Sunday, May 17, 2026
Homeবাণী ও কথাছবি - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ছবি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পলাশের ঘরে দুটো বড় জানলা, পুবের জানলা দিয়ে দেখা যায় উঁচু রেললাইন, মাথার ওপর ইলেকট্রিকের তার, সন্ধেবেলায় প্ল্যাটফর্মে নিয়নের আলো জ্বললে স্টেশনের পাশের নোংরা পুকুরটায় অদ্ভুত সুন্দর ছায়াছবি দেখা যায়। জাতীয় সড়ক রেললাইন ভেদ করে চলে গেছে, সেই সুন্দর রাস্তার দুপাশে ইটের খাঁচায় যত্নে লালিত হয়েছে গাছের চারা। একদিন জাতীয় সড়ক আরও সুন্দর হবে। এখনও ছোট্ট স্টেশনটায় দূরপাল্লার ট্রেন থামে না। না থামুক, কিন্তু জনবসতি বাড়ছে আশেপাশে। স্টেশনটা ক্রমশ হয়ে উঠছে জমজমাট। জাতীয় সড়কের দুধারে উঠছে বাড়ি, দোকানপাট, পেট্রোল পাম্প, পুবের জানলা খুললে পলাশ তাই সভ্যতার অগ্রগতির চিহ্নগুলো দেখতে পায়।

আশ্চর্য এই, পশ্চিমের জানলার ঠিক বিপরীতে একটা ছবি টাঙাননা। এদিকে সূরযের খাটাল, প্রকাণ্ড চাতাল জুড়ে গোবরের কালচে রং, অনেক গাছগাছালির ছায়ায় গরু–মোষের জলপাত্র, খাবারের চাড়ি। কচুপাতার জঙ্গল, কাঁটাগাছের হলুদ ফুলে চারিদিক আকীর্ণ, মাঝে-মাঝে জলঢোঁড়া বা হেলে সাপ ব্যাং ধরলে মর্মান্তিক শব্দ ভেসে আসে। সন্ধের পর টেমি হাতে সূরযের বাড়ির লোকে উঠোনে ঘোরে! রাতে গরু–মোষের দাপানোর শব্দ পাওয়া যায়। মানু পশ্চিমের জানালাটা তাই সহজে খুলতে চায় না। বলে–মাগো, কী বিশ্রী গন্ধ! যা মশা!

পলাশ মানুর সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা করার সুযোগ পায় না! তার সময়টা এখন খারাপ যাচ্ছে। গতবছরও ছিল একটা বড় কাগজের প্রেস ফটোগ্রাফার, বেশ নাম করেছিল পলাশ। তার দু-একটা স্টিল ছবি প্রাইজও পায়। একটা ছবি ছিল এইরকম–খুব বৃষ্টির মধ্যে আবছা একটা গোলপোস্টের সমকোণ দেখা যাচ্ছে, পেছন দিকটা ওয়াশ-এর ছবির মতো ধোঁয়াটে, সেই ধোঁয়াটে রহস্যময় পটভূতিতে দাঁড়িয়ে বয়স্ক এক গোলকিপার, কালো পুরোহাতার জামা গায়ে, হাতে কালো দস্তানা, পায়ে হোস, বুট। সে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে, তার সামনে একটা সাদা বল পড়ে আছে। বলটার দিকে তার বাড়ানো হাত, আর মুখে সীমাহীন ক্লান্তি। এই ছবি। ছবিটায় কিছু নেই, কিন্তু তবু একটি মানুষের সারাজীবনের লড়াইয়ের গল্পটি যেন বলা আছে। পলাশের এই ছবি অনেকে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখেছে একদিন। এইসব ছবি তুলেছিল পলাশ, আর তুলেছিল কিছু বিপজ্জনক ছবি। পুলিশের লাঠি–গুলির ছবি। নেতাদের অবসর মুহূর্তের ছবি। দুর্ঘটনার ছবি। ছবির চোখ ছিল বটে পলাশের। কাগজের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ভালোই। কিন্তু অতিরিক্ত স্পর্শকাতর লোকেরা চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারে না। পলাশ গতবছর চাকরিটা ছেড়েছে। মানু তার স্বামী সম্বন্ধে যখন আশাবাদী হয়ে উঠেছিল ঠিক তখনই এই অঘটন। ভারী। হতাশ হয়ে মানু বলেছিল–

–চাকরিটা ছেড়ে দিলে? এখন কী হবে?

–চাকরিটা করা যাচ্ছে না মানু। আমি ছবি তুলি, সেই ছবিগুলো লোকে দেখুক আমি তাই চাই। কিন্তু ওরা ছাপছে না। ছবিগুলো ওদের পলিসির উলটোদিকে যাচ্ছে।

মানু সব কথা বোঝে না। সে কেবল বোঝে কিছু ছবি ছাপা হয়, কিছু হয় না। যেগুলো ছাপা হয় না সেগুলো হতে নেই বলেই হয় না, সব ছবি কি ছাপা হতে আছে? মা গো! পলাশ বিয়ের পর মানুর অনেক ছবি তুলেছিল, তার মধ্যে অনেকগুলো ছিল যাতে মানুর গায়ে একবিন্দু পোশাক নেই! কখনও বনদেবী, কখনও বা ভেনাস সাজিয়েছিল তাকে পলাশ। সে সব ছবি কি তারা দুজন। ছাড়া আর কারও দেখতে আছে? তবে!

পলাশ বড় একগুঁয়ে। সে বাড়িতে ফিরে তার ক্যামেরা খুলে ফিল্ম বের করে। বাথরুমের পাশের ছোট্ট ঘরটা ডার্করুম করেছে সে। সেইখানে ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়। তারপর একদিন ছবিগুলো বের করে এনে বিছানায় ওপর তাসের মতো বিছিয়ে দেয় সে। কখনও কাছ থেকে, কখনও দূর থেকে অনেকক্ষণ ধরে ছবিগুলো দেখে। একা-একা কথা বলে তখন। সেইসব ছবি অনেক দেখেছে মানু। পলাশ মগ্ন হয়ে নিজের তোলা ছবি থেকে চোখ তুলে কখনও-কখনও অচেনা মানুষকে দেখার চোখে মানুকে দেখেছে। অন্যমনে বলেছে–দ্যাখো, দ্যাখো তো–এ সবই কি এই দেশের সত্য ছবি নয়?

হবেও বা, মানু অত জানে না, শেষ দিকে পলাশের ভোলা বেশির ভাগ ছবিই নাকচ হয়ে যাচ্ছিল। ছাপা হচ্ছিল না। কিন্তু তাতে কী? স্থায়ী চাকরির মাইনেটা পলাশ পেয়ে যাচ্ছিল ঠিকই। কোনও গোলমাল ছিল না সেখানে। কিন্তু চাকরির চেয়ে ছবির নেশা পলাশের অনেক বেশি।

–এই সবই এই দেশের সত্য ছবি। মানু, খবরের কাগজের জন্য শিল্প নয়। তার ছবি আলাদা। আমি থাকতে পারব না।

মানু চমকে বলেছে–তা কেন? চাকরি চাকরিই, তোমার ছবি তুমি তুলে বেড়াও না। কে দেখতে যাচ্ছে?

পলাশ মাথা নেড়েছে–আমি বুঝতে পারছি, চাকরি ছাড়লেই আমি এক বিশাল ছবির রাজ্যে চলে যেতে পারব। ছবি ছাড়া আমি যে আর কিছু বুঝি না।

মানু খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে, তাদের বাড়িতে কেউ কোনও শিল্পচর্চা করেনি। বাবা একসময়ে শৌখিন থিয়েটার করতেন, ছোটভাইটা তবলা ঠোকে। বাস, এর বেশি কিছু না! পলাশের মতো মানুষ মানু, তাই আর দেখেনি। ফলে, সে পলাশের দুঃখটুঃখগুলো সঠিক বুঝতে পারে না কোনওদিনই, কখনও বা পলাশকে তার ভয় হয়, কখনও বা পলাশের ওপর খুব রাগ হয় তার।

পলাশ তাকে এই বলে ভোলাত–দেখো মানু, আমি ফ্রিল্যান্সে অনেক বেশি রোজগার করব।

মানু তাতে ভোলেনি, কিন্তু পলাশ গতবছর চাকরিটা ছেড়েছিল ঠিকই। বড় দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ পলাশ। তাদের এখন দু-দুটো বাচ্চা। বড়টা ছেলে, তার নাম চিত্রার্পিত–পলাশেরই রাখা। নাম। চিত্রার্পিতের ছয় বছর বয়স চলছে। ছোটটি মেয়ে নাম সোনারেখা–তার বয়স তিন। এই বাড়ন্ত ছেলেমেয়ের বাবা কোন আক্কেলে যে চাকরি ছাড়ে।

এখন আর পলাশের সময় নেই! কোন সকালে ক্যামেরা ঘাড়ে করে বেরোয়, রোদে–রোদে ঘোরে সারাদিন। তার মুখ হয়ে যাচ্ছে রুক্ষ, গায়ে লাবণ্য কমে যাচ্ছে। গায়ে প্রায়দিনই ময়লা পোশাক থাকে, গালে দাড়ি বেড়ে যায়, সানগ্লাস পরে থাকে বলে ওর চোখের চারপাশে একটা সাদা ভাব। ভারী ক্লান্ত হয়ে রাতে ফেরে পলাশ। কারও দিকে তাকায় না। জামাকাপড় ছেড়ে একটা কালো অ্যাপ্রন পরে ডার্করুমে ঢুকে যায়। লাল আলো জ্বেলে ক্যামেরা আনলোড করে, সেখানে বসেই এককাপ চা খায়, তারপর আলো নিভিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। ঘণ্টার–পর–ঘণ্টা কেটে যায় তার ডার্করুমে। মানুর সঙ্গে তার মেলামেশা নেই–ই প্রায়, চিত্র আর সোনাও ক্রমেই বাপকে ভুলে যাচ্ছে। কখনও ভুলেও তাদের কাছে ডাকে না পলাশ, আদর করে না। মানু মাঝে মাঝে বলে–তুমি কি আমার পেয়িং গেস্ট?

পলাশ কথাটার অর্থ না বুঝে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর কোনওদিন বা হাসে, কোনওদিন নিজের মধ্যে ডুবে থাকে।

এক-একদিন পলাশ বাড়িতে থাকে। সারাদিন অজস্র ছবি ডার্করুম থেকে বের করে বিছানার ওপর তাসের মতো সাজায়। কখনও দূর থেকে, কখনও কাছ থেকে দেখে। ছবি দেখায় এক সময়ে নিশ্চয়ই ক্লান্তি আসে পলাশের। তখন সে মাঝে-মাঝে পুবের জানলার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে চেয়ে থাকে। মানু বুঝতে পারে, এই জানলাটা পলাশের প্রিয় নয়। এ জানলা দিয়ে যখন তাকিয়ে থাকে পলাশ, পুব আকাশের উজ্জ্বল আলোর আভা যখন তার মুখে এসে পড়ে, তখন তাকে ভারী নির্জীব দেখায়। হতাশা ফুটে ওঠে তার রুক্ষ মুখে। সে মাঝে-মাঝে মানুকে ডেকে বলে–এ জায়গাটা খুব কমার্শিয়াল হয়ে যাচ্ছে, দেখেছ! কত দোকানপাট উঠছে!

মানু বলে ভালোই তো।

–ভালো কেন?

–বাঃ। কলকাতার এত কাছে একটা জায়গা, চিরকাল কি তা গ্রাম হয়ে থাকতে পারে? কলকাতার প্রভাব আছেনা? আমার বাপু, দোকানপাট, আলো, মানুষজন ভালো লাগে।

পলাশ অন্যমনে জানালাটা দিয়ে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ আস্তে-আস্তে বলে–জায়গাটা মরে যাচ্ছে।

তারপর শ্বাস ফেলে আবার নিজের তোলা অজস্র ছবির মধ্যে হারিয়ে যায়।

এ কথা ঠিক যে পলাশের রোজগার অনেক কমে গেছে। যত তার ঘোরাঘুরি তত তার রোজগার নয়। বাড়িতে ছবি জমে পাহাড় হচ্ছে, তার ক’টাই বা বিক্রি হয়? তার ওপর আছে সরঞ্জামের খরচ। সব কিছুরই দাম বেড়ে যাচ্ছে। তবু সংসার চলে যায়। এক-এক সময়ে বেশ কিছু টাকা এনে ফেলে পলাশ, এক-এক সময়ে দিনের–পর–দিন টাকার ছবি দেখা যায় না। পলাশের চারটে দামী ক্যামেরায় অজস্র ছবি আসে, টাকা আসে না। সেজন্য পলাশের তাপ উত্তাপ নেই, মানুর আছে। কিন্তু মানু ঝগড়া করে না। পলাশকে সে কখনও ভয় পায়, কখনও বুঝতে পারে না, কখনও পলাশের ওপর রাগ করে গুম হয়ে থাকে।

যেদিন পলাশ বাড়িতে থাকে সেদিন প্রায় সময়েই দুপুরবেলা সে পশ্চিমের জানালাটা খুলে একটা চেয়ার টেনে বসে থাকে। দুপুরে ঘুমোনোর অভ্যাস পলাশের নেই। কিন্তু তখন মানু ঘুমোনোর চেষ্টা করতে গিয়ে কেবল এপাশ–ওপাশ করে। কারণ, পশ্চিমের জানালা দিয়ে আসে খাটালের বিশ্রী গন্ধ, উড়ে আসে মশা, পোকামাকড়, খড় কাটার শব্দ। কিন্তু তবু পশ্চিমের জানালাটা পলাশের প্রিয়। জানালার ওপর একটা মহানিমের ছায়া নিবিড় হয়ে থাকে। সেই ছায়ায় স্নিগ্ধ দেখায় পলাশের মুখ! তার মুখের রুক্ষ রেখাগুলি কোথায় মিলিয়ে যায়। দুই ঘুমহীন চোখে স্বপ্নেরা ভিড় করে আসে। চেয়ারটা পিছনে হেলিয়ে জানলার চৌকাঠে পা তুলে বসে পলাশ চেয়ে থাকে। তার মাথার ওপর দেওয়ালে সেই গোলকিপারের বিখ্যাত বাঁধানো ছবিটা দেখা। যায়। সামনে সাদা বলের দিকে হাত বাড়িয়ে এক ধোঁয়াটে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে বয়স্ক গোলকিপার, তার মুখের ওপর দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা তীরের মতো নেমে আসছে, কপালের ওপর লেপটে আছে, তার মুখে গভীর হতাশা। পশ্চিমের মহানিমের শান্ত ছায়া পড়ে সেই গোলকিপারের মুখেও, বড় অদ্ভুত দেখায় তাকে। সে যেন একটি মুহূর্তের ভঙ্গির ভিতর দিয়ে তার সারা জীবনের গল্প নীরবে বলে যাচ্ছে। বড় কষ্ট হয় মানুর, সে গোলকিপারের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। পলাশের মুখ থেকেও। ঘুমঘোরে সে মনে আনতে চেষ্টা করে–সে ভেনাসের সুন্দর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। ঠোঁট টিপে একা হাসে মানু। মনের বিষাদ উড়ে যায়।

আস্তে-আস্তে গড়িয়ে যায় শান্ত দুপুর। বিকেলে চায়ের সময় হয়ে আসে। মানু শ্লথ শরীরে আধোঘুম থেকে উঠে তখনও দেখে পলাশ পশ্চিমের জানলার কাছে চুপ করে বসে আছে। গাছগাছালির ভিতর দিয়ে রাঙা রোদ এসে পড়েছে তার রুক্ষ মুখে। মুখটা কোমল দেখাচ্ছে।

–কী দেখছ সারা দুপুর বসে-বসে? মানু জিগ্যেস করে।

পলাশ মুখ ফিরিয়ে হাসে। বলে–কী জানি! এদিকটা দেখতে আমার বেশ লাগে। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়।

যখন মানু চা এনে পলাশের হাতে দেয়, তখনও পলাশের ঘোর কাটেনি, স্তব্ধ হয়ে আছে। চা নিয়ে মানুর দিকে চেয়ে বলে–আমাদের গ্রামের বাড়িতে এইরকম একটা উঠোন ছিল। তার পশ্চিমে গোয়ালঘর, দক্ষিণে বেঁকিঘর, চেঁকিঘরের পিছনে পুকুর! আমরা এরকম বিকেলে উঠোনে খেলতে-খেলতে শুনতাম পেঁকিঘরে পাড় দেওয়ার শব্দ। উঠোনে খুব আলোছায়ার খেলা ছিল। পুকুরের আঁশটে গন্ধ ভরভর করত বাতাসে, গোবর–নিকোনো উঠোন থেকে সিঁদুর তুলে নেওয়া যেত! মানু, এই পশ্চিমের জানালাটা আমার অতীত, আমার নস্টালজিয়া। এই জানালা খুললেই আমি আমার দাদুকে দেখি–ওই দক্ষিণের ঘরের দাওয়ায় বসে তামাক টানতে-টানতে সুনীলকে বকছেন, বাবাকে দেখি–দুপুরে ছিপ ফেলে মাথায় গামছা দিয়ে পুকুরপাড়ে বসে আছেন, মাকে দেখি–স্নান সেরে ভেজা পায়ের ছাপ উঠোনে ফেলে ঘরে যাচ্ছেন, ঠোঁটে আদ্যার স্তব–ভেজা শাড়ি থেকে জলকণা ছড়িয়ে পড়ছে–কী ঠান্ডা গা ছিল মায়ের। পৃথিবীতে কত ছবি মুছে গেছে–সব ক্যামেরায় আসে না-কিছুতেই আসে না।

পশ্চিমের জানালার আলো মরে যায়। টিমটিমে টেমি জ্বলে ওঠে সূরযের খাটালে। তাতে মহানিমের ছায়ায় অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে জমে ওঠে। রাত্রির চোখ গড়িয়ে নামে। পুবের জানালায় তখন নিয়নের আলো দেখা যায়, জাতীয় সড়কের দোকানপাট ঝকমকিয়ে ওঠে, পেট্রোল–পাম্পের আলো জ্বলতে এবং নিভতে থাকে, আলো জ্বেলে দৌড়ে যায় লরি। পুবের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁতে ফিতে চেপে চুল বাঁধে মানু। দেখে দোকানপাট, প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রিক ট্রেন, লোকজন। তখন এক-এক সময়ে মানু মুখ ফিরিয়ে জিগ্যেস করে–আর, এ দিকটা দেখলে তোমার কিছু মনে হয় না?

পলাশ আধো-অন্ধকারে মুখ ফেরায়। তার মুখে স্টেশন আর জাতীয় সড়কের আলোর আভা এসে পড়ে, দ্রুত তার মুখে আবছা আলোর আভা ফেলে দৌড়ে যায় লরি, পলাশ মাথা নেড়ে বলে–হয়, মনে হয় আমি ওই জগতের কেউ না। আমি বাইরের লোক।

–কেন এরকম মনে হয়?

–কী জানি!

মানু হাসে-আমি জানি। যা নড়েচড়ে, যা জীবন্ত, তার কিছুই তোমার ভালো লাগে না। তুমি ছবির রাজ্যে বাস করতে-করতে এখন আর যার গতি আছে এমন কিছু পছন্দ করো না।

পলাশ হাসে, বলে–বাঃ মানু, তুমি কী সুন্দর সাজিয়ে বললে! বাঃ!

