দ্যা লাস্ট লিফ – ও. হেনরী

'দ্যা লাস্ট লিফ' ও. হেনরী

পশ্চিম ওয়াশিংটন স্কোয়ারের একটি ছোট্ট শহরের রাস্তা গুলো পাগলের মত একেবেকে বিভিন্ন দিকে টুকরো পথে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। এদেরকে “প্লেস” বলা হয়। এই টুকরো রাস্তা গুলোয় অদ্ভুত সব কোন ও বাক দেখা যায়। কোন কোন রাস্তা হয়তো এভাবে ঘুরপাক খেয়ে নিজের উপর দিয়েই দু’একবার অতিক্রম করেছে গিয়েছে। এইসব অঞ্চলেই পুরনো বাড়ি সস্তায় ভাড়া পাওয়া যায়। শিল্পীরা অনেকে এইখানে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে। একটা পুরনো নড়বড়ে তেতলা বাড়ির মাথায় স্যু আর জনসির ছবি আঁকবার স্টুডিও ছিল। একজন এসেছিল মেইন থেকে। আর একজন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে। দু-জনেরই একটা হোটেলে খেতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল। তারপর দুজনের সব বিষয়ে একই রকম পছন্দ হওয়াতে একসঙ্গে এই স্টুডিওটা করেছিল।

সেটা মে মাস। কিন্তু নভেম্বর মাসেই নিউমোনিয়ার আক্রমণ শুরু হল এ অঞ্চলে। জনসিকেও একদিন নিউমোনিয়ায় ধরল। অসুখে পড়ে সে তার বিছানায় শুয়ে পড়ে রইল। জানালার ফাঁক দিয়ে একটা ইটের বাড়ির পেছনের দিকটা দেখা যায়। একদিন ডাক্তার এলেন। থার্মোমিটার ঝাড়তে স্যকে ডেকে তিনি বললোন বাঁচবার আশা খুব কম দেখলাম। একমাত্র ভরসা যদি রোগীর বাচবার খুব আকাক্ষা থাকে। তোমার বন্ধু যেন পণ করেছে যে সে আর ভালো হবে না। ওর মনে কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা আছে?

স্যু বলল—‘ওর ইচ্ছে ছিল ও নেপলস-এর উপসাগর আঁকবে।’

আঁকার কথা থাক! কোনো ছেলের কথা কখনো ভেবেছে—মানে কোনো ছেলেকে কি ও ভালোবেসেছিল?
‘ছেলে! না ডাক্তারবাবু, সে-রকম কোনো ঘটনার কথা আমি শুনি নি।’

‘তাহলে আশা বড় কম । ওষুধের যা-কিছু ক্ষমতা আছে তা আমি করব। একটা কথা শুধু জিজ্ঞেস করো ওকে যদি কখনো ওর নতুন জামা-কাপড় পরতে ইচ্ছে হয়—তাহলে বুঝবে ওর কিছু আশা আছে।’

ডাক্তার চলে যাবার পর স্যু তার ছবি আঁকবার বোর্ডটা নিয়ে শিস দিতে দিতে জনসির ঘরে ঢুকল।
জনসি চুপ করে জানলার দিকে মুখ করে শুয়েছিল। স্যুর মনে হল জনসি বোধহয় ঘুমুচ্ছে–তাই শিস দেওয়া বন্ধ করল।

স্যু আপন মনে বোর্ডটা সাজিয়ে একটা সাময়িক পত্রিকার গল্পের জন্যে ছবি আঁকতে লাগল। যারা নতুন লেখক তারা যেমন সাহিত্যে নাম করবার জন্যে সাময়িক পত্রিকায় লিখে হাত পাকায়, তেমনি তরুণ শিল্পীরাও সাময়িক পত্রিকায় ছবি এঁকে হাত পাকায়। স্যু যখন ছবি আঁকছিল, তখন হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ কানে আসতেই জনসির বিছানার পাশে গেল। জনসির চোখ খোলা ছিল। সে বাইরের দিকে চেয়ে কী যেন গুনছিল।

জনসি গুনছিল—বার, তারপর এগার, তারপর দশ, তারপর নয়, তারপর ‘আট’, তারপর সাত। স্যুও জানলার বাইরে চেয়ে দেখছিল। কী শুনছে জনসিঃ কুড়ি ফুট দূরে একটা ইটের বাড়ির পেছনদিকটা ফাঁকা—আর একটা নীরব উঠোন দেখার কিছুই নেই সেখানে। একটা আইভিলতা ইটের দেওয়ালটা আধখানা বেয়ে উঠেছে তার গোড়াটা শুকিয়ে গেছে। শরতের ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে তার পাতাগুলো খসে গেছে—শুধু ডাটাটা ইটের দেওয়ালে আটকে আছে কোনো রকমে ।

সু জিজ্ঞেস করলে—‘ওদিকে কী দেখছ ভাই?’

জনসি চুপি চুপি বলল, ‘আর ছ’টা। খুব তাড়াতাড়ি খসে পড়ছে। তিন দিন আগে প্রায় একশোটা পাতা ছিল । গুনতে আমার মাথা ধরে যেত। এখন গোনা খুব সোজা হয়ে গেছে। ওই আর-একটা খসে গেল—এখন মাত্র পাঁচটা পাতা রইল।’ ‘কী বলছ জনসি?’

‘পাতার কথা বলছি। ওই-যে আইভিলতা গাছটা দেখছ, ওর পাতা। যখন শেষ পাতাটা খসে যাবে তখন আমিও চলে যাব। আজ তিন দিন হল আমি জানতে পেরেছি। ডাক্তার তো তোমাকে সে-কথা বলে গেছে।’

স্যু বললো—যত সব বাজে কথা। তোমার ভালো হওয়ার সঙ্গে পাতা-ঝরার কী সম্পর্ক ও গাছটাকে তোমার তো খুব ভালো লাগত? তা এসব কথা ভেব না তুমি। ডাক্তার বলেছিল—তুমি শিগগির সেরে উঠবে। এখন এই ঝোলটুকু একটু খেয়ে নাও। আমি এখন সম্পাদকের কাছে গিয়ে ছবিটা দিয়ে কিছু টাকা আনব—তোমার জন্যে ওষুধ আনব, আমার নিজের খাবারও কিনে আনব।’

জনসি বলল—আমার জন্যে আর ওষুধ আনতে হবে না, ওই আর-একটা পাতা খসল। আমি আর ঝোল খাব না। আর চারটে পাতা রইল-সন্ধে হবার আগে বাকি ক-টাও খসে যাবে, তখন আমারও যাবার পালা আসবে।’

সু বললো— ‘জনসি, ওদিকে আর চেয়ে দেখো না ভাই, চোখ বুজে থাক। আমি আঁকাটা শেষ করে কালকেই দিয়ে আসতে চাই। আমি জানলাটা বন্ধ করে দিতাম, কিন্তু আমার একটু আলো দরকার হবে।’

জনসি বললো—‘কেন, ও-ঘরে গিয়ে তুমি আঁকতে পার না?’

সু বললো— ‘না, আমি এ-ঘরে তোমার পাশে বসে থাকতে চাই—তা ছাড়া আমি চাই না তুমি ওই আইভি-পাতার দিকে চেয়ে দেখো।’
জনসি চোখ বুজে চুপ করে থেকে বললো—‘তোমার আঁকা শেষ হলেই আমাকে বলবে। আমি শেষ পাতাটার খসে যাওয়া দেখতে চাই। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছি। আর ভাবতে পারি না। আমি আস্তে আস্তে সবকিছুর মায়া কাটাতে চাই-তারপর এই পাতাগুলোর মতোন হাওয়ায় ভেসে যেতে চাই।’

সু বললো— ‘তুমি একটু ঘুমোবার চেষ্টা কর। আমি বুড়ো বেরম্যানকে ডেকে এনে তাকে মডেল করবো—আমি যাব আর আসব—তুমি যেন নড়বার চেষ্টা কর না।’

বুড়ো বেরম্যান একজন শিল্পী । সে তাদের বাড়ির একতলায় থাকত। বয়েস তার ষাট পেরিয়ে গেছে। তার মুখে একটা দাড়ি। শিল্পী হিসেবে বেরম্যান কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। চল্লিশ বছর ধরে ছবি এঁকেও কোনো নাম হয় নি তার। চিরকাল তার ইচ্ছে যে সে একটা শ্রেষ্ঠ চিত্র আঁকবে—কিন্তু তা কখনো আরম্ভ করা হয় নি। অনেক বছর ধরে কেবল বিজ্ঞাপনের ছবি এঁকেই কাটিয়েছে। নতুন শিল্পীদের কাছে মাঝে মাঝে মডেল হিসেবে কাজ করেও সে সামান্য কিছু আয় করত। নতুন শিল্পীরা অনেকেই জাত-মডেল নিয়ে কাজ করবার পয়সা দিতে পারত না। আর সে যে একদিন শ্রেষ্ঠ একটা ছবি আঁকবে সে-কথাও বলত। এ ছাড়া সে একজন ভয়ানক প্রকৃতির লোক ছিল—তার কাছে হৃদয়বৃত্তির কোনো মূল্য ছিল। এই দুজন মেয়েশিল্পীকে সে একটু নেকনজরে দেখত—তাদের ভালো-মন্দের সম্বন্ধে সে একটু ভাবত।

বেরম্যানের ঘরে গিয়ে স্যু দেখলো তার ঘরে ছবি আঁকবার সেই বোর্ডটা তখনো তেমনি ফাঁকা। গত পঁচিশ বছর ধরে একটা আঁচড়ও কাটেনি সে তাতে । বেরম্যানকে সমস্ত খুলে বললো সে। বললো—কেমন করে জনসি শুকনো পাতার মতো খসে পড়ে যাবার ভয় করছে।

বেরম্যান বললো দূর, আইভি গাছ থেকে পাতা খসে যাবার সঙ্গে মরে যাবার কথা কেউ কল্পনা করতে পারে! যত সব উদ্ভট কল্পনা। আমি তো একরম কথা কখনো শুনিনি। আমি তোমার মডেল হব না— ‘তোমারই তো দোষ, তুমি জনসির মাথা থেকে এইসব উদ্ভট কল্পনা দূর করতে পার না?’

সু বললো— ‘কী করব, অসুখে ভুগে ভুগে জনসি খুব রোগা আর দুর্বল হয়ে গেছে তাই যত অদ্ভুত কল্পনা ওর মাথায় ভর করে। তা যাকগে—তুমি যদি আমার মডেল না হও আর কী করব!’

বেরম্যান বললো— ‘আসলে তুমি মেয়ে মানুষ বৈ তো নও-কে বললো আমি মডেল হব না? তুমি যাও আমি তো আধঘণ্টা ধরে বলে আসছি আমি মডেল হব—মিস জনসির মতো ভালো মেয়ে এখানে অসুখ হয়ে পড়ে থাকবে, এটা ভালো কথা নয়। আমি বলছি একদিন আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবি আঁকব—তখন আমরা সবাই এই জায়গা ছেড়ে চলে যাব। তারা দু-জনে যখন ওপরের তলায় গেল তখন জনসি ঘুমোচ্ছে। সু আস্তে আস্তে জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে পাশের ঘরে গেল। সেখান থেকে ভয়ে ভয়ে আইভিলতাটার দিকে চেয়ে দেখলে। তারপর দুজনেই দু-জনের মুখের দিকে চাইলো । বৃষ্টি হচ্ছে—

বৃষ্টির সঙ্গে বরফও পড়ছে। বেরম্যান তার নীল শার্টটা পরে মডেল হয়ে বসল। পরের দিন সকালে যখন স্যু একঘণ্টা মাত্র ঘুমিয়ে উঠল তখন দেখলো জনসি বন্ধ জানালাটার দিকে চেয়ে রয়েছে।

বললো— ‘জানলাটা খুলে দাও আমি দেখব।’
স্যু জানলাটা খুলে দিলো।

কিন্তু আশ্চর্য, সমস্ত রাত ধরে অত বৃষ্টি আর ঝড়ের পরও ইটের দেয়ালের গায়ে সেই আইভিতার গাছে তখনও একটা পাতা লেগে রয়েছে। ওইটেই শেষ পাতা। গোড়াটা এখনও সবুজ রয়েছে, যদিও ধারগুলো হলদে হয়ে গেছে। পাতাটা মাটির ওপরের প্রায় কুড়ি ফুট উঁচুতে ডালের গাছে লেগে রয়েছে শক্ত হয়ে।

জনসি বললো—ওইটেই শেষ পাতা। আমি ভেবেছিলাম, রাত্রে বৃষ্টিতে ওটা ঝরে পড়ে যাবে। বাতাসের শব্দ আমার কানে এসেছে। আজকে ঠিক পড়বে—আমিও ঠিক সেই সময়ে চলে যাব।

স্যু নিজের মুখটা বালিশের কাছে নিয়ে এসে বললো—জনসি, তোমার কথা তুমি না ভেবে আমার কথাটা একবার ভাব। তুমি চলে গেলে আমি কী করে থাকব একবার ভাব।

কিন্তু জনসি চুপ করে রইল। যে চলে যাবে, তার মতো নিঃসঙ্গ আর কে আছে? যেন তার সঙ্গে এ-পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক আস্তে-আস্তে ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে ।

আস্তে-আস্তে দিন গড়িয়ে চলল। সন্ধেবেলার অল্প অন্ধকারে দেখা গেল পাতাটা তখনও দেয়ালের গায়ে আটকে রয়েছে। রাত আসবার সঙ্গে সঙ্গে আবার উত্তরে বাতাস বইতে শুরু করল। বৃষ্টির ঝাপটা এসে জানলায় লাগতে লাগল। সকাল হলে জনসি জেদ ধরলে জানলাটা খুলে দিতে। আইভিলতার পাতাটা তখনও তেমনি রয়েছে। জনসি সেইদিকে চেয়ে অনেকক্ষণ শুয়ে রইল। তারপর স্যুকে ডাকলে। স্যু তখন জনসির জন্যে খাবার তৈরি করছে।

জনসি বললো— আমি খুব খারাপ মেয়ে স্যুডি। আমি খারাপ, তাই পাতাটাও পড়ছে না। আমি আর মরতে চাই না স্যুডি । আমার খাবার যা আছে নিয়ে এস—আমি খাব। আর একটা আরশি দাও তো—আর আমাকে পিঠে বালিশ দিয়ে একটু বসিয়ে দাও না।

একঘণ্টা পরে সে বললো— ‘স্যুডি, একদিন হয়ত আমি নেপলস-এর উপসাগরটা আঁকতে পারব।’

বিকেলবেলা ডাক্তার এল। ডাক্তার চলে যাবার পর স্যু বাইরে গিয়ে দেখা করল। ডাক্তার স্যুকে বললেন—এখন একটু আশা হচ্ছে কিন্তু আপনার সেবার জন্যেই হয়ত আপনার বন্ধু এ-যাত্রা বেঁচে গেল। একতলায় আমাকে আর-একটা রোগী দেখতে যেতে হবে তার নাম বেরম্যান নাকি! শুনেছি লোকটা নাকি ছুবি আঁকে। তারও বোধহয় নিউমোনিয়া হয়েছে। বুড়ো মানুষ, খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে তার। অবস্থাও খুব সঙ্গিন। তাকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

পরের দিন সকালবেলা ডাক্তার এসে বলল— ‘আর কোনো বিপদ নেই, এবার শুধু একটু সেবাযত্ন আর পুষ্টিকর খাওয়া দরকার।’

সেদিন বিকেলবেলা জনসি যেখানে শুয়েছিল সেখানে স্যু এল। একটা নীল সস্তা পশমের স্কার্ফ বুনছিল সে। জনসির গলা জড়িয়ে ধরে বলল— আজ তোমাকে একটা কথা বলব জনসি। মিস্টার বেরম্যান আজকে হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। দু-দিন শুধু অসুখে ভুগেছে। প্রথম দিন বাড়ির দারোয়ানটাই তাকে দেখতে পায় ঘরের মধ্যে সে যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে।

তার পোষাক ও জুতো সব ভিজে গিয়েছিল। ওই রাত্রে বৃষ্টির মধ্যে মানুষটা যে কোথায় গিয়েছিল তা কেউ জানে না। তারপর একটা লণ্ঠন ও একটা মই দেখতে পেল। কয়েকটা তুলি, কিছু রঙ- জানলার বাইরে চেয়ে দেখ, দেয়ালের গায়ে শেষ পাতাটা আটকে রয়েছে। তোমার কি কখনো মনে হয়েছে, শেষ পাতাটা এখনো নড়ছে না কেনো। আসলে ওটা ছিল বেরম্যানের জীবনের সেরা ছবি। শেষ পাতাটা যেদিন ঝড়ে যায় বেরম্যান সেদিনই সেরা ছবিটা এঁকেছিল।’

Facebook Comment

You May Also Like