বিষাক্ত উপত্যকা – অনিল ভৌমিক

বিষাক্ত উপত্যকা - অনিল ভৌমিক

বিষাক্ত উপত্যকা কঙ্কাল দ্বীপ থেকে ফ্রান্সিসদের জাহাজ যাত্রা শুরু করল স্বদেশের দিকে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়েছিল ফ্রান্সিস আর ওর অভিন্নহৃদয় বন্ধু হ্যারি। ফ্রান্সিস ভাবছিল কঙ্কাল দ্বীপের বর্তমান রাজা মোকার কথা। মন খারাপ লাগছিল ওর। উপহার হিসেবে মোকা ওদের দুটো বিরাট রূপোর থাম দিয়েছে। জাহাজের ডেকের ওপরেই থাম দুটো রেখে দিয়েছে ওরা। দিন রাত নিয়ম করে পাহারা দেওয়া চলছে। আফ্রিকা থেকে হীরের খণ্ড নিয়ে আসার সময় ওরা নির্মম জলদস্যু লা ব্রুশের পাল্লায় পড়েছিল। আবার যাতে ওরকম কোনো বিপদ না হয় তার জন্যে রাত জেগেও পাহারার ব্যবস্থা হয়েছে।

জাহাজ চলেছে। নির্মেঘ আকাশ। বাতাস বেগবান। পালগুলো ফুলে উঠেছে। জাহাজ সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে দ্রুত চলেছে। দাঁড় বাওয়া বন্ধ। জাহাজের কাজও নেই তেমন। ভাইকিংরা জাহাজে এখানে ওখানে বসে শুয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এবার রূপোর থাম নিয়ে যাচ্ছে।

দেশবাসীকে অবাক করে দেবে। সেই সব গল্প, দেশ বাড়ির গল্প এসব চলছে।

বিকেল হলো। পশ্চিমাকাশে লাল টকটকে সূর্য অস্ত গেল। মনে হলো যেন সূর্যটা সমুদ্রের উঁচু উঁচু ঢেউয়ের মধ্যে ডুবে গেল।

সাত আট দিন কেটে গেছে। জাহাজ চলেছে ফ্রান্সিসদের দেশের দিকে।

সেদিন বিকেল হয়ে এসেছে। ভাইকিংরা এখানে ওখানে গল্প করছে। হঠাৎ মাস্তুলের মাথায় বসে থাকা নজরদারের চিৎকার শোনা গেল–ডাঙা, দেখা যাচ্ছে–বাঁ দিকে। ভাইকিংরা সবাই এসে মাস্তুলের নিচে জড়ো হলো। একজন ছুটল ফ্রান্সিসকে খবর দিতে।

একটু পরেই ফ্রান্সিস হ্যারি দুজনেই ডেকে উঠে এল। জাহাজটা তখন ডাঙার অনেকটা কাছে চলে এসেছে। দেখা গেল ডাঙাটা পাথুরে। এক ফোঁটা সবুজ নেই কোথাও। সমুদ্র থেকে উঠে গেছে খাড়া পাহাড়। গেরুয়া রঙের পাহাড়। পাথর ধুলোবালির রঙও গেরুয়া। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–হ্যারি তোমার কী মনে হয়? এটা কি একটা দ্বীপ না দেশ?

–ঠিক বুঝতে পারছি না।

–এখানে তো খাবার জলও পাবো বলে মনে হয় না। পাশ কাটিয়ে চলে যাই কী বলে? ফ্রান্সিস বলল।

-হ্যাঁ, মিছিমিছি এখানে জাহাজ ভিড়িয়ে কী হবে। হ্যারি বলল।

ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে জাহাজ চালককে সেই নির্দেশই দিতে যাবে, তখনই মাস্তুলের মাথা থেকে নজরদার চেঁচিয়ে বলে উঠল–একটা সাদা কাপড় মতো কী যেন দেখা যাচ্ছে।

এবার ফ্রান্সিস আর হ্যারি ভালো করে তাকাল। জাহাজটা তখন অনেক কাছে চলে এসেছে। দেখল–পাহাড়ের গায়ে একটা গুহামতো কী দেখা যাচ্ছে। তার সামনে একটা গাছের মোটা ডাল পোঁতা। ডালের মাথায় এক টুকরো সাদা কাপড় বাঁধা। হাওয়ায় উড়ছে। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল-সাদা কাপড়টা দেখেছো?

–হ্যাঁ।

–তাহলে তো ওখানে মানুষ আছে। আর লক্ষ্য করে দেখ-ওটা শুধু কাপড় নয়। একটা ছেঁড়া সাদা জামা।

–হুঁ। হ্যারি বলল–তার মানে বুনো মানুষ না, সভ্য মানুষই কেউ আছে। এখন একদল মানুষ আছে না একজন আছে সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।

–যাহোক–সাদা জামাটা খুঁটিতে বাঁধা হয়েছে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যেই। ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কী করবে এখন?

–একজনই থাক আর একদলই থাক–ওদের তো উদ্ধার করতেই হবে। জাহাজ ভেড়াতে বলল।

–কিন্তু ভেড়াবে কোথায়? উঁচু উঁচু পাথর সব। তা ছাড়া সন্ধ্যে হয়ে আসছে। অন্ধকারে একটা অজানা অচেনা জায়গায় নামা কি ঠিক হবে? হ্যারি বলল।

-তাহলে জাহাজ এখানেই থামাতে বলি। কাল সকালে যা করার করবো।

–সেটাই ভালো হবে।

.

পরদিন। সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস ডেকে এসে দাঁড়াল। জাহাজ-চালককে বলল তোমার কী মনে হয়–জাহাজটা ঐ পাহাড়গুলোর কাছে নেওয়া যাবে?

–হ্যাঁ–যাবে। কারণ পাহাড়গুলো খাড়া উঠে গেছে। কিন্তু। এদিক দিয়ে ঐ পাহাড়ে নামা যাবে না।

-কিন্তু আমাদের তো ওখানে যেতে হবে।

–পাহাড়গুলোর ওপাশটা দেখা যাক?

–তাহলে তাই কর। জাহাজ চলতে শুরু করল। গেরুয়া রঙের পাহাড়গুলোর ওপাশে জাহাজটা আসতেই দেখা গেল একটা সমভূমি মতো রয়েছে। তবে অসমান। পাথর ধুলোয় এবড়ো খেবড়ো। তবে তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবে।

জাহাজটা সেই জায়গার অনেকটা কাছে নিয়ে আসা হলো। তারপরেই ডুবো পাথর। জাহাজ যাবে না। জাহাজ থেকে পাটাতন ফেলা হলো। পাটাতন পাথুরে জমি পর্যন্ত গেল না। ওটুকু জলে হেঁটে যেতে হবে।

ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–আমি শাঙ্কোকে নিয়ে আগে যাচ্ছি। কী ব্যাপার দেখে আসি।

–তোমরা মাত্র দুজন যাবে। যদি কিছু বিপদ হয়?

ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। শাঙ্কো এলে বলল–যাও তীর ধনুক নিয়ে এসো। আর এক টুকরো লাল কাপড়।

একটু পরেই শাঙ্কো তীর-ধনুক হাতে এলো। পাটাতনে পা রেখে রেখে দুজনে তীরের কাছে এলো। বাকিটুকু জলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। দুজনেই জলে নামল। কোমর অব্দি জলে ডুবে গেল। শ্যাওলা ধরা পেছল পাথরের ওপর পা রেখে ওরা এগিয়ে গেল। তারপর তীরে উঠল।

ফ্রান্সিস চারিদিকে তাকাল। আশ্চর্য! সব পাথরের রঙ গেরুয়া। অন্য কোনো রঙের পাথর নেই। এবার ওরা পাথরের টুকরো ছড়ানো জায়গা দিয়ে চলল। একটু এগোতেই পাহাড়ে ওঠার মতো পথ পেল। বড় বড় পাথরের চাই ছড়ানো। সেগুলোর ওপর পা রেখে রেখে উঠতে লাগল। রোদ বেশ চড়া। সমুদ্রের হু হু হাওয়া বইছে বলেই ওরা ঘামছে না। পাথরগুলো এর মধ্যেই তেতে উঠেছে।

উঠতে উঠতে একসময় গুহাটা যে পাশ থেকে দেখেছে সেইদিকে চলে এল। এখানে পাথর কম। গুহাটা দেখা গেল। গুহা পর্যন্ত গেরুয়া রঙের ধুলোটে পথ।

এক সময় গুহার সামনে এল। দেখলগাছের ডালে বাঁধা সাদা জামাটা শতছিন্ন। গেরুয়া ধুলোমাখা। তাতে নীল হলুদ সুতোর কাজ করা।

ওরা এবার হার মুখে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ইঙ্গিত করল। শাঙ্কো তীর ধনুক বাগি এ ধরল।

আস্তে আস্তে তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিস গুহার মধ্যে ঢুকতে লাগল। পেছনে তীর উঁচিয়ে শাঙ্কো। বাইরের তীব্র রোদ থেকে এসেছে। একটু এগোতেই অন্ধকার। কিছুই নজরে পড়ছে না। ফ্রান্সিস অল্পক্ষণ দাঁড়াল। শাঙ্কোও দাঁড়াল। অন্ধকারটা চোখে একটু সয়ে আসতেই দেখল একটু দূরে শুকনো ঘাসের একটা বিছানা। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। খালি গায়ে একটা মানুষ সেই বিছানায় শুয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে একজন শ্বেতকায় মানুষ। এখন অবশ্য রোদে জলে পুড়ে গায়ের রঙ ঘোর তামাটে।

ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে পোর্তুগীজ ভাষায় বলল–আপনি কে? কোনো সাড়া শব্দ নেই। ফ্রান্সিসের কণ্ঠস্বর গুহাটায় প্রতিধ্বনিত হলো। ফ্রান্সিস আবার বলল–আপনার নাম কী? লোকটি নিশ্চপ। শরীরে কোনো সাড়া নেই। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল। শাঙ্কো আস্তে বলল–মরে টরে যায়নি তো?

–বুঝতে পারছি না।

ফ্রান্সিস বিছানাটার পাশে এসে বসল। লোকটার ডান হাতটা তুলে নিল। হাতটা একেবারে ঠাণ্ডা নয়। নাড়ী দেখল। নাড়ী চলছে ক্ষীণ ভাবে। বুকে কান পাতল। দুর্বল হৃৎপিণ্ডের শব্দ। তাহলে বেঁচে আছে। ফ্রান্সিস এদিক ওদিক তাকাল। দেখল পাথুরে মেঝেয় একপাশে একটা মাটির হাঁড়ি। হাঁড়িটার কাছে গেল। দেখল তাতে জল ভরা। আরো কয়েকটা হাঁড়িকুড়ি রয়েছে। কালো পোড়া। ও হাতে জল নিল। এগিয়ে এসে লোকটার চোখে মুখে জলের ঝাঁপটা দিল। বারকয়েক জলের ঝাঁপটা দেবার পর হঠাৎ কয়েকবার পিট পিট করে লোকটা চোখ খুলল। তারপর মাথাটা আস্তে আস্তে এপাশ ওপাশ করল। এতক্ষণে ফ্রান্সিস অনেকটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। দেখল লোকটা মধ্যবয়স্ক। মাথায় লম্বা চুল। মুখে বড় বড় দাড়ি গোঁফ।

ফ্রান্সিস এবার ঝুঁকে লোর্কটার কানের কাছে মুখ এনে পোর্তুগীজ ভাষায় বলল–আপনি কে?

খুব ক্ষীণস্বরে দুর্বলকণ্ঠে লোকটা বলল–বা-রিন থা-স।

–আপনি কি অসুস্থ?

–হ্যাঁ। বারিনথাস ক্ষীণকণ্ঠে পোর্তুগীজ ভাষায় বলল?

–আপনি এখানে কী করে এলেন?

–সে অ-নে-ক কথা। আ-আ-মি-বারিনথাস–আর কথা বলতে পারল না। ভীষণভাবে কাশতে লাগল। কাশির ধমকে বুকটা ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিস চুপ করে রইল। কাশি একটু কমতে ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–আপনি কতদিন এখানে আছেন?

বারিনথাস আস্তে আস্তে ডান হাতটা তুলল। কাঁপা কাঁপা আঙুল তুলে গুহার দেয়ালটা দেখাল। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট দেখল গেরুয়া পাথরে দেয়ালে কতকগুলো টানা টানা দাগ। বোঝা গেল দিনের হিসেব। ফ্রান্সিস ওকে আর কোনো কথা জিজ্ঞেস করল না। বুঝলো কথা বললে লোকটা আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। শাঙ্কোকে বলল–শাঙ্কো, একে জাহাজে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এ অবস্থায় নেওয়া যাবে না। তুমি এক কাজ করো। জাহাজের বদ্যিকে ডেকে আনন। চিকিৎসা চলুক। একটু সুস্থ হলে তখন নিয়ে যাবো।

শাঙ্কো চলে গেল বদ্যিকে ডাকতে।

জাহাজ থেকে বদ্যি ওষুধপত্র নিয়ে এল। মৃতপ্রায় বারিনথাসকে পরীক্ষা করে বলল–অসুখ তেমন সাংঘাতিক কিছু নয়। অনাহারে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ভালো হয়ে যাবে।

বদ্যি কোনো রকমে ওষুধ খাওয়ালো। বদ্যি চলে গেল। ফ্রান্সিস বারিনথাসের জন্যে জাহাজ থেকে পোশাক কম্বল পাঠিয়ে দিল।

দিন তিনেক চিকিৎসা চলতে বারিনথাস অনেকটা সুস্থ হলো। ফ্রান্সিস বারিনথাসের সঙ্গে কথা বলে এইটুকু জানতে পারল–ও জাতিতে স্প্যানিশ। তবে পোর্তুগীজ ভাষা ভালোই জানে। স্পেনদেশের রাজধানী মাদ্রিদে সে থাকতো। রাজসভার। এক গণ্যমান্য অমাত্যের বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাজ করত।

বারিনথাস এখন সুস্থ। কয়েকজন ভাইকিং বারিনথাসকে ধরে ধরে জাহাজে নিয়ে এল। আসার সময় বারিনথাস ঘাসের বিছানার তলা থেকে একটা চামড়ায় বাঁধানো বড় খাতা নিয়ে এল। খাতাটা দেখে ফ্রান্সিস বেশ অবাক হলো। কী আছে ওটাতে যে বারিনথাস অনেক যত্নে ওর কাছে রেখে দিয়েছে।

দিন দশেক কাটল। ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা তাগাদা দেয়। বলে, এখানে পড়ে থেকে কী হবে? চলো দেশে ফিরি। কিন্তু ফ্রান্সিসের মন তখন বারিনথাসের বলা একটা কথাই ভাবছে। বারিনথাস একবারই কথাটা বলেছিল। বলেছিল–বিষাক্ত উপত্যকার নাম শুনেছো?

ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলেছিল–না। বারিনথাস আস্তে আস্তে বলেছিল–তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো। সব তোমাকে বলবো। শরীরটা ভালো হোক।

এই বিষাক্ত উপত্যকার কথা শুনেই ফ্রান্সিস উৎসুক হয়েছিল। কোথায় এই বিষাক্ত উপত্যকা? কী আছে ওখানে? নামটাও বা এরকম কেন? ফ্রান্সিস অনেক কষ্টে নিজের ঔৎসুক্য চেপে রাখল। বন্ধুদের ডেকে বলল–আর কয়েকটা দিন। বারিনথাস সুস্থ হলেই জাহাজ ছাড়বো।

একদিন রাতের খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল-চলো বারিনথাসকে দেখে আসি।

বারিনথাসের কেবিনঘরে ঢুকল ওরা। দেখল বারিনথাস আয়নায় দেখে দেখে চুল আঁচড়াচ্ছে। ওদের ঢুকতে দেখে আয়না চিরুনি রেখে বসল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসতে বসতে বলল–তারপর এখন কেমন আছো বন্ধু?

–ভালো। বারিনথাস হাসল। হ্যারিও বসল?

–আচ্ছা–বিষাক্ত উপত্যকা ব্যাপারটা কী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

বারিনথাস একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শিয়রের কাছে রাখা সেই চামড়ার বইটা বের করল। বলল–এই বইটা দেখ।

ফ্রান্সিস বইটার পাতা ওল্টালো। প্রাচীন বই। সাদাটে চামড়ায় লেখা। ফ্রান্সিস লেখার ভাষাটা কিছুই বুঝল না। হ্যারিকে দিল। হ্যারি উল্টেপাল্টে দেখে বলল মনে হচ্ছে কোনো প্রাচীন ভাষায় লেখা।

-–ঠিকই ধরেছেন–এটা প্রাচীন ল্যাটিন ভাষায় লেখা। এই বইটা পড়বার জন্যে আমি অনেক কষ্টে ঐ ভাষাটা শিখেছি। তারপর বইটা পড়েছি। একটু থেমে বলল-বইটা পেয়েছিলাম অদ্ভুতভাবে। মাদ্রিদে রাজপ্রাসাদের পাঠাগারে। সেখানে নানা বিষয়ে পড়াশোনা করতে যেতাম। আগেই বলেছি আমি গৃহশিক্ষকতা করতাম। তখনই ঐ পাঠাগারে একবাক্স পুরোনো বই পুঁথির মধ্যে এই বইটা পাই। সব বইই তো হাতে লেখা। মোটামুটি সব বইয়ের লেখকের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু এই বইটার লেখকের নাম নেই। বইটার নাম ন্যাভিগেশিও। সেন্ট ব্ৰেণ্ডন নামে, একজন ধর্মযাজকের সমুদ্রযাত্রা নিয়ে লেখা। নানা দ্বীপ নানা জায়গায় গিয়েছিল সেন্ট ব্ৰেণ্ডন। একবার আয়ার্ল্যাণ্ডের অনেক পশ্চিমে এক অজানা দেশে পৌঁছেছিল। সেই দেশের নাম স্ত্রোমো। রাজধানীর নাম তুলা। সেই দেশে সেই রাজধানীতে আমি গিয়েছিলাম।

–কোথায় সেই দেশ? হ্যারি জিজ্ঞেস করল?

–এখান থেকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে গেলে আট দশ দিনের পথ?

–তাহলে এটা একটা দ্বীপ নয়?

–না, এটা একটা দেশের পূর্বভাগ। একটু থেমে বারিনথাস বলতে লাগল ন্যাভিগেশিও বইটাতে এসবের একটা অতীত ইতিহাসও লেখা আছে। সেটা বলছি।

বারিনথাস বলতে লাগল–পশ্চিমের দিকে অ্যাজটেক সভ্যতার পত্তন করেছিল একদল রেড ইণ্ডিয়ান। সেই উপজাতির নাম ছিল তলতেক উপজাতি। যে সাম্রাজ্য তারা গড়েছিল তা এক গৃহযুদ্ধে ভেঙে যায়। সেই গৃহযুদ্ধের মধ্যে যারা বেঁচেছিল কালহুয়াকান নামে এক উপজাতি-নেতার নেতৃত্বে তারা অরো পূর্বদিকে সরে আসে। এদের আরাধ্য দেবতার নাম কোয়েতজালকোয়াত্তি। সংক্ষেপে কোয়েতজাল। এই দেবতা নাকি তাদের আদেশ দিয়েছিল–যে উপত্যকায় দেখবি একটা পাথরের ওপর ফণিমনসা গাছ সেখানেই তোরা বসতি স্থাপন করবি। কাহুয়াকানের নেতৃত্বে সেই তলতেক উপজাতির দল মহামূল্যবান হীরে চুনি পান্না দামী পাথর আর প্রচুর সোনা নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে খুঁজতে বেরোয়। কোথায় আছে সেই উপত্যকা যেখানে পাথরের চাইয়ের ওপর রয়েছে ফণিমনসার গাছ। দীর্ঘ বারো বছর তারা নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াল সেই উপত্যকার খোঁজে। দলের কত লোক মারা গেল, কিন্তু অন্বেষণ চলল। অবশেষে ওরা এসে পৌঁছল এই স্রোমো নামে জায়গাটায়। এখানেই তারা দেখল একটি উপত্যকা যেখানে একটি মাত্র পাথরের উপর একটা ফণিমনসার কাটাছাওয়া গাছ। ওদের যাযাবরবৃত্তি শেষ হলো। এখানেই কালহুয়াকান বসতি স্থাপন করল। রাজধানীর নাম তুলা। কোয়েতজাল দেবতার বড় মন্দির তৈরি করল পাথর গেঁথে। দেবতার মূর্তি কাঠ দিয়ে তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করল। বারিনথাস থামল। বইটা খুলে একটা আলগা পাতা বের করল। বলল–এই দেখ কোয়েতজাল দেবতার ছবি।

ফ্রান্সিস ও হ্যারি দেখল ছবিটা।

–কিন্তু এ তো গেল ইতিহাস। বিষাক্ত উপত্যকা কী? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল। বারিনথাস হাসল। বলল–আর একটু ইতিহাস আছে। সব বলছি। একটু থেমে বলতে লাগল–কালহুয়াকানের নেতৃত্ব সেই দল যে মহামূল্যবান হীরে পান্না চুনি প্রচুর সোনা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে বেরিয়েছিল সে সবের কী হলো? ন্যাভিগেশিও বইটিতে তার হদিস নেই। কিন্তু ইঙ্গিত আছে। কালহুয়াকান নিজেকে রাজা বলে ঘেষণা করলেন, সবাই তাকে রাজা বলে মেনে নিল। এখন সেই প্রচুর ধনসম্পত্তি কোথায় লুকিয়ে রাখা যায় এই নিয়ে রাজা কালহুয়াকান খুব চিন্তায় পড়লেন। এই সময়েই সেন্ট ব্ৰেণ্ডন সেই দেশে গিয়ে হাজির হলেন। রাজা কালহুয়াকান তার কোনো ক্ষতি করলেন না। দু একটা ছোটখাট যুদ্ধে ব্ৰেণ্ডন-এর পরামর্শ নিলেন তিনি। সেসব যুদ্ধে সেই পরামর্শেই জিতলেন। এবার ধনসম্পত্তি লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে ব্ৰেণ্ডন-এর পরামর্শ চাইলেন। ব্রেন সমস্ত দেশ, ধারেকাছের গুহা-গহ্বর পাহাড়ের ঢাল সব তন্নতন্ন করে দেখলেন। কিন্তু সেই ধনসম্পত্তি লুকিয়ে রাখার মতো জায়গা পেলেন না।

একটু থেমে বারিনথাস বলতে লাগল–অবশেষে ব্ৰেণ্ডন এলেন বিষাক্ত উপত্যকায়। উপত্যকাটি কোয়েতজাল মন্দিরের পেছনেই। কাছের পাহাড়ের ঢাল থেকে একটা ছোট্ট ঝর্ণা নেমে এসেছে এই উপত্যকায়। খুব ক্ষীণ সেই জলধারা যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। সেই ঝর্ণার জল সাংঘাতিক বিষাক্ত। দূর থেকে দেখেছি সেই জলের রং গাঢ় সবুজে। সেই জল জমে জমে সমস্ত উপত্যকাটিতে বিষাক্ত হয়ে গেছে। সেখানে সবসময় কুয়াশা জমে থাকে। সমস্ত উপত্যকাটি ঘাসের চিহ্ন মাত্র নেই। সবুজে শ্যাওলার মতো স্তর জমে আছে। সেই স্তরে মানুষ বা জন্তু জানোয়ার পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া বেরোয়। সেই সঙ্গে তীব্র কটু গন্ধ আর মানুষ বা জন্তু-জানোয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। কোনো তলতেক ভুলেও ওদিকে যায় না। তাই ঐ উপত্যকার নাম বিষাক্ত উপত্যকা। বারিনথাস থামল। একটু হাঁপাতে লাগল।

–ব্রেণ্ডন কী করলেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করল। বলছি। বারিনথাস বলল–ঐ বিষাক্ত উপত্যকার মাঝখানে আছে একটি পাথরের চাই আর তার ওপর একটা ফণিমনসার গাছ। সেই গাছটা যে কী করে বেঁচে আছে এটা এক আশ্চর্য ব্যাপার। তার চেয়েও আশ্চর্য বিষাক্ত উপত্যকায় সবুজ কাঠির মতো এক ধরনের ছোট ছোট গাছ আছে। তাতে গাঢ় বেগুনী রঙের ফুল ফুটে থাকে। সেই ফুল যদি কেউ শোঁকে সে সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে যায়। মরে যায় না। কয়েক ঘন্টা পর সুস্থ হয়, কিন্তু তার ঘ্রাণশক্তি চিরদিনের জন্যে লুপ্ত হয়ে যায়।

-তারপর? ফ্রান্সিস আগ্রহ সহকারে বলল।

–ন্যাভিগেশিও বইটিতে লেখা আছে ব্ৰেণ্ডন রাজাকে ঐ বিষাক্ত উপত্যকাতেই ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রাখতে উপদেশ দিয়েছিলেন। রাজা নাকি তাই করেছিলেন। কিন্তু কী করে সেই ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রাখা হয়েছিল তা লেখক লেখেননি। তারপর ব্ৰেণ্ডন আয়ার্ল্যাণ্ডে ফিরে এসেছিলেন। সেখানেই মারা যান। কিন্তু বিষাক্ত উপত্যকায় রক্ষিত সেই ধনভাণ্ডারের কোনো হদিস তিনি কাউকে দিয়ে যেতে পারেননি।

-এটা কত দিন আগের কথা? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল?

–প্রায় দুশো বছর?

–এখনো কি ঝর্ণাটা থেকে বিষাক্ত জল পড়ে?

–হ্যাঁ, তবে চুঁইয়ে চুঁইয়ে?

–সেই পাথরের চাই ফণিমনসার গাছ এখনো আছে?

–হ্যাঁ। আমি নিজের চোখে দেখেছি।

–উপত্যকার মধ্যে দিয়ে পাথরের ওপর ফণিমনসার গাছের কাছে যাওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়? অসম্ভব।

–আচ্ছা পরে তো অনেকে রাজা হয়েছে, তারা কেন এই গুপ্তধন উদ্ধারের চেষ্টা করেনি?

–করেছে, কিন্তু ঐ বিষাক্ত উপত্যকা! প্রথম রাজা কালহুয়াকান এরপর যারাই রাজা হয়েছে সবাই কালহুয়াকান পদবীটা তাদের নামের সঙ্গে ব্যবহার করত। এই রীতি এখন পর্যন্ত সব রাজাই মেনে এসেছেন। এখন যে রাজা তারও পদবী কালহুয়াকান।

–আপনি তো ঐ দেশে গিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ। ব্ৰেণ্ডনের ন্যাভিগেশিও বইটি পড়েই আমার ঔৎসুক্য জাগে। মাদ্রিদ থেকে বেরিয়ে পড়ি এই স্রোমো রাজ্যের উদ্দেশে। বেশ কটা জাহাজ বদলে একদিন। এই গেরুয়া পাহাড় এলাকায় এসে নামলাম। কয়েকদিন সেই গুহাটাতে রইলাম। তারপর গেরুয়া পাহাড়ের ওপাশের সবুজ তৃণভূমি থেকে যাত্রা করেছিলাম স্ত্রোমো দেশের উদ্দেশে।

–পায়ে হেঁটে? হ্যারি জানতে চাইল।

–না, ঘোড়ায় চড়ে?

–ঘোড়া পেলেন কোথায়?

–গেরুয়া পাহাড়ের ওপাশে সবুজ তৃণভূমির কথা বললাম, সেখানে অনেক বুনো ঘোড়া আর বুনো ভেড়া চরে বেড়ায়। একটা বুনো ঘোড়া ধরে পোষ মানিয়ে তার পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম।

তারপর? ফ্রান্সিস বলল।

–দিন আট দশেক পরে স্ট্রোমো দেশে পৌঁছলাম। আগেই বলেছি ওখানে তলতেক উপজাতির বাস। ওরা ভেড়ার চামড়ার ফুলপ্যান্ট মতো পরে। ওরা তুলোর চাষ জানে। প্রায় সমতল স্রোমো দেশের মাটি কালো। তুলোচাষের খুব উপযোগী। তুলো থেকে সুতীর পোশাক বানিয়ে ওরা ব্যবহার করে। ওদের বাড়িঘর বলে কিছু নেই, বংশ পরম্পরায় চামড়ার তাবুতে বাস করে। তাবু ছিঁড়ে গেলে সারিয়ে নেয়। শুধু কোয়েতজাল দেবতার মন্দিরটা পাথর গেঁথে তৈরি।

–ঐ দেশে গিয়ে আপনি বিপদে পড়েননি?

–প্রথমে কয়েকবার বিপদে পড়েছিলাম। তখন আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। ওরা নাহুয়াতল ভাষায় কথা বলে। ঐ ভাষার কয়েকটা শব্দ আমি শিখেছিলাম। তারই সাহায্যে কথা দিয়ে অঙ্গভঙ্গি করে সৈন্যদের বললাম–আমাকে রাজা কালহুয়াকানের কাছে নিয়ে চল। ওরা আমাকে রাজার কাছে নিয়ে গেল। রাজাকে অনেক কষ্টে বোঝালাম যে আমি ব্ৰেণ্ডন-এর বংশধর। ব্ৰেণ্ডন নামটা ওদের কাছে পরিচিত। ব্রেন প্রথম রাজা কালহুয়াকানের পরামর্শদাতা ছিলেন এটা রাজা জানতেন। আমি প্রাণে বেঁচে গেলাম। আমার স্বাধীন চলাফেরায় আর কোনো বাধাই রইল না।

–কিন্তু আপনি গিয়েছিলেন কেন? হ্যারি বলল।

বারিনথাস হাসল–এখনও বুঝতে পারলে না?

–সেই গুপ্ত ভাণ্ডার উদ্ধার করতে তাই কি না? ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক তাই। কিন্তু দীর্ঘ দশ বারো বছর চেষ্টা করেও সেই ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারিনি। তবে সেই দেশটার সব জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে আমি স্থির সিদ্ধান্তে এসেছি যে গুপ্ত ভাণ্ডার আছে.ঐ বিষাক্ত উপত্যকার মধ্যে যে পাথরের ওপর ফণিমনসার গাছ আছে ওখানেই।

–কিন্তু-ফ্রান্সিস বলল–একটা কথা ভেবেছেন কি সেই বিষাক্ত জলের উপত্যকার মধ্যে ব্ৰেণ্ডন বা রাজা কালহুয়াকান কী করে গুপ্ত ভাণ্ডার রেখে এলেন?

–আমার মনে হয় দুশো বছর আগে ঐ উপত্যকাটা হয়তো অতটা বিষাক্ত হয়ে ওঠেনি।

–তাহলে তো পরবর্তীকালে রাজারা সহজেই গুপ্ত ভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারতেন। ফ্রান্সিস বলল।

বারিনথাস একটু ভাবল। বলল–হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছে।

–আমার মনে হয় ওখানে পৌঁছবার এবং ফিরে আসার নিরাপদ কোনো পথ আছে। হয়তো বিষাক্ত উপত্যকার একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বরাবর কোনো পথ চলে গেছে। সেই পথে গিয়েই ধনভাণ্ডারে রেখে আসা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই পথ বিষাক্ত জলে ডুবে যায়। পাথরের ওপর ফণিমনসার গাছের কাছে আর তারপরে কেউই যেতে পারে নি। ফ্রান্সিস বলল।

বারিনথাস কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবল। তারপর মাথা তুলে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে হাসল। ফ্রান্সিস তুমি সত্যিই বুদ্ধিমান।

হ্যারি হেসে বলল–ফ্রান্সিসের বুদ্ধি আর সাহসের কাহিনী নিয়ে আমাদের দেশের চারণকবিরা গান বেঁধেছে। গ্রামে গ্রামান্তরে সেই কাহিনী ওরা গেয়ে বেড়ায়।

–বলো কি!

ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–থাক ওসব কথা। আপনি বিশ্রাম করুন। পরে কথা হবে।

ফ্রান্সিস ও হ্যারি নিজেদের কেবিন ঘরে চলে এল।

তখন রাত হয়েছে। ফ্রান্সিস জাহাজের ডেকে পায়চারি করছে। সমুদ্রের হু হু হাওয়ায় ওর মাথার চুল এলোমেলো হচ্ছে। মাথার ওপর নির্মেঘ আকাশ। পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়। চাঁদ উজ্জ্বল। চাঁদের নরম আলো পড়েছে গৈরিক পাহাড়ে, সমুদ্রে।

এ সময় হ্যারি ডেকে উঠে এল। ফ্রান্সিস হ্যারির কাছে এল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস,–ভাইকিং বন্ধুরা তো দেশে ফেরার জন্যে উদগ্রীব। কী করবে এখন?

–এখন দেশে ফেরা হবে না।

–কিন্তু ওরা কি শুনবে?

–শুনতে হবে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–তলতেকের দেশ স্লোমোতে যাব। কালহুয়াকান রাজাদের গুপ্তধন উদ্ধার করতে হবে।

-পারবে?

–ওখানে সব দেখেশুনে তবে বুঝতে পারবো?

–তুমি কি এজন্যে, বারিনথাসের সাহায্য নেবে?

–হ্যাঁ–তা তো নিতেই হবে। ওর সঙ্গে এই নিয়ে কালকে কথা বলবো। ও কেন ফিরে এলো, একা, একা গুহায় পড়ে রইল, এসব এখনও শোনা হয়নি।

–তাহলে আগে কথাবার্তা বলে তারপর সিদ্ধান্ত নাও?

–বেশ, তাই হবে।

পরদিন। ফ্রান্সিস আর হ্যারি বারিনথাসের কেবিনঘরে এল। বারিনথাস তখন ন্যাভিগেশিও বইটা পড়ছিল। ওদের দেখে বই বন্ধ করে উঠে বসল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ওর বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস বলল–এখন কেমন বোধ করছেন?

-খুব ভালো।

–আমাদের স্ট্রোমো দেশে নিয়ে যেতে পারবেন?

–এ্যাঁ? বারিনথাস বেশ চমকে উঠল।

-শুনুন–আমি স্থির করেছি আমরা কয়েকজন ঐ দেশে যাবো। আপনি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। প্রথম রাজা কালহুয়াকানের ধনসম্পদ আমরা খুঁজে বের করবো।

–অসম্ভব। বারিনথাস মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল–আমি দীর্ঘ পনেরো বছরের আপ্রাণ চেষ্টাতেও পারিনি।

–আমি এখুনি অসম্ভব বলতে রাজী নই। ফ্রান্সিস বলল-ওখানে যাবো। সব দেখবো তারপর ভাববো। যদি বুঝি অসম্ভব, তখনই অসম্ভব বলবো। তবে একটা কথা জানবেন–একটা ক্ষীণ সূত্র থাকেই যেটা ধরে চিন্তা করে সমাধান বের করা যায়।

–দেখবেন চেষ্টা করে। বারিনথাস বলল?

–এবার বলুন তো আপনি তুলা থেকে চলে এলেন কেন?

–সে অনেক ব্যাপার। আমি যে সেই গুপ্ত ভান্ডারের খোঁজে আছি এটা কী করে রাজা টের পেয়ে গেল। আমাকে তখন থেকে চোখে চোখে রাখতে লাগল। আমি এর মধ্যে তলতেক উপজাতির রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। আমি নাহুয়াতল ভাষাও অনর্গল বলতে পারি। কিন্তু শত চেষ্টা করেও গুপ্তধনের হদিস করতে পারলাম না। যা হোক–কী যে দুর্বুদ্ধি হলো আমার। সেনাপতির দলে ভিড়ে গেলাম। সেনাপতি মড়যন্ত্র করেছিল রাজাকে সিংহাসন থেকে উচ্ছেদ করতে। সেনাপতি অনেক মূল্যবান মুক্তো মণিমাণিক্য দেবার লোভ দেখিয়ে আমাকে দলে টানল। কিছু অনুগামী সৈন্য নিয়ে সেনাপতি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। রাজা কালহুয়াকান নিষ্ঠুর হাতে সেই বিদ্রোহ দমন করলেন। বিদ্রোহী সেনাপতি ও সৈন্যদের সঙ্গে আমিও বন্দী হলাম। এখন তলতেক উপজাতিদের একটা ধর্মীয় রীতি প্রচলিত আছে, প্রতি তিন মাস অন্তর অমাবস্যার রাতে ওরা কোয়েতজাল দেবতার মন্দিরে নরবলি দেয়। অন্য উপজাতিদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় যাদের বন্দী করা হয় তাদেরই বলি দেওয়া হয়। মৃতদেহগুলি ছুঁড়ে ফেলা হয় বিষাক্ত উপত্যকায়। যে সব বিদ্রোহীদের বন্দী করা হয়েছিল তাদের বলি দেওয়া হতে লাগল। আমার ভাগ্যেও মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু তার আগেই বহু কষ্টে আমি পালালাম। পালিয়ে চলে এলাম এই গৈরিক পাহাড়ের আস্তানায়। গুহার বাইরে একটা গাছের ডাল পুঁতে ছেঁড়া জামাটা ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম। যদি কোনো জাহাজযাত্রীদের নজরে পড়ে। আমাকে উদ্ধার করে। বারিনথাস কথা শেষ করে একটু হাঁপাতে লাগল।

–হুঁ। শুনুন–আমরা যাবো। আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন? ফ্রান্সিস বলল।

–পারবো বৈ কি। কিন্তু আপনাদের জীবনের নিরাপত্তা আমি দিতে পারবো না। উল্টে রাজা কালহুয়াকান আমাকে হাতের কাছে পেলে মেরে ফেলবে।

–ঠিক আছে। সে সব সমস্যার মোকাবিলা আমরাই করবো। ফ্রান্সিস বলল–ব্যাপারটা কি জানেন। জীবনে দুঃসাহসিকতা আমি পছন্দ করি। তাই আমি সমুদ্রযাত্রা করি, দ্বীপে দেশে ঘুরে বেড়াই। যে কোনো কঠিন কাজ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্ত ধনসম্পদের ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। কিন্তু সেটা উদ্ধার করবার জন্য নিজের বুদ্ধি সাহস সব কাজে লাগাতে আমি আগ্রহী। বলতে পারেন এটাই আমার জীবন-দর্শন। অবশ্যই এ ব্যাপারে আমার বন্ধুরা আমাকে নানাভাবে সাহায্য করে।

–আপনার কথাগুলো আমার কাছে একটু অদ্ভুত লাগছে। গুপ্তধনের ওপর কোনো লোভ নেই অথচ সেটা উদ্ধার করতে আগ্রহী–এটা ঠিক বুঝলাম না।

হ্যারি হেসে বলল–ফ্রান্সিসের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হোক তাহলেই ওর মনটাকে বুঝবেন।

–আচ্ছা চলি। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। হ্যারিও উঠল।

জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াল দুজনে। হ্যারি বলল–তাহলে কী স্থির করলে? তলতেকদের দেশে যাবে?

–যাবো বৈকি?

–কিন্তু বন্ধুরা কি সব রাজী হবে? বাড়ি ফেরার জন্যে সবাই মুখিয়ে আছে।

–সে সব আমি বুঝিয়ে বলছি। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সবাইকে ডেকে উপস্থিত থাকতে বলো।

–বেশ।

সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়া বেশ তাড়াতাড়িই সারল সব ভাইকিংরা। ফ্রান্সিস রাতে সভা ডেকেছে। সবাইকে উপস্থিত থাকতে হবে। কেন সভা ডেকেছে ফ্রান্সিস সেটা এ-কান ও-কান হতে হতে সবাই জেনে গেল। ফ্রান্সিস আবার নতুন এক অভিযানে যাবে। কিন্তু খবরটা সত্যি কিনা সেটা ফ্রান্সিসের মুখে শোনার জন্যে সবাই ডেকে এসে জড়ো হলো।

একটু পরেই ফ্রান্সিস এল। সঙ্গে হ্যারি। সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ওপরে মেঘহীন আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছে। সমুদ্রের শোঁ শোঁ হাওয়া আর ঢেউয়ের মৃদু গর্জন। এ ছাড়া চারদিকে কোনো শব্দ নেই।

ফ্রান্সিস একবার সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর বলতে লাগল। ভাইসব, এখান থেকে ঘোড়ায় চড়ে দিন আট দশেকের পথ। তারপর একটা দেশ। নাম স্ত্রোমো। রাজধানীর নাম তুলা। সেখানে আছে এক উপত্যকা। নাম বিষাক্ত উপত্যকা। নাম শুনেই বুঝতে পারছো সেই উপত্যকা কত মারাত্মক। বিষাক্ত জলাভূমি ওটা। কোনো প্রাণী ঐ উপত্যকায় পড়লে মুহূর্তে তার মৃত্যু হয়। এই জলাভূমির মাঝখানে রয়েছে একটা পাথরের চাই আর একটা ফণিমনসার গাছ। আর এখানেই রয়েছে তলতেক উপজাতির প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধন। ফ্রান্সিস একটু চুপ করল। তারপর বলতে লাগল–ভাইসব, ঐ গুপ্ত ধনভাণ্ডার আমরা খুঁজে বের করবো। সেইজন্যে আমি হ্যারির সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করেছি আমরা তিনজন–আমি হ্যারি আর আমাদের তীরন্দাজ শাঙ্কো ঐ গুপ্তধন, উদ্ধারে যাবো। ফ্রান্সিস চুপ করল। কেউ কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিস বলল–ভাইসব, তোমাদের কিছু বলবার থাকলে বলো।

একজন ভাইকিং বলল–তোমরা ফেরা না পর্যন্ত তো আমরা দেশে ফিরতে পারবো না।

–হ্যাঁ, তোমাদের এখানেই থাকতে হবে।

–কিন্তু ফ্রান্সিস, বিস্কো বলল–আমরা অনেকদিন দেশ ছাড়া। আমাদের মনের অবস্থাটা একবার বিবেচনা করো।

–বিস্কো, তুমি আমাকে জানে। আমাকে সংকল্পচ্যুত করা কঠিন হয়ে যাবে। যখন স্থির করেছি–যাবোই। তারা জাহাজ নিয়ে চলে যাও… … … আরামে দিন কাটাও।

–কিন্তু তোমরা তিনজন?

–আমরা স্ত্রোমো যাবো। এখনই বলতে পারছি না গুপ্তধন খুঁজে বের করতে পারবো কিনা। পারি বা না পারি ফিরে এসে এখানে থাকবো। কোনো জাহাজ নিশ্চয়ই পাবো। তখন দেশে ফিরে যাবো।

বিস্কো চেঁচিয়ে উঠলো–না, তোমাদের রেখে আমরা দেশে ফিরে যাবো না। সব ভাইকিং চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো।

ফ্রান্সিস হাসল। বলল–আমি গর্বিত যে তোমাদের মতো বন্ধু আমি পেয়েছি। ঠিক আছে। তাহলে দুএকদিনের মধ্যে আমরা রওনা হবো।

এবার হরি বলল–আমরা কী ভাবে যাবো?

–বারিনথাস আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। ও সঙ্গে থাকলে দোভাষীর কাজটা ও চালাতে পারবে।

–কিন্তু ভুলে যেও না ফ্রান্সিস-বারিনথাস পলাতক বন্দী। ও রাজা কালহুয়াকানের সুনজরে নেই।

ফ্রান্সিস একটু ভাবল মাথা নিচু করে। তারপর বলল–কথাটা ঠিকই বলেছো। ঠিক আছে, আগে স্রোমোতে চলো তো, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবো।

সভা ভেঙে গেল। ভাইকিংরা সব কথাবার্তা বলতে বলতে কেবিনে চলে গেল।

পরদিন সকালে ফ্রান্সিস হ্যারির কেবিনে এল। ওর হাতে ন্যাভিগেশিও বইটা। হ্যারি বলল–বইটা দেখলে?

–হ্যাঁ। প্রাচীন ল্যাটিন ভাষা। পড়তে তো পারবো না। তবে কোয়েতজাল দেবতার ছবিটা ভালো করে দেখেছি। আচ্ছা হ্যারি ফ্রান্সিস বইটা হ্যারির সামনে এগিয়ে ধরল। একেবারে শেষ পাতাটা দেখিয়ে বলল–দেখ তো, এই শেষ কটা লাইন কেমন অন্যভাবে সাজানো বলে মনে হচ্ছে না–যেন ছড়া বা কবিতার মতো।

হ্যারি মনোযোগ দিয়ে জায়গাটা দেখল। বলল–তোমার অনুমান সত্যি। এটা আগের লেখা গদ্যের মতো নয়, মনে হচ্ছে ছড়া জাতীয় কিছু।

–হ্যারি চলো, বারিনথাসের সঙ্গে এই নিয়ে কিছু কথা বলবো।

দুজনে যখন বারিনথাসের কেবিনঘরে ঢুকল, বারিনথাস তখন একটা ভাঙা আয়নায় মুখ দেখছে। ওদের দেখে আয়নাটা রেখে দিল। দুজনে বসল।

–আপনার বইটা।

বারিনথাস বইটা নিয়ে বিছানায় রাখল।

ফ্রান্সিস বলল–বইটা ভালো করে দেখলাম। আচ্ছা, দেবতা কোয়েতজালের মূর্তিটা একটু অদ্ভুত না?

–কেন বলো তো?

–কোয়েতজালের হাত দুটো পেছনে। এরকম দেমূর্তি বড় একটা দেখা যায়।

–এটা তোমার নজরে পড়েছে তাহলে? হ্যাঁ ঠিকই–দেবমূর্তির হাত দুটো পেছনে।

মুখটা কঙ্কাল।

–হ্যাঁ, কোয়েতজালের জীবন ও মৃত্যুর দেবতা?

–মূর্তিটা কত বড়?

–একজন সাধারণ মানুষের উচ্চতার সমান।

–একটা কথা–ফ্রান্সিস বলল। তারপর বিছানা থেকে বইটা নিয়ে বারিনথাসের হাতে দিল। শেষ পাতাটা বের করে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল-এটা কী লেখা বলুন তো?

বারিনথাস হাসল। বলল–এটা একটা উদ্ভট ছড়া। মাথামুণ্ডু বোঝার উপায় নেই।

–তবু–ছড়াটা অনুবাদ করে বলুন তো?

–ছড়াটা কিন্তু ল্যাটিন ভাষায় লেখা নয়। তলতেক উপজাতির মুখের ভাষা নাহুয়াতল–সেই ভাষায় লেখা। স্পেনীয় বর্ণমালায়।

–আপনি তো ঐ ভাষা জানেন। অনুবাদে অর্থ বলুন।

বারিনথাস বলল–ঠিক অক্ষর সাজিয়ে অনুবাদ করলে এইরকম দাঁড়ায়–

অদ্ভুত অদ্ভুত!
ব্ৰেণ্ডনের ছড়া!
পা আছে হাত নেই
মাথা
এক হাত পিঠে বাঁধা
টলমল টলমল
অতল তল, অতল তল।
এক হাত ধূলিময়
মুখ নয় কথা কয়
আঙুল তুলে হে–
কোন ভুলে হে–
পাথরেতে মনসা গাছ
কিম্ভুত কিম্ভুত!

ছড়াটা শেষ হতে ফ্রান্সিস বলল–ছড়াটা আর কয়েকবার বলুন।

বারিনথাস বার পাঁচেক ছড়াটা বলল। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে গভীর মনোযোগ দিয়ে ছড়াটা শুনল।

একটু পরে হ্যারি বলল–কিছু বুঝলে?

ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকাল–না। তবে এই ছড়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্ৰেণ্ডনের এই ছড়াটা অর্থহীন উদ্ভট নয়। অবশ্য সমস্ত ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারবো দেবমন্দির-মূর্তি-বিষাক্ত উপত্যকা-রাজবাড়ি দেখার পর। মোট কথা, ওদেশে গেলে। এবার ফ্রান্সিস বারিনথাসের দিকে তাকাল–আচ্ছা, একটা ব্যাপার। যাজক ব্রেণ্ডন রাজাকে ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিলেন তো?

–হ্যাঁ।

–এই জন্যে নিশ্চয়ই ব্ৰেণ্ডন তলতেক সৈন্যদের বা অন্য লোকদের সাহায্য নিয়েছিলেন?

–হ্যাঁ, বইটিতে লেখা আছে ব্ৰেণ্ডন সেনাপতি ও সৈন্যদের সাহায্য নিয়েছিলেন?

–তাহলে তো তাদের এই গুপ্ত ভাণ্ডারের হদিশ জানার কথা।

–কিন্তু ব্রেনের পরামর্শে রাজা কালহুয়াকান সেই সেনাপতি ও সৈন্যদের বিষাক্ত উপত্যকায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন।

–রাজা নিজেও কি জানতেন না? তিনি তো তার বংশধরদের বলে যেতে পারতেন।

–এখানেই ব্ৰেণ্ডন আর ধর্মযাজকের মতো নির্লিপ্ত থাকেননি। তিনি একটা চাল চেলেছিলেন। তিনি ধনসম্পদের নেশায় পাগল হয়ে উঠেছিলেন। রাজাকে বলেছিলেন-আমি দেশে যাচ্ছি। ফিরে এসে আপনাকে জানাব কীভাবে আমি ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছি। রাজাও ওকে বিশ্বাস করে দেশে যেতে দিয়েছিলেন। ব্ৰেণ্ডনের মতলব ছিল দেশে ফিরে আরও লোকজন নিয়ে সেই ধনভাণ্ডার চুরি করবে। দেশে নিয়ে যাবে। কিন্তু ব্ৰেণ্ডনের এই আশা অপূর্ণই থেকে গেছে। বয়েসও হয়েছিল। কঠিন অসুখে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। তখনই ন্যাভিগেশিও গ্রন্থের লেখকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ব্রেন লেখককে তার সমুদ্রযাত্রার কাহিনী বিভিন্ন দ্বীপ দেশের কাহিনী, স্ট্রোমো দেশের কাহিনী মুখে মুখে বলেছিলেন। লেখক সেই কাহিনী লিখেছিল। তারপর ব্লেণ্ডন মারা গেলেন। রাজা কালহুয়াকানের আর জানাই হলো না সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডারের হদিস।

–তাহলে দেখা যাচ্ছে–ফ্রান্সিস বলল–একমাত্র ব্রেনই জানতেন কোথায় এবং কীভাবে লুকোনো আছে সেই ধনভাণ্ডার।

–ঠিক তাই। বারিনথাস বলল?

–এবার বলুন তো, কীভাবে যাবো আমরা? হ্যারি বলল।

–এই পাহাড়ের ওপাশে আছে বহুদূর বিস্তৃত সবুজ ঘাসের প্রান্তর। সেখানে অনেক বুনো ঘোড়া ভেড়া চরে বেড়ায়। সেই ঘোড়া ধরতে হবে। পোষ মানাতে হবে। সেসব ঘোড়ার পিঠে মোটা কাপড়ের জীন বাঁধতে হবে। তারপর সেইসব ঘোড়ায় চড়ে যেতে হবে, বারিনথাস বলল।

ফ্রান্সিস বলল–এ তো সময়সাপেক্ষ।

-হ্যাঁ, দিনকয়েক ঘোড়াগুলোকে পোষ মানাতেই যাবে। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–তাহলে কালকেই আমরা ঐ প্রান্তরে যাবো। ঘোড়া ধরতে পোষ মানাতে আপনি কিন্তু সাহায্য করবেন।

-নিশ্চয়ই করবো।

-চলি।

ফ্রান্সিস ও হ্যারি চলে গেল।

পরদিন দুপুরে বারিনথাসকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো চলল সবুজ প্রান্তরের উদ্দেশে। বারিনথাস সঙ্গে নিল লম্বা দড়ি। গোল করে পাকানো। ফ্রান্সিস বলল–দড়ি নিলেন ঘোড়া বাঁধবার জন্যে?

–হ্যাঁ। দ্যাখো দড়ি দিয়ে ফাঁস তৈরি করেছি। এই ফঁসকে বলে ল্যামসা। বুনো ঘোড়ার গলায় ফাস ছুঁড়ে বাঁধতে হয়। শিখে গেলে তোমরাও পারবে।

গৈরিক পাহাড়ের পাথরের খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে ওরা পাহাড়টা পার হলো। ফ্রান্সিস দেখল, দূরে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের প্রান্তর। মাঝে মাঝে ছড়ানো ছিটানো পাথর।

ওরা এক সময় প্রান্তরের মুখে এসে দাঁড়াল। দেখল অনেক বুনো ঘোড়া ভেড়া চরে বেড়াচ্ছে। বারিনথাস ঘোড়াগুলোর দিকে যেতে যেতে বলল–আমার ঘোড়াটাও এই দলের মধ্যে আছে।

বারিনথাস ঘোড়াগুলোর কাছে যেতেই ঘোড়াগুলো এদিক ওদিক সরে গেল। বারিনথাস তীক্ষ্ণস্বরে শিস দিল। দেখা গেল একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেটার পিঠে মোটা কাপড়ের জিন বাঁধা। মুখে দড়ির লাগাম। বারিনথাস আস্তে আস্তে ঐ ঘোড়াটার কাছে গেল। ঘোড়াটার চোয়ালের কাছে চোখের কাছে আলবার্তো চাপড় মেরে মেরে আদর করতেই ঘোড়াটা চি-হি-হি করে ডেকেউঠল। বারিনথাস তখন মাটি থেকে একটা বেশ বড়সড় পাথর তুলে ল্যাপোর অন্য প্রান্তে বাঁধল। তারপর পেটের কাছে নিয়ে লাফিয়ে ঘোড়াটার পিঠে উঠে বসল। তাকে ছোটাল বুনো ঘোড়াগুলো যেখানে ঘাস খাচ্ছিল সেইদিকে। মুহূর্তে বারিনথাস বুনো ঘোড়ার দঙ্গলের একেবারে কাছে পৌঁছে গেল। বুনো ঘোড়াগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে ছুট লাগাল। বারিনথাস একটা গায়ে সাদা ছিট ছিট ছুটন্ত ঘোড়ার পেছনে ছুটল। বুনো ঘোড়াটা ছুটছে। বারিনথাস পেছনে পেছনে ছুটল। এবার বারিনথাস হাতের দড়িটা শূন্যে ঘোরাতে লাগল। ঘোরাতে ঘোরাতে একসময় ছুঁড়ে দিল সাদা ছিট ছিট ঘোড়াটার গলায়। মুহূর্তে ল্যাসোর ফাঁস জড়িয়ে গেল ঘোড়াটার গলায়। বারিনথাস এবার বাঁ হাতে কোলের কাছে ধরা দড়ি বাঁধা পাথরটা মাটিতে ফেলে দিল। বুনো ঘোড়াটা দড়ি বাঁধা পাথর টানতে টানতে ছুটল। বারিনথাস এবার নিজের ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল। বুনো ঘোড়াটার গতি তখন অনেক কমে গেছে। আরো কিছুক্ষণ ছুটোছুটি করল ঘোড়াটা। তারপর ক্লান্ত হয়ে আস্তে আস্তে একসময় দাঁড়িয়ে পড়ল। বারিনথাস বুনো ঘোড়াটার কাছে এল। ল্যাসোর দড়িটা ধরে টানতে টানতে ফ্রান্সিসদের দিকে আসতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল ক্লান্ত বুনো ঘোড়াটার মুখ দিয়ে গাজলা উঠছে।

বারিনথাস নিজের ঘোড়া থেকে নামল। বুনো ঘোড়াটার চোখের কাছে চোয়ালে আলবার্তো চাপড় মেরে আদর করতে লাগল। ঘোড়াটা শান্ত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রইল। বারিনথাস লাগাম জিন ছাড়াই এক লাফে ঘোড়াটার পিঠে চড়ে বসল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াটা ছুটল। কিন্তু জোরে নয়। ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ওটা। বারিনথাস এপাশ ওপাশ কঁকুনি খেতে খেতে বসে রইল। কখনো ঘোড়াটার গলা জড়িয়ে ধরল, কখনো ঘোড়াটার ঘাড়ের লম্বা লম্বা কেশর টেনে ধরল। ঘোড়াটাকে কিছুক্ষণ ছুটিয়ে বারিনথাস তার পিঠ থেকে নামল। তারপর ওটার গলায় দড়ি পরিয়ে। হাঁটিয়ে নিয়ে এল ফ্রান্সিসদের কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-এটা আর দুএকদিনের মধ্যেই পোষ মেনে যাবে। তোমরা দুজন আমার পুরোনো ঘোড়াটায় চড়ে যাবে।

বারিনথাস এবার ঘোড়া দুটোকে দড়ি দিয়ে পাথরের একটা খণ্ডের সঙ্গে বেঁধে রাখল। তিনজনে এরপর গেরুয়া পাহাড় পেরিয়ে জাহাজে ফিরে এল।

পরের দুতিনদিন ধরে বারিনথাস নতুন ঘোড়াটাকে পোষ মানাল। ঘোড়াটা শান্ত হলো। বারিনথাস ঘোড়াটার মুখে দড়ির লাগাম পরাল-পিঠে মোটা কাপড়ের জিন বাঁধল।

রওনা হবার দিন এসে গেল। সেদিন সকাল থেকেই ফ্রান্সিস খুব ব্যস্ত। জল, ময়দা, খাবার দাবার, ঘোড়ার খাদ্য ছোলা সব জড়ো করল। তরোয়াল, তীর ধনুক, বর্শাও নিল। জাহাজ থেকে গেরুয়া পাহাড়ে নামল। বারিনথাস বারবারই বলছিল–আরো ঘোড়া পোষ মানিয়ে বেশি লোক নিয়ে চলো। কিন্তু ফ্রান্সিস রাজী হয়নি।

চার পাঁচজন ভাইকিং বন্ধু ওদের মালপত্র বয়ে নিয়ে চলল।

তখন দুপুর। ওরা ঘাসের প্রান্তরে এসে পৌঁছল। দুটো ঘোড়া পাথরে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। বারিনথাস নতুন ঘোড়াটার পিঠে উঠল। হ্যারি ওর পেছনে বসল। বন্ধুরা কিছু মালপত্র ঘোড়াটার পিঠের দুপাশে ঝুলিয়ে দিল। পুরোনো ঘোড়াটার পিঠে উঠল ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো। বন্ধুরা ঐ ঘোড়ার পিঠেও বাকী মালপত্র ঝুলিয়ে দিল।

যাত্রা শুরু করার আগে ফ্রান্সিস বন্ধুদের উদ্দেশে বলল–তোমরা সজাগ থেকো। রুপোর থামদুটো পাহারা দিও। যদি আমাদের কোনো বিপদ হয় তোমাদের এখানে খবর পাঠাবো। তবে আমরা তো লড়াই করতে যাচ্ছি না। কাজেই বিপদে পড়ার আশঙ্কা নেই। এবার তোমরা জাহাজে ফিরে যাও।

ফ্রান্সিস ঘোড়া ছোটাল। বন্ধুরা হাত নেড়ে বিদায় জানাল। তারপর জাহাজে ফিরে এল।

সন্ধ্যে নাগাদ একটা পাহাড়ী এলাকায় এল ফ্রান্সিসরা। রাতে পথ চলা যাবে না। একটা বড় কঁকড়া পাতাঅলা গাছের নিচে ওরা ঘোড়া থেকে নেমে বসল। আজ রাতের মতো এখানেই আশ্রয়। বিশ্রাম।

চকমকি পাথর ঠকে আগুন জ্বালাল শাঙ্কো। রান্না করল শাঙ্কো। খাওয়া দাওয়া সেরে ঘোড়া দুটোকে গাছের সঙ্গে বাঁধল। একটা পাত্রে জল ছোলা খেতে দিল। ঘাসের ওপর কম্বল পেতে ওরা শুল। ফ্রান্সিস বাদে ওরা তিনজন ঘুমিয়ে পড়ল।

ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। ও উঁচু গাছটার ঝুপসি ডালপাতার দিকে তাকিয়ে রইল। চারদিকে অন্ধকার। কৃষ্ণপক্ষ চলছে বোধহয়। নানা চিন্তা মাথায়। স্ট্রোমো কেমন দেশ। কোনো বিপদ হবে কিনা। গুপ্তধন শেষপর্যন্ত উদ্ধার করা যাবে কিনা। এসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে আবার সব বাঁধা ছাঁদা করে ঘোড়ার পিঠে উঠল ওরা। বারিনথাস রওনা হবার সময়ই বলল, ঘোড়া জোরে ছুটিও না। কোনো কারণে ঘোড়া অসুস্থ হয়ে পড়লে সর্বনাশ। এই পথে ঘোড়াই একমাত্র সম্বল। তাই ওরা ঘোড়া জোরে ছোটাচ্ছিল না।

বিচিত্র প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে ওরা চলল। কোথাও উঁচু পাহাড়। কোথাও গভীর খাদ। অনেক নিচে রুপোলি ফিতের মতো পাহাড়ী নদী বয়ে চলেছে। কোথাও লালরঙের ধুলোর প্রান্তর। তার মধ্যে ছড়ানো পাথর। ঘোড়া ছুটছে। পেছনে উঠছে লাল ধুলোর ঝড়। কোথাও পেয়েছে ছোট নদী। ঘোড়াগুলো পেট ভরে জল খেয়ে নিয়েছে। ওরাও জল খেয়েছে। চামড়ার থলেয় জল ভরে নিয়েছে।

তিন চার দিন কেটে গেল। ফ্রান্সিস বারিনথাসকে বলল-চলো, রাতেও আমরা এগিয়ে যাই। আমার বন্ধুরা বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত। কাজেই বেশি দেরি করতে পারবো না।

বারিনথাস রাজী হলো। ওরা রাতেও ঘোড়া ছোটাতে লাগল।

পাঁচদিনের দিন বিকেলে ওরা সবুজ গাছগাছালিভরা একটা জায়গায় এল। দেখলে দূরে দূরে কয়েকটা পাথরের বাড়িঘর। কোন কোন বাড়ি রোদে পোড়া হঁটে তৈরী। এদিকে ওদিকে তুলো গাছের ক্ষেত। বাড়ির সামনে মেয়েরা দাঁড়িয়ে বসে আছে। বাচ্চা ছেলেপুলেরা এদিকে ওদিকে খেলছে। সবাই অবাক চোখে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল।

বারিনথাস ঘোড়া থামাল। ফ্রান্সিসও ঘোড়া থামাল। বারিনথাস বলল–স্ত্রোমো দেশ শুরু হলো। এরা তলতেক উপজাতির মানুষ।

সেই রাতটা ওখানেই একটা গাছের নিচে ওরা রইল। বারিনথাস কাছাকাছি কোনো তলতেক-এর তাবু থেকে খরগোশের মাংসের ঝোল নিয়ে এল। কয়েকদিনের পর ভালো খাবার পেট ভরে খেল সবাই। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে উঠেই সব গোছগাছ করে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো। দুপুরের দিকে ওরা রাজধানী তুলায় পৌঁছল। দূর থেকে পাথরে গড়া বাড়ি চোখে পড়ল। বারিনথাস বলল–ঐ বাড়িটাই কোয়েতজাল দেবতার মন্দির। মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছতে বারিনথাস আঙুল দিয়ে মন্দিরের পেছনে একটা উপত্যকা মতো নিচু জায়গা দেখাল। বলল–এটাই হচ্ছে বিষাক্ত উপত্যকা।

–একটু ভালো করে দেখতে হয়। কথা বলে ফ্রান্সিস ঘোড়া থেকে নামল। উপত্যকার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। বারিনথাস ঠিকই বলেছে। ঐ দুপুরেও জায়গাটায় কুয়াশা ছড়িয়ে আছে। যেন ধোঁয়া উঠছে। জলের রঙ সঠিক বোঝার উপায় নেই। জলাভূমি মত। সাজের চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু আশ্চর্য-কাঠি কাঠি ঘাসের মতো গাছ আছে আর তাতে অজস্র গাঢ় বেগুনি রঙের ফুল ফুটে আছে। উপত্যকাটার একপাশে একটা ছোট পাহাড় উঠে গেছে। অন্যপাশে কোয়েতজাল দেবতার পাথরের মন্দির।

বারিনথাস হাত উঁচিয়ে বলল–ঐ দেখ, পাথরে ফণিমনসার গাছ।

ফ্রান্সিস দেখল সত্যিই উপত্যকাটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা কালো পাথর। তার ওপর একটা ফণিমনসার গাছ।

তুলা নামেই রাজধানী। তেমন কিছু জমজমাট জায়গা নয়। তুলার চারপাশে। এক মানুষ উঁচু পাথুরে দেয়াল। বোধহয় শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্যে। পাথরের বাড়িঘর এলাকাটায়। এখানে বেশি সংখ্যক লোকজনের বাস। পাথরের দেয়ালের বাইরে বাজার মতো বসেছে। লোকজন কেনাকাটা করছে। মেয়ে পুরুষ সকলের গায়েই মোটা সুতোর পোশাক। নানা বিচিত্র রঙের পোশাক সেসব। পোশাক থেকে সুতোর ঝালর ঝুলছে। এমন সময় দেখা গেল একদল সৈন্য এগিয়ে আসছে। সৈন্যদের গায়ে কোনো পোশাক নেই। পরনে পা পর্যন্ত ঢাকা এক ধরনের পোশাক। খালি গায়ে মুখে লাল হলুদ সবুজ উল্কি আঁকা। মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টি। তাতে অনেক পাখির পালক গোঁজা। সৈন্যদের হাতে লোহার ছুঁচোবলামুখ বর্শা।

সৈন্যরা এসে ওদের ঘিরে দাঁড়াল। বারিনথাস ডান হাত ওপরে তুলে নাহুয়াত ভাষায় কী বলে গেল। সৈন্যদের মুখে হাসি দেখা গেল। কথাটা শুনে ওরা খুশি হয়েছে বোঝা গেল। সকলৈ সরে গেল।

ফ্রান্সিস ফিসফিস্ করে বলল-হ্যারি ওদের এত খুশি হবার কারণ কী?

–বোধহয় বারিনথাস বলল,আমরা বন্ধু,শত্রু নই। তাছাড়া বারিনথাস পলাতক বন্দী। অথচ ও বেশ নির্ভয়েই সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলল। আত্মগোপনের কোনো চেষ্টাই করল না।

বারিনথাসের পিছু পিছু ওরা চলল। কোয়েতজাল দেবতার মন্দিরের পাশে একটা পাথরের বাড়ি। ছাউনিটা এই এলাকায় যে লম্বা লম্বা ঘাস হয় তাই দিয়ে তৈরি। বারিনথাস বলল–এটা রাজবাড়ি। চলো–সব আগে রাজার সঙ্গে দেখা করার নিয়ম।

যেতে যেতে ফ্রান্সিস বলল-বারিনথাস তোমার বাড়ি কোনটা?

বারিনথাস আঙুল দিয়ে রাজবাড়ির ডানপাশে একটা পাথরের বাড়ি দেখাল।

রাজবাড়িতে ঢুকল ওরা ঘোড়া থেকে নেমে আলো থেকে অন্ধকার ঘরে ঢুকে ওরা প্রথমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধকার সয়ে আসতে দেখল একটা তুলো কাপড়ের আসনে জাগুয়ারের চামড়ার ওপর রাজা বসে আছেন। খাড়া নাক। গায়ের রঙ তামাটে। মাথায় পাখির পালকের মুকুট। কপালে হলুদ কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। রাজা ফ্রান্সিসদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন।

বারিনথাস দুহাত ওপরে তুলে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর মাথা মেঝের ওপর রাখল। উঠে বসল। তারপর নাহুয়াতল ভাষায় কী বলে গেল; রাজার মুখে হাসি ফুটল। ফ্রান্সিস অস্ফুটস্বরে ডাকল হ্যারি।

হ্যারি চাপাস্বরে বলল–লক্ষ্য করেছি-কী ব্যাপার বুঝতে পারছি না।

-বারিনথাস বলেছিল রাজা ওকে পেলে মেরে ফেলবে। এখন দেখছি রাজা ওর কথা শুনে খুব খুশী। ওকে কিছু বলছে না।

এবার রাজা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কী বলল। বারিনথাস দোভাষীর কাজ করতে লাগল। তাতে রাজা ও ফ্রান্সিসের কথাবার্তা এইরকম দাঁড়াল।

রাজা–তোমরা জানো তোমাদের এখানে কেন আনা হয়েছে?

ফ্রান্সিস–আমাদের আনা হয়নি। আমরা নিজেরাই এসেছি।

রাজা–কেন?

ফ্রান্সিস–প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধন বের করবো তাই।

রাজা–সেই গুপ্তধন কোথায় আছে জানো?

ফ্রান্সিস–না। তবে শুনেছি বিষাক্ত উপত্যকার মাঝখানে।

রাজা–বিষাক্ত উপত্যকা কেমন জায়গা জানো?

ফ্রান্সিস–জানি।

রাজা–পারবে গুপ্তধন উদ্ধার করতে?

ফ্রান্সিস–আগে সব দেখি শুনি তারপর বলতে পারবো।

রাজা (হেসে)-যদি ততদিন বাঁচো।

ফ্রান্সিস–তার মানে?

রাজা–কোয়েতজাল দেবতা যেমন জীবনের দেবতা তেমনি মৃত্যুরও দেবতা।

ফ্রান্সিস বারিনথাসের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল–এসব কথার মানে কী?

–রাজার মেজাজের কিছু স্থিরতা নেই। ভুলে যাও এসব কথা।

ফ্রান্সিস দ্রুত চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। দেখল–ঘরের দরজার কাছে দুজন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে দ্রুত বলে উঠল–হ্যারি শাঙ্কো পালাও–আমার পেছনে।

ফ্রান্সিস এক লাফে দরজার কাছে চলে এল। পেছনে হ্যারি আর শাস্কো। দরজায় পাহারাদার সৈন্য কিছু বোঝবার আগেই ফ্রান্সিস দুজনকেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। তারপর এক লাফে বাইরের চত্বরে গিয়ে দাঁড়াল। পেছনে হ্যারি আর শাঙ্কো। ঠিক তখনই দরজার পাহারাদার একজন উঠে দ্রুত হাতে বর্শা চূড়ল। বর্শা গিয়ে বিধল ফ্রান্সিসের বাঁ পায়ে। ফ্রান্সিস হাত দিয়ে এক টানে বর্শাটা খুলে ফেলল। গলগল করে রক্ত ছুটল। ফ্রান্সিস বসে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়াল। ছুটতে যাবে দেখল ততক্ষণে রাজবাড়ির পাহারাদার সৈন্যরা ওদের ঘিরে ফেলেছে। ফ্রান্সিস আবার দুহাতে পা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল। শাঙ্কো তখন তীর ছোঁড়ার জন্য তৈরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। বলে উঠল–শাঙ্কো, ধনুক নামাও। এখন লড়াই নয়।

শাঙ্কো ধনুক নামাল। হ্যারি ছুটে এসে ফ্রান্সিসের পায়ের জখমের জায়গার ওপরে দুহাত দিয়ে চেপে ধরল–যদি রক্তপড়া বন্ধ করা যায়। রক্ত পড়া একটু কমল বটে কিন্তু একেবারে বন্ধ হলো না।

এর মধ্যে রাজা কালহুয়াকান বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে বারিনথাস। রাজা চিৎকার করে বারিনথাসকে কী বললেন। বারিনথাস ফ্রান্সিসদের কাছে এসে দাঁড়াল। হেসে বলল–পালাতে গিয়ে ভু করলে। রাজার রাগ বাড়িয়ে দিলে। এবার চললা গারদ ঘরে। ওখানেই থাকতে হবে কয়েকদিন।

–কয়েকদিন কেন?

–সেটাও কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝবে। বারিনথাস হেসে বলল।

ফ্রান্সিস এক ঝটকায় দ্রুত উঠে দাঁড়াল। রাজার দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল–আমাদের নিয়ে কী করতে চান?

রাজা একবার ফ্রান্সিসদের দিকে ক্রুদ্ধ নজরে তাকিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। বারিনথাস হেসে বলল–তাহলে এবার আসল কথাটা বলি। আর চারদিন পর অমাবস্যা পড়বে। সেই রাতে কোয়েতজাল দেবতার বেদীতে তোমাদের বলি দেওয়া হবে।

তিনজনেই ভীষণভাবে চমকে উঠে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বারিনথাসের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল–তাহলে এইজন্যেই তুমি আমাদের প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধনের লোভ দেখিয়েছিলে?

–হ্যাঁ?

–আমার আরো বন্ধুদের আনতে বলেছিলে?

–ঠিক তাই। আমার কাজই এই। রাজা আমাকে এখানে থাকতে দিয়েছেন একটি চুক্তিতে–তিন মাস অন্তর অমাবস্যার রাতে নরবলি দেবার জন্যে আমি মানুষ যোগাড় করে আনবো। আমিও এ কাজে রাজী হলাম এইজন্যে যে আমি তাহলে এখানে থাকতে পারবো। গুপ্তধন খুঁজতে পারবো। তারপর একদিন গুপ্তধন উদ্ধার করে নিয়ে পালাতে পারবো।

–কিন্তু গেরুয়া পাহাড়ের গুহায় গিয়েছিলে কেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।

ওটা আমার ফাঁদ পাতার জায়গা। গুহার বাইরে ঘেঁড়া জামা ঝুলিয়ে রাখি, জাহাজ এলে জাহাজের লোকেরা সেই সংকেত দেখে আমাকে উদ্ধার করে। আমি গুপ্তধনের লোভ দেখিয়ে জাহাজের লোকদের এখানে নিয়ে আসি। তাদের বলি দেওয়া হয়। রাজাও আ : ওপর খুশি হয়। আমিও নিশ্চিন্তমনে গুপ্তধন খুঁজি।

–এর আগেও নিরীহ মানুষদের লোভ দেখিয়ে নিয়ে এসেছো?

–হ্যাঁ, তবে এর আগেরবারগুলোতে দশ পনেরো জন করে এনেছি। এবার তোমরা তিনজন মাত্র। বোধহয় কয়েদ রয়েছে কিছু।

ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আস্তে আস্তে বলতে লাগল–বারিনথাস, মৃত্যুর মুখ থেকে তোমাকে আমরা ফিরিয়ে এনেছি, ওষুধ দিয়েছি, সেবা-শুশ্রূষা করে তোমাকে সুস্থ করেছি। খাদ্য দিয়েছি, আশ্রয় দিয়েছি। যে পোশাকটা পরে। আছো সেটাও আমরাই দিয়েছি। বদলে আমাদের হত্যা করবার জন্যে নিয়ে এলে! কী অকৃতজ্ঞ! কী সাংঘাতিক মানুষ তুমি!

নির্বিকার বারিনথাস বলল-নইলে গুপ্তধন খুঁজবো কী করে।

ফ্রান্সিস বলল–আমাদের ভাগ্যে যাই ঘটুক তোমাকে একটা অনুরোধ করে যাই–এমন কাজ আর করো না। এতে মানুষ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাবে। আমরা জানোয়ারেরও অধম হয়ে যাবো।

বারিনথাস হাসল শুধু।

বারিনথাস সৈন্যদের উচ্চস্বরে কী আদেশ করল। সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের টেনে নিয়ে চলল।

ফ্রান্সিস খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। তখনো ওর ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়ছে। হ্যারি চলতে চলতে বলল–ফ্রান্সিস, বারিনথাসকে ওষুধ দেবার কথা বলবো?

–না, ওরকম একটা জঘন্য প্রকৃতির মানুষের কোনো সাহায্য আমি চাইবো না।

–এত রক্ত পড়ছে–তুমি দুর্বল হয়ে পড়বে।

–শরীরের দিক থেকে, মনের দিক থেকে নয়। হ্যারি, আমরা লড়াই করবো মনের জোরে।

ঘরটা রাজবাড়ির দক্ষিণ কোণায়। দেওয়ালগুলো পাথর গেঁথে তৈরি। তখনও ফ্রান্সিসদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়নি। অবশ্য তরোয়াল তীর ধনুক হাতে থাকা সত্ত্বেও ফ্রান্সিস তখন লড়াই করার কথা নিজে ভাবছিল না। ও আহত। ওদিকে সৈন্যরা সংখ্যায় জনা দশেক। এই অবস্থায় একবার লড়াইয়ে নামলে ওরা তিনজন বাঁচবে না। বরং বন্দী করে রাখলে পরে পালানোর উপায় বার করা যাবে। বুদ্ধি খাঁটিয়ে সেই কাজটিই করতে হবে। এখন ওরা যা করতে চাইছে সেটা মেনে নেওয়াই ভালো।

ওরা কয়েদ ঘরের কাছাকাছি চলে এসেছে ঠিক তখনই দুজন অশ্বারোহী সৈন্যদের কাছে এসে থামল। অশ্বারোহী সৈন্য দুজন ঘোড়া থেকে নামল। সৈন্যদের কাছে এসে ওরা হাত পা নেড়ে ওদের ভাষায় কী বলল। সৈন্যটি বর্শা উঁচিয়ে মুখ হাত দিয়ে থাবড়াতে থাবড়াতে উলুধ্বনির মত এক অদ্ভুত শব্দ করতে লাগল। তারপর শব্দ থামিয়ে ছুটল ঐ শহরের চারপাশে গাঁথা পাথুরে দেয়ালের দিকে।

শুধু যে দুজন সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল সেই দুজন রইল। তারা সামনের একটা গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে ঘোড়া দুটো বাঁধতে লাগল। তখনই ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল-হ্যারি-শাঙ্কো–এই সুযোগ। ঘোড়া দুটো বাঁধবার আগেই ঘোড়া দুটো ছিনিয়ে নিতে হবে। একটায় আমি অন্যটায় শাঙ্কো আর হ্যারি তুমি জলদি।

সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ছুটে গিয়ে সৈন্য দুটোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সৈন্য দুজন ভাবতেও পারে নি যে ওরা এভাবে আক্রান্ত হবে। ফ্রান্সিস একজন সৈন্যের ঘাড়ে তরোয়ালের বাঁট দিয়ে ঘা মারল। সৈন্যটা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। শাঙ্কো অন্য সৈন্যটার মাথা দুহাতে ধরে গাছের গায়ে ঠুকে দিল। ঐ সৈন্যটাও গাছের গোড়ায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস আহত পা নিয়েও লাফিয়ে একটা ঘোড়ার পিঠে উঠল। তরোয়ালটা কোমরে জল। লাগাম হাতে নিয়ে ঘোড়ার পেটে পা দিয়ে জোরে খোঁচা মারল। ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠে ছুটল। শাঙ্কোও ততক্ষণে আর একটা ঘোড়ায় উঠে পড়েছে। হ্যারিও সেই ঘোড়ার পিঠের সামনের দিকে লাফিয়ে শাঙ্কো বাঁ হাতে হ্যারিকে সামনে বসিয়ে নিয়ে ঘোড়া ছোটাল।

একটু পরেই তুলা শহরের পাথুরে দেয়াল ছাড়িয়ে ওরা বাইরের প্রান্তরে চলে এল। দেখল তলতেক সৈন্যরা কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। হয়তো অন্য কোন উপজাতির সৈন্যদের সঙ্গে। ওরা দেখল দুদলের কিছু সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করছে। বাকিরা মাটিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছে। ফ্রান্সিস দ্রুত দেখে নিল অন্য উপজাতির যোদ্ধারা অনেকেই বন্দী হয়েছে। উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন যোদ্ধা মাটিতে পড়ে আছে। আহতদের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। তবে তলতেক যোদ্ধারা প্রায় জয়ের মুখে। অন্য উপজাতির লোকেরা ঘোড়ায় চড়ে পালাচ্ছে।

কয়েকজন তলতেক সৈন্য ফ্রান্সিসদের দেখল। ঘোড়া চালাতে চালাতে শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস কোনদিকে? ফ্রান্সিস বলে উঠল-বাঁ দিকে–ঐ পাহাড়ের দিকে। বিষাক্ত উপত্যকাকে বাঁ পাশে রেখে ওরা উত্তরের পাহাড়টা লক্ষ্য করে ঘোড়া ছোটাল।

এতক্ষণে যে কজন তলতেক সৈন্য ফ্রান্সিসদের দেখেছিল তারা বুঝল যে বন্দীরা পালাচ্ছে। এবার ওরা ঘোড়া ছুটিয়ে ফ্রান্সিসদের ধাওয়া করল। কিন্তু ফ্রান্সিসরা। ততক্ষণে অনেকটা চলে গেছে।

ফ্রান্সিস ঘোড়া ছোটাচ্ছে। কিন্তু খুব একটা দ্রুত ঘোড়া ছোটাতে পারছে না। বর্শা বেঁধা বাঁ পাটা অসাড় লাগছে। তবু ও প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাতে লাগল। কারণ ততক্ষণে ফ্রান্সিস দেখেছে পেছনে কিছু দূরে তলতেক সৈন্যরা ধুলো উড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। ঘোড়া ছোটাতে ছোটাতে শাঙ্কো বলে উঠল, ফ্রান্সিস–সৈন্যরা আসছে।

–হ্যাঁ দেখেছি। ঘোড়া ছোেটাও। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

ঘোড়ায় চড়ে ছুটছে ওরা। পেছনে তলতেক সৈন্যরা। ফ্রান্সিস ওর বাঁ পাটা দেখল। রক্ত পড়ছে তখনও। ঘোড়ায় চড়ার ঝাঁকুনিতে রক্ত বেশী বেরোচ্ছে। পা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বেশ দুর্বল লাগছে শরীরটা। শাঙ্কো আর হ্যারি তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস একটু পেছনেই পড়ে গেল। শাঙ্কো ঘোড়ার চলার গতি কমালো। ফ্রান্সিসদের কাছাকাছি পিছিয়ে এল। ফ্রান্সিস আহত। ঘোড়া থেকে যদি পড়ে যায়? এতে তলতেক সৈন্যদের সঙ্গে ওদের ধরে ফেলবে। ওর নিজের এই আহত শরীর। পারবে কি তলতেক সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই চালাতে?

তলতেক সৈন্যদের সঙ্গে ওদের দূরত্ব আরো কমে এল। তলতেক সৈন্যদের মধ্যে একজন লোহামুখ বর্শা ছুঁড়ল। সেটা ফ্রান্সিসদের থেকে বেশ দূরে এসে মাটিতে গেঁথে গেল।

একটা ঘাসে ঢাকা উপত্যকার মধ্যে একটা পায়ে চলা রাস্তার ওপর দিয়ে ওরা ছুটছে তখন। শাঙ্কো আর হ্যারির ঘোড়া আগে ছুটছিল। উত্রাইটা পেরোতেই হঠাৎ শাঙ্কো দেখল–সামনে গভীর খাদ। খাদের অনেক নীচে একটা পাহাড়ী নদী বয়ে চলেছে। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার মুখের রাশ প্রাণপণে টেনে ধরে চেঁচিয়ে উঠল–ফ্রান্সিস সামনে খাদ। থামো। ফ্রান্সিস তখন ঠিক ওদের পেছনে। শাঙ্কোর কথাটা কানে যেতে ফ্রান্সিসও প্রাণপণে ঘোড়ায় রাশ টেনে ধরল। ঠিক খাদের মুখে ওরা থেমে গেল।

ফ্রান্সিস দেখল–নদীর খাদটার ওপর দিয়ে একটা দড়ির সেতু বাঁধা। শক্ত পাকানো দড়ি দিয়ে তৈরী সেতুটা। এপারে সেতুটা দুটো মোটা কাছির মত দড়ি দিয়ে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বাঁধা। দেখল ওপারে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে কাছি দুটো টান টান বাঁধা। মাঝখানে সেতুটা হাত পাঁচেক দড়ির জাল বোনা। ওটার ওপর দিয়ে অনায়াসে হেঁটে পার হওয়া যায়। অনেক নীচে দেখল ছোট্ট পাহাড়ী নদী এঁকে বেঁকে চলেছে। খাদটার দুপাশের পাহাড়ে ঘন বন। নীচেও দুপাশে অনেকটা জায়গায় বন জঙ্গল। দড়ির সেতুটা দিয়ে মানুষ হেঁটে যেতে পারে। কিন্তু ঘোড়া যেতে পারবে না।

ফ্রান্সিস পেছনে তাকাল। একজন ঘোড়সওয়ার তলতেক সৈন্য অনেক কাছে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস দ্রুত ভাবতে লাগল কী করবে এখন। হঠাৎ মনে একটা চিন্তা ধাক্কা দিল। হ্যাঁ–এ ছাড়া উপায় নেই। ফ্রান্সিস ঘোড়া থেকে নামল। শাঙ্কো আর হ্যারিও নামল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো-সামনেরটার মোকাবিলা আমি করছি। তুমি পেছনেরগুলোকে ঠেকাও।

শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে তীর ধনুক হাতে নিল। নিশানা করল পেছনের একজন সৈন্যকে। ছুঁড়ল তীর। নিখুঁত নিশানা। ঘোড়াসুদ্ধ সৈন্যটা লাফিয়ে উঠে মাটির ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। তীরটা ওর বুকে লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে তিন চারজন সৈন্য ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল।

এদিকে খুব কাছে এগিয়ে আসা সৈন্যটা ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ল। ফ্রান্সিস মাথা নীচু করে দ্রুত সরে গেল। লক্ষ্যভ্রষ্ট বর্শাটা একটা পাথরের গায়ে লেগে ছিটকে পড়ল। পাথরের গায়ে আগুন ছিটকোল। ফ্রান্সিস এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তরোয়াল খুলে চালাল সৈন্যটার ডান উরু লক্ষ্য করে। উরু কেটে রক্ত ছুটল। সৈন্যটা চিৎকার করে দুহাতে আহত উরুটা চেপে ধরল। ও তখন বুঝতে পারে নি সামনে খাদ, দড়ির সেতু। লাগাম ছাড়া হতেই ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল। পড়ল গিয়ে দড়ির সেতুটার ওপর। প্রচও জোরে দুলে উঠল সেতুটা। দড়িতে পা আটকে ঘোড়াটা কাত হয়ে গেল। সৈন্যটা লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে গেল। কিন্তু পারল না। ঘোড়াটা পাক খেল। ঘোড়াসুদ্ধ সৈন্যটা ছিটকে পড়ল। গভীর খাদের শূন্যতার মধ্যে দিয়ে নীচে পড়তে লাগল। মৃত্যুমুখী সৈন্যটা ভয়ার্ত চীৎকার করে উঠল। সেই চীৎকারের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল পাহাড়ের গায়ে গায়ে। ঘোড়া আর সৈন্যটা আছড়ে পড়ল অনেক নীচে পাহাড়ী নদীটার ওপর। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে গেল। সৈন্যটার অন্তিম চীৎকার তখনও খাদের দুপাশের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

ওদিকে শাঙ্কো তীর মেরে আর একটা সৈন্যকে ঘায়েল করছে। বাকী কয়েকজন সৈন্য এবার দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস দেখল–ঐ সৈন্যদের পেছনে আরো সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে ধুলো উড়িয়ে আসছে।

ফ্রান্সিস নদীখাদের দিকে তাকাল। দড়ির জালের সেতু। লোক চলাচলের জন্য। শক্ত দড়ির জাল। ওপারে যাওয়া যায়। কিন্তু লাভ নেই। পেছনে আরো সৈন্য আসছে। এখন লড়াই করতে যাওয়া বোকামি। একমাত্র উপায় দড়ির সেতুটা কেটে ফেলা। কিন্তু ওপারে গিয়ে সেতুর দড়ি কাটার সময় নেই। সৈন্যরা অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। দড়ির সেতুটাও কাটতে হবে আবার সৈন্যরা এসে পৌঁছোবার আগে ওপরে পৌঁছতে হবে। কিন্তু কীভাবে? ফ্রান্সিস একটু আগেই সেটা ভেবে রেখেছিল। সেইভাবেই কাজ শুরু করতে হবে। তার আগে ও নদীখাদটার মুখে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল সেতুটা ছিঁড়ে ফেলে ওপারে নীচে গিয়ে কোথায় লাগবে। দড়ির সেতুটার মোটামুটি মাপটা ভেবে নিয়ে দেখল দড়ির সেতুর এই মাথাটা যেখানে ঝুলে। গিয়ে লাগবে সেখানে ঝোঁপ আর জঙ্গল। ও নিশ্চিত, হল। ওদের আহত হবার ভয় নেই। ও ফিরে এসে দাঁড়াল। দড়ির সেতুর যে মোটা কাছি দুটো একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা ছিল সেখানে। দেখল তলতেক সৈন্যরা তীরের আক্রমণের ভয়ে সন্তর্পণে গতি কমিয়ে এগিয়ে আসছে।

ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–হ্যারি শাঙ্কো শিগগির এই কাছিটা কাটো। বলেই ও কাছির একটায় তরোয়ালের কোপ দিল। হ্যারিও তরোয়াল দিয়ে ঘা দিল। তরোয়ালের কোপে দড়ির ছিবড়ে বেরিয়ে গেল। শাঙ্কো তীর ধনুক কাঁধে ঝুলিয়ে কোমরে গোজা ছুরিটা বের করল। বলল-ফ্রান্সিস সেতুটা কাটতে চাইছো কেন?

সেতুটা কেটে এদিকের কাছি দুটো ধরে আমরা ঝুলে পড়বো। ঝুল খেয়ে ওপারের খাদের নীচের দিকে ঝোঁপ জঙ্গলে গিয়ে পড়বে। তারপর দড়ির সেতু বেয়ে ওপরে উঠে পালাবো। দড়ির সেতু ভেঁড়া হলে তিলতেক সৈন্যরা নদীখাত পেরোতে পারবে না।

শাঙ্কো হেসে বলল–সাবাস সাবাস। শাঙ্কো ওর ছোরা দিয়ে ঘষে ঘষে একটা কাছি কেটে ফেলল। অন্য কাছিটা তখন প্রায় কাটা হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস তারোয়াল কোমরে গুঁজল। হ্যারিও তরোয়াল কোমরে গুজল। ফ্রান্সিস বলল–কাছি আর দড়ির জাল ধরে ঝুলে পড়। হ্যারি আর শাঙ্কো খাদের মুখের কাছে কাটা কাছি আর জাল ধরে ঝুলে পড়ল। ফ্রান্সিসও ছুটে এসে ঝুলে পড়ল। ঠিক তখনই দুজন তলতেক সৈন্য ঘোড়া থেকে নেমে ছুটে এল ওদের ধরতে। কিন্তু ততক্ষণে তিনজনের ভারে অন্য অল্প কাটা কাছিটাও ছিঁড়ে গেছে। ছেঁড়া দড়ির সেতু ধরে ঝুলে নেমে তিনজন ওপারে পাথুরে দেয়ালের নীচের দিকে ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়ল।

তলতেক সৈন্যরা নদীখাতের মুখে দাঁড়াল। নীচে শুকিয়ে দেখল ফ্রান্সিসরা তলায় ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে ঝুলছে। সৈন্যরা ভাবতেও পারেনি ফ্রান্সিসরা এভাবে ওদের হাত থেকে পালাবে। তলতেক দৈন্যরা নদীখাদ-এর পাশ দিয়ে এদিক ওদিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দেখে এল। না : নদীখাদ পার হবার কোন উপায় নেই। সৈন্যরা কিছুক্ষণ ওখানে বিশ্রাম নিল। তারপর দল বেঁধে চলে গেল।

ছেঁড়া কাছি দড়ি ধরে ঝুলে নেমে ফ্রান্সিস হ্যারি শাঙ্কো ঝোঁপ জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়ল। তাতে ওদের হাত পা ছড়ে গেল। ফ্রান্সিসের আহত পায়েও একটা গাছের ডাল লাগল। আবার ঘা খাওয়া জায়গাটা থেকে রক্ত পড়তে লাগল। কিন্তু ফ্রান্সিস দাঁত চেপে সহ্য করতে লাগল। যাক–মৃত্যুর হাত থেকে তো বাঁচা গেছে। পায়ের ক্ষত শুকিয়ে যাবে। কিন্তু রাজা কালহুয়াকানের কয়েদ ঘরে বন্দী হলে জীবিত অবস্থায় আর ওরা বেরিয়ে আসতে পারতো না।

ফ্রান্সিস নীচের দিকে তাকালো। ছোট আঁকাবাঁকা নদীটা অনেক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যে উচ্চতায় ওরা দড়ির সেতু ধরে ঝুলছে সেখান থেকে হাত ফস্কে নীচে পড়লে ওদের শরীর গুঁড়িয়ে যাবে। নদীটার জলস্রোতে অনেক বড় বড় পাথরের বাধা। তীব্র গতিতে বয়ে যাওয়া নদীর জল সেই পাথরগুলোতে ঘা খাচ্ছে। জল ছিটকে উঠছে। তাই শব্দও হচ্ছে। ফ্রান্সিস স্পষ্ট সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।

এ সময় হঠাৎ হ্যারি বলে উঠল–ফ্রান্সিস–আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে। ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি তুমি নীচের দিকে তাকিও না। তারপর বলল–হ্যারি শাঙ্কো–এবার দড়ির ফোকরে হাত-পা ঢুকিয়ে আঁকড়ে ধরে ওপরের দিকে উঠতে থাকো। ফ্রান্সিস প্রথম কিছুটা উঠে দেখাল কী ভাবে উঠতে হবে। হ্যারি আর শাঙ্কো সেভাবে উঠতে লাগল। উঠতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল। একদিকে নদীখাদের শুন্যতা অন্যদিকে তীব্র হাওয়া। দড়ির সেতুটা দোল খেতে লাগল।

আস্তে আস্তে ওরা উঠতে লাগল। একসময় ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি এখন কেমন আছো? হ্যারি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–একটু ভালো। কিন্তু ফ্রান্সিস আর কতটা উঠতে হবে? ফ্রান্সিস মাথা উঁচু করে দেখল। বলল–আর কিছুটা। কোন দিকে তাকিও না। শুধু উঠতে থাকো। সামনে দড়ির দিকে তাকিয়ে থাকো।

আবার আস্তে আস্তে সেতুর দড়ির জালে হাত পা রাখতে রাখতে ওরা উঠতে লাগল। হ্যারি কোনদিকে তাকাচ্ছিল না।

হঠাৎ দড়ির জাল শেষ। সামনেই একটা বড় পাথর। এবার টান দেওয়া দুটো কাছি বেয়ে বেয়ে ওরা পাথরটার ওপর টেনে-হিঁচড়ে শরীরটাকে নিয়ে উঠল। পা রাখল পাথরটায়। শাঙ্কো আর হ্যারি তখনও হাঁপাচ্ছে। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে। ফ্রান্সিসও পরিশ্রান্ত। তবে শাঙ্কো আর হ্যারির মত কাহিল হয়ে পড়েনি। ওকে দুর্বল করে দিচ্ছিল পায়ের ক্ষতের যন্ত্রণাটা।

পাথরটার ওপর বসল তিনজনে–ভীষণ হাঁপাতে লাগল। পশ্চিম দিলে নদী খাদের কোনাকুনি সূর্য দিগন্তের অনেক কাছে নেমে এসেছে। সন্ধ্যে হতে খুব দেরী নেই। হ্যারি বলল

–ফ্রান্সিস-এ আমরা কোথায় এলাম?

–কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু বিশ্রাম করে চলো হাঁটতে থাকি?

–কোনদিকে? শাঙ্কো বলল।

-ঐ উত্তরদিকে। ফ্রান্সিস আঙুল তুলে দেখাল। ও দিকে দেখা গেল গম্ভীর বনাঞ্চল।

–কিন্তু ওদিকে কোথায় যাবো? শাকো বলল।

ফ্রান্সিস বলল–একটু বুদ্ধি খাটাও শাঙ্কো। এই পাথরটার ওপাশে তাকিয়ে দেখ–একটা অস্পষ্ট পায়ে চলা পথ। তার মানে এখান দিয়ে দড়ির সেতু পেনি লোকজন যাতায়াত করে। এই অস্পষ্ট পথটা ধরে যদি আমরা বনের মধ্যে এগোতে থাকি নিশ্চয়ই মানুষজনের বসতি পাবো সেটা বনের মধ্যেও হতে পারে, বনের শেষেও হতে পারে।

-কিন্তু সেই মানুষজন তো আমাদের সঙ্গে শত্রুতাও করতে পারে?–হ্যারি বলল।

–সেটাই স্বাভাবিক হ্যারি। ফ্রান্সিস বলল–আমরা বিদেশী বিধর্মী আমাদের এরা কেউ ডেকে খাদ্য ও আশ্রয় দেবে না। যদি দেয় ভালো, না দিয়ে আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার জন্য লড়াইয়ে মতে হবে। অবশ্য যদি ওরা সংখ্যায় অল্প হয়। সংখ্যায় বেশী হলে বনের আড়ালে আড়ালে পালাবো।

পাথরের ওপর বসে তিনজনে একটু জিরিয়ে নিল। ফ্রান্সিসের পায়ের ক্ষতস্থান থেকে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পছে। ফ্রান্সিস বেশ দুর্বল বোধ করছে। কিন্তু হাত পা ছেড়ে বিশ্রাম করার সময় এখন নয়। সামনে এগোনো ছাড়া উপায় নেই। পেছনের সেতু তো ওরা কেটে ফেলেছে।

ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। বলল-চলো ঐ বনের দিকেই যাওয়া যাক। লোকালয় নিশ্চয়ই পাবো। কারণ এই পথটা দিয়ে তোক চলাচল করে। হ্যারি আর শাঙ্কোও উঠে দাঁড়াল। হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস তুমি পারবে হাঁটতে? কতটা হাঁটতে হয় কে জানে। ফ্রান্সিস হাসল-না পারলে চলবে কেন। শাঙ্কো বলল–আমরা তোমাকে ধরে নিয়ে যাবো?

–না-না। চলো। ফ্রান্সিস খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। হ্যারি আর শাঙ্কো চলল। হ্যারি বলল–এখন আমাদের দুটো জিনিস দরকার। ফ্রান্সিসের চিকিৎসা আর খাদ্য। আশ্রয় না জুটলেও ক্ষতি নেই। গাছতলায় শুয়ে পড়বে।

ওরা যখন বনের কাছে পৌঁছল তখনও সন্ধ্যে হয়নি। কিন্তু বনের বিরাট বিরাট গাছগাছালি আর ঝোঁপের নীচে এর মধ্যেই অন্ধকার জমাট বেঁধেছে। এতক্ষণ ওরা যা লক্ষ্য করেনি এবার সেটা লক্ষ্য করল। বনের সমস্ত গাছের লতার পাতা শুকিয়ে হলুদ হয়ে গেছে। গাছ লতার শুকনো পাতা নীচে মাটিতে স্তূপ হয়ে জমে আছে। অনেক গাছ-গাছালিতে একটা পাতাও নেই। শুকনো আঁকাবাঁকা ডাল উঁচিয়ে আছে আকাশের দিকে। মাঝে মাঝে শুকনো গরম হাওয়া ছুটে আসছে। শুকনো ডাল পাতায় শব্দ তুলছে। ওরা তিনজনেই অবাক হয়ে শুকনো বনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তখনই হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস এখানে প্রচণ্ড খরা চলছে। বোধহয় কয়েক বছর এদিকে এক ফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। তাই বনটার এই অবস্থা।

ফ্রান্সিস বলল–ঠিকই বলেছো। অনাবৃষ্টির জন্যেই এই অবস্থা। এখন সমস্যা হল এই বনে বা ধারে-কাছে যারা থাকে তাদের তো পোচনীয় অবস্থা। আশ্রয় ও খাদ্য পাওয়া যাবে কি?

-চলো এগিয়ে যাই তো। দেখা যাক অবস্থাটা। হ্যারি বলল। ওরা বনের মধ্যে দিয়ে এগোতে লাগল। একে অন্ধকার। তার ওপর জমে থাকা শুকনো পাতায় হাঁটু অব্দি ডুবে যাচ্ছে। কাজেই চলার গতি কমে গেল। তবু চলল ওরা। রাত নামার আগে যদি একটা আশ্রয়, কিছু খাদ্য জল পাওয়া যায়। শুকনো ঝরা পাতার টিবির ওপর দিয়ে ওরা হেঁটে চলল। ফ্রান্সিসের কষ্ট–তে লাগল সবচেয়ে বেশী। একে কাটা ঘা তার ওপর শুকনো ডালপাতার ঘষটানি। যন্ত্রণা মাঝে মাঝে অসহ্য হয়ে উঠছে। তবু ফ্রান্সিস দাঁত চেপে কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল। ও যদি শারীরিক কষ্ট বিন্দুমাত্রও প্রকাশ করে তাহলে হ্যারি শাঙ্কো দুজনেই অস্থির হয়ে পড়বে। কাজেই ফ্রান্সিস নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল। নিজের জ্বালা যন্ত্রণার কথা বলল না।

হঠাৎ দুপাশের শুকনো পাতায় জোরে শব্দ উঠল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তরোয়াল খুলে ফেলে ডাকল–হ্যারি–শাঙ্কো। হ্যারিও ততক্ষণে তরোয়াল কোমর থেকে খুলে ফেলেছে। শাঙ্কোও তীর ধনুক নিয়ে তৈরী। বুনো জন্তু-জানোয়ারের আশঙ্কাই করছিল ওরা। কিন্তু বুনো জন্তু-জানোয়ার নয়। ঝরা পাতায় শব্দ তুলে জমাট অন্ধকারের মত একদল মানুষ ওদের ঘিরে ধরল। অন্ধকারে ফ্রান্সিসরা অনুমান করতে পারল না ওরা সংখ্যায় কত। মুহূর্তে লোকগুলো ওদের বুকের কাছে বর্শা উঁচিয়ে ধরল। ফ্রান্সিস এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর তরোয়াল নামাল। চেঁচিয়ে বলল–হ্যারি শাঙ্কো-লড়াই নয়। হ্যারি তরোয়াল নামাল। শাঙ্কো তীর ধনুক নামাল।

লোকগুলোর মধ্যে একজন বর্শা হাতে এগিয়ে এল। ওদের ভাষায় চীৎকার করে কী বলল। ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না। চুপ করে রইল। সেই সবার সামনে এগিয়ে আসা লোকটা নিজের লোকদের দিকে ফিরে কী বলল। দুতিনজন এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসদের পিঠে বর্শার খোঁচা দিয়ে হাঁটতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা হাঁটতে লাগল। পেছনে লোকগুলো। শুকনো পাতায় জোর মড়মড় শব্দ উঠল। সবাই চলল।

শাঙ্কো চাপাস্বরে বলল–এরা কী করতে চায় আমাদের নিয়ে?

–কিছুই বুঝছি না। ফ্রান্সিস বলল?

–এদের হাতে মশাল-টশাল থাকলে তবু এদের ভালোভাবে জানতে পারতাম।

-পাগল হয়েছে শাঙ্কো। হরি বলল-এই শুকনো খটখটে বনে মশাল তো দূরের কথা এককণা আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়লে সমস্ত বন জ্বলে যাবে।

–দেখাই যাক না কোথায় নিয়ে যায়। একটা উন্মুক্ত প্রান্তরে এসে দাঁড়াল ওরা। এবার ফ্রান্সিসরা লোকগুলোকে দেখল। তলতেকদের মতই মোটা সূতীর কাপড় গায়ে কোমরে। মাথায় কাপড়ের ফেট্টি। তাতে পালক গোঁজা। হাতে বর্শা। বোঝা গেল এরা যোদ্ধা। প্রান্তরের পরেই দেখা গেল–পাথরের বাড়িঘর। ছাতগুলো পাথরের না। ঘাস পাতার। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। এখানে ওখানে মশাল জ্বলছে।

এই যোদ্ধাদের আসতে দেখে বাড়িঘর থেকে লোকজন বেরিয়ে এল। তাদের হাতে মশাল। স্ত্রীলোক, বৃদ্ধরা এই যোদ্ধাদের ঘিরে ধরল। তাদের ভাষায় নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। যোদ্ধারা ঐ ভীড়ের মধ্যে পথ করে ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। যেতে যেতে যোদ্ধারা ভীড় করে আসা লোকজনদের কী বলতে লাগল। দু একজন স্ত্রীলোক চীৎকার করে কেঁদে উঠল। অন্যদের চোখমুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা গেল। ফ্রান্সিসরা বুঝল কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু ঠিক বুঝল এখানকার মানুষগুলো এত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হল কেন? কী জানতে চাইছে ওরা?

ফ্রান্সিসদের নিয়ে যোদ্ধার দল একটা বড় পাথরের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়িটার সামনে পাথরে বাঁধানো সিঁড়ি উঠে গেছে। সবাই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। একটা বিরাট দরজা সামনে। এবড়ো খেবড়ো কাঠের দরজা। দরজার কাঠ ভালো করে চাঁছা হয়নি। দরজার দুদিকে দেয়ালে মশাল জ্বলছে। বর্শা হাতে দুজন দ্বারী দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ঢুকল ওরা।

পাথরে বাঁধানো মেঝে। বিরাট লম্বাটে ঘর। দুদিকে মশাল জ্বলছে। মশালের আলোয় দেখা গেল ঘরের শেষ দিকে একটা কাঠের সিংহাসন। রঙ-বেরঙের মোটা কাপড়ে ঢাকা। পালকের গদী। যোদ্ধাদের দলনেতা ফ্রান্সিসদের সিংহাসনের সামনে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস আস্তে বলল, বোধহয় রাজার বাড়ি–এটা রাজ দরবার।

-আমারও তাই মনে হচ্ছে। হ্যারিও গলা নামিয়ে বলল।

যোদ্ধারা সবাই পিছিয়ে দাঁড়াল। সামনে রইল শুধু দলনেতা।

একটু পরেই ও পাশের পাথরের থামের দিক দিয়ে একজন ঢুকল। তার পরনে নানারঙের জমকালো পোশাক। মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টি। তাতে নানারকম রঙীন পাখির পালক গোঁজা। বোঝা গেল ইনিই রাজা। ততক্ষণে সব যোদ্ধারা দলপতি দুহাত সামনে মেলে মেঝেয় হাঁটুগেড়ে মাথা নিচু করল। রাজা আস্তে আস্তে গিয়ে সিংহাসনে বসলেন। এবার সবাই উঠে দাঁড়াল।

ফ্রান্সিস রাজাকে দেখছিল। রাজার বয়েস হয়েছে। চোখে মুখে বয়েসের ছাপ পড়েছে। তবে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। এই বয়েসেও শরীর ঋজু। চলাফেরা বসায় বেশ স্বচ্ছন্দ।

রাজা একটুক্ষণ ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে রইল। ওদিকে যোদ্ধাদের দলনেতা তাদের ভাষায় কী বলে যেতে লাগল। দলনেতা থামল। রাজা মৃদু হাসলেন। ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বললেন–তোমরা–বিদেশী? ফ্রাসিস এটা ভাবেনি। ও ভহিন কা করে রাজাকে সব কথা বলবে। এখন রাজা স্পেনীয় ভাষা বলার ও একটু চমক!ল। খুশও ইল যে রাজা স্পেনীয় ভাষা জানেন। রাজা বললেন–আমাকে সম্মান। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি শাঙ্কো-একটু মাথা নইয়ে শ্রদ্ধা জানাও। তিনজনেই একটু মাথা নুইয়ে আবার সোজা করল। রাজা বললেন–গুনলাম কেন এসেছো? ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে স্পেনীয় ভাষায় সব ঘটনা বলল। রাজা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন–বারিনথাস—স্পেনীয় ভাষা শিখিয়েছে। বারিনথাস মন্দ–। তুলার রাজা-কালহুয়াকান–ছোটভাই। বারিনথাস–ভাইর মন বিষিয়ে–আমাকে দেশত্যাগী। এখানে নতুন রাজ্য স্থাপন–চোলুলা। আমি রাজা হুয়েমাক। যোদ্ধাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল–আমার প্রজা শ্রদ্ধা করে–ভালোবাসে। একটু থেমে রাজা বললেন–আজ তুলায়-যুদ্ধ হয়েছে–আমার যোদ্ধা–কালহুয়াকানের যোদ্ধা–ফলাফল এখনও জানি না। ফ্রান্সিস বলল, রাজা হুয়েমাক আমরা পালাবার সময় যুদ্ধক্ষেত্রের কাছ দিয়েই এসেছি। দেখেছি আপনার সৈন্যদলকে যুদ্ধ করতে। কিন্তু–

–কিন্তু? রাজা হুয়েমাক সপ্রশ্নদৃষ্টিতে তাকালেন?

–কিন্তু আপনার সৈন্যরা বোধহয় হেরে গেছে। ফ্রান্সিস বলল।

রাজা আস্তে আস্তে মাথা নিচু করলেন। তারপর আস্তে আস্তে মুখ তুললেন। তাঁর দুচোখ ছলছল করছে। ভারী গলায় বললেন–

–মারা গেছে? সবাই?

–না-না। ফ্রান্সিস বলে উঠল–অনেক যোদ্ধাকে আমরা আত্মরক্ষার জন্যে সরে যেতে দেখেছি।

–কিন্তু কেউ ফিরল না–এখনও। রাজা বিষণ্ণস্বরে বললেন।

এবার ফ্রান্সিস সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পারলো। যে যোদ্ধারা শুকনো বনের মধ্যে ছিল ওরা অপেক্ষা করছিল যারা যুদ্ধে গেছে তাদের জন্যে। হয়তো সেই যযাদ্ধারা আহত হয়ে ফিরে এলে এরা তাদের জায়গায় যেতো। কিন্তু ফ্রান্সিসরা দড়ির সেতু কেটে ফেলেছিল। তাই পরাজিত যযাদ্ধারা কেউ এই পথে ফিরতে পারেনি। সেইজন্যে বৃদ্ধ বৃদ্ধারা স্ত্রীলোকেরা এই যযাদ্ধাদের ঘিরে সাগ্রহে জানতে চাইছিল সেই যোদ্ধারা কেউ ফিরছে কি না। এই যোদ্ধারা বলেছিল কেউ ফেরে নি। তাই স্ত্রীলোকদের মধ্যে কান্নার রোল উঠেছিল। ফ্রান্সিস বলল–রাজা হয়েমাক–আপনাকে আমি বলেছি একটা পাহাড়ি নদী পেরিয়ে আমরা এসেছি।

–পুয়েবেলা নদী। রাজা বললেন।

–নদীটার ওপর দিয়ে কীভাবে এসেছি বলিনি। নদীটার ওপর একটা দড়ির সেতু ছিল। আমরা সেটা কেটে ফেলে–ঝুলতে ঝুলতে এপারে এসেছি। সেটা নেই তাই আপনার সৈন্যদল আসতে পারেনি।

রাজা বললেন–সেতু নেই–অনেক ঘুরে-আসবে। দেরী হবে। প্রজারা ভালোবাসে–তুলা থেকে নির্বাসিত–আমি–সঙ্গে এসেছে–আমার সন্তানতুল্য-কোয়েতজাল রক্ষা করবেন। রাজা মাথা নীচু করলেন।

ফ্রান্সিস একটু নিশ্চিন্ত হল। কথার ও ব্যবহারে বোঝা যাচ্ছে রাজা হুয়েমাক ময়টা ভাল। ওদের কোন ক্ষতি করবে না! এতক্ষণে ফ্রান্সিস পায়ের যন্ত্রণার তীব্রতা অনুভব করল। ও পায়ের দিকে তাকাল। দেখল চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। ফ্রান্সিস বাজার দিকে তাকিয়ে বলল–রাজা হুয়েমোক–আমি খুব অসুস্থ একটু বিশ্রাম করতে চাই। রাজা বললেন–কী অসুখ? হ্যারি বলে উঠল–পালাতে গিয়ে আমার বন্ধুর পায়ে বর্শা বিঁধেছে। হ্যারি নীচু হয়ে ফ্রান্সিসের পায়ের স্থান দেখাল। রাজা দ্রুত কী বলে উঠলেন দুজন যোদ্ধা বেরিয়ে গেল। রাজা বললেন–বদ্যি-চিকিৎসা বসো। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে মেঝেতেই বসে পড়ল। আহত পাটা অসাড় লাগছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। হ্যারিও ওর পাশে বসল।

একটু পরেই মোটা মত একটা লোক এল। লোকটা তখনও বেশ হাঁপাচ্ছে। বোধহয় রাজার ডাক পেয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে। ওর হাতে একটা পুটুলি। বোঝা গেল বদ্যি।

বদ্যিকে হ্যারি ফ্রান্সিসের পায়ের ক্ষতস্থানটা দেখাল। বদ্যি পুঁটুলিটা পাশে রেখে বসে পড়ল। ক্ষতস্থানটা ভালো করে দেখল। তখনও ক্ষতস্থান থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। এবার বদ্যি পুঁটুলি খুলল। দুটো চ্যাপ্টামত পাথর বের করল। সে দুটো মেঝেয় রেখে পুঁটুলি থেকে দুটো ছোট গোল শুকনো ফল বের করল। তারপর বের করল একটা কাঠের মুখটাকা পাত্র। ফল দুটো একটা চ্যাপ্টা পাথরে রেখে অন্য পাথরটা দিয়ে চেপে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলল। এবার কাঠের পাত্র থেকে একটা তেলের মত জিনিস গুড়োটায় ঢালল। মাখাল। তারপর ওটা নিয়ে আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের ক্ষতস্থানে চেপে চেপে লাগিয়ে দিতে লাগল। ওষুধটা লাগাতেই ফ্রান্সিস যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। সবটা ওষুধ লাগাতেই ফ্রান্সিসের জ্বালা যন্ত্রণা অনেক কমে গেল। একটা ঠাণ্ডা ভাব ক্ষতস্থানটায়। ফ্রান্সিস বদ্যির দিকে তাকিয়ে হাসল। বদ্যিও হাসল। তারপর সব জিনিসপত্র পুঁটুলিতে ভরল। উঠে দাঁড়িয়ে রাজাকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। তারপর চলে গেল। রাজা ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললেন–এই যোদ্ধারা-অনুগামী–ননোয়াক্লা–তোমাদের বিশ্রাম-ব্যবস্থা করবে। রাজা যযাদ্ধাদের দলনেতাকে কী বললেন। দলনেতা এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসকে আস্তে ধরে ধরে তুলল। ফ্রান্সিসের ডান হাতটা নিজের কাঁধে দিয়ে হ্যারি আর শাঙ্কোকে পেছনে পেছনে আসতে ইঙ্গিত করল। দলনেতা ফ্রান্সিসকে ধরে নিয়ে চলল।

ওরা রাজবাড়ির বাইরে এল। সিঁড়ি দিয়ে নামল। তারপর ডানদিকে চলল। এদিকেও একটা পাথরের সিঁডিওলা বাড়ি। ফ্রান্সিসরা ঠিক বুঝল না এটা কীসের। বাড়ি। হ্যারি দলনেতাকে ইঙ্গিতে বাড়িটা দেখিয়ে জানতে চাইল এটা কী। দলনেতা কী বলে গেল। তার মধ্যে কোয়েতজাল কথাটা ওরা বুঝল। তার মানে এখানেও জীবন ও মৃত্যুর দেবতা কোয়েতজালের মন্দির আছে।

বেশ কয়েকটা বড় পাথরের ঘর বাড়ি ছাড়িয়ে একটা বাড়ির সামনে এসে দলনেতা থামল। বাড়ির দরজাটা চ্যালা কাঠের। দলনেতা গিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল। ভেতরে ঢুকল। ফ্রান্সিসরাও ভেতরে ঢুকল! একজন সৈন্য একটা মশাল জ্বেলে ঘরের পাথুরে দেয়ালের খাঁজে রাখল। দেখা গেল ঘরটা মোটামুটি পরিচ্ছন্ন। একপাশে শুকনো ঘাসের বিছানা। তার ওপর মোটা সুতীর কাপড় বিছানো।

দলনেতা ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসদের জানাল এই ঘরেই ফ্রান্সিসরা থাকবে। ওদের খাবারদাবার এই ঘরে নিয়ে আসা হবে। এখানেই ওরা খাবে থাকবে। দলনেতা তার সৈন্যদের নিয়ে চলে গেল। শুধু একজন সৈন্যকে রেখে গেল ফ্রান্সিসদের দেখাশোনা করার জন্যে।

ফ্রান্সিস আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। কোমর থেকে তরোয়াল খুলে হ্যারিকে দিল। তারপর আস্তে আস্তে ঘাসের বিছানায় বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। হ্যারি ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোর তুলনায় বরাবরই দুর্বল। হ্যারিও খুব ক্লান্তিবোধ করছিল। ও বিছানায় পা ছড়িয়ে বসল। শাঙ্কোও বসল। ফ্রান্সিস ক্লান্তস্বরে বলল–হ্যারি-রাজা হুয়েমাকের সব কথা বুঝলে?

–হ্যাঁ–কিছু কিছু বোঝা গেল। আগে হুয়েমাক কালহুয়াকান উপাধি নিয়ে তুলার রাজা ছিলেন। বারিনথাস ওঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। ছোটভাইকে সেই ষড়যন্ত্রে সঙ্গী করে নেয়। তারপর ছোটভাই তলতেক সৈন্যদের রাজা হুয়েমাকের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। অবশ্যই তাকে সাহায্য করে বারিনথাস। রাজা হুয়েমাক তার অনুগত ননোয়াক্লা যোদ্ধাদের নিয়ে তুলা থেকে পালিয়ে আসেন এই চোলুলায়। নতুন বসতি গড়ে তোলেন অনুগত যোদ্ধা আর প্রজাদের নিয়ে। তুলায় রাজা হন তার ছোটভাই রাজ পরিবারের প্রচলিত পদবী কালহুয়াকান নামে পরিচিত হন। ফ্রান্সিস বলল–তুমি ঠিক বুঝতে পেরেছো কী ঘটেছিল। তবে এই সবকিছুর পেছনে কলকাঠি নেড়েছে বারিনথাস। তাই রাজা হুয়েমাক বলেছিলেন–বারিনথাস মন্দ যদিও এই বারিনথাসের কাছে উনি স্পেনীয় ভাষা শিখেছেন। শাঙ্কো বলল–তাহলে তো এই চোলুলায় অধিবাসীরাও তলতেক উপজাতির লোক।

–হ্যাঁ ঠিকই বলেছে। তবে এখানে রাজা হুয়েমাকের অনুগামী যোদ্ধাদের নাম ননোয়াক্লা। ফ্রান্সিস বলল।

একটু রাত হতেই দুজন লোক ফ্রান্সিসদের ঘরে এল। চীনেমাটির থালায় খাবার নিয়ে এল ওরা। একটা মাটির বড় হাঁড়িতে করে জল। খাবার হচ্ছে ভুট্টার রুটি, কীসের মাংস, ধান টিয়া টমেটো। তিনজনে আস্তে আস্তে খাওয়া শেষ করল। তিনজনেরই প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। জল খেতে গিয়ে মুস্কিল হল। জলের পরিমাণ কম। তিনজনে খাওয়ার পর আর সামান্য জল রইল। শাঙ্কো ইঙ্গিতে হাঁড়ি তুলে জল চাইল। লোক দুটি মাথা নাড়ল। বোঝা গেল আর জল দিতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল–ঠিক আছে এই জলেই আমরা চালিয়ে নেব। লোক দুটো এঁটো বাসনপত্র নিয়ে চলে গেল।

ঘরের কোনায় অনেক বড় বড় শুনো ঘাস জড়ো করা ছিল। সেসব এনে ছড়িয়ে পেতে বিছানাটা বড় করা হল। তার উপর কাপড় পেতে তিনজনে শুয়ে পড়ল। হ্যারি ডাকল-ফ্রান্সিস?

–হুঁ। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে পাশ ফিরল?

–এখন কেমন আছো? হ্যারি বলল?

–অনেকটা ভালো।

–খাওয়া দাওয়া তো মোটামুটি ভালোই কিন্তু খাবার জল এত কম দিচ্ছে কেন? হ্যারি বলল।

–হ্যারি–সেতু পেরিয়ে আসার সময় মনে আছে একটা বনের মধ্যে দিয়ে আমরা এসেছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ–একেবারে শুকনো পাতা ঝরা বন।

–তার মানে দীর্ঘকাল এই চোলুলায় বৃষ্টি হচ্ছে না। দেখনি পাথরের বাড়ি ঘরগুলোয় কেমন ধুলোটে আস্তরণ পড়ে গেছে। তাই এই অঞ্চলে জলকষ্ট দেখা দিয়েছে। হয়তো অনেক দূর থেকে জল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ধারে কাছের ঝর্ণাগুলো বোধহয় শুকিয়ে গেছে।

–ঠিক বলেছো। হ্যারি বলল।

অনেক রাত তখন। হঠাৎ ঘোড়র পায়ের শব্দে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও কান পেতে রইল। বেশ কয়েকটা ঘোড়ার পায়ের শব্দ এসে বাইরের প্রান্তরটায় থামল। লোকজনের হাঁক ডাক শোনা গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে বাইরে লোকজনের ছুটোছুটির শব্দ পাওয়া গেল। ফ্রান্সিস উঠে বসল। মশালের আলোয় দেখল হ্যারি আর শাঙ্কো নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠল। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে দরজার কাছে গেল। দরজার হুড়কো খুলল। দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল। দেখল চাঁদের নিস্তেজ আলোয় সামনের খোলা জায়গাটায় অনেক লোকজন জড় হয়েছে। অনেকের হাতে মশাল। অনেকে মশাল হাতে ছুটোছুটি করছে। আহত লোকজনের গোঙানি শোনা যাচ্ছে। তাহলে তুলার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যোদ্ধারা ফিরে এসেছে।

ঘুম ভেঙে হ্যারি আর শাঙ্কো এসে ফ্রান্সিসের পাশে দাঁড়াল। হ্যারি বলল–কী ব্যাপার?

–তুলাতে যুদ্ধ হচ্ছিল আমরা দেখে এসেছিলাম। এদিকে ফেরার পথের দড়ির সেতুটা আমরা কেটে দিয়েছিলাম। তাই ননোয়াক্লা যোদ্ধারা অনেক ঘুরে পুয়েবেলা নদী পেরিয়ে এসেছে। অনেকেই যুদ্ধে আহত। যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরার পথেও অনেকে মারা গেছে বোধহয়। ফ্রান্সিস বলল।

–আমার খুব চিন্তা হয়েছিল আবার কোন ঝামেলায় পড়লাম। হ্যারি বলল?

–চলো আমরা যতটা পারি ওদের সাহায্য করি। ফ্রান্সিস বলল।

ওরা তিনজনে লোকজনের ভীড়ের দিকে গেল। দেখল একজন স্ত্রীলোক একজন মৃত ননোয়াক্লা যোদ্ধার বুকের ওপর পড়ে পাগলের মত কাঁদছে। আরো কয়েকজন স্ত্রীলোক বুক চাপড়ে কাঁদছে। তাদের স্বামীপুত্র বা আত্মীয়স্বজন কেউ হয়তো ফিরে আসেনি।

কোয়েতজাল মন্দিরের সামনের পাথরের সিঁড়ির ওপর আহতদের শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজবদ্যি তার শিষ্য বদ্যিদের নিয়ে আহতদের চিকিৎসা করছে। ওর দম ফেলার ফুরসত নেই।

ফ্রান্সিসরা দেখে আশ্চর্য হল রাজা হুয়েমাক সঙ্গে কয়েকজন গণ্যমান্য সঙ্গী নিয়ে ঘুরে ঘুরে আহতদের দেখছেন। কাউকে উৎসাহিত করছেন কাউকে সমবেদনা জানাচ্ছেন। রাজার গায়ে রাজকীয় পোশাক নেই। রাতে যে সাধারণ পোশাক পরে ঘুমিয়েছিলেন তাই পরেই চলে এসেছেন। রাজার সঙ্গী একজন রাজার সঙ্গে চলতে চলতে কী বলে যাচ্ছিল। ঐ সঙ্গীটি বোধহয় সেনাপতি। রাজাকে হয়তো যুদ্ধের বিবরণ দিচ্ছিল। রাজা শুনছিলেন আর মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছিলেন।

ফ্রান্সিসরা আহতদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একজন আহত ননোয়াক্লা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কী বলল। ফ্রান্সিসরা বুঝল না। তখন যোদ্ধাটি ইঙ্গিতে ওকে তুলে বসিয়ে দিতে বলল। শাঙ্কো সেটা বুঝতে পেরে দ্রুত গিয়ে যোদ্ধাটিকে বসিয়ে দিল। লোকটি তখন হাতের ইঙ্গিতে জল খেতে চাইল। ফ্রান্সিস বলল-শাঙ্কো যাও আমাদের ঘর থেকে জলের হাঁড়িটা নিয়ে এসো। শাঙ্কো দ্রুত ছুটে গিয়ে জলের হাঁড়িটা নিয়ে এল। পিপাসার্ত আহত যোদ্ধাটি সাগ্রহে জল খেল। ওকে জল খেতে দেখে চার পাশের আহত যোদ্ধাদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল–মাজাপান–মাজাপান। ফ্রান্সিসরা কথাটার অর্থ বুঝল না। কিন্তু অন্য আহতদের তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে জলের হাঁড়িটার দিকে ইঙ্গিত করছে দেখে বুঝল–ওরা মাজাপান মানে পানীয় জল চাইছে। ফ্রান্সিস জলের হাঁড়ি নিয়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু কয়েকজনকে জল দিতেই হাঁড়ির জল শেষ হয়ে গেল। তখনও আহতদের মধ্যে গুঞ্জন চলছে–মাজাপান মাজাপান। ফ্রান্সিস অসহায় দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাচ্ছে তখনই দেখল রাজা হুয়েমাক ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফ্রান্সিস বলল, রাজা–আহতরা জল চাইছে। রাজা চিন্তাগ্রস্ত মুখে বললেন–জানি–নিরুপায়–বহুদিন–বৃষ্টি নেই-খরা ঝর্ণা সরোবর–শুকনো–অনেক দূরে-ঝর্ণা-জল-আনতে গেছে। ফ্রান্সিস বলল–রাজা এই সমস্যাটার কথা আহত ননোয়াক্লাদের বলুন। ওরা ভীষণ তৃষ্ণার্ত। রাজা আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বললেন–স্বাভাবিক ঘোড়ার পিঠে শুয়ে রাজপথ হেঁটে–আহতরা এসেছে। কথাটা শেষ করে রাজা নাহুয়াতল ভাষায় সেনাপতিকে কী বললেন। সেনাপতি চীৎকার করে কী বলতে লাগল। তার মধ্যে রাজা হুয়েমাক কথাটা ফ্রান্সিসরা বুঝল। সব চাকার কান্নাকাটি থেমে গেল। শুধু মৃদু গোঙানির শব্দ শোনা যেতে লাগল। রাজা হুয়েমাক সিঁড়িগুলোর মাথায় গিয়ে দাঁড়ালেন। দুহাত ওপরে তুলে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বেশ কিছুক্ষণ বক্তৃতার মত বললেন নাহুতল ভাষায়। রাজার কথা এতক্ষণ সবাই। চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনল। রাজার বক্তৃতা শেষ হলে আবার সবাই নিজের কাজ করতে লাগল। বোঝা গেল রাজা হুয়েমাক যুদ্ধ, জলের সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা এসব নিয়েই বলেছেন।

তখনই একজন ঘোড়সওয়ার সেখানে ঘোড়া ছুটিয়ে এল। তার পেছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা আর একটা ঘোড়া। সেটার পিঠে একটা বেশ বড় পীপে। বোঝাই গেল জলের পীপে। জনতার মধ্যে চাঞ্চল্য জাগল। মাটির আর চীনেমাটির বাটি নিয়ে অনেকে এ য়ে এল। পীপে থেকে জল বিতরণ শুরু হল। রাজা হুয়েমাক তখনও সঙ্গীদের নিয়ে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় বাকী রাতটুকু এখানেই থাকবেন। আহতদের মধ্যে জল বিতরণ শুরু হল। ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল রাত আর বেশি নেই। চলো–যতটুকু পারা যায় ঘুমিয়ে নি। তিনজনে নিজেদের ঘরে ফিরে এল। শুয়ে পড়বার আগে ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি–হুয়েমাক একজন আদর্শ রাজা।

–ঠিক বলেছো। যুদ্ধে হেরে গেছেন তবু নিজের কর্তব্যে অটল। হ্যারি বলল?

–তুলনায় কালহুয়াকান একটা নরপশু। ফ্রান্সিস বলল।

–অবশ্যই। হ্যারি বলল।

দুতিনদিন শুয়ে বসে কাটাল ওরা। ফ্রান্সিস সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। শাঙ্কোও বেশ অধৈর্য হয়ে উঠল। সেদিন বলল–চলো ফ্রান্সিস আমরা জাহাজে ফিরে যাই।

ফ্রান্সিস বলল তোমার ইচ্ছে হলে চলে যেতে পারো। আমরা যাবো না।

–কী করবে এখন? শাঙ্কো বলল।

–সুস্থ হয়ে আবার তুলায় যাবো। প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধনভাণ্ডার খুঁজে বের করবো।

–মাথা খারাপ? তুলায় গেলেই ওরা আমাদের বন্দী করবে। তারপর কোয়েতজাল মন্দিরে বলি দেবে। শাঙ্কো বলল।

–বুদ্ধি খাঁটিয়ে সব করতে হবে। গুপ্তধন উদ্ধার করবো আবার আমাদের কোন ক্ষতি হবে না ঐ ভাবেই কাজ সারতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

–আমার এরকম নিষ্কর্মার মত বসে থাকতে ভালো লাগছে না। আমি শিকার করতে যাবো। শাঙ্কো তীরধনুক গোছাতে গোছাতে বলল।

–বেশ যাও। কিন্তু সাবধান কালহুয়াকানের সৈন্যদের হাতে যেন ধরা পড়ো। ফ্রান্সিস বলল।

শাঙ্কো তীরধনুক নিয়ে বেরিয়ে গেল।

এভাবেই দিন কাটতে লাগল। শাঙ্কো কোনদিন সকালে কোনদিন বিকেলে বনে জঙ্গলে শিকার করতে বেরিয়ে যায়। রাজবৈদ্যর চিকিৎসায় ফ্রান্সিস এখন সুস্থ। বাঁ পায়ে আগের মতই জোর পাচ্ছে।

সেদিন সন্ধে থেকেই আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হল। রাত হতেই ঝড়ো হাওয়া শুরু হল। গভীর রাত। ফ্রান্সিসরা ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ শুরু হল বজ্রপাত। প্রচণ্ড জোর শব্দে বাজ পড়তে লাগল। তারপরই শুরু হল বৃষ্টি। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল।

বাইরে লোকজনের চীৎকার হৈ হল্লা আরম্ভ হল। হ্যারিও ঘুম ভেঙে উঠে বসল। হ্যারি বলল কী ব্যাপার বলো তো?

–বুঝলে না–এতদিন পরে বৃষ্টি এল। তাই ওরা আনন্দ করছে?

–চলো তো দেখি। হ্যারি বলল। দুজনে দরজা খুলে দাঁড়াল। দেখল অন্ধকারে স্ত্রী পুরুষ বাচ্চা কাচ্চা সবাই বৃষ্টিতে ভিজছে। নাচছে কয়েকজন ওরই মধ্যে নাকি গলায় গান গাইছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ওদের নাচতে দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন কী সব বাজনা নিয়ে এল। কচ্ছপের খোল দিয়ে তৈরী বাজনা। একটা হাড়ের কাঠি দিয়ে বাজনা বাজাচ্ছে। তালে তালে নাচছে সবাই। লোকগুলো যেন পাগল হয়ে উঠেছে। কতদিন পরে বৃষ্টি হল কে জানে।

রাজপ্রাসাদের পাথরের দরজার কাছে দুজন জ্বলন্ত মশাল হাতে এসে দাঁড়াল। তাদের পেছনে পেছনে রাজা হুয়োক এসে দাঁড়ালেন। রাজাকে দেখে নৃত্যরত নারীপুরুষের আনন্দ দ্বিগুণিত হল। রাজা হুয়েমাক দুহাত নেড়ে নেড়ে ওদের উৎসাহিত করতে লাগলেন।

বেশ কয়েকদিনের গুমোট গরমের পর বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা হাওয়া ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস বলল–দরজা খোলা থাক। ঘরটা ঠাণ্ডা হোক। দুজন দরজা থেকে চলে এল। শুয়ে পড়ল। বাইরে তখনও দাপাদাপি নাচানাচি চলছে। ফ্রান্সিস বলল–বুঝলে হ্যারি–এরাও তলতেক উপজাতি। নাহুয়াল ভাষায় কথা বলে।

–তা হবেই। এরা আর রাজা হুয়েমাকের অনুগত ননোয়াক্লা যোদ্ধারা তো তুলাতেই ছিল। রাজা হুয়েমাকের সঙ্গে ওরাও দেশত্যাগ করেছিল। কাজেই ভাষা তো এক হবেই।

দুজনে আর কোন কথা হল না বাইরে আনন্দ উল্লাস তখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। বৃষ্টিও থেমে গেছে। আকাশে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে শুধু।

পরদিন সকালে শাঙ্কো তীরধনুক নিয়ে শিকার করতে বেরিয়ে গেল। শাঙ্কো প্রতিদিনই বুনো মুরগী নীল কতিঙ্গা পাখি, লাল চামচ ঠোঁট পাখি শিকার করে আনে। পাখীর মাংস খাওয়া হয় আর চোলুলার লোকেরা ভীড় করে আসে কতিঙ্গা পাখির, লাল চামচঠোঁট পাখির পালক নিতে। এসব পাখির পালক খুব দামী আর তলতেকরা মাথায় গুঁজে গর্ব অনুভব করে।

সেদিন দুপুর হয়ে গেল শাঙ্কো শিকার থেকে ফিরল না। ফ্রান্সিস আর হ্যারি তখনও ভাবল শাঙ্কো এখুনি আসবে। কিন্তু দুপুর পেরিয়ে বিকেল হতে চলল শাঙ্কো তখনও ফিরল না। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দুজনেই চিন্তায় পড়ল। এত দেরী হবার কথা তো নয়।

সন্ধের সময় দুজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের ঘরে এল। কী বলতে লাগল। হ্যারি ওদের বলল-কোথায় যাবো? রাজা হুয়েমাকের কাছে? রাজা হুয়েমাক কথাটা শুনে যোদ্ধা দুজন মাথাটা বারবার ঝাঁকাতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল–চলো রাজার কাছেই যাওয়া যাক। এদের কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।

দুজন যোদ্ধার সঙ্গে ওরা দুজন রাজার পাথরের প্রাসাদে এল। ভেতরে ঢুকল। দেখল রাজা হুয়েমাক কাঠের সিংহাসনে বসে আছেন। রাজসভার গণমান্য ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ফ্রান্সিস ও হ্যারি মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানাল। রাজাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হল। রাজা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বললেন তোমাদের বন্ধু–পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে কালহুরাকানের সৈন্যরা ধরেছে–চারজন ননোয়াক্লা যোদ্ধাকেও-ধরে নিয়ে গেছে–তুলাতে।

ফ্রান্সিস হ্যারি দুজনেই ভীষণভাবে চমকে উঠল। শাঙ্কোকে ধরে নিয়ে গেছে? দুজনেই পরস্পরের মুখের দিকের তাকাল।

–কখন ধরে নিয়ে গেছে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।

–দুপুরে। রাজা বললেন। ফ্রান্সিস বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। ফ্রান্সিস রাজাকে বলল–কিন্তু পুয়েবেলা নদীর সেতু তো আমরা কেটে দিয়ে এসেছিলাম।

–কালহুয়াকান–সৈন্যরা–সেতু কাঠের করেছে-পাকাপোক্ত–আমরা জানতাম না। রাজা বললেন।

–তাহলে তো কালহুয়াকান যে কোন সময় আপনার রাজ্য আক্রমণ করতে পারে। হ্যারি বলল।

–পারে–আমরা তৈরীলড়াই হবে। রাজা বললেন।

ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি সে তো পরের কথা। এখন শাঙ্কোকে মুক্ত করার কথা ভাবো।

–তা তো বটেই। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছি না কী করবো? হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস মাথা নীচু করে দুতিনবার পায়চারী করল। হ্যারি জানে গভীরভাবে ফ্রান্সিস যখন কিছু ভাবে তখন পায়চারী করে। হঠাৎ ফ্রান্সিস রাজার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল।–একমাত্র উপায় আমাদের ধরা দেওয়া।

–মানে? রাজা সপ্রশ্নদৃষ্টিতে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।

–আমি আর আমার বন্ধু কালহুয়াকান সৈন্যদের হাতে ধরা দেব। ওরা আমাদের নিশ্চয়ই কয়েদখানায় নিয়ে যাবে। আমাদের বন্ধুকেও নিশ্চয়ই ওখানেই রেখেছে। পরে বুদ্ধি করে কয়েদখানা থেকে পালাবো। ফ্রান্সিস বলল।

–পারবে? রাজা বললেন।

–পারতেই হবে। এ ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। ফ্রান্সিস বলল–দেখ–পারো কিনা। রাজা বললেন।

ওরা দুজন মাথা একটু নীচু করে রাজাকে সম্মান জানিয়ে চলে এল।

রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর বিছানায় শুল দুজনে। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস ধরা দেওয়াটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

–এ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল?

–কালহুয়াকানের সৈন্যরা তো আমাদের মেরেও ফেলতে পারে।

–পারে কিন্তু যাতে মেরে না ফেলে তার জন্য বরাবর রাজা কালহুয়াকান ও বারিনথাসের কাছে আমাদের নিয়ে যেতে বলবে। তাহলেই ওরা আর মারবে না।

তাছাড়া কোয়েতজালের কাছে বলি দেবার জন্য ওদের তো মানুষ দরকার। বলি দেবার জন্যেই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে।

–হুঁ তা ঠিক। তাহলে কবে ধরা দেবে? হ্যারি বলল।

–কালকেই। দেরী করা চলবে না।

–যদি শাঙ্কোকে এর মধ্যেই মেরে ফেলে থাকে? হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ডান হাতটা বাড়িয়ে মশালের আগুনের কাছে রেখে বলল–তাহলে এই আগুন ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করছি–রাজা কালহুয়াকান আর বারিনথাস দুজনকেই আমি হত্যা করবো। তারপর আমার মৃত্যু হোক–কোন দুঃখ থাকবে না আমার।

হ্যারি আর কোন কথা বলল না। ফ্রান্সিস বিছানায় শুল। শুয়ে শুয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভাবতে লাগল। এক সময় ওর দুচোখ ঘুমে জড়িয়ে এল।

পরদিন সকালে জলখাবার খেয়েই ওরা দুজন তৈরী হতে লাগল। কোমরের কেভিতে তরোয়াল জল। রাজা হুয়েমাক ওদের দুজনকে দুটো সূর্তীর মোটা চাদর দিয়েছিল। সেদুটো গায়ে জড়াল। তারপর ওদের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। দুচারজন ননোয়াক্লা সৈন্য এগিয়ে এল। রাজার আদেশ-ওদের ফ্রান্সিসদের সঙ্গে যেতে হবে। ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে ওর সঙ্গে যেতে নিষেধ করল। তারপর প্রান্তর পেরিয়ে ওরা দুজন সেই শুকনো পাতাঝরা বনের দিকে চলল।

বনের মধ্যে দিয়ে চলেছে দুজনে। শুকনো গাছপালা ঝোঁপ ঝাড়ের মধ্যে দিয়ে চলল ওরা। দিন কয়েক আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। তবু গাছপালা সতেজ হয়নি। সেই শুকনো মরা মরা।।

শুকনো বন শেষ হল ওরা দুজনে সেতুর কাছে এল। সত্যিই সেতুটা বেশ পাকাপোক্ত করা হয়েছে। গাছের ডাল ফালা করে দড়ি দিয়ে বেঁধে বেশ শক্ত সেতু তৈরী করা হয়েছে। হ্যারি বলল–এর ওপর দিয়ে ঘোড়ার চড়ে যাওয়া যাবে?

–না–তবে ঘোড়া হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে আর কালদুয়াকান চোলুলা আক্রমণ করলে এভাবেই ঘোড়া পার করবে।

ওরা হেঁটে সেতু পার হল। এখন কালহুয়াকানের রাজত্ব শুরু হল। কিছুদূর এগোতেই দূর থেকে নজরে পড়ল কয়েকজন ঘোড়সওয়ার ধুলো উড়িয়ে আসছে। হ্যারি বলল–মনে হচ্ছে কালহুয়াকানের সৈন্যদল। ফ্রান্সিস বলল–তাই মনে হচ্ছে।

অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘোড়সওয়ার সৈন্যরা ওদের কাছে এসে পড়ল। ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে দেখেই ওরা ঘোড়ার গতি কমাল। কাছে এসে ওরা ঘোড়া থামাল। নাহুয়াল ভাষায় ওরা নিজেদের মধ্যে কী বলাবলি করল। ওদের মধ্যে থেকে দাড়ি গোঁফ ওলা একজন ঘোড়া থেকে নেমে এল। ফ্রান্সিসের সামনে এসে দাঁড়াল। বাকী সৈন্যরা বর্শা উচিয়ে তৈরী হল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল-হ্যারি–তরোয়াল ফেলে দাও। ফ্রান্সিস হ্যারি দুজনেই কোমরে গোঁজা তরোয়াল বের করে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর দুহাত তুলে দাঁড়াল। দলনেতার দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস দুটো কথা বার বার বলতে লাগল–রাজা কালহুয়াকান আর বারিনথাস। দলনেতা কী বুঝল কে জানে। ও হাত তুলল। সৈন্যরা বর্শা নামাল। দলনেতা হাত নামিয়ে চেঁচিয়ে কী বলল। একজন সৈন্য জিনের সঙ্গে বাঁধা দড়ি দলনেতার দিকে ছুঁড়ে দিল। দলনেতা দড়িটার একটা মাথা নিয়ে ফ্রান্সিস আর হ্যারির দুহাত বাঁধল। তারপর দড়ির অন্য মাথাটা হাতে নিল। তরোয়াল দুটো মাটি থেকে তুলে নিয়ে একজন ঘোড়সওয়ারের হাতে দিল। তারপর সে নিজের ঘোড়ায় উঠল। ঘোড়ার জিনের সঙ্গে দড়ির অন্য মুখটা বাঁধল।

তারপর দলনেতা ঘোড়া চালাল। অন্য সৈন্যরাও ঘোড়ায় চড়ে চলল। ওদের পেছনে পেছনে ফ্রান্সিস ও হ্যারি হাত বাঁধা অবস্থায় হাঁটতে লাগল।

দলনেতা কী বলে উঠল। একজন ঘোড়সওয়ার সৈনিক দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে তুলার দিকে চলে গেল।

ঘোড়া চালাতে চালাতে দলনেতা কী একটা বলে উঠল। অন্য সৈন্যরা হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে দলনেতা ঘোড়ার গতি বাড়াল। হাত বাঁধা দড়িতে টান পড়ল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দৌড়াতে লাগল। দলনেতা ঘোড়ার গতি আরো বাড়াল। অন্য সৈন্যরাও সেই সঙ্গে ঘোড়ার গতি বাড়াল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঘোড়ার অত দ্রুত গতির সঙ্গে তাল রাখতে পারল না। মাটিতে পড়ে গেল। দলনেতা ওদের দুজনকে হাতে দড়িবাঁধা অবস্থায় মাটির ওপর দিয়ে হিঁচড়ে নিয়ে চলল। ধুলো মাটি আর পাথুরে জায়গা দিয়ে ফ্রান্সিস আর হ্যারির শরীর হিচড়োতেহিচড়োতে চলল। সৈন্যরা হো হো হাসতে লাগল।

একটা ছুঁচালো পাথরে ফ্রান্সিসের ঘা খাওয়া বা পাটা লাগল। ওখানকার ক্ষতটা শুকিয়ে গিয়েছিল। এখন ছুঁচালো পাথরের ধাক্কায় জায়গাটা কেটে গেল। রক্ত বেরিয়ে এল। যন্ত্রণায় ফ্রান্সিসের প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। দাঁত চেপে ও যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল। হ্যারি এমনিতেই শরীরের দিক থেকে বরাবর দুর্বল। ও যেন এই হিচড়ানি আর সহ্য করতে পারছিল না। ওদের দুজনেরই কনুই হাঁটু ভীষণ ভাবে ছড়ে গেছে। পোশাক ছিঁড়ে গেছে। সমস্ত শরীর ধুলোয় ভর্তি হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস ওর মধ্যেই মাথা উঁচু করে দেখল বিষাক্ত উপত্যকার কাছে চলে এসেছে ওরা। সেই পাথরের ওপর ফণীমনসার গাছ। তারপরেই তো কোয়েতজালের মন্দির। ফ্রান্সিস চীৎকার করে বলে উঠল-হ্যারি-এসে গেছি। আর একটু সহ্য কর।

এবার দলনেতা ঘোড়ার গতি অনেক কমিয়ে দিল। অন্য সৈন্যরাও গতি কমাল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল। ধুলোয় লাল শতছিন্ন পোশাক, ছড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে ওরা হাঁটতে লাগল। দেখল বারিনথাস ওর পাথরের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় আগেই ওকে ঘোড়সওয়ার দিয়ে খবর পাঠানো হয়েছে। বারিনথাস কী একটা বলে উঠতে ঘোড়সওয়ার সৈন্যরা দাঁড়িয়ে পড়ল। বারিনথাস ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে গেল। হেসে বলল-পুরোনো বন্ধুরা যে। বলেছিলাম কিনা–পালিয়ে বাঁচবে না। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দুজনেই ভীষণ হাঁপাচ্ছিল। ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না। হ্যারি বলল–বারিনথাস, আমরা ধরা পড়িনি। ইচ্ছে করে ধরা দিয়েছি। তাই নাকি? খুব ভালো হল। কয়েদ ঘরে জনা চারেক ননোয়াক্লা সৈন্য রয়েছে। তোমাদের এক বন্ধুও রয়েছে। এবার কোয়েতজাল দেবতার পুজো খুব ধুমধাম করে হবে। অনেক বলি হবে। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দুজনেই এত কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যেও হাসল। যাক–শাঙ্কো বেঁচে আছে।

বারিনথাস চীৎকার করে কী বলে উঠল। দলপতি আবার ওদের টেনে নিয়ে চলল। ফ্রান্সিস হাঁটতে হাঁটতে বলল-বারিনথাস–রাজা কালহুয়াকান আর তলতেক যোদ্ধাদের বলে দাও–আজ থেকে ওরা আমাদের শত্রু হল। পশুর মত যেভাবে আমাদের মাটিতে পাথরে হিঁচড়ে এনেছে–এই অমানুষিক অত্যাচার আমরা কোনদিন ভূলবো না। এই সব অত্যাচারের প্রতিশোধ আমরা নেব। বারিনথাস হেসে বলল–প্রতিশোধের কথা ভাবতে ভাবতেই তোমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে। রাজা কালহুয়াকানের কয়েদঘর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ পালাতে পারেনি।

–দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।

তুলতেক সৈন্যরা ওদের দুজনকে টেনে নিয়ে চলল কয়েদঘরের দিকে। একসময় কয়েদ ঘরের সামনে পৌঁছল ওরা। কোয়েতজাল মন্দিরের কাছেই কয়েদঘর।

দরজার দুপাশে দুজন পাহারাদার সৈন্য দাঁড়িয়েছিল। ফ্রান্সিসদের সৈন্যরা বন্দী করে নিয়ে আসছে দেখে একজন পাহারাদার কাঠের দরজার হুড়কোমতো লম্বা কাঠটা খুলে নিল। দরজা খুলে গেল। সৈন্যরা ধাক্কা দিয়ে ফ্রান্সিসদের ঘুরে ঢুকিয়ে দিল। তারপর দুজনেরই হাত পা দড়ি দিয়ে বেঁধে দিল। সৈন্যরা চলে গেল। বারিনথাস বলল–পালাবার চেষ্টা করো না। করলে–আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল ঐ দশা হবে।

ফ্রান্সিস আলো থেকে অন্ধকার ঘরটায় ঢুকে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। এইবার অন্ধকার ভাবটা চোখে সয়ে এল। দেখল দুজন লোককে কড়িকাঠে দুপা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সিস ও হ্যারি দেখল দুটো কাঠের খুঁটিতে হাত পা বাঁধা অবস্থায় শাঙ্কো নিজীবের মত পড়ে আছে। পাহারাদার দুজন এবার ফ্রান্সিস ও হ্যারির হাত পা দড়ি দিয়ে দুটো কাঠের খুঁটির সঙ্গে বাঁধল। ফ্রান্সিস বা হ্যারি কারোরই তখন এতটুকু শক্তি নেই যে পাহারাদারদের বাধা দেবে।

বারিনথাস বলল–তোমাদের বন্ধুকে তো পেলে। সন্ধের দিকে খবর নিতে আসবো। বারিনথাস যাবার সময় পাহারাদার দুজনকে নাহুয়াতল ভাষায় কী বলে গেল। পাহারাদার দুজন ঘরের বাইরে গেল। তারপর কাঠের হুড়কো টেনে দরজা বন্ধ করে দিল।

গারদ ঘরের দরজা খোলা হলনতুন বন্দীদের আনা হল, বাঁধা হল অথচ শাঙ্কো মাথা নিচু করেই রইল। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল না।

ফ্রান্সিস ক্লান্তস্বরে ডাকল–শাঙ্কো। ডাক শুনে শাঙ্কো চমকে উঠল। এ তো ফ্রান্সিসের গলা। ও মাথা তুলে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। প্রায় অন্ধকারেও ফ্রান্সিসদের চিনল। ও দুর্বল কণ্ঠে বলল–ফ্রান্সিস হ্যারি তোমাদের বন্দী করেছে এরা?

–না। আমরা নিজেরাই ধরা দিয়েছি। হ্যারি আস্তে আস্তে বলল। শাঙ্কো এবার দেখল–ফ্রান্সিস আর হারির পোশাক ছেঁড়া ফোঁড়া। মুখে মাথায় সারা গায়ে পাহাড়ী লাল ধুলো মার্টি। ও অবাক হয়ে গেল। শাঙ্কো বলল-তোমাদের এ অবস্থা হল কী করে?

–পরে বলবো সব। এখন ভীষণ ক্লান্ত। ফ্রান্সিস দুর্বলস্বরে বলল। হ্যারি বলল–শাঙ্কো–এই দুজন ননোয়াক্কা যোদ্ধাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কেন?

–ওরা রাজা কালহয়াকানকে অপমান করেছিল। শাঙ্কো বলল।

হ্যারি খুঁটির সঙ্গে হাত পা বাঁধা অবস্থাতেই শুয়ে পড়ল। ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ও। ফ্রান্সিস একবার হ্যারির দিকে তাকাল। কিছু বলল না। এবার ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। সার সার কয়েকটা খুঁটি পোঁতা মেঝেয়। কোণার দিকে দুজন খুঁটির সঙ্গে ওদের মতোই হাত পা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। মাথার ওপর লম্বা লম্বা ঘাস পাতার ছাউনি। তার নীচে গাছের মোটা মোটা ডালের কড়ি বরগা। সেই কড়ি বরগা থেকে দুজনকে মাথা নিচু অবস্থায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঈশ্বর জানেন ওরা বেঁচে আছে কিনা। চারপাশের দেয়াল পাথরের।

হ্যারির দুর্বল কণ্ঠস্বর শুনল-ফ্রান্সিস, আমরা বোধহয় বাঁচবো না। পালাবার উপায় নেই।

–হ্যারি, ফ্রান্সিস বলল–এখনি ভেঙে পড়ো না। এখনও চারদিন সময় আছে হাতে। মৃত্যুর ভাবনা না ভেবে পালানোর উপায় ভাবো।

শাঙ্কো বলল–এখান থেকে কি পালানো সম্ভব?

–দুএকদিন যেতে দাও। ওদের পাহারা দেবার পদ্ধতিটা দেখি। তখন ভেবে দেখবো। ফ্রান্সিস বলল।

পায়ের ক্ষতস্থানে অসম্ভব ব্যথা। ব্যথা বেড়েই চলছে যেন। ফ্রান্সিস পায়ের ক্ষতস্থানের দিকে তাকাল। দেখল তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে।

তখন দুপুর। হুড়কো টেনে দরজা খুলে একজন পাহারাদার ঢুকল। বড় একটা মাটির পাত্রে যবসেদ্ধ। কয়েকটা ছোট ছোট মাটির পাত্র প্রত্যেক বন্দীর সামনে রাখল। যবসেদ্ধ দিল। সেদ্ধ মাছ দিল আর বুনো আলুর ঝোল। তারপর প্রত্যেকের হাতের বাঁধন খুলে দিল। ফ্রান্সিস বলল–কিছু ফেল না। পেট পুরে খাও। খেতে ভালো না লাগলেও খাও।

পাহারাদার সৈন্যটি ঝুলন্ত বন্দী দুজনকে খাইয়ে দিল। ঘরের এক কোণায় রাখা বিরাট জালার মতো পাত্র থেকে জল এনে সবাইকে খাওয়াল। তারপর একবার দরজার দিকে তাকিয়ে নিয়ে দেখল অন্য পাহারাদারটি উঠোনে আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। এই সুযোগে ও ওর মাথার মোটা ফেট্টিটা খুলে ফেলল। নিচু হয়ে ফ্রান্সিসের পায়ের ক্ষতস্থানে শক্ত করে বেঁধে দিল। তারপর সবার হাত আগের মতো বেঁধে দিয়ে এঁটো বাসনপত্তর নিয়ে দ্রুত চলে গেল। অন্য পাহারাদারটি এসে হুড়কে। টেনে দরজা বন্ধ করে দিল।

ক্ষতস্থানে কাপড় বাঁধা পড়ায় ফ্রান্সিস একটু আরাম পেল। ব্যথাটাও অনেকটা কমল। ফ্রান্সিস হেসে মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি, দেখ বারিনবাসও মানুষ–এই পাহারাদারটাও মানুষ! অথচ দুজনের কত পার্থক্য।

সন্ধে হলো। দরজা খুলে সেই পাহারাদারটা ঢুকল। মাথায় ফেট্টি বাঁধা নেই। একটা মশাল নিয়ে এসেছিল সেটা দরজার ওপরে পাথরের খাঁজে বসিয়ে রেখে গেল।

মশালটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফ্রান্সিস হঠাৎ চমকে উঠে বসল। ওর চোখ মুখ উজুল হয়ে উঠল। চাপাস্বরে বলল–হ্যারি, তুমি মৃত্যুর কথা বলছিলো,–আমি তোমাকে জীবনের কথা বলছি।

–তার মানে? হরি অবাক চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।

–আজ রাত্রেই আমরা মুক্তি পাবো। ফ্রান্সিস বলল?

–কী করে?

–দেখতেই পাবে। এখন শুধু বারিনথাসের আসার অপেক্ষা?

–বারিনথাস মুক্তি দেবে আমাদের?

–না, মুক্তির উপায় করে দেবে।

হ্যারি চিন্তিত হলো। ফ্রান্সিসের জ্বর আসেনি তো? প্রলাপ বকছে যেন। ও বলল–ফ্রান্সিস, তোমার শরীর ভালো আছে তো?

–আমার কথা প্রলাপের মতো শোনাচ্ছে তাই না?

–হ্যাঁ।

ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। হ্যারি আর কোনো কথা বলল না।

একটু রাতে বারিনথাস এল। ফ্রান্সিস হেসে বলল–এসো, মুক্তিদূত এসো।

–কাছে এসো, তোমার কানে কানে বলবো, গুপ্তধন উদ্ধারের হদিস।

–ঠিক। বারিনথাস লাফিয়ে উঠল। প্রায় ছুটে এল ফ্রান্সিসের কাছে। ফ্রান্সিসের মুখের কাছে কান নিয়ে এল। মুহূর্তে এক অদ্ভুত কাণ্ড করল ফ্রান্সিস। বারিনথাসের মুখে থুতু ছিটিয়ে দিল। বারিনথাস এক ঝটকায় সরে গেল। রাগে উত্তেজনায় ও থরথর করে কাঁপতে লাগল। চিৎকার করে পাহারাদারদের ডাকল। পাহারাদার দুজন এক লাফে ঘরে ঢুকল। বারিনথাস চিৎকার করে কী হুকুম দিল। পাহারাদার দুজন ছুটে এল ফ্রান্সিসের কাছে। তারপর ফ্রান্সিসকে টেনে দাঁড় করাল। হাতের বাঁধন খুলে দিল। একজন লাফিয়ে কড়িকাঠে উঠল। তারপর দুজনে মিলে ফ্রান্সিসকে কড়িকাঠ থেকে মাথা নিচু করে ঝুলিয়ে দিল। দুহাত বেঁধে দিল। ফ্রান্সিস এইবার হো হো করে হেসে উঠল। বারিনথাস চিৎকার করে বলল–এইবার তোর মরণ। মর তুই–।

ফ্রান্সিস এবার হাসি থামিয়ে বলল–বারিনথাস, আমার তো মৃত্যু ছাড়া গতি নেই। তোমাকে একটা শেষ অনুরোধ করবো। রাখবে?

–এই তো, এবার বুঝেছো তো আমাকে অপমানের ফল কী?

–বুঝলাম বৈ কি। তা শেয অনুরোধ আমার। আমাদের দুটো তরোয়াল আর ধনুকবাণ ছোরা এই ঘরে রেখে যাও।

–কেন?

–মরেই তো যাবো, মরবার আগে অস্ত্রগুলো দেখতে দেখতে মরতে চাই। আমাদের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে ঐ অস্ত্রগুলোর সঙ্গে।

–ভালো–ভালো। বারিনথাসের হুকুমে পাহারাদাররা ফ্রান্সিসদের তরোয়াল, শাঙ্কোর ধাকবাণ ছোরা ঐ ঘরের মেঝেয় রেখে গেল।

–আর একটা কথা। ফ্রান্সিস বলল–আগুনকে নাইয়া ভাষায় কী বলে?

–ওমেতে?

–শেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি তোমাকে। ফ্রান্সিস হাসল।

বারিনথাস চলে গেল। হুড়কো টেনে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো।

হ্যারি এতক্ষণ অবাক হয়ে এইসব অদ্ভুত ঘটনা দেখছিল। একটা কথাও বলতে পারেনি। এইবার ভাবল যে বর্শাটা ফ্রান্সসের পায়ে বিঁধেছিল তাতে কি বিষ মাখানো ছিল? সেই বিষে কি ফ্রান্সিসের মাথায় গোলমাল হলো? গভীর দুঃখে হ্যারির বুক ভেঙে যেতে লাগল। বাল্যবন্ধু ফান্সিস–শেষে তার এইভাবে মৃত্যু হবে? ও ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল করার। তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। হারিকে কাঁদতে দেখে শাঙ্কোর চোখেও জল এল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি, কেঁদো না। পায়ের ক্ষত ছাড়া আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু হ্যারি তবু চাপা শব্দে কাঁদতে লাগলো। পাহারাদার ওদের রাতের খাবার দিয়ে গেল। খাওয়া হলে পাহারাদার চলে গেল।

রাত বাড়ল। হঠাৎ ফ্রান্সিস নিজের শরীরটাকে দোলাতে লাগল। দোলা বাড়তে লাগল। একবার একটা জোরে দুলুনি দিয়ে মশালের কাছে কাঠের কড়ি কাঠ দুহাতে ধরে ফেলল। ঐ অবস্থায় ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে দড়ি দিয়ে বাঁধা হাত দুটো মশালের আগুনের কাছে নিয়ে আসতে লাগল। খুশিতে হ্যারি চাপাস্বরে বলে উঠল–ফ্রান্সিস।

ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–চুপ।

ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে হাতবাঁধা দড়িটা মশালের আগুনের ওপর রাখল। দড়িটা পুড়ে যেতে লাগল। ফ্রান্সিসের হাত দুটোতে আগুনের ছ্যাকা লাগছে। কালো হয়ে যাচ্ছে হাতের ঐ জায়গাটা। দড়িটা আগুনে কিছু পুড়তেই ফ্রান্সিস এক হ্যাঁচকা টানে দড়ি খুলে ফেলল। আবার ঝুলতে লাগল।

একটু দম নিয়ে শরীরটা বেঁকিয়ে ওপরের দিকে হাত বাড়িয়ে ঝোলানো দড়িটা ধরল। তারপর আস্তে আস্তে দুহাত তুলে ওপরের কড়িকাঠটা ধরে ফেলল। শরীরের একটা ঝাঁকুনি দিয়ে কড়িকাঠটায় উঠে বসে পড়ল। দুহাত নামিয়ে পায়ের বাঁধন খুলে ফেলল। কড়িকাঠ থেকে ঝুলে মেঝেয় নামল। আস্তে যাতে কোনো শব্দ না হয়। মেঝে থেকে নিজের তরোয়ালটা তুলে নিল। তারপর একে একে সকলের হাত পায়ে দড়ির বাঁধন কেটে দিল। ননোয়াক্কা যোদ্ধারা মুক্তি পেয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে হাসল। হ্যারি তরোয়াল তুলে নিল। শাঙ্কো তীর-ধনুক আর ছোরাটা নিল?

এইবার ফ্রান্সিস ঘরের চারদিকে তাকাল। দেখল এক কোণায় শুকনো ঘাসের বিছানামতো। ও একটানে মশাল খুলে নিল। ছুঁড়ে ফেলল ঘাসের বিছানাটার ওপর। দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–সবাই ওমেতে বলে চেঁচিয়ে ওঠো। তিনজন মিলে চিৎকার করে উঠল–ওমেতে ওমেতে। চিৎকার চলল। ননোয়াক্লা যোদ্ধারাও গলা মেলাল।

দরজা খুলে দুজন পাহারাদার ঢুকল। আগুন দেখে ওরা হতবুদ্ধি। যোদ্ধারা পাহারাদার দুজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিল ঘুষি মেরে দুজনকেই মেঝেয় ফেলে দিল। কিল ঘুষি খেয়ে দুজন পাহারাদারই অজ্ঞান হয়ে গেল। ফ্রান্সিস উপকারী পাহারাদারটিকে আঘাত করতে চায়নি। কিন্তু এখন যা হবার তা হয়ে গেছে। যোদ্ধারা এক ছুটে পালিয়ে গেল।

ওদিকে আগুন কয়েদঘরের ঘাসের ছাউনিতে লেগে গেল। কালো ধোঁয়া উঠতে লাগল। ধোঁয়া আগুন দেখে তলতেকদের বাড়িতে বাড়িতে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। তলতেকরা ছুটে আসতে লাগল। আগুনের আভায় আকাশ লাল হয়ে গেল। সৈন্যরাও জলের জন্যে ততক্ষণে ছুটোছুটি শুরু করেছে।

এই সুযোগে ফ্রান্সিসরা বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রাজবাড়ির দিকে ছুটল। পেছনে হ্যারি ও শাঙ্কো। কিছুটা এগিয়ে ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াল। শাঙ্কোকে বলল–শাঙ্কো, তুমি বারিনথাসের বাড়ি চেন তো?

–হ্যাঁ সেদিন ও দেখিয়েছিল।

–যে করেই হোক বারিনথাসকে ধরে রাজবাড়িতে নিয়ে এসো। একেবারে রাজার শোবার ঘরে। আমরা ওখানে থাকবো।

শাঙ্কো তোকজনের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে চলে গেল।

দুজনে রাজবাড়িতে ঢুকল। দেখল পাহারাদার সৈন্যরা কেউ নেই। সবাই আগুন নেভাতে ব্যস্ত। শুধু একজন সৈন্য রাজার শোবার ঘরের দরজায় পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিস সোজা সৈন্যটার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পায়ে ক্ষত। হাত দুটোও অক্ষত। নেই। তবু ফ্রান্সিস দমল না। ফ্রান্সিস বর্শাটা আমূল বিধিয়ে দিল সৈন্যটার বুকে।

রাজার শোবার ঘরে ঢুকে দেখল রাজা ঘাস-বিছানো গদির মতো বিছানায় বসে আছেন। বাইরের চিৎকার চাচামেচিতে বোধহয় ঘুম ভেঙে গেছে। ফ্রান্সিস একছুটে গিয়ে রাজার বুকের ওপর তরোয়াল চেপে ধরল। রাজা কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। ফ্যাল ফ্যাল করে ফ্রান্সিস ও হ্যারির দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফ্রান্সিস বুঝল রাজাকে কোনো কথা বলে লাভ নেই। কিছুই বুঝবেন না উনি। বারিনথাসের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

ওদিকে শাঙ্কো খুঁজে খুঁজে বারিনথাসের বাড়ি পেল। দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ল। দেখল এত গোলমাল হৈ-চৈয়ের মধ্যেও বারিনথাস ঘাসের বিছানায় গুঁড়িশুড়ি মেরে ঘুমিয়ে আছে। শাঙ্কো ওকে ধরে জোরে ধাক্কা দিল। বারিনথাস লাফিয়ে উঠে বসল। চেঁচিয়ে বলে উঠল-কে? কে?

শাঙ্কো কোমর থেকে ছোরাটা খুলে ওর পিঠে ঠেকাল। ছোরাটায় চাপ দিয়ে বলল–রাজবাড়িতে চলো।

–কেন?

–দরকার আছে। যদি যেতে যেতে কোনো চালাকি করো ছোরাটা আমূল ঢুকিয়ে দেব।

–না-না–চলো যাচ্ছি।

বারিনথাস বিছানা থেকে নেমে বাড়ির বাইরে এল। শাঙ্কো ওর পিঠে ছোরা ঠেকিয়ে ওকে প্রায় ঠেলে নিয়ে চলল। লোকজনের ছুটোছুটি চ্যাঁচামেচি তখনও চলছে। তবে গারদঘরে আগুন অনেক স্তিমিত হয়ে এসেছে।

বারিনথাস আর শাঙ্কো রাজার শয়নঘরে ঢুকল। দেখল ফ্রান্সিস রাজার বুকে তরোয়াল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে হ্যারি। বারিনথাস তো এই দৃশ্য দেখে অবাক। ফ্রান্সিস হেসে বলল–বারিনথাস এসো। খুব আশ্চর্য হয়েছে তাই না?

–না–মানে-তোমরা কী করে

–সেসব পরে হবে। তুমি রাজাকে বলো আমার হুকুমে এখন তাকে চলতে হবে। নইলে তরোয়াল বুকে বিঁধিয়ে দেব।

বারিনথাস নাহুয়াতল ভাষায় রাজাকে সে কথা বলল। রাজা দুবার জোরে মাথা নাড়লেন। বারিনথাস বলল-রাজা বিপদ বুঝতে পেরেছেন এবং তোমার হুকুম শুনতে রাজী হয়েছেন।

ফ্রান্সিস বলল–এবার তুমি বাইরে যাও। রাজবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব সৈন্য পাহারাদারদের বলো-রাজা কালহুয়াকানের হুকুম, তোমরা সবাই অস্ত্রত্যাগ কর। তারপর বাইরের প্রাচীরের ওপাশে চলে যাও। রাজার আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত কেউ ভেতরে ঢুকবে না। শাঙ্কোকে বলল-বারিনথাসকে নিয়ে বাইরে যাও। পিঠের ওপর ছোরা ঠেকিয়ে রাখবে। যদি বোঝ অন্যরকম কিছু বলছে সঙ্গে সঙ্গে ওকে হত্যা করবে।

শাঙ্কো বারিনথাসকে ঠেলতে ঠেলতে বাইরের বারান্দায় নিয়ে এল। তখন আগুন নিভে গেছে। হৈচৈ থেমে গেছে। সৈন্য পাহারাদার নিজের নিজের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে।

বারিনথাস চিৎকার করে নাহুয়াতল ভাষায় ওদের লক্ষ্য করে কী বলতে লাগল। শাঙ্কো তীক্ষ্ণচোখে সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে রইল। ওরা কী করে লক্ষ্য রাখল। দেখল সৈন্যরা হাতের বর্শা মাটিতে রেখে দিতে লাগল। মাথা নুইয়ে চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। বোধহয় রাজার আদেশকে সম্মান জানাল। তারপর প্রাচীরের ওপাশে চলে যেতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব সৈন্য পাহারাদার চলে গেল।

বারিনথাসকে নিয়ে শাঙ্কো রাজার শয়নকক্ষে ফিরে এল। সব কথা ফ্রান্সিসকে, বলল। ফ্রান্সিস বলল–বারিনথাস, আমি রাজার সঙ্গে কথা বলবো তুমি দোভাষীর কাজ কর।

–বেশ।

রাজা ও ফ্রান্সিসের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো।

ফ্রান্সিস-রাজা কালহুয়াকান, আপনার বংশের প্রথম রাজা যে ধনসম্পত্তি এখানে কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন তার ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। কিন্তু আমি বুদ্ধির খেলা পছন্দ করি। সেই ধনসম্পদ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল যাজক ব্রেন্ডনের পরামর্শমতো। আমি সেই ধনসম্পদ উদ্ধার করবার চেষ্টা করবো। এই জন্যে আপনার সাহায্য চাই। আপনি সাহায্য করবেন কী?

রাজা–নিশ্চয়ই করবো। কিন্তু যা কেউ পারেনি। আপনিও পারবেন না।

ফ্রান্সিস–চেস্তা করতে দোষ কি। কাল থেকে আপনাকে ও বারিনথাসকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গুপ্তধনের অনুসন্ধান শুরু করবো। আপনি রাজী?

রাজা–হ্যাঁ।

ফ্রান্সিস–তাহলে আজকে বাকী রাতটুকু আমরা বিশ্রাম করবো। ঘুমুবো। কাল থেকে কাজে নামবো।

রাজা-বেশ।

ফ্রান্সিস–আমি আহত। আমার চিকিৎসার জন্যে একজন বদ্যি ডেকে দিন। ক টা দিন আমাকে সুস্থ থাকতে হবে।

রাজা–বেশ ব্যবস্থা করছি।

বারিনথাসই একজন রাজভৃত্যকে ডেকে নিয়ে এল। রাজা তাকে কী বললেন। রাজভৃত্য একটু পরেই একজন খুব রোগা লম্বামতো লোককে ধরে নিয়ে এলো। লোকটার মুখে দাড়ি গোঁফ। গলায় নানারঙের পাথরের মালা। গায়ে তুলোর কম্বলের মতো। বিচিত্র বর্ণের নক্সা আঁকা তাইতে। বোঝা গেল বদ্যি। হাতে কয়েকটা চো। ফ্রান্সিসের হাত পা দেখল। মাথা নাড়ল। তারপর পায়ের ক্ষতস্থানে কাপড়ের ফেট্টি খুলে কয়েকটা পাতা চেপে বেঁধে দিল। ফ্রান্সিস একটু আরাম পেল। হাতের কব্জিতে আঠামতো মলম লাগাল। তারপর চলে গেল।

ফ্রান্সিস ও হ্যারি রাজার শোবার ঘরের পাশে শুকনো ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। এতক্ষণে ফ্রান্সিসের শরীরটা দুর্বল লাগল। ভীষণ ক্লান্তিতে ও ঘুমিয়ে পড়ল। শাঙ্কো তীর-ধনুক হাতে রাজাকে আর বারিনথাসকে পাহারা দিতে লাগল।

পরদিন দুপুর নাগাদ ফ্রান্সিসের শরীরে ব্যথা শুরু হলো। ফ্রান্সিস বুঝল ওর জ্বর হয়েছে। কিন্তু আসল কাজ এখনো বাকী। এখন শরীরের কথা ভাববার সময় নেই।

রাজা ও বারিনথাসকে সামনে রেখে ওরা কোয়েতজাল দেবতার মন্দিরে ঢুকল। পাথরে গড়া মন্দির। ভেতরটা একটু অন্ধকার অন্ধকার।

কোয়েতজাল দেবতার মূর্তির সামনে এসে ওরা দাঁড়াল। মুর্তিটার উচ্চতা এক মানুষ সমান। কাঠ কুঁদে কুঁদে বিচিত্র কাজ মূর্তির গায়ে। হাত দুটো পেছনে। ফ্রান্সিস বারিনথাসকে বলল–তোমার ব্রেন্ডনের বইয়ের শেষে যে ছড়াটা লেখা সেটা মনে আছে?

–সমস্ত বইটাই আমার মুখস্থ।

মুর্তিটার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ফ্রান্সিস বলল–ছড়াটা বলো তো।

বারিনথাস বলতে লাগল–

অদ্ভুত–অদ্ভুত
ব্রেন্ডনের ছড়া।
পা আছে হাত নেই।
মাথা ঠিক খাড়া।
এক হাত পিঠে বাঁধ
টলমল টলমল
অতল তল অতল তল?

–থামো। ফ্রান্সিস বলে উঠল। তারপর আস্তে আস্তে গিয়ে মূর্তিটার পেছনে দাঁড়াল। দেখল মূর্তিটার কাঁধের কাছ থেকে একটা পাড়অলা কালো কাপড় ঝুলছে। তবে কাপড়টা একেবারে জীর্ণ। এখানে ওখানে ছোপ লাগা। ফেঁসে গেছে।

ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে পেছন দিয়ে পাথরের বেদিটায় উঠল। মূর্তির কাপড়টা হাত বাড়িয়ে খুলতে যাবে–রাজা চেঁচিয়ে উঠলেন। কী যেন বললেন। ফ্রাসিস দাঁড়িয়ে পড়ল। বারিনথাস বলল–রাজা বলছেন ওটা দেবতার পবিত্র গাত্রাবরণ। তুমি বিধর্মী। ছোঁবে না।

তাহলে রাজাকেই বলো গাত্রাবরণটা খুলে দিক। বারিনথাস রাজাকে সেই কথা বলল। রাজা আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন। সাবধানে দেবতার গাত্রাবরণটা খুলে ফেললেন। সকলেই চম্‌কে উঠল। এ কী? কোয়েতজাল দেবমূর্তির পেছনে রাখা দুটো হাতই ভাঙা। মুহূর্তে ফ্রান্সিস দেবমূর্তির পিঠের কাছে ঝুঁকে পড়ল। দেখল–মূর্তির ডান হাতটা পিঠের কাছে একটা লোহার কড়ার সঙ্গে বাঁধা ঝুলছে। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকিয়ে হাসল–হ্যারি, ছড়াটার যে অর্থ আমি করেছি তাতে এই খানেই হাতটা থাকার কথা। ও বারিনথাসকে বলল-রাজাকে বলো এই হাতটা ভাঙা ডানহাতে বসিয়ে দিক।

বারিনথাস রাজাকে সেইকথা বলল। রাজা তখনও অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন ভাঙা হাতটার দিকে। বারিনথাসের কথামত রাজা মূর্তির পিঠ থেকে হাতটা খুলে নিলেন। তারপর মূর্তির ভাঙা হাতটায় বসিয়ে দিলেন। ঠিক খাপে খাপে লেগে গেল।

ফ্রান্সিস চারপাশে তাকিয়ে দেখল বেদীর কাছে কয়েকটা শুকনো মালা পড়ে আছে। ও একটা মালা তুলে নিল। ফুলগুলো খুলে ফেলে মোটা সুতোটা বের করল। রাজার দিকে এগিয়ে ধরে ইশারায় হাতটা বেঁধে দিতে বলল। রাজা তাই করলেন। তারপর বেদী থেকে নেমে এলেন।

ফ্রান্সিস সুতো দিয়ে জোড়া দেওয়া হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আওড়াতে লাগল–টম টম-অত ত অত ত। মূর্তির হাতের আঙুলগুলো পরস্পর আবদ্ধ এবং করতল প্রসারিত। নিচের মেঝের দিকে। ফ্রান্সিস তখনও বলছে–অত ত–অতল তল। মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ফ্রান্সিসের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কী নির্দেশ দিচ্ছে জোড়া লাগানো ডান হাতটা? মেঝে কেন কালো আর সাদা পাথরে বাঁধানো? অবশ্য পাথরগুলো অমসৃণ। তবু রঙের বৈষম্য কেন?

জ্বর বেড়েছে ফ্রান্সিসের। সমস্ত শরীরটা যেন কাঁপছে। কানের দুপাশ ঝিমঝিম করছে। ফ্রান্সিস শরীরের এই অবস্থাকে আমল দিল না। হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। আর সবাই অবাক চোখে ফ্রান্সিসের কাণ্ডকারখানা দেখছে। শুধু হ্যারি অচঞ্চল। ও বুঝতে পারছে সমাধানের কোনো সূত্র ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই পেয়েছে।

ফ্রান্সিস মেঝের চারদিকে দৃষ্টি বোলাতে লাগল। দেখল মূর্তির প্রসারিত ডান হাত সোজাসুজি কয়েকটা সাদা পাথরের দিকে নির্দেশ করছে যেন। তার চারদিকে অন্য পাথরগুলো কালো। অন্য পাথরগুলো ছোটবড় এলোমেলো বসানো। কিন্তু সাদা পাথরগুলো অনেকটা চৌকোনো ধরনের আর যেন বেশ যত্নে বসান।

ফ্রান্সিস এক লাফে দাঁড়াল। বলল–হ্যারি, আমার পদক্ষেপ নির্ভুল। এই সাদা পাথরগুলো তুলতে হবে। তার জন্যে লোক দরকার। আমরা কজন পারবো না। কী করা যায় বলো তো।

–তাতে আমরা বিপদে পড়তে পারি?

–তার ব্যবস্থাও করতে হবে। হ্যারি বারিনথাসের দিকে তাকাল। বলল–তুমি প্রাচীরের ওপাশ থেকে পাঁচজন সৈন্যকে ডেকে নিয়ে এসো। ওরা যেন লোহার কুড়ুল নিয়ে আসে। তোমার পেছনে ছোরা হাতে শাঙ্কো থাকবে। বেচাল দেখলে তোমাকে হত্যা করবে। কী? পারবে?

–হ্যাঁ, হ্যাঁ–কেন নয়। তবে গুপ্তধনের অর্ধেক আমাকে দিতে হবে?

–আগে তো উদ্ধার করি। হ্যারি হেসে বলল। বারিনথাসের পেছনে ছোরা হাতে শাঙ্কো চলল

অসুস্থ ফ্রান্সিস মেঝের ওপর বসে পড়ল।

ওর ভয় হতে লাগল জ্বরের ঘোরে ও না অজ্ঞান হয়ে যায়।

একটু পরেই কুড়ুল হাতে পাঁচজন তলতেক সৈন্য মন্দিরে ঢুকল। পেছনে বারিনথাস। তার পেছনে শাঙ্কো।

হ্যারি এক লাফে গিয়ে রাজার সামনে দাঁড়াল। হাতের তরোয়ালের চকচকে ফলাটা রাজার গলায় ঠেকিয়ে বলল–বারিনথাস, সৈন্যদের বলো–যদি ওরা আমাদের আক্রমণ করে তাহলে ওদের রাজা আমার হাতে মারা যাবে।

এদিকে সৈন্যরা রাজাকে দেখে মাথা নোয়ল। শ্রদ্ধা জানাল। বারিনথাস হ্যারির কথাগুলো ওদের বলল। ওরা চুপ করে শুনল।

এবার ফ্রান্সিস উঠল। সৈন্যদের। এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। সৈন্য। পাঁচজন এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস। আকারে ইঙ্গিতে ওদের বোঝাল সাদা পাথরগুলোর খাঁজে খাঁজে কুড়ুলের কোপ মেরে পাথরগুলোকে তুলতে হবে। সৈন্যরা মাথা ঝাঁকাল। তারপর সাদা পাথরগুলোর খাঁজে কুড়ুলের ঘা দিতে লাগল। জোর ঠকঠক শব্দ উঠল মন্দিরে। রাজা ও বারিনথাস অবাক চোখে দেখতে লাগল।

কিছুক্ষণ কুড়ুলের ঘা চলল। দুতিনটে সাদা পাথর আগা হয়ে গেল। ফ্রান্সিস তাকিয়ে রইল সেদিকে। ওরা পাথর কটা তুলে ফেলতেই ফঁক দেখা গেল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–সরে যাও সব।

সৈন্যরা কিছু না বুঝে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। একজন সৈন্য একটা সাদা পাথর নিচু হয়ে সরাল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পাথরটা ওর হাত থেকে পড়ে গেল। ও অজ্ঞান হয়ে ঐ ফোকরের মধ্যে মাথা রেখে গড়িয়ে পড়ল। বারিনথাস চিৎকার করে তুলতেকদের ভাষায় বলল–উঠে এসো সব। সৈন্যরা এক লাফে সরে এল। যে সৈন্যটা পড়ে গিয়েছিল সে ততক্ষণে মরে গেছে।

কিছুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করল সবাই। বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে সৈন্যদের কাজ শুরু করতে বলল। আবার কুড়ুলের ঘা চলল। সাদা পাথর সব কটা তুলে ফেলল ওরা। নিচে অন্ধকার। সৈন্যটার মৃতদেহ তুলে মেঝেয় রাখা হলো।

ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো, শীগগির মশাল জ্বেলে আনন। মন্দিরেরই পাথরের খাঁজে চারটে মশাল ছিল। শাঙ্কো চমকি ঠুকে জ্বালল সব কটা। নিজে একটা নিল। বাকি তিনটে ফ্রান্সিস হ্যারি ও বারিনথাসকে দিল।

ফ্রান্সিস গর্তের মুখে এসে মশাল ধরল। দেখল পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে। ফ্রান্সিস চিৎকার করে উঠল–হ্যাবি সুড়ঙ্গ। আমরা সাফল্যের মুখে।

সবাই এগিয়ে এল।–অবাক হয়ে দেখল সুড়ঙ্গের মুখে সিঁড়ি।

প্রথমে ফ্রান্সিস তারপর একে একে সবাই নামতে লাগল। বিস্মিত রাজার . মুখে কোনো কথা নেই।

কিছুটা নামতেই দেখল সুড়ঙ্গটা টানা চলে গেছে। ফ্রান্সিস দিনির্ণয় করে বুঝল সুড়ঙ্গটা বিষাক্ত উপত্যকার নিচে দিয়েই চলে গেছে।

সুড়ঙ্গের গায়ে এবড়ো খেবড়ো পাথরের গাঁথুনি। বোঝাই যাচ্ছে মানুষের হাতে তৈরি। সুড়ঙ্গে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ধুলো। ঐ ধুলোর মধ্যে দিয়েই ওরা চলল। মশালের আলোয় চারিদিকে তাকাতে তাকাতে ওরা সুড়ঙ্গপথে চলল। দশ বারো পা এগোতেই দেখল বাঁদিকে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়ির মাথায় গোলমত মুখ। পাথরকুচির ঢাকনা দেওয়া। তাতে গুঁড়ো পাথরের প্রলেপ।

হ্যারি বলল–ঐ উঁচু মুখটাতেই কি পাথর আর ফণিমনসার গাছ?

–না। ফ্রন্সিস বলল–মনে রেখো, কোয়েতজাল দেবতার বাঁ হাতটা এখনো পাইনি।

ওরা কথা বলছে তার মধ্যেই বারিনথাস একটা কুড়ল হাতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের সেই গোল মুখমতো জায়গাটা লক্ষ্য করে উঠতে লাগল। হ্যারি চিৎকার করে ডাকল–বারিনথাস, এখনো আমরা হদিস পাইনি। নেমে এসো।

ফ্রান্সিস বলল–কোনো লাভ নেই ওকে ডেকে। ও এখন গুপ্তধনের লোভে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। ওকে বাধা দিতে গেলে ও তোমাকেই মেরে ফেলবে।

ততক্ষণে বারিনথাস ঐ মুখটার কাছে পৌঁছে গেছে। পাগলের মতো এলো। পাথাড়ি কুড়ুলের ঘা মারতে শুরু করল। একটু পরেই কুচি পাথর পড়তে শুরু করল। তারপরই গাঢ় সবুজ রঙের বিষাক্ত জলের ধারা। জলের ধারা প্রথমেই পড়ল বারিনথাসের মুখে, শরীরে, বারিনথাসের শরীর থেকে ধোঁয়া উঠতে লাগল। সতীক্ষ্ণ আর্ত চিৎকার করে বারিনথাস সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নীচে ধুলোর মধ্যে পড়ে গেল। দুএকবার ঝাঁকুনি খেয়ে বারিনথাসের দেহ স্থির হয়ে গেল। তখনও বিষাক্ত জলের ধারা নামছে। তবে পরিমাণে বেশী নয়।

এদিকে বারিনথাসের এই ভয়াবহ মৃত্যু দেখে রাজা ও সৈন্যরা ভয় পেয়ে গেল। চারিদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ রাজা ছুটলেন সুড়ঙ্গ থেকে বেরোবার সিঁড়ির দিকে। তার পেছনে সৈন্যরাও হাতের কুড়ুল ফেলে দিয়ে ছুটল। শাঙ্কো ধনুকে তীর পরাল। ওদের দিকে নিশানা করল। ফ্রান্সিস ডান হাত তুলল–শাঙ্কো, তীর ছুঁড়ো না। ওদের যেতে দাও।

রাজা ও সৈন্যরা পালিয়ে গেল। শাঙ্কো ধনুক নামাল।

হ্যারি বলল–ঐ বিষাক্ত জলে সুড়ঙ্গ ভেসে যাবে না তো?

অনেক দিন লাগবে। দেখছো না এক হাঁটু ধুলো, সব জল শুষে নেবে। ফ্রান্সিস বলল–তবু আমাদের তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে।

–এখন কী করবে?

–দেবমুর্তির আর একটা হাত খুঁজতে হবে। চলো সুড়ঙ্গর শেষ পর্যন্ত দেখি।

আবার চলল তিনজনে। ধুলোর মধ্যে তিনজনেরই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তবে অসুস্থ ফ্রান্সিসের কষ্ট হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তবু ও তা বুঝতে দিল না। বাঁ পাটা টেনে টেনে দাঁতে দাঁতে চেপে ও হাঁটতে লাগল।

একটু এগিয়ে আবার পাথরের সিঁড়ি। ওপরে সেই গোলমতো জায়গাটা পর্যন্ত উঠে গেছে। ওরা দাঁড়াল না। হাঁটতে হাঁটতে সুড়ঙ্গের শেষ পর্যন্ত গেল। আবার পাথুরে সিঁড়ি উঠে গেছে। ওপরটায় সেই গোলমতো জায়গা।

সুড়ঙ্গ শেষ। ফ্রান্সিস বলল–দেখা যাচ্ছে তিনটি সিঁড়ি আছে। তিনটি সিঁড়ির মাথায় গোলমতো জায়গা। একটা তো দেখা গেল। বিষাক্ত উপত্যকার জল বেরিয়ে এল। বাকী রইলো দুটি। কুড়লের ঘা দিয়ে পরীক্ষা করবার উপায় নেই। আস্তরণ ভেঙ্গে বিষাক্ত জল নেমে আসতে পারে। কাজেই আগে দেখতে হবে কোন গোল জায়গাটায় ঘা মারবো। একটু থেমে বলল–হ্যারি, ছড়ার পরের অংশটা বলো তো।

হ্যারি বলতে লাগল–

এক হাত ধুলিময়
মুখ নয় কথা কয়
আঙুল তুলে হে–
কোন ভুলে হে–
পাথরেতে মনসা গাছ
কিম্ভুত কিম্ভুত।

ফ্রান্সিস বলল-চলো ফেরা যাক। মশালগুলো ভালো করে ধরো। তোমরা চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে চলো। আমিও দেখছি।

ওরা ফিরে আসতে লাগল। তখনই হঠাৎ ফ্রান্সিসের মাথাটা ঘুরে উঠল। চোখের সামনে দুলতে লাগল সুড়ঙ্গের পাথরে দেওয়াল, ধুলোর ঢিবি, সিঁডি, সিঁডির মাথায় গোলমত জায়গাগুলো। ধুলোর ওপর গড়িয়ে পড়ে যেতে যেতে ফ্রান্সিস কোনরকমে পাশের পাথুরে দেওয়ালে হাত রেখে নিজেকে সামলাল। ধুলোর ওপর দিয়ে ছুটে এসে শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে ধরে ফেলল। হরি বলল–ফ্রান্সিস–আর নয়। এখন পালাই চলো। তোমার শরীরের যা অবস্থা তাতে তোমার চিকিৎসা এখুনি প্রয়োজন। নইলে তোমাকে বাঁচানো যাবে না।

কিন্তু এতটা এগিয়ে মানে আর একটামাত্র সুত্র। তাহলেইসব রহস্যের সমাধান। ফ্রান্সিস ক্লান্তস্বরে বলল।

–না ফ্রান্সিস–এখন আমরা পালিয়ে গেরুয়া পাহাড়ে চলে যাবো। শাঙ্কো বলল।

–না-না–চোলুলা যাবে। চিকিৎসা হবে, বিশ্রাম নেব-সুস্থ হয়ে আবার আসবো শেষ সূত্রটা সমাধানের জন্যে। ফ্রান্সিস খুব দুর্বলকণ্ঠে বলল।

–বেশ-এখন ভাবছি সুড়ঙ্গের বাইরে বেরুলে রাজা কালহুয়ানের সৈন্যরা যদি আক্রমণ করে? হ্যারি বলল।

–যে কজন সৈন্য এখানে নেমেছিল তারা বারিনথাসের ভয়াবহ মৃত্যু দেখেছে। এতক্ষণে অন্য সৈন্যরা সে খবর পেয়েছে। আমার তো মনে হয় ভয়ে ওরা কেউ ধারে কাছে নেই। তবু শাঙ্কো তীর ধনুক নিয়ে তুমি সামনে থাকো। কথাগুলো বলে ফ্রান্সিস হাঁপাতে লাগল। যন্ত্রণায় ওর মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ভালো করে তাকাতে পারছে না পর্যন্ত।

ওরা আস্তে আস্তে মন্দিরের চত্বরে ওঠার সিঁড়ির কাছে গেল। প্রথমে উঠতে লাগল শাঙ্কো তীর ধনুক বাগিয়ে। তারপরে ডানহাতে খোলা তরোয়াল আর বা হাতে ফ্রান্সিসকে ধরে ধরে হ্যারি উঠতে লাগল।

মন্দিরের চত্বরে উঠে ওরা দেখল কোথাও কোন সৈন্যের চিহ্নমাত্র নেই। আস্তে আস্তে কোয়েতজালের মূর্তির কাছে এল ওরা। দেখল একা রাজা কালহুয়াকান দেবমূর্তির বেদীর কাছে মাথা নীচু করে বসে আছে। দুহাত ওপরে তোলা। রাজা ওদের দিকে ফিরেও তাকাল না। মুখে বিড় বিড় করে কী বলছে।

ওরা আস্তে আস্তে মন্দিরের বাইরের দিকে চলল। শাঙ্কো চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিল। ফ্রান্সিস খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলল। নিজেকে ওর এত ক্লান্ত এত দুর্বল মনে হচ্ছিল যে পারলে ওখানেই শুয়ে পড়ে।

মন্দিরের বাইরে এল ওরা। মন্দিরের সিঁড়ি, সামনের প্রাঙ্গণ কোথাও কোন সৈন্য বা পাহারাদার কেউ নেই। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–শাঙ্কো এই সুযোগ। শিগগির তিনটে ঘোড়া জোগাড় কর।

শাঙ্কো ধনুকটা কাঁধে ঝুলিয়ে, তীরগুলো কাঁধের খাপে রেখে ছুটে গেল। লোকেরা এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে তখনই দেখল আগুনেপোড়া গারদঘরের ওপাশে তিন চারটে ঘোড়া একটা খুঁটিতে বাঁধা। ঘোড়াগুলোর পিঠে খড়ভরা মোটা কাপড়ের জিন। শাঙ্কো ছুটে গেল। দড়িগুলো খুঁটি থেকে দ্রুতহাতে খুলে নিল। তারপর তিনটে ঘোড়াকে টানতে টানতে মন্দিরের সিঁড়ির কাছে নিয়ে এল। প্রথমে হ্যারি আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে একটা ঘোড়ায় তুলে দিল। তারপর কোমরে তরোয়াল খুঁজে হ্যারি আর একটা ঘোড়ার পিঠে উঠল। শাঙ্কোও দ্রুত অন্য ঘোড়ার পিঠে উঠল। এখানে ওখানে তলতেক স্ত্রীপুরুষরা জটলা করছিল। ওরা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। কেউ কোন কথা বলল না। ওরা বোধহয় বারিনথাসের অপমৃত্যুর কথা আলোচনা করছিল।

দ্রুত ঘোড়া ছোটাল তিনজনে। প্রাচীরের বাইরে এল। দেখল তলতেক সৈন্যরা বসে আছে, দাঁড়িয়ে আছে, গল্পগুজব করছে। ওরা ফ্রান্সিসদের ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে। দেখল। ওরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। কারণ তখনও ওরা রাজার আদেশ পায়নি।

বাঁদিকে বিষাক্ত উপত্যকাকৈ রেখে ওরা উত্তর দিকে পুয়েবেলা নদীর সেতুর উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছোটাল। একটা বিস্তৃত প্রান্তরে এসে পড়ল। ফ্রান্সিস কষ্ট করে পেছনে তাকাল। না তলতেক সৈন্যরা পিছু ধাওয়া করেনি। ফ্রান্সিস এতক্ষণ শরীরের জ্বর যন্ত্রণা দাঁত চেপে সহ্য করছিল। আর পারল না। মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে যেন। হঠাৎ চোখের সামনে সাদা রঙের ফুলকি মত দেখল। অবসাদে শরীর ছেড়ে দিল। ছিটকে পড়ল ঘোড়া থেকে।

হ্যারি আর শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া থামাল। নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। দুজনে ধরাধরি করে তুলল ফ্রান্সিসকে। ফ্রান্সিসের ঘোড়াটা ওরা ছেড়ে দিল। শাঙ্কো নিজে ঘোড়ায় উঠল। নীচে থেকে হ্যারি ফ্রান্সিসের প্রায় অচেতন শরীরটা শাঙ্কোর সামনের। দিকে ঠেলে ধরল। শাঙ্কো দুহাতে ফ্রান্সিসকে ওর সামনে তুলে নিল। হ্যারি ওর ঘোড়ায় উঠল। ঘোড়া ছোটাল আবার। শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে বাঁ হাতে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রাখল। ডান হাতে লাগাম ধরল। ঘোড়া ছোেটাল।

ফ্রান্সিসের যেন মনে হল শরীরটা খুব হালকা হয়ে গেছে। কোনো জ্বালা যন্ত্রণা নেই আর। ও যেন স্বপ্ন দেখতে লাগল–ওদের বাড়ির সেট এ সেই নীল ফুলের গাছটা। গেট এ দাঁড়িয়ে আছে ওর বাবা আর মারিয়া। অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মা যেন বাগান থেকে ছুটে আসছে। চারদিকে উজ্জ্বল রোদ। দুরন্ত হাওয়া বইছে। ও যেন ঘোড়ায় চড়ে ওদের দিকে চলেছে। ওর শরীরটা দুলছে। বাবা মারিয়া ও দূরে মা–হাসছে। ফ্রান্সিস এগিয়ে চলেছে। আস্তে আস্তে।

সামনেই পুয়েবেলা নদীর সেতু। শাঙ্কো আর হ্যারি ঘোড়া থামাল। শাঙ্কো ঘোড়া থেকে নামল। তারপর ফ্রান্সিসকে ঘোড়ার ওপর শুইয়ে দিল। ফ্রান্সিসকে ধরে ধরে ঘোড়াটাকে আস্তে আস্তে চালিয়ে নিয়ে সেতুটা পার হল। হ্যারিও ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে সেতু পার করাল।

তারপর আবার ঘোড়ায় চড়ল দুজনে। যখন ওরা সেই শুকনো পাতাঝরা বনে ঢুকল তখন বিকেল হয়ে এসেছে। কিছুদিন আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। তবু বনের গাছ-গাছালি ঝোঁপঝাড় সব শুকিয়ে আগের মত হয়ে গেছে। বনের গাছ গাছালি লতাপাতার মধ্যে দিয়ে ঘোড়া চালানো যায় না। দুজনে ঘোড়া থেকে নামল। বনের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে ঘোড়া হাঁটিয়ে নিয়ে এল। বন শেষ হল। ঘোড়া চালিয়ে ওরা চোলুলায় ঢুকল। ওদের পাথরের ঘরটার সামনে এসে থামল। হ্যারি দেখল চোলুলার অনেক স্ত্রী-পুরুষ ছুটে আসছে। হ্যারি আর শাঙ্কো দুজনেই তখন ভীষণ পরিশ্রান্ত। ওরা দুজনে ঘোড়া থেকে নামল। ধরাধরি করে ফ্রান্সিসের অচেতন দেহটা ওরা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামাল। নিয়ে চলল ঘরের মধ্যে। ঘরে ঢুকে ঘাসের বিছানায় ফ্রান্সিসকে শুইয়ে দিল। ফ্রান্সিসের কপালে হাত দিল হ্যারি। জুরে গা পুড়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত হ্যারি আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসের পাশে শুয়ে পড়ল। হ্যারি চোখ বুজল। শুনতে পাচ্ছে দরজার কাছে দাঁড়ানো স্ত্রী-পুরুষরা ওদের ভাষায় কী বলাবলি করছে। একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধাই বোধহয় চীৎকার করে হ্যারিদের কী জিজ্ঞেস করল। হ্যারির কোন কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। ও বুঝতেও পারল না কী জিজ্ঞেস করছে। ক্লান্ত স্বরে হ্যারি বলল-রাজবৈদ্যকে ডাকো। কিন্তু ওর কথা কেউ ভালো শুনতে পেল না আর শুনলেও বুঝতো না।

কতক্ষণ এভাবে কেটেছে হ্যারি জানে না। হঠাৎ দরজার কাছে দাঁড়ানো লোকজনদের চ্যাঁচামেচি বন্ধ হয়ে গেল। সবাই সরে দাঁড়াল। রাজা হুয়েমাক ঘরে কলেন। কাছে এসে বিছানায় বসলেন। আস্তে আস্তে বললেন–বন্ধুরা–শরীর ভালো নেই? হ্যারি রাজার গলা শুনে কষ্ট করে উঠে বসল। মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল। ক্লান্তস্বরে বলল–ফ্রান্সিস ভীষণ অসুস্থ। রাজবৈদ্যকে ডাকুন। রাজা দরজার দিকে তাকিয়ে কী বলে উঠলেন। একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা ছুটে চলে গেল। তার মুখ গম্ভীর হল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন–তোমরা?

আমরা ভালো। শুধু ভীষণ ক্লান্ত আমরা। হ্যারি বলল। রাজা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–বিশ্রাম–খাবার। তারপর বললেন–চারজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা–বন্দী ছিল।

-ওরা পালিয়েছে–চলে আসবে। হ্যারি বলল।

রাজা হাসলেন। বললেন–আমার সন্তান।

তারপর রাজা হুয়েমাক চলে গেলেন।

একটু পরেই রাজবৈদ্য এল। ফ্রান্সিসের কপালে গলায় হাত দিয়ে পরীক্ষা করল। তার আগের মতই শুকনো ফল গুঁড়িয়ে ওষুধ তৈরী করল। ওষুধের লেই লাগিয়ে দিল ফ্রান্সিসের পায়ের কাটা জায়গায়। ফ্রান্সিস একটু কঁকিয়ে উঠল। তারপর রাজবেদ্য ফ্রান্সিসকে হ্যারির শাঙ্কোর ছড়ে যাওয়া কনুই হাঁটু জল ন্যাকড়ায় ভিজিয়ে আঠামত ওষুধ লাগিয়ে দিল। তারপর হ্যারিকে চারটে কালো কালো বড়ি দিল। ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে খাইয়ে দিতে বলল। রাজবৈদ্য চলে গেল।

দুজন পাহারাদার ওদের খাবার দিয়ে এল। ঘরে মশাল জ্বালিয়ে দিল। রাত হল। হ্যারি ইঙ্গিতে ওদের খাবার রেখে খেতে বলল। ওরা খাবার-জল রেখে চলে গেল।

রাত বাড়তে লাগল। হ্যারির ক্লান্তি অনেকটা দূর হয়েছে। কনুই হাঁটুর জ্বালাও অনেকটা কমেছে। শাঙ্কোও উঠে বসল। ওরও শরীর ভালো লাগছে এখন। হ্যারি ফ্রান্সিসের কপালে হাত দিল। জ্বর কমেছে অনেক। তখনই ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর চোখ মেলে তাকাল। হ্যারি ডাকল–ফ্রান্সিস?

–উঁ? ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে হ্যারির দিকে তাকাল?

–এখন শরীর কেমন লাগছে। ? হ্যারি বলল?

–ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। বলল ভালো। আচ্ছা আমার কী হয়েছিল?

–সে সব কথা পরে হবে খন। তোমার খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই? হ্যারি বলল।

–ভীষণ। ফ্রান্সিস বলল?

–আমরা খাবার রেখে দিয়েছি। খাবে এসো। হ্যারি বলল।

তিনজনেই খেতে বসল। পাখির মাংসের ঝোল। বীন, টম্যাটোর তরকারি। ভুট্টার রুটি। তিনজনেরই খিদে পেয়েছিল। পেট পুরে খেল। জল খেয়ে শুয়ে পড়ল। তিনজনেই ক্লান্ত। এদিকে ফ্রান্সিসকে সুস্থ দেখে হ্যারি আর শাঙ্কো নিশ্চিন্ত হল। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল ওরা। ফ্রান্সিস শুধু জেগে রইল। মনে পড়ল–তুলার কোয়েতজাল মন্দির–দেবমূর্তি ভাঙা হল–সুড়ঙ্গ–সিঁড়ি-গোলমত ফোকর। কিন্তু গুপ্তধন খুঁজে বার করা যায়নি। এসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।

দিন চারেক কাটল। রাজবৈদ্যর চিকিৎসায় ফ্রান্সিস এখন অনেকটা সুস্থ। তবে শরীরের দুর্বলতা এখনও সম্পূর্ণ কাটেনি। হ্যারি ও শাঙ্কো এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। শুধু ঘরে বসে থাকতে শাঙ্কোর ভালো লাগে না। ও শিকার করতে যেতে চায়। কিন্তু ফ্রান্সিস ওকে যেতে দেয় না। একবার বিপদে পড়েছে। অনেক কষ্টে ওকে মুক্ত করে ফিরিয়ে এনেছে। আবার কিছু হলে? ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলেছে–আরো তীর তৈরী কর। হয়তো পরে কাজে লাগবে। শাঙ্কো দুবেলা তাই করে। বেশ কিছু তীর তৈরী করেছে এর মধ্যে।

রাজা হুয়েমাক প্রতিদিন ফ্রান্সিসদের ঘরে আসেন। ওদের খোঁজখবর নেন। নানা কথা হয়। সেদিন সকালে ফ্রান্সিসকে বললেন–চলো-আমার পড়ার ঘর তোমাকে দেখাবো। ফ্রান্সিস বেশ আগ্রহ বোধ করল। সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকতে ভালোও লাগে না।

রাজার সঙ্গে ফ্রান্সিসচলল। লম্বা লম্বা পাথরবাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে ওরা কোয়েতজাল দেবতারমন্দিরে ঢুকল। এখানে প্রতিদিন দেবতার পুজো হয়; ফ্রান্সিস দেখল এখানকার কোয়েতজালের মুর্তিটাও তুলার মন্দিরের মূর্তির মতই। উচ্চতাও প্রায় এক। মূর্তির বেদীতে বুনো ফুল ফুলের মালা ছড়ানো।

রাজা হুয়েমাক মূর্তির সামনে কিছুক্ষণ হাঁটু গেড়ে বসল। দুহাত ওপরে তোলা। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল–তুলার রাজা কালহুয়াকান–নরবলি–পূজা–আমি মানি না–মনে করি–কোয়েতজাল শুধু জীবনের দেবতা–মৃত্যুর নয়। ফ্রান্সিস রাজা হুযেমাকের এই মনোভাবের মনে মনে প্রশংসা করল। রাজা বললেন এখানে কয়েদ ঘর নেই–মানুষ সৎ-বিশ্বাস করি।

মন্দিরের পাশেই একটা বড় ঘর। ফ্রান্সিসকে নিয়ে রাজা সেই ঘরে ঢুকলেন। সাদাসিদে ঘর। কয়েকটা লম্বাটে পাথরের ওপর কিছু চামড়াবাঁধা বই। ফ্রান্সিস বইগুলো খুলে দেখল ভেড়ার সাদা চামড়ার পাতা। হাতে লেখা বই। ভাষা স্পেনীয়। পাথরের ওপর একটা চীনে মাটির দোয়াত কালি। পাশে মোটা ঘাস কেটে তৈরী কলম। পাশে কয়েকটা ভেড়ার সাদা চামড়া। বোঝা গেল এই কালি কলম চামড়ায় লেখা হয়। রাজা বললেন–এই ঘরে পড়ি–লিখি।

–বইগুলো কোথায় পেলেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।

–বারিনথাস–প্রথমে ভালো–পরে মন্দ। স্পেনীয় ভাষা-শিখেছি। রাজা বললেন।

-এখন আপনি ক পড়েন–কী লেখেন? ফ্রান্সিস বলল?

–স্পেনীয় ভাষার অক্ষরে-নাহুয়াতুল ভাষা–তৈরী–চেষ্টা।

ফ্রান্সিস শুনে খুব খুশী হল। বলল–সত্যি আনন্দের কথা।

আপনি সত্যি আপনার প্রজাদের কথা ভাবেন।

প্রজাসন্তান। বিদেশের জ্ঞান-চাই। রাজা বললেন। তারপর বললেন–

–স্পেনীয় অক্ষর লেখ। রাজা একটা সাদা চামড়া এগিয়ে দিল। ফ্রান্সিস কলম দিয়ে স্পেনীয় বর্ণমালা লিখে দিল। রাজা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। জোরে পড়লেন। ফ্রান্সিস হেসে বলল

–আপনি স্পেনীয় ভাষা মোটামুটি শিখেছেন।

–আরো ভালো-শেখাবেন? রাজা বললেন?

–ঠিক আছে–আমি যতটুকু জানি শেখাবো। ফ্রান্সিস বলল।

রাজা খুশীর হাসি হাসলেন। বললেনকাল সকাল–।

–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস পরদিন থেকে সকালে রাজার ঘরে আসতে লাগল। ও রাজাকে আরো ভালোভাবে স্পেনীয় ভাষা শেখাতে লাগল। নিজেও নাহুয়াল ভাষা শিখতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যে রাজা হুয়েমাক স্পষ্ট স্পেনীয় ভাষা বলতে শিখলেন। ফ্রান্সিস মোটামুটি নাহুয়ালভাষা শিখল।

সেদিন দুপুরের দিকে। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঘরে রয়েছে। ঘরের দরজায় বসে শাঙ্কো লোহার ফলা দিয়ে তীর তৈরী করছে। হঠাৎ দেখল একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা শুকনো বনটা থেকে বেরিয়ে ছুটে রাজবাড়ির দিকে আসছে আর চীৎকার করে কী বলছে। শাঙ্কো বুঝল একটা কিছু হয়েছে। ও ছুটে ফ্রান্সিসের কাছে গেল। বলল ফ্রান্সিস একজন যোদ্ধাকে বনের দিক থেকে দৌড়ে আসতে দেখলাম–বোধহয় কিছু হয়েছে।

–যোদ্ধাটা কোথায় গেল?

–রাজবাড়িতে।

তিনজনেই দরজায় এসে দাঁড়াল। সত্যি একটা কিছু হয়েছে। লোকজন ছুটোছুটি করছে। সকলের মুখেই ভয়।

ঠিক তখনই রাজবাড়ি থেকে একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা ছুটতে ছুটতে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। ফ্রান্সিস এই যোদ্ধাটাকে চেনে। দেখা হলেই এই যোদ্ধাটা হাসে। রাজা হুয়েমাক এই দেহরক্ষী যোদ্ধাটিকে দিয়েই বরাবর ফ্রান্সিসকে ডেকে পাঠায়। আজকে যোদ্ধাটি কিন্তু হানছে না। বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও ফ্রান্সিসকে কিছু বলল। ফ্রান্সিস এখন নাহুয়াল ভাষা একটু বোঝে। রাজা ডাকছেন–এটুকু বুঝল। ও বলল-আমি আসছি।

ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে এসে রাজপ্রাসাদে ঢুকল। দেখল রাজদরবারে গণ্যমান্যরা বসে আছেন। রাজা হুয়েমাক কাঠের সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দুটিচোখে দুশ্চিন্তা। রাজা ফিরে তাকিয়ে ফ্রান্সিসকে দেখলেন। অনেক পরিষ্কার স্পেনীয় ভাষায় বললেন–ফ্রান্সিস রাজা কালহুয়াকান আমার রাজ্য আক্রমণ করতে আসছে। ওরা ভোরবেলা একটা একটা করে ঘোড়া পুয়েবেলা নদীর সেতুর ওপর দিয়ে পার করে এপারে এসেছে। তারপর পদাতিক সৈন্যরা এসেছে। শুকনো বনের মধ্যে দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আসা অসুবিধে। তাই বনের পাশ দিয়ে অনেক দূরে ঘোড়া দুটিয়ে সৈন্যদল আসছে। পেছনে পদাতিক সৈন্যরা। বিকেলের মধ্যেই এসে পড়বে?

–তাহলে আপনার সৈন্যদের তৈরী হতে বলুন। ফ্রান্সিস বলল।

–সে আদেশ আমি দিয়েছি–আমার সন্তানতুল্য প্রজাদের ভাগ্যে যা ঘটবে আমার ভাগ্যেও তাই ঘটুক।

–আপনার উপযুক্ত সিদ্ধান্তই আপনি নিয়েছেন। ফ্রান্সিস বলল—

ভাবছি যুদ্ধ না করে সন্ধির প্রস্তাব করবো কিনা। রাজা বললেন।

আতেও আপনি বা আপনার প্রজারা রেহাই পাবে না।

কালহুয়াকানের মত নরপশু সন্ধির প্রস্তাব মানবে না। বলি দেবার জন্যে অনেক বন্দী পাবে। এতেই ওর আনন্দ। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক বলেছো। মরতে যখন হবেই তখন লড়াই করেই মরবো। রাজা বললেন। তারপর রাজা নাহুয়া ভাষায় গণ্যমান্যদের নিজের সিদ্ধান্তের কথা বললেন। গণ্যমান্যরা উঠে দাঁড়ালেন। তারপর মাথা নীচু করে রাজাকে সম্মান জানিয়ে চলে গেলেন। ফ্রান্সিস বলল–মহামান্য রাজা–আপনার এই বিপদে আমরা মাত্র তিনজন কী সাহায্য আর আপনাকে করতে পারবো। তাছাড়া আমি নিজে এখনো সুস্থ নই। আমার বন্ধুরা থাকলে–যাকগে দেখি কী করতে পারি। ফ্রান্সিস মাথা একটু নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে চলে এল।

ফ্রান্সিস নিজেদের ঘরে ফিরে এল। হ্যারি আর শাঙ্কোকে সব বলল। হ্যারি বলল–কিন্তু তোমার যা শরীরের অবস্থা

–না তরোয়াল নিয়ে আমি যুদ্ধ করতে পারবো না। তুমিও খুব সুস্থ নও। এক শাঙ্কো। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল। বলল–এবার বুঝলে কেন তোমাকে অনেক তীর তৈরী করতে বলেছিলাম।

ফ্রান্সিস বিছানার ধার থেকে তরোয়াল তুলে কোমরে গুজল। হ্যারিও তরোয়াল নিল। শাঙ্কো ধনুক নিল। কাঁধের খাপে অনেক তীর নিল।

ওরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। ঠিক তখনই একদল ননোয়াক্লা যোদ্ধা যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে বেড়িয়ে গেল বনের বাঁদিক লক্ষ্য করে। সামনের প্রান্তরে পদাতিক সৈন্যরা সারি বেঁধে দাঁড়াতে লাগল।

ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কোকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াতে লাগল আর নাহয়া ভাষায় ভেঙে ভেঙে বলতে লাগল–খাদ্য নাও-শুকনো বনে–পালিয়ে যাও।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নারী শিশু বৃদ্ধারা হাতে খাবারের পুটুলি নিয়ে শুকনো বনের দিকে ছুটে পালাতে লাগল। সন্ধের আগেই চোলুলা জুনহীন হয়ে গেল।

সন্ধের সময়ই–কালহুয়াকানের অশ্বারোহী সৈন্যরা চোলুলায় পৌঁছল। পদাতিক ননোয়াক্লা সৈন্যরা যুদ্ধ করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে কালহুয়াকানের পদাতিক

একটা পাথরের বাড়ির আড়াল থেকে এতক্ষণ শাঙ্কো নিখুঁত নিশানায় তীর ছুঁড়ে বেশ কিছু কালহুয়াকানের ঘোড়সওয়ার সৈন্য মেরেছে। কিন্তু অন্ধকার নেমে এল তখনই। অন্ধকারে শাঙ্কো নিশানা ঠিক করতে পারল না। ও তীর ছোঁড়া বন্ধ করল। অনর্থক তীর নষ্ট করল না।

ননোয়াক্লা যোদ্ধারা বীরের মত কালহুয়াকানের অশ্বারোহী সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করল। কিন্তু কালহুয়াকানের পদাতিক সৈন্যরা আসতেননোয়াক্লা যোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙে গেল। তারা হেরে যেতে লাগল। আহত আর মুমুর্যদের আর্তনাদে প্রান্তর ভরে উঠল। পরাজিত ননোয়াক্লা সৈন্যদের দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে বন্দী করা হল। প্রান্তরে দাঁড় করিয়ে রাখা হল।

ওদিকে রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরা রাজপ্রাসাদে ঢুকল। রাজসভার গণ্য মান্যদের বন্দী করা হল। রাজা হুয়েমাকের দেহরক্ষীরা যখন লড়াই করছে তখন রাজা ছুটে এলেন। বললেন–তোমরা পালাও। আমি একা লড়াই করবো। করলেনও তাই। তার বাঁ কাঁধে বর্শা বিধল। আহত হয়ে তিনি প্রাসাদের সিঁড়ির ওপর পড়ে গেলেন। আহত রাজা হুয়েমাক বন্দী হলেন।

যুদ্ধে রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরা জিতল। ওরা মুখে হাতের থাবড়া দিয়ে শব্দ করতে লাগল। চীৎকার করতে লাগল। তারপর জনশূন্য বাড়িগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লুঠপাট চলল অবাধে।

যুদ্ধজয়ী রাজা কালহুয়াকান একটা সাদা ঘোড়ার পিঠে বসে এসব দেখছিলেন। এবার ঘোড়া থেকে নেমে এলেন। কালহুয়াকানের পরনে রাজবেশ। দুকানে অলঙ্কার। গলায় দামী পাথরের মালা। তিনি রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন। সোজা গিয়ে রাজা হুয়েমাকের সিংহাসনে বসলেন। সঙ্গে ছিল গণ্যমান্যরা। তারা মাথা নীচু করে সম্মান জানিয়ে রাজা কালহুয়াকানের সামনে দাঁড়াল। রাজা কালহুয়াকান রাজসভাগৃহের চারদিকে তাকাতে তাকাতে হা হা করে হেসে উঠলেন। তাঁর অনেকদিনের বাসনা পূর্ণ হল। রাজা হুয়েমাককে চোলুলা থেকে তাড়িয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। রাজা হুয়েমাকের এই রাজধানী চোলুলা দখল করার কল্পনাও তার অনেকদিনের।

বিজয়ী কালহুয়াকানের সৈন্যদের বিজয়োল্লাস আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে রাত বাড়তে লাগল।

ফ্রান্সিসরা নিজেদের ঘরে ফিরে এল। ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়েছে সবে তখনই শুনল দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দ। নিশ্চয়ই কালহুয়াকানের সৈন্যরা। এই ঘরের দরজা বন্ধ দেখে ধরে নিল ভেতরে মূল্যবান কিছু আছে। দরজায় ধাক্কা দেওয়া চলল।

ফ্রান্সিস আর হ্যারি দ্রুত বিছানা থেকে উঠল। তরোয়াল হাতে নিল। ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশালটা মেঝেয় চেপে নিভিয়ে ফেলল। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। শাঙ্কোও উঠে দরজার হুড়কোটা খুলো দিয়েই দ্রুত পিছিয়ে এল। চার-পাঁচজন রাজা কালহুয়াকানের সৈন্য এক ধাক্কায় দরজা খুলে ঢুকল। প্রথম সৈন্যটার বুকে লাল করে হ্যারি তরোয়াল চালাল। সৈন্যটির বর্শা হাতেই রয়ে গেল। ঘাড়ে গভীর ক্ষত নিয়ে সে মেঝেয় গড়িয়ে পড়ল। পরের সৈন্যটি অন্ধকারেই বর্শা ছুঁড়ল। বর্শা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। ফ্রান্সিস এক লাফে এগিয়ে এসে সৈন্যটার বুকে তরোয়াল বিধিয়ে দিল। সৈন্যটা দুহাত শূন্যে তুলে চিৎ হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল। পরেরটাকে ঘায়েল করল শাঙ্কোর ছোঁড়া তীর। আহত সৈন্যটা দোর গোড়াতেই পড়ে গেল। পরের সৈন্যটি আর ভয়ের চোটে ঘরেই ঢুকল না। এক লাফে বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

ফ্রান্সিসরা ধরাধরি করে মৃত সৈন্যদের দরজার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঘরে ফিরে হ্যারি আর শাঙ্কো বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে থেকেই বলল–ঘরের দরজা বন্ধ করো না। তাহলেই কালহুয়াকানের সৈন্যরা ভাববে এ ঘর লুঠ হয়ে গেছে। আর ঢুকবে না। শাঙ্কো তীর ধনুক পাশে রেখে শুয়ে পড়ল। হ্যারি তরোয়াল হাতে বিছানায় বসে রইল। ফ্রান্সিস বলল–তোমরা সজাগ থেকো–আমি একটু ঘুরে আসছি।

–এত রাতে কোথায় যাবে? হ্যারি জানতে চাইল।

–রাতেই সুবিধে। এক্ষুনি আসছি। ফ্রান্সিস কথাটা বলে দরজার বাইরে এল। সাবধানে চারিদিকে অন্ধকারে নজর রেখে চলল প্রাসাদের সিঁড়ির দিকে। দেখল এখানে ওখানে আগুন জ্বেলে কালহুয়াকানের সৈন্যরা হৈ হৈ করে খাওয়া দাওয়া করছে। সেই আলোয় দেখল কোয়েতজাল মন্দিরের সিঁড়িতে আহত ননোয়াক্লা সৈন্যরা শুয়ে বসে আছে। প্রান্তরে হাতবাঁধা বন্দীরা সারি বেঁধে বসে আছে। এরই মধ্যে সেই রাজবৈদ্যকে দেখল ফ্রান্সিস। রাজবৈদ্য সঙ্গে দুজন বৃদ্ধকে নিয়ে আহত সৈন্যদের চিকিৎসা করছে। সঙ্গী বৃদ্ধের হাতে ওযুধের দুটো থলি। রাজবৈদ্য নিচু হয়ে একজন ননোয়াক্কা সৈন্যর ক্ষতে ওষুধ লাগাচ্ছে তখনই একজন কালহুয়াকানের সৈন্য রাজন্যৈর দিকে বর্শা উঁচিয়ে ছুটে এল। বর্শা ছোঁড়ার আগেই ফ্রান্সিস সৈন্যটার বুকে বর্শা বিধিয়ে দিল। সৈন্যটা বর্শা ফেলে মাটিতে উবু হয়ে পড়ে গেল। রাজবৈদ্য উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস রাজবৈদ্যকে চাপাস্বরে ভাঙা ভাঙা নাহুয়াল ভাষায় বলল–রাজা হুয়েমাক–খুঁজছি-কোথায়? রাজবৈদ্য মাথা নাড়ল। ও জানে না।

ফ্রান্সিস আবার অন্ধকারে সাবধানে চলল। সামনেই কোয়েতজালের মন্দির। ফ্রান্সিস ভেবে দেখল এই ডামাডোলের মধ্যে রাজা হুয়েমাককে পাওয়া যাবে না। তাছাড়া তিনি এতক্ষণে বন্দী। কালহুয় কানের সৈন্যরা নিশ্চয়ই তাকে পাহারা দিচ্ছে। অথচ রাজাকে একটা নির্দেশ দিতেই হবে। কী করে এই নির্দেশটা রাজা হুয়েমাকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়? আচ্ছা চিঠি পাঠালে কেমন হয়? ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে কোয়েতজালের মন্দিরে ঢুকে পড়ল। একপাশে রাজার পাঠকক্ষ। এখানে শত্রুসৈন্যরা নেই। মন্দিরে আর পাহারা দেবার কী আছে। ফ্রান্সিস অন্ধকারে পা টিপে টিপে পাঠকক্ষে ঢুকল। দেখল মশাল জ্বলছে। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে একটা ভেড়ার সাদা চামড়া টেনে নিল। দোয়াতের কালিতে কলম ঢুকিয়ে লিখল–

মহানুভব রাজা হুয়েমাক–

একটা প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছি। আপনি রাজা কালহুয়াকানকে বলবেন সব বন্দীদের সঙ্গে নিয়ে আপনি হেঁটে শুকনো বন পেরিয়ে প্রথমে পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে যাবেন। আপনাদের পেছনে আসবেন রাজা কালহুয়াকান ও তার সৈন্যরা। আপনি রাজা কালহুয়াকানকে প্রতিশ্রুতি দেবেন যে আপনি নিজে বা কোন বন্দী পালাবেনা। শুকনো বনে আত্মগোপনকারী সবাইকে ডেকে নিয়ে যাবেন। বনে কেউ যেন না থাকে।

ইতি ফ্রান্সিস।

চিঠিটা লিখে ফ্রান্সিস পাঠকক্ষ থেকে বেরিয়ে এল। এখন চিন্তা এই চিঠি হুয়েমাকের কাছে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়। রাজা হুয়েমাককে কোথায় রাখা হয়েছে কে জানে। রাজা হুয়েমাকের এখানে কোন কয়েদ ঘরও নেই। অগত্যা কাল সকালে চেষ্টা করতে হবে।

ফ্রান্সিস সতর্কভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে নিজেদের ঘরে নিয়ে এল। হ্যারি শাঙ্কো দুজনেই জেগে ছিল। ফ্রান্সিস ঢুকতেই হ্যারি বলল–তোমার কোন বিপদ হয়নি তো?

না। শত্রুসৈন্যরা আর এখানে এসেছিল? ফ্রান্সিস বলল?

–না। রাত বেশী নেই। শুয়ে পড়। হ্যারি বলল।

ওরা বিছানায় শুল বটে। কিন্তু ভালো ঘুম হল না কারোরই। রাতে খাওয়া হয়নি। ভোরেই উঠে পড়ল ওরা। খিদেও পেয়েছে। আবার সকালের আলোয় দেখল রাজবৈদ্যর একজন সঙ্গী যাচ্ছে। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল–শুনুন। বৃদ্ধটি থামল। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে ফ্রান্সিসকে দেখতে পেল। এগিয়ে এসে দোর গোড়ায় দাঁড়াল। ফ্রান্সিস হাতের ভঙ্গী করে বলল–খাবার। বৃদ্ধটি হাসল। তারপর চলে গেল।

–ও কি খাবার আনতে পারবে? শাঙ্কো বলল?

–দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল। ওরা অপেক্ষা করতে লাগল।

কিছুক্ষণ পরেই বৃদ্ধটি ফিরে এল। হাতে একটা পুঁটুলি। ঘরে ঢুকে পুঁটলি খুলে খাবার বের করল। সেই ভুট্টার রুটি। বুনো ফলের তরকারি। খিদের জ্বালায় তিনজনেই উবু হয়ে বসে খেতে লাগল। বৃদ্ধটি হাসতে লাগল। তিনজন ক্ষুধার্তকে খাইয়ে বৃদ্ধটি খুশীই হয়েছে বোঝা গেল। খাওয়ার পর চীনেমাটির পাত্রগুলো নিয়ে যাচ্ছে তখন ফ্রান্সিস ভাঙা ভাঙা নাহুয়াতল ভাষায় ধন্যবাদ জানিয়ে বলল-রাজা হুয়েমাক কোথায়?

বৃদ্ধটি দরজার কাছ থেকে আঙুল তুলে দেখাল। ফ্রান্সিসরা দেখল রাজপ্রাসাদের সিঁড়ির ওপর রাজা হুয়েমাক হাতবাঁধা অবস্থায় বসে আছেন। রাজবৈদ্য রাজার কাঁধের ক্ষতে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে। বৃদ্ধটি একনাগারে কী বলে গেল। ফ্রান্সিস মোটামুটি বুঝল। বলল–জানো, কালরাতে রাজা হুয়েমাককে রাজবৈদ্য চিকিৎসা করতে চেয়েছিল। রাজা রাজি হননি। বলেছেন–আমার প্রজাদের আগে চিকিৎসা কর। তারপর আমাকে। তাই এখন সকালে চিকিৎসা হচ্ছে। হ্যারি বলল সত্যি–এরকম মানুষ কম দেখা যায়। বৃদ্ধটি চলে গেল। ফ্রান্সিস ভাবল, এই সুযোগ। রাজাকে চিঠিটা দিয়ে আসি। কিন্তু দেখল–দুজন শত্রুসৈন্য রাজার দুপাশে দাঁড়িয়ে বর্শাহাতে পাহারা দিচ্ছে। অন্য উপায় ভাবতে হবে। তখনই দেখল শাঙ্কো ওর তীরগুলো খাপে গুছিয়ে রাখছে। ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো শিগগির তীর ধনুক নিয়ে এসো। বিপদ আঁচ করে শাঙ্কো তীর ধনুক বাগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল ভয় নেই। তারপর শাঙ্কোর হাত থেকে তীরটা নিল। চিঠিটা কোমরবন্ধনী থেকে বের করল। চিঠিটা একটা তীরের ফলায় জড়ালো। তারপর রাজা হুয়েমাক যে ওদের যে নতুন পোশাক পরতে দিয়েছিল তারই স্কুল থেকে সুতো ছিঁড়ে নিল। তীরের ফলার সঙ্গে চিঠিটা বেঁধে দিল। তারপর তীরটা শাঙ্কোর হাতে দিয়ে বলল–ঐ দেখ রাজা হুয়েমাক সিঁড়িতে বসে আছে। ঠিক তীর ছুঁড়ে রাজার সামনে চিঠিটা ফ্যালো। পারবে তো? শাঙ্কো মাথা ঝাঁকাল। তারপর নিশানা ঠিক করে শাঙ্কো তীরটা ছুঁড়ল। ঠিক রাজা হুয়েমাকের পায়ের কাছে তীরটা পড়ল। রাজা দুএকবার এদিক ওদিক তাকালেন। তারপর বাঁধা হাতদুটো বাড়িয়ে তীরটা তুলে নিলেন। সুতোর বাঁধন খুলে চিঠি বার করলেন। খুর মন দিয়ে বারকয়েক পড়লেন। এতক্ষণ ফ্রান্সিস রুদ্ধনিঃশ্বাসে তাকিয়ে ছিল। এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–যাক রাজাকে নির্দেশটা দিতে পেরেছি। রাজার পাহারাদার একজন দেখল রাজা চিঠি পড়ছে। পাহারাদারটা মুখ নামিয়ে দেখল চিঠিটা। স্পেনীয় ভাষায় লেখা। ও মাথামুণ্ড কিছুই বুঝল না। তবু চিঠিটা ছিনিয়ে নিল। রাজার এতক্ষণে বারকয়েক পড়া হয়ে গেছে। চিঠিটা নিয়ে পাহারাদার সৈন্যটি রাজপ্রাসাদে ঢুকল। দেখল রাজা কালহুয়াকান সিংহাসনে হাত পা গুটিয়ে শুয়ে আছেন। সৈন্যটি মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চিঠিটা রাজার হাতে দিল। তারপর কী বলে গেল। বোধহয় কী করে চিঠিটা পেয়েছে তাই বলল। রাজা কালহুয়াকান সিংহাসনে উঠে বসলেন। চিঠিটা পড়বার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুই পড়তে পারলেন না। তখন চিঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার হাত-পা গুটিয়ে শুয়ে পড়লেন। সৈন্যটি চলে এল।

পাথরের সিঁড়িতে রাজা হুয়েমাক বসে আছেন।

একটু পরেই একজন সৈন্যদের দলনেতা ঘোড়ায় চড়ে সিঁড়ির কাছে এল। দুতিনজন সৈন্য এগিয়ে গেল। দলনেতা তাদের কী বলল। তারা খুব হাসাহাসি করল। একজন ছুটে গিয়ে একটা লম্বা দড়ি নিয়ে এল। ফ্রান্সিস ঘরের দরজার আড়াল থেকে সবই লক্ষ্য করছিল। সৈন্যটা দড়ির একটা প্রান্ত আহত রাজা হরেমাকের হতে বাঁধল। ফ্রান্সিস ডাকল—হ্যারি দেখে যাও। ওরা যে খেলা আমাদের সঙ্গে খেলেছিল সেই একই খেলা খেলছে রাজা হুয়েনাকের সঙ্গে। হ্যারি শাঙ্কো দুজনেই এগিয়ে এল। দেখতে লাগল দরজার আড়াল থেকে।

রাজা হুয়েমাকের হাতে দড়ি বেঁধে সৈন্যটি দড়ির অপর প্রান্ত ঘোড়সওয়ার দলনেতার হাতে দিলে। দলনেতা দড়িতে এক হ্যাঁচকা টান দিল। রাজা হুয়েমাক কিছু ভাবছিলেন। চমকে উঠে দাঁড়ালেন। দলনেতা ঘোড়া চালাতে লাগল। দড়িবাঁধা রাজাও হাঁটতে লাগলেন ঘোড়ার পেছনে পেছনে। হঠাৎ দলনেতা ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দিতেই আহত রাজা মাটিতে পড়ে গেলেন। দলনেতা মাটিতে ধুলোয় হিঁচড়ে নিয়ে চলল রাজাকে। শত্রুসৈন্যরা উল্লাসে চীৎকার করতে লাগল। রাজাকে হিঁচড়ে নিয়ে দলনেতা ঘোড়াটাকে ঐ মাঠের মত জায়গাটায় পাক খাওয়াতে লাগল। রাজার পোশাক ছিঁড়েখুঁড়ে গেল। সারা গায়ে ধুলো৷ কাঁধে বর্শার জখম। তবু রাজা নিঃশব্দে এই অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে লাগলেন। দেখতে দেখতে বেদনায় দুঃখে ফ্রান্সিসের চোখে জল এল। ও চোখ বন্ধ করে বলল–শাঙ্কো–মারো ঐ ঘোড়সওয়ারকে। শাঙ্কো বলল–অত দূরে তীর যাবে না।

–ফ্রান্সিস তারপর খুব নিবিষ্টমনে তাকিয়ে ঘোড়সওয়ারকে দেখল। ঐ তো–সেই দাড়িগোঁফওলা দলপতি। বলল–হ্যারি–সেই লোকটা না?

–হ্যাঁ। হ্যারিও দেখতে দেখতে বলল?

–শাঙ্কো-পাথরের বাড়ির আড়ালে আড়ালে কাছে চলে যাও।

ঐ নরপশুটাকে হত্যা করা চাই। শাঙ্কো বিছানা থেকে কাপড়টা নিয়ে গা মাথা ঢাকল। তীর ধনুক নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পাথরের বাড়িগুলোর আড়ালে আড়ালে এগিয়ে চলল। সব সৈন্যরা তখন ঐ কাণ্ড দেখতে ব্যস্ত। খুব মজা পাচ্ছে। শাঙ্কোর দিকে কারো চোখ পড়ল না। শাঙ্কো মন্দিরের সামনে পাথরের সিঁড়ির একপাশে মাথা নীচু করে বসে পড়ল। তারপর ধনুক বাগিয়ে ধরল। একটার বেশী তীর ছোঁড়া যাবে না। কাজেই নিশানা নিখুঁত হতে হবে। একটু সময় নিল শাঙ্কো তারপর তীর ছুঁড়ল। নির্ভুল নিশানা। তীরটি দলনেতার বুক ভেদ করল। দুহাত ওপরে তুলে সে ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে গেল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে মন্দিরের ওপাশে চলে গেল। এক মুহূর্ত। সৈন্যরা তখনও ভাবছে কী হল? তারপরই অনেকে ছুটে গেল দলনেতার দিকে। আর কিছু সৈন্য এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে লাগল। কে তীর ছুড়ল? কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারল না ওরা। গা মাথা কাপড়ে ঢাকা শাঙ্কো ততক্ষণে ঘরে চলে এল। ওদিকে কয়েকবার এপাশ ওপাশ করে দলনেতা মারা গেল। রাজা হুয়েমাক মাটি থেকে উঠলেন। টলতে টলতে হাঁটতে লাগলেন। ওভাবেই, হাঁটতে হাঁটতে কোনরকমে এসে পাথরের সিঁড়িতে শুয়ে পড়লেন। তার পায়ের পোশাক তখন ছিন্নভিন্ন, রক্ত ধুলোয় ভরা সারা শরীর।

কিছুক্ষণ পরে রাজা হুয়েমাক উঠে বসলেন। পাহারাদার যে সৈন্যটি রাজা কালহুয়াকানের কাছে চিঠিটা নিয়ে গিয়েছিল তাকে জিজ্ঞেস করলেন–ওদের রাজা কোথায়? সৈন্যটি বলল–সিংহাসনে বসে আছেন। রাজা হুয়েমাক রাজপ্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন। তার পা কাঁপছে তখনো। ফ্রান্সিস দরজার আড়াল থেকে সব দেখছিল।

কিছু সময় গেল। রাজা হুয়েমাক ফিরে এলেন। আবার সিঁড়িটায় বসলেন।

বেলা বাড়তে লাগল। ওদিকে রাজবৈদ্যর দুই বৃদ্ধ সঙ্গী কোত্থেকে ভুট্টার রুটি তরকারি বিরাট কাঠের পাত্রে করে নিয়ে এসেছে। বন্দীননোয়াক্লা যোদ্ধাদের খাইয়ে দিল। আহতদেরও খেতে দিল। রাজা হুয়েমাকও খেলেন। তবে সামান্য নিলেন।

রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরা একটা জাগুয়ার শিকার করে আনল। জাগুয়ারের চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কাটল। আগুন জ্বেলে তাই পুড়িয়ে খেতে লাগল। খাওয়া দাওয়া হতে হতে আরও বেলা হল।

রাজপ্রাসাদ থেকে রাজা কালহুয়াকান বেরিয়ে এলেন। সিঁড়িতে বসা রাজা হুয়েমাককে কী বললেন। রাজা হুয়েমাক উঠে দাঁড়িয়ে বন্দী যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে চীৎকার করে বলতে লাগলেন। আমার সন্তানতুল্য প্রজারা–সর্ব প্রথমে আমি যাবো। তারপর তোমরা আসবে। আমরা আগে ঐ শুকনো বন পেরিয়ে পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে গিয়া অপেক্ষা করবো। তারপর রাজা কালহুয়াকান ও তার সৈন্যদল আসবেন কিন্তু সাবধান কেউ পালিয়ে যাবে না। আমার প্রতিশ্রুতির মূল্য তোমরা দেবে ঐ বিশ্বাস আমার আছে। রাজা থামলেন। ফ্রান্সিস হেসে বলল–রাজা হুয়েমাক এই কথাগুলো আমাকে লক্ষ্য করে বললেন। উনি জানেন যে আমরা এই ঘরেই থাকি।

রাজা হুয়েমাক প্রান্তরে নামলেন। এগিয়ে চললেন বনের দিকে। পেছনে বন্দীরা আসতে লাগল। বনের কাছে এসে রাজা চেঁচিয়ে কী বলতে লাগলেন। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট শুনে বলল-রাজা ঠিক ঠিক আমার নির্দেশ পালন করছে। বনের আত্মগোপনকারী সব প্রজাদের তার সঙ্গে যাবার জন্য বলছেন।

রাজা হুয়েমাক বন্দীদের নিয়ে শুকনো বনে ঢুকলেন। শুকনো গাছগাছালি ঝরাপাতার বনের নীচে তখনও একটু অন্ধকার রয়েছে। রাজার নির্দেশে একজন বন্দী চেঁচিয়ে রাজার কথাগুলো বলতে বলতে চলল। বনের আড়াল আবডাল থেকে স্ত্রীলোক-বৃদ্ধ-ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে এসে বন্দীদলের সঙ্গে চলল। কিছু আহত যোদ্ধাও এসে যোগ দিল। ছেলেমেয়ে কোলে মায়েরাও এসে যোগ দিল।

একসময় বন শেষ হল। রাজা হুয়েমাক তার প্রজাদের নিয়ে পুয়েবেলা নদীর সামনে এসে দাঁড়ালেন।

ওদিকে রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরাও তৈরী হল। সবার আগে দুটো ঘোড়া রাখা হল। প্রথম সাদা ঘোড়াটায় রাজা কালহুয়াকান উঠলেন। রাজপ্রাসাদ থেকে একটা লম্বাটে কালো কাঠের সিন্দুক কয়েকজন সৈন্য কাঁধে করে নিয়ে এল। পেছনের ঘোড়াটার পিঠে বাক্সটা দড়ি দিয়ে বেঁধে দিল। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসরা সবই দেখছিল। বাক্সটা দেখে ফ্রান্সিস বলল–বাক্সটায় নিশ্চয়ই রাষ্ট্র: হুয়েমাকের ধনসম্পত্তি আছে।

এবার রাজা কাহিয়াকানের সৈন্য ঘোড়াগুলোকে লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চলল। পদাতিক সৈন্যরা হেঁটে চলল।

রাজা কালহুয়াকান বনে ঢুকলেন। কিন্তু ঘোড়া থেকে নামলেন না। দুতিনজন সৈন্য কুড়ুল হাতে সামনের গাছপালার ডাল পাতা কাটতে কাটতে চলল। পথ পরিষ্কার হতে লাগল। রাজা কালহুয়াকান ঘোড়ার পিঠে চড়ে চললেন। পেছনের বাক্স পিঠে ঘোড়াটাও চলল পেছনে পেছনে।

সব সৈন্যদের নিয়ে রাজা কালহুয়াকান বনের মধ্যে দিয়ে চললেন।

ফ্রান্সিস ঘর থেকে দেখল প্রান্তর জনশূন্য। ও আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। ঘরের কোনা থেকে দুটো তেলে-ভেজা মশাল নিল। সঙ্গে চকমকি পাথর। বলে উঠল–্যারি শিগগির চলো, শাঙ্কো তীর ধনুক নিয়ে এসো।

তৈরী হয়ে ওরা ঘরের বাইরে এল। তারপর দ্রুত ছুটল বনের দিকের মন্দিরের সিঁড়িতে শুয়ে থাকা বসে থাকা ননোয়াক্লা যোদ্ধারা ওদের ছুটে যেতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

বনের কাছাকাছি পৌঁছল ওরা। ফ্রান্সিস উঁচু হয়ে বসল। একটু ধুলো মাটি থেকে নিয়ে হাত উঁচু করে আস্তে আস্তে ফেলল। দেখল ধুলোগুলো উত্তর দিকে ঘেঁষে পড়ল। তার মানে হাওয়া উত্তরমুখী। ফ্রান্সিস বলে উঠল–এটাই চাইছিলাম। তারপর ফ্রান্সিস চকমকি ঠুকে একটা মশাল জ্বালাল। অন্য মশালটা থেকে তেলে ভেজা কাপড়ের টুকরো ছিঁড়ে নিল। একটা তীরের ফলায় জড়ালো। জ্বলন্ত মশাল থেকে তীরের ফলায় জড়ানো কাপড়ে আগুন লাগাল। জ্বলন্ত তীরটা শাঙ্কোর হাতে দিয়ে বলল-এই তীরটা বনের পেছন দিকে ছোড়ো। এইবার হ্যারি ও শাঙ্কো বুঝতে পারল, হ্যারি হেসে বলল-সাবাস ফ্রান্সিস। শাঙ্কো দ্রুত হাতে তীর ছুঁড়ল। জ্বলন্ত তীর উড়ে গিয়ে বনের পেছন দিককার গাছগাছালিতে গিয়ে পড়ল। শুকিয়ে যাওয়া গাছগাছালিতে সঙ্গে সঙ্গে আগুন লেগে গেল। তারপর আবার তীরে কাপড় জড়াল ফ্রান্সিস। আবার আগুন লাগাল। বলল–এবার যত দূরে পারো তীর ছোঁড়ো। আবার আগুন মুখে তীর ছুড়ল। প্রায় বনের মাঝামাঝি পড়ল। ওখানেও আগুন লেগে গেল। উত্তুরে হাওয়ার মুখে আগুন ছড়াতে লাগল। তারপর শাঙ্কো দ্রুতহাতে আরো আগুনজ্বালা তীর ছুঁড়ল। সমস্ত বনেই আগুন লেগে গেল। বনে আগুন ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

ওদিকে আগুন আর ধোঁয়ার বেড়াজালে পড়ে গেল কালহুয়াকানের সৈন্যরা। কালহুয়াকান নিজেও। পাগলের মত সৈন্যরা বনের মধ্যে ছুটোছুটি করতে লাগল। কিন্তু চারদিকেই আগুন আর ঘন ধোঁয়া। আগুন ছড়াতে লাগল। উঁচু উঁচু গাছগুলোকে পেঁচিয়ে আগুনের কুণ্ডলী ওপরের দিকে উঠতে লাগল। রাজা কালহুয়াকান ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। পালাতে গেলেন। কিন্তু কোনদিকে পালাবেন? চারদিকেই আগুন আর গাঢ় ধোঁয়া। বনের মাথায় আকাশে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে লাগল। দুতিনজন সৈন্য ঘোড়ার পিঠে উঠে আগুনের বলয় পার হতে গেল। কিন্তু ঘোড়াসুদ্ধ পুড়ে মরল। প্রাণভয়ে ভীত ঘোড়াগুলো পাগলের মত এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল। ছুটন্ত ঘোড়ার পায়ের নীচেও অনেক সৈন্য মারা পড়ল। আগুনের শিখা ওপরে আকাশের দিকে অনেকটা উঠে গেল। বিকেলের আকাশে বন থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে লাগল।

রাজা হুয়েমা সেতুর কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার প্রজাদের নিয়ে। সবাই অবাক চোখে বনের মাথায় ধোঁয়া আগুন দেখতে লাগল। রাজা হুয়েমাক ধোঁয়া উঠতে দেখে আগেই বুঝেছিলেন শুকনো বনে আগুন লেগেছে। আরো বুঝলেন ফ্রান্সিসই আগুন লাগিয়েছে আর এইজন্যেই তাকে চিঠি দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিল। রাজা মৃদু হেসে মনে মনে ফ্রান্সিসকে অজস্র ধন্যবাদ জানালেন।

আগুন বনের দুদিকে অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। এই পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে দাঁড়িয়েও বন্দী আর চোলুলার লোকজনদের গায়ে আগুনের উত্তাপ এসে লাগল। রাজা হুয়েমাক চেঁচিয়ে বললেন–সেতুর ওপারে চলো। সবাই সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে ওপারে চলে গেল। একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা এরমধ্যেই দাঁত দিয়ে কামড়ে হাতের বাঁধা দড়ি ছিঁড়ে ফেলেছিল। সে ছুটে রাজার হাতের বাঁধা দড়ি খুলে দিল। রাজা নিজেই তখন যোদ্ধাদের হাতের বাঁধন খুলে দিতে লাগলেন। সব বন্দীরা মুক্ত হল। সবাই ওখানেই পাথরে মাটিতে বসে পড়ল। জ্বলন্ত বনের দিকে তাকিয়ে রইল।

সন্ধে হল। কিন্তু জ্বলন্ত বনের আগুনের আভায় বহুদূর দিনের আলোর মত পরিষ্কার দেখা যেতে লাগল।

বনের আগুন থেকে মাত্র দুজন সৈন্য পালিয়ে আসতে পেরেছিল। একজন বনের বাইরে এসেই মুখ থুবড়ে পড়ে মারা গেল। অন্যজন মাটিতে শুয়ে রইল মড়ার মত। তারও বাঁচার আশা নেই।

ওদিকে ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শাঙ্কো বনের ধার থেকে সরে এসে প্রান্তরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস সেই ভীষণ অগ্নিলীলার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল–এই আগুন থেকে একজনেরও বাঁচার আশা নেই। আমাদের ওপর রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যদের পশুর মত অত্যাচারের প্রতিশোধ তাহলে নিতে পারলাম। উফ–আমার ঘুম পাচ্ছে চলো।

ফ্রান্সিসরা ঘরে ফিরে এল। ফ্রান্সিসের শরীরের দুর্বলতা তখনও কাটেনি। ও ঘরে ঢুকেই বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং একটুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। গত রাতে কারোর ঘুম হয়নি। হ্যারি আর শাঙ্কোও শুয়ে পড়ল।

রাত বাড়তে লাগল। বনের আগুনের তেজও কমে আসতে লাগল। শেষ রাতের দিকে আগুন অনেকটা স্তিমিত হয়ে এল।

ওদিকে রাজা হুয়েমাক তার প্রজাদের নিয়ে পুয়েবেলা নদীর সেতুর ওপাশে বসে রইলেন। আগুনে পোড়া বনের ওপর দিয়ে চোলুলায় ফেরা অসম্ভব। সারারাত কাটল।

ভোর হল। ঘুম ভেঙে গেছে। তখনও ফ্রান্সিস শুয়ে ছিল। হ্যারি ডাক–াণিন-কী করবে এখন?

–রাজা শোক আর তার প্রজাদের চোলুলায় ফিরিয়ে আনবো। কিন্তু বনে আগুন এখনও সম্পূর্ণ নেভেনি। বন ঘুরে আসতে গেলে বহু দূর ঘুরে আসতে হবে। নিদ্রাহীন ক্ষুধার্ত মানুষগুলো কি পারবে? হ্যারি বলল।

এর মধ্যে বৃদ্ধ লোকটি ওদের খাবার দিয়ে গেল। খেয়েদেয়ে ফাঁসিস উঠে দাঁড়াল। বলল-চলো, আগুনের অবস্থাটা দেখে আসি।

তিনজনে ঘরের বাইরে এল। চলল আগুনে পোড়া বনের দিকে। বনের কাছে এসে দেখল তখনও বনের কোন কোন জায়গা থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। কিন্তু কিছু পোড়া কালো গাছ তখনও দাঁড়িয়ে আছে। মাটির ওপর স্থূপাকার শুকনো পাতা পুড়ে গেছে। কিন্তু তখনও ওসব জায়গায় ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছে। কী করে পোড়া বন পার হওয়া যায়? কী করেই বা রাজা হুয়েমাকের কাছে যাওয়া যায়? শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস রাজা হুয়েমাকের আর তার প্রজাদের বিপদ কিন্তু এখনও কাটেনি।

–ও কথা বলছো কেন? হ্যারি জিজ্ঞাস করল।

–ভেবে দেখ–রাজা কালহু যাকান হয়তো সমস্ত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করতে আসেনি। কিছু সৈন্য রাজধানী তুলাতে হয়তো রয়েছে। তারা আগুনের খবর পেয়েছে নিশ্চয়ই। এর মধ্যে তারা রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যদের কী হল নিশ্চয়ই জানতে আসবে। ওরা সশস্ত্র হয়েই আসবে। পুয়েবেলা সেতুর কাছে নিশ্চয়ই রাজা হয়ে মাক ও তার নিরস্ত্র সৈন্য লোকজনদের দেখবে। তখন তারা আক্রমণ করলে কেউ বাঁচবে না। ফ্রান্সিস মন দিয়ে শাঙ্কোর কথাগুলো শুনল। বলল–তুমি ঠিক বলেছো। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজা হুয়েমাক আর তার প্রজাদের এখানে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু কী করে? হ্যারি এতক্ষণ একটা ভাঙা পাথরের বাড়ির দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎ ওর মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল। ও বলল–আচ্ছা ফ্রান্সিস–একটা কাজ করলে হয় না? ঐ ভাঙা বাড়িটা থেকে পাথরের টুকরো এনে যদি পোড়া বনের মধ্যে পেতে আমার এগিয়ে যাই তাহলে বনের শেষে পৌঁছোতে পারবো না? ভেবে দেখ পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে আমাদের পা পোড়ার কোন ভয় নেই। রাজা হুয়েমাক আর তার প্রজারাও ঐ পাথরের ওপর পা রেখে চলে আসতে পারবে। ফ্রান্সিস হেসে বলল-সাবাস হ্যারি। হ্যাঁ এটা সম্ভব। তবে ঐ ভাঙা বাড়িতে যত পাথরের খণ্ড পাবো তাতে কি সবটা বন পেরুনো যাবে?

-কাজটা তো শুরু করি–এগিয়ে তো যাই তারপর দেখা যাবে। হ্যারি বলল।

তিনজনেই কাজে লেগে পড়ল। ফ্রান্সিস বনের ধারে দাঁড়াল। শাঙ্কো ভাঙা বাড়িটা থেকে পাথরের খণ্ড তুলতে লাগল। দিতে লাগল হ্যারির হাতে। হ্যারি সেটা এনে ফ্রান্সিসকে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস পোড়া বনের মধ্যে সেগুলো পাততে লাগল। ফাঁক ফাঁক করে। তারপর পাতা পাথরে পা দিয়ে বনের মধ্যে এগোতে লাগল। কিছুক্ষণ পর পর জায়গা পরিবর্তন করতে লাগল নিজেদের মধ্যে। আস্তে আস্তে বনের মধ্যে বেশ দূরে এগিয়ে গেল ওরা। তখন বেলা হয়েছে। ফ্রান্সিসরা পাতা পাথরে পা রেখে রেখে ফিরে এল। দেখল দুতিনজন আহত ননোয়াক্লা যোদ্ধা উঠে এসে ওদের কাজকর্ম দেখছে। ফ্রান্সিস ভাঙা ভাঙা ওদের ভাষায় বলল–পারবে সাহায্য করতে? আমরা বিশ্রাম করবো। যোদ্ধাদের মধ্যে একজন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর তিনজন যোদ্ধাই ফ্রান্সিসদের মত পাথর পাতার কাজে লেগে পড়ল। ফ্রান্সিসরা একটু বিশ্রাম নিল। তারপর আবার কাজে লেগে পড়ল।

দুপুর হল। বৃদ্ধ লোকটি খাবার নিয়ে এল। খাবার খেয়ে আবার সবাই কাজ শুরু করল।

বিকেলের আগেই ওরা পোড়া বনের প্রায় শেষে পৌঁছে গেল। কিন্তু আর পাথর নেই। ভাঙা বাড়ির পাথর শেষ হয়ে গিয়েছিল আগেই। এখান ওখান থেকে আরো পাথর জোগাড় করেছে, কিন্তু আর ভাঙা পাথর পাওয়া যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস হেঁটে হেঁটে শেষ পর্যন্ত এল। ভালো করে দেখল আর একটুখানি গেলেই পোড়া বন শেষ। ও দেখল এখানকার আগুন নিভে গেছে। রাজা হুয়েমাক ওদের কাঁচা চামড়ার জুতো মত দিয়েছিল। ফ্রান্সিসের পায়ে সেই জুতো। ও পোড়া পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে বাকিটুকু পেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিসের দেখাদেখি হ্যারি শাঙ্কো আর আহত যোদ্ধারাও বাকিটুকু হেঁটে পার হয়ে গেল।

এবার ফ্রান্সিসরা চলল রাজা হুয়েমাকের খোঁজে। পুয়েবেলা নদীর সেতু পেরিয়েই দেখল প্রজাদের নিয়ে রাজা বসে আছেন।

ফ্রান্সিসদের দেখে রাজা হুয়েমাক বেশ আশ্চর্য হলেন। ওরা আগুনে পোড়া বন পার হল কী করে। সব আগুন তো এত তাড়াতাড়ি নিভে যাবার কথা না? রাজা হুয়েমাক কিন্তু ভীষণ খুশী হলেন। উঠে দাঁড়ালেন। ফ্রান্সিসরা কাছে আসতেই ফ্রান্সিসকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রাজার ছেঁড়া পোশাকে তখনও ধুলো রক্ত লেগে রয়েছে। হ্যারি শাঙ্কো যোদ্ধারা সবাই মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানাল। রাজা বললেন–ফ্রান্সিস তোমরা পোড়া বন পেরিয়ে এলে কী করে?

–পাথর ফেলে ফেলে পাথরের ওপর হেঁটে হেঁটে পার হয়েছি। আপনাদেরও সেভাবেই পার হতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ফ্রান্সিস বলল।

–কেন?

রাজা কালহুয়াকানের কিছু সৈন্য হয়তো তুলায় আছে। ওরা রাজার খোঁজে এদিকে আসতে পারে। যে কোন মুহূর্তে। কাজেই আর দেরী করবেন না। আপনি প্রজাদের সেভাবেই নির্দেশ দিন। এদিকে ফ্রান্সিসদের আসতে দেখে সবাই এদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। রাজা হুয়েমাক সকলের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বললেন, পোড়া বন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে পার হতে। রাজার কথা শেষ হতে সবাই ছুটল পোড়া বনের দিকে। সবার আগে বাচ্চা কোলে মায়েদের তারপর স্ত্রীলোকেরা, বাচ্চারা, বৃদ্ধবৃদ্ধারা রওনা হল। যোদ্ধারা গেল তারপর। সবশেষে রাজা ও ফ্রান্সিসরা।

ওরা বনের মাঝামাঝি এসেছে তখনই দেখল দক্ষিণ দিক থেকে ধূলো উড়িয়ে একদল অশ্বারোহী ছুটে আসছে। বোঝাই গেল কালহুয়াকানের যে সৈন্যরা তুলাতে ছিল তারাই রাজার খোঁজে এসেছে। সৈন্যদল পুয়েবেলা সেতুর কাছে এসে দাঁড়াল। এবার একটা একটা করে ঘোড়া হাঁটিয়ে পার করতে হবে। ওরা বোধহয় সেইজন্যেই তৈরী হতে লাগল। ওরা তখনও জানে না রাজা কালহুয়াকান তার সমস্ত সৈন্যসহ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বোঝা গেল ফ্রান্সিসদের আশঙ্কাই সত্য।

সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। সবাই একে একে চোলুলা নগরে ফিরল। আহত রাজা হুয়েমাক এত অত্যাচার দুশ্চিন্তা পরিশ্রম সহ্য করতে পারলেন না। রাজপ্রাসাদের প্রবেশ করবার আগেই পাথরের সিঁড়ির ওপর প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি রাজাকে ধরে ফেললেন। প্রায় অচেতন রাজাকে সিঁড়ির ওপর শুইয়ে দিল। হ্যারিকে বলল–শিগগির রাজবৈদ্যকে ডেকে আনে। হ্যারি কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর রাজবৈদ্যকে পেল। তার হাত ধরে টেনে সঙ্গে আসার জন্যে ইঙ্গিত করল। রাজবেদ্য এল। প্রায় অচেতন রাজার কাছে বসল। পুঁটুলি থেকে ওষুধপত্র বের করল। রাজার কাঁধের ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিল। রাজার কাছেই বসে রইল। ওদিকে রাজা হুয়েমাকের প্রজারা যে যার লুঠ হয়ে যাওয়া বাড়িতে ফিরল। চীনেমাটির বাসনকোসন যা পেল জড়ো করল। শুকনো কাঠ দিয়ে উনুন ধরিয়ে রাতের রান্না শুরু করল। পুরো একটা রাত আর একটা দিন উপবাসী হয়েছে। সবাই ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত।

কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজা হুয়েমাক একটু সুস্থ হলেন। উঠে বসলেন। ফ্রান্সিসরা রাজাকে ধরাধরি করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এল। শয়নঘরে এনে রাজাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। পাহারাদার দুজন সৈন্যকে ঐ ঘরে রেখে ফ্রান্সিসরা নিজেদের ঘরে চলে এল।

রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস রাজার খোঁজ নিতে গেল। দেখল রাজা ঘাস আর পালকের বিছানায় বসে আছেন। তানেকটা সুস্থ এখন। ফ্রান্সিসকে দেখে হেসে বললেন–তোমাদের কাছে আমি আর আমার প্রজারা চিরকালের জন্যে ঋণী রইলাম। ফ্রান্সিস বলল–ওসব থাক। একটা জরুরী কথা আপনাকে বলতে এসেছি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–আপনার প্রাসাদ থেকে রাজা কালহুয়াকান একটা কাঠের সিন্দুমত নিয়ে যাচিছল। কী ছিল ঐ সিন্দুকে? রাজা শাবরে বললেন–জানতাম, আমার ঐ মী অলঙ্কার হীরে মুক্তো কালহয়াকান লুঠ করে নিয়ে যাবেই।

–-কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস নিয়ে যেতে পারেনি। এখন ঐ সিন্দুক নিশ্চয়ই বনের মধ্যে পড়ে রয়েছে। হয়তো সোনা রূপার অলংকার সব আগুনের তাপে গলে গেছে। তবে হীরে মুক্তো দামী পাথর এসব নিশ্চয় রয়েছে। ফ্রাসিস বলল।

–কী হবে ওসব অলঙ্কার মণিমুক্তো দিয়ে। রাজা বললেন।

–ও কথা বলবেন না। ফ্রান্সিস বলল–ভবিষ্যতে আপনার প্রজাদের দলের জন্যে প্রয়োজন পড়বে।

–ও কি আর উদ্ধার করা যাবে?

–কেন যাবে না। আমরাই উদ্ধার করবো। ফ্রান্সিস বলল?

–বেশ-দেখ চেষ্টা করে। রাজা বললেন।

ফ্রান্সিস ঘরে ফিরে এল। রাত একটু বাড়তেই চোলুলার অধিবাসীদের আনন্দ গান নাচ হৈ হল্লা শুরু হল। ওরা বোধহয় ভাবতেও পারেনি এভাবে বন্দী জীবন থেকে, অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচবে। ফ্রান্সিসরা দরজায় দাঁড়িয়ে মশালের আলোয় আলোকিত প্রান্তরে চোলুলার অধিবাসীদের নাচ দেখতে লাগল। গান শুনতে লাগল।

পরদিন ভোরেই খবর রটে গেল যে রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরা আক্রমণ করতে আসছে। ননোয়াক্লা যযাদ্ধাদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। কয়েকজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের ঘরের সামনে এসে ডাকাডাকি করতে লাগল। ফ্রান্সিসরা উঠে পড়ল। বাইরে এসে শুনল আক্রমণের কথা।

ফ্রান্সিস হ্যারি তরোয়াল নিল। শাঙ্কো নিল তীরধনুক। ওরা প্রান্তরে এসে দাঁড়াল। ননোয়াক্লা যোদ্ধারাও ততক্ষণে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

পোড়া বনের ছাই উড়িয়ে কিছুক্ষণ পরেই কালহুয়াকানের সৈন্যরা ঘোড়া ছুটিয়ে এসে পড়ল। প্রান্তরে আসতেই শুরু হল লড়াই। ওরা সংখ্যায় বেশি ছিল না। ওরা হয়তো ভেবেছিল ওদের দেশের অন্য সৈন্যদেরও এখানে পাবে। এসেই দেখল ওদের দেশের একজন সৈন্যও নেই। ওরা বেশ দমে গেল। ননোয়াক্কা সৈন্যরা মরণপণ লড়াই করতে লাগল। শাঙ্কো তীর ছুঁড়ে একটার পর একটা শত্রু সৈন্যকে ঘায়েল করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা হার স্বীকার করল। জনাদশেক বন্দী হল। বেশ কিছু মারা গেল। বাকীরা ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল। চোলুলার অধিবাসীরা যুদ্ধজয়ের আনন্দে চীৎকার হৈ-হল্লা শুরু করল।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাজা হুয়েমাক যুদ্ধজয়ের সংবাদ শুনলেন। কোয়েতজাল দেবতাকে স্মরণ করে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলেন।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস বলল–চলো–রাজা হুয়েমাকের সেই সিন্দুকটা খুঁজতে হবে।

ওরা পোড়া বনের কাছে এল। ফ্রান্সিস ঠিক যেখান দিয়ে রাজা হুয়েমাক ঢুকেছিল সেই জায়গাটা লক্ষ্য করল। সেখান দিয়েই ফ্রান্সিস ঢুকল। পেছনে হ্যারি শাঙ্কো আর কয়েকজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা।

পোড়া বনের মধ্যে কিছুটা গেল ওরা। ফ্রান্সিস প্রত্যেককে একটা করে পোড়া গাছের ভাঙা ডাল নিতে বলল। তাই দিয়ে ছাইয়ের গাদা সরিয়ে সরিয়ে সবাই সেই সিন্দুকটা খুঁজতে লাগল। এক জায়গায় ছাই সরিয়ে হ্যারিই প্রথম দেখতে পেল সিন্দুকটার পুড়ে যাওয়া কোণাটা। হ্যারি চীৎকার করে ডাকল–ফ্রান্সিস এই যে সিন্দুকটা। সবাই ছুটে এল। দেখল সিন্দুকটা সবটা পুড়ে যায়নি। আধ-পোড়া অবস্থায় পড়ে আছে। তবে দেখা গেল ফ্রান্সিস যা বলেছিল তাই হয়েছে। সোনা রূপার অলঙ্কার চাকতি সব গলে সিন্দুকটার গায়েই লেপ্টে আছে। মণিমুক্তোগুলো কালচে হয়ে গেছে। কিন্তু হীরের কোন চিহ্ন দেখা গেল না। ফ্রান্সিসরা ঐ অবস্থাতেই পোড়া সিন্দুকটায় যতগুলি মণি-মুক্তো দামী পাথর ভরল। গলিত সোনা রূপোর পাত কটা হাতে নিল। সব নিয়ে চোলুলায় ফিরে এল ওরা। তারপর রাজপ্রাসাদে রাজার শয়নকক্ষে ঢুকল। রাজাকে সব জিনিস ফ্রান্সিস দিয়ে দিল। রাজা খুশীই হলেন।

দিন সাতেক কেটে গেল। রাজা হুয়েমাক অনেকটা সুস্থ হলেন। রাজা কালহুয়াকান মারা গেছেন। তুলায় এখন রাজা কালহুয়াকানের এক মন্ত্রী শাসনকার্য চালাচ্ছেন। সেদিন তিনি রাজা হুয়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চোলুলায় এলেন। রাজা হুয়েমাককে সবিনয়ে অনুরোধ করলেন স্ত্রোমো দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে। রাজা হুয়েমাক জানালেন তিনি চোলুলার প্রজাদের নিয়েই আনন্দে থাকতে চান। নতুন রাজ্যভার নিতে তাঁর কোন আগ্রহ নেই। মন্ত্রীই যেন শাসন করবার দায়িত্ব নেন। মন্ত্রী দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলেন। তিনি বারবার বলতে লাগলেন স্রোমের রাজা হতে পারে একমাত্র প্রথম কালহুয়াকানের বংশধররাই। সুতরাং রাজা হুয়েমাকই বংশধর হিসেবে রাজা হওয়ার উপযুক্ত। এবার রাজা হুয়েমাক দ্বিধায় পড়লেন। ভেবে পেলেন না কী বলবেন। তাই তিনি বললেন মন্ত্রী যেন দিন কয়েক পরে আসেন। রাজা হুয়েমাক এর মধ্যে ভেবেইতিকর্তব্য স্থির করলেন।

সেদিন সন্ধেবেলা রাজা হুয়েমাক ফ্রান্সিসকে ডেকে পাঠালেন। ফ্রান্সিস রাজপ্রাসাদে এল। রাজা হুয়েমাক কালহুয়াকানের মন্ত্রীর সব কথা বললেন। ফ্রান্সিস বলল–আপনি অবশ্যই স্রোমোর শাসনভার গ্রহণ করুন।

–কী লাভ? এই তো বেশ আছি। রাজা বললেন।

–না মহামান্য রাজা–আপনার মত প্রজাবৎসল মহান মানুষকে ওরা রাজা হিসেবে পেলে ওরা ধন্য হয়ে যাবে। আমরা য়ুরোপীয়রা সভ্য বলে গর্ব করি কিন্তু আমাদের য়ুরোপেও আপনার মত রাজা খুব কমই আছে।

-কিন্তু চোলুলার কী হবে? রাজা বললেন।

–চোলুলাকেও স্রোমো রাজ্যের মধ্যে নিয়ে নিন। রাজধানী স্থাপন করুন তুলাতে। দুদেশের প্রজাই তো এক। তলতেক ভাষাও। কোন অসুবিধের কারণ নেই। আপনার সুশাসনে তলতেক জাতি আরও সভ্য হোক উন্নত হোক। এটা কি আপনিও চান না? ফ্রান্সিস বলল। রাজা হুয়েমাক ফ্রান্সিসের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন-বেশ ওদেশের মন্ত্রীকে সে কথাই বলবো।

–মহামান্য রাজা–আমার কয়েকটা কথা বলার আছে?

–বলো। তুলার বিষাক্ত উপত্যকার নীচে প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধনের খোঁজ আমরা পেয়েছি।

-বলো কি। রাজা আশ্চর্য হয়ে বললেন–কতকাল ধরে ঐ গুপ্তধনের সন্ধ ন চলছে আর তুমি তার খোঁজ পেয়ে গেছো?

–হ্যাঁ–যাজক ব্ৰেণ্ডনের একটা ছড়ার মধ্যে সাংকেতিক নির্দেশ ছিল। আমি তার সাহায্যেই এগিয়েছি। এখন মাত্র একটা সংকেত বাকি। আমি নিশ্চিত সেই সংকেতের অর্থ বার করতে পারবো যদি আপনি আমাদের অনুমতি দেন। ফ্রান্সিস বলল।

-ঐ গুপ্তধনের ওপর আমার কোন লোভ নেই।

–তা জানি। কিন্তু প্রথম রাজা কালহুয়াকানের বংশধর হিসেবে ঐ গুপ্তধন আপনারই প্রাপ্য।

-ঠিক আছে। দেখ যদি খুঁজে বের করতে পার। রাজা বললেন।

–আমরা ঠিক গুপ্তধন আবিষ্কার করতে পারবো। তবে একটা অনুরোধ আপনি তো এখন সুস্থ। আপনি তুলাতে আসুন এটাই আমরা চাই।

–বেশ। স্রোমের শাসনভার নিলে তুলাতে তো আমাকে যেতেই হবে। রাজা বললেন।

রাজাকে সম্মান জানিয়ে ফ্রান্সিস চলে এল।

পরদিন রাজা কালহুয়াকানের মন্ত্রী তুলা থেকে এলেন। রাজা হুয়েমাক রাজ্যের শাসনভার গ্রহণে সম্মতি জানালেন। বললেন পরদিন সকালে তিনি তুলায় যাবেন। তার সঙ্গে যাবে শুধু ছজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা আর তিনজন বিদেশী বন্ধু। কোন রকম জাঁকজমক যেন করা না হয়। তিনি প্রথমে তুলার কোয়েতজাল মন্দিরে যাবেন। পূজা দেবেন। তুলার অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন। তারপর সিংহাসনে বসবেন।

পরদিন সকালে রাজা হুয়েমাক রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন। একটা সুসজ্জিত ঘোড়াতে উঠলেন। দুপাশে তিনজন করে ননোয়াক্লা অশ্বারোহী যোদ্ধা রইল। পেছনে তিনটে ঘোড়ায় ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কো।

রাজা হুয়েমাককে সামনে রেখে যাত্রা শুরু হল। রাজা খুবই সাধারণ পোশাক পরেছেন। দেহে কোন অলংকার নেই। শুধু মাথায় গোঁজা পাখির পালকগুলো যা জমকালো। প্রান্তর পোড়া বন পেরিয়ে রাজাকে নিয়ে সবাই এল পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে। সবাই ঘোড়া থেকে নামল। ঘোড়াগুলো হাঁটিয়ে পার করানো হল। তারপরই স্ত্রোমো রাজ্য। মন্ত্রী ও কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে অপেক্ষা করছিলেন। তারা মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানালেন। তারপর রাজার পেছনে পেছনে চললেন তুলার দিকে।

তুলায় প্রবেশের মুখে দাঁড়িয়েছিল নানারঙের পোশাক পরা কয়েকটি মেয়ে। তারা রাজাকে সম্মান জানিয়ে অনেক ফুল ছড়িয়ে দিল। একদল পুরুষ কাছিমের খোলের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নেচে নেচে চলল।

কোয়েতজাল মন্দিরের সামনে এসে সবাই ঘোড়া থেকে নামল। পুরোহিত মন্দিরের সিঁড়ির ওপরই দাঁড়িয়েছিল। সে ফুল ফল ছড়িয়ে জোরে জোরে কী আওড়াতে লাগল। রাজা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। পুরোহিত থামল। রাজা মন্দিরে ঢুকলেন। বুনো ফল, ফুল পাতা দিয়ে কোয়েতজালের পুজো করলেন। তারপরে বাইরে এসে দাঁড়ালেন মন্দিরের সিঁড়ির মাথায়। ততক্ষণে সামনের প্রান্তরে তুলার অধিবাসীদের ভীড় জমে গেছে। অধিবাসীরা অনেকেই মুখে থাবড়া দিয়ে শব্দ করে আনন্দ প্রকাশ করেছিল।

রাজা হুয়েমাক দুহাত ওপরে তুললেন। সব কোলাহল বন্ধ হয়ে গেল। রাজা হুয়েমাক হাত নামিয়ে বলতে লাগলেন-আমার প্রিয় সন্তানতুল্য প্রজাগণ–এই দেশের শাসনভার আমি এইজন্যে নিলাম যাতে আরো মানুষের মঙ্গল আমি করতে পারি। দুটো নির্দেশ আমার–কয়েদঘর বলে এখানে কিছু থাকবে না। যেটা আছে। সেটা হবে মেয়েদের তাঁতঘর। দুই–কোয়েতজালের মন্দিরে নরবলি প্রথা আমি বন্ধ করে দিলাম। কোয়েতজাল শুধু মৃত্যুর দেবতা নয় জীবনেরও দেবতা। মূল্যবান সম্পদ, খ্যাতি যশ, রাজ্যজয়, সম্মান, প্রতিপত্তি এসব নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ভাবি না। আমার চিন্তা একটাই–প্রজাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যবিধান, আর দেশের উন্নতি। রাজার কথা শেষে তুলার অধিবাসীরা আনন্দধ্বনি দিল।

তারপর রাজা হুয়েমাক ফ্রান্সিসদের ও মন্ত্রী গণ্যমান্যদের নিয়ে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন।

রাজা হুয়েমাক সিংহাসনে বসলেন। দুপাশে মোটা নক্সাকরা কাপড়বিছানো কাঠের আসনে বসলেন আগের মন্ত্রী আর তুলার : গণ্যমান্যরা।

ফ্রান্সিসরা রাজার সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস রীতিমাফিক শ্রদ্ধা। জানিয়ে বলল–মহামান্য রাজা আমাদের জাহাজে ফেরার সময় হয়েছে। এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। এখন আমরা প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তভাণ্ডার খুঁজতে যাচিছ। আপনি অনুমতি দিন।

–বেশ যাও। প্রয়োজন হলে আমার যোদ্ধাদের নিয়ে যেতে পারো?

–তার দরকার হবে না।

ফ্রান্সিসরা রাজসভা থেকে চলে এল। প্রাসাদের বাইরে এসে চলল কোরেতজালের মন্দিরের দিকে। মন্দিরে ঢুকে মূর্তির পেছনে এল ওরা। দেখল আগের মতই পাথর সরানো আছে। কেউ সুড়ঙ্গপথের মুখ বন্ধ করেনি। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো, মশাল নাও। শাঙ্কো মন্দির থেকে দুটো জ্বলন্ত মশাল নিয়ে এলো।

মশালের আলোয় সিঁড়ির পথ দেখে দেখে ওরা আস্তে আস্তে নাল। নীচে সিঁড়ির কাছে তিনটি কুড়ুল পাওয়া গেল। রাজা কালহুয়াশনের সৈন্যরা সেদিন পালাবার সময় ফেলে গেছে। ফ্রান্সিস দুটো কুণ্ডুল হাতে নিল। আর একটা দিল হ্যারিকে।

ধুলোভরা পাথুরে মেঝে দিয়ে ওরা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল। দেখল প্রথম খোঁদলটা থেকে বিষাক্ত জল ফোঁটা ফোঁটা পাথরের সিঁড়িটির ওপর পড়ছে। বারিনথাসের মৃতদেহ নেই। হয়তো বিষাক্ত জলে, গলে গেছে। হয়তো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিষাক্ত জল বা সিঁড়ি গড়িয়ে আসছে তাই নীচের ধুলোয় শুষে যাচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে ওরা দ্বিতীয় খোঁদলটার কাছে এল। মাথা উঁচু করে ফ্রান্সিস দেখল সেই একই রকম খোঁদল। পাথরের সিঁড়ি খোঁদল পর্যন্ত উঠে গেছে। হেঁটে হেঁটে তৃতীয় খোঁদলের কাছে এল। সেই একই রকম খোঁদলটা পর্যন্ত পাথরের সিঁড়ি উঠে, গেছে। ফ্রান্সিস বলল–এবার ফিরবো। শেষ সমাধান এখনও বের করতে পারিনি। কিন্তু সেই সমাধান এখানেই পাবো। তোমরা পাথরের ছাত দেয়াল মেঝের দিকে ভালো করে নজর রাখো। মুর্তির ভাঙা বাঁ হাতটা এখনো পাইনি। আস্তে আস্তে ফিরে চললো। ভাঙা বাঁ হাতটা পেতেই হবে।

ওরা ধুলোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরতে লাগল। তীক্ষ্ণ নজর রাখলো চারদিকে। ফ্রান্সিস মুখে মুখে ছড়ার শেষটুকু আওড়াতে লাগল–এক হাত ধুলিময়। মাঝখানের সিঁড়ির কাছে এসে ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–হ্যারি–দেখ তো ওটা কী? মশালের আলোয় দেখা গেল ধুলোর মধ্যে থেকে কী যেন একটু উঁচু হয়ে আছে। ফ্রান্সিস ধুলো ঠেলে তাড়াতাড়ি ওখানে এল। দেখল একটা হাত ধুলোয় পোঁতা। হাতের তর্জনীটা ওপরের দিকে উঁচিয়ে আছে যেন কিছু নির্দেশ করছে। ফ্রান্সিস তর্জনীর নির্দেশ লক্ষ্য করল। দেখল তর্জনীটা নির্দেশ করছেওপরে সেই দ্বিতীয় গোল খোঁদলটা। ফ্রান্সিস ঐ দিকে তরোয়াল উঁচিয়ে চীৎকার করে বলল–হ্যারি ঐ যে গুপ্তধন।

–কী করে বুঝলে?

–এই হাতটাই কোয়েতজাল দেবতার ভাঙা বাঁ হাত যেটা আমরা খুঁজছিলাম। একবার ছড়াটা মনে করো

এক হাত ধুলিময়
মুখ নয় কথা কয়
আঙুল তুলে হে–

ঐ দেখ হাতের তর্জনীটা ঐ গোলমত খোঁদলটার দিকেই ইঙ্গিত করছে কিনা ফ্রান্সিস বলল।

তারপর ফ্রান্সিস তরোয়াল কোমরে গুঁজে হাতের কুড়ুলটা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেল। হ্যারি হাত বাড়িয়ে ওকে আটকাল। বলল–যদি কুল চালালে গোল জায়গাটা ভেঙে গিয়ে বিষাক্ত উপত্যকার জল নেমে আসে।

–অসম্ভব। আমি নিশ্চিত ওখানেই রয়েছে গুপ্তধন।

–বেশ–সবাই একসঙ্গে উঠবো। একসঙ্গেকুল চালাবো। মরতে হয় তিনজন একসঙ্গে মরবো। হ্যারি বলল।

–আমরা মরবো না হ্যারি। ফ্রান্সিস বলল।

–না। বারিনথাসের ভয়াবহমৃত্যু আমরা দেখেছি। তোমরাও যদি-না ফ্রান্সিস–যা করবার একসঙ্গে করবো। ্যরি বলল।

সিঁড়িটা প্রশস্ত নয়। তিনজন কোনরকমে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে উঠতে লাগল। গোলমত খোঁদলটার কাছে উঠে এল। শাঙ্কো হাতের মশাল পাথরের খাঁজে আটকাল। তারপর তিনজন একসঙ্গে ঐ জায়গায় কুড়ুলের ঘা দিল। পাথর কুচি ঝরে পড়ল ওদের মাথায় গায়ে। আবার কুড়ুল চালাল। আবার পাথর কুচি ঝরে পড়ল। তারপর হ্যারি ও শাঙ্কো কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিস দেহের সমস্ত শক্তি একত্র করে হঠাৎ সজোরে ও জায়গাটায় কুড়ুলের ঘা মারল। ওর কুড়ুলের ফলাটা কীসের মধ্যে ঢুকে গেল। ফ্রান্সিস বলে উঠল-হ্যারি, যেটাকে পাথর বলা হয়েছে সেটা আসলে পাথর নয়। খুব সম্ভব কাঠ আর সেটা রাখা হয়েছে ঠিক বিষাক্ত উপত্যকার মাঝখানে।

আবার তিনজনে কুড়ুল চালাল। কুড়ুলের ফলা বসে যেতে লাগল। ভেঙে পড়ল কাঠের টুকরো। ফুটো হয়ে গেল আর সেখান থেকে গড়িয়ে পড়তে লাগল হীরে মোতি চুনী পান্না–দামী দামী সব পাথরের টুকরো। ফ্রান্সিস চীৎকার করে বলল–হ্যারি প্রথম কালহুয়াকান রাজার গুপ্তধন। এবার তিনজনেই উৎসাহের সঙ্গে কুড়ুল চালাতে লাগল। কাঠ কেটে কঁকটা বড় হল। ঝর ঝর করে হীরের টুকরো, পান্না চুনী সোনার চাকতি পড়তে লাগল। সিঁড়িতে জমা হতে লাগল সেসব। হঠাৎ গড়িয়ে পড়ল কোয়েতজাল দেবতার দুফুটের মত উঁচু একটা সোনার মূর্তি। মূর্তির দুচোখ দামী পাথরের। সারা গায়ে হীরে মণিমাণিক্য বসানো। মন্দিরে যে মূর্তি আছে অবিকল তেমনি দেখতে এই মূর্তি। ফ্রান্সিস মূর্তিটায় হাত দিল না। ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপার। রাজা হুয়েমাক হয়তো বিধর্মী মূর্তি স্পর্শ করেছে বলে মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন।

ফ্রান্সিস বলল–আর কাটার দরকার নেই। শাঙ্কো–রাজা হুয়েমাককে গিয়ে সব বলো। উনি যেন জনাকয়েক ননোয়াক্লা যোদ্ধা নিয়ে এখানে আসেন। শাঙ্কো চলে গেল। ফ্রান্সিস মণিমাণিক্য ছড়ানো সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ পরে রাজা হুয়েমাক এলেন। সঙ্গে কয়েকজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা। ফ্রান্সিস সিঁড়ি থেকে নেমে এল। রাজা হুয়েমাক অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন সিঁড়িতে ছড়ানো মণিমাণিক্য। ফ্রান্সিস বলল–মহামান্য রাজা–আমরা বিধর্মী তাই কোয়েতজাল দেবতার ভাঙা বাঁ হাত, এই মূর্তি দুইনি। এবার আপনি যা করার করুন।

রাজা হুয়েমাক ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরলেন। আনন্দে তার চোখে জল এসে গেল। অরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন–সাবাস ফ্রান্সিস।

রাজা যযাদ্ধাদের নির্দেশ দিলেন ওপরের কাঠের আস্তরণ সব ভেঙে ফেলতে। একজনকে বললেন কাপড়ের বস্তা আনতে। যোদ্ধারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। কাঠের আস্তরণ কুড়ুল চালিয়ে ভাঙতে লাগল। আরো মণিমাণিক্য হীরে চুনী পান্না পড়তে লাগল। যোদ্ধাটি কাপড়ের বস্তা নিয়ে ফিরে এল। কাপড়ের বস্তায় সব ভরা হতে লাগল।

ফ্রান্সিস বলল–মহামান্য রাজা–আমাদের কাজ শেষ। এবার আমরা গেরুয়া পাহাড়ে যাবো। সেখান থেকে জাহাজে। আপনি এক জন পথপ্রদর্শক আমাদের সঙ্গে দিন।

–নিশ্চয়ই। রাজা আস্তে আস্তে সিঁড়ির কাছে গেলেন। কোয়েতজালের ছোট মূর্তিটা তুলে নিলেন। তারপর মুর্তিটা ভালো করে দেখলেন। ফ্রান্সিসের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন–ফ্রান্সিস এই দেবমূর্তি তোমাদেরই প্রাপ্য। নাও।

ফ্রান্সিস বুঝে উঠতে পারলো না কী করবে। ও হ্যারি আর শাঙ্কোর দিকে তাকাল। হ্যারি বলল–নাও ফ্রান্সিস। এ তো সম্মানের। ফ্রান্সিস মূর্তি নিয়ে হাত দিয়ে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। রাজা হেসে বললেন–তলতেক জাতির উপাস্য দেবতার মূর্তি। এ মূর্তিকে কখনো অপবিত্র করো না। দেশে ফিরে কোন পবিত্রস্থানে এই দেবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করো।

–নিশ্চয়ই করবো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বলল–মহামান্য রাজা–আমাদের কাজ শেষ। আমরা যাচ্ছি।

ওরা মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে ধুলোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে সুড়ঙ্গের সিঁড়ির কাছে এল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দিরে এল। দেখল পুরোহিত কোয়েতজাল দেবতার ভাঙা বাঁ হাতটা জোড়া দিচ্ছে।

ফ্রান্সিসের মনে কী হল। ও দেবমূর্তির সামনে এসে মাথা নুইয়ে ভক্তিশ্রদ্ধা জানাল। তারপর তিনজনে মন্দিরের বাইরে এল।

সামনের প্রান্তরে ওদের ঘোড়া বাঁধা ছিল। ওরা সেদিকে চলল। একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা মন্দির থেকে ছুটে এসে ওদের কাছে দাঁড়াল। হেসে ফ্রান্সিসের হাতে একটা ছোট কাপড়ের ঝোলামত দিল। ফ্রান্সিস ঝোলার মুখ খুলে দেখল কিছু মণিমাণিক্য। ফ্রান্সিস ঐ ঝোলাতেই মূর্তিটা রাখল। যোদ্ধাটি বলল–সেই পথপ্রদর্শক। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।

চারজনে ঘোড়ায় উঠল। ফ্রান্সিস ঝোলাটা ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে রাখল।

সামনে পথপ্রদর্শক। পেছনে ওরা তিনজন। লাল ধুলো উড়িয়ে ওদের ঘোড়া ছুটল। বিষাক্ত উপত্যকার পাশ দিয়ে যাবার সময় ফ্রান্সিস ঐ দিকে তাকাল। দেখল সেই ধোঁয়াটে ভাব, বেগুনী রঙের ফুল আর মনসা গাছটা। ফ্রান্সিস বলল–জানো হ্যারি ঐ মনসা গাছটাও কাঠের। লোকের চোখে ধূলো দেবার জন্যে ওটা করা হয়েছে।

সামনেই বিস্তৃত প্রান্তর। ঘোড়া ছুটল পূর্বদিক লক্ষ্য করে। গেরুয়া পাহাড়ের উদ্দেশ্যে।

– সমাপ্ত –

Facebook Comment

You May Also Like