ঘড়ি – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ঘড়ি - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমার একটা টেবিল ঘড়ি আছে। মেড ইন জার্মানি। ঘড়িটা আমি এক স্মাগলারের কাছ থেকে কিনেছিলুম। তখন আমার খুব দুঃসময়। আমার স্ত্রী অসুস্থ! চিকিৎসার জন্যে জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে। তবু ঘড়িটা আমি কিনে ফেললুম। আমার স্ত্রী দোতলার ঘরে রোগশয্যায়। আর সেই বিদেশি বেআইনি মালের ব্যবসায়ী আমাদের নীচের ঘরে। তার ঝোলা থেকে ঘড়িটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। কালো ডায়াল। সাদা কাঁটা। অক্ষর আর কাঁটায় রেডিয়াম লাগান। রাতে জ্বলজ্বল করে জ্বলবে। মানুষের যেমন রূপ থাকে ঘড়িরও সেই রকম রূপ আছে। কোনও কোনও ঘড়ি সুন্দরী রমণীর মতো। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যেতে হয়। টেবিলের ওপর কালো ডায়ালের ঝকঝকে জার্মান-সুন্দরীকে দেখে প্রেমে পড়ে গেলুম।

লোকটি তখন ঘড়ির গুণাগুণে ব্যস্ত। গভীর অন্ধকারে ঘড়ি জুয়েলের মতো জ্বলবে। অ্যালার্ম আপনি দু-কায়দায় বাজাতে পারবেন। এক কায়দায় থেমে থেমে বাজবে। যত গভীর ঘুমই হোক, সে ঘুম আপনার ভাঙবেই। আর এক কায়দায় টানা বেজে যাবে। বাজতেই থাকবে। ঘুম থেকে। টেনে তুলবেই তুলবে।

‘দেখতে চান।’ বলেই সে লোকটি পেছন দিকে কী এক কেরামতি করতেই, ঘণ্টা বেজে উঠল। বেশ জোর, যেন স্কুল ছুটির ঘণ্টা। কিছুক্ষণ বেজে থামল। আবার বাজল, আবার থামল। সারা। ঘরে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। এক পাশে আমার ধবধবে সাদা, লোমঅলা কুকুরটা ঘুমোচ্ছিল। সে তড়াক লাফিয়ে উঠল। ঘড়িটাকে ধমকাতে লাগল ঘেউ ঘেউ করে। আমার রোগ-নিস্তব্ধ বাড়িতে সহসা শব্দের আন্দোলন।

আমি বললুম, ‘থামান থামান।’

লোকটি মাথার উপর একটা বোতাম টিপতেই সারা বাড়িতে নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু কুকুরটা। তখনও রাগে গরগর করছে। আমি মনে মনে ভাবলুম, তুই তো কুকুর, তুই কেন, সময়ের ওপর সকলের রাগ। তোর অবশ্য বেশি রাগ হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ, তোদের আয়ু মাত্র বারো বছর। বারো বছরেই এই সুন্দর লোমঅলা নরম দেহটি ফেলে চলে যেতে হবে। ওই ঝকঝকে কালো চোখে আর দৃষ্টি থাকবে না। আমি মানুষ। আমি হয়তো সত্তরটা বছর দুঃখে-সুখে কাটিয়ে যেতে পারব। প্রায় ছ-টা কুকুরের পরমায়ু এক সঙ্গে করলে যা হয়। আর যদি যত্নে-তোয়াজে থাকি, আনন্দে থাকি, তাহলে সাতটা কুকুরের পরমায়ু এ যুগে কিছুই নয়। আমাদের বংশে প্রায় একশো রান তোলার মতো ব্যাটসম্যান ছিলেন।

কুকুরটা আবার কোণের দিকে গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস। লোকটি বললে, ‘একবার একটানা বাজানোটা দেখাব!’

আমি বললুম, ‘না না, কোনও প্রয়োজন নেই!’

লোকটি ঘড়ির পেছন দিকে, ছোট্ট একটা উঁচু মতো লোহার খোঁচা দেখিয়ে বললে, ‘ভেরি সিম্পল। এই দেখুন, কনটিনিউয়াসের দিকে ঠেললে নাগাড়ে বাজবে আর ইন্টারমিটেন্টের দিকে ঠেললে থেমে থেমে।’

বুঝলাম তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে আর একবার বাজায়। সব মানুষের মধ্যেই শিশুটা থেকে যায়। আমের ভেতর আমের আঁটির মতো। অ্যালার্ম বাজতেই কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করেছিল, গোঁ গোঁ করেছিল। বেশ মজা লেগেছে। আর একবার খ্যাপাতে চায়। জানে না আমার বাড়িতে কী জীবন মরণ সংগ্রাম চলেছে দোতলার ঘরে। যে-কোনও মুহূর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয়জন, আমার স্ত্রী। চলে যেতে পারে। সে এখন সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আমি তাকে বলিনি। ডাক্তার আমাকে বলে গেছেন, ‘শি ইজ ব্যাটলিং উইথ টাইম। এই যে ওষুধ, এতে আরোগ্য হবে না, শুধু কিছুদিন ধরে রাখা। আজ থেকে কাল, কাল থেকে পরশু স্পষ্ট দিন গোনা। একদিন দপ করে আলো নেবার মতো দীপ নিবে যাবে।’

যে লোকটি ঘড়ি এনেছে তার সবই ভালো, কথায় কথায় সামনের দুটো দাঁত বের করে হাসিটা ভালো লাগে না। লোকটাকে তখন ভীষণ স্বার্থপর মনে হয়। কেনা আর বেচা এর বাইরে যেন পৃথিবীতে আর কিছু নেই। উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরুর মতো, ক্রেতার পৃথিবী আর বিক্রেতার পৃথিবী। ভালোবাসার পৃথিবীটা যেন উবে গেছে!

আমাদের বাড়িতে যে মেয়েটি কাজ করে, সে রাগ রাগ মুখে দু-কাপ চা দিয়ে গেল। যাবার সময় বলে গেল, ‘আপনি এখন এই ঘড়ি নিয়ে রঙ্গ করছেন। বাড়িতে তো তিনটে ঘড়ি রয়েছে। এখন এই অ্যাতো খরচের সময়?’ আমাদের বাড়ির সঙ্গে মেয়েটি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, তার এইসব কথা বলার অধিকার জন্মেছে। সবাই জানে আমাকে টুপি পরানো খুব সহজ। চকচকে ঝকঝকে জিনিসের ওপর আমার ছেলেমানুষের মতো লোভ।

মেয়েটি যেতে যেতে দরজা পার হবার আগে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললে, ‘বউদি আগে ভালো হয়ে উঠুক না, তারপর এইসব বাজে খরচ যত পারেন করবেন।’

লোকটি সেই অদ্ভুত হাসি, সামান্য তোতলানো গলায় বললে, ‘এসব ঘড়ি একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না। মেড ইন জার্মানি।’

লোকটিকে ভীষণ বোকা বোকা দেখালেও পাকা ব্যবসাদার। আমার বাড়ির পরিস্থিতি, তাতে কারুর হাসা উচিত নয়, তবু লোকটির মুখের লোভী অথচ বোকা বোকা হাসি মেলাচ্ছেনা। সেই হাসিটাই বজায় রেখে চায়ের কাপে ফরফর করে চুমুক দিল।

মেয়েটি আমার বিবেকে খোঁচা মেরে গেছে। সত্যিই তো, আমি কী বলে বাজে খরচ করতে চলেছি! এই কি সময়! ওষুধে-ডাক্তারে রোজ জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি আমার সামনে নিষ্ঠুর ভবিষ্যৎ মেলে দিয়ে গেছে। বউদির ভালো হওয়া। বউদি আর কোনও দিন ভালো হবে না। খসখস করে এই ঘড়ির কাঁটা চলছে। বউদির জীবনঘড়িও চলছে। কতটা দম আছে কেউ জানে না। জীবনঘড়ির কোনও মেকানিক নেই। নিজেই চলে, নিজেই বন্ধ হয়। স্বাধীন। বাইরে থেকে দম দেবার কোনও চাবি নেই।

‘ঘড়িটার দাম কত?’

‘আপনার জন্যে আমার সবসময় স্পেশাল দাম। এ ঘড়ি আপনি আর কোথাও পাবেন না।’ লোকটি নিঃশব্দে হাসতে লাগল।

‘দামটা বলুন।’

‘কত আর, তিনটে পাত্তি দেবেন!’

‘বলেন কী! একটা টেবিল ক্লকের দাম তিনশো! আপনার মাথা খারাপ!’

‘এটা কোথাকার ঘড়ি দেখুন! জার্মানির। সারাজীবন চলবে।’

‘আমার দরকার নেই মশাই, নিয়ে যান। আমার এখন খুব দুঃসময়। আপনার সঙ্গে ঘ্যানোর ঘ্যানোর করার সময় নেই।’

‘ঠিক আছে, আমি আপনার জন্যে লোকসান করেই দেব। আপনি দুটো পাত্তি দিন।‘

‘দুশো! দুশো টাকার টেবল ক্লক।’

‘আচ্ছা যান, একশো ষাট।’

লোকটার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আমি আগেও লক্ষ করেছি। যাকে ধরবে, তাকে বধ করে ছাড়বে। ঘড়িটা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল। সেই জার্মান রূপসির দিকে তাকিয়ে আমি বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলুম।

আমার স্ত্রী-র ঘরে কোনও ঘড়ি ছিল না। বাইরের দালানে একটা ওয়াল ক্লক সারা দিন খটর খটর করত, আর সময়মতো চড়া সুরে বেজে উঠত। রাতের দিকে যখন রোগের অসম্ভব বাড়াবাড়ি, রুগি যন্ত্রণায় ছটফট করছে, সেই সময় ঘড়িতে বাজছে রাত বারোটা। ঘড়িকে তো আর থামানো যায় না। সে এক বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা। ওই ওয়াল ক্লকটা আমি সরাব।

সকালের দিকে আমার স্ত্রী ওরই মধ্যে একটু ভালো থাকে। অসুখও আলোকে ভয় পায়। দিনের আলো নিবে গেলেই দাপাদাপি শুরু করে দেয়। আমি ঘড়িটাকে সাবধানে বুকের কাছে ধরে যখন তার ঘরে ঢুকলুম, তখন বাইরের প্রকৃতি রোদের আলোয় ঝলমল করছে। বালিশের পর বালিশ সাজিয়ে তাকে ঠেসান দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আমার মনে হল, আমি একটা কপূরের মূর্তি দেখছি। একটু একটু করে উবে যাচ্ছে। কপূর তার এই প্রাত্যহিক ক্ষয় জানে না। আমরা জানি। কাল যা ছিল, আজ আর তা নেই। দিন দিন সাদা, ফ্যাকাশে হয়ে আসছে, শুধু চোখ দুটো হয়ে উঠছে অসম্ভব রকমের উজ্জ্বল!

আমি বললুম, ‘দ্যাখো, তোমার জন্যে একটা ঘড়ি কিনে এনেছি। ভারী সুন্দর।’

ঘড়িটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। আমি তাকিয়ে আছি তার মুখের দিকে। চোখ দুটো ধীরে ধীরে জলে ভরে উঠছে। আমার একটা অস্বস্তি শুরু হল। কোনও অন্যায় করে ফেললুম না। তো! ধরা ধরা গলায় সে বললে, ‘সময়?’

আমি তার মনটাকে ঘুরিয়ে দেবার জন্যে বললুম, ‘জার্মানির ঘড়ি। সারাজীবন নিখুঁত সময় দেবে। একটুও এদিক-ওদিক হবে না।’

‘সুন্দর দেখতে। ভারী সুন্দর। পৃথিবীতে কত যে সুন্দর সুন্দর জিনিস আছে।’

‘এটা তোমার চোখের সামনে, এই তাকে থাকবে। তুমি বুঝতে পারবে ক’টা বাজল। একে-ওকে আর জিজ্ঞাসা করতে হবে না, ক’টা বাজল।’

‘একটা হিসেব বলো?’

‘কীসের হিসেব?’

‘এই আর কতটা বাকি আছে!’

তখনই মনে হল, ঘড়িটা এনে আমি ভুল করেছি। যার খরচের পালা, তার সামনে এই মাপের যন্ত্র হাজির করার অর্থ, তাকে সচেতন করা। আমি বললুম, ‘তুমি বড় বেশি ভেঙে পড়েছ। অসুখ কি। কারুর করে না!’

‘তিন মাস হল।’

‘হোক না, ছ’মাসও হতে পারে।’

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। যে যাবে, সে জানতে পারে। যাত্রীর কাছে ট্রেন আসার টাইমটেবল থাকে। আমি ঘড়িটাকে সামনের তাকে রাখলুম চোখের সামনে। সেকেন্ডের সাদা কাঁটা কালো ডায়ালের ওপর পাক মেরে চলেছে।

সেদিন রাতে ভীষণ বাড়াবাড়ি হল। অসম্ভব শ্বাসকষ্ট। একবার নিশ্বাস নেবার জন্যে মাছের মতো খাবি খাওয়া। নাকে অক্সিজেনের নল পুরে দেওয়া হল। ঘর ভরতি আত্মীয়স্বজন। রোজই আমরা দল বেঁধে রাত জাগি। আমি এক পাশে বসে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছি। ন-টা বাজল, এগারোটা বাজল। বাইরের দালানের ঘড়িতে আগেই বারোটা বেজে গেল দুর্দান্ত সুরে। আমার। ভাবনা হল, কোন ঘড়িটা ঠিক! বাইরেরটা না ভেতরেরটা। একশো ষাট টাকায় ঠকে গেলুম! মাঝে মাঝে আমার স্ত্রী-র নাক থেকে নল বের করে ইঞ্জেকশানের উঁচ দিয়ে ফুটো পরিষ্কার করে আবার নাকে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে।

বাইরের ঘড়িতে একটা বাজল। ভেতরের ঘড়িতে বারোটা বাজতে পাঁচ। আমি ভালো করে তাকালুম। সেকেন্ডের কাঁটাটা ঘুরছেনা। এ কী, ঘরের সময় ফুরিয়ে গেল নাকি! তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে ঘড়িটা তাক থেকে নামালুম। দু-দিকে দুটো দম দেবার চাবি। বাঁ দিকেরটা তিন পাক ঘোরাতেই চড়া সুরে অ্যালার্ম বেজে উঠল। আমাদের কুকুরটা একপাশে পাখার বাতাসে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ঘেউ ঘেউ শুরু করল। আমার এক আত্মীয়া বিরক্তির গলায় বললেন, ‘এখন ওসব থাক না।’ আমার ভুলটা বুঝতে পারলুম। অ্যালার্মের দমটা দিয়ে ফেলেছি। তখন ডান দিকের চাবিটা ঘোরাতে লাগলুম কটর কটর শব্দে। কোনওদিকে। আমার দৃকপাত নেই। খেয়াল নেই, একজনের সময় থেমে আসছে। যার দম হল বাতাস। সেই বাতাস টানতে পারছে না। আমার ঘড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। দীর্ঘ, সুঠাম সেকেন্ডের কাঁটা নেচে নেচে চলেছে। বাইরে গিয়ে সময়টা মিলিয়ে নিয়ে তাকে তুলে দিলুম। এখন আমার শান্তি। উদবেগ কেটে গেছে। দুটো ঘড়িই আমার এক সময় দিচ্ছে। সকলেই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। যার স্ত্রী-র এই রকম এখন-তখন অবস্থা, সে একটা ঘড়ি নিয়ে এই রকম ন্যাকামি করছে! সময় যে একটা দীর্ঘ রাজপথের মতো। গাড়ি যারা চালায় তারা জানে, পথের খারাপ অংশটা পেরোতে পারলেই আবার কিছুটা মসৃণ পথ, তখন সুন্দর পথ চলা। খারাপ সময়টা কোনওরকমে কাটাতে পারলেই আবার সুসময়। আমি যে সেই দিকেই তাকিয়ে আছি। ঘড়িতে সময়ের হাত ঘুরছে। দুটো বাজল, তিনটে বাজল। আমি জানি রাতটা কোনওরকমে পার করে দিতে পারলেই আমার স্ত্রী আবার কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠবে। গত তিনমাস ধরে রাতের অন্ধকার শক্তি জীবনের কূল থেকে অজানা সমুদ্রের কূলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে।

পুবের আকাশ রক্তিম হল। আমার স্ত্রী-র যন্ত্রণাকাতর চোখ দুটো সেই আকাশে। লাল। আরও লাল। অক্সিজেনের নল খুলে দেওয়া হল। একজন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললে, ‘ক্রাইসিস ইজ ওভার।’ রাতজাগানিয়ার দল একে একে বিদায় নিয়ে চলে গেল। লাল আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় আমার স্ত্রী জানাল, দিন এসেছে। রাতের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আর একটা দিন। আমি তার পাশে বসে আছি। সে ফিশফিশ করে আমাকে বলল, ‘ঘড়িটাকে একটা সুন্দর। খোপ তৈরি করে এই উত্তরের দেয়ালে রেখো। বেশ দেখাবে। নারায়ণের ছবিটাকে সরিয়ে দিয়ো পুবের দেয়ালে।’ এই কথা ক’টি বলেই ক্লান্ত হয়ে বালিশে মাথা রাখল। বাইরে কোলাহল শুরু হয়েছে। দিনের প্রথম গাড়িটা সশব্দে চলে গেল। ‘বালিশ-তুলো’ হেঁকে চলেছে ধুনুরি। শীত আসছে। আমার জীবন থেকে একজন চলে যাচ্ছে। বসন্তের অপেক্ষায় সে আর থাকবে না। আমার এই দোতলা ঘরে সবই ঠিক আগের মতোই আছে। খাট, বালিশ, বিছানা, চাদর, বইয়ের শেলফ, ছবি, দেরাজ সব আছে। শুধু একজন নেই। সবাই প্রশ্ন করে, ‘উত্তরের দেয়ালে, তোমার অমন সুন্দর ঘড়িটা ন’টা পঁয়তাল্লিশ বেজে বন্ধ হয়ে আছে কেন?’ আমি পালটা প্রশ্ন করি, ‘বলো তো ওটা রাত না দিন?’ সেদিন ছিল শুক্লা দ্বাদশী। রাত নটা পঁয়তাল্লিশ। সময়টাকে সময়ের। স্রোতে আমি খুঁটির মতো পুঁতে রেখেছি। বাইরের ঘড়িটাকে আমি সরাইনি। সেটা চলছে। চলেই চলেছে। ওটাই আমার হিসেব। দেখতে চাই, নদীর কত দূরে এসে আর একটা খুঁটি পড়ে।

Facebook Comment

You May Also Like