মুরারিবাবুর মোটরগাড়ি – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

মুরারিবাবুর মোটরগাড়ি - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

মুরারিবাবুর গাড়ি কেনার পিছনে একটা জব্বর না হলেও ছোটখাট কারণ ছিল। আজকাল বাসে-ট্রামে ওঠা বড় সহজ কথা নয়। মুরারিবাবুর মতো বয়স্ক লোকের পক্ষে তো নয়ই।

সেদিন কসবা যাবেন মাসতুতো এক দাদার নাতির অন্নপ্রাশনে। নিউ মার্কেট থেকে কয়েকটা খেলনা কিনে এনেছেন। তার মধ্যে আছে একটা রঙিন ইয়া মোটা বল। ফুটবলেরই সাইজ প্রায়। পাতলা রবারের তৈরি। সেই বলটা মাঝে-মাঝে মাথার ওপর তুলে খোকা-খুকুরা যেমন করে তাকিয়ে দেখে, তেমনি করে দেখতে-দেখতে এসেছেন। হেসেছেন প্রচুর। খোকনের খুব পছন্দ হবে এটা। আহা, দোলনার মাথার ওপর এমন রাঙা বল ঝুলিয়ে রাখলে তিনি এখনই থোকা হতে রাজি আছেন।

হায় রে সেকাল! ছ্যা, ছ্যা, তখন এমন সব ছেলেভুলানো সেরা জিনিস ছিল কোথায়? মুরারিবাবু যে-আমলে খোকা, তখন তাঁর মাথার ওপর বড়জোর রঙিন কাগজের ফুল ঝুলিয়ে দেওয়া হতো।

আর কিছু না, কাগজের ফুল! কোনও মানে হয়? খোকা-মুরারিবাৰু দৈবাৎ খুদে হাত বাড়িয়ে ওটা ছিঁড়ে নিতে পারতেন কত সহজে। এবং সঙ্গে সঙ্গে মুখে পুরে দিতেন নিশ্চয়। তার ফলটা মারাত্মক হতো না? গলায় লেগে দম আটকে ওই বয়সেই মারা পড়তেন। রাস্তার ভিড়ের মধ্যেই তিনি আঁতকে উঠলেন।

এই সুন্দর পৃথিবীর কত কিছু সেরা জিনিস দেখার সুযোগ পেতেন না, যদি ওভাবে দৈবাৎ মারা পড়তেন। তাই মানুষ বুদ্ধি করে এমন রঙিন হালকা বল বানিয়েছে মুরারিবাবুর মোটরগাড়িচ খোকা-খুকুদের জন্যে। এ তো গেলা যাবে না। কোনও রিস্ক নেই। তোফা! আজকাল মানুষের কত বুদ্ধি!

বিগলিত এবং আনন্দিত মুরারিবাবুর সামনে এই সময় এসে পড়ল একটা বাস। ভিড় ছিল, নাকি ছিল না, অত লক্ষ না করে যেই চাপতে গেছেন, হুড়মুড় করে লোকেরা নেমে এল কিংবা চাপতে গেল, মুরারিবাবু ছিটকে পড়ে রাস্তায় চিৎপাত হলেন এবং হায়, হায়, সেই সুন্দর রঙিন বলের ওপর প্রকাণ্ড একটা উঁড়িওলা লোকও মুরারিবাবুর মতো রোগাপটকা লোকের ধাক্কায় সশব্দে পড়ল। ব্যস!

পট-পট-পটাৎ! কিংবা ফটফটফটাস! এই রকম একটা শব্দ হল। তারপর মুরারিবাবু মাথা তুলে দেখলেন, বাসটা চলে গেছে এবং তার মাথার দুহাত দূরে পড়ে আছে কয়েক টুকরো রঙিন রবারের ছিবড়ে!

আর্তনাদ করতে গিয়ে করলেন না। শান্ত-মাথায় উঠে জামার ধুলো ঝাড়লেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন আর কখনও বাসে-ট্রামে চাপবেন না।

সেদিন সন্ধ্যায় আর সেই অন্নপ্রাশনের নেমন্তনে গেলেন না। ভাগ্নে বীরুকে পাঠিয়ে দিলেন। খোকার জন্যে কেনা বাকি খেলনাগুলো তো পৌঁছে দেওয়া দরকার।

মুরারিবাবুর গাড়ি কেনার কারণ হল এই।…

হ্যাঁ, মুরারিবাবু ঝোঁকের মাথায় তারপর একটা মোটরগাড়িই কিনে ফেললেন। মল্লিকবাজারে পুরোনো মোটরগাড়ি কেনা-বেচার দালালি করেন ভোঁদা মিত্তির। মুরারিবাবুর সহপাঠী ছিলেন কলেজজীবনে। পুরোনোমোটর পার্টসের একটা দোকানও আছে ভেঁদা মিত্তিরের। তিনিই পরামর্শ দিয়েছিলেন, নতুন গাড়ি কেনার অনেক হাঙ্গামা আজকাল। পারমিটের জন্য লাইন দিয়ে হাপিত্যেস করতে হয়। তুমি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনো। দামও কম পড়বে। পারমিটেরও হাঙ্গামা হবে না।

যে গাড়িটা কিনলেন, সেটা একটা ল্যান্ডমাস্টার, বেশ জব্বর গাড়ি। ড্রাইভার রাখতে হল। তার নাম ছিল মুকুন্দলাল। খুব পাকা ড্রাইভার।

মুরারিবাবু দিনকতক ভাগ্নে বীরু আর রাঁধুনি জটিলকে নিয়ে হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে জি. টি. রোড, কখনও বোম্বে রোড হয়ে ঘোরাঘুরি করতে থাকলেন। মুকুন্দ অবাক হয়ে ভাবল, বাবুর কি মাথা খারাপ? আপিস নেই, ব্যবসাপাতি নেই অথচ খামোকা তেল খরচ করে সেই বর্ধমান, নয়তো ওদিকে কোলাঘাট অবধি ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছেন।

কখনও মুরারিবাবু পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীদেরও হাওয়া খেতে নিয়ে যেতেন। প্রতিবেশীরা আর তার আড়ালে নিন্দামন্দ করতেন না। প্রায়ই মুরারিবাবুকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াচ্ছিলেন। মুরারিবাবুর পাড়াজুড়েও সুনাম। এরপর ক্রমশ পাড়ায় যখন যার গাড়ি দরকার, মুরারিবাবুর কাছে এসে ধরনা দিয়েছে।

কিন্তু পেট্রোলের যা দাম আজকাল! কাহাতক আর এ উপকার করা যায়? মুরারিবাবু শেষটায় খুব ব্রিবত বোধ করছিলেন। ড্রাইভারের মাইনে আর তেলের খরচে ব্যাঙ্কে জমানো টাকাকড়ি ফুরিয়ে ফতুর হয়ে যাবেন যে!

তখন একদিন ভাগ্নে বীরু আর রাঁধুনি জটিলকে নিয়ে পরামর্শ করতে বসলেন। বীরু বলল,–এক কাজ করুন মামা। আমি নিজেই ড্রাইভিং শিখে নিই। তাহলে খামোকা মুকুন্দকে আর রাখার দরকার হবে না। আমিই আপনার ড্রাইভার হব।

মুরারিবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, তুই গাড়ি চালাবি? রক্ষে কর বাবা! কবে কোথায় অ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়ে…আঁতকে উঠে কথা বন্ধ করে তিনি আধমিনিট চোখ বুজে বসে সম্ভবত দুর্গানাম জপ করে নিলেন।

জটিল বলল, বরং এক কাজ করুন বাবুমশাই! আপনিই নিজে গাড়ি চালানো শিখুন। আপনি বিচক্ষণ মানুষ। ঠান্ডা মাথা। আপনি নিজে গাড়ি চালানো শিখলে

কোনও বিপদের ভয় থাকবে না।

পরামশটা মনঃপূত হল মুরারিবাবুর। বীরু বিরসমুখে চলে গেল নিজের ঘরে। মুরারিবাবু ভাবলেন, ঠিকই তো। বীরু ছেলেমানুষ। গোঁয়ার্তুমি করাটা ওর পক্ষে স্বাভাবিক। তার চেয়ে আমি প্রবীণ মানুষ। আমি হুঁশিয়ার হয়ে গাড়ি চালাতে পারব।

মুরারিবাবু মুকুলের কাছে গাড়ি চালানো শিখতে শুরু করলেন। মুকুন্দ টের পাচ্ছিল, এবার তার চাকরি যাবে। তা যাক। ড্রাইভারের চাকরি পেতে অসুবিধে নেই। তাছাড়া এই বাবুমশাইটি যা খামখেয়ালি! রোজ খামোকা বর্ধমান-কোলাঘাট করে তাকে নাকাল করে ছাড়ছেন। এবার নিজে গাড়ি চালানো শিখে বুঝবেন ঠ্যালাটা। মুকুন্দ নেহাত লজ্জায় চাকরি ছেড়ে যেতে পারছিল না।

রোজ ভোরবেলা গড়ের মাঠে গিয়ে চালানোর তালিম নিতে থাকলেন মুরারিবাবু।

মাস তিনেক পরে রাস্তায় ভিড়েও মুরারিবাবু গাড়ি চালাতে চেষ্টা করেন। তাঁর পাশ ঘেঁষে বসে থাকে মুকুন্দ। দরকার বুঝলে সে হাত লাগাবে।

এই করে শেষপর্যন্ত মুরারিবাবু দিব্যি গাড়ি চালানো শিখে নিলেন। লাইসেন্সও জোগাড় করে ফেললেন। তার ক্রিমরঙের ল্যান্ডমাস্টারের সামনে ইংরেজি হরফে লাল রঙের এল অর্থাৎ নতুন লাইসেন্স মার্কা ঝুলিয়ে পাইকপাড়া থেকে কক্সবা, কসবা থেকে ক্যানিং করে ঘুরে বেড়ালেন।

তারপর যথারীতি মুকুন্দকে জবাব দিলেন। এবার থেকে একা গাড়ি চালাতে আর কোনও অসুবিধে হল না।

কিন্তু তাঁর বিচক্ষণ ড্রাইভিং-হাত হলে হবে কী? ওই যেসব কল্পিত যমের মতো প্রকাণ্ড লরিগুলো হরদম আনাগোনা করছে রাস্তায়! তাদের সঙ্গে টক্কর বাঁচিয়ে চলা কি সহজ কাজ?

একদিন বাধল টক্কর। হাওড়া ব্রিজের মুখে একটা লরি পেছন থেকে মুরারিবাবুর গাড়িকে ধাক্কা মারল। গাড়ি গিয়ে থামে লাগল। ইঞ্জিন প্রায় হাড়গোড় ভেঙে অক্কা পেল।

কিন্তু মুরারিবাবুর বরাত। ব্রেক কষেছিলেন সঙ্গেসঙ্গে, কিংবা লরির ড্রাইভারই ব্রেক কষেছিল, অল্পের জন্য মুরারিবাবু রক্ষা পেলেন। কাঁচের টুকরোয় কপাল ও কান কেটে গেল। স্টিয়ারিং-এর ধাক্কা বুকে লাগলেও আশ্চর্য, মুরারিবাবুর ফুসফুস আর কলজের জোর আছে বলতে হয়, খুব একটা জখম হলেন না। হাসপাতালে ফাস্ট এড দিয়েই ছেড়ে দিলেন ডাক্তার! খবর পেয়ে বীরু ছুটে গিয়েছিল। রিকশো চাপিয়ে মামাকে বাড়ি নিয়ে এল।

সবাই ভেবেছিল, মুরারিবাবু আর গাড়ির কাছ মাড়াবেন না। কিন্তু কোথায় কী? একবার অ্যাকসিডেন্ট ঘটে তাঁর সাহস বরং বেড়ে গেল বুঝি। আরে বাবা, গাড়ি থাকলেই অ্যাকসিডেন্ট হয়। বড় থাকলে যেমন মাথা থাকে। তেমনি।

ভোঁদা মিত্তিরের একটা গ্যারেজও ছিল। ল্যান্ডমাস্টারটা সারাতে গেলে ভোঁদাবাবু বললেন,–শোনো মুরারি, তোমার এই গাড়ির যা অবস্থা হয়েছে, অনেক খরচ পড়ে যাবে। বরং এটা যা হোক দামে ঝেড়ে দাও। তোমাকে আমি আরও সস্তায় এর চেয়ে মজবুত এবং হালকা একটা গাড়ি দিচ্ছি। গাড়িটা পুরোনো মডেলের। আকারেও ছোট। ছোট বলেই সুবিধে। ফঁক গলিয়ে নিয়ে যাওয়া সোজা হবে। গলিটলিতেও ঢোকা যাবে।

মুরারিবাবু ভেবেচিন্তে রাজি হলেন।

গাড়িটা কালো রঙের একটা পুরোনো মডেলের ফোর্ড। পাদানি আছে। তেলখরচ কমে। লম্বা-চওড়ায় যা আকার, খেলনা গাড়ি বলে মনে হবে।

তা হোক। অত প্রকাণ্ড ল্যান্ডমাস্টারের চেয়ে এই জিনিসই ভালো। যেমন পক্ষী, তেমন বাস্য।

মুরারিবাবু আরও খুশি হলেন ভেঁদা মিত্তির মাত্র সাড়ে তিনহাজার টাকায় গাড়িটা বেচতে চান শুনে।

গাড়িটা গ্যারেজের কোণার দিকে রাখা ছিল। ঝুল জমেছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। গ্যারেজের মিস্ত্রিরা ঝেড়ে-ছে চকচকে করে দিল। মুরারিবাবু স্টার্ট দিয়েও দেখে নিলেন. হ্যাঁ, এ যেন বাঘের বাচ্চা। চাপা গরগর আওয়াজ তুলে গুলতির মতো ছুটতে চায়।

মুরারিবাবু গ্যারেজের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সস্নেহে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মিস্ত্রিরা আবার একদফা কলকবজা পরীক্ষা করছে, এমন সময় কালিঝুলি মাখা প্যান্টশার্ট পরা অন্য একজন মিস্ত্রি তাঁর কাছে এল।

সে চাপা গলায় বলল,-বাবু কি ওই গাড়িটা তাহলে কিনছেন?

কিনছি মানে? মুরারিবাবু অবাক হয়ে বললেন। কিনে ফেলেছি। কেন বলো তো?

–বাবু, গাড়িটার সব ভালো। কিন্তু একটা দোষ আছে।

–দোষ! কী দোষ?

–মাঝে-মাঝে গাড়িটার মাথায় যেন ভূত চাপে।

মুরারিবাবু চমকে উঠে বললেন, ভূত চাপে? তার মানে?

সে ফিসফিস করে বলল,–মাঝে-মাঝে দেখেছি, রাতের বেলা গাড়িটা গ্যারেজে থাকে না। চুপিচুপি বেরিয়ে যায়। তারপর ভোরবেলা ফিরে আসে। আমি এই ঘরটায় থাকি না। ঘুম-টুম বিশেষ হয় না আমার। তাই গরগর চাপা আওয়াজ এলেই সব টের পাই!

মুরারিবাবু সন্দিগ্ধ স্বরে বললেন,-বলো কী? তাহলে নিশ্চয় কেউ চালিয়ে নিয়ে কোনও কাজে বেরিয়ে যায়।

না বাবু। তা নয়। বলে মিস্ত্রি জোরে মাথা নাড়ল।

মুরারিবাবু বললেন,–অসম্ভব। নিশ্চয়ই কেউ নিয়ে যায়। আজকাল গাড়ি চুরি করে ডাকাতরা ডাকাতি করতে যায়। তেমনি কোনও ব্যাপার দেখে থাকবে। এক্ষেত্রে ডাকাতরা গাড়িটা ফেরত দিয়ে যায়, এই যা।

মিস্ত্রি বলল, না বাবু। গেট তো তালাবন্ধ থাকে। তা ছাড়া, আমি স্বচক্ষে দেখেছি, গাড়িতে ড্রাইভার থাকে না। আর গেটটাও আপনা-আপনি খুলে যায়। গাড়িটা চলে গেলে আবার গেট যেমন ছিল তেমনি বন্ধ।

মুরারিবাবু এবার হো-হো করে হেসে উঠলেন। এই মিস্ত্রিটার নিশ্চয় রাগ আছে মালিক ভোঁদা মিত্তিরের ওপর। হয়তো মাইনেকড়ি বেশি চায়।

কিংবা, নির্ঘাত আফিম বা গাঁজা খায়। নেশার ঘোরে ওই আজগুবি ব্যাপার দেখে।

মিস্ত্রি বলল,-হাসছেন বাবু? পরে কিন্তু কাঁদতে হবে। যাই হোক, মিত্তিরবাবুকে দয়া করে বলবেন না। আপনার ভালোর জন্য বললাম।

তার করুণ মুখ দেখে অগত্যা মুরারিবাবু ঠিক করলেন, কথাটা বলবেন না ভোঁদাবাবুকে। মিস্ত্রিটা নিশ্চয় গরিব। চাকরি খেয়ে লাভ কি? নেশার ঘোরে যা দেখেছে, সরল মনে বলতে এসেছে।

কিছুক্ষণ পরে মুরারিবাবু গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। চমৎকার গাড়ি। মাঝে মাঝে এর মাথায় ভূত চাপার কোনও লক্ষণই দেখলেন না।

নিচের তলায় একটা গ্যারেজ বানিয়ে দিয়েছিলেন বাড়িওলা। সেই গ্যারেজে গাড়িটা ঢুকিয়ে তালা আটকালেন। সন্ধে হয়ে এসেছে। এখন আর কোথাও বেরিয়ে লাভ নেই। সকাল হোক, তখন বেরুবেন। কল্যাণী অবধি ঘুরে আসা যাবে। বেশ গরম পড়েছে শহরে। তার ওপর ভিড়। কল্যাণীর মাঠে গিয়ে হাওয়া খেয়ে আসবেন। নিরিবিলি কোথাও একটু বসবেন। ভাবতেও খুশিতে রোমাঞ্চ জাগছিল।

সেই খুশিতে চোখে আর ঘুমই আসে না সে রাতে।

পুবের ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নিচের উঠানমতো জায়গায় একপাশে গ্যারেজটা দেখা যায়। সিঁড়ির মাথায় বালটা মোটে চল্লিশ ওয়াটের। আলো সামান্যই। তেরচা হয়ে একটুখানি আবছা আলো গ্যারেজের কিনারা অবধি পৌঁছয়। মাঝে-মাঝে ব্যালকনি থেকে তিনি নিচের গ্যারেজটা দেখছিলেন।

কখন সকাল হবে, সেই প্রতীক্ষায় অস্থির। ঘুম আসতেই চায় না।

রাত বারোটা নাগাদ বিছানায় গড়িয়ে সবে চোখ বুজেছেন, হঠাৎ মনে হল, নিচে চাপা গরগর শব্দ হচ্ছে। তখন চোখ খুলে কান পাতলেন মুরারিবাবু।

ভাবলেন, রাস্তায় কোনও গাড়ি যাচ্ছে, তারই শব্দ।

কিন্তু শব্দটা তো দূরে সরে যাচ্ছে না।

তারপর ক্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁচ এবং ঘটঘট্টাং…গেট জোরে আচমকা খুললে যেমন শব্দ হয়।

তখন বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠলেন মুরারিবাবু। গাড়িচোর নয় তো? তক্ষুনি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন।

উঁকি মেরেই অবাক হলেন মুরারিবাবু।

গ্যারেজের গেট খুলে গেছে এবং তাঁর গাড়িটা বেরিয়ে উঠোনে এগিয়েছে এবং পিছিয়ে যাচ্ছে বাড়ির বড় গেটের দিকে। তারপর বড় গেটটা খুলে গেল। ঘট ঘট্টাং…ঘং ঘং ঘং…

গাড়ি সেখানে যাওয়ার পর মুরারিবাবুর মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরুল। হেঁড়ে গলায় প্রচণ্ড চেঁচিয়ে উঠলেন,–চোর! চোর! চোর!

দেখতে-দেখতে হুলুস্থুল-হইচই শুরু হয়ে গেছে। বীরু আর জটিল দৌড়ে এসেছে এবং কিছু না বুঝেও মুরারিবাবুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে চ্যাঁচিতে শুরু করেছে,–চোর! চোর! চোর!

মুরারিবাবু ততক্ষণে টের পেয়েছেন, শুধু চোর বলাটা ঠিক হচ্ছে না। অমনি চ্যাঁচিতে থাকলেন,–গাড়িচোর! গাড়িচোর! গাড়িচোর!

জটিল শুনল বাড়িচোর। সে বাজখাঁই আওয়াজে পাড়া মাথায় করে চ্যাঁচিতে শুরু করল, বাড়িচোর! বাড়ি চুরি করে পালাচ্ছে।

প্রতিবেশীরাও ঘুম ভেঙে যে যার ঘর থেকে চিৎকার জুড়ে দিয়েছেন। জটিলের চিৎকার জোরে শোনা যাচ্ছে এবং বাড়িচোর শুনে তারাও বলছেন,-বাড়িচোর! বাড়ি চুরি করে পালাচ্ছে-এ-এ-এ!

আশেপাশের বাড়ি এবং ক্রমে সারা পাড়া থেকে লোকেরা বেরিয়ে পড়ল। লাঠিসোটা কাটারি বঁটি কয়লা ভাঙা হাতুড়ি–যে যা পেরেছে নিয়ে বেরিয়েছে। একজনের হাতে ক্রিকেট ব্যাটও দেখা গেল।

ততক্ষণে সাহস পেয়ে মুরারিবাবু নিচে নেমেছেন। হ্যাঁ, বড় গেট বন্ধ। গ্যারেজের গেটও বন্ধ। তালাও আটকানো আছে। আর গাড়ি?

কী মুশকিল। গাড়িটাও তো আছে। বহাল তবিয়তে আছে। যেমন রেখেছিলেন, তেমনি।

তাহলে কী দেখলেন তখন? স্বপ্ন?

অসম্ভব। মুরারিবাবু দিব্যি জেগে ছিলেন এবং ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

গতিক বুঝে চেপে গেলেন মুরারিবাবু।

সবার প্রশ্নের জবাবে বললেন,–হ্যাঁ, চোর ঢুকেছিল গেট ডিঙিয়ে। ভাগ্যিস আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিলাম। তাই ব্যাটা পালাল।

সবাই চোরের কথা আলোচনা করতে করতে যে যার বাড়িতে ফিরে গেল। সত্যি, পাড়ায় আজকাল মাঝে-মাঝে চুরি তো হচ্ছে।

মুরারিবাবু কিন্তু ব্যাপারটার মাথামুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছেন না। নিজের চোখকে অবিশ্বাস করবেন কেমন করে?

ভাবতে-ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কখন। ঘুম ভাঙল ভোরের দিকে। টেবিলল্যাম্প জ্বেলে অভ্যাসমতো ঘড়ি দেখে নিলেন। চারটে কুড়ি বেজেছে। ঠিক পাঁচটায় বিছানা ছেড়ে ওঠা ইদানীং অভ্যেস। আর চল্লিশটে মিনিট চোখ বুজে কাটাবেন ভাবলেন।

কিন্তু সেই সময় আবার নিচে গরগর শব্দ।

গেট খোলার ক্যাঁ…অ্যাঁ…চ! ঘট…ঘট…ঘটাং! ঘঙ ঘঙ!

লাফিয়ে উঠে ব্যালকনিতে গেলেন মুরারিবাবু। তারপর সবিস্ময়ে দেখলেন, বড় গেট আপনা-আপনি খুলেছিল, সদ্য বন্ধ হচ্ছে এবং তার কালো খুদে ফোর্ড গাড়িটা পিছু হটে গ্যারেজে ঢুকছে। গ্যারেজের গেটও খুলে রয়েছে। গাড়িটা পিছু হটে ভেতরে ঢুকতেই গেট আবার সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি, না সত্যি জেগে আছি? মুরারিবাবু এই ভেবে নিজের চুল টানলেন। না, দিব্যি ব্যথা করছে।

তারপর কান টেনে দেখলেন, হুঁ, কানও ব্যথা করছে।

নিজেকে কাতুকুতু দিলেন। কাতুকুতু এমন জিনিস, না হেসে পার নেই। তাই খিকখিক করে হেসে উঠলেন।

তারপর গম্ভীর হলেন। হাসির কথা নয়। নির্ঘাত তার কোনও গুরুতর অসুখ বিসুখ হয়েছে। মানসিক ব্যাধি যাকে বলে। কোনও সাইক্রিয়াট্রিস্ট বা মনোচিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার। হ্যাঁলুখিনেশান বা ভ্রমদর্শন নামে একরকম উল্কট ব্যাধি আছে নাকি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে মানুষ বিস্তর ভুলভাল দেখতে পায়।

অস্বস্তিতে আড়ষ্ট হয়ে উঠলেন মুরারিবাবু।

কিন্তু সকালের উজ্জ্বল আলোয় সেই অস্বস্তিটা নিমেষে চলে গেছে মুরারিবাবুর। রাতের ভুতুড়ে ব্যাপারটা দিনের আলোয় স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছে। স্বপ্নটা বেয়াড়া, এই যা। ডাক্তার-টাতার দেখাতে গেলেই আজকাল হাঙ্গামা। কাড়ি কাড়ি ওষুধ গিলতে হবে। হয়তো বলবেন, হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে মুরারিবাবু!

তাও সাধারণ হাসপাতাল হলে কথা ছিল। মানসিক হাসপাতাল যে কী সাংঘাতিক, তা কি তিনি জানেন না? ওরে বাবা, সেখানে যত রাজ্যের পাগল থাকে।

মুরারি ব্রেকফাস্ট খেয়ে গ্যারেজে গেলেন। বীরু ও জটিলকে বলে গেলেন, কল্যাণী যাচ্ছি। কল্যাণীতে রাধাকান্তর বাড়িও একবার যেতে পারি। বুঝলি বীরু? অনেকদিন দেখা হয়নি ওর সঙ্গে। যদি দেখিস, সন্ধ্যা নাগাদ ফিরলাম না, তোরা জানবি রাত্তিরে রাধাকান্তর ওখানেই আছি।

গ্যারেজে কালো গাড়িটার মধ্যে এতটুকু ভৌতিক ব্যাপার নেই। খাঁটি একটি মোটরগাড়ি বলতে যা বোঝায়, তাই!

দিব্যি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল। মানে–মুরারিবাবুই চালাচ্ছেন। নিজে থেকে চলবে কোন আক্কেলে? ও তো যন্ত্র মাত্র। যেদিকে চালানো যাবে চলবে। দাঁড় করালে দাঁড়াবে। মানুষের হাতে তার যত জারিজুরি। মানুষ নইলে সে একেবারে অচল জড়বস্তু মাত্র।

মুরারিবাবু মনের সুখে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

কল্যাণী পৌঁছতে ঘণ্টা দেড়েকও লাগল না।

প্রথমে কিছুক্ষণ বিশাল এলাকায় অজস্র রাস্তা দিয়ে চক্কর মেরে বেড়ালেন। কখনও কোনও গাছতলায় থেমে উদাসমনে দিগন্ত দেখতে থাকলেন। গুনগুন করে গান গাইতেও ছাড়লেন না।

দুপুর নাগাদ খিদে পেলে তখন রাধাকান্তবাবুর বাড়ি চললেন।

বাড়িটা তার চেনা। পিছনে ফাঁকা বিশাল মাঠের ওপাশে গঙ্গা! একটেরে ভারি সুন্দর জায়গায় বাড়ি করেছেন রাধাকান্তবাবু। মুরারিবাবুর অফিসের সহকর্মী ছিলেন ভদ্রলোক। একই সঙ্গে অবসর নিয়েছেন চাকরি থেকে। গোলমাল হইচই পছন্দ করেন না বলে এবং কম দামে জমি পেয়ে এতদূরে বাড়ি করেছেন।

দুই বন্ধুতে প্রচুর সুখদুঃখের কথা হল। আহারাদিও হল ভালোরকমের। তারপর বিকেলে গাড়ি চাপিয়ে রাধাকান্তবাবু এবং তার বাড়ির সবাইকে সারা এলাকা ঘোরালেন।

রাধাকান্তাবাবু তাঁকে রাতে থেকে যেতে বলবেন, সে তো জানা। কিন্তু মুরারিবাবু খেয়ালি এবং গোধরা মানুষ বরাবর।

হঠাৎ মাথায় ঝোঁক চেপে গেল, কলকাতা ফিরবেন।

তখন সন্ধে হয়ে আসছে। সাড়ে ছটা বাজে। রাধাকান্তবাবু পথে ডাকাতের ভয় দেখিয়েও কাবু করতে পারলেন না মুরারিবাবুকে।

মুরারিবাবু বেরিয়ে পড়লেন।

কাঁচরাপাড়া পৌঁছতে বড়জোর আধঘণ্টা লাগার কথা। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলেন, সম্ভবত রাস্তা ভুল করে ফেলেছেন। দুধারে বিরাট সব গাছ! ফাঁকা মাঠের মধ্যে দূরে-দূরে কোনও বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা কী?

আন্দাজ করে এগিয়ে এক জায়গায় বাঁ-দিকে মোড় নিলেন।

কিন্তু চলেছেন তো চলেছেন। সেই দুধারে বড়-বড় গাছ, ফাঁকা মাঠ এবং আলোজুলা বাড়িগুলো এবার অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে।

আবার ডাইনে ঘুরলেন। এ-রাস্তার ধারে কোনও ল্যাম্পপোস্টই নেই। ঘন অন্ধকার জমেছে ততক্ষণে। হেডলাইটের আলোয় শুধু ঝোঁপঝাড় আর মাঝে-মাঝে ইটখোলা ভেসে উঠছে। কিন্তু কোথাও জনপ্রাণীর দেখা নেই। ঘড়ি দেখলেন, আটটা বাজছে।

এবার একটু অস্বস্তি হল মুরারিবাবুর। দূরে একটা আলো-জ্বলা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। সেদিকেই এগিয়ে চললেন। বাড়িটা ওই রাস্তার ধারে বলেই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু যত যাচ্ছেন, বাড়িটার দূরত্ব যেন একই থেকে যাচ্ছে। স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছেন গাড়ির। মনে হচ্ছে, ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইলেরও বেশি গতি, এ গাড়ির পক্ষে এই গতিই চরম! ইঞ্জিন গরম হয়ে উঠেছে। হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটে গেলে বিপদে পড়তে পারেন। তাই একটু সংযত হলেন মুরারিবাবু।

তারপর হঠাৎ একসময় একটা ব্যাপার তিনি টের পেয়ে শিউরে উঠলেন।

গাড়িটা আর যেন তার আয়ত্তে নেই। আপনা-আপনি চলছে। স্পিড কমাতে গিয়ে টের পেলেন, কমল না।

ব্রেক কষলেন ভয় পেয়ে। আশ্চর্য, ব্রেক কষা গেল না।

স্টিয়ারিংটাও যেন অন্য কেউ ধরে আছে। কারণ, সামনে বাঁক দেখে তিনি ঘোরাবার জন্য তৈরি হতে না হতে স্টিয়ারিং নিজে থেকে ঘুরতে শুরু করল। তখন আঁতকে উঠে হাত সরিয়ে নিলেন।

আশ্চর্য এবং আশ্চর্য! পরমাশ্চর্য! স্টিয়ারিং যেখানে যেমন ঘোরার ঘুরছে। কোথাও গাড়িটা ধাক্কা খাচ্ছে না।

তারপরই ঘটল আরও অদ্ভুত ব্যাপার। আচমকা একটা ব্রিজের আগে ভাঙাচোরা জায়গায় গাড়িটার ব্রেক আপনা-আপনি শব্দ তুলে গতি সামলানো হল এবং জায়গাটা পেরিয়ে ব্রিজে ওঠার পর ঘ্যাঁচ করে গিয়ার টানার শব্দ উঠল। মুরারিবাবু গিয়ারেও হাতটা ঠেকাননি। অথচ…।

মুরারিবাবুর শরীর হিম হয়ে গেল।

তবু মাথা ঠান্ডা রেখে বসে রইলেন। স্টিয়ারিং, ব্রেক, গিয়ার আয়ত্তে আনার শেষ চেষ্টা করলেন। পারলেন না। যেন কোনও অদৃশ্য ড্রাইভার তাঁরই জায়গায় বসে গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এমনি ভয় পেয়ে বাঁদিকে সরে গিয়ে বসলেন। ড্রাইভারের জায়গা ফাঁকা রইল।

আর অশরীরী সেই ড্রাইভার স্টিয়ারিং দরকারমতো ঘুরিয়ে এবং গিয়ারে মাঝে মাঝে শব্দ তুলে গাড়িটাকে নিয়ে চলল কোথায়?

মুরারিবাবুর মাথা ঝিমঝিম করছিল। হঠাৎ দেখলেন, সামনে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছে এতক্ষণে। তারপর দেখলেন, এটা একটা লরি। প্রচণ্ড বেগে আসছে। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তার আলোয় মুরারিবাবু দেখতে পেলেন, স্পষ্ট দেখলেন–স্টিয়ারিংয়ের সামনে তাঁর পাশে মাত্র এক ফুট তফাতে কে যেন বসে আছে। তার মুখে দাড়িগোঁফ আছে যেন। আর পোশাকটা বিলিতি বলেই মনে হল। মুখটা লালচে রঙের। এবং সেই অশরীরী ড্রাইভার যে একজন সায়েব, তাতে কোনও ভুল নেই।

মুরারিবাবুর আর মাথার ঠিক রইল না। গোঁ-গোঁ করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

মুরারিবাবু যখন চোখ মেলে তাকালেন, তখন সকাল হয়েছে। অভ্যাসমতো তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসলেন।

তারপর অবাক হয়ে গেলেন। ভেবেছিলেন, নিজের ঘরেই ঘুমোচ্ছিলেন আজ উঠতে বেলা হয়ে গেছে, এই যা। ঘুম থেকে তুলে দেয়নি বলে জটিলকে একচোট নেবেন ভেবে পা বাড়াতেও যাচ্ছিলেন।

কিন্তু, ও হরি! এ তো তাঁর নিজের ঘর নয়। জানলা দিয়ে বাইরের যতখানি নজরে আসছে, মনে হচ্ছে খুব জঙ্গুলে জায়গা। পাখপাখালি ডাকছে। গাছপালাও দেখা যাচ্ছে খুব ঘন। আর ঘরের ভেতর কেমন একটা পুরোনো-পুরোনো ভাব। প্রকাণ্ড লোহার খাটের ওপর পুরু নারকেল ছোবড়ার গদি, তার ওপর ছেঁড়াখোঁড়া তোক এবং তার ওপর পাতা চাদরটাও ময়লা। মুরারিবাবু উল্টে-পাল্টে দেখে নিলেন। বিকৃত মুখে বসে রইলেন। ছ্যা-ছ্যা!

ঘরের কোণায় একটা আয়না বানো টেবিল। একটা সেকেলে ঢাউস আরামকেদারা, রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে যেমন থাকে।

আর দেয়ালে একটা মস্ত ঘড়ি। ঘড়ির দোলকটা টকটক শব্দ করে দুলছে। বাজছে সাড়ে সাতটা।

এবার সব মনে পড়ল মুরারিবাবুর। রাতের সেই অত্যত দুঃস্বপ্নের মতো ঘটনা স্পষ্ট ভেসে উঠল চোখের সামনে। কিন্তু এখন উজ্জ্বল রোদে ভরা সকালের পৃথিবীতে তিনি অনেক সাহসী হয়ে উঠেছেন। তাই গটগট করে হেঁটে দরজা খুলে বেরোলেন। আশ্চর্য ব্যাপার এই দরজাটা ভেতর থেকেই বন্ধ ছিল। কে বন্ধ করেছিল?

বেরিয়ে বুঝলেন, রীতিমতো জঙ্গলের মধ্যিখানে এটা একটা ডাকবাংলো। একটা কাঠের ফলকে লেখা আছে–মোহনপুর ফরেস্ট বাংলো।

সর্বনাশ! মোহনপুর ফরেস্ট! কোথায় কলকাতা, কোথায় কল্যাণী, আর কোথায় তাকে আনা হয়েছে? এ একেবারে কেনগর এলাকায় এসে পড়েছেন, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি বললেও চলে।

মোহনপুর ফরেস্টের কথা কতবার শুনেছেন মুরারিবাবু। এটা নাকি সরকারি অভয়ারণ্য। হরিণ-টরিণও আছে। হরিণ থাকলে বাঘ থাকবে না, তা কি হয়? আর বাঘ যদি থাকে, ভাল্লুকই বা থাকবে না কেন? কথায় বলে না বাঘ-ভাল্লুক?

তবে মুরারিবাবু এবার তার ভুতুড়ে কালো রঙের খুদে ফোর্ড গাড়িটাও দেখতে পেয়েছেন। ঘাস আর আগাছায় ভরা লনের কোণায় একটা গাছের তলায় গাড়িটা রয়েছে। দেখেই হনহন করে এগিয়ে গেলেন কাছে।

গাড়িটা দিনের আলোয় দিব্যি ভালোমানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কোনও দুষ্টুমি বা ভূতে পাওয়া বদমাইশির বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই।

যেন ছুঁলেই ফোঁসকা পড়বে, এমন সাবধানি ভঙ্গিতে মুরারিবাবু তার গায়ে হাত ঠেকালেন। বুঝে নিলেন, স্বপ্ন না সত্যি।

জ্বলজ্যান্ত সত্যি। হ্যাঁ–দিনের বেলা গাড়িটার ভুতুড়ে ব্যাপার-স্যাপার থাকে না। অতএব চালিয়ে নিয়ে যেতে অসুবিধে হবে না।

মুরারিবাবু উঠে বসে স্টার্ট দিতে চেষ্টা করলেন। স্টার্ট নিল না। কয়েকবার চেষ্টার পর তেলের কাটার দিকে চোখ পড়তেই চমকালেন। একফোঁটা তেল নেই গাড়িতে। তাহলে উপায়? তাকে এই জঙ্গল থেকে পায়ে হেঁটে বেরুতে হবে ভেবে ভাবনায় পড়ে গেলেন। মনে-মনে সেই অশরীরী ড্রাইভারকে গালমন্দ করতে থাকলেন। সবটুকু তেল পুড়িয়ে খামোকা এই জঙ্গলে বাংলোয় তাকে নিয়ে আসার কোনও মানে হয়? আরে বাবা, এতই যদি গাড়ি চালানোর শখ, তাহলে সোজা কলকাতা নিয়ে গিয়ে তুললি নে কেন?

পরক্ষণে মনে পড়ে গেল, অশরীরী ড্রাইভারটা যে রীতিমতো সায়েব! তখন মুরারিবাবু মুখ ফুটে তার উদ্দেশে ইংরিজিতে বলে উঠলেন,–গো টু হেল! ইউ স্টুপিড ঘোস্ট!

অমনি বাংলোর বারান্দা থেকে আওয়াজ এল, হ্যাল্লো ব্যাবু! গুড মর্নিং। হাউ ডু য়ু ডু?

তারপর মুরারিবাবু ছানাবড়া চোখে দেখলেন, এক বুড়ো লালমুখো সায়েব বগলে টুপি আর হাতে ছড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন।

মুরারিবাবুর সব সাহস পিদিমের মতো ফস করে নিভে গেল। কাঁপাকঁপা গলায় বললেন,-গুড মর্নিং স্যা-স্যার।

–আর য়ু অলরাইট ব্যাবু?

–ই-ইয়েস স্যা-স্যার।

–দেন প্লিজ কাম। দা ব্রেকফাস্ট ইজ রেডি। য়ু আর মাই অনারেবল গেস্ট।

বলে কী! আমি ওর সম্মানিত অতিথি! সকালের খানা খেতে ডাকছে যে! মুরারিবাবু ভাবনায় পড়ে গেলেন। ওই সায়েবই যে রাতের সেই অশরীরী ড্রাইভার, তাতে কোনও ভুল নেই। তার মানে এখন মুরারিবাবু দিনদুপুরে একটি জলজ্যান্ত সায়েব ভূতকে দেখতে পাচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে তাঁর ইংরেজিতে বাক্যালাপও হচ্ছে। কিন্তু ভূতের সঙ্গে এক টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট খাওয়া? ওরে বাবা!

কে জানে কী খাওয়ার আয়োজন করেছে। সায়েব হোক, আর দিশি হোক, ভূত ইজ ভূত। ভূতরা ভুতুড়ে খাবারই খাবে। তাদের হজম হবে বা সুস্বাদু লাগবে বলে মানুষেরও হজম হবে বা সুস্বাদু লাগবে–এমন কথা নেই। পেটের গণ্ডগোল হওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি স্বাদটাও বিচ্ছিরি না হয়ে পারে না।

তার দেরি হচ্ছে দেখে সায়েব হাত নেড়ে ফের ডাকলেন কাম বাবু, কাম! প্লিজ ডোন্ট হেজিটেট।

তার মানে, চলে এসো সটান, দ্বিধা কোরো না। এভাবে যখন ডাকছেন, তখন যাওয়া যাক না। খিদেও তো পেয়েছে। সেই কাল বেলা দুটোয় রাধাকান্তবাবুর বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া হয়েছে। প্রায় সতেরো ঘণ্টা যাবৎ পেটে দানাপানি পড়েনি।

আর ভয়টা কীসের? কাল রাতে নির্জন রাস্তায় ইচ্ছে করলেই তো সায়েব ভূত ঘাড় মটকাতে পারত। মটকায়নি। এই দিনের বেলা আর ঘাড় মটকাবার সাহস কি হবে ওর? অতএব যাওয়া যাক। ভূতের খাবার চেখেও দেখা যাক। এ বরং এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে জীবনে।

মুরারিবাবু গটগট করেই হেঁটে গেলেন হাসিমুখে। বারান্দায় উঠে হাত বাড়িয়ে দিলেন হ্যান্ডশেক করার জন্যে!

সায়েব কিন্তু তার ছড়িধরা বাঁ-হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। তখন মুরারিবাবু দেখলেন, ওঁর ডান হাতটা কাটা। কোটের শূন্য হাতাটা ঝুলছে কাঁধ থেকে। কিন্তু অদ্ভুত কায়দায় ওই হাত দিয়েই টুপিটা বগলদাবা করে রেখেছেন।

এবার ছড়িটা বগলদাবা করে হ্যান্ডশেক করলেন। মুরারিবাবুর মনে হল প্রচণ্ড ঠান্ডা এক টুকরো বরফ তাকে কিংবা তিনিই বরফের টুকরোটাকে আঁকড়ে ধরেছেন।

হাত ছাড়াছাড়ি হয়ে কিছুক্ষণ মুরারিবাবুর হাত নিঃসাড় হয়ে রইল। ঠান্ডায় রক্ত যেন জমে গেছে।

নাকি সায়েবরা শীতপ্রধান বরফ পড়া দেশের লোক বলেই তাদের শরীর এমন ঠান্ডা হয়? মুরারিবাবু জীবনে কোনও সায়েবের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেননি।

সায়েবের পিছু-পিছু বাংলোর অন্য ঘরটায় ঢুকে দেখেন, টেবিলে পুরোনো ছেঁড়া একটা ঢাকনা। তার ওপর চমৎকার লোভনীয় খাবার সাজানো আছে। স্যান্ডউইচ, ডিমের অমলেট, কলা, আপেল, আঙুর পর্যন্ত! একটা প্লেটে সন্দেশ দেখে অবাক হলেন মুরারিবাবু। তাহলে সায়েবরাও সন্দেশ খায়! পটে সম্বত কফি রয়েছে। আঃ, মুরারিবাবুর নোলায় জল এসে গেল।

নাঃ, সায়েব ভূত হতে পারে এবং তোক না ভূত, কী ক্ষতি। কিন্তু খাবারগুলো মোটেও ভুতুড়ে নয়। রীতিমতো সুস্বাদু। জটিলের হাতের সেঁকা আর পচা মাখন মাখানো টোস্ট, বাদুড়চোষা কলা আর কুকুরের কানের মতো শক্ত অমলেট খেয়ে মুরারিবাবুর ঘেন্না ধরে গেছে। আর আঙুর, এমন মিঠে রসে টইটম্বুর আঙুর খেতে পাওয়া কি সহজ কথা?

হুঁ, কফিই বটে। তারিয়ে-তারিয়ে খাচ্ছেন মুরারিবাবু। আর যতটা সাধ্য, ইংরিজিতে দেশের হালচাল নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। সায়েব কিন্তু কোনও জবাবই দিচ্ছেন না। শুধু ঠোঁটের কোণায় হাসি রয়েছে, এই যা!

একসময় মুরারিবাবু বললেন, স্যার! আই থিংক, দ্যাট কার ইজ ইওর্স?

সায়েব মাথাটা দুলিয়ে বললেন,–ও, ইয়েস ব্যাবু।

এবার মুরারিবাবু গাড়িটা কীভাবে ভোঁদা মিত্তিরের কাছে কিনেছেন, কীভাবে ওটার যত্নআত্যি করেন–তা বললেন। তারপর ফের জানতে চাইলেন, রোজ রাতে গাড়ি চেপে সায়েব কোথায় যান এবং ফিরে আসেন?

সায়েব একটু হেসে জবাব দিলেন, আই কাম হিয়ার এভরি নাইট।

–হোয়াই স্যার?

–ও ব্যাবু, দ্যাটস এ লং স্টোরি।

লম্বা কাহিনি! ঠিক আছে। মুরারিবাবু না শুনে ছাড়বেন না। সাগ্রহে বললেন, প্লিজ টেল মি, স্যার।

এরপর সায়েব বা সায়েব-ভূত যা বললেন, তা সংক্ষিপ্তভাবে এই রকম,

সায়েবের নাম রবার্ট বেলিংটন। এই বাংলোটা ছিল তাঁরই। পিছনে নদী আছে। আজ থেকে ষাট বছর আগে এর চেয়ে বেশি জঙ্গল ছিল এখানে। কেউ আসতে সাহস করত না এই এলাকায়। শিকার করার নেশা ছিল বেলিংটন সায়েবের। তাই এখানে বাংলোটা বানিয়েছিলেন। মাঝে-মাঝে এসে থাকতেন। বিয়ে-টিয়ে করেননি। ওই ফোর্ড গাড়িটা চেপেই আসতেন বাংলোয়। একবার কলকাতা ফেরার পথে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। রাস্তা কাঁচা ছিল তখন। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। চাকা পিছলে গাড়িটা পাশের খাদে কাত হয়ে পড়ে। সায়েব বেঁচে যান। কিন্তু ডান হাতটা কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। সুস্থ হওয়ার পর বাঁ-হাতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালাতেন। কোনও অসুবিধে হতো না। বাংলোয় এসে রাত কাটাতেন আগের মতো।

একবার হল কী, অভ্যাসমতো কলকাতা থেকে বেরিয়ে পড়েছেন বেলিংটন। অন্ধকার রাত। কেষ্টনগরের কাছাকাছি এসে চাঁদ উঠল। সেই চাঁদের আলোেই গণ্ডগোলটা বাধিয়ে ফেলল। চকচকে রাস্তা ভেবে গাড়ি চালিয়ে দিয়েছেন জোরে আর ব্যস! ফের পড়েছেন গভীর খাদে। কিন্তু এবার আর শুধু একটা হাতের ওপর দিয়ে গেল না। পুরো শরীরের ওপর দিয়েই গেল।

তার মানে? তার মানে বেলিংটন মারা পড়লেন।

হ্যাঁ, মারা না পড়লে ভূত হলেন কেমন করে? মুরারিবাবু এবার কিছু প্রশ্ন ইংরিজিতে জিগ্যেস না করে পারলেন না। তার প্রশ্ন এবং সায়েবের জবাব বাংলায় এই রকম,–

–আচ্ছা স্যার, ভূত তো হলেন। কিন্তু কেমন লাগে-টাগে একটু বলবেন?

–কেমন লাগে মানে? দারুণ ভালো লাগে। যা খুশি খেতে ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায়। বাবু, খাওয়ার মতো সুখ কি পৃথিবীতে আছে? যদি ইচ্ছে করে, এখনই তাজিকিস্তানের আঙুরকুঞ্জের টাটকা আঙুর খাব, সঙ্গে-সঙ্গে এসে যাবে। দেখবে নাকি?

বলে বেলিংটন চোখ বুজে কী বিড়বিড় করলেন, অমনি সবিস্ময়ে মুরারিবাবু দেখলেন টেবিলে ঝুপ করে সদ্য ডালভাঙা একগুচ্ছ আঙুর এসে পড়ল। সায়েব টুক টুক করে ভেঙে খেতে-খেতে বললেন,–ইট ব্যাবু, ইট। খাও বাবু, খাও।

সাহস করে হাত বাড়িয়ে মুরারিবাবুও গালে পুরতে থাকলেন। আহা! কী অপূর্ব স্বাদ! চাঁদনি বা নিউ মার্কেটের আঙুর তো খেয়ে দেখেছেন। টক ভাবটা থাকবেই,

সে তুমি যত দাম দিয়ে কেননা আর এ আঙুর কী মিঠে, কী রসালো!

আঙুর খেতে-খেতে সায়েব বললেন,–দেখলে তো, মরে ভূত হওয়ার কত সুখ?

মুরারিবাবু রিফ করে বললেন,–আচ্ছা স্যার, যদি বাগবাজারের রসগোঙ্গা খেতে চাই?

–তুমি চাইলে তো হবে না বাবু। তুমি জ্যান্ত মানুষ। আমি চাইলেই পেয়ে যাব। ইচ্ছে করলেই হল।

নোলায় জল নিয়ে মুরারিবাবু বললেন, ইচ্ছে করুন না স্যার।

সায়েব চোখ বুজে ফের বিড়বিড় করা মাত্র কে যেন অদৃশ্যহাতে মুখে শালপাতা আঁটা একটা মাটির সরা সাবধানে টেবিলে রাখল। মুরারিবাবু শালপাতা ছিঁড়ে ফেলতে দেরি করলেন না। আঃ, অপূর্ব! খাসা! ডাগর-ডাগর শ্বেতশুভ্র রসালো রসগোল্লা ভরা রয়েছে সরাটায়। সায়েবের মুখের দিকে তাকিয়ে মুরারিবাবু বললেন, খাব স্যার?

–আলবত খাবে। খেলে তবেই তো বুঝবে মরে ভূত হওয়ার কী আনন্দ!

মুরারিবাবু গালে পুরলেন। মহানন্দে মুখ নেড়ে চিবুতে থাকলেন। মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল। এবার সায়েবকে বলেকয়ে বর্ধমানের সীতাভোগ আর মিহিদানা আনাতে পারলে জীবন ধন্য হয়। বললেন, সত্যি বটে স্যার। স্বীকার করছি, মরে ভূত হওয়ার বড় আনন্দ। কোনও দায় নেই, ঝক্তি নেই, আপিস দৌড়াদৌড়ি, ট্রাম-বাসে ঝুলোঝুলি ঠেলাঠেলি-গুঁতোগুতি নেই, রোজগারের ধান্দায় মুখ চুন করে ঘুরে বেড়ানো নেই শুধু খাও আর খাও। খেয়েদেয়ে ঘুমাও। আবার উঠে খাও। খেয়ে বেড়াতে বেরোও।

বেলিংটন বললেন,–আর বেড়াতেও অসুবিধে নেই। মোটরগাড়ি চাও? তাও পাচ্ছ। তবে মোটরগাড়িটিরও মরে ভূত হওয়া চাই। বুঝেছ তো? আমার ওই ফোর্ড গাড়িটা ভাগ্যিস সেই দুর্ঘটনায় আমার সঙ্গেই মারা পড়েছিল। তাই ওটা পেতে অসুবিধে হয়নি।

রসগোল্লার সরা সাবাড় করতে করতে মুরারিবাবু বললেন, কিন্তু স্যার, গাড়িটা ভোঁদা মিত্তিরের গ্যারেজে গেল কীভাবে?

–আরে, সে এক কাণ্ড! গাড়ির ভাঙাচোরা যন্তর আর বডিটা কুড়িয়ে মল্লিকবাজারে কারা বেচে দিয়ে এসেছিল। তোমাদের ভোঁদা মিত্তির তাকে মাত্র পঁচিশ টাকায় কিনে জোড়াতাড়া দিয়ে আগের মতো গড়ে ফেলেছিল। লোটার প্রশংসা করতে হয়। অবিকল আগের চেহারা ফিরিয়ে দিল।

মুরারিবাবুর রসগোল্লা খাওয়া শেষ। এবার বর্ধমানের সীতাভোগ-মিহিদানার কথাটা তুলবেন। কাচুমাচু মুখে বললেন, স্যার, এবার…

তাঁকে বাধা দিয়ে বেলিংটন বললেন, সব হবে, সব হবে। কিন্তু এবারে তাহলে স্বীকার করেছ তো বাবু, মরে ভূত হওয়ার মতো আনন্দ আর নেই?

মুরারিবাবু উৎসাহে সায় দিয়ে বললেন, আলবত স্যার! তা আর বলতে? বেঁচে থাকার কোনও মানেই হয় না।

অমনি সায়েব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–তাহলে এসো।

অবাক হয়ে মুরারিবাবু বললেন,–কোথায় স্যার?

–কেন? মরতে!

মরতে! –মুরারিবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন।

–হ্যাঁ, না মরলে ভূত হবে কী করে? চলে এসো বাবু। দেরি কোরো না। আরে, শুনতে যতটা লাগে, তত কিছু নয়। টেরই পাবে না। এসো, উঠে এসো।

অ্যাঁ! মুরারিবাবু আঁতকে উঠলেন। এবার বুঝতে পেরেছেন, ঝোঁকের বশে কী বলে ফেলেছেন! হায়, হায়, খাওয়ার লোভেই এই বিপদ!

বেলিংটন টেবিলের ওপর দিয়ে বাঁ-হাতটা বাড়িয়ে খপ করে মুরারিবাবুর একটা হাত ধরে ফেললেন। তারপর হ্যাঁচকা টান মেরে ওঠালেন তাকে। চেয়ারগুলো দুমদাম ছিটকে পড়ল।

বেলিংটন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা একটা হাতে তাঁকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে বাংলো থেকে বেরোলেন।

এবার মুরারিবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন, ওরে বাবা রে! মেরে ফেললে রে! বাঁচাও, বাঁচাও!

কিন্তু বেলিংটন তখন নিজমূর্তি ধরেছেন। কোটপ্যান্ট পরা আস্ত কঙ্কাল হয়ে উঠেছেন। কঙ্কালটার একটা হাত নেই, এই যা।

এবং সেই কঙ্কালের মুন্ডুটা দাঁত কিড়মিড় করে হাসছে আর বরফের চেয়ে ঠান্ডা হাড়ের আঙুলে মুরারিবাবুর লিকলিকে কবজি ধরে আছে। টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে তাকে।

এই বিজন অরণ্যে কেই বা তাকে বাঁচাবার জন্য আসবে? একেই তো বলে অরণ্যে রোদন। মুরারিবাবুর গলা ভেঙে গেল চ্যাঁচিতে-চ্যাঁচিতে। তখন চুপ করলেন।

বেলিংটন তাকে সেই ফোর্ড গাড়িতে ঢুকিয়ে কালিহাস্য হেসে বললেন, এত ভয় পাচ্ছ কেন বাবু? টেরই পাবে না কিছু। মরার চেয়ে সোজা কাজ আর নেই। তবে তোমার মারা পড়াটা যাতে আরও ঝটপট হয়, সেই ব্যবস্থা করতেই তোমায় গাড়িতে ওঠালাম। চুপ করে বসে থাকো।

বাঁ-হাত মানে হাড়ের হাত কোটের হাতায় ঢাকা রয়েছে এবং হাতের আঙুলগুলো এবার মুরারিবাবুর পিঠ বেড় দিয়ে স্টিয়ারিং ধরেছে। অর্থাৎ মুরারিবাবু বেলিংটনের শরীরের তলায় বন্দি। গাড়ি চলতে শুরু করল।

জঙ্গলের মধ্যে এবড়ো-খেবড়ো কাঁচারাস্তায় ধুলো উড়িয়ে গাড়ি চলেছে। মুরারিবাবু প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়ে অগত্যা চুপচাপ বসে আছেন কুঁজো হয়ে। বড় বেকায়দায় বসে থাকা। দম আটকে যাওয়ার দশা।

কিছুদূর চলার পর জঙ্গল শেষ হল। একটা নদীর ব্রিজ দেখা গেল। কিন্তু কোথাও কোনও লোক নেই। মুরারিবাবু রাগে, দুঃখে ভাবছেন, জেলেরাই বা নদীতে মাছ ধরতে আসেনি কেন আজ? নদীতে কি মাছের অভাব আছে? ওরা এলে মুরারিবাবু চেঁচিয়ে ডাকতেন!

জেলেদের মুণ্ডুপাত করতে থাকলেন মুরারিবাবু।

এবারে দুধারে ধুধু ফাঁকা মাঠ। কোনও রাখালও গরু-উরু চরাচ্ছে না। মুরারিবাবু এবার রাখালদেরও মনে-মনে গালমন্দ করলেন।

এ যেন রূপকথার সেই তেপান্তর। সেকেলে কালো ফোর্ড গাড়িটা চলেছে তো চলেছে। ধুলোর মেঘ জমেছে দুপাশে। ঠা-ঠা রোদ্দুর তেপান্তরে ছড়িয়ে রয়েছে উজ্জ্বল সোনার মতো। নাকি কসর-ঘণ্টার মতো। যেন ছুঁলেই ঢং করে বেজে উঠবে। নীল আকাশটা দেখাচ্ছে তপ্ত কড়ার মতো গনগনে।

হঠাং মুরারিবাবু দেখলেন, কখন দুপাশের পাদানিতে কারা এসে দাঁড়িয়েছে। ওরে বাবা! এরাও যে কঙ্কাল! কিন্তু বেলিংটনের মতো পোশাক পরা নয়। তার মানে এরা দিশি ভূত। পাদানিতে দাঁড়িয়ে দিব্যি গাড়ি চড়ার সুখ মিটিয়ে নিচ্ছে বুঝি! নির্ঘাত এরা কলকাতার ট্রাম-বাসে চড়ে আপিস যেত ইহকালে। তারা জানালায় মুন্ডু বাড়িয়ে হি-হি করে হাসছে আর মুরারিবাবুকে দেখছে। মুরারিবাবু কাঠ হয়ে বসে আছেন। দিনদুপুরে এ কী দুঃসাহস ব্যাটাদের!

দিশি ভূতের কঙ্কালগুলো এবার সায়েবকে বলতে শুরু করল,–এঁ কেঁ স্যাঁর? কাঁকে নিঁয়ে যাঁচ্ছেন স্যাঁর?

বেলিংটন হেসে ভাঙা বাংলায় জবাব দিলেন, ব্যাবু টোমাডের একজন সঙ্গী হবে। আইস, টোমরাও আইস। মজা ডেকিবে।

এই শুনে ওরা আরও হিঁ হিঁ করে হাসতে থাকল। কেউ-কেউ বলল,–খুঁব ভাঁলো হঁবে। খুঁব ভাঁলো হঁবে।

একজন বলল,–দেঁরি কঁরছেন কেঁন স্যাঁর?

আরেকজন বলল,–ওঁকে কোঁথায় নিঁয়ে গিঁয়ে ঘাঁড় মঁটকাবেন স্যাঁর?

বেলিংটন বললেন, সবুর, সবুর। এট্রো টাড়া কেন আসে? (এত তাড়া কেন আছে?) হামি ব্যাবুকে হামার কোবোরে নিয়ে যাসসে। সেখানে নিয়ে যাবে। টারপর ইহার গোলা টিপে মারবে।

এক কঙ্কাল বলল, নাঁ স্যাঁর! ওঁর ঘাঁড় মঁটকাবেন। নাঁ পাঁরেন তোঁ আঁমাদের হাঁতে ছেঁড়ে দেঁবেন। এঁ কাঁজটা আঁমরা ভঁলো পাঁরি।

বেলিংটন হাসতে-হাসতে বললেন,–হাঁ! টোমরা নেটিভ (দিশি) আসে। টোমরা ওভাবে মারটে পারে। হামরা ইংলিশ আসে, হামরা অন্যভাবে মারবে।

তার মানে, ঘাড় মটকানোটা দিশি ভূতের ব্যাপার। বিলিতি ভূত যখন, তখন তার ব্যাপারটা অন্যরকম হবেই। কিন্তু বেলিংটন মুরারিবাবুকে তার কবরে নিয়ে যাচ্ছেন বললেন। তাহলে কি কেষ্টনগরে যে সায়েবদের কবরখানা আছে, সেখানেই তার কবর? মুরারিবাবু এসব কথা ভেবে একটু সাহস পেলেন। কেষ্টনগরের ধারে কাছে যেতে পারলে বাঁচার একটা উপায় মিলতে পারে। লোকজন তো সেখানে প্রচুর আছে, শহর জায়গা। রোসো সায়েব, তোমায় মজা দেখিয়ে ছাড়ব। আজকালকার দিশি মানুষগুলোকে তো চেনো না। ভাবছ, তোমাদের সেই ব্রিটিশ আমলের জিনিস। সায়েব দেখলেই ভয় পাবে? তখন একটা-দুটো ক্ষুদিরাম ছিল। এখন অজস্র ক্ষুদিরাম। একালের ছেলেরা কী ডানপিটে, তা টের পাওনি কিনা!

কিন্তু বেলিংটনের কথা শুনে দিশি ভূতগুলো তখন নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে ইশারায় যেন কী পরামর্শ করে নিল। তারপর একজন বলে উঠল, স্যাঁর, আঁমাদের এঁকটা কঁথা আঁছে।

–কী কোঠা আসে?

–আঁমরা আঁমাদের দেশের লোককে নিজের হাতে মারব। আঁপনাকে মারতে বে না।

বেলিংটন হেসে বললেন,–ও! প্যাট্রয়টিজম (দেশাত্মবোধ)?

সেই সময় দুধারে মাঠ থেকে দলে দলে আরও কঙ্কালকে দৌড়ে আসতে দেখলেন মুরারিবাবু। তারা চ্যাঁচিতে-চ্যাঁচিতে আসছিল, কী রেঁ? কীঁ, কীঁ কীঁ?

তারপর তারা এসে কেউ বনেটে কেউ ছাদের ওপর বসে পড়ল। গাড়ির ওপরে কঙ্কাল, দুই পাদানিতে কঙ্কাল, ইঞ্জিনের ওপর কঙ্কাল। মুরারিবাবু এবার একটু সাহস পেয়েছেন। হাজার হলেও এরা তার দিশি ভাই। ভারতীয় ভূত। এই বিধর্মী সায়েব-ভূতের কবল থেকে এরা কি তাকে বাঁচাবে না?

অন্তত বেলিংটনের হাত থেকে উদ্ধার হতে পারলে এই দিশি ভাই-বন্ধুদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে পৈতৃক প্রাণটা রক্ষা করার একটা আশা জেগে উঠল মুরারিবাবুর মনে। ভাবলেন, গতিক বুঝলে বরং একখানা গরম-গরম বক্তৃতা দেবেন। তাতে দেশপ্রেমের কথা প্রচুর থাকবে।

হ্যাঁ, বিবেকানন্দের সেই প্রখ্যাত উক্তি জুড়ে দেবেন বক্তৃতায়। চণ্ডাল ভারতবাসী, মুখ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী আমার ভাই…..

আচমকা সেই সময় একটা তুমুল হুলুস্থুল ঘটে গেল।

মুরারিবাবুকে কঙ্কালগুলো খামচে ধরে গাড়ি থেকে বের করার জন্যে টানছে বেলিংটন স্টিয়ারিং সামলাবেন, না বন্দিকে ধরে রাখবেন ঠিক করতে পারছেন না এবং গাড়ি এদিক-ওদিক টলেটলে চলছে। তুমুল চ্যাঁচিমেচিও হচ্ছে। নাকিস্বরে স্লোগান হাঁকতে শুরু করেছে ছাদের ওপর একদল কঙ্কাল

–বেঁলিংটন! ভাঁরত ছাঁড়ো!

–আঁভি ছোঁড়ো, জঁলদি ছোঁড়ো!

–গঁলা টেঁপা…

–চঁলবে না, চঁলবে না।

–মুঁরারিবাবু!

–জিঁন্দাবাদ, জিঁন্দাবাদ!

সেই তুলকালাম হট্টগোলের মধ্যে গাড়িটা ঘুরে গেল। পাশে গভীর খাদ। এবং মুরারিবাবু ভয়ে চোখ বুজেই টের পেলেন ঠান্ডা-ঠান্ডা হাড়ের হাতে দিশি ভূতেরা তাঁকে গাড়ি থেকে বের করল।

তারপর তাকে চ্যাংদোলা করে তুলে মাঠের দিকে দৌড়ে চলেছে ওরা। সেই অবস্থায় একটা প্রচণ্ড আওয়াজে বুঝলেন, বেলিংটনের গাড়ি সেই অতল খাদে পড়েছে।

মুরারিবাবু ভয়ে-ভয়ে চোখ খুললেন। খুলেই বন্ধ করলেন। শুনলেন, কে তাকে ডাকছে, মামা, মামা! ও মামা!

ফের চোখ খুলে দেখলেন–বীরু। ফিসফিস করে বললেন, আমি কোথায়?

আবার কোথায়?–বীরু বলল। সেবারকার মতো হাসপাতালে।

মুরারিবাবু ওঠার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। পাদুটো যেন বেঁধে রেখেছে। বললেন, আমার কী হয়েছিল বল তো?

বীরু বলল,-আবার কী হবে? অ্যাকসিডেন্ট করে কল্যাণীর মাঠে পড়েছিলেন। সেখান থেকে লোকেরা হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। ডাক্তার বলছেন, কয়েক জায়গায় হাড় ভেঙে গেছে। প্লাস্টার বেঁধে মাস চারেক পড়ে থাকতে হবে বিছানায়।

মুরারিবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,–গাড়িটা?

বীরু জানাল, গাড়িটা চুরমার হয়েছে। ভাগ্যিস মুরারিমামা গতিক বুঝে সঙ্গে-সঙ্গে লাফ দিয়ে পড়েছিলেন। গাড়িটা নয়–গাড়ির হাড়গোেড় ট্রাকে চাপিয়ে আনতে গেছেন ভোঁদা মিত্তির।

Facebook Comment

You May Also Like