ধূসর – বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

dui banglar dampotto koloher shato kahini

স্ত্রী তার প্রেমিকের সঙ্গে পালাতে গিয়ে যেদিন ধরা পড়ল, তারপর থেকেই সে গেল বদলে। কোনোকিছুতেই যেন স্বস্তি নেই ফরিদের, কোথাও কোনো শান্তি নেই, বাড়িতেও নয় অফিসেও নয়। সবকিছুই মনে হয় এলোমেলো, উদ্ভট ও বিশৃঙ্খল। বন্ধুদের আলাপ যেন ব্যঙ্গ লুকননা, এমনকি করুণা। পরিজনদের সান্ত্বনা যেন উপদেশের বীজভরা: ভালোবাসার মেয়েকে বিয়ে করো না, আমরা বলিনি সবাই তখন!

কিন্তু কী ক্ষতি করেছে সে ভালোবাসার মেয়েকে বিয়ে করে? ভালোবাসে মানুষ বিশ্বাসে নিবিড় হয়ে, বিয়ে যেন সেই নিবিড় বিশ্বাসের প্রতীক।

সেই কবেকার কথা মনে পড়ে।

জুলেখা বলেছিল। টাকা হাতে এলে আমায় একটা রেনকোট কিনে দিও।

দিনটা ছিল বৃষ্টির, বিয়ের আগের সেই বৃষ্টি উচ্ছল দিন, রিকশা চেপে কোথাও তারা যাচ্ছিল বুঝি। শাদা কাপড় পরা ট্রাফিক পুলিশ, মাথায় কালো ছাতা, একা নিঃসঙ্গ রাস্তার মোড়ে, সেদিকে তাকিয়ে ফরিদ বলেছিল, রেনকোট কেন, সবই তো তোমার। নয় জুলি?

উল্টোদিকে নীলরঙা একটা মোটর ট্রাফিক-পুলিশের সংকেতের আশায় দাঁড়ান। ঝাঁপসা উইন্ডস্ক্রিনের মধ্যেও দেখা যায় এক মহিলার মুখ, অপলকে তাদের দিকে তাকিয়ে। ফরিদ তাকাল জুলেখার চোখে। জুলেখা হাসল, নিঃশব্দে, চূর্ণ-চূর্ণ বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে গেল সে হাসি, চুল থেকে শ্বসিত হল একটা গন্ধ, বুঝি কদম ফুলের, তাই মনে হল ফরিদের, যে কদম ফুল একলা আকাশের তলায় বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গন্ধ ছড়ায় অনেক দূর।

কিন্তু এখন? সব দেয়ার পরও জুলেখা মন করল কী করে? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনেছে, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেছে, ফরিদ পাগলের মতো। আলাপ করা, চিঠি লেখা, অন্তরঙ্গ হওয়া বাদে আর কী করেছে জুলেখা! আর কী করেছে তার জবাব জুলেখার জানা নেই।

ফরিদ ফের তাই জিজ্ঞেস করেছে, তুমি আগে লিখেছ, না ঐ রাস্কেলটা লিখেছে?

শান্ত, নির্লিপ্ত বুঝি জুলেখার স্বর, আমিই লিখেছি আগে।

ফরিদ থেমে যায়। হঠাৎ মত্ততা স্তম্ভিত হয়ে যায় অমন স্বীকারে। জুলেখার যে জবাব জানা নেই ফরিদ তা জানে। সানাই বাজানো রাতে, তারো আগের তন্ময়। দিনগুলি রাতগুলিতে যে-বিশ্বাসের জন্ম তা গেছে ভেঙে। তাই প্রশ্নের পর প্রশ্ন, একই জবাব শুনে যেন নিস্তার নেই, রেহাই নেই, দারুণ একটা অস্বস্তি ফরিদের হৃদয় মনের প্রতে পরতে জড়ানো। যাকে ভালোবেসেছে, ভালোবাসার বিশ্বাসে বিয়ে করেছে, সে-ই যদি বিয়ের পর বিশ্বাস ভেঙে দেয়, তাহলে কী থাকে! জুলেখা কী করেছে যন্ত্রের মতো বলে গেছে, দীর্ঘ এক তালিকা যেন। একসময় ভেবেছিল মনই স্থায়ী। এখন মনে হয় কোনোকিছুই স্থায়ী নয়, যদি হত জুলেখা অমন করতে পারত না কিছুতেই। তবু সে বিশ্বাস ফিরে পেতে চায়, জীবনে কোথাও কিছু স্থায়ী আছে সেই বিশ্বাসে আশ্বস্ত হতে চায়। না-হলে অনন্ত অবিশ্বাস সন্দেহের মত্ততা নিয়ে কী করে এখন সে বাঁচবে।

বিয়ের পরের সেরাতের কথা মনে পড়ে। দেয়ালে ক্যালেন্ডার, নীল পাহাড়ের চূড়ো আঁকা। বেশ কটি নীল পাহাড় হঠাৎ মিলে গিয়ে শাদা চুড়োটি পড়েছে বোধহয়।

ফরিদ ক্যালেন্ডারের পাতায় চোখ বুলিয়ে বলে উঠেছিল, চল ছুটি নিয়ে ঘুরে আসি কদিন।

চুলে বিলি কাটতে কাটতে জুলেখা বলেছিল, জানো ঘোরাঘুরি নয়। বড় দুঃস্বপ্ন দেখেছি কাল।

কী দেখেছ বল না, বুঝি উতল উদগ্রীব ফরিদের গলা।

একটু থেমে আস্তে-আস্তে বলেছিল জুলেখা, দেখেছিলাম তোমার ভীষণ একটা এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। তোমার একটা নানা আমি বলতে পারব না।

অনাগত দুর্ঘটনার ছায়া যেন ঘরজুড়ে। জুলেখার মুখ ম্লান, রোদনের ভারে চোখ বুঝি ছলছল।

ফরিদ একটু জোর করেই বলে উঠেছিল, তুমি একটা পাগল। স্বপ্ন কখনো সত্যি হয়।

জুলেখা যেন সেকথা শুনতেই পায়নি, তেমন যদি কিছু হয় বু তোমাকেই নিয়ে আমি বাঁচব। আমার মন তোমাকে ঘিরেই যে বেঁচে থাকে, তুমি জানো না।

পরম মন্ত্রের মতো কথাগুলি ঘরজুড়ে ছড়িয়ে গেল, পরম আশ্বাসের মতো সব অমঙ্গল ঝেটিয়ে নিল, পরম শান্তির মতো নমিত হয়ে এসেছিল জুলেখার চোখ ফরিদের চোখে চেয়ে।

সেই বিশ্বাস আজ নেই, আশ্বাসও নয়, শান্তিও নয়। স্ত্রীকে এখন মনে হয় ফরিদের ভার, দুঃস্বপ্ন, আতঙ্ক, কয়েদি, যে কেবল পালাবার সুযোগ খোঁজে। চেনা ঘর,

অফিসের কাজ সবই মনে হয় ঝুলোনো, এলোমেলো, বিশৃঙ্খল।

সকালবেলা অফিসে যাওয়ার সময় ফরিদের হঠাৎ বোধ হল আসবাবপত্র বড় অগোছাল। রেডিওর পাশের নিচু চেয়ার বহুদূরে সরানো, বুক-কেসের উপর তাদের যুগল ছবি উধাও।

চেঁচিয়ে উঠল তাই ফরিদ, ঘরে বসে কি কর তোমরা? সব এলোমেলো, ছত্রখান হয়ে আছে।

জুলেখা ছুটে এল শোবার ঘর থেকে, অমন করছ কেন? কী হয়েছে?

দু-চোখে আগুন জ্বেলে তাকাল ফরিদ, কী হয়েছে? বুক-কেসের উপর ফটো কই? তোমাদের কাছে খারাপ লাগত, তাই সরিয়ে দিয়েছ, না? এ ঘরে বসে গল্প করতে, জোড়া ছবি চোখে কামড়াত, আমাকে পাশে দেখতে খারাপ লাগত, আর একজনের জায়গা ঐখানে কিনা।

জুলেখা আস্তে-আস্তে বলে উঠল, ক্ষীণ ঠাণ্ডা, নিপ্রাণ শোনাল তার গলা, বুক কেসের উপর জোড়া ছবি কখনো ছিল না। তুমি শোবার ঘরে রাখতে বলেছ। ড্রেসিং টেবিলের উপর সবসময়েই রাখা আছে।

ফরিদ জবাব না দিয়ে ছিটকে শুধু ঘর থেকে গেল বেরিয়ে। দপদপ করছে মাথা, জ্বলছে সারা শরীর, মনে পড়ছে জোড়া ছবি শোবার ঘরে রাখা। তবু জুলেখা গল্প করেছে তো ওখানে বসে কতদিন, হেসেছে মদির হয়ে, আদর করেছে রাস্কেলটাকে; ঘরে পা দিলেই ঐসব স্মৃতি প্রেতের মতো তাকে হানা দিয়ে ফেরে, সে কী করবে, কী করবে।

অফিসে বস তাকে ডেকে পাঠাল। একহারা গড়ন, একটু গম্ভীর মুখ।

চশমা চোখ থেকে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, জরুরি ফাইলটা এখনো ছেড়ে দিলেন না আপনি। আশ্চর্য!

অন্য সময় হলে বলত না ফরিদ। কিন্তু এখন মেজাজ তার খারাপ, সকালবেলার ছাপ দগদগ করছে মনে, তাই বলেই বসল আচমকা, ফাইল তো আমি ছেড়ে দিয়েছি অনেক আগেই। ঐ তো আপনার টেবিলের কোণে।

বস-ওর গম্ভীর মুখ তীক্ষ্ণ হল একটু। চশমা না-থাকায় চোখ ঝাঁপসা, তাই চোখে মনের প্রতিফলন নেই, দ্যোতনাও নেই।

একটু বিরতি নিয়ে শুধু বললেন, আচ্ছা আপনি আসুন।

তিক্তবিরক্তিতে ফরিদ এল বেরিয়ে। সেইসঙ্গে চাপা একটা অপমান বোধ শিরায় শিরায় ছড়িয়ে গেল। কোনো কিছুই ঠিক জায়গায় নেই বলেই তার বোধ হল। স্ত্রীর নয়, সে নয়, সবাই কেমন বিশৃঙ্খল হয়ে আছে। স্ত্রী আর নয় এখন বন্দরের মতো নিরাপদ। বস নয় এখন ভদ্র যান্ত্রিক নিখুঁত প্রতিনিধি।

নিজের ঘরে এসে চোখ বুজে বসে থাকল ফরিদ কতক্ষণ। ফ্যান ঘুরছে, শব্দ উঠছে ধাতক নিয়মিত স্পন্দনে। পাশের ঘরে কাদের কথা কোলাহল হয়ে উঠছে। ঝিরিঝিরি বাতাসের প্রার্থনা জাগল ফরিদের, ঠাণ্ডা, শীতল, দীঘল নদীর স্রোতের মতো ঝিরিঝিরি বাতাস গাছে, পাখি পাখালিতে ঢেউ তুলে-তুলে মিলিয়ে যায় কেবলি, যেখানে শান্তি, সান্ত্বনা।

পায়ের শব্দ শুনে চোখ মেলে তাকাল ফরিদ। আনোয়ার, তার সহকর্মী, চেয়ার টেনে বসে পড়েছে।

প্যাডের উপর পেন্সিল বুলোল আনোয়ার, বেল বাজাল খামোকা, পরে বলল, তোমার কী হয়েছে? শরীর খারাপ?

ফরিদ জবাব দিল, না।

একটু থেমে, বেশ দ্বিধার সঙ্গে যুঝে আনোয়ার ফের বলল, মন খারাপ করতে নেই। যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। মানিয়ে চল, সংসারে ভুল বোঝাবুঝি হয়-ই।

আশ্চর্য দৃষ্টি তুলে তাকাল ফরিদ। কী বলছে আনোয়ার। অদ্ভুত কিংবা অজানা ভাষা যেন তার জিভের ডগে।

ফরিদের বলতে ইচ্ছে করল চেঁচিয়ে, তোমার স্ত্রীকে নিয়ে কেউ পালালে তুমি বুঝতে। কিন্তু কিছুই বলল না ফরিদ। চাপা উত্তেজনা আস্তে-আস্তে মনের মধ্যে গেল। ছাই হয়ে। ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ, শূন্য বোধ হল নিজেকে। কিছুই স্থায়ী নয়, বিশ্বাস কোথাও নেই, শুধু সন্দেহ, তিক্ততা ছড়ানো সব কিছুতেই। আর জুলেখাই যেন শিখিয়েছে তাকে এই সন্দেহ তিক্ততা অবিশ্বাস।

কয়েক লহমা চুপ করে থাকল ফরিদ, কথা বলতে গিয়েও ফের চুপ করে গেল। চোখ ঝাঁপসা হয়ে এল। একটা সর্বগ্রাসী ধূসরতা তাকে গিলে নিল, আর সেইদিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকল আনোয়ার।

Facebook Comment

You May Also Like