অশ্বডিম্ব রহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

অশ্বডিম্ব রহস্য - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ঘোড়া ডিম পেড়েছে–মানে ঘোড়ার ডিম? খি খি করে হাসতে লাগলেন কৃতান্তবাবু। প্রাইভেট গোয়েন্দা কে, কে, হালদার। গণেশ অ্যাভিনিউতে যাঁর রীতিমতো হালদার ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে।

ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, এতে হাসির কী আছে? যা সত্যি তা সত্যি। গিয়ে দেখে আসুন আমার গ্যারাজে!

কৃতান্তবাবু আরও খি খি করে বললেন, আপনার গ্যারাজে মোটর গাড়ির বদলে ঘোড়া থাকে বুঝি?

থাকে। –ভদ্রলোক রূষ্টভাবে বললেন, কারণ তেলের খরচ প্রচণ্ড বেড়েছে। একটা গাড়ি রাখার খরচ আপনি নিশ্চয় জানেন। কলকাতার রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, হরদম পার্টস বদলাতে হয়। সেই সব খরচ হিসেব করে দেখেছিলাম, এর চেয়ে ঘোড়া পোর খরচ অনেক কম। ছোটাতে পারলে ছোটেও গাড়ির মত জোরে।

কথা হচ্ছিল কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ড্রইংরুমে বসে। কর্নেল বুরুশ দিয়ে একটা তামার ফলক ঘষে সাফ করছিলেন। সম্প্রতি লোহাগড়ার জঙ্গলে কুড়িয়ে পেয়েছেন ফলকটি। অজানা হরফে কি সব লেখা আছে ওতে। মন্তব্য করলেন, গাড়ির ইঞ্জিনের সঙ্গে হর্সপাওয়ার অর্থাৎ অশ্বশক্তি কথাটার যোগ আছে, হালদারমশাই। আধুনিক যুগেও গতিশীল কোনও যন্ত্রের গতিশক্তি বেঝাতে হর্সপাওয়ার কথা চালু।

কৃতান্তবাবু হাসি চেপে বললেন, জানি। কিন্তু ইনি যা বলছেন তাতে মনে হচ্ছে, কবে শুনব মোটরগাড়িও ডিম পেড়েছে।

পাড়লেও অবাক হবার কিছু নেই। পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু থাকাটাই অসম্ভব।

কর্নেলের কথায় কৃতান্তবাবু খুব অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, তাহলে আপনি বলছেন ঘোড়ার ডিম কথাটা সত্যি?

কর্নেল কোনো জবাব দিলেন না আর। আমি বললুম, ইনি এমন করে বলছেন যখন, তখন হয়তো সত্যি।

ভদ্রলোক জোর গলায় বলে উঠলেন, জলজ্যান্ত সত্যি। সত্যি বলেই তো ছুটে এসেছি কর্নেল সায়েবের কাছে। …

ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পরনে ধোপদুরস্ত সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। মোটাসোটা নাদুসনুদুস গড়ন। চাঁছাছোলা মুখ। আঙুলে অনেকগুলো দামি পাথরবসানো আংটি। কারবারি বড়োলোক বলেই মনে হয়। নাম যদুগোপাল চৌধুরী। থাকেন ব্যারাকপুর এলাকায়।

তিনি হন্তদন্ত ঘরে ঢুকেই নিজের নামধাম বলে এক নিশ্বাসে তার গ্যারাজের অশ্বডিম্বটির। বিবরণ দিয়েছেন। আমার বা কৃতান্তবাবুর উপস্থিতি গ্রাহ্য করেননি। কাজেই আমার মনে হয়েছে, ভদ্রলোক কর্নেলের কীর্তিকলাপ ভালোই জানেন। তাই তার সাহায্য নিতে ছুটে এসেছেন।

কৃতান্তবাবু অর্থাৎ প্রাইভেট গোয়েন্দা কে. কে. হালদারকে এতক্ষণে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম কেসটি হাতে পেলে উনি কোমর বেঁধে রহস্যভেদে নামতে রাজি। কর্নেলের। কথাটা শোনার পর বেশ গম্ভীর হয়ে গোঁফের ডগা পাকাচ্ছেন আর আড়চোখে যাদুগোপালবাবুকে দেখছেন।

কর্নেল তামার ফলকটি টেবিলের ড্রয়ারে রেখে সোফায় এসে বসলেন। ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে করে কফি দিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, কি হালদারমশাই, অশ্বডিম্ব-রহস্যের কেসটা নেবেন নাকি?

কৃতান্তবাবু কিছু বলার আগে যাদুগোপালবাবু বললেন, সায়েব আমি কিন্তু আপনার কাছেই এসেছি।

কৃতান্তবাবু আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন। কর্নেল বললেন, ইনি প্রখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে, কে, হালদার। আগে জাঁদরেল পুলিশ অফিসার ছিলেন। রিটায়ার করে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। আমার মনে হয়, এসব রহস্যের মীমাংসা উনিই ভালো করতে পারবেন।

কী মুশকিল!–যাদুগোপালবাবু ক্ষুব্ধভাবে বললেন রহস্যটা তো কোনও চুরি-ডাকাতি বা খুনখারাপি সংক্রান্ত নয়। নেহাত সায়েন্টিফিক রহস্য। আপনি শুনেছি, সায়েন্স-টায়েন্সেরও চর্চা করেন। তাই

কথা কেড়ে ক্রুদ্ধ কৃতান্তবাবু বললেন, তা আপনি সায়েন্টিস্টদের কাছেই যান না কেন?

গিয়েছিলুম তো-যাদুগোপালবাবু বললেন, কেউ কোনও কিনারা করতে পারেননি।

কর্নেল বললেন, ডিমটি কত বড়ো?

পেল্লায়। –যাদুগোপালবাবু বললেন, তারপর সেটির সাইজ দেখালেন হাতের মাপে। মনে হল, ডিমটি অন্তত হাত দেড়েক উঁচু। কর্নেল বললেন, সেটি এখন আছে কোথায়?

আমার ঘোড়ার পেটের তলায়। যেন তা দিচ্ছে। -যাদুগোপালবাবু মুখে রহস্যের ভঙ্গি ফুটিয়ে বললেন, ঘোড়াটার স্বভাবও রাতারাতি বদলে গেছে। খুব হিংস্র হয়ে উঠেছে. ডিমটাকে সরাতে গেলেই ঠ্যাং ছুঁড়ছে। চিহি চিহি করে চাঁচ্যাচ্ছে।

–তাহলে সায়েন্টিস্টরা পরীক্ষা করলেন কীভাবে?

একটু দূর থেকে কি সব হাবিজাবি মেশিনের নল ডিমটার গায়ে ঠেকিয়ে পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। –যাদুগোপালবাবু হতাশভাবে বললেন, এদিকে খবরটা গেছে রটে। বাড়ির গেটে রোজ হাজার হাজার লোক জড়ো হচ্ছে। পুলিশে খবর দিতে হয়েছে পর্যন্ত। আপনি দয়া করে এখনই একবার চলুন, কর্নেল।

কৃতান্তবাবু হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। হাই তুলে বললেন, চলি কর্নেল। জয়ন্তবাবু আসি। তারপর মুচকি হেসে বেরিয়ে গেলেন।

আমি বললুম, আচ্ছা যাদুগোপালবাবু, ডিমটি কবে দেখতে পেলেন বলেননি কিন্তু।

যাদুগোপাল গুম হয়ে বললেন, গতকাল ভোরবেলা। গ্যারাজে রোজকারমতো ঘোড়াটাকে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি, পেটের তলায় একটা ডিম। যেই সরাতে গেছি সেটা;মুখ ঘুরিয়ে চিহিহি করে কামড়াতে এল। রাতারাতি একেবারে বদলে গেছে ঘোড়াটা। বিশেষ করে আমাকে দেখলেই চিহিহি করে দাঁত বের করছে। বুঝুন অবস্থা।

-ঘোড়াটা দেখাশোনার জন্য নিশ্চয় সহিস রেখেছেন?

–না। আমি নিজেই ওর দেখাশোনা করি। খাওয়াদাওয়া, স্নান করানো সবকিছুই। কর্নেল সাদা। দাড়িতে অভ্যাসমত আঁচড় কাটছিলেন। মাঝে মাঝে বিশাল টাকেও হাত বুলোচ্ছিলেন। চোখ দুটো বন্ধ। সেই অবস্থায় বলে উঠলেন, আচ্ছা চৌধুরীমশাই, আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?

যাদুগোপালবাবু বললেন, আমরা দুভাই। আমি ছোটো। দাদার নাম প্রাণগোপাল। গত বছর থেকে মাথার একটু গন্ডগোল হয়েছে। তবে পুরোপুরি পাগল বলা চলে না। শুধু কথাটথা কম বলেন। যদি-বা বলেন, তার মানে সবসময় বোঝা যায় না।

–আর কে আছেন বাড়িতে?

আমরা দুভাই বিয়ে করিনি–চিরকুমার!–ম্লান হাসলেন যাদুগোপাল, দাদা বরাবর সাধু-সন্ন্যাসী টাইপ মানুষ। শিশি-বোতলের পৈতৃক ফ্যাক্টরি ছিল। ইদানীং কাচের চেয়ে প্ল্যাস্টিকের পাত্রের চাহিদা বেশি। তাই প্ল্যাস্টিক গুডস তৈরির কারখানাও করেছি। গতবছর প্রচণ্ড লোকসান হবার পর দাদা প্রচণ্ড শক খেয়েই হয়তো ওইরকম হয়ে যায়। তারপর থেকে আমি একা বিজনেস দেখাশোনা করি। আর দাদা যখন বিয়ে করেনি, তখন আমিও আর ওদিকে মন দিলাম না। হাঁ, বাড়িতে আমরা দুভাই বাদে আর আছে জগন নামে একজন কাজের লোক। রান্নাবান্নার জন্য আছে হবু ঠাকুর। একজন ঠিকে-ঝি আছে।

কর্নেল চোখ খুলে বললেন, ঠিক আছে। আমি সন্ধ্যার দিকেই যাবখন। বাই দা বাই যে বিজ্ঞানীরা ডিমটি পরীক্ষা করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার। আপনি তাদের নাম ঠিকানা লিখে দিন।

যাদুগোপালবাবুকে আমি একটা প্যাড এগিয়ে দিলুম। উনি তিনজন বিজ্ঞানীর নাম-ঠিকানা লিখে দিলেন। কর্নেল কাগজটা নিয়ে চোখ বুলোচ্ছেন, এমন সময় ফোন বাজল। কর্নেলের ইশারায়, আমি ফোন তুলে সাড়া দিলুম। খুব ব্যস্তভাবে কাকে জিজ্ঞেস করতে শুনলুম, হ্যালো! এটা কি ২৯-৬৩৯৫?

বললুম, হ্যাঁ কাকে চান?

-আচ্ছা, ওখানে কি যাদুগোপাল চৌধুরীমশাই আছেন?

–আছেন। আপনি কে বলছেন?

আজ্ঞে, দয়া করে ওঁকে একটু ফোনটা দিন।

যাদুগোপালবাবুকে ফোন দিয়ে বললুম, আপনার।

উনি খুব অবাক হয়ে ফোন নিয়ে বললেন, কে? জগন? কী হয়েছে?….অ্যাঁ! সে কী…কী আশ্চর্য! হতভাগা, তোকে না নজর রাখতে বলেছিলুম? খালি খাবিদাবি আর গাঁজা টেনে…! ফোন রেখে যাদুগোপলবাবু ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বললেন, কী অদ্ভুত কাণ্ড!

কর্নেল বললেন, ডিমটা উধাও হয়েছে কি?

যাদুগোপালবাবু চমকে উঠে বললেন, টের পেয়েছেন আপনি? এজন্যই আপনার কাছে আসা। শুনেছিলুম আপনার আশ্চর্য দিব্যশক্তি আছে।

কর্নেল মাথা নেড়ে বললেন, মোটেও না চৌধুরীমশাই। নিছক অনুমান।

আমি বললুম, আপনার জগনবাবুর কথা আমিও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলুম। খুব জোরে চেঁচিয়ে কথা বলছিলেন। কাজেই কর্নেলেরও শুনতে পাওয়া স্বাভাবিক।

যাদুগোপালবাবু ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়ালেন, কর্নেল দেখছেন তো কী রহস্যময় ব্যাপার। এজন্যই তো আপনাকে এখনই যেতে অনুরোধ করছিলুম। যাই হোক, তা যখন যাবেন না, সন্ধ্যা ছটা নাগাদ আসবেন, প্লিজ।

কর্নেল বললেন, যাব।

যাদুগোপালবাবু বেরিয়ে গেলে বললুম, ব্যাপারটা কী মনে হচ্ছে কর্নেল।

কর্নেল একটু হাসলেন। -ডার্লিং! ঘোড়ার ডিম সত্যিই একটা রহস্যময় ব্যাপার। একটু আগে বললুম না, পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু না থাকাটাই অসম্ভব!

–আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। কিছুই বুঝতে পারছি না।

কর্নেল অট্টহাসি হেসে বললেন, অর্থাৎ তুমি ঘোড়ার ডিম বুঝেছ!..

যাদুগোপালবাবুদের বাড়িটা একেবারে গঙ্গার ধারে। মাঝখানে সেকেলে গড়নের দোতলা দালান। চারদিকে অনেকটা জায়গা ঘিরে পাঁচিল। গ্যারাজটা উত্তর-পূর্ব কোনার পাঁচিল ঘেঁসে। গেটে ঢুকেই চোখে পড়েছিল, ওই গ্যারাজে একটা কালচে রঙের ঘোড়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মিটমিটে বাতি জ্বলছে সেখানে। দালান-বাড়ির বাকি তিন দিকটায় ঝোপজঙ্গল, কিছু গাছ। বুঝলুম, একসময় এগুলো ফুলফলের বাগানই ছিল। অযত্নে এখন জঙ্গুলে হয়ে গেছে।

কর্নেল প্রথমেই গ্যারাজে যেতে চাইলেন ঘোড়াটাকে দেখতে। যাদুগোপালবাবু ব্যস্তভাবে সেদিকে নিয়ে চললেন আমাদের। তার হাতে টর্চ। গ্যারাজের সামনে গিয়ে বললেন, ওই দেখুন! ঘোড়াটার পেটের তলায় ওইখানে ডিমটা ছিল। জগন, হরু ঠাকুর, কাজের মেয়ে লক্ষ্মী–প্রত্যেকে দেখেছে ডিমটাকে। তিনজন সায়েন্টিস্ট দেখেছেন। পুলিশও দেখে গেছে। আজ সকালে যখন আপনার কাছে যাব বলে বেরুচ্ছি, তখনও আমি দেখে গেছি। অথচ তারপর ডিমটা হঠাৎ উধাও। জগন বলছে, বাজারে গিয়েছিল একটা কাজে। ফিরে এসে দেখে, ডিমটা নেই।

কর্নেল আমাকে অবাক হয়ে ঘোড়াটার কাছে গেলেন এবং তার চোয়ালে হাত বুলিয়ে আদর। করলেন। ঘোড়াটা যেন ঝিমুচ্ছে। তেমনি স্থির দাঁড়িয়ে রইল। শুধু ওর কালো চামড়াটা একবার তিরতির করে কেঁপে উঠল।

যাদুগোপাল বললেন, ডিমটা চুরি যাওয়ার পর ও আগের মতো শান্ত হয়ে গেছে। এও এক রহস্য!

হুঁ-রহস্য। -কর্নেল চারদিকে চোখ বুলিয়ে বললেন, তো চলুন যাদুগোপালবাবু, আপনার দাদার সঙ্গে আলাপ করা যাক।

যাদুগোপালবাবু একটু বিব্রত হলেন যেন। বললেন, তা যাবেন তো চলুন। তবে দাদার মুডটা আজ বড্ড খারাপ দেখছি সকাল থেকে। হরু ঠাকুর ব্রেকফাস্ট দিতে গিয়েছিল। ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। দুপুরেও কিছু খেতে চাননি। জগন অনুরোধ করতে গিয়েছিল। তাকে থাপ্পড় মেরেছেন। আর আমাকে তোইদানীং কেন যেন দেখলেই খেপে ওঠেন। চ্যাঁচামেচি করে বলেন, তোর মুখদর্শন করব না।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, কেন একথা বলেন জানতে চাননি?

খোয়াঢাকা সঙ্কীর্ণ রাস্তার দুধারে বর্মী বাঁশ, ফণিমনসা, ঝাউ, আগাছা। বাড়ির দোতলায় একটা ঘরের জানলা থেকে একটু আলো এসে পড়েছে। পা বাড়িয়ে যাদুগোপল ম্লান হেসে বললেন, বিয়ে করিনি, হয়তো তাই। দাদা আমার জন্য পাত্রী ঠিক করেছিলেন–সে বছর কয়েক আগের কথা। তখন উনি সুস্থ মানুষ। ওঁর কথা রাখিনি–এটা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।

কর্নেল বললেন, আজ সকাল থেকে আপনার দাদার মুড খারাপ বললেন। একটু বুঝিয়ে বলুন তো?

যাদুগোপাল চাপা স্বরে বললেন, বললুম না? কিছু খাননি

-না। মানে, পাগলামির নতুন কোন লক্ষণ দেখছেন কি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। প্রায় লাফিয়ে উঠলেন যাদুগোপাল, দেখেছেন? আপনি না বললে খেয়ালই হত না। এজন্যই আপনার শরণাপন্ন হওয়া! দাদার গলার স্বর কেমন বদলে গেছে। ভাঙা-খনখনে-কেমন যেন…., উপযুক্ত শব্দ হাতড়াচ্ছিলেন যাদুগোপাল। শেষে বললেন, মানে। মানুষ প্রচণ্ড রাগে চ্যাঁচামেচি করে শেষে ক্লান্ত হয়ে গেলে যেমন গলায় গজরাতে থাকে, ঠিক তেমনি।

–কিংবা অষ্টপ্রহর সঙ্কীর্তন করে গাইয়ের গলার অবস্থা যেমন হয়!

কর্নেলের এই মন্তব্যে আমি হো হো করে হেসে ফেললুম। যাদুগোপালও দুঃখের মধ্যে হাসবার চেষ্টা করে বললেন, তাও বলতে পারেন অবশ্য। মোট কথা, দাদার মুড ভালো নেই।

দোতলা বাড়িটাতে ঢুকেই প্রশস্ত হলঘর! দামি সোফাসেট, বুক সেলফ আর হরেক ভাস্কর্যে সাজানো। কর্নেল কিছু বলার আগেই যাদুগোপাল বললেন, সবই দাদার নিজের হাতে সাজানো। কারবারি লোক হলে কী হবে, দাদার বইপত্তর পড়ার খুব ঝোব ছিল। রুচিশীল মানুষ। এখন মাথার গন্ডগোল হলেও সবসময় বই পড়ার অভ্যাস যায়নি। গিয়েই দেখবেন আশা করি।

দেয়ালে বড়ো বড়ো সব পোর্ট্রেট ঝোলানো। কর্নেল ছবিগুলো দেখছিলেন। তখন যাদুগোপাল একে একে এইগুলোর সঙ্গে কর্নেলের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, এইটে আমার ঠাকুরদা পোপাল চৌধুরীর। নিঃসম্বল অবস্থায় বর্ধমান থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। পুরোনো শিশিবোতল কেনার কারবার খোলেন। শেষে–তো এইটে আমার পিতৃদেব নবগোপাল চৌধুরীর ছবি। আর এটা হল আমার মাতৃদেবী ভবসুন্দরীর।

কর্নেল আরেকটি পোর্ট্রেটের দিকে আঙুল তুলে বললেন, উনি কে? বলেই কর্নেল ছবির নিচে গিয়ে ছবির তলায় নামটা পড়তে থাকলেন-

নিস্তারিণী দেবী।
জন্ম : ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ, ১৭ জুন।
মৃত্যু : ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০ ডিসেম্বর।

যাদুগোপাল একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রী। অসুখ হয়ে মারা যান।

–ওঁর সন্তানাদি ছিল না?

যাদুগোপাল কুণ্ঠিতভাবে হাসলেন একটু, পারিবারিক সব কথা তো খুঁটিয়ে বাইরের লোককে বলা যায় না। তাছাড়া দাদা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। আমরা কখনও নিজেদের সৎ ভাই। বলে চিন্তা করিনি। তাই কাউকে সেকথা বলতেও চাইনি।

কর্নেল ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, তাহলে প্রাণগোপালবাবু আপনার সহোদর ভাই নন?

যাদুগোপাল ব্যস্তভাবে জিভ কেটে বললেন, না-না। আমরা দুই মায়ের ছেলে বটে, কিন্তু কক্ষনো ওসব ভাবিনি। আজও ভাবি না। ভাবতেও খারাপ লাগে। আমার মা, দাদাকে নিজের পেটের ছেলের মতোই মানুষ করেছিলেন। বরং আমিই যেন মায়ের কাছে সৎ ছেলে ছিলুম। যত আদর যত্ন সব দাদার প্রতি ছিল মায়ের। মরার সময়ও

ঢোক গিলে চোখ মুছলেন যাদুগোপাল। কর্নেলের ওপর আমার রাগ হল। ওসব পারিবারিক আবেগপ্রবণ জায়গায় কী দরকার ছিল নাক গলানোর?

কর্নেল নির্বিকার মুখে বললেন, বুঝেছি। চলুন, আপনার দাদার সঙ্গে আলাপ করা যাক। কীভাবে আমাকে নেন, দেখি।

যাদুগোপাল বললেন, চলুন, চলুন। দাদার মাথায় গন্ডগোল থাকলেও এমনিতে খুব ভদ্র। কথাবার্তা একটু কম বলেন এই যা। তবে আজকের ব্যাপার যা দেখছি, বুঝতে পারছি না কীভাবে আপনাকে নেবেন। শুধু একটা অনুরোধ–তেমন কিছু দেখলে যেন ওঁকে আর ঘাঁটাবেন না। নইলে ভাঙচুর শুরু করে দেবেন। সামলাতে পারব না আমরা।

ঘরের ভেতর থেকে ঘোরানো চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের তলায়। লম্বা বারান্দার মুখে একটা তাগড়াই চেহারার গুফো লোককে দেখা গেল। যাদুগোপাল চাপা স্বরে তাকে বললেন, কি রে জগন? বড়োবাবুর কী অবস্থা?

এই তাহলে জগন। সে গম্ভীর মুখে তেমনি চাপা স্বরে বলল, প্রায় একই রকম। ইজিচেয়ারে বসে বই পড়ছেন। টেবিলে খাবার ঢাকা দিয়ে রাখতে বললেন শুধু। মনে হচ্ছে, খিদে পেয়েছে তাহলে। যাই, হরু ঠাকুরকে বলি গে সকাল-সকাল খাবার পাঠিয়ে দিতে।

সবে জগন ঘুরে পা বাড়িয়েছে হঠাৎ আলো নিভে গেল বাড়ির। যাদুগোপাল ব্যস্ত হয়ে বললেন, ওই যাঃ। লোডশেডিং-এর আর সময় ছিল না! ও জগন, বড়োবাবুর ঘরে মোম জ্বেলে দিয়ে আয় এক্ষুনি। নইলে হুলস্থুলু বাধাবেন।

বলে জগনের হাতে টর্চটা দিলেন। জগন টর্চ জ্বেলে টানা লম্বা বারান্দা ধরে হন্তদন্ত এগিয়ে গেল। সেই সময় ওদিক থেকে খনখনে গলায় কার চ্যাঁচামেচি শোনা গেল, অ্যাই জগনা! তারপর দুমদাম শব্দ ভেসে এল। যাদুগোপাল বললেন, দেখলেন? শুনলেন তো কর্নেল? জগনটা এত বোকা। ওকে সবসময় কাছাকাছি থাকতে বলি এজন্যই।

টানা বারান্দার শেষ প্রান্তে উত্তর-পূর্ব কোনার ঘরের দরজার সামনে পৌঁছে দেখলুম, জগন একটা নিচু টেবিলে মোমটা ইতিমধ্যে জ্বেলে দিয়েছে। উত্তরের জানালার কাছে আমাদের দিকে পেছন ফিরে ইজিচেয়ারে এক ভদ্রলোক হেলান দিয়ে বসে আছেন। তাঁর মাথায় একরাশ সাদাকালো বড়ো বড়ো চুল। পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ওঁর দুহাতে ধরা একটা খোলা বই। জগন মোমটা আরও একটু সরিয়ে এনে বলল, এবার পড়তে পারছেন তো বড়োবাবু?

খনখনে ভাঙা গলায় উনি বললেন, ঠিক আছে, তুই যা।

জগন দরজার সামনে এসে আমাদের দিকে আঙুল তুলে বলল, দুজন বাবুমশাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, বড়োবাবু।

-আমার সময় নেই। যেতে বল।

যাদুগোপাল বললেন, দাদা! ইনি বিখ্যাত লোক–কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। তুমি তো কাগজ পড়ে এঁর কত গল্প করতে!

–এখন না। পরে আসতে বল। আমি ব্যস্ত।

যাদুগোপাল হতাশ মুখে কর্নেলের দিকে ঘুরেছেন, ঠিক সেইসময় কেউ হেঁড়ে গলায় পেঁচিয়ে উঠল, চোর! চোর! পাকড়া! অমনি জগন কিরকম যেন হয়ে গেল। যাদুগোপাল বারান্দার রেলিঙে ঝুঁকে চাঁচাতে থাকলেন, পাকড়া!

কর্নেল ও আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। দুজনেই বারান্দার রেলিঙে যাদুগোপালের পাশে গিয়ে ঝুঁকে পড়লুম, নিচে কী ঘটছে দেখার জন্যই। কিন্তু ঘটনাটা ঘটছে পশ্চিম দিকে–যেদিকে গঙ্গা। তাই যাদুগোপালের টর্চের আলোয় কিছু দেখা যাচ্ছে না। জগন আমাদের পাশ কাটিয়ে দৌড়ে চলে গেল সিঁড়ির দিকে। কিছুক্ষণ পরেই জগনের চিৎকার ভেসে এল, ডিমচোর! ডিমচোর!

যাদুগোপাল ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, চলুন কর্নেল! শিগগির চলুন। জগন ডিমচোরকে ধরেছে মনে হচ্ছে।

বলে কর্নেলের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললেন।

নিচে গিয়ে শুনি চ্যাঁচামেচিটা উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে ভেসে আসছে। সেদিকে ছুটে গেলুম তিনজনে। টর্চের আলোও দেখা যাচ্ছে সেখানে। ঝোপঝাড় লতাকুঞ্জে জায়গাটা একেবারে ঠাসা জঙ্গল। সেখানে পৌঁছে দেখলুম, সদ্য একটা গর্ত খোঁড়া হয়েছে। যাদুগোপাল বললেন, কি ঠাকুর, ও কিসের গর্ত?

এই লোকটা তাহলে হরুঠাকুর। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ঘোড়ার ডিমের গর্ত, ছোটোবাবু। সাইজটা দেখুন না গর্তের। চোর আজ সকালেই ডিমটা চুরি করে এনে এখানে পুঁতে রেখেছিল। এখন সুযোগ বুঝে সেটা নিয়ে গেছে।

কর্নেল বললেন, তুমি কীভাবে টের পেলে ঠাকুরমশাই?

হরু ঠাকুর বলল, আমার কান খুব খাড়া স্যার। রাতবিরেতে পাতাটি ঝরলেও শুনতে পাই। কিচেন থেকে খসখস শব্দ শুনতে পেয়েছিলুম। ওই দেখছেন কিচেন। জানালা দিয়ে টর্চের আলো ফেলে দেখি, কে এখানে কী একটা করছে, অমনি দৌড়ে এলুম। লোকটা ঘোড়ার ডিমটা নিয়ে পালিয়ে গেল।

–তাকে দেখেছ তাহলে? কেমন চেহারা?

আজ্ঞে, আবছা দেখেছি। যা জঙ্গল ওই দেখুন না জুতোর ছাপ।

লোকটা বুদ্ধিমান। গুঁড়ো এবং চাপ চাপ নরম মাটিতে জুতোর সোলের ছাপ আছে বটে। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, কী বয়সি লোক মনে হল ঠাকুরমশাই?

হরুঠাকুর একটু ভেবে বলল, তা আমার বয়সিই মনে হল। হা-নাকটা বেজায় লম্বা স্যার।

-হ্যাঁ, তোমার বয়স কত হল, ঠাকুরমশাই?

–তা স্যার, ষাট-বাষট্টি হয়ে এল প্রায়।

এই সময় জগন এসে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকেছিল চোর। গঙ্গার ঘাটের দরজা খুলে পালিয়ে গেছে।

কর্নেল ঝুঁকে সদ্য খোঁড়া গর্তটা দেখছিলেন। আমিও দেখতে থাকলুম। হুঁ ঘোড়ার ডিমটার যা সাইজ বলেছিলেন যাদুগোপাল, সেই সাইজের গর্তই বটে।

একটু পরে কর্নেল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন চলুন যাদুগোপালবাবু! ব্যাপারটা দেখছি সত্যি রহস্যময়!

যাদুগোপাল পা বাড়িয়ে উত্তেজিতভাবে বললেন, রীতিমতো রহস্যময়। অ্যাই জগন–ঘাটের দরজায় খিল দিয়েছিস? দিসনি তো? যা-যা-খিল দিয়ে দে..চলুন কর্নেল।

হলঘরের বারান্দায় পৌঁছেছি, তখন আলো জ্বলে উঠল। লোডশেডিং বাবুদের মতিগতি বোঝ দায়। দেখেটেখে মনে হয়, কে যেন কলকাতাবাসীদের সঙ্গে মজার খেলা খেলছে। আলো-আঁধারি খেলা। হলঘরে ঢুকে কর্নেল হঠাৎ বললেন, আচ্ছা যাদুগোপালবাবু, আপনাদের প্লাস্টিক গুডসের কারবারের দেখাশোনা করার জন্য কোনো ম্যানেজার রেখেছেন নিশ্চয়?

এই প্রশ্নে যাদুগোপাল একটু অবাক হয়ে বললেন, রেখেছি। কিন্তু

কর্নেল বললেন, না–এমনি জানতে ইচ্ছে হল। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, এই ঘোড়ার ডিমের রহস্যের পেছনে অন্য কারও হাত আছে।

যাদুগোপাল চাপা স্বরে বললেন, ঠিক বলেছেন। আমারও তাই সন্দেহ। সে জন্যই দাদার সঙ্গে আপনার কথাবার্তা হওয়া দরকার। চলুন আরেকবার দাদার মুডটা ট্রাই করা যাক। চলুন। এ রহস্য ভেদ করতেই হবে।

এখন আলো জ্বলছে। আমরা টানা বারান্দা হয়ে দোতলায় প্রাণগোপালবাবুর ঘরের সামনে পৌঁছোলম। দরজা তেমনি খোলা। নিচু টেবিলে মোমটা তেমনি জ্বলছে। কিন্তু ঘরে এখন বিদ্যুতের আলো। সেই আলোয় শিউরে উঠে দেখলুম, প্রাণগোপালবাবু ইজিচেয়ারের পাশে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। পিঠে পাঞ্জাবি ছাপিয়ে চাপ চাপ রক্ত। যাদুগোপাল দৃশ্যটা দেখামাত্র দুহাতে মুখ ঢেকে প্রচণ্ড আর্তনাদ করে উঠলেন, দাদা!..

কর্নেলের ন্যাওটা এবং সঙ্গী হওয়ায় এযাবৎ বিস্তর খুনখারাপি আর রহস্যময় কাণ্ডকারখানা দেখেছি। কিন্তু এই অশ্বডিম্ব-রহস্য এবং প্রাণগোপালবাবুর হত্যা-রহস্যের মতো যুগল রহস্যের ঘোরপ্যাঁচ কখনও দেখিনি। মনে মনে বলছিলাম, ওহে বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবর! এবার দেখি তোমার টেকো মাথার ঘিলুর শক্তি কতখানি! এবার তোমার ঋষিসুলভ সাদা দাড়ি ছিঁড়েও কুল পাবে না!

সক্কালে আমাকে ওঁর ড্রয়িংরুমে দেখে গোয়েন্দাপ্রবর মুচকি হেসে বললেন, কী জয়ন্ত? তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক তো এইমাত্র পড়লুম, এক জব্বর অন্তর্তদন্তের সূত্রপাত করেছ। কিন্তু তুমিও যে পুলিশের থিয়োরি মেনে জগনকে হত্যাকারী শাব্যস্ত করবে, ভাবতেও পারিনি।

ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম, ঘটনাস্থলে আমিও ছিলুম। প্রাণগোপালবাবুকে যখন জীবিত দেখেছি তখন জগন সেখানে ছিল। ডিমচোরের ব্যাপারটা নিয়ে চ্যাঁচামেচি শুরু হলে আমরা নিচে গেলুম। তারপর একমাত্র জগন ছাড়া আর সবাই-মানে, যাদুগোপালবাবু আর হরুঠাকুর আমাদের সামনে উপস্থিত ছিল। জগন এল অন্তত মিনিট কুড়ি পরে। এসে বলল, চোর খুঁজতে গিয়েছিল। তারপর আমরা ওপরে গিয়ে দেখলুম প্রাণগোপালবাবু খুন হয়ে পড়ে আছেন। কাজেই জগন ছাড়া ওই সময় আর কারুর পক্ষে খুন করার সুযোগ ছিল না।

কর্নেল সেই তামার ফলক সাফ করতে করতে বললেন, প্রত্যেকটি খুনের পেছনে মোটিভ বা উদ্দেশ্য থাকে। জগনের মোটিভ কী?

জানা যাবে। অশ্বডিম্ব-রহস্য ভেদ করতে পারলেই জানা যাবে।

কর্নেল হাসলেন, একটু অপেক্ষা করো। অশ্বডিম্ব এসে পৌঁছোবে।

ভীষণ চমকে গিয়ে বললুম, তার মানে? ঘোড়ার ডিমের কি ঠ্যাং গজিয়েছে–নাকি ডিম ফুটে ঘোড়ার বাচ্চা বেরিয়েছে যে আপনার ফ্ল্যাটে এসে হাজির হবে?

এই সময় কলিংবেল বাজল। কর্নেল চাপা গলায় বললেন, সম্ভবত ঘোড়ার ডিমটি এসে গেল।

ষষ্ঠী দরজা খুলে দিচ্ছে শুনতে পেলুম। তারপর দেখলুম, ঘোড়ার ডিম-টিম নয়–প্রাইভেট গোয়েন্দা কে. কে. হালদারমশাই সহাস্যে ঢুকে গুড মর্নিং জানালেন। তার কাঁধে আজ একটা–প্রায় সিমেন্টের বস্তার সাইজ কাপড়ের ব্যাগ। ধপাস করে সোফায় বসে বললেন, কফি! কফি দরকার! বাপস!

কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে আরেক কাপ কফি আনতে বলে মুচকি হাসলেন, কী ডার্লিং! কী বুঝছ?

বললুম, বুঝছি, আপনার নাকি একটা তৃতীয় চোখ থাকার কথা শোনা যায়, সেটা নিছক গুজব।

-কেন, কেন?

–আপনি বললেন অশ্বডিম্বের আগমন ঘটছে। কিন্তু এলেন আমাদের হালদারমশাই।

গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদার খি খি করে হেসে পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় বললেন, কী কাণ্ড! হ–আমি আইছি, অশ্বডিম্ব আইছে। বড্ড টায়ার্ড। জয়ন্তবাবু, খুইল্যা দ্যাহেন।

বলে প্রকাণ্ড ঝোলাটি দুহাতে তুলে আমার দুই উরুর ওপর স্থাপন করলেন। চমকে উঠে ঝোলা খুলতেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। প্রকাণ্ড সাদা একটা ডিম! অন্তত হাত দেড়েক উঁচু তো বটেই। হালদারমশাই খি খি করে হাসতে থাকলেন। কর্নেলও অট্টহাস্য করলেন। আমি হতবাক। তাজ্জব একেবারে।

ডিমটি শোলার মতো হালকা। হাওয়াঠাসা প্রকাণ্ড ফুটবল বললেও চলে। যদিও এটা ঝকঝকে সাদা এবং নিতান্তই ডিম। কারণ এর গড়ন ডিমের মতো। কর্নেল চোখ নাচিয়ে বললেন, কি ডার্লিং, তাহলে ঘোড়ার ডিম যে সত্যি সত্যিই আছে, হাতেনাতে তার প্রমাণ পেলে তো?

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললুম, কিন্তু এটা হালদারমশাই পেলেন কোথায়?–বলেই নড়ে বসলুম। কৃতান্তবাবুর দিকে ঘুরে দেখি, উনি মিটিমিটি হাসছেন। বললুম, তাহলে কি কাল সন্ধ্যায় যাদুগোপালবাবুর বাড়ি থেকে আপনিই-

আমার কথা কেড়ে কৃতান্তবাবু বললেন, আবার কে? আমিই গঙ্গার দিক থেকে পাঁচিল বেয়ে উঠে বাড়ির ভেতর ঢুকেছিলুম। এই দেখুন, মাটি খোঁড়ার জন্য খুরপি নিয়ে গিয়েছিলুম।

উনি জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে রিভলবার বের করার ভঙ্গিতে একটা হাতুড়ি সাইজ খুরপি বের করে কফি টেবিলে রাখলেন। খুরপিতে একটু-আধটু মাটিও লেগে আছে। বললুম, বুঝলুম। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে যে কোথায় এটা পোঁতা আছে?

খি খি করে অভ্যাসমতো হাসলেন প্রাইভেট গোয়েন্দা কে. কে. হালদার, মশায়! ছত্তিরিশ বৎসর যাবৎ পুলিশে চাকরি করছি। গত সনে রিটায়ার কইর‍্যা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলছি। ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চে কাম করছি নয় বৎসর। তো হইল গিয়া

কথা কেড়ে বিরক্ত হয়ে বললুম, আহা! সে তো সবই জানি। কিন্তু ডিমটা ওখানে পোঁতা আছে, কী করে টের পেলেন?

হালদারমশাই এক চুমুকে কফি সাবাড় করে চাপা স্বরে বললেন, যাদুগোপালবাবুর বাড়ির পেছনে গঙ্গা। গঙ্গার ধারে জঙ্গলে ভর্তি। তো গতকাল সকালে এখান থেকে বেরিয়ে গেলুম যখন, তখন মাথায় ওই একটাই চিন্তা, ঘোড়ার ডিম তো একটা অসম্ভব ব্যাপার। এদিকে যাদুগোপালবাবু এখানে কর্নেলের কাছে কথা বলছেন। এই সুযোগে জিনিসটা দেখে আসি আগে। কিন্তু গিয়ে দেখি গেট বন্ধ। কোনো পুলিশ-টুলিশ কিছু নেই। ডাকাডাকি করলে একটা লোক–মানে ওই জগন ব্যাটাচ্ছেলে, আমাকে ভাগিয়ে দিল। তখন গলিরাস্তায় ঘুরে বাড়ির পেছনে চলে গেলুম। ডাইনে ঘুরে ঝোপজঙ্গলে ঢুকে পড়লুম। তারপর পাঁচিলের কাছে একটা ঝাকড়া গাছে উঠে বসলুম।

কর্নেল ফোড়ন কাটলেন, পুলিশের চাকরিতে গাছে চড়ার ট্রেনিংও নিতে হয়। আসামী ধরতে পাঁচিলও ডিঙোতে হয়।

হয়!-কৃতান্তবাবু উৎসাহে সায় দিলেন, কতবার কত গাছে চড়েছি। কত পেল্লায় পাঁচিল ডিঙিয়েছি!

বিরক্ত হয়ে বললুম, আহা, তারপর কী হল বলুন।

কৃতান্তবাবু খিক করে হেসে বললেন, পাঁচিলের ধারে গাছের ডালে হনুমানের মতো বসে আছি-ডালপালা আর পাতার আড়ালে লুকিয়েই বসে আছি। হঠাৎ দেখি, সেই ব্যাটাচ্ছেলে জলে বাগানের ভেতর দিয়ে এই জিনিসটা চুপিচুপি নিয়ে আসছে। এনে করল কি, ঝোপের ভেতর একটা ছোট্ট শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। গর্ত করে জিনিসটা–মানে এই ডিমটা পুঁতে মাটি ঢাকা দিল। দিয়ে একটু তফাত থেকে ঘাসের চাপড়া এনে বসিয়ে জায়গাটা স্বাভাবিক করে দিল। তারপর চলে গেল। আমি চিন্তায় পড়ে গেলুম। এ তো ভারি রহস্যময় ব্যাপার। কিন্তু এখন যদি ভেতরে ঢুকি, তাহলে ওর নজরে পড়ার চান্স আছে। কী দরকার ঝুঁকি নিয়ে? তাই সন্ধ্যাবেলা এসে ডিমটা চুরি করার মতলব করলুম।

এ পর্যন্ত শুনেই হাসতে হাসতে বললুম, বুঝেছি। কাল সন্ধেবেলা তাহলে আপনিই এটা চুরি করে এনেছেন। কী কাণ্ড!

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, মনে পড়ছে তো জয়ন্ত? হালদারমশাই কিন্তু জগনের ফোন করার আগেই এঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। উনি ডিম চুরি যাওয়ার কথা শুনে যাননি।

জোরগলায় বললুম, কাজেই শেষ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে, আমার থিয়োরি কারেক্ট। পুলিশ ঠিক লোককেই অ্যারেস্ট করেছে। তার মানে জগন নিজে ডিমটা লুকিয়ে ফেলে যাদুগোপালবাবুকে মিথ্যে কথা বলছিল ফোনে। অতএব

কর্নেল ভুরু কুঁচকে মিটিমিটি হেসে বললেন, অতএব?

বললুম, ডিমটার ভেতর কিছু রহস্য আছে।

-তার আগে বলল, তুমি ওটা সত্যি সত্যি ঘোড়ার ডিম বলে মনে করছ কি না?

হাসতে হাসতে বললুম, মোটেও না।

–তাহলে জিনিসটা কী?

ডিম্বাকৃতি হালকা জিনিসটা নাড়াচাড়া করে বললুম, তিনজন বিজ্ঞানী নাকি এটা পরীক্ষা করেছেন। তারাও এর হদিস করতে পারেননি। আমি নিতান্ত এক সাংবাদিক। আমি বড়োলজার ওই তিন বিজ্ঞানীর কাছে সাক্ষাৎকার নেব। নাম ঠিকানা আপনাকে তো যাদুগোপালবাবু দিয়ে গেছেন। কই লিখে দিন আমাকে।

কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে নোটবুক বের করে পাতা উলটে বললেন, লেখো—

ড. বি. এ. অধিকারী, ১৭/২ হরি দত্ত, স্ট্রিট, কলকাতা-৬
ড. এন. কে. খড়াই, ৩৩২/এ, সাউথ অরবিন্দ লেন, কলকাতা-৭৬
ড. আর. পি. শর্মা, ১০১/৩/ই সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, কলকাতা-১২।

ডিমটা এখন কৃতান্তবাবুর হাতে। নোটবইতে নাম-ঠিকানাগুলো টুকে নিয়ে দেখলুম, উনি ডিমটা নাকে ঠেকিয়ে শুঁকছেন। বললেন, কেমন একটা গন্ধ বুঝলেন কর্নেল। কতবার রগড়ে ধুয়েও দুর্গন্ধটা যাচ্ছে না।

কর্নেল এতক্ষণে ওঁর কাছ থেকে ডিমটা নিয়ে শুঁকে বললেন, হঁ অ্যামোনিয়ার সঙ্গে থাইরামাইন জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ মেশালে এইরকম কটু গন্ধ ছড়ায়। ঘোড়া কেন, যে কোনও জন্তুর কাছে ওই দুটো জিনিস মাখিয়ে কিছু রাখলে সে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, নেশাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকলেও হিংস্র হয়ে ওঠে সে। কাছে শব্দ হলেই চমকে ওঠে এবং কামড়াতে আসে। যাই হোক, জয়ন্ত, তুমি ওই তিন বিজ্ঞানীর কাছে আমার এই অভিমতও জানাতে পারো। তাঁরা কী বলেন শোনো।

বলেই হঠাৎ অট্টহাসি হেসে উঠলেন। বললুম, হাসছেন কেন? কর্নেল। হঠাৎ হাসবার কারণ কী?

কর্নেল সমানে হাসতে থাকলেন। কৃতান্তবাবু হাঁ করে আছেন। হঠাৎ আমার সন্দেহ জাগল, কর্নেল ওই রাসায়নিক দ্রব্যের সংক্রমণে প্রাণীর মতোই নেশাগ্রস্ত কিংবা পাগলপ্রায় হিংস্র হয়ে পড়েননি তো?

আমি কাছে যেতে সাহস না পেয়ে ডাকতে থাকলুম, কর্নেল! কর্নেল! প্লিজ! ষষ্ঠীও ভেতরের দরজার পর্দা তুলে তার বাবা-মশাইকে এমন বিকট হাসতে দেখে হাঁ করে দাঁড়িয়ে গেছে।

হাসির চোটে কর্নেলের হাত থেকে প্রকাণ্ড ডিমটি মেঝেয় পড়ে গেল। পড়েই চৌচির। অমনি কর্নেল হাসি থামিয়ে বলে উঠলেন, এই রে! তারপর টুকরোগুলো কুড়োতে ব্যস্ত হলেন।

নাঃ। দিব্যি সুস্থ মানুষ মনে হচ্ছে এখন। টুকরোগুলো কুড়িয়ে হাঁক দিলেন, ষষ্ঠী। এগুলো আমার ল্যাবে রেখে আয় তো বাবা। কাগজে মুড়ে যত্ন করে রাখবি কিন্তু।

কৃতান্ত হালদারমশাইয়ের জোরালো ফোঁস শব্দ কানে এল। বললেন, এমন হাসছিলেন যে আমরা বড্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। কেন হাসছিলেন কর্নেলস্যার?

কর্নেল নিভন্ত চুরুট লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে বললেন, ডিমটা নিছক প্লাস্টিকে তৈরি।

ষষ্ঠীচরণ কাগজে মুড়ে খোলসগুলো নিয়ে গেল। ভেতরে কিছু নেই। ফাপা একটা নিচ্ছিদ্র ডিম্বাকৃতি খোল মাত্র এবং কর্নেল তো বলেই দিলেন, ওটা প্লাস্টিক তৈরি।

এবার কৃতান্তবাবু নড়ে বসলেন। বললেন, হ হ। আমারও হেই ডাউট হইছিল। সাহস কইর‍্যা কইতে পারি নাই। হ–ঠিক কইছেন। প্লাস্টিক। সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, যাদুগোপালবাবুর প্লাস্টিক গুডস তৈরির কারখানা আছে না?

আছে। -কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, যাই হোক, তবু আমিই যে ঠিক বলছি, তারও প্রমাণ নেই–যতক্ষণ না ল্যাবরেটরিতে জিনিসটা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডার্লিং! তুমি বরং তোমার কাজটা আজই সেরে ফ্যালো। ওই তিন বিজ্ঞানীর কাছে গিয়ে ওঁদের মতামত জেনে নাও। দেরি কোরো না। বেরিয়ে পড়ো।

সন্ধ্যা ছ-টা নাগাদ কর্নেলের ফ্ল্যাটে হাজির হলুম, তখন আমি ক্লান্ত, ক্ষুব্ধ। ধপাস করে ওঁর যাদুঘর-সদৃশ ড্রয়িংরুমের ভেতর সোফায় বসে পড়ে সকালের কৃতান্তবাবুর গলায় বললুম, কফি! শুধু কফি!

.

দেখলুম, প্রাইভেট গোয়েন্দা হালদারমশাইও বসে রয়েছেন। মুখটা গম্ভীর। কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে ঝটপট কফির ফরমাশ করে আমার দিকে ঘুরলেন। মুখে মিটিমিটি হাসি। বললেন, খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে।

-হুঁ ভীষণ ক্লান্ত।

এবং ক্ষুব্ধ দেখাচ্ছে।

–হ্যাঁ। আমি ক্ষুব্ধ খামোখা ছুটোছুটি করে

তিন বিজ্ঞানীকে খুঁজে পাওনি। -বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবর সহাস্যে বললেন, পাওনি, কারণ সত্যি সত্যি ও নামে কোনো বিজ্ঞানী নেই।

খাপ্পা হয়ে বললুম, এমনকী ঠিকানাও ভুয়ো।

কর্নেল তার সাদা দাড়িতে আঙুলের চিরুনিতে আঁচড় কাটতে কাটতে বললেন, অবশ্য ব্যারাকপুর থানার সাব-ইস্পেক্টর বারীন মণ্ডল

ওঁর কথার ওপর বললুম, ওই থানাতেও গিয়েছিলুম। বারীনবাবুর ইন্টারভিউ নিয়েছি। উনি জগনের কাছে খবর পেয়ে ব্যাপারটা দেখতে গিয়েছিলেন মাত্র। অফিসিয়াল তদন্তের প্রশ্নই ওঠে না। বললেন, হ্যাঁ–একটা প্রকাণ্ড ডিম দেখেছেন বটে। তবে ঘোড়াটার পেটের তলায় নয়। একটু তফাতে–গ্যারাজের কোনায়, ঘোড়াটার মুখের দিকে।

এবং ঘোড়াটা ঝিমোচ্ছিল।

–হ্যাঁ!

এবং বারীনবাবুর ডিমটার দিকে এগোলে চিঁহি ডাক ডেকে ওঁকে কামড়াতে এসেছিল।

এবার অবাক হয়ে বললুম, তাহলে আপনি তো সবই জানেন দেখছি।

ষষ্ঠী কফি আনল। চুমুক দিলুম। ষষ্ঠী কফিটা দারুণ করে। ক্লান্তি জুড়িয়ে গেল। কর্নেল একটু হেসে বললেন, জানি-মানে, কাল সকালে যাদুগোপালবাবু চলে যাওয়ার পর বিজ্ঞানীত্রয়ের খোঁজে বেরিয়েছিলুম। পাত্তা না পেয়ে ব্যাপাকপুর থানায় গিয়েছিলুম। এসবের জন্যই যাদুগোপালবাবু সঙ্গে যেতে অনুরোধ করা সত্ত্বেও সঙ্গে যাইনি। সন্ধ্যায় যাব বলেছিলুম। ডার্লিং! তুমি তো জানো, আমি আগে ভালো করে চারদিক না দেখেশুনে কোনো কাজে পা বাড়াইনে।

কৃতান্তবাবু বারবার ঘড়ি দেখছিলেন। বললেন, সাড়ে ছটা বেজে গেল। এখনও তো লালবাজার থেকে ডি. সি. ডি. ডি. সায়েব এলেন না।

বললুম, ডি. সি. ডি. ডিমানে গোয়েন্দা দফতরের কর্তা অরিজিৎ লাহিড়ী?

কর্নেল শুধু মাথা দোলালেন।

কৃতান্তবাবু একটু অস্থিরভাবে বললেন, পুলিশের আর সে ডিসিপ্লিন নাই। সব ভাইঙ্গা তছনছ হইয়া পড়ছে। রেগুলারিটি নাই। কিছু নাই। কথা দিয়া, কথা রাখেন না কেউ। আমাগো আমলে কী অবস্থা আছিল কহন যায় না। একবার হইল কি

বাধা পড়ল ওঁর কথায়। কলিংবেল বাজল। অমনি কৃতান্তবাবু নড়েচড়ে এবং হাসিমুখে ঝটপট উঠে দাঁড়ালেন। চাপা গলায় বললেন, সায়েব আইয়া পড়েছেন।

প্রাক্তন ইস্পেক্টর কৃতান্ত হালদার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার সায়েবকে স্যালুট ঠোকার জন্য অ্যাটেনশানভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেখে হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু তার বরাত! লাহিড়ীসায়েবের বদলে যিনি এলেন, তিনি যাদুগোপাল।

মুখে গভীর শোকের ছাপ। কর্নেল আস্তে বললেন, বসুন যাদুগোপালবাবু।

যাদুগোপালবাবু ক্লান্তভাবে বসলেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে ভাঙা গলায় বললেন, জগন যে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবে, কল্পনাও করিনি। দুধ দিয়ে সাপ পুষেছিলুম, কর্নেল!

কৃতান্তবাবু বসে পড়েছেন। মুখটা গম্ভীর। কর্নেল বললেন, আচ্ছা যাদুগোপালবাবু, জগন কেন আপনার দাদাকে খুন করল? এ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

যাদুগোপালবাবু বললেন, একটা সন্দেহ হচ্ছে

–হুঁ, বলুন।

-মায়ের কাছে শুনেছিলুম, বাবা নাকি একবার নিলামে বহু টাকা দামের হিরে মুক্তোর অলংকার কিনেছিলেন। কিন্তু সেগুলো বাবা কোথায় রেখে গেছেন, হদিস পাওয়া যায়নি। এখন। আমার মনে হচ্ছে, দাদার কাছেই সেগুলো লুকোনো ছিল। গত বছর কারবারে প্রচণ্ড লোকসানের শকে দাদার মাথায় গণ্ডগোল দেখা যায়। আমাদের প্লাস্টিক গুডস তৈরির কারখানা আছে। এখন মনে হচ্ছে, দাদা গোপনে একটা প্লাস্টিকের খোল তৈরি করে

কৃতান্তবাবু বলে উঠলেন, ঘোড়ার ডিম বলুন। অশ্বডিম্ব।

যাদুগোপাল একটু বিরক্ত হলেন বোঝা গেল। বললেন, আঃ! কথাটা শুনুন আগে। ওটাই দাদার পাগলামি। জিনিসগুলো ওই ডিমের গড়ন খোলের ভেতর ঢুকিয়ে মুখটা সিল করে দিয়েছিলেন। তারপর পাগলামির ঝোঁকে আমার ঘোড়াটার কাছে রেখে এসেছিলেন। স্রেফ পাগলামি ছাড়া কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। যাই হোক ধূর্ত জগন কীভাবে তা টের পেয়ে জিনিসটা চুরি করে বাগানে পুঁতে রেখে আমাকে কাল সকালে এখানে মিথ্যে ফোন করেছিল।

কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, ঠিক, ঠিক!

যাদুগোপাল শ্বাস ফেলে বললেন, কাল সন্ধ্যোয় ওটা…

আমি বাধা দিয়ে বললুম, কিন্তু হরু ঠাকুর যখন চোর চোর বলে চাঁচায়, তখন তো জগন আমাদের সঙ্গে ছিল।

যাদুগোপালবাবু জোরে মাথা নেড়ে বললেন, না না। ওর কোনো লোককে বলা ছিল। সেই লোকই ওর কথামতো বাগানে ঢুকে জিনিসটা ঠিক জায়গা থেকে তুলে নিয়ে পালায়। জগনকে তো জানেন না। পাড়ায় ওর চ্যালার অভাব নেই।

কর্নেল বললেন, তা সম্ভব বটে।

যাদুগোপালবাবু জোর দিয়ে বললেন, ঠিক তাই। চোর তাড়ানোর ছলে শয়তানটা ওপরে গিয়ে দাদাকে খুন করে। তারপর ভালোমানুষ সেজে গঙ্গার দিকের দরজা খুলে আমাদের কাছে আসে। আমরা তখন বাগানে।

–ঠিক, ঠিক। আপনার কথায় যুক্তি আছে।

এবার যে জন্য আপনার কাছে ছুটে এলুম, বলি। -যাদুগোপালবাবু কান্না জড়ানো স্বরে বললেন, ব্যাটাচ্ছেলে আমার নামে পুলিশকে কিসব বলেছে। পুলিশ আমাকে জেরায় জেরায় জেরবার করে দিচ্ছে। আমিই নাকি ষড়যন্ত্র করেছিলুম দাদাকে খুন করার জন্য। অথচ দেখুন, আপনি আর জয়ন্তবাবু সাক্ষী। দাদাকে আমরা তিনজন জীবিত অবস্থায় বই পড়তে আর কথাবার্তা বলতে শুনেছি।

কর্নেল জোরগলায় বললেন, হ্যাঁ–শুনেছি। আপনি আমাদের সঙ্গেই ছিলেন সারাক্ষণ।

এবারে দয়া করে পুলিশকে সেই কথাটা বলুন, স্যার।

–কাল রাত্রে তো পুলিশকে আমরা বলেছি সেকথা।

-আজ আবার পুলিশ উলটো গাইছে। জগন নাকি কিসব কবুল করেছে। আমাকে যে কোনো সময় পুলিশ অ্যারেস্ট করবে মনে হচ্ছে। তাই আপনার কাছে ছুটে এলুম কর্নেল স্যার! আপনারা আমার সাক্ষী।

আমি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অন্তর্তদন্তের দ্বিতীয় দফা হিসেবে যাদুগোপালবাবুর বক্তব্য নোট করছিলুম। সায় দিয়ে বললুম, আলবাত সাক্ষী আমরা। কিন্তু তিন বি

বিজ্ঞানী টা আর বলা হল না। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, থামো তো তুমি! এই কাগজের লোকগুলো তিলকে তাল করতে ওস্তাদ।

তারপর যাদুগোপালবাবুর দিকে মিঠে গলায় বললেন, একটু বসুন। কৃফি খান। লালবাজার থেকে ডি. সি. ডি. ডি. সায়েব এসে যাবেন। আমরা তাকে বলব-হা, সুস্পষ্ট ভাষায় বলব, আপনার দাদাকে আমরা জীবিত অবস্থায় দেখেছি এবং তখন আপনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। ঘরে পর্যন্ত ঢোকেননি। এমনকী, হরুঠাকুরের চ্যাঁচামেচি শুনে যখন নিচের বাগানে যাই, তখনও আপনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আপনার সঙ্গে আমরা বাগান থেকে ফিরে ফের যখন ওপরে আপনার দাদার ঘরে যাই, তখন ওঁকে নিহত অবস্থায় দেখি। কাজেই আপনাকে খুনি শাব্যস্ত করার কোনো উপায় নেই–পুলিশ যাই বলুক। আপনি কিছু ভাববেন না।

যাদুগোপালবাবু ধাতস্থ হয়ে বসলেন। রুমালে চোখ মুছতে থাকলেন। বললেন, দাদাকে চিরদিন সহোদর বলেই জেনেছি। আমাকে মানুষ করেছেন দাদা। আর তাকে আমি-ওঃ!

কৃতান্তবাবু কী বলতে যাচ্ছিলেন, কলিংবেল বাজাল। কিন্তু এবার আর উঠে দাঁড়ালেন না সেলাম ঠোকার জন্য। মুখটা কেমন বাঁকা।

ডি. সি. ডি. ডি. অরিজিৎ লাহিড়ী ঘরে ঢুকেই বললেন, মাই ওল্ড ম্যান! ইউ আর রাইট–একেবারে কাঁটায় কাঁটায় রাইট। ওটা পাওয়া গেছে। কৃতান্তবাবু এতক্ষণে উঠে খট করে সেলাম ঠুকলেন। অরিজিৎ তার দিকে তাকালেন না।

যাদুগোপালবাবুকে দেখে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? কর্নেল পরিচয় করিয়ে দিলেন। অমনি যাদুগোপালবাবু হাউমাউ করে কেঁদে বলে উঠলেন, এঁরা সাক্ষী স্যার! এঁদের জিজ্ঞেস করুন, আমি

লাহিড়ীসায়েব বললেন, কর্নেল! একবার ফোন করব।

স্বচ্ছন্দে। -কর্নেল কোনার দিকে তুলে রাখা ফোনটা দেখিয়ে দিলেন।

লাহিড়ীসাহেব ফোনে কার সঙ্গে চাপা গলায় কিসব কথাবার্তা বলে সোফায় এসে বসলেন। যাদুগোপালবাবুর পাশেই বসলেন। লাহিড়ীসায়েবের হাতে একটা ব্রিফকেস। নিচু টেবিলটাতে রেখে মৃদু হেসে কর্নেলকে বললেন, মর্গের রিপোর্ট পাওয়া গেছে।

কর্নেল বললেন, কী আছে রিপোর্টে?

লাহিড়ীসায়েব ব্রিফকেস সামান্য খুলে একটা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন। যাদুগোপালবাবু চাপা উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসে বললেন, কী লিখেছে রিপোর্টে, কর্নেলস্যার?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, বলছি। কাল আমি ও জয়ন্ত ঠিক কটা নাগাদ আপনার বাড়ি গিয়েছিলুম, যাদুগোপালবাবু?

যাদুগোপাল হকচকিয়ে বললেন, টাইম তো দেখিনি স্যার। সন্ধ্যাবেলায় গিয়েছিলেন। ঠিক সাড়ে ছটায়। কর্নেল বললেন, গিয়ে দরজার বাইরে থেকে আপনার দাদাকে বই পড়তে দেখলুম। কথাও বললেন

কর্নেলস্যার! তার আগে সিঁড়িতে ওঠার সময় লোডশেডিং হয়েছিল। তখন দাদাকে–অ্যাই জগনা বলে চাঁচাতেও শুনেছিলেন।

কর্নেল নির্বিকার মুখে বললেন, হ্যাঁ আপনার মুখস্থ আছে দেখছি। যাই হোক, মর্গের রিপোর্ট বলছে, আপনার দাদার মৃত্যু হয়েছে বিকেল চারটে থেকে ছ-টার মধ্যে। তার মানে, সাড়ে ছটার পর আমরা যখন প্রাণগোপালবাবুর ঘরের সামনে যাই, তখন উনি মৃত–অন্তত মর্গের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতে। খটকা আমারও লেগেছিল রক্তের চেহারা এবং ছড়িয়ে পড়ার ধরন দেখে। আঁচ করেছিলাম, খুনটা সেই মুহূর্তে হয়নি–বিশেষজ্ঞের রিপোর্টে তা যাচাই হয়ে গেল।

যাদুগোপাল ভাঙা গলায় বললেন, ভুল, ভুল রিপোর্ট। ডাক্তার ঘুষ খেয়েছে জগনার কাছে। দাদা জগনের সঙ্গে কথা বলছে, তাও শুনেছেন। জগন মোমের আলো ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিল। তখন দাদা বললেন, ঠিক আছে। তুই যা। তারপর জগন আপনাদের কথা বলল। তখন দাদা

বাধা দিয়ে কর্নেল লাহিড়ীসায়েবের দিকে একটা চোখ রেখে বললেন, যাদুগোপালবাবু, টেপরেকর্ডার নামে একটা যন্ত্র আছে, জানেন তো?

যাদুগোপালবাবু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই কৃতান্তবাবু তাকে টেনে বসিয়ে দিলেন। আর সেই মুহূর্তে লাহিড়ীসায়েব একটি ছোট্ট টেপরেকর্ডার বের করলেন ব্রিফকেস থেকে। যন্ত্রটায় ধুলো-কাদা মাখা। লাহিড়ীসায়েব একটু হেসে কর্নেলকে বললেন, আপনি গ্যারাজে ঘোড়ার জাবনা খাওয়া পাত্রের তলায় খুঁজতে বলেছিলেন। ঠিক সেখানেই পাওয়া গেছে। তবে মেঝেয় পোঁতা ছিল।

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ–ওটাই সম্ভাব্য জায়গা বলে মনে হয়েছিল।

লাহিড়ীসায়েব টেপটা চালিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে খ্যানখেনে গলায়–গতকাল সন্ধ্যায়। শোনা সেই চ্যাঁচামেচি শোনা গেল : অ্যাই জগনা!…তার আন্দাজ দুমিনিট পরে : ঠিক আছে, তুই যা। …আমার সময় নেই। যেতে বল। ..এখন না। এখন না। পরে আসতে বল। আমি ব্যস্ত।

টেপ বন্ধ করে দিলেন লাহিড়ীসায়েব। কর্নেল বললেন, আমাকে নিজের নির্দোষিতার সাক্ষী রাখতে চেয়েছিলেন যাদুগোপালবাবু। এই বিকৃত স্বরে কথাবার্তা ওঁরই। দারুণ হত্যা পরিকল্পনা! জগন ওঁর সহকারী হয়েছিল টাকার লোভে।

লাহিড়ীসায়েব বললেন, জগন সব কবুল করেছে। হিরে-মুক্তোর ব্যাপারটা সত্যি। তাই নিয়েই দুই ভাইয়ে ইদানীং ঝগড়াঝাটি চলছিল।

কর্নেল বললেন, জগনকেও সন্দেহ করা যেত না। অ্যারেস্ট করার কারণ খুঁজে পেত না পুলিশ। কারণ সে আমাদের সঙ্গে থাকত। কিন্তু আমাদের হালদারমশাই নাক গলাতে গিয়ে গণ্ডগোল করে। ফেলেছিলেন। উনি অশ্বডিম্ব চুরি না করতে গেলে জগন অমন করে দৌড়ে যেত না। কিছুক্ষণের জন্য সে আমাদের সঙ্গছাড়া হয়েছিল। তাই তার ওপর সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। নইলে পুলিশ বাইরের অজ্ঞাত পরিচয় খুনির পেছনে হন্যে হত। ঘোড়ার ডিম খুঁজে বেড়াত। -কর্নেল হাসতে থাকলেন।

বললুম, কিন্তু দ্বিতীয়বার গিয়ে প্রাণগোপালবাবুকে উপুড় হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।

কর্নেল বললেন, নিচে চোর চোর চ্যাঁচামেচি শুনে জগন, ঘর থেকে দৌড়ে বেরুনোর সময় বুদ্ধি করে আগেই মৃত প্রাণগোপালকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। ভুলে যেয়ো না, তখন চোর চোর শুনে আমাদের চোখ অন্যদিকে ঘুরে গেছে। সেই সুযোগ সে নিয়েছে। এমনকী লোডশেডিংও সাজানো ব্যাপার। কারণ আমার চোখ এড়ায়নি, পাড়ায় আলো ছিল। শুধু ওই বাড়িটাই অন্ধকার হয়ে গেল। জগনই সিঁড়ির মাথায় দ্বিতীয় একটা মেইন সুইচ অফ করে দিয়েছিল। দ্বিতীয়বার গঙ্গার ঘাটের দরজা বন্ধ করার অছিলায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার মানেই হল আমাদের অসাক্ষাতে যেন সে আবার মেইন সুইচ অন করে দেয়। করেও ছিল তাই।

লাহিড়ীসায়েব হাসলেন, কারেক্ট। নিচেই মেন সুইচ থাকে। কিন্তু আমাদের এক অফিসারের চোখে পড়ে, দ্বিতীয় একটা মেইন সুইচ সিঁড়ির মাথায় ডানদিকের দেয়ালে বসানো হয়েছে। সেটা আনকোরা নতুন।

কর্নেল বললেন, যাদুগোপালবাবুই দ্বিতীয়বার তাঁর দাদার ঘরে যাবার জন্য তাগিদ দেন মনে পড়ছে, জয়ন্ত? কারণ, এবার তাকে দেখাতে হবে, প্রাণগোপালবাবু নিহত হয়েছেন!

কৃতান্তবাবু মুখ খুললেন এতক্ষণে, কিন্তু অশ্বডিম্বটার ব্যাপার বুঝলুম না!

কর্নেল বললেন, খুব প্রাঞ্জল। আমি রহস্যটহস্যের গন্ধ পেলে ছুটে যাই-যাদুগোপালবাবু বিলক্ষণ জানেন। তাই প্লাস্টিক কারখানার আজগুবি অশ্বডিম্ব বানিয়ে পুলিশ অফিসার বারীন মণ্ডলকেও সেটা দেখিয়ে সাক্ষী রেখেছিলেন–সত্যি যেন ডিম্ব প্রসব করেছে তার ঘোড়া। তারপর আমার পক্ষে অশ্বডিম্বের প্লাস্টিক বডি টের পেতে দেরি হবে না ভেবে সেটা জগনকে বলে এসেছিলেন লুকিয়ে ফেলতে। ওটা আমাকে নিয়ে যাওয়ার একটা অছিলা। তাছাড়া পুলিশ এই খুনের সঙ্গে অশ্বডিম্ব রহস্য জড়িয়ে ধাঁধায় পড়ুক এই ছিল ওঁর উদ্দেশ্য। যাই হোক, সিঁড়িতে বুটের শব্দ শোনা যাচ্ছে, অরিজিৎ, তোমার বাহিনী আসছে।

যাদুগোপালবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলুম, খড়ের কাকতাড়ুয়া হয়ে বসে আছেন। ..

Facebook Comment

You May Also Like