চুক্তি – জসীম উদ্দীন

'চুক্তি' জসীম উদ্দীন

গ্রামের মধ্যে সবচাইতে বড়লোক আমাদের খাঁ সাহেব; কিন্তু বড়ই কৃপণ। একটি পয়সাও তার হাতের কানি আঙুল গড়িয়ে পড়ে না। তার বাড়িতে কেহ কোনোদিন দাওয়াত খেতে পায় না।

সেবার তার ছেলের বিবাহ। সমস্ত গ্রামের লোক এসে ধরল, “খাঁ সাহেব! এবার আর আপনাকে ছাড়ব না; আপনার ছেলের বিবাহ। আমাদিগকে দই চিনি খাওয়াতে হবে।”

খাঁ সাহেব অনেক ওজর আপত্তি করল, “এ বছর ক্ষেতের ধান তেমন হয় নাই। পাটের দামও কম। দই-চিনিটা বাদ দাও। আমি তোমাদেরকে মাছ-ভাত খাওয়াব।”

গ্রামের লোকেরা কি আর তা মানে? অগত্যা খাঁ সাহেবকে রাজি হতে হল।

কিন্তু গ্রামের সমস্ত লোককে দই-চিনি খাওয়াতে গেলে অনেক টাকা খরচ হবে। সারারাত এই খরচের চিন্তায় তার ঘুম হল না। শেষরাতে খাঁ সাহেব মনে মনে একটি ফন্দি আঁটল।

সকাল হলে সে মতি গোয়ালার বাড়ি গিয়ে তাঁকে ঘুম হতে জাগাল। মতি চোখ মুছতে মুছতে জিজ্ঞাসা করল, “তা খাঁ সাহেব কি মনে করে?”

খাঁ সাহেব বলল, “দেখ মতি! কাল আমার ছেলের বিয়ে। তোমাকে দশ মণ দই করে দিতে হবে।”

মতি খুশি হয়ে বলল, “সে আর এমন বেশি কথা কি? আমি ঠিক সময়ে দই বানিয়ে হাজির হব।”

খাঁ সাহেব গোয়ালাকে আরও একটু নিকটে ডেকে বলল, “দেখ মতি! এর মধ্যে আমার একটি কথা আছে। তুমি আমাকে একমণ মিষ্টি দই বানিয়ে দিবে। আর বাদ বাকি নয় মণ দই টক করে তৈরি করবে।”

মতি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “খাঁ সাহেব! সবাই তো মিষ্টি দই চায়। আপনি টক দই চান কেন?”

খাঁ সাহেব হেঁসে বলল, “দেখ মতি! তুমি বুঝবে না। তুমি যদি আমাকে সব মিষ্টি দই দাও, তবে দশ মণে কুলাবে না। গ্রামবাসীরা যেভাবে রাক্ষসের মতো খায়, বিশ মণ দই না হলে তাদের পেট ভরাতে পারব না। সে অনেক টাকার খরচ।”

গোয়ালা হেঁসে বলল, “আচ্ছা! আপনি যেভাবে বলছেন, সেভাবেই দই তৈরি করব।”

খাঁ সাহেব গোয়ালার কানে কানে বলল, “দেখ মতি! আরও একটা কথা, তোমার টক দই খেয়ে গ্রামের লোকেরা যখন নিন্দা করবে, তখন আমি তোমাকে খুব বকব। কিন্তু তুমি একটি কথাও বলতে পারবে না। এজন্য আমি তোমার টক দইয়ের প্রতি মণের দামে আরও চার আনা করে ধরে দিব। মনে থাকে যেন, আমি টক দই আনার জন্য তোমাকে যতই গালাগালি করব, তুমি টু শব্দটিও করবে না।”

মতি হেঁসে বলল, “আচ্ছা।”

নিমন্ত্রণের দিনে গ্রামের লোক খেতে এসেছে। মাছ-ভাত খাওয়ার পর প্রত্যেকের পাতে যখন মিষ্টি দই পড়ল; তখন সকলেই খাঁ সাহেবের তারিফ করতে লাগল। কিন্তু এক চামচ দুই চামচ করে যখন পাতে পাতে টক দই পড়তে লাগল, তখন সকল লোকের মধ্যে হৈচৈ পড়ে গেল। কেউ খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়ল, কেউ খাঁ সাহেবকে গালি দিতে লাগল।

খাঁ সাহেব তখন গোয়ালাকে ডেকে খুব রাগের সঙ্গে বলল, “দেখ! তুমি এত টক দই দিয়েছ কেন?”

গোয়ালা কোনো কথা বলে না। খাঁ সাহেব গলা আরও চড়িয়ে বলে, “কি, এখন যে মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। বেটা পাজি নচ্ছার এত টাকা দাম নিয়ে আমাকে টক দই দিয়েছিস? দাঁড়া, তোকে আমি মজা দেখাচ্ছি!”

গোয়ালা তখনও কোনো কথা বলে না।

খাঁ সাহেব আরও রেগে বলে, “বেটা পাজি নচ্ছার! ভেবেছিস তোকে আমি এমনি এমনি ছেড়ে দিব? এত লোকের খাওয়া নষ্ট করলি, তার শাস্তি তোকে দিব না?”

তাঁকে এইভাবে বকতে বকতে খাঁ সাহেবের মাথা গরম হয়ে উঠল। রাগের মাথায় গোয়ালার মুখে বিরাশির দশ আনা ওজনের এক থাপ্পড় মেরে বসল।

মার খেয়ে গোয়ালা নিমন্ত্রিত লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বলল, “দেখেন, সব লোকজন আপনারা দশজনে ইহার বিচার করেন। খাঁ সাহেব কোরান শরিফ মাথায় নিয়ে বলুন, দই টক হলে আপনারা কম খাবেন, তাই আমাকে টক দই আনার জন্য বায়না দিয়েছিলেন কি না?”

শুনে গাঁয়ের সকল লোক খাঁ সাহেবের উপর ভীষণ চটে গেল। খাঁ সাহেব এর মেজাজ নরম হয়ে এলে কানে কানে আস্তে গোয়ালাকে বলল, “কিরে মতি, তোর সঙ্গে কথা হয়েছিল না, টক দই দেখে আমি খুব রাগারাগি করব, তুই কিছু বলবি না? এখন কেন সকল কথা ফাঁস করে দিলি?”

গোয়ালা আরও আস্তে আস্তে খাঁ সাহেবকে বলল, “আপনার সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল, আপনি যতই গালাগালি করবেন, যতই আমাকে বকবেন, ধমকাবেন আমি টু শব্দটিও করব না। যতক্ষণ আপনি রাগারাগি করতে থাকবেন আমি কিছুই বলব না। কিন্তু আপনি আমার মুখে বিরাশির দশ আনার একটি থাপ্পড় মারলেও যে আমি কথা বলব না, একথা তো চুক্তিতে ছিল না।”

গ্রামের সমস্ত লোকের কাছে খাঁ সাহেবের মাথা হেঁট হল।

Facebook Comment

You May Also Like