Saturday, June 22, 2024
Homeবাণী-কথাস্বপ্নের রাজপ্রাসাদ - তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ - তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

দুপুরের ঠিক পরেই গোটা আকাশটা এমন মেঘময় হয়ে উঠল, এমন বিষণ্ণতার প্র‌তীক যে, ব্রতীনের মুখখানা ধারাপাতের পাঁচ। ছুটির বিকেল, তার উপর আকাশের ধমক, কোন আহাম্মকের বেরতে ইচ্ছে করে ঘরের নিরাপত্তা ছেড়ে! কিন্তু বেরতে হবেই। বিমলেন্দ্রদাকে কথা দেওয়া রয়েছে বিশাখাকে সঙ্গে করে তাঁর ফ্ল্যাটে যাবে আরও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।

গড়িয়া থেকে নিউটাউন দূরত্ব কম নয়, কিন্তু কলকাতার লেটেস্ট ক্রেজ আপাতত নিউটাউন, সেখানেই এখন গড়ে উঠছে যাবতীয় স্বপ্নের হাইরাইজ বিল্ডিং, সেখানে একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান দিয়েছেন বিমলেন্দ্রদা। বিশাখা একেবারে পাগল হয়ে উঠেছে সেই ফ্ল্যাট কিনতে।

অবশ্য ফ্ল্যাট দেখলেই যে পছন্দ হয়ে যাবে তা নয়। গড়িয়ায় একটা প্র‌শস্ত ফ্ল্যাটে তারা ভাড়াটে হিসেবে থাকে, ফ্ল্যাটের ভিতরটা যদিও বা পছন্দ বিশাখার, কিন্তু অপছন্দ অনেকগুলি কারণে। প্র‌থমত, ভাড়াতে হয়ে থাকাটাই তার কাছে অপমানের। দ্বিতীয়ত, লোকেশন। এই অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক পিছনেই একটা মস্ত বস্তি, রাত দুপুর পর্যন্ত সেখান থেকে বিশ্রী ঝগড়াঝাঁটি আর মদ খেয়ে হইহল্লার আওয়াজে রাতের ঘুম বিঘ্নিত হয়। তৃতীয়ত, কাছাকাছি ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অভাব। বুম্বার এই থ্রি প্লাস, এখনই স্কুলে ভর্তি না করলেই নয়!

অতএব গত তিনমাস ধরে প্র‌তি রবিবার নিয়ম করে সকালে ও বিকালে ফ্ল্যাট দেখাদেখি চলছে, একদিন সল্টলেকের ফ্ল্যাট দেখে এল তো পরেরটা বাইপাসে, তার পরেরটা ঢাকুরিয়ায় তো তার পরেরটা লেক টাউনে। কিন্তু তেত্রিশটা মেয়ে দেখার পর যেমন বিশাখাকে পছন্দ করেছিল ব্রতীন, তার বদলা হিসেবে এর মধ্যে তেইশটা ফ্ল্যাট দেখে ফেলেছে বিশাখা, একটাও পছন্দ হয়নি। যে-ফ্ল্যাটটা বিশাখার পছন্দ হয়, সেটা ব্রতীনের রেস্তয় কুলোয় না, যেটা তার নাগালের মধ্যে, সেটা দেখে বিশাখা আবিষ্কার করে একশো এক খুঁত।

এতদিন পরে তাদের অফিসের বিমলেন্দ্রদা নিউটাউনে, তাঁদের ফ্ল্যাটের অদূরে একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান দিয়েছেন সেটা যদি বিশাখার মনমতো হয়, তা হলে বোধহয় ব্রতীনের অফিস-লোনের আওতার মধ্যে হবে। নিউটাউন শুনেই তো লাফাচ্ছে বিশাখা।

শেষ-বিকেলে দুটো অটো আর দুটো বাস বদলে যখন বিমলেন্দ্রদার নিউটাউনের ফ্ল্যাট খুঁজে পেল, তখন সাতটা বেজে গেছে। তার মধ্যে টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, ছাতা সঙ্গে ছিল বলে ভিজতে হল না ঠিকই, কিন্তু বিমলেন্দ্রদার ফ্ল্যাটের বেল টিপতে খুলে দিল তার দশ বছরের পুত্র রম্বস, গম্ভীর মুখে বলল, বাবা-মা কেউ ঘরে নেই।

নেই! ব্রতীনের গলায় প্র‌ায় আর্তনাদ, কোথায় গেলেন?

শপিং-এ।

শপিং-এ? কতক্ষণ আগে? কখন ফেরার কথা?

রম্বস ঠোঁট উল্টে বলল, কে জানে কখন ফিরবে? যাওয়ার সময় বলে গেল এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরবে, হয়ে গেল তিন ঘণ্টা। মাকে সঙ্গে নিলে এরকমই হয়।

ব্রতীন কব্জিতে চোখ রেখে একটু চিন্তিত হল। বাইরে তখন বৃষ্টির ফোঁটার আকার বেড়েছে, সঙ্গে ছাতা থাকলেও এখন ফেরা মুশকিল।

রম্বস ঘরে একা আছে, অতএব অতিথি সামলানোর দায়িত্ব এখন বর্তেছে তারই উপর, বলল, তোমরা এখন সোফায় বসো, আমি টিভি দেখছি।

টিভিটা খোলাই ছিল, রম্বস তার কর্তব্যকর্ম সেরে আবার বসে গেল টিভির স্ক্রিনের সামনে।

ব্রতীন চোখোচোখি করে বিশাখার সঙ্গে, আকাশের মেঘখণ্ডগুলি এখন জমতে শুরু করেছে বিশাখার চোখেমুখে, যেন বিমলেন্দ্রদার শপিং করার অপরাধ এখন ব্রতীনেরই।

ব্রতীন হিসেব করছিল বিমলেন্দ্রদার ফেরার সময়। রম্বসকে বলে গিয়েছিলেন এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসবেন, এক ঘণ্টার জায়গায় দু ঘণ্টা পরে ফিরলেও এতক্ষণ ফ্ল্যাটে ফিরে আসার কথা, কিন্তু বৃষ্টির কারণেই বোধহয় আটকে গেছেন কোথাও।

একবার মোবাইল অন করে বিমলেন্দ্রদাকে ফোন কল, ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বেজে বেজে নীরব হয়ে গেল আচমকা। ব্রতীনের মুখটা অন্ধকার। নিশ্চয় বিমলেন্দ্রদা এমন কোথাও আছেন, মোবাইলের আওয়াজ শুনতে পাননি!

এই বৃষ্টিতে এখন বেরনোও মুশকিল। এখন তাঁদের ফ্ল্যাটে বসে কালক্ষেপ করা ছাড়া উপায়ম নাস্তি।

সোফায় বসে কিছুক্ষণ মুখ গোমড়া করে থাকার পর বিশাখার নজর পড়ল সেন্টার টেবিলের উপর জিরোতে থাকা একটা খেলনা-বাক্সের উপর। বাক্সটা একপাশে রাখা, তার পাশে বাক্সের ভিতকার ছোটো বড়ো নানা ধরনের আর নানা রঙের কিউব আর রড সাজিয়ে একটা মডেল ফ্ল্যাট বানানো।

বিশাখা কিছুক্ষণ ফ্ল্যাটটা গভীর চোখে নিরীক্ষণ করে বলল, রম্বস, তুমি বানিয়েছ ফ্ল্যাটটা?

টিভির স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে মডেলটা একবার দেখে নিয়ে রম্বস বলল, হ্যাঁ। বানিয়েছি আমাদের এই ফ্ল্যাটটাই। কিন্তু আমার মোটেই পছন্দ নয়! বড্ড ছোটো।

বিশাখা চকিতে ফ্ল্যাটের বাইরের ঘরটা দেখে নিয়ে বুঝতে চাইল মডেলটির কোন ঘরে তারা বসে আছে! বাকি ঘরগুলির অবস্থান ও আকার কীরকম! দেখে বুঝল রম্বসের কথাই ঠিক। দু-কামরার এই ফ্ল্যাটটিতে বাইরের এই ঘরটাই যা একটু বড়ো, বাকি ঘরটায় তেমন নড়াচড়ার জায়গা নেই।

বিশাখা হঠাৎ স্বর নিচু করে ব্রতীনকে বলল, ফ্ল্যাট কেনার জন্য আমরা ঘুরছি, কিন্তু একটা নিজস্ব বাড়ি হলে বেশ হত, তাই না?

তা তো হতই। কিন্তু ফ্ল্যাট তবুও পাওয়া সম্ভব। জমি পাওয়া দূর অস্ত।

বিশাখার মাথার মধ্যে তখন ঘুরছে তার একটা স্বপ্নের বাড়ি। বিমলেন্দ্রদারা কখন ফিরবেন তার ঠিক নেই, হঠাৎ রম্বসকে বলল, তোমার এই কিউবগুলো দিয়ে আমি একটা বাড়ি বানাব?

রম্বস টিভিতে ব্যস্ত, এদিকে মাথা ঘামানোর সময় নেই, বলল, তোমার যা ইচ্ছে!

জানালাটা খোলা বলে কিছু বৃষ্টির ছাঁট এসে বিঁধছে গায়ে, ভিজে যাচ্ছে একটা সোফাও। রম্বস ছোটোমানুষ বলে ঠিক গ্র‌াহ্য করছে না, ব্রতীন উঠে জানালাটা ভেজিয়ে দিতে বিশাখা মনঃসংযোগ করল রঙিন কিউব আর রডগুলোর উপর।

পুরনো ফ্ল্যাটটা ভেঙে গড়তে বসল একটা নতুন বাড়ি। ব্রতীনকে বলল, দাঁড়াও, বিমলেন্দ্রদাদের আসতে এখনও অনেক দেরি। ততক্ষণে আমরা একটা থ্রি-বেডরুমের বাড়ির পরিকল্পনা নিয়ে কিউব আর রডগুলো সাজিয়ে ফেলি পটাপট। বেশ অনেকটা জায়গা থাকবে বাড়িটায়।

ঝকঝকে কিউবগুলো সাজিয়ে বিশাখা বাড়ি তৈরি করতে শুরু করল দ্রুত হাতে। সামনে একটা মস্ত বারান্দা। বলল, এখানে একটা বেতের টেবিল-চেয়ারের সেট থাকবে, সেখানে আমরা সকাল-সন্ধে চা খাব।

ব্রতীন হাসি-হাসি মুখে দেখল বিশাখার ব্যস্ততা।

বিশাখা বলল, বারান্দা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলে তিনটে বেডরুম। প্র‌তিটা ঘরের তিনটে দেওয়াল একই রঙের তো চতুর্থ দেওয়ালটা হবে অন্য রঙের। তবে লিভিংরুমই সবচেয়ে বড়ো করে করলাম যেখানে দিনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটবে আমাদের।

লিভিংরুমের তিনটে দেওয়াল অফ হোয়াইট করল তো চতুর্থ দেওয়াল গাঢ় ঘিয়ে রঙের। তার একদিকে ডাইনিং টেবিল, অন্যদিকে মস্ত সোফাসেট। বড়ো করে একটা বইয়ের র‍্যাক বানাল যার মধ্যে থাকবে দেশি-বিদেশি নানা বই।

উল্টোদিকের সোফায় বসে ব্রতীন বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছিল বিশাখার ফ্ল্যাট তৈরি। কিন্তু এই মুহূর্তে কোনও কথা বলছিল না কেননা ব্রতীন জানে বিশাখা একটু বিরক্ত হয়ে আছে আজকের এত দূরের জার্নিটা মাঠে মারা গেল বলে।

তবে বিশাখাকে এখন স্বপ্নে পেয়েছে, বলল, বলো, লিভিংরুম কীরকম তোমার পছন্দ?

ব্রতীনকে অংশগ্র‌হণ করতেই হল, বলল, যেদিকে মুখ করে সোফায় বসব, সেই দেওয়ালে শুধু একটা প্র‌মাণ সাইজের ওয়ালপেপার থাকবে। এটা জলপ্র‌পাতের ছবি।

বিশাখা লাফিয়ে উঠে বলল, ঠিক। কোনও একটা রেস্তরাঁয় এরকম দেখেছিলাম। নীল জল ঝাঁপিয়ে পড়ছে অনেকটা নীচে। স্বপ্নের মতো লাগছিল সেই ঘরটা।

লিভিংরুম শেষ করে বিশাখা তখন হাত দিয়েছে বড়ো বেডরুমটায়। এটাও বেশ প্র‌শস্ত করে তৈরি করছে যাতে বড়ো একটা খাট রেখেও তার চারদিকে জায়গা থাকে অনেকটা। তার তিনটে দেওয়াল হালকা নীল রং করল তো চতুর্থ দেওয়ালটা গাঢ় সমুদ্র রঙের। ঘরের ভিতর কোথায় আলমারি থাকবে, কোথায় ওয়ারড্রোব সব ঠিকঠাক তৈরি করে একবার দেখল মনোযোগ দিয়ে।

ব্রতীন অধৈর্য হয়ে কান পেতে শুনছিল বৃষ্টির শব্দ কতটা জোরালো শোনা যাচ্ছে! কবজিতে নজরও রাখছিল রাত কতটা গড়িয়ে চলেছে নিজের মনে। নিউটাউন থেকে ঘরে ফেরার কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে সারাক্ষণ। ট্যাক্সি ছাড়া ফেরা অসম্ভব। ট্যাক্সি পাওয়া আরও অসম্ভব।

বিকেল থেকে মেঘ করে আছে দেখেও তাদের বেরতে হল শুধুমাত্র বিশাখাকে খুশি করতে। ফ্ল্যাট-ফ্ল্যাট করে বিশাখা এতটাই পাগল হয়ে গেছে যে, ফিরতে কষ্ট হবে জেনেও বেরিয়ে পড়েছে বৃষ্টি মাথায় করে নিয়ে। ব্রতীনকেও সমানে তাল দিয়ে যেতে হচ্ছে।

বিশাখার এখন একটুও টেনসন নেই ফেরা বিষয়ে। সে তখন আরও মনোযোগ দিয়ে সাজাচ্ছে গেস্টরুমটা। তাদের এখনকার ফ্ল্যাটটা বড়ো ঠিকই, কিন্তু একটা এক্সট্রা ঘর নেই যে, কোনও একজন আত্মীয় এলে তাকে শুতে দিতে পারে একটা আলাদা ঘরে।

অতএব মনোযোগ দিয়ে বানাচ্ছে গেস্টরুম। তার তিনটে দেওয়াল হালকা গোলাপি তো চতুর্থ দেওয়ালটা ঘন গোলাপি।

বিশাখাকে এমন টেনসনহীন ব্যস্ত দেখে ব্রতীন স্বস্তি পাচ্ছিল। বিমলেন্দ্রদার কথায় এত দূরে এত কষ্ট করে এসে ফ্ল্যাট দেখতে পেল না এ নিয়ে পরে নিশ্চয় গঞ্জনা দেবে বিশাখা, কিন্তু আপাতত সে অতি ব্যস্ত বাড়ির পিছনেও একটা ব্যালকনি আকারের বারান্দা করতে। বেশ প্র‌শস্ত বারান্দা। তাতে পাতা থাকল দুটো চেয়ার একটা ছোট্ট সেন্টার টেবিল। কখনও ইচ্ছে হলে এখানে বসে চা খেতে খেতে পিছনের জমির দিকে চোখ রাখবে।

পিছনের বারান্দাটা খুব পছন্দ হল ব্রতীনের, তবু বলল, দুপাশে দুটো বারান্দা! এত স্পেস এখনকার আর্কিটেক্টরা নষ্ট করে না!

বিশাখা অনায়াসে বলল, তিনিও তোমার মতো স্পেসকেপ্পন। বাড়িতে হাত-পা ছড়িয়ে থাকতে হলে বড়ো বারান্দা আমার খুব পছন্দ। সামনে-পিছনে দুদিকেই। সামনের বারান্দায় বসে থাকলে সমস্ত এলাকার মানুষের চলাচল জানতে পারব। এলাকার হৃৎস্পন্দন জেনে যাওয়া যাবে।

ব্রতীন হেসে উঠে বলল, আজকাল কার হাতে এত সময় আছে যে, সারা বিকেল মানুষ দেখে কাটিয়ে দেবে! আমি এক রবিবারে ঘরে থাকি, তাও যদি কোনও সিনেমা-থিয়েটারে যাওয়া না থাকে!

বিশাখা তার ভাবনাকে নস্যাৎ করে বলল, আর নির্জনতা চাইলে পিছনের বারান্দায় বসে চা।

বিশাখা ব্যস্ত হয়ে পড়ল কিচেন তৈরি করতে। রান্নাঘর হল মেয়েদের নিজস্ব জগৎ। সেখানে খুব মনোনিবেশ করে বেশ বড়ো মাপে তৈরি করল কিচেনটা। একদিকে একটা প্র‌শস্ত স্ল্যাব বসিয়ে বানাল গ্যাসের ওভেন রাখার জায়গা। অন্য দেওয়ালগুলিতে অনেকগুলো র‍্যাক। বাসনকোশন, মশলাপাতি— কত্ত জিনিস রাখতে হয় কিচেনে। দেওয়ালে বেশি র‍্যাক হলে অনেকটা জায়গা পাওয়া যায় মেঝের দিকে।

ব্রতীন মুচকি হেসে বলল, এটা কি কিচেন হচ্ছে, না ব্যাডমিন্টনের কোর্ট! কিচেনের জন্য এত স্পেস?

বিশাখা নিরস্ত না হয়ে বলল, বুঝলে রান্নাঘর বড়ো হলে রান্নাও ভালো হয়। রান্নাঘরে আরাম করে ঘুরে ফিরে বেড়াতে পারলে মন ভালো থাকে। মন খুশি-খুশি থাকলে রান্নার স্বাদই বদলে যায়।

বলতে বলতে বিশাখা একটা চমৎকার র্যাক তৈরি করল যাতে থাকে অনেক রকমের ডাল— মুসুরি, মুগ, অড়হর, মটর। একদিকে রাখবে পেঁয়াজ-রসুন-আদা। একদিকে তেল-নুন-হলুদ-মশলা।

ব্রতীন তবু খুঁত খুঁত করতে থাকে, রান্নাঘরে এত স্পেস দিলে বেডরুমে বেশি জায়গা পাবে না। কিচেনের চেয়ে বেডরুমে স্পেস বেশি দরকার। বেডরুমে আরাম বেশি।

সে তোমরা পুরুষরা এরকম বলবে। তোমাদের তো রান্নাঘরে ঢুকতে হয় না! রান্নাঘর ছোটো হলে দম বন্ধ হয়ে আসে। গরমকালে ঘেমে সেদ্ধ হয়ে যায়। তোমরা সেবসব বুঝবে না! ছেলেদের কাছে শোওয়াটাই সব।

আর শোওয়ার ঘর ছোটো হলে দম বন্ধ হবে না!

বিশাখা বেশি সময় নষ্ট না করে চলে গেছে বাথরুম বানাতে। বেশ প্র‌শস্ত টয়লেট, যার একদিকে গিজার আর তার নিচে বাথটাব। একদিকে পোশাক বদলানোর জায়গা।

ব্রতীন হেসে উঠে বলল, বাথরুমটা এত বড়ো করেছ যে, অনায়াসে ভলিবল খেলা যাবে।

বিশাখা ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, একমাত্র টয়লেটেই প্র‌ত্যেক মানুষ কিছুক্ষণের জন্য একা হতে পারে। তখন সে আর কারও নয়। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ, মানুষের চারপাশ, সংসারের যাবতীয় কূটকচালি কিছুক্ষণ ভুলে থাকতে পারে বাথরুমে ঢুকলে। যা খুশি ভাবতে পারে। তার মনের দখল নেওয়ার কেউ থাকে না তখন।

বলতে বলতে বিশাখা বাথরুমের দেওয়ালটা এমন একটা নীল আর সবচে মেশা রং করল যা স্বপ্ন দেখার পক্ষে চমৎকার। শাওয়ার খুলে দিলে মনে হবে স্নান করতে নেমেছে একটা সমুদ্রের মধ্যে। যেন সমুদ্র থেকে রূপবতী ভেনাস এখনই উঠে আসবে দু-চোখে স্বপ্ন মেখে। যেন তার নগ্ন শরীর থেকে ঝরে পড়বে সমুদ্রের তুঁতে রং জলের সঙ্গে সাদা ধবধবে ফেনা।

ব্রতীন এক চোখ বিস্ময় নিয়ে দেখে যাচ্ছে নানা রঙের কিউব সাজিয়ে বিশাখা রচনা করে যাচ্ছে তার স্বপ্নের বাড়ি।

এই রে, বাড়ি তো হল, কিন্তু ছাদ দেওয়া হয়নি যে! বিশাখা ভাবনায় পড়ে।

অমনি তড়িঘড়ি খুঁজতে লাগল কী দিয়ে ছাদটা ঢাকবে! বাক্সটার মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেল কয়েকটা প্লাস্টিকের শিট। অমনি মাপমতো শিট নিয়ে ছাউনি দিতে শুরু করল তার স্বপ্নের বাড়ির। ব্যাস, এবার বাড়িটাকে বাড়ি-বাড়ি মনে হচ্ছে।

বাড়িটা শেষ হলে বিশাখা কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল মুগ্ধ দৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য সম্মোহিত করল ব্রতীনকেও। মাঝেমধ্যে তার ছ-বছরের বিয়ে-করা বউটাকে ঠিক চিনে উঠতে পারে না। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বিশাখার দু-ঠোঁটের কোণে জড়ো হয়েছে কী এক রহস্যময় হাসি। অচেনা পুলক।

এরকম হাসিই কি হেসেছিল কিংবদন্তী মোনালিসা!

বিশাখা কিছুটা সময় বাড়িটা নিরিখ করে শুরু করল বাড়ির চারদিকে একটা পাঁচিল তুলতে। বলল, বাড়িতে পাঁচিল না দিলে যেন আব্রু থাকে না বাসিন্দার। পাঁচিল মাস্ট।

পাঁচিল তুলতে গিয়ে বাড়ির চারপাশে অনেকটা জায়গা ছাড় দিচ্ছে যাতে পাঁচিল আর বাড়ির মধ্যে অনেকটা জায়গা থাকে যেখানে তৈরি হতে পারে সুন্দর সবুজ একটা লন। তার মধ্যে রকমরকম রঙের ফুল। গোলাপ ভারী পছন্দ করে বিশাখা। তিন-চার রঙের গোলাপ চারা পুঁতবে— সাদা, হলুদ, খুনখারাবি রং। পিছনেও কিছুটা জায়গা রাখল যেখানে পুঁতবে টম্যাটো, ফুলকপি, ঢ্যাঁড়শ। দু-তিনটে পেঁপে চারা।

সব কিছু হওয়ার পরও বিশাখার মনে খুঁতখুঁতি। উঁহু, কিছু একটা খুঁত আছে বাড়িটায়। কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে! কী নেই কী নেই যেন!

হঠাৎ মনে হল ছাদ তো দিলাম, ছাদের তো একটা প্যারাপিট চাই!

বিশাখা মহা উৎসাহে বাক্স খুলে খুঁজতে বসল আরও কিছু ছোটো ছোটো কিউব। ব্যস, অমনি ছাদের চারপাশ ঘিরে ফেলল সেই কিউবগুলো সাজিয়ে। ব্যস, প্যারাপিটও শেষ। আরও অনেকটা উঁচু হয়ে উঠল বাড়িটা। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ভয়ও রইল না।

বিশাখাকে খুব খুশি খুশি দেখাল এবার। বাড়িটা এতটাই উঁচু হয়ে গেছে যে, ওপাশে বসে থাকা ব্রতীনকেও আর দেখা যাচ্ছে না। অদৃশ্য ব্রতীনের দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন হয়েছে বলো?

ব্রতীনের কণ্ঠস্বর গম্ভীর শোনাল, বলল, ভালো।

বিশাখা একটু উঁচু হয়ে ব্রতীনকে দেখার চেষ্টা করল, পারল না, এতটাই উঁচু বাড়িটা।

এত বড়ো একটা বাড়ি বানাতে বেশ রাত হয়ে এল। বৃষ্টির রেশ এখন অনেকটাই কম। ব্রতীন অস্থির হচ্ছে ফেরার ভাবনাটা মাথায় ঘুরছে বলে।

এখান থেকে গড়িয়া অনেকটাই দূর। সেসময় হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল বিমলেন্দ্রদার। ব্রতীন দ্রুত অন করতে শুনল, ব্রতীন, বৃষ্টিতে এমন আটকে গিয়েছিলাম যে বেরতেই পারলাম না। এখন থেমেছে। একটা ট্যাক্সি নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সমস্যা হল, যিনি ফ্ল্যাট দেখাবেন, তিনিও ফেঁসে গেছেন হাওড়ার কাছে। আমাকে বললেন, আজ হবে না, পরে আর একদিন আসতে বলুন।

তাহলে আমরা উঠছি আজ। রম্বস কিন্তু একা রয়েছে।

রম্বসের একা থাকা অভ্যেস আছে। পাশের ফ্ল্যাটের কাকলিকে বলা আছে। ও-ই দেখাশুনা করে রম্বসের।

ঠিক আছে, বিমলেন্দ্রদা।

মোবাইল বন্ধ করে ব্রতীন। বিশাখার দিকে তাকায়, বিমলেন্দ্রদার ফোনেরর সারমর্ম জানিয়ে বলল, কী আর করা যাবে। আজ সন্ধেটাই বরবাদ। চলো। পরে একদিন অ্যাপো করে চলে আসব আবার।

ব্রতীন ভেবেছিল বিশাখা হয়তো খুব প্র‌তিক্রিয়া প্র‌কাশ করবে। কিন্তু আশ্চর্য, বিশাখা তখনও বাস করছে এক ঘোরের মধ্যে। ব্রতীনের কথা শুনল কি শুনল না, একই ভঙ্গিতে বসে রইল সোফায়, সেন্টার টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ে, দুটি চোখ নিবদ্ধ তৈরি করা সেই বাড়িটার দিকে।

ব্রতীন আবার বলল, চলো, বিশাখা।

বিশাখা তখন বিড়বিড় করছে, দ্যাখো, কী চমৎকার বাড়িটা। একেবারে স্বপ্নের বাড়ি। এরকম একটা বাড়ি আমার পছন্দ।

ব্রতীন হাসল, বলল, এরকম একখানা বাড়ি তৈরি করতে কত খরচ জানো?

বিশাখা ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়ে এসেছে, তবু তাকে ঘিরে আছে এক আশ্চর্য ঘোর। সিঁড়ি দিয়ে নামছে আর আত্মমগ্ন হচ্ছে ক্রমশ। সেই সম্মোহনের মধ্যে বলল, এটা তো স্বপ্নের বাড়ি। সব মানুষেরই একটা স্বপ্নের বাড়ি থাকে। সেই বাড়ি সবাই চায়, ক-জনই বা পায়!

স্বপ্নের বাড়ি? ব্রতীন বোঝার চেষ্টা করছে তার বউকে।

হ্যাঁ। স্বপ্নের বাড়ি তৈরি করতে তো আর টাকা লাগে না। যা লাগে তা হল মন।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments