Thursday, April 18, 2024
Homeবাণী-কথাগাভী বিত্তান্ত - আহমদ ছফা

গাভী বিত্তান্ত – আহমদ ছফা

০১-৩. উপাচার্য পদে নিয়োগপ্রাপ্তি

আবু জুনায়েদের উপাচার্য পদে নিয়োগপ্রাপ্তির ঘটনাটি প্রমাণ করে দিল আমাদের এই যুগেও আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ফ্যাকাল্টির সদস্যবৃন্দ আবু জুনায়েদের উপাচার্যের সিংহাসনে আরোহণের ব্যাপারটিকে নতুন বছরের সবচাইতে বড় মজার কাণ্ড বলে ব্যাখ্যা করলেন। আবু জুনায়েদ স্বয়ং বিস্মিত হয়েছেন সবচাইতে বেশি। আবু জুনায়েদের বেগম নুরুন্নাহার বানু খবরটি শোনার পর থেকে আণ্ডাপাড়া মুরগির মতো চিৎকার করতে থাকলেন। তিনি সকলের কাছে বলে বেড়াতে লাগলেন যে তার ভাগ্যেই আবু জুনায়েদ এমন এক লাফে অত উঁচু জায়গায় উঠতে পারলেন । কিছু মানুষ অভিনন্দন জানাতে আবু জুনায়েদের বাড়িতে এসেছিলেন। নুরুন্নাহার বানু তাদের প্রায় প্রতিজনের কাছে তার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর থেকে কী করে একের পর এক আবু জুনায়েদের ভাগ্যের দুয়ার খুলে যাচ্ছে সে কথা পাঁচকাহন করে বলেছেন । অমন ভাগ্যবতী বেগমের স্বামী না হলে, একদম বিনা দেন-দরবারে দেশের সবচাইতে প্রাচীন, সবচাইতে সম্ভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদটি কী করে আবু জুনায়েদের ভাগ্যে ঝরে পড়তে পারে। যারা গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই মুখে কিছু না বললেও মনে মনে মেনে নিতে দ্বিধা করেননি যে একমাত্র স্ত্রী ভাগ্যেই এরকম অঘটন ঘটতে পারে।

শিক্ষক হিসেবে আবু জুনায়েদ ছিলেন গোবেচারা ধরনের মানুষ। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ডিপার্টমেন্টে বা ডিপার্টমেন্টের বাইরে তার সঙ্গে কারো বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল না। আর আবু জুনায়েদ স্বভাবের দিক দিয়ে এত নিরীহ ছিলেন যে তার সঙ্গে শত্রুতা করলে অনেকে মনে করতেন, শত্রুতা করার ক্ষমতাটির বাজে খরচ করা হবে। তাই গোটা বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় তার বন্ধু বা শত্রু কেউ ছিলেন না।

আমাদের দেশের সবচাইতে প্রাচীন এবং সবচাইতে সম্ভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি হাল আমলে এমন এক রণচণ্ডী চেহারা নিয়েছে। এখানে ধন প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা মোটেই নিরাপদ নয়। এখানে যখন তখন মিছিলের গর্জন কানে ঝিম ধরিয়ে দেয়। দুই দলের বন্দুক যুদ্ধে যদি পুলিশ এসে পড়ে সেটা তখন তিন দলের বন্দুক যুদ্ধে পরিণত হয়। কোমলমতি বালকেরা যেভাবে চীনা কুড়াল দিয়ে অবলীলায় তাদের বন্ধুদের শরীর থেকে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে, সেই দক্ষতা ঠাটারি বাজারের পেশাদার কশাইদেরও আয়ত্ত করতে অনেক সময় লাগবে। এখানে যত্রতত্র সে সকল বিস্ময় বালকের সাক্ষাৎ মিলবে যারা কিমিয়া শাস্ত্রের গোপন রহস্য জানার মতো করে সেই চমৎকার রোমাঞ্চকর তথ্যটি জেনে ফেলেছে। রিভলবারের ট্রিগারে একবার চাপ দিলে একটি গুলি বেরিয়ে আসে, সে-একটিমাত্র গুলি একজন মানুষের বুকে আঘাত করে সে মানুষটিকে জগৎ থেকে পত্রপাঠ বিদায় নিতে হয়। উপন্যাস রচনা করা কিংবা উচ্চাঙ্গের ট্র্যাজেডি লেখার চাইতে অনেক সুন্দর এবং কঠিন এই কর্ম। একবার দক্ষতা অর্জন করতে পারলে কাজটি কিন্তু অতি সহজে নিষ্পন্ন করা সম্ভব। সকলের দৃষ্টির অজান্তে এখানে একের অধিক হনন কারখানা বসেছে, কারা এন্তেজাম করে বসিয়েছেন সকলে বিশদ জানে। কিন্তু কেউ প্রকাশ করে না। ফুটন্ত গোলাপের মতো তাজা টগবগে তরুণেরা শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর হনন কারখানার ধারেকাছে বাস করতে করতে নিজেরাই বুঝতে পারেন না কখন যে তারা হনন কারখানার কারিগরদের ইয়ার দোস্তে পরিণত হয়েছেন। তাই জাতির বিবেক বলে কথিত মহান শিক্ষকদের কারো কারো মুখমণ্ডলের জলছবিতে খুনি খুনি ভাবটা যদি জেগে থাকে তাতে আঁতকে ওঠার কোনো কারণ নেই। এটা পরিবেশের প্রভাব। তুখোড় শীতের সময় সুঠাম শরীরের অধিকারী মানুষের হাত-পাগুলোও তো ফেটে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কোনো কাজ অত সহজে হওয়ার কথা নয়। সহজে ভর্তি হওয়ার উপায় নেই, সহজে পাস করে ছাত্ররা বেরিয়ে যাবে সে পথ একরকম বন্ধ। এখানকার জীবনপ্রবাহের প্রক্রিয়াটাই অত্যন্ত জটিল। এই জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে তরুণ-তরুণীর হৃদয়াবেগ পর্যন্ত টকে যাওয়া দুধের মতো ফেটে যায়। একজন তরুণ শিক্ষককে কোনো ছাত্রাবাসের আবাসিক শিক্ষকের রদ্দি মার্কা কাজটি পেতেও জুতোর সুখতলা ক্ষয় করে ফেলতে হয়। কোনো শিক্ষক যখন অবসর নেন, তার বাসাটি দখল করার জন্য শিক্ষকদের মধ্যে যেভাবে চেষ্টা তদবির চলতে থাকে, কে কাকে ল্যাঙ মেরে আগে তালা খুলবে, সেটাও একটা গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে। পরীক্ষার খাতা দেখার বেলায়, কে কার চাইতে বেশি খাতা হাতিয়ে নিয়েছে তা নিয়ে যে উত্তাপ, যে ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলতে থাকে তা একটা স্থায়ী অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা যুদ্ধে নাহি দেগা সূচাগ্র মেদিনী’ এটা একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ বিনা প্রয়াসে বলতে গেলে একরকম স্বপ্ন দেখতে দেখতে উপাচার্যের আসনটি দখল করে বসবেন, সেই ঘটনাটি সকলকে বিস্ময়াবিষ্ট করে ছেড়েছে। আবু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানুর কাহিনীটিকে সঠিক বলে মেনে নিলে মাথা ঘামানোর বিশেষ প্রয়োজন পড়ে না। ধরে নিলাম সতীর ভাগ্যে পতির জয় হয়েছে। তারপরেও ভাগ্যচক্রের হাতিটি কোন পথ দিয়ে আৰু জুনায়েদকে পিঠে করে বয়ে এনে এই অত্যুচ্চ আসনে বসালো তার একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো প্রয়োজন। তা নইলে নবীর মেরাজ গমন, যীশুর স্বর্গারোহণের মতো আবু জুনায়েদের ব্যাপারটি একটি অলৌকিক কাণ্ড বলে মেনে নিতে হবে।

.

০২.

শুরুতে আবু জুনায়েদের দুয়েকটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছি। কিন্তু ও থেকে আবু জুনায়েদ মানুষটি সম্বন্ধে কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত গঠন করা সহজ হবে না। পৃথিবীতে নিরীহ মানুষের সংখ্যাই অধিক। এমনকি আমাদের এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতেও তারা এখনো বিরল প্রজাতির প্রাণীতে পরিণত হয়ে যাননি। তত্ত্ব-তালাশ করলে আরো দু-পাঁচজন এমন মানুষের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব হবে না। এই নিরীহ মানুষেরা এখনো পর্যন্ত কী করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে কোনোরকম বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া টিকে আছেন, সেটা কম আশ্চর্যের ব্যাপার নয়।

আবু জুনায়েদের দৈনন্দিন জীবনের ছকটা চলুন পর্যালোচনা করে দেখি। তিনি খুব সকালে বেলা পাঁচটার দিকে ঘুম থেকে উঠেই এক চক্কর হেঁটে আসেন। প্রাতভ্রমণ সেরে আসার পর গোসল করতে বাথরুমে ঢুকতেন। মেজাজ ভালো থাকলে কোনো কোনোদিন ফজরের নামাজটা পড়ে ফেলতেন। এমনিতে আবু জুনায়েদ নামাজি বান্দা ছিলেন না। তবে তার একটা ধারণা গজিয়ে গিয়েছিল সকালবেলার নামাজ দিয়ে শুরু করলে সারাটা দিন নির্ঝঞ্ঝাট কাটে। সব দিন এই নামাজ পড়ার নিয়মটা রক্ষা করতে পারতেন না। তাকে নামাজের বিছানায় দেখলে বেগম নুরুন্নাহার বানু বেজায় রকম ক্ষেপে যেতেন। ইদানীং নুরুন্নাহার বানুর মনে একটা সন্দেহের রেখা উঁকিঝুঁকি মারতে আরম্ভ করেছে। আবু জুনায়েদ যে ডিপার্টমেন্টটির শিক্ষক সেখানে বেশ কয়েকজন মহিলা শিক্ষিকা কাজ করেন। তাদের মধ্যে বেশ কজন সুন্দরী। এই সুন্দরীদের একজন আবার অবিবাহিতা। তাকে নিয়ে সব সময় নতুন নতুন গুজব রটতে থাকে। নুরুন্নাহার বানুর মনে একটি চাপা আশঙ্কা আছে। তার স্বামীটি ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না। এই রকম দুর্বল শিরদাঁড়াসম্পন্ন মানুষেরাই খুব সহজে ডাকিনিদের খপ্পড়ে পড়ে যায়। নুরুন্নাহার বানুর বয়স বাড়ছিল এবং তলপেটে থলথলে মেদ জমছিল। এটা একটুও অস্বাভাবিক নয়। এরই মধ্যে নুরুন্নাহার বানু বুড়িয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জুনায়েদ দেখতে এখনো তরুণ। মাথার একগাছি চুলেও পাক ধরেনি। নুরুন্নাহার বানুর সঙ্গে সঙ্গে আবু জুনায়েদের শরীরে কেন বার্ধক্য আক্রমণ করছে না, এটাই ছিল নুরুন্নাহার বানুর অসন্তোষের একটা বড় কারণ। নুরুন্নাহার বানু মনে করতে আরম্ভ করছিলেন, আবু জুনায়েদ নিশ্চয়ই অন্য কারো সঙ্গে একটা গোপন সম্পর্ক তৈরি করেছে এবং সেটাই তার সতেজ সজীব থাকার একমাত্র কারণ। নিয়মিত নামাজি না হয়েও যে আবু জুনায়েদ মাঝে-মাঝে ফজরের নামাজ পড়তেন, দেখে নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন, তিনি যে তাকে সন্দেহ করছেন ওটা কেমন করে টের পেয়ে গেছেন, তাই কখনো-সখনো নামাজের পাটিতে দাঁড়িয়ে তার কাছে প্রমাণ করতে চাইছেন, দেখো আমি নামাজ পড়ি এবং আমার মনে প্রবল ধর্মবোধ বর্তমান, সুতরাং অন্য স্ত্রীলোকের উপর আমি কোনো আসক্তি পোষণ করতে পারি নে। কিন্তু নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন, আবু জুনায়েদ অন্য মেয়ে মানুষের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন সেটা গোপন করার জন্য মাঝে-মাঝে নামাজ পড়ে দেখিয়ে থাকেন। আসলে আবু জুনায়েদের এই লোক দেখানো নামাজ পড়া ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। তাছাড়া অনেকদিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাস করে নুরুন্নাহার বানুর মনে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে এখানে মেয়ে পুরুষ মাঠে ছেড়ে দেয়া গরু-মোষের মতো ঘুরে বেড়ায়, তাই যেকোনো সময়ে তারা যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারে। সব মেয়েমানুষ কি আর নুরুন্নাহার বানুর মতো!

যা হোক, আবু জুনায়েদ গোসল সারার পর নামাজ পড়ন, না পড়ন, নাস্তা খেতে বসতেন। নাস্তার পর পত্রিকার পাতায় চোখ বুলোতেন এবং সম্পাদকীয়, উপ সম্পাদকীয় কলামগুলো ভালো করে পড়তেন। তারপর ধীরে-সুস্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। এ সময়ে কোনো উপলক্ষ নিয়ে নুরুন্নাহার বানু চটাচটি করলে তিনি মেজাজ খারাপ করতেন না। অ্যাটাচি কেসটা দুলিয়ে ডিপার্টমেন্টের দিকে হাঁটা দিতেন। ডিপার্টমেন্টে তিনি দেড়টা, কখনো কখনো দুটো অবধি কাটাতেন। বিভাগীয় মিটিং বা অন্য কোনো ব্যাপার থাকলে তাকে আরো দেরিতে ফিরতে হতো। আবু জুনায়েদ যেদিন দেরিতে ফিরতেন, নুরুন্নাহার বানুর মেজাজ খিঁচিয়ে থাকত। তিনি মনে করতেন, আজ তার স্বামী সে অবিবাহিতা শিক্ষিকার সঙ্গে লটর-ফটর কোনো একটা কাণ্ড করছেন, নইলে এত দেরি কেন?

ডিপার্টমেন্ট থেকে ফিরে অ্যাটাচি কেসটা টেবিলের উপর রাখতেন, জামা-কাপড় ছাড়তেন। তারপর খেতে বসতেন। যেদিন নুরুন্নাহার বানুর মেজাজ ভালো থাকত পাতে এটা সেটা তুলে দিতেন। পাশে বসে মাছি তাড়াতেন। মেজাজ খারাপ থাকলে রান্নাঘরে থালাবাসন, খুন্তি, হাঁড়ি নিয়ে প্রলয় কাণ্ড বাধিয়ে তুলতেন এবং আবু জুনায়েদের পেয়ারের মাদী বেড়ালটাকে ধরে আচ্ছা করে পেটাতেন। আবু জুনায়েদ ডানে বামে কোনো দিকে না তাকিয়ে খাবার গলাধঃকরণ করে যেতেন। খাওয়ার পর বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাতমুখ ধোয়ার পর শব্দ করে কুলি করে নিতেন। অবশেষে বিছানার উপর শরীরটা ছেড়ে দিয়ে বেলা পাঁচটা অবধি ঘুমোতেন।

পাঁচটার পর ঘুম থেকে উঠে তিনি আবার ডিপার্টমেন্টের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। ছাত্রছাত্রীদের টিউটোরিয়াল খাতা দেখতেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করতেন, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের রিপোর্ট লিখতেন। এসব করতে করতে সন্ধ্যে নেমে আসত। অন্য শিক্ষকেরা এই সময়টিতে ক্লাবে গিয়ে কেউ কেউ টেনিস খেলতেন, কেউ কেউ দাবার সামনে বসে যেতেন। কেউ কেউ গোল হয়ে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলুদ, ডোরাকাটা, বেগুনি দলের নির্বাচন নিয়ে তর্ক জুড়ে দিতেন। কে কাকে ডিঙিয়ে প্রমোশন পেলেন, কার ছেলেমেয়ে বখে যাচ্ছে, কে আধারাতে বউকে ধরে পেটায়, চাকরাণী মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে গিয়ে আচ্ছা নাকাল হয়েছে কে, সরকারি দলে নাম লিখিয়ে কে গুলশানের প্লট বাগিয়ে নিল ইত্যাকার বিষয় ক্লাবে নিত্যদিন আলোচিত হতো। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে কেউ কখনো ক্লাবের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেখেননি। সন্ধ্যাটি যখন গহন হয়ে নামত জুনায়েদ সেই পুরনো ব্যাগটি নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাজারে চলে যেতেন।

তরিতরকারি, মাছ, মাংসের দোকানে গেলে আবু জুনায়েদ নতুন মূর্তি ধারণ করতেন। ডিপার্টমেন্টে, বাড়িতে, বিশ্ববিদ্যালয় পাড়া সর্বত্র আবু জুনায়েদ মিনমিনে স্বভাবের লোক বলে পরিচিত ছিলেন। কাঁচা বাজারে পদার্পণ করামাত্রই কোত্থেকে একটা পৌরুষ এসে তার অস্তিত্বে ভর করত। লাল চোখ পাকিয়ে তরকারিঅলাকে ধমক দিতে একটুও ইতস্তত করতেন না। বলে বসতেন, মিয়া তোমার সাহস তো কম নয়, এই পচা পটলের কেজি চৌদ্দ টাকা দাবি করছ? তোমার জেল হওয়া উচিত। মাছঅলাকে বলে বসতে কসুর করতেন না, দেশে যদি আইন থাকত তোমার মতো মানুষকে বহু আগেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেত। কাঁটা পর্যন্ত পচে ভর্তা হয়ে গেছে, এমন মাছের চারগুণ দাম বেশি দাবি করছ। কশাইরা তো কশাই, ওদের সঙ্গে রাগারাগি করলে রাগের কোনো মূল্যই থাকে না, তাই আবু জুনায়েদ তাদের সম্পর্কে কোনো মন্তব্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতেন। তিনি মাংস বিক্রেতাদের ধারেকাছে যেতেন না, কারণ নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন, আবু জুনায়েদের তাজা মাংস চিনে নেয়ার ক্ষমতা নেই। আবু জুনায়েদ রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক। রসায়নবিষয়ক গবেষণাটা তিনি কাঁচা বাজারেই চালাতেন। কাঁচা বাজারের প্রায় সমস্ত দোকানদার নিত্যদিনের ওই মহামান্য খদ্দেরটাকে চিনে নিয়েছিল। এই ভদ্রলোকের হাঁক-ডাক দরাদরির বহর এত প্রকাণ্ড ছিল যে যদি সম্ভব হতো সকলে মিলে এই আবু জুনায়েদের বাজারে প্রবেশ বন্ধ করে দিত। দোকানদারদের সে রকম কোনো আইন পাস করার ক্ষমতা থাকলে আবু জুনায়েদের বাজারে যাওয়া লাটে উঠত। পাক্কা তিনটি ঘণ্টা কাটিয়ে ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে তিনি বাড়িতে ফিরতেন। আসার সময় তিনি রিকশা চাপতেন। বাজারের ব্যাগ রান্নাঘরে রেখে বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ কোত-কোত শব্দ করে সারা শরীর থেকে কাঁচা বাজারের স্পর্শদোষ মুছে ফেলতে চেষ্টা করতেন।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে তিনি বাড়িতে কাঁচা পাজামা পাঞ্জাবী পরে একটু ফুরফুরে হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন। টেলিভিশন খুলে বাংলা সংবাদটি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সংবাদের পরে যখন নতুন কোনো প্রোগ্রামের দিকে দৃষ্টি যোগ করতে চেষ্টা করতেন, সেই সময়ে নুরুন্নাহার বানু কিল চড় দিতে দিতে কলেজ পড়ুয়া মেয়েটিকে খাতা বইসহ আবু জুনায়েদের সামনে বসিয়ে দিতেন। অগত্যা আবু জুনায়েদকে মেয়েটিকে ক্যালকুলাস এবং ইংরেজি ব্যাকরণের ট্যান্স, নাম্বার, জেন্ডার এসব শেখাতে হতো। রাতের খাবার খেতে কোনোদিন দশটা বেজে যেত। খাওয়ার পর তিনি চুক চুক করে এক গ্লাস দুধ পান করতেন। তারপর বাতি নিভিয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়তেন। এই সময়ে নুরুন্নাহার বানু বাসি পাউরুটির মতো থলথলে শরীরখানা মেলে ধরে তাকে উস্কে তোলার চেষ্টা করতেন। সব দিন তিনি সাড়া দিতে পারতেন না এবং পাশ ফিরে ঘুমোতেন। নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন সেই ডিপার্টমেন্টের ছেনাল শিক্ষিকার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ইদানীং আবু জুনায়েদ শয্যায় তাকে উপেক্ষা করতে আরম্ভ করেছেন। আবু জুনায়েদ ঘুমিয়েই নাক ডাকতে শুরু করতেন। নুরুন্নাহার বানু ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসতে থাকতেন। আবু জুনায়েদের ঘুমটা গাঢ় হয়ে এলে ঠেলা দিয়ে তাকে জাগিয়ে দিয়ে গণ্ডারের মতো নাসিকা গর্জনের জন্য আধারাতে ঝগড়া লাগিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করতেন। আবু জুনায়েদের শরীর লম্বা লম্বা কালো কালো লোমে ভর্তি ছিল। একবার তো ম্যাচকাঠি জ্বালিয়ে লোমের বনে আগুনই ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের এ সকল অসঙ্গতি এগুলো কাল্পনিক হোক বা বাস্তব হোক বেগম নুরুন্নাহার বানু এবং কাঁচা বাজারের দোকানদারেরা ছাড়া অন্য কারো দৃষ্টিতে বিশেষ ধরা পড়েনি। তবে তার বৃদ্ধ শ্বশুর তার বিষয়ে মনের ভেতর একটা চাপা ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন। তার পয়সায় আবু জুনায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। তিনি মনে করেন বিগত কয়েক বছর ধরে আবু জুনায়েদ যেভাবে কদমবুসি করেন, তাতে ভক্তি শ্রদ্ধার পরিমাণ যথেষ্টভাবে কমে এসেছে। কিন্তু একথা তিনি মুখ ফুটে কারো কাছে প্রকাশ করেননি। আবু জুনায়েদের দৈনন্দিন জীবনযাপন পদ্ধতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করে আমরা তার মধ্যে সামান্য পরিমাণ দোষও আবিষ্কার করতে পারিনি। নুরুন্নাহার বানুর মৌন সন্দেহটুকুকে ধর্তব্যের মধ্যে আনাও উচিত নয় মনে করি। তার সবটাই কাল্পনিক। মেয়ে মানুষ ঘরে বসে থাকলে এবং নিজেকে ক্লান্ত করার প্রচুর কাজ না থাকলে, মাথার উকুনের মতো মনের মধ্যে সন্দেহের উকুন বাসা বাঁধতে থাকে। তরকারিঅলা, মাছঅলা এদের মতামতের কী দাম। তারা তো অহরহ নিরীহ নাগরিকদের পকেট কাটছে।

এই পর্যায়ে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের একটি বিশেষ প্রবণতার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। এটাকে দোষ বলব বা গুণ বলব এখনো স্থির করে উঠতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিছাটার সময় আবু জুনায়েদ সাভার, আমিন বাজার, জয়দেবপুর, মাওয়া শহরতলী এসকল অঞ্চলে জমির দালালদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন। অল্প পয়সায় অধিক জমি কোথায় পাওয়া যায় এবং কীভাবে কেনা যায় সে ধান্ধায় মত্ত হয়ে থাকতেন। জমি কেনার আকাঙ্ক্ষা তার মনে মগজে নেশার মতো প্রবেশ করেছিল। তার দৈনন্দিন জীবনযাপন পদ্ধতির মধ্যে ওই একটি বিষয় যেখানে তিনি কোনো শাসন বারণ মানতেন না। আবু জুনায়েদের মনে একটা পেশাগত অহংকার ছিল। সেটা চাপা থাকত। তবু তার যে সমস্ত সহকর্মী নানা প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক জরিপকারকের কাজ করে টাকা-পয়সা করে লাল হয়ে যাচ্ছেন, আবু জুনায়েদ তাদের সম্পর্কে নীচু ধারণা পোষণ করতেন। মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলার অভ্যাস নেই বলে এ-কথাটিও কাউকে বলা হয়নি। তার স্বভাবের মধ্যে পেশাগত অহংকারের সঙ্গে যোগ হয়েছিল একটা জেদ। আবু জুনায়েদ মনে করতেন, তার সহকর্মীরা অনৈতিক উপায়ের আশ্রয় গ্রহণ করে যে টাকা-পয়সা আয় করেন, তিনি সৎ ভাবে চেষ্টা করে অনেক বেশি টাকার মালিক হতে পারবেন। তিনি মনে করতেন, ওই জমিকে আশ্রয় করে একদিন তার ভাগ্য খুলে যাবে। নিশ্চয়ই কোথাও নামমাত্র মূল্যে তার জন্য প্রচুর পরিমাণ জমি অপেক্ষায় আছে। তার কাজ হলো খুঁজে বের করা। খুনোখুনি কিংবা অন্যরকম গণ্ডগোলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে আবু জুনায়েদ ভীষণ খুশি হয়ে উঠতেন। দালালদের নিয়ে তিনি দূর দূর অঞ্চলে জমির সন্ধানে পাড়ি জমাতেন। তার বাড়িতে নানা আকার নানা প্রকারের দালাল হরহামেশা লেগেই থাকত। তাদের কারো কারো পায়ে রবারের পাম্প সু, মুখে গুছি দাড়ি। কেউ ছাতাটি বগলে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে ড্রয়িং রুমে হানা দিত। আবু জুনায়েদ এ ধরনের লোকদের ভারি সমাদর করতেন। পরীক্ষার প্রশ্ন করে, খাতা দেখে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত পরীক্ষক হিসেবে গিয়ে মাস মাইনের বাইরে যে টাকা তিনি আয় করতেন, প্রায় তার সবটাই দালালদের সেবায় ব্যয় করতেন। পারলে মাস মাইনের টাকাটাও দালালদের পেছনে ঢেলে দিতেন। সেটি সম্ভব হয়নি। কারণ, সব টাকাটা নুরুন্নাহার বানুর হাতে তুলে দিতে হতো। দৈনন্দিন হাতখরচ টাকাটাও তাকে স্ত্রীর কাছ থেকে চেয়ে নিতে হতো। দশটা টাকা বেশি দাবি করলে দশ রকম জেরার সম্মুখীন হতে হতো।

.

০৩.

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টির ছিল গৌরবময় অতীত। অনেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গোটা দেশের আত্মার সঙ্গে তুলনা করে গর্ব বোধ করতেন। এখানে মহান ভাষা আন্দোলন জন্ম নিয়েছে। যুগ যুগ ধরে অবদমিত ইতিহাসের উষ্ণ নিঃশ্বাসের মতো এখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগুন সমগ্র ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। মুক্তি সংগ্রামের জ্বালামুখ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়।

অতীতের গৌরব গরিমার ভার বইবার ক্ষমতা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। সাম্প্রতিককালে নানা রোগব্যাধি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কাবু করে ফেলেছে। মাছের পচন যেমন মস্তক থেকে শুরু হয়, তেমনি যাবতীয় অসুখের জীবাণু শিক্ষকদের চিন্তা চেতনায় সুন্দরভাবে স্থান করে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বরজারি, ধনুষ্টঙ্কার নানা রকমের হিস্টিরিয়া ইত্যাকার নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাধিগুলো শিক্ষকদের ঘায়েল করেছে সবচাইতে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বারশ শিক্ষক। এখন শিক্ষকসমাজ বলতে কিছু নেই। আছে হলুদ, ডোরাকাটা, বেগুনি এসব দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা কজা করার জন্য দলগুলো সম্ভব হলে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতো। মাঠ এবং রাস্তা ছাত্ররা দখল করে রেখেছে বলে শিক্ষকদের লড়াইটা স্নায়ুতে আশ্রয় করে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে বেশি প্যাচাল পাড়লে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের উপাচার্য হওয়ার উপাখ্যানটি অনাবশ্যক লম্বা হয়ে যায়।

সেই বছরটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ডোরাকাটা দলটি নির্বাচিত হওয়ার খুবই সম্ভাবনা ছিল । আৰু জুনায়েদের সঙ্গে এই দলের একটা ক্ষীণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আবু জুনায়েদ নির্বিরোধ শান্তশিষ্ট মানুষ। দলবাজি তার মতো ধাতের মানুষের পোষায় না। তারপরেও আবু জুনায়েদ কীভাবে যুক্ত হয়ে গেলেন। বলা যেতে পারে আবু জুনায়েদের ভাগ্য তাকে দলের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল । তথাপি পেছনে ছোট্ট একটা কাহিনী আছে। রসায়ন বিভাগের অবিবাহিতা সুন্দরী শিক্ষিকাটি পুরুষ মানুষদের সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলে বিরক্ত হয়ে গেলে অধিক উত্তেজনাপূর্ণ কোনো কিছুর মধ্যে নিজেকে ঢেলে দিতেন। এরকম ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। ভদ্রমহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে যে উপাচার্য ভদ্রলোকটি আসীন আছেন, তার পেয়ারের এক সুদর্শন শিক্ষকের প্রেমে আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিলেন। সকলকে বলাবলি করতে শোনা যেত এবার দিলরুবা খানমের একটা হিল্লে হয়ে যাবে । হঠাৎ করে বলা নেই কওয়া নেই, ভদ্রলোক শিল্প মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারির অল্প বয়েসী এক কন্যাকে বিয়ে করে ফেললেন। এই ঘটনাটি দিলরুবা খানমকে এক রকম ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। তিনি সপ্তাহখানেক ক্লাসে আসেননি। আঘাতের ধকলটা হজম করতে একটু সময় নিয়েছিল। পরে দিলরুবা খানম জেনেছিলেন ওই সেক্রেটারি ভদ্রলোকের সঙ্গে উপাচার্যের কী ধরনের আত্মীয়তা ছিল। তিনিই বিয়েটা ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। দিলরুবা খানমের সমস্ত ক্ষোভ রাগ ওই উপাচার্যকে উপলক্ষ করে ফুঁসে উঠতে থাকল । তিনি সর্বত্র বলে বেড়াতে লাগলেন এই দুর্নীতিবাজ আবু সালেহকে আসন থেকে টেনে ফেলে না দিলে এই বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয়ে যাবে। উপাচার্য ছিলেন হলুদ দলের মনোনীত প্রার্থী। হলুদ দল ছাড়া বাদামি দলের শিক্ষকেরাও তাকে সমর্থন করতেন। দিলরুবা খানম কিছুদিনের মধ্যে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললেন। হলুদ দলের সমর্থক বাঘা শিক্ষকদের ডোরা কাটা দলে নিয়ে এলেন। দিলরুবা খানমের মুখে ওই এক কথা। বর্তমান উপাচার্য অথর্ব, অশিক্ষিত, দুর্নীতিবাজ। তাকে ঝেড়ে ফেলে দিতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘাস গজাবে না। অবশ্য বাঘা বাঘা শিক্ষকেরা একেবারে নিজের নিজের কারণে ডোরা কাটা দলে যোগ দিয়েছেন। বর্তমান উপাচার্য নিজের পেটোয়া লোক ছাড়া কারো প্রত্যাশা পূরণ করেননি। এই দলছুট শিক্ষকদের কেউ আশা করেছিলেন, উপাচার্য সাহেব তাকে একটা চার রুমের ফ্ল্যাট বরাদ্দ করবেন। কেউ আশা করেছিল, বিদেশ যাবার সুযোগ দেবেন। কেউ প্রত্যাশা করতেন তার আদরের দুলালীটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাবে। কিন্তু মুহম্মদ আবু সালেহ একে ওকে সবাইকে নিরাশ করেছেন। তাই তারাও একে একে ক্ষমতার বলয় থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। দিলরুবা খানমের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে কোনো মহিলা শিক্ষককে এমন অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। তরুণ শিক্ষকদের অনেকে মনে করতেন, শিক্ষক বাহিনীতে একজন মহিলা অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় শিক্ষক রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ হলো । দেশের প্রধানমন্ত্রী মহিলা, বিরোধী দলীয় নেত্রী মহিলা, সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতিতেও একজন মহিলা যদি নেতৃত্ব দিতে ছুটে আসেন এই চরাচরপ্লাবী নারী জাগরণের যুগে এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত সঙ্গত ও স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে হবে।

সুন্দরী মহিলার স্বভাবের খুঁত, দুর্বলতা যখন প্রকাশ পায় তখন তার পুরুষ মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা অনেক গুণ বেড়ে যায়। বেচারী আবু জুনায়েদ তার সুন্দরী এবং স্মলিতস্বভাবা সহকর্মী মহিলাটির আকর্ষণে মুগ্ধ হয়ে ডোরাকাটা দলের সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন। শুধু একজন নীরব সমর্থক, তার বেশি কিছু হওয়ার ক্ষমতা মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে আবু জুনায়েদের ধর্মপত্নী রাতের বেলা তার পাশে ঘুমিয়ে মনের মধ্যে যে সন্দেহটি নাড়াচাড়া করতেন, সেটি একেবারে অমূলক নয়। আবু জুনায়েদ যদি দিলরুবার টানে আকৃষ্ট হয়ে ডোরাকাটা দলে যোগ না দিতেন তার উপাচার্য হওয়ার প্রশ্নই উঠত না। তাহলে একথা থেকে আরেকটি কথা বেরিয়ে আসে। আবু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানু সকলের কাছে যে দাবি করে বেড়াচ্ছেন, তার ভাগ্যে আবু জুনায়েদের ভাগ্য খুলেছে সেটা সত্যি নয়। এতে দিলরুবা খানমের হাত ছিল। আবু জুনায়েদের উপাচার্য হওয়ার ঘটনাটিকে যদি আল্লাহর কেরামত বলে মেনে নিই, আমরা বেহুদা কল্পনা করার কষ্ট থেকে রেহাই পেয়ে যাই। আল্লাহ নুরুন্নাহার বানুর খসম আবু জুনায়েদকে উপাচার্য বানাবার জন্য দিলরুবা খানমের হাবুডুবু খাওয়া প্রেমকে নষ্ট করে দিয়ে তাকে শিক্ষক রাজনীতিতে টেনে এনেছিলেন। শুধু এটুকু বললে আল্লাহর লীলাখেলার সূক্ষ্ম কেরামতির কথা সঠিকভাবে বর্ণনা করা হয় না। আল্লাহ যে বিশ্বজগতের সমস্ত রহস্য নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং তার ইঙ্গিতে যে সবকিছু ঘটে, সেটা প্রাঞ্জলভাবে উপলব্ধি করার জন্য আরো কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন।

ডোরাকাটা দলে যেসব সিনিয়র শিক্ষক এসে যোগ দিয়েছিলেন, শুরুর দিকে সকলের বুলি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচাতে হবে, প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে এবং সর্বক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর জুনিয়র শিক্ষকদের যাতে তাড়াতাড়ি প্রমোশন হয় এবং তারা তাড়াতাড়ি বিদেশ যেতে পারেন সে ব্যবস্থাটিও নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো তো হলো নির্বাচনী দাবি। কিন্তু প্রার্থী মনোনয়নের বেলায় একটা মস্ত ঘাপলা দেখা দিল।

এবারের নির্বাচনে ডোরাকাটা দলের জয়লাভ করার সমূহ সম্ভাবনা। এই দলের ভেতর থেকে তিনজন যোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়ে তিনজনের একটি প্যানেলকে মনোনয়ন দিতে হবে। এই তিনজনের প্যানেল ঠিক করার সময় শুরু হলো আসল গণ্ডগোল। সাম্প্রতিককালে প্রায় বার জন ঝুনো প্রফেসর ডোরাকাটা দলের সমর্থক। তাদের প্রত্যেকেই মনোনয়ন পেতে ভীষণ রকম আগ্রহী। সকলেই মনে করেন, তার মতো যোগ্য প্রার্থী পূর্বে কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। প্রায় সকলেই মনে করেন বিশ পঁচিশ বছর ধরে শিক্ষকতার মহান ব্রতে নিযুক্ত আছেন, অবসর নেয়ার পূর্বে উপাচার্যের চেয়ারটিতে একটা পাছা ঠেকাতে পারলে নিঃস্বার্থ জ্ঞান সেবার একটা স্বীকৃতি অন্তত মিলে। এই জ্ঞানবৃদ্ধ মহান শিক্ষকদের মধ্যে এ নিয়ে এত ঝগড়াঝাটি হতে থাকল যে সকলে আশঙ্কা পোষণ করতে লাগলেন ডোরাকাটা দলটিই না আবার তিন টুকরো হয়ে যায় । আগের জমানা হলে তলোয়ার দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাথা কেটে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতেন। কিন্তু মুশকিলের ব্যাপার হলো নিজে নিজে ঘোষণা করে প্যানেলভুক্ত প্রার্থী হওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য দলের স্বীকৃতি অর্জন করতে হয়। দলের কর্তা ব্যক্তিদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তারা কিছুতেই সিনিয়র শিক্ষকদের একটা আপস মীমাংসায় টেনে আনতে পারলেন না। দিনে রাতে মিটিং করেও কোনো গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা বের করা সম্ভব হলো না। বুড়ো প্রফেসররা নিজ নিজ অবস্থান এমন দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে রইলেন যে বিরক্ত জুনিয়র শিক্ষকেরা তাদের কাছে যাওয়া আসা ছেড়ে দিয়ে যার যার ঘরে ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করছিলেন। সকলে আবার বলাবলি করতে থাকলেন আবু সালেহ্ আরো এক টার্মের জন্য উপাচার্য থেকে যাবেন। ডোরাকাটা দলটাকে বুড়ো প্রফেসররা পাংচার করে দিয়েছেন। সুতরাং আবু সালেহর দল এবারও বিনা বাধায় নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে। ডোরাকাটা দল পনের দিনব্যাপী ঝগড়াঝাটির কারণে ভেঙে চার টুকরো হয়ে গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু দিলরুবা খানম এবারেও তার ম্যাজিকটা অব্যর্থভাবে প্রয়োগ করলেন ।

তিনি রিকশা করে তরুণ শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে এনে জড়ো করলেন। দলীয় ঐক্যটাকে ভেতর থেকে মজবুত করে তুললেন। তারপর তরুণ শিক্ষকদের দিয়ে ঘোষণা করালেন যে সমস্ত সমর্থকদের দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। যিনি স্বেচ্ছায় মেনে নেবেন না তাকে দল থেকে বের করে দেয়া হবে। এই ঘোষণাটা ভয়ানকভাবে কাজ দিল। জ্ঞানবৃদ্ধ প্রফেসরদের আস্ফালন আপনা থেকেই থেমে গেল। এত পানি ঘোলা করার পরে আবু সালেহর দলে গিয়ে যে জুটবেন, সে পথও খোলা নেই। অগত্যা দলীয় সিদ্ধান্তের জন্য চুপ করে অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর রইল না। ডোরাকাটা দলের সমর্থকেরা বৈঠকের পর বৈঠক করে প্যানেলের জন্য দুজন মানুষকে বেছে নিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজে তাদের মোটামুটি সুনাম আছে। তারা প্রতিপক্ষকে খুন করে নিজেরা মনোনীত হওয়ার উগ্র আকাঙ্ক্ষা বিশেষ ব্যক্ত করেননি। দুটি নাম তো পাওয়া গেল। কিন্তু তৃতীয় নামটির বেলায় তারা মস্ত ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন। সমস্ত ডোরাকাটা দলে আর একটিও মানুষ নেই, যাকে মনোনয়ন দিলে দলে বিতর্ক সৃষ্টি হবে না। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে মনোনয়ন দিলে কোনো বিতর্ক হতো না, এটা সকলেই জানতেন। কিন্তু তার কথা একটিবারও কারো মনে আসেনি। তিনি প্রফেসর বটে, বিদেশের নামকরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রিও আছে। ছাত্রী কিংবা সহকর্মী কাউকে নিয়ে লটরটর করার অপবাদও কেউ তাকে দিতে পারবেন না। পরীক্ষার খাতা দেখার বেলায় তিনি মোটামুটি নিরপেক্ষতা মেনে চলেন। ডোরাকাটা দলের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও তার নাম কারো মনে আসেনি, কারণ তার মতো গোবেচারা মানুষের নাম উপাচার্যের জন্য বিবেচিত হতে পারে, এটা কেউ স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারেননি। এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছিল। আজা কর রাতটাই সময়। আগামী কাল সকাল দশটার মধ্যে তিনজন প্রার্থীর প্যানেল ঘোষণা দিতে হবে। তারপর নির্বাচন হবে। তৃতীয় নামটির জন্য দলের মধ্যে আবার উৎকণ্ঠা ঘনীভূত হয়ে উঠল। একজন প্রবীণ শিক্ষক তো মন্তব্যই করে বসলেন, চলুন ফেরা যাক। এবারেও আবু সালেহর কাছে আমরা হেরে গেলাম। ডোরাকাটা দলের ভাগ্য চিকন সুতোয় ঝুলছিল। এই শেষ মুহূর্তটিতে দিলরুবা খানম আবার ত্রাণকর্তীর বেশে এসে দেখা দিলেন। প্রবীণ শিক্ষক ড. সারোয়ারের মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে বললেন, আমরা আবু সালেহর কাছে হার মানব কেন, আর ফিরেও যাব কেন । দিন এক টুকরো কাগজ, আমি

তৃতীয় প্রার্থীর নাম লিখে দিচ্ছি। তারপর নিজে ভ্যানিটি ব্যাগের চেন খুলে ডায়েরি বের করে একটা বাতিল খাতা ছিঁড়ে একটানে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের নামটা লিখে দিয়েছিলেন। পড়ে এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। দুয়েকজন হাসি চাপতে পারলেন না। ড. সারোয়ার মহা বিরক্ত হয়ে বলে বসলেন, এটা কী করলেন? দিলরুবা খানম চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, এটা হলো গিয়ে আপনার তিন নম্বর নাম। আমাদের তিনটি নামের একটি প্যানেল দেয়ার কথা। সে তিনটি নাম পুরো হলো। আর কোনো কথা নয়। এখন যে যার ঘরে চলে যেতে পারেন। সকলে এত ক্লান্ত এবং বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন যে আর কথা বাড়ানো উচিত মনে করলেন না।

ডোরাকাটা দল নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। অবশ্য আবু জুনায়েদ কম ভোট পেয়েছিলেন । চ্যান্সেলর আবু জুনায়েদকে উপাচার্য হিসেবে অনুমোদন দিয়েছিলেন, সে খবরটাকে ভিত্তি করেই কাহিনীটি তৈরি হয়েছে। সুতরাং এ নিয়ে আর বাক্য ব্যয়ের প্রয়োজন নেই। নুরুন্নাহার বানুর ভাগ্য, নাকি দিলরুবা খানমের হস্তক্ষেপ, নাকি চ্যান্সেলরের অনুমোদন অথবা এসব কিছুর মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের পূঢ় বিজয় সূচিত হয়েছে বলা অত সহজ নয়। তবে খুব গোপন একটি তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। গোয়েন্দা রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, আবু জুনায়েদ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু করা দূরে থাকুক, জীবনে সভা-সমিতির ধার দিয়েও যাননি।

০৪-৬. ব্রিটিশ স্থাপত্যের সুন্দর নিদর্শন

ব্রিটিশ স্থাপত্যের সুন্দর নিদর্শন উপাচার্য ভবনটিতে নুরুন্নাহার বানু, কলেজগামী কন্যা এবং ছোঁকড়া চাকরটি নিয়ে উঠে আসার পর মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ পূর্বে চিন্তা করেননি এমন কতিপয় অসুবিধের সম্মুখীন হতে থাকলেন। উপাচার্য ভবনে পা দিয়েই নুরুন্নাহার বানু এমন সব মন্তব্য করতে থাকলেন সেগুলো আবু জুনায়েদের মতো গোবেচারা স্বামীর পক্ষেও পরিপাক করা একটু কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ মনেপ্রাণে নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। নিজের উপর আস্থার অভাব ছিল, সেটুকু কাপড়চোপড় দিয়ে চাপা দেয়ার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করছেন না। উপাচার্য হিসেবে প্রথম মাসের মাইনেটি পাওয়ার পূর্বেই দু-দু-জোড়া স্যুট তিনি শহরের সেরা টেইলারিং হাউস থেকে আর্জেন্ট অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নিয়েছেন। এক ডজন নানা রঙের টাই সংগ্রহ করেছেন। আবু জুনায়েদ মাঝে-মধ্যে ধূমপান করেন। কিন্তু শুনেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজ উপাচার্য লরেন্স সাহেব সব সময় পাইপ টানতেন। পাইপ মুখে থাকলে লরেন্স সাহেবের মুখমণ্ডল ভেদ করে আশ্চর্য একটা ব্যক্তিত্বের প্রভা বিকিরিত হতো। তিনি সামনের দেয়ালে উপাচার্যের প্রতিকৃতিসমূহের মধ্য থেকে পাইপ মুখে দণ্ডায়মান লরেন্স সাহেবের সঙ্গে মনে মনে নিজের তুলনা করছিলেন। টানতে পারবেন কি না বলতে পারবেন না তথাপি তিনটি পাইপ এবং টোবাকোও তিনি কিনে ফেলেছেন। ঘোড়ার রেস খেলার জকিদের পোশাক থাকে, ফুটবল ক্রিকেট খেলোয়াড়েরাও নিজেদের পোশাক পরে। এমনকি মসজিদের ইমামেরও একটা বিশেষ পোশাক আছে, যা পরলে চেনা যায় ইনি একজন ইমাম সাহেব, কোর্টের উকিল জজদের তো কথা নেই। সুতরাং উপাচার্যের নিজের একটা পোশাক থাকবে না কেন? বিশ্ববিদ্যালয় বিধিমালায় না থাকুক তিনি নিজেকে বিশেষ পোশাকে মডেল উপাচার্য হিসেবে হাজির করবেন ।

আবু জুনায়েদের মধ্যে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে চলছিল এই প্রক্রিয়াটিতে নুরুন্নাহার বানু একটা মূর্তিমান বাধা হয়ে দেখা দিলেন । আবু জুনায়েদ দুরকম সংকটের মধ্যে পড়ে গেলেন। দিলরুবা খানম যদি হস্তক্ষেপ না করতেন, চেষ্টা চরিত্র করে হয়তো মাতৃগর্ভে প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু উপাচার্য হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হতো না। দিলরুবা খানম এই মেন্দামারা মানুষটির সাজ-পোশাকের বহর দেখে সকলের কাছে তাকে দরজির দোকানের ডামি বলে বেড়াতে আরম্ভ করেছেন। এই মহিলা যিনি বলতে গেলে একবারে অবজ্ঞেয় অবস্থা থেকে তাকে উপাচার্যের চেয়ারটিতে হাতে ধরে বসিয়ে দিয়েছেন, তার মতামতের নিশ্চয়ই মূল্য আছে।

এদিকে নুরুন্নাহার বানু ভিন্ন রকম উৎপাত শুরু করে দিয়েছেন। উপাচার্য ভবনে পা দেয়া মাত্রই এমন সব কাজ করতে লাগলেন এবং এমন সব মন্তব্য ছুঁড়তে থাকলেন, পদে পদে আবু জুনায়েদকে নাকাল হতে হচ্ছিল। সকাল বেলা উপাচার্য ভবনে প্রবেশ করেছেন, সেই বিকেলেই ড্রয়িং রুমে কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষককে নিয়ে চা খেতে বসেছেন। এই সময়টিতে একজন জুনিয়র শিক্ষককে ডেকে মন্তব্য করে বসলেন, আচ্ছা ওই বাড়িটার ছাদ অত উঁচু করা কি ঠিক হয়েছে? আর দেয়ালগুলোও অত পুরু কেন? অনর্থক অনেক টাকার বাজে খরচ করা হয়েছে । অনায়াসে দোতলা বানানো যেত। দেখুন না দেয়ালগুলো কী রকম পুরু। একটু কম পুরু করে বানালে তিনটা বাড়ি বানানো যেত। একজন মাঝবয়েসী শিক্ষক নুরুন্নাহার বানুকে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন, বেগম সাহেবা এটা এক ধরনের বাড়ির নির্মাণ পদ্ধতি। এটাকে গথিক বলা হয়। এই ধরনের বাড়িগুলো এরকমই হয়ে থাকে। নুরুন্নাহার বানু মনে করলেন, শিক্ষকটি সকলের সামনে তাকে হেয় করার জন্য গথিক ধাঁচের কথা বলেছেন। তিনি মনে করলেন, এটা এক ধরনের অপমান। তিনি জবাব দিলেন, আপনি কি মনে করেন, আমি দালানকোঠার কিছুই বুঝিনে, আমার আব্বা সারা জীবন ঠিকাদারি করেছেন, এখনো আমার ভাই সি. এন্ড বি, হাউজিং কর্পোরেশন এবং রোডস এন্ড হাইওয়েজের ফার্স্ট ক্লাস কন্ট্রাক্টর। আমাকে আপনার বাড়ি চেনাতে হবে না। জবাব শুনে সকলকে চুপ করে যেতে হলো। তারপরে কথার গতি কোনদিকে যেত বলা যায় না। চারজন ডীন গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে তাকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানাতে এলেন। উনারা সকলে ডোরাকাটা দলের সমর্থক। আগে যদি তাদের জানা থাকত আবু জুনায়েদ মিয়া তাদের কাঁধের উপর পা রেখে উপাচার্য হয়ে বসবেন এবং তাদের ফুলের তোড়া দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাতে হবে, তাহলে কাঁচা বাজারের থেকে ফেরার পথে তাকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলতে ইতস্তত করতেন না। যা হোক, প্রবীণ শিক্ষকদের আগমনে পরিবেশ আবার হাল্কা হয়ে এল।

সন্ধ্যেবেলা বেয়ারারা সবগুলো কক্ষের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। পয়লা নুরুন্নাহার ভাবলেন, অত আলোর কী দরকার। বেহুদা মোটা বিল আসবে। নিজ হাতে নিভিয়ে দিতে গিয়ে থেমে গেলেন। জ্বলুক বাতি জ্বলুক। তাদের তো আর বিল দিতে হবে না। বাতি জ্বালাবার পর তার চোখে একটা নতুন জিনিস ধরা পড়ল । উপাচার্য ভবনের রুমগুলো সত্যি প্রকাণ্ড। আবু জুনায়েদের ঘাড়ে ঠেলা দিয়ে বললেন, দেখেছ কত বড় একেকটা রুম। ফুটবল খেলার মাঠের মতো। আবু জুনায়েদ এবার একটা লাগসই জবাব দিতে পারলেন। টুটুলকে নিয়ে এসো। সারা দিন ঘরের মধ্যে ফুটবল খেলবে। টুটুল তাদের নাতি । কথাটা নুরুন্নাহারের মনে ভীষণ ধরে গেল । স্বামী-স্ত্রী দুজন ঠিক করলেন, রেবাকে তার বর এবং টুটুলসহ এসে কিছুদিন থেকে যাওয়ার জন্য খবর দেয়া হবে। প্রস্তাবটি শুনে নুরুন্নাহার বানু উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। এতদিনে তার প্রাণপ্রিয় নাতিটির হেসে খেলে বেড়াবার একটা ব্যবস্থা হলো ।

তারপর আবু জুনায়েদ এবং নুরুন্নাহার বেডরুমে গিয়ে ঢুকলেন। মেহগনি কাঠের কারুকার্য করা খাট দেখে নুরুন্নাহার বানুর খুশিতে একেবারে ফেটে পড়ার অবস্থা। দেখেছ দেখেছ কত বড় খাট, আর কী সুন্দর! তারপর গলায় একটা কৃত্রিম বিষণ্ণতা সৃষ্টি করে বললেন, কিন্তু মুশকিলের কথা হলো কী জানো, এই এতবড় খাটে ঘুমালে আমি অন্ধকারে তোমাকে খুঁজে বের করতে পারব না। নুরুন্নাহার বানুর জবাব দিতে গিয়ে আবু জুনায়েদ একটা বেফাঁস কথা বলে ফেললেন। খুঁজে পেয়েও লাভ কী? তোমার কী আছে? কথাটি মুখ থেকে কেমন করে বেরিয়ে এল জুনায়েদ টেরও পাননি। নুরুন্নাহার বানু সাপিনীর মতো উদ্যত ফণা তুলে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, কী বললে তুমি?

আবু জুনায়েদ বুঝতে পারলেন, ভারি অন্যায় করেছেন। এখন বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। তিনি তাড়াতাড়ি বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলেন এবং বেয়ারাকে বললেন, ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলো। ড্রাইভার গাড়ি বের করলে আপাতত তিনি পালিয়ে বাঁচলেন।

নুরুন্নাহার বানু কিছুক্ষণ স্থাণুর মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এই প্রথম অনুভব করলেন আবু জুনায়েদের জিহ্বায় অতি অল্প সময়ে শান পড়তে আরম্ভ করেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার দিকে তাকালেন। নিজের ছবি দেখে ঘুষি মেরে আয়নাটা ভেঙে ফেলার ইচ্ছে হচ্ছিল। এই সময়ে ড্রয়িং রুমে টেলিফোনটা বেজে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি নুরুন্নাহার বানু টেলিফোনটা ধরে জিজ্ঞেস করলেন :

হ্যালো কে কথা বলছেন?

ওপার থেকে নারীকণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এল, ভি . সি. স্যার আছেন?

না, নেই, খুব ভারী এবং গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন নুরুন্নাহার বানু।

কবে পাওয়া যাবে?

কেন আপনার কী দরকার?

আমি তার ডিপার্টমেন্টের একজন কলিগ, একটু কথা ছিল। ওপার থেকে জবাব এল।

কী নাম আপনার?

আমার নাম দিলরুবা খানম।

নামটি শোনামাত্র নুরুন্নাহার বানু টেলিফোনে চিৎকার করে উঠলেন :

আমার স্বামীর সঙ্গে, আপনি রাতের বেলা কী কথা বলতে চান? শুনুন দিলরুবা খানম, আপনাকে আমি চিনি। ঘাড় মটকানোর মতো অনেক যুবক পুরুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের কারো একজনের ঘাড়ে বসুন, আমার সংসারটির এমন সর্বনাশ করবেন না। আর কথা নয়। টেলিফোন রাখলাম।

উপাচার্য ভবনের প্রথম রাতটি আবু জুনায়েদের জন্য ছিল অগ্নি পরীক্ষার রাত । রাত দশটার দিকে বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখেন ঢাকা দেয়া ভাত তরকারি পড়ে আছে। নুরুন্নাহার বানু ছুঁয়েও দেখেননি। আবু জুনায়েদের বুকটা কেঁপে গেল। সরাসরি বেডরুমে প্রবেশ করতে সাহস হলো না। তিনি বাঁ দিকে বাঁক ঘুরে মেয়ের ঘরে গেলেন।

জিজ্ঞেস করলেন, তুমি খেয়েছ দীলু?

হ্যাঁ বাবা কবে। মেয়ে জবাব দিল ।

তোমার মা খায়নি কেন বলতে পার, অসুখ-বিসুখ করেনি তো?

আব্বা মেজাজ খারাপ করাটাই মার স্বভাব। কী হয়েছে আমি বলতে পারব না । এসব তোমাদের ব্যাপার, তোমরা দেখবে। আমাকে টানতে চেষ্টা করছ কেন? আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, আমি এখন ঘুমোব ।

অগত্যা আবু জুনায়েদকে বেডরুমে প্রবেশ করতে হলো। দেখেন নুরুন্নাহার বানু মেহগনি কাঠের অপূর্ব কারুকার্যময় খাটে বাঁকা হয়ে শুয়ে আছেন। তিনি কপালে হাত দিলেন। জ্বরজ্বারি কিছু নয়। অসুখটা অন্য জায়গায়। তিনি আস্তে আস্তে নুরুন্নাহার বানুর শরীরে হাত বুলিয়ে ডাকতে লাগলেন :

এই ওঠো খাবার পড়ে আছে। অনেক রাত এখন। সারা দিন তো কম ধকল যায়নি। নুরুন্নাহার বানু কোনো সাড়াশব্দ করলেন না। যেমন ছিলেন তেমনি শুয়ে রইলেন। আবু জুনায়েদ আরো একটু জোরে ঠেলা দিয়ে তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য ডাকাডাকি করতে থাকলেন। নুরুন্নাহার বানু এবার হাউমাউ করে কেঁদে বিছানার উপর উঠে বসলেন। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগলেন :

আমার আব্বা তোমাকে পড়ার খরচ না যোগালে আজ তুমি কোথায় থাকতে? আব্বা নিজের কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে ওরকম একজন ছোটলোকের কাছে তোমার আদরের মেয়েকে তুলে দেয়ার বদলে তাকে খুন করে ফেললে না কেন? তোমার কাছে হাত পাতা মেনি বেড়ালটির সাহস কতদূর বেড়েছে আর ঘাড় কতটা মোটা হয়েছে তুমি নিজের চোখে দেখে যাও । আজ সে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করে বেড়ায়। রাতের বেলা গাড়ি করে তার মেয়েমানুষদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আব্বা তোমার ছোট মেয়ের কপালে আল্লাহ কী দুঃখ লিখেছে দেখে যাও ।

আবু জুনায়েদ তার মুখে হাতচাপা দিয়ে বললেন :

–একটু ঠাণ্ডা হও, এসব আবোল-তাবোল কী বলছ?

নুরুন্নাহার বানু হাতটা মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে আরো জোরে চিৎকার করে বললেন :

–আমি ঠাণ্ডা হলে তোমার খুব আনন্দ হয়, না? আমি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেব । আমার আম্মাকে, ভাইকে ডাকব । তোমার মেয়ে জামাই সবাইকে খবর দিয়ে এনে সকলের সামনে প্রমাণ করব, রাতের বেলা তুমি ওই কসবি দিলরুবার সঙ্গে কোথায় কোথায় মজা করতে যাও। ঘরে মেয়ে আছে, মাগীর সে কথাটাও মাথায় আসেনি। টেলিফোন করে বলবে স্যারকে চাই।

আবু জুনায়েদ নুরুন্নাহার বানুর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, দেখো এসব কথা তুমি মন থেকে বানিয়ে বানিয়ে বলছ, আমি গাড়ি করে তোমার ভায়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম । তুমি টেলিফোন করে দেখো।

ধার্মিক সাজার চেষ্টা করবে না। তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনেছি। কতদিন থেকে ওই কসবির সঙ্গে তোমার লীলা চলছে?

কার কথা বলছ, আমি কোনো মহিলাকে চিনি না, কারো সঙ্গে আমার কোনো রকমের সম্পর্ক নেই।

এবার নুরুন্নাহার বানু আবু জুনায়েদের চোখে চোখ রেখে বললেন, তুমি বলতে চাও, তোমার সঙ্গে দিলরুবা খানমের গোপন পীরিত নেই?

–ছি ছি কী বলছ তুমি? চুপ করো । দারোয়ান বেয়ারা শুনলে কী বলবে?

নুরুন্নাহার বানু কণ্ঠস্বর আরো বাড়িয়ে বললেন, আমি সকলকে ডেকে শোনাব। ওই মাগী দিলরুবা টেলিফোনে আঁকু পাঁকু করে বলে কেন, স্যারকে চাই? এই রাতে স্যারকে কেন চাই? নুরুন্নাহার মুখের একটা ভঙ্গি করলেন। আবু জুনায়েদ এবার উপলব্ধি করতে পারলেন, তার দুর্ভোগের এই সবে শুরু। নুরুন্নাহার বানু কাটা কলাগাছের মতো ধপ করে বিছানায় পড়ে হাপুস-হুঁপুস করে কাঁদতে লাগলেন। তাদের চিৎকার সহ্য করতে না পেরে পাশের ঘর থেকে মেয়েটি বেরিয়ে এসে বলল :

আব্বা আম্মা আধারাতে তোমরা এসব কী শুরু করে দিয়েছ? সব কথা সব লোক শুনছে। কাল থেকে পাড়ায় মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না। সে বাতি নিভিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।

পরের দিন ভোর হওয়ার অনেক আগেই নুরুন্নাহার বানুর ঘুম ভেঙে গেল । আসলে সারা রাত তিনি দুচোখ এক করতে পারেননি। তার বুকের ভেতরটা জ্বলেছে। এবার থেকে তার পরাজয়ের পালা শুরু হলো। তার স্বামীর পদোন্নতি হওয়ার সংবাদ শোনার পর থেকে সকলের কাছে বলে বেড়াচ্ছিলেন, তার ভাগ্যেই, আবু জুনায়েদের জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। সে কথা মনে হওয়ায় এখন নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করল । মোল্লা আজান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিছানা থেকে উঠে পড়লেন। আবু জুনায়েদ বাম কাত হয়ে শুয়ে আছেন। তার নাক ডাকছে। নুরুন্নাহার বানু মনে করতে থাকলেন ওই মানুষটাই তার সারা জীবনের সমস্ত দুর্ভাগ্যের কারণ। মশারির বাইরে এসে স্পঞ্জে পা ঢুকিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে অনুভব করলেন, তিনি ভীষণ ক্ষুধার্ত। তক্ষুনি তার মনে পড়ে গেল গত রাতে তিনি কিছু মুখে তোলেননি। ডাইনিং রুমে এসে দেখেন গত রাতের ঢাকা দেয়া খাবার তেমনি পড়ে আছে। তিনি বাথরুমে গিয়ে মুখ হাতে পানি দিয়ে খেতে বসে গেলেন। ক্ষুধাটা পেটের ভেতর হুংকার তুলছিল। তাই বাসী ভাতে আটকালো না। ঢকঢক পানি খেয়ে নিয়ে কিচেনে ঢুকে এক কাপ চা করে আস্তে আস্তে খেতে লাগলেন। চা খাওয়া হয়ে গেলে তিনি হুড়কো খুলে বাইরে চলে এলেন। অল্প অল্প শীত করছিল। তাই একটি হাল্কা চাদর পরে নিয়েছিলেন। প্রথম সূর্যের আলো গাছপালার উপর এসে পড়েছে। ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দুগুলো টলটল করছে। অনেকদিন এমন নরম তুলতুলে ভোর দেখেননি। তিনি বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ির চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। হঠাৎ তার মনে একটা অনুভূতি জন্ম নিল, সঙ্গে আবু জুনায়েদ থাকলে বেশ হতো। তক্ষুনি গত রাতে যেসব ঘটনা ঘটেছে একটা একটা করে সবগুলো মনে পড়ে গেল। তিনি নিজের মনে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করতে লাগলেন, ছোটলোক, ছোটলোক। এই ছোটলোকটাই তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে । গত রাতে আবু জুনায়েদকে যে সকল হুমকি দিয়েছিলেন, সেগুলো মনে এল। তিনি তার আম্মা, ভাই এবং নিজের মেয়েকে ডেকে এনে যেসব কথা ফাঁস করবেন বলে ভয় দেখিয়েছিলেন, সেগুলো নিয়ে মনের ভেতর খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন। তার মনে হলো যেসব করবেন বলে রাগের মাথায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই প্রভাতের আলোতে মনে হলো তার কোনোটা করাই তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার মুখটা তেতো হয়ে গিয়েছিল । ছোটলোক, তার ঠোঁটে আপনিই মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হতে থাকল।

মনের মধ্যে অশান্তি, তবু সকাল বেলাটা তার মন্দ লাগছিল না। এইরকম ভোর তার জীবনে আর কখনো আসেনি। তিনি মস্ত কম্পাউন্ডটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। এরই মধ্যে একটা বেলা হয়েছে। দারোয়ান ঘটাং করে লোহার গেট খুলে ফেলেছে । ঝাড় হাতে, খুন্তি হাতে একদল মেয়ে পুরুষ কম্পাউন্ডের ভেতরে প্রবেশ করল । নুরুন্নাহার বানু পায়ে পায়ে গেটের কাছে চলে এলেন। ঝাড়অলা ঝড় তুলে, খুন্তি অলা খুন্তি তুলে সালাম দিল । নুরুন্নাহার বানুর নিজেকে তখন রাণী মনে হচ্ছিল । তিনি খুব খুশি হয়ে উঠেছিলেন। তথাপি তার মনের মধ্যে একটা খুঁত থেকে গেল। তার ইচ্ছে হলো বিষয়টা তিনি বুঝিয়ে দেবেন। পরক্ষণে চিন্তা করলেন, এসকল ছোটলোককে ভালো কিছু শিখিয়ে লাভ হবে না।

বরঞ্চ তিনি তাদের কাছে নিজের কর্তৃত্বটা জাহির করা অধিক উপযুক্ত মনে করলেন। কে কী কাজ করে জিজ্ঞেস করলেন। ঝাড়দার ঝাড়দারনী বলল, মেম সাহেব আমরা বাগানে ঝাড় দিতে এসেছি। বাড়িতে যারা ঝাড়ামোছার কাজ করবে, আসবে বেলা আটটার সময়। সকালবেলা ওই সমস্ত ঝাড়দার ঝাড়ুদারনীর সঙ্গে কথা বলতে তার মন চাইছিল না। তিনি মনে মনে ভেবে নিলেন, ঘুম থেকে উঠে, এই শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গে দেখা হলো, আজকের দিনটাই জানি কেমন যায়। মাথায় টুপি দাড়িঅলা বুড়ো মানুষটার দিকে তাকিয়ে মনে করলেন, হ্যাঁ, এই লোকের সঙ্গে তবু কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলা যেতে পারে । নুরুন্নাহার বানু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাজ কী?

বুড়ো ভদ্রলোকের মুখে একটা ছায়া পড়ল । সেদিকে নুরুন্নাহার বানুর চোখ আদৌ গেল না।

সালামত মিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক দিন থেকেই মালীর কাজ করে আসছেন। তার পেশার জন্য নয়, প্রাচীনতা এবং প্রবীণত্বের জন্য সকলেই তাকে সমীহ করেন, এবং আপনি সম্বোধন করেন। নুরুন্নাহার বানুর মুখে তুমি শব্দটা তার মনে আঘাতের মতো বাজল। তিনি তার স্বাভাবিক গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ না করে প্রশান্ত স্বরে জবাব দিলেন :

আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড মালি। বিগত বিশ বছর ধরে আমি এই কাজ করে আসছি। হাতের খুন্তিখানা আদর করতে করতে বললেন, ওই জোয়ান ছাওয়ালটা দেখছেন সে আমার অ্যাসিস্টেন্ট এবং মেয়ের জামাইও । গত পাঁচ বছর ধরে আমার সঙ্গে কাজ করে। বর্তমান উপাচার্যের আগের জনের আগের জন দয়া করে জামাইকে চাকরিটা দিয়েছিলেন। নুরুন্নাহার বানুর মনে হঠাৎ করে হুকুম করার আকাক্ষাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। তিনি বললেন :

চলো দেখাও দেখি তোমরা কী কাজ করো। সালামত মিয়া বললেন, বেগম সাহেবা আমার সঙ্গে সঙ্গে আসেন। বিরাট প্রশস্ত বাগান। সালামত মিয়া তাকে সাত রকমের গোলাপের গাছ দেখালেন। ক্রিসেনথেমামের ঝাড়গুলো দেখিয়ে বললেন, এগুলো অল্প কদিন পরে ফুটবে। শীতকালীন ফুলগুলো যখন ফুটতে থাকবে দেখবেন বাগানের চেহারাই পাল্টে যাবে । সালামত মিয়া তার জামাইকে সদ্য ফোঁটা ফুল নিয়ে ঝটপট একটা তোড়া করতে বললেন। তোড়াটা নুরুন্নাহার বানুর হাতে দিয়ে বললেন, বেগম সাহেবা নিন। নুরুন্নাহার বানু তোড়াটা নিলেন, কিন্তু বিশেষ খুশি হতে পারলেন না। সেটা তার ভাব ভঙ্গিতে প্রকাশ পেল।

তোমরা এতগুলো মানুষ সব বেহুদা পাতাপুতা লতা এসব লাগিয়ে গোটা জমিটাই ভরিয়ে রেখেছ। ওগুলো কোন কাজে আসবে? সব কেটে ফেলবে। এপাশে লাগাবে ঢেঁড়শ, ওপাশে বরবটি আর ওই যে খালি জায়গাটা রয়েছে ওখানে লাগাবে বেগুন এবং সুরমাই মরিচের চারা। বাজারে চারা পাওয়া না গেলে বলবে, আমার বড় বোনের বাড়িতে অনেক আছে, এনে দেব।

নুরুন্নাহার বানুর কথা শুনে সালামত মিয়া একেবারে চুপ করে গেলেন। তার মুখ থেকে কোনো কথাই বেরোল না। নুরুন্নাহার বানু ধমক দিয়ে বলল :

কী মিয়া চুপ করে আছ যে, কথাটা বুঝি মনে ধরল না?

সালামত মিয়া আমতা আমতা করে বললেন :

-বেগম সাহেবা তরিতরকারি লাগানো খুব ভালো। আর এইটা সিজনও। আমি আপনাকে পেছনে একটা তরকারির বাগান করে দেব। অনেক জমি আছে।

–কেন মিয়া সামনে লাগালে কী ক্ষতি। তরকারি বাগান সামনেই করো।

–না বেগম সাহেবা সামনে তরিতরকারির বাগান করা যাবে না।

–কেন যাবে না শুনি। আমি বলছি সামনেই করো।

–বেগম সাহেবা এ বাড়িতে সামনে তরিতরকারি লাগানোর নিয়ম নেই। আপনি নতুন এসেছেন তাই বুঝতে পারছেন না।

–কী বললে মিয়া?

–বেগম সাহেবা আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি আপনার এ হুকুম তামিল করতে পারব না।

সালামত মিয়ার কথা শুনে নুরুন্নাহার বানুর পায়ের তলা থেকে মাথার ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে উঠল । দাঁতে দাঁত চেপে তিনি একরকম দৌড়েই বাড়ির ভেতর গিয়ে ঢুকলেন। ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে পা দিয়েই তিনি অবাক হয়ে গেলেন। এই সাত সকালে পাঁচ পাঁচজন মানুষ ড্রয়িং রুমে বসে আছেন। তারা নুরুন্নাহার বানুকে উঠে সালাম দিলেন। তিনি কোনোরকমে সালামের জবাব দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। তিনি দেখলেন, নতুন স্যুট টাই পরে আবু জুনায়েদ অপর দরজা দিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করছেন। নুরুন্নাহার বানুর একচোট মনের ঝাল ঝাড়ার ইচ্ছে ছিল। সেটাই মাঠে মারা গেল। তারপরে তিনি কৌতূহলবশত ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখেন, সকালের নাস্তা দেয়া হয়েছে। আবু জুনায়েদ নাস্তা খাওয়ার সময় পাননি, তাকে জামা কাপড় পরে বের হতে হয়েছে। তখনই নুরুন্নাহার বানুর মনে পড়ল মানুষটা গত রাতেও কিছু খায়নি। আর এই সকালে চলে গেল । স্বামীটির প্রতি তার মনে এক ধরনের মমতা জন্মাতে লাগল। মানুষটা বোকাসোকা। খুব সহজেই তাকে ঠকানো যায়। তার সরল-সহজ স্বামীটিকে কোন ধুরন্ধর কোন বিপদে ফেলে দেয়, সে আশঙ্কায় তার মনটা গুড়গুড় করে উঠল । নুরুন্নাহার বানু মনে করেন, তিনি জীবনে যত জায়গা দেখেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ জায়গা। হঠাৎ অনেকদিন বাদে তার ইচ্ছে হলো, বেলা হয়ে গেলেও তিনি ফজরের নামাজটা পড়বেন।

সেদিন দিবানিদ্রা শেষ করে আবু জুনায়েদ বিছানায় বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে কি একটা বিষয় চিন্তা করছিলেন, এমন সময় নুরুন্নাহার বানু ঢুকলেন। তার মনে একটুখানি অনুশোচনার মতো হয়েছিল। তবে রাগটা পুরোপুরি মরেনি। আবু জুনায়েদের সঙ্গে দুটো মিষ্টি কথা বলার ইচ্ছে তার মনের মধ্যে জন্মেছে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছেন না। আর কি নিয়ে আলাপটা শুরু করবেন, বিষয় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ওগো আমি তোমাকে ভালবাসি, তোমাকে না দেখলে মনটা আমার কেমন করে, এসব কথা বলার বয়েস কি নুরুন্নাহার বানুর আছে? যখন তরুণী ছিলেন তখনো তিনি এ জাতীয় কথাবার্তাকে ন্যাকামি মনে করতেন। অনেক চিন্তা ভাবনা করে তিনি মুখ দিয়ে কথা বের করলেন :

-সকালে নাস্তা পানি মুখে না দিয়ে অমন হন্তদন্ত হয়ে কোথায় ছুটে গিয়েছিলে?

-আবু জুনায়েদ খুব খুশি হয়ে উঠলেন, তাহলে মেঘ কেটে গেছে। তিনি মনে মনে খুব স্বস্তি বোধ করলেন। এ বেলাটা মনে হচ্ছে ভালোই কাটবে।

-এখনো কি তোমাকে আবার বেরুতে হবে? জিজ্ঞেস করলেন নুরুন্নাহার বানু।

-না এ বেলা আর কোনো প্রোগ্রাম নেই, ঘরে থাকব । ভাবছি চা খাওয়ার পর বাড়ির পেছনের দিকটা একবার দেখব ।

নুরুন্নাহার বানুর মনে পড়ে গেল সকালবেলা সালামত মিয়া বলেছেন, পেছনে অনেক জমি আছে, সেখানে তার তরকারির বাগান করে দেয়ার কথা বলেছেন। প্রস্তাবটা তার খুব পছন্দ হয়ে গেল।

-আগে চাটা খেয়ে নিই। তারপর দুজন এক সঙ্গে যাব ।

নুরুন্নাহার বানু এবং জুনায়েদ যখন বাড়ির পেছনে এলেন, তখন বিকেলের রোদের তেজটা মরে এসেছে। এই বাড়ির পেছনে ঝোপেঝাড়ে ঢাকা এমন আশ্চর্য সুন্দর এক নির্জন পরিবেশ আছে, এখানে আসার আগে দুজনের কেউ চিন্তা করতে পারেননি। তারা কাঠবিড়ালিদের ছুটোছুটি করতে দেখলেন। দূরে কোথায় ঘুঘুর ডাক শুনতে পেলেন। সবুজ সতেজ দুর্বাবেষ্টিত প্রসারিত ভূমির উপর হাঁটতে হাঁটতে আবু জুনায়েদের মনে এল, এখন তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তার হাতে অনেক ক্ষমতা। শিশু যেমন প্রথম মাতৃ স্তন মুখে লাগিয়ে দুধের স্বাদ অনুভব করে, তেমনি আজ সকাল থেকে তিনি ক্ষমতার স্বাদ অনুভব করতে আরম্ভ করেছেন। এই ক্ষমতা নিয়ে কী করবেন চিন্তা করতে লাগলেন। এই ক্ষমতা নিয়ে কী করবেন? এই অপার ক্ষমতা দিয়ে যদি তার কোনো একটা শখ পূরণ করতে পারতেন, তাহলে সবচাইতে খুশি হয়ে উঠতে পারতেন। সহসা তার মনে এল, তিনি একটা দুধেল গাই পুষবেন। অঢেল জায়গা, প্রচুর ঘাস। অনায়াসে একটা গাই পোঝা যায় । গাইয়ের কথা মনে হওয়ার পর তার বাপের চেহারাটা চোখের সামনে জেগে উঠল । তার বাবা প্রতিদিন ধলেশ্বরির পাড়ে পাড়ে দড়ি ধরে গাই গরুটা চরাতে নিয়ে যেতেন। একদিন পাড় ভেঙে বাবা এবং গাই উভয়েই পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন। আয়ু ছিল তাই বেঁচে গিয়েছিলেন। এই গাইয়ের এক গ্লাস টাটকা গরম ফেনা ওঠা দুধ প্রতিদিন বিকেল বেলা তাকে পান করতে হতো। বাবা মরেছেন কতদিন হয়ে গেল। তবু মনে হয় গত কালের ঘটনা। আবু জুনায়েদ বারবার পরীক্ষায় ভালো করতেন। পরীক্ষায় ভালো করার পেছনের কারণ আবু জুনায়েদের প্রকৃতিদত্ত মেধা নাকি গাইয়ের দুধের উপকার, দুটোর মধ্যে কোনটা সত্যি এখনো স্থির করতে পারেন নি। দুধের ব্যাপারে তিনি ভাবনা-চিন্তা করছিলেন, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই গয়লাদের কথা তার মনে এল। এদের স্বভাব-চরিত্র ভীষণ খারাপ। দুধের মধ্যে শহরের ড্রেনের পানি মিশেল দিতেও তাদের আটকায় না। সমস্ত গয়লা শ্রেণীর উপর তার ভয়ানক রাগ। উপাচার্যের বদলে গয়লাদের শায়েস্তা করার কোনো চাকরি যদি পেতেন তার ধারণা তিনি আরো সুখী হতেন। মানুষের এই শত্রুদের তিনি থামের সঙ্গে বেঁধে আচ্ছা করে চাবকাবার হুকুম দিতেন। তিনি হাঁটছিলেন, আর অস্ফুটে কী সব বলছিলেন । নুরুন্নাহার বানুর মনে হলো, তার স্বামীটি তারই চোখের সামনে ভিন্ন প্রাণীতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তার রূপান্তর, পরিবর্তনের সবগুলো চিহ্ন তার চোখে এখন স্পষ্টভাবে ধরা পড়তে আরম্ভ করেছে।

আবু জুনায়েদ ডালপালা প্রসারিত ছাতিম গাছটিতে পিঠ ঠেকিয়ে স্বগতোক্তি করার মতো বলে ফেললেন: আমি একটা গাই গরু কিনব। এখন রাখার জায়গার অভাব নেই এবং ঘাসও বিস্তর। একটা গরু পোষার শখ অনেক দিনের। এবার আল্লাহ আশা পূরণ করার সুযোগ দিয়েছেন।

নুরুন্নাহার শুনে লাফিয়ে উঠলেন:

–সত্যি তুমি গাই কিনবে?

হ্যাঁ। আবু জুনায়েদ জবাব দিলেন ।

খুশিতে নুরুন্নাহার আবু জুনায়েদকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন । আবু জুনায়েদ তার মুখ চুম্বন করলেন।

.

০৫.

মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ থ্রি পিস স্যুট পরতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন। দিলরুবা খানম যতই তাকে দরজির দোকানের ডামি বলে লোকসমাজে অপদস্থ করতে চেষ্টা করুন না কেন, স্যুট টাই পরলে কোত্থেকে একটা আলগা বুকের বল তিনি অনুভব করেন। স্যুট পরে তিনি অফিস করেন, স্যুট পরে লোকজনের সঙ্গে দেখা করেন। যেদিন স্যুট গায়ে থাকে না, সেদিন নিজেকে ভারি বেচারা বেচারা বোধ করতে থাকেন। আবু জুনায়েদ মনে করতে থাকেন তিনি উলঙ্গ রয়েছেন। আর সব মানুষ তার যাবতীয় অক্ষমতা, দুর্বলতা এমনকি পেটের ভেতরের নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত দেখে ফেলছে। বাড়িতেও সর্বক্ষণ স্যুট পরে থাকতে চেষ্টা করেন। এই পোশাকটা তার শরীরে নতুন জন্মানো চামড়ার মতো সাপটে থাকে। মোট কথা, এই কয়দিনে তার এতদূর রূপান্তর ঘটেছে, মাঝে-মাঝে তিনি ভাবতে চেষ্টা করেন, এই স্যুট এই টাইসহ তিনি মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন কি না। যেদিন থেকে তিনি উপাচার্যের আসনটিতে বসেছেন, বুঝে গেছেন এই পোশাকটাই তার একমাত্র ভরসা। এই পোশাকই তাকে সোলেমানী গালিচার মতো বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করবে। এই গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনও তার বন্ধু নেই, সেই নিষ্ঠুর তেতো সত্যটি তিনি দাঁত তোলার মতো বেদনা দিয়ে অনুভব করেছেন।

বেগম নুরুন্নাহার বানু তার স্বামীর বেশভূষা দেখে হাসি-ঠাট্টা করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু মজার কথা হলো নির্মল হাসি-ঠাট্টা নুরুন্নাহার বানুর মুখ থেকে বেরোয় না। তিনি জখম না করে কাউকে কিছু বলতে পারেন না। একবার আবু জুনায়েদ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে টাইয়ের গেরোটি ঠিক করছিলেন, দেখে নুরুন্নাহার বানু মন্তব্য করে বসলেন

তুমি কি মনে করো স্যুট বুট পরলে তোমাকে সুন্দর দেখায়? তোমার হনুমানের মতো চেহারার কোনো খোলতাই হয়?

কথাটি শুনে আবু জুনায়েদ ভীষণ রেগে গেলেন । জবাবে বললেন—

আমাকে কেমন দেখায় তা নিয়ে তোমার মাথা ব্যথা কেন?

নুরুন্নাহার বানু আবু জুনায়েদের মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন :

–আমার কেন মাথা ব্যথা হবে? মাথা ব্যথা হবে ওই খানকি দিলরুবা খানমের? আমার আব্বা যদি তোমার পেছনে গাঁটের টাকা না ঢালতেন, আজকে তুমি কোথায় থাকতে?

মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করার লোকের অভাব নেই। সম্প্রতি তিনি বিশ্বস্তসূত্রে সংবাদ পেয়েছেন শিক্ষক সমিতির সভায় একজন প্রবীণ শিক্ষক রসিকতা করে তাকে ওরাং ওটাঙের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দিলরুবা খানম তাকে হরদম দরজির দোকানের ডামি বলে সকলের কাছে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন । বুড়ো বুড়ো শিক্ষকেরা তার নামে এটা কেন বলে বেড়ান, বিলকুল তিনি বুঝতে পারেন। তার মতো শিক্ষক সমাজের একজন অপাঙক্তেয় মানুষ ভাগ্যের কৃপায় তাদের নাকের ডগার উপর দিয়ে উপাচার্যের আসন দখল করে বসলেন, তাদের দৃষ্টিতে এটা অপরাধ। এই কারণেই তাদের সকলের নখ দাঁত গজিয়েছে। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ যতই বোকা হয়ে থাকুন না ওই ব্যাপারটা বোঝার মতো বুদ্ধি তার আছে। কিন্তু দিলরুবা খানম কেন সর্বক্ষণ তার নামে নিন্দের গীত গেয়ে বেড়াচ্ছেন, তিনি তার কোনো কারণ খুঁজে পান না। বলতে গেলে দিলরুবা খানমই তো তাকে হাত ধরে উপাচার্যের আসনটিতে বসিয়ে দিয়ে গেছেন।

মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ ভাবতে চেষ্টা করেন, এর হেতুটা কী হতে পারে? নারীর মনের গহন রহস্য আবু জুনায়েদের মতো ভোঁতা মানুষের বোঝার কথা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে নুরুন্নাহার বানুর পৌনঃপুনিক খোঁচা খেয়ে একটা বিষয় তার মনে আনাগোনা করে। দিলরুবা খানম কি তার প্রেমে পড়েছিলেন? প্রেমে না পড়লে, বলতে গেলে একা একটি জেহাদ পরিচালনা করে তাকে উপাচার্যের চেয়ারে বসালেন কেন? যতই বিষয়টা গভীরভাবে চিন্তা করেন, তিনি একটা ধাঁধায় পড়ে যান। দিলরুবা খানম তাকে এই যে এতদূর টেনে নিয়ে এলেন, তার পেছনে বিশুদ্ধ অনুরাগ ছাড়া আর কী স্বার্থ থাকতে পারে? মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ ভাবতে চেষ্টা করেন কোনো কারণে দিলরুবা খানমের কোনো দুর্বল জায়গায় তিনি আঘাত করে বসেছেন। তাই তিনি সকাল বিকেল তার বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই বলে বেড়াচ্ছেন। মানুষের মনের ভেতর কত রকম অলিগলি থাকতে পারে চিন্তা করে আবু জুনায়েদ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান । নুরুন্নাহার বানু যদি ক্রমাগতভাবে দিলরুবা খানমের নাম করে তাকে খোঁচা না দিতেন এদিকটা চিন্তা করে দেখার ফুরসতও তার হতো না।

আবু জুনায়েদ টাইয়ের নট বাঁধা শেষ করেন। জুতো পরতে গিয়ে দেখা গেল মোজা পাওয়া যাচ্ছে না। এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করলেন, পাওয়া গেল না। ছোকরা চাকরটিকে ডেকে আচ্ছা করে ধমকে দিলেন । নুরুন্নাহার বানুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, দেখো না মোজাজোড়া কোথায়? এদিকে আমার মিটিং শুরু হয়ে গেছে। নুরুন্নাহার বানু আঙুলে শাড়ির কোণা জড়াতে জড়াতে বললেন,

-তুমি আমার বাবার চাকর । তোমার আমার কাজ করে দেয়ার কথা, আমি কেন তোমার কাজ করব?

-কী বললে, আবু জুনায়েদ জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। নিজের কণ্ঠস্বরে নিজেই অবাক হয়ে গেলেন।

-তোমার বাবার কাছে চলে যাও। যে টাকার খোটা প্রতিদিন দিয়ে যাচ্ছ আমি সুদে আসলে শোধ করে দেব। তারপর মোজা না পরেই আবু জুনায়েদ জুতোয় খালি পা গলিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।

আবু জুনায়েদ চলে যাওয়ার পর নুরুন্নাহার বানু জগটা টেনে নিয়ে সবটা পানি ঢকঢক করে পান করে ফেললেন। মিনমিনে স্বভাবের আবু জুনায়েদ কখনো ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানতেন না। সেই মানুষটি কত প্রচণ্ড হতে পারেন তার প্রমাণ নুরুন্নাহার বানু হাতেনাতে পেয়ে গেলেন। তার সারা শরীর জ্বালা করছিল। তিনি চিৎকার করে উঠতে চাইলেন। পারলেন না, কে যেন কণ্ঠস্বর চেপে ধরল। পরম বেদনায় তিনি অনুভব করলেন, তার প্রতিপত্তির দিন শেষ হয়ে আসছে। উপাচার্যের চাকরি, এই সুদৃশ্য অট্টালিকা, গণ্ডায় গণ্ডায় লোকজন সাজসজ্জা সবকিছুকে তার অভিশাপ দিতে ইচ্ছে হলো ।

উপাচার্যের চাকরি করতে গিয়ে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ প্রতিদিন টের পাচ্ছিলেন তার ভেতরে অবিরাম ভাঙচুর চলছে। আগামী দিনে কী ঘটবে সে কথা বাদ দিন, একঘণ্টা পরে কী ঘটবে, সেটাও অনুমান করার উপায় নেই। আবু জুনায়েদ উপাচার্য হওয়ার পরে অর্থনীতি বিভাগের একজন ছাত্র খুন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দুটি ছাত্রদলই দাবি করেছে নিহত ছাত্রটি তাদের দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। দুদলই উপাচার্য ভবনের সামনে এসে মিছিল করেছে, স্লোগান দিয়েছে। দুদলই উচ্চ চিৎকারে দাবি করেছে জহিরুল হক কেন খুন হলো, সে জবাব আবু জুনায়েদকেই দিতে হবে। দুদলই চরম উত্তেজনার সঙ্গে জহিরুল হকের খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। নিহত ছাত্রের লাশটিও কারা দখল করবে তাই নিয়ে দুদলের মধ্যে যে তোড়জোড় চলছিল, অনায়াসে আরো এক ডজন ছাত্র খুন হতে পারত। সময়মতো পুলিশ এসে হস্তক্ষেপ করেছিল, তাই রক্ষে । নিহত ছাত্রটির গ্রামের বাড়ি কাঁপাসিয়া । সংবাদ পেয়ে মা-বাবা দুজনেই ছুটে এসেছিলেন । গ্রামের কৃষক । আবু জুনায়েদকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুত্র শোকাতুর মা-বাবার বুকফাটা ক্রন্দন শুনতে হয়েছে। একেবারে দাঁড়িয়ে থেকে ছাত্রটির লাশ বাড়িতে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। অনবধানতাবশত কোনো একদল যদি লাশ ছিনিয়ে নিয়ে যেত তাহলে সেই লাশ কাঁধে নিয়ে শহরে মিছিল করার সুযোগ পেলে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করা অসম্ভব ছিল না যার ফলে গোটা দেশে খুন এবং পাল্টা খুনের একটা উৎসব লেগে যেত। ব্যাপারটি যদি এতটুকুতে চুকেবুকে যেত তাহলেও কথা ছিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং ডেকে নিয়ে ধমক দিয়েছেন, সরকারি ছাত্রদলটির সমর্থক শহীদ ছাত্রটির খুনীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তিনি কেন তাদের পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিচ্ছেন না। আবার বিরোধী দলের একজন নেতা টেলিফোন করে শাসিয়ে দিয়েছেন, তাদের সমর্থক সুবোধ ছাত্রেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদে লেখাপড়া করতে পারছে না। সরকার তাদের অযথা হয়রানি করার জন্য পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে এবং আবু জুনায়েদ সরকারকে সাহায্য করে যাচ্ছেন, একথাটি যেন মনে থাকে। সব সময় দিন একরকম থাকবে না। কেন্টিনে চালের সঙ্গে বেশি কাকড় পাওয়া গেছে। ছাত্রেরা ভাতের থালাসহ দল বেঁধে মিছিল করে উপাচার্য ভবনে প্রবেশ করে একেবারে ডাইনিং রুমে চলে এসেছে। তখন আবু জুনায়েদ, নুরুন্নাহার বানু এবং একজন মেহমান দুপুরের খাবার খেতে বসেছিলেন। দারোয়ান কেয়ারটেকার কারো বাধা ছাত্রদের ঠেকাতে পারেনি ।

একজন ছাত্র ভাতের থালাটি ডাইনিং টেবিলে উপুড় করে দিয়ে স্লোগান দিয়ে উঠল, ‘ভাতের সঙ্গে কাকড় কেন আবু জুনায়েদ জবাব চাই’। যে সকল ছাত্র ভেতরে প্রবেশ না করে বাইরে ভিড় করেছিল তারাও সকলে মিলে স্লোগান দিতে থাকল ‘আবু জুনায়েদের চামড়া, তুলে নেব আমরা’। ছাত্রদের হাতে আবু জুনায়েদের লাঞ্ছনা এবং ভোগান্তি দেখে নুরুন্নাহার বানুর হাততালি দিয়ে খলখল করে হেসে উঠতে ইচ্ছে করে। কোন্ বাপের মেয়েকে অপমান করেছে, আবু জুনায়েদ! আল্লাহ কি নেই?

একদিন মহিলা হোস্টেলের পাশের ট্রান্সফরমারটি বিকট একটা শব্দ করে জানিয়ে দিল যে বেটা আত্মহত্যা করেছে! এই অকালপ্রয়াত ট্রান্সফর্মার মহিলা হোস্টেলের ছাত্রীদের একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থার মধ্যে ছুঁড়ে দিল। দুদিন ধরে হোস্টেলে কোনো পানি নেই। মেয়েদের গোসল, টয়লেট সব একরকম বন্ধ। বাইরে থেকে বালতি বালতি পানি আনিয়ে এক বেলার নাস্তা এবং রান্না কোনো রকমে সারা হয়েছে। মেয়েরা প্রথমে হাউজ টিউটর, তারপর প্রভোস্টের কাছে নালিশ করল। কোনো ফল হলো না দেখে সকলে তোয়ালে কাঁধে জড়িয়ে সাত পাঁচশ মেয়ে একযোগে উপাচার্যের বাড়ি ঘেরাও করে বসল। প্রমিলাবাহিনীকে বাধা দেয়ার ক্ষমতা দারোয়ানের কী করে হবে। তাদের একদল উপাচার্য ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে বাথরুমের বেসিন কমোড এগুলো ভাঙচুর করতে থাকল। আবু জুনায়েদের কিছুই করার ছিল না। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রলয়কাণ্ড দেখলেন। নুরুন্নাহার বানু ফস করে একটা অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন । এই মন্তব্য শুনে একটি মোটা উঁচু ষণ্ডামার্কা মেয়ে তার পরনের শাড়ির অর্ধেক টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই মেয়েরা যেমন পঙ্গপালের মতো ঝাঁক বেঁধে এসেছিল, তেমনি ঝাঁক বেঁধে চলে গেল। চলে যাবার সময়ে একটি বব কাটিং চুলের মেয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে রিভলবার বের করে আবু জুনায়েদের মস্তক তাক করে উঁচিয়ে ধরে বলল

-চাঁদু যেন মনে থাকে, কত ধানে কত চাল। গাঁইগুই করলে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব ।

হোস্টেলের মেয়েরা সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর নুরুন্নাহার বানু সিঁড়ির উপর বসে সমস্ত জীবন ধরে যে সমস্ত গালাগাল মুখস্থ করে রেখেছিলেন, একে একে মেয়েদের উদ্দেশ্যে ঝাড়তে লাগলেন-খানকি, মাগি, বেশ্যা, ছেনাল-হায়েজ নেফাজের পয়দায়েস আরো কত কী। মনে মনে সন্ধান করতে লাগলেন আরো শক্তিশালী গালাগাল আছে কি না। সে রকম কোনো কিছু না পেয়ে আবু জুনায়েদকে নিয়ে লাগলেন। তার দিকে রোষ কষায়িত লোচনে তাকিয়ে বলতে লাগলেন

-তোমার মতো একটা ছাগলের সঙ্গ বিয়ে হয়েছিল বলে এই ছেনাল মাগীদের হাতে আমাকে নাকাল হতে হলো।

সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় নতত্ত্ব বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে জোর লেখালেখি চলছে । ভদ্রলোক ছাত্রছাত্রীদের কাছে টাকা নিয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রয়ের ব্যবসাটি নিরাপদে এতদিন চালিয়ে আসছিলেন। অল্প কদিন আগে সেটি ধরা পড়েছে। বিভাগের সমস্ত শিক্ষক এবং ছাত্রেরা অকাট্য প্রমাণসহ উপাচার্যের কাছে দাবি জানিয়েছেন, এই ভদ্রলোক যদি এই বিভাগে বহাল থাকেন শিক্ষকেরা ক্লাশ নেবেন না এবং ছাত্রেরাও শিক্ষকদের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদও মনে মনে স্বীকার করেন, আবদুর রহমানের চাকরিটি থাকা উচিত নয় । কিন্তু মুশকিলের ব্যাপার হলো আবদুর হলেন উপাচার্যের নিজের দলের লোক। দলের কেউ চাইবেন না, আবদুর রহমানের চাকরিটি চলে যাক। আবু জুনায়েদের ইচ্ছে আবদুর রহমানকে বরখাস্ত করেন। কিন্তু উপাচার্যের ইচ্ছেই তো সব না, সিনেট আছে, সিন্ডিকেট আছে। সেখানে ব্যাপারটা ফয়সালা করতে হবে। সিনেট সিন্ডিকেটে আবদুর রহমান দলে ভারি। সুতরাং, আবদুর রহমানের অপরাধ কবুল করেও তিনি তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা রাখেন না। আবদুর রহমানকে বরখাস্ত করলে তার দলটি কানা হয়ে যাবে। দল না থাকলে আবু জুনায়েদকেও কানা হয়ে যেতে হবে ।

সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগের ছেলেমেয়েরা সদলবলে মিছিল করে এসে উপাচার্যের দপ্তরের দরজা জানালা ভাঙচুর করেছে। তাদের দাবি ছিল একটিই কেন তাদের পরীক্ষার তারিখ বারবার পিছানো হচ্ছে। ভাঙা দরজা জানালা নতুন করে মেরামত করার পর সমাজতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা তাদের পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে মেরামত করা দরজা জানালা আবার নতুন করে ভেঙে দিয়ে গেছে।

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা তাদের বেতন এবং ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে একটানা সাত দিন কর্মবিরতি পালন করেছেন । তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সপ্তাহব্যাপী কর্ম বিরতির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসারেরা পাঁচ দিনের কর্ম বিরতির ঘোষণা করেছেন। তাদেরও বেতন ভাতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। অফিসারদের কর্মবিরতির পর শিক্ষকেরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডেকে বসলেন। তাদের দাবি বেতন-ভাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, অনেক দূর প্রসারিত । বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সের সমস্ত দাবি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসরদের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর করতে হবে এবং অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরদের প্রফেসর । মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদও স্বীকার করেন এগুলো শিক্ষকদের অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত দাবি। কিন্তু দুঃখের কথা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে কোনো বাড়তি টাকা নেই। বাজেটের বরাদ্দ সমস্ত অর্থ ব্যয় করা হয়ে গেছে। শিক্ষকেরা আড়াই মাস গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ালেন। আর তাদের মধ্যে যারা সত্যিকার করিতকর্মা চুটিয়ে কনসালটেন্সি ব্যবসা চালালেন।

অবশেষে একদিন শিক্ষকেরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে ক্লাশে যোগ দিলেন। ঠিক সেই সময়ে দুই প্রধান ছাত্র সংগঠনের মধ্যে একটা সম্মুখ সমর বেঁধে গেল। মারা গেছে আটজন এবং আহত হয়েছে একশ জনেরও বেশি। যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে একজন ছাড়া আর সকলেই নির্দলীয় ছাত্র। প্রাণ দেয়া প্রাণ নেয়ার নেশা দু দলের বীর পুরুষদের এমনভাবে পেয়ে বসল তিনদিন ধরে গোটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কুরুক্ষেত্রের আকার ধারণ করল। কাটা রাইফেল ও মেশিনগান অবাধে ব্যবহার হতে লাগল। বোমাবাজির শব্দে কানপাতা দায় হয়ে দাঁড়ালো। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে সিন্ডিকেট ডেকে আবার অনির্দিষ্টকালের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে হলো।

বিশ্ববিদ্যালয় যখন একেবারে বন্ধ হয়ে যায় তখন আবু জুনায়েদের খুব খালি খালি লাগে। নানা উত্তেজনার মধ্যে সময় কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। চাপের মধ্যে থাকার একটা মজা হলো, নিজেকে কিছুই করতে হয় না, ঘটনা ঘটনার জন্ম দিয়ে চলে এবং ঘটনাস্রোতই সবকিছুকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। এ রকম সময় এলে মনটা

কাঁচা বাজারে যাওয়ার জন্য আঁকুপাঁকু করতে থাকে। হায়রে সেদিন কি আর আছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে কত কবি বাস করেন সঠিক সংখ্যাটি নিরূপণ করা হয়নি। দুশও হতে পারে আবার তিনশও হতে পারে। ফুল টাইম পার্ট টাইম মিলিয়ে যত লোক কবিতা লেখেন, প্রথম প্রেমে পড়ার উত্তাপ ছন্দোবদ্ধ অথবা গদ্য কবিতায় প্রকাশ করেন, সব মিলিয়ে হিসেব করলে হাজারখানেক দাঁড়িয়ে যেতে পারে। তিরিশ হাজার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে মাত্র এক হাজার কবি, সংখ্যাটা কিছুতেই অধিক বলা যাবে না। বাঙালি মাত্রেই তো কবি। এমনকি বাংলার দোয়েল, শ্যামা, কোকিল ইত্যাকার বিহঙ্গকুলের মধ্যে কবিত্বের লক্ষণ অত্যধিক মাত্রায় পরিস্ফুট। বিহঙ্গ সমাজের মধ্যে প্রচলিত সাধারণ কোনো বর্ণমালার চল নেই বলেই ওদের কবিত্ব শক্তির প্রতি আমরা উদাসীন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে স্থায়ীভাবে যারা কবিতা রচনার কাজে নিবেদিত রয়েছেন তরুণে প্রবীণে মিলিয়ে তাদের সংখ্যা গোটাতিরিশেক দাঁড়াতে পারে। মোটে তিরিশ জন, ফুলটাইম কবি তাদের মধ্যে মত ও পথের এত ফারাক যে খুব সূক্ষ্মভাবে হিসেব করলে একত্রিশটি উপদলের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা অসম্ভব হবে না। কবিদের কেউ কেউ বলেন কবিতাকে হতে হবে সমাজ বিপ্লবের হাতিয়ার । আরেক দল বলেন কবিতায় বিপ্লব টিপ্লবের কথা বলা এক ধরনের অশ্লীলতা। কবিতাকে পরিশুদ্ধ কবিতা হতে হলে অবশ্যই প্রেম থাকতে হবে। আরেকটি উপদল মনে করে প্রেম আবার কী? প্রেম কাকে বলে? মেনি বিড়ালের সঙ্গিনী খোঁজার চিৎকার যাকে ভদ্র ভাষায় প্রেম বলা হয়, ওই জিনিস কি কবিতার বিষয়বস্তু হতে পারে? এই রকম কত আছে! কেউ বলে ছন্দ দিয়ে কবিতা লেখা হয়, কেউ বলে ভাবই কবিতার আসল প্রাণবস্তু। আরেক দল বুকে তাল ঠুকে প্রকাশ করতে কসুর করে না ভাষাই কবিতার সবকিছু। এই ধরনের যত প্রকারের মতভেদ আছে সেগুলোর কোনোদিন নিরসন হবে, কবিরাও তা আশা করেন না। ডিম্ব আগে না বাচ্চা আগে এই বিতর্ক চলতে থাকবে।

সূক্ষ্ম ভেদ, উপভেদ এগুলো আপনিই লুপ্ত হয়ে যায়, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী কবিগোষ্ঠী সুযোগ-সুবিধের প্রশ্নে একে অপরের প্রতিস্পর্ধী হয়ে দাঁড়ায়। একদল বাংলা একাডেমীর মাঠে কবিতা পড়লে, আরেক দল শিল্পকলা একাডেমীর মিলনায়তনে এসে জড়ো হন। যেহেতু রাজনীতি সমাজের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, তাই কবিদেরও রাজনৈতিক ছাতার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। বিরোধী দলীয় কবিদের সুবিধে একটু বেশি। কারণ দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারকে আক্রমণ করা সহজ এবং তা করে অনায়াসে পাঠক বাহবা লাভ করা যায়। বিরোধী দলের কবিরা যদি স্লোগান দেয় কবিতা মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা রুখতে পারে। সরকার ঘেঁষা কবিরা আরো মনকাড়া স্লোগান উচ্চারণ করেন, প্রকৃত কবিতা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়ে দিতে পারে।

মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ কবিতার কিছুই বোঝেন না। তথাপি তাকে সরকার ঘেঁষা কবিদের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হওয়ার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বাংলার প্রবীণ অধ্যাপক সরকারঘেঁষা কবিদের সংগঠনটির সভাপতি। তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে আবু জুনায়েদের দল করে থাকেন। ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদকসহ এসে ড. (কবি) মনিরুল আলম যখন ধরে বসলেন আবু জুনায়েদ না করতে পারলেন না। সভা-সমিতিতে কথা বলতে বলতে এককালীন মুখচোরা লাজুক মানুষ আবু জুনায়েদের জিহ্বাটি ওই সময়ের মধ্যে অসম্ভব রকমের ধারালো হয়ে উঠেছে। যে কোনো সভায় কোনোরকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া ঝাড়া আড়াই ঘণ্টা বক্তৃতা দিতে পারেন। উপাচার্য হওয়ার প্রথম দিকে সভা-সমিতিতে কথা বলতে উঠলে তার হাত পা কাঁপত, গলা শুকিয়ে আসত। এখন কথা বলতে গেলে জিহ্বাটি আপনা থেকে নেচে উঠতে চায়। শব্দগুলো বাকযন্ত্রের মুখে পুঁটি মাছের মতো আপনিই উজিয়ে আসে । তথাপি কোনো জটিল বিষয়ে বক্তৃতা দেয়ার প্রশ্ন উঠলেই ব্যক্তিগত সহকারীকে ডেকে সে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর করতে নির্দেশ করতেন। মোটের উপর একটা প্রস্তুতি গ্রহণ করেই সভা-সমিতিতে যেতেন। এই কবিদের সভাটিতে যাওয়ার সময় সহকারীকে ডাকার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। আবু জুনায়েদ নিশ্চিতভাবে জানতেন বাংলা সাহিত্য বিষয়ে তার ব্যক্তিগত সহকারীর জানাশোনা তার চাইতে অনেক কম। সুতরাং, শুধু আত্মপ্রত্যয়ের উপর নির্ভর করে সরকারঘেঁষা কবি সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে একটা মজার বক্তৃতা দিয়ে বসলেন।

তিনি তার বক্তৃতার এক জায়গায় বলে বসলেন, কাজী নজরুল ইসলাম যদি : দীর্ঘকাল সুস্থ থাকতে পারতেন তিনিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো নোবেল প্রাইজটি পেয়ে যেতেন। হিন্দুরা ষড়যন্ত্র করে নজরুলের মাথাটি খারাপ করে দিয়েছিল, তাই তার ভাগ্যে নোবেল পুরস্কারটি জোটেনি।

নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। আবু জুনায়েদ জাতীয় কবির সম্মান বৃদ্ধি করার জন্য যে অপূর্ব বক্তৃতা দিলেন, শুনে সরকারের চামচা কবিরা পর্যন্ত প্রমাদ গুনলেন। তারা তাদের সম্মেলনটির ওজন বৃদ্ধি করার জন্য উপাচার্য আবু জুনায়েদকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। আবু জুনায়েদ নজরুলকে বড় করে দেখাতে গিয়ে পূর্বাপর সম্পর্করহিত একটা বেঁফাস মন্তব্য করে তাদের গোটা সম্মেলনটাকে খেলো করে দিলেন। সভার শেষে ড. (কবি) মনিরুল আলম আবু জুনায়েদকে উদ্দেশ্য করে বললেন :

-স্যার নজরুলের ব্যাপারে এই অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি না করলেও পারতেন।

-কোন্ মন্তব্যের কথা বলছেন। আবু জুনায়েদের কণ্ঠে ঈষৎ বিরক্তির সুর।

-আপনি যে বলেছেন নজরুল সুস্থ থাকলে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতেন এবং হিন্দুরা ষড়যন্ত্র করে তার মাথা খারাপ করে দিয়েছিল।

-অন্যায় কী বলেছি। একজন কামেল এবং বুজুর্গ মানুষের কাছ থেকে আমি শুনেছি হিন্দুরা ষড়যন্ত্র করে নজরুলের মাথাটি খারাপ করে দিয়েছিল। শাহ্ সুফী খান বাহাদুর মরহুম রহমতুল্লাহ এম. এ. বিটি সাহেবের মুখ থেকে আমি ছাত্রজীবনে এই কথা শুনেছি। তিনি আমাদের হেডমাস্টার ছিলেন। আদর্শ শিক্ষক হিসেবে ব্রিটিশ সরকার তাকে খান বাহাদুর টাইটেল দিয়েছিল। সেই যুগে গোটা জেলায় তার মতো অমন বাঘা হেডমাস্টার একজনও ছিলেন না। তাকে কেউ কখনো একটিও বেহুদা কথা বলতে শোনেনি। জীবদ্দশায় তিনি তিন তিনবার পবিত্র মক্কা শরীফ জেয়ারত করেছিলেন। এন্তেকালের পর তার কবরটা একটি দরগাতে পরিণত হয়েছে। তার মুখ থেকে যে কথাটি অনেকবার শুনেছি আমি অকপটে বলেছি এতে দোষের কী থাকতে পারে।

এমন অকাট্য প্রমাণ হাজির করবার পর ড. (কবি) মনিরুল আলমের আর কিছু বলার রইল না। দুদিন না যেতেই বিরোধী দল সমর্থক সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্রটিতে আবু জুনায়েদের একটি কার্টুন চিত্র প্রকাশিত হলো। আবু জুনায়েদের প্রতিকৃতি শূয়রের আকারে আঁকা হয়েছে, সামনে মাইক্রোফোন এবং তিনি কবিতা সম্মেলনে ভাষণ দিচ্ছেন।

উপাচার্য পদে আসীন হওয়ার পর থেকে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের একটি নতুন অভ্যেস জন্ম নিয়েছে। তিনি নিয়মিত শুক্রবারে মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজটি আদায় করতে শুরু করেছেন। তার মধ্যে কোনোরকম ধর্মপ্রীতি বা পরকালভীতি জন্ম নিয়েছে বলেই শুক্রবারে মসজিদে আসাআসি করছেন, সেটা সত্যি নয়। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়লে তার প্রতি এক শ্রেণীর মানুষের ভক্তি শ্রদ্ধা বাড়ে, সেটা ঠিক । তবু আবু জুনায়েদ সঠিক বুঝে উঠতে পারেন না, কী কারণে তার এ নতুন অভ্যেসটি জন্মেছে।

মসজিদে কিছুদিন যাওয়া আসার পর আবু জুনায়েদের উপলব্ধি করতে বাকি রইল না, এর একটি সাংঘাতিক ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই মসজিদে এসেই তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হন স্বঘোষিত নাস্তিক আহমদ তকির উপর সাধারণ মুসল্লির কী পরিমাণ ঘৃণা রয়েছে। আহমদ তকি ভদ্রলোকটির সঙ্গে তার এক ধরনের খাতির হয়েছিল। তকি সাহেব রস করে কথাবার্তা বলতে জানতেন এবং আবু জুনায়েদ সেটা উপভোগও করতেন। আর তাছাড়া অনেক ভালো কথাও তকি সাহেব বলে থাকেন। মসজিদে এসেই আবু জুনায়েদ টের পেয়ে যান যে, আহমদ তকি এই সময়ের মধ্যে আল্লাহ এবং তার প্রিয় রসুলের খাস দুশমনে পরিণত হয়েছেন। সহজাত অনুভব দিয়েই আবু জুনায়েদ বুঝে গেলেন ভবিষ্যতে আহমদ তকির সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

আহমদ তকি আল্লাহ রসুলের পুরনো চিহ্নিত দুশমন। এই সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আল্লাহ রসুলের যে সকল নতুন দুশমন পয়দা হয়েছে, তাদের সকলের নাড়িনক্ষত্রের খবর জেনে গেছেন। আবু জুনায়েদ মনে করেন, একটা ব্যাপারে তিনি লাভবান হতে পেরেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনমতের হাওয়া কোনদিকে বইছে মসজিদে এলে তার একটি পূর্বাভাস তিনি পেয়ে যান। হালে তার মধ্যে একটা নতুন অন্তদৃষ্টি জন্মাতে আরম্ভ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাপারে জনমত গঠন করার জন্য মসজিদ একটি মোক্ষম জায়গা।

এক শুক্রবারে তার মসজিদে আসতে একটু দেরি হয়েছিল। তিনি পেছনের কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছিলেন। কিন্তু নামাজ শেষ হওয়ায় অন্যান্য মুসুল্লীরা তাকে সামনে আসতে অনুরোধ করলেন। তিনি সামনে এলে চার পাঁচজন মুসল্লী একসঙ্গে কবিতা সম্মেলনে নজরুল ইসলাম সম্পর্কিত একেবারে বৈজ্ঞানিক সত্যটি (অর্থাৎ হিন্দুরা তার মাথাটি খারাপ করে দিয়েছিল) প্রকাশ করার জন্য একসঙ্গে ধন্যবাদ জানালেন। ফার্সি ভাষার শিক্ষক (যে বিষয়ে একজনও ছাত্র নেই) মাওলানা আবদুর রহমান তালিব দাঁড়িয়ে তার হস্ত চুম্বন করলেন এবং প্রকাশ্যে আলিঙ্গন দান করলেন। তারপর আবদুর রহমান তালিব সাহেব সমবেত মুসল্লিদের সামনে ঘোষণা দিয়ে বসলেন, এই এতদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন পরহেজগার উপাচার্য এসেছেন। আল্লাহ তার হায়াত দারাজ করুন। এই উপাচার্যকে দিয়ে ইসলামের অনেক খেদমত হবে। নামাজ শেষ করে বেরিয়ে আসছিলেন। মাওলানা আবদুর রহমান তালিব সাহেব অনুরোধ করলেন,

-হযরত আমি কি আপনার সঙ্গে আসতে পারি? আপনার দরবারে আমি পবিত্র ইসলামী উম্মাহর পক্ষ থেকে কিছু আরজি পেশ করতে চাই। আবু জুনায়েদ মাওলানা আবদুর রহমান তালিবকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলেন।

উপাচার্য ভবনে আসার পর মাওলানা আবদুর রহমান তালিব জানালেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের শত্রুরা তৎপর হয়ে উঠেছে। তিনি যদি একটা শক্ত অবস্থান না নেন ইসলামের জানি দুশমনেরা মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি করতে অধিক তৎপর হয়ে উঠবে।

ইসলামের ক্ষতি করার জন্য ইসলাম বিরোধীরা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে, সে বিষয়ে আবু জুনায়েদ কিছু জানতেন না। তিনি একটু বিশদ করতে বললেন। উত্তরে মাওলানা সাহেব জানালেন রামনাথ ছাত্রাবাসে হিন্দুরা বিবেকানন্দ না কোন একজন হিন্দুর মূর্তি তৈরি করেছে। এ ধরনের কাজ ব্রিটিশ আমলে সম্ভব হয়নি, পাকিস্তান আমলে সম্ভব হয়নি। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে যেখানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম বিবেকানন্দ বাবুর পাথুরে মূর্তি বহাল তবিয়তে তৈরি হয়ে গেছে। এটা কি একটা ষড়যন্ত্রমূলক কাজ নয়?

আবু জুনায়েদ জানালেন, বিবেকানন্দের মূর্তিটা তিনিই উদ্বোধন করেছেন। মাওলানা সাহেব যেসব অভিযোগের কথা বলছেন, এসব কিছুই তার মনে আসেনি। আর মূর্তিটা তৈরি করেছে একজন মুসলমান মহিলা, ভাস্কর। এতে দোষের কী থাকতে পারে, তিনি ভেবে পান না।

মাওলানা সাহেব জবাবে জানালেন–

-আপনি খুব সরল মানুষ। মালাউনদের চক্রান্তটি ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। একটি মুসলিম মহিলাকে দিয়ে মূর্তিটি তৈরি করিয়ে আপনাকে দিয়ে উদ্বোধন করালো, এখানেই চক্রান্তের খেলায় আমরা হেরে গেলাম। মূর্তি নির্মাণের টাকাটি দিয়েছে গোপনে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা এতই চালাক যে, মুসলমানদের দিয়ে তাদের মূর্তি নির্মাণের রাজমিস্ত্রীর কাজটি করিয়েছে এবং আপনাকে দিয়ে উদ্বোধন করিয়ে মূর্তিটা আইনগতভাবে সিদ্ধ করে নিল। পূর্বে কখনো মালাউনেরা মুসলমানদের এভাবে ব্যবহার করেছে আমার জানা নেই। তাদের এক দাঁতের বুদ্ধি যদি থাকত কওমের কি এত দুর্দশা হয়?

আবু জুনায়েদ দুচোখ বন্ধ করে কিছু একটা চিন্তা করতে চেষ্টা করলেন। তার মনে হলো মাওলানা আবদুর রহমান তালিবের কথার মধ্যে কিছু পরিমাণ হলেও সত্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। তিনি বললেন :

কাজটা তো করা হয়ে গেছে। এখন কি কিছু করার উপায় আছে? আপনারা এ কথা আগে বলেননি কেন?

মাওলানা তালিব সাহেব জানালেন,

-আগে তো আমরা জানতাম না আপনার ঈমান এমন সাচ্চা। আমরা ধরে নিয়েছিলাম আপনি দিলরুবা খানমের লোক। ওই বেটির সঙ্গে মালাউনদের গলায় গলায় ভাব।

-এখন কী করতে হবে সেটা বলুন, যা হবার তো হয়ে গেছে। বললেন আবু জুনায়েদ।

মাওলানা সাহেব সাড়া দিয়ে জানালেন-আপনি যদি একটা দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন, আমরা ইসলামের জন্য অনেক কিছু করতে পারি।

সে অনেক কিছুর মধ্যে কোন্ কাজগুলো পড়ে? জানতে চাইলেন আবু জুনায়েদ।

মাওলানা আবদুর রহমান তালিব ফিসফিস করে বললেন-হাবিবুল্লাহ মুসলিম ছাত্রাবাস এবং ফরমানুল হক মুসলিম ছাত্রাবাস দুটো থেকে একাত্তর সালের পর মুসলিম নাম বাদ দেয়া হয়েছে, আমরা মুসলিম নাম যোগ করার আন্দোলন চালাব এবং দাবি তুলব বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম ইসলামসম্মত নয়, সেটা পাল্টাতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম পাল্টাতে বলছেন আপনারা, সেটা কি সম্ভব। মাওলানার প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন।

মাওলানা জবাবে বললেন :

-কেন সম্ভব নয়, বিবেকানন্দ বাবুর মূর্তি যদি তৈরি হতে পারে, মনোগ্রাম পাল্টানো যাবে না কেন? খোঁজ করে দেখুন ভারতবর্ষে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিবেকানন্দের মূর্তি বসানো হয়নি। অথচ আপনারা এখানে পূজা আরম্ভ করে দিয়েছেন।

এবার জুনায়েদের মুখে ভয়ার্ত ভাব ফুটে উঠল। যথাসম্ভব কণ্ঠস্বর সংযত করে বললেন–

-আমি কিন্তু এসবের মধ্যে থাকতে পারব না।

মাওলানা আবদুর রহমান কণ্ঠে দরদ ঢেলে বললেন :

আমরা আপনার অবস্থা বুঝি। আপনাকে বিপদে ফেলার কোনো খায়েশ আমাদের নেই। কিন্তু আমরা যখন কোনো আন্দোলন শুরু করব আপনি সমর্থন না করতে পারেন, কিন্তু বাধা দেবেন না।

আবু জুনায়েদ মাথা নাড়লেন। এর অর্থ হা হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

মাওলানা আবদুর রহমান তালিব উঠে দাঁড়িয়ে আবার বসে পড়লেন।

–আপনার কাছে আমি আরো দুটো আর্জি পেশ করতে চাই। আবু জুনায়েদ বললেন, বলুন। মাওলানা সাহেব জানালেন, কলাভবনের ছাদে গুণ্ডা বদমায়েশরা নানা জায়গা থেকে মেয়েছেলে নিয়ে সারা রাত মৌজ করে কাটায়। দারোয়ানরা কোনো বাধাই দেয় না। বরঞ্চ টাকা-পয়সা নিয়ে বদমায়েশদের সহযোগিতা করে। ও জিনিসটি আপনাকে বন্ধ করতে হবে।

আবু জুনায়েদ বললেন :

দারোয়ানরা যদি এই কাণ্ড করে আমি কী করে বাধা দিতে পারি।

–মাঝে-মাঝে এক আধবার আপনি নিজে গিয়ে চেক করেন, ভয় পেয়ে দারোয়ানরা বন্ধ করে দেবে। বললেন মাওলানা তালিব।

-সেটা কি উপাচার্যের পক্ষে সম্ভব? বললেন আবু জুনায়েদ।

-কেন সম্ভব নয়? ইসলামের খলিফারা এভাবেই তো খারাপ কাজের সংবাদ নিতেন। মাওলানা আবদুর রহমান আঙুলে দাড়ি নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন :

উপাচার্য ভবনের পশ্চিম দিকে যে রাস্তাটা আছে তার ডানে বামে রজবতী মহিলারা তাদের হায়েজ নেফাজের পুরিন্দাগুলো ফেলে দিয়ে যায়। এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। এই পথ দিয়ে যারাই যাওয়া আসা করে তাদের কাপড়চোপড় থেকে শুরু করে সারা শরীর নাপাক হয়ে যায়। গোটা এলাকার পবিত্রতা বজায় রাখতে হলে রাস্তার পাশে পুরিন্দাটি ফেলার কাজ বন্ধ করতে হবে।

মাওলানা আবদুর রহমান তালিবের দ্বিতীয় প্রস্তাবটি শুনে একদিকে যেমন আবু জুনায়েদের হাসি সংবরণ করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ালো তেমনি অন্যদিকে ভীষণ রাগ হচ্ছিল। তিনি মাওলানা সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন :

–মহিলারা ম্যানাস্ট্রসনের প্যাড কোথায় ফেলবেন, তাও আমাকে পাহারা দিতে বলেন? সেটাও কি উপাচার্যের কাজ? মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি অকারণে রেগে যাচ্ছেন। আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি একটা নোটিশ লটকে দিন। এই রাস্তার পাশে পুরিন্দা ফেলা বেআইনী এবং অনৈসলামিক। এই পথ দিয়ে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান যাতায়াত করে থাকেন। পুরিন্দার কারণে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ এবং অনেক সময় তামাম শরীর অপবিত্র হয়ে যায়। যারা পুরিন্দা ফেলে যায়, আখিরাতে তাদের আজাব ভোগ করতে হবে ।

.

০৬.

শেখ তবারক আলীর সঙ্গে আবু জুনায়েদের পরিচয় ঘটল। এটা তার উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর সবচাইতে স্মরণীয় ঘটনা। তবারক আলী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকাদার। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর মহিলা ছাত্রীনিবাসের নির্মাণ কাজ দেখতে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত কানপুরি টুপি মাথায় এক ধোপদুরস্ত বুড়োমতো ভদ্রলোক এগিয়ে এসে তাকে সালাম দিয়েছিলেন। ভদ্রলোকের মুখে অল্প অল্প দাড়ি। একহারা দীঘল চেহারা। বয়েস হলেও ভদ্রলোক শিরদাঁড়ার উপর ভর করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। এই দাঁড়ানোর ভঙ্গি ছাড়া আরো দুটো জিনিস আবু জুনায়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। একটা হলো ভদ্রলোকের তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। অন্যটা গলার আওয়াজ। এমন শান্ত অনুত্তেজিত কণ্ঠস্বর আবু জুনায়েদ কখনো শুনেছেন মনে পড়ে না।

তবারক সাহেবের কাছে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ভদ্রলোক বলতে আরম্ভ করলেন। তিনি এবং আবু জুনায়েদের স্বর্গগত শ্বশুর, আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন, একই সময়ে ঠিকাদারী ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন। বলা যেতে পারে আবু জুনায়েদের শ্বশুর সাহেবই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তবারক আলীকে ঠিকাদারী পেশায় টেনে এনেছিলেন। কর্মজীবনে তার কাছে এক পয়সা মূলধন ছিল না। মরহুম আব্দুল গোফরানের লোক চেনার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। একবার চোখের দেখা দেখেই ঠিক ধরে নিতে পারতেন, কে কাজের মানুষ, কে ফালতু। আর জুনায়েদের শ্বশুর সাহেব কপর্দকহীন শেখ তবারক আলীকে ওয়ার্কিং পার্টনার হিসেবে গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ করেননি। আজকে যে তিনি ছেলে মেয়ে নিয়ে আল্লাহর রহমতে দুটো নুন-ভাত খেয়ে জীবন চালাতে পারছেন, তার পেছনে গোফরান ভাইয়ের মস্ত একটা ভূমিকা রয়েছে। যতদিন জীবিত ছিলেন, তিনি গোফরান সাহেবকে আপন মায়ের পেটের বড় ভাইয়ের চাইতেও অধিক শ্রদ্ধা-সম্মান করে এসেছেন। তবারক সাহেব আবু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানুকে আপন মেয়ের মতো জ্ঞান করেন। মরহুম গোফরান ভাই কত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন, তার একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে নুরুন্নাহার বানুর পাত্র নির্বাচন করার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করলেন। কত বড় বড় খানদানি পরিবারের ছেলের সঙ্গে বানুর মানে নুরুন্নাহারের বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। গোফরান ভাই এক কথায় সবাইকে বিদেয় করে বানুর পাত্র হিসেবে আবু জুনায়েদকে পছন্দ করেছিলেন। আজকে যদি গোফরান ভাই জীবিত থাকতেন, নিজেই দেখতে পেতেন, তার পছন্দ কত সঠিক ছিল। বানুর বর আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন। তার দুচোখের কোণা চিকচিক করে উঠল। বুঝি তখনই কেঁদে ফেলবেন। আবু জুনায়েদের ভীষণ ভয় করতে লাগল। এই তবারক বেটা তাহলে তার বিষয়ে সবকিছু জানে। তার স্বর্গগত পাতানো বড় ভাইয়ের মহিমা কীর্তন করতে গিয়ে যদি বলে বসেন, আবু জুনায়েদ শ্বশুরের কাছ থেকে পয়সা নিয়ে লেখাপড়া করেছেন তাহলে লোকজনের সামনে তার মাথাটা কাটা যাবে। তার হৃদয়স্পন্দন দ্রুত হলো, বুক দুরুদুরু করতে থাকল।

শেখ তবারক আলীকে কিছু একটা বলে কথার মোড় ঘুরিয়ে দেবেন সে রকম কোনো বিষয়ও তিনি খুঁজে পেলেন না। আবু জুনায়েদের পা দুটো মাটির সঙ্গে গেঁথে যাচ্ছিল। ঠোঁট শুষ্ক হয়ে আসছিল। বারবার তিনি জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটছিলেন। অবশেষে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। শেখ তবারক আলী জানালেন, তিনি মরার আগে বানুর স্বামীকে উপাচার্যের আসনে দেখে গেলেন এটাই তার সান্ত্বনা। তবারক আলীর প্রতি আবু জুনায়েদের মনোভাবটাই পাল্টে গেল। তবারক আলী ইচ্ছে করলে মাত্র একটি বাক্য উচ্চারণ করে আবু জুনায়েদের মান ইজ্জত ধুলোয় লুটিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি কথাটি বলেননি। আবু জুনায়েদ তবারক আলীকে অত্যন্ত মহানুভব মানুষ মনে করলেন। ছাত্রীনিবাসের নির্মাণ কাজ দেখে ফিরে আসার সময় তিনি শেখ তবারক আলীকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন। শেখ তবারকও সেই নিমন্ত্রণ কবুল করেছিলেন।

তারপর সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন পরিস্থিতিতে আবু জুনায়েদের সঙ্গে শেখ তবারক আলীর মুলাকাত ঘটল। একদিন তিনি তার অফিসে ফ্যাকাল্টির ডীনদের নিয়ে বহিরাগত মস্তানদের উৎপাত ঠেকানোর উপায় উদ্ভাবন করার বিষয়ে মিটিং করছিলেন। মিটিং চলাকালীন সময়ে একেবারে দরজা ঠেলে শেখ তবারক অফিস কক্ষে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এবং বললেন আমাকে বাঁচান। তার চুল উষ্কখুষ্ক। পাজামার অর্ধেক কাদায় ভরে গেছে। শরীর থরথর করে কাঁপছিল। মুখ দিয়ে ঠিকমতো স্বর বেরুচ্ছিল না। ঠিকাদার সাহেবের এই করুণ অবস্থা দেখে সকলে ভীষণ হতবাক হয়ে গেলেন। আলোচনায় আপনাআপনিই ছেদ পড়ে গেল। সকলেই উৎকণ্ঠাসহকারে জানতে চাইলেন, কী ঘটেছে? শেখ তবারক আলী বললেন, তিনি পানি খাবেন। এক গ্লাস পানি এনে তাকে দেয়া হলো। সবটা পানি নিঃশেষ করার পর বললেন, আরো এক গ্লাস পানি। আরো এক গ্লাস তাকে দেয়া হলো, তারপর আরেক গ্লাস।

শেখ তবারক আলীর নিশ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। শরীরের কাঁপুনিও অনেকটা কমেছে। কিন্তু চোখ থেকে আতঙ্কের ভাবটা এখনো কাটেনি। যা হোক, কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি পুরোপুরি বোধশক্তি ফিরে পেলেন। এই অবস্থায় তাকে সুসজ্জিত অফিসে দেখে তিনি ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। ঝোঁকের বশে তিনি একপায়ে জুতো নিয়ে উপাচার্যের অফিসে চলে এসেছেন। বাকি একপাটি জুতো কোথায় ফেলে এসেছেন বলতে পারেন না। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন

আপনি বিচলিত হবেন না। কী হয়েছে বলুন-

স্যার এই মাত্র আমার একজন ওভারসীয়রের ডান পায়ে গুলি করা হয়েছে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দিচ্ছে না। এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা ক্যাশ তাদের হাতে তুলে না দিলে, তারা আহত ওভারসীয়রের কাছে কাউকে ঘেঁষতেও দিচ্ছে না। এই মুহূর্তে আমার হাতে অত টাকা নেই। অনেক কাকুতিমিনতি করেছি। কোনো কথাই কানে তুলছে না। বেচারী বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান। এই হারে রক্তপাত চলতে থাকলে মারা যাবে । আপনারা দয়া করে কিছু একটা করুন।

সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডীন ড : শামসুল হুদা জিজ্ঞেস করলেন—

আপনি পুলিশকে জানাননি?

পুলিশকে জানাব কি? পুলিশের চোখের সামনেই তো তারা ওভারসীয়রকে টেনে নিয়ে ডান পায়ে গুলি করেছে এবং ঘোষণা দিয়েছে আড়াইটার মধ্যে যদি তাদের দাবি না মেটাই তাহলে তারা বাম পায়েও গুলি করবে। আমাকেও খোঁজাখুঁজি করছিল কিন্তু পালিয়ে আসতে পেরেছি।

পুলিশ যেখানে কিছু করছে না, আমরা কী করতে পারি? আমাদের এখতিয়ারে তো আর এমন সৈন্য-সামন্ত নেই যে, মস্তান-গুণ্ডাদের ঠেকাতে পারি। আপনি আইজির কাছে যান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে নালিশ করুন, তারা একটা বিহিত করবেন। আমরা কী করব, কী করতে পারি?

ড. হুদার এই বক্তব্যের জবাবে শেখ তবারক আলী অনেক কথা বলতে পারতেন। তিনি বলতে পারতেন আইজির কাছে গেলে আইজি বলবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কিছু ঘটলে সেখানে পুলিশের নাক গলানোর অধিকার নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ৩ দিনে পাওয়া যাবে না। তার মতো একজন সামান্য ঠিকাদার কী করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। সেসব কিছুই উল্লেখ না করে বললেন-স্যার একজন মানুষের জীবন, আপনারা এ মুহূর্তে কিছু না করলে ছেলেটা মারা যাবে। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত দিয়ে সরাসরি উপাচার্যের পা দুটো চেপে ধরলেন।

আহ্ করেন কী বলে আবু জুনায়েদ তিড়িং করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আবু জুনায়েদের কাছ থেকে যে আচরণ স্বপ্নেও কেউ আশা করেননি তাই করে বসলেন। তিনি বললেন–

হুদা সাহেব দয়া করে আমার সঙ্গে চলুন, বজলু সাহেব আসুন, একজন মানুষ মারা যাচ্ছে কী করে আমরা চুপ করে থাকতে পারি।

স্যার ওই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তো সব সময়েই মানুষ মারা যাচ্ছে, কী করতে পেরেছি আমরা? গেলে আমাদেরও তো গুলি করতে পারে। তাদের দাবি টাকা, ভালো কথা শুনবে কেন?

আবু জুনায়েদ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, রাখেন হুদা সাহেব আপনার দার্শনিক বক্তব্য। আমাদের কিছু একটা এ মুহূর্তে করতে হবে। তারপর তিনি গট গট করে হেঁটে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন। সেই সভায় আগত মাননীয় ডীনদের সকলকে অগত্যা আবু জুনায়েদের পিছু পিছু আসতে হলো। উপাচার্যের অফিসের পিয়ন, চাপরাশি, দারোয়ান, কেরানী থেকে শুরু করে সমস্ত অফিসার কেউ কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে, কেউ চাকরিগত বাধ্যবাধকতার কারণে আবু জুনায়েদকে অনুসরণ করলেন। বের হবার আগে আবু জুনায়েদ ব্যক্তিগত সহকারীকে হাসপাতালে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বললেন। সকলে বেরিয়ে যাচ্ছেন, অথচ শেখ তবারক আলী চৌকাঠ ধরে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আবু জুনায়েদ শেখ তবারককে উদ্দেশ্য করে বললেন

একি আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন যে। শেখ তবারক আবার আবু জুনায়েদের পা ধরতে উদ্যত হলেন। আবু জুনায়েদ একটু সরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন–

আপনি এসব করেন কী?

স্যার আপনাদের সঙ্গে আমাকে দেখলে মনে করবে আমি আপনাদের ডেকে নিয়ে এসেছি। তারা চটে গিয়ে আমার বাড়িতে হামলা করবে। আমার পুত্র কন্যাদের খুন করে ফেলবে।

সেদিন আবু জুনায়েদের হস্তক্ষেপে ওভারসীয়রটি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি আহত ব্যক্তিকে অবস্থা আয়ত্তের বাইরে যাওয়ার আগে হাসপাতালে পাঠাতে পেরেছিলেন। আবু জুনায়েদের শত্রুরাও স্বীকার করেন এটা আবু জুনায়েদের একটা সাহসী কাজ। এই কাজটি কেন তিনি করতে পেরেছিলেন, আবু জুনায়েদের একটি নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। তিনি যখন বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন, এভাবে যুক্তি দাঁড় করান। শেখ তবারক আলী সেদিন ইচ্ছে করলে তার মান-সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে দিতে পারতেন। তিনি ফাঁস করে দিতে পারতেন আবু জুনায়েদ শ্বশুরের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। বলতে পারতেন একেবারে সাধারণ খেটে খাওয়া পরিবার থেকে তিনি এসেছেন। আবু জুনায়েদের জীবন বৃত্তান্ত যে বিশ্ববিদ্যালয়ের তার সহকর্মীদের কাছে অজানা এটা মোটেও সত্যি নয়। এখানে সকলে সকলের হাঁড়ির খবর জানেন। প্রকৃত সত্যটা অনেক সময় রঙচঙে হয়ে প্রকাশ পায়। আবু জুনায়েদের বিপক্ষের লোকেরা তার নামে সাম্প্রতিককালে যে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তার সঙ্গে প্রকৃত তথ্যের অনেক গড়মিল আছে। বিরুদ্ধবাদীরা বলে থাকেন, আবু জুনায়েদ অন্যের টাকায় পড়াশোনা করেছেন, একথা সঠিক। কিন্তু তিনি মেয়েটিকে বিয়ে না করে কন্যার পিতা ভদ্রলোককে প্রতারিত করেছেন। যা হোক, আবু জুনায়েদ মনে করেন শেখ তবারক তার একটা উপকার করেছেন। তিনি ওভারসীয়রকে হাসপাতালে পাঠিয়ে একটু প্রত্যুপকার করেছেন মাত্র। তার সঙ্গে সাহস মহানুভবতা ওসবের কোনোই যোগ নেই।

একদিন রাত নটার দিকে শেখ তবারক আলী মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে টেলিফোন করলেন। ধরেছিলেন নুরুন্নাহার বানু। হ্যালো কে বলতেই ও প্রান্ত থেকে দরদী মোলায়েম কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো ।

-কে বানু?

নুরুন্নাহার বানু একটু চমকালেন। আব্বা মারা যাওয়ার পর তাকে এ নামে সম্বোধন করার কোনো মানুষ এ দুনিয়াতে আছে তিনি জানতেন না। আম্মা তাকে বানু টানু বলেন না। সরাসরি নুরুন্নাহার বলেই ডাকেন। ইদানীং টেলিফোনে তার বিরক্ত বিরক্ত কর্তৃত্বব্যঞ্জক কণ্ঠস্বর প্রকাশ করে এক ধরনের গোপন আনন্দ অনুভব করতেন। একটু রাগত স্বর, একটু বিরক্তি, একটু কর্তৃত্বের ভাব না দেখালে মানুষ তাকে আলাদা করে চিনে নেবে কীভাবে। নুরুন্নাহার বানুর ধারণা উপাচার্যের স্ত্রীদের কণ্ঠস্বরে একটু উত্তাপ একটু আঁজ থাকা ভালো। আবু জুনায়েদ টেলিফোনের রিসিভার কানে লাগিয়ে যেভাবে বিনয়ে বিগলিত হয়ে মিনি-মিনি করে কথা বলেন, দেখলে নুরুন্নাহার বানুর পিত্তি জ্বলে যাওয়ার উপক্রম হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কর্মচারী সব মিলিয়ে তিরিশ পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষের নায়ক এবং চালক হলেন মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ। নুরুন্নাহার বানু মনে করেন, তুমি যদি একটু ধমকধামক দিতে না পার, একটু রাগ একটু হুংকার না দিতে পার, তাহলে উপাচার্য হওয়ার মজা কোথায়, নুরুন্নাহার বানু বালিকা বয়সে থানার একজন সামান্য দারোগাকেও বাঘের মতো হুংকার ছাড়তে দেখেছেন। আবু জুনায়েদ এত বড় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর মানুষ, অথচ তার কণ্ঠে রাগ ঝাল নেই।

আবু জুনায়েদের স্থলে নুরুন্নাহার বানু যদি দায়িত্বভার গ্রহণ করতেন, তাহলে প্রথম চোটেই তিনি যে সকল মেয়ে ঘরে ঢুকে তাকে অপমান করে গেছে তাদের খোঁপার চুল কেটে কপালে লোহা পুড়িয়ে সারা জীবন অক্ষয় থাকে এমন দাগ বসিয়ে দেয়ার হুকুম দিতেন। খারাপ মানুষদের কপালে একটা স্থায়ী দাগ থাকা উচিত। নুরুন্নাহার বানু মনে করেন, যে সকল মেয়ে তার বাড়িতে চড়াও হয়েছিল, বাথরুমের কমোড, জানালার কাঁচ এবং ডাইনিং হলের বেসিন চুরমার করেছে আর নুরুন্নাহার বানুকে বিবস্ত্র করে ফেলেছিলেন, তাদের বেশিরভাগই নষ্টা এবং খারাপ মেয়ে মানুষ। নষ্টা না হলে কি কেউ আচমকা এসে এমন জঘন্য কাণ্ড করতে পারে । এভাবে চিন্তা করলে নুরুন্নাহার শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা অনেক দীর্ঘ হয়ে দাঁড়ায়। তার মধ্যে প্রথমে আসবেন তাদের পাশের ফ্ল্যাটে যে ফাত্তাহ সাহেব থাকতেন তার স্ত্রী রহিমা খাতুন। রহিমা খাতুনের ছাগল একাধিকবার তার তরকারী বাগান খেয়ে ছারখার করেছে। নালিশ করলে জবাবে রহিমা খাতুন সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছিলেন নুরুন্নাহারের বাগান ভক্ষণ করার জন্যেই রহিমা খাতুন ছাগল পুষেছেন। সে অবধি নুরুন্নাহার বানু রহিমা খাতুনের প্রতি ভেতরে একটা গনগনে রাগ পুষে রেখেছেন। তারপরে আসে উপরতলার সালমা বেগম। সালমা বেগমের পোষা মুরগি একবার ঘরে ঢুকে নুরুন্নাহার বানুর কালোজিরে চাল সবটা খেয়ে ফেলেছিল। নুরুন্নাহার বানু যদি চাল ডাল এসব মুরগির নাগালের বাইরে রাখেন। তাহলে কষ্ট করে পুনরায় তাকে নালিশ করতে আসতে হবে না। এই বাঁজা মহিলাটির এমন জবাব শুনে নুরুন্নাহার বানুর ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে উঠেছিল, কিন্তু বাদানুবাদ করেননি। ঠিক করেছিলেন সুযোগ পেলে আস্ত মুরগিটাই জবাই করে হালাল করবেন। সেই পুণ্য কর্মটি সমাধা না করেই তাকে উপাচার্য ভবনে চলে আসতে হয়েছে।

নুরুন্নাহার বানুর সবচেয়ে বেশি আক্রোশ আবু আবদুল্লাহর মাকাল চেহারার ঢ্যাঙা ছেলেটির উপর। একদিন চারদিক থেকে অন্ধকার কেঁপে এসেছে। সেই কার্তিকের মিহি হিমের সন্ধ্যেয় দেখেছেন তার আদরের মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে আবু আবদুল্লাহর মাকাল ছেলেটা চুমু খাচ্ছে। আর মেয়েটি বাঁশের কঞ্চির মতো এঁকে বেঁকে যাচ্ছে। এই সংবাদটি তিনি আবু জুনায়েদের কাছেও প্রকাশ করতে পারেননি। কেবল মেয়েটিকে চুল ধরে টেনে এনে মারতে মারতে আধমরা করে ছেড়েছিলেন। আবু আবদুল্লাহর মাকাল ছেলেটিকে তার ফাঁসিতে লটকাবার ইচ্ছে হয়েছিল। সে আকাঙ্ক্ষাটিও এখনো মরেনি। এরকম ছোট বড় অনেক খেদ অনেক ক্ষোভ তার মনে ফোস্কা ফেলতে থাকে। তার স্বামীরত্নটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। কিন্তু তাকে দিয়ে নুরুন্নাহার বানুর কোন কাজটি হয়েছে, কোন শখটি পূরণ হয়েছে? নুরুন্নাহার বানু মনে করেন, একেবারে চালচুলোহীন পরিবারের সন্তান বলেই তার স্বামীটির এমন মেন্দামারা স্বভাব । স্বামীটি ওরকমই থেকে যাবে। নুরুন্নাহার বানুকে মনের জ্বালা, মনের ভেতর পুষে যেতে হবে। টেলিফোনে তার কণ্ঠস্বরে ঝাঁজ এবং বিরক্তি প্রকাশ হয়ে পড়ে, কারণ তার অবদমিত দুঃখ যন্ত্রণাগুলো প্রাণ পেয়ে উঠতে চায়।

শেখ তবারক আলীর বানু সম্বোধন শুনতে পেয়ে নুরুন্নাহার বানুর সমস্ত অস্তিত্বের মধ্যে ঢেউ খেলে গেল। একটি আওয়াজ শোনামাত্রই তার শৈশব, তার কৈশোর দৃষ্টির সামনে মূর্তিমান হয়ে উঠল। শরীর ভেদ করে প্রথম রক্তপাতের ঘটনাটি তার মনে পড়ে গেল। বানু, বানু, কে ডাকে, কে ডাকে? সেই ভাবাবেশমাখা কণ্ঠেই জবাব দিলেন :

-জি আমি বানু, আপনি কে বলছেন?

-আমি তোমার তবারক চাচা, আমার কথা তোমার মনে আছে?

-কী যে বলেন চাচা আপনার কথা মনে থাকবে না? কতদিন পর আপনার গলার আওয়াজ শুনলাম। আনন্দে নুরুন্নাহার বানুর নাচতে ইচ্ছে হলো, দুঃখে কাঁদতে ইচ্ছে হলো।

-হ্যাঁ মা দিন বসে থাকে না। তোমার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল তোমার বিয়ের দিন। প্রায় চব্বিশ পঁচিশ বছর হয়ে গেল ।

-চাচা আপনি কোত্থেকে বলছেন, চলে আসুন আমার আপনাকে দেখার খুব ইচ্ছে করছে।

-শেখ তবারক জবাব দিলেন আমি মতিঝিলে আমার অফিস থেকে বলছি। জামাই মিয়া কি আমার কথা কিছু বলেননি।

-আপনাদের জামাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো কখন?

-বানু আমি তো এখন জামাইর অধীনে কাজ করছি।

-চাচা আপনি কী যে বলেন-

-ঠিকই বলছি বানু, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন কাজ করছি। জামাই আমাকে তোমার বাড়িতে খাওয়ার দাওয়াত করেছিলেন। সব সময় টেনশনের মধ্যে থাকেন, বোধহয় ভুলে গিয়ে থাকবেন । নুরুন্নাহার বানু মনে করলেন, তবারক চাচার কাছে আবু জুনায়েদের হয়ে কিছু সাফাই গাওয়া উচিত। তাই তিনি বললেন :

-ছেড়ে দেন চাচা আপনাদের জামাইর কথা। এরকম ভোলামনের মানুষ দ্বিতীয়টি আমি চোখে দেখিনি। কাজে-কর্মে এত ব্যস্ত থাকেন যে কোনো কোনো সময়ে এক পায়ে মোজা পরে অফিসে চলে যান। থাকুক আপনাদের জামাইর কথা। আপনি এক্ষুনি চলে আসুন। আমি আপনাকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াব। এই আমি রান্নাঘরে গেলাম। নুরুন্নাহার মনে করলেন, এই একটা চমৎকার সুযোগ । তবারক চাচা এলে এই বিশাল প্রাসাদের সবগুলো ঘর ঘুরে ঘুরে দেখাবেন। কত ধরনের চীনামাটির সুন্দর সুন্দর বাসনপত্র, ছুরি, কাঁটাচামচ, ডিনার সেট, কফি সেট সব দেখিয়ে অবাক করে দেবেন। তৈজসপত্র সব দেখানো হয়ে গেলে তিনি তাকে ঘুরিয়ে গোটা বাড়ির কম্পাউন্ড দেখাবেন। সামনের ফুল বাগান, পেছনের তরকারি বাগান, চার পাশের ডালপালা প্রসারিত শিশু গাছের সারি সব দেখলে তবারক চাচার চোখে ধাঁধা লেগে যাবে। পোশাক পরা চাপরাশি, মালি, আয়া, খিদমতগার সব যখন নিজের চোখে দেখবেন, চাচা ঠিকই মনে করবেন নুরুন্নাহারটি রাণীর ভাগ্য নিয়ে জন্মেছিল।

নিজের সৌভাগ্য এবং ঐশ্বর্যের কথা অপরকে জানাতে এত সুখ, এত আনন্দ এতদিন একথা নুরুন্নাহারের মনে যে উদয় হয়নি একথা ঠিক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সের শিক্ষকদের স্ত্রীদের নিমন্ত্রণ করার কথা চিন্তা করছিলেন। এ সমস্ত ফুটানিমারা মহিলারা এসে খাবেন এবং খেতে খেতে তাকে উদ্দেশ্য করে বাঁকা তেরছা মন্তব্য করবেন, শুনলে নুরুন্নাহার বানুর মাথায় রক্ত চড়ে যাবে, সে আশঙ্কায় তিনি তাদের খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে পয়সা খরচ করার পরিকল্পনাটি বাতিল করেছেন। তার ভাই এবং ভ্রাতৃবধূদের দেখানোর ইচ্ছেও মাঠে মারা গেছে। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ উপাচার্য হওয়ার পর দুতিনবার তারা আসা-যাওয়া করেছেন। ভাইয়ের বউদের সঙ্গে নুরুন্নাহার বানুর একটা অঘোষিত বিবাদ রয়েছে। ভাই দুজন আব্বাজান এন্তেকাল করার পর ঠিকাদারী করে অঢেল পয়সার মালিক হয়েছেন। তাদের বাড়ি আছে, গাড়ি আছে। বউরাও এসেছেন বাড়িঅলা, গাড়িঅলা পরিবার থেকে। মাপা মাইনের সংসারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাট বাড়িতে নানা উপলক্ষে যখনই এসেছেন তার সংসারে এটা নেই, ওটা নেই একথা প্রচ্ছন্নভাবে নুরুন্নাহার বানুকে জানিয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন থেকে তিনি ভ্রাতৃবধূদের সূক্ষ্ম খোঁচাগুলো সহ্য করে আসছেন। আবু জুনায়েদ উপাচার্য হওয়ার পর ভাই ভ্রাতৃবধূদের, তাদের ছেলেমেয়েসহ খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে এসেছেন। নুরুন্নাহারের ইচ্ছে ছিল ভ্রাতৃবধূদের সঙ্গে এই বাড়িটির পরিচয় করিয়ে দেবেন। বলবেন ওই রকম বাড়ি সারা বাংলাদেশে এই একটাই আছে। এ ধরনের বাড়িকে গথিক বাড়ি বলা হয়। চীনামাটির বাসন পেয়ালা যেগুলোতে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে এগুলো কেনা হয়েছিল সাহেব উপাচার্যের আমলে। বিলেতের প্রধানমন্ত্রী ডিনার এবং লাঞ্চ খাওয়ার সময় এ ধরনের বাসন পেয়ালা এখনো ব্যবহার করেন।

নুরুন্নাহার বানু তার কথা বলার কোনো সুযোগ করে উঠতে পারলেন না। বড় ভাইয়ের বউ খাওয়ার সময় ভিসিপিতে সদ্য দেখা অমিতাভ বচ্চন এবং মাধুরী দীক্ষিতের একটা ছবি নিয়ে বকবক করতে লাগলেন। নুরুন্নাহার বানু মতলব করেছিলেন খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর পুরুষ মানুষেরা যখন আলাদা হয়ে পড়বেন, পান চিবুতে চিবুতে তার সৌভাগ্য সম্পদের কথা ভ্রাতৃবধূদের সামনে সবিস্তারে তুলে ধরবেন। কিন্তু খাওয়া শেষ হওয়ার পর পান মুখে দেয়ার আগেই ছোট ভাইয়ের আহলাদী বউটি আমেরিকার লসএঞ্জেলস শহরে তার ভাইয়ের মেম বিয়ে করার কাহিনী নিয়ে মেতে উঠলেন। আমেরিকা থেকে বিয়ের যে ভিডিও ছবিটি পাঠিয়েছেন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করতে থাকলেন। ভায়ের গাড়ি, ভায়ের বাড়ি, কুকুর, বাগান, বউয়ের শুভ বিয়ের গাউন, নীল সুন্দর আয়ত নয়ন এবং লসএঞ্জেলস শহরের আকাশ ঠেকা অট্টালিকার সারি, বিরাট বিরাট গাড়ির মিছিল, শীতের তুষারপাত এসবের এমন জমকালো বর্ণনা দিতে থাকলেন, স্বয়ং নুরুন্নাহার বানুও মুগ্ধ হয়ে কাহিনীটা না শুনে পারলেন না। তারপরেও একটা ক্ষীণ আশা ছিল, শান শওকতের কথা না হোক অন্তত এই বাড়ির একটা ঐতিহ্য আছে সেটা বুঝিয়ে দেবেন। বিয়ের গল্প শেষ হওয়ার পর বড় ভাইয়ের বোনের মেয়েটি মা এবং চাচির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়ে বসল। বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য এমন চিৎকার এবং কান্না জুড়ে দিল যে ভাই এবং ভ্রাতৃবধূরা বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হলেন। নুরুন্নাহার বানু ভাই, ভ্রাতৃবধূদের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। তাদের গাড়ি রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেলে তিনি অনুভব করলেন, ভ্রাতৃবধূরা তাকে একটা মস্তরকম দাগা দিয়ে গেলেন।

নুরুন্নাহার বানু একজন মনের মতো মানুষের সন্ধান করছিলেন, যার কাছে হৃদয় বেদনার কথা প্রকাশ করে মনের ভার লাঘব করবেন। সুখ, ঐশ্বর্য, আড়ম্বর এসবের কথা কাউকে বলতে না পারা, তার বেদনা কী অল্প! আমি স্বর্গে গিয়ে আরাম-আয়েশ ভোগ করে লাভ কী, যদি আমার প্রতিবেশী সেগুলোর প্রতি ঈর্ষাতুর দৃষ্টিপাত না করে। সুতরাং নুরুন্নাহার বানু মনে মনে একজন মানুষের সন্ধান করছিলেন। তবারক চাচা নিঃসন্দেহে নুরুন্নাহার বানুর সেই মনের মানুষটি হবেন ।

ছোটবেলায় পাকা কুল খাওয়ার আবদার ধরে তাকে কুল গাছে চড়তে বাধ্য করেছেন। একবার পেয়ারা গাছে চড়তে গিয়ে ডাল ভেঙে পা মচকে গিয়েছিল । পছন্দমতো ফ্রক, সালোয়ার, কামিজ চাইতে গিয়ে আব্বা-আম্মার কাছে ধমক খেয়ে যখনই তবারক চাচাকে ধরেছেন, তিনি তাকে পছন্দসই জামা কাপড় কিনে দিয়েছেন। এরকম কত কাহিনী তার মনে পড়ে গেল। তিনি শেখ তবারক আলীকে টেলিফোনে জিজ্ঞেস করলেন :

-চাচা আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছি। আপনার কতক্ষণ লাগবে?

-বানু, বেটি আমার, এত উতলা হওয়ার কী আছে? আমি তো সর্বক্ষণ তোমার বাড়ির পাশেই থাকি। যে কোনোদিন যাওয়া যাবে।

-তাহলে চাচা আপনি আজ আসবেন না? নুরুন্নাহার বানুর উৎসাহ-উদ্দীপনা দপ করে নিভে গেল। তিনি দাঁড়িয়েছিলেন, বসে পড়লেন। মনে হলো টেলিফোনের রিসিভারটা ছুঁড়ে দেবেন। ও প্রান্ত থেকে শেখ তবারকের কণ্ঠ ভেসে এল :

-বানু, মা আমি কি জন্য টেলিফোন করেছি সে কথাটি আগে শুনে নাও।

ক্ষুণ্ণকণ্ঠে নুরুন্নাহার বানু বললেন :

-বলুন।

-আগামী শুক্রবার আমার ছোট ছেলের বাচ্চার আকিকার তারিখ । ঐদিন রাত আটটায় তুমি, তোমার মেয়ে এবং জামাই মিয়াসহ আমার বাড়িতে এসে দুটো দানাপানি গ্রহণ করবে। না এলে তোমার বুড়ো চাচার মনে খুব কষ্ট হবে। জামাই মিয়াকে বলতাম, ভাবলাম মেয়ে থাকতে আবার জামাই কেন। মেয়ে ছিল বলেই তো জামাই পেয়েছি। আসবে তো?

-নুরুন্নাহার বানু বললেন :

-চাচা কেমন করে যাব, আপনার বাড়ি তো আমরা কেউ চিনি না। আর আপনার জামাইয়ের নানা মিটিং থাকে। এখানে সেখানে সভা-সমিতিতে যেতে হয়। সময় আছে কি না আমি তো বলতে পারব না।

-বানু, একজন উপাচার্যকে কত ব্যস্ত থাকতে হয়, তা কি আমি জানিনে। কিন্তু আমি ভালো করে খবর নিয়েছি ঐদিন জামাই মিয়া মোটামুটি ফ্রি আছেন। আর আমার বাড়ি চেনার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি লোক পাঠিয়ে নিয়ে আসব।

-দেখি চাচা আপনার জামাইয়ের সঙ্গে আলাপ করে দেখি।

-জামাইয়ের কাজ থাকে আসবেন না। তুমি আসতে চাও কি না বলো।

-কী যে বলেন চাচা, আমার ইচ্ছে হচ্ছে এক্ষুনি চলে যাই।

-কোনো ভাবনা নেই বেটি, আজ বুধবার, পরশু শুক্রবার। মাঝখানে বৃহস্পতিবার একটি দিন। পরশু তো তোমাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হচ্ছেই ।

শেখ তবারক আলীর বাড়িতে আকিকার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবেন কি না একটু দ্বিধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন আবু জুনায়েদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ঠিকাদারের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবেন, একথা নিশ্চয়ই জানাজানি হবে। এখানে কোন কথাটি গোপন থাকে? আবু জুনায়েদ মিয়ার অজানা নেই, অবশ্যই পাঁচজনে পাঁচ কথা বলবে। অতীতে ঠিকাদারদের সঙ্গে উপাচার্যের সম্পর্ক নিয়ে অনেক কেলেঙ্কারি হয়েছে। আবু জুনায়েদ সেসব জানেন না তা নয়। তথাপি তাকে মত দিতে হলো। নুরুন্নাহার বানু জেদ করলেও তিনি রাজি হতেন না। নুরুন্নাহার বানুর প্রভাব খাটাবার কতটুকু অধিকার তার সীমারেখাঁটি আকারে ইঙ্গিতে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আসল কথা হলো শেখ তবারক আলী মানুষটিকে তার পছন্দ হয়েছে। এজন্যেই তিনি যাবেন বলে কথা দিলেন।

শুক্রবার দিন আবু জুনায়েদ, নুরুন্নাহার বানু এবং তাদের কন্যা দীলু সেজেগুজে অপেক্ষা করছিলেন। নুরুন্নাহার বানুর মনে একটুখানি অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল । ইদানীং তার মনে একটা কুসংস্কার জন্মেছে। নির্বিঘ্নে তার কোনো কাজ সমাধা হয় না। কোথা থেকে না কোথা থেকে একটা বাধা এসে হাজির হয়। তার শরীরে অল্প অল্প ঘাম দিচ্ছিল।

ঠিক আটটা বাজতেই খবর দেয়া হলো তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি এসে হাজির। নুরুন্নাহার বানুর মনে অন্যরকম একটা পরিকল্পনা ছিল। উপাঁচর্যের গাড়িটি নিয়ে যেতে পারলে বেশ হতো। তবারক চাচাকে দেখানো যেত, তারা এখন কত বড় গাড়িতে চলাফেরা করেন। নিচে নেমে নুরুন্নাহার বানুর ভিমরি খাওয়ার যোগাড়। বাড়ির সামনে একেবারে চকচকে নতুন একটি পাজেরো গাড়ি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। নুরুন্নাহার বানু ভাবলেন নিশ্চয়ই তবারক চাচার অনেক টাকা হয়েছে। গাড়িটি যে ভদ্রলোক চালিয়ে নিয়ে এসেছেন, তাকেও পেশাদার ড্রাইভার মনে হলো না। উনারা কাছাকাছি আসতেই ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে সালাম দিলেন। দীর্ঘদিন পশ্চিম দেশে থাকলে বাংলা উচ্চারণের মধ্যে যে ধাতবতা পরিলক্ষিত হয়, ভদ্রলোকের কথাবার্তার মধ্যে তেমনি একটি আভাস পাওয়া গেল। এই সুদর্শন তরুণটিকে দেখে নুরুন্নাহার বানুর একটা কৌতূহল জেগে গিয়েছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন :

-আপনি তবারক চাচার কে হন?

ভদ্রলোক একটুখানি ঢোক গিলে বললেন :

-জ্বি উনি আমার শ্বশুর।

নুরুন্নাহার বানু ফের জানতে চাইলেন :

-আপনি কি আমেরিকা থাকেন? আমেরিকা দেশটির প্রতি তার ভারি আকর্ষণ। ছোট ভাইয়ের বউয়ের ভাই আমেরিকার লসএঞ্জেলস শহরে থাকে। তাদের ফ্ল্যাটের উপরতলার কুদসিয়া বেগমের স্বামী সপ্রতি আমেরিকা থেকে গাড়ি, ফ্রিজ, ভিসিপি,ওয়াশিং মেশিন কত কিছু নিয়ে ফিরেছেন। নুরুন্নাহার বানুর কপালে বিদেশ দেখার সুযোগ নেই। যাক আবু জুনায়েদের সঙ্গে বিয়েটা যদি ডক্টরেট করার আগে হতো, অন্তত বিলেত দেশটা দর্শন করা থেকে তিনি বঞ্চিত হতেন না। এখন বিদেশের কথা উঠলেই চাপা দীর্ঘনিশ্বাস বুকের ভেতর জমিয়ে রাখেন। যা হোক,

ভদ্রলোক জবাব দিলেন :

-এখন চলে এসেছি, চার বছর ছিলাম। এবার কথোপকথনে আবু জুনায়েদ যোগ দিলেন।

-আমেরিকার কোন শহরে ছিলেন?

-এখানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স শেষ করেছিলাম। ওখানে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে লেখাপড়া করেছি।

গাড়ি নিউমার্কেট ছাড়িয়ে গেছে। হঠাৎ আবু জুনায়েদের খেয়াল হলো, তবারক সাহেবের জামাতার নামটা জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন।

-ভাই তোমার নামটা জানা হয়নি। তুমি বললাম, রাগ করলে?

অল্প বয়সের কারো সঙ্গে আলাপ হলে আপনা-আপনি তুমি বেরিয়ে আসে, মাস্টারি করার এটাই দোষ।

-স্যার, তুমিই তো বলবেন। এক সময়ে আমি আপনার ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছিলাম। বেশ কিছুদিন ক্লাস করেছি। পরে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়ে চলে গেছি। আমার নাম আবেদ হোসেন।

-আচ্ছা আবেদ তোমার সঙ্গে তবারক সাহেবের মেয়ের বিয়ে হয়েছে কতদিন?

-সে অনেক আগে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আমরা ক্লাসফ্রেন্ড ছিলাম।

-তোমার স্ত্রীও ইঞ্জিনিয়ার?

-হ্যাঁ স্যার ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করে।

আবু জুনায়েদ মনে মনে হিসেব মেলাতে চেষ্টা করেন । তিনি তবারক আলীকে শিক্ষা-সংস্কৃতিহীন সাধারণ একজন ঠিকাদার ধরে নিয়েছিলেন। পাজেরো গাড়ি, মার্কিন দেশ ফেরত জামাতা এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক কন্যার কথা শুনে শেখ তবারক আলী সম্পর্কে লালিত ধারণাটি ভেঙে যাচ্ছিল। নুরুন্নাহার বানুর মুখে তো কথাই নেই। তিনি ভেবেছিলেন, তবারক চাচাকে তাক লাগিয়ে দেবেন। সেটি আর হচ্ছে না বুঝতে পারলেন। আরো কত বিস্ময় তার জন্য অপেক্ষা করে আছে কে জানে।

আবু জুনায়েদ জিজ্ঞেস করলেন :

-আবেদ তুমি কি চাকরি করো?

আগে তো আমরা হাজবেন্ড এন্ড ওয়াইফ এক সঙ্গে একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতাম। কিন্তু আব্বা আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করলেন। আব্বার তাগিদেই

তো আমাকে আবার বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পড়শোনা করতে হলো।

-বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আমাদের সামান্য কাজ। আমরা চিটাগাং পোর্ট ট্রাস্টে কাজ করি। হাউজিংয়ে কাজ করি। রোডস এন্ড হাইওয়েজে কাজ করি। রিভার ড্রেজিং-এ কাজ করি।

আবু জুনায়েদের আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হলো না। নুরুন্নাহার বানু জানতে চাইলেন :

-আপনার কয় ছেলেমেয়ে?

-আমার একটি ছেলে, একটি মেয়ে।

-কত বয়স?

-ছেলেটি কেজিতে পড়ছে। মেয়েটি দেড় বছরের।

গাড়ি সংসদ ভবন ছাড়িয়ে আগারগাঁওয়ের দিকে মোড় নিয়েছে। শেরে বাংলানগর এবং মীরপুরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছে গাড়ি আবার বাঁ দিকে মোড় নিল। দুপাশে সার সার বস্তি। আবেদ হোসেন জানালেন আমরা এসে পড়েছি।

আবু জুনায়েদ ভাবলেন এত জায়গা থাকতে শেখ তবারক আলী এই নোংরা বস্তির মধ্যে বাড়ি করতে আসলেন কেন? আসলে ঠিকাদারদের যতই টাকা-পয়সা হোক, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায় না। কোটি টাকার মালিক হলেও নোংরা জিনিসের প্রতি আকর্ষণ তারা ছাড়তে পারে না। আবু জুনায়েদ এরকম এক বড়লোকের কথা শুনেছেন। বড় লোকটি বারে গিয়ে বিলেতি মদের বদলে বাংলা মদ পান করে। বারের পরিবেশনকারীর সঙ্গে একটা বন্দোবস্ত করে রেখেছে, সে পূর্ব থেকেই বাংলা মদ সংগ্রহ করে রাখে। এ কারণে সে মোটা বখশিস পায়।

একটা বিরাট গেটের কাছে এসে গাড়ি দাঁড়ালো। আবু জুনায়েদ লক্ষ্য করে দেখেন, বাড়িটির চারপাশে গোল কম্পাউন্ড। কম্পাউন্ডের প্রাচীর ঘেঁষে একটার পাশে একটা লাগানো ঘন বস্তির ভিড়। ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় গাছ মাথা তুলেছে। খুব ভালো করে না তাকালে কারো চোখে পড়ার কথাই নয়, এই সবের ভেতর একটা বড় বাড়ি আত্মগোপন করে আছে। বাড়িটার গেট পেরিয়ে কম্পাউন্ডের ভেতর প্রবেশ করল। আওয়াজ শুনে শেখ তবারক নিজে থেকে এগিয়ে এসে নিজে দরজা খুলে দিয়ে সালাম দিলেন।

-স্যার তাহলে এলেন, গরিবের বাড়িতে পায়ের ধুলো পড়ল। বানু মেয়ে আমার, নুরুন্নাহার বানুকে হাত ধরে নামালেন।’

আবু জুনায়েদের ইচ্ছে হলো বাড়িতে প্রবেশ করার আগে একটা বিষয়ে ফয়সালা করে ফেলবেন। তিনি শেখ তবারক আলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন :

-আপনি আমার বয়সে বড়, মুরুব্বী, আমাকে স্যার বলেন কেন? তুমি বলবেন।

-জামাই বাবাজি ওই কথাটি বলবেন না। সবচাইতে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে আমি যদি স্যার না বলি আল্লাহতায়ালা অসন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহ আপনাকে ইজ্জত দিয়েছেন, আমি সম্মান না দেখানোর কে? আমার কপাল আমার কন্যার স্বামীকে আমি স্যার ডাকতে পারছি। গোফরান ভাই বেঁচে থাকলেও বাবা আপনাকে স্যার বলতেন। মা বানু জানে, আমরা দুজন একই মায়ের পেটের ভাইয়ের মতো ছিলাম।

দুপাশে বাগান, মাঝখান দিয়ে পীচ করা রাস্তা। সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আবছা আলোতে সবকিছু ভালো করে দেখাও যায় না। বাড়ির কাছাকাছি এসে আবু জুনায়েদ শেখ তবারকের প্রতি একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন।

-আপনার বাড়িটা দেখতে খুবই সুন্দর । অথচ হাল আমলের বাড়ির মতো নয়। এ ধরনের চৌকোণা চক মেলানো বাড়ি বানাবার কথা আপনার মনে এল কেমন করে?

ঠিক সেই সময়ে বিদ্যুৎ নিভে গেল। শেখ তবারক তার জামাতাকে বললেন :

-বাবা আবেদ, বাতি কখন আসে তার কোনো ঠিকানা নেই। ডায়নামোটা চালু করতে বলল।

আবু জুনায়েদকে বললেন :

স্যার একটা মিনিট দাঁড়াবেন দয়া করে। আগে আলোটা আসুক,

তারপর এ ধরনের অন্যরকম বাড়ি বানানোর খেয়াল কেন তার মাথায় চাপল সে কাহিনী বলতে আরম্ভ করলেন।

-আমি তাজমহলের সৌন্দর্য দেখে একরকম পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। প্রতি বছরই সুযোগ পেলে একবার আগ্রা ছুটে যেতাম। পাঁচ সাত দিন থেকে যেতাম। বার বার ঘুরে ফিরে তাজমহলের নির্মাণ কৌশল বুঝতে চেষ্টা করতাম। মোটামুটি একটা ধারণা যখন করতে পারলাম, আমার মাথায় একটা পাগলা খেয়াল চাপল। তাজমহলের নকশার একটা বাড়ি আমি নিজেই বানাব। এটা তো নিছক পাগলামী। কোথায় বাদশাহ শাহজাহান, কোথায় তবারক আলী আপনাদের মতো দশজনের দয়ায় কোনোরকমে দুটো ভাত খেয়ে টিকে আছি। আমার মনের কথাটা যখন আর্কিটেক্টদের কাছে খুলে বললাম, তারা মনে করলেন আমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। কেউ কি তাজমহলের মতো বাড়ি বানাবার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে! আমি বললাম, কেন পারবে না, তাজমহল যারা বানিয়েছিল তারাও তো মানুষ। শাজাহানের তাজমহল বানানো সম্ভব নয় বুঝলাম, আমি বললাম আপনারা আমাকে একখানি তবারক আলীর তাজমহল বানিয়ে দেন। তা আর্কিটেক্টদের দিয়ে কিছু করানো গেল না। আমিও দমে যাওয়ার ছেলে নই। নিজে নিজে এই বাড়ির নকশা করেছি।

শেখ তবারক আলীর কথা শুনে আবু জুনায়েদের মনের মধ্যে একটা মস্ত ধাক্কা লাগল। তিনি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন এই মানুষটির চিন্তার পরিধি কতদূর প্রসারিত। কিন্তু একটা ব্যাপারে তিনি ঠিক পাচ্ছিলেন না তাই জানতে চাইলেন :

-এত সুন্দর বাড়ি, ঢাকা শহরের একটা দর্শনীয় জিনিস। কিন্তু বস্তির ভিড় এবং ঝোঁপঝাড়ের কারণে বাড়ির চেহারাটি বাইর থেকে কারো নজরেই আসে না। এগুলো কি পরিষ্কার করা যায় না? আবু জুনায়েদ বললেন।

-স্যার কথাটা হলো সেখানেই। আমাদের এটা কি দেশ? এই দেশে কি মানুষ বাস করতে পারে? এখানে কি কোনো আইন-শৃঙ্খলা আছে? প্রেসিডেন্ট এরশাদের বিরুদ্ধে লোকজন যখন আন্দোলন শুরু করল, পশ্চিম দিকের কম্পাউন্ড ওয়াল ভেঙে এক অংশে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। অনেক কষ্টে থামাতে পেরেছি। এরশাদ পাপ করেছে তবারককে কেন শাস্তি ভোগ করতে হবে? বোঝেন অবস্থাটা। আমরা ঠিকাদারি করে খাই। যে সরকারই আসুক না কেন আমাদের তো সম্পর্ক রাখতে হবে। সেবার তো একটা মস্ত শিক্ষা হলো। তারপর এই ঘরগুলো বানিয়ে গরীব মানুষদের থাকতে দিয়েছি। কারো কাছ থেকে ভাড়াপত্তার কিছুই আদায় করিনে। বিপদে-আপদে একটু সামনে এসে দাঁড়ায়।

তিন চার মিনিট শেখ তবারকের কথা শুনে আবু জুনায়েদের ইচ্ছে হলো তিনি তার পায়ের ধুলো নেবেন। সারা জীবন ধরে মনে মনে এরকম একটি মানুষের সন্ধান করছিলেন। তিনি যে তাকে অনুগ্রহ করে নিমন্ত্রণে ডেকেছেন, সেজন্য মনে মনে কৃতার্থ বোধ করলেন। এ সময়ে বাতি জ্বলে উঠল । তিনি ডায়নামোর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন।

শেখ তবারক তার জামাতা আবেদকে বললেন :

বাবা আবেদ তুমি মা বানু এবং আমার নাতনিকে ভেতরে নিয়ে যাও। আমি স্যারকে মেহমানদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।

বড় হলো ঘরটিতে যখন ঢুকলেন আবু জুনায়েদের চোখ ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম। হলভর্তি ছড়ানো সোফা সেট। অনেক মানুষ। কেউ হুইস্কি টানছেন, কারো সামনে বিয়ারের গ্লাস। আবু জুনায়েদের জন্য এটা একটা নতুন জগৎ। উপবিষ্ট অতিথিদের চেহারা দেখেই আবু জুনায়েদ অনুভব করতে পারলেন, এরা নিশ্চয়ই সমাজের কেষ্টবিষ্ট হবেন। মাত্র একজন ভদ্রলোককেই চিনতে পারলেন। তিনি হলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সাদেক আলী খান। হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিলেন আর ডানহিল টানছিলেন। আবু জুনায়েদ একটু অবাক হয়ে গেলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে তার তিনবার দেখা হয়েছে। প্রতিবারই বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে ডেকে নেয়া হয়েছিল। প্রতিবারই তিনি তাকে ইসলাম সম্পর্কে অনেক হেদায়েত করেছেন। বারবারই বলেছেন, ইসলাম থেকে সরে এসেছে বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অনাচার চলছে। আবু জুনায়েদের খুব ভয় হতে লাগল । যদি ক্ষমতা থাকত এক দৌড়ে তিনি এখান থেকে পালিয়ে যেতেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেবকে হুইস্কি পান করতে দেখে তার মনে কোনো ঘৃণা জন্মেছে সে কারণে পালিয়ে যাওয়ার কথা তার মনে আসেনি। ইসলাম প্রচারক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেবকে তিনি নির্জলা হুইস্কি পান করতে দেখেছেন মন্ত্রী সাহেব এটা জানতে পারলে তার ক্ষতি করতে পারেন এ আশঙ্কাই তার মনে জেগেছে। আবু জুনায়েদ একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেব হুইস্কির গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে তাকে আহ্বান করলেন

-এই যে উপাচার্য সাহেব, এদিকে আসুন। আপনার স্কুলে আজ কি ফুটুস ফাটুস কিছু হয়নি? বাচ্চালোগ সব শান্ত হয়ে গেছে।

সামনের ভদ্রলোকটিকে বললেন, আপনি একটু ওদিকের সোফাটায় বসুন দয়া করে। উপাচার্য সাহেবকে আমার কাছে বসতে দিন।

আবু জুনায়েদের জানু কাঁপছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বান তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে নিয়ে গেল। কোনো রকমে মন্ত্রী সাহেবের বিপরীত দিকের সোফাটিতে নিজেকে স্থাপন করলেন আবু জুনায়েদ। তার মনে প্রবল আতঙ্ক। কখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেব বেয়াদবি ধরে বসেন। জেনারেল মানুষ। যদি রেগে যান। তরল পানীয়ের প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রী সাহেব দিলদরিয়া মেজাজে ছিলেন। পরিবেশনকারীকে হুকুম দিলেন

-ওখানে আরেকটা গ্লাস দাও। পরিবেশনকারী হুইস্কি কাজু এবং বরফ দিয়ে গেলে মন্ত্রী সাহেব নিজেই সোডার সঙ্গে হুইস্কি মেশালেন, তারপর কুচি ঢেলে দিয়ে বললেন-

-এবার চেখে দেখেন উপাচার্য সাহেব।

আবু জুনায়েদ মস্ত ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন। জীবনে তিনি কোনোদিন মদ মুখে দেননি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অসন্তুষ্ট করার সাহসও তার নেই। তাই তিনি অত্যন্ত কাতর স্বরে বললেন

-স্যার জীবনে আমি কোনোদিন মদ খাইনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন-

-নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াই ইউ আর সো নার্ভাস। ইউ ডোন্ট নো হাউ টু থ্রো অ্যাওয়ে দ্য প্রেসার অব ওঅর্ক হ্যাজার্ড। প্লিজ হ্যাভ এ সিপ, এন্ড ইউ উইল ফিল হোয়াই ইট ইজ। বুঝলেন সব ফর্সা। সবকিছু ফর্সা। নো ভাবনা, নো দুশ্চিন্তা এন্ড এ ব্রিসফুল স্লিপ।

অগত্যা আবু জুনায়েদ গ্লাসটা তুলে একটা ঢোক গলার মধ্যে চালান করে দিলেন। তার মনে হলো পেটের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। বমি করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। অন্য জায়গায় হলে গলগল করে বমি করে দিতেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভয়ে মুখ দিয়ে বমি নির্গত হচ্ছিল না। তাকে উদ্ধার করলেন শেখ তবারক আলী। তিনি এগিয়ে এসে বললেন-

-জেনারেল সাহেব, উপাচার্য আমার ভাইঝি জামাই। অতি নির্মল স্বভাবের ছেলে। আপনার সঙ্গে পাল্লা দেয়া উনার কাজ নয়। তাকে মাফ করতে হবে।

শেখ তবারক আলী আবু জুনায়েদকে হাত ধরে টেনে নিয়ে সমাগত অতিথিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে থাকলেন। অভ্যাগতদের মধ্যে তিনজন রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের মানেজিং ডিরেক্টর আছেন, দুজন মাননীয় সচিব, তিনজন শিল্পপতি, পুলিশের আইজি-এমনকি দুজন কুখ্যাত ছাত্রনেতাও রয়েছেন। তাদের একজনকে সম্প্রতি সরকারি ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং সে বিরোধী দলে যোগ দিয়েছে। অন্যজন বিরোধী দল সমর্থক। বিশ্ববিদ্যালয়ে টেণ্ডার বক্স দখল নিয়ে যত খুন জখম হয়েছে তার সঙ্গে এ দুজন একেবারে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এই দুজনের চেলারা টেণ্ডার খোলার দিন একে অপরের মাথা ফাঁক করে ফেলতে উদ্যত হয়। অথচ এখানে দুজন টেবিলে মুখোমুখি বসে পরস্পরের সঙ্গে খোশগল্প করছে, যেন কতকালের বন্ধু। আবু জুনায়েদ তাদের টেবিলের পাশ দিয়ে যেতে স্প্রিংয়ের পুতুলের মতো দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে খুব নরম স্বরে সালাম দিল। একজন তো বলেই বসল-

-স্যার আসবেন জানতাম, তবারক সাহেব আগে জানিয়েছিলেন।

অন্যজন হুইস্কির গ্লাসে ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায় কি না পরখ করে দেখছিল। সালামের জবাবে আবু জুনায়েদের মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুল না । তিনি আমতা-আমতা করতে লাগলেন। একটা আড়ষ্টতাবোধে জিভটা শক্ত হয়ে রইল। শেখ তবারক আলী আবু জুনায়েদকে বললেন

-মা বানু আর তার মেয়ে নিশ্চয়ই একটুখানি ব্যস্ত রয়েছে। কতদিন পরে তার চাচীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। ছেলের বউ, মেয়ে সকলে এসেছে। একটু আমোদ আহ্লাদ, গাল-গল্প করবে। চলুন আমরা ততক্ষণ পাশের ঘরটাতে গিয়ে একটু কথাবার্তা বলি।

দরজা ঠেলে দুজন ছোট্ট ঘরটিতে ঢুকলেন। ছিমছাম সাজানো সুন্দর ঘর । একপাশে টেলিফোন, ফ্যাক্স মেশিন। ফটোকপিয়ার। শেখ তবারক বললেন

-স্যার এটা আমার অফিস ঘর। মতিঝিলে আরেকটা বড় অফিস আছে। আজকাল শরীরে কুলোয় না। বাইরে বেরোতে ক্লান্তি লাগে। বাড়িতে বসে যতটুকু পারি, কাজকর্ম দেখাশোনা করি।

আবু জুনায়েদ যতই দেখছিলেন অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করার জন্য তার জিভ চুলবুল করছিল। শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেই বসলেন।

-আজকে এখানে দুজন মাস্তান ছাত্রকে দেখলাম। তারাই তো টেণ্ডার ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তারা কী করে আপনার এখানে এল?

শেখ তবারক আলী বললেন

-স্যার বলব, অনেক কথাই বলব। সেজন্যই তো এ ঘরে এসেছি। তার আগে একটু বেয়াদবি করব, যদি এজাজত দেন।

-আরে বলুন, আপনি এমন করে কথা বলেন আমি খুব বেকায়দায় পড়ে যাই।

শেখ তবারক আলী জানালেন, তিনি একটু তামাক সেবন করার ইচ্ছে করছেন। আবু জুনায়েদ যদি অনুমতি দেন, চাকরকে হুঁকা আনার হুকুম দিতে পারেন।

আবু জুনায়েদ বললেন-

-আপনি অবশ্যই তামাক খাবেন, তার জন্য অনুমতির কী প্রয়োজন। আপনি তো আমার মুরুব্বী ।

জবাব শুনে শেখ তবারক খুব খুশি হলেন। চাকরকে ডেকে তামাক আনতে হুকুম দিলেন। তারপর আবু জুনায়েদকে জিজ্ঞেস করলেন

-স্যার আপনাকে সিগারেট দিতে বলি।

-আমি সিগারেট খাইনে। একটু খয়ের জর্দা দেয়া পান হলেই আমার চলবে।

চাকর তামাক দিয়ে গেল। শেখ তবারক আলী একটা লম্বা টান দিয়ে ঢোক গিললেন। গলগল করে নাকমুখ দিয়ে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন

-স্যার আপনি মাস্তান ছাত্র দুটোর কথা বলছেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ বছর ধরে কনস্ট্রাকশনের কাজ করছি। এরকম হারামজাদা মার কানের সোনা চুরি করে খায় যুবক আমি বেশি দেখিনি। কিন্তু কী করব। আমাকে তো এ কাজ করেই বেঁচে থাকতে হয়। এই গর্ভস্রাব হারামজাদাদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলে চলবে কেমন করে। তারাই তো আজকের গোটা বাংলাদেশটা হাতের তালুর তলায় চেপে রেখেছে।

তারপর আবু জুনায়েদ হতবাক হয়ে শুনলেন। এই মাস্তানদেরকে শেখ তবারক আলীর মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে মাসোহারা দিতে হয়। তাছাড়া মদ, মেয়ে মানুষ, খাবার দাবার এটা সেটা কত কিছুর খরচ যোগাতে হয় তার কোনো হিসেব নেই। আরো জানতে পারলেন, ইদানীং বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো একটি দল জন্ম নিয়েছে। তাদের হাতেও পিস্তল কাটা রাইফেল ইত্যাদি আছে। এসব অস্ত্রশস্ত্র কোত্থেকে আসছে, তিনি ভালোরকম জানেন, কিন্তু প্রকাশ করেন না। কারণ তাতে বিপদের আশঙ্কা আছে। এই দলটির দাবি মেটাতে রাজি হননি বলেই সেদিন টেণ্ডার বক্স খোলার সময়ে ডান পায়ে ওভারসীয়রকে গুলি করেছিল। আবু জুনায়েদ জিজ্ঞেস করলেন

-ওরাও কি আপনার কাছ থেকে টাকাকড়ি পায়?

-কিছু তো দিতে হয়। জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করব কেমন করে? বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন সবখানেই সন্ত্রাসীরা ছড়িয়ে আছে। এদের না হলে ক্ষমতাসীন দলের চলে না, বিরোধী দলের চলে না। ছোটখাটো রাজনৈতিক দলগুলোকেও মাস্তানির মাধ্যমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। আমি একজন সামান্য ঠিকাদার মানুষ আমি কোন সাহসে ওদের সঙ্গে বিবাদে নামব?

শেখ তবারক আলীও বোধহয় হুইস্কি পান করেছেন। আবু জুনায়েদ নিজের চোখে দেখেননি। কিন্তু মুখ থেকে ওরকম গন্ধ পাচ্ছিলেন। হুঁকোর নলে টান দিয়ে মাঝে-মাঝে চোখ বন্ধ করতে চেষ্টা করেন। ধোয়া ছেড়ে কথা বলতে থাকেন। নেশার ঘোরে কি না আবু জুনায়েদ বলতে পারবেন না, শেখ তবারক আলীকে কথা বলায় পেয়ে বসেছে। আবু জুনায়েদ রুদ্ধশ্বাস বিস্ময়ে শুনে যেতে লাগলেন।

শেখ তবারক আলীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চীফ ইঞ্জিনিয়ার, সাব ইঞ্জিনিয়ার, ওভারসীয়র, কেরানী, একাউন্ট্যান্ট সবাইকে নিয়মিত পয়সা দিতে হয়। নয়ত তারা একটা অনর্থক ঘাপলা বাঁধিয়ে দেয়। বাজার থেকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মাল কিনে দিলেও বাগড়া দিয়ে বসবে, বলবে ইট ভালো নয়, বালুর মধ্যে কাঁকড় আছে, রডগুলো মাপে দুই সুতো কম আছে। শেখ তবারক আলীর কাজ কী এই সমস্ত ছোটলোকের বাচ্চাদের সঙ্গে ঘাপলা করে। তাই কিছু কিছু দিয়ে ছোটলোকের বাচ্চাদের মুখ বন্ধ রাখতে হয়।

শেখ তবারক তামাক টানছিলেন। ফ্যানের বাতাসে কল্কে থেকে স্ফুলিঙ্গগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ছিল। তার মুখ থেকে অবলীলায় কথা বেরিয়ে আসছিল। আবু জুনায়েদ এই প্রথম জানতে পারলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড ওভারসীয়র দেখতে যাকে মনে হবে মুসল্লী মানুষ, কপালে নামাজ পড়তে পড়তে দাগ পড়ে গেছে, এই শহরের নানা জায়গায় তার পাঁচটি বাড়ি এবং তিনটি দোকান আছে। ইচ্ছে করলে হেড ওভারসীয়র কফিল উদ্দিন পাঁচ পাঁচ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে মাইনে দিয়ে পুষতে পারে। দেখে কি চেনার কোনো উপায় আছে? আবু জুনায়েদ আরো শুনলেন, একজন উপাচার্য তার কাছ থেকে মেয়ের বিয়ের সমস্ত নিমন্ত্রিত অতিথিদের খাওয়ার খরচটা গলায় পা দিয়ে আদায় করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এত গলিখুঁজি বারান্দা, চোরাগলি, সুড়ঙ্গ, গোপন লেনদেনের এত পাকা বন্দোবস্ত দীর্ঘকাল থেকে তৈরি হয়ে রয়েছে এ ব্যাপারে আবু জুনায়েদ কিছুই জানতেন না। তার মনে হতে থাকল, এতকাল শূন্যের উপর ভেসে বেড়াচ্ছিলেন। শেখ তবারক আলীর কথায় হঠাৎ করে তার জ্ঞান নেত্রের উন্মীলন ঘটতে থাকল। তবারক আলী বলে যেতে লাগলেন, কর্মচারীরা এত টাকা আদায় করে নেয়, সে তুলনায় মাস্তানদের আর কত দিতে হয়। এরই মধ্যে টেলিফোনটা বেজে উঠল । শেখ উঠে রিসিভারটা নামিয়ে রাখলেন।

-স্যার আজ শুধু আপনার সঙ্গেই কথা বলব। টেলিফোন রিসিভ করব না। মনের কথা বলার মানুষ পাইনে। মাঝে-মাঝে পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। দেশটা কোথায় যাচ্ছে। মোটা অঙ্কের টাকা সরকারি দলকে দিতে হয়। বিরোধী দলকে দিতে হয়। আমলাদের দিতে হয়, মাস্তানদের দিতে হয়। আমাদের মতো সৎ ব্যবসায়ী যারা পলিটিক্যাল ব্যাকিংয়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়নি, ঘরের টাকা ঢেলে ব্যবসাপাতি করে থাকে, তাদের কি টিকে থাকার কোনো উপায় আছে? ব্যাংকগুলোতে গিয়ে দেখুন, ব্যাংকের ষাট ভাগ টাকা নানা রকম প্রভাব প্রতিপত্তি খাঁটিয়ে ফাটকাবাজ ব্যবসায়ীরা নিয়ে গেছে। কলকারখানার নাম করে টাকা নিয়েছে। গিয়ে দেখুন একটা কম্পাউন্ড ছাড়া কিছু নয় ভেতরে ফাঁকা। কোনো যন্ত্রপাতি বসেনি। ব্যাংক থেকে লোনটা নিয়ে প্রথম চোটেই গুলশান, বনানী কিংবা বারিধারায় বৌয়ের নামে বাড়ি বানিয়ে উপরতলা ভাড়া দিয়ে নিচের তলায় স্থায়ীভাবে বাস করার ব্যবস্থা করেছে, অধিকাংশ মানুষ। ব্যাংক যখন টাকা দাবি করে, সুদ দাবি করে, অজুহাত দেখিয়ে বসে লেবার ট্রাবলের জন্য প্রোডাকশন কিছুই হয়নি। সুতরাং সুদ মওকুফ করতে হবে। ব্যাংক যখন আসল দাবি করে, জবাব দেয় আপনারা গোটা কারখানাটাই নিয়ে যান। ব্যাংক যখন কারখানার দখল নিতে যায় দেখে লোনের টাকার দশ ভাগের এক ভাগও সেখানে বিনিয়োগ করা হয়নি। বাড়িঘর, নিলাম করে নেয়ার ক্ষমতাও ব্যাংকের নেই। এই হলো ব্যাপার, এভাবেই বাংলাদেশ চলছে। মাঝে-মাঝে ভাবি চাষারা লাঙলের মুঠি ধরে দেশটা টিকিয়ে রেখেছে। নয়ত অসাধু আমলা, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক এবং ফটকা ব্যবসায়ীরা দেশের সমস্ত মাটি মন মেপে বিদেশে চালান করে দিত।

আবু জুনায়েদ শেখ তবারক আলীর মধ্যে ক্রমাগত সমুদ্রের গভীরতা আবিষ্কার করছিলেন। যতই শুনছিলেন তিনি যেন তলিয়ে যাচ্ছিলেন। তার দেশপ্রেমের সংবাদ যখন জানতে পারলেন তার প্রতি শ্রদ্ধা অনেক গুণেই বেড়ে গেল। জর্দার নেশায় তার মাথাটা একটু একটু ঘুরছিল। উত্তর দিকের জানালা খুলে তিনি মুখের পিকটা ফেলে এলেন। রুমালে মুখ মুছে তিনি বললেন-

-এবারে আপনার সম্বন্ধে কিছু বলুন। আপনি কত ধরনের ব্যবসা করেন।

শেখ তবারক আলী বললেন-

-আমি নেহায়েতই চুনোপুটি। ঠিকাদারি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখনো ঠিকাদারি আঁকড়ে ধরে রয়েছি। ছেলেমেয়েরা এটা ওটা বানাবার জন্য শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার কথা বলে। আমি কোনোরকমে বুঝিয়ে সুজিয়ে বারণ করে রেখেছি। আমি বলি বাবা ওদিকে যাবে না, গেলে মারা পড়বে। ঠিকাদারী না করতে চাও ট্রেডিং করো, বিদেশ থেকে সিমেন্ট আনন, গাড়ি আনো যা প্রাণ চায় আনো এবং বাজারে বেচো। মুনাফা বেশি না হোক তোমার মূলধন মারা যাবে না। তুমি কলকারখানা বসিয়ে কিছু একটা বানাতে গিয়েছ কি মরেছ। কে কিনবে তোমার জিনিস। হাল আমলের ছেলে সব সময় বুড়ো বাপের কথা শুনতে চায় না। তিনি আরো জানালেন, শুধু নগদ টাকা থাকলেই ব্যবসা হয় একথা মোটেই ঠিক নয়। তোমার ধৈর্য থাকতে হবে, মেজাজ থাকতে হবে এবং পরিশ্রম করার অভ্যেস থাকতে হবে। ব্যবসাও একটা এবাদতের মতো ব্যাপার। সকলকে দিয়ে ব্যবসা হয় না। মাঝে-মাঝে ছেলেদের মতিগতি দেখে তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। জামাইটা ছিল বলেই ব্যবসাটা টিকে আছে। ভারি ঠাণ্ডা মেজাজের ছেলে। আর মাথাটাও খুব পরিষ্কার। তিনি জামাতার একটা সাম্প্রতিক বিচক্ষণতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন। ওয়াটার বোর্ড থেকে বুড়িগঙ্গা ড্রেজিংয়ের কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল জামাই। পাশাপাশি পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে মীরপুরের নিচু জমি ভরাট করার কাজটাও আদায় করে নিয়েছিল। এখন বুড়িগঙ্গার ড্রেজিং করা মাটি দিয়েই নিচু জমি ভরাট করার কাজটি চলছে। নদী ড্রেজিং এবং নিচু জমি ভরাট করা দুটি মিশালে যে একটি চমৎকার বড় ব্যবসা হয়, এই জিনিসটি প্রথম জামাইর মাথায় এসেছিল। আড়াই কোটি এবং তিন কোটি টাকার কাজ। কোনোক্রমে যদি উঠিয়ে দিতে পারা যায় তাহলে তিন গুণ লাভ হওয়ার সম্ভাবনা। সব টাকা কি তিনি ঘরে তুলতে পারবেন? তিন ভাগের এক ভাগ রাঘব বোয়ালদের পেটেই চলে যাবে।

আবু জুনায়েদ শেখ তবারক আলীর মুখের কথা রূপকথার গল্পের মতো মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনছিলেন। আর তার মুখের হাঁটি ক্রমশ বড় হয়ে যাচ্ছিল।

চাকর নতুন করে তামাক দিয়ে গেল। শেখ তবারক আলী দুটো এলাচদানা মুখে পুরলেন এবং গুড়গুড়িতে টান দিয়ে বলতে আরম্ভ করলেন-দিনকাল পাল্টে যাচ্ছে। নতুন জমানার অনেক কিছুই বুঝিনে। ঠিকাদারিও আমাকে দিয়ে আর বেশি দিন চলবে না। বয়স তো হয়েছে। ছেলে এবং জামাইয়ের উপর ছেড়ে দিয়েছি, তারা যা পারে করবে। না পারলে করবে না। আমি এই বুড়ো বয়সে আবার বাপের পেশায় ফিরে যাচ্ছি। গুলশান এবং বাচ্ছার মাঝখানে আমার তিনশ বিঘার মতো জমি আছে। জায়গাটা জলা। সারা বর্ষাকাল পানির তলায় ডুবে থাকে। শীতের শেষে যখন পানি শুকিয়ে আসে বোরো ধান চাষ করি। হাজার দশেক মন ধান পাই। ঐ এলাকার গরিব লোকদের দিয়ে চাষ করাই। তারা কিছু নিয়ে যায়, আমি কিছু আনি। বর্ষাকালে সমস্ত বিলটা পানিতে যখন সয়লাব হয়ে যায়, আমার স্পীড বোটে চড়ে ঘুরে বেড়াতে বেশ লাগে। একবার সময় সুযোগ করে আপনাকে, মা বানুকে এবং আমার নাতনিকে ঘুরে ঘুরে জায়গাটা দেখাব। আপনাদের ভালো লাগবে। এই জমিটার উপর দেশী-বিদেশী অনেকেরই কড়া নজর । অনেক দাম দিয়ে আমার কাছ থেকে কিনে নিয়ে দালান কোঠার কমপ্লেক্স বানাতে চায়। ছেলে এবং জামাই অনেকবার বলেছে ঐ জমি কিনে বেচে শিল্প-কারখানায় ইনভেস্ট করতে। আমি সাফ সাফ বলে দিয়েছি, আমার জীবদ্দশায় এটি হচ্ছে না। যতদিন বেঁচে আছি চাষ করে যাব।

আবু জুনায়েদ যখন শেখ তবারক আলীর মুখ থেকে শুনলেন বাচ্ছার মাঝখানে তার তিনশ বিঘে জমি আছে এবং সেখানে তিনি রীতিমতো ধান চাষ করেন, তার বুকের ভেতর জমির ক্ষুধাটা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তার মনের একটা গোপন দরজা খুলে গেল। শরীরের সমস্ত রক্ত সভা করে উজানে উঠে আসতে চাইল। মুসা নবীর লোহিত সাগরের বুক দর্শন করে যে রকম অনুভূতি হয়েছিল সে রকম একটা ভাবাবেগ তার মনে ঢেউ খেলতে থাকল। মনে করতে থাকলেন, কামনা সমুদ্রের তীরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। শেখ তবারক আলীকে স্বর্গ থেকে নেমে আসা আকাঙ্ক্ষা পূরণের বার্তাবাহক বলে ভাবতে থাকলেন।

শেখ তবারক আলীর তামাক ফুরিয়ে গিয়েছে। তিনি নলটা একপাশে সরিয়ে রাখলেন। আবু জুনায়েদ অত্যন্ত বিনীতভাবে জানালেন-

-আমার একটি শখের কথা আপনাকে জানাতে খুব ইচ্ছে করে, কিন্তু লজ্জা লাগে।

-স্যার, আপনি আমাকে এখনো আপনা মানুষ হিসেবে ভাবতে পারছেন না শুনে আমার খুব দুঃখ হচ্ছে। আপনি তো আবেদের মতো আমার আরেকজন জামাই। কীসের শখ আপনি মুখ খুলে জানাবেন। নইলে এ বুড়ো মানুষটি কষ্ট পাবে।

আবু জুনায়েদ এবার তার মনের কথা প্রকাশ করলেন।

-ছোটবেলা থেকে আমার একটা গাইগরু পোর খুব শখ। গোটা চাকরি জীবন তো ফ্ল্যাট বাড়িতে কাটাতে হলো। জায়গার অভাবে সে শখটা অপূর্ণ থেকে গেছে। এখন জায়গা আছে, ঘাসও বেশ আছে। আমার মনে হচ্ছে একটা গরু আমি পুষতে পারি। গরু কোথায় বেচাকেনা হয়, কীভাবে পছন্দ করে কিনতে হয় কিছুই জানিনে। আপনার হাতে লোকজন আছে, যদি একটা গরু দেখেশুনে কেনার ব্যবস্থা করে দিতেন। আপনার হাতে কি সেরকম সময় আছে?

শেখ তবারক আলী বললেন-

-আপনার শখটি খুব উত্তম শখ। গাই গরু পোষা সৌভাগ্যের লক্ষণ। শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে। মেয়ে নাতনি জামাইকে একটা কিনে দেয়ার তৌফিক আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। কিন্তু একটি কথা। গরু যে কিনবেন, রাখবেন কোথায়, চিন্তা করেছেন?

-না সে ব্যাপারে একেবারে কিছুই চিন্তা করিনি। আপনার চাষবাসের কথা শুনে আমার গরু পোষার কথাটা মনের মধ্যে জেগে উঠল । আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল গরু পুষতে গেলে গোয়াল আগে।

আবু জুনায়েদ একটুখানি নিরাশ হয়ে পড়লেন। শেখ তবারক আলীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবু জুনায়েদের মুখের ভাব লক্ষ্য করে বললেন:

ঠিক আছে গরু আর গোয়ালের ভাবনা আপনাকে ভাবতে হবে না। কাল নটার দিকে আমার মিস্ত্রি আপনার বাড়িতে যাবে, কোথায় গোয়াল ঘর বানাতে চান, জায়গাটা দেখিয়ে দেবেন, বাকি দায়িত্ব মিস্ত্রির। তারপর বললেন, চলুন একটু ভেতরে যাই, ছেলে মেয়ে, বউ এবং আপনার চাচীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই ।

ভেতরের ঘরে গিয়ে শুনলেন, শেখ তবারক আলীর ছেলে দুজন অধিক রাত হচ্ছে দেখে চলে গেছে। তাদের একজন থাকে গুলশানে, অন্যজন বারিধারায়। যে নাতিটির আকিকা উপলক্ষে যাওয়া, তাকে দোয়া করার সুযোগও পেলেন না আবু জুনায়েদ। ইঞ্জিনিয়ার মেয়ে তাহমিনা, তার স্বামী আবেদ এবং শেখ তবারক আলীর স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হলো। আবু জুনায়েদের ইচ্ছে করছিল, এই বুড়ো মহিলার পদধূলি নেবেন। উপাচার্যের পোশাকটা তাকে এটা করতে দিল না। শেখ তবারক আলী তার স্ত্রীকে বললেন

-এই হলো মা বানুর স্বামী আমার উপাচার্য জামাই।

আবু জুনায়েদ সালাম করলেন।

-সুখে থাক বাবা। বললেন মহিলা।

আবু জুনায়েদের মেয়ে দীলু হরিণ শিশুর মতো ছুটোছুটি করছিল। আবু জুনায়েদের গা ঘেঁষে আবদেরে গলায় বলল

-এই দেখো আমাকে এবং মাকে নানি কী সব দিয়েছেন।

দীলু বাক্স খুলে দেখালো তাকে সোনার লেডিজ ঘড়ি, পার্কার ফাউন্টেন কলম, একটা চমৎকার বেনারশী শাড়ি এবং নুরুন্নাহার বানুকে দেয়া জড়োয়া গয়নার সেটটি দেখালেন।

-এসব দিতে গেলেন কেন? আবু জুনায়েদের কেমন বাধোবাধো ঠেকছিল।

শেখ তবারক আলীর স্ত্রী নরম সুরে বললেন-

-জামাই মিয়া এগুলো মেয়ে নাতনির কাছে নানির সামান্য উপহার ।

সে রাত্রে ফিরে আসার সময় নুরুন্নাহারের ঠোঁটে তবারক চাচার কথা লেগেই রইল । ভীষণ আকর্ষণীয় এবং খুশি খুশি দেখাচ্ছিল তাকে।

০৭-৯. শেখ তবারক আলী

শেখ তবারক আলী এক কথার মানুষ। পরের দিন নটা বাজতেই ট্রাক এসে উপাচার্য ভবনের গেটের সামনে হর্ন দিতে থাকল। দারোয়ান গেট খুলতে রাজি ছিল না। ইট সিমেন্ট, রড বালুতে ভর্তি তিন তিনটি ট্রাকের এই সকালবেলায় আগমনের হেতু দারোয়ান জানত না। ট্রাকগুলো বারবার হর্ন দিতে থাকল। বাধ্য হয়ে দারোয়ানকে উপাচার্য সাহেবকে খবর দিতে উপরে যেতে হলো। আবু জুনায়েদ স্যুট টাই পরে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে পায়চারি করছিলেন। দারোয়ানকে উপরে উঠে আসতে দেখে তিনি রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী চাই?

-স্যার তবারক সাহেব ইটা বালু ভর্তি তিনটি ট্রাক পাঠিয়ে দিয়েছেন। ট্রাকগুলো ভেতরে ঢুকতে চাইছে, জবাব দিল দারোয়ান।

আবু জুনায়েদের মনে পড়ে গেল। আগের রাতে শেখ তবারক আলী তাকে বলেছিলেন, ঠিক নটার সময় তবারক সাহেবের লোকজন ট্রাক নিয়ে তার বাড়ির গেটে এসে হাজির হবে। সাড়ে নটার সময়ে তার একটি মিটিংয়ে বসার কথা। আজ রসায়ন বিভাগের লেকচারার নিয়োগের ইন্টার্যুর তারিখ। সাধারণত আবু জুনায়েদ প্রফেসর এবং অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ছাড়া নিচের দিকের পোস্টগুলোর ইন্টারভুর সময়ে উপস্থিত থাকেন না। যেহেতু রসায়ন তার একেবারে নিজস্ব ডিপার্টমেন্ট, তাই তিনি আপনা থেকেই প্রস্তাব করেছিলেন, লেকচারারদের ইন্টারভ্যুর সময় তিনি স্বয়ং হাজির থাকবেন। কথা দিয়েছেন অথচ এদিকে ট্রাক এসে হাজির। তিনি যদি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জায়গা দেখিয়ে না দেন, কী রকম ঘর তৈরি করতে হবে ভালো করে বুঝিয়ে না দেন, তাহলে পরে অসুবিধেয় পড়ে যেতে হবে। ট্রাকসহ লোকজনদের আজ চলে যেতে বলবেন কি না একটুখানি চিন্তা করে দেখলেন। তিনি উপস্থিত না থাকলে বড় রকমের ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তার বদলে টেলিফোনে উপ উপাচার্যকে ডেকে ইন্টারভুটা চালিয়ে নিতে বললে কাজ চলে যায়। তারপরেও একটা ব্যাপারে আবু জুনায়েদের মনের মধ্যে একটা সংশয় থেকে গেল। আবু জুনায়েদ বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পেরেছেন, আজকে যে সকল প্রার্থীর ইন্টারভু হবে, তার মধ্যে ড. করিমের একজন নিকটাত্মীয় রয়েছে। বর্তমানে ড. করিম একইসঙ্গে রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্সের ডীন। উপ-উপচার্য ড. খয়রাত হোসেন হলেন ড. করিমের বেয়াই। আবু জুনায়েদের অনুপস্থিতিতে ড. করিম এবং ড. খয়রাত হোসেন মিলে ড. করিমের আত্মীয়টিকেই বেছে নেবেন । আবু জুনায়েদ জেনেছেন ড. করিমের আত্মীয়টির চাইতে একাধিক উজ্জ্বল প্রার্থী আছে। বোর্ডে যখন বসবেন ড. করিম এবং খয়রাত হোসেন মিলে আত্মীয়টির মধ্যে এত সব প্লাস পয়েন্ট খুঁজে বের করবেন অধিকতর যোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা মাঠে মারা যাবে। আরো একজন অযোগ্য প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপত্র পাবে। তা পাক, আবু জুনায়েদের কিছু করার নেই। তার চোখের সামনেই কত অন্যায় ঘটে যায়। কটা তিনি ঠেকা&