পুরী রহস্য – ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

পুরী রহস্য - ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

পাণ্ডব গোয়েন্দারা ঠিক করল এবার বড়দিনের ছুটিতে ওরা পুরী বেড়াতে যাবে। বাচ্চু-বিচ্ছুদের বাড়িতে বসে এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সমস্যা হল পঞ্চুকে নিয়ে। বাবলু, বিলু, ভোম্বল ও বাচ্চু-বিচ্ছু তো স্টুডেন্ট কনসেশনে যাবে। কিন্তু পঞ্চুুকে নিয়ে কী করা যায়?

ভোম্বল বলল, “কী আবার, ডব্লু টি।”

বাবলু বলল, “তোর ওই সব বদ বুদ্ধিগুলো রাখ তো।”

বাচ্চু বলল, “পঞ্চুর জন্য চিন্তা কী? ওর একটা আলাদা টিকিট কেটে নিলেই হবে।”

বিলু বলল, “অত সস্তা নয়। যাত্ৰীগাড়িতে পঞ্চুুকে উঠতেই দেবে না।”

বাবলু বলল, “ওইটাই তো একমাত্র সমস্যা। তবে ও সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এখন এসপ্ল্যানেডে গিয়ে পুরী এক্সপ্রেসের থ্রি-টায়ারে রিজার্ভেশনটা করিয়ে আসতে পারলে বাঁচি।”

বাচ্চুু বলল, “কনসেশনটা দেখিয়ে বাবা হাওড়া স্টেশন থেকে ছাপটাপ মেরে এনেছেন। এখন গিয়ে যেদিনের টিকিট পাবে সেইদিনেরই নিয়ে নেবে।”

বাবলু কনসেশনের কাগজটা পকেটে রেখে বিলুকে বলল, “তুই তা হলে আমার সঙ্গে আয়।”

বাচ্চু-বিচ্ছুর মা বসে বসে একটা উলেনের সোয়েটার বুনছিলেন। বললেন, “তোমরা সবাই যাও না কেন? তা হলে সবাই সবাইয়ের দিকে নজর রাখতে পারবে। না হলে যেরকম দিনকাল পড়েছে তাতে অত টাকাকড়ি নিয়ে দু’জনের যাওয়া কি ঠিক হবে?”

বাবলু বলল, “আমি তো একাই একশো কাকিমা।”

“তা হোক। তবু দল বেঁধেই যাও।”

“বেশ, আপনি যখন বলছেন তখন দল বেঁধেই যাই।”

বাচ্চু-বিচ্ছুর তৈরি হয়ে নিতে বেশি সময় লাগল না। পাঁচজনের পুরো গ্যাঙটাই চলল এসপ্ল্যানেডে। সঙ্গে পঞ্চুও চলল।

অফিসটাইম, বাসে এখন দারুণ ভিড়। তাই ওরা লঞ্চেই পার হবে ঠিক করল। কিন্তু ফরশোর রোডে আসতেই ওরা দেখল কাতারে কাতারে লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চু-বিচ্ছু বলল, “ওরে বাবা। এত বড় লাইন শেষ হবে কখন?”

বাবলু বলল, “বেশি সময় লাগবে না। লাইন এখনই এগিয়ে যাবে।”

ওরা সবাই গিয়ে লাইনে দাঁড়াল।

ওদের সামনে দু’জন মেয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজনের হাতে রেক্সিন বাইন্ডিং একটি বড় খাতা। তাইতে নাম লেখা ছিল শর্মিলা সরকার। বাবলু বিলুদের সঙ্গে পঞ্চুকেও লাইন দিতে দেখে হেসে উঠল তারা। বলল, “ওমা। কুকুরটা কেমন লাইনে দাঁড়িয়েছে দেখ।”

তারপর বাবলুকে বলল, “তোমাদের পোষা কুকুর নাকি ভাই?”

“হ্যা।”

“ওকে লঞ্চে উঠতে দেবে?”

“আমাদের সবাই চেনে। লঞ্চের ছাদে উঠে যাবে ও। কেউ কিচ্ছু বলবে না।”

“কামড়ায় না তো কাউকে?”

“না।”

এক ভদ্রলোক লাইনে দাঁড়িয়ে একটু বিরক্তির সঙ্গে বললেন, “এই অফিসটাইম ছাড়া কি তোমরা ঘর থেকে বেরোতে পার না?”

বিলু বলল, “এখন এগারোটা বাজে। অফিসটাইম পার হয়ে গেছে। আপনি দেরি করে অফিস যাবেন,তার জন্য কি আমরা দায়ী?”

লাইন একটু একটু করে এগোচ্ছে তখন। বাবলুর সামনে যে মেয়ে দুটি দাঁড়িয়েছিল তাদের একজন বলল, “তোমরা কুকুর নিয়ে ওপারে কোথায় যাবে? ইডেনে?”

“উহু। আমরা পুরী যাব। তাই টিকিট কাটতে যাচ্ছি এসপ্ল্যানেড বুকিং অফিসে।”

“সে কী ! তোমরা পারবে টিকিট কাটতে?”

“কেন পারব না? সব কিছু পারি আমরা। আমরা পাণ্ডব গোয়েন্দা।”

“তাই নাকি? তোমাদের মুখগুলো কিন্তু খুব চেনা চেনা লাগছে।”

“আমরাও আপনাদের চিনি। আপনারা শিবপুরের দিকে থাকেন। আপনাদের অনেকবার দেখেছি। শুধু তাই নয় আপনার নামও বলে দিতে পারি। আপনার নাম শর্মিলা সরকার।”

মেয়েটি আশ্চর্য হয়ে চোখদুটি বড় বড় করে বলল, “আরে! আমার নাম জানলে কেমন করে?”

বাবলু হেসে বলল, “কেন আপনার খাতাতেই তো লেখা রয়েছে আপনার নাম। দিব্যি দেখতে পাচ্ছি।”

মেয়েটি এবার বাবলুর পিঠ চাপড়ে বলল, “নাঃ! তুমি দেখছি বড় হয়ে ডিটেকটিভ হবে। অত্যন্ত ব্রেনি ছেলে তুমি।”

লাইন এগিয়ে তখন জেটিতে ঠেকেছে৷ ওপার থেকে লঞ্চটা এল। এরা সকলে হইহই করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। লঞ্চের মাথায় সাইকেল চাপানো হচ্ছে দেখে পঞ্চুও লঞ্চের পিছন দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে এল।

লঞ্চ যখন মাঝ গঙ্গায় তখন হঠাৎ পঞ্চু গোঁ গোঁ করে উঠল। একজন লোক এক পাশে বসে রান্নার আয়োজন করছিল। এতক্ষণ সে লক্ষ করেনি পঞ্চুুকে। এবার ওর গোঁ গোঁ শব্দ শুনেই চেঁচিয়ে উঠল, “এই মরেছে। এই নেড়ি কুত্তাটা কোথেকে ঢুকে এল রে?”

বাচ্চুু-বিচ্ছু সঙ্গে সঙ্গে লোকটাকে বলল, “এটা আমাদের পোষা কুকুর। একে নেড়ি কুত্তা বলবেন না।”

বাবলু পঞ্চুর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, “কী রে, অমন গোঁ গোঁ করছিস কেন?”

পঞ্চু বার বার একটা তক্তার খোলের নীচে তাকাতে লাগল। বাবলু সেদিকে এগোতেই লঞ্চের একজন লোক ধমকে উঠল তাকে, “এই খোকা, ওখানে কী করতে যাচ্ছ?”

বাবলু তার কথার উত্তর না দিয়ে সেখানে উকি-বুকি মারতে লাগল। তারপর ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে কী যেন একটা তুলে নিল। সেটার সঙ্গে টিনের একটা বাক্সও ছিল।

লোকটা বলল, “এরই মধ্যে হাত সাফাইয়ের কাজ শিখে গেছ বাবা?”

লঞ্চসুদ্ধ লোক তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এদের দিকে। বাবলু বলল, “কথাবার্তা যা বলবেন একটু ভেবে-চিন্তে বলবেন।” বলে হাতের জিনিসটা লোকটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “জিনিসটা কী জানেন? এটা টাইমবোমা। ফাটলে গোটা লঞ্চটা উড়ে যেত।”

তাই না দেখে সকলেই তো হইহই করে উঠল। বাবলু তখন টিনের বাক্সটা খুলতেই তার ভেতর থেকে একটা চিঠি পেয়ে গেল। তাইতে লেখা আছে, রাতারাতি লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর ওষুধ। সব লঞ্চগুলোকে এইভাবেই ওড়াব। অফিসটাইম পার হলে বেলা একটার সময় পাঁচটা লঞ্চই উড়ে যাবে একসঙ্গে।”—জনৈক বন্ধু।

লঞ্চসুদ্ধ লোক সকলেরই চোখ কপালে উঠে গেছে তখন। সবাই এসে ধন্যবাদ জানাল ওদের, “ওঃ। ভাগ্যে তোমরা ছিলে ভাই। না হলে সব লঞ্চ নষ্ট হয়ে গেলে কাল থেকে আমাদের বাসের হাতলে ঝুলে অফিস যেতে হত। কী যে করতুম। তোমরা কারা ভাই?”

বাবলু বলল, “পাণ্ডব গোয়েন্দা।” এ নাম সকলেরই চেনা। সকলেই তাই আনন্দে হইচই করে উঠল। লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল ওদের নাম— পাণ্ডব গোয়েন্দা।

লঞ্চ ওপারে ভিড়তেই বাবলু গিয়ে পুলিশের হাতে বোমা ও সেই চিঠিটা দিয়ে সব লঞ্চগুলোকে সার্চ করে দেখতে বলল। তারপর রেডিয়ো অফিসের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে ওরা এসপ্ল্যানেডে চলল বুকিং অফিসে টিকিট কাটতে। ভাগ্য ভাল তাই পরের দিনের টিকিটই পেয়ে গেল ওরা।

পরদিন সন্ধের পরই সকলে যথাসময়ে এসে হাজির হল হাওড়া স্টেশনে। বাবলুর বাবা এসেছিলেন ওদের সি-অফ করতে। ওদের ট্রেনে চাপিয়ে খুব সাবধানে চলাফেরা করবার উপদেশ দিয়ে ট্রেন না ছাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলেন। তারপর যথাসময়ে ট্রেন নড়ে উঠতেই ওদের হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে বাবলুর বাবা চলে এলেন।

পাণ্ডব গোয়েন্দারাও তখন থ্রি-টায়ার কামরায় বেশ জাঁকিয়ে বসেছে সকলে।

হাওড়া স্টেশন ছাড়তেই ঝড়ের বেগে ছুটে চলল ট্রেন।

এই প্রথম পাণ্ডব গোয়েন্দাদের দূর দেশে যাত্রা। তাই আনন্দে অধীর সকলে। একটা বড় র‌্যাশন ব্যাগে করে পঞ্চুকে নিয়ে আসা হয়েছিল গেট চেকারের নজর এড়াবার জন্য। বাবলু এবার ব্যাগটা লোয়ার বার্থের তলায় ঢুকিয়ে মুখটা খুলে দিতেই পঞ্চু গুটিগুটি বেরিয়ে এল তার ভেতর থেকে। তারপর সেই বার্থের নীচেই কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে রইল চুপচাপ। কামরার অন্যান্য যাত্রীরা কেউ দেখতেও পেল না পঞ্চুুকে।

টাকা-পয়সা বাবলুদের সঙ্গেই ছিল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর রাখা সুটকেশটা বার্থের নীচে পঞ্চুর জিন্মায় রেখে নিশ্চিন্তে বসল ওরা।

ট্রেন যখন খড়গপুরের কাছাকাছি তখন ওরা রাতের খাওয়া সেরে নিল। লুচি, আলুর দম, সন্দেশ পেট ভরে খেল পাঁচজনে। পঞ্চুুরটা বার্থের তলায় বাবলুই ঢুকিয়ে দিল। এবার শোবার পালা।

ততক্ষণে কোচ অ্যাটেন্ডেন্টস এসে ওদের টিকিট পরীক্ষা করে চলে গেছেন। অনেকেই শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে। বাবলুরাও শোবার জন্য তৈরি হল।

মুখোমুখি দুটাে আপার বার্থে শুয়ে পড়ল বাবলু আর বিলু। মাঝের বার্থে বাচ্চু এবং লোয়ার বার্থে বিচ্ছু। বাকি রইল ভোম্বল। তার সিট পড়েছিল এদেরই লাগোয়া সাইডের লোয়ার বার্থে। একজন ভদ্রমহিলাও ছিলেন সেই দিকে। তার ছিল আপার বার্থ। ভোম্বল তাকে লোয়ার বার্থটা দিয়ে নিজে উঠে পড়ল আপার বার্থে। এতে ওদের খুবই সুবিধে হল। বাবলু, বিলু, আর ভোম্বল আপার বার্থে মুখোমুখি শুয়ে গল্প করতে লাগল। শতরঞ্জি আর বালিশ পেতে পা থেকে গলা পর্যন্ত চাদরে ঢেকে শুয়ে রইল সকলে। ট্রেন ছুটে চলেছে রাতের অন্ধকারে ঝড়ের বেগে। কাল সাতটার মধ্যেই ওরা পৌছে যাবে যথাস্থানে।

রাত তখন কত তা কে জানে! –

হঠাৎ কামরার মধ্যে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হল। বাবলুরা ছিল মাঝামাঝি জায়গায়। কামরার গোড়ার দিক থেকে আতঙ্কের রেশটা ছড়িয়ে পড়ল।

ডাকাত পড়েছে।

চারজন বলিষ্ঠ চেহারার লোক পাইপগান, বন্দুক রিভলবার বার করে যাত্রীদের যথাসর্বস্ব লুট করতে শুরু করেছে। ভয়ার্ত যাত্রীরা কেউ চিৎকার করছে, কেউ অনুনয়-বিনয় করছে। কিন্তু ডাকাতদের কঠিন প্রাণে এতটুকু মমতাও জাগছে না। নিষ্ঠুরভাবে তারা বলছে, “আমরা অযথা রক্তপাত চাই না। যার কাছে টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি যা কিছু আছে ভালয় ভালয় বার করে দিন। না হলে দেখছেন তো?”

ওপর থেকে বাবলুরাও দেখল। চারজন লোকই সশস্ত্র। বিলু বলল, “প্রতিদিন পালা করে এইসব লাইনে এমন চুরি ডাকাতি হচ্ছে, অথচ এর কোনও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই।”

বাবলু বলল, “না থাক। এর প্রতিকার আমরাই করব। আমরা তো তৈরি হয়েই এসেছি। সবাই রেডি হয়ে যা। একমুহূর্ত দেরি নয়। আসুক ব্যাটারা একবার এখানে।” .

বলার সঙ্গে সঙ্গেই এরা কাজ শুরু করে দিল। প্রত্যেকের মাথার বালিশের কাছে একটা করে ঝোলা ব্যাগ রাখা ছিল। তাইতে ছিল বেশ শক্তগোছের নাইলনের দড়ি। তার এক মুখে ফাঁস। যেদিকে ফাঁস তার বিপরীত দিকটা বার্থের লোহার রডের সঙ্গে বেঁধে ফাঁসটা লুকিয়ে বসে রইল ওরা। বিলু, ভোম্বল, বাচ্চু ও বিচ্ছু বালিশের নীচে হাত দিয়ে ইস্পাতের ধারালো ছোরাগুলো একবার দেখে নিল। বাবলুর হাতে লুকনো রইল ওর পিস্তলটা।

ডাকাতগুলো তখন ওদিক থেকে এদিকে এসে পড়েছে।

ভোম্বলের বার্থের নীচে যে ভদ্রমহিলা শুয়েছিলেন ওরা এসে তার গলার হারগাছাটির দিকে তাকাল, “ওটা দিয়ে দিন।”

“না। এ আমি কিছুতেই দেব না।”

“দিয়ে দিন বলছি।”

একজন যাত্রী ভয়ে ভয়ে মহিলাকে বললেন, “দিয়ে দিন দিদি, এরা ডাকাত। এদের প্রাণে মায়া-দয়া নেই। হয়তো খুন করে ফেলবে।”

একজন বলল, “অমন তাগড়া-তাগড়া জোয়ান লোকগুলো ভয়ে ভেড়ার মতো সব কিছু তুলে দিল, আর আপনি দিতে চাইছেন না? সাহস তো কম নয় আপনার?”

বাবলু আর থাকতে না পেরে ওপর থেকে বলল, “আসল ব্যাপারটা কী জানেন দাদা? বাশ বনেই ডোম কানা হয়। আপনারাও তাই আঘাটায় ফেঁসেছেন।”

বাবলুর কথা শুনে ডাকাতরা ঘুরে তাকাল ওর দিকে। একজন ততক্ষণে ভদ্রমহিলার গলার হার ছিনিয়ে নিয়েছে। বাকিরা বাবলুকে বলল, “একটি ঘুষিতে তোমার মুখ ভেঙে দেব ডেপো ছোকরা কোথাকার।”

বিলু আর ভোম্বল দুদিক থেকে বলল, “আমাদের মুখগুলো কী করবেন? ফোটো তুলে বাঁধিয়ে রাখবেন?”

একজন বলল, “তোরা কারা?”

বাবলু বলল, “আমরা ধূমকেতু। বাজিকর যেমন ডুগডুগি বাজিয়ে বাঁদর নাচায় আমরা তেমনি তুড়ি দিয়ে ডাকাত নাচাই। তোমরা নাচবে? টুইস্ট নাচ?”

“খবরদার বলছি, মুখ সামলে কথা বলবি। তোদের ওই ঝোলার ভেতরে কী আছে বার কর।”

ভোম্বল বলল, “এই ঝোলায় করে আমরা ডাকাত ধরে নিয়ে গিয়ে বাবা জগন্নাথের কাছে বলি দেব।”

একজন বলল, “ছেলেগুলোর মাথা খারাপ আছে নাকি বল তো? কোথায় ভয়ে কাঁপবে তা নয় ফাজলামি করছে।”

বিলু বলল, “না, মাথা খারাপ তোমাদের। সেইজন্যেই মনে করেছ রেলের পুলিশগুলো মরে গেলেও জনগণও বুঝি মরে গেছে। আমরা সেই জনতার প্রতিনিধি।”

“চুপ করলি কেন, বল? আরও বল।”

“না। ওস্তাদের মার শেষরাতে। আগে তোমরা তোমাদের কাজ কর। তারপরে আমরা আমাদের কাজ করব। অনেক টাকা আছে আমাদের কাছে। আমরা বড়দিনের ছুটিতে পুরী বেড়াতে যাচ্ছি। কাজেই বুঝতে পারছ তো, শুধু হাতে যাচ্ছি না? পার তো কেড়ে নাও। তারপরে খেলা দেখবে।”

একজন বলল, “আমরা তো টাকা নিতেই এসেছি। শিগগির বল, কোথায় টাকা আছে? অযথা সময় নষ্ট করিস না আমাদের। এখনই নেমে যাব আমরা। না হলে সামনেই বড় জংশন। ধরা পড়ে যাব।”

বাবলু বলল,“টাকাকড়ি আছে আমাদের ছোট্ট ভাইয়ের সুটকেশে।”

“বার্থের নীচে কেন?”

“আরে দাদা বুঝছেন না, ডব্লু টি। যদি চেকার এসে ধরে! তাই ওকে বার্থের তলায় রেখেছি। ভারী বাধ্য ছেলে। হাত বাড়ান, দিয়ে দেবে। একেবারে শান্তশিষ্ট এক চোখ কানা এবং ল্যাজবিশিষ্ট।

বলা মাত্রই একজন বার্থের তলায় হাত ঢোকাল। বাবলু ওপর থেকে বলল, “পঞ্চুু, কুইক! এবার তোর যথাকর্তব্য পালন করে ফ্যাল।”

পঞ্চু তো এতক্ষণ ধরে এই সুযোগটারই অপেক্ষা করছিল। ডাকাতটা যেই না সুটকেশ নেবে বলে বার্থের তলায় হাত ঢুকিয়েছে অমনি সে ঘ্যাক করে কামড়ে ধরল তার হাতটাকে।

ডাকাতটা চিৎকার করে উঠল, “ওরে বাবারে, গেলুম রে, আমাকে কুকুরে কামড়েছে।” কামড়ানো বলে কামড়ানো? পঞ্চু যাকে কামড়ায় তাকে কামড়ে ধরে রাখে। বাবলু না বলা পর্যন্ত ছাড়ে না।

বাবলুরা তো এই সুযোগই চাইছিল। একবার শুধু চোখে চোখে ইশারা হল। তারপরই নাইলনের দড়ির সেই ফাঁস তিনটে তিনজনের গলায় মালার মতো আটকে দিয়ে হেঁচকা টানে টেনে ধরল। যেমন তেমন টান নয়, একেবারে মোক্ষম টান যাকে বলে। চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে লাগল সব। সমস্ত রক্ত মুখে এসে জমাট বাঁধল। বিকৃত হয়ে গেল মুখ। দুজনের হত থেকে দুটো পাইপগান ছিটকে পড়ল মেঝেতে। একজনের হাতে বন্দুক ছিল। সেটা সে তোলবার চেষ্টা করতেই বাবলু সজোরে তার মুখে একটা লাথি মারল। বাচ্চু ছিল মাঝের বার্থে। সেখান থেকে লাফিয়ে নেমে সে কেড়ে নিল বন্দুকটা। মুহুর্তের মধ্যে যেন ম্যাজিক শুরু হয়ে গেল।

কামরাসুন্ধু লোক যারা এতক্ষণ সর্বস্বাস্ত হয়ে কান্নাকাটি করছিল তারা দলবদ্ধ হয়ে ছুটে এল। সে এক দেখবার মতো দৃশ্য।

বাবলু ডাকাতগুলোকে বলল “কী রে ব্যাটারা, আর কখনও ডাকাতি করবি? এবার দেখলি তো ওস্তাদের মার কেমন হয়?”

কিন্তু কে দেবে সাড়া? তিনজনের গলা তখন এমনভাবে ফাঁসে আটকানো যে সামান্য আভ ঘেটার ক্ষমতাটুকুও তাদের নেই।

যে লোকটাকে পঞ্চু কামড়ে ধরেছিল সে বলল, “দোহাই তোমাদের। আমাদের ছেড়ে দাও ভাই। আমরা সব মালপত্তর ফেলে রেখে চলে যাচ্ছি। আর কখনও এমন কাজ করব না।”

বাবলু বলল, “হ্যাঁ। ছেড়ে দেব বইকী! না হলে চার-চারটে গাধাকে নিয়ে কী করব আমরা? তোমরা আমাদের কোন কাজে লাগবে বল? তার চেয়ে পুলিশের হাতে দেওয়াই ভাল। কিছুদিন তবু জেলের ঘানি টানতে পারবে।”

ডাকাতটার এক হাত পঞ্চু কামড়ে থাকলেও অন্য হাতটা সে গুটি গুটি পকেটে ঢোকাবার চেষ্টা করল। যেই না করা বিচ্ছু অমনি তার মাথাটা দড়াম করে ঠুকে দিল বার্থের কাঠে। সঙ্গে সঙ্গে উহু-হু করে উঠল সে।

বিচ্ছু মাথাটা ঠুকে দিয়েই বালিশের তলা থেকে ছুরিটা বার করে তার পিঠের কাছে ঠেকিয়ে ধরল। বাচ্চু বলল, “পকেটে হাত ঢোকাচ্ছ কেন? উ?”

“ও কিছু নয়।”

“কিছু নয়? কই দেখি?” বলেই বাচ্চু তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে বার করে আনল একটা ছোট্ট রিভলবার। ধীর শ্লথ গতিতে ট্রেন এসে থামল একটা বড় স্টেশনে।

বাবলু যাত্রীদের বলল, “যান। কেউ গিয়ে তাড়াতাড়ি পুলিশকে খবর দিন।”

খবর দেওয়া মাত্রই জনা কুড়ি সশস্ত্র আর পি এফ হইহই করে ছুটে এল। ওদের সঙ্গে একজন ইনস্পেক্টরও এলেন। এসে ওদের দেখেই বললেন, “আরে, এইটুকু ছেলেমেয়েরা এই অতি ভয়ংকর ডাকাতগুলোকে ধরে ফেলল? অথচ এগুলোকে ধরবার জন্য কত চেষ্টা করেছি আমরা। এক ব্যাটা আমাদের গুলিতে আগেই মরেছে। বাকি চারটেকে কিছুতেই বাগে পাচ্ছিলুম না।”

বাবলু বলল, “চেষ্টা আপনারা ঠিক সেভাবে করেননি স্যার। না হলে পুলিশের অসাধ্য কিছু আছে? হাওড়া জেলার আমতা গ্রামে রাতের অন্ধকারে একটা খালের ভেতর একজন লোক খুন করে পালিয়েছিল। অথচ মাত্র সাত দিনের ভেতর সেই লোকটাকে ত্ৰিবেন্দ্রামের এক পার্বত্য উপত্যকায় এই পুলিশই অ্যারেস্ট করেছে। কী করে করল বলুনঃ দু-একদিন ছাড়া প্রায় রোজই যখন এই লাইনে এইভাবে ট্রেনে ডাকাতি হচ্ছে তখন দিন না কিছুদিন প্রত্যেকটি দূরপাল্লার ট্রেনে প্রতিটি কামরায় দু-চারজন করে সশস্ত্র সাদা পোশাকের পুলিশকে ছেড়ে। তারপর দেখি তো এদের কেমন না ধরা যায়?”

ইনস্পেক্টর হেসে বললেন, “তার অনেক অসুবিধা আছে ভাই। তোমরা ছেলেমানুষ, এসব ঠিক বুঝবে না।”

ততক্ষণে গার্ড, চেকার এবং আরও অনেকে এসে জুটেছে। পুলিশের একজন ফোটোগ্রাফারও এসে গেছে। যে অভিনব কায়দায় বাবলুরা ডাকাত ধরেছে সেই কায়দায় পর পর কয়েকটা ছবি তুলে নিতেই পুলিশের লোকেরা ডাকাতদের হাতে হাতকড়া লাগাল।

ডাকাতরা সকলের সব জিনিস ফেরত দিল তখন। পঞ্চুুকেও তখন বার্থের তলা থেকে বেরিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে হয়েছে। গার্ডসাহেব বললেন, “ভাগ্যে এই কুকুরটা ঢুকে পড়েছিল কামরায়, ও না থাকলে কিছুই হত না।” বলেই হ্যাট হ্যাট হ্যাট করে তাড়াতে গেলেন পঞ্চুুকে, “ব্যাটা পাগলা কুকুর নয় তো?”

বাবলু বলল, “না। ও কুকুর আমাদের পোষা। ট্রেনিং দেওয়া কুকুর। ওকে আমরা সঙ্গে এনেছি। পথে বিপদ-আপদ এলে বাঁচবার জন্য।”

“তাই নাকি? কিন্তু এটা তো দেশি কুকুর।”

“হলে কী হয়। অ্যালসেশিয়ানের বাবা।”

বাবলু তাড়াতাড়ি ওর ব্যাগ থেকে একটা ফোটাে বার করে দেখাল। তিনজন দুঁদে দারোগার সঙ্গে পঞ্চুুকে নিয়ে ওদের ছবি।

গার্ডসাহেব বললেন,“তোমরা তা হলে পুলিশের ছেলেমেয়ে?”

বাবলু বলল, “না। আমরা সকলের। সবাই আমাদের পাণ্ডব গোয়েন্দা বলে।”

বাবলু এবার পঞ্চুকে সকলের সামনেই আপার বার্থে তুলে নিল।

গার্ড, পুলিশ সবাই নেমে যাবার পর কামরাসুদ্ধ যাত্ৰী সকলেই এসে ছেকে ধরল এদের। প্রত্যেকেই যে যার মালপত্তর ফিরে পেয়ে খুব খুশি।

ট্রেন নড়ে উঠল।

সে-রাত্রে আর ঘুম হল না কারও, গল্প করেই রাতটা কাটিয়ে দিল সকলে।

পরদিন সকাল সাতটায় ট্রেন থামল পুরীতে। ওরা সবাই যে যার মালপত্তর নিয়ে নেমে এল।

পুরীতে এসে প্রথমে একটু অসুবিধেয় পড়ল ওরা। কেন না বড় দিনের ছুটিতে বহু লোক পুরী বেড়াতে আসায় সস্তার কোনও হোটেলেই জায়গা পেল না।

অবশেষে একজন লোক সহায় হতে সমুদ্রের ধারে মস্ত একটা খালি দোতলা বাড়ির ওপর তলায় একটা ঘর পেয়ে গেল ওরা। ঘরের জানালায় বসে সমুদ্র দেখা যায়। যতদুর চোখ যায় শুধু ধুধু করে নীল জলরাশি।

বাবলুরা অবাক হয়ে সেই জলরাশির দিকে চেয়ে রইল।

তারপর ঘরে মালপত্তর রেখে বাথরুমে স্নান সেরে বেশ ঝরঝরে হয়ে সবাই মিলে চলল মন্দিরে।

মন্দির থেকে ফেরার পথে জগন্নাথের প্রসাদি ভোগ ডাল-ভাত-তরকারি কিনে নিয়ে এল।

সকলে মিলে তাই খেয়ে শুয়ে পড়ল দরজা বন্ধ করে। কাল রাত্রে ট্রেনে ঘুম হয়নি। তাই শোওয়া মাত্রই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল সকলের।

ঘুম ভাঙল দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে।

বাবলু উঠে দরজা খুলে দিতেই বাড়ির মালিক বিপিনবাবু একখানা খবরের কাগজ হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তারপর বললেন “কী ব্যাপার গো? খুব ঘুমোচ্ছিলে মনে হচ্ছে বেড়াতে যাবে না?”

বাবলুরা বলল, “হ্যাঁ। খুব ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আপনি না ডাকলে সহজে এ ঘুম ভাঙত না। কাল সারারাত ট্রেনে জেগে এসেছি তো।”

বিপিনবাবু হেসে বললেন, “তোমাদের পরিচয় আমি আজকের খবরের কাগজ মারফত পেয়ে গেছি। এই দেখ তো এটা তোমাদেরই ফোটো কিনা?”

বাবলুরা কাগজের ছবির দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, “ও হ্যাঁ। কাল রাতে পুরী এক্সপ্রেসে চারজন ট্রেনডাকাতকে আমরা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। এ তারই ফোটো।”

বিপিনবাবু বাবলুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “তোমরাই তা হলে বিখ্যাত পাণ্ডব গোয়েন্দা! তোমাদের নাম আমি এর আগেও শুনেছি। যাক। ভালই হল। তা আজ রাত্রে তোমরা ঘুরে বেরিয়ে এসে আমার বাড়িতেই খাওয়া-দাওয়া করবে। কেমন? তোমাদের নিমন্ত্রণ রইল। এটা আমার যাত্রীনিবাস। এর পিছনে দুটো বাড়ির পরই আমার বসতবাড়ি। সেখানে আমার পরিবারের সবাই থাকে। আমার কোনও লোককে বললেই সে তোমাদের নিয়ে যাবে আমার বাড়িতে। যাবে তো?”

বাবলু বলল, “নিশ্চয়ই যাব।”

বিপিনবাবু চলে গেলেন।

বাবলুরা সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে বাইরে এসে একটা দোকানে চা-টোস্ট খেয়ে সমুদ্রের ধারে চলে এল।

সূর্য তখন ডুবুডুবু!

সূর্যাস্তের রক্তিম ছটায় সমুদ্রের জল লাল হয়ে উঠেছে।

ওরা পাঁচজনে মনের আনন্দে পঞ্চুকে নিয়ে সি-বিচের ওপর দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে সামনের দিকে এগিয়ে চলল।

পঞ্চুর আনন্দ যেন সবচেয়ে বেশি।

কখনও সে সামনের দিকে অনেকখানি এগিয়ে যাচ্ছে, কখনও আবার ছুটতে ছুটতে এসে বাবলুর পায়ে লুটিয়ে পড়ছে। কখনও জলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের ঢেউতেও যেন ভয় নেই পঞ্চুুর। ঢেউ সরে গেলেই সে নেমে যাচ্ছে জলের দিকে। আবার ঢেউ এলেই ছুটে পালিয়ে আসছে।

দু-একটা অন্য কুকুর অবশ্য একবার আক্রমণ করবার চেষ্টা করেছিল পঞ্চুকে। কিন্তু বিলু আর ভোম্বলের পাকা হাতের মোক্ষম ঢিল দু-একটা খাবার পর আর তারা এগোয়নি।

এইভাবে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে বেড়িয়ে অনেকটা পথ যাবার পর চারদিক যখন অন্ধকারে ঢেকে আসছে, বাবলু তখন বলল, “আর নয়। এবার ফেরা যাক। এখন আমরা মেন রোড ধরে বেড়াই গে চল।”

বিলু বলল, “সেই ভাল।”

এই বলে ওরা ফিরতে যাবে এমন সময় দেখতে পেল সমুদ্রের জলের কাছে বালিতে কী যেন একটা চিকচিক করছে।

ততক্ষণ চাঁদ উঠে গেছে।

সেই চাঁদের আলোয় যেন চেকনাই দিয়ে উঠল জিনিসটা।

বাবলু বলল, “কী বল তো ওটা?”

বিলু বলল, “কোনও দামি পাথর নিশ্চয়।”

ভোম্বল বলল, “নিয়ে আসব ওটা?”

বাবলু বলল, “না। সমুদ্রের অত কাছে যাওয়া ঠিক নয়। ধারে কাছে লোকজন নেই। অন্ধকার।”
কিন্তু যে যাবার সে তখন কারও আদেশের অপেক্ষা না রেখেই চলে গেছে। অর্থাৎ কিনা পঞ্চু গিয়ে জিনিসটাকে শুকতে আরম্ভ করেছে।

হঠাৎ একটা ঢেউ এমন ভাবে সেটার ওপর লাফিয়ে পড়ল যে পঞ্চু কয়েক হাত পিছিয়ে এল।

তারপর যখন ঢেউ সরে গেল তখন দেখা গেল অনেক দূরে সরে গেছে সেটা।

আবার একটা ঢেউ এল।

জিনিসটা তখন অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে। যেই না উঠে আসা পঞ্চু অমনি এক লাফে সেটা মুখে নিয়েই ছুটে এল বাবলুর কাছে।

বাবলু আদর করে পঞ্চুর পিঠ চাপড়ে বলল, “শাবাশ পঞ্চুু।” তারপর জিনিসটা হাতে নিয়ে বলল, “আরে! কী চমৎকার আংটি রে ভাই।”

সবাই তখন ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগল আংটিটাকে।

বিচ্ছু বলল, “মনে হচ্ছে খুব দামি জিনিস।”

বিলু বলল, “একবার স্যাকরার দোকানে নিয়ে দেখালে কেমন হয়।”

বাবলু আংটিটা এ আঙুল ও আঙুল করে মাঝের আঙুলে পরে বলল, “কোনও দরকার নেই।”

ওরা অন্ধকার থেকে আলোয় চলে এল এবার। মেন রোডে ঘুরে বেড়াবার সময় বাবলুর হাতের সেই আশ্চর্য আংটির ছটায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল সকলের।

মেন রোডে খুব বেশিক্ষণ ঘুরল না ওরা। বাসায় ফিরে এসে চাকরকে সঙ্গে নিয়ে বিপিনবাবুর বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেল।

বিপিনবাবুরা খুব ভাল লোক। স্ত্রী-পুত্র নাতি-নাতনিদের নিয়ে বিপিনবাবুর জমজমাট সংসার।

বাবলুরা যেতে সকলেই ওদের খুব সমাদর করলেন। তারপর বেশ হাসিখুশিতে ভরে উঠলেন সকলে।

বিপিনবাবুর স্ত্রী ওদের জন্য যে কত রকমের রান্না করেছিলেন তার ঠিক নেই। মাংস, পোলাও, চপ, পায়েস, তা ছাড়া এখানকার বিখ্যাত ছানার কেক, রসগোল্লা, দই এসব তো ছিলই।

গল্প করতে করতে বিপিনবাবুর হঠাৎ নজর পড়ল বাবলুর হাতের আংটিটার দিকে। ভুরু কুচকে তিনি সেদিকে তাকিয়ে বললেন, “ও কীসের আংটি। তখন তোমাদের ঘরে গেলাম কিন্তু তোমার হাতে ওই আংটটিটা দেখলাম না তো?”

বাবলু বলল, “ওটা তখন পরিনি। গত বছর দার্জিলিং গিয়েছিলাম, সেখানে কিনেছিলাম ওটা পাঁচ সিকি দিয়ে। পেতলের আংটি। কাঁচ বসানো।”

আংটির প্রসঙ্গ আসতেই বাবলুরা পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। তারপর তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ল যে যার।

আংটিটা দেখার পর বিপিনবাবু এবং ওঁর স্ত্রীও কেমন যেন মিইয়ে গেলেন। দু’জনেরই চোখে চোখে ইশারায় কী যেন কথা হল।

বিপিনবাবু কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকালেন আংটিটার দিকে।

খাওয়া শেষ করে যখন চলে আসবে বলে পা বাড়াচ্ছে তখন হঠাৎ বিপিনবাবু বললেন, “আমার একটা কথা বলবার ছিল তোমাদের।”

বাবলু বলল, “কী কথা?”

“তোমার হাতের ওই আংটিটার খুব কম করেও বেশ কয়েক হাজার টাকা দাম, ওটা হিরের আংটি। এবং ওতে যে হিরেটা বসানো আছে সে হিরে এখন দুর্লভ। ও আংটি একবারও হাতছাড়া কোরো না। আবার সব সময় পরেও থেক না। যখন কোথাও যাবে তখন ঘরে রেখে যাবে। না হলে বাগে পেলে যে কেউ ওটা কেড়ে নিতে পারে।”

বাবলুর মুখটা ঈষৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তবু বলল, “আচ্ছা।” বলে বিপিনবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ওরা ওদের আস্তানায় গিয়ে ঢুকল। আস্তানাটি মন্দ নয়, একটু সেকেলে ধরনের বাড়ি বলে যাত্রী নেই।

যাই হোক, ঘরে এসে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল সকলে। শুয়ে শুয়ে হিরের আংটির সম্বন্ধে আলোচনা করতে লাগল ওরা। বিপিনবাবুর প্রসঙ্গও উঠল।

বাবলু বলল, “আংটিটা যে বহুমূল্য এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। তবে বিপিনবাবুর ব্যাপারে আমি কিন্তু রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।”

বিচ্ছু বলল, “আংটিটার দিকে কী ভাবে যেন তাকাচ্ছিল, না বাবলুদা ?”

“হ্যাঁ। আর ওই তাকানোতেই মনে হল আংটিটা এর আগেও দেখবার সুযোগ ওঁর হয়েছিল। কিন্তু এ আংটি সমুদ্রে এল কী করে এটাই হচ্ছে রহস্য।”

বিলু বলল, “মনে হচ্ছে খেলা জমবে।”

ভোম্বল বলল, “খুব সাবধানে কাছে কাছে রাখতে হবে এটাকে।”

বাবলু বলল, “আমার মনে হচ্ছে কাল পরশুর মধ্যেই এটাকে আমরা হারাব। এতক্ষণে লোক বোধহয় লেগেই গেছে আমাদের পিছনে।”

বিলু বলল,“বলিস কী!”

“হ্যাঁ। রাতভিতে একা কেউ উঠবি না। ল্যাট্রিন যাবার দরকার হলে ঘরের নর্দমায় ছেড়ে জল ঢেলে দিবি। বুঝলি?”

বাচ্চু বলল, “আমাদের কেমন যেন ভয় করছে।”

বাবলু বলল, “ভয় কী? আজ দুপুরে সবাই যে রকম ঘুমিয়েছি, তাতে রাতে আর ঘুম হচ্ছে না। একটু সজাগ তো থাকছিই আজ।”

বাবলুর কথাই সত্যি। ঘুম এল না কারও চোখেই। সবাই শুয়ে শুয়ে চাপা গলায় নানারকম আলোচনা করতে লাগল।

রাত তখন কত তা কে জানে? হঠাৎ পঞ্চু ভেী ভোঁ করে ছুটে গেল জানলার দিকে। যেই না যাওয়া, অমনি মনে হল কে যেন ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ল পাশের ছাদে।

পঞ্চুর চিৎকারে কানে যেন তালা ধরে গেল।

বাবলুও চোখের পলকে টর্চ হাতে ছুটে গেল জানলার কাছে। তারপর টর্চের আলো ফেলে পাশের ছাদটাকে ভাল করে দেখতে লাগল। কিন্তু কোথায় কে? আগন্তুক ততক্ষণে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে ফেলেছে নিজেকে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন ওরা বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে তেমন সময় দু’জন নুলিয়া এসে হাজির, “সমুদ্রে স্নান করতে যাবেন তো খোকাবাবুরা? চলুন। এই বাড়িতে যারা ভাড়া আসে আমরা তাদের নুলিয়া হই।”

নুলিয়ার পিছন পিছন বিপিনবাবুও এলেন। বললেন, “এদের দু’জনকে একটা করে টাকা দেবে, কেমন? তা হলেই এরা তোমাদের সবাইকে ঢেউ খাইয়ে স্নান করিয়ে দেবে।”

বাবলু বলল, “বেশ তো। নুলিয়া ছাড়া সমুদ্রে তো নামা যাবে না। তা এদের সঙ্গেই না হয় যাওয়া যাবে।” কথা বলার সময়টুকুর মধ্যে বাবলু দেখল বিপিনবাবুর চোখদুটি কেমন যেন বার বার আকর্ষণ করছে বাবলুর হাতের আংটিটাকে।

বাবলুরা আর দেরি করল না। সবাই মিলে দলবদ্ধ হয়ে চলল সমুদ্রে স্নান করতে।

একজন নুলিয়ার পায়ে ব্যান্ডেজ বাধা। কী হয়েছে কে জানে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

বাবলু বলল, “কী হয়েছে গো তোমার পায়ে ?”

“আর বলেন কেন? দিন রাত জলে জলে থাকি। কী যে একটা ছিল জলের তলায় তা কে জানে। তাতেই কেটে গেছে পা টা।”

“তা হলে তুমি জলে নামবে কী করে?”

“কেন নামব না? এ তো নোনা জল বাবু। এতেই তো ঘা শুকোয়।”

ঘরে তালাচাবি দিয়ে নীচে নেমে এল ওরা। বাবলু নুলিয়াদের বলল, “তোমরা ঘাটে যাও। আমরা আধঘণ্টার মধ্যেই যাচ্ছি। একটু জলযোগ সেরে নেব।”

নুলিয়ারা চলে গেলে বাবলুরা একটা চায়ের দোকানে বসে চা-টোস্ট, ডিম-সিদ্ধ ইত্যাদি খেল। তারপর সমুদ্রে না গিয়ে সোজা চলে এল নিজেদের বাসায়।

ওদের ফিরে আসতে দেখেই চমকে উঠলেন বিপিনবাবু, “কী হল! তোমরা এর মধ্যেই ফিরে এলে যে!”

বাবলু বলল, “হ্যা, ফিরে এলাম। আমাদের জানলার ওপাশে যে বাড়ির ছাদটা রয়েছে ওখানে যেতে পারি কি?”

“কেন?”

“কাল রাত্রে একজন মাননীয় অতিথি জানলায় উঠে লক্ষ করছিলেন আমাদের। কিন্তু পঞ্চুুর চোখে ধরা পড়ে গিয়ে তিনি কোনও রকমে ছাদে লাফিয়ে গা ঢাকা দেন। সেইজন্য ওই ছাদে উঠে আমরা একটু দেখতে চাই অতিথি মহাশয়ের লাফ দেওয়ার ফলে কোনও কষ্ট হয়েছিল কিনা।”

বিপিনবাবুর চোখ কপালে উঠে গেল। বললে, “এ কথা এতক্ষণ বলনি কেন তোমরা?” তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, “এত তাড়াতাড়ি যে ওরা তোমাদের পিছনে লাগবে তা আমি ভাবতেও পারিনি। খুব সাবধান।”

বাবলু বলল, “ওরা কারা?”

“সে তোমাদের জানার দরকার নেই।”

বাবলু বলল, “বেশ। তবে ওই ছাদে উঠে আমরা একটু দেখতে চাই।”

বিপিনবাবু ওঁরই একজন লোককে ডেকে পাশের বাড়ির ছাদে ওঠবার ব্যবস্থা করিয়ে দিলেন। বাবলুরা পাশের বাড়ির ছাদে উঠে সব দেখল। এক জায়গায় কতকগুলো ভাঙা কাঁচ পড়েছিল। সেই কাচের ওপর পা পড়ায় অতিথি যথেষ্ট জখম হয়েছেন বোঝা গেল। পা কেটে একেবারে রক্তারক্তি হয়ে গেছে। চাপ চাপ রক্ত পড়ে আছে সেখানে। ছাদের ওপাশেই বালির ঢিপি। ছাদ থেকে উনি বালিতে লাফিয়েছেন। মাত্র দু হাতের ব্যবধান। বাবলুরা দেখল বালির ঢিপি থেকে যে কোনও লোক অনায়াসে এই ছাদে উঠতে পারে এবং ছাদে উঠে পাইপ বেয়ে জানলায় পৌছতে পারে। যাক, বাবলুরা সবাই একে একে ছাদ থেকে বালির ঢিবিতে নেমে এল। এখানে আর রক্ত পড়াটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে পায়ের ছাপ বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বাবলু অনেকক্ষণ ধরে সেই ছাপ লক্ষ করল। তারপর বলল, “ঠিক আছে। তোরা সমুদ্রে চলে যা, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই যাচ্ছি।”

বিলু বলল, “তুই এক কোথা যাবি বাবলু?”

“যেখানেই হোক। তোদের জানবার দরকার নেই।” এই বলে চলে গেল বাবলু।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে বাবলু যখন আবার ফিরে এল সমুদ্রতীরে তখন লোকজনে জমজম করছে জায়গাটা।

নুলিয়ারা বলল, “এত দেরি করলেন কেন খোকাবাবু?”

“আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তাই দেরি হয়ে গেল।”

“তা এবার জলে নামুন।”

“হ্যাঁ।”

নুলিয়ার হাত ধরে ওরা জলে নামল। ঢেউ খেল। স্নান করল। তারপর যখন উঠে এল ওপরে তখন বিলু হঠাৎ চেচিয়ে উঠল, “বাবলু, তোর আংটি কই?”

বাবলুও চমকে উঠল, “আরে! সত্যিই তো। আংটি কই?”

নুলিয়া দুজন মনের আনন্দে হাসছে তখন। একজন বলল, “ও আংটি তা হলে সমুদ্রেই পড়ে গেছে খোকাবাবু! স্নান করতে গিয়ে খুলে গেছে হয়তো।”

বাবলু বলল, “তা যাক। কিন্তু তোমরা খুব খুশি হয়েছ মনে হচ্ছে।”

“হ্যাঁ। তার কারণ বিপিনবাবু আমাদের বলেছেন আপনাদের একটু নজরে রাখতে। ছেলেমানুষ আপনারা। অত দামি জিনিস পরে থাকেন সব সময়। সেটা কি ঠিক! যে কোনও মুহুর্তে আপনাদের বিপদ হতে পারে। তা এখন থেকে আর আপনাদের কোনও ভয় নেই। আপনারা বিপদমুক্ত।”

বাবলু বলল, “সত্যি নাকি! যাক। তোমাদের অনেক ধন্যবাদ। তা আমাদের ওপর নজর রাখতে গিয়ে তোমরা যে অনেক কষ্ট সহ্য করেছ, সেজন্য তোমাদের ডবল ধন্যবাদ।” তারপর পা-কাটা নুলিয়াটার দিকে তাকিয়ে বাবলু বলল, “কিন্তু তোমার জন্যে সত্যিই আমার দুঃখ হচ্ছে। সামান্য একটু নজর রাখার কাজ করতে গিয়ে ওইভাবে জানলার ওপর থেকে ছাদে লফিয়ে পা-টা কাটলে তো?”

বলা মাত্রই মুখটা যেন মড়ার মুখের মতো সাদা হয়ে গেল নুলিয়াটার। বলল, “এসব কী বলছেন?”

“যা বলছি তা ঠিকই বলছি। তোমার ডান পা কেটেছে। আর বা পায়ের একটা আঙুল নেই। আমাদের ঘরের পাশে বালির ঢিপিতে যে পায়ের ছাপটা আমরা দেখে এসেছি, এখানে ভিজে বালির ওপরে সেই পায়ের চাপ হুবহু মিলে যাচ্ছে। কাজেই লুকোবার চেষ্টা কর না।”

নুলিয়া দু’জন কটমট করে একবার তাকাল বাবলুর দিকে তারপর হনহন করে চলে গেল। ওরা চলে গেলে বিলু অবাক হয়ে বলল, “তোর বুদ্ধিকে বলিহারি বাবলু। তুই এতও লক্ষ করেছিলি? কিন্তু আংটিটা কী করে পড়ল? এত দামি আংটি!”

“ওটা পড়েনি। সমুদ্রে নামিয়ে ওই ব্যাটাই কায়দা করে খুলে নিয়েছে।”

“তুই বাধা দিলি না কেন?”

“তা হলে বিপদ হত। ওরা হচ্ছে জলের পোকা। কোথায় টেনে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিত তা কে জানে?”

সবাই বলল, “ঠিক কথা। বাধা দিসনি ভালই করেছিস। দরকার নেই আংটিতে। যাক। এবার মনের আনন্দে ঘোরা যাবে, কী বল?”

বাবলু বলল, “দেখা যাক। এখন বাসায় ফিরি চল!”

ওরা যখন বাসায় ফিরে এল তখন বিপিনবাবু বাবলুর হাতের দিকে তাকিয়েই বিস্মিত ভাবে বলে উঠলেন, “তোমার আংটিটা কই?”

বাবলু বলল, “সমুদ্রে নাইতে গিয়েছিলাম, সেখানেই হাত থেকে পড়ে গেছে। তা যাক। ওতে আমাদের কোনও লোভ নেই। কিন্তু একটা কথা আমাদের জানাবেন কি? ওই আংটিটা কার?”

বিপিনবাবু বললেন, “তা আমি কী করে জানব? তবে দেখেই বুঝেছিলাম ওটা খুব দামি আংটি। সেইজন্যে সাবধান করে দিয়েছিলাম।”

বাবলু বলল, “অশেষ ধন্যবাদ। তবে আংটির রহস্যটা আপনি আমার মুখ থেকেই শুনুন।”

বিপিনবাবু চমকে উঠে বাবলুর মুখের দিকে তাকালেন।

বাবলু বলল, “আজ থেকে দশ বছর আগে যশোর থেকে এক জমিদারপুত্র বেশ কয়েক লক্ষ টাকার অলঙ্কার নিয়ে গোপনে সীমান্ত লঙ্ঘন করে এদেশে পালিয়ে এসেছিল। জমিদারের পুত্র হলে কী হয়, সে ছিল একজন খুনি আসামি। বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে গোলমাল হওয়ায় সে তার পরিবারের প্রায় প্রত্যেককেই খুন করে এদেশে পালিয়ে আসে। তারপর সারা ভারতের সমস্ত তীর্থে তীর্থে সে ঘুরে বেড়াতে থাকে। এই ভাবেই সে পুরীতেও এসে হাজির হয়। এবং এইখানে এই বাড়িতেই সে এক মাসের জন্য ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে।”

বিপিনবাবু যেন ঘেমে নেয়ে উঠলেন। কঠিন গলায় বললেন, “এসব তোমাকে কে বললে?”

“যেই বলুক, আমি শুনেছি।”

“ওসব সত্যি নয়।”

“সত্যি না হলে আপনি এত উত্তেজিত হয়ে উঠতেন না। যাক। তারপর শুনুন–”

“আমি তোমার কোনও কথা শুনতে চাই না।”

“শুনতেই হবে। তারপর হঠাৎ একদিন সেই জমিদারপুত্র খুন হয়। আপনি এবং আপনার লোকেরা তাকে খুন করেন। এ বাড়ির মালিক ছিল তখন অন্য লোক। যাই হোক, খুন করে তার সর্বস্ব হরণ করে যখন আপনারা মৃতদেহ বালির বস্তায় বেঁধে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন সেই সময় ওই হিরের আংটিটা নেবার জন্য আপনাদের মধ্যে প্রচণ্ড মারামারি হয় এবং দুজনে সেই মারামারির ফলে নিহত হয়। নিহত দুজনের নাম দশরথ পাটসেনা ও বৃন্দাবন রথ। এদেরই একজনের হাতে ছিল সেই হিরের আংটিটা। মরার সময় আংটিটা সে সমুদ্রের জলে ছুড়ে দেয়। দৈবক্রমে সেই সময় পুলিশ এসে পড়ে এবং কয়েকজনকে ধরেও ফেলে। আপনি এবং আরও দু-একজন গা ঢাকা দেন। আপনারা ফাঁকা মাঠের বেড়াল। তাই পুলিশ কিছু করতে পারে না আপনাদের। কোর্টে কেস ওঠে। কয়েকজনের যাবজীবন কারাদণ্ড হয়। কিন্তু প্রমাণের অভাবে আপনারা সন্দেহভাজন হওয়া সত্ত্বেও ছাড় পেয়ে যান। পরে এই বাড়ি কিনে নেন এবং এখানে ঘর ভাড়ার ব্যবসা শুরু করেন। আপনি এখন প্রচুর টাকার মালিক। জমিদারপুত্রের অনেক টাকাকড়ি এবং অলঙ্কার আপনার ভাগে পড়েছে।”

বিপিনবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, “চাবকে লাল করে দেব তোমাকে, ডেপো ছোকরা কোথাকার। উলটো-পালটা বলবার জায়গা পাওনি?”

বাবলু বলল, “শুনুন। আমি যা বললাম তার এক বর্ণও মিথ্যে নয়। কেন না, খুনের পরে পুলিশ এই বাড়ি তল্লাশি করে জমিদারপুত্রের লেখা একখানি ডায়রি থেকে এই কথা জানতে পারে। এ পুলিশের রিপোর্ট। মিথ্যে নয়।”

“কিন্তু তুমি কী করে জানলে?”

“সেটা যথাসময়েই জানতে পারবেন। যাক, আমাদের হাতে ওই আংটিটা নেহাত ভাগ্যক্রমেই এসে পড়ে। সমুদ্রতীরে ওই আংটিটা আমরা কুড়িয়ে পাই। কিন্তু আপনার লোভী চোখ ওই আংটি দেখা মাত্রই লোলুপ হয়ে ওঠে এবং আপনি ওটা কৌশলে হস্তগত করবার জন্য একদিকে আমাদের সতর্ক হতে বলেন, অন্যদিকে আমাদের পিছনে লোক লাগান। যে নুলিয়া দু’জনকে আপনি লাগিয়েছেন তারা আপনারই সাগরেদ। ওরা লোককে জলে নামিয়ে কৌশলে তাদের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে আংটি, হার, পদক ইত্যাদি ছিনতাই করে। আমার হাতের আংটিও আপনার নুলিয়ারা জলে নামিয়ে হস্তগত করে নিয়েছে।”

বিপিনবাবু এবার মারাত্মক রকমের হিংস্র হয়ে ভয়ংকর মূর্তি ধারণ করে বললেন, “হ্যাঁ, নিয়েছে। ওই আংটি পাবার জন্যে আমি দিনের পর দিন প্রচুর অর্থ ব্যয় করে সমুদ্র তোলপাড় করেছি। কাজেই ওটা পাবার অধিকার আমার আছে।”

এমন সময় হঠাৎ নুলিয়া দু’জন এবং জনাচারেক লোক ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হল সেখানে।

বিপিনবাবু বললেন, “মাল যথাস্থানে লুকিয়ে ফেলেছ?”

একজন নুলিয়া বলল, “ও আংটি জাল।”

বিপিনবাবু চিৎকার করে উঠলেন, “হোয়াট!”

“ও আংটি আসল আংটি নয়।”

“হতেই পারে না।”

নুলিয়া ছাড়াও যে চারজন লোক ওদের সঙ্গে ছিল তারা বলল, “আপনি আমাদের সঙ্গেও দু’ নম্বরি করতে চাইছেন বিপিনবাবু?”

বিলু, ভোম্বল, বাচ্চু, বিচ্ছু তো কিছুই বুঝতে পারল না, কী হল ব্যাপারটা! এত সব কথা বাবলুই বা জানল কী করে?

বিপিনবাবু বললেন, “এ সব ষড়যন্ত্র।”

আগন্তুকরা সঙ্গে সঙ্গে পিস্তল বার করে উঁচিয়ে ধরল বিপিনবাবুর দিকে।

“ঠিক করে বলুন আংটি কোথায়?”

নুলিয়া দুজনও তখন চেপে ধরেছে, “আজ একটা হেস্তনেস্ত করবই। আমাদের ঠকানোর চেষ্টা করলে আমরা কিছুতেই ছাড়ব না।”
বিপিনবাবু বললেন, “উলটো চাপ দেবার জায়গা পাওনি শয়তানরা। আংটি ছিনতাই করে এখন আমাকে এসেছ ভয় দেখাতে, ধাপ্পা দিতে?”

বাবলু এবার বলল, “ওঁরা ঠিক কথাই বলছেন। ও আংটি জাল।”

লোকগুলো তখন বাবলুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি ঠিক বলছ খোকা?”

বাবলু বলল, “হ্যাঁ। আমরা যখন স্নান করতে যাই তখন বিপিনবাবু আমাদের বললেন, তোমরা ছেলেমানুষ। এত দামি আংটি পরে স্নান করতে যেয়ো না। ওটা আমার জিন্মায় রেখে এই নকল আংটিটা পরে যাও। না হলে এখানকার নুলিয়ারা চোর। জলে নামিয়ে ওরা হাত থেকে আংটি খুলে নেবে। আমরা তাই বিশ্বাস করে আংটিটা ওঁর কাছে দিয়ে যাই, এখন স্নান করে এসে আংটি ফেরত চাইছি কিন্তু উনি দিতে চাইছেন না। চোখ রাঙাচ্ছেন। ওঁর মূর্তি তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন।”

বিপিনবাবু গলা ফাটিয়ে বললেন, “মিথ্যে কথা! সব মিথ্যে। ওরা মিথ্যেবাদী।”

আগন্তুকরা বলল, “আর আপনি খুব সত্যবাদী। বলুন শিগগির আংটি কোথায় রেখেছেন? না হলে চারজনের চারটে পিস্তলই একসঙ্গে গর্জে উঠবে।”

নুলিয়ারা বলল, “এরা ছেলেমানুষ। জাল আংটির পরিকল্পনা কখনও এদের মাথায় আসে? এ সবই আপনার প্ল্যান। আমাদের ঠকাবার ষড়যন্ত্র।”

বাবলু বলল, “ঠিক তাই। আমরা চাই উনি যেন এর উপযুক্ত শিক্ষা পান। ও আংটিতে আমাদের কোনও দরকার নেই। তবে আংটিটা যেন উনি ভোগ করতে না পারেন। গায়ের জোরে কেড়ে নিন ওটা।”

আগন্তুকরা বাবলুকে বলল, “উনি আংটিটা নিয়ে কোথায় রেখেছিলেন দেখেছ?”

বাবলু বলল, “হ্যাঁ।” বলেই বাঁ দিকের একটা আধো অন্ধকার ঘরের দিকে দেখাল। ওরা বিপিনবাবুকে বলল, “আংটি কি ওই ঘরেই আছে?”

“জানি না।”

“তা হলে আপনি মৃত্যুর জন্যে তৈরি হন।”

চার চারটে পিস্তল একসঙ্গে গর্জে উঠল। বিপিনবাবুর রক্তাক্ত দেহ লুটিয়ে পড়ল মেঝেয়। বাচ্চু-বিচ্ছু সভয়ে চিৎকার করে উঠল। আগন্তুকরা একবার শুধু চেয়ে দেখল ওদের দিকে। তারপর নুলিয়া দু’জনকে ধরে বলল, “এর মধ্যে তোদের কোনও কারসাজি নেই তো?”

“বাঃ রে! মাল তো আমরাই তুলে দিলাম আপনাদের হাতে!”

“তা তো দিলি। কিন্তু আসলটা লুকিয়ে নকলটা দিসনি তো?”

নুলিয়া দুজনের মুখও ফ্যাকাসে হয়ে গেল এবার, “শেষকালে আমাদের সন্দেহ? ছেলেরা তো নিজেরাই বলছে আংটিটা ওরা বিপিনবাবুর কাছে রেখে গেছে। তবু সন্দেহ কেন?”

“সন্দেহ করবার কারণ আছে বই কী। কাল রাত্রে যখনই তোরা ছেলেমেয়েগুলোকে টারগেট করেছিলি তখনই আমাদের সন্দেহ হয়েছিল। আর কাল রাত্রেই ছেলেগুলোর একজনের হাতে ওই আংটি আমরা প্রথম লক্ষ করি। তবে এটা যে ওই জিনিস তা ভাবিনি, কিন্তু যখনই দেখলাম তোরা ওদের পিছনে লেগেছিস তখনই আমাদের সন্দেহ হল। আমাদের না জানিয়ে নিজেরা কেন দাও মারতে গেছলি বল?”

“কিন্তু পরে তো সব বলেছি। আর তা ছাড়া সমুদ্রতীর থেকে আমরা তো অন্য কোথাও যাইনি। সোজা আপনাদের কাছেই গেছি। আপনারাও লক্ষ করেছেন আমাদের। যদি ওটা লুকোই তা হলে তো আমাদের কাছেই থাকবে। সার্চ করুন।”

ওরা কী বুঝল কে জানে, বলল, “ঠিক আছে। তোরা বিপিনবাবুর লাশ আন্ডারগ্রাউন্ডে ঢুকিয়ে দে। আমরা ততক্ষণ এ ঘরটা সার্চ করি।”

বিপিনবাবুর কাজের লোকটা সেই সময় বাজার করে ফিরে এসেছিল। নুলিয়ারা চোখের পলকে তাকে ধরে আনল তখন। বলল, “এই ব্যাটাকেও এখনই ওর মনিবের কাছে পৌছে দিন। না হলে ও ধরিয়ে দেবে আমাদের।”

কাজের লোকটা বলল, “আজ্ঞে আমার কী দোষ?”

কে দোষী আর কে নির্দোষী এসব দেখবার সময় আগন্তুকদের নেই। তাই আরও একটি পিস্তলের শব্দ হল “ডিসুম।”

আর একটা লাশ লুটিয়ে পড়ল মেঝেয়। নুলিয়ারা সঙ্গে সঙ্গে লাশ দুটাে সিঁড়ির নীচে আন্ডারগ্রাউন্ডের গর্তে ঢুকিয়ে দিল। তারপর এক দৌড়ে গিয়ে বন্ধ করে দিয়ে এল বাইরের দরজাটা।

বাবলু, বিলু, ভোম্বল, বাচ্চুু আর বিচ্ছুর মাথাতেও আসছে না তখন কী করে এদের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। পঞ্চুও বোধহয় ভয় পেয়ে গেছে।

এমন সময় হঠাৎ সুযোগ এসে গেল। বাবলুর দেখিয়ে দেওয়া ঘরে ওরা সবাই তখন ঢুকে পড়ে তল্লাশি চালাতে লাগল। বাবলু এদের ইশারা করে নিজেও ঢুকে পড়ল ঘরে। তারপর যেন ওদেরই দলে, এমনভাবে এটা ওটা সেটা ধরে খোঁজাখুঁজি করতে করতে পায়ে পায়ে দরজার কাছে এসেই সশব্দে বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল দরজাটা। বন্ধ করেই শিকল তুলে দিল।

ওরা সবাই বন্দি হয়ে ঘুষি মারতে লাগল দরজায়, “কী হল? দরজায় শেকল দিলে কেন? শিগগির খোল দরজা। না হলে আমরা একবার বেরুতে পারলে কিন্তু তোমাদের কাউকে আস্ত রাখব না।”

বাবলু বলল, “যদি বেরোতে পারেন তা হলে আপনাদের যা খুশি তাই করবেন। কিন্তু বেরুতে আপনারা পারছেন না। তার কারণ দরজা মাত্র একটাই।”

ওরা বলল, “প্লিজ। আমাদের ছেড়ে দাও ভাই। লক্ষ্মীটি তোমাদের আংটি আমরা খুঁজে বার করে তোমাদের হাতেই ফেরত দেব, কথা দিলাম।”

বাবলু বলল, “তার আগে জানলা গলিয়ে পিস্তলগুলো আপনারা বাইরে ফেলে দিন।”

“বেশ তো, তোমরাই কেউ এসে নিয়ে যাও।”

“না। আমরা যেমন দরজার আড়ালে আছি তেমনই থাকব। আপনারা দু’জনকে যখন খুন করতে পেরেছেন তখন এখান থেকে যাবার সময় আমাদেরও খুন করবেন, সেটা অনুমান করেই আপনাদের আটকালাম।”

“আরে দুর। তাই কখনও পারি?”

“ওসব বাজে কথা রেখে যা বলছি তাই করুন।”

বন্দিরা বেগতিক বুঝে পিস্তলগুলো জানালা গলিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুড়ে দিল। এক—দুই— তিন-চার।

বাবলু সেগুলো কুড়িয়ে এনে বলল, “এবার একটু বিশ্রাম করুন আপনারা। আমরা পুলিশ ডেকে আনছি।”

“পুলিশ। পুলিশ কেন?”

“বাঃ রে! পুলিশ যে আপনাদের হিরের আংটি উপহার দেবে!”

“পুলিশের সঙ্গে আংটির কী সম্পর্ক! আমাদের ছেড়ে দাও। সত্যি বলছি, ছাড়া পেলে আমরা তোমাদের অনেক টাকা দেব।”

বাবলু বলল, “টাকার আমাদের দরকার নেই, আর আংটিও আমরা চাই না। চাই না বলেই সমুদ্রে স্নান করতে যাবার আগে আমি কাউকে না জানিয়ে থানায় চলে যাই এবং আমার কুড়িয়ে পাওয়া হিরের আংটি আমি সেখানে জমা দিই। আর তখনই পুলিশের মুখ থেকে এই বাড়ির ইতিহাস এবং আংটির রহস্য জানতে পারি। পুলিশ বলেছে, আমাদের সাহায্য করবার জন্য তারা সব সময় প্রস্তুত। আমরা খবর দিলেই তারা ছুটে আসবে। যাই হোক, আমার সন্দেহ হয়েছিল ও আংটি আমাদের হারাতে হবে। তাই ওটা পুলিশের হাতে জমা দিয়ে তার রসিদ নিয়ে দোকান থেকে একটা কাঁচ বসানো মেকি আংটি পরে সমুদ্রে স্নান করতে যাই। পরের ঘটনা তো সবই জানেন আপনারা। যাক, এবার আপনারা খাঁচা-গাড়িতে চেপে বৃন্দাবন দেখবার জন্য তৈরি হন। আমি এলুম বলে।”

বাবলু তখন সবাইকে পাহারায় নিযুক্ত রেখে চলে গেল থানায়। রসিদ দেখিয়ে ওর আংটিটা ফেরত নিয়ে আদ্যোপান্ত সব খুলে বলতেই পুলিশের লোকেরা জিপ ভ্যান যা যা ছিল সব নিয়ে হইহই করে ছুটে এল।

তারপর সবাইকে গ্রেপ্তার করে ভ্যানে উঠিয়ে মৃতদেহ দুটো সুড়ঙ্গ-ঘর থেকে বার করল।

দারোগাবাবু বাবলুকে বললেন,“তোমরা তা হলে কোথায় থাকবে?”

“আপাতত কোনও একটা হোটেলে। যদি জায়গা না পাই তা হলে আজই রাতের ট্রেনে কলকাতায়।”

“না। তার দরকার হবে না। তোমরা একটা ধর্মশালায় চলে যাও। ওদের রিজার্ভ ঘর থাকে। আমাদের লোক সঙ্গে গেলেই সেই ঘর খুলে দেবে ওরা।”

বাবলু বলল, “আপনারা সেই ব্যবস্থাই করে দিন তা হলে আমার বন্ধুরা রইল। আমি এখনই একবার দু-এক মিনিটের জন্যে আসছি।” এই বলে ঝড়ের বেগে চলে গেল বাবলু।

খানিক বাদে ঝড়ের মতোই আবার ফিরে এল সে।

সবাই অবাক হয়ে বলল, “কী ব্যাপার। কোথায় গেছলে?”

“সমুদ্রের ধারে।”

“হঠাৎ?”

“আংটিটার একটা সদগতি করতে।”

“ওটা যার জিনিস তাকেই দিয়ে এলাম। সমুদ্র থেকে পেয়েছিলাম, সমুদ্রেই ফেলে দিয়ে এলাম ওটা।”

“সে কী! ওর যে অনেক দাম!”

“আমার কাছে ওর কোনও দামই নেই। ও বড় অভিশপ্ত জিনিস। ও যেখানে থাকবে সেখানেই রক্তারক্তি ঘটাবে।”

কারও মুখে কোনও কথা নেই। বিলু, ভোম্বল, বাচ্চু, বিচ্ছু মালপত্তর নিয়ে বেরিয়ে এল। পুলিশের লোকেরা ওদের নিয়ে চলল ধর্মশালার দিকে।

বাইরে তখন প্রচণ্ড ভিড়।

পঞ্চুও চলল ওদের সঙ্গে।

পুলিশ তখন গোটা বাড়িটাকে আরও ভাল করে তল্লাস করছে। বাড়িটার আগাগোড়াই ঘিরে আছে পুলিশে।

পঞ্চু হঠাৎই ভুক ভুক করে কী যেন মনে করিয়ে দিল ওদের।

বাবলু আনন্দে বলে উঠল, “থ্রি চিয়ার্স ফর পাণ্ডব গোয়েন্দা।”

সবাই বলে উঠল, “হিপ হিপ হুরর রে।”

পঞ্চুও আকাশের দিকে মুখ তুলে ডেকে উঠল, “ভৌ। ভৌ ভৌ।”

Facebook Comment

You May Also Like