Sunday, March 3, 2024
Homeবাণী-কথামানব অথবা দানব - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

মানব অথবা দানব – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বৃদ্ধ ছিটকে খানায় পড়ে যাচ্ছিলেন, ধরে ফেললুম। একেবারেই পেছনে ছিলুম। বৃদ্ধ ভ্যাবাচ্যাকা। জিগ্যেস করলুম, কী দেখছেন?

কেমন ধাক্কা মেরে চলে গেল। কোনও দৃকপাত নেই। ভাবছি, আমি গরু, না, ওই নব্যযুবকটি গরু?

কিচ্ছু ভাববেন না, ও যখন আপনার মতো বৃদ্ধ হবে, তখন ওর নেকস্ট জেনারেশন ওকে এর চেয়েও জোরে ধাক্কা মারবে। আপনাকে আমি ধরেছি। ওকে ধরার কেউ থাকবে না। নর্দমাতেই পড়ে থাকবে, পরের দিন স্ক্যাভেঞ্জার গাড়ি এসে ক্লিয়ার করে নিয়ে যাবে। কিচ্ছু ভাববেন না। তা এই নড়বড়ে শরীর নিয়ে চলেছেন কোথায়?

স্কুল থেকে নাতনিকে আনতে।

ছেলেবেলায় পড়েছিলেন, পথে বড় রিপু ভয়, মিনি, মিডি, অটো, টেম্পো, মোটরবাইক, সাইকেল রিকশা, ঠ্যালা, লরি, সাইকেল, স্টেটবাস, প্রাইভেট বাস, ট্যাক্সি, প্রাইভেট, গরু, ষাঁড়, কুকুর, মানুষ—এদের কেউ কি আপনাকে খাতির করবে? নাতনি আপনাকে রক্ষে করবে, না, আপনি নাতনিকে রক্ষা করবেন?

কী করব বাবা! ছেলে সকাল আটটায় বেরিয়ে যায়, বউমা বেলা একটায় স্কুল থেকে ফেরে। আমি যদি এই কাজটুকু না করি, কথা হবে, রাগ হবে, সমালোচনা হবে! তাই যদ্দিন পারি!

ধুতি-পাঞ্জাবি পরাবৃদ্ধ। চোখে মোটা কাচের চশমা। রোদের তেজে নাকের ওপর কপাল তিন ভাঁজ খেয়ে আছে। ব্যস্ত বললে ভুল হয় উদব্যস্ত বাজারের পথ ধরে, উন্নত বক্তৃতাসর্বস্ব আধুনিক কালের খানাখন্দে ভরা পথ মাড়িয়ে ধীরে ধীরে চলেছেন। বুঝতে পারছেন না, সব কিছু কেন এত এলোমেলো, নৃশংস, হৃদয়হীন!

না জানলেও আমি জানি, স্বাধীনতা যখন এক বছরের শিশু, তখন বাংলার ফেঁড়ে ফেলা অংশে জীবনের সব স্বপ্ন ফেলে রেখে, এক বস্ত্রে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে আশ্রয় পেয়েছিলেন কুপার্স ক্যাম্পে। সেখানে দরদি নেতা, মরমি দালাল, উদার লম্পট, ধূর্ত সমাজসেবী, তোমাদের ভালো করব, তোমাদের স্বর্গ দেখাব বলে, নরকের নরক দেখিয়েছিল। আকাশে ঝাঁক ঝাঁক শকুন, জমিতে নতুন ইহুদি। দিন বড় কষ্টের, রাত বড় মজার। শরীর বড় সস্তার।

সেই ঘেটো থেকে যৌবনের অদম্য শক্তিতে উঠলেন। শহরতলির নয়া বসতিতে নিজের আশ্রয় খুঁজে নিলেন, ছেলেকে দাঁড় করালেন, মেয়েদের বিয়ে দিলেন। ছেলে প্রেম করে বউ নিয়ে এল। উপহার পেলেন, অবসর আর নাতনি। অহরহ শুনলেন, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। সবসময় দ্বিতীয়। বিশ্বযুদ্ধের পরিবেশ, আলোহীন অন্ধকার রাত, জাপানি বোমায় সেই যে চুরমার হয়েছিল পথঘাট, সেই একই হল। সৈনিকরা মার্চ করছে স্লোগানের তালে তালে, লড়াই, লড়াই, লড়াই, লড়াই। বৃন্দাবনের নিরেট ছেলে নেতা হয়েছে। পমেটম মাখা চুল। ঠোঁটে মুরলী নয়, বাঁকা সিগারেট,। যেদিকে ধোঁয়া সেদিকের চোখ আধবোজা, গলায় ভাওয়েল-এ ই আই ও ইউ। কনসোনেন্ট নেই। কলের জাহাজের ভেঁপুর মতো কণ্ঠস্বর। সড়কের ওপর পাঁচতলা। বেসমেন্টে বোমার ফ্যাকট্রি। তার ওপর আমদরবার। তার ওপর মধুবন। তার ওপর পরিবার-পরিজন। টঙে মন্দির। ওঁ শান্তি। সকালে ক্যাসেটে নামসংকীর্তন। দু-খানা গাড়ি দু-পাশের গ্যারেজে। নাদুসনুদুস ছেলেমেয়ে, গজেন্দ্রগামিনী স্ত্রী। পোড়া কাঠের মতো মা, পিতা ফুলের মালা দোলানো ছবি। মাঝে মাঝে লাল। আলোর গাড়ি আসে। খালে লাশ ভাসে। মায়েরা বুকফাটা কান্না কাঁদে। বিরোধী নেত্রী ছুটে। আসেন সান্ত্বনা দিতে। কাগজে ছবি ছাপা হয়। ঠোঙা হয়। অফিসের তাত্বিকবাবুরা ঝালমুড়ি খান। ঢেউ মসৃণ হয়ে যায়। আলু, পটল, ফুচকা, ছোট পরদায় মাধুরী, অজয় দেবগণের ঢিসুম ঢিসুম। দুই নেতার বৈঠক। ফিরিস্তির আদান, প্রদান। শান্তি, শান্তি। বেসমেন্টে বোমা। বাংলা বনধ। এপক্ষ ফেলিওর। ওপক্ষ—ফুল বনধ। জনগণ, অভিনন্দন, অভিনন্দন। একটা লাল, একটা সাদা, খবরের কাগজে স্টক ছবি, খাঁ খাঁ হাওড়া ব্রিজ, রাস্তায় ব্যাট বল।

বৃদ্ধকে প্রশ্ন, কেন এইসব ভাবছেন? ওপরদিকে এখন এমন সব নেতা আছেন, যাঁরা দাদার দাদা। হালকা জিনিস ওপর দিকেই ভেসে ওঠে। জমাট আদর্শ, আর্দশের গুরুভারেই তলিয়ে যায়। যদি মনে রাখি এই কথাটি—The apple is well known in history, but the grapefruit stays in the public eye. আপেলের অনেক উপকারিতা; কিন্তু মদিরা ফল। দ্রাক্ষা চোখের সামনে দুল দুল করে দোলে। বড়ই নয়নলোভন। যত ক্যারানি দেখাবে ততই হেডলাইন হবে। রোজ সকালে শহরের সব কাগজের ফ্রন্ট পেজে তোমার নাম দোল খাবে। তোমার মদ, মহিলার খেলা। আইনের গলায় বকলস বেঁধে বুক ফুলিয়ে ঘোরা। আর থেকে থেকে বলা, সবই অযথা অপপ্রচার।

বৃদ্ধ মহাশয় তাহলে শুনুন, সাতটি আশ্চর্যের মতো সাতটি আধুনিক পাপের তালিকা :

Policies without principles
Pleasure without conscience
Wealth without work
Knowledge without character
Industry without morality
Science without humanity
Worship without sacrifice

বৃদ্ধ! আপনার এ কী অবস্থা, প্ল্যাটফর্মে পড়ে আছেন কোমর ভেঙে!

বাবা! ডেলি প্যাসেঞ্জার ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।

অপরাধ?

টিকিট কেটে, রিজার্ভেশন নিয়ে, আসানসোল থেকে কলকাতা আসছিলুম ভোরের ট্রেনে।

তারপর?

কয়েক স্টেশন পরেই ডেলি প্যাসেঞ্জাররা উঠতে লাগলেন। হুকুমের গলা, উঠুন, উঠুন, উঠে পড়ুন, অনেক বসেছেন।দলনেতা এ-মাথা থেকে ও-মাথা ফরমান জারি করতে করতে ঘুরছেন। কয়েকজন মেয়েদের আসনের হাতলে ভারী নিতম্ব স্থাপন করে ঠেলতে লাগলেন। মহিলারা বিনা প্রতিবাদে উঠে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে দখল হয়ে গেল আসন। একটাই আশ্চর্য, এই দল অবাঙালিদের কিছু বললেন না।

কারণ অবাঙালিরাই বাঙালিদের অন্নদাতা। খুনোখুনির রাজনীতিতে পশ্চিমবাংলায় যখন থরহরি কম্প, বিদ্যাসাগরের মুণ্ডু কাটা হচ্ছে, বিবেকানন্দকে বেদি থেকে উৎপাটিত করা হচ্ছে, খুচরো বাঙালি ব্যবসাদারদের গলা কাটা হচ্ছে, তখন কিন্তু একটিও অবাঙালি শ্রেণিশত্রুর গায়ে হাত পড়েনি চেয়ারম্যানের নির্দেশে। বিবেকানন্দ রোডের দক্ষিণ ফুটপাথের নর্মাল লাইফ, উত্তরে সশস্ত্র বিপ্লব। কারণ—অন্নদাতা পিতা! বুঝলেন কিছু?

বুঝেছি।

তারপর।

আমাকে যখন হাত ধরে টানছে, সামান্য প্রোটেস্ট করেছিলুম। আমার টিকিট রয়েছে, রিজার্ভেশন রয়েছে, বৃদ্ধ মানুষ, হাই প্রেসার, চোখে দেখি না, আপনারা কি মানুষ!

না, আমরা ডেলি প্যাসেঞ্জার!

তারপর?

তারপর আমাকে বলো হরি বলে, ঝপাং। পড়ে আছি এইখানে। আমার ব্যাগ হাওড়া চলে গেছে।

ভাববেন না কিছু, ওঁদের ছেলেরা যখন বড় হয়ে ডেলি প্যাসেঞ্জার হবে, তখন তারা ড্রাইভার, কন্ডাক্টরকেও ছুড়ে ফেলে দেবে।

তাহলে ট্রেন চালাবে কে? কে চেক করবে টিকিট?

ভূতে।

একজন একটি মজার কথা বলেছিলেন,

Every thing is relative. If a monkey had fallen from the tree in place of an apple, Newton would have discovered the origin of species instead of the Law of gravity. সবই আপেক্ষিক। বিবর্তন এখন ভিন্নমুখী। মানুষ থেকে বাঁদর, বাঁদর থেকে হায়না।

একালে প্রেমিক আছে প্রেমিকা আছে, শিক্ষালয় আছে, শিক্ষক আছেন, গুরু আছেন, কাতারে। কাতারে শিষ্য, দেশ আছে, ঝুড়ি ঝুড়ি নেতা; কিন্তু পিতা-মাতা নেই, আচার্য নেই, আত্ম অন্বেষণ নেই, সেবা নেই, ত্যাগ নেই। কৌশল করে বাঁচতে গিয়ে সব শেষ। ঘরে ঘরে অনন্ত আদিখ্যেতা; কিন্তু চরিত্র গঠনের চেষ্টা নেই। চরিত্র গঠনের কথা পুরোনো কথা, শুনলে হাসি পায়। অর্থের কাছে চরিত্র এক ছিন্নবসন ভিখারি। শঙ্কর, বুদ্ধ, চৈতন্য, বিবেকানন্দ, হু আর দে! তাঁরা কি বিজনেস টাইকুন ছিলেন!

চিন্তাবিদরা বড় ধন্ধে পড়েছেন, ব্যাপারটা হল কী? ভগবান মারা গেলেন, না মানুষ! দি ডেথ অফ দি ফ্যামিলি।

গভীর রাতে আমেরিকার রাজপথে একটি শিশু সাদা স্লিপিং সুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে রাস্তার মাঝখানে। একটা দামড়া লরি গাঁক গাঁক করে চলে গেল। এক চুলের জন্যে শিশুটি বেঁচে গেল। সাঁই সাঁই করে গাড়ি ছুটছে। এক প্রবীণ নিজের জীবন বিপন্ন করে শিশুটিকে উদ্ধার করে আনলেন। এইবার সভ্য মানুষের সভ্য কাহিনিটা কী! বাপ, মা ফুর্তি করতে গেছেন। শিশুটিকে রেখে গেছেন বৃদ্ধ দাদুর কাছে। শিশুটি খাটে দাঁড়িয়ে সশব্দে দরজার খিল খুলেছে ইচ্ছে করে। দেখতে চায়, কেউ তার জন্য জেগে আছে কি না! না, কেউ নেই। নিঃসঙ্গ। নোবডি লাভস মি। কাঁদতে কাঁদতে বললে, নো বডি লাভস মি!

প্রেমহীন সমাজ কী তৈরি করবে—দেবতানা দানব!

ফ্যাকট্রি থেকে ট্রাক বেরোবে, পরিবার থেকে মানুষ। ও কী খায়, ডিজেল। এ কী খায়, চিকেন চাও। ওর স্টিয়ারিং-এ শিক্ষিত হাত, এর স্টিয়ারিং-এ। কেউ নেই। একটি প্রাচীন কথা—

If you want your children to turn out well, spend twice as much time with them, and half as much money.

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments