Thursday, February 22, 2024
Homeবাণী-কথাসুখস্বপ্ন - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সুখস্বপ্ন – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আমার বন্ধু অমল দুপুরবেলা হঠাৎ ফোন করে জিগ্যেস করল, তুমি কি আজ বিকেলটা ফ্রি আছ? তাহলে তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটাতে পারি। নইলে তোমার সঙ্গে আর তিন-চার বছর দেখা হবে না।

আমি অবাক। পালটা প্রশ্ন করলুম। কেন, আমি কী অপরাধ করেছি, যে জন্য তুমি আমার সঙ্গে আর তিন-চার বছর দেখা করবে না?

অমল বলল, আমি আজ রাত্রের প্লেনেই নাইজিরিয়ায় চলে যাচ্ছি। মাঝখানে কয়েক ঘণ্টা মাত্র সময় আছে। এখন একটু ব্যস্ত আছি, তাহলে বিকেল পাঁচটায় দেখা করছি।

আমি খুবই কৌতূহলের সঙ্গে অমলের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলুম। মাত্র তিন মাস আগে। অমল দেশে ফিরে এসেছে বহুকাল বাদে। বিদেশে ও নানান জায়গায় চাকরি করেছে। ইওরোপ আমেরিকা ঘুরে ও শেষ চাকরি করছিল আফ্রিকার নাইরোবিতে। গত বছর নাইরোবিতে একটা ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেই উপলক্ষে ভারতীয়দের অনেক দোকানপাট লুঠ হয়। মিলিটারি এসে বাড়ি-বাড়ি সার্চ করার নামে সব জিনিসপত্র কেড়ে নিয়ে যায়। সে-সময় অমলের অবশ্য ব্যক্তিগত কোনও ক্ষতি হয়নি। ওর বাড়ি সার্চ হয়নি কিংবা মিলিটারি ওকে হয়রানি করেনি। কিন্তু অমলের আর মন টিকলো না। স্ত্রী-পুত্র সমেত গোটা সংসার তুলে নিয়ে চলে এল। কলকাতায়। আমাদের বলল, অনেকদিন দেশের বাইরে কাটিয়েছি, এখন দেশে থাকতেই ইচ্ছে করছে।

অমলের চাকরি পাওয়ার সমস্যা নেই। বিশেষ ধরনের কাগজ উৎপাদনের ব্যাপারে ও একজন বিশেষজ্ঞ। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে ও নতুন কাগজের কারখানা স্থাপনের কাজ করেছে। কাগজের চাহিদা এইসব দেশে দিন-দিন বাড়ছে, সুতরাং অমলের মতন বিশেষজ্ঞদেরও কদর বাড়ছে।

দু-মাস বিশ্রাম নেওয়ার পর অমল সদ্য চাকরি খুঁজতে শুরু করেছিল। সঙ্গে-সঙ্গে নানান জায়গা থেকে ওর ডাক পড়ে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অমল অনবরত বোম্বাই-দিল্লি-মাদ্রাজ যাতায়াত করছিল। এমনকী শুনেছিলুম একজন ব্যবসায়ী অমলকে সপরিবারে দশদিনের জন্য কাঠমাণ্ডুতে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানে বসে-বসে অমল চাকরির শর্ত নিয়ে চিন্তা করবে। চাকরির বাজারে। অমলের এত খাতির দেখে অনেকেরই ঈর্ষা হবার কথা। সেই অমল আবার আফ্রিকায় ফিরে যাচ্ছে কেন?

বিকেলবেলা অমল এসে যা বলল, তার সারমর্ম এই:

প্রথম কথা, কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে তার চাকরি করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কারণ পশ্চিমবঙ্গে চালু ইণ্ডাস্ট্রিগুলোই এক-এক করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নতুন কারখানা খোলার কথা এখানে কোনও ব্যবসায়ী চিন্তা করে না। অমলের অবশ্য ভারতবর্ষের যে-কোনও জায়গাতেই চাকরি করতে আপত্তি নেই। বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়ে মোটামুটি দুটি কোম্পানি ওর পছন্দ হয়েছিল। প্রথমটি বোম্বাইতে, সেখানে যোগ দেওয়ার সব ব্যবস্থা ঠিকঠাক, হঠাৎ মালিকদের দুই ভাইয়ের ঝগড়ার জন্য হাইকোর্টের ইনজাংকশানে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অমল বলল, তুমি ভাবতে পারো, দুই ভাইয়ের ঝগড়ার জন্য কারখানার প্রোডাকশন বন্ধ? প্রোডাকশন বন্ধ হলে তো সেটা দেশের ক্ষতি। তা ছাড়া মালিকদেরও তো লাভের অংশ কমে যাচ্ছে, সেটাও ওরা বোঝে না?

দ্বিতীয় চাকরিটি বাঙ্গালোরে। এটা সব দিক থেকেই ঠিক ছিল। নতুন কারখানা খোলা হবে, তার দায়িত্ব নিতে হবে অমলকে। এই মাসের এক তারিখ থেকে অমলের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবার কথা। কিন্তু মালিক জানাল যে তাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হবে তিন তারিখে। এক তারিখের বদলে তিন তারিখ কেন? মালিক প্রথমে কারণটা বলতে চায়নি। কিন্তু অমল জেদ ধরায় জানতে পারলে যে মালিক সব সময় পঞ্জিকা দেখে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেন। পঞ্জিকার মতে তিন তারিখটা শুভ দিন।

আমার চোখে অবিশ্বাস ফুটে উঠতেই অমল হেসে উঠে বলল, আরও শুনবে? ওই কোম্পানির কর্মচারীরা, যাদের মধ্যে বড়-বড় ইঞ্জিনিয়ার এবং টেকনোক্রাট আছে, তারাও মালিকের ঘরে ঢুকবার সময় জুতো বাইরে খুলে রেখে যায়, মালিকের সামনে কেউ চেয়ারে বসে না, মালিকের সামনে সিগারেট খাওয়ার কথা তারা কেউ কল্পনাই করতে পারে না। মালিক নিজে নিরামিষভোজী বলে ওই কোম্পানির অফিসের ক্যান্টিনে শুধু নিরামিষ খাবার দেওয়া হয়। আমাকে ওই কোম্পানি থেকে বাড়ি, ড্রাইভার সমেত গাড়ি, অন্যান্য আরও সুযোগ-সুবিধে আর ইনকাম ট্যাক্স বাদ দিয়ে ক্যাশ চার হাজার টাকা মাইনে দেবার লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছিল, আমি রাজি হলুম না। যে মালিকের সামনে সিগারেট খাওয়া নিষেধ, তার সঙ্গে আমি কাজ করতে পারব না। আমি অবশ্য যে কদিন দেখা করেছি, জুতো খুলিনি, চেয়ারে বসেছি এবং পরপর সিগারেট টেনেছি। মালিকও আমার সঙ্গে বন্ধুর মতন ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমি জানি, দেড়-দু বছর বাদে যখন কারখানাটা চালু হয়ে যাবে, আমারও বিদেশের চাকরির কানেকশানগুলো একটু ঢিলে হয়ে যাবে, তখন ওই মালিক আমার সঙ্গে ওর বাড়ির চাকরের মতন ব্যবহার করতে শুরু করবে।

উঠে দাঁড়িয়ে বিদায় নেওয়ার সময় অমল বলল, দেশ ছেড়ে কেন চলে যাচ্ছি জানো? ভারতবর্ষের চেয়ে আফ্রিকা অনেক সভ্য জায়গা।

আমার আর-একজন বন্ধু তপনের অভিজ্ঞতা একটু অন্যরকম। আমেরিকায় বেশ ভালো চাকরি করত তপন, কিন্তু দেশের জন্য বরাবর তার টান ছিল। একবার প্লেনে জাপান যাওয়ার সময় একজন ভারতীয় ভদ্রলোকের সঙ্গে তার আলাপ হয়। ভদ্রলোক নানা কথার পর তপনকে। একসময় বললেন, আপনার মতন গুণী ছেলেরা বাইরে পড়ে থাকবেন? দেশে সুযোগ পেলে আসবেন না? তপন বলেছিল, দেশে আমাদের কে চাকরি দেবে বলুন? দেশে তো এমনিতেই বেকারের সংখ্যা অনেক! ভদ্রলোক বললেন, আমি যদি আপনাকে চাকরি দিই?

সেই ভদ্রলোক ভারতবর্ষের একটি নামকরা ওষুধ কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেকটর। তিনি তপনকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় ফিরলেন এবং তাঁর অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে তপনকে। চাকরির প্রস্তাব দিলেন। আমেরিকার চাকরির মাইনে এবং সুযোগসুবিধের সঙ্গে ভারতীয় চাকরির মাইনে ইত্যাদির তুলনাই হয় না। তবু তপন রাজি হয়ে গেল। আমেরিকায় তার বারো বছরের পুরোনো চাকরি ছেড়ে দিয়ে এল এক কথায়। আসবার আগে আমেরিকায় তার বন্ধুবান্ধবরা খুব ঠাট্টা করেছিল। তারা বলেছিল, সেই তো আবার ফিরে আসতেই হবে, কেন শুধু-শুধু যাওয়া? ইন্ডিয়াতে অত গরম, রাস্তাঘাট খারাপ, লোডশেডিং, যখন-তখন মারামারি, জল পাওয়া যায় না—এর মধ্যে কোনও সভ্য মানুষ থাকতে পারে! তপন তেজ দেখিয়ে বলেছিল, আমি কক্ষনো আর ফিরে আসব না। গ্রিন কার্ড ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে যাব।

দেশে ফিরে নতুন চাকরিতে তপন খুব খুশি হয়েছিল। দেখা হলেই বলত, দারুণ লাগছে, আমি প্রত্যেকটা মিনিট উপভোগ করছি। লোডশেডিং সম্পর্কে তার বিরক্তি নেই, ভাঙা রাস্তা দিয়ে খুব সহজে গাড়ি চালিয়ে যায়, এখানকার সমস্ত খাবারদাবার তার খুব পছন্দ।

অন্তত ছমাস আমি তপনকে এই রকম মুডে দেখেছিলুম। তারপর একদিন দুপুরবেলা তপন এসে বলল, চলো, আজ কোনও বড় হোটেলে খেতে যাব। আজ একটা ব্যাপার সেলিব্রেট করতে হবে।

আমি জিগ্যেস করলুম, কী ব্যাপার? তোমার কি এরই মধ্যে চাকরিতে প্রমোশন হলো নাকি?

তপন একগাল হেসে বলল, না, আজ থেকে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।

তখনও আমি ভেবেছিলাম যে তপন নিশ্চয়ই প্রথম চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে আরও কোনও ভালো। চাকরির সন্ধান পেয়েছে বলে। কিন্তু ঘটনাটা তাও নয়। তপন বলল, এই চাকরিটাই যথেষ্ট ভালো ছিল, এর চেয়ে ভালো চাকরি সে আশা করে না। তবু কেন তপনকে চাকরি ছাড়তে হল?

তপন অত্যন্ত ভদ্র ছেলে। সে কারুর নামে অভিযোগ জানাতে চায় না। সে শুধু হতাশভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, এখানে কাজ করার কোনও পরিবেশ নেই। কেউ কাজ করতে চায় না। দু-একজন কাজ করতে চাইলেও অন্যরা তাদের বাধা দেয়। আমেরিকায় এতদিন থেকে আমার একটা বাজে অভ্যেস হয়ে গেছে। কাজ না করে মাইনে নিতে লজ্জা করে।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে তপন আবার বলল, এমনকী মালিকরাও চায়, যা চলছে তা-ই চলুক, বেশি প্রোডাকশান বাড়াবার দরকার নেই। কোম্পানি এক্সপ্যাণ্ড করলে আরও অনেক লোক নিতে হবে, তাতে আবার লেবার-ট্রাবল দেখা দিতে পারে ইত্যাদি। এইরকম মনোভাব নিয়ে আমার পক্ষে কাজ করা অসম্ভব!

আমি জিগ্যেস করলুম, তা হলে কী করবে? আমেরিকাতেই ফিরে যাবে আবার?

তপন বলল, কী করি বলো তো? আমেরিকায় যখন মাঝে-মাঝে খুব মন খারাপ হয়ে যেত, তখন ভাবতুম কবে যে দেশে ফিরে যাব! দেশ ছিল আমার কাছে একটা সুখস্বপ্ন। সেই স্বপ্নটাই নষ্ট হয়ে গেল।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments