Thursday, February 22, 2024
Homeকিশোর গল্পহীরক সিন্দুকের সন্ধানে - অনিল ভৌমিক

হীরক সিন্দুকের সন্ধানে – অনিল ভৌমিক

হীরক সিন্দুকের সন্ধানে - অনিল ভৌমিক

তখন সকাল হয়েছে। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের মাথায় ওর জায়গা ছেড়ে নিচে নেমে এল। চলল ফ্রান্সিসের কাছে।

পেড্রো ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের দরজায় টোকা দিল। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়েই বলল–এসো। পেড্রো ঢুকল। বলল–ফ্রান্সিস–একটা অদ্ভুত ঘটনা।

-কী ঘটনা? ফ্রান্সিস জানতে চাইল। –

-এরকম ঘটনা। ভয়ের কথা।

–সোজা বল না বাপু-ঘটনাটা কী?

–এখানে ছোট্ট বন্দর মত দেখলাম।

–আরো জাহাজ নোঙর করে আছে?

–হ্যাঁ। তবে একটা মাত্র জাহাজ।

বেশ এবার বলো।

কী আর বলবো। অদ্ভুত ঘটনা।

ফ্রান্সিস এবার সত্যিই রেগে গেল। গম্ভীর স্বরে বলল–এখনও বলো অদ্ভুত ঘটনাটা কী? নইলে বিদেয় হও।

–মাস্তুল থেকে দেখলাম একটা ছোট জাহাজ নোঙর করা আছে। অদ্ভুত ব্যাপারটা হল জাহাজটায় জনপ্রাণী নেই। মানুষ তো দূরের কথা একটা ঘোড়াও নেই।

ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল–হয়তো বন্দরে নেমে খেতে টেতে গেছে।

–আমি ঘণ্টা পাঁচেক এক নাগাড়ে নজর রেখেছি। কেউ জাহাজটায় উঠলোও না নামলোও না।

–হুঁ, এটা একটু ভাববার কথা। ফ্রান্সিস বলল–তবে ভয় পাওয়ার মত কিছু নয়।

তাহলে কী করবে এখন? পেড্রো বলল।

–ঐ জাহাজটায় যেতে হবে। কী ব্যাপার সেটা জানতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

কে কে যাবে? পেড্রো জানতে চাইল।

–হ্যারি আর শাঙ্কোকে ডাকো। ওরাই যাবে। জাহাজের লোকদের সঙ্গে কথা বলবে–জানবে আমরা কোথায় এলাম।

পেড্রো হ্যারি আর শাঙ্কোকে ডাকতে গেল।

একটু পরেই হ্যারি আর শাঙ্কো এল। হ্যারি বলল,

–কী ব্যাপার ফ্রান্সিস?

–পেড্রো একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখেছে। তীরের কাছে একটা জাহাজ নোঙর করে আছে। পেড্রো দেখেছে জাহাজটা থেকে কোন মানুষ বেরোয় নি, ঢোকেও নি। জাহাজে কোন জনপ্রাণী নেই।

হ্যারি ব্যাপারটা ভাবল। বলল–ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুতই। এখন আমরা কী করবো?

জাহাজটায় যেতে হবে। লোকজন আছে কিনা দেখতে হবে। যদি কাউকে পাওয়া যায়। তাহলে বুঝতে পারবো দেশের দিকে যাচ্ছি কিনা। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। শাঙ্কোকে নিয়ে যাবো। হ্যারি বলল।

–তাই যাও। এখনই যাও। দেরি করো না। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস এই ব্যাপারটা কী হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?

–ঠিক বুঝতে পারছি না। জাহাজটায় গিয়ে উঠলেই সঠিক জানা যাবে রহস্যটা কী।-ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। শাঙ্কোকে নিয়ে আমি যাচ্ছি। হ্যারি বলল।

কিছু পরে হ্যারি আর শাঙ্কো তৈরি হয়ে এল। দড়ির মই দিয়ে ছোট নৌকোয় নামল। শাঙ্কো নৌকো চালাল জাহাজটার দিকে।

জাহাজটার কাছে আসতে বেশি দেরি হল না। শাঙ্কো নৌকোটা জাহাজের গায়ে লাগাল। হালের কাছে দড়ি ধরে শাঙ্কো আগে উঠল। পেছনে উঠল হ্যারি।

জ্যোৎস্না বেশ উজ্জ্বল। সবকিছুই মোটামুটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। হ্যারি দেখল জাহাজের মাথায় পোর্তুগালের পতাকা উড়ছে। তার মানে পর্তুগীজদের জাহাজ।

প্রথমে হ্যারি জাহাজটার ডেকে উঠে এল। হ্যারি আশ্চর্য এক দৃশ্য দেখল। জাহাজের ডেক-এ পাঁচ-সাতজন জাহাজী শুয়ে আছে। শাঙ্কোও উঠে এসে এই দৃশ্য দেখল। দুজনেই অবাক। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সবাই মৃত। মৃত জাহাজীদের গায়ে পোর্তুগীজ পোশাক। বোঝা যাচ্ছে সবাই পোর্তুগীজ। কিন্তু ওদের শরীরে কোথাও অস্ত্রাঘাত নেই। শাঙ্কো মৃতদেহগুলোর কাছে গেল। না। ওদের গায়ে কোথাও রক্ত লেগে নেই। তাহলে ওরা কিভাবে মারা গেল?

হ্যারি বলল–শাঙ্কো–বোঝা যাচ্ছে না এরা কিভাবে মারা গেল! আশ্চর্য ব্যাপার।

–এখন কী করবে? শাঙ্কো বলল।

চলো। তীরে নামি। লোকজনের দেখা পাই কিনা। হ্যারি বলল।

হ্যারি আর শাঙ্কো জাহাজ থেকে নৌকোয় নামল। একটু এগিয়ে তীরভূমিতে এল। চলল পায়ে চলা পথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে হ্যারি বলল–শাঙ্কো–একটা জিনিস লক্ষ্য করেছো?

–কী? শাঙ্কো বলল।

–এই মৃতদের সবারই মুখচোখ খুব ফোলা। এর কারণ বুঝছি না। হ্যারি বলল।

–যে অসুখে ওরা মারা গেছে, সেটা একই অসুখ। শাঙ্কো বলল।

হ্যারি বলল–এখন জানা দরকার ঐ প্রাণঘাতী অসুখটা কী?

পায়ে চলা রাস্তাটা বনভূমিতে ঢুকেছে। ওরা বনে ঢুকল। এতদূর আসার সময় কোন ঘরবাড়ি দেখল না।

বন থেকে বেরিয়ে এসে সামনেই দেখল দু’তিনটে পাথরের বাড়ি। ওপরে, শুকনো গাছের আচ্ছাদন।

সামনের প্রথম বাড়িটার কাছে গেল ওরা। দরজায় টোকা দিল। কিন্তু ভেতরে কোন সাড়াশব্দ নেই। শাঙ্কো আবার টোকা দিল। ভেতর থেকে কোন সারা শব্দ পাওয়া গেল না।

হ্যারি এগিয়ে এসে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। আলোছায়ার মধ্যে দিয়ে দেখল বিছানায় দুজন নারী পুরুষ শুয়ে আছে। একটা ছেলেও পাশে শুয়ে আছে। দেখে বোঝা গেল–এরা সবাই মৃত। হ্যারি কাছে গিয়ে দেখল–সবারই মুখ ফোলা। তাহলে জাহাজে আর এখানে সবাই একই অসুখে মারা গেছে।

দুজনে বেরিয়ে এল। হ্যারি বলল–চলো ঐ বাড়িটায় যাই। অন্য একটা বাড়িতে ওরা এল। দরজা খোলা। দেখল তিনটি বড় মানুষ আর একটি শিশু মরে পড়ে আছে। এদেরও মুখচোখ ফোলা। কী অসুখ হয়েছিল এদের? হ্যারি ভাবল। শাঙ্কোকে বললোও কথাটা।

আরও কয়েকটা পাথরের বাড়ি এদিকে ওদিকে আছে। হ্যারি বলল–শাঙ্কো কী করবে?

–বোঝাই যাচ্ছে–এক মারাত্মক অসুখে এখানে থাকতো যারা তারা সবাই মারা গেছে।

–ঠিক। যে বাড়িতেই যাবো সেখানেই মৃত মানুষ দেখবো। চলো জাহাজে ফিরি। ওরা ঘরের বাইরে আসার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তখনই ঘরটার অন্ধকার কোণা থেকে একটা বড় আকারের মাছি উড়ে এল। হ্যারির ঘাড়ে বসল। হ্যারি মাছিটাকে দেখল। মাছিটার সারা শরীর গভীর নীল। পাখা কালো। হ্যারি হাত দিয়ে মাছিটা তাড়াতে গেলে তখনই মাছিটা হুল ফোঁটাল। ছুঁচ ফোঁটার মত লাগল। হ্যারির ঐ হুল ফোঁটানো জায়গাটা অবশ হয়ে গেল। হ্যারি চেঁচিয়ে বলল–শাঙ্কো জলদি। পালাও। হারি এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মাছিটা শাঙ্কোর দিকে দ্রুত উড়ে এল। শাঙ্কো এক লাফ দিয়ে ঘরের বাইরে এল। দেখল মাছিটা অন্ধকার কোণায় উড়ে যাচ্ছে।

-পা চালাও। হ্যারি বলল। দুজনে ছুটে চলল সমুদ্রতীরের দিকে।

নৌকো বেয়ে ওরা জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস রেলিঙে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। সঙ্গে মারিয়া। হ্যারি আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। দুজনেই একটু হাঁফাচ্ছে তখন। হ্যারি যা যা ঘটেছে বলল। অবশেষে বলল-পেটটা নীল, পাখা কালো এরকম মাছি আমি কখনও দেখিনি। এগুলোর হুলও আছে। আমাকে ঘাড়ের কাছে হুল ফুটিয়েছে। জায়গাটা অসাড় হয়ে গেছে।

–এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার। তুমি এখন কেমন বোধ করছো? ফ্রান্সিস বলল।

–অসাড় ভাবটা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ভীষণ দুর্বল লাগছে। ফ্রান্সিস পাশে দাঁড়ানো বিস্কোকে বলল–ভেনকে ডেকে আনন। একটু পরেই ভেন এল। হ্যারিকে জিজ্ঞেস-টিজ্ঞেস করে ওর শরীরটা টিপে টিপে দেখল। নাড়ি টিপে দেখল। বলল–হ্যারির শরীর গরম। জ্বর আসছে। কথা হচ্ছে; তখনই হ্যারি আস্তে আস্তে ডেক-এ বসে পড়ল।

ফ্রান্সিস হ্যারিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। হ্যারিকে কেবিনঘরে জড়িয়ে ধরে নিয়ে চলল। ভেনকে বলল–ভেন কেবিনঘরে চল। হ্যারিকে ওষুধ দাও।

ভেন বলল–ওষুধ নিয়ে আসছি।

ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো হ্যারিকে ধরে ধরে ওর কেবিনঘরে নিয়ে এল।

হ্যারি আর বসে থাকতে পারল না। শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসরা কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ঐ কেবিনঘরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল। মারিয়াও ছিল তাদের মধ্যে।

ভেন ওর ওষুধের বোয়াম পুঁটুলি এসব নিয়ে এল। ভেনকে মাছির হুলের কথা বলা হয়নি। হ্যারি বুঝল ভেনকে এটা জানানো দরকার। হ্যারি বলল– ভেন একটা বাড়িতে ঢুকেছিলাম। অন্ধকার কোণা থেকে একটা বেশ বড় নীলরঙের মাছি উড়ে এসে আমাকে হুল ফুটিয়েছিল।

–এটা তো আগে বলোনি। ভেন বলল।

–বিশেষ গুরুত্ব দিই নি। হ্যারি বলল।

–না-না। ওটাই আসল কথা। এই জ্বর দুর্বলতার কারণ ঐ নীলমাছি।

ভেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ওষুধ বানাল। ফ্রান্সিসকে বলল–তিনটে বড়ি দিলাম। এখন একটা খাইয়ে দাও অন্য দুটি দুপুর রাতে খাওয়াবে। মারিয়া এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসকে বলল–ওষুধ আমাকে দাও। আমি খাওয়াবো। ফ্রান্সিস মারিয়াকে বড়ি তিনটি দিল।

মারিয়া জল এনে একটা হলুদ রঙের বড়ি হ্যারিকে খাওয়াল। হ্যারির কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখে বলল-জ্বর আছে।

ভেন চেটে খাওয়ার জন্যে মারিয়াকে ওষুধ দিল। তারপর বলল–হ্যারির মাথায় জল দিতে হবে। জ্বর কমাবার জন্যে। মারিয়া বলল–বালতি আর বড় গ্লাশ জোগাড় করতে।

ভেন বেশ আস্তে বলল–ফ্রান্সিস বাইরে এসো। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। দেখল–হ্যারি চোখ বুজে শুয়ে আছে।

ঘরের বাইরে এসে ভেন বলল–হ্যারিকে মারাত্মক নীলমাছি হুল ফুটিয়েছে। হ্যারির বাঁচবার আশা নেই।

বলো কি? ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠল।

–হ্যারিরা জাহাজে, বাড়িতে মৃত মানুষ দেখেছে; সবাই এই নীলমাছির হুল ফোঁটানোর জন্যে মারা গেছে। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস দু’হাতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠল। ভেন বলল–একটা ব্যাপার বলা যায় যে হ্যারিকে একটা নীলমাছি একবারই হুল ফুটিয়েছে দুবার হুল ফোঁটালে এতক্ষণে মারা যেত। হ্যারির ওষুধগুলো খাইও। এখন ওষুধ কতটা কাজ করে তাই দেখার।

–তবে কি হ্যারি সুস্থ হবে?

–দেখা যাক। আমার কয়েকটা কথা জানার আছে। তুমি শাঙ্কোকে পাঠিয়ে দাও। মুখ চোখ মুছে যাও। তুমি কেঁদেছো এটা হ্যারি যেন না বুঝতে পারে। যা বললাম তা কাউকে বলবে না। বিশেষ করে রাজকুমারীকে তো বলবেই না।

ফ্রান্সিস চলে গেল। একটু পরেই শাঙ্কো এল। বলল, তুমি আমাকে

–হ্যাঁ। তোমার কাছ থেকে কিছু জানার আছে।

–বেশ। বলল। শাঙ্কো বলল।

–মাছিটা হ্যারির শরীরের কোথায় হুল ফুটিয়েছিল? ভেন জানতে চাইল।

ঘাড়ে। শাঙ্কো বলল।

–একবারই তো হুল ফুটিয়েছিল? ভেন বলল।

–হ্যাঁ। শাঙ্কো বলল।

–দুবার নয়? সে আবার জানতে চাইল।

–না। শাঙ্কো বলল।

–মাছিটা কোথা থেকে এসেছিল? ভেন জানতে চাইল।

–ঘরটার অন্ধকার কোণা থেকে। শাঙ্কো বলল।

–তার মানে মাছিটা অন্ধকারে ছিল। ভেন বলল।

–হ্যাঁ। শাঙ্কো বলল।

–হুঁল ফোঁটানোর পর হ্যারি কী বলেছিল? ভেন জানতে চাইল।

–ঘাড়টা যেন অবশ হয়ে গেল। হ্যারি বলেছিল। শাঙ্কো বলল।

–হুঁ বুঝলাম। ভেনের মুখ গম্ভীর হল।

ভেন হ্যারির কেবিনঘরে ঢুকল। বলল–ফ্রান্সিস একটু বাইরে এসো। ফ্রান্সিস ঘরের বাইরে এল। ভেন বলল–আমার যা সন্দেহ হয়েছিল তাই ঘটেছে। এক ধরনের মাছি আছে। প্রাণঘাতী মাছি। মানুষের গায়ে দুবার হুল ফুটোলে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। এই মাছিগুলো দিনের বেলায় অন্ধকার জায়গায় থাকে। সন্ধ্যের বেশ পরে–অন্ধকার জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। প্রায় সারা রাত উড়ে বেড়ায়। মানুষ, ঘোড়ার গায়ে হুল ফুটিয়ে দেয়। তাতে মানুষ ঘোড়া মারা যায়। ভোর হতেই বনের মধ্যে অন্ধকার জায়গায় লুকিয়ে থাকে। একটু থেমে বলল–হ্যারিরা যে জাহাজটায় জাহাজীদের মৃত দেখে এসেছে লোকজনের বাড়িতেও মৃত মানুষ দেখে এসেছে তারা সবাই এই মাছিদের হুল ফোঁটানোর জন্যে মারা গেছে। একটু থেমে ভেন বলল আমাদের একমাত্র হ্যারি ছাড়া আর কারো গায়ে হুল ফোঁটাতে পারে নি। আমরা এখনও নিরাপদ। তুমি যত শিগগির সম্ভব জাহাজ ছাড়ো। এই তল্লাট ছেড়ে পালাও।

–ঠিক আছে। আমি বলছি। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস ঘরের সামনে দাঁড়ানো এক বন্ধুকে বলল–ভাই তুমি সবাইকে খবর দাও যেন সবাই ডেক-এ আসে। বন্ধুটি চলে গেল।

কিছু পরে শাঙ্কো এল। বলল–ফ্রান্সিস চলো। সবাই এসেছে। মারিয়া এগিয়ে। এসে বলল–আমি যাবো?

–না তুমি হ্যারিকে দেখ। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। দেখল বন্ধুরা এসেছে। ফ্রান্সিস বলতে লাগল– ভাইসব– আমরা একটা সাংঘাতিক সমস্যায় পড়েছি। এই অঞ্চলে এক ধরনের হুলওয়ালা নীল রঙের মাছি আছে। মানুষের শরীরে এরা হুল ফোঁটায়। একবার কামড়ালে মানুষ বাঁচে। কিন্তু দুবার কামড়ালে তার মৃত্যু অবধারিত। আমাদের বন্ধু হ্যারিকে সেই মাছি একবার হুল ফুটিয়েছে। হ্যারি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই মাছিরা দিনের বেলা অন্ধকার জায়গায় আত্মগোপন করে থাকে। সন্ধ্যে হলেই বেরোয়। ফ্রান্সিস থামল।

তারপর বলল–কাজেই আমরা স্থির করেছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা এই তল্লাট ছেড়ে পালাবো। রান্না হয়ে এসেছে। চান খাওয়া সেরে আমরা জাহাজ চালাবো। দেখি–কোন বন্দর পাই কিনা। ফ্রান্সিস চুপ করল। বন্ধুরা সবাই চলে গেল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–তা হলে পালানোটাই স্থির করলে?

এ ছাড়া কোন উপায় নেই। খাওয়া দাওয়া হলেই জাহাজ ছেড়ে দাও। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিসরা খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে নিল। পেড্রো মাস্তুলের মাথায় উঠে গেল। দাঁড়ঘরে দাঁড়িরা গিয়ে লম্বা বৈঠায় হাত লাগাল। সব পাল খুলে দেওয়া হল। জাহাজ কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্রুত চলতে লাগল।

ফ্রান্সিস হ্যারিকে দেখতে এল। মারিয়া হ্যারির কপাল থেকে জল-পট্টিটা খুলে রাখল। ফ্রান্সিসকে বলল–ভেন বলেছে–লক্ষণ খুব ভাল। হ্যারির জ্বর অনেক কমে গেছে। তবে এখনও সম্পূর্ণ ছেড়ে যায় নি। তবে কমের দিকে। হ্যারি ডান হাতটা ফ্রান্সিসের দিকে বাড়াল। ফ্রান্সিস ওর হাতটা জড়িয়ে ধরল। হ্যারি শুকনো মুখে অল্প হাসল। ফ্রান্সিস বলল

–কিছছু ভেব না। ভেন আমাকে বলেছে তুমি তাড়াতাড়িই সুস্থ হবে। ভেন এর ওষুধ কাজ করছে।

–ফ্রান্সিস–কী ভয়ানক জায়গা থেকে আমরা পালিয়ে আসতে পেরেছি। মারিয়া বলল।

–সেটা বলতে। খুব বেঁচে গেছি আমরা। এখন হ্যারি সুস্থ হলেই নিশ্চিন্ত হবো। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি একবার মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, রাজকুমারী যে আমার জন্যে কতকিছু করছেন–এ জন্যে

–ওসব থাক। হ্যারি তুমি ভালো হয়ে উঠবেই। আমার মন বলছে। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যারি মৃদু হাসল। বন্ধুদের শুভেচ্ছায় হয়তো ও সুস্থ হবে। হ্যারি এটাই ভাবে।

সেদিন ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। হঠাৎ হ্যারির আবার জ্বর এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভীষণ প্রচণ্ড জ্বর এল।

ফ্রান্সিসের কাছে খবর গেল। ফ্রান্সিস ছুটে এল। হ্যারির কপালে গলায় হাত বুলিয়ে যেন বুঝতে পারল–ভীষণ জ্বর। হ্যারি কেমন আচ্ছন্নের মত শুয়ে রইল। ফ্রান্সিস ভেনকে ডেকে পাঠাল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ভেন ওর ওষুধপত্র নিয়ে চলে এল। হ্যারির মুখ গলা দেখল। নাভি দেখল। বিড়বিড় করে বলল–মারাত্মক সময়টা কেটে গেছে। এখন তো সুস্থ হওয়ার কথা।

ভেন বসে ওষুধ তৈরি করতে লাগল। মারিয়াকে ওষুধ বুঝিয়ে দিল। কখন কোনটা খেতে হবে বলল। তারপর চারদিকে তাকিয়ে দেখল এক কোনায় শাঙ্কো বসে আছে। নিজে উঠে শাঙ্কোর কাছে এল। বলল-বাইরে এসো। শাঙ্কো ভেন-এর পেছনে পেছনে বাইরে এল। ভেন গলা নামিয়ে বলল,

-হ্যারির অবস্থা ভালো নয়। ফ্রান্সিসূকে ডাকো। আমি এখানে দাঁড়ালাম।

শাঙ্কো দ্রুত ছুটে গেল। একটু পরেই ফ্রান্সিসকে সঙ্গে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে! হাঁপাতে বলল–ভেন কী হয়েছে?

হ্যারির অবস্থা ভালো নয়। নাক মুখ ফুলতে শুরু করেছে। যতদূর আমার বিদ্যেয় কুলোয় করেছি। এখন একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাতে হবে।

–কিন্তু এখন এখানে কোথায় অভিজ্ঞ চিকিৎসক পাবো? পাবো। ফ্রান্সিস বলল।

উপায় নেই। সামনেই যে বন্দর পাবে সেখানে খুঁজে নিতে হবে। কালকে সকালের মধ্যেই কোন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাও। আমার যা সাধ্য আমি করেছি। ভেন বলল।

–তাহলে ভেন আজ রাতের মধ্যেই যে করে তোক কোন বন্দরে পৌঁছতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যাঁ। দেরি করো না। জাহাজ চালাও। আমি ওষুধ তৈরি করতে যাচ্ছি। ভেন চলে গেল।

ফ্রান্সিসের পিঠে আলগা চাপড় মেরে ভেন চলে গেল।

ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল–সবাইকে ডেক-এ আসতে বল। আমি কিছু বলবো। শাঙ্কো দ্রুত চলে গেল। বন্ধুদের ফ্রান্সিসের কথা বলল।

অল্পক্ষণের মধ্যে বন্ধুরা সব ডেক-এ উঠে এল। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ। জ্যোৎস্না পড়েছে সমুদ্রের বড় বড় ঢেউয়ের ওপর। ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটেছে।

ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল–ভাইসব। আমরা খুবই বিপদে পড়েছি। হ্যারির আবার জ্বর এসেছে। ভীষণ জ্বর। ভেন চিকিৎসা করছে। ভেন কিছুক্ষণ আগে আমাকে বলল–যদি কাল সকালের মধ্যে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে না পাওয়া যায় তবে হ্যারি–ফ্রান্সিস দুহাতে চোখ বন্ধ করল। একটু ফুঁপিয়ে উঠল। বলল–তবে হ্যারি বাঁচবে না।

শ্রোতা বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। বিস্কো বলল–তাহলে এখন আমরা কী করবো?

যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ চালিয়ে একটা বন্দরে পৌঁছতে হবে। তারপর হ্যারির ভাল চিকিৎসা কালকে সকালের মধ্যে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–একজন দাঁড় টানতে চলে যাও। অন্যদল সব পাল খুলে দিয়ে পালগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বেশি করে বাতাস ধরাবে। পেড্রোফ্রান্সিস থামল। দেখল পেড্রো মাস্তুল বেয়ে উঠছে। ফ্রান্সিস মৃদু হাসল।

সব ভাইকিংরা ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো।

সবাই কাজের জায়গায় চলে গেল। একদল পাল ঠিক করতে লাগল। আর কয়েকজন হাল ঠিক রাখল। অন্য দল দাঁড়ঘরে চলে গেল।

ফ্রান্সিস জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে এল।

বলল–ফ্লেজার-জাহাজ যাতে চূড়ান্ত গতিতে যায় তার ব্যবস্থা করেছি। এবার তোমার কাজ–যে ভাবে পারো জাহাজের গতি বাড়াও। ফ্লেজার মাথা কাত করে বলল–ঠিক আছে।

তখন আস্তে আস্তে জাহাজের গতি বাড়তে লাগল। বেগবান বাতাসে পালগুলো ফুলে উঠল। জাহাজ পূর্ণগতিতে চলল।

শাঙ্কো দাঁড়িদের ঘরে এল। দেখল বন্ধুরা প্রাণপণে দাঁড় টানছে। দুসারি দাঁড়িদের মাঝখানে গিয়ে শাঙ্কো দাঁড়াল। তারপর হাততালি দিয়ে দিয়ে শরীর ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো-। ওপরে ডেক থেকে ভেসে এল–ও–হো–হো–ধ্বনি।

জাহাজের গতি অনেক বেড়ে গেল।

দাঁড়ঘরে শাঙ্কো তখন দাঁড় টানার দ্রুত ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে শরীর দোলাতে লাগল। আর মুখে শব্দ করতে লাগল–ওহহাওহো! মাস্তুলের মাথায় বসে থাকা পেড্রো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিক দেখতে লাগল। জ্যোৎস্না উজ্জ্বল। সমুদ্রের বুকের অনেক দূর দেখা যাচ্ছে। আজ সমুদ্রের বুকে কুয়াশা কম।

দ্রুতগতিতে জাহাজ চলল।

ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–একজন একজন করে খেয়ে এসো। জাহাজের গতি যেন কমে না।

গভীর রাত তখন। দাঁড়িরা কেউ কেউ পরিশ্রমে কাতর হয়ে শুয়ে পড়ছে। যেখানে অন্যেরা এসে বসছে। দাঁড় বাওয়া চলছে। ওদিকে পাল টেনে টেনে মুখ ঘুরিয়ে বাতাস বেশি আসছে পালে। ফ্লেজার হুইল ঘুরিয়ে চলেছে।

রাত শেষ হয়ে আসছে। আকাশ সাদাটে হয়ে গেছে। তারাগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস সারা জাহাজ ঘুরে ঘুরে বন্ধুদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।

পূব আকাশে লাল রঙের ছোপ।

মাস্তুলের ওপর থেকে পেড্রো চেঁচিয়ে বলল–ডাঙা দেখা যাচ্ছে, ডাঙা। জাহাজে ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল– ও–হো–হো। ওদের আনন্দের ধ্বনি।

সূর্য উঠল। ভোরের আলো সমুদ্রে জাহাজে ছড়াল। দূরে ডাঙা দেখা গেল।

ফ্রান্সিস দাঁড় ঘরে এল। দেখল বন্ধুরা কেউ কেউ ঘরের মধ্যেই শুয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল-দাঁড় বাওয়া আস্তে কর। জাহাজ ডাঙায় গিয়ে ধাক্কা মারতে পারে।

জাহাজের গতি কমল। আস্তে আস্তে গিয়ে জাহাজঘাটায় গিয়ে থামল।

শাঙ্কো জাহাজ থেকে পার পর্যন্ত কাঠের তক্তা পেতে দিল। ফ্রান্সিস তক্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে নামবার সময় বলল–শাঙ্কো–আমি আগে চিকিৎসক খুঁজে বের করছি। তোমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করো।

ফ্রান্সিস পারে নামল। বেশ বড় বন্দর। আট দশটা জাহাজ নোঙর করে আছে। চারদিকে তাকাল একবার। কোন দিকে কোথায় যাবে চিকিৎসকের খোঁজে এটা বুঝে উঠতে পারছিল না।

রাস্তার ধারের দোকানপাট খুলে গেছে। লোকজনের ভিড় বাড়ছে। ফ্রান্সিস এদিন-ওদিক ঘুরতে লাগল। এক প্রৌঢ় ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করল–এখানে ভাল চিকিৎসক কোথায় পাবো? ভদ্রলোক ফ্রান্সিসের মুখের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল। বুঝল–ফ্রান্সিস বিদেশি। ভদ্রলোক হাত তুলে বললেন–ঐ যে চেস্টনাট গাছটা দেখছেন–তার পাশেই একটা ওষুধের দোকান আছে। ওরা বলতে পারবে।

ফ্রান্সিস চেস্টনাট গাছটা দেখল। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে দেখল– সাইনবোর্ড–ওষুধের দোকান। ফ্রান্সিস দোকানে ঢুকল। এক যুবক বসে আছে।

ফ্রান্সিস বলল–বলছিলাম–এখানে চিকিৎসক পাবো।

-হা পাবেন বই কি।

–তিনি কোথায়?

বাড়িতে আছেন। ঘণ্টাখানেক পরে আসবেন।

–আমার রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ। আমি এক্ষুনি তাঁকে দেখাতে চাই। তার বাড়িটা কোথায় বলুন।

দেখুন গিয়ে কথা বলে। যুবকটি বলল–তারপর আঙ্গুল তুলে একটা ছোট গীর্জা দেখাল। বলল–ঐ গীর্জার পেছনেই চিকিৎসকের বাড়ি।

-খুব উপকার করলেন। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ছুটল গীর্জার দিকে।

গীর্জার সামনে এল। পেছনে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে। সেটা ধরে গীর্জার পেছনে এল। দেখল একটা কাঠের কাঠ পাথরের বাড়ি। ফ্রান্সিস বন্ধ দরজায় টোকা দিল একবার। ভেতরে কারু সাড়াশব্দ নেই। আবার ঠুকলো।

–কে? একজনের গম্ভীর গলা শুনল

—আমি চিকিৎসকের কাছে এসেছি। তাঁকে বড় দরকার। ফ্রান্সিস বলল।

দরজা খুলে গেল। একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি। পাকা দাড়ি গোঁফ। বললেন–আমিই চিকিৎসক। বলুন।

–আমরা জাতিতে ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।

–হুঁ। নাম শুনেছি। চিকিৎসক বললেন।

–আমরা জাহাজে এসেছি। আমার বন্ধু খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আপনি তাকে বাঁচান। ফ্রান্সিস বলল।

–কী করে অসুস্থ হল? চিকিৎসক বললেন।

–আমি বন্ধুকে নিয়ে আসতে যাবো। বন্ধুকে এনে সব বলবো। এখন কোথায় আপনাকে দেখাবো। ফ্রান্সিস বলল।

–দোকানে নিয়ে আসুন। ঘণ্টাখানেক পরে। চিকিৎসক বললেন।

–না-না-না। আমরা এখানেই নিয়ে আসছি। দেরি করতে সাহস পাচ্ছি না। ফ্রান্সিস বলল।

-বেশ। আসুন। চিকিৎসক বলল।

–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস ফিরে দাঁড়াল। তারপর রাস্তার মানুষের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ছুটল। জাহাজঘাটার দিকে।

জাহাজে উঠল। দেখল বন্ধুরা সব দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল– চিকিৎসক পেয়েছি। তোমরা একটা দুহাত পাশে এরকম একটা কাঠের তক্তা নিয়ে এসো।

ছুটতে ছুটতে হ্যারির কেবিনঘরে এল। দেখল মারিয়া জলভেজা ন্যাকড়া হ্যারির কপালে আলগোছে চেপে ধরে আছে।

জ্বর কমেছে? ফ্রান্সিস বলল।

–কিছুটা কমেছে। মারিয়া বলল।

মারিয়া ফ্রান্সিসের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল–নাকমুখ ফুলে যাচ্ছে।

–ঠিক আছে। চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। তুমি জাহাজেই থাকো। তোমার মুখ চোখ-কয়েক রাত জেগে আছো। হ্যারিকে শুশ্রূষা করছে।

আমার জন্যে ভেবো না। তুমি শিগগির চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাও। মারিয়া বলল। #

শাঙ্কো বিস্কোরা কয়েকজন ঘরে ঢুকল। হাতে করে নিয়ে এসেছে চওড়া কাঠের পাটাতন। ওরা পাটাতনটা বিছানার কাছে নিয়ে এল। দু’তিনজন হ্যারিকে ধরে এনে পাটাতনে শুইয়ে দিল। তারপর তুলে কাঁধে নিয়ে হাতে ধরে পাটাতনটা তুলে বাইরে এল। ফ্রান্সিস হ্যারির মুখের দিকে তাকাল। অবিন্যস্ত মাথার চুল। চোখ দুটো কোটরে। হ্যারি চোখ বুজে আছে। ফ্রান্সিস তাকিয়ে থাকতে পারল না। আবাল্য বন্ধু–কত সুখ দুঃখের স্মৃতি। ফ্রান্সিস অনেক কষ্টে কান্না চাপল।

হ্যারিকে নিয়ে ফ্রান্সিসরা ডেক-এ এলো। তারপর কাঠের পাটাতনে শোওয়া হ্যারিকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘাটে নামল।

রাস্তার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিসরা চলল।

ফ্রান্সিস বলল–একটু তাড়াতাড়ি চল। শাঙ্কোরা ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত চলল।

গীর্জার পেছনে চিকিৎসকের বাড়ির সামনে এল। দরজায় আঙ্গুল ঠুকল। একটা অল্পবয়সী ছেলে দরজা খুলল।

–তোমার কর্তা কোথায়?

–আসছেন। আপনারা এই ঘরে আসুন। ছেলেটি পাশের ঘরটায় এল। ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। দেখল মেঝেয় কয়েকটা কাঠের পাটাতন পাতা তার ওপর শুকনো ঘাসের বিছানা। ওরা হ্যারিকে ধরাধরি করে ঐ বিছানায় শুইয়ে দিল।

ফ্রান্সিসরা কেউ কেউ ঘরের বাইরে গেল। শাঙ্কো বিস্কো দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস বিছানার পাশে রাখা একটা কাঠের আসনে বসল।

হ্যারি দুর্বলকণ্ঠে ডাকল ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি হ্যারির মুখের ওপর ঝুঁকল। বলল–হ্যারি–কেমন আছো? হ্যারি দম নিয়ে নিয়ে বলল–আমি বাঁচবো না।

ফ্রান্সিস আর নিজেকে সম্বরণ করতে পারল না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিসের দুচোখে জলধারা নামল। শাঙ্কো ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরে বলল ফ্রান্সিস-ফ্রান্সিস তুমি কেঁদো না। ফ্রান্সিস হাতের উল্টেপিঠ দিয়ে চোখের জল মুছল।

তখনই চিকিৎসক ঢুকলেন। পরনে জোব্বা। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বন্ধুরা দরজায় এসে দাঁড়াল।

ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে চিকিৎসক বললেন–কিভাবে অসুখ হল এটা বলবেন বলেছিলেন। এখন বলুন।

ফ্রান্সিস বলল–জাহাজে চড়ে আমরা আসছিলাম। একটা জায়গায় এলাম। সমুদ্রতীর। একটা জাহাজ নোঙর করে আছে। দেখলাম। আশ্চর্য জাহাজের সব মানুষ মরে পড়ে আছে। এই রোগী আর একজন বন্ধু তীরে এসেছিল। একটা বন পার হয়ে দুটো পাথরের বাড়ি দেখেছি। দুজনে বাড়ি দুটোয় গিয়ে দেখেছিল সব লোকজন ঘরে মরে পড়ে আছে। তখনই ঘরের অন্ধকার কোনা থেকে কয়েকটা নীলরঙের বড় বড় মাছি আমার এই বন্ধুর ঘাড়ে হুলমত ফুটিয়ে দেয়। জাহাজে ক ফিরে এসে বন্ধুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে।

ক’বার হুল ফুটিয়েছিল। চিকিৎসক জিজ্ঞেস করলেন।

–একবার। ফ্রান্সিস বলল।

–হুঁ। চিকিৎসক বললেন–আশা আছে।

ফ্রান্সিস প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল–আমার বন্ধুটি বাঁচবে তো।

–হ্যাঁ। বাঁচবে। চিকিৎসক বললেন। তারপর গলা চরিয়ে ডাকলেন–

–হিবু? ছেলেটি এসে দাঁড়াল। চিকিৎসক তাকে কয়েকটা ওষুধ আনতে বললেন। ফ্রান্সিসরা ঐ ওষুধের নাম জীবনেও শোনে নি।

একটু পরে হিবু দুটো বোয়াম আর একটা পুটুলি নিয়ে এল। একটা ছোট পাথরের পাটা আর হামান দিস্তা। একটু পরে একটা কাঠের গ্লাশে জল নিয়ে এল। চিকিৎসক ওষুধ তৈরি করতে লাগলেন। গোল শুকনো ফল হামান দিস্তায় গুঁড়ো করে বড়ি বানালেন। হিবু সাহায্য করতে লাগল। চিকিৎসক হিবুকে দুটো বড়ি একসঙ্গে খাওয়াতে দিলেন। হিবু হ্যারির মুখের কাছে এল। হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাশটা এনে বলল–দুটো বড়ি খেয়ে নিন। হ্যারির কোন সাড়া নেই।

–আপনারা তো বন্ধু। ডেকে ওষুধটা খাওয়ান।

ফ্রান্সিস হিবুর কাছে থেকে বড়ি দুটো নিল। হ্যারির মুখের কাছে মুখ এনে ডাকল–হ্যারি! হ্যারি চুপ। কোন কথা নেই। ফ্রান্সিস বার তিনেক ডাকতে হ্যারি চোখ মেলে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল–এই বড়ি দুটো খেয়ে নাও। হাঁ কর, আমি জল ঢেলে দিচ্ছি। বড়ি দুটো খেয়ে নাও। চিকিৎসক বলেছেন তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। হ্যারি কিছু বলল না। মুখ হাঁ করল। ফ্রান্সিস মুখে জল ঢালল। পর পর দুটো বড়ি মুখে দিল। হ্যারি খেয়ে নিল। এতক্ষণে ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

এবার চিকিৎসক হিবুকে সব বুঝিয়ে দিল। কাঠের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। শাঙ্কো কোমরে গোঁজা একটা সোনার চাকতি বের করে চিকিৎসকের হাতে দিল। চিকিৎসক নিয়ে জোব্বার পকেটে রাখলেন। ফ্রান্সিস বলল–দয়া করে আমার বন্ধুকে একটু অভয় দিয়ে যান। ও খুবই ভেঙে পড়েছে।

–হুঁ। চিকিৎসক মুখে শব্দ করলেন।

–হ্যারি–হ্যারি চিকিৎসক কী বলছেন শোন।

ফ্রান্সিস বলল-নীল মাছির হুল ফোঁটানোর কথা।

–রোগীর চোখ মুখ ফোলা দেখেই বুঝতে পেরেছি। চিকিৎসক বললেন। চিকিৎসক এবার হ্যারির দিকে তাকিয়ে বললেন–আপনার বিপদ কেটে যাবে। আপনি সুস্থ হবেন। হ্যারি ম্লান হাসল। চিকিৎসক বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। হিবু নিজের কাজ করে চলল।

এবার হিবু বসে বসে ওষুধ বানাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ওষুধ তৈরি করল। বোঝা গেল এই ওষুধ তৈরির কাজটা ও ভালোই শিখেছে। শাঙ্কো হাত বাড়িয়ে ওষুধগুলো নিল।

হিবু–ফ্রান্সিস বলল–তোমার কাজ তো হয়েছে এবার আমাদের সঙ্গে আমাদের জাহাজে এসো।

–না–না। আমার কত কাজ। হিবু মাথা নেড়ে বলল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ইঙ্গিত করল। শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে একটা ছোট স্বর্ণমুদ্রা বের করে হিবুর দিকে বাড়াল। হিবু ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাতে লাগল। তারপর বলল–এই সোনার চাকতি আমাকে দিচ্ছেন কেন?

–চিকিৎসককে আমরা তার প্রাপ্য দিয়ে থাকি। তোমাকেও দিলাম।

এবার হিবু সোনার চাকক্টিা নিল। বলল–আমি আসছি। ও বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

কিছু পরে পোশাক পাল্টে এল হিবু। বলল–চলেন। কিন্তু আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব।

শাঙ্কোরা হ্যারির পাটাতনটা ধরল। আস্তে আস্তে তুলে কাঁধে নিল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তা দিয়ে চলল। ফ্রান্সিসদের বিদেশী পোশাক দেখে কেউ কেউ চেয়ে চেয়ে দেখল।

পথে আসতে আসতে ফ্রান্সিস বলল–হিবু এই বন্দরের নাম কি?

–ভালপেরাইসো বন্দর। সংক্ষেপে বলি প্যারাইসা।

–এটা কোন দেশ?

–চিলি।

ফ্রান্সিস আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। হ্যারিকে নিয়ে সবাই জাহাজঘাটায় এল। হ্যারিকে নিয়ে সাবধানে জাহাজে উঠল। মারিয়া আর সব বন্ধুরা ছুটে এল। ফ্রান্সিস মারিয়া আর বন্ধুদের বলল–চিকিৎসক ওষুধ দিয়েছে। বলেছে হ্যারির অসুখ সেরে যাবে। ভয়ের কিছু নেই।

মারিয়া কেঁদে ফেলল। ফ্রান্সিস এসে সান্ত্বনা দিল। বলল–রাত জেগে জেগে তোমার শরীরের অবস্থা খারাপ হয়েছে। এসব নিয়ে আর ভেবো না। দেখ এই ছেলেটি হিবু নাম-চিকিৎসকের ওষুধ বানায়।

–এই বাচ্চা ছেলেটা? মারিয়া হেসে বলল।

–হ্যাঁ। তারপর ফ্রান্সিস বলল–হিবু তুমি কখনও কোন রাজকুমারী দেখেছো?

–না–না। তবে গল্পের বইয়ে ছবি দেখেছি। কী সুন্দর দেখতে। কী সুন্দর মাথার চুল। কী সুন্দর মুকুট পরা। হিবু বলল।

ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–ইনিও আমাদের দেশের রাজকুমারী। মারিয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল—না না না। ফ্রান্সিস একবার মারিয়ার দিকে তাকাল। মারিয়া মাথা নিচু করে আছে। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া — হিবুকে যে জন্য এনেছি সেটা কর আগে। হ্যারির ঘরে চল।

তিনজনে হ্যারির ঘরে এল। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া হিবুর কাছ থেকে ওষুধটা কখন কবার খেতে হবে এসব বুঝে নাও।

–ওষুধগুলো বের করুন। হিবু বলল। শাঙ্কো ওষুধগুলো নিয়ে এল। হিবু বলল কতটা ওষুধ খাওয়াতে হবে। কয়বার খাওয়াতে হবে এসব মারিয়াকে বোঝাল। স, মারিয়া ওষুধগুলো নিজের কাছে রাখল।

ফ্রান্সিস হ্যারির কাছে এল। হ্যারি তখন তাকিয়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল-হ্যারি একটু ভালো লাগছে?

–ঠিক কিছুই বুঝতে পারছি না। হ্যারি দুর্বল কণ্ঠে বলল।

–ওষুধ পড়বে। কয়েকদিনের মধ্যেই তুমি সুস্থ হবে। দুশ্চিন্তা করো না।

–না-চিন্তা করে–কী হবে। যা হবার তাতো হবেই। হ্যারি আস্তে আস্তে বলল।

এবার হিবু বলল–এখানে আমার কাজ হয়ে গেছে। আমি যাচ্ছি।

–বেশ যাও। দরকার হলে তোমাকে যেন পাই। শাঙ্কো বলল।

–তা পাবেন বৈকি। তারপর হ্যারির দিকে তাকিয়ে বলল–ঠিক সময়ে ওষুধ পড়েছে। প্রথমে আপনার মুখ ফুলে যাওয়াটা কমে যাবে। তারপর আর কিছুদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সেরে যাবেন। হিবু কেবিন ঘরের বাইরে এল। শাঙ্কো সঙ্গে এল। জাহাজঘাটায় নামিয়ে দিয়ে শাঙ্কো বলল–এই জায়গার নাম তো প্যারাইসো বন্দর।

–হ্যাঁ। হিবু মাথা কাত করে বলল।

–আর কোন নগর আছে?

–হ্যাঁ, হ্যাঁ। উত্তর দিকে সান্তিয়াগো নগর। পূবে তালকানগর।

–অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। শাঙ্কো বলল।

হিবু জাহাজ থেকে নেমে লোকজনের ভিড়ে হারিয়ে গেল।

শাঙ্কো ভাবছিল। এখন ওরা কি করবে? শাঙ্কোর নিজেকে খুব দুর্বল বলে মনে হতে লাগল। আমরা এখানেই থাকবো কি দেশের দিকে জাহাজ চালাবো–এটা ফ্রান্সিস হ্যারির কাছ থেকে জানতে হয়। কিন্তু ফ্রান্সিসদের কাছে যেতে পারল না। দুর্বল শরীর নিয়ে নিজের কেবিনঘরে এল। খাবার সময় বলব। এখন থাক।

শাঙ্কো বিছানায় শুয়ে পড়ল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। পাশের বিছানা থেকে এক ভাইকিং বন্ধু ডাকল–শাঙ্কো–শাঙ্কো। শাঙ্কো জাগল না। বন্ধুটি আর শাঙ্কোকে জাগাবার চেষ্টা করল না।

বেলা বাড়ল। বন্ধুটি স্নান সেরে এল। এসে দেখল–শাঙ্কো বিছানায় বসে আছে। বন্ধুটি বলল যাও স্নান সেরে এসো। খেতে যাবে তো?

–আমি স্নান করবো না। শাঙ্কো বলল।

–খাবে তো? বন্ধুটি বলল।

–হ্যাঁ–খাবো।

–তাহলে–হাতমুখ ধুয়ে খেতে চলল। বন্ধুটি বলল।

–না আমি স্নান করে খেতে যাবো। শাঙ্কো বলল।

–বেশ তাই কর। তবে দেরি করো না। বন্ধুটি বলল।

–একটা কথা বলছি। শাঙ্কো বলল।

–কী? বন্ধুটি বলল।

–ভাবছি–আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা হ্যারিই দেখতো। আজ হ্যারি অসুস্থ।

তুমিই তো বলছিলে চিন্তার কিছু নেই। হ্যারি সুস্থ হবে। একটু সময় লাগবে এই যা।

শাঙ্কো স্নান করতে চলল। কিছুক্ষণ পরে স্নান করে এল। জামাটামা পাল্টে .. মাথার চুল আঁচড়ে খেতে চলল।

তখন বিকেল। শাঙ্কো হ্যারিদের ঘরে এল। দেখল–মারিয়া হ্যারির মাথার কাছে বসে আছে। হ্যারিকে হাওয়া করছে। শাঙ্কো মারিয়ার দিকে তাকাল। ভাল করে রাজকুমারীকে দেখল–রাজকুমারীর গায়ে দুধে আলতা রংটা নেই। কেমন তামাটে হয়ে গেছে।

ফ্রান্সিস ঘরে পায়চারী করছে। বিস্কো দাঁড়িয়ে আছে।

শাঙ্কো দেখল-হ্যারি চলে গেছে। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–একটা কথা ছিল।

–বল। ফ্রান্সিস বলল।

–এখন কী করবে? শাঙ্কো বলল।

–পায়চারি করতে করতে এতক্ষণ সেই কথাই ভাবছিলাম। শাঙ্কো তুমি কী করতে চাও বল। ফ্রান্সিস বলল।

–আমি আর কী বলবো। শাঙ্কো বলল।

–তোমার মতটাই বলবে। ফ্রান্সিস বলল।

–আমি আর এখানে পড়ে থাকতে রাজি নই। শাঙ্কো বলল।

–আমি আর হ্যারি ছাড়া আর সবাই দেশের দিকে যেতে চায়। ফ্রান্সিস বলল।

–খুবই স্বাভাবিক। এতদিন হয়ে গেল। শাঙ্কো বলল।

যাত্রা শুরুর আগে প্রতিবারই আমি বলেছি–সমুদ্রপথে চরম সমস্যায় পড়তে পারি আমরা। খাদ্য নেই, জল নেই। তখন হতাশ হওয়া চলবে না। দেশে চল’ দেশে চল’ বলে ঘ্যানঘ্যান করতে পারবে না। দাঁত চেপে সব সহ্য করতে হবে। যারা সব সহ্য করে থাকতে চাইবে তারাই থাকবে। যারা দেশে চলে যেতে চাইবে তাদের কোন বন্দরে নামিয়ে দেব। স্বর্ণমুদ্রা দেব যাতে তাদের পথে কোন অর্থকষ্টে পড়তে না হয়। বল–এর বেশি আমি কী করতে পারি। ফ্রান্সিস থামল। বলল রাতে খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে সবাইকে ডেক-এ উঠে আসতে বল। আমি কিছু বলবো। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। শাঙ্কো বলল। তারপর হ্যারির কাছে এল। হ্যারির ডান হাতটা জড়িয়ে ধরল। বলল–হ্যারি তোমার কষ্ট কমেছে? দুর্বলস্বরে হ্যারি বলল– কিছুটা কমেছে ওষুধ খেয়ে।

–কিছছু ভেবো না। দিন কয়েকের মধ্যেই সুস্থ হবে। তবে শরীরের দুর্বলতাটা আস্তে আস্তে যাবে। শাঙ্কো বলল।

–দেখি। হ্যারি পাশ ফিরতে চেষ্টা করল। মারিয়া ঝুঁকে পড়ে হ্যারির পিঠটা আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে দিল। হারি কাত হয়ে শুল।

ভাইকিং বন্ধুরা সব ডেক-এ এসে জড়ো হল। একটু পরে ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে দেখাশুনার জন্যে মারিয়াকে রেখে এসেছে।

আকাশে চাঁদ অনুজ্জ্বল। ছেঁড়া কাপড়ের মত ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ উত্তরমুখি সার বেঁধে উড়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস বলতে শুরু করল–ভাইসব হ্যারি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ দেশীয় চিকিৎসককে দেখানো হয়েছে। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ হ্যারিকে খাওয়ানো হচ্ছে। চিকিৎসক বলেছেন–তার ওষুধ নিয়মিত খেলে হ্যারি অল্পদিনের মধ্যেই সুস্থ হবে। তবে ঘাড়ের জোরটা কমে যাবে। তাতে কিছু ক্ষতি মেনে নিতে হবে। কিন্তু হ্যারি বাঁচল তো। ফ্রান্সিস থামল। সবাই চুপ করে ফ্রান্সিসের কথা শুনতে লাগল। ফ্রান্সিস আবার বলতে শুরু করল–হ্যারি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া। পর্যন্ত আমরা এই বন্দর শহর প্যারাইসো ছেড়ে যাবো না। মাঝ সমুদ্র দিয়ে যেতে যেতে হ্যারি যদি আবার অসুস্থ হয় তাহলে ভেন ওকে বাঁচাতে পারবে না। তখন অন্য চিকিৎসকও পাওয়া যাবে না। অসহায় আমরা দেখবো হ্যারি আস্তে আস্তে মৃত্যুর। কোলে ঢলে পড়ল। ফ্রান্সিস থামল। বন্ধুরা নিশ্চুপ। কানে লাগছে শুধু সমুদ্রের শো শোঁ শব্দ। ফ্রান্সিস বলল–তাহলে হ্যারি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকবো। বন্ধুরা ধ্বনি তুলল– ও–হো–হো। তারপর চলে গেল। কোন নতুন বন্দরে এসে ফ্রান্সিস মারিয়া অন্য বন্ধুরা শহর দেখতে বেরোয়। বেশ রাত পর্যন্ত ছোট ছোট দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। তারপর জাহাজে ফিরে আসে।

আজ কিন্তু কোন বন্ধু জাহাজ থেকে নামল না। কেউ তীরে নামবার কথা বলল না। অসুস্থ হ্যারির জন্যে সবাই উৎকণ্ঠিত। কিছুই ভালো লাগছে না তাদের।

চিকিৎসকের ওষুধ খেয়ে তিন চারদিনের মধ্যে হ্যারি অনেকটা সুস্থ হল। ফ্রান্সিস উৎফুল্ল হল–যাক হ্যারির বিপদ কেটে গেছে।

সেদিন ডেক-এ নাচ গানের আসর বসল। হ্যারিও শাঙ্কোর কাঁধে ভর রেখে ওরা আস্তে আস্তে ডেক-এ উঠে এল। সবাই দেখল–হ্যারি আস্তে আস্তে এসে আসরে বসল। সবাই ও–হো–হো ধ্বনি তুলল। ডেক-এ বেশ কিছুটা গোল জায়গা ঘিরে ভাইকিংরা বসল।

প্রথমে বিস্কো এল। বিস্কো হাসির গল্প বলতে ওস্তাদ। কত হাসির গল্প যে ও জানে। কয়েকজন বন্ধু গলা চড়িয়ে বলল–বিস্কো প্রথমে হাসির গল্প। বিস্কো মাথা নেড়ে বলল–বেশ। তারপর গল্প বলতে লাগল–এক সার্কাস পার্টিতে একটা গাধা ছিল। মজার খেলা দেখাত। কিন্তু সার্কাস মালিক গাধার ওপর তেমন নজর রাখতো না। কাজেই অনেক সময় গাধাটাকে খেতেও দেওয়া হত না। এরকম মাঝে মাঝেই হত। খিদের জ্বালায় গাধাটা রাতে ঘুমুতে পারতো না। ওকে এত অবহেলা সহ্য করেও ঐ সার্কাস পার্টিতে থাকতে হতো। ঘোড়া ভালুকরা গাধাটাকে বলত–তুই এত কষ্ট করে এই সার্কাস পার্টিতে পড়ে আছিস কেন? গাধা চুপ করে থাকতো। একদিন দুটো কুকুর ওকে বলল–এই দল থেকে চলে যা।

–না, না। এখানে আমাকে থাকতেই হবে। ঐ দ্যাখ-মালিকের মেয়ে তারের ওপর দিয়ে হাঁটা অভ্যেস করছে। মালিক মেয়েটিকে বলে–যদি পা ফসূকে পড়ে যাস তবে এই গাধাটার সঙ্গে তোর বিয়ে দেব। ভাই–একদিন না একদিন পা ফস্কাবেই। সেই দিনের জন্যেই আমি মার খেয়ে খেয়ে এই সার্কাস দলে পড়ে আছি।

তুমুল হাসি আর হাততালিতে ভরে উঠল জাহাজের ডেক। এবার গান। এক বন্ধু এগিয়ে এল। সঙ্গে একটা পীপে হাতে নিয়ে আর এক বন্ধু এল। গান শুরু হল। পীপের দুপাশে হাতে চাপড় দিয়ে বাজনা বাজল। গান জমে উঠল। হাততালি দিল শ্রোতা বন্ধুরা।

এবার সেই গায়ক বন্ধুটি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–ফ্রান্সিস– রাজকুমারীকে একটা গান গাইতে বল। ফ্রান্সিস বলল কী বকছো। মারিয়া গাইতে জানে নাকি??

জানে। তুমি জানো না। আমরা রাজকুমারীর গান শুনেছি। বন্ধুটি বলল।

— ঠিক আছে। বলে দেখি। তোমরা মারিয়াকে বলো–আমি ডাকছি। ওরা চলে গেল। একটু পরে মারিয়া এল।

-কী ব্যাপার? আমাকে ডেকে পাঠালে কেন? মারিয়া এসে বলল।

–আমার বন্ধুরা খুব ধরেছে আমাকে। ওরা তোমার গান শুনতে চায়।

–একসময় গাইতাম। এখন আর গাই না। মারিয়া বলল।

–যা পারো গাও। ফ্রান্সিস বলল।

–বেশ। মারিয়া বলল।

মারিয়া মাঝখানের গোল জায়গাটায় দাঁড়াল। তারপর গান গাইতে শুরু করল। ফ্রান্সিস বেশ চমকে উঠল–মারিয়ার এত সুন্দর গলা। সঙ্গে পীপেয় চাপড় মেরে তাল রাখল এক বন্ধু। গানটা যেন কোথায় শুনেছে ফ্রান্সিস। একটু পরে ফ্রান্সিসের মনে পড়ল–ওরা আইসল্যাণ্ড গিয়েছিল। সেখানে এক উৎসবে চাষী মেয়েরা এই গান গেয়েছিল। বলা যায় আইসল্যাণ্ডের গান।

মারিয়ার গান শেষ হল। বন্ধুরা কয়েকজন আনন্দে লাফাতে লাগল। সেইসঙ্গে হাততালি। মারিয়াকে আরো দুটি গাইতে হল। তুমুল হর্ষধ্বনি শোনা গেল।

গানের আসর শেষ হল। বন্ধুরা নিজেদের কেবিনে চলে গেল। শাঙ্কো হ্যারিকে ধরে নিয়ে গেল।

কেবিনঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া তুমি এত সুন্দর গান গাও আমি জানতেই পারিনি।

–তোমার সামনে আমি কখনো গাই নি। তাই।

এখন থেকে গাইবে। আমি মাঝে মাঝে তোমার গান শুনবো।

–বেশ। মারিয়া হেসে বলল।

পরদিন সকালে বন্ধুরা কয়েকজন ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এল। শাঙ্কোও ওদের সঙ্গে ছিল। ফ্রান্সিস বলল–কী ব্যাপার?

শাঙ্কো বলল–আমরা পোশাক তৈরি করাব। তুমি কিছু সোনার চাকতি দাও।

বেশ তো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর মারিয়াকে বলল–বন্ধুদের সোনার চাকতি দাও। মারিয়া বিছানার এক কোনে এল। হাত নামাল। একটা কাঠের বাক্স বের করল। চাবি নিয়ে বাক্সটা খুলল। বিছানা থেকে নেমে এল। শাঙ্কোদের একটা একটা করে সোনার চাকতি দিল। তারপর তিনটে, চাকতি নিয়ে রাখল।

ভাইকিং বন্ধুরা খুব খুশি। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস আমরা এই দেশীয় পোশাক বানাব। তুমিও আমার সঙ্গে চলো। ফ্রান্সিস হ্যারি আর মারিয়ার দিকে তাকাল। দুজনেই নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।

মারিয়া তুমি আর হ্যারি থাকে। আমরা যাচ্ছি। তোমার জন্যে পোশাক কিনে আনবো। ব, হ্যারির শরীরের কয়েকটা মাপ নিয়ে যাচ্ছি। দর্জি ঠিক সেই পোশাক বানাতে পারবে।

ফ্রান্সিসরা তৈরি হয়ে জাহাজ থেকে জাহাজঘাটায় নামল। রাস্তায় বেশ ভিড়। ওরা একটা দর্জির দোকান খুঁজে পেল। দোকানে ঢুকল। দোকানের মালিক খুব খুশি। এত খদ্দের। এবার দর্জিকে কাপড় দেখাতে বলল। দর্জিরা দেখাল নানা রঙের কাপড়। ওর মধ্যেই ফ্রান্সিস পেল সবুজ রঙের কাপড়। কাপড়টা তুলে সবাইকে দেখাল। সকলেরই পছন্দ হল।

এবার ফ্রান্সিস মালিকের কাছে এল। কাপড়টা দেখিয়ে বলল–আমাদের মাপ অনুযায়ী এ দেশের পোশাক বানিয়ে দিন। তৈরি জামা বিকেলের মধ্যে চাই।

–এত তাড়াতাড়ি।

ফ্রান্সিস কোমড় থেকে সোনার চাকতি দেখাল। মালিককে দিল।

মালিক খুব খুশি। বলল–কোন অসুবিধে নেই। দু’জন বেশি লোক রাখতে হবে।

–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস হ্যারির মাপটা দিল। বলল–এই মাপের হবে।

–বেশ। মালিক মাথা দুলিয়ে বলল।

ফ্রান্সিসরা দোকান থেকে বেরিয়ে এল। বলল, চলোমারিয়ার জন্যে একটা গাউন কিনবো। সবাই রাস্তা দিয়ে চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বেশ বড় জামাকাপড়ের দোকান দেখল।

ফ্রান্সিসরা দোকানে ঢুকল। দোকানের মালিক হাসিমুখে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস তৈরি হওয়া ঝোলানো গাউনগুলো দেখতে লাগল। কত রঙের কত রকমের গাউন। ঝুলছে। ফ্রান্সিস গাউনগুলো দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে একটা হলুদ রঙের মধ্যে নীলফুল এইরকম একটা গাউন দেখল। দোকানের কর্মচারীকে গাউনটা নামিয়ে দিতে বলল। কর্মচারী ঐ গাউনটা নামাল। ফ্রান্সিস–দেখতে দেখতে বলল–শাঙ্কো-দেখ তো এই গাউনটা তোমাদের কেমন লাগছে। শাঙ্কো বলল তোমার পছন্দ, আমাদেরও ভালো লেগেছে। রাজকুমারীকে খুবই সুন্দর দেখাবে। অন্য দুই তিনজন বন্ধুও বলল সেকথা। ফ্রান্সিস ঐ গাউনটা কিনল। একজন কর্মচারী একটা পেস্টবোর্ডের বাক্সের মধ্যে গাউনটা ভরে ফ্রান্সিসকে দিল।

কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে সবাই জাহাজে ফিরে এল। ফ্রান্সিস হ্যারির কেবিনঘরের দিকে চলল। অন্য বন্ধুরা নিজেদের কেবিনঘরে চলে গেল।

হ্যারির কেবিনঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি–কেমন আছো?

–ভালো। তোমরা শহরে ঘুরে এলে?

–হ্যাঁ। সকলের পোশাক তৈরির জন্যে একজন দর্জির দোকানের মালিককে বলে এলাম। হ্যারির পাশেই মারিয়া বসে আছে।

ফ্রান্সিস এবার মারিয়ার দিকে পেস্টবোর্ডের বাক্সটা এগিয়ে ধরল। হেসে বলল–খোল। মারিয়া বাক্সটা খুলল। গাউনটা ঝুলিয়ে ধরল।

–পছন্দ হয়েছে? ফ্রান্সিস বলল।

–ভালোই হয়েছে। তবে অল্পবয়সী মেয়েদের ভালো মানাবে। আমার মত বুড়িকে ততটা মানাবে না। মারিয়া বলল।

তুমি এখনও বুড়ি হও নি। এটা অনায়াসে পরতে পার। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। তুমি এনেছো নিশ্চয়ই পারবো। মারিয়া বলল।

ভাইকিংবা খুব খুশি। নতুন পোশাক পরবে। বিকেল হওয়ার আগেই শাঙ্কো? কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দর্জির দোকানে এল। দোকানের মালিক হেসে বলল– আপনাদের পোশাক হয়ে গেছে। কাপড়ের একটা বড় বোঁচকার মত এক কর্মচারী নিয়ে এল। শাঙ্কো দাম মিটিয়ে দিতে গেল। দু’জন বন্ধু বোঁচকাটা ধরে রইল। শাঙ্কো ফিরে এল। বোঁচকা নিয়ে জাহাজে ফিরে এল।

ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে বোঁচকা নিয়ে টানাটানি চলল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–একটু ধৈর্য ধর। শাঙ্কোই যার যা পোশাক একে একে বার করে দিল। খুশি হয়ে সবাই নতুন পোশাক পরতে নিজেদের কেবিনঘরে চলে গেল।

নতুন জামাটামা পরে ভাইকিংরা খুব খুশি। ওরা ডেক-এ উঠে এল। শাঙ্কোরা কয়েকজন ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল-রাজকুমারীও আমাদের সঙ্গে বেড়াতে যাবেন।

ফ্রান্সিস বলল–আমি হা না বলবো না। তোমরা রাজকুমারীকে বলে দেখ।

তখনই মারিয়া ঘরে ঢুকল। হ্যারিকে জিজ্ঞেস করল–হ্যারি এখন কেমন আছো?

–খুব ভাল। আজকে দুপুরে এই ঘরে হাঁটাচলা করেছি। শরীরের দুর্বলতা অনেকটা কেটে গেছে। শাঙ্কো এগিয়ে এল। বলল–আমাদের একটা কথা ছিল।

-বল। মারিয়া বলল।

–আপনিও নতুন পোশাক পরে আমাদের সঙ্গে বেড়াতে চলুন। শাঙ্কোরা বলল।

–তাহলে হ্যারিকে দেখবে কে? মারিয়া বলল।

–ফ্রান্সিস দেখবে। শাঙ্কো বলল!

মারিয়া ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–তুমি হ্যারিকে দেখবে?

–এখন হ্যারি অনেকটা সুস্থ। আমিই ওকে দেখবো। শাঙ্কেরা বলছেও বেড়িয়ে এসো।

–বেশ। তাড়াতাড়িই ফিরে আসবো। মারিয়ার সম্মতি পেয়ে শাঙ্কোরা খুব খুশি।

–তোমরা কোথায় বেড়াতে যাবে? মারিয়া শাঙ্কোকে বলল।

–সান্তিয়াগো নগরে। শাঙ্কো বলল।

–সে তো বেশ দূর। মারিয়া বলল।

সান্তিয়াগোতে বেশিক্ষণ থাকবো না। তাড়াতাড়িই ফিরবো। শাঙ্কো বলল।

মারিয়া নিজের কেবিনে গেল।

কিছু পরে মারিয়া নতুন পোশাকটা পরে হ্যারির ঘরে এল। ফ্রান্সিসের দিকে চেয়ে হাসল। ফ্রান্সিসও হাসল। বলল–ঠিক পরতে পেরেছে।

–হ্যাঁ হ্যাঁ। মারিয়া বলল।

–তোমাকে খুব ভালো দেখাচ্ছে এই পোশাকে। ফ্রান্সিস বলল।

–তাহলে যাই। মারিয়া বলল।

–যাও। তাড়াতাড়িই ফিরবে। ফ্রান্সিস বলল।

মারিয়া ডেক-এ উঠে এল। সব ভাইকিং গলা চড়িয়ে ধ্বনি তুলল ও-হো-হো।

সবাই পাটাতনে পা রেখে রেখে হেঁটে তীরে উঠল। শুরু হল চলা। মারিয়া ক শাঙ্কোকে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো এগিয়ে এল।

মারিয়া বলল–যাচ্ছো তো–সান্তিয়াগো কোথায় কতদূর জানো।

–হ্যাঁ এক এদেশী লোকের কাছে খোঁজ নিয়েছি। খুব বেশি দূর নয়। আর প্যারাইসোর এই রাস্তা ধরে গেলেই সান্তিয়াগো পৌঁছোনো যাবে।

পথচলা শুরু হল। শেষ বিকেলের রোদ বেশ সহনীয়। ওরা চলল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই প্যারাইসো পার হয়ে উন্মুক্ত ক্ষেতখামারের এলাকায় এল। শাঙ্কোরা চলল। একটা গ্রাম দেখল। কয়েকটা বাড়ি ধরে গ্রাম। গ্রামের মেয়েরা কপিকলের সাহায্যে ইঁদারা থেকে জল তুলছে। শাঙ্কোরা চলল।

সূর্য অস্ত গেল। চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল।

শাঙ্কোরা হাঁটছে। আকাশে আধভাঙা চাঁদ উজ্জ্বল হল। চারিদিকে চাঁদের আলো ছড়াল। শাঙ্কো আনন্দে শিস্ দিল।

–তোমার এত আনন্দের কারণ কী? বিস্কো শাঙ্কোকে বলল।

–চাঁদের আলো পেলাম। ভাগ্য ভাল কিনা বলো। শাঙ্কো বলল।

–হ্যাঁ। চাঁদের আলোর কথা ভেবে আমরা বেরোই নি। এখন রাস্তার উঁচুনিচু গর্তটর্ত দেখে হাঁটতে পারবো।

শাঙ্কোরা হাঁটতে লাগল। বিস্কো ওর দেশের গান ধরল। ভাইকিংরা ধ্বনি দিল ও–হো–হো।

আর কিছুদূর যেতেই সান্তিয়াগো নগরের আলো দেখা গেল। শাঙ্কোরা আরো জোরে পা চালাল।

সান্তিয়াগো নগরে ঢুকল। বেশ সাজানো গোছানো শহর। রাস্তায় ভিড়। ঐ ভিড়ের মধ্যে দিয়ে শাঙ্কোরা ঘুরে ঘুরে শহরটা দেখতে লাগল। রাজা আজপার অট্টালিকা দেখে মারিয়া হাততালি দিল। মারিয়া খুব খুশি। কতদিন পরে এরকম অট্টালিকা দেখল।

হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত শাঙ্কোরা রাজপ্রাসাদের ধারে সুন্দর বাগান দেখল। কত ফুল ফুটে আছে। মারিয়া বলল–উঃ। আর হাঁটতে পারছি না। চলো এই বাগানে বসি। ওরা বাগানে ঢুকল। পাহারাদার লাঠি হাতে ছুটে এল। গলা চড়িয়ে বলল–রাতে বাগানে বসা যাবে না। শাঙ্কো পাহারাদারের কাছে এল। কোমর থেকে একটা রুপোর চাকতি বের করে পাহারাদারের হাতে দিল। পাহারাদার রুপোর চাকতিটা কোমরে গুঁজে বলল–

–আরও চাকতি দাও। এবার শাঙ্কো পাহারাদারের মাথার টুপি তুলে আনল। বলল–এই টুপি তুমি পাবে না।

–না-না–আমার টুপি দাও। পাহারাদার বলল।

–দিচ্ছি। কিন্তু আর চাকতি চাইবে না। শাঙ্কো বলল।

–বেশ–বেশ। তোমরা বস। পাহারাদার হাত বাড়াল। শাঙ্কো টুপি ফিরিয়ে দিল।

এবার সবাই পাথরের আসনে বসল। এতদূর হাঁটা। শাঙ্কো মারিয়াকে বলল রাজকুমারী আপনার খুব কষ্ট হল।

–মোটেই না। আমি ঠিক আছি। আমার জন্যে ভেবো না। মারিয়া বলল।

বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল। শরীর যেন জুরিয়ে গেল। কেউ কোন কথা বলল না।

বেশ কিছুক্ষণ শাঙ্কোরা বিশ্রাম করল। এত হাঁটাহাঁটি। শাঙ্কো বলল– রাজকুমারী আপনার খুবই কষ্ট হয়েছে।

–আমি এখনও আরো হাঁটতে পারি। মারিয়া বলল।

–তাহলে এবার শেষবারের মতো দুপাক ঘুরে আসি। তারপর কোন সরাইখানায় রাতের খাওয়া আর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

সবাই উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কো বলল–পুব দিকটায় আমরা এখনও যাই নি। ঐ দিকে চলো।

ওরা পুবমুখে চলল। বেশ বড় বড় পাথর আর শুকনো ঘাসের ছাওয়া বাড়ি। কে জানে কাদের এই বাড়ি। নিশ্চয়ই মন্ত্রী-টন্ত্রীর। কিছু দূরেই একট মস্ত বড় মাঠ। হয়তো এখানে খেলা টেলা হয় মেলাও বসে। চাঁদের আলো খুব। উজ্জ্বল নয়। আর কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি হল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–আর ঘুরে বেড়ানো নয়। এক ভাইকিং বন্ধু বলে উঠল,–খিদেয় পেট জ্বলছে।

বিস্কো বলে উঠল–শাঙ্কো ঐ যে একসারি গাছ। বেশ কয়েকটা দোকান। ওখানে সরাইখানা পাওয়া যাবে। চল।

বিস্কোর অনুমান ঠিক। ওখানে দুটো সরাইখানা পাওয়া গেল। শাঙ্কোকে বলল– দুই সরাইখানার মালিককে দেখ ভালো করে। ওরা দাঁড়িয়ে আছে। তখনই প্রথম সরাইখানার মালিক ওর এক কর্মচারীকে বকতে বকতে তার গালে চড় কষাল। শাঙ্কো বলল–এই সরাইখানার মানিক রগচটা। ওর দোকানে যাবো না। এবার পরের সরাইখানাটায় এল। দাড়ি গোঁফওয়ালা মানিক হাসিমুখে এগিয়ে এল। বলল–আসুন–থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থাই ভাল। শাঙ্কো বলল–এই সরাইখানায় এসো। সবাই সরাইখানায় ঢুকল। পেছনে দেখল এক মস্তবড় জালায় জল রাখা। ওঁরা হাতমুখ ধুয়ে ঢালাও বিছানায় বসল।

মালিক এল। হাসিমুখে বলল–আপনারা কি এখন খাবেন?

–আমরা ক্ষুধার্ত। এখনই খাবো। শাঙ্কো বলল।

–সে ব্যবস্থা করছি। মালিক চলে গেল।

মিনিট পনেরোর মধ্যে কাজের লোকেরা শাঙ্কোদের সামনে চিনেমাটির থালা রেখে গেল। তারপর চিনেমাটির বড় বাটি রেখে গেল। বাটিতে গরম মুর্গির মাংস। থালায় দিল চারখানা গরম রুটি। শাঙ্কোরা খেতে শুরু করল। বেশ সুস্বাদু মাংসের ঝোল। সবাই বেশ ভালোই খেল। মালিকের মুখে হাসি নেই। শাঙ্কো মালিকের কাছে গেল। হাসল। কোমরের ফেট্টিতে রাখা দুটো সোনার চাকতি বের করল। মালিক অবাক। তাকিয়ে আছে। শাঙ্কো সোনার চাকতি দুটো দিল। বলল,

–কী খুশি তো?

–হা-হা-মালিক মাথা নাড়তে নাড়তে বলল।

–আমরা একটু বেশি খেয়ে ফেলেছি। খিদে তো। শাঙ্কো বলল।

না না। তাতে কি? মালিক বলল। তারপর গলা নামিয়ে বলল–এখনও তো পাঁচজন খেতে বাকি। আবার রান্না চাপানো হয়েছে। তারা দুতিনদিন ধরে এখানে আছে। তাদের তো আর না খাইয়ে রাখতে পারি না।

–তা তো বটেই। শাঙ্কো বলল।

রাতের খাওয়া হলে। ক্লান্ত বিস্কোরা বেশ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।

ভোর হল। শাঙ্কোর ঘুম ভাঙল। পাখির ডাক শোনা গেল। শাঙ্কো মারিয়ার। আলাদা ঘরে এল। দেখল মারিয়া প্রাতরাশ খাচ্ছে। শাঙ্কো বলল-রাজকুমারী আমরা এখন কী করবো?

প্যারাইসো বন্দর শহরে ফিরে যাবো। শহর দেখা ঘুরে বেড়ানো সবই তো হয়ে গেছে।

–ঠিক আছে। একটা কথা বলছিলাম–আমরা এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে রওনা দেব। শাঙ্কো বলল।

–এটা ঠিক করেছো কেন? মারিয়া বলল।

-সকালের সামান্য খাবার খেয়ে সারা পথ হাঁটতে হবে। দুপুর নাগাদ প্যারাইসো পৌঁছব। তখন সরাইখানায় সবারই খাওয়া হয়ে যাবে। আমাদের জন্যে আবার রান্না করতে সরাইওয়ালা রাজি হবে কিনা সন্দেহ। মারিয়া বলল।

ঠিক আছে। দুপুরের খাওয়া খেয়ে যাবো। সবাইকে বলে দাও।

শাঙ্কো বিস্কোর কাছে গেল। রাজকুমারীর সঙ্গে যা কথা হয়েছে বলল।

বিস্কো রাজি হল। বলল–এইভাবে গেলেই আমরা কোন সমস্যায় পড়ব না। শাঙ্কো সব বন্ধুদের বলল। সবাই রাজি হল।

দুপুরের খাওয়া শাঙ্কোরা তাড়াতাড়িই খেয়ে নিল। সবাই তৈরি হয়ে যাত্রা শুরু করল প্যারাইসো বন্দর শহরের দিকে।

রোদের তেজ কম। মাঝে মাঝে সূর্য উড়ন্ত মেঘে ঢাকা পড়ছিল। মেঘ সরে যেতেই রোদ।

কালো রঙের মাটির রাস্তা। হাওয়ায় ধুলো উড়ছে মাঝে মাঝেই। রাস্তায় ঝরে পড়ছে গাছের পাতা।

শাঙ্কোরা চলল। শাঙ্কো একবার দুবার মারিয়ার কাছে এল। বলল–আপনার কষ্ট হচ্ছে না তো?

–না–না। মারিয়া হেসে বলছে–আমি ঠিক আছি। আমার জন্যে ভেবো না।

সন্ধ্যে হল। অন্ধকার নামল। শাঙ্কোরা হেঁটে চলেছে। একটা মোড়ে এসে দেখল– একটা অশ্বত্থাগাছের নিচে আলো জ্বেলে কয়েকটা দোকানে কেনাকাটা চলছে। বিস্কো তাড়াতাড়ি গেল। দেখল–মাংসের বড়া বিক্রি হচ্ছে। ও তাড়াতাড়ি শাঙ্কোর কাছে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–মাংসের বড়া বিক্রি হচ্ছে। তাড়াতাড়ি চল। ভাইকিংরা দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াল। শাঙ্কো সবার জন্যে বড়া কিনতে চাইল। কিন্তু বড়াওয়ালা বলল–অত বড়া নেই। শাঙ্কো যা আছে তাই চাইল। দোকানি শাঙ্কোদের মাংসের বড়া আর কটা রুটি দিল। ভাইকিংরা সবাই খাবার পেল না। যারা পেল বড়া ভেঙে খেল। রুটি অবশ্য বেশিই ছিল। ভাইকিংরা তাই খেল। সামনেই একটা ইঁদারা। শাঙ্কোরা জল খেল। তারপর হাঁটা।

কিছুদূর যেতে হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। আর কিছুদূর এগোতে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। সেইসঙ্গে বাজ পড়ার শব্দ।

শাঙ্কোরা জাহাজী। সমুদ্রের সঙ্গে ওদের নাড়ির যোগ। বিদ্যুতের আলো দেখে শাঙ্কো আন্দাজ করল আর অল্পক্ষণের মধ্যেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হবে। শাঙ্কো জোরে বলল–ভাইসবঝড়বৃষ্টি শুরু হবে। তার আগেই ডানদিকের জঙ্গলে ঢুকে পড়। এখানে কোন বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে না। আশ্রয় নেবার হলে বনের মধ্যে ঢুকতে হবে।

এতক্ষণ বাতাস খুব আস্তে বইছিল। হঠাৎ সেই বাতাসও বন্ধ হয়ে গেল।

শাঙ্কোই প্রথমে ডানদিকের বনে ঢুকে পড়ল। তারপর সকলেই যখন ছুটে আসছে প্রচণ্ড ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবাই বনে ঢুকে পড়ল।

বৃষ্টি শুরু হল। গাছের পাতায় চট চট শব্দ হতে লাগল। তারপর সেই শব্দ আর শোনা গেল না। ততক্ষণে গাছের পাতা ভিজে গেছে।

অন্ধকারে শাঙ্কোরা দাঁড়িয়ে রইল। প্রচণ্ড ঝড়ের হাওয়া বইছে। গাছগাছালি। মাথা দোলাচ্ছে। বাতাসের শনশন শব্দ। ঝড় বৃষ্টি চলল।

বিস্কো হঠাৎ বিদ্যুতের আলোয় দেখল চারপাঁচজন প্রহরী বন্দীদের নিয়ে যাচ্ছে। বারবার বিদ্যুতের আলোয় দেখল বন্দীদের দল থেকে একজন খুব দ্রুত বেরিয়ে এল। দুজন প্রহরী খোলা তরোয়াল নিয়ে ছুটে এল। কয়েদীটি এক লাফে রাস্তা থেকে বনের গাছের কাছে চলে এল। প্রহরীরা থেমে গেল। বন্দী কয়েদী সঙ্গে সঙ্গে বড় গাছের আড়ালে চলে এল। বিদ্যুতের আলো চমকালেই সেই আলো অন্ধকার বনে খোলা তরোয়াল হাতে প্রহরীরা নিজেদের দলে ফিরে গেল। ওরা চলল। প্রহরীরা কয়েদীদের চেঁচিয়ে বলল–কেউ পালাবার চেষ্টা করলে মরবে। কয়েদীদের নিয়ে প্রহরীরা চলে গেল।

বৃষ্টি থামল। শাঙ্কো অন্ধকারে সেই কয়েদীদের কাছে গেল। আন্দাজে কয়েদী কোথায় আছে বুঝে নিল। তারপর গলা চড়িয়ে বলল- আমরা ভাইকিং। বিদেশী। আমাদের জন্যে ভয় পেও না। একটু পরে শাঙ্কো বুঝল কয়েদীটি হেঁটে হেঁটে ওদের দিকেই আসছে। একটু পরে কয়েদীটি শাঙ্কোর কাছে এল। অন্ধকারে শাঙ্কো দেখল কয়েদীটি বড় রোগা। যেন অনেকদিন না খেয়ে আছে। শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল,

–তুমি কে?

–আমি তামাকা। এখানকার মানুষ। পুবদিকে কিছু দূরে একটি রাজ্য তানাকা। ওখানেই আমার ঘরবাড়ি।

একটু থেমে বলল–বৃষ্টি মনে হয় কমেছে। এখন এখানে থাকলে গাছের তলা থেকে জল পড়বে বেশি। বেশি ভিজে যাবো। বনের বাইরে চলুন।

তানাকা আর শাঙ্কোরা বনের বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। বৃষ্টি একেবারে থেমে যায় নি। টিপটিপ পড়ছিল। তানাকা শাঙ্কোকে বলল–আপনারা কারা? বিদেশী নিশ্চয়ই?

–হ্যাঁ–আমরা ভাইকিং। আমরা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি।

শাঙ্কো মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–উনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।

–আপনারা এরকম বেড়ান–কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই?

-ঠিক উদ্দেশ্যহীন নয়। কোথাও কোথাও আমরা গুপ্তধনের কথা শুনলে তা বুদ্ধি খাঁটিয়ে খুঁজে আবিষ্কার করি। শাঙ্কো বলল।

–গুপ্তধন নিয়ে যান। তানাকা বলল।

–না। যে আসল মালিক তাকে দিয়ে দিই। নিজেরা একটা মুদ্রাও নিই না। শাঙ্কো বলল। তানাকা বেশ অবাকই হল। ও ঠিক বিশ্বাস করল না। আবার এই নিয়ে কোন কথাও বলল না।

এতক্ষণ তানাকার হাতের দড়ি খোলা হয়নি। শাঙ্কো দেখল সেটা। ও নিজের জামার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করল। তানাকার হাতের দড়িটাকে ছোরা দিয়ে কেটে দিল। তানাকা হাতের কব্দিদুটোয় হাত বুলোতে লাগল।

সূর্য উঠেছে কিছুক্ষণ আগে। এবার ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। সবার পোশাক ভেজামাথা থেকে টপ্ টন্ করে জমা জল পড়ছিল এতক্ষণ। সবাই ভিজে ঢোল। এক ভাইকিং বন্ধু এতক্ষণে বলল–সুন্দর জামাটামা পরা আমাদের কপালে নেই। যাও বা পেলাম জলকাদায় এক কদাকার চেহারা নিয়েছে। এবার আরো দুতিনজন ভাইকিং বলল–মাথা গা সব ভিজে একশা। দুর্ভাগ্য–দুর্ভাগ্য। হাঁটতে হাঁটতে আরো কয়েকজন বলল–রাস্তায় কাদা জমে গেছে। কাদা ছিটকোচ্ছে। নতুন পোশাক দেখাচ্ছে যেন তিরিশ বছরের পোশাক।

বেলা বাড়তে লাগল। সবাই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। কিন্তু কোথায় জুটবে সরাইখানা। চলছে সবাই। হঠাৎ তানাকা গলা তুলে বলল–ঐ ওক গাছটার নিচেই রয়েছে একটা সরাইখানা।

চলল সবাই। সত্যিই দুটো ঘর। পাথর আর শুকনো ঘাস দিয়ে তৈরি।

সবাই সরাইখানার সামনে এসে থামল। মালিক কাঠের পাটাতনে বসে আছে। এত খরিদ্দার দেখে খুব খুশি।

আসেন, আসেন। মালিক একগাল হেসে বলল। তারপর তাড়াতাড়ি উঠে এল।

শাঙ্কোরা ঘরের ভেতর ঢুকল। পাটাতন পাতা। তার ওপরেই শাঙ্কোরা বসল। সবাই জল খেল। কেউ কেউ রান্নার বড় উনুনের কাছে এসে বসল। জামাটামা যত তাড়াতাড়ি পারা যায় শুকিয়ে নেওয়া।

শাঙ্কো মালিকের কাছে এল। বলল–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের খেতে দিন। বেশি দেরি করলে ময়দা আটা চিনির জলে ঢেলে খেয়ে নেব। মালিক আঁতকে উঠল।

না না। দেখছি দেখছি। মালিক কথাটা বলে রাঁধুনিদের কাছে গেল। ফিস্ ফিস করে বলল–তাড়াতাড়ি রুটি মাংস বেঁধে দাও। নইলে আঁড়ার ঘরে রাখা আটা ময়দা, চিনি সব লুঠ করবে। তাড়াতাড়ি করো।

রাঁধুনিরা খুব তাড়াতাড়ি রুটি মাংস রাঁধল। মালিক শাঙ্কোদের কাছে এসে হেসে বলল–আপনাদের খাবার আসছে। আপনারা খেতে বসুন।

শাঙ্কোরা সার দিয়ে বসল। পদ্মপাতা দেওয়া হল। তারপর রুটি আর মাংস। কেউ জানতে চাইল না এটা কিসের মাংস। পাতে পড়ামাত্র ওরা হাপুস হুপুস খেতে লাগল। শাঙ্কো বারকয়েক মারিয়াকে জিজ্ঞেস করেছে শরীর ভালো আছে কিনা। মারিয়া হেসে বলেছে আমার জন্যে ভেবো না।

খাওয়া শেষ। জল খেয়ে উঠল সবাই। শাঙ্কো সোনার চাকতি দিয়ে দাম মেটালো। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–চল সবাই।

শাঙ্কোরা চলল। একটা মোড়ে এসে দাঁড়াল সবাই। শাঙ্কো দেখল একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে অন্যটা ডানদিকে মোড় নিয়েছে। তানাকা শাঙ্কোর কাছে এগিয়ে। এল। বলল-সোজা রাস্তা চলে গেছে তানাকার দিকে। ডানদিকের রাস্তাটা গেছে। প্যারাইসো। এখন আপনারা কোথায় যাবেন?

–প্যারাইসো বন্দরের কাছে।

–তাহলে ডানদিকের রাস্তাটা ধরে চলতে হবে।

–হুঁ। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–ডান দিকের রাস্তা দিয়ে আমরা যাবো। চলো সব।

ডানদিকের রাস্তা ধরে চলল সবাই।

মাথার ওপর সূর্য যেন আগুন ছড়াচ্ছে। পেট ভরা আছে। এতেই ওরা তৃপ্ত। রোদের তীব্রতা ওদের কাহিল করতে পারল না। বেশ জোরেই হাঁটতে লাগল সবাই।

শাঙ্কো তানাকার কাছে এল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তানাকা বলল–এবার। তোমার কথা বলো তো। কী করেছিলে যে বন্দী হলে?

—-সে অনেক কথা। তানাকা বলল।

–বল–শুনি। শাঙ্কো বলল।

–দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্য। তানাকা বলল।

–বেশ তো। দুঃখের কথাটাই শুনি। শাঙ্কো বলল।

একটু থেমে তানাকা বলতে লাগল–তানাকা রাজ্যেই আমার জন্ম। তাই আমি নিজেই আমার নাম রেখেছি তানাকা। পড়াশুনো বেশি করতে পারি নি। বাবা ছিলেন হীরের গয়না তৈরিতে ওস্তাদ।

সান্তিয়াগো আর অন্য দেশ থেকে বাবার কাছে লোক আসতো হীরের গয়না তৈরি করার জন্যে। বাবার হাতের কাজ ছিল নিখুঁত। তানাকার বাজারের মধ্যে আছে বাবার দোকান। স্কুল পালিয়ে আমি বাবার দোকানে এসে বসে থাকতাম। পড়াশুনোর প্রতি আমার কোন আগ্রহই ছিল না। বাবাও বুঝল সেটা। বাবা। বললেন কী আর করবি। হীরের কাজই শেখ। বাবা হাতে ধরে আমাকে হীরের কাজ শেখাতে লাগলেন। আমার বাবা আমার কাজ দেখে বললেন–ভালো। তাহলে হীরের সঙ্গে সোনা রুপোর কাজও শেখ। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে হীরে সোনা রুপোর কাজও শিখলাম। বাবার কাজে সাহায্য করি। আবার শুধু নিজেও গয়না টয়না তৈরি করতে লাগলাম।

তানাকা থামল। তারপর বলতে লাগল–আসলি হীরে সোনা এক নজর দেখেই আমি চিনে ফেলতাম। বাবা আমার এই গুণটার খুব প্রশংসা করলেন। বললেন– আমিও তোর মত এত তাড়াতাড়ি হীরে সোনা চিনতে পারি না। বাবা মাঝে মাঝে শুধু আমাকেই একটা গয়না তৈরির দায়িত্ব দিতে লাগলেন। আমিও গয়নাগুলো নিখুঁতভাবে করতে লাগলাম।

একটু থেমে তানাকা বলতে লাগল–এইসময় আমার এক বন্ধু জুটল– আরোনাস নাম। ও দোকানে আসতো। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওর সঙ্গে গল্পটল্প করতাম। মাঝে মাঝে আরোনাসের সঙ্গে দোকানের কাজ শেষ করে দোকান থেকে বাইরে আসতাম। বাবা আপত্তি করতেন না। তানাকা থামল। শাঙ্কো কিছু বলল না। তানাকা বলতে শুরু করল

এক দুপুরে আরোনাস একটু আগেই আমাকে দোকানের বাইরে নিয়ে এল। বলল–চন্আজকে মন্ত্রীমশাইর বাড়ি যাবো।

–তোকে নেমন্তন্ন করেছে? আমি বললাম।

না না। আমি নিজে থেকেই যাচ্ছি। আরোনাস বলল।

কী জন্যে যাচ্ছিস? আমি বললাম।

–আছে–আছে। চল–দেখবি। আরোনাস শুধু এই কথাটাই বলল।

দুজনে মন্ত্রীমশাই-র বেশ বড় বাড়িটার সামনে এলাম। চারদিকে পাথরের দেয়াল। খুব উঁচু নয়। আরোনাস বলল–দেওয়াল পার হতে পারবি তো?

-হা হা। আমি বললাম। কিন্তু এভাবে না বলে কয়ে

উপায় নেই। বিনা কারণে কেউ তোকে এমনি এমনি থলিভর্তি সোনার চাকতি দিয়ে যাবে না। আরোনাস বলল।

–ঠিক আছে। পার হ! আমি বললাম।

দুজনে দেওয়াল পার হলাম। একটা বড় বাগান। ফলফুলের গাছ। আরোনাসের পেছনে পেছনে মাথা নিচু করে একটা বড় আপেল গাছের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি তখনও জানি না ওখানে কেন দাঁড়িয়ে গেলাম। ওখান থেকে কাঁচের জানালা দিয়ে ঘরটা মোটামুটি দেখা যাচ্ছে।

দাঁড়িয়ে আছি। কিছু পরে রাজার এক পেয়াদা এল। দরজায় শব্দ করল। মন্ত্রীমশাই নিজেই দরজা খুলে দিলেন। বাড়ির পাহারাদার বোধহয় অন্য কাজে গেছে। পেয়াদা কোমর থেকে একটা ভেলভেট কাপড়ের থলিমত বের করল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে মন্ত্রীমশাইর হাতে দিল। আরোনাস ফিস্ ফিস্ করে বলল-পেছনে চ। জলদি।

দুজনে দ্রুতপায়ে বাড়ির পেছনে এলাম। একটা মোটাগাছের আড়াল থেকে দেখলাম একটা ঘর। শোবার ঘর। মন্ত্রীমশাই সেই ঘরে এলেন। একটা আবলুশ কাঠের আলমারি। মন্ত্রীমশাই আলমারির দরজাটা খুললেন। থলিটা পরের তাকে রাখলেন। তারপর চলে গেলেন। আলমারিটা বন্ধও করলেন না। বোধহয় পরে থলিটা কোথাও রাখবেন।

এবার আরোনাস ফিসফিস্ করে বলল–তুই পেছনের গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়া। দাঁড়িয়েই থাকবি। আমি কথামত গেট-এ গিয়ে দাঁড়ালাম। শুনলাম দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ। একটি কাজের স্ত্রীলোক দরজা খুলে বেরিয়ে এল। আরোনাস আমাকে দেখিয়ে কী বলল। স্ত্রীলোকটি আমার কাছে আসতে লাগল। তখনই দেখলাম আরোনাস খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে দ্রুত ঢুকে পড়ল। আর অল্প সময়ের মধ্যে বেরিয়ে এল। স্ত্রীলোকটি তখন আমার সামনে আসছে। আরোনাস মুহূর্তের মধ্যে শোবার ঘরের দরজা ভেজিয়ে ছুটে এল আমাদের কাছে। স্ত্রীলোকটি তখন আমাকে জিজ্ঞেস করছে–এই দরজা দিয়ে এলেন কেন? বড় দরজায় যান। আরোনাস ও ছুটে এল। চাপা গলায় বলল–পালা। ছোট। আমিও আরোনাসের পেছনে পেছনে ছুটলাম। কাজের স্ত্রীলোকটি হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

রাস্তায় নেমেই আরোনাস বলল–এবার স্বাভাবিকভাবে হাঁট। সব হিসেবমত করেছি। আর ভয়ের কিছু নেই।

হাঁটতে হাঁটতে দুজনে আরোনাসের বাড়ি এলাম। আরোনাস কী একটা লোহার মত লম্বা কাঠি বের করল। দরজাটার ফাঁকে ঢোকাল। দরজা খুলে গেল। দুজনে ভেতরে ঢুকলাম। তখনও আমরা হাঁপাচ্ছি। যীশু বাঁচিয়েছেন। ঠিক সময় পালাতে পেরেছি।

আরোনাস জামার গলার কাছ দিয়ে হাত ঢোকাল। থলিটা বার করল। সোনার চাকতিগুলো বিছানায় ছড়াল। গুনল। বলল–মন্ত্রীমশাই আমাদের টিকিও ছুঁতে পারবে না। আমাদের কামাইটা আজ ভালোই হল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। বললাম– চলি রে।

–দাঁড়া–এই সার্টিনের থলিটা নিয়ে যা। আরোনাস বলল।

–না–না। আমি বললাম।

নিয়ে যা। অনেক কাজে লাগবে। আরোনাস বলল।

কেমন লোভ হল। জিনিসটা দেখতেও সুন্দর। থলিটা নিলাম। বাড়িতে আর আনলাম না। দোকানেই রেখে দিলাম।

–ওটাই ভুল করেছো–শাঙ্কো বলল–চুরির জিনিস রাখাও অপরাধ।

–সেটা পরে বুঝলাম।

–হুঁ। তারপর বলো। শাঙ্কো বলল।

–বেশ কিছুদিন কাটল। মন্ত্রীর বাড়িতে চুরি। হৈ-চৈ পড়ে গেল। সে সব চাপাও পড়ল।

আরোনাস মাঝে মাঝেই আসে। একটা কথা ভালোই বুঝলাম–আরোনাস পাকা চোর। আমি ওর সঙ্গে যেতে না চাইলেও ও প্রায় জোর করে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে লাগল। তখন ও বলছিল–আমি চুরি টুরি করা ছেড়ে দিয়েছি। চল্ এমনি ঘুরে টুরে আসি।

কিছুদিন গেল। আরোনাস একদিন বলল,তোর বাবা তো হীরের কাজের নাম করা কারিগর। কত রাজা-রাজড়া তাকে দিয়ে গয়নাটয়না বানায়।

–হ্যাঁ। এসব কাজে বাবার সুনাম আছে। আমি বললাম।

–শুনেছি–আট দশ মাস আগে এখানকার রাজা ব্রাপেন নাকি একটা হীরে দিয়েছে ভেঙে গয়না বানাতে।

–হ্যাঁ। ঐ কাজে এখনও আমরা হাত দিতে পারিনি।

–রাজা কী দিয়েছে? আরোনাস বলল।

–একখণ্ড তিনকোনা হীরে। ওটাই ভেঙ্গে দুটো গয়না গড়াতে হবে। আমি বললাম।

–তোর বাবা হীরেটা কোথায় রেখেছে? আরোনাস বলল।

দোকানের লোহার সিন্দুকে। আরোনাসকে আমি বললাম।

–ওটার চাবি তোর বাবার কাছেই থাকে। আরোনাস বলল।

–নিশ্চয়ই। আমি বললাম।

–উনি চাবিটা কোথায় রাখেন? আরোনাস বলল।

–সে অনেক ব্যাপার।

তার মানে? আরোনাস বলল।

–একটা ছোট্ট রুপোর শেকলের মধ্যে চাবিটা থাকে। আমি বললাম।

–সে কি। ঐ নিয়েই স্নান খাওয়া শোওয়া? আরোনাস বলল।

-হ্যাঁ। শুধু রোববার বাবা ঘুম থেকে উঠে ওটা আমাদের এক ছোট্ট যীশুর মুর্তির বেদীতে ঢুকিয়ে রাখে। আমি বললাম।

তারপর–সোমবার সকালে কোমরে পরেন। আরোনাস বলল।

–তাহলে রোববার সারা দিন রাত ওটা ঐ বেদীতেই থাকে। আরোনাস বলল।

–হ্যাঁ। কিন্তু এত কথা জানতে চাইছো কেন? আমি বললাম।

–কারণ আছে। আমার এক দাদা পেরুর রাজধানী লিসা থেকে এক খণ্ড হীরে কিনে এনেছে। আমাকে বলল–বড় দামী হীরে। বাড়িতে সিন্দুক- টিন্দুক নেই। সিন্দুক আছে এমন কারুর সঙ্গে তোর জানাশোনা আছে? আমি তোদের কথা বললাম। ঐ হীরেটা আমি তোদের সিন্দুকে রাখবো। আরোনাস বলল।

–কিন্তু বাবা বোধহয় রাজি হবেন না। আমি বললাম।

–আরে বাবা দিন পনেরোর মামলা। দাদা দিন পনেরো পরে চলে যাবে। তখন নিয়ে যাবে। আরোনাস বলল।

–ঠিক আছে। কিন্তু পনেরো দিনের মধ্যে নিতে হবে। আমি বললাম।

নিশ্চয়ই। এখন আমি বলছিলাম তুই তোর বাবাকে এই নিয়ে কিছু বলবি না। আরোনাস বলল।

-বেশ। আমি রাজি হয়ে গেলাম।

–তাহলে সামনের রোববার দুপুরে তুই চাবিটা নিয়ে আয়। হীরেটা দোকানের সিন্দুকে রেখে দেব। চাবি আগের জায়গায় রেখে আসবি। এইজন্যে আমি তোকে একটা স্বর্ণমুদ্রা দেব। আরোনাস বলল।

–বেশ। আমি বললাম।

তবে পরশু রোববার। দুপুরের সময় তোদের দোকানের সামনে আমি দাঁড়িয়ে থাকবো। আরোনাস বলল।

–বেশ। স্বর্ণমুদ্রাটা? আমি বললাম।

–কাজ সেরে দেব। আরোনাস বলল।

তানাকা থামল। তারপর আবার বলতে লাগল–সেই রোববার চাবি নিয়ে এলাম। দোকান খুলে সিন্দুকের কাছে গেলাম। সিন্দুক খুললাম। আরোনাস বলল ওপরের জানলাটা খুলে দে। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমি জানলা খুললাম। আরোনাস বলল-জানালা বন্ধ করে দে। কাজ হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম হীরেটা কত বড়? আমি জানতে চাইলাম।

-বেশি বড় না। তোদের যেটা আছে–তেমনি বড়। আরোনাস বলল।

দুজনে দোকানের বাইরে এলাম।

–তারপর? শাঙ্কো বলল।

–কী আর বলবো। তানাকার রাজা মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দেশে যান। ঐদিনের পরেই খবর পেলাম–রাজা ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে এসেছেন। শোভাযাত্রা করে রাজা প্রাসাদে ফিরলেন।

কয়েকদিন পরে সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে এলেন। দোকানে ঢুকলেন। বাবা উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে সেনাপতিকে সম্মান জানালেন। সেনাপতি বললেন– রাণিমা আগে দেওয়া হীরের খণ্ডটা থেকে গয়না করতে বলেছেন। আপনাকে কাল রাজপ্রাসাদে যেতে হবে। রাণিমা নকশা তৈরি করেছেন। সেরকম অলঙ্কারই আপনাকে করতে হবে। বাবা মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন–ঠিক আছে।

সেনাপতি কোমর বন্ধনী থেকে একটা গভীর নীল রঙের রুমাল বের করলেন। রুমালের ভাঁজ খুলে বললেন–এই হীরেটা নিন। রেখে দিন। রাণিমা পরে কিভাবে তৈরি করবেন তার নক্শা দেবেন।

বাবা আবার বললেন–ঠিক আছে।

সেনাপতি চলে গেলেন। বাবা সিন্দুক খুলে হীরেটা রেখে দিলেন। সিন্দুকটা বন্ধ করলেন। তখনও আমরা বুঝিনি আমাদের কী সর্বনাশ হয়ে গেছে।

-তারপর? শাঙ্কো বলল।

বাবা পরদিন রাজবাড়িতে গেলেন। বড় দরজার এক প্রহরী বাবাকে দেখে বলল–আপনিই তো মণিকার?

–হ্যাঁ।

রাণিমার সঙ্গে দেখা করতে চলুন। প্রহরী বাবাকে নিয়ে অন্দরমহলের কাছে নিয়ে এল। অন্দরমহলের প্রহরী বাবাকে অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল। একটু পরে ফিরে এসে বাবাকে ভেতরে নিয়ে গেল। বাবা তো অবাক হয়ে চারদিকের সাজসজ্জা দেখছিলেন। একটা ঘরে দেখলেন রাণিমা একটা সিংহমুখওয়ালা আসনে বসে আছেন। বাবাকে বসতে বললেন। বাবা একটা ছোট আসনে বসলেন। রাণিমা একজন। পরিচারিকাকে বললেননকশাটা নিয়ে আয় তো। পরিচারিকা একটা পার্চমেন্ট কাগজ নিয়ে এল। কাগজটা বাবার হাতে দিয়ে বললেন-দেখুন নকশাটা কেমন করেছি। বাবা দেখে টেখে বললেন কিছু এদিক-ওদিক করে হীরে দিয়ে করা যাবে।

–নকশা নিয়ে যান। এই নকশামত করবেন।

বাবা ফিরে এলেন। তখন দুপুর। আমি দোকান খুলে বসে আছি। বাবা এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে চাবি বের করে সিন্দুকটা খুললেন। চিৎকার করে বলে উঠলেন– রাণিমার হীরেটা কোথায়? আমি লাফিয়ে উঠলাম। ছুটে এসে দেখি আগের হীরের খণ্ডটা নেই। সেখানে একটা কাঁচের ডেলা। হাতে নিয়ে দেখে বুঝলাম কাঁচের ডেলা। বাবা তখনও চিৎকার করছেন–সর্বনাশ হয়ে গেল। রাণিমা, আমাকে ফাঁসি দেবেন। তার হীরের খণ্ডটা চুরি হয়ে গেছে।

আমি সবই বুঝলাম তখন। আরোনাসের হাত সাফাই–কোন সন্দেহ নেই। আমি বললাম–বাবা–আমি দেখছি। তুমি বাড়ি যাও। খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করো।

আমি দোকানের বাইরে এলাম। প্রায় ছুটে এলাম আরোনাসের বাড়িতে। দরজা বন্ধ। দরজায় জোরে টোকা দিলাম। এক বুড়ি হয়তো আরোনাসের মা এসে দাঁড়াল। আমি হাঁপাচ্ছি তখন। বললাম–আরোনাস কোথায়?

–তুমি কে? আরোনাসের মা বলল।

–সেসব পরে বলছি। আরোনাস কোথায় বলুন। আমি বললাম।

–আরোনাস সান্তিয়াগোতে–ওর পিসির বাড়ি বেড়াতে গেছে।

–সেই পিসির বাড়ি কোথায়? আমি জানতে চাইলাম।

–তা তো ঠিক বলতে পারবো না। আরোনাসের মা বলল।

–আপনাদের আত্মীয় তার ঠিকানা জানেন না? আমি বললাম।

–আহা–কী যেন নাম গীর্জাটার–হ্যাঁ মনে পড়েছে– নর্থ গীর্জার কাছে।

–পিসেমশাইর নাম? আমি জানতে চাইলাম।

ভিক্টর। আরোনাসের মা বলল।

–ঠিক আছে। আমি বললাম।

আমি আর বাড়ি ফিরলাম না। কোমরের ফেট্টি থেকে বেশ কয়েকটা রুপোর মুদ্রা পেলাম। এই সম্বল করে সান্তিয়াগোর দিকে চললাম।

সন্ধে হল। আমি চললাম। রাতে এক সরাইখানায় কিছু খেয়ে আবার হাঁটতে লাগলাম। সারারাত হাঁটলাম। পরদিন দুপুরবেলা সান্তিয়াগো পৌঁছলাম। খুঁজে খুঁজে নর্থ গীর্জার সামনে এলাম। কাছাকাছি একটা দর্জির দোকান পেলাম। দর্জিকে জিজ্ঞেস করলাম ভিক্টরের বাড়ি কোনটা? সে আঙ্গুল দিয়ে একটা বাড়ি দেখাল। সেই বাড়ির দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। দরজায় টোকা দিলাম। ভেতরে কোন সাড়া নেই। আবার আঙ্গুল ঠুকলাম। একটু জোরে। শব্দ করে দরজা খুলে গেল। এক মধ্যবয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। বুঝলাম–ভিক্টর।

বলল–কাকে চাই?

–তানাকায় আপনাদের কোন আত্মীয় থাকে? আমি জানতে চাইলাম।

–হ্যাঁ। ভিক্টর বলল।

–তাহলে আরোনাস তো আপনার আত্মীয়। আমি বললাম।

–হ্যাঁ। কেন বলুন তো। ভিক্টর বলল।

–পরে বলছি। আরোনাস আপনাদের কাছে বেড়াতে এসেছে। আমি বললাম।

–হ্যাঁ। ভিক্টর বলল।

–আরোনাসকে ডেকে দিন। আমি বললাম।

ভিক্টর একটা ঘরের দিকে যেতে যেতে ডাকল–আরোনাস–আরোনাস। কোন উত্তর নেই। একটা ঘরের দরজা দিয়ে মুখ গলিয়ে দেখে ফিরে দাঁড়াল। বলল– আরোনাসকে একটু আগেও আমি দেখে গেছি। ও কোথাও গেছে বোধহয়। ও নেই। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এতদূর এসে সব আশার শেষ? এটাই ভাবলাম। তবু জিজ্ঞেস করলাম–আরোনাস কোথায় যেতে পারে?

–যায় তো কয়েকটা জায়গায়। কিন্তু ব্যাপারটা কী বলুন তো। ভিক্টর বলল।

আমি আস্তে আস্তে সব কথা বললাম। তারপর বললাম–বাবার সাংঘাতিক বিপদের কথা।

আপনি কি নিশ্চিত যে আরোনাসই ঐ হীরের খণ্ডটা চুরি করেছে। ভিক্টর বলল।

–হ্যাঁ। নিশ্চিত। আপনারা জানেন না আরোনাস কত বড় চোর। আমি বললাম।

–না না এ বিশ্বাস করা যায় না। ভিক্টর বলল।

–যাক গে–আপনার বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে আমি ভাবছি না। আমি আরোনাসকে পেতে চাই। কোথায় পাবো ওকে? আমি বললাম।

–তা কী করে বলি। ভিক্টর বলল।

তবু দু-একটা জায়গা বলুন। আমি বললাম।

–গীর্জার পেছনে একটা শরীরচর্চার ঘর আছে। ওখানে ও যায়। ভিক্টর বলল।

–বেশ। আর একটা? আমি বললাম।

–মোড়ের মাথায় রুটির দোকান আছে। সেখানে ওর দু’একজন বন্ধু আছে। ভিক্টর বলল।

–ঠিক আছে। আমি বললাম।

আমি গীর্জার পেছনে এলাম। একটা ঘরও পেলাম। দেখি বেশ কয়েকজন যুবক ঘরে বাইরে দাঁড়িয়ে বসে আছে। আমি তাদের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলাম। আরোনাস নেই। তাদের কাছে আমি গেলাম। বললাম–আপনারা আরোনাসকে দেখেছেন?

এসেছিল। চলে গেছে। একজন বলল। আমার কেমন সন্দেহ হল ওরা মিথ্যে কথা বলছে। তাহলে আরোনাস জানতে পেরেছে যে আমি এসেছি। চললাম রুটি তৈরির কারখানার দিকে। পেলাম দোকানটা।

মালিক একটা উঁচু পাটাতনে বসে। কয়েকজন যুবকও বসে আছে। ওদের একবার দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম–আরোনাস কি এখানে এসেছিল?

–না। ও আসে নি। একজন বলল। আর একজন বলল–কী ব্যাপার বলুন তো? ওকে খুঁজছেন কেন?

-ও আমার বন্ধু ছিল। আমি বললাম।

বন্ধু ছিল বলছেন। এখন কি বন্ধু নয়? একজন বলল।

–না। ও চোর। বিশ্বাসঘাতক। বললাম। কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম।

তখন বিকেল হয়ে গেছে। সারাদিন না খেয়ে আছি। এবার ঠিক করলাম– ওকে পিসির বাড়িতেই ধরবো।

একটা সরাইখানায় ঢুকলাম। রূপার মুদ্রা দিয়ে খেলাম। সরাইখানায় শুয়ে রইলাম। ঠিক করলাম–একটু রাতে পিসির বাড়ি যাবো। এখন বিশ্রাম করি। শুয়ে রইলাম। দুচোখ জ্বালা করছে। ঘুম আসবে না। চুপ করে শুয়ে রইলাম। ভাবলাম একটু বেশি রাতে যেতে হবে।

রাতের খাওয়া হল। একটু শুয়ে থেকে উঠলাম। আরোনাসের পিসির বাড়ির এ দিকে চললাম।

অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে ওর পিসির বাড়ি এলাম। দরজায় আঙ্গুল ঠুকলাম। ভিতরে শব্দ হল। তারপর চুপ। এবার জোরে আঙ্গুল ঠুকলাম। সশব্দে দরজা খুলে গেল। কে আমার বুকে জোরে ধাক্কা দিল। আমি ছিটকে মাটিতে পড়লাম। এ নিশ্চয়ই আরোনাস। জ্যোৎস্নার মৃদু আলোতে দেখলাম আরোনাস ছুটে পালাচ্ছে। আমিও ওর পেছনে ছুটলাম।

ছুটতে ছুটতে চারটে রাস্তার মোড়ে এলাম। এবার ডাকলাম–আরোনাস দাঁড়া। আরোনাস দাঁড়াল না। ছুটতে লাগল। এবার আমি প্রাণপণে দৌড়ে আরোনাসের ঠিক পেছনে এলাম। এক লাফ দিয়ে ওকে ধরে ফেললাম। ঘাড়ে পিঠে জোরে দুই ধাক্কায় আরোনাসকে রাস্তায় ফেলে দিলাম। ও চিৎ হয়ে গেল। আমি ওর গলা চেপে ধরতে গেলাম। বললাম হীরে ফেরত দে। ও এক হ্যাঁচকা টানে কোমর থেকে ছোরা বের করল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। সাবধান হলাম।

তখনই দুই পাহারাদার ছুটে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–এই লোকটি আমাকে খুন করতে চাইছে। একে ধরুন। একজন পাহারাদার আরোনাসের হাতে ধরা ছোরা দিতে ইঙ্গিত করল। আরোনাস ছোরা দিল। এক পাহারাদার বলল– দুজনেই চলল।

তোমাদের কয়েদখানায় ঢোকানো হবে।

–আমি কোন দোষ করি নি। ও আরোনাস আমার হীরে চুরি করেছে। আমি হীরেটা ফেরত চাই। আমি বললাম।

–ঠিক আছে। কালকে সব শোনা যাবে। বিচারও হবে। এখন দুজনেই চল। পাহারাদার কোমর থেকে দড়ি বের করল।

তানাকা থামল। তারপর বলল–বুঝলাম আমি আরোনাসের কাছ থেকে হীরেটা উদ্ধার করতে পারব না। পাহারাদারদের কিছুতেই বোঝাতে পারবো না যে আমার হীরেটা ওই চুরি করেছে। ওটা আদায় করবার জন্যেই ওর পেছনে ছুটে এসেছি। ওকে ধরেছি। পাহারাদার কোন কথা বলল না।

তখন ভোর হয়ে এসেছে। সবাই কয়েদঘরে এলাম। পাথরের টানা বাড়ি একটা। সেই বাড়ির একটা ঘরের সামনে আমরা এলাম। লোহার দরজা একজন প্রহরী খুলে দিল। ভেতরে ঢুকলাম আমরা দুজন।

মশালের আলোয় দেখলাম শক্ত পাথরে গাঁথা দেয়াল মেঝে। দেখলাম আরও তিন-চারজন বন্দী রয়েছে। শুকনো লম্বা ঘাসের বিছানা। বিছানায় শুয়ে পড়লাম। রাত জেগেছি মাথা টন্ টন্ করছে। তানাকা বলতে লাগল–

সকাল হল। দুজন প্রহরী সকালের খাবার নিয়ে ঢুকল। প্রত্যেকের হাতে বড় পাতা দিল। দু’টো করে পোড়া রুটি আর দু-তিনরকম আনাজপত্রের ঝোল। ভীষণ খিদে। অল্পক্ষণেই খেয়ে ফেলে পাতা এগিয়ে ধরলাম। বললাম–আরো দাও। প্রহরী বলল–আর একবার পাবে। ব্যাস্।

–তাই দাও। আমি বললাম–পেট ভরে খেলাম।

একটু বেলায় প্রহরীদের ওপরওয়ালা এল। মুখে গোঁফ দাড়ি। প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করল–তুই কে? আমি আমার কথা বললাম। তারপরে সবাইকে জিজ্ঞেস করল–বাড়ি কোথায়। প্রহরীরা সকলের অপরাধের কথা বলল। ওপরওয়ালা গোঁফ চুলকে বলল–দেখছি চারজনের বাড়ি তানাকায়। ঐ চারটাকে হাতে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাবি তানাকা সীমান্তে। ওদের তানাকার পাহারাদারদের হাতে তুলে দিবি। দেখিস পালিয়ে না যায়। আমি বললাম আমার একটা আর্জি ছিল।

-বল্। ওপরওয়ালা ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাল। আরোনাসকে দেখিয়ে বললাম–এই লোকটা আরোনাস আমাকে বোকা বানিয়ে একটা হীরের খণ্ড চুরি করেছে।

বলো কি। তা হীরে পেলি কোথায়? বড় পাহারাদার জানতে চাইল।

–আমার বাবা হীরের গয়নাগাঁটি তৈরি করে। আমি বললাম।

–ও। তা এসব বিচার তোদের দেশের রাজা করবে। তোদের বিচারের ঝামেলা আমরা নেব না।

প্রহরীদের কর্তা চলে গেলেন।

-তারপর? শাঙ্কো বলল।

ঝড়বৃষ্টির মধ্যে পালালাম। এবার আমার একটাই চিন্তা বাবার কোন বিপদ হয়নি তো?

শাঙ্কো বলল–এখন কী করবে?

–অপেক্ষা করবো। আরোনাস মুক্তি পেলেই ওকে ধরে হীরের খণ্ড আদায় করে ছাড়বো।

শেষ বিকেলে শাঙ্কোরা প্যারাইসে পৌঁছল। হৈ হৈ করে জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস হাসিমুখে এগিয়ে এল। সবাইকে নির্বিঘ্নে ফিরতে দেখে ফ্রান্সিস খুশি। মারিয়াকে বলল–কোন সমস্যায় পড়োনি তো?

না না। মারিয়া হেসে বলল। ফ্রান্সিস তানাকাকে দেখে বলল–এই যুবক কে?

–আমি সব বলছি। তার আগে বিকেলের খাবারটা খেয়ে নিই তানাকা বলল।

–ঠিক–ঠিক। আমি একটু বেশি কৌতূহল দেখিয়ে ফেলেছি। তোমরা খেয়ে নাও। ফ্রান্সিস বলল। তারপর রসুই ঘরে গিয়ে রাঁধুনি বন্ধুদের বলল–একটু তাড়াতাড়ি খাবার তৈরি কর। শাঙ্কোরা খুব ক্ষুধার্ত।

শাঙ্কোরা অনেকেই হ্যারির ঘরে এসে হ্যারিকে দেখে গেল। হ্যারি এখন একেবারে সুস্থ। বন্ধুদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করল। সকলেই খুশি হল হ্যারির অসুখ সেরে গেছে।

ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডেকে পাঠাল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এল। ফ্রান্সিস বলল–তানাকাকে ডেকে আনো। শাঙ্কো তানাকাকে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস তানাকাকে বিছানায় বসতে বলল। মারিয়া বিছানার কোনায় বসল। ফ্রান্সিস বলল–তানাকা তোমার পরিচয় দিয়ে বল তুমি আমাদের কাছে আশ্রয় নিচ্ছো কেন। তানাকা শাঙ্কোকে যা বলেছিল তাই বিস্তারিত বলল।

ফ্রান্সিস বলল–তুমি কি নিশ্চিত যে আরোনাসই হীরের খণ্ডটা চুরি করেছে?

-হ্যাঁ। এতে কোন ভুল নেই।

–হীরের খণ্ডটা নেই এটা প্রথমে কে দ্যাখে। তুমি না তোমার বাবা? ফ্রান্সিস বলল।

–বাবা। রাণিমার গয়না তৈরি করবে বলে বাবা সিন্দুকটা খোলেন। তখনই দেখলেন হীরের খণ্ডটা নেই।

–হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। পরে বলল–তানাকা আমি আর শাঙ্কো তোমাদের দেশে যাবো। অন্য কিছু দেশেও যাবো। একটু থেমে বলল–অন্য দেশেরও রাণিরা রাজকুমারীরা নিশ্চয়ই তোমার বাবার কাছে গয়না গড়াতে দেন।

-হ্যাঁ হ্যাঁ।

–তাই তোমাদের দেশে আগে যাবো। কিছু খোঁজখবর করবো। তারপর অন্য দেশে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।

–ফ্রান্সিস এতো মাস দুয়েকের ধাক্কা। শাঙ্কো বলল।

–না-না। অত সময় লাগবে না। ফ্রান্সিস বলল।

মারিয়া বলল–অত খোঁজখবরের কী দরকার?

দরকার আছে। যাক গে–শাঙ্কো কালকে দুটো ঘোড়া ভাড়া করতে হবে। আমরা কয়েকটা জায়গায় যাবো।

–আমি আপনাদের সঙ্গে তানাকা যেতে চাই। তানাকা বলল।

–ঠিক আছে। তোমার বাবার দোকানটা দেখা যাবে।

আমাদের বাড়িটাও দেখতে পারবেন। তানাকা বলল।

–না। তোমাদের দোকানটাই দেখতে হবে। ভালো কথা-তোমাদের দোকানে। যে সিন্দুকটা আছে তোমার বাবা ঐ সিন্দুকেই তো সব হীরে জহরত রাখতেন।

–হ্যাঁ। বাড়িতে কোথাও রাখতেন না। তানাকা বলল।

–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।

সকালের খাবার খেয়েই তিনজনে জাহাজ থেকে নামতে তৈরি হল। মারিয়া একপাশে দাঁড়িয়েছিল। ফ্রান্সিস মারিয়ার কাছে গেল। নিম্নস্বরে বলল–কোন চিন্তা করো না। আমরা দুজনে অক্ষত দেহে ফিরে আসবো। মারিয়া মুখ নিচু করল। কোন কথা বলল না।

জাহাজঘাটার কাছে একটা মাঠ মত। সেখানে দুটো ঘোড়া একটা চেস্টনাট গাছের সঙ্গে বাঁধা। একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। শাঙ্কো ঐ লোকটার কাছে এল। ফ্রান্সিসরাও এল। শাঙ্কো লোকটিকে একটা সোনার চাকতি দিল। আঙুল দিয়ে নিজেদের জাহাজটা দেখিয়ে বলল–দিন পাঁচ সাত পরে ঐ জাহাজে আমাদের পাবে। ঘোড়া দুটো এই গাছের সঙ্গেই বেঁধে রাখবো। ফ্রান্সিসরা আর দেরি করল না। তিনজনে ঘোড়ায় চড়ল। আরোনাস শাঙ্কোর ঘোড়ায় উঠল। ওরা ঘোড়া ছোটাল।–তানাকা দেশের উদ্দেশ্যে।

রোদের তেজটা একটু কম। ফ্রান্সিসদের খুব একটা কষ্ট হল না।

দুপুরে একটা ছোট গ্রামে এল। ফ্রান্সিস ঘোড়া থামাল। শাঙ্কো বলল–থামলে কেন?

–দুপুর হল। কিছু তো খেতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

–দেখা যাক কোন বাড়িতে খাবার জোটে কিনা? এখানে তো আর সরাইখানা নেই। শাঙ্কো বলল।

সামনে একটা বাড়ি দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল–আগে এই বাড়িটায় চলো।

তিনজনে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসই বন্ধ দরজায় টোকা দিল। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিস বলল–দেখুন আমরা প্যারাইসো বন্দর শহর থেকে আসছি। যাবো তানাকা। এত বেলায় খুবই ক্ষুধার্ত আমরা। যদি কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করেন।

নিশ্চয়ই। আসুন–আসুন। বয়স্ক মানুষটি দরজার পাল্লাটা আরো খুলে বলল।

তিনজনে ভেতরে ঢুকল। পাটাতনের ওপর শুকনো ঘাসপাতার বিছানা। তিনজনেই বসল। ততক্ষণে দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ে ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসদের দেখছে। ফ্রান্সিস একটা বাচ্চা মেয়েকে ডাকল। যা তোক একটু সাহস করে মেয়েটি ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস নাম জিজ্ঞেস করল। নাম বলল মেয়েটি। মেয়েটির ভাইও সাহস পেয়ে এগিয়ে এল।

তখনই বাড়ির কর্তী এল। বলল–আপনারা এসেছেন আমাদের বাড়িতে এটা অত্যন্ত আনন্দের। কিন্তু আমাদের তো দুপুরের খাওয়া হয়ে গেছে কাজেই আপনাদের জন্যে রাঁধতে হবে। কিছু দেরি হবে।

–কোন সমস্যা নেই। আমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করবো। ফ্রান্সিস বলল। কত্রী ছেলেমেয়েকে নিয়ে চলে গেল।

ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বলল–এতক্ষণ ঘোড়ায় চড়ে হাতপায়ে খিল ধরে গেছে। শাঙ্কোও শুয়ে পড়ল। তানাকা বসে রইল।

শেষ বিকেলে ফ্রান্সিসদের খেতে দেওয়া হল। তিনজনেই তখন ক্ষুধায় কাতর। পাতে খাবার পড়তেই খেয়ে নিল ফ্রান্সিসরা। খাওয়া শেষ। কী এসে বলল আপনাদের পেট ভরেছে তো?

–হ্যাঁ-হ্যাঁ। বোধহয় একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছি। শাঙ্কো বলল।

আবার ফ্রান্সিসরা ঘোড়ায় উঠল। ঘোড়া চলল তানাকার দিকে।

বেশ রাতে তানাকা পৌঁছল। তানাকা বলল–এই রাতে আর কোথায় যাবেন? আমাদের বাড়িতেই চলুন। ফ্রান্সিস বলল–বেশ চলো।

তানাকাদের বাড়ির সামনে এসে ওরা ঘোড়া থেকে নামল।

তানাকা এগিয়ে গেল। দরজায় ধাক্কা দিল। কয়েকবার ধাক্কা দেওয়া হল। একটি নারীকণ্ঠ শোনা গেল-আসছি।

একটু পরেই দরজা খুলে গেল। স্ত্রীলোকটির হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি। তানাকা বলল–মা-বাবা কেমন আছে?

–ভেতরে আয় বলছি। কিন্তু এঁরা কারা? তানাকার মা বলল।

–আমার বন্ধু। বিদেশি। রাতে খাবে থাকবে। তানাকা বলল।

–ও। আয়।

মোমবাতির আলোয় ছোট উঠোনমত পার হল। সামনে ঘর দেখল। তানাকা ঘরের দরজা খুলল। মার হাত থেকে মোমবাতিটা নিয়ে উঁচু পাটাতনে রাখল। ফ্রান্সিস শাঙ্কো কাঠের পাটাতনে বসল। তানাকা বলল–আপনাদের খাওয়ার এ ব্যবস্থা দেখি। ঘোড়াদুটোকেও তো খাওয়াতে হবে। তানাকা বেরিয়ে গেল।

এবার ফ্রান্সিস নিম্নস্বরে বলল শাঙ্কো–একটা ব্যাপারে আমার সন্দেহ যাচ্ছে না।

–কোন ব্যাপারে? শাঙ্কো বলল।

–তানাকার বাবা মনে হয় সৎ ব্যবসায়ী নয়। তবে এটা এখনো আমার অনুমান। এখন কয়েকটা দেশে যেতে হবে। বাবার মানে তানাকার বাবা আর কোন কোন রাজ্য থেকে হীরের গয়না গড়িয়ে দেবার নির্দেশ পেয়েছিলেন এটা জানলেই সিদ্ধান্তে আসা যাবে।

তানাকা ঘরে ঢুকল। বলল–মা রান্না বসিয়ে দিয়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রান্না হয়ে যাবে।

ফ্রান্সিস বলল–তানাকা তোমাদের দোকান তো বাজার এলাকায়।

–হ্যাঁ।

কালকে একবার দেখবো। ফ্রান্সিস বলল।

–বেশ তো। একটু থেমে তানাকা বলল–এই তানাকা রাজ্যের রাজা বাবাকে বন্দী করে রেখেছে। রাণিমা বলেছেন–যেখান থেকে তোক হীরে জোগাড় করে গয়না গড়িয়ে দিতে হবে। তানাকা বলল।

কিন্তু তোমার বাবাকে মুক্তি না দিলে উনি কী করে গয়না গড়বেন? ফ্রান্সিস বলল।

–সেসব কথা বলতেই কাল রাজসভায় যাবো। তানাকা বলল।

–বেশ। আমরাও যাবো। ফ্রান্সিস বলল।

–আপনারা কেন যাবেন? তানাকা জানতে চাইল।

–সেনাপতির সঙ্গে কিছু কথা আছে। ফ্রান্সিস বলল।

–ও। তানাকা মুখে শব্দ করল।

পরের দিন সকালে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো রাজসভায় গেল।

-বাবার মুক্তির ব্যাপারে কিছু বলবেন না? তানাকা বলল।

–না। আগেই নয়। পরে। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো রাজসভায় এল। বেশ ভিড়। রাণী একটা কাঠের সিংহাসনে বসে আছেন। বিচার চলছে। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস সেনাপতিকে আগেই দেখেছে। তক্কে তক্কে রইল কখন সেনাপতি রাজসভার বাইরে আসে।

কিছু পরেই হঠাৎ সেনাপতি রাজসভার বাইরে এলেন। সৈন্যাবাসের দিকে চললেন। ফ্রান্সিস প্রায় ছুটে সেনাপতির কাছে এল। সেনাপতি দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন–কী ব্যাপার।

মাননীয় সেনাপতি–আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।

–তোমাদের দেখে তো মনে হচ্ছে-বিদেশি। সেনাপতি বলল।

–হ্যাঁ। আমরা ভাইকিং। একটা কথা জানতে এলাম। ফ্রান্সিস বলল।

–বলো। সেনাপতি বলল।

–বার্বার যিনি রাণীর গয়নাগাঁটি গড়েন তিনি রাণীর পাঠানো হীরে হারিয়ে ফেলেছেন। ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। কঠোর শাস্তি হবে বার্বারের। সেনাপতি বলল।

–আচ্ছা বার্বার কি এর আগেও হীরের খণ্ড হারিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। আবার হারানো রাণীমা খুব রেগে গেছেন। সেনাপতি বলল।

–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।

তখনই পেছন থেকে তানাকা ছুটে এল। সেনাপতিকে বলল–মাননীয় সেনাপতি। বার্বার আমার বাবা। তাকে কি মুক্তি দেওয়া হবে না?

–এখন না। কিছু শাস্তি ভোগ করুক আগে। সেনাপতি বললেন।

–বাবা হীরেটা হারিয়ে ফেলেছেন। তানাকা বলল।

–ওসব বলে পার পাওয়া যাবে না। রাণিমা রেগে আগুন হয়ে আছেন। বাবার যে হীরের খণ্ডটা কিভাবে হারাল–এটাই আমরা বুঝতে পারছি না।

সেনাপতি আর কিছু বললেন না। সৈন্যাবাসের দিকে হাঁটতে লাগলেন। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনজনেই ফিরে আসছে তখন ফ্রান্সিস বলল–তানাকা তোমাকে আসতে মানা করেছিলাম।

–বাবার জন্যে আমার চিন্তা হয় না? আমি চুপচাপ বসে থাকতে পারি? তানাকা বলল।

-তোমার বাবার খবরও আমি নিতাম। ফ্রান্সিস বলল–যা গে–তুমি আমার ঘোড়া দুটোকে জল আর খাবার দিয়েছো?

-হা-হা-দিয়েছি। আপনাদের ঘোড়া দুটি এখন তরতাজা। তানাকা বলল।

–হু। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল।

রাজবাড়ির কাছে এসে ফ্রান্সিস বলল-চলো তোমাদের দোকানটা দেখবো।

চলুন।

বাজার এলাকায় এল ওরা। দোকানপাট পার হয়ে চলল। একটা বন্ধ দোকানের সামনে এসে তানাকা বলল–এটাই আমাদের দোকান। দোকানের দরজায় তালা লাগানো। ফ্রান্সিস বলল–তানাকা দোকানের চাবিটা কই?

–বাবার কাছে।

–তাহলে দোকান খুলবে কী করে?

–দোকানের পেছনে একটা ছোট্ট দরজা আছে। ওটার চাবি আমার কাছে। আছে। চলুন পেছনের দরজা দিয়েই ঢুকবো।

তিনজনে দোকানের পেছনে এল। ফ্রান্সিস দেখল একটা ছোট্ট দরজা। দরজায় তালা ঝুলছে।

–তানাকা ফ্রান্সিস বলল–এই দরজাটা বোধহয় বেশি ব্যবহার করা হয় না।

–হ্যাঁ। এই দরজা দিয়ে যাওয়া আসা খুব কমই হয়। তানাকা বলল।

দরজাটা খোলো। ফ্রান্সিস বলল।

তানাকা কোমর থেকে চাবির গোছা বের করল। খুঁজে খুঁজে পেছনের দরজাটার চাবিটা বের করল। তালায় চাবিটা ঢোকালো। মোচড় দিতেই দরজাটা খুলে গেল।

তিনজনে ঢুকল। ঘরটায় দুপুরের আলো আঁধারি। সামনের ঘরে এল। ফ্রান্সিস সিন্দুকটা দেখল। বেশ বড়। ভারি লোহায় তৈরি।

ফ্রান্সিস সিন্দুকটার চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখল। বলল—এই সিন্দুকের চাবিটা তো তোমার কাছে নেই।

–না। তানাকা মাথা এপাশ-ওপাশ করল।

–হুঁ। ফ্রান্সিস ভালো করে চারদিক তাকিয়ে দেখল।

–একটা কথা। তোমার এক বন্ধু আছে। সে নাকি তোমাকে বোকা বানিয়ে সিন্দুক থেকে হীরে চুরি করেছে। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যাঁ। আরোনাস যে একটা পাকা চোর আমি সেটা বুঝতে পারিনি। তানাকা বলল।

–তুমি ওর খোঁজ পেয়েছো? ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। পেয়েছি। সান্তিয়াগোর কয়েদঘরে আমরা দুজনেই ছিলাম। কিন্তু কী করবো? হাতে তো কোন অস্ত্র নেই। তাই ওকে খুন করতে পারি নি। তানাকা বলল।

–বলো কি। খুন করতে চেয়েছিলে? শাঙ্কো বলল।

–হ্যাঁ। কিন্তু ভেবে দেখলাম ওকে মেরে ফেললে হীরেটার কোন খোঁজই পাওয়া যাবে না। এখানকার কয়েদঘর থেকে যেদিন ছাড়া পাবে সেইদিনই ওকে চেপে ধরবো হীরের খণ্ড কোথায় রেখেছিস্ বল্। আদায় করে ছাড়বো। তানাকা বলল।

-বুঝলাম। সে তো ওকে দেখতে পারলে। তার আগে আরোনাসের বিরুদ্ধে তুমি রাজার কাছে বিচার চাও। দ্যাখো কী হয়। আরোনাস তো কয়েদঘরেই আছে। প্রহরীদের ওকে খুঁজে বেড়াতে হবে না। ফ্রান্সিস বলল।

–দেখি। তানাকা মাথা নাড়ল।

ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। পেছনের দরজা দিয়ে তিনজনে বেরিয়ে এল।

তানাকার বাড়িতে এল। ফ্রান্সিস তানাকাকে বলল–ঘোড়া দুটোকে একটু দানাপানির ব্যবস্থা করো।

–ভাববেন না। সে সব দেখা হবে। তানাকা বলল।

রাতে খেয়েদেয়ে ফ্রান্সিস, শাঙ্কো শুয়ে পড়ল।

শাঙ্কো বলল–তুমি ঠিক কী করতে চাইছো?

ফ্রান্সিস বলল–বাবার কোন কোন রাজবাড়িতে হীরের গয়না করার নির্দেশ পেয়েছিল সেই রাজবাড়িতে যাবো। রাণীমাদের কাছে হারিয়ে গেছে, চুরি হয়ে গেছে বলে কান্নাকাটি করে পার পেয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বার্বার মানে তানাকার বাবা হীরের খণ্ড চুরি করেছে। এই ব্যাপারটা যাচাই করে দেখবো।

–এতে বার্বার তো আরো বিপদে পড়বে। শাঙ্কো বলল।

–উপায় কি। চোরের চোরামি তো মেনে নেওয়া যায় না। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। এখন তুমি সবদিক দেখে শুনে এগোও। শাঙ্কো বলল।

পরদিন। সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ঘোড়া ছোটাল সান্তিয়াগোর দিকে। পথে এক চাষীর বাড়িতে আশ্রয় নিল। খেল। তারপর আবার ঘোড়া ছোটাল।

শেষ বিকেলে সান্তিয়াগোতে পৌঁছল। ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে ফ্রান্সিসরা দেখল বেশ বড় নগর। রাস্তাঘাটে বেশ লোকজনের ভিড়। যেতে যেতে একটা সরাইখানা দেখল। ঘোড়া থামাল। দুজনে ঘোড়া থেকে নামল। সরাইখানার দিকে চলল। সরাইওয়ালা হাসিমুখে বারবার বলতে লাগল–আসুন–আসুন।

–ঘোড়ার খাবার জল দানা পাওয়া যাবে তো? শাঙ্কো বলল।

–হ্যাঁ। কত লোক ঘোড়ায় চড়ে আসে। সব ব্যবস্থা আছে আমার। সরাইওয়ালা কাকে ডাকল। দেখা গেল একটি কিশোর এগিয়ে এল। সরাইওয়ালা বলল–ঘোড়া দুটো নিয়ে যা। দানাপানি খাওয়া। কিশোরটি বেশ অভ্যস্ত হাতে ঘোড়া দুটোকে পেছনে নিয়ে গেল।

ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় ঢুকল। খিদে, ক্লান্তি।

পাটাতন পাতা। তার ওপর শুকনো ঘাসপাতার বিছানা। দুজনেই শুয়ে পড়ল। দুজনেই চুপ করে শুয়ে রইল।

কিছু পরে সেই তরুণ ছেলেটি দুটো কাঠের থালায় বিকেলের খাবার নিয়ে ঢুকল। ফ্রান্সিস ও শাঙ্কোর হাতে থালা দিয়ে চলে গেল।

ফ্রান্সিস খেতে খেতে বলল–আজকের দিনটা কাজে লাগাতে পারলাম না। কাল সকালে কাজে নামতে হবে। ওরা শুয়ে এসব কথাবার্তা বলছে তখন চার-পাঁচজন লোক চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে সরাইখানায় ঢুকল। প্রত্যেকের কোমরেই তরোয়াল গোঁজা। ওরা ফ্রান্সিসদের শুয়ে থাকা দেখল। একজন ঝুঁকে পড়ে ফ্রান্সিসদের দেখল। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–আরে–দুটোই বিদেশী ভূত। সবাই হৈ হৈ করে উঠল। ফ্রান্সিস বা শাঙ্কো কোন কথা বলল না। একজন এগিয়ে এসে বলল–তোরা এখানে শুয়ে আছিস কেন? এটা আমাদের জায়গা। ফ্রান্সিস বললশাঙ্কোসরে এস। দুজনেই বেশ সরে গেল। ওরা কেউ বসল, কেউ শুয়ে পড়ল। একজন ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–তোদের দেশ কোথায় রে?

আমরা ভাইকিং। শাঙ্কো বলল।

–তাহলে তোরা তো জলদস্যু।

ফ্রান্সিস লোকটার কথা শেষ হওয়ামাত্র তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। তরোয়াল কোষমুক্ত করল। দাঁতচাপা স্বরে বলল–ঐ কথাটা ফিরিয়ে নাও।

শাঙ্কোও উঠে দাঁড়াল। তরোয়াল খুলল। যে লোকটা জলদস্যু বলেছিল সে ফ্রান্সিসদের এই রূদ্ররূপ দেখে বেশ ভয়ই পেল। ওর বন্ধুরাও দুজন তরোয়াল খুলল। ফ্রান্সিস বলল–কথাটা ফিরিয়ে নাও। বললো যে আমি ভুল বলেছি। বলো। ঐ লোকটা চুপ করে রইল। ওর কথার জন্যে এরকম একটা কিছু হবে ও ভাবতে পারে নি। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–একজন একজন করে আয়। আজ তোদের সবাইকে নিকেশ করবো। একজন তরোয়াল তুলে সামনে এল। ফ্রান্সিস ওর তরোয়ালে নিজের তরোয়ালটা এত জোরে ঘা মারল যে লোকটার হাত থেকে তরোয়ালটা ছিটকে গেল। লোকটা হাঁ মুখে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস অনায়াসে লোকটার কাঁধে তরোয়ালের কোপ বসাতে পারতো কিন্তু ফ্রান্সিস তা করল না। অন্যজন তরোয়াল নিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে এল। শাঙ্কো তার মোকাবিলা করল। শাঙ্কো দ্রুতগতিতে ঐ লোকটার হাতের কব্জিতে তরোয়াল দিয়ে ঘা মারল। ওর হাত থেকে তরোয়াল খসে পড়ে গেল। শাঙ্কো তরোয়াল তুলতে গিয়েও তুলল না।

সরাইখানার মালিক ছুটে এল। দুহাত তুলে বলল–আপনারা এভাবে মারামারি করবেন না। আমার দোকানের বদনাম হবে।

অন্য লোকগুলো চুপ করে বসে রইল। ফ্রান্সিস তখনও তরোয়াল কোষবদ্ধ করেনি। দাঁতচাপা স্বরে বলল–যে লোকটা আমাদের বদনাম দিয়েছো সে এগিয়ে এসো। তরোয়াল আনো। লোকটা বুঝল এ বড় কঠিন ঠাই। এঁটে ওঠা যাবে না। লোকটা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–ঠিক আছে–ঠিক আছে। আমি কথাটা ফিরিয়ে নিচ্ছি।

–পথে এসো। কথাটা বলে ফ্রান্সিস তরোয়াল কোষবদ্ধ করল। সরাইওয়ালা তখনও বলে চলেছে–এখানে খুন-টুন হলে আমার দোকানের বদনাম হবে। আপনারা শান্ত হোন। ওদের মধ্যে একজন বলল–ঠিক আছে–আর কিছু হবে না। সরাইওয়ালা মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল। লোকগুলোও শান্ত হল। থেকে থেকে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল।

পরদিন সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো রাজার দরবারে এল। রাজবাড়িটা প্রাসাদের মত। ওরা দেখল দরজায় দাড়ি গোঁফওয়ালা একজন প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে পেতলের বর্শা। বশার মুখটা লোহার।

ফ্রান্সিসরা দরজা পার হতে যাচ্ছে তখনই একজন প্রহরী এগিয়ে এল। বলল তোমাদের দেখে তো বিদেশি বলে মনে হচ্ছে।

-হ্যাঁ। আমরা বিদেশি। আমরা ভাইকিং। শাঙ্কো বলল।

–এখানে এসেছো কেন? প্রহরী জিজ্ঞেস করল।

মাননীয় সেনাপতির সঙ্গে দেখা করবো। শাঙ্কো বলল।

–কেন? প্রহরী বলল।

কথা আছে। শাঙ্কো বলল।

–কী কথা? প্রহরী জানতে চাইল।

–সেটা সেনাপতিকেই বলবো। ফ্রান্সিস বলল।

-বেশ। প্রহরীটি ভেতরের দিকে মুখ তুলে বলল-রবিন–এখানে শোন। অন্য একজন প্রহরী এগিয়ে এল। বলল–কী হয়েছে?

–এই দুজন বিদেশি সেনাপতির সঙ্গে দেখা করবে। তুই একটু নিয়ে যা। রবিন ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–এসো।

প্রহরীটি ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোকে রাজসভার কাছে নিয়ে এল। বেশ কিছু বিচারপ্রার্থী জড়ো হয়েছে। রাজামশাই সিংহাসনে বসে আছেন। বিচার চলছে। রাজার একপাশে মন্ত্রী অমাত্যরা বসে আছেন। অন্য পাশে সেনাপতি আর দু-একজন উচ্চপদাধিকারী। রবিন আঙ্গুল দেখিয়ে সেনাপতিকে দেখাল। বলল- উনিই সেনাপতি। সভার কাজ হয়ে গেলে কথা বলবেন। তবে একটা কথা বলে রাখি সেনাপতি কিন্তু ভীষণ রগচটা। চটে গিয়ে এর আগে বেশ কয়েকজনকে চড় মেরেছেন।

রবিন চলে গেল।

ফ্রান্সিসরা সভার কাজকর্ম দেখতে লাগল। কতক্ষণে সভা শেষ হবে তার চিন্তা।

সভার কাজ চলল।

প্রায় ঘণ্টা তিনেক পরে সভা শেষ হল।

রাজা অন্দরমহলে চলে গেলেন। লোকজন বেরিয়ে আসতে লাগল। মন্ত্রী অমাত্যরা বেরিয়ে আসতে লাগলেন। সেনাপতিও আসছিল। ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। মাথা একটু নুইয়ে সেনাপতির সামনে দাঁড়াল। সেনাপতি ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোকে দেখে বললেন-দেখে তো মনে হচ্ছে তোমরা এই রাজ্যের মানুষ না।

–ঠিকই ধরেছেন। আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।

–হু। শুনেছি তোমরা খুব সাহসী যোদ্ধা। জাহাজ চালনায় দক্ষ। সেনাপতি বলল।

–আপনি ঠিকই শুনেছেন। ফ্রান্সিস বলল।

–আমার কাছে কেন? সেনাপতি জানতে চাইলেন।

–একটা খবর জানতে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।

–কী খবর?

–এখানকার রাণিমা কি কখনও তানাকার একজন বিখ্যাত হীরের মণিকার বার্বারের কাছ থেকে হীরের গয়না করিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।

–আমি কি অন্দরমহলের খবর রাখি নাকি। সেনাপতি বললেন।

–না–মানে, যদি জানেন–ফ্রান্সিস বলল।

–আমি এসবের কিছুই জানি না। সেনাপতি মাথা এপাশ-ওপাশ করে বলল।

–মানে বলছিলাম–ফ্রান্সিস বলতে গেল।

–এবার গালে চড় মারবো। বেরো, এখান থেকে। সেনাপতি ক্ষেপে গিয়ে বলল। তারপর চলে গেলেন।

ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না।

শাঙ্কো বলল–এই খবরটা অন্য কার কাছ থেকে পাবো?

–সেটাই ভাবছি। দাঁড়াও–একবার প্রহরী রবিনকে বলে দেখি। ফ্রান্সিস বলল।

প্রধান প্রবেশপথের সামনে রবিনকে পাওয়া গেল।

ফ্রান্সিস বলল–ভাই রবিন তোমার কাছ থেকে একটা খবর জানতে চাই।

–কী খবর? রবিন বলল।

–অন্দরমহল থেকে একটা খবর এনে দিতে পারো? ফ্রান্সিস বলল।

চেষ্টা করে দেখতে পারি। রবিন বলল।

ব্যাপারটা হল তানাকায় একজন নামকরা জহুরী আছে। নাম বার্বার। এখানকার রাণিমা তাকে কোন হীরের গয়না গড়তে দিয়েছিলেন কিনা। ফ্রান্সিস বলল।

–যদি খবরটা আনি তাহলে আমাকে কী দেবে? রবিন হেসে বলল।

–একটা সোনার চাকতি। ফ্রান্সিস বলল।

–দেখি চেষ্টা করে। রবিন বলল।

–আর একটা খুব দরকারি খবর চাই এইসঙ্গে। ফ্রান্সিস বলর।

–কী খবর? রবিন বলল।

–বার্বার রাণিমার দেওয়া হীরের খণ্ড হারিয়ে ফেলেছিল কিনা। ফ্রান্সিস বলল।

–এটা আবার কী খবর! রবিন বলল।

–খবরটা আমাদের খুব প্রয়োজন। ফ্রান্সিস বলল।

–বেশ। রবিন বলল।

রবিন সভাঘর ছাড়িয়ে অন্দরমহলের দিকে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পরে রবিন ফিরে এল। সঙ্গে আর একজন প্রহরী। রবিন বলল–ও অন্দরমহলে রাণিমার ফাইফরমাস খাটে। ও ব্যাপারটা জানে বলল। সেই প্রহরীকে ফ্রান্সিস বলল–ভাই একটা খুব দরকারী কথা জানতে চাইছি।

কী দরকারী কথা? প্রহরী বলল।

–তানাকা দেশে বার্বার নামে একজন জহুরী আছে। হীরের গয়না গড়তে খুব ওস্তাদ। তাকে দেখেছো? ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। তানাকা থেকে আসতো। আমি রাণিমার কাছে নিয়ে গেছি। প্রহরী বলল।

–হ্যাঁ। এখন জানতে চাইছি বার্বারকে গয়না গড়ার জন্যে যে হীরের খণ্ডটা দেওয়া হয়েছিল সেটা কি বার্বারের কাছে হারিয়েছিল অথবা চুরি হয়েছিল? ফ্রান্সিস বলল।

– হ্যাঁ- হ্যাঁ-এরকমই ব্যাপারটা হয়েছিল। বাবার কেঁদেকেটে বলেছিল হীরের খণ্ডটা হারিয়ে গেছে। যা হোকরাণিমা কিছু বলেন নি। নতুন হীরের খণ্ড দিয়েছিলেন। প্রহরী বলল।

–এটাই জানতে চাইছিলাম। ভাই অনেক ধন্যবাদ। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কোর দিকে তাকাল। শাঙ্কো কোমর থেকে একটা সোনার চাকতি বের করল।

ফ্রান্সিস বলল–দুজনকে দুটো দাও। শাঙ্কো আর একটা সোনার চাকতি বের করল। প্রহরী দুজনকে দিল। দুই প্রহরীই খুশি।

রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল দুজনে। ঘোড়ায় চড়ে উঠল। নেমে সরাইখানায় এল। দেখল সেই গুণ্ডার দল চলে গেছে।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিসরা শুতে এল।

ফ্রান্সিস বলল–ধারে কাছে কোন কোন রাজ্য আছে তা জানতে হবে। তানাকার কাছে দুটো নাম পেয়েছিলাম। সে তো দেখাও হল–জানাও হল। এবার আরো কয়েকটা দেশের নাম জানতে হবে। ভালো কথা। সরাইওয়ালাই বলতে পারবে। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। সরাইওয়ালার কাছে এল। সরাইওয়ালা আলো জ্বেলে মাথা। নিচু করে মুদ্রা গুনছিল।

ফ্রান্সিস বলল–একটা কথা বলছিলাম।

-বলুন। সরাইওয়ালা মুখ তুলে হেসে বলল।

—-ধারে কাছে কয়েকটা দেশের নাম কী?

–ঐ তো কাকোয়াম্বো লা সেরিনা। সরাইওয়ালা বলল। ফ্রান্সিস ওকে জিজ্ঞেস করে রাজ্য দুটিতে যেতে হলে কোন দিকে যেতে হবে এসব ভালো করে জেনে নিল।

পরের দিন সকালের খাবার খেয়ে দুজনে ঘোড়ায় উঠল। দিক ঠিক করে ঘোড়া ছোটাল।

দুপুর হল। গরম হাওয়া ছুটেছে।

জলতেষ্টা পেয়েছে, খিদেও পেয়েছে। এবার খাবার জোগাড় করতে হয়। একটা গ্রামমত দেখল। কয়েকটা পাথরের বাড়ি। ঘোড়া থামালো।

ফ্রান্সিস বলল-চলো দেখা যাক।

একটা বাড়ির বাইরের ঘরে গাছের ডাল দিয়ে তৈরি দরজা খোলা। শাঙ্কো খোলা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। দেখল একজন বৃদ্ধ একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে ঘাসপাতায় তৈরি বিছানায় বসে আছে। শাঙ্কোকে দেখে বৃদ্ধটি বলল–আপনি কে? কি চান? শাঙ্কো বলল–আমরা বিদেশি। লা মেরিনা দেশে যাবো। আমরা খুবই। ক্ষুধার্ত। যদি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেন তাহলে আমাদের খুবই উপকার হয়।

–নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। বৃদ্ধ ছেলেটিকে কোলে নিয়ে বলল–আপনারা বসুন। বাড়ির মেয়েদের বলছি। বৃদ্ধ একটু গলা চড়িয়ে বোধহয় কাউকে ডাকলেন। একটি বৌ ঢুকল। বাচ্চাটি প্রায় লাফিয়ে মেয়েটির কোলে গেল। বোঝাই যাচ্ছে বৌটি বৃদ্ধের ছেলের বৌ। বৃদ্ধটি এবার বলল–এঁরা দুজন লা মেরিনা যাবেন। এখানে তো আর সরাইখানা নেই। কাজেই ক্ষুধার্ত দুজন আমাদের এখানে খেতে চাইছেন। বৌটি ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোর দিকে তাকাল। বলল–আমাদের তো খাওয়া হয়ে গেছে। আপনাদের জন্যে বেঁধে দিচ্ছি। আপনারা বসুন। আমরা তাড়াতাড়ি বেঁধে দিচ্ছি। ফ্রান্সিস বাচ্চাটার দিকে দুহাত বাড়াল। আশ্চর্য। বাচ্চাটি ফ্রান্সিসের হাত ধরে ঝুঁকে পড়ল। ফ্রান্সিস কোলে নিল। ওর মা চলে গেল। ফ্রান্সিস হেসে বলল– শাঙ্কো কে ভালো মানুষ আর কে নয় এটা শিশুরা ঠিক বুঝতে পারে। তাই সব লোকের আদরেই ওরা সাড়া দেয় না। ওরা যাচাই করে নেয়।

ফ্রান্সিস বাচ্চাটিকে বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে ধরল। বৃদ্ধ বাচ্চাটিকে কোলে নিল।

ফ্রান্সিসরা মেঝের পাটাতনে বসল। বৃদ্ধও নাতি কোলে ফ্রান্সিসদের পাশে বসলেন। বৃদ্ধটি ফ্রান্সিস ও শাঙ্কোর পরিচয়-টরিচয় জানতে চাইলেন। কথাবার্তা চলল। ফ্রান্সিস আধশোয়া হল। খুব ক্লান্ত লাগছে নিজেকে।

এমন সময় একটি যুবক ঘরে ঢুকল। জামাকাপড়ে ধুলোবালি লেগে। ফ্রান্সিসদের দেখে বলল–আপনারা কে? বৃদ্ধ বলে উঠলেন–এরা বিদেশি। লা মেরিনা যাবে। এখন এখানে আর কোথায় খাবার পাবে। তাই আমাদের অতিথি হয়েছে।

যুবকটি হাসল। বলল–নিশ্চয়ই। আপনাদের খাবার তৈরি হচ্ছে। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। যুবকটি বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস–তুমি কী প্রমাণ করবার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছো?

বার্বার যে অসৎ এটা আমি প্রমাণ করতে চাই।

–কী লাভ? তাছাড়া এখনো প্রমাণ করতে পারো নি।

–আর দুটো দেশলা মেরিনা আর কাকোয়াম্বোয় খোঁজ করা হয়নি। দেখবে ঐ দেশ দুটিতেও আমরা একই তথ্য পাবো–দু জায়গাতেই বাবার হীরে চুরির অথবা হারিয়ে যাওয়ার গল্প ফেঁদেছে। তারপর নতুন করে নতুন হীরে দিয়ে গয়না গড়েছে। প্রথম দেওয়া হীরের খণ্ডটি নিজে রেখে দিয়েছে।

–কোথায় রেখেছে? শাঙ্কো বলল।

বাড়িতে অথবা দোকানে। ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি এতসব করতে যাবে কেন? শাঙ্কো বলল।

আগেই বলেছি বার্বার যে অসৎ এটা প্রমাণ করবো। ফ্রান্সিস বলল।

–এরা এ দেশের মানুষ। এরা যেমন বুঝবে করবে। আমরা তার সঙ্গে জড়াবো কেন। ওদিকে রাজকুমারী, বন্ধুরা নিশ্চয়ই চিন্তায় পড়েছে। শাঙ্কো বলল। একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো যে জীবন আমরা বেছে নিয়েছি সেখানে দুশ্চিন্তার কোনো স্থান নেই। যে কোন সময় আমাদের মৃত্যু হতে পারে এটা প্রথমেই ধরে নিতে হবে। জীবনকেআমরা এরকমই বলে মেনে নিয়েছি। কাজেই এখানে দুশ্চিন্তার কোন স্থান নেই।

-তোমার মত মনের জোর তো সকলের নেই। তাই তারা দুশ্চিন্তা ভোগ করে। শাঙ্কো বলল।

–যাক্ আমার কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। দুটো দেশ বাকি। তারপরেই প্যারাইসোতে আমাদের জাহাজে ফিরে যাবো।

–ঠিক আছে। তুমি যা করতে চাও করো। শাঙ্কো বলল।

যুবকটি ঘরের দরজা খুলে মুখ বাড়িয়ে বলল–আপনাদের খাবার তৈরি। আপনারা আসুন।

ফ্রান্সিসরা বিছানা থেকে উঠল। বাড়ির ভেতরে ঢুকল।.ভেতরে একটা ছোট উঠোন মত। চারপাশে ঘর।

যুবকটি উঠোনে দুটো লম্বা বড় পাতা পেতে দিল। ফ্রান্সিসরা পাতাগুলোর সামনে বসল। ফ্রান্সিস শাঙ্কো খেতে বসল। কাঠের গ্লাশে জল ভরা ছিল। শাঙ্কো গ্লাশের সবটা জল ঢক ঢক্‌ করে খেয়ে নিল। এইবার বুঝতে পারল কী জলতেষ্টা পেয়েছিল।

যুবকটির স্ত্রী খাবার নিয়ে এল। গোল রুটি আর তরকারি মত দিল। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। সুস্বাদু লাগল। ক্ষুধার্ত ফ্রান্সিসরা অল্পক্ষণের মধ্যেই খেয়ে নিল। বৌটি আরও রুটি তরকারি দিল। পেট কিছুটা ভরেছে। এবার ফ্রান্সিসরা আস্তে আস্তে খেতে লাগল।

খাওয়া শেষ। হাত মুখ ধুয়ে মুছে বাইরের ঘরে ওরা এল। বিছানায় বসল। যুবকটি এল। হেসে বলল-পেট ভরেছে তো?

শাঙ্কো হেসে বলল–পেট পুরে খেয়েছি। ফ্রান্সিস বলল–অনেক উপকার করলেন। আর একটা অনুরোধ–ঘোড়া দুটোর জন্যে যদি দানাপানির ব্যবস্থা করে দেন। ওরাও তো ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত।

–কিচ্ছু ভাববেন না। আমার এক বন্ধু আছে। ঘোড়া কেনাবেচা করে। ওর বড় আস্তাবল আছে। ওকে ডেকে আনছি। আপনাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

–ঠিক আছে। শাঙ্কো বলল। যুবকটি বেরিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে যুবকটি ওরই সমবয়সী একজন যুবককে নিয়ে এল। বন্ধুটি অভ্যস্ত হাতে ঘোড়া দুটোর লাগাম ধরে নিয়ে চলল।

ফ্রান্সিস ভাবল–একটা বড় সমস্যার সমাধান হল। ঘোড়া দুটো দানাপানি পাবে। দম নিয়ে ছুটতে পারবে।

বিকেল হল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ঐ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। বৃদ্ধ ও যুবকটিকে বারবার ধন্যবাদ দিল।

এবার ঘোড়ায় চড়ল। ফ্রান্সিস যুবকটিকে ডাকল। যুবকটি এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–কাকোয়াম্বো দেশটিতে কী করে যাবো?

–এই যে রাস্তাটা, এটা সোজা চলে গেছে কাকোয়াম্বো। এখন তো শেষ বিকেল। কাকোয়াম্বো পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যাবে। আজকের রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে কাল সকালে গেলে পারতেন।

–উপায় নেই ভাই। আমাদের জাহাজ প্যারাইসো বন্দরে নোঙর করে আছে। সেই জাহাজে আমার বন্ধুরা রয়েছে। তাই এখানকার কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে জাহাজে ফিরে যাবো।

–আপনারা কায়াকোম্বো যাচ্ছেন তো?

–হ্যাঁ, কেন বলোতো? ফ্রান্সিস বলল।

–কায়াকোম্বোর রাজা আরকানিয়া খুব ধূর্ত আর নৃশংস। প্রজাদের সামান্য কারণে ফাঁসি দিয়ে থাকেন এবং ঐ ফাঁসি নিজে দেন। এজন্যে কোন ফাঁসুড়ে নেই। আবার তরোয়াল দিয়ে হত্যাও করেন। কাজেই খুব সাবধানে চলবেন। যুবকটি বলল।

–খুব উপকার করলে ভাই। আমরা সাবধানে চলবো। ফ্রান্সিস বলল।

দুজনে ঘোড়া চালাল।

দুজনের ভাগ্য ভাল যে এক জায়গায় ছোট শহরে সরাইখানা পেয়েছিল। তাই দুপুরের খাওয়াটা সন্ধেবেলা সারতে পেরেছে।

কাকোয়াম্বো পৌঁছতে বেশ রাতই হল। বেশ বড় শহর। তবে এই রাতে রাস্তাঘাটে খুব একটা ভিড় নেই। সদর রাস্তা দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে চলল। দুজনেই একটা সরাইখানা খুঁজছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা সরাইখানা খুঁজে পেল। সরাইখানার সামনে ঘোড়া থামাল। ঘোড়া থেকে নামল। শাঙ্কো ঘোড়া দুটোর লাগাম ধরে রইল।

ফ্রান্সিস সরাইওয়ালার কাছে গেল। সরাইওয়ালা নতুন খদ্দের পেয়ে খুব খুশি। এই শহরে লোকজন আসা খুব কমে গেছে। দুজন তো পাওয়া গেল। কাছে এসে ফ্রান্সিস বলল–আমরা দুজন থাকবো।

–বেশ তো, বেশ তো। সরাইওয়ালা বলল।

–কোন ঘরে থাকবো? শাঙ্কো বলল।

–একটাই তো ঘর। কোন অসুবিধে হবে না। সরাইওয়ালা বলল।

রাতের খাওয়ার ব্যবস্থাটা একটু জলদি করুন। শাঙ্কো বলল।

নিশ্চয়ই। আমি বলে দিচ্ছি। সরাইওয়ালা পেছন দিকে চলে গেল।

ফ্রান্সিস বলল–চল। পেছনের ঘরে। দুজনে পেছনের ঘরে এল। সরাইখানার ব্যবস্থা যা হয়। শুকনো ঘাসপাতার ঢালাও বিছানা। কয়েকটা বালিশ। ফ্রান্সিস ঢালাও বিছানায় শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস ঘোড়াগুলোকে দানাপানি খাওয়াতে হয়।

ফ্রান্সিস বলল–সরাইওয়ালাকে বল। ওর এই সরাইখানায় তো অশ্বারোহী মানুষও আসে। তাকে তো সেই ব্যবস্থা রাখতে হয়। নিজেকে বড়ই ক্লান্ত মনে হচ্ছে। একটু বিশ্রাম নেবো।

–ঠিক আছে। আমিই দেখছি। শাঙ্কো বলল।

শাঙ্কো বাইরের ঘরে এল। সরাইওয়ালার সামনে এসে দাঁড়াল। সরাইওয়ালা মাথা নিচু করে হিসেবটিসেব দেখছিল। এবার মুখ তুলল। শাঙ্কোকে দেখে বলল– কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো?

–তা হচ্ছে। শাঙ্কো বলল।

-মানে? সরাইওয়ালা থমকে গেল।

–আমরা দুজন ঘোড়ায় চড়ে এসেছি। ঘোড়াদুটো এখনও দানাপানি পায় নি।

–ও–এই কথা। আসুন। সরাইওয়ালা বলল।

সরাইওয়ালা শাঙ্কোকে সরাইয়ের পেছনে নিয়ে এল। আবছা চাঁদের আলোয় দেখল–ঘোড়া দুটো একটা গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা।

–আপনাদের ঘোড়াকে দানাপানিও দেওয়া হয়েছে। সরাইওয়ালা বলল।

–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। শাঙ্কো বলল।

–না। সে কি কথা। এটা তো আমার কর্তব্য। সরাইওয়ালা বলল। শাঙ্কো সরাইখানায় ঢুকল। নিজের জায়গায় বসে সরাইওয়ালা বলল–একটা কথা ছিল।

শাঙ্কো বলল–বলুন।

–ম-মানে–এখানকার নিয়ম–আগেভাগে দাম দিয়ে দেওয়া।

–কেন? পরে দিলে ক্ষতি কি? শাঙ্কো বলল।

–না-না। এ দেশে এটাই চলে। সরাইওয়ালা বলল।

শাঙ্কো বুঝল যুবকটি ঠিক কথাই বলেছিল। শাঙ্কো বলল–বেশ। বলুন কতদিতে হবে?

–আপনি কিভাবে দেবেন? সরাইওয়ালা বলল।

সোনার চাকতি দিয়ে। শাঙ্কো বলল।

–তাহলে একটা বড় চাকতি আর একটা ছোট চাকতি। সরাইওয়ালা বলল।

-বেশ। শাঙ্কো বলল। তারপর কোমরের ফেট্টিতে গোঁজা সোনার একটা চাকতি বের করল। সরাইওয়ালাকে দিল। সরাইওয়ালা হেসে বলল–ঘোড়ার দানাপানি, দেখাশুনো। আর আধখানা একটা ছোট চাকতি। শাঙ্কো তাই দিল।

শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। সরাইওয়ালার কথা বলল। দুজনেই হাসতে লাগল।

খাওয়ার ডাক পড়ল। গরম গরম মাংস, রুটি। খিদের জ্বালায় হাপুস হুপুস খেতে লাগল দুজনে। রুটি কম পড়ে গেল। দুজনে আর খেতে চাইল না। ফ্রান্সিসদের খাওয়া দেখে দুই পরিবেশনকারীর মুখ হাঁ।

খাওয়া শেষ। শাঙ্কো একজন পরিবেশনকারীকে বলল–আরো আট দশখানা রুটি খেতে পারতাম। পরিবেশনকারী চুপ করে শাঙ্কো আর ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

পরদিন সকালে ফ্রান্সিস সরাইওয়ালার কাছে এল। বলল–আপনাকে একটা উপকার করতে হবে।

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই—সরাইওয়ালা হেসে বলল।

–আমরা রাজবাড়ি যাচ্ছি। হেঁটেই যাবো। ঘোড়ায় চড়ে যাবো না। আপনি কি ঘোড়াদুটোকে কিছু দানাপানি খাওয়াবেন। ফ্রান্সিস বলল।

–নিশ্চয়। তবে আধখানা চাকতি দিতে হবে। সরাইওয়ালা বলল।

–ফিরে এসে দেব। শাঙ্কো বলল।

না। এখন দিতে হবে। সরাইওয়ালা বলল।

–বেশ। শাঙ্কো আধখানা চাকতি বের করে দিল।

রাজবাড়িতে আসতে অসুবিধে হল না। রাজবাড়ি বলে কথা। সবাই চেনে।

ফ্রান্সিসরা ভেতরে ঢুকল। এবার রাজসভার দরজার কাছে এল। ঢুকতে যাবে তখন একজন প্রহরী এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল। ফ্রান্সিস বলল–আমরা সেনাপতির সঙ্গে দেখা করবো।

-তোমরা বিদেশি। রাজসভায় ঢুকতে পারবে না। প্রহরী বলল।

রাজসভায় ঢুকবো না। সভার বাইরে সেনাপতির সঙ্গে কথা আছে। ফ্রান্সিস বলল।

–তোমরা যেতে পারবে না। প্রহরী বলল।

ফ্রান্সিস পিছিয়ে এল না।

বলল–আমাদের যেতেই হবে।

দাঁড়াও। প্রহরী বর্শা তুলে ফ্রান্সিসের মাথা লক্ষ্য করে চালাল। ফ্রান্সিস তৈরিই ছিল। মুহূর্তে মাথা পিছিয়ে নিল। বর্শার ঘা পড়ল ফ্রান্সিসের ডান বাহুতে। ফ্রান্সিস বাঁ বাহুটা ডান হাতে চেপে ধরল। ব্যথাটা ছড়াল সারা শরীরে। ফ্রান্সিস দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করল। তারপর তরোয়াল কোষমুক্ত করল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিসের হাত চেপে ধরল। বলল–ফ্রান্সিস শান্ত হও। এখন লড়াইয়ে নামলে বাঁচবো না। দেখ আরো কয়েকজন প্রহরী ছুটে আসছে। আমাদের গায়ে মাথায় তরোয়াল চালাতে পারবে। আমাদের জীবন বিপন্ন হবে। শান্ত হও ফ্রান্সিস।

ফ্রান্সিস প্রহরীর মুখের দিকে তাকিয়েছিল। এবার দৃষ্টি সরাল। শাঙ্কোর দিকে একবার তাকিয়ে তরোয়াল কোমরে গুঁজল।

এইসবের জন্যে কিছু শব্দটব্দ হল। শাঙ্কো দেখল সভার অনেকগুলো লোক ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। বিচার চলায় বিপ্ন দেখা দিল। রাজা বিরক্ত হলেন। বিচার থামিয়ে প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল–কী ব্যাপার? কী হচ্ছে ওখানে?

প্রহরী রাজার দিকে এগিয়ে গেল। মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল– দুজন বিদেশি আপনাদের কাছে আসতে গিয়ে ধরা পড়েছে। ওরা বলছে– আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়।

–ওদের নিয়ে এসো। রাজা বললেন।

প্রহরী দরজার কাছে এল। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–মহামান্য রাজা ডাকছেন। এসো।

ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো এগিয়ে গেল। রাজাকে মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে ফ্রান্সিস বলল–আমরা ভাইকিং। এখানে বেড়াতে এসেছি।

–এতদূর এলে?

–অন্য একটা কাজও আমরা করি। কোন দেশে গুপ্তধনের কথা জানতে পারলে গুপ্তধন খুঁজে উদ্ধার করি। গুপ্তধন সেই দেশের রাজাকে দিয়ে আমাদের জাহাজে চড়ে আবার অন্য দেশে যাই। এটাই আমাদের কাজ।

–কিন্তু গুপ্তধন উদ্ধার করে পালিয়েও তো যেতে পারো। রাজা বললেন।

–না। আমরা উদ্ধার করা গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে যাই না। যার ধনসম্পদ তাকে দিয়ে দিই। আমরা প্রতারণা করি না। ফ্রান্সিস বলল।

–এরকম মানুষ তোমরা? বিশ্বাস হয় না। রাজা হেসে বললেন।

–দেখেন নি কাউকে। তাই বিশ্বাস হচ্ছে না আপনার। ফ্রান্সিস বলল।

–যাক গে–তোমরা কোথা থেকে আসছো? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

–প্যারাইসো থেকে। ওখানে জাহাজঘাটায় আমাদের জাহাজ রয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।

–হুঁ। কী জন্যে এখানে এসেছো?

–তাহলে একটু খুলে বলতে হয়। তানাকাতে বাবার নামে একজন জহুরী থাকে। আপনি বোধহয় নাম শুনেছেন। ফ্রান্সিস বলল।

না। বলে যাও। রাজা বললেন।

–সেই বার্বার এখানে বেশ কয়েকটি দেশের রাণিদের জন্যে বা রাজকুমারীদের জন্যে হীরের গয়না তৈরি করে দিয়েছেন। ফ্রান্সিস বলল।

জানি না। হতে পারে। রাজা বললেন।

–এখন এই বার্বার এখানেও হীরের গয়না গড়াবার ডাক পেয়েছিল কিনা সেটা জানতে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।

কে কোথায় কার জন্য গয়না গড়াচ্ছে এটা জেনে তোমাদের কী লাভ? রাজা বললেন।

–আমাদের আর্থিক লাভ কিছুই নেই। তবে এই থেকে একটা কথা জানা যাবে বলে আমাদের ধারণা। ফ্রান্সিস বলল।

রাজা আরকানিয়া হঠাৎ সিংহাসন থেকে উঠলো। তারপর সিংহাসনের চারপাশে ঘুরে এল। রাজা দাঁড়িয়ে রইলেন কাজেই মন্ত্রী সেনাপতি অমাত্যরাও উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের আসনের চারপাশে ঘুরে এল। সিংহাসনে রাজা আরকানিয়া বসলেন। সবাই বসল।

–কী কথা জানতে চাও? রাজা বললেন।

–গয়না গড়ার আগে বার্বার বলেছে কিনা সেই হীরকখণ্ড হারিয়ে গেছে কিংবা চুরি হয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।

রাজা আরকানিয়া সিংহাসন থেকে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে পড়লেন। মন্ত্রী, অমাত্যরাও উঠে দাঁড়ালন। রাজা বললেন–সব মিথ্যে কথা। তোমরা প্যারাইসো দেশের গুপ্তচর। আর কিছুদিনের মধ্যেই আমরা প্যারাইসো আক্রমণ করবো। খুব জমবে লড়াইটা। তোমরা লুকিয়ে জানতে এসেছে–আমরা কিভাবে যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছি। কোন দিক দিয়ে আমরা আক্রমণ করবো। কবে আক্রমণ করবো এসব তথ্য জানতেই প্যারাইসসা থেকে তোমরা এসেছে। রাজা আরকানিয়া সিংহাসনের এর চারধারে ঘুরে এসে সিংহাসনে বসলেন। মন্ত্রী, সেনাপতি, অমাত্যরাও তাই করলেন। সিংহাসনে বসে রাজা আরকানিয়া বললেন

–তোমাদের বন্দী করা হল।

–কিন্তু আমরা বিদেশি। অল্পদিন হল এখানে এসেছি। আমরা কাউকেই চিনি না এই দেশের কিছুই জানি না। তাছাড়া গুপ্তচরবৃত্তি করতে যাবো কেন? কী লাভ আমাদের? ফ্রান্সিস বলল।

সোনার চাকতি পাবে। তারপর জাহাজে চড়ে পালাবে। রাজা বললেন।

–আমাদের যথেষ্ট সোনার চাকতি আছে। আমরা এই কাজ করতে যাবো কেন? ফ্রান্সিস বলল।

রাজা আবার হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। মন্ত্রী, অমাত্যরাও উঠে দাঁড়াল। রাজা সেনাপতির দিকে আঙ্গুল বাড়িয়ে বললেন–কয়েদখানা। রাজা বসে পড়লেন আর। সবাই বসলেন। ফ্রান্সিস বুঝল এই পাগল রাজাকে কিছুই বোঝানো যাবে না। যা হচ্ছে তাই মেনে নিতে হবে।

ততক্ষণে সেনাপতি উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রহরীদের ইঙ্গিত করল। চারজন প্রহরী এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের হাতে দড়ি বাঁধল। সবাই রাজসভা থেকে নেমে এল। প্রহরীরা ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। রাজসভার লোকজন তাকিয়ে দেখল। বোঝাই যাচ্ছে বন্দীরা বিদেশি। কেউ ভেবে পেল না পাগল রাজা ওদের বন্দী করল কেন।

ফ্রান্সিসদের সদর রাস্তায় নিয়ে আসা হল। তারপর নিয়ে চলল কয়েদখানার দিকে। রাস্তার লোকজন ফ্রান্সিসদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল! এই বিদেশিদের বন্দী করা হয়েছে কেন?

ফ্রান্সিসদের একটা পাহাড়ের নিচে আনা হল। দেখা গেল–বেশ কিছু জায়গা নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া। তার মধ্যে কাঠ পাথরের কয়েকটা বাড়ি। একটা বাড়ি বেশ বড়। ঘেরা জায়গা জুড়ে ফুলের গাছ। দু-একটা ফ্রান্সিসদের চেনা যেমন গোলাপ টিউলিপ সান ফ্লাওয়ার ক্রিসেনথেমাম। কিছু লোক ফুলগুলোর পরিচর্যা করছে। বোঝাই গেল কয়েদী ওরা।

সর্দার প্রহরী কাঁটাতারের পাশ দিয়ে হেঁটে দরজার কাছে এল। কার নাম ধরে ডাকল। তারপর কোমরে গোঁজা চাবিটা বের করল। ওদিকে একজন কয়েদী এগিয়ে এল। তারও হাতে চাবি। প্রথমে সর্দার প্রহরী বাইরের দিককার তালায় চাবি ঢোকাল। মোচড় দিল। মৃদু কট শব্দ তুলে তালাটা খুলে গেল। এবার ওপাশে কয়েদী এগিয়ে এসে চাবি দিয়ে ওপাশের তালা খুলে দিল। এইবার দরজা। সম্পূর্ণ খুলে গেল। সর্দারসহ সবাই ঢুকল। ভেতর দিককার দরজায় আবার তালা লাগাল কয়েদীটি। বাইরের তালায় চাবি ঢুকিয়ে বন্দী করল।

সর্দার প্রহরী ফ্রান্সিসকে বলল–এটাই কয়েদখানা। আমরা পাহারাদার। কয়েদখানার মাঝখানে এত ফুলের সমারোহ ফ্রান্সিসরা বুঝতেও পারে নি। প্রহরীরা বড় ঘরটায় চলে গেল। সর্দার ফ্রান্সিসকে বলল–ঐ যে ঘরগুলো দেখছো ওখানকার একটা ঘরে তোমাদের থাকতে হবে। যাও।

ফ্রান্সিসরা প্রথম ঘরটায় ঢুকল। দেখল কাঠ আর পাথর দিয়ে তৈরি ঘরটা বেশ বড়ই। দরজায় তালাচাবির ব্যাপার নেই। ঘরে কেউ নেই। চারদিকে মাটির ওপর ও শুকনো ঘাস আর পাতা দিয়ে তৈরি বিছানামত।

তখনই কয়েকজন কয়েদী ঢুকল। হাতে মাটি লেগে আছে। তাহলে এরাই ফুলগাছের পরিচর্যা করছিল? একজন এগিয়ে এল। বলল–তোমরা কয়েদী হলে আমাদের মত? কী করেছিলে তোমরা? চুরি না খুন? ফ্রান্সিস বলল–আমরা আমাদের মত? কী করে এই রাজ্যে এসেছিলাম জন্যেই তোমাদের

–কিন্তু তোমরা তো বিদেশি। বোধহয় ঐ জন্যেই তোমাদের কয়েদখানায় ঢোকানো হয়েছে।

–সেটা তো একটা কারণ বটেই। তা ছাড়া আরও কারণ আছে। এই কাকোয়াম্বোর সঙ্গে প্যারাইসো দেশের অল্পদিনের মধ্যেই লড়াই বাঁধবে। আমরা বিদেশি গুপ্তচর বলে সন্দেহ করে এখানকার পাগলা রাজা আরকানিয়া আমাদের কয়েদ করেছে।

–তাহলে তোমরা এখানে এলে কেন? আর একজন কয়েদী বলল।

ফ্রান্সিস বার্বারের কথা–তার হীরে চুরির কথা সব বলল। তারপর বলল– আমাদের মিথ্যে বদনাম দিয়ে পাগলা রাজা আরকানিয়া আমাদের কয়েদখানায় ঢুকিয়েছে।

–রাজা আরকানিয়াকে পাগলা রাজা বলছো কেন?

–পাগলা না হলে কেউ কাটাতারে ঘেরা কয়েদখানা করে? কয়েদখানার মধ্যে বাগান করে? কয়েদখানার চাবি থাকে কয়েদীর কাছে।

দুতিনজন কয়েদী হেসে উঠল। একজন বলল–তাহলে তুমিও পাগলা রাজাকে চিনেছো। পাগলা রাজার আরো কাণ্ডকারখানা আছে। যাক গে–সবেমাত্র এলে। তাই রেহাই পেলে। কাল ভোর থেকেই কাজে ডেকে নিয়ে যাবে। বাগান পরিচর্যার কাজ চলছে এখন। আমাদের সঙ্গে ঐ কাজেই লাগতে হবে।

এমন সময় ঘরে ঢুকলো সর্দার প্রহরী। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল– তোমরা কোথায় থাকতে চাও?

–এই ঘরেই। ফ্রান্সিস বলল।

তাহলে ঐ দক্ষিণ কোনায় তোমাদের বিছানা করে দেওয়া হবে। তোমরা আমার সঙ্গে এসো। সর্দার দরজার দিকে চলল।

ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো সর্দারের পেছনে পেছনে চলল।

প্রহরীদের ঘরে ঢুকল। কোনার একটা পাশে স্থূপীকৃত শুকনো ঘাস পাতা। উঁই করে রাখা। সর্দার বলল–এখান থেকে ঘাসপাতা নিয়ে নিজেদের বিছানা তৈরি করো।

ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ঘাসপাতা দফায় দফায় নিয়ে এসে বিছানা তৈরি করল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বসে রইল।

দু’দিন কাটল। ফ্রান্সিসের এক চিন্তা–এই অদ্ভুত কয়েদখানা থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কেমন করে। সব চিন্তাভাবনা গুলিয়ে যাচ্ছে।

সেদিন সর্দার এসে বলে গেল রাজা আরকানিয়া কয়েদখানা দেখতে আসবেন।

সকাল গেল। বিকেলও গেল। রাত হল। ফ্রান্সিসদের খুব তাড়াতাড়ি খেতে দেওয়া হল। কয়েদীরা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল না। বসে রইল। ফ্রান্সিস একজন কয়েদীকে বলল–রাজা তো আর আসবে না।

–হুঁ। পাগলা রাজা নাম হয়েছে কি সাধে। ঘুমিয়ে পড়ো না। রাজা ঘুমুচ্ছে দেখলে ভীষণ রেগে যায়। বলে–আমার আসার খবর আগেই দেওয়া হয়েছে। গভীর রাতেও আসতে পারি। তোমরা শুয়ে পড়লে কেন। ওঠ। সবাই উঠে দাঁড়ায়। রাজা ইঙ্গিত করে–বসো। সবাই বসে পড়ে। কথাগুলো শাঙ্কোও শুনল। বলল–রাজাটা। একেবারে বেহেড একটা। একজন কয়েদী বলছিল এসব সত্ত্বেও পাগল রাজা ভালো।

গভীর রাত তখন। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু প্রহরীদের ঘরে মশালের আলো। কয়েদীদের ঘরেই মশাল জ্বলছে।

হঠাৎ প্রহরীদের ছুটোছুটির শব্দ শোনা গেল।

রাজা আরকানিয়া ঘোড়ায় চেপে এলেন। পেছনে দুজন অশ্বারোহী। সবাই দরজার কাছে থামল। সর্দার প্রহরী ছুটে এসে দরজা খুলে দিল। ঘোড়া থেকে নেমে রাজা আস্তে আস্তে দরজা পার হয়ে কয়েদীদের ঘরের সামনে এলেন।

তারপর কয়েদীদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। প্রথমেই ফ্রান্সিসদের ঘরটা পেলেন। নিজেই ভেজানো দরজা খুলে ঢুকলেন। মশালের আলোয় দেখলেন সব কয়েদী উঠে দাঁড়িয়েছে। রাজা ফ্রান্সিসদের সামনে এসে বললেন–তোমরা গুপ্তচর। কঠিন শাস্তি হবে তোমাদের।

–আমরা নির্দোষ। আপনার দেশের কোন ক্ষতি করতে আমরা আসি নি। আমরা বিদেশি। আপনাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্কই নেই।

–আছে–আছে। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি না। তোমরা আমার রাজত্বে এলে কেন? রাজা বললেন।

-যদি শোনেন তাহলে বলি? ফ্রান্সিস বলল।

–বলো। রাজা বললেন।

ফ্রান্সিস তখন আস্তে আস্তে হীরের খণ্ড চুরির ব্যাপারটা বলল। তারপর বলল– গয়না গড়তে একখণ্ড হীরে এই বার্বারকে দিয়েছিলো কিনা। বার্বার হীরের খণ্ডটা হারিয়ে গেছে এরকম কথা বলে অন্য হীরের খণ্ড নিয়ে গিয়েছিল কিনা। শুধু এইটুকু জানতে আপনার রাজত্বে এসেছিলাম। আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই।

–হুঁ। বানিয়ে টানিয়ে ভালোই বললে। কিন্তু আমাকে অত সহজে বোকা বানানো। যাবে না। তোমাদের বিচার হবে। রাজা বললেন, তারপর অন্য কয়েদীদের কাছে গেলেন।

আশ্চর্য! কয়েদীদের নাম ধরে ডাকলেন। কয়েদীরা একে একে রাজার কাছে আসতে লাগল। কার কী অপরাধ তাও বললেন। ক’ বছরের সাজা হয়েছে তাও বললেন।

এবার রাজা প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বললেন–খুব সাবধানে পাহারা দেবে যেন কেউ পালাতে না পারে।

রাজা কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘোড়ায় উঠলেন। সঙ্গের দুজন। অশ্বারোহীও ঘোড়ায় চড়ল। রাজা ঘোড়া ছোটালেন রাজবাড়ির দিকে।

পাগলা রাজা আবার এল কয়েকদিন পরে। সঙ্গে সেনাপতি আর বেশ বেঁটে একজন লোক। তালা খুলে দেওয়া হল। রাজা সেনাপতি আর বেঁটে লোকটি– ঢুকলেন। প্রহরী সর্দারকে বলল–সব কয়েদীদের এখানে আসতে বল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সব কয়েদী জড় হল।

রাজা সর্দার প্রহরীকে বললেন, বাগানে ফুল এত কম কেন?

–মান্যবর রাজা–এটা শীতকাল। কাজেই ফুলের সংখ্যা কম। তবে ঝরে গেলেও দক্ষিণ দিকটায় খুব ফুল ফুটেছে। রাজা বেঁটে লোকটার দিকে তাকাল। বলল- মনে হয় খুব বেশি ফুল পাবেন না।

–ঠিক আছে। যা দেখছি তাতে কাজ চলে যাবে। বেঁটে লোকটি বলল।

–তাহলে দেখুন। রাজা বললেন।

বেঁটে লোকটি একটু গলা চড়িয়ে বলল–তোমরা সবাই প্রত্যেকটি গাছ থেকে একটি করে ফুল নিয়ে খাবে। বুঝতে হবে কোন ফুল খেয়ে তোমাদের শরীরের ক্লান্তিভাব চলে গেছে। এখন অনায়াসে হেঁটে অন্য রাজ্যে চলে যেতে পারবে। মন উৎফুল্ল থাকবে। বর্শা ছুঁড়তে পারবে বেশ দূরে। লক্ষ্যভেদ করতে পারবে। এই অবস্থাটা বেশ কিছুদিন চলবে। তারপরে আবার ফুল খেতে হবে। বেঁটে ভদ্রলোকটি থামলেন। তারপরে বললেন-তোমরা ফুল খেতে থাকো। কয়েদীরা ফুল গাছের ওপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবাই ফুল খেতে লাগল।

ফুল খাওয়া শেষ। এখন দেখা হবে কার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হল।

হঠাৎ ফ্রান্সিস ছুট লাগাল। প্রহরীদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ইশারা করল। শাঙ্কো লাফিয়ে উঠল। তারপর দুজন কয়েদীর ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল মারামারি। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুষোঘুষি শুরু হল। বেঁটে চেঁচিয়ে বলল—থামো থামো। শাঙ্কো থামল। বেঁটে প্রথমে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–তুমি তো দেখছি বিদেশি।

বিদেশি বলে কি ফুল কাজ করবে না? ফ্রান্সিস বলল।

–না-না তা করবে। তুমি কোন ফুল খেয়েছিলে? বেঁটে বলল।

–সূর্যমুখী ফুল। ফ্রান্সিস বলল।

এবার বেঁটে জিজ্ঞেস করল শাঙ্কোকে–তুমি?

–চন্দ্রমল্লিকা ফুল। শাঙ্কো বলল।

রাজার দিকে তাকিয়ে বেঁটে বলল–এই দুটি ফুল অনেককে খাইয়ে দেখেছি কোন সতেজভাব হয়নি। কিন্তু এখানে হয়েছে তার কারণ মাটি। আপনার এই এলাকায় মাটি খুব ভাল। তাই অন্তত দুজনের মধ্যে দ্রুত ভালো প্রতিক্রিয়া হয়েছে। চন্দ্রমল্লিকা আর সূর্যমুখীর চাষ বাড়ান। আপনার সৈন্যদের খাওয়ান। সৈন্যরা বিদেশি সৈন্যদের সঙ্গে সিংহের মত লড়বে।

-হ্যাঁ। যা বুঝছি দুটো ফুলেরই চাষ বাড়াতে হবে। রাজা বললেন।

–ঠিক তাই। বেঁটে বলল।

রাজা, বেঁটে আর সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল। ফ্রান্সিস হেসে উঠল। শাঙ্কোও হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়ে অবস্থা। কয়েদীরা ঠিক বুঝল না ওদের হাসির কারণ কী।

দুদিন পরে পাগল রাজা আর বেঁটে এল। এবার মাঝরাতে না। দিনের বেলাই এল। সামনের দুটো ঘোড়ায় রাজা আর বেঁটে। আর একটি ঘোড়ায় সেনাপতি।

রাজা ও বেঁটে কাটাতারের প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকল। সেনাপতি বেশ জোরে বলল–মাননীয় রাজা এসেছেন। তোমরা এই দেবদারু গাছের নিচে এসে দাঁড়াও। প্রহরীরাও এসো।

কিছুক্ষণের মধ্যে সব কয়েদীরা প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়াল। প্রহরীরা এসেও দাঁড়াল। রাজা বলল–তোমরা সূর্যমুখী ফুল খেয়েছিলে? কয়েকজন কয়েদী মাথা কাত করে বলল খেয়েছি। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–কী করে খাবো। কে বা কারা বাগানের সব সূর্যমুখী ফুলের গাছ শেকড়সুষ্ঠু উপড়ে ফেলেছে।

-সে কি। এতো সাংঘাতিক অপরাধ। রাজা বললেন।

–অবশ্যই অপরাধ। বেঁটে বলল।

রাজা সব কয়েদীদের দিকে তাকাল। সবাই চুপ। পাগলা রাজা আরো চটে গেল। বলতেই হবে কে কাণ্ডটা করেছি।

সবাই চুপ। সেনাপতি এগিয়ে এল। রাজাকে কানে কানে কী বলল। রাজা কান সরিয়ে বললেন–এক-এক করে এগিয়ে এসো। একজন একজন করে এগিয়ে আসতে লাগল আর রাজা তাদের হাত দেখতে লাগলেন। একজন কয়েদীকে পেলেন। তার হাত মাটিমাখা।

রাজা বললেন–সেনাপতি এটাকে ধরুন। সেনাপতি ছুটে এসে কয়েদীটিকে সরিয়ে নিল। রাজা আবার কয়েদীদের হাত দেখতে লাগলেন। এবার ফ্রান্সিস ধরা পড়ল। রাজা চেঁচিয়ে বললেন–এই বিদেশিটার হাতে মাটি ধুলো। ফ্রান্সিস বলল- মহামান্য রাজা উপড়ে-ফেলা সূর্যমুখী পাঁচটা গাছ আমি পুঁততে পেরেছি। তাই হাতে ধূলা মাটি লেগেছে।

খুব ভালো–খুব ভালো। পাগলা রাজা চেঁচিয়ে বলল।

আবার হাত দেখা শুরু হল। আবার একজনকে পাওয়া গেল। দুজনকে দেখিয়ে রাজা সর্দার প্রহরীকে বললেন–এদের কী শাস্তি হবে তা তো জানিস। ঐ দুটোকে সেই শাস্তি দে।

সর্দার প্রহরী এগিয়ে এল। পেছনে আরো কয়েকজন প্রহরীও এল।

ওরা দুই কয়েদীদের নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে নিয়ে গেল। রাজা চেঁচিয়ে ছুঁড়ে ফ্যা। দুজন প্রহরী ঐ কয়েদীদের দুজনকে ধরে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর ছুঁড়ে দিল। কয়েদী দুজন উঠে এলো। আবার ধাক্কা দিয়ে ফেলল কাটাতারের ওপর। এইভাবে কিছুক্ষণ ছোঁড়া ভোলা চলল। কয়েদী দুজন কাঁদতে লাগল। সমস্ত শরীর দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। পোশক রক্তাক্ত।

রাজা হাত তুললেন। শাস্তি বন্ধ হল। কয়েদী দুজন আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে অন্য কয়েদীদের কাছে এল তখনও সারা গা থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।

রাজা এবার হাসলেন। বললেন–সেনাপতি।

-বলুন।

–এই শাস্তিটা কেমন বের করেছি বলুন তো? রাজা বললেন।

–তুলনা নেই। কেউ ভাবতেই পারবে না। সেনাপতি বলল।

তিনজনে কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে এল। ঘোড়ায় চড়ল। রাজপ্রাসাদের দিকে চলল। রাজা যেতে যেতে বললেন জানেন এই শাস্তির ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি। ঘুমোবার আগে এই এক চিন্তা আমার। কেটে ফেলা হল, ফাঁসি দেওয়া হল এসব তো আবহমানকাল ধরে চলে আসছে। আমি চাই নতুন কিছু। আর কেউ যা ভাবতেই পারবে না।

–আমিও ভাবি বুঝলেন। ভাবি কী করে মানুষকে উজ্জীবিত করা যায়। নতুন নতুন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যেমন এখন ফুল নিয়ে ভাবছি–পরে ফল নিয়ে ভাববো। বেঁটে বলল।

–ঠিক বলেছেন। রাজা হেসে বললেন।

আহত দুই কয়েদীকে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দিল। আহত দুজন তখনও গোঙাচ্ছে। গুরুতর আহত ওরা। ফ্রান্সিস প্রহরীদের ঘরে এল। সর্দার প্রহরীকে বলল–কাটাছেঁড়ার ওষুধ আছে?

সর্দার প্রহরী বলল–আছে। কিন্তু রাজা আহতদের জন্যে ওষুধ দিতে বলে যান নি। কাজেই আমি দিতে পারবো না।

ফ্রান্সিস এক লাফে এগিয়ে সর্দার প্রহরীর গলা চেপে ধরল। সর্দার প্রহরী মাটিতে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস দাঁত চাপা স্বরে বলল, ওষুধ না দিলে তোমাকে আমি খুন করবো আর সেটা করতে গিয়ে আমি মরে যেতে রাজি। বল–কী করবে?

ঘরে আরো তিনজন প্রহরী ছিল। তিনজনই তরোয়াল খুলে এগিয়ে এল। একজন বলল–সর্দারকে ছেড়ে দাও।

–না। আহত কয়েদীর জন্য ওষুধ চেয়েছিলাম। সর্দার ওষুধ থাকা সত্ত্বেও দেবে না বলছে। ফ্রান্সিস বলল।

–কী করবো। রাজা হুকুম না দিলে আমাদের কিছু করার নেই। এক প্রহরী বলল।

ফ্রান্সিস সর্দারকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সর্দারও উঠল।

ফ্রান্সিস বলল–নিয়ম আছে। আবার মানবতার খাতিরে নিয়ম ভঙ্গও তো হতে পারে।

-সেটা অবশ্য আলাদা কথা। সর্দার প্রহরী বলল।

–ঐ আলাদা কথাটাই আমি বলছিলাম। কয়েদী দুজনের কী অবস্থা হয়েছে তোমরা দেখেছো। ফ্রান্সিস বলল।

–ওসব আমরা অনেকদিন দেখে আসছি। একজন প্রহরী বলল।

–কখনও প্রতিবাদ করো নি। ফ্রান্সিস বলল।

–না। আমাদেরই মেরে ফেলবে। অন্য এক প্রহরী বলল।

-কিন্তু আমি প্রতিবাদ করবো। আমাকে রাজার কাছে যেতে দাও। আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাও। ফ্রান্সিস বলল।

–তোমাকে রাজার কাছে যেতে দেব না। তুমি রাজার কাছে গেলে প্রতিবাদ করলে মরে যেতে পারো। অন্য প্রহরী বলল।

–ঠিক আছে। আমি যাবো না। ওষুধ দাও। ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি যাও। আমি যাচ্ছি। সর্দার প্রহরী উঠে দাঁড়িয়ে বলল।

ফ্রান্সিস ওর ঘরে এল। আহতদের একজন ফ্রান্সিসদের ঘরের। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে কয়েদীটির কাছে এল। পোশাক কিছু সরিয়ে দেখল–কী সাংঘাতিকভাবে শরীর কেটে কেটে গেছে। কয়েদীটি গোঙাচ্ছিল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল– সর্দার প্রহরী ওষুধ নিয়ে আসছে। একটু সহ্য করো কয়েদীটির গোঁঙানি বন্ধ হল।

তখনই সর্দার প্রহরী ঘরে ঢুকল। হাতে একদলা তুলো আর একটা বোতল। সর্দার কয়েদীটির কাছে গিয়ে বলল–ওষুধ লাগালে জ্বালাযন্ত্রণা হবে। কিছুক্ষণ। সহ্য করো।

সর্দার বোতল থেকে ওষুধ নিয়ে কয়েদীটির শরীরের কাটা জায়গাগুলিতে লাগাতে লাগল। কয়েদীটি প্রথমে জোরে গুঙিয়ে উঠল। একটু পরে শান্ত হল। সর্দার ওর সারা গায়ে ওষুধ লাগিয়ে দিল।

সর্দার আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসকে বলল–ও যেন দিন দুয়েক চান না করে। কালকে আবার ওষুধ লাগিয়ে দেব। দু-তিনদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠবে। সর্দার চলে গেল।

ফ্রান্সিস নিজের বিছানায় গেল। শাঙ্কো আস্তে ডাকল–ফ্রান্সিস। আহত লোকটা বাঁচবে তো?

–সর্দার তো বলল এই ওষুধেই সারবে। দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি কি পাগলা রাজাকে সত্যি কথা বলেছিলে? শাঙ্কো বলল।

–মাথা খারাপ। ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি গাছগুলো নিয়ে কী করেছিলে? শাঙ্কো বলল।

–সব গোড়াশুদ্ধু তুলে একপাশে রেখে দিয়েছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।

–প্রহরীরা দেখে নি? শাঙ্কো বলল।

–ওরা তখন নিজেদের মধ্যে তাস খেলায় মগ্ন। ফ্রান্সিস বলল।

রাত হল। খাবার সময় হল। রাঁধুনিরা খাবার নিয়ে এল। ফ্রান্সিস নিজের খাবারটা শাঙ্কোকে দেখতে বলল। নিজে আহত কয়েদীদের কাছে গেল। কয়েদীকে খাইয়ে দিল। তারপর নিজের বিছানায় এসে শাঙ্কোর হাত থেকে খাবার নিল। খেতে লাগল।

রাতে শুয়ে পড়ল। এখন শুধু এখান থেকে পালাবার চিন্তা। কিভাবে পালাবে?

কয়েকদিন কাটল। আহত কয়েদীটি সুস্থ হল। সর্দার প্রহরী ঢুকল। আহত কয়েদীটির বিছানার কাছে এল। আহত কয়েদীটিকে জিজ্ঞেস করল-কেমন আছো ভাই?

–অনেক ভালো আছি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি ওষুধ না দিলে আমি মারা যেতাম।

ফ্রান্সিস বলল–ওষুধ না দিলে সর্দারকে মরতে হত।

হঠাই ফ্রান্সিসের মনে হল–সর্দার প্রহরী কেমন যেন দুঃখভারাক্রান্ত। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–আমার বিছানার কাছে একটু আসবে?

চলো। দু’জনে ফ্রান্সিসের বিছানার কাছে এল। ফ্রান্সিস ইশারায় শাঙ্কোকে ডাকল।

ফ্রান্সিস সর্দার প্রহরীকে ওর বিছানায় বসতে বলল। সর্দার প্রহরী মাথা নাড়ল। দুজনে সর্দারের কাছে এল। ফ্রান্সিস বলল–কারণ জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার মনে খুব দুঃখ-বেদনা আছে। সর্দার ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল। বলল, হ্যাঁ আছে। রাজা আরকানিয়া যে কয়েদীদের কী নির্মম শাস্তি দেয় তা কল্পনাও করতে পারবে না। ও পশুদের চেয়েও হিংস্র। রাজা ওপরে ওপরে পাগলাটে ভাব দেখায় কিন্তু আসলে ও একটা সুস্থ মানুষ। সবাইকে দেখায় ও পাগলাটে। আসলে ও খুব বুদ্ধিমান মানুষ। ওর হুকুমে কয়েদীদের ওপর কী সাংঘাতিক অত্যাচার করতে হয়েছে সে কথা ভাবলে আমার চোখে জল আসে। কিন্তু পরক্ষণেই সাবধান হয়ে যাই অন্য প্রহরীরা যেন না দেখে ফেলে। এইভাবেই দিন কাটছে আমার। কাঁদতে পারি না।

–আহত কয়েদীটিকে যে ওষুধ দিয়েছো এটা জানতে পারলে–ফ্রান্সিস বলল।

–আমার অবধারিত মৃত্যু। একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল–আমরা দুজন পালাতে চাই।

–আমিও পালাতে চাই।

ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠল। বুঝল না সর্দারের কথাটা সত্যি না মিথ্যে।

ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল–তোমার পালাতে অসুবিধে কোথায়। চলে গেলেই হল।

–রাজার চোখ সবদিকে। আমি পালালে রাজা আমার পেছনে ঘাতক লেলিয়ে দেবে। ঘাতক আমাকে যেখানে পাবে হত্যা করবে। ফ্রান্সিস শাঙ্কো চুপ করে রইল।

একটু পরে ফ্রান্সিস বলল–তোমার সমস্যার কথা জানলাম। আমরা পালালে রাজা আর আমাদের নিয়ে ভাববে না। ফ্রান্সিস বলল।

–লোকটা কী নৃশংস তা তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না।

–দেখ সর্দার আমাদের পালাতেই হবে। আজ অথবা কাল। কী করে পালাবো সেটাই বুঝতে পারছি না।

সত্যিই পালাতে চাও?

নিশ্চয়ই।

ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করে দেব। শুধু ধরা পড়লে আমার কথা বলবে না।

–তাহলে তুমি আগে কোন কোন কয়েদীকে পালাতে সাহায্য করেছে।

–যদি পালাতে সাহায্য না করতাম তাহলে নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করা হতো। সর্দার বলল।

–ঠিক আছে। কবে পালাতে সাহায্য করবে? ফ্রান্সিস বলল।

–শোন–এই কাকোয়াম্বো সমুদ্রের কাছে। তাই এ সময়টায় এখানে ভীষণ ঝড়বৃষ্টি হয়। তেমনি এক রাতে তোমরা তৈরি থেকো! ঠিক সময় আমি ডাকবোজাহাজী? তোমরা চলে আসবে ঘরের বাইরে। তারপর কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে পালানো।

–কাঁটাতারের বেড়া পার হবো কিভাবে? শাঙ্কো বলল।

–সে সবের ব্যবস্থা তখন দেখবে–সর্দার বলল।

–তুমি এ ভাবেই অনেককে পালাতে সাহায্য করেছো নিশ্চয়ই। ফ্রান্সিস বলল।

–ওসব কথা থাক। তোমরা তৈরি? সর্দার বলল।

–হা হা। ফ্রান্সিস বলল।

সেদিন গভীর রাতে বাইরে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি চলছে। হঠাৎ শুধু শুনল–জাহাজী।

বাইরে এসো। সর্দার প্রহরী বলল।

ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো বাইরে এল। ক ঝড়ের ঝাঁপটা যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তেমনি মুষলধারে বৃষ্টি। গভীর অন্ধকার বাইরে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তাইে যা দেখা যাচ্ছে।

সর্দার প্রহরীর পেছনে পেছনে ফুল বাগানের এক কোনার দিকে এলো ওরা। সর্দার প্রহরী দুজনকে কাছে আসতে বলল। কোনার কাঁটাতারের কাছে এসে সর্দার দুহাত দিয়ে কাঁটাতারে টান দিল। কাঁটাতার আস্তে আস্তে সরে গেল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো যত তাড়াতাড়ি পারো বেড়িয়ে এসো।

দুজনে বঁটাতারের ফাঁক দিয়ে গলে গেল। দুজনেরই হাতে পিঠে বঁটাতারের খোঁচা লাগল। বেশ জোরে। কিন্তু তখন আর ওসব ভাববার সময় নেই। দেখবারও সময় নেই।

কাটাতার পার হয়ে ফ্রান্সিস সর্দার প্রহরীর দিকে হাত বাড়াল। সর্দার ওর বাড়ানো হাত ধরল। চাপ দিয়ে ছেড়ে দিল।

দুজনে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ছুটল। বিদ্যুতের আলোয় ওরা একটা প্রান্তরের মতো দেখল। ছুটল তার ওপর দিয়ে। কিছুদূর এসে দেখল একটা টানা বড় রাস্তা। দুজনে রাস্তায় উঠে ছুটতে লাগল।

বেশ কিছুক্ষণ ছোটার পর পথের দুপাশে বাড়িঘর দেখল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-শাঙ্কো–আশ্রয় চাই। আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি।

তখন বৃষ্টি একটু কমের দিকে। কিন্তু ঝোড়ো হাওয়ার বিরাম নেই।

একটা বাড়ির সামনে এল। বিদ্যুতের আলোয় দেখল বেশ বড় বাড়ি। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সদর দরজার সামনে এল। জোরে দরজায় ধাক্কা দিল। ভেতরে কোন সাড়াশব্দ নেই। আবার ধাক্কা দিল। খটাস্ শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল। একজন যুবক দাঁড়িয়ে। শাঙ্কো বলল–দেখুনঝড়বৃষ্টিতে আটকে পড়ে গেছি। একটু থাকবার জায়গা দেবেন?

–নিশ্চয়ই। আসুন। যুবকটি বলল।

ভেজা পোশাকে ফ্রান্সিস ও শাঙ্কো ঘরে ঢুকল। খেয়েদেয়ে ফ্রান্সিস যুবকটিকে বলল–তোমরা আমাদের যত্ন করে খেতে দিয়ে থাকতে দিয়েছো। তোমাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ রইলাম।

না–না। এ কী বলছেন? এটা মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য। যুবকটি চলে গেল।

রাত একটু গম্ভীর হতে দুজনে উঠে পড়ল। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তায় এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল–এখন ঠিক কর প্রথমে কোথায় যাবে?

–প্রথমে তানাকার খোঁজ করতে হবে। ওর বাবা কোথায় সেটাও জানতে হবে। শাঙ্কো বলল। দুজনে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল।

যখন তানাকা পৌঁছল তখন ভোর হয়েছে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। খুঁজে খুঁজে একটা সরাইখানা দেখল। ওরা সরাইখানায় ঢুকল। মালিক হাসিমুখে এগিয়ে এল। মালিক দুটো লাভের কথা ভাবল–এরা তো বিদেশি। খুব সহজেই জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেখাবে। এরা অন্য কোথাও যাবে না। এই সরাইখানাতেই থাকবে। থাকা খাওয়ার জন্যে বেশি অর্থ চাইবে। এরা যা দাম চাইবে তাই দেবে। এ বিষয়ে সরাইওয়ালা নিশ্চিন্ত।

সরাইওয়ালা পেছনের ঘরে এল। ফ্রান্সিসরাও চলল। ঘরটা দেখিয়ে সরাইওয়ালা বলল–এখানেই থাকবেন। আরামে থাকবেন। এখন সকালের খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।

সকালের খাবার খেয়ে দুজনে চলল তানাকাদের বাড়ি। সব খবরাখবর জানা যাবে।

তানাকাদের বাড়ির সামনে এল। দরজা বন্ধ। ফ্রান্সিস দরজায় ধাক্কা দিল। একজন বয়স্ক মানুষের গলা শুনল–কে?

–আমরা। তানাকার বন্ধু। দরজাটা খুলুন। শাঙ্কো বলল।

তানাকার মা বেরিয়ে এল। তানাকার মা বলল–তোমরা কে বাবা?

–তানাকাকে ডাকুন। ও সব বলবে। শাঙ্কো বলল।

-কিন্তু তানাকাকে তো দিন সাতআট আগে পাঁচ-ছ’জন গুণ্ডা এসে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে।

–কোথায় নিয়ে গেছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

তাতো জানি না।

ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল–যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই হয়েছে। তানাকার বন্ধু আরোনাস এবার সক্রিয় হয়েছে। তানাকাকে নিয়ে সেই বন্ধুর দল কাজে নেমেছে। ও আরো বলল–তানাকাকে কয়েদঘর থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ও এই কদিন বোধহয় বাড়িতেই ছিল। বাবা বাবার কয়েদখানায়। ওকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল। শাঙ্কো তানাকার মাকে জিজ্ঞেস করল–তাহলে তানাকাকে গুণ্ডারা কোথায় রেখেছে আপনি জানেন না।

না।

–তানাকা এক বন্ধুর কথা আমাকে বলেছিল। কী যেন নাম–ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ করে ভাবতে ভাবতে চোখ খুলল–হ্যাঁ আরোনাস। আরোনাসের বাড়ি ওদের দোকানের কাছে। ওখানে গিয়ে খোঁজখবর করতে হবে। চল।

ওরা তানাকাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

রাস্তা ধরে চলল বাজারের দিকে। তানাকাদের দোকানে দেখল ঘরে কাঁচটকা আলো। তারই আলোতে কয়েকটা কাঠের পাটাতন দেখল। একটা বড় পাটাতনে বিছানা পাতা। বোধহয় যুবকটি এখানে শুয়েছিল। ওদের দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল–

দাঁড়ান–আপনাদের শুকনো পোশাক এনে দিই। যুবকটি ভেতরে চলে গেল।

ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল। দুজনেই গায়ের পোশাক খুলতে লাগল। সব ভিজে ঢোল।

কিছু পরে যুবকটি এল। হাতে শুকনো কাপড় জামা। ফ্রান্সিসরা ভেজা জামাকাপড় একটা কাঠের পাটাতনের ওপর রাখল। শুকনো পোশাক পরল। মাথার চুলের মধ্যে আঙ্গুল চালিয়ে চুল পাট করল।

এতক্ষণে ফ্রান্সিসরা বুঝতে পারল ওরা কী পরিশ্রান্ত! যুবকটি বলল–এবার শুয়ে পড়ন। রাত আর বেশি নেই।

ফ্রান্সিস বলল–কিন্তু আপনি জানতে চাইলেন না আমরা কোথা থেকে আসছি কোথায় যাবো।

কী দরকার। যুবকটি হেসে বলল–আপনারা ঝড়-বৃষ্টিতে আটকা পড়েছেন। আপনাদের সাহায্য করতে হবে। ব্যস্-এর চেয়ে বেশী জেনে কী হবে?

ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে পড়ল। বলল–আমরা সবাই যদি এরকম হতাম? আমাদের কত প্রশ্ন কত অনুসন্ধিৎসা? পথিক হয়তো অনেকদূর হেঁটে এসেছে। কোথায় তাকে বিশ্রামের ব্যবস্থা করবে তা নয় হাজারো প্রশ্নকী নাম? জাত কী? কোত্থেকে আসছেন? দেশ কোথায়? বেচারি পথিকের প্রাণ ওষ্ঠাগত।

দুজনে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট পাখির গান শুনল। তার মানে রাত শেষ হয়ে এসেছে। দুজনে ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুম ভাঙতে বেলাই হল। ফ্রান্সিসরা তাড়াতাড়ি উঠে বসল। দেখল কোনার দিকে একটা কাঠের পীপে। শাঙ্কো পীপেটার কাছে গেল। দেখল পীপে ভর্তি জল। পাশে একটা কাঠের পাত্র। শাঙ্কো জল তুলে মুখ হাত ধুল। ফ্রান্সিসও নেমে এসে হাতমুখ ধুচ্ছে তখনই যুবকটি ঘরে ঢুকল। পেছনে কাজের লোকের হাতে একটা কাঠের থালা। তাতে খাবার রাখা। কাজের লোকটি খাবারের থালা বিছানায় রাখল। ফ্রান্সিসরা তখন ক্ষুধার্ত। তাড়াতাড়ি খেতে শুরু করল।

যুবকটি ঘরে ঢুকল। হেসে বলল–মা বলছিলেন–আপনারা আজকে এখানে। থাকুন। ওরকম ঝড়বৃষ্টির মধ্যে এসেছেন। আপনাদের কোনো কষ্ট হবে না।

–আমাদের থাকবার উপায় নেই। তবে পোশাক তো এখনও শুকোয়নি। ঐ পোশাকের জন্যেই আমাদের আজকের দিনটা থাকতে হবে।

–তাহলে মাকে বলে আসি আপনারা থাকবেন। যুবকটি চলে গেল।

সারাটা দিন ফ্রান্সিসরা শুয়ে বসে কাটালো। একটু বেলায় যুবকটির মেয়ে এল। ফ্রান্সিস মেয়েটির সঙ্গে কথাটথা বলল। ফ্রান্সিস ওদের মুক্তোর সমুদ্রের গল্প ছোট্ট করে বলল। মেয়েটি খুব খুশি। আরো গল্প শুনতে চাইল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো ওকে গল্প শোনাও। অগত্যা শাঙ্কো ওকে হীরের পাহাড়ের গল্প বলল।

রাতে খাওয়ার ডাক পড়ল। এই ঘরেই পাটাতনের ওপর ফ্রান্সিসদের খেতে দেওয়া হল। দুজনেই পেট পুরে খেল। আবার কখন খাবার জুটবে কে জানে।

রাতের খাওয়া খাচ্ছে। তখনই ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো পোশাক শুকিয়ে গেছে। কাজেই আর দেরি নয়।

রাতেই চলতে শুরু করবো। আর দেরি করা ঠিক হবে না।

ওরা খাচ্ছে তখনই যুবকটি এল। বলল-রান্না কেমন হয়েছে?

-খুব ভালো। শাঙ্কো বলল।

ফ্রান্সিস বলল–বলছিলাম আমরা একটু পরেই বিশ্রাম নিয়ে চলে যাবো।

–আজ রাতটা থেকে গেলে হত না। যুবকটি বলল।

–আমরা নিরুপায়। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। কত যত্ন করে খাওয়ালেন শুতে দিলেন। ফ্রান্সিস বলল।

–না না। এতো মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য।

খাওয়ার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল দুজনে। তারপর উঠে দাঁড়াল। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল। বড় রাস্তায় উঠল। দিক ঠিক করে নিয়ে হাঁটতে লাগল। রাত শেষ হল। ভোর হল। তখনও ওরা হেঁটে চলেছে।

ওরা একটা বাড়ির কাছে এল। দেখল দরজা বন্ধ। অন্য একটা বাড়ির দরজা দেখল হাট করে খোলা। ফ্রান্সিস বলল–এই বাড়ির লোকেরা অতিথিবৎসল। চলো এখানেই দেখি।

দুজনে খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। একটা অল্পবয়সী ছেলে তখনই বেরিয়ে এল। শাঙ্কো বলল–তোমার বাবা-মা কোথায়?

ভেতরে।

–বাবাকে একটু ডেকে নিয়ে এসো।

–ছেলেটা বাবা বাবা বলে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।

একটু পরেই একজন রোগামত লোক বেরিয়ে এল। খোলা দরজার কাছে এল। ফ্রান্সিসদের দিকে একবার তাকিয়ে বুঝল ওরা বিদেশি। ভদ্রলোক বললেন আপনারা তো বিদেশি? আমার কাছে কিসের দরকার?

–আমরা খুব ক্ষুধার্ত আর পরিশ্রান্ত। আমাদের কিছু খেতে দিতে পারেন? শাঙ্কো বলল।

–নিশ্চয়ই। পিরবো। আপনা&#