Thursday, February 29, 2024
Homeকিশোর গল্পপায়রা - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পায়রা – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পায়রা - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমার দিদিটা পুরো একটা পাগলি। স্কুলে গরমের ছুটি। এই সময়টায় স্কুল বিল্ডিং রং করা হয়। মহা বিপদ হয় পায়রাদের। রংমিস্তিরা পায়রা-টায়রা বোঝে না। ভারায় উঠে ভলভল করে বিড়ি টানে, গলগল করে গান গায়। খ্যাস খ্যাস করে রঙের পোঁচরা মারে। বাসা থেকে পায়রার ডিম ফেলে দেয়। পায়রাদের বসতে দেয় না, থাকতে দেয় না। স্কুলের গায়েই নন্দদের বিশাল বনেদি বাড়ি। টেরিফিক বড়লোক। জীবনে কখনও রুটি খায়নি। লুচি আর পরোটা। কথায় কথায় পোলাও। পাঁঠা আর মুরগির ভুষ্টিনাশ। বাড়ির ছোট ছেলেরা কমলাভোগ দিয়ে ক্রিকেট খেলে। আইসক্রিমে মানিপ্ল্যান্ট। গিজগিজ করছে গাড়ি। লাল, নীল, হলদে, সবুজ। নন্দদের অনেক বেড়াল। খেয়ে খেয়ে এক-একটা কেঁদো বাঘের বাচ্চা। এদের মধ্যে একটা বেড়াল ছোটলোক, শয়তান। রোজ একটা করে পায়রা ধরবেই ধরবে। এক নম্বরের জানোয়ার। হুমদো মতো দেখতে। মেটে মেটে গায়ের রং।

এক ঝাঁকানিতে ঘুম ভেঙে গেল। বিছানায় চাঁদের আলো এসেছে। দিদি ঝুঁকে আছে মুখের ওপর। রাত কটা কে জানে! থানার পেটা ঘড়ি একটু পরেই হয়তো বাজবে। জানলার বাইরে ঝপ ঝপ শব্দ করে কী একটা উড়ে গেল। রোজই যায়, দেখতে পাই না। দিদি বলে, পরি। বিদ্যাধরীতে চান করতে আসে। আমাদের গ্রামের একটা মেয়ে লক্ষ্মীপুজোর রাতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ফকির দাদু বলে, সে পরি হয়ে গেছে। লক্ষ্মী পুজোর রাতে মেয়ে অদৃশ্য হলে বুঝতে হবে সে পরি হয়ে গেছে। ছেলে অদৃশ্য হলে, দেবদূত। যদি হঠাৎ কোনো কুকুর লক্ষ্মীপুজোর রাতে অদৃশ্য হয়ে যায়, সে নির্ঘাত হবে যমদূত। এসব আমাদের হরিদার একেবারে মুখস্থ। নলহাটির গুরুদেব কৃপা করে শিষ্যকে এই সব জ্ঞান দিয়েছেন। সেই গুরুদেবের এমন ক্ষমতা। নিজেকে ইচ্ছামতো ছোট-বড় করতে পারেন। এই শিশুর মতো ঘরের মেঝেতে হামা দিচ্ছেন তো কিছুক্ষণ পরেই সাত-আট ফুট লম্বা একটা মানুষ বোম্বাই আম পাড়ছেন।

দিদির উত্তেজিত গলা, ‘শিগগির ওঠ, শিগগির ওঠ।’

‘কেন কী হয়েছে?

‘সর্বনাশ হয়ে গেছে। বড় টর্চটা নিয়ে আমার সঙ্গে চল।

‘কোথায় যাব?’

‘কোনও প্রশ্ন নয়।’

সদর দরজাটা বিশাল। জমিদারি আমলের। দুজনে ধরাধরি করে খিলটা সবে নামিয়েছি। একটু শব্দ হয়েছে পাশেই হরিদার ঘর। দরজা খুলে গেল হরিদার ঘরের। ধূপের গন্ধ। কথাটা সত্যি। বাড়ির সবাই যখন ভোঁস ভোঁস মোষ, হরিদা তখন পুজোয় বসে।

‘চোরের মতো দুজনে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’

দিদির কাঁদো কাঁদো গলা, ‘পায়রাগুলো বোধহয় সব মরে গেল!

‘কার পায়রা, কীসের পায়রা?’

‘স্কুলের পায়রা।’

‘মরে গেল কেন? লেখাপড়ার চাপে!’

‘স্কুলবাড়ি মেরামতি হচ্ছে। মদন মিস্ত্রি সব ফোকরে ইট গুঁজে দিয়েছে। পাশেই নন্দদের বাড়ি। বাইশটা বেড়াল। সব ক-টাই জানোয়ার। ধরছে আর খাচ্ছে।’

হরিদা দালান থেকে উঠোনে নামলেন, ‘উপায়? মেজোবাবুকে জিগ্যেস না করে কিছু তো করা যাবে না। কিছু তো করতেই হবে। তোমরা আগে মেজোবাবুকে ডাকো।’

জ্যাঠামশাই বিছানায় উঠে বসলেন। সব শুনে বললেন, ‘বন্দুক নামা।’

দিদি বললে, ‘আমরা পায়রাদের বাঁচাবার কথা বলছি, মারার কথা নয়।’

‘সে আমি বুঝেছি। পায়রাদের বাঁচাতে হলে নন্দদের বেড়ালগুলোকে পাইকিরি দরে মারতে হবে। ঠাঁই, ঠাঁই, ঠাঁই।’

আমাদের পেছনে হরিদা। হরিদা বললে, ‘মারামারি, রক্তপাত, এসব ভালো নয়। পায়রাদের বাসা খুলে দিতে হবে।’

‘কে খুলবে?’

‘যে বন্ধ করেছে।’

‘কে বন্ধ করেছে?’

‘ওই যে, মদন মিস্ত্রি।‘

‘কার হুকুমে? নিশ্চয় কারও হুকুম আছে।’

‘সে তো অবশ্যই।’

‘এই হুকুম যে দিয়েছে সে নরকে যাবে। সকাল হোক, আমি একটা হুলুজুলুস বাধিয়ে দেব।’

দিদি বললে, ‘অতক্ষণ অপেক্ষা করা যাবে না। পায়রারা সব পালক হয়ে যাবে।’

‘তা হলে?’

হরিদা বললে, ‘মদনকে বিছানা থেকে তুলে ভারায় তুলতে হবে। একটা একটা করে ইট ফোকর থেকে সরাতে হবে। ভোর হওয়ার আগেই কেল্লা ফতে।’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘চলো মদন।’

নিশুতি রাত। ফটফটে চাঁদের আলো। নারকোল গাছের ঝিরিঝিরি পাতা বাতাসে দুলছে। টপটপ করে যেন দুধ ঝরে পড়ছে। গঙ্গার পাশ দিয়ে ইট বাঁধানো একটা পথ। চলেছে, চলেছে। নির্জন একটা পল্লির দিকে। সেখানে সবাই মাছ ধরে। জোয়ার এসেছে কখন। ভরা গঙ্গা। পরের পর, পরের পর নৌকো বাঁধা। টলটল করছে। কালীমন্দিরে চূড়াটা কে বুঝি রুপোর পাত দিয়ে মুড়ে দিয়েছে আজ রাতে। ক্রমে গাছের জটলা আরও বাড়ল। ছায়া ছায়া, নির্জন। একের-পর-এক। চালাবাড়ি। দিদি আমার হাতটা ধরে আছে। আমার দিদিটা যে এত সুন্দর, এই চাঁদের আলোয় ছায়াপথে না এলে বোঝাই যেত না; যেন ছোট্ট মা দুর্গা।

ফিশফিশ করে জিগ্যেস করল, ‘ভয় করছে?’

বললুম, ‘তুই তো আছিস।’

‘এই রকম চাঁদের আলোর রাতে আমরা এবার থেকে বেড়াতে বেরোব। দূর, দূর, অনেক দূরে চলে যাব, তখন সূর্য উঠবে। মহাপ্রভুর মন্দিরে কীর্তন জেগে উঠবে।‘

উঃ, কী ভালো লাগছে! মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি।

হারুর খুব সাহস। রাত্তির বেলায় ঘুমোয় না। বিছানায় মটকা মেরে পড়ে থাকে। মা ঘুমিয়ে পড়লেই পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসে। দীনবন্ধুদার মাছধরা নৌকোয় চেপে কত দূরে দূরে চলে যায়। একবার গঙ্গার ধারের একটা বড় মাঠে দেখেছিল, একই রকম চেহারার একশোজন বুড়ো ধেই ধেই করে নাচছে। দীনবন্ধুদা তিনবার জোরে জোরে ‘রাম, রাম’ বলতেই সব অদৃশ্য।

তেঁতুল গাছের তলায় মদনদার বাড়ি। চালে লাউ গাছ। ফুল ফুটেছে। চাঁদের দুধ খাচ্ছে। শিশুর মতো। হারু কিন্তু ঠিক বলেছিল, রাত্তির বেলা মানুষের নাক মোটা মোটা হয়ে যায়, ঠোঁট পুরু পুরু আর চোখ দুটো হয়ে যায় গুহার মতো। হরিদার মুখটা ঠিক ওই রকম দেখাচ্ছে। তাকাতে ভয় করছে। যেন দৈত্যের মুখ।

রাস্তার দিকে ঘর। জানলা খোলা। বেপরোয়ানাক ডাকছে। মশারি ফেলা। মদনদা শুয়ে আছে। পাশে শুইয়ে রেখেছেইয়া মোটা একটা লাঠি। এত জোরে নাক ডাকছে, মনে হচ্ছে, একটা লরির চালে কেউ শুয়ে আছে।

জ্যাঠামশাই ডাকছেন, ‘মদন, মদন।’ থেমে গেল নাকের গর্জন। লাঠিটা পাকড়ে ধরেছে। বললে, ‘মেজোবাবু! সাবধান, ঝেড়ে দেবে।’

জ্যাঠামশাই বাজখাঁই গলায় ডাকলেন, ‘মদনা!’

ঘুম চটকে গেল। মশারি তুলে মুণ্ডুটা বের করে বললে, ‘আই বাপ! মেজোবাবু!

মদনদা বেরিয়ে এল, ‘এত রাতে? আপনি?’

‘পায়রাদের উচ্ছেদ করলে কার হুকুমে?

‘আজ্ঞে পায়রা? কার পায়রা?’

‘ইস্কুলের পায়রা। যে-ইস্কুলে তুমি মেরামতির কাজ করেছ। ফোকরে ফোকরে পায়রারা থাকত, ‘তুমি সব ইট গুঁজে দিয়েছ।’

‘আই বাপ, সে খবরও পৌঁছে গেছে আপনার কাছে!’

‘হ্যাঁ গেছে। এখন চলো।’

‘কোথায় যাব?’

‘কোথায় আবার, ইস্কুলে। ভোর হওয়ার আগে একটা একটা করে ইট বের করবে।’

‘এই রাতে! অন্ধকারে!’

‘অন্ধকার? ফটফট করছে চাঁদের আলো।’

‘আপনি ক’টা পায়রার জন্যে ভাবছেন? ওরা নিজেদের জায়গা ঠিক খুঁজে নেবে।’

‘না, নেবে না। ওরা যেখানে ছিল সেইখানেই থাকবে। তোমাকে তোমার বাড়ি থেকে বের করে দিলে কেমন লাগবে?

‘তা ঠিক।’

‘তবে?’

‘তা হলে রাতারাতি খুলে দি। ভারা তো বাঁধাই আছে। সকালে খুলতে গেলে ওরা চেল্লাবে।’

‘পঞ্চাশ বছর ধরে পায়রারা ওখানে আছে। ওটা ওদের জায়গা। ওরা আদালতে গেলে কী হবে? রায় ওদের দিকেই যাবে।’

‘আজ্ঞে, আদালতেও পায়রা আছে। রাজভবনে আছে। পায়রা কোথায় নেই!’

মদনদা ভারায় উঠছে আর বলছে, ‘নিজেকে কীরকম যেন চোর-চোর মনে হচ্ছে।’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘বকবক না করে ইট খোলো।’

একশো-দেড়শো পায়রা কার্নিশে সার দিয়ে বসে আছে। অসহায়-ছবি। মদনদা তাদের কাছাকাছি পৌঁছোতেই সব ছুটে এল যেন আদর করতে। মাথায় বসছে, কাঁধে বসছে। ডানার ফটফট শব্দ। মদনদা ওপর থেকে বললে, ‘মেজোবাবু! আদরের বহরটা একবার দেখুন। এরা মানুষের চেয়ে ঢের ভালো।’ পাশের পাঁচিলে নন্দদের সেই খুনি গোদা বেড়ালটা ঘাপটি মেরে পাতার আড়ালে বসেছিল। ম্যাও শব্দ করে জানিয়ে দিল, মদন, ঠিক ঠিক।

কাজ যখন শেষ হল, ঘড়িতে তখন তিনটে। পুব আকাশে আলো ফুটছে। সূর্যদেব আসছেন। বিরাট একটা রুপোর থালা চাঁদ। পশ্চিমে গঙ্গার জল ছুঁয়েছে। শেষ রাতে চাঁদের চান। ঝিলিমিলি আলোর পথ এপারে চলে এসেছে।

মদনদা ভারা থেকে নেমে এল ধুপুস করে। গঙ্গার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। নিজের মনেই বলছে, ‘বাপরে। পৃথিবীটা কী সুন্দর! জানাই ছিল না শেষ রাতে এত সব কাণ্ড হয়। চাঁদটাকে আকাশ থেকে পেড়ে এনে দেয়ালে ঝুলিয়ে দিলেই হয়।’

‘ভালো একটা দেয়াল চাই’, জ্যাঠামশাই বলছেন, ‘যে দেয়ালে চাঁদ ঝুলবে। আজই তোমাকে আমি গঙ্গার ধারে তিনকাঠা জমি রেজিস্ট্রি করে দেব, বাড়িটা তুমি করে নেবে। রাজমিস্ত্রি! অন্যের বাসস্থান করে দিয়ে জীবন কাটালে, নিজের জন্যে কিছুই করা হল না।’

মদনা জ্যাঠামশাইয়ের পায়ে সাষ্টাঙ্গ। ওপরে পায়রারা ডানার তালি বাজাচ্ছে।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments