Saturday, April 4, 2026
Homeবাণী ও কথানটরাজ - দেবারতি মুখোপাধ্যায়

নটরাজ – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

নটরাজ – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

আধভাঙা উঠোনের যেদিকটায় শ্যাওলা জমে কালো জমাট পাঁকের মতো হয়ে গেছে, সেইখানটায় পারতপক্ষে কেউ যায় না, রাতের বেলা তো নয়ই। কোথা থেকে কি বিছেটিছে কামড়ে দেবে, সাপখোপ থাকাও বিচিত্র নয়। রুমকি দু-বার গোটা উঠোনটা খুঁজে গেছে। রিন্টুকে দেখতে পায়নি। আর শুধু দিদি কেন, পৃথিবীর কেউ আর রিন্টুকে দেখতে পাবে না কোনোদিন, দাঁতে দাঁত চিপল রিন্টু।

কালো জমাট পাঁকের মতো স্যাঁতসেঁতে জায়গাটায় গুটিসুটি মেরে বসে ফুলে ফুলে কাঁদছিল ও। ফুলে ফুলে কাঁদার একটা সুবিধা আছে। খুব জোরে কান্নার দমক এলেও খুব কাছে না থাকলে কেউ বুঝতে পারবে না যে ও কাঁদছে। হাঁটুদুটোকে ভাঁজ করে বুকের কাছে নিয়ে বসে দুই হাঁটুর মাঝে মুখ ডুবিয়ে ফোঁপাচ্ছিল রিন্টু। উঠোনের ওপাশের পুকুর থেকে ব্যাঙের আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। রিন্টুর একেবারেই যে ভয় লাগছে না তা নয়, তবু ও উঠছিল না। কনুইয়ের আর পিঠের কেটে যাওয়া অংশটা যত ফুলে উঠছিল, জ্বালাটাও ততই বাড়ছিল, তবু ও উঠছিল না।

দিদি দুবার খুঁজে যাওয়ার পর মা এল। আর মা এমনই একজন, ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেও ঠিক খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যায় রিন্টুকে, ”তুই এই নোংরার মধ্যে বসে আছিস? ইশ, রাজ্যের নোংরা, পোকামাকড় ঘুরছে! শিগগিরই উঠে আয়! খেতে দিয়েছি।”

রিন্টুর ইচ্ছে হল একছুটে গিয়ে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবু ও দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল, ”আমার খিদে নেই। তুমি যাও।”

রিন্টুর মা সুষমা ভালোই জানে তার ছেলের জেদের কথা। ও আর রাগ করল না। সাবধানে পিছল হয়ে থাকা মেঝের ওপর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ছেলের কাছে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, ”রাগ করে না বাবা! বাবা তো ভালোর জন্যই বলে বল?”

এতক্ষণের জেদ আর রাগ মায়ের স্নেহের স্পর্শে মুহূর্তে অভিমানের বৃষ্টি হয়ে দু-চোখের বড় বড় ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়তে শুরু করল, রিন্টু মা-কে জড়িয়ে ধরে বলল, ”ভালোর জন্য? কি ভালোর জন্য, মা? বাবা যে মাঠ থেকে এসে সেদিন রাতে তোমায় ধাক্কা দিল, তোমার পড়ে গিয়ে কপালটা কেটে গেল, সেটা ভালোর জন্য? নাকি আমাকে আজ মারল, আমি কি করেছি, তুমি বল?”

সুষমা ঠোঁট কামড়ে ধরল। বাচ্চাদের সামনে যে আগলগুলো থাকা দরকার, সেগুলো অনেকদিনই এই বাড়ি থেকে ঘুচে গেছে, শুধু দারিদ্রের জন্য নয়, অশিক্ষিত অত্যাচারে, যবে থেকে রমেশ তাড়ির আড্ডায় যাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু সেটা ও পনেরো বছরের ছেলের সামনে প্রকাশ করল না। বাবা, সে যত খারাপই হোক, বাচ্চাদের সামনে তার নিন্দা করাটা ঠিক নয়, সেটা সুষমা তার এইট অবধি পড়া বিদ্যেতেও জানে। শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে সবেমাত্র কৈশোরে পা দেওয়া ছেলের মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ”বাবা সবার বড় রিন্টু। তুই যেটা করছিস, পরে সেটার জন্য তোকে আরো কষ্ট পেতে হবে, তাই জন্য বাবা তোকে এখন থেকেই…!”

রিন্টু কথার মাঝেই ঝাঁঝিয়ে উঠল, ”সে তো এখনো পেতে হয়। দাসপাড়ার রতনদা, নন্টেদা কত প্যাঁক মারে আমায়, টিটকিরি দেয়, আমি কি পাত্তা দিই? কিন্তু পাপিয়া দিদিমনি? আমায় তো কত ভালোবাসে! বলে আমি ঠিকমতো প্র্যাকটিস করলে একদিন অনেক নাম করব। সেটা বুঝি কিছু না? কে কি বলল কি এসে গেল?”

সুষমা ছেলের অবুঝপনায় অস্থির হয়ে ওঠে, ”রিন্টু, তোর পাপিয়া দিদিমনি শহরের মেয়ে। কলকাতায় ওরকম অনেক ছেলেই নাচে। কিন্তু গ্রামে কখনো কাউকে দেখেছিস? হিন্দি গানের সঙ্গে নাচ, ঠিক আছে। কিন্তু ধুতি পরে চোখ এঁকে ওইসব বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে নাচ? দেখেছিস কখনো? রতনরা তোকে আরো জ্বালাবে এরকম করলে। তোর পেছনে লাগবে, মেয়েদের মতো বলে নোংরা কথা বলতে শুরু করবে। আমরা একঘরে হয়ে যাব। তার থেকে এখন থেকেই সরে আয়। তোর বাবা বলেছে তোর ওই দিদিমনিকে গিয়ে বলবে…!”

রিন্টু এবার আহত বাঘের মতো ফুঁসে ওঠে, ”খবরদার মা! বাবা যদি দিদিমনিকে কিছু বলে তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হবে, তুমি দেখে নিও! আর আমি বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে নাচ করি না মা, ওটা কত্থক। বহু পুরনো নাচ এটা। আর তুমি বলছ এটা মেয়েদের নাচ? জানো এটা আসলে কৃষ্ণের নাচ? আর আগেকার দিনে ছেলেরাই এটা বেশি নাচত। অজন্তা ইলোরা, সব প্রাচীন গুহায় তাঁদের ছবি আছে। আর আমার নাচতে ভালো লাগে, মা! তাই বলে আমি মেয়ে কেন হব? উদয়শঙ্কর কি মেয়ে ছিলেন? সারা পৃথিবী আজ ওঁকে এই নাচের জন্যই চেনে!”

সুষমা মনে মনে নিজের অজ্ঞতায় একটু থমকে যায়। রিন্টু যেটা নাচে, সেটা কেষ্টঠাকুরের নাচ? আর যার নাম রিন্টু করল, তাকে সে চেনে না। নিশ্চয়ই বিখ্যাত কেউই হবে। ও নরম গলায় বলল, ”তোকে এসব গল্প কে করে? তোর ওই দিদিমনি?”

রিন্টু এবার একটু খুশি হয়, বলে, ”হ্যাঁ, দিদিমনি বলে। আমি বইও পড়েছি। জানো মা, আমার নাচতে খুব ভালো লাগে। রামায়ণ মহাভারতের কতরকম গল্পের সঙ্গে কতরকম ভঙ্গি করতে হয় মা…!”

সুষমা ছেলের অতি উৎসাহে বলা কথাগুলো অন্যমনস্ক হয়ে শুনে চলেছিল। মাথায় অন্যদিকে ঘুরছিল আসন্ন ঝড়ের ভয়। রমেশ আজ মেরেছে, এরপর কোনদিন রক্তারক্তি ঘটাবে, তার ঠিক নেই। এই অজপাড়াগাঁয়ের মানুষজন কোনো কিছু অন্যরকম দেখেই টিপ্পনী কাটতে ছাড়ে না। সুষমার হঠাৎ বুকটা মুচড়ে ওঠে। কতলোকের ছেলে কত বয়ে যাচ্ছে, দিনরাত বিড়ি ফুঁকছে, গালাগাল করছে, আর তার ভদ্র সভ্য ছেলেটা একটু নাচতে ভালোবাসে, নিজের খেয়ালে নাচে, তাতে লোকের এত চোখ টাটানো কেন? এই তো, পাশের বাড়ির শন্টের মা এসে সেদিন চোখমুখ টিপে হাত ধরে কিরকম ইশারা করে কথা শুনিয়ে গেল, ”না রে তুই তো জানিস না, ওদের বাবা সেদিন বলছিল এরকম কিছু কিছু ছেলের দোষ হয়। বয়স থাকতে থাকতে ডাক্তার দেখালে সেরেও যায়। তোরা ডাক্তার দ্যাখা, সুষমা! নাহলে দেখবি কোনদিন ওরা খবর পেয়ে এসে ধরে নিয়ে যাবে।”

সুষমা কিছু বলতে পারেনি, চুপচাপ হজম করেছে গায়ে জ্বালা-ধরানো কথাগুলো। বলতে পারেনি যে তুমি নিজের চরকায় তেল দাও গে যাও দিদি! তোমার ছেলে দুলেদের মাঠে গিয়ে নেশা করে চুর হয়ে পরে থাকে। বলতে পারেনি কিছুই। লোকের আঁতে ঘা দিয়ে কথা ও কিছুতেই বলতে পারে না কোনোদিন। ক্লান্ত চোখে ও দূরের গোয়ালের গোরুটার দিকে তাকায়। কলকাতা থেকে রিন্টুদের ইস্কুলে পড়াতে আসা ওই দিদিমনি একদিন সুষমাকেও বুঝিয়েছিল, ”দিদি আপনি বুঝতে পারছেন না, রিন্টুর মধ্যে একটা জন্মগত প্রতিভা আছে ক্লাসিক্যাল নাচে। এটা নষ্ট করবেন না প্লিজ! ওকে উৎসাহ দিন। দেখবেন, ও অনেকদূর যাবে। ওর নাচই আপনাদের জীবনটা পালটে দেবে।”

সুষমার হঠাৎ গোয়ালে আপন খেয়ালে জাবর কেটে যাওয়া মঙ্গলার মতোই নিজেকে অসহায় মনে হয়। মঙ্গলার মতো ও নিজেও রমেশের পোষা প্রাণী ছাড়া আর কি? গোরুটাও যেমন সারাদিন মাঠে লাঙল টেনে, দুধ দিয়ে খেতে পায়, ও-ও তেমনি সারাদিন উদয়াস্ত খেটে এই বাড়িতে থাকতে পড়তে পারছে। ওর কথার দাম কি এই বাড়িতে? এই যে রুমকির পড়ায় মাথা নেই, ও বলেছিল মেয়েটা সেলাই করতে ভালোবাসে, আঁকার হাতও আছে, ওকে বরং ওইসব শেখাও, আর কিছু না হোক, নিজেরটা নিজে চালাতে পারবে, যেটা বলেনি সেটা হল সুষমার মতো লাথি-ঝ্যাঁটা খেয়ে তো বাঁচতে হবে না। কই, রমেশ শুনল ওর কথা? ফুতকারে উড়িয়ে দিল। তেমনি আজও তো বলতে গিয়েছিল ওই দিদিমনির শেখানো মতো। আর সত্যিই তো, আপত্তির কোনো কথাও নয়। সপ্তাহে একদিন কলকাতায় রিন্টুকে নিয়ে যাবে ওই দিদিমণির যে দিদিমণি, তার কাছে ক্লাস করাতে, তার নাকি অনেক নাম। টাকাও দিতে হবে না। কিন্তু কি হল? মাঝখান থেকে ছেলেটা শুধুশুধু মার খেলো।

আজ বোধ হয় তাড়ির নেশাটা একটু বেশিই চড়েছিল রমেশের। ছেলেটাকে বেধড়ক পেটাতে পেটাতে যে গালাগালগুলো দিচ্ছিল সেগুলো অতি বড় শত্রুকেও মানুষ দেয় না। মারতে মারতে চিৎকার করছিল, ”শালা হিজড়ে কোথাকার! কানে দুল পরে ঘাগরা পরে নাচার শখ হয়েছে তোর? শালা আমি লজ্জায় পাড়ায় মুখ দ্যাখাতে পারছি না, আর ইনি যাবেন কলকাতায় খ্যামটা নাচতে? প্যাঁদানিতে চোর চুরি করা ভুলে যায় আর তোর এই রোগ সারবে না?” সঙ্গে উপযুক্ত সঙ্গত দিচ্ছিল সুষমার ভাসুরের ছেলে অজয়। ভাইয়ের নাচে তার ঘোরতর আপত্তি। পড়াশুনোয় ভালো, তার দেমাকও খুব।

সুষমার হঠাৎ হুঁশ হতে দ্যাখে, রিন্টু কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, চোখের দু-পাশ থেকে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে মাঝপথেই শুকিয়ে গেছে। সুষমা তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবে, মাঝপথে শুকিয়ে যাওয়া চোখের জলটা যেন বালির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটা নদী। এমন কত নদী যে ওর মনের মধ্যে শুকিয়ে গেছে! সেই একই জিনিস ছেলেটার সাথেও হবে?

পরের দিন সুষমা স্কুলে গিয়ে দেখা করল পাপিয়া দিদিমণির সঙ্গে।

দিনচারেক বাদে রমেশ যখন মাঠ থেকে ফিরে শুনল, রিন্টু এবারেও ফেল করাতে ওদের ইস্কুলেরই একটা মাস্টার ওকে কলকাতা নিয়ে গেছে তার কোন আত্মীয়র বাড়িতে খাওয়া-পড়ার কাজে, যতটা গণ্ডগোল করবে ভেবেছিল, সেরকম কিছুই করল না। সুষমা মার খাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে ছিল, কিন্তু রমেশ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে মুড়ি লংকা চিবোতে চিবোতে অজয়কে বলল, ”ভালোই হয়েছে! এখানে থাকলে ওই দিদিমণিটা ওর মাথা খেত। আমাকেও লোকজন ঢিল ছুড়ত। তার চেয়ে নিজে করেকম্মে খাক।”

সুষমা শেষবেলায় গোরুটাকে একটু জল দিচ্ছিল। নিজের মনেই হাসি পেল ওর। দিনরাত বউ-ছেলে-মেয়েকে পেটালে লোকে এখানে ঢিল ছোড়ে না, এদিকে ওর ভালোমানুষ নরম ছেলেটা সুন্দর গানের সঙ্গে নাচে, তাতে নাকি লোকের ঢিল ছোড়ার জন্য হাত নিশপিশ করে!

পাশে বসে থাকা অজয় টিপ্পনী কাটল, ”যাই বল কাকা, আমার ভাই হয়ে কিনা লোকের বাড়ি চাকরের কাজ করবে, বন্ধুদের কাছে মুখ দ্যাখাবো কি করে?”

মাসদুই পরে রিন্টু প্রথম টাকা পাঠাল। সাতশো টাকা। সুষমা কাঁপা কাঁপা হাতে জলভরা চোখে পাপিয়া দিদিমণির ফোন থেকে ফোন করল, ”তুই কেমন আছিস বাবা? খাওয়াদাওয়া করছিস ঠিকমতো?”

ওপাশ থেকে রিন্টুর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ”আমি খুব ভালো আছি মা! এখানে আমি মাসিমনির কাছে নাচ শিখি, টুকটাক কাজও করি। তুমি বিশ্বাস করবে না মা, এখানে আমার মতো কত দাদারা আছে কি ভালো নাচে জানো?”

সুষমা হাসল। এই ক-দিনেই ছেলের গলা ভেঙে পুরুষালি ভাব এসেছে। কে বলে তার ছেলে হিজড়ে? তার ছেলে হিজড়ে হলে কেষ্টঠাকুর নিজেও হিজড়ে বলতে হয়। ও অস্ফুটে বলল, ”ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করিস।”

দিন যায়, মাস যায়, ঘোরে বছরও। মাঝে রিন্টু বারচারেক বাড়ি এসেছে। বাপের সাথে কথা বলেনি বিশেষ, মায়ের সাথেই দিনরাত গুজগুজ ফুসফুস। তাতে রমেশ খুব একটা রাগ করেনি, বেশ চেহারা হয়েছে ছেলের। পেটানো জোয়ান চেহারা। রক্তবের হওয়া কাশির সাথে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে দাওয়ায় বসে রমেশ আড়চোখে ছেলেকে দ্যাখে আর ভাবে, নাহ এই একটা কাজ সুষমা সত্যিই ভালো করেছিল, ওই নাচনি মাস্টারনিটার কবল থেকে ছেলেটাকে বাঁচিয়ে! নিজের কড়া হাতে রাশ ধরার ওপরও গর্ব হয় রমেশের, ওরকম শক্ত হাতে ছেলেকে শাসন করেছিল বলেই না আজ তার জোয়ান ছেলে দু-হাতে টাকা রোজগার করছে! কোনো বড় কারখানায় নিশ্চয়ই কাজ করে, এত ভালো কামাই যখন!

অজয় প্রথম প্রথম রিন্টুকে চাকর বলে ঠেস দিত, ইদানীং আর দেয় না। বারো ক্লাস পাশ করে আর এগোতে পারেনি অজয়, টুকটাক টিউশানি ছাড়া কিছু জোটাতেও পারেনি। সংসার ওই রিন্টুর টাকাতেই চলছে যে!

এবার যাওয়ার আগে রিন্টু মা-কে আড়ালে নিয়ে যায়, ”এবার অনেক দিন আসতে পারব না মা! মুম্বাই যাচ্ছি একটা বড় কম্পিটিশনে। মাসিমনির আমার ওপর অনেক আশা। আমাকে বলেছে, রিন্তু, এই নাচের স্কুলের মাস্টার হয়ে থাকলে কিন্তু চলবে না। এই খুচখাচ প্রোগ্রাম আর মাস্টারিতে ক-টাকাই বা আয়। একটা কোনো বড় কোরিওগ্রাফারের নজরে পড়তে পারলে……! ঘুরে আসি, এসে তোমাকে কলকাতা নিয়ে যাবো। সাবধানে থেকো।”

*

রিন্টু চলে যাওয়ার প্রায় তিন মাস বাদে একদিন সুষমাকে পাপিয়া স্কুলে ডেকে পাঠাল। মুখে উজ্জ্বল হাসি, উত্তেজনায় চোখ জ্বলজ্বল করছে, ”রিন্টু সারা ভারতের মধ্যে প্রথম দশে পৌঁছে গেছে দিদি! এবার শুধু দরকার আমাদের সবার প্রার্থনা! জিততে পারলে পঁচিশ লাখ টাকা পাবে রিন্টু, তার সাথে ওর কেরিয়ার তৈরি। ভাবতে পারছেন?”

সুষমা মাথামুন্ডু কিছুই বোঝেনা, ঘোমটার একটা খুঁট দাঁতে চেপে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। ওর বিস্মিত মুখ দেখে পাপিয়া অবাক হয়ে যায়, ”একি, আপনি কিছু জানেন না? না ওর বাবার ভয়ে কাউকে কিছু বলেননি!”

আর একমাসের মধ্যে অবশ্য সারা গ্রাম তো দূর, গোটা বর্ধমান জেলাই জেনে গেল। এত প্রত্যন্ত গ্রামের একটা ছেলে, এতবড় নাচের কম্পিটিশনে নাচছে, শাহরুখ, সলমনের মতো হিরো, যাদের এখানকার মানুষজন অন্য গ্রহের মানুষ ভাবে, সেই অত বড় বড় স্টারেরা এখানকার ছেলেটার পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে, গোটা গ্রামে হইহই পড়ে গেছে। অজয় আজকাল পড়িয়ে এসেই টিভি খুলে ফ্যালে, আরো অনেক ছেলে এসে জোটে সেদিন তারা যাকে টিটকিরি মারত, তার নাচ দেখতে। তার প্রশংসায় সিটির হুল্লোড় পড়ে যায় উঠোনে। আগে টিভি ছিল না। কয়েক মাস আগে রিন্টু পাঠিয়েছিলো। পাড়ার ছেলেদের আড্ডা এখন ডকে, সারাক্ষণ রিন্টুকে নিয়ে তারা মশগুল। রতন, নন্টের মতো কিছু অত্যুৎসাহী ছেলে ছোট ছোট ফেস্টুন ছাপিয়ে সারা গ্রামে টাঙিয়ে দিয়েছে, ”আমাদের খড়মপুর গ্রামের গর্ব, আমাদের সবার আদরের ভাই রিন্টু আজ লড়ছে ভারতের সেরা ড্যান্সার হতে, আপনারা সবাই ভোট দিয়ে আমাদের রিন্টুকে জয়ী করুন…।” এরকম সব ফেস্টুন।

ফাইনালের আগে একদিন কলকাতার দুজন রিপোর্টার এল বাড়িতে। রমেশ দাওয়ায় বসে বিড়ি টানছিল। মাঠে যাওয়া অনেক কাল ছেড়ে দিয়েছে, শরীরও দেয় না, আর দরকারও হয় না। কাশিটাও বেড়েছে।

রিপোর্টার মেয়েটা মাইক হাতে জিজ্ঞেস করল, ”আচ্ছা সেমিফাইনালে আপনার ছেলের যে নটরাজ পারফরম্যান্সে সারা দেশ মুগ্ধ হয়ে গেছে, আপনি বাবা হিসেবে কতটা গর্ববোধ করছেন? কেমন লাগছে আপনার?”

রমেশ কাশি চেপে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ইদানীং তার ছেলেকে নিয়ে এত নাচানাচি, এত হুল্লোড় সব ওই নাচের জন্য! তার বিশ্বাস হয় না। কিন্তু সে নিজের চোখে দেখেছে টিভিতে, কত বড় স্টেজে তার ছেলে নাচছে। পাশ থেকে অজয় মুখ বাড়ায়, সে ভালো করে চুল আঁচড়ে এসেছে, বলে, ”আমাদের খুবই ভালো লাগছে। কিন্তু এটা তো আমরা জানতামই। ছোট থেকেই রিন্টু, মানে আমার ভাই অসাধারণ নাচে। আমরা সবাই তাই ওকে ছোট্ট থেকে এই দিকে অনেক উৎসাহ…।”

মেয়েটা বলে, ”আচ্ছা, ইতিমধ্যেই উনি অনেক কটা বড় বড় অফার পেয়ে গেছেন। ইদানীং কালের ওয়েস্টার্ন ড্যান্সের মাঝে যেভাবে উনি আমাদের ক্ল্যসিকাল ঘরানাকে সারা দেশের সামনে তুলে ধরেছেন, তাতে সবাই মুগ্ধ। এত প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ওই জায়গায় যাওয়ার জার্নিটা ওঁর কেমন ছিল, দাদা হিসেবে একটু যদি শেয়ার করেন।”

সুষমা দূরে দাঁড়িয়ে গোরুকে জল দিতে দিতে নিজের মনে হাসে। অজয়ের সাথে চোখাচোখি করতে পারে না, পাছে ছেলেটা লজ্জা পায়। দূরে চোখ চলে যায় সেই শ্যাওলা পড়া স্যাঁতস্যাঁতে উঠোনটার দিকে, মনে পড়ে যায় বছরকয়েক আগের মা-ছেলের সেই রাতের কথা। মঙ্গলার গলায় আলতো আদর করতে করতে মুখে খড় ঠুসে দিতে দিতে সে ভাবে, হাজার লোকের কথা শুনতে শুনতে তারও মনে মাঝে মাঝে ভয় হত, সত্যিই তার ছেলে হিজড়ে নয় তো? কিন্তু আজ আর সে ভয় নেই। সত্যিকারের হিজড়েদের সুষমা এখন চেনে। ভাগ্যিস সে সেই রাতে বালির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া নদীটাকে বাঁচাতে চেয়েছিল!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুষমা হাসিমুখে গলা চড়ায়, ”আপনারা এট্টু বসুন, অ্যাদ্দূর এসেছেন, জলমিষ্টি খেয়ে যাবেন!”

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor