গভীর রাতের আগন্তুক – মানবেন্দ্র পাল

গভীর রাতের আগন্তুক - মানবেন্দ্র পাল

বাড়িটার নাম মহলেশ্বরী।

না, বাড়ি নয়, প্রাসাদ–জীর্ণ দোতলা প্রাসাদ।

চুচড়ো থেকে আা, পঞ্চাননতলা, ভৈরবপুর ডিঙিয়ে ভস্তারার দিকে চেলে গেছে চমৎকার পিচঢালা রাস্তা। সারাদিন বাস যায় আসে। এ ছাড়া ছোটে লরি। মাঝে মাঝে প্রাইভেট কারও। বড়ো শান্ত পরিবেশ। দুদিকে মাঠ। মাঠের ওদিকে ছবির মতো দেখা যায় গ্রাম।

বাসরাস্তা থেকে ডান দিকে একটা সরু ধুলোভরা পথ চলে গেছে। দুপাশে বাবলা গাছ, আর ঢোলকলমীর ফুল-বাহার।

এই কাঁচা রাস্তার শেষে যে জায়গাটা সেখানে কিছু লোকবসতি আছে। খুবই গরিব তারা। চাষ করে, মজুর খাটে। ওরই মধ্যে রয়েছে দু-একটা চায়ের আর ছোটোখাটো মুদির দোকান। কোনো একসময়ে এখানকার জমিদার নন্দীদের প্রভাবে জায়গাটার নাম ছিল নন্দীগ্রাম। পরে নীলকর সাহেবরা এখানে নীলের চাষ করতে এলে তাদের দৌলতে নন্দীগ্রামের নাম ঘুচে গিয়ে নতুন নাম হয় নীলগঞ্জ। এই নামটা অবশ্যই অনেক পরের।

নন্দীদের বিরাট তেতলা বাড়িখানা এখনও দিব্যি টিকে আছে। দোতলার সার সার ঘরগুলোর জানলা যে শেষ পর্যন্ত কবে বন্ধ করা হয়েছিল কে জানে! এখনও পর্যন্ত তা খোলা হয়নি। গোটা বাড়িটার চারদিকে অনেকখানি জায়গা জীর্ণ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পিছনের দিকে নন্দীদের নিজস্ব ঘাট-বাঁধানো পুকুর। পুকুরে এখনও জল টলটল করছে। পুকুরপাড়েই একটা বেলগাছের নিচে নন্দীদের শিবমন্দির। আগে বাড়ির বৌ-ঝিরা এখানে শিবরাত্রিতে পুজো দিত। রাত জাগত।

বাড়িতে ঢোকার মুখেই লোহার পাত-আঁটা ভারী কাঠের পাল্লা দেওয়া দরজা। দুটো পাল্লার একটা ভেঙে পড়ে আছে এক পাশে। তাতে জঞ্জাল জমে উঠেছে।

এরপর সিংদরজা। দোতলাসমান উঁচু। তার ওপর নহবৎখানার ভগ্নাবশেষ। একসময়ে প্রহরে প্রহরে বাজত রাগ-রাগিণীর আলাপ।

নিচের তলাটা অবশ্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তার কারণ নিচের কয়েকটা ঘর ভাড়া দেওয়া আছে–না, না, বাস করার জন্যে নয়, গুদামঘর হিসেবে।

নিচের ঘরগুলোর সামনে দিয়ে চলে গেছে শ্বেতপাথরের বাঁধানো অন্দরে যাবার পথ। সেই পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকলে যেন গোলকধাঁধার মধ্যে পড়তে হয়। ঘরের পর ঘর গলির পর গলি। সব ঘরেই তালা ঝুলছে।

বাড়ির ঠিক পিছনে বিরাট আমবাগান। তার ডালপালা প্রেতাত্মার বীভৎস হাতের মতো ঝুলে পড়েছে ছাদের ওপর। সন্ধেবেলায় হঠাৎ দেখলে কেমন ভয়-ভয় করে। আশ্চর্য এই, এত যে সতেজ আম-গাছ, কিন্তু আম ফলতে দেখেনি এ অঞ্চলের লোক। কেন আম ফলে না?

তা নিয়েও নানা জল্পনা। থাক, এখন সেকথা।

বাড়িটার নাম একটু অদ্ভুত–মহলেশ্বরী। শোনা যায় এবাড়ির কোনো এক মহীয়সী রানীমাই নাকি এবাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। তাই ঐ নাম।

বাড়িতে বহুদিন ধরে কেউ থাকে না। কাছে-পিঠের মানুষ সন্ধের পর এবাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না।

কেন ঘেঁষে না তার উত্তর মেলে না। বলে–রাজরাজড়াদের অভিশপ্ত বাড়ি। কত খুন, গুম খুন হয়েছে তার কি ঠিক আছে?

কিন্তু এসবের কোনো প্রমাণ নেই–জনশ্রুতি মাত্র।

জনশ্রুতি-গল্পকথা ছাড়া কী? নইলে একালের ছেলে-ছোকরারা সারা দুপুর ঐ মার্বেল পাথরের বারান্দায় বসে তাস পিটোতে পারে? নাকি কেউ গুদামঘর করে ব্যবসা করতে পারে? তাছাড়া দালালরাও আসে কলকাতা থেকে। ঘুরঘুর করে বাড়িটা কেনার জন্যে। এই বাড়ি ভেঙেই দিব্যি হাল ফ্যাশানের বহুতল বাড়ি করা যায়।

কিন্তু এ বাড়ির মালিক বড়ো কড়া। তিনি এবাড়ি কিছুতেই বিক্রি করবেন না। এ তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ি। তিনি যতদিন বেঁচে আছেন এ বাড়ির একখানি ইটও কেউ খসাতে পারবে না।

তার পাত্তা পাওয়াও কঠিন। কোথায় কখন থাকেন কেউ বলতে পারে না। দেশভ্রমণ তার নেশা।

তিনি এবাড়িতে বহুকাল আসেননি। আসার দরকারও নেই। তিনি জানেন এ বাড়িটার সম্বন্ধে অনেক দুর্নাম আছে। ভয়ে কেউ অন্তত জবর-দখল করতে এগোবে না। চোরও আসে না দামী-দামী জানলা খুলে নিতে।

এই প্রাসাদের কাছেই আছে আরও কয়েকটা ভাঙা বাড়ি। সেসব বাড়িতে এক সময়ে থাকত নীলকর সাহেবরা। নীলের চাষ করে তারা লাল হয়ে গিয়েছিল। পিছনেই বিরাট বাঁওড়।

ভাবতে ভারি অদ্ভুত লাগে–একদিকে থাকত সাহেবরা, কাছেই বাঙালি জমিদার। সাহেবদের ছিল বন্দুক, পিস্তল; জমিদারদের ছিল বাঁধা লেঠেল। তাদের ঘরে ঘরেও থাকত বন্দুক, আর তরতরে-ধার তরোয়াল।

সাহেব আর বাঙালি জমিদারদের সম্পর্ক কিরকম ছিল কে জানে!

সম্পর্ক যেমনই থাক, কয়েক বছর আগে জমি চাষ করতে গিয়ে বেরিয়েছিল রাশিরাশি কঙ্কাল। আর সাহেব-মেমরাও যে ভূতের ভয় পেত তার অনেক লোমহর্ষক কাহিনি শোনা যায় নব্বই বছরের বুড়ো ওঝা সনাতন সোঁর মুখে।

সেদিন তখন সন্ধের মুখ। মহলেশ্বরীর অন্দরমহলে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে। তারই মধ্যে কেউ একজন এক-একটি ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢুকছে। তারপর বেরিয়ে এসে বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক-একসময়ে নিজের মনেই বলছে-বাঃ! চমৎকার!

লোকটি এগিয়ে গেল দ্বিতীয় মহলের দিকে। হঠাৎ যেন শুনতে পেল কিসের শব্দ। শব্দটা আসছিল পাশের ঘর থেকে। একটা যেন ঝটাপটির শব্দ। লোকটির দুচোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠল উত্তেজনায়। চাবির থোক থেকে বেছে বেছে একটা চাবি লাগিয়ে দরজাটা খুলল। ভেতরে ভ্যাপসা গন্ধ। টর্চের আলো ফেলল। দেখল দুটো চামচিকে ঝটাপটি করছে।

ধুস্! যেন হতাশ হলো লোকটি। বেরিয়ে এল ঘর থেকে। আবার তালা লাগালো।

ঠিক তখনই পিছনে পায়ের শব্দ। কেউ আসছে। চমকে উঠে ঘাড় ফেরালো।

 বাবু!

কি হলো, এখানে কেন? বাবু বিরক্ত হলেন।

 বড্ড অন্ধকার। আলো জ্বেলে দিই?

না। তুই তোর কাজে যা।

ভৃত্যটি কিছু বুঝতে পারল না। খানিকক্ষণ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর চলে গেল বাইরে। ভাবল, যেমন অদ্ভুত বাড়ি, তেমনি অদ্ভুত তার মনিব। অথচ তিনি এমন ছিলেন না। এখানে এসে পর্যন্ত যেন কেমন হয়ে গেছেন।

.

০২.

