ফিসটের ফিসটি – শিবরাম চক্রবর্তী

ফিসটের ফিসটি - শিবরাম চক্রবর্তী

অনেক দিন পরে দেখা।

দেখতে পেয়েই পাকড়ালাম পরিতোষকে—‘এই, বিয়ে করেছিস শুনলাম, খাওয়াবিনে? বিয়ের খাওয়াটা ফাঁকি দিবি নাকি?’

‘খাবি? তা—বললেই হয়!’ পরিতোষ বললে—‘যেদিন বলবি। আমার সব বন্ধুকেই খাইয়ে দেব একদিনে।’

বিয়ে করে মানুষ বদলে যায় শুনেছি। বিয়ের পর কেমন যেন বদলে গেছে পরিতোষ। চেনাই যায় না তাকে আর। কোথায় সেই আগেকার তার ছিপছিপে ছিমছাম চেহারা। তার জায়গায় ইয়া ইয়া হাত-পা! হাতে-পায়ে এমন এমন গুলতি!

ও বললে,—গুলতি নয়। ওসব হচ্ছে, মাসল। শরীরের ওপর গজায়। মাংসপেশি বলে ওদের। বিয়ের আগে ব্যায়াম করে করে হয়েছে।

রেজিস্টারি ডাকের চিঠিতে যেমন বেশি মাশুল দেয়া থাকে, তেমনি ওর সারা গায়ে বাড়তি মাশুলরা ডাক দিচ্ছিল যেন। বেশি বেশি তো বটেই, মাংসপেশি তো বটেই, এমনকী, ওর আঙুলগুলি পর্যন্ত সেই মাশুলের ভারে নিষ্পেষিত। আঙুল ফুলে কলা গাছও বলা যায়।

‘যেমন-তেমন খাওয়ালে চলবে না। ভোজ চাই রীতিমতন। ফিসটি খাব আমরা।’ আমি বললাম।

খাওয়া হচ্ছে শখের, আর খাওয়ানো হচ্ছে সখার। দু-টি কাজ পরিপাটি হলেই সখ্যতা বজায় থাকে। সেকথাটা জানাতেও আমি কসুর করি না।

‘তা খাবি নাহয়। ফিসটি খাবি, এই তো? সেআর এমন কী?’ জবাব দিল সে—‘ও আমি খুব খাওয়াতে পারি। এনতার! আমার হাতেই রয়েছে।’

‘হাতেই আছে, তার মানে?’

‘ফিসটি তো? যত চাস। যত খেতে পারিস! ও তো আমার হাতের পাঁচ রে! বললেই হল। যেদিন বলবি।’

‘কোনো বাজারটাজারের ইজারা নিয়েছিস না কি?’ আমি জানতে চাই—একটু অবাক হয়েই। শিয়ালদা, জগুবাবু, কলেজ স্ট্রিট—এইসব মার্কেটের যারা মালিক (কিংবা গোমস্তা) তাদেরই শুধু এই মস্তানি সাজে। তারাই এ বাজারে এমন ঘটা করে খাওয়াতে পারে। আর যারা কাঁচি কি ভোজালি নিয়ে কারবার করে, তারাই পারে এই ভোজরাজ সাজতে।

সেকথার উত্তর না দিয়ে সেবলে—‘কিন্তু ভাই, আমার একটা অনুরোধ আছে। আমার ছোটোশালাকে একটা দাঁতের দোকান করে দিয়েছি, তোদের যদি কারুর দাঁত বঁাধাতে হয় তো সেখানে যাবি, তার কাছেই বঁাধাবি। কেমন? কথা দে আগে—’

এ আর এমন কী কথা! দাঁত পড়লে—তার পরেই তো বঁাধাবার কথা? তা, রামের দোকানে না বঁাধিয়ে, শ্যামের দোকানেই বঁাধালাম নাহয়? বাধা কীসের?

‘আর বলিস না ভাই! বাধ্য হয়েই ছেলেটাকে একটা দোকান করে দিতে হল। কী করি?’ ও দুঃখ করে—‘গালাগালির মতো শোনালেও—শালা তো আসলে ভাইয়ের মতোই? ছোটোশালা—ছোটোভাই-ই! তা, ছোটোভাইয়ের মতো গাল টিপে তাকে একটু আদর করেছি…করতে গেছি…’ বলতে গিয়ে আদরের কথাটা সেচেপে যায়—‘যাক গে সেকথা। স্কুল ছাড়িয়ে তাকে ব্যবসায় এনে বসালাম। এখন, খদ্দের জোগাবার দায় আমার!’

‘খদ্দেরের কথা রাখ, খাদ্যের কথা বল। কী কী খাওয়াচ্ছিস বল আগে।’ আমি তাকে চেপে ধরি।

‘ওই যে বললি, ফিসটি খাবি। তাই খাওয়াব, বললুম তো! যত চাস!’

‘পরিতোষপূর্বক খেতে চাই আমরা।’ আমি জোরগলায় জানাই—‘পেটের তলা থেকে এই গলা অবধি, তা নইলে নড়ব না কিন্তু।’

‘পরিতোষপূর্বক তো নিশ্চয়।’ সেবললে—‘পরিতোষ, মানে আমি, এই শর্মা—তোর পূর্বে, কি না সামনে বসে তোদের খাওয়াব। বসে কিংবা দাঁড়িয়ে সেযা-ই হোক—যেমন আমার সুবিধে—খাওয়াব তোকে—বলছি তো! তোকে আর তোর সঙ্গে আমার সব বন্ধুদের—একদিনেই! নিজের হাতে করে খাওয়াব কথা দিচ্ছি। তাহলে তো হবে?’

পাকা কথা পাবার পর ফলার পাকার দিন গুনছি—এর মধ্যে ওর দূত এসে হাজির। বাচ্ছা ছেলে, বিদুৎ না কী নাম।

‘জামাইদাদা আপনাকে নেমন্তন্ন করেছেন।’ সেবলল।

শুনে আমি খুশি হয়ে উঠলাম—‘তা, এর জন্যে ফের খরচা করে নেমন্তন্ন-চিঠি ছাপানো কেন? ওর হাতের কাগজখানার দিকে তাকিয়ে আমি বলি—‘নিজের বন্ধুদের খাওয়ানো তো! তা, তুমি এসে এমনি মুখে বললেই তো হত।’

‘না, এ নেমন্তন্ন-চিঠি না, খদ্দেরের তালিকা।’

‘খাদ্যের তালিকা? দেখি দেখি—’ উৎসাহে আমি হাত বাড়াই।

‘খাদ্যের নয়, খদ্দের।’ কাগজখানা সেআমাকে দেয়।

হাতে নিয়ে দেখি—যত লোকের নাম। তাতে থাকহরি, নিমাইচরণ, বিজয়ভৈরব, বদ্যিনাথ, বটোকেষ্ট, দিব্যলোচন, অন্নদাপ্রসাদ—এমনি সব। তার মধ্যে ভীম নাগ কি দ্বারিক ঘোষ কেউ নেই। অখাদ্যই যত!

‘জামাইবাবুর খাইয়ে, আর আমার দোকানের খদ্দের।’

‘তোমার দোকান? তোমার আবার কীসের দোকান হে? এইটুকুন ছেলে—এই বয়সেই ব্যাবসা ফেঁদে বসেছ? পড়াশুনো ছেড়েছুড়ে? অ্যাঁ?’ আমি অবাক হই।

‘পড়াশুনো আর হল কই? জামাইদাদার জন্যেই তো ছাড়তে হল স্কুল। আদর দিয়ে তিনি আমার মাথাটা খেলেন।’ তার গলায় দুঃখের সুর বাজে।

‘আপনার লোক হয়েও তিনি তোমার মাথা খেলেন? সেকী কথা হে?’ আত্মীয় না হয়েও আমাকে একটুখানি আত্তি দেখাতে হয়।

‘খেলেন না তো কী বলব? মাথার আর কী রয়েছে আমার? দেখুন-না। কী আর বাকি রেখেছেন!’ বলে সেহাঁ করে কী যেন দেখাবার চেষ্টা করে। আমি তার হাঁ-কারের মধ্যে তাকাই—হাঁ করে তাকাই। কিন্তু যতই উঁকিঝুঁকি দিই-না কেন, কিছুই আমার চোখে পড়ে না। ওর টাকরা, গলা, জিভ, এমনকী আলজিভ পর্যন্ত দেখতে পাই—সমস্তই ঠিকঠাক। যতই কেননা তাক করি, না-দেখতে পাবার মতো কিছুই আমার নজরে ঠেকে না।

‘তোমার হাঁ-র মধ্যে মাথার কিছুই তো দেখছি না। মাথা তো তোমার হাঁ-য়ের বাইরেই হে!’ বলতে হয় আমায়।—সত্যি বলতে, ওর হাঁ-য়ের মধ্যে কোনোই মাথা নেই—ওর নিজের কি অন্য কারও। অবশ্যি, যেমন বিরাট একখানা হাঁ করেছে, তাতে চেষ্টা করলে আমার মাথাটা হয়তো তার মধ্যে যেতে পারে, কিন্তু তা গেলেও, ওর নিজের মাথাটাও যে সেই হাঁ-ড়িতে পুরতে পারবে এমন আমার মনে হয় না।

বিস্ময়ে আমাকেও হাঁ করতে হয়। দুজনেই আমরা হাঁ করে থাকি—এ-ওর দিকে হাঁকিয়ে।

তখন বাধ্য হয়ে ও মুখের ভেতর থেকে বার করে। না, ওর মাথা নয়, তবে মাথার ভগ্নাংশ বটে! ওর দাঁত। ওর দাঁতদের ও বার করে—কিন্তু যাকে দাঁত বার-করা বলে তা কিন্তু নয় ঠিক। দেঁতো হাসি নয়, দাঁতকেই হাঁসিল করা। ওর দু-পাটি দাঁত—পরিপাটিরূপে বঁাধানো—মুখের ভেতর থেকে বের করে আনে।

‘এই দেখুন!’ বলে সেদেখায়।

আমি দেখি।

‘এ কী! এই বয়সেই তুমি দাঁত বঁাধিয়েছ? সেকী হে?’

‘কী করব বলুন? ঝুরঝুর করে পড়ে গেল যে। এক চোটেই পড়ে গেল সব—করব কী?’ ওর দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে।

অকালে মানুষের টাক পড়ে, চুল পাকে দেখেছি। কিন্তু কাঁচা দাঁত বয়স না পাকতেই টাকরা থেকে খসে পড়বে তা আমি ধারণাও করতে পারি না।

‘কী করে পড়ল?’ আমি জানতে চাই।

‘সেঅনেক কথা…!’ বলতে গিয়ে সেচমকে উঠল—‘না, ও-কথা বলবার নয়। শুনলে জামাইবাবু রাগ করবেন।…আমি এখন যাই। আমাকে আবার বামাচরণবাবুর বাড়ি যেতে হবে এখন।’ এই বলে সেবিদায় নিল।

বিদ্যুৎ চমকে উঠে মিলিয়ে যেতেই আমি তৈরি হয়ে নিলাম, বেরিয়ে পড়লাম বিদ্যুৎগতিতে।

বাড়ির দরজাতেই দাঁড়িয়ে ছিল পরিতোষ। দেখেই অভ্যর্থনায় এগিয়ে এল—‘ইস! এত দেরি করে ফেললে? সবাই এসে গেছে কখন! কতক্ষণ!’

‘এসে গেছে, বল কী? কই, কাউকে তো দেখছিনে!’ এদিকে-ওদিকে তাকাই, ‘দেখতে পাচ্ছিনে তো কারুক্কেই।’

‘শুয়ে পড়েছে সব। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে কখন। এমন গিলেছে গন্ডেপিন্ডে যে, নড়বার কারও শক্তি নেই। আমার ছোটোশালা বামার লরি ডাকতে গেছে, সেএলেই—’

‘বামার লরি? সেকী! সেযে বিরাট কোম্পানি হে! তাদেরকেও খেতে ডেকেছ নাকি? সাহেবসুবো সমেত? ডেকেছ তো, কিন্তু তোমার এই ছোট্ট বাড়িতে আঁটলে হয়!’

‘আহা সে-বামার লরি নয়, বামাচরণের লরি। আমাদের বামাকে মনে নেই তোমার? লরি ভাড়া খাটায় যে?’ পরিতোষ জানাল।

তখন আমার মনে পড়ল।—‘হ্যাঁ, বলছিল বটে বিদ্যুৎ! বামাচরণের বাড়িই যাবে, বলছিল যেন। কিন্তু এসব লরিটরি কীসের জন্যে?’

নেমন্তন্নবাড়িতে আমরা অতিথিরাই লড়ব—খাদ্যাখাদ্যের সঙ্গে—সেখানে অন্য লড়ালড়ি কেন আবার?

‘লরি এলেই সবাইকে ধরাধরি করে তুলে দিতে হবে। বলছি না যে, একেকজন এমন খেয়েছেন—’

‘যে নট নড়ন-চড়ন নট কিচ্ছু?’ ওর কথাটা আমিই খোলসা করি—‘ফাঁসির খাওয়া খাইয়েছিস বল তাহলে!’

‘যা বলিস!…মুশকিল হয়েছে, বামাচরণ নিজেই এসে গেছে আগে। আমি আর অতটা খেয়াল করিনি। হাতে পেয়ে তাকেও খাইয়ে দিয়েছি। খেয়ে-টেয়ে শুয়ে পড়েছেন তিনিও। একেবারে সটান! এখন কার লরি কে দ্যাখে কে-ই বা দেয়!’

‘কত জন খেয়েছে এখন পর্যন্ত?’ জানবার আমার কৌতূহল হয়।

‘তা, ডজন আড়াই হবে। একটা কম আছে, তুই হলেই হয়ে যায়। তা, যাহা উনত্রিশ তাহা ত্রিশ!’ সেজানায়, ‘সকালের ধাক্কাতেই এই। আরেকটা চোট আছে, সন্ধ্যেয়।’

‘এই ক-খানা তোর ঘর, এইটুকুন তো উঠোন,’ বাড়ির ভেতরে পা বাড়িয়ে আমি বলি—‘এত লোককে খাওয়ালি কোথায়, বল তো?’

‘ওয়ান বাই ওয়ান! একে একে—আর, একা একা পেলে, গোটা কলকাতাকেই আমি খাওয়াতে পারি। তা জানিস?’ হাতের গুলতিগুলো ফুলিয়ে সগর্বে সেবলে—গুল মারে কি না সে-ই জানে!—‘তা, তুই কি এখনি খাবি, না কি লরিটা আসুক আগে, তারপর?’

লরির কথাটা আমার ভালো লাগে না। খাওয়ানোর পাট যেমনই হোক-না, আর খাওয়ার পরের অবস্থা যতই শোচনীয় হোক, খাওয়ার পরে পাটের বস্তার মতো লরিবোঝাই হয়ে যাওয়াটা যেন কেমন! কিন্তু ও যা কঞ্জুস, বিয়ে করার এই ট্যাকসো দেবার পরে ট্যাক্সি দেবার কথা তুললে এখুনি হয়তো বেঁকে বসবে। বাড়ি ছেড়ে পিটটানই না দেয়! ভোজের এমন একটা বাজি—হঠাৎ ভোজবাজি হয়ে দাঁড়াবে—দেখতে না দেখতেই। সেই ভয়ে ও-বিষয়ে কিছু আর বললাম না। অন্য কথা পাড়া গেল—

‘তোর বউকে তো দেখছিনে! বউ কোথায়? আগে বউ দেখা—বিয়ে করলি! তারপরে তো খাওয়াদাওয়া।’ বলি আমি।

‘বউ? বউ ভাই হাসপাতালে।’ গম্ভীর হয়ে ও বলে।

‘কেন? হঠাৎ কী অসুখ হল আবার—অ্যাঁ?’

‘অসুখ? না, অসুখবিসুখ না। আজ সকালে এল বাপের বাড়ি থেকে। গাড়ি থেকে নামাতে গেছি হাত ধরে—তা, বউদের হাত যে এত ঠুনকো হয় কে জানত! বিয়ে তো করিনি সাতজন্মে—এই প্রথম বউ! জানবই-বা কী করে? আদর করে খুব আলতো করেই ধরেছিলাম—তাতেই মট করে ভেঙে গেল হাতখানা! সেই গাড়ি করেই আমার সেজোশালা তাকে নিয়ে গেছে ক্যাম্বেলে।’

‘ভারি দুঃখিত হলুম ভাই।’ শুনে আমি দুঃখ জানাই।

‘দুঃখ করে কী করবি? দুঃখ তো আছেই—বিবাহিতজীবনে। সেকথা যাক—সেই কথাটা মনে আছে তো? সেই দাঁতের কথা? আমার ছোটোশালার দোকানে দাঁত-বঁাধানোর কথাটা? কথা দিয়েছিস মনে রাখিস।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—মনে আছে। বঁাধাব বই কী। আলবাত বঁাধাবো। পড়ুক আগে দাঁতগুলো।’

‘দেখি, তোর দাঁত দেখি। বা:, বেশ দাঁত তো। এবড়ো-খেবড়ো নয়। দিব্যি ঘনবিন্যস্ত—বঁাশঝাড়ের মতোই, কলা গাছও বলা চলে।’ ও তাকিয়ে তাকিয়ে দ্যাখে—‘অনেকের আবার গজদন্ত থাকে, তোর কিন্তু নেই।’ বলে ও একটু গজগজ করে। আমার দন্ত-গঞ্জনার অভাবে মনে হয় ওকে যেন একটু দুঃখিতই দেখা যায়।

‘গজদন্ত না থাকলে কী হয়?’ আমি জানতে চাই।

‘কিছুই হয় না। তবে থাকলে হয়—দাঁতের ওপর দাঁত হয়। কিংবা দাঁতের ওপর দাঁত হলেই বুঝি গজদন্ত হয়। ও সেএকই কথা! তোর নেই, তার কী হবে?’ ক্ষুব্ধ-কন্ঠে ওর একটু সান্ত্বনার সুর বাজে—‘যাক গে, নাই থাক গে। না থাকলেও কোনো হানি নেই। আমার কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। চ, বাড়ির ভেতরে চ।’

ভেতর-উঠোনে পা দিতেই আমি ‘উঃ’ করে চেঁচিয়ে উঠেচি—‘ইস! পিঠটা জ্বলে গেল রে!’ নিজের পীঠস্থানে হাত বুলিয়ে বলি।—‘অ্যাঁ, খাবলে দিলি পিঠটা?’

খাবার ঘরে যাবার আগেই একটা রামচিমটি খেলাম।

‘তোর হজমশক্তিটা কেমন, পরীক্ষা করলাম একটু।’ পরিতোষ হাসতে হাসতে বলল।

আমিও হাসতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হাসিটা শুকিয়ে এল হঠাৎ। উঠোনময় রক্তের ছড়াছড়ি দেখা গেল—‘একী রে! এত রক্ত কীসের! ও, খাসি কেটেছিস বুঝি? তাহলে তো বা:! খাসাই করেছিস রে!’

‘তা যা বলিস! খাসিও বলা যায়, পাঁঠাও বলতে পারিস। তবে আমাদের বামাচরণকে—’ বলতে গিয়ে ও থামে, কোথায় যেন ওর খটকা লাগে—‘গণ্ডার বললেই যেন ঠিক হয়। আস্ত একটা মোষ।’

আমি কোনো কথা বলি না। মহিষের সঙ্গে রাজমহিষীর যে পার্থক্য, গণ্ডারের সঙ্গে তার চেয়ে কিছুমাত্র কম নয়। এক গণ্ডার হতে হলে এক-কে চারগুণ হতে হয়, কীরকম গুণপনা থাকলে মোষ গণ্ডার হতে পারে আমি জানিনে। কিন্তু এই অতিবাদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাধ করে বিষাদ আনা—প্রীতিভোজের মাঝখানে ইতি টানা—কোনো কাজের কথা নয়।—‘মিত্তিরমশাইকে মোষ বলচিস, তা বল—তা বলতে পারিস। মোষই বটে!’ আমার সন্তোষ জানাই।

‘আরে, কার যেন গোঙানি শুনছি-না?’ কেমন একটা গুমরানো ধ্বনি পাশের ঘর থেকে আমার কানে আসে।

‘গোঙানি? না না। শুয়ে শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে কেউ।’ সেবলে—‘বামাচরণই হয়তো, কিংবা হৃষীকেশ, নবদ্বীপ, নিতাইলালও হতে পারে। বটুকভৈরব, বটকেষ্ট, দিব্যলোচন—কে যে—কার যে নাক, ঠিক করে বলা কঠিন। থাকহরি হওয়াও আশ্চর্য নয়।’

‘আশ্চর্য কী!’ আমি বলি—‘নাকের কথা কী বলচিস—খিদের চোটে আমিই কি কম নাকাল নাকি? বলে আমার পেটই ডাকছে গোঁ-গোঁ করে—’

‘খাবি? এখনই খাবি? লরি না আসতেই? বলে সেএকটু থামে—‘তাহলে বল, কীরকম ফিসটি খেতে চাস—কেমন ধারার ফিসটি শুনি একবার?’

‘কেমন ধারা কী রে? ফিসটি—ফিসটি। ফিসটির আবার রকম বেরকম আছে নাকি?’ আমি বলি। বলতে বলতেই লালায়িত হই—আহা! আলুভাজা, পটলভাজা, বেগুনভাজা দিয়ে আরম্ভ—তারপরে আলুর দম, ছোলার ডাল, ছানার ডালনা,—তারপর মাছের কালিয়া, মুড়িঘণ্ট, মাংসের পোলাও, তারপরেও দই রাবড়ি দরবেশ রসগোল্লা সন্দেশ—আরম্ভর থেকে শেষ পর্যন্ত অশেষ আড়ম্বর!’

‘বা:, রকম বেরকম নেই? বললেই হল? ফিসটি খেয়ে আর খাইয়ে খাইয়ে বলে আমি বুড়ো হয়ে গেলাম! কী রকমের ফিসটি চাস খুলে বল আমায়। তোর পছন্দমতোই তোকে খাওয়াব? কী খেতে চাস? লেফট হুক? না, স্ট্রেট কাট?’

লেফট হুক, না, স্ট্রেট কাট? সেআবার কী রে বাবা? নামও শুনিনি বাপের কালে। কোনো বিলিতি খাবার নাকি? একে, খিদেয় চোঁ চোঁ করছে পেট, তার ওপরে এইসব হেঁয়ালি—চোখে যেন ধোঁয়া দেখি। স্ট্রেট হুক? না, লেফট কাট?’ নাকি, কাট হুক আর লেফট স্ট্রেট? কী বলল? আস্তে আস্তে ধোঁয়াটে কাটে যেন, মনে হয়, এ জিনিসের কথা কানে এসেছে —এ খাবার—এই হুক লেফট আর কাট স্ট্রেট খেয়েছি যেন এর আগেও। জুলুই একবার খাইয়েছিল যেন আমায়—

শ্রীমান জুলুর কাছেই এই খাবারের মানে টের পেয়েছিলাম একদিন—আমার বেশ মনে পড়ে।

আট বছরের জুলু কোনো এক ঘুসোঘুসির আখড়ায় আড্ডা মারতে যেত, একদা সেসহসা এসে খাবার জন্যে সাধতে লাগল আমায়—‘কী খাবে শিব্রামদা? লেফট হুক, না, স্ট্রেট কাট?’ আমি ভাবলাম চকোলেট কি লজেঞ্জুস বুঝি। বলেছি, ‘দুই। দুই-ই খাব। তুই খাওয়াবি তো? আমার তো পয়সা লাগবে না? তাহলে দুটোই আমি খেতে চাই।’

বলতে বলতে দুটোই সেআমায় খাইয়েছে। সেই আট বছরের জুলুর পরিবেশনেই আমার আটাশটা দাঁত নড়ে গেছল। তার সেই স্ট্রেট হুক আর লেফট কাট একবারটি না খেয়েই! জুলুর সেই ধরে-বেঁধে খাওয়ানোর জুলুম কোনোদিন আমার ভুলবার নয়।

সেই হুক কাট আর স্ট্রেট লেফট—এখন, এখানে, এই পরিতোষের হাতেও? বলেছিল বটে ও, মনে পড়ে, খাওয়ানোটা ওর হাতের পাঁচ। সেকি ওর ওই হাতের পাঞ্চ? অমন পাঞ্জার—ওর বক্সিংয়ের মারপ্যাঁচ?

এমনটা কে জানত! জানবার সাথে সাথেই শুনতে পাই—গোঙানি বা নাকের গোঁ, সেযাই হোক—! পাশের ঘরগুলো থেকে কানে আসে, গন্ডেপিন্ডে গিলে—কিংবা গেলবার পরে গন্ডেপিন্ডে এক হয়ে—ধরাশায়ী বটকেষ্ট বটুকভৈরব শ্যামাকান্ত বামাচরণ…

না দেখেও দেখতে পাই ওদের—দিব্যলোচনে দেখি। এমনকী, দিব্যলোচনকেও যেন দেখা যায়।

দেখে আর দাঁড়াইনে। দৌড় লাগাই—পরিতোষের প্রশ্নের জবাব মুলতুবি রেখে। পরিতোষপূর্বক খাওয়া ফেলে রেখেই। হন্যে হয়ে ছুট মারি।

বাইরে এসে পড়তেই লরিটাও এসে পড়ে। বামাচরণের লরি নিয়ে এসেছে আবার পরিতোষের শালা। সেই দাঁতের দপ্তরি।

পরিতোষকে পূর্বে রেখে খাওয়ার যে পালা ছিল, পরিতোষকে পশ্চাতে রেখে তার থেকে আমি পালাই…

বিদ্যুৎ দৌড়ে আমায় বাধা দিতে আসে—তার একটা দাঁতবঁাধাই বুঝি-বা হাতছাড়া হয়ে যায়! কিন্তু আমার আবার তার চেয়েও বিদ্যুৎবেগ…! ছুটতে ছুটতেই আমি হাত কামড়াই। দাঁতগুলো হাতে আছে কি না, ধাতে আছে কি না—আস্ত আছে কি না—হাতিয়ে দেখি একবার। হাতে হাতে বাজিয়ে দেখি দাঁতদের।

আবার দিই আরেক কামড়—নিজের হাতেই। খিদেয় না, রাগে নয়—অনুরাগেই।

Facebook Comment

You May Also Like