ঘরের পথ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

যতীনবাবুর চাকর - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আমার বাবা গিয়েছিল বিদেশে, রোজগার করতে। মা গিয়েছিল পাহাড়ে পাতা কুড়োতে। কেউই আর ফিরল না।

আমাদের বাড়িটা ছিল মাটির। তাতে ফাটল ধরেছিল। যখন বাতাস বইত তখন সেই ফাটলের মুখে শিস দেওয়ার মতো শব্দ হত। যেন বাইরে থেকে কেউ ডাকছে। কখনও-কখনও রাত্রিবেলা সেই শব্দে ভয় পেয়ে আমি মাকে জড়িয়ে ধরতাম, মা আমাকে। মাটির দাওয়ায় কিংবা দেওয়ালে অশ্বত্থ গাছের চারা দেখলেই মা আমাকে সেটি কেটে ফেলতে বলত। অশ্বখ চারা কাটতে–কাটতে আমার অভ্যেস দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অবসর পেলেই আমি দা হাতে অশ্বত্থ চারা খুঁজে বেড়াতাম।

ঘরের চালে ভালো খড় ছিল না। বর্ষাকালে জল পড়লে আমাদের ভিজতে হত। সারা ঘর যখন জলে থইথই করত তখন মা আমাকে আধখানা আঁচলের আড়ালে রেখে আমাদের আগের দিনের সুখের গল্প বলত। আমাকে আঁচল দিয়ে ঢাকা ছিল মার স্বভাব। শীতে কিংবা বর্ষায় কিংবা ঝড়ে আমি মার আঁচলের আড়ালে চাপা থাকতাম। আমার বাবার একটা বুড়ো ঘোড়া ছিল। ঘোড়াটা কোনও কাজ করত না। আমি ঘাস কেটে এনে ওকে খাওয়াতাম। ঘোড়াটাকে বাবা খুব ভালোবাসত। আমি বাবাকে দেখিনি। যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন বাবা গিয়েছিল বিদেশে, রোজগার করতে। তারপর আর ফেরেনি। আমি বাবার ঘোড়াকে ভালোবাসতাম। ওর গায়ের গন্ধে আমার বাবার কথা মনে পড়ত।

বাবা ফিরল না দেখে মা পাহাড়ে কাঠ–পাতা কুড়োতে যেত। আমাদের গাঁয়ের গরিব মানুষেরা সবাই কাঠ কুড়োত। মা তাদের সঙ্গে খুব ভোরে চলে যেত। ফিরত সন্ধেবেলায়, কখনও-কখনও রাত্রি হত। যাওয়ার সময় মা বলত, সারাদিনে ঘর পাহারা দিও। ঘোড়াটাকে ঘাসজল দিও। সন্ধেবেলায় শুকনো পাতা জড়ো করে বাইরে একটা আগুন জ্বেলে তার পাশে বসে থেকো। পাহাড় থেকে আগুনটি দেখতে পেলেই আমি বুঝব তুমি ভালো আছ, ঘরে আছ। তা হলেই আমার ভাবনা থাকবে না।

আমি সারাদিন ঘরে থাকতাম। ঘোড়াটাকে ঘাসজল দিতাম। আর সন্ধে হলেই শুকনো পাতা জড়ো করে বাইরে একটি মস্ত আগুন জ্বালতাম। আগুনের পাশে বসে দেখতাম দূরে বহু দূরে নীল পাহাড় দৈত্যের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার বাঁদিকে মস্ত মাঠের ওপাশে, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর পাহাড়টি মেঘ আর কুয়াশার মতো আবছা হয়ে যেত। তবু পাহাড়টি আমার চোখ থেকে কখনও হারিয়ে যায়নি। ছবির মতো পাহাড়টা আমার চোখের ওপর স্থির থাকত। আগুন জ্বলতে-জ্বলতে নিবে আসত। পাহাড়টিকে আমার বড় ভয়। ওই পাহাড় পেরিয়ে আমার বাবা চলে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। মা কখন ফিরবে ভাবতে-ভাবতে আমি কখনও-কখনও ঘুমিয়ে পড়ে মা ফিরে আসার স্বপ্ন দেখতাম।

কখনও-কখনও মা আমাকে বাবার গল্প বলত। ওই পাহাড়ের ওপাশে অনেক নদী–নালা খাল–বিল পেরিয়ে বাবা বিদেশে গেছে। সেখানে যেতে হলে ক’টা নদী ক’টা পাহাড় পার হতে হয়। মা জানে না। মা শুধু জানে, একদিন বাবা অনেক রোজগার করে ফিরে আসবে। তখন আমি নতুন জামা জুতো পরে একটা বাচ্চা ঘোড়ায় চড়ে বাবার বুড়ো ঘোড়াটার পাশে-পাশে টগবগিয়ে কোথাও চলে যাব।

মা কখনও-কখনও পাহাড়টাকে অভিশাপ দিত, ওটা গোটা পৃথিবীটাকে আড়াল করে বসে আছে বলে। আবার কাঠ–পাতা কুড়োতে ওই পাহাড়েই যেত।

একদিন মা আর ফিরল না। অনেকক্ষণ জ্বলে–জ্বলে আগুনটা নিবল। দূরের নীচে পাহাড় মেঘ আর কুয়াশার মতো আবছা হল। মা আর ফিরল না।

ভোর হতেই আমি মার খোঁজে বেরোলাম। যারা কাঠ কুড়োতে গিয়েছিল তারা সবাই ফিরেছে, শুধু আমার মা বাদে। তাদের মধ্যে একজন বলল , তোর মা গেছে সুখের খোঁজে। পাহাড়ের ওপারে। তুই ছিলি গলার কাঁটা, তাই তোকে ফেলে গেছে।

আমার বিশ্বাস হল না। ওরা হাসল প্রাণ খুলে। আমার পিঠে চওড়া হাতের চাপড় মেরে বলল , ‘তার জন্য ভাবনা কী, তুইও তো জোয়ান মরদ হয়ে উঠবি দু-দিন বাদে। খেটে খেতে পারবি না? চিরকাল কি মায়ের আঁচল চাপা থাকে কেউ, না কি আমাদের তাই করলে চলে?’

মা আমাকে ফাঁকি দিয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে ভেবে সারা গাঁ পাতি–পাতি করে খুঁজলাম। ওরা বলল , ‘খুঁজে কী করবি! তার চেয়ে পাহাড়ে চল। পাতা কুড়োবি।’

আমি পাহাড়ে গেলাম। কিন্তু কাঠ–পাতা কুড়োতে মন গেল না।

ওরা বলল , ‘তোর মা গেছে সুখের খোঁজে। পাহাড়ের ওপারে। আয়, কাঠ কুড়োবি।’

আমি জেনেছিলাম যে আমি আছি বলেই মার সুখ। সুখ মানেই দুঃখের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি। আমি আছি বলেই মার সেই শক্তি আছে। অনেক বড় হয়ে জেনেছিলাম যে আমিই মার দুঃখ, আমি ছিলাম বলেই মা সুখের খোঁজে চলে যেতে পারছিল না। দুঃখ মানেই সুখের পথ আগলে যে দাঁড়ায়।

আমার বাবা গেল পাহাড়ের ওপারে, আমার মা-ও আর ফিরল না। রইল শুধু ঘোড়াটা। সেই ঘোড়াটাও বুড়ো হয়েছে। কাজকর্ম করতে পারে না। কখনও মাঠে চরতে যায়, বেশিরভাগ সময়েই ঘরে বসে ঝিমোয়। আমি ঘাস কেটে এনে খাওয়াই, জল দিই। যেমন বাপ বুড়ো হলে ছেলে তার কাজকর্ম করে। মাঝে-মাঝে ওর প্রকাণ্ড বুড়ো মাথাটি আমার কাঁধে নামিয়ে রাখত। তখন ওর ঘন, গাঢ় দীর্ঘ নিশ্বাসের শব্দ শোনা যেত। সে নিশ্বাসে ওর গায়ের চামড়া থরথর করে কাঁপত। ওর মুখে, চোয়ালে, ঘাড়ে শিরাগুলো থাকত ফুলে, ওর ভাঙাচোরা মুখটা ছিল গাছের কাণ্ডের মতো এবড়োখেবড়ো। ওর প্রকাণ্ড ঘাড়টা দু-হাতে জড়িয়ে থেকে আমার মনে হত যেন বহুদিনের পুরোনো একটা বটগাছ শাখাপ্রশাখা মেলে আমায় আশ্রয় দিয়েছে।

একদিন ঘোড়াটিকে দেখে গাঁওবুড়ো বলল , ‘ঘোড়াতে চেপে তোর বাপ বিয়ে করতে গিয়েছিল। ঘোড়াটি তোর বাপের মতন। ওকে যত্ন–আত্তি–করিস!’

ঘোড়াটিকে নিয়ে ছিলাম মেতে। বাদবাকি সময়টা কাটত চুপচাপ দাওয়ায় বসে। সারাদিন। বাতাস আমাদের ফাঁকা বাড়িটায় শিস দিয়ে খেলা করত। দেখতাম, গুড়মি শাকের জঙ্গলে চড়াই নেচে বেড়াচ্ছে, ধনে পাতার গন্ধে বাতাস ভারী, সরসর করে গাছের শুকনো পাতায় বাতাস বইছে। কুয়োর পারের ছোট্ট একটু গর্তে জমে থাকা জলে শালিক চান করছে জল ছিটিয়ে। ও চলে গেলে জলের কয়েকটা সরু রেখা থাকত মাটিতে, কয়েকটা পালক বাতাসে। আমার চকচকে দা’টাতে মরচে পড়ল। সারা বাড়িটায় অশ্বখ চারা উঠল গজিয়ে।

দিন কাটে। সন্ধে হলে পাতা জড়ো করে আগুন জ্বেলে চুপ করে শুয়ে থাকি। আগুনটা মরে এলে তার নরম আঁচ অনেকটা মার শরীরের তাপের মতো মনে হয়। তাই কখনও ঘুম আসে শরীর অবশ করে দিয়ে।

যে দাই আমার নাড়ি কেটেছিল সে এসে একদিন বলল , ‘এমনি করে কি না খেয়ে মরবি? তার চেয়ে আমার কাছে চল। আমার তো ছেলে নেই, একটা মাত্র মেয়ে। দুজনে বেশ থাকবি।’

‘উঁহু। আমি রাতে স্বপ্ন দেখি বাবা ফিরে আসছে।’

‘হ্যাঁ যেমন তোর মা মুখপুড়ী ফিরল। তা খাস কী?’

‘শাকপাতা যখন যা হয়।’

বুড়ি গজগজ করে আমাকে বকতে–বকতে চলে গেল।

তারপর থেকে দাইমার মেয়ে চন্দ্রা আমার জন্য ভাত আনত রোজ। ভাতের থালাটা মাটিতে রেখে বেড়ালের মতো খাপ পেতে আমার দিকে চেয়ে থাকত চন্দ্রা, যেন শহরের মানুষ দেখছে।

একদিন আমি বললাম, ‘কী দেখছিস? কী দেখিস রোজ?’

ও বলল , ‘তোকে। তুই একটা বুড়ো জানোয়ারের সঙ্গে থাকিস কেন?’

‘ওকে আমি আমার বাপের মতো ভালোবাসি।’

ও খিলখিল করে হাসল। তারপর আমার চোখের দিকে চেয়ে ভয় পেয়ে থামল। বলল , ‘ভালোবাসার আর লোক পেলি না। ওটা চড়ে তুই কোন দেশ জয় করতে যাবি?’

আমি ভাবলাম, যাব, একদিন যাব। পুবদিকে যাব–যে দিকে সূর্য ওঠে। একদিন আমি রাজা হয়ে ফিরব, দেখিস। আমি বললাম, ‘জানি না রে।’

ও হাত তুলে আমাকে আমার ঘর দেখাল। বলল , ‘ওই দেখ গাছের শেকড়গুলো সাপের মতো দেওয়ালের মাটিতে গর্ত খুঁড়ছে। তোর চারপাশের দেওয়াল আর বেশিদিন থাকবে না; ধসে পড়বে! সময় থাকতে শত্রুরগুলোকে মুড়িয়ে কাট!’

আমি ঠাট্টা করে বললাম, ‘ওরা আমার মায়ের মতো। কেটে ফেললে বাইরে থেকে ডালপালা দেখা যায় না, কিন্তু মনের মধ্যে ওদের শেকড় থাকে।’

শুনে ও রাগ করে চলে গেল। বলে গেল, ‘তোর মরণ এসেছে ঘনিয়ে। একদিন তুই দেওয়ালচাপা হয়ে মরবি।’

আমি ভাবলাম, শেকড়গুলো গর্ত খুড়বে, আরও গভীর হবে। মনের দেওয়ালে চিড় ধরবে, ফাটল হবে। তারপর একদিন চৌচির হয়ে ভাঙবে। সেদিন আমি আমার বুড়ো ঘোড়ায় চেপে পুবদিকে রওনা দেব। গাঁয়ের লোকেরা দেখবে আমার লাঠির আগায় বাঁধা পুটলিটা আস্তে-আস্তে দূর থেকে দূরে পাকা ধানের খেতের আড়ালে মিলিয়ে গেল। ওরা জানবে, আমি ফিরে আসব একদিন। রাজা হয়ে।

একদিন চন্দ্রা আমার ভাত নিয়ে এল না। ফাগনলালের ঘরের পাশ দিয়ে মৌরিখেতের কিনারায় কিনারায় যে পথটা ধরে চন্দ্রা আসে, সেদিকে চেয়ে সারা দুপুর কাটল। চন্দ্রা এল না। তারপর দিনও না। চন্দ্রা এল না দেখে আমি উঠে খুঁজে-পেতে আমার পুরোনো মরচে ধরা দা’টা বের করে পাথরে শান দিতে বসলাম।

সারাটা দুপুর পাথরে মুখ ঘষে দা’টা ঝকঝক করে হেসে উঠল, ওর গায়ে আগুন ছুটল। দা’য়ে শান দিয়ে–দিয়ে আমার হাতপায়ের মাংসগুলো ফুলে উঠল, শিরায়-শিরায় গরম রক্ত ছুটল টগবগিয়ে। কেমন যেন খুশি লাগল। নেশা পেল।

ভেবেছিলাম সূর্য ডোবার আগেই অশ্বথের চারাগুলো কেটে ফেলব। এমন সময় চন্দ্রা এল হাতে ভাতের থালা নিয়ে। রোজ যেমন আসত।

আমি বললাম, ‘এতদিন আসিসনি কেন?’

ও গম্ভীর হয়ে বলে, ‘একটা বাঘ রোজ আমার পথ আগলে থাক। বলে, কোথায় যাচ্ছিস? থালা নামিয়ে রাখ সামনে আর বসে-বসে আমার লেজে হাত বুলিয়ে দে। নইলে তোকে যমের বাড়ি পাঠাব। রোজ এমনি করে বাঘটা তোর ভাত খেয়ে ফেলে।’

আমি বললাম, জানি। এ গল্প আমি মার কাছে শুনেছি। এক বুড়ি রোজ তার ছেলের কাছে খাবার নিয়ে যেত, আর পথ আগলে থাকত বাঘ।

‘হ্যাঁ, শুনেছিস। তাতে কী? এমন বুঝি হয় না?’

আমি ভেবেছিলাম, বড় হয়ে আমি বাঘটাকে মেরে ফেলব, খিদেকে বাঁচিয়ে রাখতে নেই, তেষ্টাকে বাঁচিয়ে রাখতে নেই। পথ আগলে যেই থাকবে তাকে সাফ করে দাও।

চন্দ্রা খিলখিল করে হাসল মুখ আঁচল দিয়ে। বলল , ‘তুই বাঘটাকে মারবি, না ওর লেজে হাত বুলিয়ে দিবি?’

আমি বললাম, ‘জানি না।’

ও বলল , ‘মা দেখছিল, তুই খিদের জ্বালায় আমাদের বাড়ি যাস কি না। মা তোকে যাচাই করছিল। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে মা বলেছে তুই মানুষ নয়। তোর বাপটা ছিল একটি গোঁয়ার, তাই একমুখো চলে গেছে। ঘরের পথ ফিরে চিনল না। তুইও যাবি, যাবি। কাঁদতে কাঁদতে মা ভাত বেড়ে দিল।’

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে, অনেক ভেবে চন্দ্রা বলল , ‘কিন্তু আমি জানি তুই যাবি না।’

এই বলে ও চলে গেল। আমি আমার দা’টা হাতে নিলাম। এক-এক কোপে অশ্বথের মোটা মোটা ডালগুলো খসে পড়তে লাগল। আমার শরীর গরম হল, ছলাৎছল করে রক্ত বইল শিরায় শিরায়। আমি আপন মনে হাসতে লাগলাম। শীতকালে আমাদের বুড়ো ঘোড়াটার গা থেকে ধোঁয়ার মতো একটা ভাপ বেরোত। সেই ভাপে ওর রক্তমাংস আর ঘামের গন্ধ পাওয়া যেত। নিজের শরীর থেকে আমি তেমনি এক গন্ধ পেলাম। মদের যেমন স্বাদ নেই, এ-গন্ধেরও তেমন ভালোমন্দ নেই। এ শুধু আমাকে মাতাল করে। আমি আপন মনে হাসলাম। যেন আমার নেশা হল। আমার ইচ্ছে নিজের শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে আদর করি। মাটির দাওয়ায় আমি শরীরটাকে গড়িয়ে দিলাম। আমার শরীরের ঘাম মাটির সঙ্গে মিশল। শীতের শেষে বসন্তের গোড়ার দিকে আমার কাছে এক বাঁশিওয়ালা এল। তখন বাতাসে টান লেগেছে। শুকনো পাতাগুলো টুপটাপ করে ঝরে-ঝরে শেষ হয়েছে। খেতে মটর শাকে পাক ধরল। যারা শুকনো কাঠ-পাতা কুড়োতে যেত তাদের দিন গেল।

এমনি একদিন শেষ দুপুরে অনেক দূর থেকে বাঁশিওয়ালা এসে আমার দাওয়ায় বসল। তার গায়ে একশো রঙের একশো তালি দেওয়া একটা জোব্বা, মাথায় একটা মস্ত পাগড়ি। সেই পাগড়িটা তার কপালটিকে ঢেকে ফেলেছে। রোগা দুটো পা রাঙা ধুলোয় মাখা। আমি কখনও এই বাঁশিওয়ালাকে দেখিনি।

সে বলল , ‘আমি বাঁশি বিক্রি করিনি। বাঁশির সুর বিক্রি করি।’ এই বলে সে তার বাঁশিতে একটা অদ্ভুত সুর বাজাল।

আমি বললাম, ‘বাঁশিতে তুমি কী সুর বাজালে? আমি তার কতক বুঝলাম, কতক বুঝলাম না।’

বাঁশিওয়ালা তার ঘন জ্বর নীচে গভীর গর্তের মতো চোখ দুটো দিয়ে আমায় দেখল। বলল ‘এ সুর আমি কোথাও শিখিনি বাবা, কেউ আমাকে শেখায়নি। আমার কোনও গুরু নেই। আমি হাটে মাঠে ঘাটে যা শুনি তাই বাজিয়ে বেড়াই। কখনও নোঙর করা নৌকোয় জলের ঢেউ লাগবার সুর, কখনও শীতের শুকনো পাতায় বাতাস লাগবার সুর।’

সে আবার তার বাঁশিতে ফুঁ দিল। শেষে শীতের শুকনো বাতাসে বাঁশির টান লাগল। কয়েকটা সুর তীরের মতো আকাশে ছড়িয়ে মিলিয়ে গেল। আমার চোখের সামনে দুপুরটা মাতালের মতো টলতে লাগল। যেন অনেক দূর পথ! আমাদের এই মৌরি খেত ডিঙিয়ে ধানের আবাদের পাশ দিয়ে পাহাড় পেরিয়ে চলেছে–চলেছে–চলেছে। কত গঞ্জ, কত ব্যাপারীর আস্তানা, কত বন্দর, ঘাট মাঠ পেরিয়ে যাওয়া দেশ। বাঁশির সুর সেই দূর-দূরান্তের আভাস মাত্র নিয়ে কোকিলের অস্পষ্ট ডাকের মতো নরম, বিষণ্ণ হয়ে ফিরে ফিরে আসছে। সেই পথ ধরে, অনেক আলো, অনেক অন্ধকার মাড়িয়ে মাড়িয়ে কে যেন আসছে–আসছে–আসছে।

বড় ক্লান্ত পথ! বড় দীর্ঘ পথ! আমি চোখ বুজে ভাবলাম, সে আমার বাবা। কত দিন গেল, কত রাত গেল। ঘোড়াটি বুড়ো হল। বাবা আর ফিরল না।

বাঁশিওয়ালা সুর পালটে নতুন সুর ধরল। কখন আমার চোখ ছাপিয়ে কান্না এসেছে। এ কেমন সুর যা দিনের আলোকে অন্ধকার করে দেয়।

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘এর মানে কী? আমাকে বুঝিয়ে দাও।’

বাঁশিওয়ালা থামল না।

যেন এতদিন মাঠটা ছিল রোদে পোড়া, ফাটা-ফাটা। একদিন পাহাড়ে মেঘ জমল। বৃষ্টি নামল। অঝোর ধারে বৃষ্টি। মাটির কোষে-কোষে জল ঢুকল। বীজধান ফুলে উঠল। বুক ফাটিয়ে শিষ বার করল আকাশে।

বাঁশিওয়ালা থামল। বলল , ‘এর অর্থ যেমন করে কুঁড়ি থেকে ফুল হয় আস্তে-আস্তে, তোমার চোখের আড়ালে অন্ধকারে যেমন করে আস্তে-আস্তে পাপড়িগুলো মেলে দেয়, যেমন করে শুকনো

পাতা ঝরে পড়ে আবার নতুন পাতায় ছেয়ে যায় গাছ তেমনি করে তোমার দেহেও একটা ঋতু আসে আর-একটা যায়।’

এই বলে বাঁশিওয়ালা আবার তার বাঁশিতে সুর দিল। যেন বলল , বুড়ো ঘোড়াটার জন্য দুঃখ কোরো না। এক-একটি ঋতু যায়, আর-একটি আসে। দুঃখকে সহ্য করো। খেতে আগুন লাগলে ফসল ভালো হয়।

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘এ সুর তুমি কোথায় পেলে?

সে দাঁড়িয়ে উঠে হাসল।

আমি বললাম, ‘আমাকে এ সুর শিখিয়ে দাও। আমি তোমার মতো জোব্বা পরে বাঁশি বাজিয়ে বেড়াব।’

বাঁশিওয়ালা ফিরে বলল , ‘তুমি আমাকে অবাক করলে বাবা, এ জোব্বা কি তোমাকে মানায়! আমি যেখানে যেমন পেয়েছি তেমন কুড়িয়ে ঘুরিয়ে এই কাপড়ের টুকরোগুলো জুড়ে সেলাই করে জোব্বা বানিয়েছি। যারা সুখে আছে এ জোব্বা তারা সাধ করে পরে না। আমার মনে রং নেই, তাই বাইরে এত রঙের বাহার।’

বাঁশিওয়ালা চলতে লাগল, আমি দেখলাম শীতের ঘন রোদে রোগা দুটো পায়ে রাঙা ধুলো মেখে সে আস্তে-আস্তে আমাদের পাড়া ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ডাকছে না। শেষ শীতের গরম দুপুরে সেই অদ্ভুত বাঁশিওয়ালা আর তার সুর দূর থেকে দূরান্তরে মিলিয়ে গেল।

আমি কাঁদতে কাঁদতে ভাবলাম, এ সুর তুমি কোথায় পেলে বাঁশিওয়ালা। আমার সারাটা দিন যেন টালমাটাল–টালমাটাল। যেন আমি বিনি মদের বোতল। যেন আমি এক পাগল বাঁশিওয়ালা। শিরা ছিঁড়ে সুর তৈরি করে–সে সুরে আমি সারাদিন গাই। কাঁদি। কেন বাঁশিওয়ালা আমাকে দিল সারাদিন বাজাবার এই বাঁশি? আমি যে একে তাড়াতে পারি না। এ যে আগুনে দিলে পোড়ে না, ঝড়ে ওড়ে না। পোষা কবুতরের মতো নড়ে–চড়ে ঘুরে বেড়ায়। উড়ে যায় না।

উঁচু–নীচু পথ। পাথর ছড়ানো। চড়াই–উতরাই ভেঙে বাঁশিওয়ালা চলেছে। শুকনো হাওয়ায়। তার চামড়া ফেটেছে, পাথরে তার পা ফেটেছে। তবু তার চলবার শেষ নেই। সে পুব থেকে। পশ্চিমে গেল। যেদিকে সূর্য ওঠে সেদিক থেকে যেদিকে সূর্য ডোবে সেদিকে গেল, যে পথে আমার বাবা গেছে তার বুড়ো ঘোড়া রেখে, যেদিকে মা গেছে আগুনের পাশে তার ছেলেকে বসিয়ে রেখে।

বুড়ো ঘোড়াটার জন্য দুঃখ কোরো না। খেতে আগুন দিলে ফসল ভালো হয়। মাটির কোষে কোষে বৃষ্টির জল ঢুকবে, বীজধান কেঁচোর মতো ফুলবে, বুক ফাটিয়ে শিষ বের করবে আকাশে। আমি জানি বাঁশিওয়ালা আর ফিরবে না। কোনওদিন না। দাওয়ায় শুয়ে কাঁদতে–কাঁদতে কখন আমার দিন গেল।

একদিন সকালে ঘোড়াটাকে দেখে মনে হল আমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমার সামনেই বুড়ো ঘোড়াটা কখন যেন আরও একটু বুড়ো হয়ে গেছে। ওর গায়ে হেলান দিয়ে আমি আমার মাকে ভাবলাম। কিন্তু মার মুখ আমার মনে এল না। রোদ লেগে ঘাসের বুক থেকে শিশির যেমন ভাপ হয়ে মিলিয়ে যায়, তেমনি করে মার মুখটা হারিয়ে গেছে। শাড়ির আঁচল, পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকা শান্ত ছায়ায় ডাকা দিঘির মতো সেই চোখ আমি আগের জন্মে দেখেছিলাম।

গাঁওবুড়ো আমায় দেখে চোখ কুঁচকে বলল, ‘তুই যে রীতিমতো পুরুষমানুষ হয়ে উঠলি! কখন এত ঢ্যাঙা হয়ে উঠলি, বেড়ে উঠলি আমাদের চোখের সামনে, টেরও পেলাম না।’

আমি লজ্জা পেলাম।

গাঁওবুড়ো বলল , ‘তোর গড়নপেটন হয়েছে তোর বাবার মতন, চোখ দুটো পেয়েছিস মার। তা এবার তো জোয়ান হলি, কাজকর্মে লেগে যা। বসে থাকিস না। দিনগুলো চলে যেতে দিস না। বুড়ো ঘোড়াটাকে দানাপানি দিস, ঘর সামলে রাখিস।’

আমি ভাবলাম গাঁওবুড়োকে বাঁশিওয়ালার কথা বলব। আমার চোখের দিকে চেয়ে গাঁওবুড়ো হাসল, ‘জানি রে, জানি, তোর কাছে এক বাঁশিওয়ালা এসেছিল। সে মাত্র একবারই আসে। মাত্র একবার।’ গাঁওবুড়ো তার নড়বড়ে মাথাটা দোলাল, ‘তাই তো বলছি দিনগুলো চলে যেতে দিস না। বসে থাকিস না। ঘোড়াটাকে দানাপানি দিস। ঘরদোর সামলে রাখিস।’

চন্দ্রা এসে বলল , ‘তুই নাকি পয়সা দিয়ে বাঁশির সুর কিনেছিস?’

আমি বলি, ‘হু।’

চন্দ্রা আমার কাছে এসে বসল, ‘পাখি কিনেছিস, আর খাঁচা কিনিসনি? সুর কিনেছিস আর বাঁশি কিনিসনি? তবে তোর ঘরে রইল কী, তোর নিজের বলতে থাকল কী? কিনতে হয় এমন জিনিস কিনবি যা হাত দিয়ে ধরাছোঁয়া যায়, চোখ দিয়ে দেখা যায়, যাকে ধরে ছুঁয়ে দেখে মনের সুখ, ভালো না লাগলে যাকে বেচে দিয়ে আবার পয়সা পাওয়া যায়।’

এই বলে ও হাসল। বলল , ‘আমি আর কতকাল তোর জন্য ভাত বয়ে আনব? তোরই তো ভাত দেওয়ার বয়স হল। তুই কাজকর্ম করবি, না সারাদিন দাওয়ায় বসে হাঁ করে আকাশ গিলবি?’

আমি বললাম, ‘জানি না।’

‘গাঁওবুড়ো বলছিল ঘরে মেয়ে না দিলে জোয়ানগুলো কাজকর্মে মন দেয় না।’

এই বলে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ও চলে গেল। আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম ওর বাসন্তী রঙের ডুরে শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়তে–উড়তে ফাগনলালের দাওয়া পেরিয়ে মৌরিখেতের পাশ দিয়ে ওর শরীরের গন্ধ ছড়াতে-ছড়াতে চলে গেল। খুব পাতলা বুটিদার একটা মেঘ রোদের মুখের ওপর দিয়ে সরে গেল। সেই ছায়াটা একটু সময়ের জন্য ওর মুখের ওপর থাকল। বাতাস ওর চারদিকে একটু খেলা করল। ওর চারপাশে উড়ে বেড়াতে লাগল কয়েকটা মৌমাছি।

আমি বাঁশির সুর কিনেছি বলে গাঁয়ের বুড়োরা আমার নিন্দে করল। দুঃখ করে বলল , আমার ঘরে কিছুই থাকবে না। যেমন করে আমার বাবা থাকল না, মা থাকল না। গাঁয়ের জোয়ান মরদরা এসে আমায় পিঠ চাপড়ে গেল! এই তো চাই। বাঁশির সুর কিনবি, পাখির ডিম কিনবি। যেমন করে পারিস উড়িয়ে দিবি রোজগারের টাকা। আমরা জোয়ান মরদ, আমাদের রোজগারের। ভাবনা কী? দেখছিস না বুড়োগুলোর দশা, দু-আঙুলের ফাঁক দিয়ে পুরো আয়ুটা খরচ হয়ে গেল। ওরা আমাদের বেহিসেবি বলে। কিন্তু সামনের শীতে ওরা যখন মরবে তখন তো আমরাই থাকব। এই শুনে বুড়ো ঘোড়াটার কাছে গেলাম। ও আমার কাঁধে ওর প্রকাণ্ড মাথাটা রাখল।

কখন আমার শরীর দীঘল হয়েছে, হাত-পা কোমর হয়েছে সরু, আমার চামড়ায় টান লেগেছে, রুক্ষ হয়েছে মুখ তা আমি নিজেই জানি না। কিন্তু ও যেন টের পেল। আমার কাঁধে মুখ ঘষে শরীর কাঁপিয়ে ওর খুশি জানাল। ওর গাছের কাণ্ডের মতো এবড়ো–খেবড়ো মুখে আমার গাল রাখলাম। রেশমের মতো কেশর আমার হাতে খেলা করল। আমি বললাম, ‘বুড়ো, তুই আমার বাপ। কোনও ভাবনা করিস না, আমি তোকে দেখব।’

এই শুনে পাঁজর কাঁপিয়ে ও নিশ্বাস ছাড়ল। ঘোড়াটা বুড়ো হয়েছে বলে দুঃখ কোরো না। ও বুড়ো হচ্ছে তার মানে তুমি বড় হয়েছ। কবে শীত আসবে তার জন্য দুঃখ করে দিনগুলোকে চলে যেতে দিয়ো না। মনে রেখো, দু-আঙুলের ফাঁক দিয়ে স্রোতের জল বয়ে যায়। আটকানো যায় না। সামনের শীতে ঘোড়াটা যদি মরে, তুমি থাকবে।

‘বুড়ো, তুই আমার বাপ।’ আমি বললাম, ‘কোনও ভাবনা করিস না বুড়ো, আমি তোকে দেখব।’

ঘোড়াটা পুরোনো ঠান্ডা শরীর দিয়ে আমার শরীর থেকে তাপ নিল। আমি দু-হাতে ওর গলাটা জড়িয়ে চোখ বুজে রইলাম। যেন আমি পুরোনো প্রকাণ্ড একটা বটগাছের আশ্রয়ে আছি।

চন্দ্রা এসে বলল , ‘সারাদিন ঘরে বসে কী বকিস একা-একা?’

আমি শান্তভাবে ওর দিকে তাকালাম। ওর শরীর ঘামে ভিজে তেল–তেল করছে। দু-চোখে মিটিমিটি আলো। এ কেমন আলো? আমি কোনওদিন এমন আলো দেখিনি। ওর শরীর থেকে কেমন একটা মাতাল–মাতাল গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। আমি ভাবলাম বোধহয় কোনও ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। এ কেমন ফুল? জানি না। কেমন তার রং? জানি না।

ও আমার হাত টেনে বলল , ‘চল, তোকে আজ একটা নতুন জিনিস দেখাব।’

‘কী জিনিস?’

ও ঘন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল, ‘সে একটা রাজার বাড়ি। খুব অদ্ভুত।’

‘কোথায় সেটা?’

ও হাসল, ‘আছে আছে। তোর খুব কাছেই আছে। অথচ তুই দেখিসনি।’ চন্দ্রা ওর বুকের কাপড় সরিয়ে নিল। তারপর কাপড়টা ওকে একা রেখে মাটির ওপর ছড়িয়ে পড়ল। চোখে হাত চেপে ও বলল , ‘এ এমন রাজা যে দখল নেয় না, দখল ছাড়েও না। আমি সারাদিন সব কাজ ফেলে তার বাড়ি পাহারা দেব কেন?’

ওর বেলেমাটির মতো শরীরের দিকে চেয়ে আমি ভয় পেলাম।

চোখে হাত চেপে ও কাঁদছিল, ‘আমার সারা দিনের কাজ পড়ে থাকে। আনমনে আমার বেলা বয়ে যায়। তোর বাঁশিওয়ালা কি তোকে একথা বলেনি?’

সেই অচেনা ফুলের গন্ধ বাতাসে ভাসছে। এ কেমন ফুল জানি না। কেমন তার গন্ধ জানি না। আমার বুক ফেটে কান্না এল। আমি ভেবেছিলাম, যে বাঘটি রোজ পথ আগলে থাকে, বড় হয়ে তাকে মেরে ফেলব। কিন্তু ক’টা বাঘকে মারব আমি? গাঁওবুড়ো বলেছিল, ঘরদোর সামলে রাখিস। গাঁয়ের বুড়োরা বলেছিল বাঁশির সুর কিনিস না।

চন্দ্রা দু-হাতে আমার মাথাটা টেনে নিল। বলল , ‘আমি তোকে কতক বুঝি কতক বুঝি না!’

ওর বুক, ছিঁড়ে–নেওয়া ফুলের বোঁটার মতো আমার কপালে, চোখের পাতায় নরম হয়ে লেগে–লেগে মুছে গেল।

ও বলল , ‘একদিন তুই পাহাড়ে যাবি কাঠ কুড়োতে। সেদিন আমি তোর ঘর পাহারা দেব। পাতা জড়ো করে আগুন জ্বালব বাইরে, যেন তুই পাহাড় থেকে দেখতে পাস।’

বাঁশিওয়ালা তার প্রথম সুরে বলেছিল, ঘর বলতে তোর কোনও কিছুই নেই। কোনওদিন ছিল। বৃথাই তুই সারা বিকেল আগুন জ্বেলে পাহাড়ের দিকে চেয়ে রইলি। যারা পাহাড়ের ওপারে গেছে তারা আর ফিরবে না। আমি কাঁদতে লাগলাম।

চন্দ্রা কেঁদে–কেঁদে বলল , ‘তুই যদি আমাকে ছেড়ে না যাস, আমিও যাব না। আমরা ঘর বাঁধব।’

ওর চোখের জলে আমার মাথা ভিজল। আমি ভয় পেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ও আমাকে ওর বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। চুমু খেল আমার ঠোঁটে। জন্মের পর আমরা যেমন ছিলাম তেমনি হয়ে শুয়ে রইলাম।

বসন্তকাল প্রায় শেষ হয়ে এল। আমার বুড়ো ঘোড়াটা আরও বুড়ো হয়েছে। কুটকুট করে সারাদিন ঘাস খায়, কখনও ঝিমোয়।

বাতাসে গরম হলকা ছুটল। বুড়োরা বলল , ‘এইবার আকাল এল। ঘাট শুকোবে, মাঠ ফাটবে। সেই বর্ষা যতদিন না আসছে।’

কাছাকাছি মাঠের ঘাসগুলো হলদে হয়ে এল। তাই আমি একদিন বুড়ো ঘোড়াটাকে দূরের মাঠে নিয়ে ছেড়ে দিলাম। সন্ধেবেলা ও নিজেই খুটখুট করে ঘরে ফিরতে লাগল। কিন্তু একদিন ও ফিরল না। সারা সন্ধে আমি দাওয়ায় বসে রইলাম পথের দিকে চেয়ে। দূরের পাহাড় ঝাঁপসা হয়ে এল। ও এল না। আকাশে মস্ত বড় চাঁদ উঠল। জ্যোৎস্নায় বান ডাকল দিগন্ত জুড়ে। কিন্তু পেটের নীচে নিজের বাঁকাচোরা বুড়ো ছায়াটা নিয়ে টুকটুক করে ও ফিরল না। অনেক ভেবে আমি হাতে দড়ির ফাঁস নিলাম। তারপর পথে নামলাম। মনে মনে বললাম : যখন আমি ছোট ছিলাম তখন কেউ আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। কিন্তু বুড়ো, তোকে আমি চলে যেতে দেব না। আমি তোকে শেষপর্যন্ত খুঁজে দেখব। চলতে-চলতে আমি ধানখেত ছাড়িয়ে, মরা মটর শাকের পাশ দিয়ে, বুড়ো বটের তলায় মহাবীরের থান পেরিয়ে গেলাম। তারপর দিগন্ত জোড়া মাঠ। মাঠে বান ডাকা সমুদ্রের মতো টলমল করছে জ্যোৎস্না। কিন্তু তার কোথাও আমার বুড়োর ছায়া নেই।

আমি পাগলের মতো সারা মাঠ বুড়োকে খুঁজতে লাগলাম। আমার ভাঙা গলার ডাক আমাকে ঘিরেই ঘুরতে লাগল। আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, ‘বুড়ো, আমি তোকে শেষপর্যন্ত খুঁজে দেখব।’

আমি মাঠ পেরিয়ে বনের মধ্যে ঢুকলাম। আমার চারধারে ঘন গাছ। আলো আর ছায়ার মধ্যে আমি হাঁটতে লাগলাম। তারপর আমি ভয় পেলাম। আমার মনে হল কেউ যেন আছে। কাছেই পাশেই। মৃত শুকনো পাতাগুলোতে শব্দ হল। মনে হল, যেন কোনও আত্মা আমার পিছু নিয়েছে। আমার গায়ে কাঁটা দিল। যেন সেই আত্মা আমার হাত ধরল, তারপর আমাকে চেনা পথ ভুলিয়ে নিয়ে চলল কোথাও। আমি ভাঙা গলায় বুড়োকে ডাকতে লাগলাম। বন পার হয়ে আমি একটা জলার ধারে এলাম। তাকিয়ে দেখলাম, আমি এর আগে কখনও এখানে আসিনি। এত জ্যোৎস্না আমি কোনওদিন দেখিনি। জলাটা মস্ত বড়। তার ওপাশেবুড়ো দাঁড়িয়ে আছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ও যেন কিছু দেখছে। আমি ডাকলাম, ‘বুড়ো, বুড়ো!’

ও শুনল না। তেমনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমি আস্তে-আস্তে ওর কাছে গেলাম, ওর গায়ে হাত দিয়ে ডাকলাম, ‘বুড়ো, তোকে আমি পেয়েছি।’

ও ঘাড় ফিরিয়ে আমাকে দেখাল। তারপর ভয় পেয়ে ও সরে গেল। আমি বুঝলাম, ও আমাকে চিনতে পারল না। আমি ওর কাছে এগিয়ে যেতে লাগলাম। ও চিৎকার করে আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে ছুটতে লাগল। ওর ছায়াটা এবড়ো–খেবড়ো মাঠের ওপর টাল খেতে লাগল। আমি ওর পিছনে ছুটলাম। প্রাণপণে ওকে ডাকলাম। সেই ভীষণ ভয়ঙ্কর জ্যোৎস্নার

মধ্যেও বুড়ো আমাকে চিনতে পারল না। আমি দড়ির ফাঁসটা মুঠো করে ধরলাম। তারপর শেষবারের মতো ওকে ডাকলাম। ও শুনল না। কাকে যেন ও দেখতে পেয়েছে। কে যেন ওকে নিয়ে যাচ্ছে।

আমি ফাঁসটা ছুঁড়ে দিলাম। ও দাঁড়িয়ে পড়ল। আমার হাতধরা দড়িটা থরথর করে কাঁপল। আমি বুঝলাম ফাঁসটা ওর গলায় পড়েছে।

আমি বললাম, ‘বুড়ো আমি তোকে চলে যেতে দেব না। দেব না।’

আমি কাছে এগোতেই বুড়ো চিৎকার করে ছুটতে চাইল। ফাঁসের দড়িটা কাঁপতে লাগল থরথর করে।

বুড়ো দড়িটা ছিঁড়ে চলে যেতে চাইল। আমি দড়িটা ছাড়লাম না। বললাম, ‘বুড়ো, আমি শেষপর্যন্ত লড়াই দেব।’

বুড়ো শুনল না। ছেড়ে যেতে চাইল। আমি ধরে রইলাম। কিন্তু বুড়োকে একসময়ে থামতে হল। চারটে পা ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়াল বুড়ো। কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ল।

কাছে গিয়ে দেখলাম ফাঁসটা ওর গলায় আটকে গেছে। ও দম নিতে পারছে না। আমি কপালের ঘাম মুছে বললাম, ‘বুড়ো, তোকে আমি যেতে দেব না। আমি শেষপর্যন্ত লড়াই দিয়েছি।’

এই বলে আমি ওর গলার ফাঁসটা খুলতে চাইলাম। কিন্তু ফাঁসটা খুলল না। নীচু হয়ে দেখলাম দড়ির গায়ে ছোট্ট একটা গিঁটে ফাঁসটা আটকে গেছে, গভীর হয়ে বসেছে বুড়োর গলায়।

আমি প্রাণপণে চেষ্টা করলাম। কপালে বিনবিনে ঘাম ফুটল। কিন্তু ফাঁসটা নড়ল না। বুড়ো ছটফট করতে লাগল। আমি দড়িতে দাঁত দিলাম। দড়িটা লোহার মতো বসেছে। আমার গলার রগ ফুলল, রক্তে ভরে গেল সারাটা মুখ। বুড়ো আমার দিকে চেয়ে আস্তে-আস্তে স্থির হয়ে এল।

আমি ওর মুখের কাছে মুখ চিৎকার করে বললাম, ‘বুড়ো, আমি ফাঁসটা খুলব, খুলব।’

বুড়ো আমার দিকে তাকাল। আমার গা থেকে পিতৃহত্যার সমস্ত পাপ মুছে নিতে চাইল। তারপর সেই ভয়ঙ্কর জ্যোৎস্নার ভেতর ওর দুটো চোখ ঘোলা হয়ে গেল। আমি বললাম, ‘বুড়ো, এই ফাঁসটা দিয়ে আমি তোকে ধরতে চেয়েছিলাম।’

আমি দড়িটা ছেড়ে দিয়ে গাঁয়ের পথ ধরলাম। ভাবলাম–আমার হাত দিয়ে কে তোকে মেরেছে আমি তা জানি না। জানি না।

আমার বাবা গিয়েছিল বিদেশে রোজগার করতে। আমার মা গিয়েছিল পাহাড়ে পাতা কুড়োতে। আমাদের ঘোড়াটা গিয়েছিল জলার ধারে, ঘাস খেতে। কেউই আর ফিরল না।

গাঁওবুড়ো একদিন সবাইকে ডেকে বলল , ‘শোনো তোমাদের এক গল্প বলি। গাছের তলায় ধুনি জ্বেলে একটা সাধু বসে থাকত। তাকে মস্ত বড় সাধু ভেবে গৃহস্থরা তার চারধারে হাতজোড় করে থাকত। একদিন একটা লোক এসে বলল , সাধুবাবা, আমার ইচ্ছে তোমাকে কিছু খাওয়াই। সাধু রাজি হল। লোকটি কিছু রুটি কিনে আনাল। তারপর আবার বলল , সাধুবাবা, তুমি এই শুকনো রুটি কী করে খাবে? তোমার লোটাটা দাও, দুধ নিয়ে আসি। সাধু খুশি হয়ে লোটা দিল। লোটা নিয়ে লোকটা সেই যে চলে গেল আর ফিরল না।’

সবাই বলল , ‘তারপর?’

গাঁওবুড়ো বলল , তারপর লোটার শোকে সাধুর মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে সে কী কান্না। সবাইকে ডেকে-ডেকে বলল , ‘দেখ–দেখ, চোট্টার কাণ্ড দেখ, আমাকে এক পোড়া রুটি খাইয়ে আমার রুপোর লোটাটা নিয়ে ভেগেছে।’

সবাই বলল , ‘তারপর?

গাঁওবুড়ো হাসল, ‘যার লোটা চুরি যায় সে বোকা। কিন্তু সেই লোটার শোকে যে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে সে আরও বোকা।

এই বলে শীত আসবার আগেই গাঁওবুড়ো মরে গেল। গাঁয়ের বুড়োরা জমায়েত হয়ে বলল , জন্মের পর মৃত্যু, তারপর আবার জন্ম। ঠিক যেমন ঢেউয়ের–পর–ঢেউ। চলতে-চলতে পড়ে যাওয়া, আবার ওঠা। কে যেন আমাদের নিয়ে দিনরাত এই খেলা খেলছে। এ খেলার শেষ নেই।’

শীত আসছে শুনে বুড়োরা ভয় পেল। বলল , ‘এবার ঘর ছাড়তে হবে।’

কেউ বলল , ‘ঘর আর কোথায়! ওই তো নড়বড়ে পাতার ছাউনি, রোদ মানে না, জল মানে না!’

বুড়ো ঘোড়ার মতো খুটখুট করে শীত এল। তারপর বুড়োদের কাঁধে মাথা রেখে তাদের দেহ থেকে তাপ শুষে নিতে লাগল। বুড়োরা পাতা জড়ো করে আগুন জ্বালল। গোল হয়ে ঘিরে বসল। তারপর প্রাণপণে বলতে লাগল, ‘কে যেন জন্মের পর স্রোতে ভাসিয়েছিল। তাই চেয়ে দেখলাম। মাথার ওপর ছাদ নেই, চারিদিকের দেওয়াল নেই।’

কেউ বলল , ‘অনেকের সঙ্গে মিলেমিশে পথ চলছিলাম কোনও ভিন–গাঁয়ের সীমানা ভিঙিয়ে। তারপর অন্ধকার হল যারা ছিল সাথের সাথী তাদের মুখ দেখা যায় না, পাশে কে চলছে জানা যায় না। অন্ধকারকে গাল পাড়ি, কিন্তু ঠাহর করে দেখলে এ অন্ধকারও সুন্দর।’

কেউ বলল , ‘যাব আর কোথায়, সেই ফিরে আসতেই হয়। অণু অণু হয়ে আমি বাতাসে। মাটিতে মিশব। কিন্তু দ্যাখো, তারপর একদিন পাহাড়ে মেঘ জমবে, বৃষ্টি আসবে, বাতাস ভিজবে, মাটির কোষে–কোষে ঢুকবে জল। তখন আমি ফুল হয়ে ফুটব, নদীর জল হয়ে বয়ে যাব, বাতাস

হয়ে খেলব, মেঘ হয়ে ভাসব।’ এইসব শুনে গাঁয়ের জোয়ানগুলো হাসল।

তাই আমি চন্দ্রাকে নিয়ে ঘর বাঁধলাম।

আমার মা বলেছিল, ‘বাইরে একটি আগুন জ্বেলে রেখো। পাহাড় থেকে আমি যেন দেখতে পাই তুমি ঘরে আছ, তুমি ভালো আছ। ঘর সামলে রেখো, কোথাও যেয়ো না।’

দাইমা বলেছিল আমার কাছে চল। আমার ছেলে নেই, তোকে ছেলের মতো পালব।

বাঁশিওয়ালা বলেছিল : বৃষ্টির জল লেগে বীজধান ফলবে। বুক ফাটিয়ে শিষ বের করবে আকাশে। বড় ঘোড়াটার জন্য দুঃখ কোরো না। একটা ঋতু আসে আর একটা যায়।

গাঁওবুড়ো বলেছিল : ঘরদোর সামলে রাখিস। বুড়ো ঘোড়াটাকে দানাপানি দিস। বসে থাকিস না, দিনগুলো চলে যেতে দিস না। মনে রাখিস বাঁশিওয়ালা মাত্র একবার আসে।

আমি বলেছিলাম: বুড়ো, তুই আমার বাপ। ভাবনা করিস না, আমি তোকে দেখব।

আমি আগুন জ্বেলেছিলাম। ঘর আগলে ছিলাম। তবু কেন যে আমার বাবা গেল বিদেশে, রোজগার করতে! আমার মা গেল পাহাড়ে, পাতা কুড়োতে। আমার ঘোড়াটা গেল জলার ধারে, ঘাস খেতে।

Facebook Comment

You May Also Like