Thursday, April 18, 2024
Homeকিশোর গল্পছেলেটা - হুমায়ূন আহমেদ

ছেলেটা – হুমায়ূন আহমেদ

ছেলেটা - হুমায়ূন আহমেদ

০১. রনির জন্য আরো একজন নতুন মাস্টার

রনির জন্য আরো একজন নতুন মাস্টার ঠিক করা হয়েছে। এই মাস্টার সাহেব প্রতি শুক্রবার আসবেন। সময় এখনো ঠিক করা হয় নি। সকালে আসতে পারেন। বিকেলেও আসতে পারেন।

রনি লক্ষ করেছে বড় বড় দুঃসংবাদগুলি সে পায় নাস্তার টেবিলে। যেবার তাদের নেপালে বেড়াতে যাওয়া ঠিক হলো, রনি ব্যাগ গুছিয়ে পুরোপুরি তৈরি। স্কুলের বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। তাদের বাসার ঠিকানা নিয়েছে, নেপাল থেকে ভিউকার্ড পাঠাবে। তার ক্যামেরার জন্যে দুটা ফিল্ম কিনেছে। সেবারও নাশতার টেবিলে মা বললেন, নেপাল যাওয়া হচ্ছে না। এবারের শীত খুব বেশি পড়েছে। রনি তখন মাত্র পাউরুটি মুখে দিয়েছে। তার এতই মন খারাপ হলো যে, পাউরুটি গলায় আটকে খকখক করে কাশতে শুরু করল। মা রনির দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললেন, ঠিক মতো খাও রনি। একটি আস্ত পাউরুটি মুখে দিয়ে ফেললে তো গলায় বাঁধবেই। বাবাও মুখের ওপর থেকে পত্রিকা নামিয়ে সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন। যেন পাউরুটি গলায় বিঁধে যাওয়া বিরাট অপরাধ। অথচ অপরাধ তাঁরাই করেছেন। বেড়াতে যাওয়া ঠিকঠাক করে হঠাৎ বাতিল করে দিয়েছেন।

রনির ইচ্ছা করছে বাবা-মা দুজনের ওপরই রাগ করতে। রাগ করতে পারছে না, কারণ এই দুজনের কেউ তার বাবা-মা না। দুজনই নকল বাবামা। রনির ক্লাসের একটি মেয়ের সম্মা আছে (নাম মিঠু, অতিরিক্ত মোটা বলে তাকে ডাকা হয় মোটা-মিঠু, সংক্ষেপে মো মি)। দুজন ছেলের আছে সৎবাবা। আর রনির আছে একজন সৎবাবা, একজন সম্মা। ব্যাপারটা অন্যদের কাছে খুব অদ্ভুত লাগলেও রনির কাছে লাগে না। তার কাছে বরং ব্যাপারটা স্বাভাবিকই মনে হয়। রনির জন্মের সময়ই তার মা মারা গেলেন। বাচ্চা একটা শিশুকে বড় করতে হবে, রনির বাবা বিয়ে করলেন। কাজেই রনির মা হয়ে গেল সম্মা।

রনি যখন ক্লাস টু-তে উঠল তখন তার বাবা জাহাজড়ুবি হয়ে মারা গেলেন পর্তুগালের কাছে এক সমুদ্রে। সমুদ্রটার নাম ব্লু ক্যানেল। ক্যানেল মানে খাল। একটা সমুদ্রের নাম নীল খাল কী করে হয় রনি জানে না। হয়তো তারা কোনো ভুল করেছে। করুক ভুল। মূল ঘটনা হলো রনির বাবা মারা যাবার পর রনির সত্য বিয়ে করলেন। কাজেই রনির বাবা হয়ে গেল সত্বাবা।

এইসব নিয়ে রনির দুঃখ নেই। শুধু কেউ যখন তার দিকে তাকিয়ে বলে–আহারে, আসল বাবা-মা কেউ নেই। দুজনই নকল। কী কষ্ট! কী কষ্ট! তখন একটু রাগ রাগ লাগে।

কষ্ট কোথায়? কোনো কষ্ট নেই। স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে যখন থাকে, তখন কত ভালো লাগে। স্কুল লাইব্রেরি থেকে যখন বই নিতে যায়, তখন ভালো লাগে। বাসায় ফিরে যখন টিভি দেখে, তখন ভালো লাগে। পড়া শেষ করে কম্পিউটার গেমস খেলে, তখন ভালো লাগে।

খারাপ লাগে কখন?

সকালে নাশতা খাবার সময় খারাপ লাগে। (কারণ তখন বাবা-মার কঠিন কথা শুনতে হয়।)

টিচাররা যখন তাকে পড়াতে আসেন তখন খারাপ লাগে। (রনির তিনজন টিচার–ইংরেজি, ম্যাথ, সায়েন্স। এখন আবার একজন বাড়ল, আর্ট টিচার।)

সে যখন রাতে ঘুমুতে যায়, তখন খারাপ লাগে। কারণ একা ঘুমুতে তার খুবই ভয় লাগে। টিভিতে দেখা ভূতের ছবিগুলির কথা মনে হতে থাকে। টিভিতে দেখার সময় তত ভয়ঙ্কর লাগে না। একা ঘুমুতে যাবার সময় ভয়ঙ্কর লাগে। কফিনের ডালা আপনা-আপনি খুলে যাচ্ছে। একটা হাত বের হয়ে আসছে সেই হাতে লম্বা লম্বা নখ। নখের গায়ে রক্ত লেগে আছে।

বেশি ভয় লাগলে রনি চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। তখন মনে হয়, এই বুঝি কেউ এসে চাদর সরিয়ে রনির দিকে তাকিয়ে নাকি গলায় বলবেতুই কেঁ? বলেই কাতুকুতু দেয়া শুরু করবে। মেয়ে-ভূতরা বাচ্চাদের কাতুকুতু দিতে খুব পছন্দ করে।

রাতে ঘুমুতে যাবার সময় রনির মনে হয়, আসল বাবা-মা থাকলে কী করতেন? তারা নিশ্চয় রনিকে আলাদা ঘরে রাখতেন না। আর রাখলে খুব বেশি ভয় পেলে কেউ-না কেউ তার সঙ্গে ঘুমুতে আসতেন। হয় মা আসতেন, কিংবা বাবা আসতেন। আসল বাবা-মা দুজনের ছবিই রনির স্ক্রাপ-বুকে আছে। রনি ছবির দিকে তাকিয়ে চিন্তা করে দুজনের কে তার সঙ্গে ঘুমুতে আসতেন।

মার ছবিটা খুবই হাসিখুশি। হাসির মধ্যেই দুষ্টু দুষ্টু ভাব। হ্যাঁ, মা তো আসতই। তবে মা তার সঙ্গে থাকতে এলে সমস্যাও হতো। যে-রকম দুষ্ট দুষ্ট চেহারা, নিশ্চয়ই খুবই দুষ্টামি করত। তাকে ঘুমুতে দিত না। কাতুকুতু দিত। চুল টানত। ঘুমে যখন তার চোখ জড়িয়ে আসত, তখনো গল্প করত।

মার ছবি দেখেই মনে হয়, এই মহিলা গল্প করায় ওস্তাদ।

বাবার চেহারাটা আবার গম্ভীর ধরনের। চোখে চশমা। ভুরু সামান্য কুঁচকানো। গম্ভীর ধরনের মানুষ আবার ভেতরে ভেতরে হাসিখুশি হয়। হাসিখুশি ভাবটা তারা প্রকাশ করে না। বাবা নিশ্চয়ই তার সঙ্গে ঘুমুতো। তবে ঘুমুবার আগে নানান উপদেশ দিত–পৃথিবীতে ভূত বলে কিছু নেই। কাজেই ভূতের ভয়ে অস্থিত হওয়া কোনো কাজের কথা না। তাদের ছেলেমেয়েদের আদর আদর গলায় উপদেশ দিতে পছন্দ করে। স্কুলে সে দেখেছে মোটা-মিঠুর বাবা মেয়েকে স্কুল থেকে নিতে এসেই উপদেশ শুরু করেন। আদর আদর গলায় উপদেশ।

রনি যে এখন একেবারে একা ঘুমায় তা-না। ইদরিস মিয়া রনির ঘরের বাইরে বিছানা পেতে ঘুমায়। তার মাথার কাছে থাকে একটা মশার কয়েল, পায়ের কাছে থাকে আরেকটা কয়েল। ইদরিস মিয়া সারাক্ষণ কথা বলে। দিনের বেলা তো কথা বলেই, রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও কথা বলে।

ইদরিস মিয়া হলো রনির পাহারাদার। সে এ বাড়িতে রনি ঠিকমতো আছে কি-না, তার যত্ন ঠিক হচ্ছে কি-না, রনির নকল বাবা-মা তাকে অনাদর করছে কি-না সে এইসব লক্ষ করে এবং রনির দাদার কাছে রিপোর্ট করে তাকে রাখাই হয়েছে এই কাজে। ইদরিস মিয়ার ভাবভঙ্গি স্পাইদের মতো। রনির সঙ্গে কথা বলার সময় গলা নিচু করে কথা বলে, যেন ষড়যন্ত্র করছে। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে এদিক-ওদিক তাকায়। এই সময় ইদরিসকে ইঁদুরের মতো দেখায়। টম এন্ড জেরির ইঁদুর। জেরি। রনির খুব হাসি পায়। সে অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখে।

ইদরিস তখন কথাও বলে ইঁদুরের মতো কিচকিচ করে নিচ্চিন্ত থাকেন ভাইজান, সব হিসাবের মধ্যে আছে। আপনার ওপর নজর খালি আমি একলা রাখতেছি না। আরো লোকজন রাখতেছে। অনেকের নজর আছে।

আমার ওপর এত নজর রাখার দরকার কী?

আছে, দরকার আছে। বিষয়সম্পত্তি, টাকাপয়সা সবই তো আপনের। আপনের পিতা লিখিতভাবে দিয়ে গেছেন। সেই সম্পত্তিও পাঁচ-দশ টাকার সম্পত্তি না। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। গুলশানে যে সাততলা দোকানতার ভাড়াই মাসে ত্রিশ লাখ। বিবেচনা করেন অবস্থা।

ত্রিশ লাখ মানে কত মিলিয়ন?

মিলিয়ন ফিলিয়ন জানি না ভাইজান, এইটা জানি বেশুমার টাকা। বেশুমার। বেশুমার।

বেশুমার টাকা মানে কী?

অত কিছু জানি না ভাইজান। একটা জিনিস জানি আমার কাজ আপনেরে চউক্ষে চউক্ষে রাখা। রাইতে যে আপনের ঘরের সামনে শুইয়া থাকি–আপনে কি ভাবেন ঘুমাই? ঘুমাই না, জাগনা থাকি। দুই চউক্ষের পাতা ফেলি না।

কিন্তু আমি যে নাক ডাকার শব্দ পাই?

এইটা কল্পনা। শিশু-মনের কল্পনা। তয় আমার একটা বিষয় আছে। জাগনা অবস্থায়ও আমার নাক ডাকে। বড়ই আজিব।

মাঝে মাঝে রনির দাদা, আসগর আলি, রনিকে দেখতে আসেন। এমন রাগী বুড়ো মানুষ রনি তার জীবনে দেখে নি। ধমক না দিয়ে সহজভাবে এই বুড়ো কোনো কথা বলতে পারে না। তার গা দিয়ে সিগারেটের কড়া গন্ধ আসে। এত কড়া গন্ধ যে রনির বমি আসার মতো হয়। তিনি রনির সঙ্গে তুই তুই করে কথা বলেন, এটাও রনির পছন্দ না। কথা বলার সময় খামচি দেয়ার মতো রনির কাঁধ ধরে রাখেন। রনির ব্যথা লাগে, তারপরও সে কিছু বলে না।

তুই কেমন আছিস?

ভালো।

এরা তোকে মারধর করে?

কারা মারবে?

আবার কারা? যাদের সঙ্গে আছিস তারা?

না তো। ঠিক করে বল। চড় থাপ্পড়, ধাক্কা?

না।

মারধোর করলে বা বকা দিলে, কোনোরকম অবহেলা করলে আমাকে বলবি। কোর্টে পিটিশন করে তোর কাস্টডি নিয়ে নেব। বুঝতে পারছিস?

পারছি।

আমার তো ধারণা তোকে মারে। তুই ভয়ে বলছিস না। ভয়ের কিছু নাই। খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো দিচ্ছে?

হুঁ।

খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারেও সাবধান। যদি দেখিস তোকে তারা গোপনে কোনো শরবত খেতে দিচ্ছে, তাহলে খাবি না। নিতান্তই যদি খেতে ইচ্ছা হয় আগে ইদরিসকে এক চামুক খাওয়াবি।

কেন?

আরে এই গাধাকে নিয়ে দেখি যন্ত্রণায় পড়লাম। বিষ-টিষ খাইয়ে মেরে ফেলবে, এইজন্যে।

মেরে ফেলবে কেন?

মেরে ফেলবে না তো কী করবে? কোলে বসিয়ে চুমু খাবে? তুই দেখি তোর বাবার মতোই বেকুব হয়েছিস। তোর বাবা ছিল বেকুব নাম্বার ওয়ান, আর তুই হলি বেকুব নাম্বার টু।

বাবাকে বেকুব বলবেন না দাদাজান।

বেকুবকে বেকুব বলব না?

না।

এইটুকু বাচ্চা কেমন ধমক দিয়ে কথা বলে! আছাড় দিয়ে ভুঁড়ি গালায়ে দেব। তোর বাবা যখন তোর মতো ছিল, সেও চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলত। একদিন শূন্যে তুলে দিলাম আছাড়। মট করে পাটকাঠি ভাঙার মতো একটা শব্দ হয়েছে। তারপর দেখি কজির নিচে হাড় ভেঙে হাত ঝুলছে।

দাদাজান, তুমি দুষ্টলোক।

অবশ্যই দুষ্টলোক। এই দুনিয়ায় কোনো ভালো লোক নাই। যা আছে। সবই দুষ্ট।

রনি জানে তাকে নিয়ে নানান সমস্যা আছে। কয়েকবারই তাকে কোর্টে যেতে হয়েছে। সে কার সঙ্গে থাকবে এই নিয়ে মামলা। জজ সাহেবরা এইসময় তাকে জিজ্ঞেস করেন, খোকা তুমি কোথায় থাকতে চাও?

রনি সবসময় বলেছে, আমি যেখানে আছি সেখানে থাকতে চাই।

কেন?

ঐখানে আমার কম্পিউটার আছে, সে জন্যে।

তুমি তোমার দাদাজানের সঙ্গে থাকতে চাও?

না।

না কেন?

উনি খুবই রাগী। আমাকে একবার ফাজিল বলেছিলেন।

তোমার যে ছোটচাচা আছেন, উনার সঙ্গে থাকতে চাও না?

না।

উনিও কি রাগী? জানি না।

তোমার এক ফুপু আছেন–মেহরিনা খানম। মগবাজারে থাকেন। তাঁর সঙ্গে থাকবে?

না।

থাকবে না কেন?

উনি যখন কথা বলেন, তখন মুখ দিয়ে থুথু বের হয়। আমার গা ভিজে যায়। খুবই ঘেন্না লাগে।

জজ সাহেব দুজনের একজন হেসে ফেলতে গিয়েও ফেললেন না। গম্ভীর হয়ে বললেন, What a pity! A very unfortunate boy.

বড়রা এই ভুলটা সবসময় করে। তারা ভাবে ইংরেজিতে কথা বললে ছোটরা বুঝবে না। এই জজ সাহেব জানেন না, যে ইংরেজি রনি খুব ভালো জানে। গত পরীক্ষায় ইংরেজিতে সে A ডাবল প্লাস পেয়েছে। সে ইংরেজিতে একটা রচনা লিখেছিল। রচনার নাম My Last Vaccation. সে লিখেছিল নেপাল ভ্রমণ নিয়ে। (বানিয়ে লেখা। সে তো নেপাল যায় নি।) রচনাটায় একটাও বানান ভুল ছিল না।

জজ সাহেব বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যেখানে থাকতে চাও থাকো। শুধু একটা ব্যাপার খেয়াল রাখবে। তুমি যেখানেই থাকো সাবধানে থাকবে।

কেন?

জজ সাহেবরা এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলেছেন।

রনি সাবধানেই থাকে। তার স্কুলব্যাগে একটা ম্যাগগাইভারের ছুরি আছে। টর্চলাইট আছে। মোমবাতি আছে, নাইলনের দড়ি আছে। সাবধানী মানুষের জন্যে এইসব দরকার আছে। কেউ যদি তাকে কোনো একটা অন্ধকার ঘরে আটকে রাখে, সে সেখান থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসতে পারবে।

টুন টিন, টুন টিন করে কলিং বেল বাজছে। রনি ড্রয়িংরুমে বসে ছিল। কলিং বেলের শব্দ শুনে অবাক হলো। যেই আসুক দারোয়ান গেট থেকে ইন্টারকম করে আগে জানাবে কে এসেছে। শুধু তিনজনের বেলায় এই নিয়ম খাটে না। সেই তিনজন হলো রনি আর তার বাবা, মা। তিনজনের মধ্যে দুজন সে এবং মা বাড়িতেই আছে।

তাহলে কে এসেছে? বাবা? তিনি তো চিটাগাং। সোমবার আসবেন।

আজ মাত্র শুক্রবার। রনি দরজা খুলল। অপরিচিত এক লোক দাঁড়িয়ে GI

লোকটা তার দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন আছ রনি?

রনি বলল, ভালো। অপরিচিত লোক তার নাম জানে এতে সে বিস্মিত হলো না। রনি দেখেছে অনেক অপরিচিত লোকই তার নাম জানে।

যাও খোকা তোমার মা-কে খবর দাও। আমি তোমার নতুন আর্ট টিচার। ইন্টারভু দিতে এসেছি। শুনেছি তিনি ইন্টার ছাড়া কাউকে রাখেন না।

ঠিকই শুনেছেন। আসুন, ভেতরে এসে বসুন।

এটা তোমাদের ড্রয়িংরুম?

জি।

যে রুমে ড্রয়িং করা হয় না তার নাম ড্রয়িংরুম কেন বলো তো?

জানি না কেন।

ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে সোফায় আরাম করে বসলেন। রনি তার মা-কে খবর দিতে গেল। রনির মা সালমা বানু টিচারের ইন্টার নিচ্ছেন। সব টিচারকেই এই ইন্টারভু দিতে হয়। যারা ইন্টারভ্যুতে পাস করে তারাই শুধু পড়াতে পারে। নতুন এই আর্ট টিচারকে দেখেই রনির মনে হচ্ছে ইনি পাস করতে পারবেন না। কেমন আউলা ঝাউলা গরিব চেহারা। গাল ভাঙা। ভদ্রলোক এ বাড়িতে আসার আগে নিশ্চয়ই শেভ করেছেন। শেভ ভালো হয়নি। গালের বেশ কয়েকটা জায়গায় খাবলা খাবলা কাঁচাপাকা দাড়ি বের হয়ে আছে। হাতের নখ লম্বা। রনি নখ দেখেই বলে দিতে পারছে দুসপ্তাহ কাটা হয়নি। এই গরমেও গায়ে চাদর। চাদরটা এমনভাবে জড়ানো যে দেখে মনে হয় তার জ্বর এসেছে।

ভদ্রলোক কথা বলা শুরু করার আগেই চাদরের ভেতর থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সালমা বানু বললেন, এ বাড়িতে সিগারেট খেতে পারবেন না।

ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে সিগারেটের প্যাকেট চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেলে বোকার মতো দাঁত বের করে হাসতে লাগলেন। রনি তখনি বুঝে গেল, এই লোকের চাকরি হবে না। তার একটু খারাপ লাগল। কোনো কারণ ছাড়াই লোকটাকে তার পছন্দ হয়েছে।

সালমা বানু বললেন, আপনার নাম কী?

আমার নাম মুহাব্বত আলি।

এটা আবার কেমন নাম?

বাবা শখ করে রেখেছে। আপনার যদি এই নামে ডাকতে অসুবিধা হয়, তাহলে মু-টা বাদ দিয়ে হাব্বত আলী ডাকতে পারেন। হাব্বত আলি নামটা খারাপ না।

সালমা বানু বললেন, মুহাব্বত আলি নামে তো কারোর আসার কথা না। আমাকে বলা হয়েছিল আর্ট টিচারের নাম–সেরাজুল সালেহিন।

উনি আসতে পারবেন না। এই একমাস উনি খুবই ব্যস্ত। আমাকে বলেছেন একমাস প্রক্সি দিতে। একমাস পর থেকে উনি নিয়মিত আসবেন।

সরি, কিছু মনে করবেন না। আপনাকে আমার পছন্দ হচ্ছে না। একমাস আর্ট টিচার না থাকলেও আমাদের অসুবিধা হবে না। সেরাজুল সালেহিন সাহেবের কাছে রনি ছবি আঁকা শিখবে।

আমি কিন্তু ছবি খুব ভালো আঁকি। আমার নামটা হয়তো আপনার কাছে খারাপ লাগছে। ছবি খারাপ না।

আপনি যদি মদিলিয়ানির মতো ছবিও আঁকেন, তাহলেও আমি আপনাকে রাখব না।

তাহলে আর কী করা! একটা চাকরির খুবই প্রয়োজন ছিল। আপনি যখন মদিলিয়ানির মতো আর্টিস্টকেও রাখবেন না–তখন আমি মুহাব্বত আলি কোন ছার!

