রম্য গল্প: বাসর ঘর

রম্য গল্প: 'আভার বাসর'

উঠোনে চেয়ার পেতে বসে আছি। এত রাতে ঠান্ডার মধ্যে উঠোনে বসে গল্প করছি। আমার সামনের চেয়ারে দুলাভাই বসে আছে। পাশে আরেকজন বসে আছে। দুজন গল্প করে চলেছে। আমি বাধ্য হয়ে তাদের গল্প শুনছি। এছাড়া আমার কাছে কোন অপশন নেই।

এইসময় আমার লেপের নিচে শুয়ে থাকার কথা। বউ না থাকায় কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর কথা। কখনো কোলবালিশ নিচে পরে গেলে টেনে আবার জড়িয়ে নিব। কিন্তু আজ সেইরকম কিছুই করতে হবেনা। কোলবালিশের পরিবর্তে আজ বউ পেয়েছি। তাকে আনার পরে আরেক ঝামেলায় পরেছি। সবাই নতুন বউ দেখার জন্য আমার ঘর জুড়ে বসে আছে। আমি বেচারা বাইরে বসে দুজনের গল্প শুনছি।

-শালাবাবু। ঠান্ডা লাগছে?
দুলাভাইয়ের মুখের দিকে তাকাতেই বুঝলাম, তিনি মজা করছেন। সুযোগ পেলে যা হয় আর কি! আমি মুচকি হাসার চেষ্টা করে বললাম–

-না। ঠিক আছি।
-আরো তো কিছুক্ষণ। তারপরে ঠান্ডা লাগার বদলে গরম লাগবে।

চুপ করে বসে থাকলাম। উনারা দুজন বলে হাসতে থাকুক। পাশের জন বেশ মজা পাচ্ছে মনে হয়। উনি আভার দুলাভাই। উনিও মজা করতে পারেন সেটা বুঝতে পারলাম।

একটু আগে একবার রুমে গিয়েছিলাম। ঘরে ঢুকতেই ছোট ভাই বলল–

-এইরুমে এত ঘন ঘন আসছিস কেন? তোর বউ অন্য কেউ নিয়ে যাবে নাকি!

আরেক বিপদ। আমি এসেছিলাম লুঙ্গি নিতে। এই বিয়ের পোষাকে কতক্ষণ থাকা যায়! ছোট ভাইয়ের কথা শুনে এমনিতেই বেড়িয়ে এলাম।

দুলাভাই উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন–

-চল। এবারে ঘরে চল। অনেক রাত হল।

এতক্ষণে তবে বুঝতে পারল। দুলাভাই উঠে আমার ঘরে গিয়ে সবাইকে বের হতে বলল। আভার দুলাভাই পাশে দাঁড়িয়ে বলল

-শুনো, নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই। প্রথম প্রথম একটু নার্ভাস লাগে।

লোকটার দিকে তাকালাম। মুখে দুষ্টামির হাসি মিশে আছে। উনার কথায় মনে হয়, উনি বেশ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। উনি কয়বার বাসর ঘরে ঢুকেছেন? জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থেমে গেলাম।

বাসরঘর থেকে সব লোক বেড়িয়ে গিয়েছে। আমি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আভার দুলাভাই আবার বলল।

-একটুও নার্ভাস হবে না। যাও।

আমি ভেতরে ঢুকলাম। দরজাটা লাগিয়ে দিতে দিতে উনার কথা ভাবছি। উনি আমাকে নার্ভাস হওয়ার কথা বলল কেন! আমাকে কি নার্ভাস মনেহয়! নার্ভাস হব কেন! বাসরঘর তো সাধারণ ঘটনা। বাংলা সিনেমায় কত দেখেছি।

-বসতে পারি?

কথাটা বলতেই চুপ হয়ে গেলাম। কথাটা কেন বললাম! উনি তো অপরিচিত কেউ না। আমার ঘরে আমি বসতে অনুমতি নিতে হবে কেন! এর আগে কখনো কারো অনুমতি লাগেনি। তবে আজ! আভার মুখের দিকে তাকালাম। ঘোমটা কিছুটা নেমে গিয়েছে। মুখের মধ্যে একটা রাগের ভাব। আমার কথায় রাগ করেছে সে।

-বস।

চুপ করে পাশে বসলাম। ভেবেছিলাম আমাকে আপনি করে বলবে। তারপরে আমি।কাছে টেনে নিয়ে বলব

-তুমি করে বল।

-লজ্জা লাগে।

-আমি তোমার স্বামী। লজ্জা কিসের!

সেইরকম কিছুই হয়নি। আমার গরম লাগছে। এই শিতের ভেতরে ঠান্ডা লাগার বদলে গরম লাগার ব্যাপারটা অস্বাভাবিক। নার্ভাস হওয়ার কারনে এমন লাগছে মনেহয়। দুলাভাইয়ের কথায় তখন পাত্তা দেইনি। তবে তার কথার বেশ যুক্তি আছে দেখছি।

টেবিলের উপরের জগ থেকে পানি ঢেলে পানি খেলাম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। কিছুতেই পারছিনা। মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস করার ছলে পাশে বসব! তার নাম আগেই জানি। তাই আবার জিজ্ঞেস করা বোকামি।

মেয়েটির নাম আভা। বিয়ের আগে কয়েকবার ফোনে কথা বলেছি। তবে সেভাবে মেশা হয়নি। ওর পাশে বসতেই বলল।

-নার্ভাস লাগছে?

আমার নার্ভাস লাগছে সেটা কিভাবে বুঝল! তবে কি সে আমার মনের খবর জানে!

-এই নাও পানি খাও।

আভার হাত থেকে গ্লাস নিয়ে আরেক গ্লাস পানি খেলাম। নতুন বউ এর দেওয়া জিনিস না নিলে কেমন হয়! আমি ওর দিকে তাকালাম। ভাল করে দেখার চেষ্টা করছি। টানা টানা দুচোখে কাজল মাখিয়ে আরো বেশি সুন্দর লাগছে। ওই চোখের মাঝে নিজেকে হারাতেও কারো দ্বিধা থাকবে না। মুখের দিকে তাকিয়ে আছি কিছুক্ষণ। মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।

এতক্ষণে নার্ভাস ভাবটা কেটে গিয়েছে। এক মুহুর্তে মেয়েটিকে খুব আপন লাগছে। আভা মুচকি হেসে বলল ।

-এভাবেই থাকবে নাকি চেঞ্জ করে নিবে?

-তুমি চেঞ্জ করে নাও। আমি পরে করছি।

-ওকে।

আমি বিছানায় বসে আছি। ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। এর জন্য আমার ভাগ্নেদের অবদান বেশি। একমাত্র মামার বিয়েতে তাদের খুশি দেখার মত। ঘর সাজিয়ে অনেক টাকা আদায় করেছে তারা। সেটা আমার বাপের পকেট থেকে গিয়েছে। এ যাত্রায় মোটামুটি বাপের উপর দিয়েই টাকার ধকল গেল।

আভা ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে এল। ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকলাম। আমার হাসির ব্যাপারটা সে বুঝতে পেরেছে বোধহয়। তাই কিছুটা লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে শাড়ি পরেছে, কিন্তু শাড়ির কুচি ঠিক হয়নি। হাসি থামানোর জন্য বলল

-এর আগে শাড়ি পড়িনি। কিভাবে কুচি দেয় সেটা পারিনা।

-সমস্যা নেই। আমি ঠিক করে দিচ্ছি।

-তুমি!

-কেন আমাকে কি অকর্মার ঢেকি মনেহয়?

-তেমন না। তবে তুমি.

-এখন এস ঠিক করে দেই।

আভার শাড়ির কুচি ঠিক করে দিলাম। আমার সুন্দর করে শাড়ি পড়ানো দেখে সে অবাক। একটা ছেলে হয়েও এত সুন্দর শাড়ি পড়াতে পারি! সে বলল —

-তুমি এত ভাল শাড়ি পড়ানো কোথা থেকে শিখলে? আগে কয়জনকে শাড়ির কুচি ঠিক করে দিয়েছ! হুম।

-কোন মেয়েকে পড়াইনি। তবে ছেলেকে পড়িয়েছি।

-মানে!

-কলেজে থাকা অবস্থায় আমরা নাটক করেছিলাম। তখন আমার এক বন্ধুকে সাজানোর জন্য শিখেছিলাম।

-এখন থেকে তাহলে তুমি আমার শাড়ি ঠিক করে দিবে।

-আচ্ছা।

-তবে পড়াতে গিয়ে দুষ্টামি করবে না।

আভার মুখে দুষ্টামির হাসি। আমি ওর হাসি দেখতে দেখতে ওয়াশরুমে চেঞ্জ করতে ঢুকলাম।

ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে দেখলাম আভা চুপ করে বিছানার উপর বসে আছে। দুজনের কারো মাঝেই জড়তা নেই। মনেহয় আমরা জনম জনম ধরে দুজনকে চিনি-জানি। আমিও বিছানায় উঠে বসলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল

-আমার ঘুম পাচ্ছে।

-ঘুমাবে! আচ্ছা ঘুমাও।

আমার কথায় আভার কিছুটা মন খারাপ হয়ে গেল। সে ভাবেনি আমি এত সহজেই ঘুমাতে বলব। আমি চাইনা সে ঘুমাক। তবুও বললাম।

কোলবালিশ মধ্যে দিয়ে আভা শুয়ে পড়ল। এমন কাজ দেখে কিছুটা অবাক হলাম। বিয়ের পরেও আমাকে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমাতে হবে! ওর দিকে তাকিয়ে বললাম।

-কোলবালিশ দিলে কেন!

সে অভিমানী সুরে বলল

-তুমি যাতে আমাকে ছুতে না পার।

চুপ হয়ে গেলাম। এখনি অভিমান করে বসে আছে! মেয়েটা বেশ অভিমানী বুঝাই যায়। অভিমান করে বসে আছে! মেয়েটা বেশ অভিমানী বুঝাই যায়। অভিমান ভাঙানোর দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে।

কোলবালিশ নিয়ে অন্যপাশে রাখলাম। আভার পাশে আমিও শুয়ে পরলাম। হাতটা ধরে কাছে টেনে নিলাম। চোখের মাঝে লজ্জা দেখা যাচ্ছে। লজ্জামাখা চোখে বলল..

-কাছে টেনেছ ঠিক আছে।জড়িয়ে ধরবে না।

কিছু নিষেধের মাঝে হ্যা সুচক কথা থাকে। সে আমাকে জড়িয়ে ধরতে বলছে। আমি কাছে টেনে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।

ঠান্ডার জন্য লেপটাও গায়ের উপর চড়িয়ে দিলাম।

রাত দুইটার বেশি বাজে মনে হয়। আমি চুপ করে শুয়ে আছি। চোখে ঘুম নেই। আভার চোখেও এখন ঘুম নেই। আমার বুকে মাথা রেখে মনের কথাগুলো বলে যচ্ছে। আমি চুপ করে ওকে দেখছি। এমন একটা মেয়ের প্রেমে না পড়লেই নয়। নিজের অজান্তেই অনেক বেশি ভালবেসে ফেলেছি। এখন দুজনের কারো ঠান্ডা লাগছে না। প্রেমের উষ্ণতায় মিশে যাচ্ছি দুজন।

Facebook Comment

You May Also Like