নিয়তির হাতছানি

 বাবুর নাম দিবাকর নন্দী। তিনি আর্টিস্ট। দারুণ ছবি আঁকেন। ছবি আঁকা নিয়েই থাকেন। কাজকম্ম কিছু করেন না। করার দরকারও নেই। প্রচুর টাকা। বিয়েও করেননি, একা মানুষ। সঙ্গে শুধু অনেক দিনের পুরনো ভৃত্য সদাশিব।

দিবাকরের শখ দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো। সঙ্গে ছবি আঁকার সরঞ্জাম। যেসব জায়গার প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখার মতো, সেখানেই তিনি ছুটে যান। কখনো বড়ো হোটেলে, কখনো ঘরভাড়া করে থাকেন, যত দিন ভালো লাগে। ভালো লাগার পালা ফুরোলেই তিনি সদাশিবকে হেঁকে বলবেন, সদাশিব প্যাক আপ।

এইভাবেই তিনি কাশ্মীর, রাজস্থান, দার্জিলিং, সিমলা, কন্যাকুমারী, উটকামণ্ড প্রভৃতি নানা জায়গা ঘুরে সম্প্রতি এসেছিলেন নেপালের কাঠমাণ্ডুতে।

মানুষটি খুশমেজাজের। তিনি যে এক সময়ের রাজপরিবারের না হোক, বনেদী জমিদার পরিবারের বংশধর সেটা তিনি মাটিতে লোটানো ধুতির কেঁচা, সিল্কের পাঞ্জাবি, বিলিতি সেন্টের গন্ধ মাখানো রুমাল, ঘাড় পর্যন্ত ঝোলা কুচকুচে কালো চুল আর চওড়া জুলপি দেখিয়ে বুঝিয়ে দেন।

তার একটু যে খুঁতখুঁতুনি তা তার কটা রঙের গোঁফ আর চোখের কটা মণিটা নিয়ে। ও দুটো যে কেন কালো না হয়ে কটা হলো তা তিনি বুঝতে পারেন না।

অবশ্য একসময়ে বাঙালিদের কটা চুল, কটা গোঁফ, কটা চোখের মণি খুব গৌরবের ছিল। কেননা সাহেবরা খুব পছন্দ করত।

বড়ো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দিবাকর নন্দী সরু গোফে আঙুল বোলাতে বোলাতে সদাশিবকে উদ্দেশ করে বলেন, বুঝলি সদাশিব, এই যে কটা গোঁফ দেখছিস এ সবার ভাগ্যে হয় না।

সদাশিব বোকার মতো তাকিয়ে থেকে বলে, এজ্ঞে। আজ যদি সাহেবরা এ দেশে থাকত, তাহলে তারা আমার এই গোঁফের মর্যাদা দিত।

সদাশিব হেসে বলে, এজ্ঞে, তা বৈকি।

দিবাকর নন্দী বরাবর প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিই আঁকেন। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের পিছনে সামান্য একটু ঘটনা আছে।

তার একটা বিশেষ শখ কিউরিওর দোকানের খোঁজ পেলেই সেখানে ছুটে যাওয়া। আর খুব পুরনো–এখন যা পাওয়া যায় না–এমন জিনিস সংগ্রহ করা। সেবার গ্যাংটকে গিয়ে অমনি একটা দোকানে পুরনো জিনিস হাতড়াতে হাতড়াতে কতকগুলো অয়েল-পেন্টিং পেয়েছিলেন। তার মধ্যে একটা ছবি দেখে তিনি আঁৎকে উঠেছিলেন। ছবিটা অদ্ভুত। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর ধূসর রঙে আঁকা একটা আবছা মুখের আভাস। মুখটা অনেকটা একজন ক্রুদ্ধ মহিলার মুখের মতো। ভয়ঙ্কর সে মুখ। কিন্তু তা মানুষেরও নয়, দেবদেবীরও নয়।

ছবিটা তাঁকে এতই আকর্ষণ করেছিল যে তিনি তখনই তা কিনতে গেলেন। কিন্তু ওটার যা দাম তত টাকা তার পকেটে ছিল না। তিনি তখনই টাকা আনতে বাড়ি ছুটলেন। কিন্তু ফিরে এসে ছবিটা আর পেলেন না। বিক্রি হয়ে গেছে।

তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কি আর করা যাবে। তারপর থেকে অনেক জায়গায় ছবিটার খোঁজ করেছিলেন। কিন্তু পাননি। ছবিটা যেন তার ঘাড়ে ভর করেছিল। কিছুতেই ছবিটার কথা ভুলতে পারছিলেন না।

আসলে ছবিটা তাঁকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি ভাবতে লাগলেন–ঐ ছবিটা যিনি এঁকেছিলেন তাঁর আঁকার উদ্দেশ্য কি ছিল? ঐরকম ছবি শুধু শুধু কেউ আঁকে? তবে কি ঐ অজ্ঞাত শিল্পী নিজের চোখে ঐরকম কিছু দেখেছিলেন? আর যা দেখেছিলেন তা বললে লোকে বিশ্বাস করবে না বলে ছবির মধ্যে দিয়ে তা ফুটিয়ে তুলেছিলেন?

ছবিটা যখন কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না তখন তিনি ঠিক করলেন নিজেই ঐরকম ছবি আঁকবেন। কিন্তু যখনই রঙ-তুলি নিয়ে বসেন তখনই সব কেমন ঘুলিয়ে যায়। ছবিটার সূক্ষ্ম কাজ কিছুতেই মনে করতে পারেন না।

এ তো বড় জ্বালা!

তিনি তখন বুঝতে পারলেন, ঐরকম কিছু স্বচক্ষে না দেখলে ও ছবি আঁকা যাবে না।

কিন্তু ঐরকম কিছুর দেখা কোথায় পেতে পারেন? অলৌকিক ব্যাপার তো যেখানে সেখানে ঘটে না। তাছাড়া আজকের যুগে ওসব ব্যাপার আশাই করা যায় না।

এই সময়ে তাঁর মনে হলো দেশের বাড়ির কথা। তাঁদের সেই মহলেশ্বরী। ঐ বাড়ি সম্বন্ধে অনেক কিছুই তিনি ছোটোবেলা থেকে শুনে এসেছেন। অনেক অপঘাত-মৃত্যু নাকি একসময়ে ঐ বাড়িতে হয়েছিল।

তিনি ভাবলেন যদি সত্যিই কিছু অলৌকিক ব্যাপার এখনও ঘটে তাহলে ওখানে গিয়ে থাকতে পারলে নিশ্চয় কিছু দেখতে পাবেন। ভাগ্য প্রসন্ন হলে সেই ছবিটার মতো ভয়ঙ্কর মুখেরও দর্শন মিলতে পারে।

কিন্তু একটাই অসুবিধে-বাড়ির নিচের তলাটা ভাড়া দেওয়া আছে। তাদের তুলতে না পারলে ওখানে গিয়ে লাভ হবে না।

তিনি তখনই কলকাতায় ওঁর একটি মাত্র বন্ধু সুরঞ্জনকে অনুরোধ করে চিঠি লিখলেন, যেন সে ভাড়াটে তোলার চেষ্টা করে। জানিয়ে দিলেন, তিনি এখন দেশের বাড়িতে গিয়েই থাকবেন।

চিঠি লিখতে গিয়ে তিনি একবার শুধু থমকে গেলেন। মুহূর্তের জন্যে মনে হলো কোথাকার কোন একটা সামান্য ছবির জন্যে এ তিনি কী করতে চলেছেন! এটা কি পাগলামো হচ্ছে না?

কিন্তু এই শুভচিন্তা শুধু মুহূর্তের জন্যে। চিঠি তিনি লিখলেন। এবং নিজে হাতে পোস্ট করে দিলেন।

সুরঞ্জন মাসখানেক পরে জানালেন, অনেক চেষ্টা করলাম, ভাড়াটে উঠবে না। তবে যদি হাজার পঁচিশ টাকা ছাড়তে পার তা হলে উঠবে।

দিবাকর তখনই বন্ধুর কাছে টাকা পাঠিয়ে দিলেন।

 ভাড়াটেরা উঠল। দিবাকর হাসিমুখে সদাশিবকে বললেন, প্যাক আপ।

তখনও তিনি জানতেন না নিয়তি তাকে কিভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

.

০৩.

দিবাকরের আনন্দ

দিবাকর নন্দী মনের আনন্দে নিজের গ্রামে ফিরে এলেন। আনন্দ তো হবেই। ভাড়াটে উঠিয়ে বহুকাল পর স্বদেশে এসেছেন। আর তার বিশ্বাস–এখানে থাকতে থাকতে একদিন না একদিন তেমন কিছু দেখতে পাবেনই যা হবে তাঁর নতুন ছবি আঁকার প্রেরণা।

তিনি যখন ছোটোবেলায় এ বাড়িতে থাকতেন তখন কিছু দেখতে পাননি। তার কারণ তখন এ বাড়িতে লোকজন ছিল অনেক। ঐ বাড়িরে মধ্যে সেরকম কিছু দেখা যায় না। আর এখন? এখন অত বড়ো বাড়িখানা খাঁ খাঁ করছে। বিশেষ করে দোতলায় উঠলে গা ছমছম করে। বহুকাল দোতলার দরজা খোলা হয়নি।

তিনি স্বদেশে ফিরলেন। তাকে গ্রামের লোক অবাক হয়ে শুধু দেখল। কেউ আলাপ করতে এগিয়ে এল না। বোধহয় তার চালিয়াতি, তাঁর সাজসজ্জা আর অহঙ্কার দেখে কারো ভালো লাগেনি। তিনিও কারো দিকে ফিরে তাকালেন না। যেন এইসব গেঁয়ো ভূতরা তাঁর সঙ্গে মেশার অযোগ্য।

নিজের বাড়িতে ঢুকে তিনি প্রথমে নিচের তলার একটা ঘর খুললেন। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এখানে ভাড়া দেওয়া ছিল বলে ঘরটা কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।

তিনি ভাবলেন, নিচের তলায় কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে তারপর দোতলার ঘরগুলো খুলে দেখবেন কোন ঘরে তিনি পাকাপাকিভাবে থাকবেন।

বেলা দুটোর মধ্যে সদাশিবকে দিয়ে নিচতলাটা ঝটপাট দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিয়ে এবার তিনি দোতলায় উঠলেন।

মনের আনন্দে শিস দিতে দিতে দিবাকর উঠলেন। টানা বারান্দার পাশে সার সার ঘর। খড়খড়ি দেওয়া জানলাগুলো সব বন্ধ। ঘরগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে তিনি মনে করবার চেষ্টা করলেন তার ছোটোবেলায় কে কোন ঘরে থাকতেন।

একটা ঘরের সামনে এসে তিনি শিস দিতে দিতেই তালা খুললেন। দু হাত দিয়ে ভারী কপাট ঠেললেন। ভেতরে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। অন্ধকারে আন্দাজ করে তিনি পা বাড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে আঁৎকে উঠে দু পা পিছিয়ে এলেন। দেখলেন সামনের দেওয়ালে ঝুলছে মস্ত একটা ছবি। অন্ধকারেও বুঝতে বাকি রইল না, এটা সেই গ্যাংটকের ছবি। সেই ক্রুদ্ধ কোনো মহিলার ভয়াবহ প্রেতাত্মার ছবি। জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু সে ছবি তো এতো বড়ো ছিল না। আর সে ছবি এখানে এলই বা কি করে?

তিনি তখনই হাঁকলেন, সদাশিব, টর্চটা নিয়ে চট করে এসো তো!

সদাশিব পড়িমড়ি করে টর্চ নিয়ে ওপরে উঠে এল। দিবাকর টর্চ জ্বাললেন। দেখলেন কোথাও কোনো ছবি নেই। ফাঁকা দেওয়াল।

তিনি মনে মনে হাসলেন। ধুস! চোখের ভুল।

চোখের ভুলই হোক, আর যাই হোক এবাড়িতে ঢুকেই ছবিটা দেখে তিনি একটু যেন খুশিই হলেন। ভাবলেন তাহলে হয়তো এখানে আসা তার ব্যর্থ হবে না।

যাই হোক, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তিনি দোতলার দুখানা ঘর সাজিয়ে গুছিয়ে নিলেন। একটা ঘরের দেওয়ালে টাঙালেন তার ভালো ভালো ছবিগুলো। অন্য ঘরের দেওয়ালে টাঙালেন বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য বিশ্ববিখ্যাত আর্টিস্টের ছবি। যেমন–রেমব্রান্ট, মাতিস, ভ্যানগগ, পল ক্লি আর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির লাস্ট সাপার ছবিটি। এসব ছবি যে অরিজিনাল অর্থাৎ আর্টিস্টের নিজের হাতে ছবি আঁকা নয়–আসলের নকল মাত্র, দিবাকর তা বুঝতেন। তবু সার্থক নকল এই ছবিগুলোরও শুধু দামই নয়, যথেষ্ট আকর্ষণও আছে।

এবাড়িতে কিছু পুরনো জিনিসও দেখতে পেলেন। যেমন একটা ঘরে দেখলেন বহু পুরনো একটা অয়েল পেন্টিং। গায়ে সার্টিনের কোট আর কোমরে বাঁধা উড়ানি। ছবিটা ছোটোবেলা থেকেই দেখেছেন। কিন্তু তিনি এই বংশের কে ছিলেন তার পরিচয় জানা যায়নি।

আর একটা ঘরে ছিল একগাদা ঝাড়বাতি। একসময়ে যখন ইলেকট্রিক ছিল না তখন ফরাশ ঘরে ঘরে এগুলো জ্বালিয়ে দিত। সেসব অবশ্য তিনি দেখেননি। কিন্তু সেই ঘড়িটা? সেটা কোথায় গেল?

দিবাকর এঘর-ওঘর খুঁজতে লাগলেন। হ্যাঁ, এই যে রয়েছে ঘড়িটা। দেওয়ালের এককোণে কালো আবলুশ কাঠের কারুকার্যকরা তাকের ওপর রয়েছে ওটা। ঝুল জমে গেছে। ঘড়িটার বৈচিত্র্য ছিল। ডায়ালের সংখ্যাগুলো ছিল রোমান হরফে আর কঁটাগুলো ছিল সোনালী রঙের। তীক্ষ্ণ তীরের মতো। ঘড়িটা প্রতি ঘণ্টায় গির্জার ঘণ্টার মতো গম্ভীর আওয়াজ দিত। সেই শব্দ এ বাড়ির যেখানে যেই থাক, শুনতে পেত।

বাড়ির নিচের তলায় একটা ঘরে পাওয়া গেল বিরাট একটা কাঠের সিন্দুক। মস্ত একটা জং-ধরা তালা লাগানো। এ-সিন্দুক ছোটোবেলা থেকেই তিনি দেখে আসছেন। কিন্তু কোনোদিন সেটা খুলে কেউ দেখত না। কারও আগ্রহ ছিল না। আজ তিনি খুললেন। দেখলেন তার মধ্যে একগাদা পুরনো কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ। অনেকগুলো পাঁজি; কিছু পুজোর সরঞ্জাম, যেমন–পিলসুজ, ঘণ্টা, পঞ্চপ্রদীপ, শাঁখ, একটা বিরাট পাঁঠাকাটার খাঁড়া।

এইসব দেখতে দেখতে তিনি আনন্দে রোমাঞ্চিত হলেন। শিস দিতে লাগলেন।

.

০৪.

সদাশিবের আতঙ্ক

দিবাকরের আনন্দ কিন্তু বেচারি সদাশিবের আতঙ্ক। এতদিন সে মনিবের সঙ্গে অনেক ভালো ভালো জায়গায় ঘুরেছে। কিন্তু এমন হতচ্ছাড়া জায়গায় এসে যে তাকে থাকতে হবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। তার এমনিতেই একটু ভূতের ভয় আছে। এখন এই বাড়িতে এসে কি জানি কেন সবসময়ে কাঁটা হয়ে থাকে। তার ঘরটাও নিচে একটেরেসিঁড়ির ঠিক পিছনে। চিৎকার করে মরে গেলেও কেউ শুনতে পাবে না।

ভয়ে যে সে কাঁটা হয়ে থাকে তার কারণও আছে।

প্রথমত, বাড়িটাই কেমন বিচ্ছিরি। এত বড়ো বাড়ি, কিন্তু জনপ্রাণী নেই! এ কিরে বাবা! সব যেন মরে হেজে গেছে। মরে গিয়ে ভূত হয়ে সবাই যেন এক-একটা ঘরে অদৃশ্য হয়ে বাদুড়ের মতো ঝুলছে।

তারপর সেই প্রথম দিন–দোতলার ঘর খুলেই মনিব এমনভাবে টর্চ নিয়ে আসতে বললেন যে দিনের বেলাতেই তার বুকে কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল। বাবু টর্চ জ্বেলে দেখে হেসে বললেন বটে কিচ্ছু না, কিন্তু নিশ্চয়ই তিনি কিছু দেখেছিলেন। মুখে কবুল করলেন না।

এর ওপর এখানে আসার ঠিক তিন দিনের মাথায়–

রাত তখন সবে সাড়ে সাতটা কি আটটা, সে রান্না করতে করতে নিজের ঘরে এসেছিল দেশলাইয়ের খোঁজে। হঠাৎ দেখল কে যেন পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে।

সদাশিব তখনই সিঁড়ির মুখে ছুটে গিয়ে হাঁকল, কে?

কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। আবছা মূর্তিটা কিন্তু তখনও উঠছে।

চোর মনে করে সদাশিব পিছনে ধাওয়া করল। কিন্তু ঠক করে দেওয়ালে মাথা ঠুকে যেতেই সে দেখল কেউ কোথাও নেই। অন্ধকারে তারই মাথা ঠুকে গেছে।

এতক্ষণে দেশলাইটার কথা মনে পড়ল। দেশলাইটা হাতেই রয়েছে। দেশলাই জ্বেলে সাবধানে নিজের ঘরে এসে ঢুকল।

চোখের ভুল নিশ্চয়। নইলে চোরটা পালালো কোথা দিয়ে! তবু তার মনে হতে লাগল– চোর বটে তো! না অন্য কিছু?

নিশ্চয়ই অন্য কিছু। নইলে ফের একদিন ঐরকম দেখবে কেন?

রাত তখন নটা। সে বাবুর রাতের খাবার নিয়ে ওপরে উঠছিল। সিঁড়িটাও বিচ্ছিরি। সোজা নয়, সাপের মতো এঁকেবেঁকে উঠে গেছে। তেমনি অন্ধকার। বাঁকের মুখে তেমন কিছু আছে কিনা দেখার উপায় নেই।

সে উঠছিল। হঠাৎ মনে হলো অল্প দূরে কালোমতো কিছু একটা যেন সিঁড়ির ওপরে পড়ে রয়েছে।

কি ওটা?

সদাশিব একটু দাঁড়িয়ে পড়ল। বুঝতে চেষ্টা করল জিনিসটা কি?

তারপরেই ও চমকে উঠল। দেখল জিনিসটা নড়ছে। শুধু নড়াই নয়, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। ক্রমে বুঝতে পারল একটা যেন মানুষের শরীর। শরীরটা হামাগুড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। পরিষ্কার দেখল পরনের কাপড়টা সারা গায়ে জড়ানো–মেয়েরা যে ভাবে শাড়ি পরে।

সে চিৎকার করে উঠল। পরক্ষণেই মূর্তিটা যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সদাশিবের সামলাতে একটু সময় লাগল। তারপর খাবার নিয়ে ওপরে গেল। ভাবল মনিবকে ব্যাপারটা বলবে। কিন্তু বলতে পারল না। কেননা তার মনিব মানুষটা অদ্ভুত। তিনি ভয় পান না। ভয় পেতে ভালোবাসেন। তিনি নাকি ভয়ের খোঁজেই এখানে এসে বাস করছেন।

কিন্তু একটা দুর্ভাবনা থেকেই গেল–এই যে সে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অত জোরে চিৎকার করল তবুও তা বাবুর কানে পৌঁছল না!

দুদিনের এই ঘটনায় সদাশিব যে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকবে তাতে সন্দেহ কি?

আরও একটা ব্যাপার ইদানীং ঘটছে। সেটা অবশ্য এ বাড়িতে নয়।

মাঝে মাঝে অনেক রাতে তার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। একদিন অমনি ঘুম ভেঙে গেলে সে শুনতে পেল অনেক দূরে একটা শব্দ–খটাখটখটাখটখটাখট …।

শব্দটা যেন পাকা রাস্তায় হচ্ছে। নিস্তব্ধ রাত্তিরে শব্দটা বেশ পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু কিসের শব্দ ঠিক বুঝতে পারল না। এক একসময় এক একরকম মনে হলো। একটু পরেই শব্দটা থেমে গেল।

এমনি শব্দ পরপর তিন দিন শুনল। শব্দটা তার কোনো ক্ষতি করছে না। কিন্তু কেবলই মনে হতে লাগল খুব শীগগিরই এ বাড়িতে কোনো বড় রকমের ক্ষতি হবে। শব্দটা যেন সেই কথাই জানিয়ে দিচ্ছে।

সদাশিব ঠিক করল, এবার কিছু হলেই সে বাবুকে জানাবে–তা বাবু বিশ্বাস করুন আর নাই করুন।

সদাশিব এখন পারতপক্ষে সন্ধেবেলা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চায় না। বাবুর খাবার নিয়ে যখন যায়, তখন এক হাতে থালা আর এক হাতে লণ্ঠন। লণ্ঠনে নিজের ছায়া দেখে নিজেই শিউরে ওঠে। এ তো মহা মুশকিল হলো!

ইদানীং বাবুরও বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করছে সে। তার সেই হাসিখুশি ভাবটা আর নেই। একটুতেই রেগে যান। সবসময়ে কি যেন চিন্তা করছেন। আগে বেশ ছবি আঁকতেন। মাঝে মাঝে তাকে ডেকে বলতেন, সদা, দেখ তো ছবিটা কেমন হচ্ছে! সে তো ছবির ভাবি বোঝে। তবু বলত, খাসা।

এইটুকু শুনেই বাবু খুশি হতেন। কিন্তু এখানে এসে পর্যন্ত বাবুকে আর ছবি আঁকতে দেখেনি। এখন রাত্তিরে কি একটা খাতা পড়েন মন দিয়ে। মাঝে মাঝে তা থেকে কাগজে কি লেখেন।

বাবুর হুকুম-রাত নটার সময় খাবার দিতে হবে। তার আগেও নয়, পরেও নয়। খেয়েদেয়ে ঘরে খিল দিয়ে বাবু কি যে করেন তা ভগবান জানেন। তবে রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত তাঁর ঘরে আলো জ্বলতে দেখেছে। অথচ এর আগে উনি কখনো এত রাত জাগতেন না।

সেদিন অমনি রাত নটার সময়ে খাবার নিয়ে ওপরে বাবুর ঘরে গেছে। বাবু তো রেগে কাঁই। বললেন, এত তাড়াতাড়ি খাবার আনতে কে বললে?

সদাশিব মনে করিয়ে দিল রাত নটাতেই তো সে খাবার দিয়ে যায়।

মুখের ওপর উত্তর শুনে বাবু কখনো যা করেন না তাই করলেন। থালাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।

সেদিন সদাশিব যত না দুঃখ পেয়েছিল তার চেয়ে বেশি পেয়েছিল ভয়। সে রাতে বাবু খাননি বলে সদাশিবও কিছু মুখে তুলতে পারেনি।

তিন দিন পর আবার এমন একটা ঘটনা ঘটল যা দেখে সদাশিব এবার তার অমন বাবুকেও ভয় পেতে লাগল।

সেদিন দুপুরবেলা, বাবু কতকগুলো পুরনো ছেঁড়া কাগজ রোদ্দুরে দিয়েছিলেন। একটা ছাগল এসে কাগজগুলো চিবুতে লাগল। বাবু দেখামাত্রই ছুটে এসে ছাগলটাকে এক হাতে তুলে গলা টিপে ধরলেন। ছাগলটা ব্যা ব্যা করে ধড়ফড় করতে করতে মরে গেল।

উঃ! তখন বাবুকে কী ভয়ঙ্করই না দেখাচ্ছিল! অথচ মানুষটা কখনো একটা পিঁপড়েকেও পা দিয়ে টিপে মারেননি।

এইসব যতই দেখছে সদাশিব ততই ভয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তার তখন কেবল এই কথাটাই মনে হতে লাগল–এ বাড়িতে কারো আসা দরকার। কিন্তু কেই-বা তার আছে?

আছে একজনই–বাবুর সেই কলকাতার বন্ধু। আঃ! তিনি যদি একবার এখানে আসতেন। তিনিই তো ভাড়াটে উঠিয়ে বাড়িটা খালি করে দিয়েছেন। তবেই না বাবু এখানে আসতে পারলেন। তা তিনি কি একবার বন্ধুকে দেখতে এখানে আসবেন না?

.

০৫.

সুরঞ্জনের সাবধানবাণী

একেই বোধহয় বলে টেলিপ্যাথি।

সদাশিব যেভাবে মনে মনে সুরঞ্জনকে ডাকছিল, সে আর না এসে পারে?

সুরঞ্জনকে পেয়ে দিবাকর খুব খুশি। অভিমান করে বললেন, এখানে এসেছি আজ দশ দিন। এত দিনে মনে পড়ল?

সুরঞ্জনও উল্টো অভিমান জানালেন, এসে পর্যন্ত একটা চিঠিও দাওনি ভাই। শেষে থাকতে না পেরে চলে এলাম।

বেশ করেছ। অ্যাই সদা

সদাশিব এসে দাঁড়ালো।

দেখছিস, কে এসেছে? আমার ফ্রেন্ড–দি ওনলি ফ্রেন্ড। ফ্রায়েড রাইস আর মাংস লাগা।

সদাশিব খুশি হয়ে চলে গেল। দিবাকর সুরঞ্জনকে নিয়ে দোতলায় উঠল।

শুনেছি কলকাতায় কোথাও কোথাও নাকি খুব পুরনো জিনিস কিনতে পাওয়া যায়? সোফায় বসে দিবাকর জিজ্ঞেস করল।

হ্যাঁ, মাঝে মাঝে নিলামের বিজ্ঞাপনে দেখি।

তা ভাই, খোঁজ পেলে আমায় জানিও তো।

কেন? পুরনো জিনিস নিয়ে কি করবে?

 এমনিই। একটা ছবির খোঁজ করছি।

এই সময়ে সদাশিব কফি আর টোস্ট দিয়ে গেল। সে ভারি খুশি। তার মনিব আবার আগের মতোন হয়ে গেছেন।

সুরঞ্জনের পরনে শার্ট, ট্রাউজার। বেশ স্মার্ট চেহারা। সবসময়ে হাসিখুশি। কোনো এক বড়ো অফিসের ছোটোখাটো অফিসার। কিন্তু কে ভাবতে পারে এই মানুষই আবার তন্ত্রমন্ত্র করেন, প্রেতাত্মা নিয়ে পড়াশোনা করেন।

একসময়ে দিবাকরের সঙ্গে কলকাতায় পড়তেন। খুব ভাব ছিল। তারপর দুজনে দুদিকে ছিটকে গেলেন যে যাঁর কাজে। তবে যোগাযোগটা ছিল বরাবর।

খাওয়া-দাওয়ার পর দিবাকর বললেন, তোমার চেষ্টাতেই বাড়িটা উদ্ধার করা গেছে। এসো গোটা বাড়িটা ঘুরে দেখাই।

দিবাকর সারা দুপুর সুরঞ্জনকে বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখালেন।

বাড়ির পিছনে এক জায়গায় ভাঙা ছাদমতো ছিল। সেখানে এসে সুরঞ্জন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।

কি দেখছ?

এখানে কি ছিল বলতে পার?

শুনেছি ঘোড়ার আস্তাবল ছিল। আমার পূর্বপুরুষেরা ঘোড়ায় চড়তে ভালোবাসতেন। পরে বোধহয় ফিটন-টিটন ছিল। ঐ দেখ না একটা ভাঙা চাকা এখনও পড়ে আছে।

সেখান থেকে দোতলায় ফিরে এসে সুরঞ্জন জিজ্ঞেস করলেন, তা তুমি হঠাৎ এখানে চলে এলে কেন?

বন্ধুর প্রশ্নে দিবাকর বললেন, আমার দেশ–আমার পূর্বপুরুষের বাড়ি। এখানে এসে থাকব না তো সারা জীবন ভেসে ভেসে বেড়াব?

দিবাকর কথাটা হেসেই বললেন, কিন্তু সুরঞ্জন হাসলেন না। বললেন, আমায় সত্যি কথাটা বলো তো, আসল উদ্দেশ্যটা কি?

দিবাকর তখন গ্যাংটকের দোকানে সেই ছবির কথা থেকে শুরু করে সবকিছু বন্ধুকে জানালেন। বললেন, ছবিটা হাতছাড়া হয়ে গেল। তাই আমি নিজেই ঐরকম একটা ছবি আঁকতে চাই। ঐ ছবিটা ভাই আমায় পেয়ে বসেছে।

এই ছবিটার জন্যেই কি তুমি কলকাতায় খোঁজ করতে বলছ?

এগজ্যাক্টলি।

তা সেই ছবি আঁকার জন্যে এখানে এসে থাকার কারণ কি?

একটু চুপ করে থেকে দিবাকর বললেন, তুমি ছবি আঁক না, তাই বুঝবে না নিজে চোখে না দেখলে নিজের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে স্পর্শ করতে না পারলে কখনো ওরকম ছবি আঁকা যায় না। ঐরকম কিছু এ বাড়িতে দেখতে পাব, এই আশাতেই আমি এখানে এসেছি।

তুমি নিশ্চিত এখানে কিছু পাবে?

হ্যাঁ। অতীতে এ বাড়িতে অনেক গুপ্তহত্যা হয়ে গেছে বলে শুনেছি। স্থানীয় লোকেরাও নাকি এ বাড়িটা এড়িয়ে চলে। হতে পারে এটা ওদের সংস্কার। কিন্তু এই কদিনে আমি যেন কিছুর আভাস পাচ্ছি। আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি।

পেয়েছ কিছু?

ঐ যে বললাম, আভাস পাচ্ছি। যেমন প্রথম দিন ওপাশের ঘরে ঢুকতেই অন্ধকারে স্পষ্ট দেখলাম সেই ছবিটা দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে। তবে অনেক বড়। অত বড়ো ছবি কেউ দেওয়ালে টাঙায় না।

তারপর?

তারপর সদাশিবকে টর্চ আনতে বললাম। আলো জ্বেলে দেখি সব ফাঁকা।

একটু থেমে বললেন, তুমি শুধু তুমি কেন, সবাই বলবে চোখের ভুল। তা হতে পারে। কিন্তু তবু কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।

সুরঞ্জন হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন।

চলো তো ঘরটা দেখে আসি।

দুজনে পাশের ঘরে গেলেন। বন্ধ দরজা-জানলা খোলা হলো। ধুলোর গন্ধ, মাকড়সার জাল, একটা বিছানাশূন্য খাট ছাড়া আর কিছুই দেখার নেই।

সুরঞ্জন অনেকক্ষণ ধরে ঘরটা পরীক্ষা করলেন। তারপর ফিরে এসে সোফায় গুম হয়ে বসে রইলেন।

দিবাকর বন্ধুর পিঠ চাপড়ে বললেন, কি হলো? কিছুর সন্ধান পেলে নাকি?

সুরঞ্জন গম্ভীর গলায় বললেন, আমার মনে হচ্ছে তুমি নিজেকে বিপদের মধ্যে জড়িয়ে ফেলছ। আমি নিজে প্রেতচর্চা করি। খবরের কাগজে আমার কথা অনেক লেখা হয়েছে। আমি বলছি এ বাড়িটা বিপজ্জনক।

দিবাকর উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন, তুমি তাহলে বলছ–এখানে সত্যিই কিছু আছে। বেঁচে থাকো ভাই, বেঁচে থাকো। আমি তো তাই চাই।

না, না, দিবাকর! গোঁয়ার্তুমি কোরো না। আমি বলি তুমি এ বাড়িটা ছেড়ে দাও।

দিবাকর গলা ফাটিয়ে হেসে উঠে জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, নো .. নো .. নো…

নিচে রান্নাঘরে বসে দিবাকরের ঐরকম উৎকট হাসি শুনে সদাশিব চমকে উঠল।

হাসি থামিয়ে দিবাকর সুরঞ্জনকে আর একটা নতুন খবর দিলেন। একটা দেরাজের ভেতর থেকে একটা পুরনো ডায়েরি পেয়েছেন। শুধু ডায়েরিই নয়, দেরাজের মধ্যে আরো ছিল সাহেবদের একটা টুপি, একটা ছড়ি, মহারানী ভিক্টোরিয়ার একটা ছবি, আর মেমেরা যেরকম পরে সেরকম একটা গাউন। সম্ভবত দেরাজটা কোনো সাহেববাড়ির। কিভাবে সেই দেরাজ জমিদারবাড়িতে এল তার মীমাংসা তিনি এখনও করে উঠতে পারেননি, তাও জানালেন। হয়তো এ বাড়ির সঙ্গে সাহেবদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

ডায়েরিটা একজন মেমসাহেবের লেখা। অনেকগুলো পাতা নেই। ছিঁড়েও গেছে অনেক জায়গায়। ডায়েরিটা তিনি পড়ছেন। ভারি ইন্টারেস্টিং।

সুরঞ্জন বললেন, ডায়েরিটা পড়াও আমাকে।

দিবাকর জোরে জোরে মাথা নাড়লেন। বললেন, আগে আমি শেষ করি। তারপর তুমি একদিন এসে সারাদিন বসে বসে পড়ো।

সুরঞ্জন হেসে বললেন, তার মানে তুমি ওটা হাতছাড়া করতে চাও না।

ঠিক তাই। ওটা অমূল্য সম্পদ। এই রহস্য নিকেতনের চাবিকাঠি।

সুরঞ্জন কলকাতা ফিরে গেলেন। বলে গেলেন, কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখলেই যেন খবর দেয়।

.

সেই দিনই। রাত তখন সবে সাড়ে আটটা। দিবাকর নিজের ঘরে বসে ডায়েরিটা পড়ছিলেন, সদাশিব এসে দাঁড়ালো।

কি খবর সদাশিব! খাবার রেডি?

না, বাবু, একটু দেরি আছে।

 বেশ, যাও।

সদাশিব তবু গেল না।

কিছু বলবে নাকি?

হ্যাঁ, বাবু।

 বলে ফ্যালো।

 এ বাড়িটা ছেড়ে অন্য কোথাও গেলে হয় না?

দিবাকর নন্দী অবাক হয়ে বললেন, কেন? এ তো আমার নিজের বাড়ি।

তা তো জানি। কিন্তু এ বাড়িতে–সদাশিবের কথা আটকে গেল।

  থামলে কেন? বলো।

এ বাড়িতে ভয়ের ব্যাপার আছে।

গভীর রাতের আগন্তুক

দিবাকরের দু চোখ খুশিতে চনমন করে উঠল।

তাই নাকি? কিরকম ভয় বলো তো শুনি। আমি তো ভয়ের জন্যেই এখানে পড়ে আছি। কিন্তু এমনই কপাল, ভয়ের টিকিটি দেখতে পেলাম না আজ পর্যন্ত।

সদাশিব অবাক হয়ে শুনল। তার মনিব বলে কী! মানুষটা সত্যিই পাগল হয়ে গেল নাকি?

তা তোমার ভয়ের বাণী একটু শোনাও। দিবাকর ডায়েরির পাতা থেকে মুখ তুলে তাকালেন।

সদাশিব মাথা নিচু করে বললে, সন্ধের পর প্রায়ই দেখি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে কেউ যেন উঠে যাচ্ছে। চোর ভেবে আমি পিছু ধাওয়া করেছিলাম। কিন্তু আদ্ধেক সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে সে যে কোথায় মিলিয়ে যায় তা আর দেখতে পাই না।

এরকম কতদিন দেখেছ?

এজ্ঞে তা এসে পর্যন্ত।

তাই নাকি! তা আমি তো বাছা একদিনও দেখতে পাই না।

এর আর উত্তর কী দেবে? একটু চুপ করে থেকে সদাশিব বলল, আমার ঘরটা সিঁড়ির কাছেই। ও ঘরে আমি থাকতে পারব না।

দিবাকর খুব খানিকটা হেসে বললেন, ও এই ব্যাপার? তা ঠিক আছে। তুমি দোতলাতেই শুয়ো।

সদাশিব তবু দাঁড়িয়ে রইল। দিবাকর জিজ্ঞেস করলেন, আর কিছু বলবে?

 এজ্ঞে রোজ রেতে আমি একটা শব্দ শুনতে পাই।

শব্দ! কিসের শব্দ?

 খুব দূরে–মানে বড়ো রাস্তায়। ঠিক যেন একটা ঘোড়ার গাড়ি যাচ্ছে।

 তা তো যেতেই পারে।

সদাশিব মাথা চুলকে বলল, কিন্তু রোজ রাতদুপুরে ঘোড়ার গাড়ি যাবে? একটু পরেই কিন্তু শব্দটা থেমে যায়!

থেমে যায়, না মিলিয়ে যায়?

এজ্ঞে?

 বলছি শব্দটা একেবারে হঠাৎ থেমে যায়, না দূরে মিলিয়ে যায়?

 এজ্ঞে থেমে যায়।

দিবাকর বিরক্ত হয়ে বললেন, ও তোমার শোনার ভুল। যাও, রান্না করো গে।

সদাশিব মাথা হেট করে তখনই চলে গেল।

অন্ধকার সিঁড়ি। সবে কয়েক ধাপ নেমেছে, হঠাৎ সদাশিব শক্ত হয়ে গেল। দেখল নিচ থেকে ধীরে ধীরে একটা কালো কাপড় পরা মূর্তি ওপরে উঠে আসছে ….

সেই মুহূর্তে সদাশিব কি করবে ভেবে পেল না। এদিকে মূর্তিটা তখন একেবারে ওর সামনে এসে পড়েছে।

এইরকম বিপদের সময় বিভ্রান্ত মানুষ হয় পিছু ফিরে দৌড়োয়, না হলে মরণপণ করে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সদাশিব পিছু ফেরার সময় পেল না। সে মরিয়া হয়ে মূর্তিটার ওপর ঝাঁপ দিল।

ঘরে বসে দিবাকর হুড়মুড় করে কিছু পড়ার শব্দ পেয়ে তখনই টর্চ হাতে ছুটে গেলেন। দেখলেন একেবারে সিঁড়ির তলার ধাপে সদাশিব পড়ে পড়ে গোঙাচ্ছে।

দিবাকর তাকে টেনে তুললেন। কি হয়েছে? পড়লে কি করে?

সদাশিব সিঁড়িতে বসেই অতি কষ্টে সব কথা বলে গেল। শেষে বলল, মুখটা দেখেছে। মেয়েমানুষের মুখের মতো অনেকটা। কিন্তু ভয়ঙ্কর।

মেয়েমানুষের মুখ! চমকে উঠলেন দিবাকর। তবে কি সেই ছবির মুখের অধিকারিণী নিজেই এখানে এসেছে দেখা দিতে?

.

০৬.

মিসেস ফেনটনের ডায়েরি

 দিবাকর যে ডায়েরিটা পেয়েছিলেন সেটা রোজ রাত্তিরে একাগ্রমনে পড়েন। ডায়েরিটার অনেক জায়গাতেই ছেঁড়া। কোথাও কোথাও লেখা বিবর্ণ হয়ে গেছে। পড়া দুষ্কর। ডায়েরিটা লিখেছিলেন মিসেস ফেনটন নামে উত্তর আয়ারল্যান্ডের এক মহিলা। সালটাও পরিষ্কার নয়। শুধু কোনোরকমে ১৮ পর্যন্ত পড়া গেছে।

ডায়েরিটার বৈশিষ্ট্য প্রত্যেক চ্যাপটারের মাথায় একটা মেমের স্কেচ আঁকা। সম্ভবত মেম নিজেই নিজের স্কেচ করেছেন। মেমের বয়েস আনুমানিক পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ।

ডায়েরির বেশির ভাগ জুড়েই তার ঘরগেরস্থর কথা। ডায়েরিটা বাংলায় অনুবাদ করলে এইরকম দাঁড়ায়–এক জায়গায় লিখেছেন…আমি যখন অফিসারের স্ত্রী হয়ে প্রথম কলকাতায় এলাম তখন আমার কাজের জন্যে আটজনের একটা দল পাঠানো হলো। তার মধ্যে একজন রাঁধুনী, তার সঙ্গে তার মশলাদার বা সহকারী। একজন খানসামা যে টেবিলে খাবার পরিবেশন করবে এবং সেইই বাজার-হাট করবে মেমসাহেবের (অর্থাৎ আমার) হুকুম অনুসারে। এটা ধরেই নেওয়া হতো প্রতি টাকায় সে দু আনা নেবে। এছাড়া টাকা-পয়সার হিসেবেও তঞ্চকতা করত। যেমন একটা মুর্গি তিন আনাতে পাওয়া যেত কিন্তু সে হিসেবে দেখাত আট আনা থেকে বারো আনা। তিন টাকার একটা শুয়োর কিনে লিখত পাঁচ টাকা। একটা পাঁঠার পা আট আনায় কিনে দু টাকা বলত। দুজন খিদমদগার সবসময়ে আমার পাশে পাশে থাকত কিছু বলামাত্র তা করার জন্য। খানসামার কাজ ছিল শুধু টেবিলে খাদ্য পরিবেশন করা। খিদমদগার লক্ষ্য রাখত কেউ কাঁটাচামচ পকেটে ঢুকিয়ে সরে পড়ছে কিনা। কেননা ওগুলো ছিল রুপোের। দরজি, ভিস্তিওয়ালা সর্বক্ষণ অপেক্ষা করে থাকত কখন কোন কাজে ডাক পড়বে।

কিন্তু নন্দীগ্রামে এসে জমিদারবাড়ি মহলেশ্বরীতে গিয়ে সেখানকার রানীদের পরিচারিকার সংখ্যা, সৌন্দর্য আর সপ্রতিভ ভাব দেখে চমকিত হয়েছি। সবাই সুন্দরী। পুরুষরাও সুন্দর। কারো কারো গোঁফ কটা। ভারি ভলো লাগত।

এঁদের খানদানি কায়দা-কানুন দেখলে ভাবি এঁরাই যদি এমন হন তাহলে না জানি মোগল বাদশাহের হারেম কিরকম ছিল।

এর পর খানিকটা ছেঁড়া। তারপর লেখা…এ বাড়িতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মহিলা এ বাড়ির রানীমা। বয়েস পঞ্চাশ-এর কাছাকাছি। কিন্তু অপূর্ব সুন্দরী। ঠিক যেন হিন্দুদের গডেস, দুর্গা। আমি তার একটা ছবিও এঁকেছি। ভাবছি কোনো একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে এটি তাকে প্রেজেন্ট করব।

এ বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন যে কত তার শেষ নেই। আমি এতদিন আসছি তবু সবাইকে চিনতে পারি না। নামও ভুলে যাই। ছোটো পুত্রবধূ যোড়শীই আমার বান্ধবী। ভারি মিষ্টি

মেয়েটা।

এ বাড়িতে বড়ো তরফ, মেজো তরফ, ছোটো তরফ নামে এক-একটা পরিবার আছে।

এ বাড়িতে একজন বিবাহিতা মেয়ে আছে–বছর চব্বিশ বয়েস। বেশ সুন্দরী কিন্তু খুব তেজী আর মেজাজী। সে সবসময়ে ভুরু উঁচিয়েই আছে। খুব কম কথা বলে। তাকে আমার তেমন ভালো লাগে না। তবে যখন জানলাম যে, কোনো বিশেষ কারণে তাকে বাপের বাড়িতেই থাকতে হয় আর তার স্বামী আসে মাসে মাত্র দু-তিন বার, আর তাকে বিশেষ। করে স্বামীকে কেউ পছন্দ করে না, বরঞ্চ খুব অনাদর, অবহেলা করে তখন তার প্রতি আমার সহানুভূতি হলো, শুধু তাই নয়, সেদিন এক মারাত্মক খবর শুনলাম–এ বাড়িরই কোনো ছেলে মেয়েটার (মেয়েটার নাম বিজলী) স্বামীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে যাতে সে এ বাড়ি ঢুকতে না পারে। উঃ! কী নিষ্ঠুর! আর কেউ তার প্রতিবাদ করছে না। কাজেই মেয়েটা যে সবার ওপর বিরক্ত হবে এ তো স্বাভাবিক।

কিন্তু ষড়যন্ত্র কিসের কারণে তা এখনো পরিষ্কার জানতে না পারলেও আভাসে ইঙ্গিতে এইটুকু জেনেছি যে, জামাই নাকি খ্রিস্টধর্মাবলম্বী হতে চায়।

এখন মনে পড়ছে ভবানীপ্রসাদ নামে একজন ইয়ং স্মার্ট, হ্যান্ডসাম ছেলে প্রায়ই আমাদের ওখানে যায়। খ্রিস্টধর্ম নিয়ে আলোচনা করে। তাহলে এই ভবানীপ্রসাদই কি এ বাড়ির জামাই– বিজলীর স্বামী?

এর পর ছেঁড়া।

তারপর এক জায়গায় লেখা…আজ আরও কিছু খবর জানলাম। এ বাড়ির মেজো তরফের এক ছেলে বটুকেশ্বর খুব উচ্ছঙ্খল প্রকৃতির। সে তাদের এই ভগ্নিপতি ভবানীপ্রসকে সহ্য করতে পারে না। একটা কারণ তার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা। এ ছাড়াও বোধহয় বৈষয়িক কারণও আছে। তাকে খুন করবার যড়যন্ত্র হচ্ছে জেনে বিজলী গভীর রাতে তার স্বামীকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেয়। ঘোড়ায় চেপে ভবানীপ্রসাদ পালায়। দশ মিনিট পরে শিকার পালিয়েছে জেনে ক্রুদ্ধ বটুকেশ্বর গাড়ি নিয়ে তার পিছনে ধাওয়া করে। কিন্তু তাকে ধরতে পারেনি। ভবানীপ্রসাদ সেই থেকে নিরুদ্দেশ। ফিরে এসে বটুকেশ্বর এই দূরসম্পর্কের বোনটির ওপর অকথ্য নির্যাতন করে।

আমি অবাক হই বটুকেশ্বরের এই স্পর্ধা দেখে। আর দুঃখ পাই অন্য সকলের মুখে কুলুপ আঁটা দেখে। আশ্চর্য, কেউ প্রতিবাদ পর্যন্ত করে না। এক-একসময়ে ভাবছি এ বাড়িতে আর আসব না। কিন্তু রানীমা বা ষোড়শীর একটা আশ্চর্য আকর্ষণী শক্তি আছে যে!

এর পর অনেক কটা পাতা নেই। তারপর এক জায়গায়….কোথায় কলকাতা আর কোথায় এই নন্দীগ্রাম! জানলা দিয়ে সারা দুপুর নীলচাষ দেখি। রাত্রে আমার সঙ্গে কেউ না থাকলে ঘুমোতে পারি না। শেয়ালের ডাক তো আছেই, তার ওপর আছে নানারকম নিশাচর পাখির ডাক। তা ছাড়া এখানে সবাই অল্পবিস্তর ভূতের ভয় পায়। আশ্চর্য কিছু নয়। জায়গাটা বড়ো বিশ্রী।

আমিও এসে পর্যন্ত সন্ধের পর যেখানে সেখানে ছায়া দেখি। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু সেদিন রাত্রে বাথরুম যেতে গিয়ে পিছনের ঘোরানো সিঁড়িতে মানুষের মতো কিছু একটাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখলাম, সেদিন সত্যিই ভয় পেলাম। তবে একথা কাউকে বলিনি। কেননা তা অনেকে বিশ্বাস করবে না। কেউ কেউ সত্যিই ভয় পাবে।…

এইটুকু পড়ে দিবাকরের দুচোখ খুশিতে নেচে উঠল। যাক, এতক্ষণে ডায়েরিতে একটু ভয়ের গন্ধ পাওয়া গেল।

এমনি সময়ে ঢং ঢং করে গম্ভীর আওয়াজে সেই ঘড়িটায় বারোটা বাজল।

.

০৭.

আবার রহস্যময় ছবি

 দুষ্প্রাপ্য কিছু ছবির বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল স্টেটসম্যান পত্রিকায়। দিবাকরের অনুরোধ মতো তারই কাটিং পাঠিয়েছেন সুরঞ্জন।

সেটা পেয়েই দিবাকর চলে এলেন কলকাতায়। বন্ধুর সঙ্গে হাজির হলেন পার্কস্ট্রিটের একটা ছোটোখাটো দোকানে। সেখানে এক বৃদ্ধ অ্যাংলো একটা বড়ো টেবিলে ছবিগুলো সাজিয়ে রেখেছে।

অ্যাংলো লোকটা জানাল এইসব ছবি যোগাড় করতে তাকে সারা ভারতবর্ষ ঘুরতে হয়। এবার সে বিভিন্ন রাজবংশের বেশ কিছু ছবি পেয়েছে।

দিবাকরের বড় আশা যদি সে গ্যাংটকের সেই ছবিটা পায়। যদিও সে ভালো করেই জানে একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে সে ছবি আর পাওয়া সম্ভব নয়।

ছবিগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ একটা ছবি হাতে নিয়ে দিবাকর থমকে গেলেন। সুরঞ্জনও ঝুঁকে পড়লেন।

এ তো সাংঘাতিক ছবি! না-না, এ ছবি নিও না। এ ছবি নিয়ে তুমি কি করবে?

কিন্তু দিবাকর ছবিটা দেখে এতই বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন যে তখনই কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তারপর যখন একটা কথাও না বলে দোকানদারকে ছবিটা প্যাক করে দিতে বললেন তখন নিরুপায় সুরঞ্জন শেষ বারের মতো চেষ্টা করলেন, তা ছাড়া ছবিটা ড্যামেজড। এই দ্যাখো, এখানে রং উঠে গেছে।

ও আমি ঠিক করে নেব।

ছবিটা ভালো করে প্যাক করিয়ে দাম চুকিয়ে দিবাকর সুরঞ্জনের বাড়ি চলে এলেন।

সুরঞ্জন বললেন, এ ছবিটা তুমি না নিলেই পারতে।

কেন?

আমার ভালো লাগছে না। কেমন যেন মনে হচ্ছে, গ্যাংটকের দোকানের সেই অশরীরী ছবিটার সঙ্গে এই ছবিটার যোগাযোগ আছে। দিবাকর, আমি বলছি একটা অদৃশ্য নিয়তি তোমাকে ঐ ছবিটা দেখিয়েছিল। সেই নিয়তিই তোমায় টেনে এনেছে তোমার পূর্বপুরুষের বাড়িতে। সেই নিয়তির প্রভাবেই এই ছবিটা তুমি বাড়ি নিয়ে যাচ্ছ। যেন তুমি তোমার সর্বনাশকে বরণ করে ঘরে তুলছ। আমার কথাটা অমন করে হেসে উড়িয়ে দিও না ভাই, অনুরোধ করছি।

দিবাকর হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন, আমিও কিছু একটার গন্ধ পাচ্ছি। সেটা আমি পরীক্ষা করে দেখতে চাই।

সুরঞ্জন হতাশ হয়ে গেলেন। শুধু দিবাকরকে সেদিনটা থেকে যেতে বললেন। কিন্তু দিবাকর রাজী হলেন না। বললেন, বাড়ি ছেড়ে আমি থাকতে পারি না।

সুরঞ্জন ঠাট্টা করে বললেন, হ্যাঁ, বড়োলোক মানুষদের ভাবনা অনেক।

বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে দিবাকর বললেন, টাকা-পয়সা চুরির কথা ভাবছি না। তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতি হবে যদি একটা ছবি চুরি যায়।

সুরঞ্জন হেসেই বললেন, আমাদের দেশে চোর-ডাকাত-ছিনতাইবাজের অভাব নেই। কিন্তু দামী ছবির মর্ম বুঝে চুরি করার মতো উচ্চস্তরের চোরের সংখ্যা কম।

দিবাকর বললেন, তাহলে আসল কথাটা বলি শোনো। প্রত্যেক দিন সন্ধের সময় আমাদের বাড়িতে কেমন একরকম গা-ছমছমানি ভাব হয়। সেটা আমার খুব ভালো লাগে। তাই সন্ধে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমি বাড়িতে ঘুরে বেড়াই। সারাদিন শুধু সময় গুনি কখন বাগানের দেবদারু গাছের মাথায় দিনান্তের শেষ রোদটুকু ম্লান হয়ে আসবে, কখন জামরুল গাছের পাতার আড়ালে কি একটা বিশেষ পাখি ককিয়ে ককিয়ে ডেকে উঠবে, কখন সন্ধে নেমে আসবে আমাদের ঐ মহলেশ্বরীর আলসের গা বেয়ে।

সুরঞ্জন হেসে বললেন, এ যে দেখছি রবীন্দ্রনাথের ক্ষুধিত পাষাণ গল্প!

দিবাকর গম্ভীরভাবে বললেন, সে গল্প আমি পড়িনি। তবে রোজ সন্ধ্যায় ঐ ভয়-ভয় ভাবটা আমার চাই-ই। ওটা আমার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাই। অনেক দেরি হয়ে গেল। আজ চলি। তুমি এসো একদিন।

.

দিবাকর নতুন কেনা ছবিটা তার বেডরুমে টাঙিয়ে রাখলেন। তারপর কখনো কাছ থেকে, কখনো দূর থেকে বারবার ছবিটা দেখতে লাগলেন।

বড়ো অদ্ভুত ছবি। একজন মেয়েকে একটা লোক গলা টিপে মারছে। যে খুন করছে তার পিছনের দিকটাই শুধু দেখা যাচ্ছে। আর দেখা যাচ্ছে তার লোমশ ডান হাতটা।

ছবিটা মন দিয়ে দেখলে কতকগুলো চিন্তা মাথায় আসে–

প্রথমত, মেয়েটার মুখের অবস্থা। ঘাড়টা বাঁ দিকে একটু হেলে আছে। পাথরের মতো চোখদুটো বেরিয়ে এসেছে। মণি দুটো স্থির। এমনকি গলায় চাপ দেবার সময়ে শরীরটা যে ঠেলে উঠেছে, ছবিতে সেটুকু পর্যন্ত পরিষ্কার। অসাধারণ আর্টিস্ট।

দ্বিতীয়ত, মেয়েটার বয়েস বছর তিরিশ। স্বাস্থ্যবতী। মুখটা বড়ো। চোয়াল চওড়া। চুল পিঠ পর্যন্ত ছড়ানো। মেয়েটা কোন দেশী? ইউরোপীয়ান যে নয় তাতে সন্দেহ নেই। বোধহয় বাঙালি। বড়োলোকের ঘরের মেয়ে বা বৌ তা তার গলার হার দেখলেই বোঝা যায়।

তৃতীয়ত, ছবিটা এত উজ্জ্বল যে মনে হয় এটা সম্প্রতি আঁকা। কিন্তু ছবিতে ঘরের মধ্যে ঝাড়লণ্ঠন টাঙানো, দেখলে বোঝা যায় এটা অনেককাল আগের পটভূমিতে আঁকা। ঘরটা জলসাঘর হতে পারে–বেড়রুমও হতে পারে।

চতুর্থত, এ ছবি হঠাৎ আঁকার কারণ কি? কেউ একজনকে খুন করছে, সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তের ছবি কি কোনো আর্টিস্ট শখ করে আঁকতে চায়? অবশ্য যদি না সে নিজে চোখে সে দৃশ্যটা দেখে থাকে!

দিবাকরের তখনই গ্যাংটকের দোকানে সেই ছবিটার কথা মনে পড়ল। সেও যেন অনেকটা এইরকম।

.

০৮.

ছবি-রহস্য

অদ্ভুত ব্যাপার তো!

ছবিটা দেখতে দেখতে দিবাকর একদিন অবাক হলেন। দিনের বেলায় যে ছবিটা কেমন নিষ্প্রাণ, ম্যাড়মেড়ে–একটা ছবিমাত্র মনে হয়, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবির রঙ উজ্জ্বল হতে থাকে।

এক-একদিন রাত দুটো-আড়াইটে পর্যন্ত ছবিটার সামনে বসে থাকেন দিবাকর। এ কি সত্যিই অলৌকিক ব্যাপার?

একদিন অমনি ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলেন এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। লোমশ সেই হাতখানার লোমগুলো একটা একটা করে যেন খাড়া হয়ে উঠছে।

পরের দিন গভীর রাতে ছবিটা দেখতে গিয়ে দিবাকরের নিজের গায়ের নোমই খাড়া হয়ে উঠল।একি আশ্চর্য ব্যাপার! মেয়েটার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে!

আর ঠিক তখনই রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে দূরে কিসের যেন একটা শব্দ শুনতে পেলেন। ভালো করে শোনবার জন্যে তিনি কান পাতলেন। খুব দূরে একটা খটখট শব্দ।

তিনি ছুটে জানলার কাছে গেলেন। কিন্তু শব্দটা আর পেলেন না।

রোজ সন্ধ্যার সময়ে ঘরে ঘরে একা ঘুরে বেড়াবার মতো এই আর একটা নেশা এখন দিবাকরকে পেয়ে বসেছে–প্রতি রাত্রে ছবিটা লক্ষ্য করা।

একটা কথা তার প্রায়ই মনে হয়–শিল্পীর চোখের সামনেই যদি খুনটা হয়ে থাকে তাহলে তিনি বাধা দিলেন না কেন?

উত্তরও যেন খুঁজে পান–হয়তো বাধা দেবার সুযোগ পাননি।

 বেশ, তাহলে ছবি আঁকার কারণ কি?

তারও উত্তর একটা এই হতে পারে যে, খুনের সত্যি ঘটনাটা হুবহু এঁকে রাখা–যেমন এখনকার দিনে লোকে ক্যামেরায় ধরে রাখে।

 কিন্তু অত করবার দরকার কি ছিল?

পুলিশকে

চিন্তায় বাধা পড়ল। হঠাৎ সদাশিব হুড়মুড় করে ঘরে এসে ঢুকল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, বাবু, আবার সেই শব্দ।

শব্দ! কই? বলে উঠে জানলার ধারে গেলেন।

হ্যাঁ, শুনলেন। স্পষ্টই শুনলেন সেই শব্দ। খটাখট-খটাখট–ঠিক যেন একটা ঘোড়া দুরন্ত গতিতে ছুটে আসছে।

ও তো ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ। ফিটনে-টিটনে চড়ে কেউ যাচ্ছে। একটু থেমে আবার বললেন, এতে ভয় পাবার কি আছে? আচ্ছা যাও, ওঘর থেকে বন্দুকটা এনে দাও।

সদাশিব কাঁপতে কাঁপতে বন্দুকটা এনে দিল। দোনলা বন্দুক। ভেতরে জার্মান কান্ট্রিজ পোরা।

যাও শোওগে। কোনো ভয় নেই। আমি জেগে আছি।

ইতিমধ্যে শব্দটা থেমে গেছে। সেই পুরনো ঘড়িটায় বাড়ি কাঁপিয়ে শব্দ হলো ঢং ঢং। রাত দুটো।

.

পরের দিন দিবাকর আবার ছবিটা নিয়ে বসলেন। সেই একই প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে লাগল– আর্টিস্ট যখন স্বচক্ষে খুন হতে দেখলেন তখন পুলিশকে জানালেন না কেন?

তখনই পাল্টা প্রশ্ন–পুলিশকে জানাননি এটা জানা যাচ্ছে কি করে?

উত্তর : পুলিশকে জানানো হলেও এ ছবি আঁকার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এ ছবি যে উদ্দেশ্যমূলক তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

তাহলে পুলিশকে না জানানোর কারণ কি?

এর একটা উত্তর হতে পারে–এখানকার মতো তখন সম্ভবত পুলিশি ব্যবস্থা ছিল না। অন্তত এই নন্দীগ্রামে। কিংবা থানা-পুলিশ করতে সাহস পাননি।

তাহলে কি মনে করে নিতে হবে প্রত্যক্ষদর্শী শিল্পী আশা করেছিলেন এই ছবি দেখে কেউ না কেউ একদিন মেয়েটাকে শনাক্ত করতে পারবে, মেয়েটা যে আত্মহত্যা করেনি, খুনই হয়েছিল, সেটা প্রমাণ করে দেবে? হয়তো খুনীকেও ধরতে পারবে।

কিন্তু হায়! এ তো বহুকাল আগের ব্যাপার। কে এই হতভাগিনী মহিলা, কে ঐ খুনী, কেই বা সেই প্রত্যক্ষদর্শী আর্টিস্ট, আজ আর তা জানার উপায় নেই। খুনী কি শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছিল? তাই বা কে জানে? যদি ধরা না পড়ে থাকে তাহলে একজন নারীকে খুন করে খুনী দিব্যি বেঁচে রইল? তার শাস্তি কিছুই হলো না? এ কি ভগবানের বিচার!

সারারাত ধরে দিবাকর এইসব আবোলতাবোল ভেবে চললেন।

হঠাৎই আজ দিবাকরের চোখে পড়ল খুনীর বাঁ হাতে একটা তাবিজ বাঁধা। এ থেকে সিদ্ধান্ত করলেন খুনী বিদেশী নয়, অন্তত ভারতীয়। তারপর চুলের রং আর আঁচড়াবার ঢং আর মাথার গড়ন দেখে তার সন্দেহ রইল না যে খুনী বাঙালি।

আবার প্রশ্ন–ছবিটা যে আঁকল সে কে? নিশ্চয় নিহত মেয়েটার কোনো কাছের মানুষ! তা নইলে এত দরদ দিয়ে কখনো ছবিটা আঁকত না। কিন্তু সে কে হতে পারে?

ভাবতে ভাবতে দেখলেন, মেয়েটার মুখে সেদিনের মতো ঘাম ঝরছে। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথাটা ঘুরে গেল। তিনি কোনো রকমে উঠে গিয়ে ঘাড়ে, মুখে জল দিলেন। আবার ঠিক তখনই শোনা গেল সেই শব্দ–খটাখট খটাখট-খটাখট–

একটা ফিটন গাড়ি যেন বড়ো রাস্তা থেকে নেমে এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। দিবাকর বন্দুক হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কেননা এত রাতে ফিটন হাঁকিয়ে যেই-ই আসুক সে অন্তত গল্প করতে আসবে না।

শব্দটা কিন্তু মাঝপথে এসে থেমে গেল।

পরের দিন থেকে তার নতুন এক ধরনের অনুভূতি শুরু হলো। তাঁর মনে হলো যেন ছবিটা তাকে কিছু ইঙ্গিত করছে। যেন তাকে বলছে, খুনীকে ধরো। ওকে শাস্তি দাও। খুন করে বিধাতার রাজ্যে কেউ যেন নিষ্কৃতি না পায়।

দিবাকরের মনে হলো এক যুগ পরে একমাত্র তিনিই পারবেন মেয়েটিকে শনাক্ত করতে আর খুনীকে ধরতে। পারবেনই। কেননা তিনি তো অনেক তথ্যই পেয়ে গেছেন এর মধ্যে। তা ছাড়া

আচ্ছা, ডায়েরিতে কিছু পাওয়া যায় না? সবটা তো পড়ে উঠতে পারেননি। অনেক পাতা অস্পষ্ট বলে তো বাদ দিয়ে গেছেন।

সেই দিনই ডায়েরিটা নিয়ে দিনের আলোেয় বসলেন। বিবর্ণ অক্ষরগুলো কষ্ট করে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পড়বার চেষ্টা করতে লাগলেন।

.

০৯.

ডায়েরির শেষ পাতা

…ধন্যি মেয়ে বিজলী! স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে তাকে বাড়ি থেকে গোপনে সরিয়ে দিয়েছিল সেই অপরাধে উচ্ছঙ্খল বটুকেশ্বর তার গায়ে হাত তুলেছিল। বাড়ির কেউ প্রতিবাদ করেনি। তাই হিন্দু জমিদারবাড়ির মেয়ে হয়েও সে কলকাতায় গিয়ে দারোগাকে নালিশ জানিয়ে এসেছিল। এটা নাকি এ বাড়ির মেয়েদের পক্ষে গর্হিত অন্যায়! সবাই ছি ছি করছিল। দারোগা বটুকেশ্বরকে ধরতে এলে সে পালায়।

কিন্তু কিছুদিন থেকে বটুকেশ্বরকে নাকি বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। যোড়শী শঙ্কিত। সে বলছে, বোধহয় বাড়িতে খারাপ কিছু ঘটবে।

তারপর আর পড়া গেল না। প্রায় শেষ পাতাটার কোনোরকমে পাঠোদ্ধার করা…কি সাংঘাতিক, কি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল সেদিন! ভাবতেও পারিনি আবার ডায়েরি লিখতে পারব। থ্যাঙ্ক গড!

…বিকেলে গিয়েছিলাম নন্দীবাড়িতে। অন্দরমহলে গিয়ে দেখি কোনো বৌ-ই নেই। এমনকি রানীমাও। আশ্চর্য! গেল কোথায় সব?..আমি যদি জানতাম সেদিন হিন্দুদের শিবপুজোর দিন-ওদিন বাড়ির মেয়েরা সব বাড়ির পিছনে শিবমন্দিরে পুজো দিতে গেছে তাহলে কি আমি ওবাড়িতে যাই? জানতাম না বলেই আমি এমহল, ওমহল খুঁজে বেড়াচ্ছি, কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। তখন সন্ধে হয়ে এসেছে, ফিরে যাব ভাবছি, হঠাৎ একটা ঘর থেকে চাপা গোঁ গোঁ শব্দ! কি ব্যাপার দেখার জন্যে দরজাটা একটু ঠেলোম। কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। আবার ঠেলোম। চেঁচালাম, কে আছ, দরজা খোলো। কি হয়েছে?

দরজা খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একজন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার মুখটা চেপে ধরে পাশের ঘরে ঠেলে ফেলে শেকল আটকে দিল। আমাকে শাসিয়ে গেল, একটু পরে আমারও মৃত্যু হবে। সাক্ষী রাখবে না।

আমি ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছিলাম ঘরের মধ্যে একটা থামের সঙ্গে বিজলীকে বাঁধা হয়েছে। আর যে যুবকটি তাকে খুন করার চেষ্টা করছে, সে আর কেউ নয়, বটুকেশ্বর। ফাঁকা বাড়িতে ঢুকে হতভাগিনী বিজলীকে একা পেয়ে গিয়েছিল।

…আমি তবু কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালাম। জানলাটা একটু ফাঁক করলাম। আর তখনই সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা দেখতে পেলাম–বিজলীর গলা টিপে তাকে শেষ করে দিচ্ছে। তরপরই অচৈতন্য হয়ে পড়লাম।…কি করে কখন নিজের বাড়িতে আনা হয়েছিল জানি না।

আমার ইচ্ছে ছিল এই নিয়ে কাগজে লিখি, কলকাতায় খবর দিই। কিন্তু আমার স্বামী অতিশয় শান্ত স্বভাবের। তিনি বললেন, আমরা তো ইংলন্ডে ফিরে যাচ্ছি। কটা দিন মুখ বুজে থাকো। ওসব হাঙ্গামার দরকার নেই। তা ছাড়া আসামীও তো পালিয়েছে। ওকে ধরা যাবে না।

…কিন্তু আমি ভাবছি বেচারী বিজলীর স্বামী ভবানীপ্রসাদের কথা। সে যখন শুনবে তখন কি করবে? হয়তো তাকে সবাই ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা বলবে। আর সে তাই বিশ্বাস করবে। সে জানতেই পারবে না তার স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে। খুনীকে ধরার চেষ্টা বা প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করা তো দূরের কথা!…

ডায়েরিটা এখানেই শেষ।

পড়তে পড়তে দিবাকরের দুচোখ ঝকঝক করে উঠল। এই তো সব ইতিহাস বেরিয়ে এসেছে…তাহলে মিসেস ফেনটনই ছবিটা এঁকে গিয়েছিলেন।

কিন্তু এই যে কাহিনি মিসেস ফেনটন লিখে গেছেন সে কাহিনিটা যেন

হ্যাঁ, মনে হচ্ছে কাহিনিটা যেন তার জানা। অ-নে-ক অ-নে-ক দিন আগের ঘটনা। কিন্তু কার কাছ থেকে জেনেছিলেন, কবে জেনেছিলেন তা মনে করতে পারলেন না।

.

১০.

গভীর রাতের আগন্তুক

দিন সাতেক পর।

ছবিটার যে জায়গার রঙ চটে গিয়েছিল, দিবাকর বসেছিলেন সেখানে রঙ লাগাতে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেখানে রঙ ধরাতে পারছিলেন না। হয়তো পুরনো ছবিতে রঙ ধরছিল না। কিংবা তিনি খুবই অন্যমনস্ক ছিলেন। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছিল কাহিনিটা তার খুব জানা। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিলেন না কোথা থেকে জেনেছিলেন। কাহিনিটা শুধু জানাই নয়, কয়েকটা মুখও তার যেন স্পষ্ট মনে পড়ছিল….

ছবিটায় রঙ ধরাতে না পেরে তিনি শেষমেশ ঠিক করলেন নিজেই নতুন করে পুরো জিনিসটা আঁকবেন। তখনই ছবি আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত হলেন দিবাকর। পুরনো ঘড়িটায় তখন বিকট শব্দ করে রাত দুটো বাজল।

ছবি এঁকে চলেছেন দিবাকর। কিন্তু আশ্চর্য, তুলির টান দিতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে! এ আবার কি? এমন তো কখনো হয় না।

তবু তিনি জোর করে তুলি টানতে লাগলেন। কিন্তু একি! তার তুলিটা যে গোটা একটা মানুষের পিছনের অংশ এঁকে চলেছে! মনে হচ্ছে কেউ যেন অদৃশ্যভাবে তার হাত ধরে অন্য কারো ছবি আঁকিয়ে নিচ্ছে।

দূরে কি কিছু শব্দ শোনা যাচ্ছে?

হ্যাঁ, শব্দই। খটাখটখটাখটখটাখট

আজ আর দিবাকরের বুঝতে বাকি রইল না যে ওটা ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ।

না, গাড়ি বা ফিটন নয়, কেউ ঘোড়া ছুটিয়ে দুরন্ত গতিতে এই দিকেই আসছে। কিন্তু দিবাকরের মন তখন ছবির দিকে। তিনি অবাক হয়ে দেখছেন তাঁরই তুলিতে যে ছবিটা ফুটে উঠেছে সেটা

ঘোড়ার শব্দ ক্রমশই কাছে এগিয়ে আসছে–

দিবাকরের দুচোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে। এ কি! এ কার মূর্তি! এ কার মুখ!

ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ এবার আরো কাছে এসে পড়েছে।

 দিবাকর স্তম্ভিত। এই কি সেই খুনী? কিন্তু এ কার ছবি?

তাঁর মেরুদণ্ড দিয়ে যেন এক চাঙড় বরফ নেমে গেল। অতীত ফিরে এসেছে! এ যে তার নিজেরই ছবি!

ঠিক তখনই ঘোড়ার শব্দ তাঁর বাড়ির কাছে এসে থামল। ভারী পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। তারপরই মনে হলো দরজার ওপর চলছে দুমদাম শব্দ।

ভবানীপ্রসাদ! তুমি আবার এসেছ! বলেই দিবাকর বন্দুক আনার জন্যে উঠে দাঁড়াতে গেলেন। কিন্তু অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেলেন।

.

পরের দিন সকালে পাড়ার লোক দেখল একজন অপরিচিত লোক বসে আছেন ইজিচেয়ারে, যে চেয়ারে সুদর্শন যুবক দিবাকর রোজ বসতেন।

এই নতুন ভদ্রলোক অতি বৃদ্ধ! একমাথা পাকা চুল। মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে, চোখের কোণে কালি, দু-চোখে ক্লান্ত শূন্য দৃষ্টি। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখা গেল বৃদ্ধটি বোবা।

ঠিক সেইদিনই ভোরে কলকাতার বাসায় সুরঞ্জন এক দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে উঠে বসলেন। তার যেন মনে হলো বন্ধু দিবাকরের কোনো বিপদ ঘটেছে। তিনি তখনই ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে এলেন। এসে হতবাক! মাত্র কদিনের ব্যবধানে তাঁর বন্ধুর একি দশা হয়েছে। এ যেন দিবাকর নয়, আদ্যিকালের আর একজন কেউ!

[আষাঢ় ১৪০২]

Facebook Comment

You May Also Like