Sunday, May 19, 2024
Homeথ্রিলার গল্পভৌতিক গল্পভৌতিক গল্প: মানুষ কাঁদে

ভৌতিক গল্প: মানুষ কাঁদে

ভৌতিক গল্প: মানুষ কাঁদে

ভদ্রলোকের নাম প্রত্যয় গাজি। বহু বছর বিদেশে ছিলেন। দেশে ফিরে সংসার পেতে সুখী হতে চাইছেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা শিস। এই শিস সামান্য নয়, কাল্পনিক নয়, নকল নয়, স্বাভাবিক নয়, নিরীহ বা শিষ্ট নয়, আর শুভ তো নয়ই। এই শিসের ক্ষমতা…ওটা শুনে মানুষ নাকি সত্যি সত্যি পাগল হতে বসেছে।

আমি, ডাক্তার আজাদুল কান্তিক, কিছুদিন কামরূপ কামাখ্যায় ছিলাম। ইংল্যান্ডে থাকার সময় সুপারন্যাচারাল আর ব্ল্যাক আর্ট নিয়ে গবেষণা করেছি। খবরের কাগজে এসব পড়ে প্রত্যয় গাজি ফেসবুকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। যোগাযোগ মানে, সাহায্য করার কাতর আবেদন। নানা কাজে আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়, তাঁর ই-মেইল পাওয়ার এক মাস পর সময় বের করতে পারলাম এবং ভূত তাড়াতে ভবানীপুরে হাজির হলাম। ভূত তাড়াতে? হ্যাঁ, কারণ সবার নাকি ধারণা, ওই শিস নির্ঘাত কোনো ভূতের কারসাজি।

প্রসঙ্গত, ইতিমধ্যে আমাকে জানানো হয়েছে, ভূত বা জিন-পরি খেদানোয় সুদক্ষ ওস্তাদেরা একে একে পরাজয় মেনে নিয়ে মঞ্চ ছেড়ে আগেই বিদায় নিয়েছেন। ভৌতিক শিস সমস্যার কোনো সমাধান তাঁরা কেউ দিতে পারেননি। এখন নাকি একা আমিই শুধু ওদের ভরসা।

দেখা যাক, কতটুকু কী করতে পারি। এ উপলক্ষে আমার এলেমেরও একটা পরীক্ষা হয়ে যাবে—এ রকম একটা চিন্তা নিয়ে ভবানীপুরে গেলাম। ভাবলাম, খুব জোর এক কি দুটো দিন ব্যয় করব। আশা করা যায়, তাতেই সমস্যার সমাধান বের হয়ে যাবে। কিন্তু ওখানে আমাকে কয়েক সপ্তাহ থাকতে হয়েছে, অথচ সমস্যার কোনো সমাধান এখনো বের করতে পারিনি। এই কয় সপ্তায় যা দেখেছি, মহা বিস্ময়কর একটা অভিজ্ঞতা ছাড়া সেটাকে আর কিছু বলা যায় না।

আমি এখন এই কাহিনির মাঝখানে রয়েছি। অর্থাত্, শুরুটা জানি, শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে, বলতে পারছি না। জরুরি একটা কাজের ডাক পেয়ে ভবানীপুর থেকে ঢাকায় ফিরে আসতে হয়েছে আমাকে। কাজটা সেরে কদিন পর আবার ওখানে যাব। তার আগে কী ঘটেছে, অর্থাত্ কাহিনির প্রথম অংশটা তোমাদের জানানোর ইচ্ছা নিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসেছি।

কাহিনির এই অংশটা সোজাসুজি একবার লিখে ফেলতে পারলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার ও স্পষ্টভাবে দেখতে পাব আমি। তবে তার আগে জানিয়ে রাখি, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমি পুরোপুরি স্তম্ভিত ও বিধ্বস্ত। ‘ভর’ করার যত কেস আমার জীবনে আমি দেখেছি বা শুনেছি, এটার সঙ্গে সেগুলোর তুলনা চলে না।

দুই-আড়াই শ বছর আগে হরপ্রসাদ সিংহ ভবানীপুরের জমিদার ছিলেন। তাঁর প্রকৃতি আর চালচলন ছিল নির্দয় ও লোভী রাজা-বাদশাদের মতো। যৌবনকালে তিনি ব্যস্ত ছিলেন নিজের জমিদারির সীমানা বাড়ানোর কাজে, নিজেকে যাতে একসময় রাজা হিসেবে ঘোষণা করা যায়। এই লোভ চরিতার্থ করার জন্য ছল-বল-কৌশল—কোনো অস্ত্রই প্রয়োগ করতে দ্বিধা করতেন না। কাজেই অত্যন্ত শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী পুষতে হতো তাঁকে। তাজমহলের আদলে একটা রাজপ্রাসাদ তৈরির পরিকল্পনা ছিল তাঁর। তবে ঘোড়ার আগে চাবুক কেনার মতো সেই প্রাসাদকে রক্ষার জন্য প্রথমে ছোটখাটো একটা দুর্গ তৈরি করেছিলেন।

প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য লাঠিয়াল কিংবা জল্ল্ল্লাদ পাঠাতেন হরপ্রসাদ। দুর্গ তৈরি হওয়ার পর দেখা গেল, শত্রুদের ধরে আনাচ্ছেন তিনি, নির্যাতন কিংবা খুন যা করার সব তাঁর সামনে করা হচ্ছে। ওই দুর্গের দু-একটা ঘরে লোহার রড আর পাত দিয়ে বিরাট আকৃতির চুলা তৈরি করা হয়, প্রতিপক্ষ লোকজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার জন্য।

তথাকথিত সেই দুর্গ পাথর দিয়ে তৈরি হওয়ায় কিছুই তার ভেঙে পড়েনি এখনো। বিয়ে উপলক্ষে শখ করে কেনার পর এই দালানে উঠেছেন প্রত্যয় গাজি। ওঠার পর আবিষ্কার করেছেন, টাকা দিয়ে মারাত্মক একটা অশান্তি কিনেছেন তিনি।

ভবানীপুর স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে দেখি, আমাকে নিতে প্রত্যয় গাজি নিজেই চলে এসেছেন। ছোট একটা পুরোনো ফিয়াট গাড়িতে তুলে আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর কেনা দুর্গে। নানা কথার ফাঁকে আমাকে তিনি দুটো তথ্য দিলেন। এক. তাঁর বাড়ির ভৌতিক কাণ্ড দেখে চাকরবাকর প্রায় সবাই পালিয়েছে, দুই. পাশের গ্রামে বিদ্যুত্ আছে, কিছুদিনের মধ্যে সেখান থেকে তার টানার কাজ শুরু হবে। অর্থাত্, তাঁর কেনা দালান ও আশপাশের এলাকা রাতের বেলা অন্ধকারে ডুবে থাকে।

প্রত্যয় গাজির বয়স ৩৫-৩৬ হবে, সুঠাম স্বাস্থ্য, চোখে-মুখে পরিশীলিত ভাব। দুর্গের ভেতর আর বাহির, দুদিকেই সাদা রং করেছেন তিনি। দালানের নতুন নামকরণও করা হয়েছে—আদেশা।

আদেশা তাঁর পছন্দ করা পাত্রীর নাম, যাকে তিনি বিয়ে করতে যাচ্ছেন।

কথায় কথায় জানতে পারলাম, প্রত্যয় গাজি তাঁর ছোট ভাই আর এক বিদেশি বন্ধুকে নিয়ে উঠেছেন ওখানে। বেশ কয়েক বছর আমেরিকায় ছিলেন। দেশে ফিরেছেন মাস ছয়েক আগে। মাত্র দুই সপ্তাহ হলো তাঁর বিয়ে উপলক্ষে কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছেন বন্ধু অমল ঘোষ। আমেরিকাতেই ওঁদের পরিচয় ও বন্ধুত্ব।

আমি পৌঁছেছি সন্ধের খানিক পর। হাত-মুখ ধুয়ে ওঁদের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসলাম। কী ঘটনা, সব আমাকে ওই খাওয়ার ফাঁকে বলে গেলেন প্রত্যয় আর তাঁর ভাই ব্যত্যয়। অমল ঘোষ অত্যন্ত শান্ত আর ঠান্ডা প্রকৃতির মানুষ, নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করছেন। ওঁরা সবাই একমত, আর সব কাহিনির সঙ্গে এটার মিল খুঁজতে যাওয়া বৃথা। খুবই অস্বাভাবিক একটা ঘটনা।

প্রত্যয় গল্পটা ঠিক মাঝখান থেকে শুরু করলেন। ‘আমাদের এই আদেশায় একটা কামরা আছে,’ বললেন তিনি, ‘যে কামরা থেকে নারকীয় শিস দেওয়ার আওয়াজ বেরোচ্ছে। ওই আওয়াজ যেহেতু সবাই শুনতে পাচ্ছে, অথচ তার উত্স খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কাজেই ধরে নিতে হবে, ওই কামরার ওপর কিছু একটা ভর করেছে, তাই না? শিসটা যখন-তখন শুরু হয়ে যায়, আগে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই কখন শুরু হবে। একবার শুরু হলে আপনি ভয়ে দিশেহারা না হওয়া পর্যন্ত ওটা থামবে না। এটা সাধারণ কোনো শিস নয়। শুধু বাতাসও নয়। অপেক্ষা করুন, নিজের কানেই শুনবেন।’

‘আমাদের সবার কাছে পিস্তল আছে,’ ৩০-৩২ বছর বয়সী সুদর্শন তরুণ, প্রত্যয় গাজির ভাই ব্যত্যয় গাজি কোটের পকেটে হাত চাপড়ে বললেন।

‘পরিস্থিতি এতই খারাপ?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘এলাকায় ভয়ংকর সব ডাকাতি হয়, বিশেষ করে প্রবাসীদের বাড়িতে,’ বললেন প্রত্যয়। ‘লাইসেন্স জোগাড় করে পিস্তল কিনতে বাধ্য হয়েছি আমি। আর ব্যত্যয় পুলিশ অফিসার।’

‘আমাদের বাড়িতে ডাকাতি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না,’ বললেন পুলিশ কর্মকর্তা ব্যত্যয় গাজি। ‘বিপদ যদি কিছু আসে তো ওই শিস থেকেই আসবে…’

‘যতই অসাধারণ হোক, স্রেফ একটা শিসই তো? তার কী ক্ষমতা যে বিপদে ফেলে দেবে বা কারও কোনো ক্ষতি করতে পারবে?’ জানতে চাইলাম।

‘আওয়াজটা সব সময় নরম থাকে না,’ বললেন প্রত্যয়। ‘না শোনা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। একবার আমার মনে হয়, ওটা জাগতিক কিছু হতে পারে না। আবার তার পরই ভাবি, এটা কোনো ধরনের ধূর্তামি। আমাকে এখান থেকে ভাগানোর জন্য নোংরা কোনো কৌশল।’

‘কিন্তু কেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘তাতে কার কী লাভ?’

জবাবে প্রত্যয় বললেন, ‘আমাকে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে চাওয়ার খুব ভালো একটা কারণ আছে। এই এলাকায় একটি মেয়ে আছে, তার নামই আদেশা। হ্যাঁ, এই আদেশা আমার স্ত্রী হতে যাচ্ছে, আজ থেকে ঠিক দুই মাস পরে। ভূ-ভারতে যত মেয়ে জন্মেছে, তাদের সবার চেয়ে সুন্দরী সে। এলাকার অসংখ্য তরুণ দু-তিন বছর ধরে তার মন জয় করার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আদাজল খেয়ে লেগে আছে। হঠাত্ আকাশ থেকে পড়ার মতো হাজির হলাম আমি। আদেশাও আকুল হয়ে ওদের দৃষ্টিপথ থেকে আমার দিকে ছুটে এল। এবার কল্পনা করুন, আমার ওপর তারা কেমন খ্যাপা খেপেছে।’
‘হ্যাঁ,’ বললাম আমি। ‘একধরনের রেষারেষির আভাস পাচ্ছি। কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, এসব ওই কামরার ওপর কীভাবে কাজ করছে?’

‘কীভাবে কাজ করছে বলছি,’ বললেন প্রত্যয়। ‘আদেশার সঙ্গে পাকা কথা হয়ে যাওয়ার পর আমি বাড়ির খোঁজ করতে থাকি এবং এই দালানটা পছন্দ হওয়ায় তাড়াহুড়ো করে কিনে ফেলি। পরে একটা সারপ্রাইজ হিসেবে ওকে আমি খবরটা দিই। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ওদের বাড়ির খাবার টেবিলে বসে বলি, তোমার জন্য আমি একটা দুর্গ কিনেছি। শুনে প্রথমে খুশি হওয়ার ভান করলেও আদেশা আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কি জানি যে ওই দালানের একটা কামরায় শিস বাজে? যদি জেনেশুনে কিনে থাকি, আমার মধ্যে কি ভয়ডর বলে কিছু নেই? আমার উত্তর ছিল, এসব গাঁজাখুরি গল্প। সত্যি সত্যি ভয় পাওয়ার মতো কিছু হলে আমার কানে ঠিকই আসত। খাবার ওই টেবিলে আদেশার অনেক গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিল—চাচাতো-মামাতো-ফুফাতো ভাই আরকি। সব কটা ওই দলে পড়ে, যাদের মুখের গ্রাস আমি কেড়ে নিয়েছি। দেখলাম, আমার কথা শুনে দৃষ্টি বিনিময় করছে তারা, মুখে ঠোঁটটেপা হাসি। ওখানে আমি জানতে পারি, একের পর এক প্রশ্ন করে, গত ২০-৩০ বছরে বেশ কজন লোক বাড়িটা কিনেছে এবং টিকতে না পেরে পানির দামে বেচে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। ফলে বিক্রির জন্য বাজারে ওটা সব সময় আছে বা থাকে।

‘দেখলাম আদেশার সামনে ওই তরুণের দল প্রমাণ করতে চাইছে আমি স্রেফ একটা বোকা, বাড়িটা কিনে ঠকে ভূত হয়ে গেছি। ওরা আমাকে চ্যালেঞ্জের সুরে বলল, ওই বাড়িতে আমি ছয় মাসও টিকতে পারব না। আদেশার দিকে বার কয়েক তাকিয়ে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, এসব কথাকে মোটেও হালকা কৌতুক হিসেবে নিচ্ছে না সে এবং শিস দেওয়ার ব্যাপারটাকে সে-ও সত্যি বলে মনে করে।

‘মান বাঁচানোর জন্য খাওয়াদাওয়ার পর ওদের চ্যালেঞ্জ আমাকে গ্রহণ করতে হলো। বেশ মোটা টাকা বাজি ধরা হয়েছে। আমি না হারলে ওদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে এবং হার মানার সত্যি কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আদেশাকে আমি বলেছি, কপালে যা ঘটার ঘটবে, এই বাড়ি আমি ছাড়ছি না। এই হলো পরিস্থিতি, সবটাই আপনাকে জানালাম।’

‘হুঁ। এবার ওই শিস সম্পর্কে কিছু বলুন। কীভাবে শুনলেন, শুনে কী প্রতিক্রিয়া হলো।’

‘ও, ওটা!’ ওপর-নিচে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন প্রত্যয় গাজি। ‘ওই শিস শুরু হলো আমরা এখানে আসার পর দ্বিতীয় দিন। আদেশাদের বাড়িতে ওই আলাপের কারণে আমার মন একটু খুঁতখুঁত করছিল, তাই দিনের বেলা কামরাটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছিলাম। দেখলাম, দালানের প্রাচীন অংশের আর সব কামরার মতো নয় ওটা। বেশ কিছু পার্থক্য আছে। আকারে অনেক বড়, প্রতিটি দেয়াল কাঠের প্যানেল দিয়ে ঢাকা, ছাদটা গম্বুজ আকৃতির, একদিকের দেয়ালের কাছাকাছি একটা চিমনি আছে। এ ধরনের চিমনি সাধারণত ইটখোলার ভেতর দেখা যায়, সেগুলোর খুদে সংস্করণ এটা। ঘরের ভেতর চিমনি কেন, এর উত্তর আমার জানা নেই।’

‘শিস বাজতে শুরু করল রাত ১০টার দিকে, দ্বিতীয় রাতে, যেমনটি আগে বলেছি। ব্যত্যয় আর আমি লাইব্রেরিতে ছিলাম। হঠাত্ করে আশ্চর্য একটা শিস দেওয়ার আওয়াজ ঢুকল কানে। মনে হলো, পুব করিডরের ওদিক থেকে আসছে—ওই কামরাটা পুব করিডরেই।

‘“ওই শোন, ভূতের ফাজলামি শুরু হয়ে গেছে!” ব্যত্যয়কে বললাম আমি। কী ঘটছে দেখার জন্য টেবিল থেকে হারিকেন তুলে নিয়ে ছুটলাম দুজন—সরি, আমাদের সঙ্গে অমলও ছিল। বিশ্বাস করুন, করিডর ধরে আমরা যখন ছুটছি, শিসের ওই আওয়াজ আমার শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। আহত পশুর অসহ্য কাতর একটা ধ্বনি। এক অর্থে…একধরনের সুর ওটা, কিন্তু হঠাত্ শুনলে মনে হবে শয়তান আপনাকে লক্ষ্য করে হাসছে। আওয়াজটা ক্রমেই স্থান বদল করে চলে যাচ্ছে আপনার পিঠের দিকে। অনুভূতিটা এ রকমই। একসময় ভয়ে পেটের ভেতর হাত-পা সেঁধিয়ে যেতে চায়।

‘ওই ঘরের দরজায় পৌঁছে আমরা অপেক্ষা করিনি। এক টানে কপাট খুলেই ভেতরে ঢুকতে গেছি। সঙ্গে সঙ্গে সেই আওয়াজ আমার মুখে যেন প্রচণ্ড ঘুষি বসিয়ে দিল। পরে ব্যত্যয় আর অমল আমাকে জানিয়েছে, ওদের অনুভূতিও এই একই রকম ছিল। ঝাঁকি খেয়ে হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ওরা দুজন। চারদিকে তাকালাম আমরা, কিন্তু দেখার মতো কিছুই সেখানে ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যে এত নার্ভাস হয়ে পড়লাম যে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হলো। দরজায় একটা তালা লাগিয়ে দিয়ে ফিরে এলাম আমরা।

‘ফিরে এই ডাইনিংরুমে বসলাম। ব্যত্যয় কফি বানাল। একটু শান্ত হতে তিনজন একমত হলাম, খুব চালাকির সঙ্গে কেউ আমাদের বোকা বানাচ্ছে। কাজেই দুজন দুটো চেলা কাঠ আর একজন একটা হকিস্টিক নিলাম, বাড়ির বাইরে বেরিয়ে চারপাশটা ঘুরে দেখব। কিন্তু অনেক খুঁজেও কিছু পেলাম না। মানুষ তো দূরের কথা, একটা বিড়াল পর্যন্ত নেই।

‘এরপর গোটা বাড়ির ভেতর নিষ্ফল তল্ল্লাশি চালালাম। সবশেষে ফের ঢুকলাম ওই কামরায়। কিন্তু স্রেফ সহ্য করা গেল না। আবার ছুটে বেরিয়ে আসতে হলো। আবার তালা ঝুলিয়ে দিলাম। ভাষায় কীভাবে প্রকাশ করব, জানি না। যেন মনে হচ্ছে, আমরা অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। জানেন! সেই থেকে আমরা সবাই সারাক্ষণ সঙ্গে পিস্তল রাখছি।

‘সকাল হতেই দিনের আলোয় তন্ন তন্ন করে সার্চ করেছি পুরো ঘর। তারপর গোটা বাড়ি। সবশেষে বাড়ির বাইরে চারপাশ। কিন্তু অদ্ভুত বা বেমানান কিছু আমাদের চোখে ধরা পড়েনি। শুধু ওই এক দিন নয়, তার পর থেকে প্রতিদিন ওভাবে সার্চ করা আমাদের একটা রুটিনে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু বৃথাই। এখন আমি জানি না, কী করব বা কী ভাবব। বারবার শুধু মনে হচ্ছে, এলাকার তরুণ, যারা আদেশাকে না পেয়ে চরম হতাশায় ভুগছে, আমাকে ভাগানোর জন্য এটা হয়তো তাদেরই কোনো অপকৌশল।’

‘তা সত্যি কি না জানার জন্য কিছু করেননি?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘করিনি আবার,’ বললেন গাজি। ‘রাতে ঘরের দরজার ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা করেছি। বাড়ির বাইরে পাহারা দেওয়া চলছে। ঘরের দেয়াল, প্যানেল আর মেঝেতে হাতুড়ির হালকা বাড়ি মেরে শব্দ নেওয়া হয়েছে ভেতরে ফাঁক বা ফাঁপা কোনো জায়গা আছে কি না জানার জন্য। মাথায় যা যা এসেছে, সবই একেক করে করেছি। এখন ব্যাপারটা স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ দিচ্ছে, ডাক্তার কান্তিক। সে জন্যই আপনার সাহায্য চাওয়া।’

আলোচনার এই পর্যায়ে আমাদের খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। টেবিল ছেড়ে দাঁড়াতে যাচ্ছি, হঠাত্ নিজের ঠোঁটে আঙুল রেখে প্রত্যয় গাজি ফিসফিস করে বললেন, ‘শ্শ্শ্শ্শ্! শুনুন!’

সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে কান পাতলাম আমরা। তারপর শুনতে পেলাম। প্রথমে একটা শোঁ শোঁ শব্দ, যেন কেউ শিস দিতে চেষ্টা করছে, কিন্তু ঠিকমতো পারছে না। একটু পর মনে হলো কিছুতে যেন টানা শাণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এমন কিছু একটা আছে যে আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। তারপর একটু একটু বিরতি লক্ষ করলাম; ওটার মধ্যে যেন একটা সুর আছে, তাল-লয়-ছন্দ আছে।

‘হে মাবুদ!’ আবার ফিসফিস করলেন প্রত্যয় গাজি। ‘এখন মাত্র সন্ধে! এই, তোমরা দুজন হারিকেন আর টর্চ নাও, তারপর এসো।’

১০ সেকেন্ডের মধ্যে ডাইনিংরুম থেকে করিডরে বেরিয়ে এসে ছুটলাম আমরা। সবার আগে রয়েছেন প্রত্যয় গাজি। তাঁর পিছু নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের করিডরে উঠলাম। সেটা ধরে ছুটছি, চোখ রাখছি হাতের হারিকেন যেন নিভে না যায়। এগোনোর সময় খেয়াল করলাম, দূরত্ব যত কমছে, ওই বিচিত্র শব্দে ততই যেন ভরাট হয়ে উঠছে গোটা করিডর। তারপর অনুভব করলাম, আমার চারপাশের বাতাস কী একটা অশুভ শক্তির প্রচণ্ড দাপটে দপদপ করছে, বিকট শব্দে ড্রাম বাজালে যেভাবে কাঁপতে থাকে বাতাস, ঠিক সেভাবে।

নরম একটা আওয়াজের এ রকম ক্ষমতা কল্পনারও অতীত। প্রত্যয় গাজি দরজার তালা খুললেন। তারপর পা দিয়ে ধাক্কা মেরে ফাঁক করলেন কপাট। তাঁর হাতে পিস্তল বেরিয়ে এল। দরজা খোলামাত্র শব্দটা আছড়ে পড়ল আমাদের ওপর। একটা শব্দ মানুষকে নিয়ে যে কী করতে পারে, সেটা যার ওই অভিজ্ঞতা হয়নি, তাকে বোঝানো যাবে না। শিস বলি বা চিত্কার বলি, ওটার মধ্যে একটা ভীতিকর ব্যক্তিগত বিষয় আছে, কল্পনাকে উসকে দিচ্ছে সেটা, যেন অন্ধকারের ভেতর ওই কামরা একটা পাগলের মতো দুলছে, আর সেই দোলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শব্দ তৈরি করছে পাইপ, গ্রিল, রড, কাচ, পাথর আর কাঠ; ওগুলোর মিলিত ধ্বনিই অসম্ভব বিদঘুটে একটা সুর বা শিস হয়ে বাজছে আমাদের কানে। ওখানে দাঁড়িয়ে ওই শিস শোনার অর্থ হলো বাস্তবতা উপলব্ধির মাধ্যমে স্তম্ভিত হওয়া। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম: কারা যেন আচমকা তোমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে প্রকাণ্ড একটা গহ্বরের মুখ দেখাল এবং বলল, ওটা নরক। তুমি জানো, তারা সত্যি কথাই বলছে। কিছুটা হলেও কি বুঝতে পারছ, কী বলতে চাইছি?

আমি কামরায় ঢুকলাম এক পা পিছু হটে, দরজার দিকে মুখ করে। মাথার ওপর টর্চের আলো ফেললাম, দ্রুত দেখে নিলাম ঘরের চারদিক। প্রত্যয় আর ব্যত্যয় আমার দুই পাশে চলে এলেন, অমল থাকলেন আমার পেছনে। ওরাও ওদের হারিকেনের আলো ওপর দিকে ফেলার চেষ্টা করছে। তীক্ষ শিসের আওয়াজে আমার কান যখন প্রায় বন্ধ হতে চলেছে, ঠিক এই সময় কে যেন ফিসফিস করল, ‘বেরোও, বেরোও! এখান থেকে বেরিয়ে যাও! জলদি! জলদি! জলদি!’

মন এভাবে সতর্ক করলে আমি সেটা কখনোই অগ্রাহ্য করি না। প্রায়ই দেখা যায় ওটা কিছু না, স্রেফ উত্তেজিত স্নায়ু উল্টোপাল্টা কিছু শোনাচ্ছে তোমাকে। কিন্তু আবার মনের এ রকম নির্দেশ মেনে চলায় নির্ঘাত মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে পারার ঘটনাও ঘটেছে আমার জীবনে। যা-ই হোক, বন করে আধপাক ঘুরেই চিত্কার করে ওঁদের বললাম, ‘বেরোন! এখনই বাইরে বেরোন! ফর গডস সেক, কুইক!’ দুই কি তিন সেকেন্ডের মধ্যেই ওঁদের আমি বের করে আনলাম প্যাসেজে।

তারপর শুরু হলো অবর্ণনীয় একটা আহাজারি—শিসই; তীক্ষ ও অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর। একই সঙ্গে গলগল করে উথলে উঠছে প্রচণ্ড ক্ষোভ আর আক্ষেপ। তারপর আকস্মিক নীরবতা, সেটাও বজ্রপাতের মতো কানে বাজল। দড়াম করে কপাট লাগালাম আমি, চাবি ঘুরিয়ে তালা বন্ধ করলাম।

নিচতলায় নেমে কফি খাচ্ছি আমরা।

‘আপনি কিছু ধরতে পারছেন, ডাক্তার কান্তিক স্যার?’ জিজ্ঞেস করলেন প্রত্যয় গাজি।

‘আমি মনে করছি, এখানে বিপজ্জনক একটা শক্তির ভূমিকা আছে। পশুসুলভ…না, পশুরও অধম কেউ এর সঙ্গে জড়িত। ওই শিসের আওয়াজ আমাকে শুধু যে ভয় পাইয়ে দিয়েছে, তা না, আমি একটা যন্ত্রণা অনুভব করেছি, কষ্ট পেয়েছি।’
‘আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’

‘আজ, এখনই, এর বেশি আমি কিছু বলতে চাইছি না,’ বললাম তাঁকে। ‘শুধু একটা কথা বলি। এর মধ্যে একটা বিরাট কান্না আছে।’

ওখানে বসে আরও কিছুক্ষণ কথা বললাম আমরা। সময় বয়ে যাচ্ছে, কোনো আওয়াজ নেই। ঘণ্টা দেড়েক পর ঠিক হলো, আজকের মতো আমরা যে যার কামরায় ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ি, কাল সকালে ওই ঘর ভালো মতন একবার সার্চ করা হবে।

আমাকে যে বেডরুমে শুতে দেওয়া হয়েছে, সেটা দালানের নতুন অংশে। দরজা খুললে সামনেই পড়ে ছবিঘর, প্রত্যয় গাজির চমত্কার সব সংগ্রহ দিয়ে সাজানো। ছবিঘরের পুব প্রান্তের দরজা দিয়ে পুব করিডরে বেরোনো যায়। করিডর আর ছবিঘরের মাঝখানে পাশাপাশি দুটো প্রাচীন দরজা, আকারে যেমন বিশাল তেমনি মজবুতও।

নিজের ঘরে ঢুকে সরাসরি বিছানার দিকে গেলাম না। ব্রিফকেসের তালা খুলে আমার ইন্সট্রুমেন্টগুলো বের করলাম। এ রকম একটা অস্বাভাবিক শিস যখন শুনেছি, দু-একটা প্রাথমিক পদক্ষেপ না নিলে চলে না।

রাত আরও গভীর হতে দিলাম। গোটা দালান যখন ঘুমে নেতিয়ে পড়ল, কোথাও এতটুকু শব্দ হচ্ছে না, সাবধানে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম বেডরুম থেকে। ভারী একটা দরজা খুলে ছবিঘর থেকে চলে এলাম পুব করিডরে। ওটার দুদিকে পেনসিল টর্চের আলো ফেলে দেখে নিলাম, পুরোটা খালি পড়ে আছে। পেছনে হাত নিয়ে গিয়ে ছবিঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিলাম। তারপর প্যাসেজ ধরে এগোলাম। নিজের সামনে ও পেছনে মাঝেমধ্যেই আলো ফেলছি।

‘নিরাপত্তাবন্ধনী’ হিসেবে রসুন দিয়ে তৈরি একটা মালা পরেছি গলায়, ওটার গন্ধ মনে হলো করিডরকে ভরিয়ে তুলছে, আর আমাকে দিচ্ছে অভয়। ব্ল্যাক আর্টে একধরনের অস্তিত্বের কথা বলা হয়, যেগুলো পুরোপুরি বস্তু নয়, আমার সন্দেহ, ওই শিস সে রকম কোনো আংশিক বস্তু থেকে রূপ পেতে পারে বা উত্সারিত হতে পারে। দেখা যাক, কোন দিকে গড়ায় আমার তদন্ত।

ওই ঘরের সামনে পৌঁছালাম। তালা খুলে হাতল ঘোরালাম। তারপর পা দিয়ে জোরে এক ধাক্কা কপাটে। পিস্তলটা বের করে হাত রাখলাম, সাবধানের মার নেই ভেবে।

প্রথমে চারদিকে খুদে টর্চের আলো ফেলে দেখে নিলাম ঘরটা। তারপর পা রাখলাম ভেতরে, মনে আশঙ্কা অপেক্ষায় থাকা বিপদের মধ্যে ঢুকছি। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকলাম। দম আটকে অপেক্ষা করছি। কিছু ঘটছে না। খালি কামরা এক কোণ থেকে আরেক কোণ পর্যন্ত পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তার পরই আমি অনুভব করলাম, এই কামরা ঘৃণ্য ও অভিশপ্ত নীরবতায় ভরাট হয়ে আছে। ব্যাপারটা তুমি বুঝতে পারছ? এই নীরবতা উদ্দেশ্য ছাড়া নয়, এর একটা অর্থ ও তাত্পর্য আছে। যেকোনো নোংরা বা ভীতিকর শব্দের চেয়ে অনেক বেশি অসুস্থকর। এটা হুমকি, এই নীরবতা। চুপচাপ তোমাকে দেখছে। ভাবছে, তোমাকে পেয়ে গেছে সে। আর তাই পকেট থেকে বের করে বড় টর্চটা জ্বাললাম, যাতে গোটা কামরাকে আরও পরিষ্কার দেখতে পাই।

তারপর আমি আমার কাজ শুরু করলাম। হাত চালাচ্ছি দ্রুত, বারবার নিজের চারদিকে চোখ বোলাচ্ছি। মানুষের মাথা থেকে সংগ্রহ করা দুই প্রস্থ চুল দিয়ে একেক করে জানালা দুটো সিল করলাম, শুধু ফ্রেম নয়, কপাটও।

কাজ করার সময় হঠাত্ অনুভব করলাম, ঘরের বাতাস টানটান হয়ে উঠল, তা যেন রাবারের মতো একটা পদার্থ; সেই সঙ্গে নীরবতা, আমি কী বলতে চাইছি, তা যদি বোঝার সক্ষমতা তোমার থাকে, যেন আরও নিরেট হয়ে উঠল। তখন আমি উপলব্ধি করলাম ‘পরিপূর্ণ নিরাপত্তা’ ব্যতীত ওখানে আমার একদণ্ডও টিকতে পারার কথা নয়। কারণ, ততক্ষণে আমি নিশ্চিত হয়ে গেছি, আমার প্রতিপক্ষ আংশিক বস্তু হতে পারে না, তার ধরন ও জাত আরও ভয়ংকর, তা এমনকি আমারও জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার বাইরে। এ ধরনের কোনো শক্তির বিরুদ্ধে এর আগে কখনো আমাকে দাঁড়াতে হয়নি।

জানালার কাজ শেষ করে ত্রস্ত পায়ে চিমনির দিকে এগোলাম। কেন এই চিমনি, এই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যয় গাজির মতো আমারও জানা নেই। তবে আমরা সবাই বুঝি যে ধোঁয়াকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করাই একটা চিমনির কাজ।

যা-ই হোক, চিমনিটাকেও সিল করতে হলো। ওটার মুখ আমি মানুষের মাথা থেকে সংগ্রহ করা সাতটা চুল দিয়ে ‘বন্ধ’ করলাম, ছয়টা চুলের ওপর আড়াআড়িভাবে ফেলে।

তারপর আমি যখন কাজটা প্রায় শেষ করে এনেছি, হঠাত্ শুনতে পেলাম সেই আওয়াজ। নিচু, ব্যঙ্গাত্মক একটা শিস। ঘরের ভেতর বড় হচ্ছে। স্পষ্ট অনুভব করলাম, গোটা ঘরের ভেতর অস্তিত্ব পাচ্ছে। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা শিরশিরে অনুভূতি উঠে যাচ্ছে, পেছন থেকে এসে কপাল ছুঁল।

নারকীয় সেই শিস ক্রমেই জোরালো হতে লাগল। অত বড় কামরা ভরে যাচ্ছে। পরিষ্কার কোনো মানুষের শিস, কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে যত জোরে শিস বাজানো সম্ভব, তার চেয়ে শতগুণ বেশি শব্দ করছে এটা। জোরালো হলেও আওয়াজটার মধ্যে নরম একটা ভাব আছে।

শেষ কাজটা সেরে বেরিয়ে যাব, মাথার ভেতর ঝড় বইছে। কোনো সন্দেহ নেই যে অতি বিরল ও মারাত্মক একটা কেসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি আমি, যেখানে প্রাণহীন বস্তুকে জ্যান্ত কিছু একটায় পরিণত করার চেষ্টা চলছে। আস্ত একটা ইট, ১০ ইঞ্চি লম্বা, সেটা যদি নিজে থেকে নড়তে চেষ্টা করে, খাড়া হয়, ঝাঁকি খায়, লাফ দেয়, ডিগবাজি খায়, কেমন হবে সেটা। এখানে যেন ঠিক ও রকম কিছু একটা ঘটতে চলেছে।

শিস বন্ধ হয়ে গেল।

ছোঁ দিয়ে হাতে নিলাম টর্চ। লম্বা পা ফেলে দরজার দিকে এগোচ্ছি। কাঁধের ওপর দিয়ে পেছন দিকে একবার তাকালাম। কিছু একটা শোনার আশায় কান পেতে আছি। ওটা এল, ঠিক যখন দরজার হাতলে আমার হাত পড়েছে। বিতৃষ্ণায় ভরপুর অশুভ ক্রোধ নিয়ে একটা শিস, বাতাস ফুঁড়ে ছুটে এসে আমার কানের পর্দা ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করল। ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম। দড়াম করে দরজা লাগিয়ে তালায় চাবি ঘোরালাম।

প্যাসেজের উল্টো দিকের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। কামরূপ কামাখ্যার একজন নামকরা সাধুবাবা কী বলেছেন আমার মনে পড়ে গেল: ‘অদৃশ্য রাক্ষস বা দানব যখন পাথর আর কাঠকে দিয়ে কথা বলানোর ক্ষমতা অর্জন করে, তখন জানবে চারপাশের কেউ নিরাপদ নয়।’

আরও খানিক পর চুল দিয়ে কাটাচিহ্ন তৈরি করে দরজাটাও সিল করে দিলাম, তারপর লম্বা করিডর ধরে হেঁটে ফিরে এলাম নিজের বেডরুমে।

রাত বাড়ছে। বিছানায় শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম।

কিন্তু একটু পরই আবার আমার ঘুম ভেঙে গেল। ওই শিসই দায়ী। প্রথমে একটা মৃদু গুঞ্জনের মতো লাগল কানে। তারপর মনে হলো গোঙাচ্ছে। গোঙাচ্ছে, নাকি ফোঁপাচ্ছে? মুঠোফোনে সময় দেখলাম, রাত তিনটে।

আওয়াজটা মনে হলো আমাকে লক্ষ্য করে, আমার দিকেই আসছে, এমনকি বন্ধ দরজার বাধা পর্যন্ত মানছে না। তারপর একসময় গোটা বাড়ি ওই শব্দের সঙ্গে কাঁপতে শুরু করল। এ রকম আতঙ্ক আগে কখনো অনুভব করিনি। দানবটা যেন প্রতিটি করিডর ধরে উন্মাদের মতো ছোটাছুটি করছে আর বিরতিহীন ব্যবহার করছে তার অস্ত্র—ওই শিস।

উঠে পড়লাম, আলো জ্বেলে বিছানার কিনারায় বসে আছি। ভাবছি, একা গিয়ে সিলটা দেখে আসব কি না। কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছে না।

আরও প্রায় ৪০ মিনিট পর হঠাত্ করেই থেমে গেল শিসের আওয়াজ। আমি বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলাম, তারপর আবার ঘুমিয়েও পড়লাম।

সকালে ঘুম ভাঙতেই ওই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম দরজার সিল অক্ষত রয়েছে। এরপর ভেতরে ঢুকলাম। জানালার সিল আর চুল সব ঠিকঠাক আছে, তবে চিমনির মুখের সাজানো সপ্তম চুলটা দেখলাম ছেঁড়া। এটা আমাকে চিন্তায় ফেলে দিল। জানতাম যে বেশি টান দিয়ে ফেলায় আমার হাতেও ওটা ছিঁড়ে থাকতে পারে। আবার অন্য কেউ ছিঁড়লেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

সিল আর চুল ওখান থেকে সরিয়ে নিলাম আমি। মুখ তুলে চিমনির ভেতর দিয়ে ওপরে তাকালাম। মাথার দিকে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। চিমনির ভেতরটা খোলা, নির্বিঘ্ন, মসৃণ। কোনো ভাঁজ, কোণ, গর্ত বা এমন কিছু নেই, যেখানে কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে। তবে বলাই বাহুল্য, এভাবে একবার মাত্র চোখ বুলিয়ে কিছুই বোঝা যায় না, পরে আমাকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।

নাশতা খাওয়ার পর ওভারঅল পরলাম, চিমনির ভেতর ঢুকে উঠে গেলাম পুরোটা, একেবারে সেই মাথা পর্যন্ত। কোথাও কিছু দেখলাম না।

নিচে নেমে পুরো ঘরে আবার একবার তল্ল্লাশি চালাচ্ছি—মেঝে, সিলিং, প্যানেলসহ দেয়াল, কিছুই বাদ দিচ্ছি না। ছয় বর্গইঞ্চিতে ভাগ ভাগ করে নিয়ে পুরো ঘরের একটা মানচিত্র আঁকলাম। প্রোব আর হ্যামার দিকে ঠুকে ঠুকে পরীক্ষা করলাম। শুধু একদিকের প্যানেল থেকে একটু অন্য রকম আওয়াজ বেরোল। প্রত্যয় জানালেন, ওই

জায়গার পেছনে মান্ধাতা আমলের একটা দরজা আছে, সেটা সেই প্রাচীনকাল থেকেই বন্ধ।

এরপর টানা তিন সপ্তাহ ধরে দাপুটে জমিদার হরপ্রসাদ সিংহের তৈরি এই দুর্গ পুরোটা সার্চ করলাম আমরা, কিন্তু তার পরও কিছু পেলাম না। রাতে যখন শিস বাজতে থাকে, মাইক্রোফোন ব্যবহার করে আওয়াজটা রেকর্ড করলাম। রেকর্ড করার পর বাজাতে গিয়ে দেখি কিছুই শোনা যাচ্ছে না।

প্রত্যয় গাজির প্রতিদ্বন্দ্বীরা যান্ত্রিক কিছু ব্যবহার করছে, এটা আমি ধরে নিইনি। তবে তারা বা অন্য কেউ শিস রেকর্ড করে রেকর্ডারটা দেয়ালের ভেতর কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারে, এটাকে একটা সম্ভাবনা হিসেবে মাথায় রাখতে হয়েছে।
লুকানো মাইক্রোফোন বা রেকর্ডারের খোঁজ শুরু করলাম। যে প্যানেলটা প্রাচীন দরজাকে আড়াল করে রেখেছে সেটা বাদ দিয়ে বাকি সব প্যানেল খুলে প্রতিটি দেয়াল পরীক্ষা করা হলো। কোথাও কিছু লুকিয়ে রাখা হয়নি। অর্থাত্, আমি একটা নির্ভেজাল অলৌকিক সমস্যায় পড়েছি।

পুরোটা সময়, প্রতি রাতে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সারা রাত ধরে ওই গোঙানির অসহ্য আওয়াজ হচ্ছে তো হচ্ছেই। যেন একটা বুদ্ধিমান অস্তিত্ব জানে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছি আমরা, জবাবে রাগে উন্মত্ত হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, বিদ্রূপের সুরে অসন্তোষ প্রকাশ করছে।

পায়ে মোজা পরে বারবার করিডর ধরে হেঁটে গেছি আমি, নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছি সিল করা ঘরের সামনে। রাতের যেকোনো সময় গেছি। আর যখনই গেছি, যত সাবধানই হই, ঘরের ভেতর গোঙানোর ঢঙে শিস দেওয়ার ধরন প্রতিবার ঠিকই বদলে গেছে—হয়ে উঠেছে প্রতিবাদমুখর, ঝগড়াটে, মারমুখী; যেন আধো জাগতিক দানব বন্ধ দরজার ওদিক থেকে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে আমাকে।

রোজ সকালে ওই কামরায় ঢুকি। আলাদা আলাদা সিল আর চুল পরীক্ষা করি, দেখি সব ঠিক আছে কি না। বুঝতেই পারছেন, কোনো বস্তু বা প্রাণী এই কামরায় ঢুকতে পারবে না আর ঢুকলে আমার জন্য প্রচুর চিহ্ন রেখে যেতে হবে তাকে। কিন্তু সিল বলুন, চুল বলুন, রসুনের খোসা বলুন, কিছুই একবিন্দু নড়ল না। এ রকম একটা অচল অবস্থায় আমি ভাবছি ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে এক রাত এই ঘরে কাটানো উচিত হবে কি না। বিপদ যেমন আছে, বিপদকে ঠেকানোর উপায়ও তো আমার জানা। ওই ঘরের মেঝেতে আমি একটা ইলেকট্রিক পেনটাকল তৈরি করব, রাত কাটাব সেই পাঁঁচ কোণবিশিষ্ট নক্ষত্রের ভেতর, যেখানে অশুভ কোনো শক্তির ঢুকতে পারার কথা নয়। ফলে আশা করা যায়, আমি তাদের নাগালের বাইরে থাকব।

একবার, মাঝরাতের দিকে, কামরার সিল ভাঙলাম আমি। কপাট ফাঁক করে দ্রুত একবার ভেতরে তাকালাম। এরপর কী ঘটল বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। অকস্মাত্ গোটা কামরা চিত্কার জুড়ে দিল। মনে হলো, বিশাল অন্ধকার পেট নিয়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে, যেন দেয়ালগুলো ফুলে আমার কাছাকাছি চলে আসছে। ঠিক আছে, মানছি, ব্যাপারটা আমার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা। তবে ওই চিত্কারই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল। হ্যাঁচকা টানে বন্ধ করলাম দরজা। তালায় চাবি ঘোরালাম। অনুভব করলাম আমার মেরুদণ্ড খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে।

কী করব, মাথায় ঢুকছে না। এই সময় একদিন একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। রাত তখন একটার মতো বাজে। দুর্গের চারপাশ ঘিরে ধীর পায়ে একা একা হাঁটছি। পা ফেলছি শুধু নরম ঘাসে। দালানের পুব দিকের ছায়ার ভেতর পৌঁছেছি। ওখানে দাঁড়িয়ে শুনতে পাচ্ছি, আমার অনেক ওপর অন্ধকার কামরা থেকে সেই অভিশপ্ত শিস ভেসে আসছে। তারপর হঠাত্ আমার খানিক সামনে থেকে একটা পুরুষকণ্ঠ শুনতে পেলাম আমি। নিচু স্বরে কথা বলছে, বোঝাই যাচ্ছে খুব মজা পেয়ে—

‘দূর ভাই! তোমরা না! বউকে নিয়ে ওটায় উঠব—অসম্ভব!’ তার গলার আওয়াজ পরিশীলিত।

উত্তরে কেউ কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আঁতকে ওঠার মতো তীক্ষ বিস্ময়সূচক একটা আওয়াজ শোনা গেল। তারপর একটা হুটোপুটি আর ছুটন্ত পায়ের শব্দ, যে যেদিকে পারে পালাচ্ছে। পরিষ্কার বোঝা গেল, লোকগুলো আমাকে দেখে ফেলেছে।

কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলাম ওখানে। ভাবছি, আমার মতো গাধা দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি আছে কি না। শেষ পর্যন্ত তাহলে ‘ভর’ করার মূলে এরাই! ঘটনাটা আমাকে কী রকম বোকা বানাল, বুঝতে পারছ তো? ওরা যে প্রত্যয় গাজির একদল প্রতিদ্বন্দ্বী, তা আশা করি তোমাকে না বললেও চলে। অথচ এদিকে আমি কেসটাকে নির্ভেজাল অলৌকিক সমস্যা মনে করে ঘেমে অস্থির হচ্ছিলাম!

তারপর, বুঝলে, কয়েক শ খুঁটিনাটি বিষয় একেক করে মনে পড়তে লাগল। ফলে আবার আমি সন্দেহের দোলায় দুলতে শুরু করলাম।

পরদিন সকালে প্রত্যয় গাজিকে জানালাম কী আবিষ্কার করেছি। সেদিন থেকে পর পর পাঁচ রাত, সন্ধে থেকে সকাল পর্যন্ত, দালানের পুব অংশের ওপর কড়া নজর রাখলাম আমরা। কিন্তু না, কোথাও কারও দেখা পেলাম, না কারও উপস্থিতির চিহ্ন চোখে পড়ল। অথচ ওই শিস, যেন আমাদের ব্যঙ্গ করার জন্যই, ওই পাঁচ দিন সন্ধে থেকে ভোর পর্যন্ত বাজতেই থাকল, কোনো বিরতি ছাড়াই।

পাঁচ দিন পার হলো। ছয় দিনের দিন সকালে ঢাকা থেকে একটা জরুরি ফোন পেলাম আমি। তড়িঘড়ি করে পরবর্তী ট্রেন ধরে রাজধানীতে ফিরে আসতে হলো আমাকে। ট্রেন ধরতে যাওয়ার আগে প্রত্যয় গাজিকে ডেকে ব্যাখ্যা করলাম ব্যাপারটা—ব্যক্তিগত কাজে দিন কয়েকের জন্য ঢাকায় যেতে হচ্ছে আমাকে। তবে তাঁরা যেন পাহারা দেওয়ার কাজটা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে চালিয়ে যান। তাঁকে আমি বিশেষভাবে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলাম, কোনো অবস্থাতেই সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কেউ যেন ওই কামরার ভেতরে না ঢোকেন। তাঁকে আমি ব্যাখ্যা করে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিই, এখনো আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু জানি না, জানি না এটা অতীন্দ্রিয়, নাকি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো বস্তু। তবে আমি যা প্রথমে সন্দেহ করেছিলাম, কামরাটা যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর জন্য অনেক বেশি ভালো হবে আগে মারা যাওয়া, তারপর ওই অন্ধকার কামরায় ঢোকা।

ঢাকায় ফিরে এই কদিনে জরুরি কাজগুলো সারলাম আমি। তারপর কাহিনির প্রথম অংশ কম্পিউটারে কম্পোজ করলাম, যাতে আমার নিজেরই গোটা ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হয়। আবার আমি ভবানীপুরে ফিরে যাচ্ছি। দেখি দাপুটে জমিদারবাবুর যুবা বয়সের কীর্তি ওই দুর্গরহস্য আমরা সমাধান করতে পারি কি না। ফিরে এসে আশা করি বিস্ময়কর কিছু জানাতে পারব তোমাদের। এই মুহূর্তে আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে তোমরা এর মধ্যে একটু আলো ফেলতে পারো কি না, তা জানার জন্য। আমি পারছি না, অন্তত এখন পর্যন্ত।

১৫ দিন পর। রাত ১০টা।

ঢাকায় ফিরে আবার কম্পিউটার নিয়ে বসেছি। এবার ভবানীপুর থেকে বিস্ময়কর একটা কাহিনি নিয়ে ফিরেছি আমি, বলা উচিত মহা বিস্ময়কর। শুরু করছি যেদিন আমি ভবানীপুরে আবার ফিরলাম সেদিন থেকে।

স্টেশন থেকে হেঁটে দুর্গে পৌঁছালাম। আমি যে ফিরছি, ইচ্ছা করেই জানাইনি ওঁদের। দেখলাম, আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠেছে, তাই হাঁটতে বেশ ভালো লাগছিল। পৌঁছে দেখলাম, গোটা এলাকা অন্ধকারে ডুবে আছে। ভাবলাম, ভেতরে না ঢুকে প্রথমে দালানের চার পাশে একটা চক্কর দিই। দেখা যাক, প্রত্যয় গাজি বা তাঁর ভাই পুলিশ কর্মকর্তা ব্যত্যয় গাজি ঠিকমতো পাহারা দিচ্ছেন কি না। কিন্তু কোথাও আমি ওঁদের কাউকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম, একঘেয়ে আর ক্লান্ত লাগায় বিছানায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে পাহারাদার।

দালানের পুব শাখায় ফিরে আসছি, এই সময় নরম সুরে সেই গোঙানির মতো শিস বেজে উঠল। রাতের নীরবতা শব্দটাকে আরও অলৌকিক আর রহস্যময় করে তুলছে। নিষ্ঠা কিংবা মগ্নতার একটা ভাব আছে এই শিসের সুরে। প্রবল আবেগের সঙ্গে কী যেন একটা গাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু জিনিসটাকে ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারছে না বা সঠিক রূপ দেওয়ার প্রয়াসটা কাজে লাগছে না।

চোখ তুলে জানালার দিকে তাকালাম, চাঁদের আলোয় স্পষ্ট। তাকিয়ে আছি, হঠাত্ মাথায় আইডিয়াটা ঢুকল—মই জোগাড় করতে পারলে জানালার কাছে ওঠা যেত! ভেতরে একবার চোখ বুলিয়ে দেখতে পারলে মন্দ হয় না।

পাশেই চওড়া উঠান। দিনের বেলা হাড্ডিসার দু-একটা ঘোড়া দেখেছি ওদিকে। উঠানের একধারে আস্তাবল। একটু খুঁজতেই পাওয়া গেল মই। আস্তাবল প্রাচীন হলেও মই আধুনিক। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি, ভাঁজ খুলে যথেষ্ট লম্বা করা যায়, একদম হালকা। কাঁধে করে বয়ে নিয়ে এলাম, ভাঁজ খুলে দেয়ালের গায়ে ঠেকালাম। বড় জানালার কিনারায় পৌঁছে গেল মইয়ের মাথা। ধাপ বেয়ে উঠলাম আমি, আমার মুখ জানালার গোবরাট ছাড়িয়ে গেল। চাঁদের আলোর পিছু নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল আমার দৃষ্টি।

অদ্ভুত সেই শিসের শব্দ অবশ্যই এখানে খুব জোরালো, কিন্তু তার পরও ওটার মধ্যে আত্মমগ্নতার একটা ভাব পরিষ্কারই ধরা পড়ল, যেন শান্ত সুরে নিজেকেই ওই শিস শোনাচ্ছে—বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাইছি? এটা একটা মানবিক প্যারোডি, ব্যঙ্গরসাত্মক অনুকরণ, আমি যেন ওখানে দাঁড়িয়ে দানবিক কোনো ঠোঁট থেকে শুনছি মানবিক কোনো আত্মার বিলাপ, শিসের আদলে।

তারপর, বুঝলে, কিছু একটা দেখতে পেলাম আমি। বিরাট বড় খালি কামরার মেঝের মাঝখানটা ফুলে উঠতে শুরু করল। জিনিসটা দেখতে আশ্চর্য নরম স্তূপের মতো। মাথার দিকটাকে বিভক্ত করে রেখেছে একটা গর্ত, সেই গর্তের আকার-আকৃতি প্রতিমুহূর্তে বদলে যাচ্ছে, যেন তীব্র ওই শিসের উত্থান-পতনের সঙ্গে তাল রেখে। তাকিয়ে আছি, বার কয়েক দেখলাম স্তূপটা কুঁকড়ে ভেতর দিকে দেবে যাচ্ছে, যেন প্রচুর শ্বাস নিতে হচ্ছে ওটাকে। তারপর আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে করুণ রসে সিক্ত ওই শিস। তাকিয়ে আছি, তাকিয়ে আছি, অকস্মাত্ উপলব্ধি করলাম, ওটা একটা জীবিত প্রাণী! হে মাবুদ, ওটার অস্তিত্ব আছে! চাঁদের আলোয় আমি তাকিয়ে আছি কালো হয়ে যাওয়া, ফোসকা পড়া, ফেটে যাওয়া, থেঁতলানো প্রকাণ্ড আকারের একজোড়া ঠোঁটের দিকে…

আচমকা ওগুলো আরও ফুলে উঠল, ভেতর থেকে চাপা ও বিকৃত সুরে বেরিয়ে আসা শিস আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আছড়ে পড়ল আমার ওপর। চাঁদের আলোয় স্পষ্টই সব দেখতে পাচ্ছি। ওপরের ঠোঁটে জমে আছে প্রচুর ঘাম। তারপর, এমনকি আমি জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও আমাকে একটা ঝাঁকি দিয়ে ওই শিস বিস্ফোরিত হলো। পরমুহূর্তে দেখি, ঘরের মেঝে আবার আগের মতো সমতল, চাঁদের আলোয় ফাঁকা পড়ে আছে, সাদা ও ঝকঝকে পালিশ করা, এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়াল পর্যন্ত; এবং নীরবতা সম্পূর্ণ অটুট।
কল্পনার চোখে তুমি আমাকে দেখতে চেষ্টা করো। মইয়ের ধাপে পা রেখে জানালা দিয়ে শান্ত ঘরটার ভেতর তাকিয়ে আছি, কী দেখেছি জানি। অসুস্থ, সন্ত্রস্ত একটা শিশুর মতো লাগল নিজেকে। ইচ্ছা হলো চুপচাপ মই বেয়ে নামি। তারপর দৌড়ে এই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাই, আর কোনো দিন ফিরে আসব না। কিন্তু ঠিক ওই মুহূর্তেই আরেকটা ঘটনা ঘটল। কামরার ভেতর দিক থেকে ভেসে এল প্রত্যয় গাজির আর্তচিত্কার, ‘বাঁচাও! বাঁচাও! ও আল্ল্লাহ!’ কিন্তু আমি তখনো একটা আচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছি। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে বিস্ময়ে হকচকিত। ভাবলাম, আমি নিশ্চয়ই ভুল শুনছি। তারপর আবার তাঁর চিত্কার ঢুকল আমার কানে। এবার হাতের প্রচণ্ড ধাক্কায় জানালার কাচ ভেঙে ফেললাম। লাফ দিয়ে পড়লাম কামরার মেঝেতে। জানি, প্রত্যয় গাজিকে বাঁচাতে হবে আমার। ধারণা করলাম চিত্কারটা আসছে চিমনির ছায়া থেকে। প্রথমে সেদিকেই ছুটে গেলাম, কিন্তু সেখানে কেউ নেই।

‘গাজি সাহেব!’ ডাকলাম আমি, আমার চিত্কার খালি ঘরের দেয়ালে দেয়ালে শুধুই বাড়ি খেল, কোনো উত্তর আদায় করতে পারল না। বিদ্যুত্-চমকের মতো একটা চিন্তা খেলে গেল মাথায়—প্রত্যয় গাজি আসলে ডাকেইনি, ডেকেছে অন্য কেউ, অন্য ভাষায়—শিসের সুরে? ভয়ে অসুস্থ, বন করে আধপাক ঘুরে জানালার দিকে তাকালাম। জানালার কাচবিহীন কপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, আমি তাকাতেই স্থির হয়ে গেল। দম ফেলারও সময় পেলাম না, কামরার ভেতর বিস্ফোরিত হলো সেই শিস, কেউ যেন অসহ্য যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে। আমার গায়ে কাঁটা দিল। শরীর থরথর করে কাঁপছে।

কামরার ভেতর কেউ মন্ত্র পড়ছে। সংস্কৃত শ্লোক, মন্ত্র পড়ার সুরে আওড়াচ্ছে। তারপর বুঝলাম, অন্য কেউ না, আমি নিজে। কীভাবে যেন মনে পড়ে গেছে, নিজের অজান্তে ওই মন্ত্র কখন থেকে জানি না জপতেও শুরু করেছি। এরপর পরিবেশ থেকে ধীরে ধীরে অস্থির ভাবটা কেটে যেতে লাগল, যেন একটা ঝড় স্তিমিত হয়ে পড়ছে। উপলব্ধি করলাম, আমার জীবন মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য একটা গহ্বরের কিনারায় ঝুলছিল। মন্ত্রটা মনে পড়ে যাওয়ায় তাতে খসে পড়ার ভয়টা আপাতত কেটে গেছে। এ যাত্রা আমি হয়তো বেঁচে গেছি। আবার আমার শরীর আর আত্মা এক হতে পারল। ক্ষিপ্র বেগে জানালার দিকে ছুটলাম। ওই ঘর থেকে কীভাবে বেরিয়েছি বলতে পারব না। লাফ দিয়েছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, তখন আমার মধ্যে মৃত্যুভয় বলে কিছু ছিল না। মইটা কখন ভেঙে পড়েছে, তা-ও বলতে পারব না। সংবিত্ ফেরার পর দেখলাম, মাটির ওপর চিতপটাং হয়ে পড়ে আছি। আমার গায়ের ওপর মই। মুখ তুলে ভাঙা জানালার দিকে তাকালাম, ভেতর থেকে এখনো শিসের শব্দ ভেসে আসছে, তবে সুরটা নরম, আওয়াজ জোরালো নয়।

গেটে আওয়াজ করে প্রত্যয় গাজির ঘুম ভাঙালাম। তাঁকে জানালাম, ‘ওই ঘরের মায়া আপনাকে ত্যাগ করতে হবে।’

চেহারা থমথম করছে। তিনি জানতে চাইলেন, ‘ঠিক কী করার কথা ভাবছেন আপনি, কান্তিক স্যার?’

উত্তরে আমি বললাম, ‘ঘরটা ভেঙে ফেলতে হবে। শুধু ভেঙে ফেললেই হবে না, ওটার প্রতিটি টুকরা, ধুলো পর্যন্ত বড় একটা চুলা তৈরি করে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতে হবে। চুলাটা তৈরি করা হবে একটা পেন্টাকলের ভেতর।’

আমার প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে মাথা ঝাঁকালেন তিনি। এরপর আলাপ করার আর কিছু থাকল না। আমার জন্য আলাদা করা বেডরুমে আমি শুতে চলে গেলাম।

পরদিন সকালে কাজটা করার জন্য ছোট একটা বাহিনী নিয়োগ করা হলো। ১০ দিনের মধ্যে অত সুন্দর একটা কামরা ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গেল ভবানীপুরের বাতাসে। ছাই যেটা অবশিষ্ট থাকল, নির্দেশ দিলাম তা-ও যেন পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়।

শ্রমিকেরা যখন দেয়ালের প্যানেলিং খুলছে, ওখানে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা প্রাচীন সেই দরজাটা দেখতে পেলাম আমি। শক্ত, অচেনা কাঠের দরজা; গায়ে সারি সারি ইস্পাতের ফালি জড়িয়ে রাখা হয়েছে, ফালিতে গর্ত তৈরি করা, সেই গর্তে পেরেক ঢোকানো।

আমার নির্দেশে দরজাটা খোলার কাজ শুরু হলো। দুদিন সময় লাগলেও, আমি বলব আমাদের ধৈর্য ও পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। দরজার ভেতর ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি একটা চৌকো বেদি দেখতে পেলাম। বেদির ওপর পড়ে রয়েছে মরচে ধরা একজোড়া রামদা। বেদির পাশে বিশাল এক চুলা। চুলার ওপর সারি সারি লোহার রড। এলাকার প্রবীণ এক ব্যক্তি, ডাক্তার অনিল বসু জানালেন, তাঁরা বংশপরম্পরায় শুনে আসছেন, যুবা বয়সে জমিদার হরপ্রসাদ সিংহ এই চুলার ওপর শুইয়ে শত্রু নিধন করতেন। অর্থাত্, লোকজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতেন। আর দূর-দূরান্ত থেকে বালক-বালিকাদের ধরে এনে ওই বেদির ওপর বলি দেওয়া হতো, তাঁর জমিদারি যাতে আরও ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তিনি যাতে রাজা হতে পারেন, সেই প্রত্যাশায়।

আমার নির্দেশে ওই বেদি আর চুলা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। তখনই চুলার এক পাশের চওড়া দেয়াল থেকে একটা কালো পাথর বেরিয়ে এল। গায়ে কী সব খোদাই করা। পাথরের ওপর লেখা, ভাষাটা সংস্কৃত।

উপস্থিত কেউ সংস্কৃত ভাষা জানেন না। খবর দিয়ে গ্রামের মন্দির থেকে পুরোহিত মশাইকে ডেকে আনা হলো। তিনি এসে আমাদের পড়ে শোনালেন ওই শিলালিপি। এখনকার বাংলায় অনুবাদ করলে সেটা এ রকম দাঁড়ায়:

স্বভাবকবি গঙ্গারাম, যিনি জমিদার মনোরঞ্জন চৌধুরীর প্রিয় ভাঁড়ও ছিলেন, তাঁকে এই কামরায় জ্যান্ত পোড়ানো হয়। গঙ্গারামের অপরাধ, জমিদার হরপ্রসাদ সিংহের বোকামি নিয়ে তিনি একটা গান রচনা করেছিলেন।

শিরোনাম অনুবাদ করার পর পুরোহিত মশাই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। কারণ, প্রাচীন গল্পটা তাঁর জানা আছে। তিনি আমাকে গ্রামের মন্দিরসংলগ্ন লাইব্রেরিতে নিয়ে গেলেন, যেটাকে পরিত্যক্তই বলা উচিত। দেখাশোনার কেউ না থাকায় প্রায় সব বই চুরি হয়ে গেছে, বাকিগুলো পোকায় খাচ্ছে। মাত্র একটা কাঠের আলমারি অক্ষত দাঁড়িয়ে। তার ভেতর কিছু পুরোনো পার্চমেন্ট, পশুর শুকনো ও মসৃণ চামড়া পাওয়া গেল। সেই শুকনো চামড়ার ওপর পুরো গল্পটা লিখিত অবস্থায় পেলাম আমরা।

পরে কানে এল প্রাচীন এই গল্প এলাকার অনেকেরই জানা, লোকমুখে এখনো শুনতে পাওয়া যায়। তবে ইতিহাস হিসেবে নয়, তার চেয়ে বেশি বিবেচনা করা হয় কিংবদন্তি হিসেবে।

দেখা যাচ্ছে, জমিদার হরপ্রসাদ সিংহ আর জমিদার মনোরঞ্জন চৌধুরী জন্মসূত্রে পরস্পরের শত্রু ছিলেন। তবে সাধারণত লাঠিয়াল বাহিনীর ছোটখাটো হামলা-পাল্টা হামলার চেয়ে খারাপ কখনো কিছু ঘটত না। অকস্মাত্ পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটল স্বভাবকবি গঙ্গারাম জমিদার হরপ্রসাদের বোকামি নিয়ে একটা কবিতা রচনা করার পর। যে কবিতা গান হিসেবে জমিদার মনোরঞ্জন চৌধুরীর সামনে বসে গাইলেন তিনি। সেই গান শুনে মনোরঞ্জন চৌধুরী এতই মুগ্ধ হলেন যে তিনি তাঁর এই ভাঁড়কে পুরস্কৃত করলেন।’

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুই জমিদারির সব মানুষই গানটা সম্পর্কে জেনে গেল এবং তা একসময় জমিদার হরপ্রসাদ সিংহের কানেও ঢুকল। ব্যঙ্গরসাত্মক এই গান শুনে সিংহ মহাশয় এমন খ্যাপাই খেপলেন যে তিনি তাঁর মিত্র আরও দু-তিনজন জমিদারের সহায়তা নিয়ে মনোরঞ্জন চৌধুরীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসলেন। প্রথমে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর লাঠিয়াল বাহিনী নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। তারপর একদিন স্বয়ং মনোরঞ্জন চৌধুরীকে ধরে এনে নিজের দুর্গে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারলেন হরপ্রসাদ। স্বভাবকবি ও ভাঁড় গঙ্গারামকে আগেই ধরে আনা হয়েছিল। ওই গান রচনা এবং গাওয়ার অপরাধে হরপ্রসাদ নিজে তাঁর জিব টেনে বের করেন, তারপর খুর দিয়ে কেটে ফেলেন।
দুর্গের পুব শাখার একটা কামরায় গঙ্গারামকে বন্দী করে রাখা হয়। পরদিন সকালে সবাই আবিষ্কার করল গঙ্গারাম স্থির হয়ে বসে আছেন, আত্মমগ্ন অবস্থায় শিস দিয়ে বোকামির সেই গানের সুর তুলছেন, যেহেতু ওই গান গাওয়ার ক্ষমতা এখন আর তাঁর নেই।

তারপর গঙ্গারামকে চুলায় বসানো লোহার শিকের ওপর শুইয়ে আস্ত রোস্ট করা হলো। বেদির পাশে যে চুলা আগেই আমরা দেখেছি। একদিকে শরীর পুড়ছে, আরেক দিকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত শিস বাজিয়ে বোকামিকে নিয়ে রচিত গানের সুর তুলছেন গঙ্গারাম, যে গান তিনি গাইতে পারেন না। তাঁর মৃত্যু হলো, সেই সঙ্গে ওই শিসও থামল। না, ভুল হলো। গঙ্গারামের মৃত্যু হলো ঠিকই, কিন্তু তাঁর শিস থামল না। পরে ওই কামরায় প্রায়ই শোনা যেতে লাগল কে যেন শিস দিচ্ছে। তারপর লোকে বলাবলি করতে লাগল, ‘ওই কামরায় একটা শক্তি তৈরি হয়েছে’, যে কারণে রাতে ওখানে কেউ ঢুকত না। পরে ওই দুর্গ ছেড়ে অন্য দালানে সরে গেলেন হরপ্রসাদ, ওই শিসের আওয়াজ তাঁকে নাকি খুব বিরক্ত করত।

পার্চমেন্ট থেকে পাওয়া এই হলো পুরো গল্প। খুবই মর্মান্তিক। গল্প শেষ, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে অনেক। প্রত্যয় গাজি জানতে চাইলেন, ‘কিন্তু ওই কামরার ভেতর শক্তিটা এত ভয়াবহ হয়ে উঠল কীভাবে?’

‘এখানে দেখা গেছে, চিন্তার ধারাবাহিকতা আশপাশের বস্তুর ওপর পজিটিভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারছে,’ সাধ্যমতো ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলাম আমি। ‘ওই শক্তির শক্তিশালী হয়ে ওঠাটা নিশ্চয়ই যুগের পর যুগ ধরে ধীরে ধীরে ঘটেছে। দুই-আড়াই শ বছর সময় না পেলে এ রকম একটা দানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। এটাকে একধরনের জ্যান্ত আত্মিক ফাঙ্গাস বললে ব্যাপারটা বুঝতে আর ব্যাখ্যা করতে সুবিধে হয়, যেটা ইথার-ফাইবারের গঠনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্ল্লিষ্ট। মোট কথা, অজ্ঞ মানুষ হিসেবে আমরা শুধু এটুকু বলতে পারি, কিছু অজানা ও রহস্যময় কারণে জাগতিক বস্তুর ওপর অলৌকিক শক্তির প্রভাব মাঝেমধ্যে দেখা দেয় বা দিতে পারে। এখানে তারই একটা নমুনা আমরা চাক্ষুষ করেছি। অল্প কথায়, সহজ ভাষায়, সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।’

ব্যত্যয় প্রশ্ন করলেন, ‘সপ্তম চুল কে ছিঁড়ল?’

তাঁর এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। আমি শুধু আমার ধারণার কথা বলতে পারি, ওটায় হয়তো বেশি টান পড়ে গিয়েছিল।

পরে আমরা জানতে পেরেছি, সেদিন রাতে যে লোকগুলো দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা কোনো অসত্ উদ্দেশ্য নিয়ে ওখানে আসেনি। তবে চুপি চুপি এসেছিল। অন্য কোনো কারণে নয়, ওই শিস শুনতে। যেটা নিয়ে গোটা এলাকার ঘরে ঘরে আলোচনা চলছিল।

‘সব মিলিয়ে আমরা কি তাহলে বুঝব যে প্রাচীন স্বভাবকবি গঙ্গারামের বস্তুগত প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল দুর্গের ওই কামরা? তাঁর আত্মা, প্রচণ্ড ঘৃণায় ভরাট হয়ে একটা দানবিক আদল পেয়ে যায়?’

‘হ্যাঁ,’ বললাম আমি। ‘আমার চিন্তাটা বেশ পরিষ্কার সাজাতে পেরেছেন আপনি। তবে মৃত্যুর পর গঙ্গারামের আত্মা যতই দানবিক হয়ে উঠুক, তাঁর প্রতি যে অন্যায়-অবিচার করা হয়েছে, সেটা সবাইকে কাতর না করে পারে না। গোটা এলাকায় খবর নিয়ে দেখেছি আমি, এই ভূতের জন্য মানুষ কাঁদে।’

-বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে
রুপান্তর:শেখ আবদুল হাকিম

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments