘাসের মতো চেহারা। বয়স এই ধরুন পীচিশ-ছাব্বিশ। দেখতে ভালো। মেয়েদের মতো টানা টানা চোখ। একটা ভুল কথা বলে ফেললাম। সব মেয়েদের তো আর টানা টানা চোখ থাকে না।

কম্পিউটারের সব বিষয়ে হাসিবুর রহমানের জ্ঞান অসাধারণ। কিন্তু লোকটি হতদরিদ্র। তার থাকার জায়গা পর্যন্ত নেই। রাতে সে ঘুমায় একটা কম্পিউটারের দোকানে। তাকে অতি সামান্য কিছু টাকা সেই দোকান থেকে দেয়া হয়-এতে তার দুবেলা খাওয়াও বোধহয় হয়। না, তবে এতেই সে খুশি। এত অল্পতে কাউকে খুশি হতেও আমি দেখি নি।

বাবা আমাদের বাড়িতে তাকে থাকতে দিলেন। আমাদের গ্যারেজে তিনটা কামরা আছে। একটা দারোয়ানের, একটা ড্রাইভারের। একটা কামরা খালি। সেই খালি কামরাটায় তাকে থাকতে দেয়া হল। সে মহা খুশি। সারা দিন ঘষামাজা করে ঘর সাজাল। আমার কাছে এসে ক্যালেন্ডার চাইল-দেয়ালে সাজাবে।

তার পড়াশোনা সামান্য। এসএসসি সেকেন্ড ডিভিশন। টাকা পয়সার অভাবে এসএসসি-র বেশি সে পড়তে পারে নি। কম্পিউটারের দোকানে কাজ নিয়েছে। নিজের আগ্রহে কম্পিউটার শিখেছে।

ভদ্রলোককে আমার কয়েকটি কারণে পছন্দ হল। প্রথম কারণ তিনি আমাকে অত্যন্ত সম্মান করেন। আমাকে দেখামাত্র লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান। দ্বিতীয় কারণ আমার প্রতিটি কথা তিনি বিশ্বাস করেন।

যেহেতু তিনি আমাকে কম্পিউটার শেখাতে এসেছেন প্রথম দিনই আমি তাকে স্যার ডাকলাম। তিনি খুবই লজ্জা পেয়ে বললেন, ম্যাডাম আপনি আমাকে স্যার ডাকবেন না। আমার খুবই লজ্জা লাগছে।

আপনাকে তা হলে কী ডাকব?

নাম ধরে ডাকবেন। আমার নাম হাসিব।

আপনাকে হাসিব ডাকব?

জি।

আচ্ছা বেশ তাই ডাকব।

আমি সহজ ভাবেই তাকে হাসিব ডাকা শুরু করলাম। ভদ্রলোক আমার কম্পিউটারের টিচার হলেও তার সঙ্গে আমার কথাবাতাঁর ধরন ছিল মুনিব-কন্যা এবং কর্মচারীর মতো। আমার তাতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না। ওনারও হচ্ছিল না। স্যার ডাকলেই হয়তো অনেক বেশি অসুবিধা হত।

কম্পিউটারের নানান বিষয় আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শিখতে লাগলাম। উনিও খুব আগ্রহ নিয়ে শেখাতে লাগলেন। বুদ্ধিমতী আগ্ৰহী ছাত্রীকে শেখানোর মধ্যেও আনন্দ আছে। সেই আনন্দ তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠত। রাত জেগে জেগে তাঁর সঙ্গে আমি 3D STUDIO এবং MICRO MEDIA DIRECTOR এই দুটি প্রোগ্রাম শিখছি। একটা সফটওয়্যার তৈরি করছি। যে সফটওয়্যারে কম্পিউটারের পর্দায় শরিফ এসে উপস্থিত হবে। তাকে প্রশ্ন করলে সে প্রশ্নের জবাব দেবে। সহজ প্রশ্ন কিন্তু অদ্ভুত জবাব। যেমন,

প্রশ্ন : আপনার নাম?

উত্তর : আমার কোনো নাম নেই, আমি হচ্ছি ছায়াময়ী। ছায়াদের কি নাম থাকে?

প্রশ্ন : আপনার পরিচয় কী?

উত্তর : আমার কোনো পরিচয়ও নেই। পরিচয় মানেই তো ব্যাখ্যা ও বর্ণনা। আমাকে ব্যাখ্যা ও বর্ণনায় ধরা যাবে না।

পর্দায় প্রশ্নের উত্তরগুলি লেখা হবে না। পর্দায় ভাসবে শরিফার বিচিত্র সব ছবি এবং উত্তরগুলি ধাতবকণ্ঠে শোনা যাবে।

হাসিব একদিন জিজ্ঞেস করলেন। (খুব ভয়ে ভয়ে। আমাকে যে কোনো প্রশ্নই খুব ভয়ে ভয়ে করেন। ভাবটা এরকম যেন প্রশ্ন শুনলেই আমি রেগে যাব)-

শরিফা কে?

আমি বললাম শরিফা একটি মৃতা মেয়ে।

ও আচ্ছা।

আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন?

জি করি। করব না কেন?

ভূত দেখেছেন কখনো?

জি না।

আপনি যদি শরিফাকে দেখতে চান আমি তাকে দেখতে পারি। ওর সঙ্গে আমার ভালো পরিচয় আছে। আমি বললেই সে আসবে।

জি না দেখতে চাই না। আমি খুব ভীতু।

আমি ডাকলেই শরিফা চলে আসবে। আপনি এটা বিশ্বাস করলেন?

বিশ্বাস করব না কেন? আপনি তো আর শুধু শুধু মিথ্যা কথা বলবেন না। আপনি সেই ধরনের মেয়ে না।

আমি কোন ধরনের মেয়ে?

খুব ভালো মেয়ে।

আপনি কম্পিউটারের মতো আধুনিক জিনিস নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, আবার ভূতও বিশ্বাস করেন?

জি ভূত বিশ্বাস করি, জিনও বিশ্বাস করি। কুরআন শরিফে জিনের কথা আছে। একটা সুরা আছে-সুরার নাম হল—সুরায়ে জিন।

তাই বুঝি?

জি।

আপনি আমাকে একটা ভূতের গল্প বলুন তো!

ম্যাডাম আমি ভূতের গল্প জানি না।

কিছু না কিছু নিশ্চয়ই জানেন মনে করে দেখুন। ছোটবেলায় ভয় পেয়েছিলেন। এমন কিছু।

খুব ছোটবেলায় একবার শ্মশান-কোকিলের ডাক শুনেছিলাম।

কিসের ডাক শুনেছিলেন?

শ্মশান–কোকিল। ভয়ঙ্কর ডাক। কেউ যদি শ্মশান–কোকিলের ডাক শোনে তার নিকটাত্মীয় মারা যায়।

আপনার কি কেউ মারা গিয়েছিল?

আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন।

মৃত্যুর পর তাঁকে কখনো দেখেছেন?

প্রায়ই স্বপ্নে দেখি।

স্বপ্রের কথা বলছি না। জাগ্ৰত অবস্থায় তাঁকে কখনো দেখেছেন?

জি না।

শ্মশান-কোকিল পাখিটা দেখতে কেমন?

দেখতে কেমন জানি না। ম্যাডাম। শশানের আশপাশে থাকে। কেউ দেখে না।

আপনাদের গ্রামে শ্মশান আছে?

জি আছে। মহাশ্মশান। খুব বড়।

আমার শ্মশান দেখতে ইচ্ছে করছে। আপনি কি আমাকে আপনাদের গ্রামে নিয়ে যাবেন।

উনি হতভম্ব গলায় বললেন, থাকবেন কোথায়?

কেন আপনাদের গ্রামের বাড়িতে।

অসম্ভব কথা বলছেন ম্যাডাম। আমরা খুবই গরিব। খড়ের চালা ঘর। মাটির দেয়াল।

হাসিব খুবই নাৰ্ভাস হয়ে গেলেন। তার ভাবটা এরকম যেন এখনই তাকে নিয়ে আমি তাদের গ্রামের বাড়িতে রওনা হচ্ছি। মানুষের সারল্য যে কোন পর্যায়ে যেতে পারে তা তাকে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। তবে হাসিব বোকা ছিলেন না। আমাদের ধারণা সরল মানুষ মানেই বোকা মানুষ এই ধারণা সত্যি নয়।

মিসির আলি সাহেব আপনার কি ধারণা আমি এই মানুষটার প্রেমে পড়েছি? আমার মনে হয় না। মানুষটাকে আমি করুণা করতাম। প্রেম এবং করুণা এক ব্যাপার নয়। প্ৰেম সৰ্ব্বগ্রাসী ব্যাপার। প্রেমের ধর্ম হচ্ছে অগ্নি। আগুন যেমন সব পুড়িয়ে দেয় প্রেমও সব ছারখার করে দেয়। হাসিব নামের মানুষটির প্রতি প্ৰবল করুণা ছাড়া আমি কিছু বোধ করি নি।

তার সঙ্গে আমার কথা বলতে ভালো লাগত–এই পর্যন্তই। আমি নিঃসঙ্গ একটা মেয়ে, কারো সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা হওয়াটাকে আপনি নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক বলবেন না। ছোটবেলা থেকেই আমার অনেক খেলনা ছিল। খেলনা নিয়ে খেলতে ভালো লাগত। হাসিবের সঙ্গে আমার ব্যাপারটাও সেরকম। সে ছিল আমার কাছে মজার একটা খেলনার মতো।

তাকে আমি ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর গল্প বলে ভয় দেখতাম। শরিফার গল্প। আমার ছোট মার গল্প। মানুষটা ভয়ে আতঙ্কে অস্থির হয়ে যেত। দেখে আমার এমন মজা লাগত।

আমি তখন একটা অন্যায় করলাম। খুব বড় ধরনের অন্যায়। একটা নির্দোষ খেলাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবার অন্যায়। আমি তাঁকে ভয় দেখলাম। কীভাবে ভয় দেখলাম জানেন? শরিফা সেজে ভয় দেখলাম।

তিনি সে রাতে আমাকে কম্পিউটার শেখানো শেষ করে তাঁর ঘরে ঘুমাতে যাবেন, আমি বললাম, আপনি কি ভাত খেয়েছেন?

তিনি বললেন, জি না। ভাত রাধব তারপর খাব।

আমি বললাম, এত রাতে ভাত রোধে খেতে হবে না। আমি বুয়াকে বলে দিচ্ছি–আপনাকে খাইয়ে দেবে। একেবারে খাওয়াদাওয়া করে তারপর ঘুমাতে যান।

তিনি সুবোধ বালকের মতো মাথা নাড়লেন।

হাসিব যখন ভাত খাচ্ছিলেন তখন আমি গ্যারেজে তার ঘরে উপস্থিত হলাম। কেউ আমাকে দেখল না। দারোয়ান দুজনই ছিল গেটে। ড্রাইভার বাইরে। আমি কয়েক সেকেন্ড ভাবলাম তারপর হুট করে তাঁর ঘরে ঢুকে গেলাম! ঠিক করে রাখলাম অনেক রাত পর্যন্ত খাটের নিচে বসে থাকব। তিনি খাওয়া শেষ করে ঘরে ঢুকবেন। দরজা লাগাবেন। তারপর ঘুমিয়ে পড়বেন। তখন হাসির শব্দ করে তাঁর ঘুম ভাঙাব। ঘুম ভাঙতেই তিনি শব্দ শুনে খাটের নিচে তাকাবেন-আধো আলো আধো অন্ধকারে এলোমেলো চুলে শরিফা বসে আছে…সম্পূর্ণ নগ্ন এক ভয়ঙ্কর তরুণী। তাঁর কাছে কী ভয়ঙ্করই না লাগবে! ভাবতেও আনন্দ!

আমার নাম মিসির আলি

কে বলছেন?

আমার নাম মিসির আলি।

স্নামালিকুম।

ওয়ালাইকুম সালাম।

কে কথা বলছ-নিশি?

জি। তুমি ভালো আছ?

জি।

আরো আগেই টেলিফোন করতাম–আমার নিজের টেলিফোন নেই। আমি সাধারণত একটা পরিচিত দোকান থেকে ফোন করি। সেই দোকান গত এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ।

বন্ধ কেন?

জানি না কেন। খোজ নেই নি।

একটা দোকান এক সপ্তাহ হল বন্ধ। আর আপনি হলেন বিখ্যাত মিসির আলি। আপনি খোজ নেবেন না?

খোঁজ নেয়াটা তেমন জরুরি মনে করি নি।

আমার তো ধারণা ব্যাপারটা খুবই জরুরি। বড় ধরনের কোনো কারণ ছাড়া কেউ এক সপ্তাহ ধরে দোকান বন্ধ রাখে না। আজ কি আপনি সেই দোকান থেকে টেলিফোন করছেন?

হুঁ।

ওরা দোকান বন্ধ রেখেছিল কেন?

দোকানের মালিকের মেয়ের বিয়ে ছিল। তিনি দোকানের সব কর্মচারীদের নিয়ে দেশের বাড়িতে গিয়েছিলেন।

ও আচ্ছা। মেয়ের বিয়োতে আপনাকে দাওয়াত দেয় নি?

না। আমার সঙ্গে তেমন পরিচয় নেই।

কম পরিচয় থাকলেও তো আপনাকে দাওয়াত দেয়ার কথা। আপনি এত বিখ্যাত ব্যক্তি। বিখ্যাত মানুষরা খুব দাওয়াত পায়। সবাই চায় তাদের অনুষ্ঠানে বিখ্যাতরা আসুক।

তুমি যত বিখ্যাত আমাকে ভাবছ। আমি তত বিখ্যাত নই।

আপনি কি আমার লেখাটা পড়েছেন?

হ্যাঁ।

পুরোটা পড়েছেন?

না পুরোটা পড়ি নি।

কতদূর পড়েছেন?

তুমি হাসিব সাহেবকে ভয় দেখানোর জন্যে খাটের নিচú