তারপর অন্ধকার ঘরে বসে পলাশ আবার পশ্চিমের জানালা দিয়ে বাইরে গাঢ় অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকে।

রাস্তা। একটা বাস স্টপ। খুব ভিড়। একটা ডবল–ডেকার থেমে আছে। তার পাদানিতে মানুষজনের প্রচণ্ড জড়াজড়ি। উদ্যত হাত-পা বাড়িয়ে বাস স্টপের মানুষেরা সেই ভিড় ভেদ করার চেষ্টা করছে। তাদের মুখে উগ্রতা; ব্যগ্র, নিষ্ঠুর চেষ্টায় তাদের সকলের মুখই প্রায়। একরকম দেখাচ্ছে। এই দৃশ্যটা পটভূমি। সামনে রাস্তার ধারে বসে আছে উনিশ–কুড়ি বছরের। একটা ময়লা কাগজ–কুড়নি ছেলে। জরাজীর্ণ তার চেহারা। ক্ষুধার্ত মুখ। পাশে বস্তাটা নামিয়ে রেখে সে বসে দেখছে রাস্তার পিচের ওপর কারা যেন এঁটো খাবার অজস্র ফেলে গেছে। লুচির টুকরো, মাংসের হাড়, ভাতের স্তূপ। ছেলেটা উবু হয়ে বসে তার ব্যগ্র একখানা হাত বাড়িয়েছে সেই রাস্তার ওপরকার খাবারের দিকে। ছবিটা এই।

ডার্করুমে টোকা দিয়ে চা দিতে ঢুকে মানু দেখল, টেবিল–ল্যাম্পের উজ্জ্বল আলো জ্বেলে পলাশ ছবিটা দেখছে। পলাশের ঘাড়ের ওপর দিয়ে মানুও দেখল। এরকম নগ্ন দৃশ্য মানু বাস্তবে কখনও দেখেনি। দেখতে-দেখতে তার বুক ব্যথিয়ে উঠল। চোখে জল এসে গেল।

সে প্রায় রুদ্ধগলায় বলল –ইস গো, কী অদ্ভুত ছবিটা!

পলাশ মুখ তুলল। তার মুখে স্পষ্ট হতাশা। হাত বাড়িয়ে চা নিল সে। দু-একটা চুমুক দিয়ে মাথা নাড়ল আপনমনে। বিড়বিড় করল। তারপর মানুর দিকে চেয়ে বলল –তবু এ ছবিতে সত্য দৃশ্যটা নেই।

–নেই কী গো! ছবিটা দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। কান্না আসে।

পলাশ অনেকক্ষণ চুপ করে চা খেয়ে গেল। তারপর আবার মাথা নেড়ে বলল –নেই। ছবিটায় কী যেন নেই।

–কী নেই?

পলাশ আবার চুপ করে থাকে। তারপর আস্তে-আস্তে বলে–যখন এই দৃশ্যটা আমি দেখেছিলাম তখন কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না এই দৃশ্যের মধ্যে কোন বিষয়টা সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট। ওই ব্যগ্র অফিস–যাত্রীরা, না ওই ছেলেটা, না কি ওই রাস্তার ওপরকার খাবারের স্থূপটা–কোনটাকে ছবির মাঝখানে রাখব, কোনটা হবে বিষয়, আর কোনটাই বা পটভূমি! সময় হাতে নেই, কারণ, দৃশ্যটা ক্ষণস্থায়ী, ফটোগ্রাফারের জন্য কেউ কোনও দৃশ্য ধরে রাখে না। বেশিক্ষণ। তাই আমি দৌড়ে চারপাশে ঘুরছিলাম, বারবার ক্যামেরা তুলে দেখছিলাম ভিউ ফাইন্ডারে কোনটাকে সমচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট দেখায়। সবচেয়ে যেটা ভালো মনে হয় সেটা তুলে নিলাম। তারপরই বাসটা ছেড়ে দিল, দৃশ্যটা ভেঙে গেল। ছবিটা উঠলও সুন্দর। তবু মানু, ছবিটাতে কী যেন নেই।

–কী সেটা? মানু ব্যগ্র প্রশ্ন করে।

পলাশ চুপ করে কপালে এসে পড়া চুলে ঘুরলি পাকায় আঙুল দিয়ে। অস্থির বোধ করে। তারপর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে আলো নিভিয়ে দেয়।

অন্ধকারে পলাশ হাত বাড়িয়ে মানুর হাত ধরে।

বলে–মানু চারিদিকে এই যে অন্ধকার, সেটা কেমন?

–ভীষণ।

–এই অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। অথচ আমরা টের পাচ্ছি যে আমি আছি তুমিও আছ।?

–আছি তো।

–এই অন্ধকারের কি ছবি হয়? সেই ছবিতে কি বোঝানো যায় যে, তার ভিতরে আমি এবং তুমি দুজনেই আছি?

মানু চুপ করে থাকে।

পলাশ আবার আলোটা জ্বেলে হতাশার হাসি হাসে হয় না। মানু, ওরকম ছবি হয় না। ছবিটার ওপর আলোটা নামিয়ে আনে পলাশ। বলে–এই ছবিতে একটা অন্ধকার রয়েছে। তার। মধ্যে আছে আরও কিছু। কিন্তু তা ছবিতে ধরা পড়েনি।

হাতের কাছেই পড়ে আছে একটা জাইস–ইকন। সেটা তুলে নিয়ে ঝাঁকায় পলাশ। তারপর সেটা অবহেলায় ফেলে দিয়ে বলে ক্যামেরার সাধ্য বড় কম। কেন কম মানু?

মানু চুপ করে থাকে।

পলাশ ধীরে-ধীরে অন্যমনস্ক হয়ে যায় আবার। আপনমনে বে–খেয়ালে বলে–আমার বুকে কত ছবি জমে আছে।

মাঝে-মাঝে হাওয়া দিলে দেওয়ালে গোলকিপারের ছবিটা দোল খায়। দুপুরের আধো ঘুমঘোরে মানু চেয়ে দেখে। বয়স্ক মানুষটা সাদা বলের দিকে হাত বাড়িয়ে ঝুঁকে আছে। মাঝখানে অনন্ত দূরত্ব। অবিরল বৃষ্টি ধারায় ভিজে যাচ্ছে সে, মুখে অফুরান হতাশা। ছবিতে ওই বৃষ্টি থেমে কোনদিন রোদ উঠবে না। অনন্ত দূরত্ব থেকে যাবে বলটির সঙ্গে বয়স্ক মানুষটার। ছবিটা দোল খায়। একটা গল্প বলতে থাকে।

সেখান থেকে ঝুপ করে মানুর চোখ নেমে আসে। পশ্চিমের খোলা জানালায় পা তুলে নিঃঝুম বসে আছে পলাশ। মহানিমের নিবিড় ছায়া তাকে ঘিরে আছে। পলাশের রুক্ষ মুখের রেখাগুলি মিলিয়ে গেছে। তার ঘুমহীন চোখে স্বপ্নের ভিড়।

মানু টের পায়, পলাশের শরীরের ভিতরকার অন্ধকারে অজস্র ছবির জন্ম হচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে আবার। তাই মহানিমের ছায়া কোলে করে ও বসে আছে অমন। কারণ, ও জানে, সব ছবিই পৃথিবীর আলোতে আসে না। পুবের জানলা দিয়ে দেখা যায় অগ্রসরমান পৃথিবীর ছবি, জাতীয় সড়ক, দোকানপাট, দৌড়ে যাওয়া লরি। পশ্চিমের জানালায় মহানিমের ছায়া। দেওয়ালে বয়স্ক গোলকিপারের ছবি। তার নীচেই পলাশ।

চেয়ে থাকতে–থাকতে কখনও-কখনও মানুর চোখে জল চলে আসে। সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। জোর করে মনে করার চেষ্টা করে তার সেই ভেনাসের সুন্দর বিভঙ্গ। আধ–ঘুমে সে মুখ টিপে হাসে।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot dana
  • hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • slot gacor
  • desa bet
  • desabet
  • Kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor