ট্যাক্সির হর্ন – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

চিঠির বাক্সে একটি সাদা খাম পেলেন অমৃত।

এ চিঠি ডাকে আসেনি, কেউ নিজে এসে দিয়ে গেছে। ভেতরে একটি খাতা-ছেঁড়া আধখানা পাতায় মাত্র দুটি লাইন লেখা, আমি আগামী বুধবার বেলা এগারোটায় আপনার সঙ্গে একবার। দেখা করতে চাই, সেদিন যদি আপনার সময় না থাকে, তাহলে আর কিছু দরকার নেই।

এ চিঠিতে কোনও সম্বোধন নেই, স্বাক্ষরও নেই। হাতের লেখাও চেনা নয় অমৃতর, তবে মেয়েলি হাতের লেখা বলে মনে হয়।

এরকম চিঠি পেয়ে মানুষ কী করে? খাম শুষ্টু মুড়ে ফেলে দেওয়াই তো স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাক্ষরিত মেয়েলি হাতের চিঠির কথা চট করে মন থেকে মুছে ফেলা যায় না।

আজ সোমবার। একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে অমৃত গিয়েছিলেন এলাহাবাদ। বাড়ি ফিরেছেন। কিছুক্ষণ আগে। দশ-বারোখানা চিঠি জমে আছে। তার মধ্যে এই একটি চিঠিই বারবার অন্যমনস্ক করে দেয়। যে এই চিঠি লিখেছে সে দেখা করতে এসেছিল। অমৃতকে না পেয়ে খামটি রেখে গেছে। কিন্তু সাদা খামটা সে পেল কোথায়, এনেছিল সঙ্গে করে? কোনও মেয়ের ব্যাগে এরকম সাদা খাম থাকা কি স্বাভাবিক?

পাঁচ দিন কলকাতায় ছিলেন না তিনি, এর মধ্যে কবে সেই মেয়েটি বা মহিলাটি এসেছিল, গতকাল না চারদিন আগে? আগামী বুধবার লিখেছে, অথচ চিঠিটা লেখার কোনও তারিখ দেয়নি।

চিঠিটার ভাষাও মোটেই ভালো নয়। অমৃত চৌধুরী একজন ব্যস্ত মানুষ, তাঁর কখন সময় হবে না হবে, তা জিগ্যেস করা উচিত ছিল না কি? পত্র লেখিকা নিজের থেকেই সময় ঠিক করেছে। বুধবার বেলা এগারোটা। চিঠির নীচে নাম সই না করে একটা রহস্য সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছে।

অমৃতর মনে হল, এটা অভদ্রতা এবং ন্যাকামি।

বুধবার বেলা এগারোটায় তাঁর বাড়িতে থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। অমৃতকে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছতে হয় রোজ এগারোটার মধ্যেই। তাঁর নিজের ক্লাস না থাকলেও যেতে হয়। এ-বছর তিনি হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট। এগারোটায় যাদবপুরে পৌঁছতে গেলে বাড়ি থেকে বেরুতে হয় দশটার মধ্যে। একটা ন্যাকামি চিঠির জন্য তিনি নিজের কাজ নষ্ট করে বাড়িতে বসে থাকবেন কেন?

এই বুধবার তাঁর আরও একটি জরুরি কাজ আছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল এসেছে। এই বুধবার ঠিক ওই বেলা এগারোটাতেই একটি আলোচনা সভায় যোগ দিতে হবে অমৃতকে।

এতখানি ট্রেন জার্নি করে এসেও ক্লান্ত বোধ করলেন না অমৃত, ঠিক এগারোটার মধ্যেই যাদবপুর পৌঁছলেন। গত সপ্তাহের জমে থাকা কাজকর্ম শেষ করতে-করতে বিকেল পাঁচটা বেজে গেল। বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে প্রচুর ফাইলপত্র সই করতে হয় তাঁকে, নানান অভিযোগ ও নালিশ শুনতে হয়। এত সব ব্যস্ততার মধ্যেও ওই একটা সামান্য নামহীন চিঠির কথা বারবার উঁকি দিয়ে গেল তাঁর মনে। কে লিখতে পারে ওই চিঠি? সাধারণ কোনও ছাত্রী বাদর্শনপ্রার্থিনী হতে পারে না। ওই চিঠির মধ্যে যেন বেশ একটা দৃঢ় ছবি আছে।

হাতের লেখাটা স্পষ্ট মেয়েলি বলে চেনা না গেলে কি অমৃত এমন উতলা হতেন? নিজেকেই তিনি এই প্রশ্ন করেছেন। উত্তরটাও তিনি তৈরি করেছিলেন সঙ্গে-সঙ্গে। তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া আর কোনও পুরুষ এরকম হুকুমের সুরে তাঁকে চিঠি লেখার সাহসই পেত না। কোনও পুরুষ এরকম নামহীন চিঠিও লেখে না।

বিকেলে বাড়ি ফিরে তিনি মাধুরীকে জিগ্যেস করলেন, আমি যে কদিন বাড়িতে ছিলুম না, কোনও মেয়ে কি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?

বসবার ঘরের টেবিলে একটা খাতা রাখা আছে। অমৃত যখন বাড়িতে থাকেন না, তখনকার টেলিফোন বার্তা বা অন্যান্য দরকারি খবর মাধুরী ওই খাতায় লিখে রাখে। অমৃত খাতাটার পাতা উলটে আগেই দেখে নিয়েছেন। সেখানে ওই পত্র লেখিকার কোনও সন্ধান নেই।

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মাধুরী জিগ্যেস করলেন, কেন, কোনও মেয়ের আসবার কথা ছিল?

—না। তা নয়…

—ডঃ ভট্টাচার্যে আর তাঁর স্ত্রী সতী এসেছিল, তাও কোনও দরকারে নয়, এদিকে বাজার করতে এসেছিল। একটু চা খেয়ে গেল, ওই সতী ছাড়া আর কোনও মহিলা তো এর মধ্যে তোমার কথা জিগ্যেসও করেনি। আগে তোমার দু-চারজন ছাত্রী প্রায়ই আসত, আজকাল কেউ আসে না। কী ব্যাপার বলো তো, ছাত্রীদের মধ্যে তোমার পলুলারিটি কমে যাচ্ছেনাকি? তুমি তোমার চশমার ফ্রেমটা বদলাও। এই চশমাটা পরলে তোমায় বড় ভারিক্কী আর গম্ভীর দেখায়।

একটু হেসে অমৃত বললেন, একটি মেয়ে চিঠি লিখে ডাক বাক্সে ফেলে গেছে, আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। সে ওপরে আসেনি।

মাধুরী হাত বাড়িয়ে বললেন, কই চিঠিটা দেখি?

অমৃত তক্ষুণি বুঝতে পারলেন, মাধুরীকে না দেখিয়ে চিঠিটা ফেলে দেওয়া উচিত হয়নি। কিংবা, চিঠিটা যখন ফেলেই দেওয়া হয়েছে, তখন আর এ প্রসঙ্গটা মাধুরীর সামনে উত্থাপন না করলেও চলত।

চিঠিটা যে কোথায় রাখলাম!

কী নাম মেয়েটির?

নন্দিতা না ছন্দা, এই রকম যেন কী একটা নাম, ঠিক মনে পড়ছে না। এই মিথ্যেটুকু ব্যবহার। করতেই হল, কারণ একটা নামহীন চিঠির জন্য অমৃতর এই কৌতূহল মাধুরী ভালোভাবে নিতে পারত না। একটা কিছু নাম থাকলেই চিঠিটা অতি সাধারণ। অকিঞ্চিৎকর হয়ে যায়। বাড়িতে এসে চিঠি লিখে গেছে? চিঠি দেওয়ার দরকার কী ছিল, আমাকে বলে গেলেই তো পারত।

—সেই তো।

–দরকারটা কার, সেই মেয়েটির, না তোমার?

সঙ্গে-সঙ্গে অমৃতর মনে পড়ল চিঠিটার দ্বিতীয় লাইনটা। সেদিন যদি আপনার সময় না থাকে, তাহলে আর কিছু দরকার নেই। এর মানে কী? এই বুধবার বেলা এগারোটায় দেখা কারাটাই চরম দরকারি। সেদিন দেখা না হলে মেয়েটি আর আসবে না?

বুধবার কি কোনও চাকরির ইন্টারভিউ আছে? না, কিছু মনে পড়ে না তো। কোনও চাকুরি প্রার্থিনী কি এরকম কড়া সুরে চিঠি লেখে?

অমৃত উত্তর দিলেন, মেয়েটিকে না দেখলে কী করে বুঝব, দরকারটা তার নাম আমার?

—আবার কবে আসবে বলেছে?

—এই বুধবার বেলা এগারোটায়। কিন্তু তখন তো আমি থাকব না। যদি সেই মেয়েটি আসে, তুমি জেনে নিও তার বক্তব্য।

—সে আমার সঙ্গে দেখা না করে চিঠি দিয়ে গেছে, সে কি পরদিন এসে আমার কাছে কোনও গোপন কথা বলবে?

—গোপন কথা?

—সেই রকমই তো মনে হচ্ছে?