মদিলিয়ানি কে জানেন?

জানি। উনার ভালো নাম আমেদো মদিলিয়ানি। ইতালির চিত্রশিল্পী এবং ভাস্কর। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বেশ কয়েকটি ছবিই তার আঁকা। আঠার শ চুরাশি সনে তার জন্ম। মারা যান প্যারিসে উনিশ শ বিশ সনে।

ঠিক আছে আপনি যেতে পারেন।

এক কাপ কফি খেয়ে যাই। শুধু মুখে চলে গেলে পরে আপনার নিজেরই খারাপ লাগবে। কফি খেতে খেতে আমি চট করে আপনার একটা স্কেচ করে ফেলি। স্কেচটা যদি আপনার পছন্দ হয়, আপনি আমার কাছ থেকে কিনে নিতে পারেন। আমি খুবই খারাপ অবস্থায় আছি। একশ টাকা পেলেও আমার লাভ।

স্কেচ করতে হবে না। আমি আপনাকে একশ টাকা দিচ্ছি। কফি খাওয়ানো সম্ভব না। কাজের লোকজন ব্যস্ত।

আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারি। তাদের ব্যস্ততা কমুক। আসলে আমার তেমন কাজকর্ম নেই। আমার জন্যে এখানে বসে থাকা যা, রাস্তায় হাঁটাহাঁটিও তা। বরং এসি ঘরে বসে থাকাটা ভালো।

লোকটার কথাবার্তায় রনি খুব মজা পাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না মা শেষপর্যন্ত লোকটাকে কফি খাওয়াবে কি-না। মনে হচ্ছে খাওয়াবে না। রনি যেমন লোকটার কথাবার্তায় মজা পাচ্ছে, মা পাচ্ছে না। মা খুবই বিরক্ত হচ্ছে।

আপা, আমি কি বসব কফির জন্যে?

সালমা বানু উঠে দাঁড়ালেন। আর্ট টিচার ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে খুবই আগ্রহের সঙ্গে বলল–চিনি বেশি দিতে বলবেন। আমি তিন-চার চামচ চিনি খাই। এরচে বেশি হলেও আমার অসুবিধা হয় না। ডায়াবেটিস যখন হবে তখন হবে। এখন থেকে চিনি খাওয়া ছাড়ার কোনো মানে হয় না।

সালমা বানু জবাব না দিয়েই ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। লোকটা রনির দিকে তাকিয়ে বলল, এই ফাঁকে তোমার মার একটা ছবি এঁকে ফেলা যাক, কী বলো? ভদ্রমহিলা তো আমার ওপর খুবই রেগে আছেন, ছবি দেখে যদি রাগটা কমে।

রনি বলল, আপনার জন্যে পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে আসব?

লোকটা বলল, কিছু আনতে হবে না। আমার চাদরের নিচে সবকিছু থাকে। বলেই সে প্রথমে একটা পেন্সিল বের করল। তারপরই বের করল কাগজ।

কাগজ কুঁচকে ভাঁজ হয়ে আছে। দুই হাত দিয়ে ঘষে ভাজ ঠিক করল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে রইল। তারপর অতি দ্রুত ছবি এঁকে ফেলে রনির দিকে কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বলল–দেখ তো খোকা, কেমন হয়েছে?

রনির মন বলছিল লোকটা খুব ভালো ছবি আঁকে। দেখা গেল আসলেই সুন্দর ছবি। রাগী মুখে রনির মা বসে আছেন।

রনি বলল, ছবিটা খুব সুন্দর।

তোমার কি মনে হয় এই ছবি দেখে আমাকে চাকরি দেবে?

না।

আমারো মনে হয় না। আমার চেহারা তোমার মার পছন্দ হয়নি। মেয়েরা চেহারার ওপর খুব গুরুত্ব দেয়। শেভ করে ভালো কাপড়-চোপড় পরে আসা দরকার ছিল। নামটাও সমস্যা করেছে। মুহাব্বত আলি পছন্দ করার মতো নাম না। যাই হোক, কফি খেয়ে বিদায় নিই। তোমার নাম কী?

আপনি তো আমার নাম জানেন। যখন দরজা খুললাম তখন বললেন, কেমন আছ রনি।

রনি নাম জানি। এর মধ্যে নাম বদলে গেল কি-না সেইজন্যে জিজ্ঞেস করা। দেখ না আমার নাম ছিল মুহাব্বত আলি, তিন মিনিটের মধ্যে হয়ে গেল হাব্বত আলি।

রনি হেসে ফেলল এবং বুঝতে পারল এই আর্ট টিচারকে তার খুবই পছন্দ হয়েছে।

তোমার বুদ্ধি কেমন? ধাঁধা জিজ্ঞেস করলে পার? মাঝে মাঝে পারি।

যে-সব ধাঁধা পার তার দুই একটা বলো তো। তাহলে বুঝব কোন ধরনের ধাঁধা পার।

কোন মাছি উড়ে না–ঘামাছি। কোন স্টেশনে গাড়ি থামে না–রেডিও স্টেশন। এইসব।

এইসব সহজ ধাঁধা। কঠিন একটা জিজ্ঞেস করি। বলো দেখি—

কহেন কবি কালিদাস শৈশবের কথা।

নয় লক্ষ তেঁতুলগাছে কয় লক্ষ পাতা।

পারব না!

আমিও পারি না। নয় লক্ষ তেঁতুলগাছে কয় লক্ষ পাতা–কীভাবে বলব? একটা তেঁতুলগাছে কয়টা পাতা থাকে গুণে অবশ্যি দেখা যেতে পারে। সময়সাধ্য ব্যাপার।

রহিমা বুয়া কফির কাপ নিয়ে ঢুকল। সঙ্গে পিরিচের উপর দুটা বিসকিট। রনি দেখল লোকটা খুব আগ্রহ করে বিসকিট দুটা খেল। কিছু বিসকিটের গুঁড়া পিরিচে পড়ে ছিল। আঙুল দিয়ে জড়ো করে সেগুলিও মুখে দিল। কফির কাপে চুমুক দিয়ে আরামের শব্দ করল। তার মুখভর্তি হাসি। রহিমা বুয়া বলল, কফি খাইয়া আম্মা আফনেরে চইল্যা যাইতে বলছে।

আচ্ছা চলে যাব। আপনি এই ছবিটা ম্যাডামকে দেবেন?

রহিমা বুয়া ছবি হাতে নিয়ে রনির দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইজান, আপনেরে চইল্যা আসতে বলছে।

রনির ইচ্ছা করছে লোকটার সঙ্গে গল্প করতে। সব মানুষের সঙ্গে গল্প করতে তার ভালো লাগে না। এই মানুষটার সঙ্গে গল্প করতে ভালো লাগবে তা বোঝাই যাচ্ছে।

মুহাব্বত আলি কফির কাপে শব্দ করে চুমুক দিল। মা থাকলে ভুরু কুঁচকে তাকাতেন। শব্দ করে যে-কোনো জিনিস খাওয়াই অভদ্রতা।

রনি মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে। মুহাব্বত আলি এবার তাকালেন রহিমার মার দিকে। গম্ভীর গলায় বললেন, রহিমার মা শোনো। তোমার ম্যাডাম বলেছিল একশ টাকা দেবেন। দোতলায় উঠে মনে হয় ভুলে গেছেন। দোতলার মানুষ একতলার মানুষকে সহজে ভুলে যায়। তুমি উনার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে এসো। আমি চলে যাব।

রহিমা বুয়া বিরক্ত মুখে চলে যাচ্ছে। বিড়বিড় করে আবার কী যেন বলল। রনি বুঝতে পারছে না রহিমা বুয়া এত বিরক্ত হচ্ছে কেন? এত বিরক্ত হবার মতো কিছু তো এই মানুষটা বলে নি।

রনির মনে ছোট্ট একটা খটকাও লাগছে–মানুষটা রহিমা বুয়ার নাম জানল কীভাবে? এত সহজভাবে বলেছে যেন রহিমা বুয়াকে সে অনেকদিন থেকে চেনে।

রনি মুহাব্বত আলির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে আমি কী ডাকব? কিছু ডাকতে হবে না। আমি যদি তোমার আর্ট টিচার হতাম, তাহলে স্যার ডাকতে বলতাম।

রনি বলল, আপনি রহিমা বুয়ার নাম জানলেন কীভাবে?

মুহাব্বত আলি হেসে ফেলে বললেন, তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ আমার সুপারম্যানদের মতো ক্ষমতা-টমতা আছে। এসবের কোনো কারবারই আমার নেই। আমি তোমাদের গেটের দারোয়ানের কাছে সবার নাম জেনে নিয়েছি।

কেন?

বলা তো যায় না কখন কোন কাজে লাগে। কাজে তো লাগল। রহিমা বুয়াকে ডাকতে পারলাম। ভালো কথা, তোমার মা টাকা পাঠাতে দেরি করছে কেন? দেবে না নাকি?

একবার যখন বলেছে তখন দেবে।

তাহলে অপেক্ষা করি, কী বলো?

অপেক্ষা করুন।

টিভিটা ছাড়া তো, বসে বসে টিভি দেখি।

এখন টিভি ছাড়লে মা রাগ করবে।

রাগ করলে থাক।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, রহিমা বুয়া টাকা নিয়ে দোতলা থেকে নামল। মুহাব্বত আলি টাকাটা ব্যাগে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। রনির দিকে তাকিয়ে বললেন, আসি?

রনির খুব ইচ্ছা করছে বলে, আবার আসবেন। শেষ পর্যন্ত বলল না। মানুষটাকে আবার দেখলে মা অবশ্যই রাগ করবেন। মা রাগ করলে বাবা রাগ করবেন। সে কাউকেই রাগাতে চায় না।

০২. রনির স্কুল দুপুর দুইটায় ছুটি হয়

রনির স্কুল দুপুর দুইটায় ছুটি হয়। আজ ছুটি হয়ে গেল এগারোটায়। স্কুলের একজন টিচার মিস নাজমা মারা গেছেন, এইজন্যেই ছুটি। মিস নাজমা রনিদের জিওগ্রাফি ম্যাডাম ছিলেন। ক্লাসে সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকতেন। ছাত্রদের কেউ কোনো শব্দ করলেই ভুরু কুঁচকে বলতেন, Thear some noise. এতেই সবাই চুপ। মিস নাজমা কাউকে কোনো বকা দিতেন না, কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতেন না, তারপরেও সবাই তার ভয়ে অস্থির হয়ে থাকত। ক্লাসের কারো সঙ্গে যখন কথা বলতেন, তখন গম্ভীর গলায় একটা মজা করতেন। নামের সঙ্গে মিল দিয়ে চার-পাঁচটা শব্দ বলতেন। যেমন রনিকে বলতেন

রনি

কনি

মনি

লানি

আবার পুতুলকে বলতেন—

পুতুল

তুতুল

লুতুল

তুতুল

লতুল

রনি একবার সাহস করে নাজমা ম্যাডামকে বলেছিল, মিস আপনি আমাদের এইভাবে ডাকেন কেন?

নাজমা ম্যাডাম বললেন, এইভাবে ডাকার পেছনে আমার সুন্দর একটা কারণ আছে। যেদিন তোমরা এই ক্লাস থেকে পাশ করে ওপরের ক্লাসে যাবে সেদিন কারণটা বলব। তোমাদের মজা লাগবে।

কারণটা না জানিয়ে ম্যাডাম মারা গেলেন। কোনোদিনই আর কারণটা জানা যাবে না।

রনিদের ক্লাস টিচার (মিস দিলশাদ) করুণ করুণ মুখ করে বললেন, তোমরা ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকো। হৈচৈ করবে না। প্লে গ্রাউন্ডেও যেতে পার তবে খেলাধুলা করবে না। তোমাদের একজন টিচার মারা গেছেন, এইসময় কি আনন্দ করা উচিত? তোমাদের সবার বাড়িতে ফোন করা হবে, যাতে তোমাদের গার্জিয়ানরা এসে তোমাদের নিয়ে যায়। ঠিক আছে লিটিল এনজেলস? মিস দিলশাদ সবার সঙ্গে খুব মিষ্টি করে কথা বলেন। তিনি সবার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তবু কেউ তাকে পছন্দ করে না।

রনিদের ক্লাসের একটি মেয়ে (লুতপা, খুব ভালো ম্যাথ জানে। ম্যাথে সে সবসময় একশতে একশ পায়। তাকে সবাই ডাকে লুতপাইন। আইনস্টাইনের নামের সঙ্গে মিল করে লুতপাইন)। লুতপাইন বলল, নাজমা ম্যাডাম কীভাবে মারা গেছেন?

দিলশাদ মিস বললেন, কীভাবে মারা গেছেন সেটা বড়দের ব্যাপার। তোমরা ছোটরা এইসব নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাবে না। ঠিক আছে মেয়ে?

লুতপাইন বলল, আমার জানতে ইচ্ছা করছে।

লিটল এনজেল, একবার তো বলেছি কিছু ব্যাপার বড়রা জানবে। কিছু জানবে ছোটরা। এই নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন না।

নাজমা ম্যাডাম কীভাবে মারা গেছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা সবাই জেনে গেল। স্কুলের দারোয়ান-আয়া সবাই বলাবলি করছে। উনি মারা গেছেন রোড এক্সিডেন্টে। রিকশা করে যাচ্ছিলেন, পেছন থেকে একটা প্রাইভেট গাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়।

রনির অসম্ভব মন খারাপ হলো। কান্না পেতে লাগল। ক্লাসের এতগুলি ছেলেমেয়ের সামনে কেঁদে ফেলা খুব খারাপ। সে চেষ্টা করতে লাগল যেন কাঁদে। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে ক্লাসঘরের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের পাতা ফেলল না। এতে চোখে যে পানি জমে আছে তা শুকিয়ে যাবার কথা। রনির পাশেই বসেছে লুতপাইন। লুতপাইন অবাক হয়ে বলল, কী দেখ?

রনি বলল, ফ্যান দেখি।

ফ্যান দেখ কেন?

এমনি দেখি।

লুতপাইনও রনির মতো ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। লুতপাইন খুব ভালো মেয়ে কিন্তু তার কিছু খারাপ অভ্যাস আছে। রনি যা করবে সেও তাই করবে। এখন যদি রনি চোখ নামিয়ে জানালা দিয়ে তাকায়, লুতপাইনও জানালা দিয়ে তাকাবে।

রনিদের ক্লাসে কে কোথায় বসবে সব ঠিক করা। যদি ঠিক করা না থাকত তাহলে অবশ্যই রনি অন্য কোথাও বসত। লুতপাইনের পাশে বসত না।

লুতপাইন বলল, তুমি কাঁদছ কেন?

রনি বলল, কাঁদছি না তো।

তোমার চোখে পানি। তোমার কি মিস নাজমা ম্যাডামের জন্য খারাপ লাগছে?

রনি বলল, হুঁ।

খারাপ লাগছে কেন?

জানি না।

লুতপাইন বলল, আমি জানি। ম্যাডাম আমাদের সবার নাম দিয়ে ছড়া বানাতেন। কেন বানাতেন সেটা তিনি বলবেন বলেছিলেন–এইজন্য তোমার খারাপ লাগছে। কারণ তিনি তো আর বলতে পারবেন না।

রনি বলল, আমার সঙ্গে এত কথা বলবে না। আমার ভালো লাগে না।

লুতপাইন বলল, আচ্ছা আর কথা বলব না।

রনি বলল, আমার দিকে এইভাবে তাকিয়েও থাকবে না। কেউ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমার ভালো লাগে না।

আচ্ছা।

গার্জিয়ানরা আসতে শুরু করেছেন। একে একে ছেলেমেয়েরা সব চলে যাচ্ছে। ক্লাসরুম ফাঁকা। এখন ক্লাসে আছে শুধু রনি আর লুতপাইন। বাকিরা প্লে গ্রাউন্ডে খেলছে। ধরাধরি খেলা। একজন বলবে ধর আমাকে ধর, ওমনি বাকি সবাই তাকে ধরার জন্য তার পেছনে পেছনে ছুটতে থাকবে। ক্লাস টিচার আজকে খেলতে নিষেধ করেছেন তারপরও সবাই খেলছে।

রনি উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে লুতপাইনও উঠে দাঁড়াল। রনি জানে এখন সে যদি প্লে গ্রাউন্ডে যায়, লুতপাইনও তার সঙ্গে সঙ্গে যাবে। আবার সে যদি গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, লুতপাইনও তাই করবে। মেয়েটার এমন নকল করা অভ্যাস। সবসময় রনিকে নকল করবে।

বারোটা বাজার আগেই স্কুল খালি। রনি শুধু একা বসে আছে। তাকে কেউ নিতে আসে নি। রনিকে কেউ নিতে আসে নি বলে তাদের ক্লাস টিচারও বাসায় যেতে পারছেন না। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুব বিরক্ত। যদিও তিনি মুখ হাসি হাসি করে রেখেছেন। রনি প্লে গ্রাউন্ডে একটা কাঠ-গোলাপ গাছের নিচে বসে ছিল। দিলশাদ মিস তার কাছে এসে মিষ্টি গলায় বললেন, ব্যাপার কী বলো তো? তোমাদের বাসায় কেউ টেলিফোন ধরছে না কেন?

রনি বলল, ম্যাডাম আমি তো জানি না।

তোমার বাবার অফিসের নাম্বার জানো?

জি না।

জানো না কেন? গুরুত্বপুর্ণ নাম্বার মনে রাখবে না? তোমার একার জন্যে আমাকে দুটা পর্যন্ত বসে থাকতে হবে এটা কেমন কথা?

এখন দিলশাদ ম্যাডামের রাগ টের পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তিনি এখন রনিকে ধমক দেবেন। রনির ভয় ভয় করছে। কান্না কান্নাও পাচ্ছে।

রনি বলল, ম্যাডাম আপনি চলে যান।

আমি কী করব না করব সেটা আমার ব্যাপার, তোমাকে জ্ঞান দিতে হবে না। ফাজিল ছেলে।

রনি বুঝতে পারছে না ম্যাডাম তাকে কেন ধমকাচ্ছেন। তাদের বাসার কেউ টেলিফোন ধরছে না, সেটা তো বাসার সমস্যা।

ম্যাডাম যেভাবে হনহন করে এসেছিলেন ঠিক সেইভাবে হন হন করে চলে গেলেন। পনের মিনিট পর আবার উপস্থিত হলেন। আগের মতোই রাগী রাগী গলায় বললেন, তোমার কোনো আত্মীয়স্বজনের টেলিফোন নাম্বার জানা আছে, জানা থাকলো বলো–তাদের কাউকে টেলিফোন করে বলি তোমাকে নিয়ে যেতে।

জানা নেই ম্যাডাম।

তুমি তো দেখি গাধা ছেলে। গাছতলায় বসে থাকবে না। যাও ক্লাসে গিয়ে বসে।

রনি ক্লাসে গিয়ে বসল। সে কতক্ষণ বসে থাকল নিজেই জানে না। মনে হয় অনেকক্ষণ। একা বসে থাকতে কী খারাপ যে লাগে! এর মধ্যে কয়েকবার দিলশাদ ম্যাডাম জানালা দিয়ে তাকে দেখে গেলেন। প্রতিবারই এমন করে তার দিকে তাকালেন যেন রনি খুব খারাপ একটা ছেলে। দুষ্টামি করেছে বলে তাকে ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। অথচ সে তো কোনো দোষই করেনি।

রনি ঠিক করে ফেলল ক্লাস থেকে পালিয়ে যাবে। প্রথমে যাবে প্লে গ্রাউন্ডে। সেখানে কাঠগোলাপ গাছটায় উঠবে। এই গাছ থেকে স্কুলের ছাদে যাওয়া যায়। বড় ক্লাসের কোনো কোনো ছেলে এই কাজটা করে। ছাদে গিয়ে সে যদি বসে থাকে, তাহলে ম্যাডাম তাকে খুঁজে পাবেন না। রনি যখন সব ঠিক করে ক্লাস থেকে বের হতে যাবে তখনি দিলশাদ ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকে হাসি হাসি মুখে বললেন, যাও তোমাকে নিতে এসেছে।

রনি বলল, কে এসেছে?

তোমার এক রিলেটিভ, হাব্বত আলি নাম।

রনি একবার ভাবল বলে, হাব্বত আলি নামে আমার কোনো আত্মীয় নেই। হাব্বত আলির সাথে মাত্র একদিন আমার কথা হয়েছে। স্কুলের নিয়ম-অপরিচিত কারো সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের যেতে দেয়া হয় না। রনি এসব কিছুই বলল না। কিছু বললেও ম্যাডাম রেগে যাবেন। তাকে রাগিয়ে দেবার কোনো অর্থ হয় না।

রনি বলল, ম্যাডাম যাই। ম্যাডাম মধুর গলায় বললেন, গুড বাই লিটিল এনজেল।

এই ম্যাডাম কথায় কথায় ছেলেমেয়েদের লিটিল এনজেল বলেন, কিন্তু কাউকেই দেখতে পারেন না। রনির ইচ্ছা করছে ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে বলে, গুড বাই আগলি উইচ, তা সে বলল না। ম্যাডামদের সঙ্গে বেয়াদবি করা যায় না। তাছাড়া দিলশাদ ম্যাডাম মোটেই আগলি না। তিনি খুবই রূপবতী।

হাব্বত আলি হুড খোলা রিকশার সিটে পা তুলে আয়েশ করে বসে ছিলেন। এখন বৈশাখ মাস। বেশ গরম। এই গরমে তার গায়ে কালো রঙের কম্বল জাতীয় চাদর। চাদর তিনি যে শুধু গায়ে দিয়ে রেখেছেন তাই না। মাথাও ঢেকে রেখেছেন। চাদরের ভেতর থেকে তার উজ্জ্বল চোখ দেখা যাচ্ছে। তিনি রনিকে দেখতে পেয়ে আনন্দিত গলায় ডাকলেন, হ্যালো, হ্যালো!

রনি তার দিকে এগিয়ে গেল।

রিকশায় কখনো চড়েছ রনি?

রনি হ্যাঁ বা না কিছু বলল না। সে বুঝতে পারছে না অপরিচিত এই মানুষটার সঙ্গে রিকশায় উঠা ঠিক হবে কি-না। মনে হয় ঠিক হবে না।

হাব্বত আলি হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে তুললেন। রনির দিকে তাকিয়ে বললেন, মন খারাপ নাকি?

রনি বলল, হুঁ।

বেশি?

হুঁ।

মন খারাপ থাকলে মন ভালো করার একটা প্রেসক্রিপশন আমার কাছে আছে। প্রেসক্রিপশন দেব?

রনি বলল, আগে বলুন আপনি আমাকে নিতে এসেছেন কেন? কীভাবে বুঝলেন যে আমাকে কেউ নিতে আসে নি?

হাব্বত আলি বললেন, তোমার কাছে কি মনে হচ্ছে আমি সুপারম্যান টাইপের কেউ? আমার অনেক পাওয়ার। সেই পাওয়ার থেকে বুঝে ফেলেছি রনি নামের বাচ্চা একটা ছেলেকে কেউ নিতে আসছে না। বেচারা একা একা মন খারাপ করে বসে আছে। তার মিস অকারণে তাকে ধমকাচ্ছে। বেচারাকে উদ্ধার করতে হবে। এরকম মনে হচ্ছে?

হুঁ।

সেরকম কিছুই না।

তাহলে কী?

আমি খুবই সাধারণ। আমার কোনো ক্ষমতা নেই। ঘটনা হচ্ছে কী, আমি তোমাদের স্কুলের অফিসঘরে ছিলাম। সেখান থেকেই শুনলাম তোমাদের স্কুলের এক ম্যাডাম কিছুক্ষণ পরপর কোনো এক বাসায় টেলিফোন করছে, কেউ টেলিফোন ধরছে না বলে তিনি খুবই রাগারাগি করছেন। একবার বললেন, চাবকে রনি ছেলেটার পিঠের চামড়া তুলে দেয়া দরকার। তখন রনি ছেলেটার জন্যে আমার মন খারাপ হলো। ভাবলাম ছেলেটাকে একটু সাহায্য করি। যদিও তখন জানতাম না রনি তুমি। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে।

আপনি আমাদের স্কুলে এসেছিলেন কেন?

তোমাদের একজন আর্ট টিচার দরকার। আমি আর্ট টিচারের ইন্টারভু দিতে গিয়েছিলাম। তোমাদের হেড মিসট্রেস ইন্টার নিলেন।

আপনার চাকরি কি হয়েছে?

হুঁ। আগামী সপ্তাহে জয়েন করব। তোমাদের আর্ট ক্লাস আছে না?

আছে। বুধবারে আর্ট ক্লাস।

তাহলে বুধবারে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে।

হুঁ।

তোমার মন খারাপ ভাব কি কমেছে, না এখনো আছে?

এখনো আছে, তবে আগের চেয়ে একটু কম।

মন ভালো করার কৌশলটা শিখিয়ে দেব?

দিন।

হাব্বত আলি গম্ভীর গলায় বললেন, যে বিষয় নিয়ে তোমার মন খারাপ সেই বিষয়টা নিয়ে ভাববে। ভাবতে ভাবতে মুখ দিয়ে শব্দ করবে ঘোঁৎ। শব্দটা করার সঙ্গে সঙ্গে যে বিষয় নিয়ে মন খারাপ, সেই বিষয়টা পুরো এলোমেলো হয়ে যাবে। দেখবে তোমার মন ভালো হয়ে গেছে।

রনি অবাক হয়ে বলল, ঘোঁৎ বললেই হবে?

হাব্বত আলি গম্ভীর গলায় বললেন, শুধু ঘোঁৎ বললেই হবে না। যে বিষয় নিয়ে তোমার মন খারাপ সেই বিষয়টা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বলতে হবে। দেখবে চেষ্টা করে?

হুঁ।

চেষ্টা কর। কী নিয়ে মন খারাপ সেটা ভাবো। চোখ বন্ধ করে ভাবো। এই তো ঠিক আছে। এখনো বলো ঘোঁৎ। শব্দ করে বলো। মিনমিন করে না।

রনি শব্দ করে বলল, ঘোঁৎ। বলেই সে হেসে ফেলল। আশ্চর্য ব্যাপার, তার মন খারাপ ভাব একেবারেই নেই। এখন খুবই আনন্দ লাগছে। হাব্বত আলি বললেন, মন খারাপ ভাব দূর হয়েছে?

রনি বলল, হ্যাঁ।

এ চিকিৎসার নাম হলো ঘোঁৎ চিকিৎসা। চিকিৎসাটা ভালো না?

চিকিৎসাটা ভালো।

এর চেয়েও ভালো চিকিৎসা আছে। সেই চিকিৎসায় ঘোঁৎটা উল্টো করে বলতে হয়। তবে এ শব্দটা উল্টো করে বলা বেশ কঠিন বলে বেশিরভাগ মানুষ এই চিকিৎসা নিতে পারে না।

রনি বলল, আপনি কি ঘোঁৎ উল্টো করে বলতে পারেন?

অবশ্যই পারি। বলব?

বলুন।

হাব্বত আলি শব্দ করে বললেন-ৎঘোঁ।

রনির খুবই মজা লাগছে। শব্দটা শুনতেই মজা লাগছে।

হাব্বত আলি বললেন, শুরুতে ৎ আছে তো, ৎ এর উচ্চারণ কঠিন বলে বেশিরভাগ মানুষ পারে না। ঘোঁৎ উল্টো করে বলতে বললে সবাই বলে তঘোঁ। তঘো আর ৎঘোঁ এক না।

রনি আগ্রহের সঙ্গে বলল, আমাকে শিখিয়ে দেবেন?

চেষ্টা করে দেখতে পারি। পারব কি-না তা জানি না।

এখন বলো তোমাকে কি সরাসরি বাসায় নিয়ে যাব না-কি রিকশায় করে কিছুক্ষণ ঘুরব?

কিছুক্ষণ ঘুরব।

চলন্ত রিকশায় চোখ বন্ধ করে বসে থাকলে কী হয় জানো?

জানি না।

চলন্ত রিকশায় চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকলে মনে হয় তুমি শূন্যে ভাসছ।

এরকম কেন মনে হয়?

আমি জানি না কেন মনে হয়। পরীক্ষা করে দেখ সত্যি মনে হয় কি না।

রনি চোখ বন্ধ করল। কী আশ্চর্য, কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে সে শূন্যে বসে আছে। ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে। সে ভয় পেয়ে চোখ মেলে ফেলল।

হাব্বত আলি বললেন, আমার যখন শূন্যে ভাসতে ইচ্ছা করে, তখন আমি সারাদিনের জন্যে রিকশা ভাড়া করে রিকশায় উঠি। চোখ বন্ধ করে বসে থাকি। অতি অল্প টাকায় আকাশ ভ্রমণ হয়। মজা না?

হুঁ।

হাব্বত আলি বললেন, তোমাকে একটা জরুরি খবর দিতে তো ভুলে গেলাম।

জরুরি খবরটা কী?

ভালো খবর। এই খবর আগে-ভাগে দিলে ঘোঁৎ চিকিৎসা ছাড়াই তোমার মন ভালো হয়ে যেত।

খবরটা বলুন।

অনুমান করো তো দেখি, তোমার অনুমান শক্তি দেখি। এ ছড়াটা জানো না–

দেখি তোদের অনুমান
হনুমান হনুমান।

রনি বিরক্ত হয়ে বলল, আপনি পেঁচাচ্ছেন কেন? খবরটা বলুন।

ঐ যে তোমাদের নাজমা মিস। তিনি তো মারা যান নি। বেঁচে আছেন।

কে বলল আপনাকে?

আমি স্কুলে থাকতে থাকতেই হাসপাতাল থেকে খবর এসেছে। উনি আহত, জ্ঞান নেই, তবে মারা যান নি। ঠিকমতো চিকিৎসা হলে বেঁচেও যেতে পারেন। অবস্থাটা দেখ, মারা যায়নি, এদিকে স্কুল ছুটি দিয়ে বসে আছে। হা হা হা।

রনি বলল, এরকম বিশ্রী করে হাসবেন না তো, বলে সে নিজেও হাসতে শুরু করল। হাব্বত আলি হাসতে হাসতেই একবার বললেন ঘোঁৎ রনি বলল, ঘোঁৎ বললেন কেন?

হাব্বত আলী বললেন, খুব আনন্দের মধ্যে ঘোঁৎ বললে আনন্দ নষ্ট হয়ে যায় কিনা পরীক্ষা করলাম।

নষ্ট হয়?

নষ্ট হয় না। বরং বাড়ে। তুমি করে দেখ।

রনি কয়েকবার ঘোঁৎ করল। যত করে আনন্দ তত বাড়ে।

রিকশা শহরের বাইরে অনেকদূর চলে গিয়েছিল। রনি বলল, বাসায় যাব।

হাব্বত আলি রনিকে তাদের বাসার সামনে গেটে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। যদিও মানুষটাকে এভাবে ছেড়ে দিতে তার ইচ্ছা করছিল না। তার সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ গল্প করতে ইচ্ছা করছিল। ইচ্ছা করলেই তো আর করা যায় না। তার খুব ইচ্ছা করে স্কুলের কাঠগোলাপ গাছ বেয়ে ছাদে উঠতে, তা সে করতে পারে না। তার একা একা রাস্তায় হাঁটতে ইচ্ছা করে, তাও সে করতে পারে না। তাকে করতে হয় সব অনিচ্ছার কাজ। যেমন সকালে একগ্লাস দুধ খেতে হয়। ঠিক রাত দশটায় ঘুমুতে যেতে হয়। কার্টুন চ্যানেলে রাত দশটায় এমন সুন্দর একটা কার্টুন হয়। এই কার্টুনটা সে কোনো দিনই দেখতে পারে না।

স্কুল থেকে ফিরে রনি কী করবে না করবে সব আগেই ঠিক করা। যেমন–সে গোসল করবে। গোসলের আগে ইদরিস মিয়া তার গায়ে তেল মাখিয়ে দেবে। বিদেশ থেকে আনা হার্বাল কী যেন তেল, গাঢ় সবুজ রঙ। খুবই কুৎসিত গন্ধ।

গোসলের পর ভাত খাওয়া। ভাত খাওয়ার আগে খেতে হবে এক বাটি সবজি (অতি জঘন্য)।

ভাত খাওয়ার পর একঘণ্টা বিশ্রাম, তবে এইসময় সে টিভি দেখতে পারবে না। পাঠ্য বই-এর বাইরের বই পড়তে পারবে। কোন বই পড়বে তাও কিন্তু ঠিক করা। রনির বাবা ঠিক করে দেন। তিনি নিজেই বই নিয়ে আসেন। সবই জ্ঞানের বই–Insect world, Mountain Climbing, Polar Expedition. (অতি জঘন্য)।

বই পড়ার টাইম শেষ হলেই হুজুর আসবেন। তিনি শেখাবেন কোরান শরীফ পড়া। আলিফ জবার আ, বে জবর বা।

উনি চলে যাবার পর আসবেন ইংরেজি স্যার।

সন্ধ্যার আগে আগে খেলাধুলার জন্যে একঘণ্টার ছুটি পাওয়া যাবে। খেলতে হবে ছাদে গিয়ে। তাদের বাড়ির ছাদটা নেট দিয়ে ঘেরা। বাসকেট বল খেলার রিং বসানো আছে, পিং পং খেলার টেবিল আছে। একা একা রনি কী খেলবে?

আজ হাব্বত আলি সাহেবের সঙ্গে স্কুল থেকে ফেরার পর তার ধরাবাঁধা রুটিনের ওলটপালট হয়ে গেল। সে সরাসরি নিজের ঘরে ঢুকে স্কুলের কাপড় না ছেড়েই ঘুমুতে গেল এবং ঘুমিয়ে পড়ল। ইদরিস মিয়া খুব চিন্তিত হয়ে কয়েকবার তার খোঁজ নিয়ে গেল। কপালে হাত দিয়ে জ্বর আছে কি-না দেখল।

রনির মা বাইরে থেকে টেলিফোন করলেন। ইদরিস তাঁকে জানাল, ভাইজান স্কুল থাইক্যা আইসাই ঘুমাইতাছে। মনে হয় শইল ভালো না।

জ্বর নাকি? কপালে হাত দিয়ে দেখ।

জ্বর নাই, শইল ঠাণ্ডা।

আচ্ছা ঠিক আছে ঘুমাচেছ ঘুমাক। আমি ঘন্টা দুইর মধ্যে আসব, তখন দেখব।

দুপুরের খানা খায় নাই।

আমি এসে খাওয়াব।

ভয়ের চোটে ইদরিস আসল কথাটা বলতে পারল না। আসল কথা হচ্ছে, ভাইজান আজ স্কুল থেকে একা চলে এসেছে। গাড়ি তাকে আনতে গিয়ে ফিরে এসেছে।

রনি বিকাল পর্যন্ত ঘুমালো। ইদরিস মিয়াই তাকে ডেকে তুলল। তার টেলিফোন এসেছে। খুব নাকি জরুরি টেলিফোন।

রনি টেলিফোন ধরল। অবাক হয়েই টেলিফোন ধরল। তাকে কেউ টেলিফোন করে না। মাঝে মাঝে তার প্রাইভেট টিচাররা টেলিফোন করেন। আজ আসবেন না কিংবা পরশু আসতে পারবেন না এইসব জানানোর জন্য। এখন সেটাও বন্ধ। রনির মা টিচারদের বলে দিয়েছেন এ জাতীয় টেলিফোন রনিকে করার কিছু নেই। তাকে করতে হবে।

তাহলে টেলিফোনটা কে করেছে। হাব্বত আলি? রনি টেলিফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মিষ্টি গলায় কেউ একজন বলল,

রনি

কনি

মনি

লানি

মিস নাজমা ম্যাডাম যে রকম করে বলতেন অবিকল সেরকম করে বলা। তবে নাজমা ম্যাডাম টেলিফোন করেন নি। অন্য কেউ করেছে। রনি বলল, হ্যালো কে?

আমি লুতপা।

তুমি আমার টেলিফোন নাম্বার কোথায় পেয়েছ?

স্কুল থেকে নিয়েছি। কেন নিয়েছ?

তুমি রাগ করছ কেন?

রনি বলল, কেউ টেলিফোন করলে আমার ভালো লাগে না।

লুতপা বলল, আমার খুব মন খারাপ এইজন্যে তোমাকে টেলিফোন করেছি।

মন খারাপ কেন?

মিস নাজমা ম্যাডাম আমাদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে যা রাইম বলতেন তার অর্থ বের করেছি। তারপর থেকেই আমার মন খারাপ।

রনি বলল, কী অর্থ বের করেছ?

লুতপা বলল, মিস তোমাকে কী বলে ডাকতেন?

রনি!

কনি

মনি

লানি।

কনি মনি লানি এর প্রথম অক্ষরগুলি মিলে কী হয়? কমলা হয় না? ম্যাডাম তোমাকে কমলা ডাকতেন। তোমার গায়ের রঙ টুকটুকে কমলার মতো, এইজন্য কমলা ডাকতেন।

ও আচ্ছা।

পুতুলকে কী ডাকতেন মনে আছে? পুতুলকে ডাকতেন—

পুতুল!

তুতুল

লতুল

তুতুললতুল।

প্রথম অক্ষরগুলি নিলে কী হয়? তুলতুল হয় না? পুতুলকে দেখলেই মনে হয় না–গা তুলতুল করছে?

হ্যাঁ মনে হয়।

আর আমাকে ডাকতেন—

লুতপা!

মতপা

য়তপা

নাতপা

এর মানে কী?

রনি বলল, ময়না।

লুতপা বলল, আমার খুব বুদ্ধি, তাই না?

রনি বলল, হুঁ।

লুতপা বলল, আমার বাবা আমাকে কী ডাকে জানো?

রনি বলল, জানতে চাই না।

লুতপা বলল, এমন কর কেন, শোনো না–আমার বাবা আমাকে ডাকে বুদ্ধিরানী।

রনি বলল, লুতপা শোনো তুমি আর কোনোদিন আমাকে টেলিফোন করবে না।

লুতপা বলল, কেন করব না?

রনি বলল, আমার ভালো লাগে না। আরেকটা কথা শোনো, মিস নাজমা ম্যাডাম মারা যান নি। বেঁচে আছেন।

কে বলেছে? যেই বলুক, ঘটনা সত্যি।

এই বলেই সে টেলিফোন রেখে দিল। অবশ্যি টেলিফোনটা রাখার পর তার একটু মন খারাপ হলো। এমন খারাপ ব্যবহার না করলেই হতো। তার ইচ্ছা করতে লাগল লুতপাকে টেলিফোন করে সরি বলতে। কিন্তু সে তো তার টেলিফোন নাম্বার জানে না। রনি ঠিক করল, আগামীকাল যখন স্কুলে যাবে তখন সে সরি বলবে। কিংবা একটা ফরগিভ মি কার্ড দেবে। কম্পিউটারে সুন্দর সুন্দর কার্ড সে নিজেই তৈরি করতে পারে।

লুতপার কার্ডে একটা ছেলের ছবি থাকবে। ছেলেটার চোখে পানি। নিচে লেখা থাকবে–FORGIVE ME PLEASE.

০৩. রনিদের বাড়িতে মোটামুটি হৈচৈ পড়ে গেছে

রনিদের বাড়িতে মোটামুটি হৈচৈ পড়ে গেছে। মিটিং-এর পর মিটিং শুরু হয়েছে। সবাই আলাদা আলাদা করে রনিকে নিয়ে বসছে। প্রথমে বসলেন রনির মা। তিনি কথাবার্তা বলছেন খুব আদুরে গলায়। এমন ভাব যেন কিছুই হয় নি। ছেলের সঙ্গে গল্প করতে বসেছেন।

বাবা, ঠিক করে বলো তো তুমি কার সঙ্গে বাড়িতে এসেছ?

একটা লোকের সঙ্গে।

একটা লোকের সঙ্গে তুমি যে এসেছ সেটা তো আগেই বলেছ। লোকটার নাম কী? নাম বলো।

রনি চুপ করে গেল। নাম সে জানে। হাত আলি। কিন্তু হাব্বত আলির নাম শুনলেই মা রেগে যাবেন। মানুষটাকে আর কখনো বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না। কাজেই নাম না বলাই ভালো।

রনি, লোকটার নাম বলো।

নাম মনে নেই।

সে কি তার নাম তোমাকে বলেছিল?

মনে নেই।

তোমার সবকিছু মনে থাকে, এটা কেন মনে নেই? সে তোমাকে রিকশায় করে এনেছে?

হুঁ।

রিকশায় উঠে তোমাকে কি কিছু খেতে দিয়েছিল? শরবত জাতীয় কিছু? যেটা খাওয়ার পর তোমার আর কিছু মনে নেই।

না।

সে রিকশায় করে তোমাকে সরাসরি এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে?

না।

তাহলে কোথায় নিয়ে গেছে?

রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে।

কোথায় কোথায় ঘুরেছে মনে করতে পার?

না।

না কেন?

আমি চোখ বন্ধ করে ছিলাম তো।

কী সর্বনাশ! চোখ বন্ধ করে ছিলে কেন?

উনি আমাকে চোখ বন্ধ করে রাখতে বললেন।

আশ্চর্য কথা! চোখ বন্ধ করে থাকতে বলেছে কেন?

রিকশায় চোখ বন্ধ করে থাকলে মনে হবে হাওয়ায় উড়ছি–এইজন্যে চোখ বন্ধ করে থাকতে বলেছেন।

সে কি আবারো তোমার সঙ্গে দেখা করবে এরকম কিছু বলেছে?

হুঁ।

কী বলেছে?

বলেছেন প্রতি বুধবার তার সঙ্গে দেখা হবে।

কী বলছ এইসব? আমার তো হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।

রনির মা মুখ কালো করে ফেললেন। তিনি যে খুবই ভয় পাচ্ছেন এটা রনি বুঝতে পারছে। তাকে ভয় দেখাতে পেরে রনির ভালো লাগছে। এখন তার সবাইকে ভয় দেখাতে ইচ্ছা করছে।

লোকটার সঙ্গে কী কী কথা হয়েছে আমাকে গুছিয়ে বলো। কিছুই বাদ দেবে না।

উনি আমাকে মন ভালো করার কৌশল শিখিয়েছেন।

কী কৌশল?

ঘোঁৎ কৌশল।

সালমা বানু অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

রনির মার পর কথা বলতে এলেন রনির বাবা। তিনি কথাবার্তা বললেন কঠিন গলায়। তাকে তখন মনে হচ্ছিল গোয়েন্দা অফিসার। আর রনি হলো ভয়ঙ্কর এক অপরাধী।

রনি শোনো, আমি তোমার স্কুলের মিসের সঙ্গে কথা বলেছি। তোমাদের প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে কথা বলেছি। তোমাদের মিস বলেছেন তুমি খুব আনন্দের সঙ্গে ঐ লোকের সঙ্গে গেছ। তুমি তোমার মিসকে বলেছ ঐ লোক তোমার আত্মীয়। বলেছ এমন কথা?

না।

তাহলে কি তুমি বলতে চাও তোমার মিস মিথ্যা কথা বলেছেন?

হ্যাঁ।

তুমি অচেনা একজন লোকের সঙ্গে বের হয়ে গেলে কেন?

জানি না কেন।

সে বলল আর তুমি সুড়সুড় করে তার সঙ্গে রিকশায় উঠে গেলে?

হ্যাঁ।

কেন উঠলে?

জানি না।

লোকটা একা ছিল, না তার সঙ্গে দলবল ছিল?

একা ছিল। দলবল নিয়ে একটা রিকশায় করে যে যাবে কীভাবে?

তোমার মা বলছিল সে নাকি কি তোমাকে শিখিয়েছে। কী শিখিয়েছে?

ঘোঁৎ বিদ্যা।

তার মানে? রনি কয়েকবার ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করল।

রনির বাবার চোখ কপালে উঠে গেল।

রাত নটার সময় সত্যিকার একজন পুলিশ অফিসার রনির সঙ্গে কথা বলতে এলেন। তিনি আবার কারো সামনে কথা বলবেন না। কথাবার্তার সময় রনি ছাড়া আর কেউ থাকতে পারবে না। কাজেই রনি তাকে তার ঘরে নিয়ে গেল। তিনি হাসি হাসি মুখে কথা বললেন, খোকা তুমি কেমন আছ?

ভালো আছি।

তুমি কি সবসময় সত্যি কথা বলো, নাকি মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা বলো?

মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা বলি।

আমার সঙ্গে সত্যি কথা বলবে, নাকি মিথ্যা কথা বলবে?

জানি না।

না জানলে হবে না। আমার সঙ্গে সত্যি কথা বলতে হবে।

কেন?

কারণ আমি পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে সত্যি কথা বলতে হয়। আচ্ছা এখন লোকটা সম্পর্কে বলো। লোকটার বয়স কত?

বয়স কত আমি জানি না। জিজ্ঞেস করিনি।

অনুমান করে বলো।

আমি অনুমান করতে পারি না।

লোকটা কি তোমার বাবার বয়সী না তার চেয়ে বড়?

কোন বাবা? আসল বাবা না নকল বাবা।

পুলিশ অফিসার অবাক হয়ে বললেন, কী বলছ এসব! আসল বাবা নকল বাবা কী?

আমি যে বাবার সঙ্গে থাকি তিনি নকল বাবা। আসল বাবা মারা গেছেন।

বলো কী।

রনি বলল, আমার যে মাকে দেখছেন উনিও নকল।

পুলিশ অফিসার হতভম্ব গলায় বললেন, ভালো যন্ত্রণায় পড়লাম তো!

রনির খুব মজা লাগছে। পুলিশ অফিসারকে যন্ত্রণায় ফেলে দেয়া সহজ কাজ না। সে অবশ্যি এরকম একটা সিনেমা দেখেছিল যেখানে বাচ্চা একটা ছেলে ঘাপ্ত পুলিশ অফিসারকে নানান যন্ত্রণায় ফেলে দেয়। শেষে পুলিশ অফিসারের সঙ্গে ছেলেটার খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এই পুলিশ অফিসারের সঙ্গেও হয়তো রনির বন্ধুত্ব হবে। এই পুলিশ অফিসার হাসিখুশি মানুষ। আর সবচে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি হাসতে হাসতে হঠাৎ হাসি বন্ধ করে অবাক হয়ে তাকাতে পারেন।

রনি বলল, আপনার নাম কী?

পুলিশ অফিসার বললেন, আমার নাম আফসার। আফসার উদ্দিন।

আপনি কি খুব বড় অফিসার?

আমি ছোট অফিসার। পুলিশ ইন্সপেক্টর, গোয়েন্দা বিভাগের লোক।

গোয়েন্দা বিভাগ মানে কী?

আমরা সাদা পোশাকে থাকি।

সাদা পোশাকে থাকেন কেন?

কেউ যেন আমাদের চিনতে না পারে।

কেউ চিনতে পারলে কী হবে?

আফসার উদ্দিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, উফ খোকা, চুপ করো!

চুপ করব কেন?

আমি চুপ করতে বলছি এইজন্যে চুপ করবে।

আপনি চুপ করতে বলছেন কেন?

তোমার প্রশ্ন শুনতে ভালো লাগছে না, এইজন্যে চুপ করতে বলছি।

আমার প্রশ্ন শুনতে আপনার ভালো লাগছে না কেন?

আফসার উদ্দিন হতাশ চোখে তাকিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন। রনির মজা লাগছে। এই পুলিশ অফিসারের সঙ্গে সে একটা খেলা খেলছে। খেলার নাম–প্রশ্ন প্রশ্ন খেলা। এই খেলাটা সে শিখেছে লুতপাইনের কাছে।

রনির দাদাজান এলেন অফিসার চলে যাবার পর পর। তিনি রনিকে আড়ালে ডেকে থমথমে গলায় বললেন, ঘটনা কী?

রনি বলল, জানি না।

সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র হচ্ছে বুঝতে পারছিস?

সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র কাকে বলে?

আরে গাধা, সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রও বুঝিস না!

ইংরেজিতে বলো, ইংরেজিতে বললে বুঝব।

রনির দাদা অতি বিরক্ত হয়ে বললেন, ফালতু ইংরেজি স্কুলগুলি তো বড় যন্ত্রণা করে। মাতৃভাষা কিছুই শেখায় না। এখন আমি সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের ইংরেজি পাব কই! মূল ব্যাপার হচ্ছে, ওরাই সাপ ওরাই ওঝা।

কারা সাপ কারা ওঝা?

তোর ফলস বাবা-মা। ওরাই নিজের লোক পাঠিয়ে তোকে কিডন্যাপ করিয়েছে, আবার ফেরত দিয়ে গেছে।

কেন করেছে?

কেন করেছে এখনো আমার কাছে ক্লিয়ার না, তবে ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আমার জন্যে অবশ্যি সুবিধা হলো।

কী সুবিধা?

কাস্টডি মামলা করব। তোর ফলস বাবা-মা তোকে ঠিকমতো রাখতে পারছে না। সন্ত্রাসী কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছে…

রনি বলল, যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি তো সন্ত্রাসী না। আর কিডন্যাপ করেও নেন নি।

তুই চুপ থাক। নিজ থেকে খবরদার একটি কথাও বলবি না। ব্যারিস্টার যা শিখিয়ে দেবে তাই বলবি। এর বাইরে কিছু বললে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেব।

দাদাজান তুমি দুষ্ট বুড়ো।

দুষ্টামির তুই দেখেছিস কি? আসল দুষ্টামি তো শুরুই হয়নি।

তিনি আনন্দে হাসতে লাগলেন। পা দোলাতে লাগলেন। রনির মনটা খারাপ হলো–আবার মামলা-মোকদ্দমা শুরু হবে। আবার কোর্টে যেতে হবে। জজ সাহেব মায়া মায়া গলায় বলবেন–খোকা, তুমি কার সঙ্গে থাকতে চাও?

রনির দাদাজান যাবার আগে রনির কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, তোর ফলস পিতা-মাতা এখন বুঝবে–হাউ মেনি রাইস হাউ মেনি পেডি।

রনি বলল, হাউ মেনি রাইস হাউ মেনি পেডির মানে কী?

দাদাজান অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, ইংরেজি স্কুলে পড়ে তোর লাভটা কী হলো? সহজ ইংরেজিও তো জানিস না। হাউ মেনি রাইস হাউ

মেনি পেডির মানে হলো কত ধানে কত চাল।

রনি বলল, কত ধানে কত চালের মানে কী?

এত কথা বলতে পারব না। এখন থেকে তোর পেছনে থাকবে ডাবল স্পাই। একটা কালো রঙের ভক্সওয়াগন গাড়ি তোকে ছায়ার মতো ফলো করবে।

দরকার নেই দাদাজান।

দরকার আছে কি না সেটা আমি দেখব। মোদ্দাকথা ফুটবল এখন আমার কোর্টে।

মোদ্দাকথার মানে কী দাদাজান?

এত মানে বলতে পারব না। তোদের স্কুলগুলি আছে কী জন্যে? এরা দেখি কিছুই শিখায় না। কাড়ি কাড়ি টাকা নেয়, পড়াশোনা লবডংকা।

লবড়ংকা মানে কী?

চুপ।

রনি স্কুলে গেল মন খারাপ করে। স্কুলে রওনা হবার সময় দেখে, একটা কালো রঙের ভক্সওয়াগন গাড়ি সত্যি সত্যি তাদের পেছনে পেছনে আসছে।

ক্লাসরুমে ঢুকে রনির মন আরো খারাপ হলো। লুতপাইনের জন্যে সে সুন্দর একটা সরি কার্ড বানিয়ে এনেছে। অথচ লুতপাইন আসে নি। তার সিটটা খালি। লুতপাইন কখনো স্কুলে আসে না এমন হয় না। একবার জ্বর গায়ে এসেছিল। তার নাকি বাসায় থাকতে ভালো লাগে না। তার স্কুল ভালো লাগে।

আজ বুধবার নতুন আর্ট টিচার আসার কথা। রনির কেন যেন মনে হলো তিনি আসবেন না। তাঁর সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ দেখা হবে এবং সেটাই ভালো। এরকম মানুষের সঙ্গে রোজ দেখা হওয়া ভালো না। হঠাৎ হঠাৎ দেখা হওয়াই ভালো।

থার্ড পিরিয়ড আর্ট ক্লাস। রনি দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। ক্লাসে হাব্বত আলি সাহেব ঢুকেন কি-না সেটা দেখার ইচ্ছা। হাব্বত আলি ঢুকলেন না ঢুকলেন তাদের ক্লাস টিচার।

হ্যালো লিটল এনজেলস, তোমরা কেমন আছ?

ক্লাসের সবাই একসঙ্গে বলল, ভালো।

আজ থেকে তোমাদের নতুন আর্ট টিচার আসার কথা। তিনি এসেছেন। তবে একটা ছোট্ট সমস্যা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি চাকরি করবেন না। কাজেই এই ক্লাস আপাতত আমি চালাব। তোমরা খুশি তো?

সবাই যন্ত্রের মতো একসঙ্গে বলল, ইয়েস মিস।

তোমরা ড্রয়িং খাতা বের কর। আজ তোমাদের ফ্রি চয়েস। যার যা আঁকতে ইচ্ছা করে আঁকবে। শুধু কার্টুন ছবি আঁকতে পারবে না। যে ছবিটি সবচেয়ে ভালো হবে সেটা স্কুলের বিলবোর্ডে টানিয়ে দেয়া হবে। তোমরা কি খুশি?

ইয়েস ম্যাডাম।

খুশি হলে এরকম করুণ গলায় ইয়েস ম্যাডাম বলছ কেন? হাসিমুখে ইয়েস ম্যাডাম বলো।

ইয়েস ম্যাডাম।

তোমাদের একটা ভালো খবর দেয়া হয়নি–নাজমা ম্যাডাম মারা যান নি। শুরুতে আমরা ভুল খবর পেয়েছিলাম। তিনি হাসপাতালে আছেন। যদিও কন্ডিশন ভালো না। তোমরা তাঁকে Get well কার্ড পাঠাতে পারো প্রিন্সিপ্যাল আপার অফিসে জমা দিলে আমরা পাঠাব।

রনি লক্ষ করল ক্লাসের সব ছেলে-মেয়ে খুব খুশি হয়েছে। তবে সবচে খুশি যে হতো সে ক্লাসে আসে নি। তার নাম লুতপাইন, তবে তাকে রনি খবর দিয়েছে।

রনি ছবি আঁকছে। এলিয়েনদের ছবি। একটা এলিয়েন তাদের প্ল্যানেটে অন্য একটা এলিয়েনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তাদের দুজনের হাতেই রে গান। এলিয়েনদের চেহারা ভয়ঙ্কর। সারা মুখ ভর্তি চোখ। চোখগুলি বিড়ালের চোখের মতো।

রনি এলিয়েনদের ছবি খুব ভালো আঁকতে পারে। সে যখন ছবি আঁকে, লুতপাইন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। কারণ লুতপাইন ছবিই আঁকতে পারে না। আর্টে সে সবচে কম নাম্বার পায়।

লুতপাইনের বাবা মেয়ের জন্যে আর্টের একজন টিচার খুঁজছেন, পাচ্ছেন না। আজ যদি লুতপাইন ক্লাসে থাকত, তাহলে অবাক হয়ে রনির ছবি আঁকা দেখত এবং প্রশ্ন করে করে বিরক্ত করত।

আচ্ছা একটা এলিয়েনের নয়টা চোখ, আরেকটা এলিয়েনের দশটা চোখ কেন? তুমি ভুল করেছ নাকি এদের চোখের ঠিক ঠিকানা থাকে না। কারো নয়টা, কারো দশটা, কারোর এগারটা এরকম?

আচ্ছা এই এলিয়েনটা ছেলে না মেয়ে?

আচ্ছা এরা কী খায়?

এরা কি আকাশে উড়তে পারে?

এরা কি ভয়ঙ্কর? না-কি ফ্রেন্ডলি?

শুধু যে প্রশ্ন করত তাই না, ছবি আঁকা শেষ হওয়া মাত্র বলত–এই ছবিটা তুমি আমাকে দেবে? আমার ঘরে টাঙিয়ে রাখব।

রনি বলত, না।

প্লিজ, দাও না প্লিজ। এই ছবিটা দিলে আমি তোমার কাছে আর ছবি চাইব না। কোনোদিন না। প্রমিজ বাই মাই হার্ট।

তুমি আবারো চাইবে। বললাম তো আর চাইব না।

লুতপাইনের এটা কথার কথা। রনি জানে লুতপাইন আবার ছবির জন্যে তার পেছনে ঘুরঘুর করবে। এই পর্যন্ত লুতপাইন রনির আটটা ছবি নিয়েছে। এটা নিলে তার হবে নয়টা ছবি। তবে এই ছবিটা তো আর সে নিতে পারছে না। সে ক্লাসেই আসে নি।

রনির ছবি দেখে ক্লাস টিচার খুবই বিরক্ত হলেন। তিনি রাগী রাগী গলায় বললেন, এটা কী এঁকেছ কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং! এই দুটা জন্তু কী?

এরা এলিয়েন।

এলিয়েন মানে?

ভিনগ্রহের মানুষ।

ভিনগ্রহের মানুষদের পনের ষােটা করে চোখ থাকে?

রনি কিছু বলল না। মিস বললেন, এইসব আলতু ফালতু জিনিস কেন আঁকো? নরম্যাল জিনিস আঁকতে পার না?

সরি ম্যাডাম।

নদীতে সূর্যাস্ত হচ্ছে, পাল তোলা নৌকা যাচ্ছে–এইসব আঁকবে।

রনি আবারো বলল, সরি ম্যাডাম।

রনির মন খারাপ হলো। ছবিটা ম্যাডামকে দেখানোই উচিত হয়নি। সবচে ভালো হতো ছবি আঁকার পরপরই সে যদি লুতপাইনকে ছবিটা দিয়ে দিত। ছবির সঙ্গে সরি নোট।

রনি গাড়িতে উঠতে যাবে, পেছন থেকে গম্ভীর গলায় দাড়িওয়ালা একজন লোক ডাকল, হ্যালো খোকা। হ্যালো।

রনি তাকিয়ে দেখে মুখভর্তি দাড়ি অচেনা এক লোক। মাথায় টুপি, মাওলানাদের মতো লম্বা পাঞ্জাবি পরা এক লোক তার দিকে এগিয়ে আসছে।

কেমন আছ খোকা?

লোকটা কে? হাব্বত আলি না তো? কিছুক্ষণ তাকিয়েই রনি বুঝে ফেলল, লোকটার দাড়ি-গোঁফ নকল এবং সে হাব্বত আলি না। পুলিশ ইন্সপেক্টার আফসারউদ্দিন।

ভালো আছি কিন্তু আপনি যে নকল দাড়ি লাগিয়েছেন–এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।

বলো কী? তুমি কি আমাকে চিনে ফেলেছ?

অবশ্যই। যে কেউ চিনে ফেলবে।

বলো তো আমি কে?

আপনি পুলিশ ইন্সপেক্টর আফসার উদ্দিন।

তুমি তো ঠিকই চিনে ফেলেছ।

আপনাকে যে দেখবে সে-ই চিনবে। তা ছাড়া আপনার দাড়ি কিন্তু খুলে যাচ্ছে।

আফসার উদ্দিন ব্ৰিতমুখে হাত দিয়ে দাড়ি চেপে ধরলেন। রনি বলল, দাড়ি লাগিয়ে আপনি এখানে কী করছেন?

তোমার বিষয়ে তদন্তে এসেছি।

কিছু পেলেন?

প্রথম দিনেই কিছু পাওয়া যায় না, তবে ভক্সওয়াগান নিয়ে কয়েকটা লোক বসে আছে। তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক। এর মধ্যে লক্ষ করেছি পাজেরো জিপ নিয়ে এক বুড়ো এসেছে। সে ভক্সওয়াগান লোকগুলির সঙ্গে কথা বলছে।

ঐ বুড়ো কি খুব ফর্সা?

হ্যাঁ ফর্সা।

রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি?

হুঁ।

ঐ বুড়ো আমার দাদাজান।

এরা কি তোমাকে কিডন্যাপ করতে এসেছে?

আসতে পারে।

তাহলে তো মনে হয় আমার উচিত তোমার সঙ্গে যাওয়া। উঠি তোমার সঙ্গে গাড়িতে?

উঠুন।

আফসার উদ্দিন গাড়িতে উঠে সিটে হেলান দিয়ে আরাম করে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে তাঁর নকল দাড়ি খুলে পড়ে গেল। রনি সেই দাড়ি যত্ন করে তার নিজের স্কুল ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল।

আফসার উদ্দিনের ঘুম ভাঙল রনিদের বাড়ির সামনে এসে। তিনি রনিকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন আফসার উদ্দিনের একবারো মনে হলো না যে তার মুখে এখন দাড়ি নেই। রনির মানুষটাকে পছন্দ হলো। কেমন সাদাসিধা আলাভোলা মানুষ। এই ধরনের মানুষ খুব ভালো হয়।

০৪. একজন লইয়ার এসেছেন

একজন লইয়ার এসেছেন, রনির সঙ্গে কথা বলবেন। রনি লেগো দিয়ে স্পেস ক্যাপসুল বানাচ্ছিল। বানানো বন্ধ করে উঠে গেল। লইয়ারদের সঙ্গে সে আগেও অনেকবার কথা বলেছে। প্রতিবারই প্রচণ্ড রাগ লেগেছে। সে নিশ্চিত আজো তার প্রচণ্ড রাগ হবে। লইয়ার কথা শেষ করে ফিরে যাবে, সে রাগ নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকবে। স্পেস ক্যাপসুল বানাতে পারবে না। রাতে ঘুমুতে যাবার সময় দুঃস্বপ্ন দেখবে। সেই দুঃস্বপ্নে কালো টুপি মাথায় দেয়া কয়েকটা এলিয়েন তাকে নিতে আসবে। সে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করবে। যেদিকেই যাবে সেদিকেই একজন এলিয়েন দাঁড়িয়ে থাকবে। যতবার রনি কোনো লইয়ারের সঙ্গে কথা বলে ততবারই এরকম দুঃস্বপ্ন দেখে।

রনি লইয়ারের সামনে সোফায় বসল। লইয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলল, খোকা নড়াচড়া করবে না। চুপচাপ বসো।

অথচ রনি কিছুই করে নি। শান্তভাবে বসেছে। কিছু না করার আগেই ভদ্রলোক ধমক দিলেন কেন? রনি সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল। এখন সোজা হয়ে বসতে বসতে বলল, নড়াচড়া করা যাবে না কেন?

লইয়ার চোখ থেকে চশমা সরিয়ে রনির দিকে তাকিয়ে রইলেন। রনি আবারো বলল, আমাকে বুঝিয়ে বলুন কেন নড়াচড়া করা যাবে না।

লইয়ার রাগী রাগী গলায় বললেন, আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলব। কথাগুলি মন দিয়ে তোমাকে শুনতে হবে। এই জন্যেই নড়াচড়া করা যাবে না।

ভদ্রলোক সিগারেট ধরালেন। সিগারেটের গন্ধে রনির বমি এসে যাচ্ছে। তারপরেও সে শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে। যদিও সে বলতে পারে, বাচ্চাদের সামনে কেন সিগারেট খাচ্ছেন? আপনি কি চান আপনার আশেপাশে যারা আছে তাদেরও ক্যান্সার হোক? বড়দের মুখের ওপর এইসব কথা বলা যায় না। বেয়াদবি হয়।

তোমার নাম রনি?

হুঁ।

হুঁ হা না। আমি প্রশ্ন করলে স্পষ্ট জবাব দেবে। তোমার নাম রনি?

হ্যাঁ, আমার ডাক নাম রনি।

তুমি নিশ্চয়ই জানো তোমাকে নিয়ে আবারো কাস্টডি মামলা শুরু হয়েছে। তোমার দাদাজান কোর্টে মামলা করেছেন।

আমি জানি না। এখন জানলাম।

তারা যুক্তি দেখাচ্ছে তোমার প্রতি যথেষ্ট টেককেয়ার করা হচ্ছে না। অচেনা অজানা লোকজন তোমাকে স্কুল থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি কী বলছি মন দিয়ে শুনছ তো?

শুনছি।

তাহলে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছ কেন? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলো।

রনি লইয়ারের দিকে তাকাল।

কোর্টে তুমি বলবে বাইরের লোক কখনো স্কুল থেকে তোমাকে নিতে আসে নি। সবসময় বাসা থেকে তোমাকে আনতে গাড়ি যায়। সেই গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়াও একজন গার্ড বসে থাকে।

মিথ্যা কথা বলব?

হ্যাঁ।

কেন?

তোমার মতো অবস্থায় যারা আছে তাদের কিছু মিথ্যা বলতে হয়।

আমি মিথ্যা বলব না। আমি বলব একবার স্কুল থেকে একজন আমাকে নিতে এসেছিল, তার সঙ্গে আমি রিকশায় করে ঘুরেছি।

লইয়ার চাপা গলায় বললেন, আমি তোমাকে যা শিখিয়ে দেব তুমি তাই বলবে। এর বাইরে একটা কথাও বলবে না।

আপনি আমাকে মিথ্যা কথা বলা শেখাচ্ছেন?

আরে যন্ত্রণা! তুমি কি মিথ্যা বলো না?

বলি।

তাহলে মিথ্যা বলতে সমস্যা কোথায়?

অন্য কেউ যে মিথ্যা শিখিয়ে দেয় সেই মিথ্যা আমি বলি না।

ভালো যন্ত্রণায় পড়লাম তো!

রনি বলল, আপনি পড়েছেন ভালো যন্ত্রণায় আর আমি পড়েছি খারাপ যন্ত্রণায়।

তুমি তো খুবই ত্যাঁদড় ছেলে।

ত্যাঁদড় ছেলে মানে কী?

মানে টানে বলতে পারব না। তোমার মা-বাবাকে পাঠাও।

তাঁদেরকে কীভাবে পাঠাব?

তাদের বলবে যে আমি কথা বলতে চাই। তারা তো বাসাতেই আছেন।

তারা বাসায় নেই। কোথায় গেছেন?

কোথায় গেছেন কীভাবে বলব? মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায় তা তো আমি জানি না।

ওহ মাই গড! তুমি আসলেই ত্যাঁদড় ছেলে। আমি তোমার রিয়েল বাবা-মার কথা বলছি না। তাঁরা যে মারা গেছেন তা আমি জানি। যে মার সঙ্গে তুমি বাস করছ তাদের কথা বলছি। যাও এক্ষুনি তাদের আসতে বলো।

রনি বের হয়ে এল। তার মন সামান্য খুঁতখুঁত করছে। মাথায় ঘুরছে ত্যাঁদড়। এই শব্দটার মানে কী জানা হলো না। নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিছু। স্কুলে বাংলা মিসকে বললে তিনি কি বলতে পারবেন? শব্দটার মানে যদি মিস জানেন তাহলে অবশ্যই বলতে পারবেন। মানে না জানলে রেগে যাবেন। ধমক দিয়ে বলবেন, সবসময় আজেবাজে প্রশ্ন কর কেন?

রাত দশটা। রনির রাতের খাবার খাওয়া হয়ে গেছে। এখন তাকে দুধ খেতে হবে। দুধ খাবার পর দাঁত মেজে ঘুমুতে যেতে হবে। রনি নিশ্চিত দাঁত মাজার সময় তার বমি হয়ে যাবে, তার পরেও সে দুধের জন্য অপেক্ষা করছে। দুধ নিয়ে আসবেন ইদরিস চাচা। তার হাতে গ্লাস দিয়ে রাজ্যের গল্প শুরু করবেন। বেশিরভাগই ভূতের গল্প। একবার তিনি নাকি কন্ধ কাটা ভূতের সঙ্গে কুস্তি করেছিলেন। ভূতটা শেষ পর্যায়ে তাকে কামড়ে ধরেছিল। সেই কামড়ের দাগ তার ডান পায়ে এখনো আছে।

হঠাৎ রনির মনে হলো, ইদরিস চাচার সঙ্গে একটা মজা করলে কেমন হয়? তার স্কুলব্যাগে পুলিশ ইন্সপেক্টর সাহেবের দাড়িটা আছে। দাড়িটা সে যদি গালে লাগায় তাহলে কেমন হয়? গায়ে থাকবে সাদা চাদর, মুখভর্তি দাড়ি মাথায় একটা ক্যাপ। সে রকিং চেয়ারে বসে দোল খেতে থাকবে। রনির ধারণা, ইদরিস চাচা এই দৃশ্য দেখে ভয়ে বিকট চিৎকার দেবে। হাত থেকে দুধের গ্লাস পড়ে যাবে। রনি আজ রাতের জন্যে বেঁচে যাবে। গ্লাসে করে ভয়ঙ্কর কুৎসিত এই পদার্থ তাকে খেতে হবে না।

দাড়ি লাগিয়ে রকিং চেয়ারে বসতে রনির তেমন সময় লাগল না। তার কাছে মনে হচ্ছে সাজটা ভালোই হয়েছে। মাথায় ক্রিকেটারদের ক্যাপের মতো একটা ক্যাপ পরেছে। কাবার্ড খুলে লাল চাদর বের করে গায়ে জড়িয়েছে। ছোট্ট সমস্যা হয়েছে দাড়ি খুলে যাচ্ছে। রকিং চেয়ারে বেশি দুলুনি দেয়া যাচ্ছে না। রনি ঘরের আলোও কমিয়ে দিয়েছে। এখন শুধু টেবিল-ল্যাম্প জ্বলছে। রনি অপেক্ষা করছে ইদরিস চাচা ঘরে ঢুকে কী করে সেটা দেখার জন্যে। তার নিজের বুক ধুকধুক করছে। খুব মজার কোনো ঘটনা ঘটবে তার জন্যে অপেক্ষা করলে বুক এরকম ধুকধুক করে।

এই তো দরজা খুলছে। ইদরিস চাচার হাত দেখা যাচ্ছে। রনি রকিং চেয়ারে দুলুনি সামান্য বাড়িয়ে দিল। রকিং চেয়ার থেকে ক্যাচক্যাচ শব্দ হচ্ছে। শব্দটাও যথেষ্ট ভৌতিক। রনির নিজেরই সামান্য ভয় ভয় লাগছে।

ইদরিস পিরিচে ঢাকা দেয়া দুধের গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। চিৎকার দিল না। দুধের গ্লাসও ফেলে দিল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর কিছু না বলে যেভাবে ঘরে ঢুকেছিল ঠিক সেভাবেই ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করল।

ইদরিস চাচা যে থপথপ শব্দ করে চলে যাচ্ছে এটাও রনি শুনল। তার সামান্য মন খারাপ হলো। আশ্চর্য কিছুই ঘটল না? ইদরিস চাচা একবার বলল না–কে? এইটা কে? রনি একটু মন খারাপ করেই তার সাজ বদলাল। বাথরুমে ঢুকে হাত-মুখে পানি দিল। দাঁত মাজল। ইদরিস ঢুকল তার সামান্য পরে। ইদরিসের হাতে দুধের গ্লাস নেই। তার মুখ পাংশু বর্ণ। কথাও কেমন জড়ানো।

কেমন আছেন ভাইজান?

ভালো।

একটু আগে আপনের ঘরে দুধ নিয়া ঢুকছিলাম।

ও। আমি আজ দুধ খাব না।

খাইতে না চাইলে খাইয়েন না। আচ্ছা ভাইজান, আমি যখন ঘরে ঢুকলাম, তখন আপনে কই ছিলেন?

বাথরুমে ছিলাম, মুখ ধুচ্ছিলাম।

ঘরে আর কেউ কি ছিল?

না, আর কে থাকবে?

তাও তো কথা, আর কে থাকবে? ভাইজান, কেউ ছিল না, ঠিক না?

অবশ্যই ঠিক। কেন কী হয়েছে?

কিছু হয় নাই। কিছুই হয় নাই।

ইদরিস চাচা, আপনি কি ভূত-টুত দেখেছেন?

ইদরিস হড়বড় করে বলল, না, না, ভূত দেখব কী? ভূত কি দুনিয়ায় আছে যে দেখব! তয় জ্বিন আছে। পাক কোরানে জ্বিনের কথা উল্লেখ আছে।

আপনি কি জ্বিন দেখছেন?

আরে না। জ্বিন দেখব কী জন্যে? কিছুই দেখি নাই। আল্লাহর কসম, বিশ্বাস করেন।

এত কসম কাটতে হবে না ইদরিস চাচা, আমি বিশ্বাস করেছি যে আপনি কিছু দেখেন নি।

রনি তার রকিং চেয়ারে বসতে যাচ্ছিল, ইদরিস অতি ব্যস্ত হয়ে বলল, ভাইজান না। এইখানে বইসেন না।

রনি বলল, বসব না কেন।

চেয়ারে বসার দরকার কী? শুইয়া ঘুম যান। আমি সারা রাইত জাগনা থাকব, আপনে শুইয়া ঘুম যান।

রনির খুবই মজা লাগছে। যদিও শুরুতে মনে হয়েছিল ইদরিস চাচা মোটেও ভয় পায় নি, এখন দেখা যাচ্ছে খুবই ভয় পেয়েছে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলছে।

ভাইজান গো!

কী?

আপনার পিতাজির কথা কি আপনার মনে আছে?

না।

তাঁর চেহারা মনে আছে?

না।

লাইব্রেরি ঘরে উনার ছবি আছে। সেই ছবি দেখেছেন না?

হুঁ।

আফনের চেহারার সাথে উনার চেহারার বড়ই মিল।

মিল থাকতেও পারে। আমি জানি না।

ইদরিস ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, উনার গায়ের রঙ ছিল মাশাল্লাহ দুধ সাদা। আপনের গায়ের রঙের মতো রং। মুখ ভর্তি ছিল জঙ্গুইল্যা দাড়ি। মাথাত ক্রিকেট ক্যাপ দিয়া যখন বাইর হইত–মাশাল্লাহ।

বাবা মাথায় ক্যাপ পরতেন?

হুঁ। ভাইজান যাই। ভয় খাইলে আমারে ডাক দিয়েন। বাতাসের অগ্রে দুইট্টা আসব।

শুধু শুধু ভয় পাব কেন?

অবশ্যই অবশ্যই ভয়ের কী, ভয়ের কিছু নাই।

ইদরিস ঘর থেকে বের হলো।

তাঁর হাঁটাচলাও মনে হয় এলোমেলো হয়ে গেছে, ঘর থেকে বের হবার সময় দরজায় ধাক্কা খেল।

ইদরিস লাইব্রেরি ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রনির বাবার ছবির সামনে। তার হাত-পা সামান্য কাঁপছে। ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। সে একশ ভাগ নিশ্চিত কিছুক্ষণ আগে এই মানুষটাকেই সে রনির ঘরে রকিং চেয়ারে বসে দোল খেতে দেখেছে। এতে কোনো সন্দেহ নাই। সেই দাড়ি, সেই মাথায় হ্যাট। গায়ে চাদর। বোঝাই যাচ্ছে, বাবা ছেলের বিপদ দেখে ছেলের টানে চলে এসেছে।

এখন সমস্যা হয়েছে এই ভৌতিক ঘটনা কি ইদরিস কাউকে বলবে, না নিজের ভেতর চেপে রাখবে? এত বড় ঘটনা পেটের ভেতর চেপে রাখলে সে পেট ফেঁপে মরেই যাবে। কাউকে বলতে গেলেও সমস্যা। কেউ বিশ্বাস করবে না। উল্টা তাকে পাগল ভাববে। কন্ধ কাটা ভূতের সঙ্গে কুস্তির ব্যাপারটাই কেউ বিশ্বাস করে না। এমনকি রনি ভাইজানও না। গল্প শুনে রনি ভাইজান বলেছে–কন্ধ কাটা ভূতের তো মাথাই নেই। যার মাথা নেই সে দাঁত দিয়ে কামড় দেবে কীভাবে? অত্যন্ত খাঁটি কথা, যুক্তির কথা। রনি ভাইজানের এই প্রশ্নের জবাব ইদরিস দিতে পারে নি। বাচ্চা ছেলে কিন্তু বুদ্ধি মাশাল্লাহ মারাত্মক। বাপের মতো বুদ্ধি কিংবা কে জানে বুদ্ধি বাপের চেয়ে

বেশিও হতে পারে।

ইদরিস টেনশন কমানোর জন্যে রান্নাঘরে ঢুকে পরপর দুকাপ চা এবং এককাপ কফি খেল। রনির বাবা (বর্তমান বাবা) ঘুমুবার আগে কড়া এককাপ কফি খান। কড়া কফি খেলে সবার ঘুম কাটে উনার নাকি ভালো ঘুম হয়। সেই কফি ইদরিস নিজেই নিয়ে যায়। আজো তাই হলো। ইদরিস কফি হাতে উপস্থিত হলো। মজিদ সাহেব বললেন, খবর সব ভালো?

ইদরিস বলল, জি।

রনি ঘুমিয়ে পড়েছে?

জানি না। বাতি নিভা।

বাতি নেভা থাকলেও খেয়াল রাখবে। এই বয়সের বাচ্চারা মাঝরাতে জেগে উঠে কম্পিউটারে গেমস খেলে।

জি আচ্ছা খেয়াল রাখব।

ইদরিসের চলে যাবার কথা। সে চলে গেল না। মজিদ সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে হাত কচলাতে লাগল। মজিদ সাহেব বললেন, কিছু বলবে ইদরিস?

ইদরিস নিচু গলায় বলল, জি।

বলো।

ইদরিস মাথা চুলকাতে লাগল। কিছু বলল না। মজিদ সাহেব অসহিষ্ণু গলায় বললেন, চুপ করে আছ কেন? কথা বলো। কিছু কি ঘটেছে?

জি ঘটেছে।

কী ঘটেছে?

বললে আপনে বিশ্বাস যাইবেন না। ভাববেন আমার মাথা খারাপ।

আমি কী ভাবব সেটা পরের ব্যাপার। তুমি ঘটনা বলো।

ইদরিস পুরো ঘটনা বলল। মজিদ সাহেব ভুরু কুঁচকে ফেললেন। তার মানে তিনি বিশ্বাস করছেন না। ইদরিস বলল, আপনে কোরান মজিদ আনেন, কোরান মজিদ চুঁইয়া বলব আমি যা বলেছি সবই সত্য।

তুমি দেখেছ রনির মৃত বাবা রকিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে?

জি।

তিনিও তোমাকে দেখলেন?

জি আমার দিকে তাকায়া হাসছেন।

শুধু হেসেছেন? কথা বলেন নি?

কথাও বলেছেন। (এখন ইদরিস কিছু মিথ্যা বলা শুরু করেছে। গল্প বলার সময় সামান্য কিছু মিথ্যা বলা যায়। এতে দোষ হয় না।

মজিদ সাহেব কঠিন গলায় বললেন, উনি তোমার সঙ্গে কী কথা বলেছেন?

উনি বলেছেন, ইদরিস ভালো আছ?

তুমি কী বললে?

আমি কিছু বলতে পারি নাই। আমার তখন জবান বন্ধ। (এই কথা সত্যি। ইদরিসের মুখের কথা আসলেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রথম মিথ্যার পর সত্যি বলায় দোষ কাটা গেল।

মজিদ সাহেব বললেন, তারপর কী হলো?

তখন আমার মাথা চক্কর দিয়া উঠল।

উনি আর কিছু বললেন না?

জি, শেষ একটা কথা বলেছেন।

শেষ কথাটা কী?

শেষ কথাটা হইল–ইদরিস আমার ছেলের দিকে লক্ষ রাখবা। তার যেন কিছু না হয়।

কথা এইটুকুই?

জি না, আরো আছে।

পুরো কথা শেষ কর।

উনার শেষ কথা ছিল, আমার ছেলের যদি কিছু হয়, তোমাদের খবর আছে। আমি শাস্তি দিব।

মজিদ সাহেব বললেন, তোমাদের মধ্যে যখন এত আলাপ-আলোচনা হচ্ছিল, তখন রনি কোথায় ছিল?

হাত মুখ ধুইতে ছিল।

তুমি কি এই ঘটনা নিয়ে রনির সঙ্গে আলাপ করেছ?

জি না।

যাক এই একটা কাজ ভালো করেছ। খবরদার! এই ঘটনা নিয়ে কারো সঙ্গেই কথা বলবে না।

জি আচ্ছা।

তোমার যা হয়েছে তার নাম মাথা গরম। এর বেশি কিছু না। বুঝেছ?

জি বুঝেছি।

এই বিষয় নিয়ে তুমি কারো সঙ্গেই কোনো কথা বলবে না। বাঙালির স্বভাব হলো, একজন ভুত দেখলে বাকিরাও ভূত দেখতে থাকে।

ইদরিস বলল, আমার জবান বন্ধ। আমি কারো সঙ্গেই কোনো কথা বলব না।

সবচেয়ে ভালো হয় যদি তুমি কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে দেশ থেকে ঘুরে আসো। এতে মাথা ঠাণ্ডা হবে।

জি আচ্ছা।

এখন সামনে থেকে যাও। যা বলেছি মনে রাখো, কারো সঙ্গে এই আলাপ করবে না।

ইদরিস বলল, আমি যদি এই আলাপ করি তাহলে কাঁচা গু খাই।

মজিদ সাহেব বললেন, কাঁচা গু পাকা গু কোনোটাই খেতে হবে না। ওই প্রসঙ্গে আলাপ না করলেই হলো।

[সেই রাতেই মজিদ আলাপটা করল বাবুর্চির সঙ্গে। তাকে কিরা কসম কাটালো সে যেন কাউকে না বলে। তার পরপরই আলাপ করল বাড়ির দুই ড্রাইভারের সঙ্গে। তাদেরকে আগে কিরা কসম কাটিয়ে নিল। সবার শেষে আলাপ করল বাড়ির দারোয়ানদের সঙ্গে। বাড়ির দুই দারোয়ানই বলল, এখানে যে ভৌতিক কিছু আছে তা তারা
হাঁটাহাঁটির শব্দ পাওয়া যায়। একজন
একবার রাত তিনটার সময় পরিষ্কার দে
দিয়ে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার মু
গায়ে টর্চের আলো ফেলতেই লোকটা মিটি]–[এই প্যারাতে একটু মিসিং আছে]

০৫. লুতপাইন আজ ক্লাসে এসেছে

লুতপাইন আজ ক্লাসে এসেছে। চারদিন ক্লাস মিস দিয়ে আজ এসেছে। নিশ্চয় কোনো অসুখ-বিসুখ হয়েছে। তাকে দেখাচ্ছেও ফ্যাকাশে। মাথায় স্কার্ফ বাঁধা। স্কার্ফ বাঁধার জন্যেই হয়তো বেশি রোগা রোগা লাগছে। লুতপাইন বারবার তাকাচ্ছে রনির দিকে কিন্তু রনি এমন ভাব করছে যে সে দেখতে পাচ্ছে না। লুতপাইন যে চারদিন স্কুলে আসে নি তাতেও রনির কিছু আসে যায় নি। এখন বৈশাখ মাস। অতিরিক্ত গরমে অনেকের অসুখ-বিসুখ হয়। লুতপাইনেরও হয়েছে। তাতে কিছু যায় আসে না।

লুতপাইন রনির দিকে ঝুঁকে এসে বলল, এই শোনো, আমার জ্বর আর গলা ব্যথা হয়েছিল।

রনি ভাব করল যেন সে শুনতে পায়নি। সে চেয়ার ছেড়ে মিসের কাছে গিয়ে বলল, মিস বাথরুমে যাব।

মিস বললেন, যাও।

এই মিস ভালো। রনি যদি অনেক দেরি করে ফিরে, তাহলেও তিনি কিছু বলবেন না। রনির আসলে বাথরুম পায়নি। লুতপাইনের কথা না শোনার জন্যেই সে বের হয়েছে। এই মেয়েটির ওপর আজ তার খুব রাগ লাগছে। মেয়েটির জন্যে সে সরি কার্ড লিখেছিল, মেয়েটি আসে নি বলে কার্ড দিতে পারে নি। কার্ডটা এখনো আছে। কিন্তু রনির আর দিতে ইচ্ছে করছে না। এলিয়েনদের ছবিটাও আছে। ছবিটা অবশ্যি দেয়া যায়।

রনি স্কুল করিডোরে হাঁটছে। তার বেশ মজা লাগছে। সব ছাত্রছাত্রী ক্লাসে বসে আছে। সে শুধু হেঁটে বেড়াচ্ছে। কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে সে একজন অদৃশ্য মানব। মাঝে মাঝে তার অদৃশ্য মানব হতে ইচ্ছা করে। অদৃশ্য মানব হবার কোনো মন্ত্র থাকলে ভালো হতো। এইচ জি ওয়েলস-এর ইনভিসিবল ম্যান বইটা আরেকবার পড়ে দেখতে হবে।

এই ছেলে। এই।

রনি থমকে দাঁড়াল। প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামের গলা। রনিদের স্কুলের সব ম্যাডামকেই আপা বলা যায় কিংবা মিস বলা যায়। শুধু প্রিন্সিপ্যালকে ম্যাডাম বলতে হয়। ইনি খুবই রাগী।

নাম কী তোমার?

রনি।

কোন ক্লাস?

ফোর্থ গ্রেড।

কোন গ্রুপ?

বি গ্রুপ।

বারান্দায় হাঁটছ কেন?

বাথরুমে যাচ্ছি ম্যাডাম।

বাথরুমে যাচ্ছ মানে? বাথরুম তো এদিকে না।

সরি, আমি ভুলে গেছি।

বাথরুম কোন দিকে ভুলে গেছ? এর মানে কী?

Is anything wrong with you?

No Madam.

এসো আমার ঘরে এসো।

রনি প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। তার ভয় লাগা উচিত কিন্তু কেন জানি মোটেই ভয় লাগছে না। বরং মজা লাগছে। মজা লাগার কারণ হচ্ছে, প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম রনির মিথ্যা কথাটা বিশ্বাস করেছেন। রনি যখন বলেছে, বাথরুম কোথায় আমি ভুলে গেছি, তখন প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম রাগ করার বদলে অবাক হয়ে তাকিয়েছেন। এই যে এখন ম্যাডাম তার সামনে বসে আছেন, ম্যাডামের চোখে কোনো রাগ নেই। তাঁর চোখ অবাক অবাক।

বাথরুম কোথায় তুমি ভুলে গেছ?

জি ম্যাডাম।

এখন কি মনে পড়েছে?

ইয়েস ম্যাডাম।

এরকম ভুল কি তোমার প্রায়ই হয়?

জি।

কী রকম ভুল হয় বলো তো?

ক্লাসের ছেলেমেয়েদের আমি মাঝে মাঝে চিনতে পারি না।

বুঝতে পারছি না। উদাহরণ দিয়ে বলো।

আমাদের ক্লাসে একটা মেয়ে আছে, তার নাম লুতপা, তাকে আমি মাঝে মাঝে চিনতে পারি না।

বলো কী! তুমি এই ব্যাপারটা তোমার বাবা-মাকে বলেছ?

না।

বলো নি কেন?

বাবা-মা তো আমার সঙ্গে থাকে না। কীভাবে বলব?

তারা কোথায় থাকেন?

তারা মারা গেছেন।

মাই গড! তুমি এসব কী বলছ? তোমার নাম কী? আবার বলো তো।

রনি।

ও আচ্ছা, তুমি সেই ছেলে। তোমাকে তো চিনি। দুদিন পর পর তোমাকে নিয়েই থানা পুলিশ নানা সমস্যা।

সরি ম্যাডাম।

তুমি সরি হচ্ছ কেন। সমস্যা তো তুমি কর নি। তুমি কি কিছু খাবে? কোক পেপসি সেভেন আপ?

কোক খাব।

আমার ফ্রিজেই কোকের একটা ক্যান থাকার কথা। দাঁড়াও তোমাকে দিচ্ছি। ক্লাসে বসে খেও না। টিফিন পিরিয়ড়ে খাবে।

ইয়েস ম্যাডাম।

যাও এখন ক্লাসে যাও।

রনি ক্লাসে ঢুকল। সে এত দেরি করেছে, তারপরেও মিস কিছুই বললেন না। তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন। সে যখন বসতে যাচ্ছে তখন লুতপাইন বলল, এতক্ষণ লাগল কেন?

রনি জবাব দিল না। লুতপাইন অকারণে কথা বলে, তার সব কথার জবাব দেবার কোনো দরকার নেই। বরং ম্যাডাম বোর্ডে কী লিখছেন সেটা দেখা অনেক দরকার।

লুতপাইন আবারো কথা বলল, এই তোমার কি শরীর খারাপ?

রনি সেই প্রশ্নেরও জবাব না দিয়ে টেবিলে তার খাতা খুলতে গিয়ে দেখে টেবিলের এক কোনায় একটা কার্ড। কার্ড খুলে দেখল সেখানে লেখা

Please forgive me
Lutopa

এটা একটা সরি কার্ড। রনি লুতপাইনকে দেবার জন্যে একটা সরি কার্ড ব্যাগে নিয়ে ঘুরছে আর উল্টা লুতপাইনই একটা সরি কার্ড দিয়েছে। তারটা দেয়া হয়নি। রনি বলল, তুমি সরি কার্ড দিয়েছ কেন?

লুতপাইন বলল, আমি যে সবসময় তোমাকে বিরক্ত করি এই জন্যে।

রনি বলল, তুমি সবসময় আমাকে বিরক্ত কর কেন?

লুতপাইন খুব সহজ গলায় বলল, Mity be আমি তোমাকে Love করি এইজন্যে।

রনির খুবই মেজাজ খারাপ হলো। মেয়েটা কী অসভ্য কথাই না বলছে। মিসের কাছে নালিশ করে দিলে কেমন হয়?

রনি ফিসফিস করে বলল, এইসব অসভ্য কথা আমাকে বলবে না। এইসব খুব খারাপ কথা।

লুতপাইন বলল, Love করা খারাপ?

হ্যাঁ খারাপ, এইসব বড়দের ব্যাপার।

আমি যখন বড় হব তখন তোমাকে Love করতে পারব?

আমার সঙ্গে আর কথা বলবে না। প্লিজ।

লুতপাইন ফিসফিস করে বলল, বড় হয়ে আমি কী করব জানো? বড় হয়ে আমি তোমাকে বিয়ে করব।

রনি একদৃষ্টিতে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন ভাব করছে যে সে লুতপাইনের কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না।

লুতপাইন বলল, আমি বাবাকে বলেছি যে বড় হয়ে তোমাকে বিয়ে করব। বাবা বলেছেন, Ok.

রনি কঠিন গলায় বলল, চুপ।

মিস তখন রনির দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যালো রনি, তুমি দেখি ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছ। ক্লাসের সময় কথা বলা ঠিক না রনি।

রনি বলল, সরি মিস।

মিস লুতপাইনকে কিছুই বলেন নি, তারপরেও লুতপাইন দাঁড়িয়ে অবিকল রনির মতো বলল, সরি মিস।

ক্লাসের সবাই হেসে ফেলল। এমনকি মিস নিজেও হাসলেন।

টিফিন টাইমটা রনির খুব খারাপ কাটে। তখন তার প্রধান চেষ্টা থাকে লুতপাইনের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা। সেটা কখনো সম্ভব হয় না। লুতপাইন খুঁজে খুঁজে বের করে ফেলে। আজ রনি ঠিক করেছে সে এমনভাবে লুকিয়ে থাকবে যেন লুতপাইন কিছুতেই তাকে খুঁজে না পায়। টিফিনের ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রনি বইয়ের ব্যাগ নিয়ে ছুটে বের হয়ে গেল।

চট করে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। যা ভাবছে তাই। লুতপাইন তার দিকে তাকিয়ে দ্রুত ব্যাগ গোছাচ্ছে। কী সর্বনাশ!

স্কুল কম্পাউন্ডে থাকা যাবে না। যেখানেই যাবে লুতপাইন তাকে খুঁজে বের করবে। স্কুল কম্পাউন্ডের বাইরে চলে যেতে হবে। দারোয়ান সেটা করতে দেবে না। গেটে আটকাবে। দারোয়ানকে বলতে হবে গেটের বাইরে আমার গাড়ি আছে, গাড়িতে আমার স্কেল। আমি স্কেল আনব। দারোয়ান রনির ড্রাইভারকে চেনে। রনি দেখেছে এই দুজন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে চা খাচ্ছে। কাজেই দারোয়ান তাকে ছেড়ে দেবে। সে করবে কী টিফিনের সময়টা গাড়িতে বসে থাকবে। টিফিন পিরিয়ড শেষ হলে স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকবে। একটা সমস্যা অবশ্যি থেকেই যায়–লুতপাইন তাকে খুঁজে না পেয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতে পারে। এই মেয়ের যা বুদ্ধি!

রনি কোনো ঝামেলা ছাড়াই স্কুল কম্পাউন্ডের বাইরে চলে এল। গাড়ির কাছে গেল। ড্রাইভার গাড়ির আশপাশে নেই। গাড়ি তালা মেরে কোথায় যেন গেছে। রনিদের গাড়ির পাশে ভক্সওয়াগান গাড়িটাও আছে। এই গাড়ির ড্রাইভার নেই। ড্রাইভারের সঙ্গীও নেই। সবাই দল বেঁধে কোথাও আড্ডা দিতে গেছে বলে মনে হয়। দুই গাড়ির দুই ড্রাইভার একজন আরেকজনের শত্রু হবার কথা। কিন্তু তাদের মধ্যেও খুব খাতির। তারা একসঙ্গে চা খায়। সিগারেট টানে।

হ্যালো রনি।

রনি তাকিয়ে দেখে হাব্বত আলি রিকশায় বসে আছেন। রিকশা রনির দিকেই আসছে।

রনি আছ কেমন?

ভালো আছি।

বেড়াতে যাবে নাকি?

আমার ক্লাস আছে।

ছাত্রজীবনে এক আধবার স্কুল না পালালে স্কুল-জীবন সম্পূর্ণ হয় না। তাছাড়া আজকে টিফিনের পর তোমার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসও নেই। গেমস, লাইব্রেরি, মিউজিক। এই তিনটাই তো–তাই না?

আপনি কী করে জানলেন?

একদিন গিয়েছিলাম না তোমাদের স্কুলে? রুটিন ঘেঁটে দেখলাম। তুমি কি উঠবে রিকশায়?

রনি কিছু না বলে রিকশায় উঠে পড়ল। মন ঠিক আছে রনি? ঠিক আছে।

ঘোঁৎ চিকিৎসা লাগবে না?

না। আমরা কোথায় যাচ্ছি?

হাব্বত আলি বললেন, হাসপাতালে গেলে কেমন হয়? তোমাদের নাজমা মিস আছেন। তাকে দেখে এলাম। যাবে?

রনি আগ্রহের সঙ্গে বলল, যাব।

হাব্বত আলি বললেন, উনার অবস্থা ভালো না, তবে এখনো বেঁচে আছেন। দেশের বাইরে নিতে পারলে ভালো হতো।

দেশের বাইরে নিচ্ছে না কেন?

বললেই তো নেয়া যায় না। টাকা লাগে রে বাবা, টাকা। টাকা উল্টালে কী হয় জানো? টাকা উল্টালে হয় কাটা। একটা চন্দ্রবিন্দু যোগ করলে কাটা হয়ে যায় কাঁটা। কাঁটা মানে কন্টক।

রনি বলল, এইসব কী হাবিজাবি বলছেন?

হাব্বত আলি নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, জগতটাই হাবিজাবি। বলেই সুর করে প্রায় গানের মতো গাইলেন–

ওপরে কন্টক দাও
নিচেতে কন্টক
ডালকুত্তাদের মাঝে করহ বন্টক।

রনি বলল, এই ছড়াটার মানে কী?

হাব্বত আলি বললেন, কোনো মানে নেই। চোখ বন্ধ কর। এখন আমরা কিছুক্ষণ শূণ্য ভ্রমণ করব। রনি সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলল, বাহ্ সত্যি সত্যিই মনে হচ্ছে সে শূন্যে ভেসে যাচ্ছে। প্রথম দিনের চেয়েও আজকের শূন্যে ভাসাটা অনেক বেশি মজার হচ্ছে। এই মজার ব্যাপারটা লুতপাইনকে বললে হতো। সেও মজা পেত। লুতপাইনের কথা ভেবে হঠাৎ তার কেন জানি একটু খারাপ লাগল।

হাব্বত আলি বললেন, মন খারাপ কেন রে ব্যাটা?

রনি বলল, মন খারাপ না। আপনি আমাকে ব্যাটা বললেন কেন?

আদর করে বললাম।

আমার বাবা আমাকে ব্যাটা ডাকত।

কী ডাকত তোমার তো মনে থাকার কথা না।

মনে আছে।

ব্যাটা উল্টা করলে কী হয় জানো? ব্যাটা উল্টো করলে হয় টাবে। হাব্বত আলি সুর করে বললেন,

টাবে টাবে
দুটা ভাত খাবে?

আপনি এত হাবিজাবি কথা বলেন কেন?

বিরক্তি লাগছে?

লাগছে।

বিরক্তি কাটাবার একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দেব?

দিন শিখিয়ে।

আজ না।

আজ না কেন?

আমরা হাসপাতালে চলে এসেছি। এইজন্যে আজ না।

রনি এই প্রথম কোনো হাসপাতালে ঢুকেছে। হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বলে একটা জায়গা। সেখানে মরণাপন্ন সব রোগীকে রাখা হয়েছে। নাকে নল, মুখে নল। নাজমা ম্যাডামের পুরো শরীরটা ব্যান্ডেজ করা, মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখে ব্যান্ডেজ, শুধু চোখ দুটা খোলা। সেই চোখ বন্ধ।

রনির শরীর কাঁপতে লাগল। কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! সে শক্ত করে হাত আলির হাত ধরে বলল, বাসায় যাব।

হাব্বত আলি বললেন, অবশ্যই বাসায় যাবে। তবে তুমি যে মিসকে দেখতে এসেছ, এটা তাকে জানিয়ে গেলে তিনি হয়তো খুশি হবেন। মিসের কাছে গিয়ে বলো, মিস আমি রনি।

ভয় লাগছে।

ভয় লাগার কিছু নেই, বলো।

রনি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, মিস আমি এসেছি।

নাজমা মিস সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেললেন। একটু মাথা কাত করে রনিকে দেখলেন। তার ঠোঁটের কোণায় সামান্য হাসির আভাস দেখা গেল।

রনির কী যে খারাপ লাগল! সে বুঝতে পারছে তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। সে চায় না মিস তার চোখের পানি দেখেন। কিন্তু চোখের পানি সে আটকাতে পারছে না। হাব্বত আলি সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে উনি চোখের পানি আটকাবার কোনো কৌশল জানেন কি-না। জানার তো কথা। উনার যা বুদ্ধি।

রিকশায় ফেরার পথে রনি মন খারাপ করে থাকল। হাব্বত আলি বললেন, রনি, আমি কিন্তু আজ তোমাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারব না।

রনি বলল, কেন পারবেন না?

কারণ তোমাদের বাসায় হুলস্থুল পড়ে গেছে। পুলিশে খবর দেয়া হয়েছে। আমি যদি তোমাকে নামিয়ে দেই, পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে আমাকে হাজতে ঢুকিয়ে দেবে।

হাজত কী?

পুলিশ অপরাধীদের ধরে প্রথমে যেখানে রাখে তার নাম হাজত।

ভয়ঙ্কর?

খুবই ভয়ঙ্কর। হাজত হলো হাবিয়া দোজখের খালাতো ভাই।

হাবিয়া দোজখ কী?

দোজখের ইংরেজি হচ্ছে Hell এবং হাজত হচ্ছে হাবিয়া দোজখের First Cousin, এখন বুঝেছি?

হুঁ।

আমি রিকশাওয়ালাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছি। সে তোমাকে ঠিক তোমাদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দেবে। ঠিক আছে?

হ্যাঁ ঠিক আছে।

একা যেতে ভয় পাবে না তো?

ভয় পাব।

পরের বার যখন তোমার সঙ্গে দেখা হবে, তখন ভয় দূর করার কৌশল শিখিয়ে দেব। ঠিক আছে?

জি ঠিক আছে।

কয়েকবার ঘোঁৎ বলে দেখতে পার। ঘোঁৎ বললেও ভয় কাটার কথা।

হাব্বত আলি রিকশা থেকে নামলেন। রিকশাওয়ালাকে ঠিকানা বুঝিয়ে ভাড়া দিয়ে দিলেন। রনিকে বললেন, তোমাকে একটা ললিপপ কিনে দেই। ললিপপ খেতে খেতে যাও।

রনি বলল, দিন।

হাব্বত আলি রনিকে সবুজ রঙের একটা ললিপপ কিনে দিলেন। রনি বলল, থ্যাংকস।

হাব্বত আলি বললেন, সবুজ রঙটা দেখে একটা কথা মনে পড়েছে। তোমার মিসকে যে গাড়িটা ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গেছে সেটার রঙ ছিল সবুজ। তোমাদের বাসায় তো অনেকগুলি গাড়ি–সবুজ রঙের কোনো গাড়ি কি আছে?

রনি বলল, না।

রিকশা চলতে শুরু করেছে। হাব্বত আলি রোদে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন।

০৬. রনির বাবা মজিদ সাহেব

রনির বাবা মজিদ সাহেব রনিকে নিয়ে লাইব্রেরি ঘরে বসেছেন। তাঁর মুখ গম্ভীর। তিনি একটু পর পর আঙুল দিয়ে তার কপাল টিপে ধরছেন। রনির ধারণা তাঁর প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। মাথা ব্যথা হলেই মানুষ এইভাবে টিপে।

রনি!

জি।

পুলিশ অফিসার আফসারউদ্দিন সাহেব এসেছেন। তিনি তোমার সঙ্গে আলাদা বসবেন। তার আগে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব। প্রতিটি প্রশ্নের ঠিক জবাব দেবে।

জি।

টিফিন টাইমে তুমি আজ স্কুল থেকে পালিয়ে গেছ? পা

লিয়ে যাই নি। উনার সঙ্গে গেছি।

আগে যে লোক তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল সেই লোক?

রনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, না, অন্য একজন।

অন্য একজন মানে? কী বলো এইসব! লোকটা দেখতে কেমন?

উনার গায়ের রঙ খুব ফর্সা। মাথায় ক্রিকেটারদের মতো ক্যাপ। গায়ে লাল চাদর।

মজিদ সাহেবের মুখ হা হয়ে গেল। তিনি নড়েচড়ে বসলেন। এদিকওদিক তাকালেন। রনি স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার এই মিথ্যা কথা উনাকে কাবু করে ফেলেছে। রনি ঠিক করল, এই মিথ্যাই সে চালিয়ে যাবে।

লোকটা তার কোনো পরিচয় তোমাকে দিয়েছে?

না।

পুরো ঘটনা বলো। কীভাবে তুমি স্কুল থেকে বের হলে? কীভাবে তার সঙ্গে চলে গেলে? কোনো ডিটেল বাদ দেবে না। এইভাবে পা দুলিও না। পা দোলালে আমার কনসেনট্রেসন কেটে যায়। এখন বলো।

কী বলব?

কীভাবে তুমি লোকটার সঙ্গে গেলে?

উনি রিকশা নিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, এই ব্যাটা উঠে আয়। আমি রিকশায় উঠে গেলাম।

তোমাকে ব্যাটা বলল?

জি।

আর তুমি সঙ্গে সঙ্গে রিকশায় উঠে গেলে?

জি।

উনাকে আমার খুবই পরিচিত মনে হচ্ছিল তো এইজন্যে।

পরিচিত মনে হচ্ছিল?

জি।

তোমরা কী করলে?

আমরা অনেকক্ষণ রিকশায় করে ঘুরলাম। উনি আমাকে ললিপপ কিনে দিলেন। ললিপপ খেলাম। উনি ছড়া বললেন।

কী ছড়া বললেন?

উনি বললেন–টাবে টাবে, দুটা ভাত খাবে।

আবার বলো।

টাবে টাবে
দুটা ভাত খাবে।

তারপর কী হলো?

আমরা নাজমা মিসকে দেখতে হাসপাতালে গেলাম।

নাজমা মিসটা কে?

আমাদের একজন মিস। সবুজ রঙের একটা গাড়ি উনাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। উনি খুবই অসুস্থ। হাসপাতালে আছেন।

লোকটা তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল?

জি।

কেন?

একটু আগেই তো বলেছি–নাজমা মিসকে দেখতে নিয়ে গেলেন।

সে তোমাকে বাসায় না নামিয়ে চলে গেল কেন?

সেটা তো আমি জানি না।

তুমি রিকশা করে একা একা এসেছ?

জি।

ভয় পাও নি?

একটু একটু ভয় পাচ্ছিলাম। তবে উনি আমাকে ভয় না পাবার একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছিলেন। মন্ত্রটা মনে মনে পড়লে ভয় কেটে যায়।

কী মন্ত্র? ঘোঁৎ মন্ত্র। আবার বলো, কী মন্ত্র? ঘোঁৎ মন্ত্র।

আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে আর প্রশ্ন করব না। পুলিশ ইন্সপেক্টর আফসারউদ্দিন সাহেব তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। তার আগে হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা খাও। আফসার সাহেবকে আমি তোমার ঘরে পাঠিয়ে দেব।

আচ্ছা।

রনি লাইব্রেরি ঘর থেকে চলে যাচ্ছে, মজিদ সাহেব একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁকে অসম্ভব চিন্তিত মনে হচ্ছে। চিন্তার প্রধান কারণ রনি যে ছড়াটা বলল সেই ছড়া। এই ছড়া রনির আসল বাবা বলতেন। রনিকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে বলতেন–টাবে টাবে দুটা ভাত খাবে। রনির এই ছড়া মনে থাকার কোনো কারণ নেই। তাহলে ব্যাপারটা কী? ভৌতিক কোনো ব্যাপার অবশ্যই না। তিনি মনে করেন না–রনির মৃত বাবা রনিকে নিয়ে রিকশায় ঘুরছেন। তবে কিছু একটা ঘটছে। সেই কিছুটা কী?

রনিকে নাশতা দেবার সময় ইদরিস মিয়া গলা নিচু করে বলল, আফনেরে রিকশায় নিয়া যে ঘুরছে সে কে জানেন?

রনি বলল, না।

কাউরে যদি না বলেন তাইলে বলতে পারি।

আমি কাউরে বলব না।

আল্লাহর নামে কসম কাটেন। বলেন, আল্লাহর কসম, কাউরে বলব না।

আল্লাহর কসম, কাউরে বলব না।

আফনেরে রিকশায় নিয়া ঘুরছে আফনের আসল পিতা।

উনি তো মারা গেছেন।

ঘটনা তো ঐখানেই। বড়ই জটিল ঘটনা।

মৃত মানুষ কি ফিরে আসতে পারে?

ক্ষেত্র বিশেষে পারে ভাইজান। ক্ষেত্র বিশেষে পারে। আমি একদিন বড় সাহেবরে আপনের ঘরে দেখেছি। চেয়ারে বইসা দোল খাইতেছেন।

সত্যি?

যদি মিথ্যা বলি আমার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়। বড় সাহেবের সঙ্গে আমার কথাবার্তাও হইছে।

কী কথা হইছে?

আমারে জিজ্ঞাসা করেছেন–ইদরিস মিয়া, আছ কেমন? আরো অনেক আলাপ হইছে, সেইসব আপনেরে বলা যাবে না। খুবই জটিল অবস্থা ভাইজান। খুবই জটিল অবস্থা। বাড়িতে পুলিশ আনা হইছে–সিআইডি, ডিআইবি কোনো লাভ নাই।

লাভ নাই কেন?

এইটা এখন পুলিশের বিষয় নাই। অন্য বিষয় হইয়া গেছে। মুনশি মওলানা কিছু করলেও করতে পারে। দেখি আপনের জন্যে কোনো তাবিজ কবচের ব্যবস্থা নিতে পারি কি-না। তাড়াতাড়ি নাশতা শেষ করেন। আপনের ঘরে পুলিশের অফিসার বসা।

আফসারউদ্দিন সাহেব রনির ঘরে ঢুকে খুবই মজা পাচ্ছেন। আগ্রহ নিয়ে রনির খেলনা দেখছেন। একটি খেলনা তাঁর মন হরণ করেছে। কাচের একটা পাখি তার সামনে রাখা বাটিতে চুমুক দিয়ে পানি খেয়েই যাচ্ছে। পাখির তৃষ্ণা দূর হচ্ছে না।

তিনি রনিকে জিজ্ঞেস করলেন, এই খেলনাটা কি ব্যাটারিতে চলে?

রনি বলল, না।

আফসারউদ্দিন বললেন, ব্যাটারি ছাড়া এটা কীভাবে হচ্ছে?

রনি বলল, আপনি তো ডিটেকটিভ। আপনি বের করুন।

সায়েন্সের ব্যাপার তো বুঝতে পারছি না। জিনিসটা খুবই ইন্টারেস্টিং।

পাখিটার পানি খাওয়া বন্ধ করার কোনো উপায় আছে?

হাত দিয়ে ধরলে পানি খাওয়া বন্ধ হবে। ছেড়ে দিলে আবার পানি খাওয়া শুরু করবে।

আফসারউদ্দিন এসেছেন রনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। এখন তার কাজ হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর হাত দিয়ে ধরে পাখির পানি খাওয়া বন্ধ করা, আবার হাত ছেড়ে দিয়ে পানি খাওয়ানো শুরু করা। রনি রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে ভদ্রলোকের কাণ্ড দেখছে এবং বেশ মজা পাচ্ছে। কোনো বয়স্ক মানুষকে সে বাচ্চাদের খেলনা নিয়ে এভাবে খেলতে দেখে নি।

রনি বলল, আপনার একটা জিনিস কিন্তু আমার কাছে আছে।

আফসারউদ্দিন বললেন, কী জিনিস?

আপনার নকল দাড়ি। আজ যাবার সময় নিয়ে যাবেন।

আমার নকল দাড়ি তোমার কাছে গেল কীভাবে?

আপনি চিন্তা করে বের করুন কীভাবে আমার কাছে গিয়েছে। আপনি ডিটেকটিভ মানুষ। ডিটেকটিভদের অনেক বুদ্ধি হয়। ফেলুদার অনেক বুদ্ধি?

ফেলুদা কে?

ফেলুদা কে আপনি জানেন না?

না তো।

খুব নাম করা ডিটেকটিভ।

জানি না তো।

ফেলুদার খুবই বুদ্ধি। যত বড় ক্রিমিনাল হোক ফেলুদার হাতে ধরা পড়বেই। আপনি না এসে আমার কাছে যদি ফেলুদা আসতেন, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলতে পারতেন কোন সবুজ গাড়িটা নাজমা ম্যাডামের রিকশাকে ধাক্কা দিয়েছে। উনি সঙ্গে সঙ্গে সবুজ গাড়ি ড্রাইভারকে অ্যারেস্ট করে ফেলতেন।

আফসারউদ্দিন অবাক হয়ে বললেন, সবুজ গাড়ির ব্যাপারটা কী? এখানে সবুজ গাড়ি কোত্থেকে এল?

রনি বলল, সেটা আমি আপনাকে বলব না। আপনি খুঁজে বের করুন।

আর শুনুন, পাখির এই খেলনাটা আপনি নিয়ে যান। এটা আমি আপনাকে দিলাম। উপহার।

আরে না, তোমার খেলনা আমি কেন নেব? কী বলো তুমি!

আপনাকে এই খেলনাটা নিতেই হবে। আপনি যদি না নেন, আমি আপনার সঙ্গে কোনো কথাই বলব না।

আশ্চর্য ছেলে তো!

আমি মোটেই আশ্চর্য ছেলে না। আমি আমার বাবার মতো হয়েছি।

তোমার বাবা কি সবাইকে খেলনা দিয়ে বেড়াতেন?

বাবার কোনো জিনিস দেখে কেউ যদি বলতো–সুন্দর! বাবা তাকে সঙ্গে সঙ্গে সেই জিনিস উপহার হিসেবে দিয়ে দিতেন। ইদরিস চাচা আমাকে বলেছেন।

খোকা শোনো, তুমি খুবই ভালো ছেলে, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। তোমার খেলনা আমি নেব না। আমার যখন খেলনাটা দেখতে ইচ্ছা করবে, তখন এসে দেখে যাব। এখন আমার প্রশ্নের জবাব দাও।

প্রশ্নের জবাব দিতে আমার ভালো লাগে না।

ভালো লাগে না এমন অনেক কাজ আমাদের কিন্তু করতে হয়। তোমার দুধ খেতে ভালো লাগে না, তোমাকে কিন্তু দুধ খেতে হয়। তাই না?

হ্যাঁ।

যা প্রশ্ন করি সত্যি জবাব দিও। তুমি তো প্রচুর মিথ্যা বলো।

মিথ্যা বলি?

অবশ্যই। আজ যে লোকটার কথা বললে, মাথায় ক্রিকেটারদের হ্যাট, তার গায়ে লাল চাদর, সবই মিথ্যা। তোমাকে ছড়া বলেছে–টাবে টাবে দুটা ভাত খাবে। এই ছড়ার ব্যাপারটা তুমি জানো। ইদরিস মিয়া তোমার বাবার বিষয়ে গল্প করার সময় এই ছড়ার কথা বলেছে। লোকটার বর্ণনাও তুমি ইদরিসের কথা অনুযায়ী করেছ। যাতে সবাই মনে করে তুমি তোমার বাবাকেই রিকশায় দেখেছ। তুমি তোমার বাবাকে নিয়ে একধরনের রহস্য তৈরি করার চেষ্টা করছ।

রনি রকিং চেয়ারে দুলুনি বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। এখন তার কাছে মনে হচ্ছে লোকটার বুদ্ধি ফেলুদার মতো না হলেও খুব কমও না।

রনি।

জি।

ইদরিস মিয়া যে বলে তোমার ঘরে সে তোমার বাবাকে দেখেছে তা কি তুমি জানো?

জানি।

সে কী দেখেছে সেটা জানো?

কী দেখেছে?

সে তোমাকেই দেখেছে। তুমি আমার নকল দাড়ি পরে চাদর গায়ে এখন যেভাবে দোল খাচ্ছ সেইভাবে দোল খাচ্ছিলে। ভালো কথা, লাল চাদরটা কোথায়?

রনি বলল, কাবার্ডে আছে।

আফসারউদ্দিন বললেন, আমার ধারণা একই লোক তোমাকে রিকশায় করে দুবার ঘুরেছে। লোকটার নাম বলো।

নাম জানি না।

তার উদ্দেশ্যটা কী তুমি কি জানো?

না।

উদ্দেশ্য খারাপ না এইটুকু বোঝা যাচ্ছে। লোকটা একটা খেলা খেলার চেষ্টা করছে। সে তার খেলাতে তোমাকে নিয়ে নিয়েছে। তুমি নিজেও খেলছ। কেন খেলছ তুমি জানো না।

রনি বলল, আপনার বুদ্ধি ফেলুদার মতোই।

আফসারউদ্দিন ভুরু কুঁচকে বললেন, ফেলুদা ব্যাপারটা কী আমাকে বুঝিয়ে বলো তো।

রনি বলল, আপনাকে একটা বই দিয়ে দেব। বইটার নাম গ্যাংটকে গণ্ডগোল, বইটা পড়লেই আপনি বুঝবেন।

বইটা কি এখন দেবে?

হ্যাঁ।

বেশ তাহলে দাও আমি চলে যাই।

আর প্রশ্ন করবেন না?

না, বেশি প্রশ্ন করতে আমার ভালো লাগে না।

আফসারউদ্দিন আবারো পাখিটা নিয়ে খেলতে শুরু করলেন। রনি এসে তার পাশে দাঁড়াল। আফসারউদ্দিন লজ্জিত মুখে বললেন, পাখির পানি খাওয়ার বিষয়টা বুঝতে পারছি না বলে এটা নিয়ে খেলে যাচ্ছি। কোনো জিনিস না বুঝতে পারলে আমার অস্থির লাগে। তোমার ব্যাপারটাও বুঝতে পারছি না বলে অস্থির লাগছে।

রনি বলল, শুরুতে আমি ভেবেছিলাম আপনি ভালো ডিটেকটিভ না, এখন মনে হচ্ছে ভালো ডিটেকটিভ।

আফসারউদ্দিন বললেন, আমি যে ভালো ডিটেকটিভ তার প্রমাণ দেব? তুমি যে লোকটির সঙ্গে রিকশায় করে ঘুরেছ, তার নাম তুমি জানো, তাকে তুমি চেনো। মিথ্যা করে বলেছ তাকে তুমি চেনো না। লোকটার নাম হাব্বত আলি। এই বাড়িতে আগে এসেছিল।

আপনি কীভাবে বুঝলেন তার নাম হাব্বত আলি?

তুমি একটা বুদ্ধিমান ছেলে। বুদ্ধিমান ছেলে নিতান্তই অপরিচিত কারো সঙ্গে রিকশায় উঠবে না। হাব্বত আলি তোমার পরিচিত। প্রথম দিনেই তাকে তুমি পছন্দ করেছিলে। আমি তোমাদের বাড়ির বুয়া এবং ইদরিস মিয়ার কাছে শুনেছি, তুমি অনেকক্ষণ তার সঙ্গে গল্প করেছ। তুমি যে রিকশায় আজ তোমাদের বাড়িতে এসেছ, সেই রিকশাওয়ালার সঙ্গে আমি কথা বলেছি। সে লোকটার যে বর্ণনা দিয়েছে সেই বর্ণনা শুনেছি। এখন বুঝতে পারছ?

হুঁ।

এরপরেও কি তুমি আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবে?

না।

ভেরি গুড। এখন বইটা দাও চলে যাই।

আফসারউদ্দিন বই নিয়ে চলে গেলেন।

রাতে ঘুমুতে যাবার আগে আগে রনিকে টেলিফোন করল লুতপাইন। তার গলা ভারি। গলাটা শোনাচ্ছে অন্যরকম। মনে হচ্ছে একটা ছেলে কথা বলছে। রনি বলল, কে?

আমি লুতপা।

তোমার গলা এরকম শোনাচ্ছে কেন?

আমার জ্বর এসেছে। জুর এলে আমার গলা অন্যরকম হয়ে যায়। কাল আমি স্কুলে যাব না।

স্কুলে না যেতে পারলে যাবে না। আমাকে বলছ কেন?

তুমি স্কুলে গিয়ে যখন দেখবে আমি নেই তখন তোমার খারাপ লাগবে, এইজন্যে তোমাকে আগেই বলছি।

আমার খারাপ লাগবে কেন?

কারণ তোমার সঙ্গে আমার Love হয়েছে এইজন্যে।

তুমি এরকম অসভ্য কথা আর কখনো আমাকে বলবে না।

আচ্ছা বলব না।

আর আমাকে কখনো টেলিফোন করবে না।

আচ্ছা করব না।

আমার কাছে কখনো ছবিও চাইবে না। তোমাকে আমি আর কোনো ছবি একে দেব না।

যেগুলি দিয়েছ সেগুলি কি ফেরত নিয়ে যাবে?

নিতেও পারি।

প্লিজ ফেরত নিও না।

তুমি যদি আমাকে আর টেলিফোন না কর তাহলে ফেরত নেব না।

আর টেলিফোন করব না।

প্রমিজ?

লুতপা বলল, প্রমিজ। বলতে বলতেই তার কান্না পেয়ে গেল। সে কেঁদে ফেলল। তবে কোনো শব্দ করল না। তারপরেও কী করে যেন রনি ব্যাপারটা বুঝে গেল। সে গম্ভীর হয়ে বলল, কাঁদছ কেন?

লুতপাইন ফেঁপাতে ফেঁপাতে বলল, আমার জ্বর এসেছে। মাথা ব্যথা করছে এইজন্যে কাঁদছি।

রনি খট করে টেলিফোন নামিয়ে রাখল।

০৭. লুতপাইন ক্লাসে আসে নি

লুতপাইন ক্লাসে আসে নি। রনির পাশের চেয়ারটা খালি। রনির মনে হলো, ক্লাসে আজকের দিনটা তার ভালো যাবে। কেউ তাকে বিরক্ত করবে না। একটু পর পর বলবো না, এই কী করছ? ছবি আঁকছু না-কি? একটু দেখি? এই ছবিটা আমাকে দেবে? ছবি না এঁকে সে যদি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতো তাহলে বলতো, এই জানালা দিয়ে কী দেখছ? মেয়েটা যে কী কথা বলতে পারে! কেউ যদি মেয়েটার ঠোঁটে একটা স্কচ টেপ লাগিয়ে দিত।

আজ সোমবার। প্রথম পিরিয়ড অংক। অংক মিস (অংক মিসের নাম শাহানা। উনি খুব ভালো অংক জানেন এবং ক্লাসে অনেক মজা করেন। এসেই বোর্ডে একগাদা ডেসিমেলের অংক দিয়ে দিলেন। হাসি হাসি মুখ করে বললেন, পাচটা অংক দিয়েছি। যে সবার আগে পাঁচটা অংক করে আমার কাছে জমা দিতে পারবে, তার জন্যে প্রাইজ আছে। রনির ঠিক সামনের সিটে বসে মিঠু। সবাই তাকে ডাকে মোটা-মিঠু। মোটা-মিঠু অংক, ইংরেজি কোনো কিছুই পারে না; কিন্তু খুব প্রশ্ন করতে পারে। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কী প্রাইজ মিস?

অংক শেষ কর, তারপর দেখবে কী প্রাইজ।

প্রাইজ কি আজই দেয়া হবে?

হ্যাঁ, আজই দেয়া হবে।

শুধু একটাই প্রাইজ? সেকেন্ড প্রাইজ, থার্ড প্রাইজ নেই?

মিঠু, তুমি বসো তো।

মিঠু বসল এবং পেন্সিল কামড়াতে লাগল। পেন্সিল কামড়ানোর কাজটা মিঠু খুব ভালো পারে। রনি জানে ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে যাবে, মিঠু পেন্সিল কামড়াতেই থাকবে। একটা অংকও করতে পারবে না! অংক মিস একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন–Four plus point five কত? মোটা-মিঠু বলেছিল–Five. লুতপাইন থাকলে কী করত? সেও পেন্সিল কামড়াতে, তবে সব অংক শেষ করে তারপর। মেয়েটার অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সব অংক শেষ হলেও সে কখনো হাত তুলে বলবে না মিস আমি অংক সবগুলি করে ফেলেছি। তার নাকি ম্যাডামদের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না।

শাহানা মিস বললেন, কী ব্যাপার, আজ কি নুতপা আসে নি? তিনি বিশেষ কাউকে প্রশ্ন করেন নি, কিন্তু যথারীতি জবাব দিল মিঠু। মিস, লুতপা আজ আসেনি। সে গত সোমবারেও আসেনি।

মিস বললেন, লুতপা না এলে তো অংকের হজ কেউ পাবে না।

রনির মনে হলো মিসের কথা খুবই সত্যি। লুতপা থাকলে এতক্ষণে সব অংক শেষ করে সে পেন্সিল কামড়াতে কামড়াতে রনির সঙ্গে গল্প করার চেষ্টা করত।

মোটা মিঠু বলল, মিস আপনি কি প্রাইজটা টেবিলের উপর রাখবেন?

তাহলে প্রাইজটা দেখে দেখে আমরা অংক করতাম।

মিস তার হ্যান্ডব্যাগ খুলে গিফট র্যাপে মোড়া একটা প্যাকেট টেবিলে রাখলেন। প্যাকেটের সাইজ দেখে রনির কাছে মনে হচ্ছে চকলেট। লুতপা চকলেট পেলে খুবই খুশি হতো। মেয়েটা এমন চকলেট খেতে পারে! তার ব্যাগে সবসময় চকলেট থাকে।

পাঁচটা অংকের ভেতর রনি চারটা করে ফেলেছে, আর একটা শুধু বাকি। যে চারটা করেছে রনির ধারণা সেগুলি শুদ্ধ হয়েছে। পাঁচ নম্বরটা ঠিকমতো করে ফেলতে পারলে চকলেটের প্যাকেটটা সে-ই পাবে। রনি চকলেট পছন্দ করে না। সে ঠিক করে রাখল যদি প্রাইজটা সে পায় তাহলে লুতপাইনকে দিয়ে দেবে। তবে নিজের হাতে দেবে না। লুতপাইনের চেয়ারে রেখে দেবে, সঙ্গে একটা নোট থাকবে। নোটে লেখা–For you. লুতপাইন খুবই অবাক হবে। ভুরু কুঁচকে চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করবে–কে দিল চকলেটের প্যাকেট।

রনি। হ্যালো রনি।

রনি পাঁচ নাম্বার অংকটা মাত্র শুরু করেছে। তার ধারণা এই অংকটাও সে পারবে, ঠিক তখনি মিস ডাকলেন। রনি উঠে দাঁড়াল। মিস বললেন, রনি, তুমি প্রিন্সিপ্যাল আপার ঘরে যাও। তোমার বাবা টেলিফোন করেছেন। জরুরি। অংক খাতা আমার কাছে দিয়ে যাও।

রনির মোটেও যেতে ইচ্ছা করছে না, কারণ সে জানে এমন কোনো জরুরি ব্যাপার না। তারপরেও সে গেল। তার মনটা খারাপ হয়েছে, কারণ তার মনে হচ্ছে পাঁচ নাম্বার অংকটাও সে পারবে।

কে, রনি?

হুঁ।

হুঁ কী? বলো জি।

জি।

শোনো, আজ টিফিন টাইমে তুমি স্কুল কম্পাউন্ড থেকে বের হবে না।

আচ্ছা।

প্রাইভেট অ্যারেঞ্জমেন্টে আমি তোমার জন্যে একজন সিকিউরিটির লোক রেখেছি। সে সবসময় তোমাকে চোখে চোখে রাখবে।

আচ্ছা।

সে ডিউটি শুরু করবে আজ বিকাল তিনটা থেকে। অর্থাৎ তোমার স্কুল ছুটির পর থেকে।

হুঁ।

আবার হুঁ বলছ কেন? বলো জি কিংবা OK.

সিকিউরিটি লোকের নাম রুস্তম। সে এক্স-আর্মিমান। OK
তোমার দাদাজান খুবই ঝামেলা করছেন। তিনি আমার নামে ফৌজদারি মামলা করেছেন। তার ধারণা আমিই লোক দিয়ে বিভিন্ন সময়ে তোমাকে কিডন্যাপ করাচ্ছি। বদ্ধ উম্মাদ না হলে এমন আইডিয়া তার মাথায় কী করে আসে কে জানে! এই উন্মাদ আজ বিকালে বাড়িতে আসবে। তুমি তার সঙ্গে কথা বলবে না।

কেন কথা বলবো না?

একজন উন্মাদের সঙ্গে কথা বলার কোনো মানে হয় না। এইজন্যে কথা বলবে না।

OK.

টেলিফোন শেষ করে ক্লাসে ফিরে রনি দেখে, অংক মিসের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। প্রাইজটা পেয়েছে সে। কেউ চারটা অংক শুদ্ধ করতে পারে নি। শুধু রনিই পেরেছে।

শাহানা মিস বললেন, আমার কথা ছিল পাঁচটা অংক শুদ্ধ করতে হবে। তুমি পঞ্চমটা করতে পার নি। এই ফল্ট তোমার না। তোমাকে আমিই প্রিন্সিপ্যাল আপার ঘরে পাঠিয়েছিলাম। কাজেই তোমাকে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে।

মোটা-মিঠু বলল, মিস এটা ফেয়ার না। আমি প্রটেষ্ট করছি।

মিঠু, তুমি কি চুপ করে বসবে?

না মিস, আমি বসব না।

ঠিক আছে, তুমি দাঁড়িয়ে থেকে পেন্সিল কামড়াও।

মিস, আমি বাজি রাখতে পারি রনি পাঁচ নম্বর অংকটা পারবে না। লুতপা থাকলে পারত। ও পারবে না। ওকে প্রাইজ দেয়া যাবে না মিস, আমি প্রটেষ্ট করছি।

মোটা-মিঠু প্রটেস্ট করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই অংক ক্লাস শেষ হলো। পরের ক্লাস সায়েন্সের। সায়েন্স মিস ক্লাসে ঢুকেই বললেন, রনি কোথায়? রনি উঠে দাঁড়াল।

মিস বললেন, প্রিন্সিপ্যাল আপার ঘরে যাও। তোমার জরুরি টেলিফোন এসেছে।

মোটা-মিঠু বলল, প্রতি ক্লাসেই রনির একটা করে জরুরি টেলিফোন আসছে আর সে ক্লাস ফাকি দিয়ে ঘুরছে। এই প্রটেস্ট।

রনির ইচ্ছা করছে বলে, আমি টেলিফোন ধরব না। আমি নিজেও প্রটেস্ট করছি। সেটা বলা সম্ভব না। রনি প্রিন্সিপ্যাল আপার ঘরের দিকে রওনা হলো। এখন কে টেলিফোন করেছে কে জানে! বাবা কি আবার করেছেন? নতুন আরেকজন সিকিউরিটি গার্ডের কথা বলবেন? নাকি মা করেছেন? নাকি অন্য কেউ?

হ্যালো রনি?

হুঁ।

এই গাধা, আমাকে চিনতে পারছিস না?

না, আপনি কে?

আমি তোর দাদাজান।

ও আচ্ছা।

ও আচ্ছা কী? বল স্লামালিকুম।

স্লামালিকুম।

তোর ফলস বাবা তোকে নিয়ে যে সব কাণ্ডকারখানা শুরু করেছে, সেটা তো আর সহ্য করা যায় না। ওর নামে শিশু নির্যাতন আইনে মামলা ঠুকে দিয়েছি। মজা টের পাবে। মজা কত প্রকার ও কী কী এক ধাক্কায় বুঝে ফেলবে।

ও আচ্ছা।

ও আচ্ছা ও আচ্ছা করিস না। মন দিয়ে শোন কী বলছি। তোর স্কুল ছুটি হবে কয়টায়?

তিনটায়।

তিনটার আগেই আমার গাড়ি তোর স্কুল গেটের সামনে থাকবে। সঙ্গে আমার লোকজনও থাকবে। তুই আমার গাড়িতে উঠবি। সবুজ রঙের পাজেরো গাড়ি। ড্রাইভারের নাম সালাম।

কী রঙের গাড়ি?

সবুজ রঙের গাড়ি। পাজেরো।

সবুজ রঙ?

হ্যাঁ সবুজ। তুই কি কানে ঠসা হয়ে গেছিস, এক কথা কতবার করে বলতে হবে?

দাদাজান, তুমি কি সবসময় এই গাড়িতে চড়ো?

কী ধরনের কথা বলছিস? এই গাড়িতে চড়ব না তো কি অন্যের গাড়িতে চড়ব!

আমাদের স্কুলের একজন মিস রিকশা করে যাচ্ছিলেন, তখন সবুজ রঙের একটা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে তাঁকে ফেলে দেয়।

তাতে কী হয়েছে? বাংলাদেশে কি একটাই সবুজ রঙের গাড়ি! ফাজিল ছেলে! অতিরিক্ত কথা বলা শিখে গেছিস। যেটা বলছি সেটা করবি, স্কুল ছুটি হওয়া মাত্র আমার গাড়িতে উঠে পড়বি। ড্রাইভারের নাম মনে আছে?

মনে আছে।

নাম বল।

ড্রাইভারের নাম সালাম।

গুড বয়। টেলিফোন রাখলাম। এতদিন তোর ফলস বাবা তোকে কিডন্যাপ করত। আজ করবে আসল দাদা। হা হা হা।

রনিদের স্কুল ছুটি হলো তিনটায়। তিনটা বিশ মিনিটের মাথায় সব ছেলেমেয়ে চলে গেল। রনিকে কোথাও পাওয়া গেল না। বিরাট হৈচৈ পড়ে গেল। স্কুলের দুজন দারোয়ানের একজন বলল, মোটা মতো কালো একজন লোকের হাত ধরে রনি বের হয়েছে। অন্য দারোয়ান বলল, সে দেখেছে ফর্সা লম্বা একটা লোক রনির স্কুল ব্যাগ এবং পানির ফ্লাস্ক হাতে নিয়ে যাচ্ছে। রনি গেছে লোকটার পেছনে পেছনে। দারোয়ান দুজনকেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেল জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে। স্কুলের প্রতিটি ঘর খোঁজা হলো, বাথরুম খোঁজা ইলো, যদি রনি কোথাও ঘাপটি মেরে বসে থাকে।

রাত আটটার টিভি নিউজে রনির খবর প্রচার করা হলো। বাংলাদেশের প্রতিটি থানায় ওয়ারল্যাসে খবর পাঠানো হলো। ঢাকা শহরের প্রতিটি রাস্তায় মাইকে করে বলা হতে লাগল–রনি নামের একটি ছেলে হারিয়ে গেছে। তার বয়স নয়। তার গায়ের রঙ ফর্সা, কেঁকড়ানো চুল। তার পরনে সাদা সার্ট ও নীল প্যান্ট… রনির হারিয়ে যাবার খবরে তার দাদাজান খুশি হলেন। তিনি দাঁতমুখ খিচিয়ে বলতে লাগলেন–এইবার এরা মজা বুঝবে। এখন বুঝবে কত ধানে কত চাল। আমি তো সহজে ছাড়ব না, হত্যা মামলা ঠুকে দেব। শিশুহত্যা–বাপ-মা দুজন স্ট্রেইট ফাসির দড়িতে ঝুলবে।

লুতপা খবরটা পেয়েছে টিভি থেকে। খবরটা জানার পর থেকেই সে কাদছে। লুতপার বাবা মেয়েকে শান্ত করার অনেক চেষ্টা করেছেন। কিছুতেই কিছু হয়নি। এখন লুতপা দরজা বন্ধ করে তার ঘরে বসে আছে। রাত প্রায় দশটা। তার জ্বর বেড়েছে। রাতে সে কিছু খায় নি। সে তার বাবাকে জানিয়ে দিয়েছে, রনিকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত সে কিছুই খাবে না। ঘরের দরজাও খুলবে না।

রনি বসে আছে তার স্কুলের ছাদে। স্কুল ছুটি হবার পরপরই সে কাঠগোলাপ গাছ বেয়ে ছাদে উঠে গিয়েছিল। ছাদে উঠার সময় তার মোটেও ভয় লাগেনি। বরং মজা লেগেছিল। সন্ধ্যার পর থেকে খুবই ভয় লাগছে। চারপাশ কী নির্জন–একটা লোক নেই। রাতে স্কুলে দারোয়ান থাকত। দারোয়ানদের পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ায় আজ দারোয়ানও নেই। রনি বেশ কয়েকবার ছাদের রেলিং-এর কাছে গিয়ে এই এই বলে চিৎকার করেছে। কেউ তার কথা শুনে নি। দুবার সে কাঠগোলাপের গাছ বেয়ে নামার চেষ্টা করল। সেটাও পারল না। ছাদটা এত উঁচুতে, ছাদ থেকে গাছ বেয়ে নামা অসম্ভব। যতই রাত বাড়ছে তার কাছে মনে হচ্ছে ছাদটা ততই উঁচু হচ্ছে। ছাদের বা এবং ডান পাশে দুটা উঁচু দালান তৈরি হচ্ছে। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সেই দালানে মিস্ত্রি কাজ করছিল। সন্ধ্যার পর তারাও নেই।

আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অবশ্যই বৃষ্টি হবে। তখন রনি কী করবে। তাকে বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। যদি ঝড় হয়? ঝড় হলে কী করবে? স্কুলঘরের বারান্দায় একটা বাতি জ্বলছে কিন্তু ছাদ অন্ধকার। সেই অন্ধকারও বাড়ছে।

স্কুলের ছাদটা বিশাল। ছাদের মাঝখানে বড় বড় তিনটা পানির ট্যাংক। কিছুক্ষণ পর পর পানির ট্যাংকে ঘরঘর শব্দ হচ্ছে। শব্দ শুনে মনে হয় ট্যাংকের ভেতরে বসে কেউ একজন হাসছে। ভৌতিক কোনো ব্যাপার নিশ্চয়ই। দিঘির পানিতে ভূত থাকতে পারলে ট্যাংকের পানিতে থাকবে না কেন? রনি একবার একটা গল্প পড়েছিল, গল্পের নাম পানিভূত। পানিভূতটা দিঘির পানিতে ড়ুব দিয়ে থাকত। কোনো ছোট ছেলেমেয়ে দিঘির কাছে এলে হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে পানির নিচে নিয়ে যেত। ট্যাংকের পানিতে কি সে রকম কেউ ড়ুব দিয়ে আছে? সে কি ট্যাংকের ঢাকনা খুলে হাত বাড়িয়ে রনিকে ধরবে?

রনির খুব ক্ষিধে লেগেছে। সে চকলেট পছন্দ করে না, ক্ষিধের কারণে প্রাইজ পাওয়া চকলেটের প্যাকেটের সব চকলেট খেয়ে ফেলেছে। এখন তৃষ্ণা লেগেছে। তার পানির বোতলে এক ফোটা পানি নেই।

সে রেলিং-এ হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ কাদল। এখন সে বড় হয়েছে, কাঁদা ঠিক না। কিন্তু সে কী করবে? কিছুতেই কান্না থামাতে পারছে না। প্রচণ্ড শব্দে খুব কাছে কোথাও বাজ পড়ল। রনি শব্দ করে কেঁদে উঠল।

রনি আছ, রনি!

রনি চমকে উঠল। তাকে কে ডাকছে? কে টর্চের আলো ফেলছে রেলিং-এ! রনি উঠে দাঁড়াল। এখন টর্চের আলো এসে পড়ছে তার মুখে।

কে, রনি?

হুঁ।

ছাদে উঠার ব্যবস্থা কী?

রনি কান্না চাপতে চাপতে বলল, পেছনে একটা কাঠগোলাপ গাছ আছে। গাছ দিয়ে উঠতে হয়।

ভালো ঝামেলার মধ্যে পড়লাম। গাছ কি শক্ত? ডাল ভেঙে নিচে পড়ব না তো?

রনির কান্না থেমে গিয়েছিল। এখন আনন্দে আবারো কান্না পাচ্ছে। এই কান্না আনন্দের। যিনি টর্চের আলো ফেলছেন তার নাম হাব্বত আলি। রনি বলল, আমি যে এখানে আছি আপনি কীভাবে বুঝলেন?

হাব্বত আলি বিরক্ত গলায় বললেন, এটা বোঝার জন্যে ফেলুদা হতে হয় না। স্কুল থেকে বের না হলে তুমি যাবে কোথায়? স্কুলেই থাকবে।

হাব্বত আলি গাছ বেয়ে উঠছেন। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিদ্যুতের আলোয় তাকে দেখা যাচ্ছে। মানুষটার পোশাক অন্যরকম। মাথায় ক্রিকেটারদের মতো ক্যাপ। গায়ে চাদর। চাদরটার রঙ আগে বোঝা যাচ্ছিল না। বিদ্যুৎ চমকানোর পর রঙ দেখা গেল–লাল।

রনি!

জি।

বিরাট একটা ভুল হয়েছে। গাছে উঠা শুরু করার আগে চাদরটা খুলে আসা উচিত ছিল। চাদর ডালে বেঁধে বেঁধে যাচ্ছে।

এখন চাদরটা ফেলে দিন।

এখন কীভাবে ফেলব? দুই হাত দিয়ে ডাল ধরে আছি। আরেকটা বাড়তি হাত থাকলে সেই হাতে চাদর খুলতাম। বাড়তি হাত তো নেই।

আপনি উঠেই পড়েছেন। আর একটু বাকি।

শেষটা পার হওয়াই তো কঠিন। যত উপরের দিকে উঠছি গাছ ততই পিচ্ছিল হচ্ছে, এই কারণটাও তো বুঝলাম না।

হাব্বত আলি ছাদের রেলিং-এ হেলান দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেন। গাছ বেয়ে ছাদে উঠতে তাঁর বেশ পরিশ্রম হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরেই তিনি বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়েছেন। এখন তাঁর নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হয়েছে। তিনি টর্চটা রনির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, টর্চ জ্বালিয়ে আমার দিকে ধরে থাক। আমি খাওয়া-দাওয়া করব। তোমাকে নিয়ে গাছ বেয়ে নামতে হবে, প্রচুর এনার্জি লাগবে।

রনি টর্চ ধরে আছে। হাব্বত আলি ঝোলা থেকে খাবারের প্যাকেট বের করেছেন। একটা বার্গার, একটা চিকেন ব্রোস্ট। সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আছে টমেটো সস আছে। প্রতিটি খাবারই রনির খুব পছন্দের অথচ তিনি একবারও রনিকে বলছেন না, আমার এখান থেকে নিয়ে কিছু খাও। ক্ষিধের চোটে রনি চোখে অন্ধকার দেখছে। যত ক্ষিধেই লাগুক কারো কাছে খাবার চাওয়া যায় না। তারপরেও রনি ভাবল লজ্জাটজ্জা ভুলে গিয়ে সে বলে, আমি কি কয়েকটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই পেতে পারি?

রনি!

জি।

তোমার সবচে পছন্দের খাবারগুলি নাম বলো। এক নম্বরে কী আছে?

পিজা।

দুই নম্বর?

বার্গার।

তিন নম্বর?

চিকেন ব্রোস্ট।

তোমার জন্যে একজন না খেয়ে অপেক্ষা করছে। আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব। তুমি ঐ বাড়িতে পৌছানো মাত্র তোমার জন্যে ষােলো ইঞ্চি একটা পিজা চলে আসবে। ষােল ইঞ্চি পিজাতে তোমাদের হবে না?

হবে।

কে অপেক্ষা করছে জানতে চাইলে না?

কে অপেক্ষা করছে?

লুতুপাইন।

রনির একবার ইচ্ছা হলো জিজ্ঞেস করে, আপনি কী করে জানেন? তারপর মনে হলো জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। কীভাবে কীভাবে যেন এই মানুষটা সব জানে।

হাব্বত আলি চিকেন ব্রোস্টে কামড় দিতে দিতে বললেন, লুতপাইনদের বাড়িতে পৌছানোর পর পর তুমি তোমার বাবা-মাকে টেলিফোন করবে। তারা খুবই দুশ্চিন্তা করছেন। দুজনই কান্নাকাটি করছেন। বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার এই দুজন মানুষ তোমাকে অত্যন্ত পছন্দ করেন।

রনি বলল, আমি জানি।

তোমার দাদাজানের কাছ থেকে সাবধান। এই বুড়ো সবুজ রঙের পাজেরো করে ঘোরে। কে জানে ঐ বুড়োই তোমাদের মিসকে রিকশা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে কি-না।

রনি বলল, আপনি বলে দিন উনি ধাক্কা দিয়েছেন কি-না। আপনি তো সবই জানেন।

হাব্বত আলি বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি সব জানি তোমাকে কে বলল? আমি কি সুপারম্যান নাকি? আমি সুপারম্যানও না, স্পাইডারম্যানও না। তবে স্পাইডারম্যান হলে খুব সুবিধা হতো–সহজেই ছাদ থেকে তোমাকে নামাতে পারতাম।

রনি বলল, আমি কি কয়েকটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে পারি?

হাব্বত আলি বললেন, খেতে পার না। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আমার খুব পছন্দের জিনিস। আমি আমার নিজের জন্যে কিনেছি।

রাত এগারোটার দিকে হাব্বত আলি রনিকে লুতপাইনদের বাসায় নামিয়ে দিলেন। রনি এই বাড়িতে আজই প্রথম এসেছে। অপরিচিত বাড়ি। তার ভয় করছে। হাব্বত আলি বললেন, কলিংবেল টিপলেই লুতপাইনের বাবা দরজা খুলবেন। তাকে তোমার পরিচয় দেবে। উনি লোক খুবই ভালো। তোমাদের মিসকে উনি চিকিৎসার জন্যে নিজের খরচে বাইরে পাঠাচ্ছেন। কেন পাঠাচ্ছেন জানো?

না।

পাঠাচ্ছেন কারণ লুতপাইন তার বাবাকে এই কাজটা করতে বলেছে। রনি শোন, লুতপাইন মেয়েটির সঙ্গে তুমি প্রায়ই খারাপ ব্যবহার কর। আর কখনো করবে না।

কেন করব না?

সেটা তোমাকে আমি এখন বলব না। কোনো একদিন নিজেই বুঝতে পারবে কেন তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছি। আমি চলে যাচ্ছি।

আপনার সঙ্গে কি আবার দেখা হবে?

বুঝতে পারছি না। হতেও পারে।

হাব্বত আলির সঙ্গে রনির দেখা হয় বিশ বছর পর। রনির সেদিন বিয়ে। রাত প্রায় নটা, বিয়ে হয়ে গেছে। বর-কনের মুখ দেখাদেখির অনুষ্ঠান হচ্ছে। বিরাট একটা আয়না ধরা হয়েছে রনির সামনে। আয়নায় কনের মুখ দেখা হবে। আয়নার উপর সাদা সুতার কাজ করা ঝালরের মতো আছে। সুতার ঝালর সরানো হলো–লুতপাইনের মিষ্টি মুখ আয়নায় দেখা যাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে রনি। হঠাৎ তার চোখে পড়ল লুতপাইনের ঠিক পেছনেই হাব্বত আলি দাঁড়িয়েছেন। তিনি রনির দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটছেন। আজো তার মাথায় ক্রিকেটারদের ক্যাপ। গায়ে লাল চাদর।

বিয়ের আসরে রনি তাকে অনেক খুঁজেছে। তার দেখা পায় নি।

এখন রনিরা থাকে আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোর সেন হোসে নামের একটা জায়গায়। লুতপাইন একটা ইউনিভার্সিটিতে অংক পড়ায়। তার বিষয় বুলিয়ান এলজেব্রা। রনি ছোটবেলায় এলিয়েনদের ছবি আঁকতো, এখনো তাই করে। সে একজন পেইন্টার। বাচ্চাদের বইয়ের বুক ইলাস্ট্রেশন করে। সমুদ্রের পাড়ে তাদের সুন্দর একটা বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে তারা একটা ঘর আলাদা করে সাজিয়ে রেখেছে। তাদের ধারণা কোনো একদিন হাব্বত আলি তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবেন। তখন তিনি এই ঘরে থাকবেন।

————-

*একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। রনি এবং লুতপাইনের একটা মেয়ে আছে। লুতপাইনের আগ্রহে মেয়েটির নাম আমি রেখেছি। নাম হলো লীলাবতী। বাবা-মা দুজনই অবশ্যি তাঁকে ডাকে লীলা।–হুমায়ূন আহমেদ।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments