সাইকেল – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সাইকেল - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বউ দিয়ে সে কী করবে? তার দরকার একখানা সাইকেল। সাইকেলের মতো জিনিস হয় না। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হওয়ার মতো করে উঠে পড়লেই হল। তারপর দু-খানা সরু চাকার খেল। এই খেলটাও বড়ই আশ্চর্যের। পড়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু পড়ে না। ঘটুর দুনিয়াখানা এখন এসে জড়ো হয়েছে সাইকেলে। আর সাইকেলের রকমারি কম নয়। মদনবাবুর ছেলে কুঁড়োরাম কী জিনিসটাই কিনেছে। সবুজ রং নীচু হ্যান্ডেল, যায় যেন পক্ষীরাজ। হরিপদর সাইকেলে একখানা বাহারি বাতি আছে, পিছনের চাকায় তার কল। কলখানা চাকার গায়ে ঠেসে দিলেই হল, সাইকেল চালালেই টর্চবাতির মতো আলো। অত বাহারের অবশ্য দরকার নেই ঘটুর। নন্তের মতো পিছনের চাকার রডে একখানা পিচবোর্ডের টুকরো বেঁধে নেবে। চালালে চাকার স্পোকে লেগে শব্দ হবে ফটফট–ফটফট, ঠিক যেন মোটর সাইকেল যাচ্ছে।

বউয়ের দরকার না থাক, সাইকেলের জন্য বিয়ে করতেও রাজি আছে ঘটু। কিন্তু তাকে সাইকেল দেনেওলা শ্বশুর কি তল্লাটে ছুঁড়লেও পাওয়া যাবে? হাড়হাভাতে ঘটুকে মেয়েই দিতে চাইবে না কেউ, তো সাইকেল!

তা বলে কি ঘটুর বউয়ের অভাব? তা নয়। হাড়হাভাতে মেয়ের বাপ মেলাই আছে। তারা। মেয়ে পার করতে পারলে বেঁচে যায়, ঘটু চাইলে বিয়ের অভাব ঘটবে না। তা ঘটু সেটা চায় না। সে চায় সাইকেল।

ব্রজমাস্টার অবশ্য ভরসা দেয়। বলে, সাইকেল দেনেওলা শ্বশুর তোরও জুটবে। হাতের কাজটা আর-একটু শিখে নে, তারপর দেখবি। সাইকেল তো সাইকেল, সঙ্গে সেলাইমেশিন, এমন কি রেডিও অবধি পেয়ে যাবি। শুধু চাইলেই তো হবে না, চাওয়ার মতো পাত্তরও তো হতে হবে।

ব্রজমাস্টার হচ্ছে এ অঞ্চলের নামকরা টিপকলের মিস্তিরি, শ্যালো আর টিউবওয়েল বসানোর কাজে তার মতো এ তল্লাটে আর কেউ নেই। ব্রজমাস্টার মরুভূমি থেকেও জল বের করতে পারে। মজুরিটি ন্যায্য, কাজে গাফিলতি নেই, কথার খেলাপ হয় না। ব্রজমাস্টারের তাই সারা বছর দম ফেলার সময় থাকে না। শুধু নতুন কল করাই তো নয়, পুরোনো কল খারাপ হলে মেরামতির কাজেও তাকেই চতুর্দিক থেকে ডাকাডাকি।

ব্রজমাস্টারের সাকরেদ হওয়াও চাট্টিখাঁটি কথা নয়। পিছন–পিছন ঘুরলেই হবে না। ব্রজমাস্টার যাকে নেয় দেখেশুনেই নেয়। যারা বেশি খায় বা বেশি ঘুমোয় তারা প্রথমেই খারিজ। একবারে কথা বুঝতে পারে না বা বেশি ফড়ফড় করে তারাও বাতিল। যারা কথা কইতে ভালোবাসে বা নেশাভাঙ বেশি করে ফেলে তাদেরও সুবিধে নেই। ব্রজমাস্টার নেয় শুধু কাজের লোক।

ঘটু কাজের লোক কি না, তা সে নিজেও জানে না। কানাই মণ্ডল হল ব্রজ মিস্তিরির ভগ্নীপোত। ঘটু আজ বছরতিনেক কানাইয়ের তাঁবেদারি করে যাচ্ছে। সব কাজেরই যে ফল ফলে তা নয়। তবে কানাই ঘটুর জন্য এটুকু করেছিল। ব্রজ মিস্তিরির সঙ্গে জুতে দিল তাকে। খোরাকিটা হয়ে যায়। দু-পাঁচ টাকা হাতে থেকেও যায়। আপাতত এটুকুই। তবে কাজ শিখে যদি হাতযশ হয় তাহলে হাত উপুড় করলেই পর্বত।

তা ঘটু লেগে আছে। ছিনে জোঁকের মতোই লেগে আছে। কারণ তার যাওয়ার জায়গা নেই। তাদের সমাজে মা মরলেই বাপ তালুই। অর্থাৎ তখন বাপে আর তালুইমশাইতে তফাত থাকে। বাপ আবার বিয়েতেও বসেছে। সুতরাং ওদিকের পাট চুকেবুকে গেছে বলে ধরাই ভালো।

পিছনের দিকটার ঝাঁপ পড়ে গেছে বটে, কিন্তু সামনের দিকটা খোলা। ব্রজমাস্টারের হাতের কাজটি নিজের হাতের তুলে নিতে পারলেই হল। তুলছেও ভালো। গোরাচাঁদের পাম্প মেশিনে জল উঠছিল না। ব্রজমাস্টার তখন অন্য কাজে ব্যস্ত। বলল , যা দিকিনি, ব্যাপারটা দেখে এসে আমায় বল। ডিফেক্টটা যদি ধরতে পারিস তবে বুঝব কাজ শিখেছিস।

তা গিয়ে দেখেশুনে এসে ঘটু বলল , কেসিং পাইপে ফুটো হয়ে হাওয়া ঢুকে যাচ্ছে। নতুন করে পাইপ বসাতে হবে বলে মনে হচ্ছে।

ব্রজমাস্টারও গিয়ে দেখল, তাই। বলল , ঠিকই ধরেছিস তো!

গাঁয়েগঞ্জে গেলে গাহেকের বাড়িতেই থাকা–খাওয়া। খাবারদাবারও বেশিরভাগ সময়েই সুবিধের নয়। মোটা ভাত, ডাল, একটা ঘ্যাঁট হলেই যথেষ্ট। তবে উঁচু নজরের লোকও কি নেই? মাঝে-মাঝে তারাও আছে বলেই ঝপ করে পাতে একটা মাছের টুকরো বা একখানা আস্ত ডিম নেমে আসে।

তবে সব মিলিয়ে ফুর্তিতেই আছে ঘটু। এক জায়গায় বাঁধা জীবন নয়। এ-গাঁ ও-গাঁ–গঞ্জ ঘুরে ঘুরে বেশ কাটে সময়। তে কাঠির বাঁশ, পুলি, রেঞ্চ বয়ে–বয়ে বেড়ানো।

সাইকেলের বাইটা চাপল পিরপুরে গিয়ে। পিরপুর বড় জায়গা, মস্ত পিরের দরগা আছে। হরেরাম মুস্তফির বাড়িতে কাজ হচ্ছিল। বিকেলের দিকটায় একটু ফুরসত পেয়ে মুস্তফির বাড়ির বাইরের মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে ঘটু দেখছিল, মুস্তফির তেরো-চৌদ্দ বছরের ছোট ছেলেটা সাইকেল চালাচ্ছে। হঠাৎ সেই ছেলেটা তাকে বলল , চালাবে? চালাও।

ছেলেটা দেখতে যেমন ফুটফুটে সুন্দর তেমনি বড্ডই ভালো। এরকমধারা আজকাল কি আর কেউ কাউকে বলে? ঘটু খুব খুশি। কিন্তু সমস্যা হল সে জন্মে সাইকেল চালায়নি। সে কথা বলতেই ছেলেটা বলল , আরি বাঃ, তা হলে শিখে নাও। খুব সোজা।

কথাটা সোজা হলেও কাজটা সোজা ছিল না। আর সাইকেলও সোজা জিনিস নয় মোটেই, কেবল এ-কাত ও-কাত হয়ে ঢলে পড়ে। ঘণ্টাটাক অনেক কসরত করল ঘটু। বারদশেক আছাড় খেল। শিখতে পারল না বটে, কিন্তু সাইকেল সেই যে তার মাথায় ঢুকল আর বেরোতে চায় না।

উদয়পুরে কাজ হচ্ছে। মহিম মণ্ডলের বাড়িতে শ্যালো বসছে। পাইপ টেনে খেত বরাবর নিতে হবে। অনেক টাকার কাজ। সন্ধের পর কাজের ছুটি হল। মহিম মণ্ডল বড় গেরস্ত। সাঁঝবেলায় ধামাভরতি মুড়ি আর কয়েক চাকা গুড় পাঠিয়ে দিলে ঝিয়ের হাতে।

গুরুপদ, সাধু গায়েন, তারানাথ, পচা, হাঁদু আর ঘটু গোল হয়ে বসে গেল মুড়ি খেতে। গুড়টার স্বাদ বড় ভালো।

গুরুপদ বড় মিস্তিরি। নিজের কারবার খোলার তালে আছে। মুড়ি খেতে-খেতে বলল , আর হাজার দুই টাকা পেলেই আমার হয়ে যায়।

কী হয়ে যায় সবাই জানে। গুরুপদর বাড়ি জমি মহাজনের কাছে বাঁধা আছে। খেটেপিটে রোজগার করে কর্জটা মেরে এনেছে প্রায়। বাড়ি জমি ছাড়াতে পারলেই গুরুপদ নিজে ব্যাবসা করবে। কাজও জানে ভালোই।

ঘটু বলল , তা দুহাজার হতে আর কতদিন লাগাবে মনে হয়?

মেরেকেটে দুটো মাস।

তারপর তো তুমি রাজা।

গুরুপদ উদাস সুরে বলল , ধুর। রাজা গজা আবার কী রে? বাপ পিতেমোর ভিটে, সেইটুকু রক্ষে করতে পারলেই যথেষ্ট। কুলাঙ্গার বলেই না বাঁধা রেখেছিলাম। তা ওই ভিটেটুকু আর তিন বিঘের চাষ ছাড়া আর কী আছে যে রাজা হব! তবে এটুকু হাতে এলে একটা মনের জোর হয়। তখন লড়া যায়।

পাম্প মিস্তিরির কাজই করবে তো?

তা ছাড়া আবার কী? একটু টাকা-পয়সা হলে একখানা মুদির দোকান দেওয়ার ইচ্ছে আছে। বউ সেটা চালাবে। আমাদের গাঁয়ে মুদির দোকান তেমন নেই। হরি সাউয়ের একখানা দোকান আছে বটে, কিন্তু লোকটা বড় ক্যাচালে। কেউ তাকে তেমন পছন্দ করে না।

সাধু গায়েন মুড়ি চিবোতে চিবোতে বলে, তাও তোমার একখানা বাড়ি আছে, আমার তো তাও নেই। যাও-বা ছিল তা সব বেচেবুচে দিয়ে সেবার মায়ের চিকিৎসা করালাম। তা মাও বাঁচল না।

ঘটু বলল , তা হলে তোমার পরিবার থাকে কোথায়?

সে অনেক বৃত্তান্ত। নব দাস নামে এক গেরস্তবাড়িতে আমার বউ কাজের লোক। তা সেই বাড়িতেই গোয়ালঘরের পাশে একখানা লাকড়ির চালায় থাকে। জায়গা মোটে নেই। সেখানে আবার আমার থাকা বারণ। দিনমানে গিয়ে দেখা করা যায়, সন্ধের পর আর নয়। বর্ষাকালে ঘরে একহাঁটু জল হয়, তার মধ্যেই বউ দুটো বাচ্চা নিয়ে থাকে কোনওক্রমে।

তারানাথ খুব হাসছিল। বলল , ওই জন্যই তো বিয়েটা করিনি। বোনের বিয়ে দিতে গিয়ে সব ফরসা হয়ে গেল। দাঁতে কুটো চেপে এই পড়ে আছি মাস্টারের সঙ্গে। মাস্টার যদি কোনওদিন পেছুতে লাথি মেরে তাড়ায় তা হলেই হয়ে গেল।

গুরুপদ বলল , আহা, একাবোকা মানুষের আর চিন্তা কীসের? নিজের একখানা পেট ও ঠিক চলে যাবে। কাজও শিখছিস তো!

এ কাজের ভরসা কী বলো! লাইনে মিস্তিরি কিছু কম আছে? আর একাবোকাই কি চিরটাকাল থাকার ইচ্ছে ছিল?

ওরে কলের মিস্তিরির ভাত মারে কে? লেগে থাকলে কখনও না খেয়ে মরবি না।

পচা আর হাঁদুর বয়স কম। তাদের বিয়ে–টিয়ে হয়নি। তবে সংসারের খাঁই আছে। তারা ইদিকে কান না দিয়ে মুড়ি খেতে-খেতে হিন্দি সিনেমার গল্প করছিল। পরশু রাত্তিরেই একখানা মেরে এসেছে ভিডিও হল–এ। পচা মুড়ি খেতে-খেতেই সেই ছবির একখানা হিট গানের কলি গলায় খেলানোর চেষ্টা করছিল।

ঘটুর বয়স পচা বা হাঁদুর মতো কম নয়। তার বাইশ চলছে। সেও একাবোকা লোক। তারও থাকার জায়গা নেই। কিন্তু সেসব নিয়ে তার মাথা গরম হয় না। চোখ বুজলেই সে একখানা সাইকেল চোখের সামনে ভাসতে দেখে। মানুষ মেলা যন্তর আবিষ্কার করেছে বটে, কিন্তু সাইকেল হল একেবারে গন্ধমাদন। নিঝঞ্ঝাট জিনিস। পাঁইপাঁই করে উধাও হয়ে যাও। আবার সময়মতো ধীরেসুস্থে ফিরে এসো।

তা গুরুপদ যদি মাস্টারকে ছেড়ে নিজের ব্যাবসা খোলে তা হলে একটা জায়গা খালি হবে।

সেই জায়গায় উঠবে সাধু গায়েন। সাধু গায়েনের জায়গায় এক ধাপ উঠবে তারানাথ। তখন ঘটুর চাকরি পাকা হবেই।

চাকরি পাকা হলে মজুরি বাড়বে।

মজুরি বাবদেব্রজমাস্টারের কিছু গণ্ডগোল আছে। ব্রজমাস্টার একটা মোটা হিসেবে খদ্দেরের কাছ থেকে টাকা নেয়। কর্মচারীদের দেয় নিজের হিসেবমতো। গুরুপদ বা সাধু গায়েন যা পায় তারানাথ তা পায় না। তা সে হতেই পারে। পুরোনো লোক বলে কথা! কিন্তু সেই হিসেবে পচা বা হাঁদুর চেয়ে বেশি পাওয়ার কথা ঘটুর। কেন না সে ওদের চেয়ে মাস ছয়েকের পুরোনো। কিন্তু কে সে কথা বলতে যাবে?

তবে মাস্টার খুব একটা মন্দ লোক নয়। কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না। ধর্মভীরুও আছে। আর খুব কাজ পাগল লোক।

গাঁ দেশে সন্ধের পর আর কিচ্ছুটি করার থাকে না। মুড়ি খেয়ে গুরুপদ বারান্দার এক কোণে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। সাধু গায়েন আর তারানাথ বসে-বসে নানা সুখ দুঃখের কথা কেঁদে বসল। পচা আর হাঁদু বেরিয়ে পড়ল ফের ভিডিও দেখবে বলে। উদয়পুর থেকে মাইলটাক উজিয়ে গেলেই মেহেরগঞ্জে আজ হাট। ভিডিও সেখানে আছেই। পচা একবার আলগোছে জিগ্যেস করল বটে, যাবে নাকি ঘটুদা? ঘটুর ইচ্ছে হল না। ঝাড়পিট আর আশনাই আর নাচা গানা সবসময়ে ভালো লাগে না। বরং চোখ বুজে একখানা স্বপ্নের সাইকেলে সওয়ার হলে অনেক ভালো।

সাইকেলখানা দিব্যি দেখতে পাচ্ছিল ঘটু। শ্যাওলার মতো সবজে রং ঝকঝকে ক্যারিয়ার, গোল ডিবের মতো বেল, একটু নীচু হ্যান্ডেল। সাঁই সাঁই করে যাচ্ছে পাকা রাস্তা ধরে। সিটের ওপর ঘটু…

ব্রজমাস্টার আর মহিম মণ্ডল কথা কইতে কইতে ভিতর–বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

ব্রজমাস্টার কথা বলছিল, এত তাড়াতাড়ি কি এসব কাজ হয় মহিমবাবু? সবে তো বাঁশটাশ লাগানো হল। এরপর বড় পাইপ ঢুকবে। তারপর জলের পাইপ, চাট্টিখানি কথা তো নয়। আজ শনিবার, সামনের শনিবারের আগে হচ্ছে না, যদি তাও হয়।

মহিম মণ্ডল ঠান্ডা গলাতেই বলল , সবই বুঝি হেব্রজ। বলছি তো তিনগুণ মজুরি দেব।

করে দাও। মেয়ের বিয়েটা হুট করে ঠিক হয়ে গেল কিনা। বুধবার বিয়ে। তুমি বুধবার সকালের মধ্যে কাজ সেরে দাও।

বুধবার যে অসম্ভব মহিমবাবু। তিনশো ফুটের ওপর পাইপ ঢোকান কি চাট্টিখানি কথা?

তুমি ওস্তাদ লোক, মন করলে কী না পারো! দিনরাত কাজ করলে হয়ে যাবে। মজুরি চারগুণ দেব।

টাকা বাড়ালেই তো হবে না। এগুলো তো মানুষ, মেশিন তো নয়। চারদিন টানা চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করলে যে মরে যাবে।

আমার সম্মানটা রাখো মাস্টার। পাত্রপক্ষ বড়লোক, তাদের কথার নড়চড় নেই। পাত্র গোরক্ষপুর থেকে এসেছে, বিয়ে করে শুক্রবার বউভাত সেরেই চলে যাবে কাজের জায়গায়। এ পাত্র হাতছাড়া হলে তো চলবে না।

কী মুশকিল! পাত্র হাতছাড়া হতে যাবে কেন? হোক না বিয়ে, আমরা না হয় বিয়েটা ফাঁক রেখে দু-দিন পরেই কাজ করব।

আহা, আমি যে শ্যালো বসালুম তা তাদের দেখাতে হবে না? তারা বড়লোক, কিন্তু আমিও কম কীসে? শ্যালোতে ভটভট জল উঠবে, ট্যাঙ্কে জমা হবে, হুড়হুড় করে পাইপ দিয়ে পড়বে, দেখে তাদের চোখ ট্যারা হয়ে যাবে, তবে না!

এ যে বড় মুশকিলে ফেললেন মশাই। আমি রাজি হলেও আমার লোকেরা কি রাজি হবে ভাবছেন?

ডাকো তাদের, মজুরি চারগুণ তো পাবেই, তার ওপর আমি প্রত্যেককে দুশো টাকা করে বকশিস দেব।

সাধু আর তারানাথের বাক্যালাপ থেমে গেছে। গুরুপদও উঠে বসেছে অন্ধকারে।

তারানাথ চাপা গলায় বলল , শুনলে?

গুরুপদ বলল , শুনলাম।

সাইকেলের দরদাম জানে না ঘটু। দুশো টাকায় কি হয়? হোক–না-হোক, সাইকেলটা যেন আবডাল থেকে খুব খুশির ঘণ্টি বাজাতে লাগল। সে এসে পড়তে চাইছে।

মাস্টার হাঁক মারল, গুরুপদ! ও গুরুপদ, একবার আয় তো এদিকে ভাই।

গুরুপদ উঠে পড়ল। সঙ্গে সাধু গায়েন আর তারানাথও।

ঘটু গুরুতর কথায় থাকে না। তবে আড়ালে কান খাড়া করে রইল সে।

এই যে গুরুপদ, বাবু কী বলছে শোন। পারবি চার দিনে কাজ তুলে দিতে?

দশদিনের কাজ চার দিনে? ও বাবা।

মহিম মণ্ডল বলল , বাপু হে, হওয়ার কথাটা ভাবো, না হওয়ার কথাটা ভেবো না। দশ দিনে। পারলে চার দিনেও পারা যায়। খাটুনিটা বাড়িয়ে দেবে।

আজ্ঞে মানুষের শরীর তো?

মানুষ কি কম কিছু করছে? পাহাড়ে উঠছে, সমুদ্দুর পেরোচ্ছে সাঁতরে, আরও কত কথা শুনি। আমার যে সম্মানের প্রশ্ন হে!

আজ্ঞে মজুরিটা কত দেবেন।

যা পাও তার তিনগুণ, আর দুশো টাকা করে বকশিশ।

মাপ করবেন, ওতে পারব না।

কত চাও?

মজুরি চার ডবল করুন। আর হাতে–হাতে তিনশো করে টাকা।

সুযোগ বুঝে বাড়াচ্ছে হে!

আজ্ঞে না। শরীরের রসকস নিংড়ে দিতে হবে যে। চার দিন না ঘুমিয়ে, জিরিয়ে কাজ করলে মানুষের কী অবস্থা হয় তা তো জানেন।

মহিম মণ্ডলের পয়সা আছে, পয়সার গরমও আছে। হঠাৎ হুঙ্কার দিয়ে উঠল, তাই পাবে। লেগে পড়ো, বুধবার বেলা বারোটার মধ্যে কাজ সারা চাই। জামাই আসবে সাড়ে পাঁচটায়। তার আগে এমন করে সব সারতে হবে যে, সদ্য হয়েছে বলে বোঝা না যায়।

তা হয়ে যাবে।

আজ রাত থেকেই শুরু করে দাও। আমি ইলেকট্রিক মিস্ত্রি সাধনকে খবর দিচ্ছি, সে এসে একটা ডুম জ্বালানোর ব্যবস্থা করে দিক লাইন টেনে।

যে আজ্ঞে।

ও ঘটু, পচা আর হাঁদুকে দৌড়ে গিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বেশিদূর যায়নি বোধ হয়।

তারানাথের হাঁক শুনে ঘটু উঠে ছুটল। আর ছুটতে ছুটতে তার মনে হল, এই অবস্থায় একখানা সাইকেল থাকলে? আঃ, শুধু প্যাডেল মারো আর উড়ে যাও।

পচা আর হাঁদু গাঁ পেরোনোর আগেই ধরে ফেলল ঘটু। বৃত্তান্ত শুনে তারা পড়ি–কি–মরি করে ছুটে এল। সাজো সাজো রব।

মহিম মণ্ডল ভারী খুশি হয়ে বলল , এই তো চাই। ভালো করে কাজ করো বাবাসকল, আজ রাতে খাসির মাংস খাওয়াব।

ব্রজমাস্টার হাত জোড় করে বলল , ওটি করবেন না। গুরুভোজন হয়ে গেলে সবাই চুলবে, কাজ এগোবে না। বরং রুটি তরকারির বন্দোবস্ত করুন। ঊন–পেটে থাকলে রাত জাগতে সুবিধে হয়।

পুবের আকাশে সূয্যি ঠাকুরের মতো মাংসটা উদয় হচ্ছিল, কিন্তু অস্তও হয়ে গেল। বেজার মুখে ঘটু কাজে নেমে পড়ল।

কাজও বড় সোজা নয়। কার্তিক মাস, হিমেল হাওয়া দিচ্ছে। দু-খানা ডুমের আলোয় বড় বড় ছায়া ফেলে তারা কেসিং-এর পাইপ পুঁততে লাগল। হ্যামার মারতে মারতে হাঁদু, পচা আর ঘটুর গা ঘেমে গেল কয়েক মিনিটেই। তা ঘামুক, মণ্ডলের পো পুষিয়ে দিচ্ছে।

ভোর হতে না হতেই চারখানা পাইপ নেমে গেল নীচে।

ব্রজমাস্টার একখানা ঢিবির ওপর বসে দেখছিল সব। বলল , এবার যাও, চোখেমুখে জল দিয়ে একটু জিরিয়ে নাও। মুড়িটুড়ি যা জুটবে খেয়ে ঘণ্টা দুই ঘুমোও। একেবারে না ঘুমোলে। শরীর দেবে না। কাজটা তোলা চাই। শরীর পাত হয়ে গেলে কাজ তুলবে কে? মুড়ি এল, সঙ্গে সেই গুড় তো আছেই, মণ্ডলের পো একধামা বেগুনিও পাঠিয়েছে গরমাগরম। কিন্তু ব্রজমাস্টার। বেগুনির ধামা সরিয়ে নিল। বলল , ও জিনিস চলবে না। খাটুনির পর এসব ভাজাভুজি পেটে গেলে আর দেখতে হবে না।

শেষ অবধি দয়াপরবশ হয়ে দু-খানা করে দিল।

দুপুর অবধি কাজ অনেকটাই এগোল। দুপুরে যখন পেটে খাণ্ডবদাহনের খিদে তখন যা জুটল তা ব্রজমাস্টারের হুকুমেই। তেতোর ডাল, একটা ঘ্যাঁট আর ভাত। সঙ্গে আলু সেদ্ধ। ব্রজমাস্টার বলল , গুরুপাক খেলে শরীর দেবে না। উন খাওয়াই ভালো। কাজ তুলে দে, তারপর বিয়ের ভোজ তো আছেই।

খাওয়ার পর ফের ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিলে তারা। তারপর ফের কাজ। পাইপ নামছে। কাজ এগোচ্ছে। তবে রাতের মধ্যেই ঘটু বুঝতে পারল শরীরের নাম মহাশয়। চোখে ঢুলুনি। হাত পায়ে সেই দুনো জোর আর নেই। তিনশো টাকা আর তিন ডবল মজুরিতে তার সাইকেলখানা হয়ে যাবে, এই আশায় হ্যামার মারতে লাগল ঘটু। গুরুপদ খাটছে, দু-হাজার টাকার খানিক উশুল করবে বলে। সাধু গায়েন বউকে উঞ্ছবৃত্তি থেকে রেহাই দেবে। তারানাথ বিয়ে বসবে। পচা আর হাঁদু টাকাটা ওড়াবে ইচ্ছেমতো, কিছু বাড়িতেও দেবেথোবে। নানান ধান্ধায় মহিম মণ্ডলের শ্যালো নামছে মাটিতে। গভীরে।

সোমবার উদয়পুরের হাট। মহিম মণ্ডলের বাড়ির পাশের মাঠ থেকেই হাটের শুরু। রবিবার বিকেল থেকেই ব্যাপারীরা এসে হাজির হচ্ছিল পিলপিল করে। সোমবার সকালে হাঁকেডাকে জমজমাট।

খাওয়াটা তেমন জুতের হচ্ছে না, বুঝলে? আরে খাটলে পিটলে একটু পোস্টাইও তো চাই। এই বলে পচা আর হাঁদু যখন ব্রজমাস্টার সকালে মাঠপানে গেছে, তখন হাটে গিয়ে ভরপেট ঘুগনি মেরে এল। মহিম মণ্ডলের চারটে মোষ আর বারোটা গরু। পিছনের উঠোনে সকাল বিকেল যখন দোয়ানো হয় তখন মচ্ছব লেগে যায়। পচা আর হাঁদু এক ফাঁকে গিয়ে এক ঘটি করে মোষের দুধ কাঁচাই গিলে এল। রাখাল লোকটা দিলও, কারণ বাবুর গুরুতর কাজ হচ্ছে, মিস্তিরিরা জান কয়লা করে খাটছে, না দেবেই বা কেন?

বিকেলের মধ্যেই দুজনের পেট নামল সাংঘাতিক। কাজ করবে কি, হাতের জলই শুকোয় না। তার ওপর তারানাথের এল কম্প দিয়ে জ্বর।

এঃ, এ যে তীরে এসে তরী ডুবতে বসল দেখছি। বলে মুখ বেজার করল ব্রজমাস্টার।

মহিম মণ্ডল বলল , গতরে খাটার লোক দিতে পারব। তবে তারা এ ব্যাপারে আনাড়ি।

তাই দিন। কাজ তো চালাতে হবে।

দুটো মুনিশ আর ঘটু মিলে ফের লেগে পড়ল। সোমবার মাঝরাতে কেসিং-এর পাইপ তিনশো ফুট নামল বটে, কিন্তু ঘটুর তখন হাতে–পায়ে সাড়া নেই।

মাঝখানের পাইপ নামানো সাবধানের কাজ। রেঞ্চ দিয়ে ঠিকমতো আটকে না রাখলে একখানা পাইপও যদি পিছলে ভিতরে পড়ে যায় তো চিত্তির। সব পরিশ্রমই বৃথা যাবে। এ কাজ আনাড়ি দিয়ে হওয়ার নয়। জ্বর গায়েই তারানাথ এসে হাত লাগাল। পচা আর হাঁদুও লেগে পড়ল ফের। হাঁদু চুপিচুপি ঘটুকে বলল , আমার ঠাকুরদা রক্ত আমাশায় মারা গিয়েছিল। আমারই সেটাই হয়েছে, তলপেটে বড় যন্ত্রণা।

সাত-আট ঘণ্টা খাটার পর দু-ঘণ্টা ধরে ঘুমোচ্ছে তারা। কিন্তু তাতে শরীরের আবল্যি যাচ্ছে না। পাইপ নামানোর সময় রেঞ্চ ধরা হাত দু-খানা থরথর করে কাঁপছিল ঘটুর। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রইল। চোখ বুজলেই সাইকেল। সাইকেলখানা দেখতে পেলেই বুকখানা যেন ভরে যায়। নীচু হ্যান্ডেল, শ্যাওলা সবজে রং, ঝকঝকে ক্যারিয়ার।

হড়াক করে একটা শব্দ হওয়ায় চটকা ভাঙল ঘটুর। সবাই চেঁচাচ্ছে, গেল! গেল! রেঞ্চ তার ঘুমন্ত হাত থেকে আলগা মেরে পাইপ সরসর করে নেমে যাছিল। ঘটু প্রাণ হাতে নিয়ে দুহাতে সাপটে ধরল পাইপ। কাদা জলে পিছল হাত। আর চারখানা জোড়ের ভারী পাইপ। ধরে রাখতে হাতির জোর চাই। তবু ধরে রইল ঘটু। অন্য সবাই হাত না লাগালে হয়ে যেত।

না, ব্রজমাস্টার বকল না। বরং বলল , ওর দোষ কী? শরীর বলে কথা। ও ঘটু, যা বরং জর্দা দিয়ে একটা পান খেয়ে আয় ঘুমের চটকাটা যাবে।

পান আর খেতে হল না। দু-খানা হাতের তেলোর দিকে চেয়ে ঘটু জলভরা চোখে দেখল, হাত দু-খানা ছড়ে কেটে একশা। ভারী পাইপ ধরে রাখতে গিয়ে কেসিং-এর কানায় চেপে গিয়ে গর্ত হয়ে কেটেছে পঞ্জার তলার দিকটা। কলের মতো রক্ত পড়ছে। সাধু গায়েন রেঞ্চটা নিজের হাতে নিয়ে বলল , যা, ঘাস ঘেঁতো করে লাগা।

তাই লাগাল ঘটু। বাবুভাইদের হাত হলে ভোগাত। মিস্তিরির হাত বলে তেমন গা না করলেও চলে। তবে বসে থাকতে ভয় হচ্ছে ঘটুর। মহিম মণ্ডল যদি কথা তোলে, আমার মুনিশ খাটছে, তোমার লোক বসে আছে, আমি মজুরি কাটব। মুনিশ দুটোকেও তো দিতে হবে। তারা তো মাগনা খাটছে না!

কথাটা তারানাথের কানে দিল ঘটু। তারানাথ বলল , না রে, মহিম দিলদরিয়া লোক। কাটবে না।

মঙ্গলবার রাতে যখন পাইপ নেমে গেল, আর মুখ সিল করা হল তখন ঘটুর হাতে বড় বড় ফোস্কা। লেবুকাঁটা দিয়ে ফোস্কা গেলে মরা চামড়া সরিয়ে দিল সে নিজেই। তারপর বিষহরি তেল লাগাল। গরিবের হাত এতেই সারে। না সারলে কি চলে?

সারারাত জল ঢালা হল পাইপে। প্রথমে গোরবগোলা, তারপর সাদা জল। পাম্প চালিয়ে জল বের করা হতে লাগল। সবাই টান টান। জলের প্রেশার যেমন, ঠিকমতো মোটা নালে ওঠে কি না। ওঠে।

বুধবার ভোরবেলা ভোগবতী মহিম মণ্ডলের পাইপ বেয়ে উঠে এলেন। ফুরফুরে জল। পরিষ্কার ঝকঝকে।

বিয়েবাড়ির তুমুল হইরইয়ের মধ্যেও মহিম ছুটে এসে পিঠ চাপড়ে দিল ব্রজমাস্টারের কাজ দেখালে বটে বাপু! তাজ্জব!

জল ট্যাঙ্কে উঠে যাচ্ছে ডিজেল পাম্পে। বিয়েবাড়ি ভাসাভাসি।

কাজ শেষ করে তারা বাইরের দিককার ঘরের বারান্দায় বসে আছে পাশাপাশি। সামনের ফাঁকা মাঠে রাতারাতি মস্ত ম্যারাপ বাঁধা হয়ে গেছে। এই ম্যারাপের নিচেই সাঁঝবেলায় বিয়ের আসর বসবে। মণ্ডলের পো জামাইকে ঢেলে দিচ্ছে। স্কুটার, টিভি, আরও কী-কী সব যেন। জামাইও জম্পেশ। মস্ত চাকরি।

কাজের মেয়ে বলে গেছে আজ মুড়ির সঙ্গে গরম বোঁদে দেওয়া হবে, আর দুখানা করে সন্দেশ। আর বেগুনিও। কিন্তু কারোই তেমন গা নেই। শরীর নিংড়ে দিতে হয়েছে গত চার দিনে। কাজটা উঠে গেছে এই যা একটা ভালো খবর।

গুরুপদ হিসেব কষছিল। কষে বলল , আরও হাজারখানেক হলেই হয়ে গেল।

সাধু গায়েন দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসেছিল। বলল , আমার এখনও ঢের দেরি। যতীন মজুমদারের জমিটা আড়াই কাঠা। তাও দশ হাজার চাইছে।

এইসব কথাবার্তা হচ্ছিল। সকলেরই দমসম অবস্থা। গড়িয়ে নিতে পারলে হয়। হঠাৎ একটা শোরগোল মতো শোনা গেল ভিতরবাড়ি থেকে।

গুরুপদ সোজা হয়ে বসে বলল , গোল কীসের?

তারানাথ বলল , বিয়েবাড়িতে অমন হয়। আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই পুরোনো খার থাকে কিনা।

একটু বাদেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল ব্রজমাস্টার, ওরে, সর্বনাশ হয়েছে। বাবুর মেয়ে পালিয়ে গেছে।

সবাই সোজা হয়ে বসল।

ব্রজমাস্টার উত্তেজিত হয়ে বলল , সকালে কুয়োপাড়ে মুখ ধোয়ার নাম করে গিয়েছিল। সেখান একটা ছোঁকরা সাইকেল নিয়ে তৈরি ছিল। রডে তুলে নিয়ে হাওয়া।

তারানাথ বলল , তা হলে কী হবে?

কী আর হবে। মহিমবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। গিন্নি মূৰ্ছা গেছেন। চারদিকে লোক গেছে মেয়ে খুঁজতে। কিন্তু খুঁজে পেলেও লাভ নেই। রা পড়ে গেছে। পাত্রপক্ষ গায়ে হলুদের তত্ব নিয়ে এসেছিল, তারাও জেনে গেছে। বিয়ে ভেস্তেই গেল ধরে নাও।

ঘটু উঠে সোজা হয়ে বসে বলল , সাইকেল?

ব্রজমাস্টার অবাক হয়ে বলে, সাইকেল! সাইকেলের কথা উঠছে কেন?

ঘটু একগাল হেসে বলল , সাইকেলের কথাই তো বললেন! সাইকেলে করেই তো পালিয়েছে!

হ্যাঁ। তাতে কী?

ঘটু উজ্জ্বল চোখে চেয়ে রইল। একখানা সাইকেল হলে কত কী না করা যায়!

Facebook Comment

You May Also Like