অমৃত উঁচু গলায় হেসে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেন।

বুধবারের আলোচনা সভার জন্য তাঁকে একটা পেপার তৈরি করতে হবে। বিদেশি অতিথিদের সামনে পড়ার জন্য দু-তিনটি পেপার তাঁর আগে থেকে কেনাই আছে, তবু প্রসঙ্গ এবং দেশ অনুযায়ী সামান্য কিছু অদলবদল করে নিতে হয়।

রাত জেগে তাঁকে লেখাপড়া করতে হল। মাঝে-মাঝেই তাঁর মনঃসংযোগ নষ্ট করে দিতে লাগল একটা নামহীন সামান্য দু-লাইনের চিঠি।

পরদিনও তাঁর অনেক কাজ। বাড়ি ফিরলেন রাত সাড়ে নটায়। খাওয়ার টেবিলে বসে মাধুরী জিগ্যেস করল, সেই মেয়েটির চিঠিটা কোথাও খুঁজে পেলাম না তো কোথায় রেখেছিলে?

আজ সারাদিনে সে চিঠির কথা অমৃতর একবারও মনে পড়েনি। বুধবার মেয়েটির সঙ্গে তিনি দেখা করতে পারবেন না। সুতরাং তিনি ঠিকই করে ফেলেছিলেন যে ও নিয়ে আর মাথা ঘামাবেন না। কিন্তু মাধুরীর কৌতূহল মেটেনি, প্রসঙ্গটা সে-ই তুলল।

সরল, অবাকভাবে অমৃত বলল, কোন মেয়েটির চিঠি?

—বাঃ, তুমি যে কাল বললে, কোন রহস্যময়ী তোমার সঙ্গে গোপনে দেখা করতে চায়।

—যাঃ কীসব বলছ। চিঠিটা কে লিখেছে তা আমিই জানিই না।

—সেইজন্যই তো রহস্যময়ী বলছি। চিঠিটা তুমি লুকিয়ে রেখেছ কেন, আমাকে দেখাতে চাও?

—কী মুস্কিল, লুকবো কেন, নিশ্চয়ই কোথাও ফেলে দিয়েছি।

—ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটেও তো দেখলুম না।

—তাহলে জানলা দিয়ে ফেলে দিয়েছি হয়তো। মনে নেই, তুমি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট পর্যন্ত খুঁজে দেখেছ? তোমার হঠাৎ সন্দেহ বাতিক হল নাকি?

—তুমি তো কোনও চিঠি পড়েই সঙ্গে-সঙ্গে ফেলে দাও না।

—এটার নাম নেই, ঠিকানা নেই, উত্তর দেওয়ার কোনও ব্যাপার নেই, সেটা রেখে কী করব?

—তুমি না বললেনন্দিতানা ছন্দা কী একটা নাম ছিল?

—ওই নামের কোনও মেয়েকে আমি চিনি না।

–আমাকে দেখালে আমি হয়তো হাতের লেখা দেখে চিনতে পারতুম। অরবিন্দর বউয়ের নামই তোনন্দিতা, তাকে তুমি চেনো না?

—অরবিন্দর বউ নন্দিতা এরকম অড ব্যবহার করবে কেন? সে তোমার সঙ্গে দেখা না করে ডাক বাক্সে চিঠি রেখে যাবে?

—অরবিন্দর সঙ্গে নন্দিতার সেপারেশন হয়ে যাবে শুনছি।

—মিঠু প্লিজ, এইসব বাজে কথা এখন বোলো না। অরবিন্দর সঙ্গে নন্দিতার যদি সেপারেশন হয়ই, সেজন্য কি আমি দায়ী নাকি?

-নন্দিতা আমাকে পছন্দ করে না। কিন্তু তোমার সঙ্গে খুব হেসে-হেসে গল্প করে।

বেশ কয়েক মুহূর্ত স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল অমৃত। তাঁর মাথায় রাগ চড়ে যাচ্ছে। এই রাগ সংযত করতে হবে। হেসে উঠতে পারলে ব্যাপারটা লঘু করা যায়। কিন্তু মুখে কিছুতেই হাসি আসছে না। তাঁর খুব বলতে ইচ্ছে করছে, নন্দিতা তোমাকে পছন্দ না করলেও

অরবিন্দ তোমাকে খুবই পছন্দ করে। আমি বাড়িতে না থাকলেও সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসে।

কিন্তু একথা বললেই কথা কাটাকাটি আরও বাড়বে। নিছক সময় নষ্ট। অরবিন্দ বা নন্দিতার জীবনে তাঁর বা মাধুরীর কোনও ভূমিকাই নেই। মাধুরী অরবিন্দ সম্পর্কে কোনও দুর্বলতা পোষণ করে না। তিনি ভালোভাবেই তা জানেন। সেই রকম নন্দিতার সঙ্গেও তাঁর কোনওরকম গোপন সম্পর্ক নেই।

তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, কাল বেলা এগারোটায় মেয়েটি যদি আসে, তুমি তো তাকে দেখতেই পাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার কৌতূহলটা একটু চাপা দিয়ে রাখো না।

পরদিন সকালে স্নান করতে গিয়ে অমৃতর আবার মনে পড়ল সেই চিঠিটার কথা। তিনি দশটার মধ্যে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে যাবেন, তারপর মেয়েটি আসবে। সে লিখেছে, আজ দেখা না হলে তার আর কোনও দরকার নেই। আজ তার সঙ্গে অমৃতর দেখা হবে না। তারপর সে আর আসবে না। কোনওদিন?

মাধুরী কি মেয়েটির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে? মাধুরীর সেরকম স্বভাবই নয়, সে বরং বেশি বেশি ভদ্রতা দেখাবে। কিন্তু মেয়েটি যদি মাধুরীকে কোনও কথা বলতে না চায়? মাধুরী তাহলে অপমানিত বোধ করবে নিশ্চিত, পরে সেইজন্য খোঁচা দেবে অমৃতকে। আঃকী অশান্তি, কোথাকার কোনও উটকো মেয়ে কেন এরকম বিঘ্ন ঘটাতে এল তাঁর জীবনে? কিন্তু কেউ দেখা করতে চাইলে তাকে ঠেকানোই বা যায় কীভাবে?

খেতে-খেতে দশটা কুড়ি বেজে গেল। যাদবপুরের বদলে আজ গোলপার্ক পর্যন্ত যেতে হবে। একটু দেরি হলেও ক্ষতি নেই। তা ছাড়া আজ তিনি ট্যাক্সি নিয়ে যেতে পারেন, তাঁর যাওয়া আসার ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে দেওয়া হবে।

লেখার ফাইলটা গুছিয়ে নিয়ে তিনি মাধুরীর গালে একটা টোকা দিলেন। মাধুরী বিচিত্রভাবে হেসে একবার দেওয়ালের বড় ঘড়িটা দেখল। মাধুরী আজ সকাল থেকেই কম কথা বলছে। ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে মাধুরী কি কিছু বলতে চাইল? তাহলে আসি, বলে অমৃত নেমে গেলেন দোতলার সিঁড়ি দিয়ে। বড় রাস্তায় মোড় পর্যন্ত যেতে হবে ট্যাক্সি ধরবার জন্য। বাড়ি থেকে বোধহয় অমৃত এদিক-ওদিক তাকালেন। এগারোটায় আসবে। বলেছে, তার একটু আগে যদি আসত মেয়েটি, তাহলে অন্তত চাক্ষুষ দেখা হয়ে যেত।

রাস্তা দিয়ে যে দু-একজন মহিলা হেঁটে যাচ্ছেন তাদের মুখের দিকে একটু বেশিক্ষণ ধরে চোখ রাখলেন অমৃত। এদের মধ্যে কেউ কি? বাস থেকে নেমে যে মেয়েটি লাল ছাতা মাথায় দিয়ে আস্তে-আস্তে হেঁটে আসছে, সে হতে পারে? কিন্তু সে মেয়েটি একবারও অমৃতর দিকে তাকাল না।

ট্যাক্সি পাওয়া গেল সহজেই। ঠিক আধঘণ্টা সময় আছে। মিনিটকুড়ির মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া উচিত। অমৃত একটা সিগারেট ধরালেন। রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউটে সিগারেট খাওয়া যাবে না। সেমিনার অন্তত ঘণ্টা দু-এক চলবে।

ট্যাক্সির জানলা দিয়ে আজ অমৃত পুরুষদের চেয়ে নারীদেরই বেশি দেখছেন। অন্যদিন অন্যমনস্ক থাকেন, কিছুই দেখেন না। আজ এগারোটার সময় একটি মেয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবে। দেখা না পেয়ে ফিরে যাবে, আর কোনওদিন আসবে না। কেন সে আর একদিন আসতে পারবে না?

হাতে মিনিট দশেক সময় নিয়েই অমৃত গোলপার্ক পৌঁছে গেলেন। ট্যাক্সি ভাড়া মিটিয়ে, লেখার ফাইলটা হাতে নিয়ে তিনি নামলেন। গেটের কাছেই প্রফেসার মহাপাত্র দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর দিকে হাত তুলতে গিয়ে অমৃতর কীরকম যেন ফাঁকা-ফাঁকা লাগল। কীসের যেন একটা অভাব। তিনি দু-হাত দিয়ে পাঞ্জাবির পকেট ছাড়ালেন।

তার পরেই তাঁর খেয়াল হল, চশমা আনা হয়নি!

বুকের মধ্যে ধক করে উঠল তাঁর। সব নষ্ট হয়ে যাবে। এমনি সময়ে তাঁর চশমার দরকার হয় না। কিন্তু প্লাস পাওয়ার চশমা ছাড়া তিনি একটি অক্ষরও পড়তে পারেন না। তিনি পেপার পড়ে শোনাবেন কী করে?

আর্তের মতন তিনি জিগ্যেস করলেন, প্রফেসার মহাপাত্র, আপনার চশমা কি প্লাস পাওয়ার?

প্রফেসার মহাপাত্র বললেন, আমার চশমা? মাইনাস নাইন। আমি তো প্রায় অন্ধ।

একমাত্র উপায় এক্ষুণি আবার বাড়ি ফিরে গিয়ে চশমা নিয়ে আসা। প্রথমে স্বাগত ভাষণ ইত্যাদিতে খানিকটা সময় যাবেই। চশমা না নিয়ে ওই সেমিনারে উপস্থিত থাকার কোনও মানেই হয় না।

তিনি বললেন, প্রফেসার মহাপাত্র, আমি চশমা ফেলে এসেছি, আনতে যাচ্ছি, আমার একটু দেরি। হবে, আপনি বলে দেবেন।

তাড়াতাড়ি পেছন ফিরে তিনি আগের ট্যাক্সিটা ধরতে গেলেন। সেটা এর মধ্যেই চলে গেছে। মাঝ রাস্তায় ছুটোছুটি করে তিনি আর-একটা ট্যাক্সি ধরে ফেললেন দু-মিনিটের মধ্যে। ড্রাইভারকে বললেন, একটু তাড়াতাড়ি।

এইবার তাঁর আর-একটা কথা মনে হল। কেন তিনি বাড়ি যাচ্ছেন তা কি মাধুরী বুঝবে? মাধুরীর মন এমনিতে সন্দেহপ্রবণ নয়, সচরাচর সে তার স্বামীর কথা অবিশ্বাস করে না। কিন্তু আজ তার মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ওই রহস্যময়ী মেয়েটির সঙ্গে দেখা করার জন্যই অমৃত সামান্য একটা ছুতো করে বাড়ি ফিরে এসেছেন। আজই তাঁর চশমাটা আনতে ভুল হয়ে গেল?

অমৃতর চোখ ঘড়ির দিকে। এগারোটা বেজে গেলে মেয়েটি এসেও ফিরে যাবে। অমৃত যখন বাড়িতে যাচ্ছেনই, তখন দু-এক মিনিটের জন্য তিনি মেয়েটির বক্তব্য শুনতে পারতেন।

এই ট্যাক্সিটা বেশ জোরে যাচ্ছে বটে, তবু এগারোটার মধ্যে পৌঁছতে পারবে না। কোনও মানে হয় না, কী মানে হয় না, চশমাটা ফেলে আসা? চশমাটার জন্য যদি ফিরেই যেতে হল, তা হলে এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে এলেই হত। এইসব সেমিনার-টেমিনারে দু-চার মিনিট দেরি হলে কী আসে যায়।

এগারোটা বেজে আট মিনিট, অমৃত বাড়ির সামনে নেমে পড়ে ড্রাইভারকে বললেন, আপনি ভাই। একটু অপেক্ষা করুন, আমি এক্ষুণি ফিরে আসছি।

ড্রাইভারটি গাঁইগুঁই করতে যেতেই অমৃত ব্যাকুলভাবে বললেন, আমার বিশেষ দরকার। আমাকে এক্ষুনি ফিরতেই হবে।

এখন তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে হাঁপিয়ে যেতে হয়, তবু অমৃত ভ্রূক্ষেপ করলেন না, তিনি প্রায় লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠতে লাগলেন। অন্য কোনও ফ্ল্যাটের দরজা খোলা নেই। সিঁড়িটা একেবারে শূন্য। অমৃত তিনতলায় একটা দরজা খোলা ও বন্ধের শব্দ শুনলেন। সেই শব্দে অকারণেই তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এক্ষুণি যেন কিছু একটা ঘটবে। সে কি এসে চলে গেছে? মাধুরী কীরকম ব্যবহার করেছে তার সঙ্গে।

সিঁড়ির বাঁক ঘুরতেই অমৃত দেখলেন, তাঁর ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি যুবতী, তার খোলা চুল পিঠময় ছড়ানো, কাঁধে একটা ঝোলানো ব্যাগ, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা।

অমৃত থমকে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করলেন, তুমি?

ঠিক প্রেমের সংলাপের শুরুর মতন নয়। অমৃতের কণ্ঠে ফুটে উঠল খানিকটা নৈরাশ্য আর খানিকটা বিরক্তি।

মেয়েটি হাসল না, অবাক হল না, ঠান্ডা উদাসীনতা মাখা তার মুখ, চোখ দুটি সুদূর। সে আস্তে-আস্তে বলল, আমি চিঠি লিখে গিয়েছিলাম, আপনি বাড়িতে ছিলেন না।

অমৃত ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, এই সময় আমি বাড়িতে থাকি? উইক ডেতে…আমার অফিস-টফিস নেই? তুমি আরও আগে আসতে পারোনি?

মেয়েটি বলল, আমি পৌনে দশটায় হাওড়ায় পৌঁছেছি। জামশেদপুর থেকে সোজা–

তুমি…তুমি একটা চিঠি লিখে গেছ, যা পড়ে কিছুই বোঝা যায় না, নিজের নামটাও লেখা নেই…

নাম লিখিনি বুঝি? তাহলে ভুলে গেছি।

যেন এটা একটা অতি তুচ্ছ ভুল, চিঠির নীচে নাম না লেখা যেন এমন কিছুই অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। মেয়েটি নিষ্পলকভাবে চেয়ে আছে অমৃতর মুখের দিকে।

এমনসময় আবার দরজা খুলে গেল। দরজার ওপাশে মাধুরী। তার ঠোঁটে চাপা হাসি, যেন সে জানত, অমৃত ফিরে আসবেনই।

এক ধাপ ওপরে উঠে এসে অমৃত বললেন, মাধুরী এর নাম নীলিমা।

হাসিটি অক্ষুন্ন রেখে মাধুরী বলল জানি, আমার সঙ্গে এই মাত্র আলাপ হয়েছে।

অমৃত তবু বললেন, নীলিমা হচ্ছে আমার বন্ধু প্রদীপের বোন। জামশেদপুরে থাকে। ও যখন খুব ছোট ছিল তখন আমি ওকে কিছুদিন পড়িয়েছি।

মাধুরী আবার বলল, জানি, শুনেছি। আমি ওকে বসতে বললুম, বসতে চাইল না।

একটা কথা অমৃতর মাথায় ঝিলিক দিয়ে গেল। মাধুরী আর নীলিমা দুজনেই ভেবেছে যে তিনি ইচ্ছে করে ফিরে এসেছেন। তিনি প্রায় মনে-পড়া মানুষের মতন ব্যাকুলভাবে বললেন, মাধুরী, আমার চশমা!

মাধুরী জিগ্যেস করল, তোমার চশমা, কী হয়েছে?

অমৃত প্রথমে মাধুরীর দিকে চেয়ে বললেন, চশমাটা ভুল করে ফেলে গেছি। সেইজন্য বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হল, পেপার পড়তে পারব না। খাবার টেবিলের ওপর বোধহয় চশমাটা রয়েছে।

তারপর নীলিমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, আমি এখন ভীষণ ব্যস্ত, আমার এক মুহূর্ত সময় নেই।

মাধুরী বলল, কই, খাওয়ার টেবিলে তো তোমার চশমা নেই।

নীলিমা বলল, আপনি ব্যস্ত? ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি।

অমৃত মাধুরীর উত্তরটা অপেক্ষা করে নীলিমাকে বললেন, তোমার যদি বিশেষ কিছু জরুরি কথা থাকে, চটপট বলে ফেলল।

নীলিমা বলল, না থাক। আপনি ব্যস্ত। আমি চলে যাচ্ছি।

—তুমি আর একদিন আসতে পারো না? এই রবিবার? এখন তো কলকাতাতে থাকবে নিশ্চয়ই কয়েকদিন।

—নাঃ থাক, পরে আর দরকার নেই।

না বললে নয়?

মাধুরী বলল, তুমি একটু শুনে নাও না, এতদূর থেকে এসেছে।

অমৃত বললেন, বলতে তো বলছি, এই করে আরও সময় নষ্ট হচ্ছে।

মাধুরী বলল, বাইরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ওরকম ভাবে কথা হয় নাকি? ভেতরে এসো। ও বোধহয় আমার সামনে বলতে লজ্জা পাবে।

নীলিমা একবার মাধুরীর দিকে তাকাল, কিন্তু প্রতিবাদ করল না!

অমৃত বললেন, আমার সেমিনার শুরু হয়ে গেছে। আর বেশি দেরি হলে একটা লজ্জার ব্যাপার হবে।

মাধুরী ভঙ্গি করে বলল, ভারী তো সেমিনার।

নীলিমা অমৃতর পাশ কাটিয়ে তরতর করে নেমে যাচ্ছিল, অমৃত তার একটা হাত চেপে ধরে রূঢ়ভাবে বললেন, কী ব্যাপার? কী হয়েছে তোমার?

মাধুরী বলল, এই, সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ওরকম করে না। লোকে কী ভাববে।

তারপর সে খুব নরমভাবে নীলিমাকে বলল, তুমি ভাই রাগ করে চলে যেও না। ও মাঝে-মাঝে এরকম অদ্ভুত ব্যবহার করে। ভেতরে এসে বসো, প্লিজ।

মাধুরী নিজে এগিয়ে এসে নীলিমার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেল। অমৃতকে আসতে হল পেছনে পেছনে।

মাধুরী স্বামীকে বলল, তোমরা বাবলুর ঘরে বসে কথা বলো। ওই ঘরটা ফাঁকা আছে। আমি ততক্ষণ একটু চা করি।

অমত বুঝলেন, আর কথা বাড়ালে আরও সময় নষ্ট হবে। ভেতরে-ভেতরে তিনি ফুসতে শুরু করেছেন। নীলিমা তাঁর জীবনে একটা অশান্তি ঘটাতে এসেছে। নিশ্চয়ই কোনও কারণে প্রশান্তর সঙ্গে ওর ঝগড়া হয়েছে। তাতে অমৃতর কী করার আছে।

বাবলুর ঘরের দরজাটা টেনে খুলে তিনি নীলিমাকে বললেন, এসো। আমি মিনিট পাঁচেকের বেশি সময় দিতে পারব না।

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে তিনি চেঁচিয়ে বললেন, মাধুরী, আমার চশমাটা একটু খুঁজে দাও।

অমৃত বাবলুর পড়ার টেবিলের সামনের চেয়ারটায় বসে নীলিমাকে অন্য একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। কিন্তু নীলিমা বসল না। চেয়ারের পিঠ ধরে দাঁড়িয়ে সে চেয়ে রইল অমৃতর দিকে।

হাঁটু দোলাতে-দোলাতে অমৃত জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে তোমার? এবারে বলো।

নীলিমা বলল, আমি আজ আত্মহত্যা করব। কথাটাতে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিলেন না অমৃত। বিশুদ্ধ ন্যাকামি বলে মনে হল তাঁর। সামান্য মান

অভিমানের ব্যাপার হলেই মেয়েরা এরকম মরে যাওয়ার কথা বলে। সারা জীবনে প্রত্যেক মেয়েই বোধহয় প্রায় এক হাজার বার আত্মহত্যা করে। তা ছাড়া, আরও ভাবলেন, নীলিমা যদি আত্মহত্যা করতে চায় করুক না। তাঁর বাড়িতে এসে এরকম নাটক করার কী মানে হয় অমৃতর কী দায়িত্ব আছে? নীলিমার সঙ্গে তো তাঁর কখনও ভাব-ভালোবাসার সম্পর্ক হয়নি। যদিও মাধুরী বোধহয় সেইরকমই ভাবছে, একে যুবতী মেয়ে, তার ওপরে আবার বন্ধুর বোন, এ যেন এক বাঁধা ফমুলা।

তিনি নীরস গলায় জিগ্যেস করলেন, কেন?

আজ রাত্তিরে প্রশান্ত অন্য একজনকে বিয়ে করছে।

এবারে দারুণ চমকে উঠলেন অমৃত। কথাটা যেন বুলেটের মতন তাঁর কানে বিধল। এমনই অপ্রত্যাশিত এই বাক্যটি যে ভালো করে তার মাথাতেই ঢুকতে চাইল না।

—যাঃ, কী বলছ তুমি পাগলের মতন। প্রশান্ত…অন্য একজনকে…

—আপনার কাছে তো আমি মিথ্যে কথা বলতে আসিনি।

—অন্য মেয়েকে মানে কাকে?

—আপনি তাঁকে চিনবেন না। জামশেদপুরেরই মেয়ে।

—এরকম কিছু কি…হঠাৎ হল? তুমি আগে টের পাওনি? আগে আমায় কিছু জানাওনি কেন?

—আগে আপনার জানালে কী হত? সে যদি আমার কথাই না ভাবে, সে কি আপনার কথা শুনত? শুনলেও কি সেটা আমার পক্ষে সম্মানজনক হত?

—প্রশান্ত…প্রশান্ত এমন কাজ করবে? এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।

—আজ সন্ধেবেলায় ওদের রেজিস্ট্রি হবে।

–তুমি জামশেদপুর ছেড়ে চলে এলে? তুমি বাধা দিতে পারলে না?

—বাধা, এখন যদি কোনওক্রমে প্রশান্তর বিয়ে ভেঙেও যায়, তা হলেও কি আমি আর কোনও দিন ওর সঙ্গে কথা বলতে পারব? আমার পক্ষে তা সম্ভব?

অমৃত একবার বলতে চাইলেন, তুমি যদি প্রশান্তকে ধরে রাখতে না পারো, তার জন্য কি আমি দায়ী? কিন্তু একথাটা উচ্চারণ করতে পারলেন না। এ ব্যাপারে তিনি নিজের দায়িত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারেন না।

আজ থেকে তিন বছর আগে, তাঁর বন্ধু প্রদীপের বাড়িতে এই নীলিমা আর প্রশান্তকে নিয়ে একটা বিরাট গোলমাল হয়েছিল। প্রশান্তকে নীলিমার দাদা কিংবা বাবা-মায়ের একেবারেই পছন্দ নয়। অসবর্ণ বিয়েতেও ওদের ঘোর আপত্তি। অমৃত তখন প্রেমের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি নীলিমাকে বলেছিলেন, তুমি যদি মন ঠিক করে থাকো, তাহলে তুমি মা-বাবা-দাদার কথা শুনো না। প্রশান্ত আমার ছাত্র ছিল, আমি মানুষ চিনি। সে খাঁটি মানুষ।

বাড়ির সঙ্গে ঝগড়া করে নীলিমা জামশেদপুরে একটা মাস্টারি নিয়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু বিয়েটা তখনই হয়নি। কারণ প্রশান্ত বলেছিল, ওর একজন বড় বোন আছে, তার বিয়ে না হলে বাড়িতে বউ নিয়ে যাওয়া তার পক্ষে খানিকটা লজ্জার। সেই বোনের বিয়ের চেষ্টা চলছিল, নীলিমাও গরজ করেনি, প্রশান্তর সঙ্গে তার প্রায়ই দেখা হত, আর সব কিছুই স্বামী-স্ত্রীর মতন। আজ যদি রেজিস্ট্রিটাও হয়ে থাকত…

–প্রশান্তটা বড় স্কাউনড্রেল?

নীলিমা একটুও উত্তেজিত না হয়ে বলল, তার যদি অন্য একজনকে বেশি ভালো লেগে থাকে, সেজন্য খুব বেশি দোষ দেওয়া যায় কী? মানুষের জীবনে তো ও রকম হয়ই। প্রশান্ত আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। কিছু গোপন করেনি, সব খুলে বলেছে।

—কিন্তু তুমি?

—আমার কি আর অন্য কোনও উপায় আছে?

এই সময় খুব জোরে বেজে উঠল ট্যাক্সির হর্ন। সেই হর্ন শুনে কেঁপে উঠলেন অমৃত। ট্যাক্সিটার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি। ড্রাইভার নিশ্চয়ই তাঁকে মিথুক বা জোচ্চোর ভাবছে। ভাড়া না দিয়ে ফ্ল্যাট বাড়িতে পালিয়ে যাওয়া…মাধুরী রান্নাঘরে গিয়ে মনে-মনে হাসছে নিশ্চয়ই। সে ভাবছে, বন্ধুর বোন মানেই প্রাক্তন প্রেমিকা, সেই প্রেমিকা এসে বিপদে ফেলে দিয়েছে। অমৃতকে…আলাদা ঘরে বসে গোপন কথা…ওদিকে সেমিনার শুরু হয়ে গেছে, অমৃতকে খোঁজাখুঁজি হচ্ছে। বিশিষ্ট অধ্যাপক অমৃত চৌধুরী কথা দিয়ে রাখবেন না, এ কেউ বিশ্বাস করতেই পারবে না, প্রফেসার মহাপাত্র বলবেন, ওঁকে যেন দেখলাম একবার…

এই সবকিছুর মধ্যে একটি মেয়ের আত্মহত্যার প্রস্তাব…তিনি কী উত্তর দেবেন। শুকনো উপদেশ দেওয়ার কোনও মানে হয় না। প্রশান্ত সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, আমি মানুষ চিনি, মানুষ চিনতে তো ভুল হতেই পারে, সেটা এমন কিছু অপরাধ নয়, তবু নীলিমা তার মধ্যে একটা অপরাধবোধ। জাগিয়ে দিতে এসেছে…

আবার ট্যাক্সির হর্ন, সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে উঠল অমৃতর। এই মুহূর্তে যেন সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার ওই ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে সম্মান রক্ষা করা, লোকটি যদি চেঁচামেচি শুরু করে…

ঝট করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অমত। খাবারের টেবিলের সামনে তাঁর চশমাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাধুরী, ঠোঁটে সেই হাসি, আবার সে দেওয়াল ঘড়িটা দেখল।

অমৃত কাছে আসতেই মাধুরী বলল, আজ আর সেমিনারে গিয়ে দরকার নেই।

মাধুরীর হাত জড়িয়ে ধরে ব্যাকুলভাবে অমৃত বলল, আমার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে, আমাকে যেতেই হবে। মাধুরী, তুমি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলো, প্লিজ, ওকে আটকে রাখো, দ্যাখো যদি কোনও সাহায্য করতে পারো, আমার জন্য এইটুকু করো, প্লিজ…ট্যাক্সিটা চলে গেলে খুব বিপদ হবে…

চশমাটা নিয়ে তিনি দৌড়ে নেমে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে।

Facebook Comment

You May Also Like