Thursday, February 22, 2024
Homeবাণী-কথাখেলার ছল - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

খেলার ছল – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

নবদুর্গা - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

মিঠুর গোলগাল মোটামোটা দুটো পায়ের একটা জীবনের বুকের ওপর, আর একটা তার শোয়ানো হাতে। তার বুকের ওপর কাত হয়ে শুয়েছে মিঠু, ঘাড়ের কাছে মাথা আর ল্যাভেন্ডারের গন্ধময় চুল। জীবন কানের ওপর মিঠুর দুরন্ত শ্বাস-প্রশ্বাস আর কবিতা–আবৃত্তি শুনতে পাচ্ছিল : ‘ঝরনা তোমার স্ফটিক জলের স্বচ্ছ ধারা, তাহারি মাঝারে দেখে আপনার সূর্যতারা। তারি একধারে আমার ছায়ারে আনি মাঝে-মাঝে দুলায়ো তাহারে, তারি সাথে তুমি হাসিয়া মিলায়ো কলধ্বনি…’ একটা ছোট নরম হাতে মিঠু তার বাবার গাল ধরে মুখটা ফিরিয়ে রেখেছে তার দিকে। জীবন অন্যমনস্ক ভাব দেখালেই মুখ টেনে নিয়ে বলছে ‘শোনো না বাবা!’

মিঠুর ভারী শরীর, নরম তুলতুলে। বুকের ওপর যেখানে মিঠুর পা সে জায়গাটা অল্প ধরে আসছিল জীবনের। পা-টা একবার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে মিঠু দাপিয়ে উঠল। পরমুহূর্তেই উঠে এল জীবনের বুকের ওপর, দুই কনুইয়ের ভর রেখে জীবনের মুখের দিকে চেয়ে হেসে হঠাৎ অকারণে ডাকল ‘বাবা!’

‘উ’।

‘তুমি শুনছ না।’

‘শুনছি মা-মণি।’ জীবন চোখ খুলে তার ছয় বছরের শ্যামবর্ণ মেয়েটির দিকে তাকালে হঠাৎ তার বুক কানায়-কানায় ভরে ওঠে। চুলে ল্যাভেন্ডারের গন্ধ, চোখে কাজল, মুখে অল্প পাউডারের ছোপ–এত সকালেই মেয়ে সাজিয়েছে অপর্ণা। না সাজালেও মিঠুকে দেখতে খারাপ লাগে না। কী বড়-বড় চোখ, আর কী পাতলা ঠোঁট মিঠুর! জীবন মিঠুকে আবার দু-হাতে আঁকড়ে ধরে বলে, ‘তোমার কবিতাটা আবার বলল ।’ মিঠু সঙ্গে-সঙ্গে দুলে ওঠে, ‘ঝরনা তোমার স্ফটিক জলের স্বচ্ছ ধারা…’ শুনতে-শুনতে সকালের গড়িমসির ঘুম–ঘুম ভাবটা আবার ধীরে-ধীরে জীবনকে পেয়ে বসতে থাকে। বলতে কি সারাদিনের মধ্যে মিঠু আর তার বাবাকে নাগালে পায় না, সকালের এটুকু সময় ছাড়া। তাই এটুকুর মধ্যেই সে পুষিয়ে নেয়। ধামসে, কামড়ে, কবিতা বলে, গান গেয়ে বাবার আদর কেড়ে খায়। জীবনের মাঝে-মাঝে বিশ্বাস হতে চায় না যে এই সুন্দর, সুগন্ধী মেয়েটা তার!

মাঝখানের ঘর থেকে অপর্ণার গলা পাওয়া যাচ্ছিল। চাপা গলা, কিন্তু রাগের ভাব। মিঠু মাথা উঁচু করে মায়ের গলা শুনবার চেষ্টা করে বাবাকে চোখের ইংগিত করে বলল , ‘মা!’ নিঃশব্দে হাসল ‘মা আদিকে বকছে। রোজ বকে।’ জীবন নিস্পৃহভাবে বলে ‘কেন’! মিঠু মাথা নামিয়ে আনল জীবনের গলার ওপর, তার থোকা থোকা চুলে জীবনের মুখ আচ্ছন্ন করে দিয়ে বলল , ‘আতরদি রোজ কাপডিশ ভাঙে। সকালে দেরি করে আসে। মা বলে ওকে ছাড়িয়ে দেবে। বলতে-বলতে টপ করে জীবনের বুক থেকে পিছলে নেমে যায়, মশারি তুলে মেঝেয় লাফিয়ে পড়ে। জীবন ওকে ধরবার জন্য হাত বাড়িয়ে বলে ‘কোথায় যাচ্ছ, মা-মণি!’ দরজার কাছে এক ছুটে পৌঁছে গিয়ে মিঠু ঘাড় ঘুরিয়ে বলে ‘দাঁড়াও, দেখে আসি।’

গোয়েন্দা! এই মেয়েটা তার পুরোপুরি গোয়েন্দা। বাড়ির সমস্ত খবর রাখে, আর সকালে বাবাকে একা পেয়ে সব খবর চুপিচুপি বলে দেয়। বিশেষত অপর্ণার খবর। মিঠু তার সহজ বুদ্ধিতে বুঝে গেছে যে, বাবা মায়ের খবরটাই বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনে। গতকাল তাদের মোটরগাড়িটার জ্বর হয়েছিল কিনা, কিংবা তিনশো ছিয়ানব্বই নম্বর বাড়িতে কুকুরটার কটা বাচ্চা হল এসব খবরে বেশি কান দেয় না। মিঠুর উলটো হচ্ছে মধু–জীবনের তিন বছর বয়সের ছোট মেয়ে। সে মায়ের আঁচল ধরা। জীবনকে চেনে বটে, কখনও-সখনও কোলেও আসে কিন্তু থাকতে চায় না। দুই মেয়ের কথা ভাবতে-ভাবতে জীবন উঠে সিগারেট ধরাল। মাথা ধরে আছে কাল রাতের হুইস্কির গন্ধ এখনও যেন ভেঁকুরের সঙ্গে অল্প পাওয়া যাচ্ছে। কেমন ঘুমে জড়িয়ে আছে চোখের পাতা। কিছুতেই মনে পড়ে না কাল রাতে ‘বার’ থেকে কী করে সে ঘরের বিছানা পর্যন্ত পৌঁছোতে পেরেছিল। কোনওদিনই মনে পড়ে না। কাল বিকেলে কারখানা থেকে তার ড্রাইভার তাকে ‘বার’ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গাড়ি নিয়ে ফিরে এসেছিল। বার–এ দেখা হয়েছিল দুজন চেনা মানুষের সঙ্গে। আচার্য আর মাধবন। তারপর!’

মিঠু ছোট পায়ে দৌড়ে এসে মশারি তুলে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল জীবনের কোলে। হাঁফাচ্ছে। এত বড়-বড় চোখ গোল করে বলল , ‘আমাদের বেড়ালটা না বাবা ফ্রিজের মধ্যে ঢুকে ছিল। মরে কাঠ হয়ে আছে।’ একটু অবাক হয়ে জীবন বলল , ‘সে কী!’ তার হাত ধরে টানতে-টানতে মিঠু বলল , ‘চলো দেখবে। নইলে এক্ষুনি আতরদি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসবে।’ কৌতূহল ছিল। না, তবু মিঠুকে এড়াতে পারে না জীবন, তাই হাই তুলে বিছানা ছাড়ল।

ঘরের চারিদিকেই লক্ষ্মীর শ্ৰী। মেঝেতে পাতা চকচকে লিনোলিয়ম। ওপাশে অপর্ণা আর মিঠু মধুর আলাদা বিছানা। নীচু সুন্দর খাটের ওপর শ্যাওলা রঙের সাদা ফুলতোলা চমৎকার বেডকভার টান–টান করে পাতা। মশারি খুলে নেওয়া হয়েছে। ডানদিকে প্রকাণ্ড বুককেস যার সামনেটা কাঁচের, বুককেসের ওপর বড় একটা হাই ফাঁই রেডিও, তার ঢাকনার অর্গান্ডিতে অপর্ণার নিজের হাতের এমব্রয়ডারি, পাশে মানিপ্ল্যান্ট রাখা, লেবু রঙের চিনেমাটির ফুলদানি, সাদা ক্যাবিনেটের ভিতরে রেকর্ডচেঞ্জার মেশিন–কোথাও এতটুকু ধুলোময়লা নেই। পুবের জানালা খোলা, নীল পাতলা পরদার ভিতর দিয়ে শরৎকালের হালকা রোদ আর অল্প হিম হাওয়া আসছে। অপর্ণা ঘর বড় ভালোবাসে, তা ছাড়া তার রুচি আছে। এর জন্য জীবন কখনও মনে-মনে কখনও প্রকাশ্যে অপর্ণাকে বাহবা দেয়। কোন জায়গায় কোন জিনিসটা রাখলে সুন্দর দেখায় জীবন তা ভেবেও পায় না, যদিও এ সবই জীবনের রোজগারে অর্জিত জিনিস, তবু তার মাঝে-মাঝে মনে হয় এই ঘরদোর, এই ফ্ল্যাট বাড়িটার আসল মালিক অপর্ণাই। সারাদিন ঘুরে ঘুরে অপর্ণা বড় ভালোবাসায়, যত্নে, বড় মায়ায় এই সবকিছু সাজিয়ে রাখে। জীবনের সন্দেহ হয়, সে যখন থাকে না, তখন–পোষা গৃহপালিতের গায়ে লোকে যেমন হাত রেখে আদর করে তেমনি অপর্ণা রেডিও, বুককেস, সোফায় বা টেবিলে তার স্নেহশীল সতর্ক হাত রেখে আদর জানায়। তাই জীবন যখনই ঘরে ঢোকে তখনই মনে হয় এ সব জিনিস অপর্ণারই পোষমানা, এ সব তার নয়। তাই যখন সে ঘরে চলাফেরা করে, বসে, বা শুতে যায়, যখন ওয়ার্ডরোবের পাল্লা খোলে তখন সে তার নিজের ভিতরে এক ধরনের কুণ্ঠা ও সতর্কতা লক্ষ্য করে মনে-মনে হাসে। বাস্তবিক অপর্ণা হয়তো তার এ স্বভাব লক্ষ করে না, কিন্তু জীবন জানে লোকে যেমন তাদের ঘরে ফিরে সহজ, খোলামেলা, আরামদায়ক অবস্থা ভোগ করে সে ঠিক তেমন করে না।

‘শিগগির বাবা’ বলতে-বলতে মিঠু তাকে টেনে আনল মাঝখানের ঘরে। আসলে ঘর নয়, প্যাসেজ। তিনদিকে তিনটে দরজা–একটা রান্নাঘর, অন্যটা বসবার, তৃতীয়টা তাদের শোওয়ার ঘরের। তিন কোণা প্যাসেজের একধারে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ান ক্রিম রঙের সুন্দর ফ্রিজটা। রাতে যখন প্রায়ই ভীষণ ঘোর অবস্থায় খানিকটা এলোমেলো পায়ে অন্ধকার প্যাসেজটা পার হয় জীবন তখন সে মাঝে-মাঝে ফ্রিজটার কাছে একবার দাঁড়ায়, কোনওদিন ঠান্ডা সাদা ফ্রিজটার গায়ে হাত রাখে। মনে হয় ঘুমন্ত সেই ফ্রিজটা তার হাত টের পেয়ে আস্তে জেগে ওঠে, সাড়া দেয়। জীবনের মনে হয় ফ্রিজটা এতক্ষণ যেন এই আদরটুকুর জন্য অপেক্ষা করে ছিল। এখন দিনের বেলা সব কিছু অন্যরকম। ফ্রিজটার দুটো দরজা দু-হাট করে খোলা, সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে গম্ভীর মুখ অপর্ণা, তার পিঠে ঝুঁকে মধু, আতর নীচু হয়ে তলার থাকে অন্ধকারে কিছু দেখবার চেষ্টা করছে। জীবন লক্ষ করে সে এসে দাঁড়াতেই অপর্ণার শরীর হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। জীবন অল্প হেসে জিগ্যেস করে ‘কী হল!’ অপর্ণা ফ্রিজটার দিকে চেয়ে থেকেই জবাব দিল ‘দ্যাখো না, বেড়ালটা ভিতরে ঢুকে মরে আছে!’ জীবন অপর্ণার মুখের খুব সুন্দর কিন্তু একটু নিষ্ঠুর পাথুরে প্রোফাইলের দিকে চেয়ে সহজ গলায় বলে ‘কী করে গেল ভেতরে!’ অপর্ণা সামান্য হাসে, ‘কি জানি! হয়তো আমিই কখনও যখন ফ্রিজ খুলেছিলুম তখন ঢুকে গেছে। খেয়াল। করিনি।’ জীবন সঙ্গে-সঙ্গে সান্ত্বনা দিয়ে বলে ‘ওরকম ভুল হয়। ওটাকে বের করে ফ্রিজটা ভালো করে ধুয়ে দিয়ো। মরা বেড়াল ভালো নয়।’ ‘আচ্ছা।’ জীবন চলে যাচ্ছিল বাথরুমের দিকে, হঠাৎ মনে পড়ায় ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে ‘আর আজ বাজারে যাবে বলেছিলে! ছুটির দিন। যাবে না!’ এক ঝলক মুখ ফিরিয়ে জীবনের চোখে চোখ রাখল অপর্ণা, হাসল ‘যাব না কেন! একটা বেড়াল মরেছে বলে! তুমি তৈরি হও না।’ কথাটা ঠিক বুঝল না জীবন, শুধু অপর্ণার ওই একঝলক তাকানোর দিকে চেয়ে ওর সুন্দর ছোট কপালে সিঁদুরের টিপের চারপাশে কোঁকড়ানো চুল, ঈষৎ ফুলে থাকা অভিমানী সুন্দর ঠোঁট, নিখুঁত আর্চ-এর মতো জ আর থুতনির চিক্কণতা দেখে হঠাৎ নিজেকে তার বড় ভাগ্যবান মনে হল। বড় সুন্দর বউ তার। বড় সুন্দর অপর্ণা। ছেলেবেলা থেকে অনেকে এরকম বউ পাওয়ার আশায় বড় হয়ে ওঠে। ভেবে দেখতে গেলে জীবনের ছেলেবেলা ছিল বড় দুরন্ত, বড় ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির বড় দামাল দিন ছিল তখন। আজ একটা বেড়াল তার ফ্রিজ-এর ভিতর মরে পড়ে আছে, আর তখন সেই ছেলেবেলায় যখন সে ছিল চায়ের। দোকানের বাচ্চা বয়, তখন উনুনের পাশে ছোট্ট নোংরা যে চৌখুপী জায়গায় সে চট আর শতরঞ্জির বিছানায় শুত তখন আর একটা বেড়াল তার মাথার কাছে শুয়ে থাকত সারা রাত। মিনি নামে সেই বেড়াল উনিশ শো পঞ্চাশে চক্রবর্তীদের তিনতলা থেকে দিয়েছিল লাফ। জীবন আজও জানে না বেড়ালটা আত্মহত্যা করেছিল কিনা। সেই সব ছেলেবেলার দিনে জীবন কখনও অপর্ণা বা অপর্ণার মতো সুন্দর অভিজাত বউ-এর কথা ভাবেইনি।

বাথরুমের বড় আয়নায় কোমর পর্যন্ত নিজের আকৃতির দিকে চেয়ে মৃদু হাসল জীবন। দুর্ধর্ষ কাঁধের ওপর শক্ত ঘাড়, বুকে দু-ধারে চৌকো পেশি, দাঁতে ব্রাশ ঘষতে হাতের শক্ত রগ, শিরা আর মাংসপেশিতে ঢেউ ওঠে। ছোট করে ছাঁটা চুল, টানা, মেয়েলি এবং দুঃখী এক ধরনের অদ্ভুত চোখ তার। তার গায়ের রং শ্যামবর্ণ, যেমনটা মিঠুর। মধু তার মায়ের মতোই ফরসা। জীবনের নাক চাপা, ঠোঁট একটু পুরু কিন্তু সুন্দর। তার সঙ্গে মিঠুরই মিল বেশি, মধুর সঙ্গে অপর্ণার। জীবনের চেহারায় পরিশ্রমের ছাপ আছে, বোঝা যায় আলস্য বা আরামে সে খুব অল্প সময়ই ব্যয় করেছে। তৃপ্তিতে আয়নার দিকে চেয়ে হাসে জীবন। বাস্তবিক প্রায় ফুটপাথের, রাস্তার জীবন থেকে এতদূর উঠে আসতে পারার পরিশ্রম ও সার্থকতার কথা ভাবলে তার মাঝে-মাঝে নিজেকে বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। সে তার বউ মেয়ে এবং পরিবারের জন্য কি সমস্ত কর্তব্যই করেনি! এই ভেবেই সে তৃপ্তি পায় যে এরা কেউ দুঃখে নেই, জীবনের ওপর পরম নির্ভরতায় এরা নিশ্চিন্তে বেঁচে থেকে বেঁচে থাকাকে ভালোবাসছে। সে নিজেও কি বেঁচে থাকাকেই ভালোবাসেনি বরাবর। যখন সেই অনিশ্চিত ছেলেবেলায় সে কখনও চায়ের দোকানের বাচ্চা বয়, কখনও বা মোটরসারাই কারখানার ছোঁকরা কারিগর, তখনও সে রাস্তা পার হতে গিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল দেখে আনন্দে গান গেয়েছে, খাদ্য অনিশ্চিত ছিল তবু প্রতিটি খাদ্যকণার কত স্বাদ ছিল তখন! তখন দেশভাগের পর কলকাতায় এসে রহস্যময় এই শহরকে কত সহজে চিনে নিয়েছিল জীবন! আজ সে যখন তার ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে, গাড়ির জানালা থেকে, বা বার-এর দরজার কাঁচের পাল্লার ভিতর দিয়ে দেখে তখন এখানকার রাস্তাঘাট, ভিড়, আলো কত দূরের বলে মনে হয়! কিংবা রাতে ঘোর মাতাল অবস্থায় ফিরে এসে যখন খাওয়ার ঘরে ঢাকা খাবার খুলে সে সুন্দর। সমস্ত খাবারের রঙের দিকে চেয়ে দেখে তখনও তার মনে হয় এসব খাবারে কি সেই সব স্বাদ আর পাওয়া যাবে!

জীবন ঘরে ঢুকে দেখল ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে অপর্ণা মধুকে সাজাচ্ছে। জীবন বলল ‘ও যাবে নাকি!’

অপর্ণা মধুর মাথায় রিবন জড়াতে–জড়াতে বলল ‘যাবে না! থাকবে কার কাছে! যা বায়না মেয়ের।’

জীবন বিরক্তভাবে মুখ ফিরিয়ে দেখল মিঠু মেঝের লিনোলিয়মে খোলা হাসিখুশি’র সামনে বসে হাঁ করে মা আর মধুর দিকে চেয়ে আছে। জীবন বলল ‘দোকানে-দোকানে ঘুরতে হবে, ওকে নিলে অসুবিধে। কখন জলতেষ্টা পায়, কখন হিসি পায় তার ঠিক কী!’

শুনে মিঠু মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসে। অপর্ণা তার ধীর হাতে মধুর মাথার রিবন সরিয়ে নেয়। তখনই গম্ভীর মুখে একবার মিঠুর দিকে চেয়ে বলে ‘ঠিক আছে।’

জীবন সঙ্গে-সঙ্গে সহজ হওয়ার ভাব করে বলে ‘অবশ্য তোমার যদি ইচ্ছে হয়—’

‘না, থাক। আতর তো রইলই, ও দেখতে পারবে।’

‘কাঁদবে বোধ হয়।’

‘তা কাঁদবে।’

‘কাঁদুক।’ জীবন হাসে ‘কাঁদা খারাপ নয়। তাতে অভ্যেস ভালো হয়। জেদ–টেদ কমে স্বাভাবিকতা আসে।’

অপর্ণা উত্তর দিল না।

.

জীবনের খয়েরি রঙের ছোট সুন্দর গাড়িটা সামনে দাঁড় করানো। ড্রাইভার গাড়ির দরজায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। জীবনের এক পা পিছনে অপর্ণা–ছাইরঙা সিল্কের শাড়ি, ছাইরঙা ব্লাউজ, হাতে বটুয়া, মাথায় এলো খোঁপা, পায়ে শান্তিনিকেতনি চটি–বড় সুন্দর দেখায়। অপর্ণাকে। পাশাপাশি যেতে কেমন অস্বস্তি হয় জীবনের। সে নিজে পরেছে সাদা টেরিলিনের শার্ট আর জিন-এর প্যান্ট–নিঃসন্দেহে তাকে দেখাচ্ছে ক্রিকেট খেলোয়াড়ের মতো, তবু অপর্ণার পাশে কী কারণে যেন কিছুতেই তাকে মানায় না। ড্রাইভারকে ইঙ্গিতে সরে যেতে বলে জীবন একবার পিছু ফিরে চাইল। ব্যালকনিতে আতরের কোলে মধু–সে ভীষণ কাঁদছে, চোখের জলে মুখ ভাসছে তার। রেলিঙের ওপর ঝুঁকে চেয়ে আছে মিঠু–বিষণ্ণ মুখ–জীবনের চোখে চোখ পড়তেই হাসল, হাত তুলে বলল ‘টা–টা বাবা! দুর্গা দুর্গা বাবা!’ অপর্ণা খুব তাড়াতাড়ি ব্যালকনির দিকে চেয়েই চোখ সরিয়ে গাড়িয়ে ঢুকে গেল। জীবন হাসিমুখে হাত তুলে ব্যালকনিতে মিঠু আর মধুর উদ্দেশ্যে বলল ‘শিগগিরই আসছি ছোট মা! টা–টা, দুর্গা দুর্গা বড় মা।’

‘টা–টা, দুর্গা দুর্গা বাবা। টা–টা দুর্গা দুর্গা।’

‘টা–টা। দুর্গা–দুর্গা।’

.

জীবন গাড়ি এনে দাঁড় করাল মোড়ের পেট্রোল পাম্পে। অপর্ণা নামল না। জীবন নেমে ধরাল একটা সিগারেট। আকাশে শরৎকালের ছেঁড়া মেঘ, রোদ উড়ছে। পেট্রোল পাম্পের একদিকে বিরাট একটা সাইন বোর্ড ‘হ্যাপি মোটরিং!’ সেই দিকে চেয়ে রইল জীবন, হঠাৎ আলগা একটা খুশিতে তার মন গুনগুন করে উঠল ‘হ্যাপি মোটরিং! হ্যাপি হ্যাপি হ্যাপি মোটরিং!’ যে বাচ্চা ছেলেটা মোটরে পেট্রোল ভরল, হাত বাড়িয়ে তাকে একটা টফি দিল অপর্ণা। খুশি হল জীবন। অপর্ণার মুখ এখন পরিষ্কার ও সহজ। হায়! কতকাল অপর্ণার সঙ্গে জীবনের ঝগড়া বা খুনসুটি হয় না। জীবন যা বলে অপর্ণা একটু গম্ভীর মুখে তাই মেনে নেয়। সত্যিই মেনে নেয় কি না জীবন তা জানে না অন্তত বিয়ের আগে অপর্ণা যে বাড়ির মেয়ে ছিল সে বাড়ির লোকেরা সহজে অন্য কারও কথা মেনে নিতও না, বশও মানত না। অপর্ণাই মানছে কি! ঠিক জানে না জীবন। আসলে সারাদিনে তাকে অপর্ণার বা অপর্ণাকে তার কতটুকু দরকার পড়ে!

ভালো করে দেখাও হয় না। শুধু রাতে যখন সে ঘোরলাগা অবস্থায় ঘরের দরজায় পৌঁছোয়, আর দরজা খুলে দিয়ে অপর্ণা সরে যায় তখন প্যাসেজের আলো-আঁধারিতে সে একঝলক অপর্ণার সুন্দর কিন্তু নিষ্ঠুর মুখে একটু বিরাগ লক্ষ করে মাত্র। সেটুকুও ভুল হওয়া সম্ভব। তবু অপর্ণাকে ছাড়া অন্য কোনও মেয়েকে ভালোবাসার কথা মনেও হয় না জীবনের।

.

সামনেই ট্রাফিকের হলুদ বাতি লাল হয়ে যাচ্ছিল। আগে একটা সাদা বড় প্লিমাউথ শ্লথ হয়ে থেমে যাচ্ছিল, জীবন স্টিয়ারিং ডাইনে ঘুরিয়ে তাকে পাশ কাটাল, গতি কমাল না, জ্বলজ্বলে লাল আলোয় নাকের ডগা দিয়ে বেরিয়ে এল তার ছোট গাড়ি, আড়াআড়ি ক্রসিং-এর গাড়িগুলো সদ্য চলতে শুরু করেছে, জীবন অনায়াসে ধাক্কা বাঁচিয়ে বেরিয়ে গেল। অপর্ণা চমকে উঠে বলল ‘এই! কী হচ্ছে!’ জীবন বাঁ-হাতটা তুলে অপর্ণাকে শান্ত থাকতে ইঙ্গিত করল শুধু। অপর্ণা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের রাস্তা দেখে নিয়ে বলে পুলিশ তোমার নাম্বার কল করছে, হাত তুলে থামতে বলছে।’ জীবন গম্ভীর মুখে বলল , ‘যেতে দাও।’ অপর্ণা চুপ করে যায়। চওড়া সুন্দর গড়িয়াহাটা রোড দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে পার্ক সার্কাসের দিকে। সকাল। ট্র্যাফিক খুব বেশি নয়। তবু সামনেই বাস স্টপে একটা দশ নম্বর বাস আড় হয়ে থেমেছে, ফলে পাশ কাটানোর রাস্তা প্রায় বন্ধ। জীবন। নিঃশ্বাসের সঙ্গে একটা গালাগাল দেয়, গাড়ির গতি একটুও কমায় না, তার ছোট গাড়ি বাসটাকে প্রায় বুরুশ করে বেরিয়ে গেল। অপর্ণা কিছু বলে না, শুধু তার বড়-বড় চোখ কৌতূহলে জীবনের মুখের ওপর বার বার ঘুরে যায়। জীবনের মুখ বড় গম্ভীর, কপালে অল্প ঘাম। যেতে যেতে জীবন। ভীষণ বেগে হঠাৎ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে আবার সোজা করে নিল, গাড়ি এত জোরে টাল খেল যে ড্যাশবোর্ডে মাথা ঠুকে গেল অপর্ণার। ‘উঃ।’ গাড়ির সামনের রাস্তায় চমৎকার সাজগোজ করা। একটি যুবতী মেয়ে তিড়িং করে লাফ দিয়ে ট্রামলাইনের দিকে গিয়ে পড়ল। ওই বয়সের মেয়েকে এরকম লাফ দিতে আর দেখেনি জীবন, সে ঘাড় ঘুরিয়ে আর একবার মেয়েটিকে দেখবার চেষ্টা করে, অপর্ণা হঠাৎ তীব্র গলায় বলে, ‘তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো! এটা কি বাহাদুরি নাকি!’ জীবন তার গম্ভীর অকপট মুখ ফেরায়, ‘অপর্ণা, আমরা একটু মুশকিলে পড়ে গেছি।’ অপর্ণা বড় চোখে তাকায় ‘মুশকিল।’ জীবন রাস্তার দিকে তার পুরো মনোযোগ রেখে বলে ‘গাড়ির ব্রেকটা বোধহয় কেটে গেছে। ধরছে না।’ অপর্ণা নিঃশব্দে শিউরে ওঠে, চুপ করে জীবনের দিকে একটু চেয়ে থেকে বলে ‘স্টার্ট বন্ধ করে দাও।’ জীবন একটা টেম্পোকে পাশ কাটিয়ে নিল, অদূরে একটা ক্রসিং আড়াআড়িভাবে একটা লরি পাশের রাস্তা থেকে প্রকাণ্ড কুমিরের মতো মুখ বার করেছে–এক্ষুনি রাস্তা জুড়ে যাবে। জীবন এই বিপদের মধ্যেও ছোট আয়নার একপলকের জন্য নিজের ভয়ঙ্কর উদ্বিগ্ন ও রেখাবহুল মুখ দেখতে পেল, অপর্ণা চোখ বুজে হাতে হাত মুঠো করে ধরে আছে। জীবন হাত বার করে লরির ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে নাড়ল, তারপর হাত নাড়তে-নাড়তেই এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে জীবন গাড়িটাকে এক ঝটকায় মোড় পার করে দিল। অল্প হাঁপায় জীবন। স্টার্ট বন্ধ হচ্ছে না। ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। একটু আগেও সব ঠিকঠাক ছিল। অথচ…’। অপর্ণা বক্তব্যহীন ফ্যালফ্যাল চোখে তাকায় ‘কী হবে। তাহলে!’ ড্যাশবোর্ডে ঝুলছে স্টিলের চকচকে চাবির রিং, দোল খাচ্ছে। জীবন আর একবার স্টার্ট বন্ধ করার চেষ্টা করল। অপর্ণা শ্বাসরুদ্ধ গলায় বলে ‘ঠেলা গাড়ি, ওঃ, একটা ঠেলাগাড়ি…’ জীবন। তার হাতের ওপর অপর্ণার নরম হাত টের পায়, বলে ‘ভয় পেয়ো না, চেঁচিয়ো না, মাথা ঠিক রাখো, সামনে যতদূর দেখা যায় দেখে দেখে আমাকে বলো। ফাঁকা রাস্তা পাচ্ছি এখনও। বোধহয় বেরিয়ে যাব।’ অপর্ণা হাতের দলাপাকানো রুমালে চোখ মোছে, ‘গাড়ির এত গণ্ডগোল, আগে টের পাওনি কেন?’ খোলা জানলা দিয়ে হু-হু করে বাতাস আসছে, তবু জীবনের কপালের ঘাম নেমে আসছে চোখে মুখে, জিভে সে ঘামের নোনতা স্বাদ পায়, বলে ‘দিন পনেরো আগেই তো গ্যারাজ থেকে আনলুম, গিয়ারটা একটু…’ অপর্ণা হঠাৎ প্রায় লাফিয়ে উঠে বলে ‘বাঁ-দিকে, বাঁ দিকে মোড় নাও, সামনে জ্যাম।’ তিনটে রিকশা একে অন্যকে কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিল, পাশ কাটাতে গিয়ে গাড়ির বনেট লাগল একটা রিকশার হাতলে, ছোট্ট একটা ধাক্কায় রিকশাটাকে সরিয়ে বাঁয়ে মোড় ফিরল জীবন, রিকশাওয়ালা, হাতল শূন্যে তুলে প্রাণপণে। রিকশাটাকে দাঁড় করবার চেষ্টা করছে–এই দৃশ্য দেখতে দেখতে হাজরা রোডে ঢুকে উলটোদিক থেকে আসা একটা ষোলো নম্বর বাস এর দেখা পায় জীবন। বাসটা একটা ধীরগতি কালো অস্টিন অফ ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যাবে বলে রাস্তা জুড়ে আসছে। দাঁতে ঠোঁট চাপে জীবন, টের পায় ঠোঁটের চামড়া কেটে দাঁত বসে যাচ্ছে, ফুটপাথ ঘেঁষে স্টিয়ারিং ঘোরায় সে, তবু বুঝতে পারে অত অল্প জায়গা দিয়ে গাড়ি যাবে না। চোখ বুজে ফেলার ভয়ঙ্কর একটা ইচ্ছে দমন করে সে দেখে যোলো নম্বর বাসটা তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, বাস-এর ড্রাইভার হাত বাড়িয়ে তার কান মলে দিয়ে বলতে পারে শিখতে অনেক বাকি হে!’ কিন্তু জীবন খুব অবাক হয়ে দেখল তার ছোট গাড়িটা যেন ভয় পেয়ে জড়সড়ো এবং আরও ছোট হয়ে রাস্তার সেই খুব অল্প ফাঁক দিয়ে ফুরুৎ করে বেরিয়ে গেল। নেশাগ্রস্তের মতো হাতে জীবন, ‘অপর্ণা!’…তাকিয়ে দেখে অপর্ণা দু-হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে, জীবনের ডাক শুনে শুধু বলল ‘আমার মেয়ে দুটো! মেয়ে দুটোর কী হবে!’

মুহূর্তের জন্য স্টিয়ারিঙের ওপর হাত ঢিলে হয়ে যায় জীবনের। গাড়ি টাল খায়। দুর্বল সময়টুকু আবার সামলে নেয় জীবন, বলে ‘কেঁদো না, কাঁদলে আমার মাথা ঠিক থাকবে না। একটু ভুল হয়েছে তোমার, এই রাস্তার মোড় নিতে বললে, কিন্তু রাস্তায় বড় ভিড়।’ গাড়ি খুব জোরে চলছে না, জীবন চারদিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছিল। অপর্ণা চোখের জল মুছে শক্ত থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে বলে ‘যেমন করে হোক বাসার দিকে গাড়ি ঘোরাও।’ জীবন স্থির গলায় বলে তাতে লাভ কী! বাসার সামনে গেলেই কি গাড়ি থামবে!’ অপর্ণা জোরে মাথা নাড়ে, ‘না থামুক। মধু আর মিঠু হয়তো এখনও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।’ জীবনের ঘাড় টন টন করছিল ব্যথায়, সহজ ভঙ্গিতে না বসে সে অনেকক্ষণ তীব্র উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসে আছে। বাঁ-দিকে পর পর কয়েকটা সরু নোংরা গলি, মোড় ফেরা গেল না। সামনেই চৌরাস্তা, দূর থেকেই দেখল জীবন ট্র্যাফিক পুলিশ অবহেলার ভঙ্গিতে হাত তুলে তার সোজা রাস্তা আটকে দিল। অপর্ণা হঠাৎ জোরালো গলায় বলল ‘ডান দিকে মোড় নাও, ওদিকে ফাঁকা। রাস্তা, তারপর রেইনি পার্ক…’ কিন্তু জীবন মোড় নিতে পারল না, গাড়িটা অল্পের জন্য এগিয়ে গিয়েছিল, তারপর সহজ নিশ্চিন্তভাবে ট্যাফিক পুলিশটাকে লক্ষ্য করেই ছুটছিল। লোহার হাতে স্টিয়ারিং সোজা রাখে জীবন, পুলিশটার হাতের তলা দিয়ে তার গাড়ি ছোটে। বাঁকের মুখে নীল রঙের একটা ফিয়াট তার গাড়ির বাফারের ধাক্কায় নড়ে উঠে থেমে কাঁপতে থাকে। ফিরেও তাকায় না জীবন, দুটো লরি পর পর কাটিয়ে নেয়। পিছনের পুলিশটা চেঁচিয়ে গাল দিচ্ছে। সামনেই হাজরার মোড়, লাল বাতি জ্বলছে, অনেক গাড়ি পর পর দাঁড়িয়ে। কিছুই ভাবতে হয় না। জীবনকে, সে থেমে থাকা গাড়িগুলোকে বাঁয়ে রেখে অবহেলায় এগিয়ে যায়, আবার একটা ডবল ডেকার, পিছনে লম্বা ট্রাম আড়াআড়ি রাস্তা জুড়ে যাচ্ছে, জীবন শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলে ‘আজ কেবলই লাল বাতি, রোজ এমন হয় না তো!’ অপর্ণা বাঁ-হাত বাইরে বের করে মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত দেখায় ডবলডেকারটার মুখ কোনওক্রমে এড়িয়ে জীবন গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারল। রাস্তা ফাঁকা নয়, কিন্তু অনেকটা সহজ। বাঁয়ে মনোহরপুকুরের মুখ, একটু দ্বিধাগ্রস্ত হাতে গাড়ি ঘোরাবে কিনা ভাবতে-ভাবতে জীবন সোজাই চলতে থাকে। কালীঘাটের স্টপে গোটা চার পাঁচ স্টেট বাস একসঙ্গে থেমে আছে। দূর থেকেই জীবন দেখে প্রথম বাসটা ধীর–স্থির ভাবে স্টপ ছেড়ে যাচ্ছে, সে পৌঁছবার আগে আর বাসগুলো যে ছাড়বে না তা নিশ্চিত। ওখানে বাস স্টপের পাশেই একটা পাবলিক ইউরিনাল। আগে থেকেই জীবন তাই ট্রামের ট্র্যাকে তুলে দিল তার গাড়ি। অপর্ণা কী বলতে গিয়ে থেমে যায়। কিছু লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের গাড়িটাকে এবার অনেকের নজরে পড়ছে। জীবন কালীঘাট পেরিয়ে ট্রামের ট্রাকে ঘাসমাটির জমির ওপর দিয়েই চলতে থাকে। লোকজন দূর থেকে চেঁচিয়ে কী বলছে। জীবন একটু ঘোলাটে চোখে অপর্ণার দিকে চায়; ‘অপর্ণা…’ অপর্ণা অর্থহীন চোখে তার মুখের দিকে তাকায়। জীবন বলে ‘আমার কেমন ঘুম পাচ্ছে।’ অপর্ণা বুঝতে না পেরে বলে ‘কী বলছ?’ জীবন মাথা নাড়ে, ‘চোখের সামনে আঁশ–আঁশ জড়ানো একটা ভাব। অনেকক্ষণ সিগারেট না খেলে আমার একরকম হয়। আমি অনেকক্ষণ সিগারেট খাইনি।’ অপর্ণার চোখে জল টলমল করছে, রুমালের ঘষায় চোখের আশেপাশের জায়গা লাল, বড় সুন্দর দেখায় তাকে। কপালের সিঁদুর অল্প মুছে গেছে। সে তৎপর গলায় বলে ‘কোথায় তোমার সিগারেট? জীবন তার দিকে চেয়ে বলে ‘পকেটে।’ অপর্ণা বলে ‘বের করে দাও।’ এবার সামনের মোড়ে সবুজ বাতি জ্বলছে, বালিগঞ্জের ট্রাম দাঁড়িয়ে আছে বাঁকা হয়ে, ট্রাম ট্র্যাকের পাশে-পাশে কয়েকটা গাছ, স্টপে লোকের ভিড়। তাদের গাড়িটা কাছে আসতেই লোকে চেঁচাচ্ছে ‘এই কী হচ্ছে…!’ জীবন ক্রমান্বয়ে হর্ন দিয়ে ট্রামের ট্র্যাক থেকে রাস্তায় নামে। সামনেই একটা নয় নম্বর। এটা ট্রলি বাস–প্রকাণ্ড বড়, আস্তে-আস্তে রাস্তা জুড়ে চলে। জীবন হর্ন দেয়, বাসটাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা বৃথা–জায়গা নেই। ট্রাম ট্রাকের দিকে আবার মুখ ঘোরাতে গিয়ে জীবন দেখে তিন-চারজন লোক রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে। আছে, ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়ে বাঁয়ে স্টিয়ারিং চেপে ধরে জীবন। কংক্রিটে প্রবল ধাক্কা দিয়ে গাড়িটা সোজা ফুটপাতে উঠে যায়। এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের গাড়িবারান্দার তলা থেকে একেবারে শেষ মুহূর্তে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে কয়েকজন তোক সরে যায় জীবনের গাড়ির মুখ থেকে। জীবন গালাগাল শুনতে পায় ‘এই শুয়োরের বাচ্চা, হারামি…’ ছোট আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখে কয়েকজন তার গাড়ির পিছু নিয়ে দৌড়োতে–দৌড়োতে পিছিয়ে পড়তে থাকে। তারা দূর থেকে হাত নেড়ে শাসায়। মুক্ত অঙ্গনের সামনে জীবন ফুটপাথ ছেড়ে আবার রাস্তার নামে। একটা ঢিল এসে পিছনের কাঁচে চিড় ধরিয়ে দিল। এতক্ষণ উত্তেজনায় অপর্ণাকে দেখেনি জীবন, এখন দেখে অপর্ণা গাড়ির দরজায় ঢলে চোখ বুজে আছে। কপালে একটু জায়গা কাটা, একটা রক্তের ধারা খুঁতনি পর্যন্ত নেমে এসেছে। জীবন চেঁচিয়ে ডাকে ‘অপর্ণা।’ আস্তে চোখ খোলে অপর্ণা, কেমন বোধ ও যন্ত্রণাহীন দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ জীবনের মুখের দিকে তাকায়, হঠাৎ তীব্র আক্রোশে বলে ‘তুমি ছোটোলোক। তুমি বরাবর ঘোটলোক, ভিখিরি ছিলে। তুমি কখনও আমার উপযুক্ত ছিলে না।’ ঠিক। সে কথা ঠিক। জীবন জানে। ফাঁকা সুন্দর রাস্তার দিকে চেয়ে সে বলে ‘আমার ঘুম পাচ্ছে অপর্ণা। আমি রাস্তা ভালো দেখছি না।’ অপর্ণা তেমনই আক্রোশের গলায় বলে ‘ভেবো না, তুমি মরলেও আমার কিছু যায় আসে না। আমি দরজা খুলে এক্ষুনি লাফিয়ে পড়ব।’ বলতে-বলতেই দরজার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দেয় অপর্ণা, আধখোলা দরজার দিকে ঝুঁকে পড়ে, দ্রুত হাত বাড়িয়ে অপর্ণার কনুইয়ের ওপর বাহুর নরম অংশ চেপে ধরে তাকে টেনে আনে জীবন। বলে ‘কপালটা কী করে কাটল! দরজায় ঠুকে গিয়েছিল, না! রুমালে ওটা মুছে ফেল, বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে।’ বলতে-বলতে লেকের দিকে গাড়ির মুখ ফেরায় জীবন, বলে ‘গাড়ির স্পিড পঁচিশের মতো। এখন লাফিয়ে পড়লেও তুমি বাঁচবে না। যা নরম শরীর তোমার! কোনওকালে তো শক্ত কোনও কাজ করোনি। বলতে বলতে হাসে জীবন। অপর্ণা রুমালে মুখ চেপে ফোঁপায়, ‘কেমন অসম্ভব…অসম্ভব লাগছে…এমন সুন্দর সকালটা ছিল…মিঠু মধু আর এখন! দুজনেই হয়তো মরে যাব।’ জীবন প্যান্টের বাঁ-পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বের করে গাড়ির সিট-এর ওপরে রাখে, বলে ‘একটা সিগারেট আমার মুখে লাগিয়ে দাও তো। আর ধরিয়ে দাও।’ অপর্ণা কাঁপা হাতে জীবনের ঠোঁটে সিগারেট লাগায়। লেকের হাওয়া দিচ্ছে, অপর্ণা অনভ্যাসের হাতে দেশলাই ধরাতে গিয়ে পর পর কাঠি নষ্ট করে। জীবন মাথা নাড়ে ‘হবে না, ওভাবে হবে না।’ বলতে-বলতে ঠোঁটের সিগারেট নিয়ে অপর্ণার দিকে বাড়িয়ে দেয় ‘তুমি নিজে ধরিয়ে দাও। গাড়ির মধ্যে নীচু হয়ে বসে ধরাও।’ অপর্ণা প্রায় আর্তনাদ করে বলে ‘তার মানে? আমাকে মুখে দিতে হবে?’ জীবন একবার তার দিকে চেয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয় ‘তাড়াতাড়ি করো। আমার বিশ্রী ঘুম পাচ্ছে।’ অপর্ণা একটু দ্বিধা করে, তারপর গাড়ির মধ্যে ঝুঁকে পড়ে মুখে লাগিয়ে সিগারেটটা ধরানোর চেষ্টা করে। ধরায়, তারপর সিগারেট জীবনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবার বলে ‘ছোটলোক, তুমি ছোটলোক ছিলে। কোনও দিন তুমি সুন্দর কোনও কিছু ভালোবাসোনি। ভেবো না আমি টের পাইনি। কাল রাতে যখন তুমি প্যাসেজ দিয়ে আসছিলে তখন আমি ফ্রিজ-এর দরজা খোলার আর বন্ধ করার শব্দ পেয়েছিলুম।’ স্টিয়ারিং হুইলের ওপর জীবনের হাতের পেশি ফুলে ওঠে তার মানে?’ অপর্ণা হিসহিসে গলায় বলে ‘ওই বেড়ালটা, ওই সুন্দর কাবলি বেড়ালটা…তুমি কোনওদিন ওটাকে সহ্য করতে পারোনি।’ লেক-এর চারধারে ফাঁকা রাস্তায় জীবন গাড়ি ঘুরপাক খাওয়াতে থাকে। হাওয়া দিচ্ছে, প্রবল হাওয়ায় তার কপালের ঘাম শুকিয়ে যেতে থাকে, আর তার আবছা মনে পড়ে…হ্যাঁ মনে পড়ে…সে ফ্রিজ-এর দরজা খুলেছিল কাল রাতে। অপর্ণা ঠিক বলছে। অপর্ণাই ঠিক বলছে। তার গাড়ি টাল খায়, ঘুড়ি ওড়াতে–ওড়াতে একটা ছেলে রাস্তার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে, আকাশের দিকে চোখ। জীবন তার দিকে সোজা এগিয়ে যেতে থাকে, অপর্ণা চিৎকার করে ওঠে ‘এই এই–ই…’ ছেলেটা চমকে উঠে তাকায়, তারপর দৌড়ে রাস্তা পার হয়। ঘুড়ির সুতো গাড়ির উইন্ডক্রিনে লেগে দু’ভাগ হয়ে যায়। ভোকাট্টা। জীবন হাসে। অপর্ণা হাঁপাতে-হাঁপাতে বলে ‘আমাদের পিছনে একটা পুলিশের গাড়ি…’ জীবন আয়নায় তাকিয়ে একটা কালো গাড়ি দেখতে পায়। সঙ্গে-সঙ্গে ডানদিকের প্রথম রাস্তা দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নেয় সে, অল্পক্ষণ পরেই তার গাড়ি লেক পার হয়ে ঢাকুরিয়া ওভারব্রিজ-এর ওপর উঠে আসে। ব্রিজ-এর নীচে একটা পুলিশ দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে তার গাড়িতে থামবার ইঙ্গিত করে। গ্রাহ্য না করে জীবন বেরিয়ে যেতে থাকে। অপর্ণা পিছু ফিরে দেখে বলে ‘তোমার নম্বর টুকে নিল।’ বলতে-বলতেই আবার কেঁদে ফেলে অপর্ণা, ‘তোমার ফাঁসি হওয়া উচিত। তোমার অনেক বছর জেল হওয়া উচিত।’ জীবন কথা বলে না। সামনেই যাদবপুরের ঘিঞ্জি বাস ট্রার্মিনাস, বাজার দোকানপাট। একটা লরি দাঁড়িয়ে আছে, পিছনের চাকার কাছে একটা লোক বসে ঠিকঠাক করে কী যেন ঠিক করছে, একটা সাইকেল রিকশা মুখ ফেরাল। জীবন সোজা রাখে তার গাড়ি, রিকশার সামনের চাকা আর লরির পিছনের চাকায় সেই লোকটার মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় সে স্পষ্ট টের পায় কিছু একটায় তার গাড়ির ধাক্কা লাগল, একটা চিৎকার শোনা যায়। সে মুখ না ফিরিয়ে জিগ্যেস করল, ‘দেখো তো লোকটা মরে গেছে কি না!’ কিন্তু অপর্ণা কী বলল শুনতে পেল না জীবন। তার কান মাথা চোখ জুড়ে দপ দপ করে চমকে উঠল একটা রগ। সে জিগ্যেস করল ‘কী বলছ?’ অপর্ণা অস্ফুট উত্তর দিল। শোনা গেল না। সামনে লোক, অজস্র লোক, সরু রাস্তা, রিকশা লাইন, নীচু দোকান ঘর–এইসব হিজিবিজি ছবির মতো তার চোখে দুলে–দুলে উঠছিল।… একটা বেড়াল…কাল রাতে একটা বেড়াল ফ্রিজ-এর মধ্যে সমস্ত রাত…না মনে পড়ে না, মনে পড়ে না…জীবন দেখল ব্যালকনিতে মধু আর মিঠু দাঁড়িয়ে, মিঠু আর বাবার মতো, মধু তার মায়ের মতো–তারা হাত নাড়ছে, টা–টা, দুর্গা দুর্গা বাবা। অপর্ণা কিছু বলছে? ‘কী বলছ তুমি?’ সে জিগ্যেস করে, অপর্ণা –কুঁচকে তার দিকে তাকায়, হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে স্টিয়ারিং সোজা রাখাবার চেষ্টা করে। জীবন ঝাঁকুনি খেয়ে আবার ধোঁয়াটে ভাবটুকু কাটিয়ে নেয়। অপর্ণা কাঁদে কী হচ্ছে…এবার তুমি মাথা খারাপ করছ। চারজনকে ধাক্কা দিলে পর পর। ওরা ঢিল ছুড়ছে, গালাগাল দিচ্ছে।’ বাস্তবিক ঢিল এসে পড়ছিল, পিছনে লোক দৌড়ে আসছে, সামনের দিকে একটা লোক বাঁশ তুলে চিৎকার করছে ‘মাইরা ফালামু…।’ জীবন ক্লান্ত গলায় বলল , ‘এত লোক কেন বলো তো! কেন এত অসংখ্য লোক! ইচ্ছে করে খুন করে ফেলি।’ জীবন বাঁশ হাতে লোকটাকে পুরোপুরি এড়াতে পারল না, গাড়ির জানালা দিয়ে লোকটা বাঁশ ঢুকিয়ে দিয়ে সরে গেল। বাঁশের নোংরা ধারালো মুখটা তার গাল আর খুঁতনি কেটে, গলায় ধাক্কা দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ করে আবার বাইরে বেরিয়ে গেল। জীবন সিটের ওপর পড়ে গিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে আবার উঠে বসে। মাথা নীচু রাখবার চেষ্টা করে। তার চোখের সামনে। হিজিবিজি, হিজিবিজি দোকানপাট, টেলিগ্রাফের পোস্ট, সিনেমার বিজ্ঞাপন আর অজস্র মানুষের মুখ একটা ধোঁয়াটে আচ্ছন্নতার ভিতরে সরে যেতে থাকে। তার মাথা টলতে থাকে, ঘুড়ির মতো লাট খায়, সে সব ভুলে একবার সিগারেটের জন্য স্টিয়ারিং ছেড়ে হাত বাড়ায়, আবার স্টিয়ারিং চেপে ধরে। অপর্ণা কেবলই কী যেন বলছে, সে বুঝতে পারছে না। এখনও তার ট্যাঙ্ক ভর্তি পেট্রল। সে কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ক্রমে বাঘাযতীন, বৈষ্ণবঘাটা পেরিয়ে যায় জীবন। গাড়িয়ার পর হু-হু করে রাস্তা। কিন্তু জীবনের কাছে ক্ৰমে সবকিছুই আবছা হয়ে আসছিল। হঠাৎ জীবন যেন শেষ চেষ্টায় ব্রেকে পা দেয়, তারপর স্টিয়ারিং ছেড়ে দু হাত শূন্যে তুলে বলে ‘অপর্ণা, আমি আর পারছি না, পারছি না…’, গাড়ি বেঁকে গেল, রাস্তার ঢাল বেয়ে নেমে এল মাঠের ওপর। উঁচু–নীচু খোয়াইয়ের মতো জমির ওপর দিয়ে কয়েক গজ এগিয়ে কাত হয়ে থেমে পড়ল।

.

আস্তে-আস্তে চোখ খোলে জীবন। অপর্ণা গাড়ির ছোট্ট ফাঁকটুকু দিয়ে মেঝের ওপর পড়ে গেছে। ছোট্ট ছাইরঙা একটা পুঁটলির মতো দেখাচ্ছে তাকে। জীবন আপন মনে হাসে, দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায়। এখনও সকালের মতো নরম রোদ, ধান কেটে নিয়ে যাওয়া খেত। জীবন হাত-পা ছড়িয়ে একটু দাঁড়ায়, তারপর এসে দরজা খুলে অপর্ণাকে বের করে, মাঠের ওপর শুইয়ে দেয়। আস্তে আস্তে ঝাঁকুনি দেয় তাকে ‘অপর্ণা, এই অপর্ণা…’ গালে থুতনিতে তীব্র জ্বালা টের পায় সে। গলায় ডেলা পাকানো ব্যথা। মাথা এখনও অল্প ধোঁয়াটে। অপর্ণা চোখ খোলে, অনেকক্ষণ জীবনের দিকে অর্থহীন চেয়ে থাকে। জীবন হাসে ‘ওঠো। উঠে বোসো। আমরা বেঁচে আছি।’

অপর্ণার চোখ জীবনের মুখ থেকে সরে আকাশের ওপর কয়েক মুহূর্তের জন্য উড়ে যায়। তারপর আঁচল সামলে সে উঠে বসে। তার মুখের কঠিন, একটু নিষ্ঠুর অথচ সুন্দর পাথরের মতো প্রোফাইল ঘাসের সবুজ পশ্চাৎভূমিতে জেগে ওঠে। জীবনের মন গুন গুন করে ওঠে ‘ঝরনা, তোমার স্ফটিক জলের স্বচ্ছ ধারা…’ অপর্ণা দাঁড়িয়ে বলে ‘এবার, তাহলে?’ জীবনের দিকে চায় ‘তোমার মুখের ডানদিক কী ভীষণ ফুলে লাল হয়ে আছে, কেটে গেছে অনেকটা!’ জীবন হাতে অবহেলার ভাব ফুটিয়ে বলে ‘ও কিছু না।’ রাস্তা থেকে জমি পর্যন্ত এমন কিছু ঢালু নয়। জীবন ভেবে দেখে সে একাই গাড়িটা ঠেলে তুলতে পারবে। কয়েকজন পথ চলতি লোক দাঁড়িয়ে গেছে, মাঠের ওপর দিয়ে দূর থেকে দৌড়ে আসছে কয়েকটা কালো কালো ছেলেমেয়ে। জীবন অপর্ণাকে বলে ‘তুমি একা পারবে কেন?’ ‘পারব।’ অপর্ণা মাথা নাড়ে ‘তা হয় না।’ পরমুহূর্তেই একটু অদ্ভুত নিষ্ঠুর হাসি হাসে সে ‘এক সঙ্গেই মরতে যাচ্ছিলুম দুজনে। তা ছাড়া আমি তো তোমার সহধর্মিনীও, অনেক কিছুই ভাগ করে নেওয়ার কথা আমাদের।’ বলতে-বলতে সে কোমরে আঁচল জড়ায়, গাড়িতে ‘হেইয়ো’ বলে ঠেলা দেয়, রাস্তার লোকেরাও কয়েকজন নেমে আসে। ‘কোথায় যাবে এটাকে নিয়ে!’ জীবন চিন্তিত মুখে বলে কিছু দূরেই বোধহয় একটা পেট্রল পাম্প আছে।’ যারা ঠেলছিল তাদের একজন সায় দেয়, ‘হাঁ, আছে।’

.

বুড়ো মেকানিক খোলা বনেটের ভিতর থেকে মুখ তুলে জীবনের দিকে তাকায় ‘কই! কিছু পাচ্ছি না তো! কোনও গোলমাল নেই ইঞ্জিনে।’ জীবন চিন্তিত মুখে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে ‘আমি জানি যে কোনও গোলমাল নেই।’ মেকানিক ঝাড়নে হাত মোছে ‘চালিয়ে দেখব?’ জীবন মাথা নাড়ল না।’ বলল ‘বোধহয় হর্নটায় একটু…’, মেকানিক বলল , ‘কানেকশনের গোলমাল? আচ্ছা দেখছি’ কয়েক মিনিটেই কাজ সারা হয়ে গেল। অপর্ণা পেট্রল পাম্পের অফিস ঘরে বসে ছিল। জীবন ডাকতেই উঠে এসে গাড়ির কাছে একটু থমকে দাঁড়াল। জীবন তাকিয়ে ছিল। একটুও দ্বিধা না করে অপর্ণা গাড়িতে উঠে বসল। জীবন গাড়ি স্টার্ট দেয়।

সারা রাস্তায় আর কথা হয় না দুজনে।

.

সন্ধেবেলায় জীবন বসবার ঘরে সোফায় জানালার দিকে মুখ রেখে এলিয়ে পড়ে ছিল। মধু আর মিঠু আতরের সঙ্গে বেড়াতে গেছে পার্কে। জীবন মনে মনে ওদের জন্যেই অপেক্ষা। করছিল। অপর্ণা এসে সামনেই দাঁড়াল। জীবন একবার চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়।

অপর্ণা জানালার থাকের ওপর বসে বলে ‘তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল।’

জীবন দু’আঙুলে কপাল টিপে রেখে বলে ‘বলো।’

অপর্ণার মুখ খুবই গম্ভীর ‘যখন পেট্রল পাম্পে বসে ছিলুম, তখন ওখানকার লোকটার সঙ্গে কথা হল আমার। আমি গাড়ির কিছুই বুঝি না, কিন্তু লোকটাকে যখন আমাদের গাড়ির গোলমালের কথা বললুম, তখন সে খুব অবাক হয়ে বলল অত গোলমাল এক সঙ্গে একটা গাড়ির হতে পারে না। গাড়ি থামাবার অনেক উপায় নাকি ছিল।’

জীবন হাসে ‘ঠিক। সে কথা ঠিক।’

‘তবে গাড়ি থামেনি কেন?’

জীবন মাথা নাড়ে গাড়ি থামেনি গাড়ি থামানো হয়নি বলে।’

‘কেন? তুমি কি ঠিক করেছিলে আমাকে নিয়ে সহমরণে যাবে! না কি এ তোমার খেলা? “

জীবন অস্থির চোখে অপর্ণাকে দেখে, ‘খেলা! পরমুহূর্ততেই মুখ নীচু করে মাথা নাড়ে আবার ‘কি জানি কেন আমি গাড়ি থামাতে পারিনি। থামানো সম্ভব ছিল না-এইমাত্র।’

‘কেন?’

‘কেন!’ জীবন শূন্য চোখে চারপাশে চায়, ভেবে দেখার চেষ্টা করে, তারপর অসহায়ভাবে বলে, ‘কেন, তা তুমি বুঝবে না।’

ভ্রূ কোঁচকায় অপর্ণা, ‘বুঝব না কেন? বোঝাও! আমি বুঝবার জন্য তৈরি।’

জীবন অপর্ণার চোখ এড়িয়ে যায়, কী একটা কথা যেন বলবার ছিল কিন্তু তা খুঁজে পাচ্ছে না। সে, তবু সে ম্লান হেসে হালকা গলায় বলে ‘তুমি কোনওদিন আমাকে সুন্দর দেখোনি, তাই না! কিন্তু আজ যখন ওই ভিড়ের রাস্তায় প্রতি মুহূর্তে অ্যাকসিডেন্টের ওই ভয়ের মধ্যেও আমি ঠিক পঁচিশ মাইল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলুম–আমার মনে হয়–তখন আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছিল। তুমি দ্যাখোনি।’

জীবন মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখে অপর্ণার মুখ রাগে ঝলমল করে উঠল ‘সুন্দর! কীসের সুন্দর! তুমি জানতে না তোমার সংসার আছে? দুটো বাচ্চা শিশু মেয়ে তোমার? তোমার নিজের হাতে তৈরি কারখানা যা অনেক কষ্টে তৈরি করতে হয়েছে? কতগুলো মানুষ তোমার ওপর নির্ভর করে আছে, সে কথা তুমি কী করে ভুলে যাও?’

জীবন বুঝতে পারে সে অপর্ণার সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে, বস্তুত তার কোনও যুক্তিই নেই, তবু হাসি ঠাট্টার সুর বজায় রাখবার চেষ্টায় সে বলে ‘বোধ হয় তোমার কাছে একটু বাহবাও পেয়ে চেয়েছিলুম। তুমি তা দাওনি। কিন্তু মনে রেখো রাস্তার ওই ভিড়, পর পর অত বিপদের মধ্যেও আমি ঠিক পঁচিশ মাইল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে গেছি, একবারও থামিনি। মনে রেখো, একবারও থামিনি।’

রাস্তার একটা ন্যাংটো পাগলের দিকে লোকে যেভাবে তাকায়, সেভাবেই অপর্ণা জীবনের দিকে এক পলক চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তারপর এই প্রথম সে জীবনকে নাম ধরে ডাকে ‘জীবন, তুমি ছিলে রাস্তার ছেলে, প্রায় ভিখিরি। তোমার সঙ্গে কোনও ব্যাপারেই আমার মিল নেই। ভাগ্য তোমাকে এত দূর এনেছে। তবু আজ ওই কাণ্ড করে তুমি সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিতে চেয়েছিলে। ডোবাতে চেয়েছিলে নিজেকে, আমাদেরও। এর জন্যই কি তুমি বাহবা চাও?’

জীবনের মাথার ভিতরে ঘোলা জল টলমল করে ওঠে। অপর্ণার কথার ভিতরে কোথায় যেন একটু সত্য ছিল, কিন্তু জীবন তা ধরতে পারে না। তার প্রাণপণ ইচ্ছে হয় অপর্ণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলে–তুমি ঠিক বলছ অপর্ণা। ঠিক বলছ। এই ঘর–বাড়ি–সংসার আমার নিজের বলে মনে হয় না। এখানকার খাবারে আমি এক কণা স্বাদ পাই না। আমার কেবলই ইচ্ছে এই সব কিছুর বুকের ওপর দিয়ে একবার জোরে চালিয়ে দিই, আমার গাড়ি। কিন্তু সেসব কিছুই বলে না। জীবন, মুখে মৃদু হাসি টেনে আনে, তেমনই ঠাট্টার সুরে বলল , ‘জীবনে সে কয়টি মুহূর্তই দামি যে সব মুহূর্তে মানুষ মানুষকে সুন্দর দেখে। জন্ম থেকে তুমি কি কেবলই শিখেছ কী করে নিরাপদে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা যায়?’

মাথার ভিতরে, বুকের ভিতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা বোধ করে জীবন। অপর্ণা নিষ্ঠুর ধারাল চোখে কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে চেয়ে থাকে, তারপর সামান্য বিদ্রুপের মতো করে বলে যায়, আমাদের কাবলি বেড়ালটারও সেই দামি মুহূর্ত বোধ হয় কাল রাতে এসেছিল যখন তাকে তুমি সুন্দর দেখেছিলে। আমি, আর তোমার দুই মেয়েও তো সুন্দর জীবন, তাদের জন্য এবার একটা বড় দেখে ফ্রিজ কেননা, দোহাই, জোরে গাড়ি চালিয়ে নাটক কোরো না।’

হঠাৎ তীব্র এক অসহায়তা সঙ্গীহীন জীবনকে পেয়ে বসে। তার মাথার ভিতরে কল চলবার শব্দ, বুকের ভিতরে কেবলই একটা রবারের বল লাফিয়ে ওঠে। তবু তার এই কথা বলবার ইচ্ছে হয়–ঠিক, তুমি ঠিকই বলছ অপর্ণা। আমার ওই রকমই মনে হয়। এই সব ভেঙেচুরে শেষ করে। দিয়ে আমার আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে ছেলেবেলার সেই চায়ের দোকানের উনুনের পাশে, চট আর ছেঁড়া শতরঞ্জির বিছানায়, যেখানে দুঃখী রোগা এক মায়াবী বেড়াল আমার শিয়রের কাছে শুয়ে থাকবে সারা রাত। কিংবা ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই মোটর সারাই কারখানায়, যেখানে লোহার জোড় মেলাতে মেলাতে আমি কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল দেখে গান গাইব আবার। হ্যাঁ, অপর্ণা, আমি এখনও ছোটলোক, ভিখিরি। মুখে মৃদু হাসল জীবন, তার মুখ সাদা দেখাচ্ছিল, কোনওক্রমে সে গলার স্বরে এখনও সেই ঠাট্টার সুর বজায় রাখছিল, ‘কে জানে তোমার কাবলি বেড়ালটাও আত্মহত্যা করেছিল কি না!’

অপর্ণা কী বলতে যাচ্ছিল, হাত তুলে জীবন বলে ‘চুপ, অপর্ণা!’ তারপর লিত গলায় বলে, ‘তুমি সহমরণের কথা বলছিলে না! ধরে নাও আজ আমি তোমাকে সহমরণেই নিতে যেতে চেয়েছিলুম। তুমি বুঝবে কি এসব অপর্ণা?’

অপর্ণা মাথা নাড়ে না। তার চোখে জল, মুখের প্রতিটি রেখায় রাগ আর আক্রোশ। সে জীবনের দিক থেকে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে উঠে চলে যায়। জীবন বাধা দেয় না। শুধু এতক্ষণ অপর্ণা যে জায়গায় বসেছিল সেইখানে গভীর চোখে চেয়ে থাকে, যেন এখনও অপর্ণা বসে আছে।

ঘরে কেউ ছিল না, তবু হঠাৎ জীবন চমকে উঠে বলে ‘কে?’ তারপর শূন্য চোখে চারদিকে চায়। সিগারেট আর দেশলাইয়ের জন্য চারিদিকে হাতড়ে দেখে। বড় ক্লান্তি লাগে জীবনের। এলোমেলো অনেক কথা তার ভিতর থেকে ঠেলে আসতে চায়। মাথার ভিতরে ঘোলা জল টলমল করতে থাকে। সে ভীষণ অন্যমনস্কর মতে বলে ‘আঃ, অপর্ণা…’ পরমুহূর্তেই চমকে ওঠে ‘কেউ কি আছ?’ কেউ ছিল না, তবু জীবন একবার পরম বিশ্বাসে দুটো হাত আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে শূন্যে তুলে ধরে, যেন ভিক্ষুকের মতো বলতে চায়–আমাকে নাও।

দরজার কাছ থেকে মিঠু ডাকে, ‘বাবা!

অলীক আত্মসমর্পণের এক শূন্যতা থেকে জীবন আবার শব্দ, গন্ধ ও স্পর্শের বাস্তবতার ভিতরে দ্রুত ফিরে আসে।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments