Saturday, April 4, 2026
Homeথ্রিলার গল্পযীশুর কাঠের মূর্তি - অনিল ভৌমিক

যীশুর কাঠের মূর্তি – অনিল ভৌমিক

কার্সিকা দ্বীপের বোনিফেসিও বন্দর থেকে এবার ভাইকিং বন্ধুরা ফ্রান্সিসকে দেশে ফেরার জন্য বারবার বলতে লাগল। দেশ ছেড়ে এসেছে অনেকদিন। ওরা প্রায় অধৈর্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু ফ্রান্সিসকে রাজি করাতে না পারলে কিছুই হবে না। বন্ধুরা মারিয়াকেও বারবার অনুরোধ করতে লাগল, রাজকুমারী–আপনি ফ্রান্সিসকে রাজি করান।

মারিয়ার নিজেরও এইসব বিদেশ বিভুইয়ে পড়ে থাকতে মন চাইছিল না। তবু সাবধানে কথাটা পাড়ল। ফ্রান্সিসকে বলল, এবার দেশেই ফিরে চলো। পরে আবার না হয় সমুদ্রযাত্রায় বেরুনো যাবে।

ফ্রান্সিস হেসে বলল, মারিয়া, দেশের টান সকলেরই থাকে। আমারও আছে। কিন্তু দেশে ফিরে ঐ যে সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন–এ আমার ভালো লাগেনা। তবু তোমাদের বিশেষ করে তোমার অনুরোধে দেশের দিকে জাহাজ চালাতেই বলছি ফ্লাইজারকে। কিন্তু আবার যদি কোনো রহস্যের সন্ধান পাই তবে আবার লেগে পড়বো।

বেশ তো–দেখাই যাক। ফেরার পথে আবার কোনো রহস্যের সন্ধান নাও তো পেতে পারো। মারিয়া বলল।

ফ্রান্সিস একটু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, দেখা যাক।

মারিয়া বলল, তোমার বন্ধুরা কেউ কেউ বলছিল পিসায় নেমে স্থলপথে দেশে ফিরে যাওয়া যায়।

ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল, না, না। স্থলপথে যেতে অনেক বেশি সময় লাগবে। তার ওপরে স্থলপথে বিপদ-আপদ অনেক বেশি। পরিষ্কার আকাশ আর তেজি হাওয়া পেলে জাহাজে অনেক তাড়াতাড়ি দেশে পৌঁছোনো যাবে।

ফ্রান্সিসদের জাহাজ তখন বন্দর থেকে অনেকটা দূরে মাঝসমুদ্রে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে ফ্লাইজারকে বলল, দিক ঠিক রেখে দেশের দিকে জাহাজ চালাও। ভাইকিং বন্ধুদের তখন আনন্দ দেখে কে! সবাই ছুটোছুটি করে সব পালগুলো টানাটানি করে দড়ি বেঁধেছেদে জাহাজের গতি বাড়াতে লাগল। পালগুলো যথেষ্ট হাওয়া পাচ্ছে। তবু সাত-আটজন ভাইকিং দাঁড়ঘরে নেমে এলো। দাঁড় বাইতে লাগল। গতি চাই, আরো গতি। জাহাজ দ্রুত জল কেটে ঢেউ ভেঙে চলল।

তিন-চারদিন নির্বিঘ্নেই কাটল। ভাইকিংরা দেশে ফেরার চিন্তায় খুব খুশি। যার সবচেয়ে বেশি সাবধানী হওয়া উচিত ছিল সেই নজরদার পেড্রোও খুশিতে ওর কাজে ঢিলে দিল। এক রাতে মাস্তুলের মাথায় ওর নির্দিষ্ট জায়গায় বসে নজর রাখল না। ডেক-এ অন্য বন্ধুদের সঙ্গে নিজেও শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ভাবল, অল্পক্ষণ ঘুমিয়ে নজরদারির জায়গায় গিয়ে বসবে। পেড্রোর এই ভুলের জন্যে সবাইকে তার খেসারত দিতে হলো।

তখন ভোর হয় হয়। পেড্রোর ঘুম ভেঙে গেল। ও উঠে বসতেই সামনে দেখল কি খোলা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক কাফ্রি। পেড্রো ভয়ার্ত চোখে চারদিকে তাকাল। দেখল ওদের জাহাজের গায়ে গা লাগিয়ে আর একটা জাহাজও চলেছে। ডেক-এ যেখানে সেখানে ওর বন্ধুরা শুয়ে ঘুমুচ্ছে তাদের সকলের সামনে একজন করে খোলা তলোয়ার হাতে কাফ্রি দাঁড়িয়ে। কাফ্রিরা নিঃশব্দে ওদেরক রাভেল জাহাজ থেকে এই জাহাজে উঠে এসে জাহাজ দখল করে নিয়েছে।

ভোরের আধো আলো, আধো অন্ধকারে পেড্রো বোকার মতো তাকিয়ে রইল কাফ্রিটার দিকে। একবার ভাবল, চিৎকার করে সবাইকে ডাকে। কিন্তু কাফ্রিটা ওর মনোভাব বুঝতে পেরে তলোয়ারের ডগাটা পেড্রোর গলায় ঠেকিয়ে মাথা দুলিয়ে হাসল। ঐ কুচকুচে কালো মুখে সাদা দাঁতগুলো চৰ্চ করে উঠল।

ভোর হলো। ডেক-এ শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা ভাইকিংদের ঘুম ভাঙতে লাগল। চোখ। মেলে সবাই দেখল খোলা তলোয়ার হাতে কাফ্রি যোদ্ধারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে। ওরা অসহায় চোখে পরস্পরের দিকে তাকাল। ওদের তখন একটাই ভাবনা কেবিনঘরে বোধহয় ফ্রান্সিস হ্যারিরা নিরাপদেই আছে।

একটু পরেই ভোরের নরম আলো পড়ল সমুদ্রে জাহাজ দুটোয়। তখনই ডেকঘর থেকে একে একে উঠে আসতে লাগল ফ্রান্সিস মারিয়া হ্যারিরা। প্রত্যেকের পেছনেই কাফ্রি যোদ্ধারা। ফর্সা গা আরবীয় যোদ্ধারাও আছে তাদের মধ্যে। এত নিঃশব্দে এই কাফ্রি যোদ্ধারা জাহাজটা দখল করে ফেলল যে ভাইকিংরা এতটুকুও বুঝতে পারল না।

ফ্রান্সিসরা ডেক-এ উঠে আসতে একটি আরবীয় যোদ্ধা গ্রীক ভাষায় বলল, সবাই জাহাজের রেলিঙের ধারে সারি দিয়ে দাঁড়াও। ভাইকিংরা গ্রীকভাষা কিছুই বুঝল না। তখন হ্যারি গলা চড়িয়ে ওদের ভাষায় কথাটা বুঝিয়ে বলল। এবার ভাইকিংরা রেলিঙের ধারে সারি বেঁধে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস এবার ভাইকিং বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে পেড্রোকে খুঁজতে লাগল। দেখলও পেড্রোকে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে পেড্রো। ফ্রান্সিস ডাকল, পেড্রো। পেড্রো চমকে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। তারপর ছুটে এসে ফ্রান্সিসের দুই হাত জড়িয়ে ধরল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি আমরা এভাবে বন্দি হবো। ফ্রান্সিস, আমার কর্তব্যে অবহেলার জন্যে আমাকে যে শাস্তি দিতে চাও, দাও।

এখন ওসব কথা অর্থহীন। এখন এরা আমাদের নিয়ে কী করবে সেই কথা ভাবো। ফ্রান্সিস বলল।

একজন আরবী সৈন্য এসে পেড্রোর পিঠে তলোয়ারের খোঁচা দিল। পেড্রো সারির মধ্যে নিজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। দু’তিনজন ভাইকিং চিৎকার করে বলে উঠল, ফ্রান্সিস, পেড্রোকে ফাঁসিতে লটকাও। অনেকে ছিঃ ছিঃ করতে লাগল। ফ্রান্সিস হাত তুলে সবাইকে শান্ত হয়ে থাকতে বলল। এইভাবে বিনা বাধায় বন্দি হওয়াটা ভাইকিংরা মেনে নিতে পারল না। সবাই মনে মনে গজরাতে লাগল।

তখন সকাল হয়েছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় রোদ ঝিকিয়ে উঠছে। জোর হাওয়া বইছে। সাগরপাখির তীক্ষ্ণ ডাক শোনা যাচ্ছে। দুটো জাহাজই পাশাপাশি চলেছে।

ক্যারাভেল জাহাজ থেকে এক আরবীয় যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের জাহাজের রেলিং ধরে উঠে এলো। আরবী ভাষায় গলা চড়িয়ে কী বলল। যোদ্ধাদের মধ্যে বেশ তৎপরতা দেখা গেল। বোঝা গেল কেউ একজন ফ্রান্সিসদের জাহাজে আসবে এবং সে যে দলপতি এটাও বোঝা গেল।

একটু পরেই ক্যারাভেল জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো একজন আরবীয়। মাথায় কান-ঢাকা কালো বিড় বাঁধা পাগড়ি মতো। সে দু’একজন যোদ্ধার সাহায্যে ফ্রান্সিসদের জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। ফ্রান্সিসদের সারির কাছে এলো। দলপতির গোঁফ আছে। চিবুকের কাছে অল্প দাড়ি। গায়ের রং ফর্সা। শরীরটা রোগাই।

দলপতি এবার ফ্রান্সিসদের দেখে খুব খুশি হলো। দু’তিনজন যোদ্ধা অল্প মাথা ঝাঁকিয়ে খুশিমুখে হাসল।ফ্রান্সিস তখনও ভেবে পাচ্ছেনা এরা কারা?ফ্রান্সিসদের দেখে দলপতির এত খুশি হবার কারণ কী?

এবার দলপতি গ্রীক ভাষায় বলল, তোমাদের দেখেই তো বুঝতে পারছি তোমরা এই ভূমধ্যসাগরের এলাকার লোক নও–তোমরা বিদেশী। এক হ্যারি বাদে ফ্রান্সিসরা কেউই কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না। হ্যারি গ্রীক ভাষা মোটামুটি বোঝে। বলতেও পারে। হ্যারি ভাঙা ভাঙা গ্রীক ভাষায় বলল, আমরা ভাইকিং। বীরের জাতি।

দলপতি এবার হ্যারির কাছে এলো। হেসে বলল, হ্যাঁ তোমাদের ভাইকিং জাতির নাম আমরা শুনেছি। জাহাজ চালাতে দক্ষ তোমরা, আবার লুঠপাটও করো।

না–আমরা জলদস্যুতা করি না। হ্যারি বলল।

যাক গে–শোনো–আমার নাম আল জাহিরি–আমি বণিক। দলপতি বলল।

আপনার কীসের ব্যবসা? হ্যারি বলল।

মানুষ কেনাবেচা। আল জাহিরি কথাটা বলে হো হো করে হেসে উঠল। হ্যারি বুঝল–খুবই বিপদে পড়েছে ওরা। আল জাহিরির জাহাজে নিশ্চয়ই কয়েদখানা মতো আছে। সেটাতে মানুষদের বন্দি করে রাখা হয়। তারপর ক্রীতদাসদের বিকিকিনির হাটে বিক্রি করা হয়। হ্যারি বলল, বুঝেছি–আপনি আমাদের ক্রীতদাসেরহাটে বিক্রি করবেন।

ঠিক তাই–আল জাহিরি হেসে বলল, এটাই আমার ব্যবসা।

হ্যারি দেখল, আল জাহিরির গায়ে বেশ দামী রেশমি কাপড়ের সোনালি জরি বসানো পোশাক। গলায় মুক্তোর মালা। হ্যারি একটু হেসে বলল, তাহলে আপনার ব্যবসা বেশ ভালোই চলছে?

আল জাহিরিও হাসল। বলল, হ্যাঁ–তবে এবার খুব ভালো দাম পাবো।

কেন? হ্যারি জানতে চাইল।

কারণ–ইউরোপীয় মানুষ আমরা কমই পাই। এবার এতগুলি যুবক ইউরোপীয় ওঃ অনেক দাম পাবো। আল জাহিরি বলল। তারপর মারিয়াকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, এটার জন্যেই যা দাম পাবো তাতে কয়েক বছর আর মানুষ না ধরলেও চলবে।

হ্যারি বলল, মুখ সামলে কথা বলুন–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী মারিয়া। আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্রী।

আল জাহিরি চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, রাজকুমারী, বাব্বা-তাহলে তো দর আরও চড়াতে হবে।

হ্যারি কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। চুপ করে রইল। তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে আল জাহিরি সঙ্গে ওর যা কথাবার্তা হয়েছে সবই বলল।

সব শুনে ফ্রান্সিস গভীর চিন্তায় পড়ল। ফ্রান্সিসরা জানে ক্রীতদাস ব্যবসায়ীরা কী নির্মম নিষ্ঠুর হয়। দয়া মায়া বলে কোনো বোধই থাকে না। বন্দি মানুষদের দেখে পশুর মতো।

আল জাহিরি চিৎকার করে বলতে লাগল, সব কটাকে আমাদের ক্যারাভেল-এ নিয়ে যাও। কয়েদখানায় বন্দি করে রাখো। তারপর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ইনি নাকি রাজকুমারী। ইনি মুক্ত থাকবেন।

হ্যারি বলে উঠল, না ইনি আমাদের সঙ্গেই থাকবেন।

তা কি করে হয়–আল জাহিরি বলল, একে কত যত্নে রাখতে হবে। কয়েদখানায় থাকলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে যে। না, না-রাজকুমারী আলাদা কেবিনঘরে থাকবে।

হ্যারি ফ্রান্সিসকে কথাগুলো বুঝিয়ে বললো। অন্য ভাইকিং বন্ধুরা শুনল সে কথা। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো।

হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল, আল জাহিরি, দেখছেন তো রাজকুমারীকে আলাদা করে রাখতে কেউ রাজি নয়। রাজকুমারী আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

আল জাহিরি ভাইকিংদের ক্রুদ্ধ চেহারা আর ধ্বনি শুনে একটু ভাবনায় পড়ল। ভাইকিংরা নিরস্ত্র। ওর পাহারাদারদের হুকুম দিলে অল্পক্ষণের মধ্যেই নিরস্ত্র ভাইকিংদের মেরে ফেলা যায়। কিন্তু তাতে কী লাভ? বরং বাঁচিয়ে রাখলে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাটে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা পাবে। শুধু রাজকুমারীকে বিক্রি করলেই হাজার কয়েক স্বর্ণমুদ্রা মিলবে। কাজেই আল জাহিরি কোনো গোলমালে যেতে চাইল না। মারিয়াকে ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল, রাজকুমারী, আপনি কি কয়েদখানার অন্ধকারে পচতে চান না কোনো কেবিনঘরে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে থাকতে চান?

মারিয়া বলল, আমি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য চাই না। আমার স্বামী আর তার বন্ধুরা যেখানে যেভাবে থাকবে আমিও সেখানে থাকবো।

কী মুশকিল–তাতে আপনার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। ক্রীতদাসের হাটে আপনার দাম কমে যাবে যে। আল জাহিরি মাথা নেড়ে নেড়ে বলল।

সেসব আমি বুঝি না। মারিয়া বলল।

আল জাহিরির ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় কথা বিস্কো শাঙ্কোরা বুঝল। ওরা আবার একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো।

এবার আল জাহিরি বলল, আমি ব্যবসাদার লোক মারামারি কাটাকাটির মধ্যে নেই। তোমরা সবাই ক্যারাভেলের কয়েদখানায় থাকবে। মনে থাকে যেন, পালাবার চেষ্টা করলে মরবে।

আল জাহিরি নিজেদের ক্যারাভেলে চলে গেল। কাফ্রি আর আরবী পাহারাদার এবার ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে গ্রীক ভাষায় চিৎকার করে বলল, ক্যরাভেলে চলো সব। কেউ চালাকি দেখাতে গেলেই মরবে।

হ্যারি ওদের দেশীয় ভাষায় কথাগুলি বন্ধুদের বুঝিয়ে বলল।

শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, না, আমাদের জাহাজ ছেড়ে আমরা যাবো না। বন্ধুরা হৈহৈ করে শাঙ্কোকে সমর্থন করল। পাহারাদার সৈন্যরা বুঝল ওরা ক্যারাভেল-এ যেতে আপত্তি করছে। ওরা খোলা তলোয়ার হাতে ফ্রান্সিসদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো।

ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত তুলে সৈন্যদের থামাল। চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ভাইসব, আমরা ভালো করে জানি আল জাহিরি আমাদের মেরে ফেলবে না। তাতে ওর ব্যবসারই ক্ষতি। তবে নিরস্ত্র অবস্থায় লড়াইয়ে নামলে আমরা অনেকেই আহত হবো। আমি এটা চাই না। এখন লড়াই নয়। মাথা ঠাণ্ডা রেখে ক্যারাভেল-এ চলো। বন্দিজীবন মেনে নাও। সময় সুযোগ বুঝে যা করবার করা যাবে। ক্যারাভেল-এ চলো সব।

ভাইকিং বন্ধুরা বুঝল যে এই অবস্থায় ফ্রান্সিসের কথাই মেনে নিতে হবে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে পাহারাদারদের নির্দেশমতো ক্যারাভেল-এ গিয়ে উঠতে লাগল।

আল জাহিরির সৈন্যদের পাহারার মধ্যে ভাইকিংরা ক্যারাভেল-এ গিয়ে উঠল। ক্যারাভেল-এর সিঁড়ি বেয়ে একেবারে নীচের কয়েদখানার সামনে এলো সবাই। কয়েদখানার লোহার দরজার সামনে তলোয়ার হাতে দু’তিনজন পাহারাদার। একজন। গিয়ে লোহার দরজা খুলে দিল। ঠনঠন্ শব্দে দরজা ঠেলে খুলে ভাইকিংদের ঢোকানো হতে লাগল।

এরকম কয়েদখানা ভাইকিংরা আগেও দেখেছে। কিন্তু মারিয়া তো দেখেনি। লোহার মোটা মোটা গরাদ দেওয়া। মারিয়া এইবার প্রথম বেশ ভীত হলো। এখানে তো পশুর মতো থাকতে হবে। মারিয়া এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসের হাত ধরল। ফ্রান্সিস মারিয়ার মনের অবস্থা ভালোই বুঝতে পারল। মারিয়ার হাতে চাপ দিয়ে মৃদুস্বরে বলল, ভয়ের কিছু নেই। তবে কষ্ট হবে তোমার। তুমি যদি ওপরের কেবিনঘরে থাকতে চাও–

মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, না–আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকবো। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। কয়েদঘরে ঢুকে দেখল আগে থেকেও পাঁচ-ছ’জন বন্দি রয়েছে। সবাই কাফ্রি। শুধু একজন শ্বেতাঙ্গ। বোধহয় এই এলাকার লোক। জোব্বামতো চাষীদের পোশাক পরনে। একটা ব্যাপার দেখে ফ্রান্সিস খুশি হলো যে এই কয়েদ ঘরে ওদের হাত বেঁধে রাখা হলো না। তার কারণটাও ফ্রান্সিস ঠিক বুঝতে পারল হাত-পা অনেকদিন বেঁধে রাখলে কড়া পড়ে যায়। ক্রীতদাস বিক্রির হাটে দাম কমে যায়। সুস্থ সবল মানুষ চাই। তবে না দাম উঠবে।

ভাইকিংদের মধ্যে কিছু বসে পড়ল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল কাঠের পাটাতনে, কেউ কেউ ছোটো জায়গাতেই পায়চারি করতে লাগল।

ফ্রান্সিস আর মারিয়া এককোণায় বসল। হ্যারি এসে ওদের পাশে বসল। তিনজনেই চুপচাপ বসে রইল। এমনভাবে এত দ্রুত ওরা বন্দি হয়ে যাবে এটা গল্পনাও করেনি।

কিছু পরে লোহার দরজা শব্দ তুলে খোলা হলো। তিনজন কাফ্রি খাবার নিয়ে এলো। এক মস্তবড়ো কাঠের থালায় গোল করে কাটা রুটি। মস্তবড় গামলায় আলু টমেটোর ও মাংস ছড়ানো স্যুপ। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। আজ ফ্রান্সিস কিন্তু সেই কথাটা বলতে পারল না–পেট পুরে খাও–খেতে ভালো না লাগলেও খাও। সত্যিই আজ ফ্রান্সিসের মন চিন্তাভারাক্রান্ত। এই তলার ডেক-এর কয়েদখানায় থাকার অভিজ্ঞতা ওদের আছে। কিন্তু মারিয়া কি এই কঠোর জীবন কাটাতে পারবে? তার ওপর অসুখ থেকে উঠে মারিয়া এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি। হঠাৎ-ই ফ্রান্সিসদের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। দু’হাঁটুতে মুখ গুঁজে ও চুপ করে বসে রইল। ওর সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হলো মারিয়ার জন্যে।

একসময় বিস্কো উঠে এলো। ভালো লাগছেনা। এভাবে বন্দি হওয়া স্বপ্নেও ভাবেনি। সময় কাটাবার জন্যে পুরনো বন্দিদের সঙ্গে কথা বলার জন্যে বিস্কো ওদের কাছে গেল। কাফ্রি ক’জনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল। সবই বৃথা। কাফ্রিগুলো যে ভাষায় কথা বলল, সে তো অবোধ্য। কথা বলার সময় ওদের অঙ্গভঙ্গি দেখে যা কিছু বুঝল সেটাও তেমন কিছু নয়। অনেকদিন আগে আল জাহিরির দল নাকি ওদের গ্রাম থেকে ধরে এনেছে। ভাগ্যে কী আছে ওরা জানে না।

শুধু একজন শ্বেতাঙ্গ অল্পস্বল্প স্প্যানিস ভাষা বলতে পারে। তার সঙ্গেই বিস্কো কথাবার্তা বলতে লাগল। সে তার নাম বলল পারিসি। পারিসি বিস্কোকে বলল, তোমরা তো দেখছি এই ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের লোক নও। তোমরা এখানে কেন এসেছো? ধরাই বা পড়লে কীভাবে? বিস্কো তখন ওদের কথা, ফ্রান্সিসের কথা–কোন্ দ্বীপ থেকে ফ্রান্সিস কী উদ্ধার করেছে সবকিছুই সংক্ষেপে বলল। পারিসি বলল, আমিও একটা খুব দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ উদ্ধার করেছিলাম। দিয়েছিলাম সাইপ্রাসের বর্তমান শাসক গী দ্য লুসিগনানেকে। সেই গ্রন্থের প্রথম পাতায় আঁকা ছিল যীশুর একটি ছবি। এবার লুসিগনান চাইল সেই যীশুর মূর্তিটা। নিশ্চয়ই আমিই সেই মূর্তিটা লুকিয়ে রেখেছি এই সন্দেহ করে আমার ওপরে চলল অত্যাচার। পারিসি থামল।

তারপর? বিস্কো জানতে চাইল।

আমাকে আবার সেই দুরারোহ জেরস পাহাড়ে পাঠাল। আমি সুযোগ বুঝে পালালাম। চলে এলাম কেরিনিয়া বন্দরে। পর্তুগীজদের একটা জাহাজে উঠে পড়লাম। জাহাজটা তখন পর্তুগাল যাচ্ছিল। হঠাৎই আল জাহিরি আমাদের জাহাজ আটকাল। লড়াইহলো। নৃশংস আল জাহিরি প্রায় সবাইকে মেরে ফেলল। কয়েকজন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মা মেরিই জানে হাঙরের পেটে গেল না পালাল। আমাকে আর ঐ কাফ্রি কয়েকজনকে রেহাই দিল। এরমধ্যে অবশ্য একজন কাফ্রি পালাতে গিয়ে মারা গেল। পারিসি থামল।

বিস্কো বলল, তুমি কী একটা গ্রন্থের ছবি যীশুর মূর্তি এসবের কথা বললে।

সে অনেক কথা। পারিসি বলল। বিস্কো উঠে দাঁড়াল। বলল, আমার বন্ধু ফ্রান্সিসকে নিয়ে আসছি। তুমি তাকে ব্যাপারটা বলো তো।

একটু পরেই বিস্কো, ফ্রান্সিস, হ্যারি আর মারিয়াকে সেখানে নিয়ে এলো। পারিসির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। ফ্রান্সিস বলল, তোমার কথা বিস্কোর কাছে কিছু শুনলাম। এবার সব ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলো তো।

পারিসি বলল, সাইপ্রাস দ্বীপের নাম শুনেছেন?ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। হ্যারি বলল– শুনেছি।

মারিয়া বলল, সাইপ্রাস ভূমধ্যসাগরের পুবদিকের শেষ দ্বীপ।

ঠিক বলেছেন। পারিসি বলল। তারপর বলল, সাইপ্রাসের একটু ইতিহাস বলি। তৃতীয় ধর্মযুদ্ধ শেষ করে প্রথম রিচার্ড ফেরার পথে সাইপ্রাসে আসেন। তখনকার শাসক, আইজাক কমেনাসের কাছে দাবি জানালেন, এখানে তার যে জাহাজগুলো আছে সেসব আর তার দেশের নাবিকদের ফেরৎ দিতে হবে। আইজাক মানল না সেই দাবি। প্রথম রিচার্ড সাইপ্রাসবাসীদের যুদ্ধে হারিয়ে সাইপ্রাস দখল করলেন। তার অনুগত গী দ্য লুসিগনানকে সাইপ্রাসের শাসক নিযুক্ত করে তিনি চলে গেলেন। গী দ্য লুসিগনানও আইজাকের মতো সাইপ্রাসবাদীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছেন। পারিসি থামল।

আসল কথাটা বলো। ফ্রান্সিস বলল। সেটাই বলছি–পারিসি বলল, এবার একজন প্রকৃত খ্রীস্টিয় সাধুর কথা বলি। তার নাম নিওফিতস। ছোটোবেলা থেকেই তিনি খ্রীস্টিয় সাধু হতে চেয়েছেন। উত্তর সাইপ্রাসের বন্দর-নগর কেরিনিয়ার কাছে একগির্জা তৈরি করিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে লোকজনের ভিড়ে বিরক্ত হয়ে তিনি জেরস পাহাড়ে এক গুহায় একেবারে নির্জনে বাস করতে লাগলেন।

তারপর? হ্যারি বলল।

সাত বছর ধরে এক কষ্টকর জীবন কাটালেন তিনি। ধারেকাছের পাহাড়ি গাঁয়ের লোকেরা তাকে খাদ্য, পানীয়, জল দিয়ে আসতো। নিওফিতস নিজে কারো কাছে কিছু চাইতেন না। এদিকে মহান সাধুপুরুষ হিসেবে দেশবাসীর কাছে পরিচিত হন তিনি। এখন ঐ এলাকার নাম পাফোঁস। পাফোসের গীর্জার পাদ্রীরা নিওফিতসকে বারবার অনুরোধ জানাতে তিনি সেই গুহার আবাস ছেড়ে নীচে নেমে আসেন। শুরু হলো নিওফিতসের নতুন জীবন। খ্রীস্টিয়মণ্ডলীর কাজেকর্মে তিনিই নিয়মশৃঙ্খলা আনেন এবং এই নিয়ে তিনি বই লিখতে শুরু করেন।

ঐ বইটাই বোধহয় তুমি পেয়েছো। ফ্রান্সিস বলল।

না, কারণ তখন সবেমাত্র নিওফিতস লিখতে শুরু করেছিলেন। পারিসি বলতে লাগল, অদ্ভুত মানুষ এই নিওফিতস। এত খ্যাতি, এত জনপ্রিয়তা তার সহ্য হলো না। তিনি আবার গুহাবাসী হলেন। জেরস পাহাড়ের যে গুহায় ছিলেন, এই গুহাটা সেটার চেয়েও অনেক উঁচুতে। প্রায় অসম্ভব সেই গুহায় যাওয়া। নিওফিতস কোনোভাবে সেই গুহায় গিয়ে উঠলেন। নিজেই ওখানে বসে বসে শুকনো ঘাস, গাছের ডাল দিয়ে একটা মই করলেন। প্রতিদিন সকালে সেই মই নামিয়ে দিতেন নীচের একটু সমতলমতো একটা জায়গায়। পাহাড়ি গাঁয়ের লোকেরা খাবার-টাবার রেখে আসত সেখানে। সবাই চলে গেলে নিওফিতস দড়ির সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে খাবার নিতেন তারপর উঠে যেতেন। সঙ্গে সঙ্গে দড়ির মইটাও টেনে তুলে নিতেন যাতে কেউ ঐ মই বেয়ে তার গুহায় যেতে না পারে, তাকে বিরক্ত করতে না পারে। পারিসি থামল।

তারপর? মারিয়া জিজ্ঞেস করল।

পারিসি বলতে লাগল–নিওফিতস যে খ্রীস্টমণ্ডলীর পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে বই লিখেছেন–এটা এখানকার সব বিশপ ধর্মযাজকরা জানতেন। তাঁরা আমাকে দায়িত্ব দিলেন নিওফিতসের বইটা নিয়ে আসতে। একটু থেমে পারিসি বলতে লাগল, আমি অনেক কষ্টে সমতলমতো জায়গাটায় পৌঁছলাম। কিন্তু নিওফিতসের গুহায় উঠতে পারলাম না। নীচের যে সমতল জায়গায় পাহাড়ি গাঁয়ের লোকেরা খাবার রেখে যেত, আমি সেখানে অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সেখানে। কাঠকুটো জ্বেলে আমি রাত কাটাতাম। পারিসি একুট থেমে বলতে লাগল–আমি কয়েকদিন পরে পরেই দেখতাম দড়ির মই ফেলে নিওফিতস খাবার-টাবার নিয়ে যেতেন। আশ্চর্য! জলভরা পাত্র নিতেন না। বুঝলাম নিশ্চয়ই ঐ গুহার কাছে পাহাড়ি ঝর্ণা আছে। একদিন লিওফিতস মইটা তুলে নেবার আগে আমি মইয়ের সঙ্গে একটা দড়ি বেঁধে দিলাম। নিওফিতস সেটা বুঝলেন না। তিনি উপরে উঠে মই টেনে তুলে নিলেন। দড়িটা ঝুলতে লাগল। পারিসি থামল।

তাহলে মই নামিয়ে তুমি তো উঠতে পারতে। ফ্রান্সিস বলল।

হা–আমি তাই করেছিলাম। একনাগাড়ে প্রায় দিন সাতেকনিওফিতস নীচে নামলেন না। তখন তার বয়েস সত্তরেরও বেশি। বুঝলাম, তিনি নিশ্চয়ই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমি আর অপেক্ষা না করে দড়িতে বাঁধা মইটা টেনে নামালাম। খাবার-টাবার নিয়ে মই বেয়ে সেই গুহার মুখে উঠে এলাম। বাইরে ঝকঝকে রোদ। গুহার ভেতরটা কিন্তু অন্ধকার। আমি আস্তে আস্তে গুহার মধ্যে ঢুকলাম। অন্ধকারটা চোখে একটু সয়ে আসতে দেখলাম গুহার গায়ে মশাল বসানো। কিন্তু তখন নিভে গেছে। অস্পষ্টভাবে দেখলাম এবড়োখেবড়ো মেঝেয় মোটা কাপড়ের বিছানা। তারপরেই একটা অগ্নিকুণ্ড। কিন্তু এখন নিভে গেছে। বিছানায় অসাড় হয়ে আছেন নিওফিতস। প্রথম দেখে বুঝলাম না। বেঁচে আছেন কিনা। একটু থেমে পারিসি বলতে লাগল– আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে হাঁটুগেড়ে বসে তার দুই পা চুম্বন করলাম। মোটা কাপড়ে ঢাকা একটা পা যেন একটু নড়ল। আমি তাড়াতাড়ি এসে নিওফিতসের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লাম। দেখি নিওফিতস আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। সর্দিসা গলায় খুব আস্তে বললেন– তুমি কে? আমি বললাম আমি পারিসি। আপনার সেবা করতে এসেছি।

আমার সেবার প্রয়োজন নেই। সেই একইভাবে বললেন।

আমি মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে বললাম, আপনার সেবা করতে পারলে আমার জীবন ধন্য হয়ে যাবে। যীশুর নামে বলছি–আমাকে এটুকু সুযোগ দিন। নিওফিস কী। ভাবলেন। তারপর কাশতে লাগলেন। আমি আস্তে আস্তে তার বুকে হাত বুলোতে। লাগলম। কাশির কষ্টটা কমতে আগের মতোই মৃদুস্বরে বললেন–বইটা শেষ করতে পারিনি। বইটা শেষ করার জন্য আমাকে বেঁচে থাকতেই হবে। কিন্তু শরীরে জোর পাচ্ছি না। ওরকম এক মহাপুরুষের এমন অসহায় অবস্থা দেখে আমি স্থির থাকতে পারলাম না। কেঁদে ফেললাম। কাঁদতে কাঁদতে বললাম, আমি আপনাকে সুস্থ করে তুলবো।

কিন্তু এই ঠাণ্ডায় এখানে তুমি থাকবে কী করে? উনি বললেন। আমি বললাম– আমার জন্য ভাববেন না। খাবার এনেছি। অনুমতি দিন–আপনাকে যেন খাওয়াতে পারি।

বেশ বেশনিওফিতস বললেন। একটু থেমে পারিসি বলতে লাগল–আমি দেখলাম নিভে যাওয়া অগ্নিকুণ্ডের ধারে চকমকি পাথর রয়েছে। গুহার একপাশে বেশ শুকনো ডালপালা পাতা কাঠ রয়েছে। আমি কিছু কাঠ ডালপাতা দিয়ে অগ্নিকুণ্ড সাজালাম। তারপর চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালোম। কিছুক্ষণের মধ্যেই অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠল। সেখান থেকে আগুন নিয়ে পাথরের খাঁজে রাখা মশাল জ্বালোম। এতক্ষণে গুহার ভেতরটা স্পষ্ট দেখা যেতে লাগল। আমার কোমরের ফেট্টির কাপড়টা খুলে আগুনে গরম করে করে সেই মহাপুরুষের পায়ে-হাতে-বুকে সেঁক দিতে লাগলাম। গুহাটাও ততক্ষণে বেশ গরম হয়ে গেছে। নিওফিস এবার অসাড় হাত পা শরীরে সাড়া পেলেন। হাত-পা নাড়লেন। উঠে বসার চেষ্টা করলেন। আমি পিঠে দু’হাত জড়িয়ে আস্তে আস্তে তাকে বসালাম। খেতে দিলাম। উনি আস্তে আস্তে খেতে লাগলেন। আমার সেদিন যে কী আনন্দ হয়েছিল বলে বোঝাতে পারবো না। এবার জল খাওয়ানো। জল তো আমি আনিনি। পারিসি থামলো।

ধারে কাছে নিশ্চয়ই পাহাড়ি ঝর্ণা ছিল। ফ্রান্সিস বলল।

ঠিক তাই–পারিসি বলল, উনি বললেন, এই গুহার শেষে গিয়ে দেখো একটা পাহাড়ি ঝর্ণা পাবে। সেখান থেকে জল নিয়ে এসো। আমি গুহার শেষে এসে দেখলাম গুহার ছোট্ট মুখ। তারপরেই একটা বড়ো ঝর্ণা। সেই জল নিয়ে এসে নিওফিতসকে খাওয়ালাম, নিজেও খেলাম। নিওফিতস আবার শুয়ে পড়লেন। আমিও খাওয়া সেরে ঐ এবড়োখেবড়ো মেঝের একপাশে শুয়ে পড়লাম।

তারপর? হ্যারি বলল।

এভাবেই সেবা-শুশ্রূষা করে নিওফিতসকে অনেকটা সুস্থ করে তুললাম। উনি কাগজ কলম নিয়ে প্রত্যেকদিনই গ্রন্থটি লিখতেন। বোধহয় শেষ হয়ে যেত লেখা। কিন্তু শীতকাল পড়তেই তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে তিনি দেহ রাখলেন। আমি সারারাত কাঁদলাম। তারপর সেই শেষ না হওয়া গ্রন্থটা নিয়ে নীচে নেমে এলাম।

গ্রন্থ পেয়ে তো সাইপ্রাসের শাসকের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু কী এমন ঘটল যে তোমাকে পালাতে হলো? ফ্রান্সিস বলল।

সেটাই সমস্যা। গ্রন্থটির প্রথম পাতায় সাধু নিওফিতস যীশুর একটি কাঠের মূর্তি এঁকেছিলেন। এত জীবন্ত ছবি খুব কম দেখা যায়। এখন সাইপ্রাসের শাসক গী দ্য লুসিগনান সন্দেহ করল যে সেই কাঠের মূর্তিটা নিওফিতস সত্যি সত্যিই নিজের হাতে বানিয়েছিলেন। আমি সেটা চুরি করেছি। আমি বারবার বললাম, আমি সেই কাঠের মূর্তি চোখেই দেখিনি। লুসিগনান বলল, ঐ গ্রন্থের ভূমিকাতেই নাকি সাধু নিওফিতস ঐ মূর্তি নিজের হাতেই তৈরি করার কথা বলেছেন। কাজেই আমাকে আবার কয়েকজন সৈন্যের সঙ্গে সেই গুহায় পাঠানো হল। আমি সুযোগ বুঝে পালালাম।

ঐ কাঠের যীশুমূর্তি কি সত্যিই নিওফিতস তৈরি করেছিলেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

আমি অতদিন গুহায় ছিলাম। কোনোদিন কাঠের তৈরি যীশৃমূর্তি কোথাও দেখিনি। পারিসি বলল।

আচ্ছা–ঐরকম কাঠের যীশুমূর্তি সম্পর্কে নিওফিতস কি কখনো তোমাকে কিছু বলেছিল? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।

না। তবে মাঝে মাঝে যখন ঝর্ণার জলে গা ধুতে যেতেন–বলতেন যীশুও আমার। সঙ্গে স্নান করবেন। পারিসি বলল।

এ কথার মানে কী? হ্যারি ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

এটা ঐ গুহা, ঝর্ণার চারপাশ ভালো করে না দেখে বলা যাবে না। ফ্রান্সিস বলল।

ডঢং ঢং শব্দে কয়েদঘরের দরজা খুলল। রক্ষীরা খাবার নিয়ে ঢুকল। খাবার দেখে ভাইকিংরা একটু অবাক হলো। মাখন মাখানো কাটা গোল রুটি, শাকসজির জুস আর কাঠের থালাভর্তি মাংস। খুবই সুস্বাদু খাবার। সবাই পেট পুরে খেলো। ফ্রান্সিস মনে মনে হাসল ক্রীতদাসেরহাটে নীরোগ সুস্থ স্বাস্থ্যবান যুবকদের দাম বেশি। তাই সবাইকে সুস্থ রাখতে হবে। তাই কয়েদীদের জন্যে এই রাজকীয় খানা।

আল জাহিরির ক্যারাভেল জাহাজ চলেছে। পেছনে কাছি দিয়ে বাঁধা ফ্রান্সিসদের জাহাজ।

এর মধ্যে দু’বার ঝড়ের পাল্লায় পড়তে হয়েছে। ঝড়ের সময় সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় কয়েদঘরের বন্দিদের। জাহাজের প্রচণ্ড দুলুনিতে একবার কয়েদঘরের এই মাথায়, পরক্ষণেই গড়িয়ে গিয়ে ঐ মাথায়। ফ্রান্সিসরা এসবে অভ্যস্ত। কিন্তু মারিয়া তো এ জীবন কখনও কাটায়নি। ওর কষ্ট হলো সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয়বারঝড়ের সময় জাহাজের কাঠে মাথায় ধাক্কা লেগে মারিয়া প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। এই ঝড়ের সময় ফ্রান্সিস সমস্ত শরীর দিয়ে মারিয়াকে চেপে ধরে রাখে। গড়াগড়ি খায়। মেঝেয় কাঠের দেয়ালে যা ধাক্কা লাগার ফ্রান্সিসের শরীরেই লাগে। মারিয়ার শরীর অক্ষত থাকে। তবু মাথায় লেগেছিল। অবশ্য ভেন-এর চিকিৎসায় মারিয়া সুস্থ হলো।

ক্যারাভেল আর জাহাজ চলেছে। ফ্রান্সিসদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝতে পারছে না। কয়েদঘরের রক্ষীদের কয়েকদিনই হ্যারি জিজ্ঞেস করেছে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমাদের? রক্ষীরা চুপ করে নিজেদের কাজ করে যায়। কোনো কথা বলে না। একজন রক্ষী একদিন বলেছিল–আল জাহিরি কী করেন তা আগে থেকে কাউকে বলেন না। ব্যস এইটুকুই জেনেছে ওরা।

একদিন সকালের খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিসরা শুয়ে-বসে আছে, হঠাৎ রক্ষীদের মধ্যে খুব তৎপরতা দেখা গেল।

একটু পরেই আল জাহিরি গরাদের কাছে এসে দাঁড়াল। কাষ্ঠহাসি হেসে স্পেনীয় ভাষায় বলল-খাওয়াদাওয়া ভালো পাচ্ছো তো?

হা–হ্যারি বলল, কিন্তু আমরা এখনও জানি না আপনি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

সাইপ্রাসের উত্তরে কেরিনিয়া বন্দরে। ক্রীতদাস কেনাবেচার বড়ো হাট বসে ওখানে। ওখানে দরে না পোষালে আবার অন্য হাটে নিয়ে যাবো। আল জাহিরি বলল।

তাহলে ক্রীতদাস হিসেবে আমাদের বিক্রি করবেনই। হ্যারি বলল।

আল জাহিরি হো হো করে হেসে উঠল–তা না হলে ভালো ভালো খাবার খাইয়ে “ তোমাদের এত যত্নে রেখেছি কেন।

হ্যারি আর কোনো কথা বলল না। ঐ নরপশুটার সঙ্গে ওর আর কথা বলতেও ইচ্ছে করছিল না। যা কথা হলো হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল। ফ্রান্সিস বলল–আর কোনো কথা বলো না। এরা সব হৃদয়হীন মানুষ। কথা বলারও অযোগ্য এরা। আল জাহিরি চলে গেল।

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল, ফ্রান্সিস এখান থেকে পালানোর উপায় বের করো।

হ্যারি, ফ্রান্সিস বলল, এখান থেকে পালানোর কোনো নিশ্চিত উপায় আমি ভেবে পাচ্ছিনা। পালানো সম্ভব কিন্তু তাতে কিছু বন্ধুর প্রাণ যাবে, কারণ লড়াই করতেই হবে। তার চেয়েও বড়ো কথা মারিয়া। মারিয়া এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি। লড়াইয়ে নামলে সব কিছু সারতে হবে অতি দ্রুত। মারিয়া তা পারবে না। হয়তো মারিয়ার জীবন বিপন্ন হবে। তাই আমি কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল, পারিসিকে এখানে নিয়ে এসো।

হ্যারি পারিসিকে ডাকতে গেল। মারিয়া বলল, ফ্রান্সিস আমার জন্যেই তোমাদের এই ভোগান্তি ভুগতে হচ্ছে।

ফ্রান্সিস হেসে বলল, ও কথা বলছো কেন? তোমার কী দোষ?

আমার জন্যেই তো পালাতে পারছে না। মারিয়া বলল।

তোমার জন্যে নয়, লড়াই করে পালাতে গেলেই বন্ধুদের প্রাণহানি ঘটবে। এটা আমি চাই না। পালাবার অন্য কোনো উপায়ও ভাবতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।

পারিসিকে সঙ্গে নিয়ে হ্যারি এলো। ফ্রান্সিস বলল, আচ্ছা, পারিসি, তুমি তো সাইপ্রাসের অধিবাসী। কেরিনিয়া বন্দর কেমন? খুব বড়ো বন্দর না ছোটো?

খুব বড়ো বন্দর নয়। মাঝারি রকমের বন্দর শহর। পারিসি বলল।

এখন সাইপ্রাসের শাসক তো গী দ্য লুসিগনান। ফ্রান্সিস বলল।

হা। পারিসি বলল।

নিওফিতসের গ্রন্থটি তো তুমি উদ্ধার করে গী দ্য লুসিগনানকে দিয়েছিলে। ফ্রান্সিস বলল।

হা। পারিসি মাথা ওঠানামা করে বলল।

কাঠের যীশুমূর্তিটা গী দ্য লুসিগনান তোমাকেই উদ্ধার করতে পাঠিয়েছিল আর তুমি তখন পালিয়েছিলে।

হ্যাঁ, আমি ওরকম মূর্তি ওখানে কোনোদিন দেখিনি। পারিসি বলল।

আমার কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস ওরকম একটা যীশুমূর্তি আছে। ফ্রান্সিস বলল।

হতে পারে, আমি জানি না। পারিসি বলল।

দেখো পারিসি–ফ্রান্সিস বলল, তুমি বলেছিলে ঐ গ্রন্থটির প্রথম পাতায় যীশুর যে ছবিটি দেখেছিলে সেটা খুব সুন্দর ছবি ছিল।

শুধু সুন্দর নয়–পারিসি বলল, প্রভু যীশুর ওরকম জীবন্ত ছবি আমি কোথাও দেখিনি।

এমন ছবি যিনি আঁকতে পারেন–ফ্রান্সিস বলল–তিনি কাঠ কুঁদে কুঁদে ওরকমই একটা কাঠের মূর্তিও তৈরি করতে পারেন। নিওফিতস শুধু ধর্মপ্রাণ সাধুই ছিলেন না– প্রতিভাবান শিল্পীও ছিলেন।

তা ঠিক। পারিসি ঘাড় নেড়ে বলল।

এবার হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস এখন কী করবে?

কিছুই করার নেই–ফ্রান্সিস বলল, কেরিনিয়া পৌঁছে রাজা গী দ্য লুসিগনানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তারপর যীশুর কাঠের মূর্তি উদ্ধার করে আনবো, এই প্রস্তাব দেব।

কাঠের মূর্তিটা নিয়ে সবাই এত ভাবছে কেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। পারিসি বলল।

ফ্রান্সিস হেসে বলল, সত্যিই সেই মূর্তিটা কাঠের। কারণ নিওফিতস এত ধনবান ছিলেন না যে সোনা হীরে মানিক দিয়ে অত উঁচুতে গুহায় থেকে মূর্তি গড়বেন। কাজেই হাতের কাছে হয়তো ওক বা চেস্টনাট গাছ পেয়েছিলেন। তার ডাল কুঁদে কুঁদে মূর্তিটা গড়েছিলেন। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল, পারিসি–মূর্তিটা মূল্যবান অন্য কারণে। ভেবে দেখো একজন মহান সর্বত্যাগী সাধুপুরুষ সেই মূর্তিটা তিলে তিলে গড়েছিলেন। তাহলেই বুঝতে পারছো কী পবিত্র সেই মূর্তি। এই জন্যেই গী দ্য লুসিগনান মূর্তিটা উদ্ধার করার জন্যে তোমাকে পাঠিয়েছিল। তুমি সুযোগ বুঝে পালিয়ে এলে। তারপরেও হয়তো আরো লোক পাঠানো হয়েছিল। বোধহয় কেউই মূর্তিটা উদ্ধার করতে পারেনি।

আপনি পারবেন? পারিসি বলল।

দেখি। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না।

একদিন ভোর ভোর সময়ে আল জাহিরি ক্যারাভেল আর ফ্রান্সিসদের জাহাজ কেরিনিয়া বন্দরে এসে ভিড়ল। ঘড় ঘড় শব্দে নোঙর ফেলার শব্দ হলো। কয়েদঘরের অনেক ভাইকিংদের ঘুম ভেঙে গেল। ফ্রান্সিসেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। হ্যারিকে ডাকল, হ্যারি। হ্যারি চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসল। ফ্রান্সিস বলল, আমরা বোধহয় কেরিনিয়া বন্দরে এলাম।

তাই তো মনে হচ্ছে–হ্যারি বলল, দেখি পাহারাদারদের জিজ্ঞেস করে।

দু’তিনজন পাহারাদার সকালের খাবার নিয়ে ঢুকল। ভাইকিংদের খেতে দিল। খেতে খেতে হ্যারি একজন পাহারাদারকে জিজ্ঞেস করল, জাহাজ কোন্ বন্দরে ভিড়ল।

কেরিনিয়া বন্দরে। এখানে তোমাদের বিক্রি করা হবে। সবাই পেট ভরে খাও। সবাই পেট পুরে খাও শরীর ঠিক রাখো। পাহারাদারটি ঠাট্রা সুরে বলল।

ফ্রান্সিস খাওয়া থামিয়ে হ্যারিকে বলল, পাহারাদারটি ঠাট্টার সুরে কী বলল?

ও কিছু না। হ্যারি বলল।

তবু বলো। ফ্রান্সিস দৃঢ়স্বরে বলল। হ্যারি বুঝল যে ঠাট্টার সুরে পাহারাদারটি যা বলেছে তা শুনলে ফ্রান্সিস ভীষণ রেগে যাবে। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলে উঠল, হ্যারি– বলো। এবার হ্যারি আস্তে আস্তে বলল, বলল যে এখানে তোমাদের বিক্রি করা হবে। পেট ভরে খাও শরীর ঠিক রাখো। কথাটা হ্যারি বলে শেষ করতে না করতে ফ্রান্সিস এক লাফে উঠে দাঁড়াল। ছুটে গিয়ে সেই পাহারাদারটির ঘাড়ে এক রদ্দা কষাল। পাহারাদারটি ‘আঁ’ শব্দ তুলে কাঠের পাটাতনে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস পাহারাদারের কোমরে ঝোলানো তলোয়ারটা এক হ্যাঁচকা টানে খুলে নিল। এসব দেখে অন্য পাহারাদাররা খোলা তলোয়ার হাতে ছুটে এলো। কাঠের পাটাতনে ছিটকে পড়া পাহারাদারটি উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস ওর গলায় তলোয়ারের ধারালো ডগাটা চেপে ধরে বলল, হ্যারি, এই রসিকটি ঠাট্টা করে যা বলেছে তার জন্যে তাকে ক্ষমা চাইতে বলো।

হ্যারি দ্রুত পাহাদারটিকে গ্রীক ভাষায় কথাটা বলল। ক্ষমা চাওয়া দূরের কথা ও চিৎকার করে বন্ধুদের ডাকল। ততক্ষণে আট-দশজন সৈন্য কয়েদঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সবার হাতেই খোলা তলোয়ার। ফ্রান্সিস ওদিকে রুদ্রমূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অস্ফুটস্বরে ফ্রান্সিস বলল, সব কটাকে নিকেশ করবো।

হ্যারি কথাটা শুনে ভয়ে চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি বলে উঠল–ফ্রান্সিস শান্ত হও। তুমি। লড়াইয়ে নামলে আমরা কেউ বাঁচবোনা। মারিয়া এতক্ষণে অবাক চোখে ফ্রান্সিসের রাগের চেহারা দেখছিল। এবার হ্যারি রাজকুমারীকে বলল, আপনি ফ্রান্সিসকে শান্ত হতে বলুন।

মারিয়া বলে উঠল–ফ্রান্সিস, শান্ত হও। আমাদের কথা ভুলে যেও না। ফ্রান্সিসের দৃঢ়ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকা শরীরটা এবার নড়ল। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকিয়ে তলোয়ারটা কাঠের মেঝেতে ফেলে দিল। আস্তে আস্তে বসে পড়ল কাঠের থালাটা টেনে নিয়ে আধখাওয়া খাবার আবার খেতে লাগল।

এবার হ্যারি গ্রীক ভাষায় পাহারাদারদের বলল, তোমরা আর যাই করো, আমাদের এই বন্দিদশা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করো না। ফ্রান্সিসকে তোমরা চেন না। ওর হাতে তলোয়ার থাকলে তোমাদের মতো আট-দশজনকে একাই নিকেশ করতে পারে। কাজেই সাবধান, ফ্রান্সিসকে অনেক কষ্টে শান্ত করেছি আমরা। বাজে ঠাট্টা-রসিকতা করো না। এতক্ষণে সৈন্যরাও ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝল। ওরা চলে গেল। পাহারাদাররাও এঁটো কাঠের থালা গ্লাস নিয়ে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ পাহারাদারদের মধ্যে তৎপরতা দেখা গেল। কয়েকজন সৈন্যও এলো। একটু পরেই আল জাহিরি কয়েদখানার গরাদের সামনে এলো। মুখে হাসির ভঙ্গ করে এনে স্পেনীয় ভাষায় বললো, আসার পথে তোমরা গোলমাল করোনি এজন্য ধন্যবাদ। এবার তোমাদের নিয়ে যাওয়া হবে ক্রীতদাস কুটিরে। বিরাট ঘর। তোমরা আরামে। থাকতে পারবে। তোমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সব ব্যবস্থাই রয়েছে ওখানে। কোনোরকম চালাকি করো না, পালাবার চেষ্টা করো না। আমার মানুষ মারতে ইচ্ছে করে না। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতেই চাই আমি।

ক্রীতদাস হিসেবে–তাই না? ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল।

আল জাহিরি আবার কাষ্ঠহাসি হাসল। বলল, কী করি। এটাই তো আমার ব্যবসা। হ্যারির ভয় হলো ফ্রান্সিস না আবার চটে যায়।

হ্যারি তাই বলল, আল জাহিরি–আপনার কথামতোই আমরা চলবো।

আল জাহিরি চলে গেল।

সেদিন তখনও রাতের খাওয়া হয়নি। ফ্রান্সিস এতক্ষণে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল। এবার উঠে বসল। ডাকল–হ্যারি? হ্যারিও আধশোয়া হয়েছিল। উঠে বসল। বলল, কী ব্যাপার? ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, ভেবে দেখলাম–পারিসি যে খ্রীস্টমূর্তির কথা বলেছে সেটা উদ্ধার করতে আমাকে যেতে হবে। কিন্তু আল জাহিরি যেতে দেবে না। ওর মতো একটা নরপশুকে আমি এজন্য অনুরোধও করবো না। যে করেই হোক পারিসিকে নিয়ে আমি একা পালাবো। পারিসি এই সাইপ্রাসের লোক। ওর সাহায্যে আমি রাজা গী দ্য লুসিগনানের সঙ্গে দেখা করবো। আমার বন্ধুদের মুক্তি দিতে হবে এই শর্তে যীশুর মূর্তি উদ্ধার করতে যাবো।

কিন্তু পারিসি বলছিল ঐ গুহার এলাকায় নাকি অসম্ভব শীত। ঠাণ্ডায় ঝর্ণার জল পর্যন্ত জমে যায়। হ্যারি বলল।

সেটা শীতকালে। এখন বসন্তকাল। খুব ঠাণ্ডা পড়বে না–ফ্রান্সিস বলল, ঠাণ্ডার জন্যে ভাবি না–ভাবছি ওরকম কাঠের মূর্তি আছে কিনা। যদি থাকে আপ্রাণ চেষ্টা করবো খুঁজে বের করতে। এছাড়া আমাদের মুক্তির কোনো আশা নেই। ফ্রান্সিস বলল।

তাহলে তুমি একাই পালাবে? হ্যারি বলল।

একা নয় পারিসিকেও সঙ্গে নিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর পারিসিকে কাছে। আসতে বলল। পারিসিকে পালাবার পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে বলল। এবার মারিয়াকে বলল, আমি আর পারিসি পালাবো। তুমি কোনোরকম দুশ্চিন্তা করো না। তুমি এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হওনি। দুশ্চিন্তা হলে তোমার শরীর খারাপ হবে।

না–আমি কোনোরকম দুশ্চিন্তা করবো না। তুমি সফল হও–এই কামনা করি। মারিয়া আস্তে আস্তে বলল। ফ্রান্সিস অনেকটা নিশ্চিন্ত হলো।

তখন রাত হয়েছে। ডাং ঢং শব্দ করে কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। দু’জন পাহারাদার খাবার নিয়ে ঢুকল। সবাই বসে খেতে লাগল। ফ্রান্সিস আর পারিসি দরজার কাছে পায়চারি করতে করতে খেতে লাগল।

হঠাৎ ফ্রান্সিস ভেজানো লোহার দরজাটা দ্রুত হাতে খুলে বাইরে চলে এলো। পেছনে পারিসি। আচমকা এই ঘটনায় দরজার কাছে দাঁড়ানো দুই পাহারাদার হতবাক। ওর মধ্যে একজন ফ্রান্সিসের দিকে ছুটে এলো। ও কোমর থেকে তলোয়ার খুলছে তখনি ফ্রান্সিস ওর বুকে লাথি মারল। পাহারাদার ছিটকে কয়েদঘরের মেঝেয় পড়ে গেল। হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। অন্য পাহারাদারটি কাছে আসার আগেই ফ্রান্সিস কাঠের থালা ছুঁড়ে মারল কাঁচে ঢাকা বাতিটার দিকে। কাঁচে ঢাকা বাতি ভেঙে চৌচির। অন্ধকার হয়ে গেল জায়গাটা। পাহারাদার অন্ধকারে ফ্রান্সিসদের দেখতে পেল না। পারিসির হাত ধরে ফ্রান্সিস ছুটল সিঁড়ির দিকে। কয়েদঘরের পাহারাদাররা চিৎকার চাঁচামেচি করতে লাগল। কিন্তু সেই শব্দ ওপরে ডেক পর্যন্ত এলো না। কাজেই ডেক এ দাঁড়ানো সৈন্যরা কিছুই বুঝল না।

সিঁড়ি দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ফ্রান্সিস পারিসিকে নিয়ে উঠ এলো ডেক-এ। ডেক এর সৈন্যদের দু’একজনের হাতে তলোয়ার। বাকিরা গল্পগুজব করছে। ফ্রান্সিস আর পারিসিকে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে দেখে দু’একজন সৈন্য ছুটে এলো। সৈন্যরা কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিস পারিসির হাত ধরে বলল, আমার সঙ্গে লাফ দাও। দু’জনে একসঙ্গে লাফ দিয়ে রেলিং ডিঙিয়ে ঝপাৎ করে সমুদ্রের জলে পড়ল।

সব সৈন্য পাহারাদাররা ডেক-এর ধারে এসে রেলিং ধরে চিৎকার চাঁচামেচি করতে লাগল। ততক্ষণে ফ্রান্সিস আর পারিসি ওদের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ফ্রান্সিস আর পারিসি ডুব সাঁতার দিয়ে বেশ কিছুটা গিয়ে আস্তে আস্তে জলের ওপর মাথা তুলল। পেছনে তাকিয়ে দেখল ক্যারাভেল-এর ডেক-এ আল জাহিরি এসে দাঁড়িয়েছে।

ফ্রান্সিস পারিসিকে বলল, কোনোরকম শব্দ না করে আস্তে আস্তে সাঁতার কেটে চলো। একটু দূরে গিয়ে আমরা সমুদ্রতীরে উঠবো। দু’জনেই আস্তে আস্তে সাঁতার কেটে চলল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তীরে পৌঁছল। পেছল পাথর বালির ওপর দিয়ে হেঁটে এসে তীরে উঠল। মাথার জল ঝাড়তে ঝাড়তে ফ্রান্সিস বলল, পারিসি,এই জলেভেজা অবস্থায় কোথাও একটু একটু আশ্রয় তো নিতে হবে।

কিছু ভাববেন না। আমার বাড়িটা তো আছে। পারিসি বলল।

তোমার বাড়িতে কে আছে? ফ্রান্সিস বলল।

আমার বুড়ি মা। তবে বেশ কয়েক মাস তো আমি বাইরে বাইরে। মা’র কী অবস্থা জানি না। পারিসি বলল।

চলো তো। একটা মাথা গোঁজার আস্তানা পেলেই হলো। ফ্রান্সিস বলল।

কেরিনিয়া বন্দুর-শহরের রাস্তা দিয়ে ওরা চলল। রাত হয়েছে। রাস্তা নির্জন। রাস্তার এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। বাড়িঘর অন্ধকারে ডুবে আছে। সবাই ঘুমুচ্ছে বোধহয়।

প্রায় আধঘণ্টার ওপর হাঁটতে হাঁটতে ওরা পারিসির বাড়ির দোরগোড়ায় এলো। পারিসি দরজার শেকলটা দরজায় ঠুকতে ঠুকতে ডাকল–মা, মা। বারকয়েক ডাকার পর সাড়া পাওয়া গেল। বুড়ির ভাঙা গলায় কেউ বলছে–কে রে?

আমি পারিসি–মা দরজা খুলে দাও। পারিসি বলল। ঠক্ ঠক্ শব্দে কাঠের দরজা খুলল। মোমবাতি হাতে একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। পারিসিকে দেখে ফোকলা দাঁতে হাসল। বলল, তুই কী করেছিস? রাজার সৈন্যরা তোর খোঁজে তিন-চার দিন এসেছিল।

ওসব নিয়ে ভেবো না। আমি অন্যায় কিছু করিনি। পারিসি বলল। ফ্রান্সিস, পারিসি আর ওর মার কথা গ্রীক ভাষায় বলে কিছুই বুঝছিল না। পারিসি ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে বলল। তারপর মাকে বলল–আমার এক বিদেশি বন্ধু এসেছে। আমাদের কিছু খেতে দাও।

এত রাতে, কী দেব। ভালো পিঠে আছে–খাবি? মা বলল।

কেন খাবো না। চলো ভেতরে। খেতে দাও। পারিসি বলল। ফ্রান্সিস আর পারিসি তো আধপেটা খেয়েই পালিয়েছিলে। কাজেই যখন একটা মাটির থালায় পরিসির মা পিঠে খেতে দিল তখন দু’জনেই হাপুস হুপুস করে খেয়ে নিল। জলটল খেয়ে এতক্ষণে ওদের স্বস্তি হলো। দু’জনে ভেজা পোশাক পালটাল। তারপর ঐ ঘরেই দু’জনে মেঝেয় শুয়ে পড়ল। একটু পরে ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে ফ্রান্সিস বলল, পারিসি-বর্তমান শাসক গী দ্য লুসিগনানের সঙ্গে আমাকে দেখা করতে হবে। তুমি এই সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করো।

মুশকিল হয়েছে যে আমি তো জেরস পাহাড় থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে পেয়ে কয়েদখানায় পাঠাবে। পারিসি বলল।

ঠিক আছে–ফ্রান্সিস বলল, আমাকে সঙ্গে নিয়ে তুমি রাজসভায় চলো। তোমাকে যাতে কোনো ঝামেলা পোহাতে না হয় সে ব্যবস্থা আমি করবো।

আমাদের তো রাজধানী নিকোশিয়ায় যেতে হবে। পারিসি বলল।

তাই চলো। তুমি একাট চাষীদের শস্যটানা গাড়ির ব্যবস্থা করো। ফ্রান্সিস বলল।

দেখি। পারিসি এই কথা বলে বেরিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে পারিসিফিরে এলো। বলল–গাড়ি পেয়েছি। কিন্তু এতদূর পথ যেতে অর্ধ স্বর্ণমুদ্রার অর্থ চাইছে। ফ্রান্সি বলল, পারিসি, তোমার জানাশুনো কোনো স্বর্ণকার আছে?

তা আছে। পারিসি বলল।

তাহলে গাড়িতে চড়ে আগে সেখানে চলো। আমার বিয়ের আংটিটা বন্ধক রেখে স্বর্ণমুদ্রার অর্থ নেব। গাড়িভাড়া দেব। ফ্রান্সিস বলল।

পারিসির মা’র হাতে তৈরি আরো পিঠে খেল দু’জনে। বাড়িতে তৈরি এত সুস্বাদু পিঠে ফ্রান্সিস যে কতদিন খায়নি। পিঠে খেতে খেতে ফ্রান্সিসের বারবার মা’র কথা মনে পড়তে লাগল।

ওরা চাষীর গাড়িতে চড়ে বসল। পথে এক স্বর্ণকারের দোকানে ঢুকল ওরা। পারিসির পরিচিত দোকানদার। আংটি বন্ধক রেখে কিছু স্বর্ণমুদ্রা দিল। ফ্রান্সিস বারবার বলল, আমি কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়িয়ে নিয়ে যাব। এর মধ্যে সোনার আংটিটা গালিয়ে ফেলবেন না কিন্তু। দোকানদার মাথা নেড়ে বলল, না–না। অন্তত বছর খানেকের আগে আমরা বন্ধকী জিনিস গলাই না।

এবার নিশ্চিন্ত হয়ে গাড়িতে উঠল দু’জনে। গাড়ি চলল রাজধানী নিকোশিয়ার দিকে।

ওদিকে ফ্রান্সিস আর পারিসি পালিয়ে গেছে বলে হ্যারিদের সবাইয়ের হাত বেঁধে দেওয়া হলো। হাত-বাঁধা অবস্থাতেই খাওয়া শোওয়া।

সেদিন বিকেলে ডঠাং ঢং করে কয়েদখানার লোহার দরজা খুলে গেল। ভাইকিংরা একটু আশ্চর্যই হলো। এ সময় তো দরজা খোলা হয় না।

দরজা দিয়ে ঢুকল আল জাহিরি। সঙ্গে এক রোগা লিকলিকে আরবী। বেশ ফর্সা। চিবুকে ছাঁটা দাড়ি। মাথায় লাল ফেজ টুপি পরা। দু’জন পাহারাদারকে আল জাহিরি কী বলল। তারা মারিয়ার কাছে এলো। মারিয়ার হাত ধরল। মারিয়া এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল। এবার হ্যারিরা বুঝতে পারল মারিয়াকে ক্রীতদাসীর মতো ঐ শুটকো লোকটার কাছে বিক্রি করা হবে। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল– ও-হো-হো। সঙ্গে সঙ্গে সব ভাইকিং বন্ধুরা উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল। ও-হো-হো৷ পাহারাদার দু’জন বেশ ঘাবড়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। আল জাহিরি দেখল এসব। তারপর ইঙ্গিতে হ্যারিকেডাকল। ঐ শুটকো লোকটা বোধহয় গ্রীক আর আরবী ভাষা জানে। অন্য ভাষা জানে না। তাই হ্যারিকে ডাকল আল জাহিরি।

হ্যারি এগিয়ে গিয়ে আল জাহিরির সামনে দাঁড়াল। আল জাহিরি বলল, আজ হোক, কাল হোক, তোমাদের সবাইকে বিক্রি করা হবে। তবে তোমরা বাধা দিচ্ছো কেন?

হ্যারি বলল, শুধু রাজকুমারীকে আমরা বিক্রি করতে দেব না। আমাদের সবাইকে যেদিন বিক্রি করবেন সেইদিন রাজকুমারীকে বিক্রি করতে পারবেন। তার আগে নয়। আল জাহিরি হেসে বলল, ভালো দামে বিক্রি হতো।

সে তো আপনার কেঠো হাসি দেখেই বুঝতে পারছি। হ্যারি বলল।

আল জাহিরি ব্যবসাদার। বুঝল–এত তাড়াহুড়ো করতে গেলে ঝামেলায় পড়তে হবে। ওর দরকার হ্যারিদের আর মারিয়াকে বিক্রি করা। সময় সুযোগ মতো সেটা করতে হবে। দু’চারজনকে অন্য কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই অজুহাত দেখিয়ে দফায় দফায় নিয়ে বিক্রি করতে হবে। ভাইকিংদের সংখ্যাও কমে আসবে। তখন রাজকুমারীকে বিক্রি করা হবে। কারণ তখন বাধা দেওয়ার মতো ভাইকিংরা খুব কম থাকবে। সহজেই সব মিটে যাবে।

সেই শুটকো মতো লোকটাকে কী বোঝাতে বোঝাতে আল জাহিরি চলে গেল।

সেদিন একটু বেলায় কয়েদঘরের দরজা ঢং ডঠাংশব্দে খুলে গেল। সৈন্যরা কয়েদঘরে ঢুকতে লাগল। সকলের হাত দড়ি দিয়ে বাঁধতে লাগল। মারিয়াও বাদ গেল না। তারপর আট-দশজন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে ওপরে ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির কাছে দাঁড়াল। পাহারাদাররা হ্যারিকে বলল, সবাইকে বলো–ডেক-এ উঠতে হবে। হ্যারি গলা চড়িয়ে সেই কথাই সবাইকে বলল। ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা একে একে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল।

প্রায় অন্ধকার কয়েদঘর থেকে বাইরের আলোয় আসতেই সবাই কিছুক্ষণ তাকাতেই পারল না। এই অভিজ্ঞতা ফ্রান্সিস আর বন্ধুদের আছে, কিন্তু মারিয়ার এই অভিজ্ঞতা নেই। মারিয়া বলে উঠল, আমি যে তাকাতেই পারছি না।

হ্যারি বলল, রাজকুমারী কিছুক্ষণের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। সত্যিই তাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরের আলোর তীব্রতা মারিয়ার চোখে সয়ে গেল। ক্যারাভেল থেকে কাঠের পাটাতন ফেলা হয়েছে। পাটাতন দিয়ে হেঁটে হেঁটে সবাই নেমে এলো। সৈন্যদল ওদের ঘিরে নিয়ে চলল। যেখানে হ্যারিদের নামানো হলো সেখান থেকে কেরিনিয়া বন্দর বেশ দূরে।

কেরিনিয়া বন্দরে তখন ব্যস্ততা। বেশ কয়েকটি নানা দেশের জাহাজ ভেড়ানো আছে। দু’একটা জাহাজ বন্দর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। হ্যারিরা যেখানে নামল সেখানটায় দেখল দুতিনটে লম্বাটে ঘর। ঘরগুলোর মাথায় শুকনো ঘাস আর পাতার ছাউনি। কাফ্রি আরবী গ্রীক পাহারাদার সৈন্যরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা সবাই ঐ তিনটি কয়েদঘরের পাহারাদার।

ভাইকিংদের নিয়ে আসা হলো মাঝখানের ঘরটার সামনে। লোহার গরাদ লাগানো দরজা। দু’জন পাহারাদার তালা খুলে ঢং ডটাং শব্দে লোহার দরজা খুলল। ওদের সেই ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। শব্দ তুলে দরজা বন্ধ করা হলো।

এই পাথরগাঁথা কয়েদঘরে ওপরের দিকে গরাদ দেওয়া দু’টো জানালা। এই দিনের বেলাও মশাল জ্বলছে। মেঝেয় শুকনো ঘাস লতাপাতা দড়ি দিয়ে বেঁধে শক্ত করা বিছানা মতো।

যীশুর কাঠের মূর্তি ভাইকিংরা কেউ বসল, কেউ শুয়ে পড়ল, কেউ কেউ পায়চারি করতে লাগল।

হ্যারি কয়েদঘরের কাঠের দেয়ালে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসেছিল। মাথায় নানান চিন্তা। ফ্রান্সিস আর পারিসি তো পালাল। ওরা নির্বিঘ্নেই পালিয়েছে। কিন্তু ওরা কী করে হ্যারিদের মুক্ত করতে পারবে সেটাই চিন্তার। হ্যারিদের একমাত্র সান্ত্বনা ফ্রান্সিস বাইরে আছে। ও মুক্ত। একটা কিছু উপায় ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই বুদ্ধি করে বের করবে। ওদিকে শাঙ্কো ভাবল–সে একা পালাবে। ক্রীতদাসের হাটে হ্যারিদের বিক্রি করার আগেই সবাইকে মুক্ত করতে হবে। এই নিয়ে শাঙ্কো ভাবতে লাগল। শেষ পর্যন্ত স্থির করল পালাতে হবে। ও হ্যারির কাছে গিয়ে বসল। মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি আমি পালাবো।

–কী করে? হ্যারি একটু আশ্চর্য হয়েই বলল।

–সেসব আমার ভাবা হয়ে গেছে। শাঙ্কো বলল।

–শাঙ্কো ভেবেচিন্তে পা ফেলো–হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস আর পারিসি পালিয়েছে। ফ্রান্সিস আমাদের মুক্তির একটা কিছু ব্যবস্থা করবেই। তার আগে তুমি পালাতে যেও না। তোমার যদি কোনো বিপদ হয় ফ্রান্সিস রাগ করবে আমাদের ওপর। কেন আমরা তোমাকে বাধা দিই নি এই জন্যে। শাঙ্কো বলল–

–আমার কোনো বিপদ হবে না। আমি আটঘাট বেঁধেই নামবো।

–বেশ–তোমার দায়িত্বেই তুমি এই ঝুঁকি নিচ্ছে। পরে আমাদের দোষ দিও না। হ্যারি বলল।

–আমি কাউকেই দোষ দেব না। এই ঝুঁকির সব দায়িত্ব একা আমার। শাঙ্কো বলল।

তখনও রাতের খাবার দেবার সময় হয়নি। শাঙ্কো হ্যারিকে বলল–রাতের খাবার দেবার সময় আমি পালাবো। এবার হ্যারি আমার জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা বার করো। হ্যারি দড়িবাঁধা দু’হাত শাঙ্কোর গলার কাছে জামার মধ্যে ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করে আনল। শাঙ্কো বলল এবার আমার হাতের দড়িটা কাটো। হ্যারি জোড়া দু’হাতে ছোরা ধরে শাঙ্কোর হাত বাঁধা দড়ি ঘষে ঘষে কাটতে লাগলো। ছোরাটা তো হ্যারি ভালো করে ধরতে পারছে না। ছোরা এদিক-ওদিক ঘুরে যাচ্ছে। শাঙ্কোর হাত কেটে যাচ্ছে। রক্ত বেরোচ্ছে। শাঙ্কো মুখ বুজে আছে। একসময় দড়িটা কেটে গেল। শাঙ্কো ছোরাটা নিয়ে জামার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল।

রাত হল। ঢঢং ঢং শব্দে লোহার দরজা খুলে গেল। তিনজন পাহারাদার খাবার নিয়ে ঢুকল। লোহার দরজার বাইরে দু’জন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস আর পারিসি পালাবার পর ওরা সাবধান হয়ে গেছে। তিন পাহারাদার যখন খাবার দিতে শুরু করল শাঙ্কো একলাফে উঠে লোহার দরজা পার হয়ে বাইরে চলে এলো। তিন পাহারাদার খাবার কাঠের মেঝেয় রেখে তলোয়ার খুলে দরজার দিকে ছুটল। ততক্ষণে শাঙ্কো লোহার দরজা বাইরে থেকে কড়া টেনে বন্ধ করে দিয়েছে। তিন পাহারাদার আটকা পড়ে গেল। বাইরের খোলা তলোয়ার হাতে দু’জন সৈন্য শাঙ্কোর দিকে ছুটে এল। শাঙ্কো প্রথম সৈন্যটিকে আর তলোয়ার চালাতে দিল না। দ্রুত ছুটে এসে ওর পেটে মাথা দিয়ে ফুঁ মারল। সৈন্যটি কাত হয়ে কাঠের মেঝের পড়ে গেল। হাতর তলোয়ার ছিটকে গেল। পরের সৈন্যটি তলোয়ার চালাল। শাঙ্কো মাথা নিচু করে তলোয়ারের মার এড়াল। তারপর ছুটল কাঠের সিঁড়ির দিকে। সৈন্যটিও খোলা তলোয়ার হাতে পেছনে পেছনে ছুটলো। শাঙ্কো ততক্ষণে সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ দ্রুত উঠে গেছে। শাঙ্কো বুঝল যে সৈন্যটি এবার চেঁচিয়ে অন্য সৈন্যদের ডাকবে। কাজেই ওর মুখ বন্ধ করতে হবে। শাঙ্কো ঘুরে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির প্রথম ধাপে-ওঠা সৈন্যটির মুখে গায়ের সমস্ত জোর একত্র করে লাথি মারল। সৈন্যটা চিত হয়ে সিঁড়ির ওপর গড়িয়ে পড়ল। চিৎকার করে উঠতে পারল না।

এবার শাঙ্কো দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে ডেক-এ উঠে এলো। সৈন্যরা কিছু বোঝার আগেই শাঙ্কো রেলিং ডিঙিয়ে এক লাফে সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ডুব সাঁতার দিয়ে যতটা দমে কুলোয় ততটা এগিয়ে গেল। তারপর আস্তে আস্তে জলের ওপর মাথা তুলল। দেখল জাহাজ থেকে অনেকটা দূরেই চলে এসেছে। ডেক-এ সৈন্যদের সঙ্গে আল জাহিরি এসে দাঁড়িয়েছে। শাঙ্কো আস্তে আস্তে জলে কোনোরকম শব্দ না করে নিজেদের জাহাজটার দিকে সাঁতার কেটে চলল।

একসময় জাহাজটার পেছনের দিকে এলো। তারপর হালের খাঁজে পা রেখে জল থেকে উঠল। তারপর হালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে রেখে ডেক-এর কাছে উঠে এল। আগেই ডেক-এ নামল না। রেলিঙের আড়াল থেকে দেখল মাত্র দু’জন সৈন্য ডেক-এ রয়েছে। একজন ডেক-এর কাঠের মেঝেয় শুয়ে আছে অন্যজন বসে আছে। শাঙ্কো ডেক-এ শুয়ে পড়ল। তারপর বুক নিয়ে চলল সিঁড়িঘরের দিকে। সিঁড়ির কাছে এসে আস্তে সিঁড়িতে পা রেখে উঠে দাঁড়াল। অন্ধকারে সৈন্য দু’জন কিছুই দেখতে পেল না। এলো ওরা আগের মতোই গল্প করতে লাগল। শাঙ্কো সিঁড়ি দিয়ে কেবিনঘরে নেমে এলো। নিজের কেবিনঘরে গিয়ে শুকনো পোশাক বের করল। তখনও শাঙ্কো হাঁপাচ্ছে। জলে ভেজা পোশাক ছেড়ে শুকনো পোশাক পরে নিল। এবার খাওয়া। রাতের খাবারটা খাওয়া হয়নি। ভীষণ খিদে পেয়েছে। শাঙ্কো রসুইঘরে ঢুকল। দেখল বেশ কয়েকটা গোল রুটি আছে। দু’তিনদিনের মতো নিশ্চিন্ত ছুরি দিয়ে গোল রুটি কেটে কেটে খেতে লাগল। খাওয়া হলে জল খেয়ে নিজের কেবিনঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুমনো পর্যন্ত একটা চিন্তাই ঘুরে ঘুরে মাথায় এলো–মারিয়া হ্যারিদের কীভাবে মুক্ত করা যায়? ফ্রান্সিস পালিয়েছে। আমিও পালালাম। কিন্তু বন্ধুরা সবাই তো ফ্রান্সিস বা আমার মতো পালাতে পারবে না। ওদের পালাবার উপায় একটা বের করতে হবে। ফ্রান্সিস আর পারিসি পালিয়ে কী করল সেও জানি না। রাজা’গী দ্য লুসিগনানের সঙ্গে ফ্রান্সিস দেখা করতে পেরেছে কি না কিছুই জানি না। যা হোক–আমিই বন্ধুদের মুক্ত করবো। তার উপায়টা ভেবে ভেবে বের করতে হবে। দেখা যাক। রাত বাড়তে শাঙ্কোর দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো।

সকালে ঘুম ভেঙে গেল। শাঙ্কো রসুইঘরে গিয়ে কিছু খেয়ে এলো। সারাক্ষণই ভাবতে লাগল কী উপায়ে হ্যারি, মারিয়া আর বন্ধুদের মুক্ত করা যাবে। কিন্তু কোনো উপায় ভেবে ভেবে স্থির করতে পারল না।

এমন সময় আল জাহিরির ক্যারাভেল জাহাজ থেকে উচ্চস্বরে কথাবার্তা ভেসে। এলো। শাঙ্কোর কৌতূহল হল। কী ঘটল ঐ জাহাজে।

শাঙ্কো আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে ডেক-এ উঠে এলো। তারপর জাহাজের পাটাতনে শুয়ে পড়ে গড়িয়ে চলে এলো মাস্তুলের পেছনে। মাস্তুলের আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখল মারিয়া হ্যারিদের জাহাজ থেকে নামিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। বোঝা গেল ওদের সমুদ্রতীরের কাছে কোনো কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মারিয়া হ্যারিদের জাহাজ থেকে নামিয়ে আনা হল। সৈন্যরা খোলা তলোয়ার হাতে ওদের ঘিরে দাঁড়াল। তারপর হাঁটিয়ে নিয়ে চলল কিছুদূরে একটা লম্বাটে ঘরের দিকে। শাঙ্কো বুঝল–ঐ লম্বাটে ঘরটাই কয়েদঘর। ক্রীতদাস কেনাবেচারহাট এখানেই আছে। হাতবাঁধা মারিয়া হ্যারিরা ততক্ষণে ঐ কয়েদখানায় পৌঁছে গেছে।শাঙ্কো গভীরভাবে ভাবতে লাগল কী করবে ও? একটু ভেবে ভেবে বের করল যে জাহাজের বাইরে আসায় হ্যারিদের মুক্ত করা সহজ হবে। মৃত্যু রক্তপাত না। ঘটিয়ে জাহাজ থেকে মুক্ত করা অসম্ভব ছিল। এখন কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল। শাঙ্কো ভেবে ভেবে স্থির করল যা করার আজ রাতেই করতে হবে। সময় নষ্ট করা চলবে না। হয়তো কাল পরশুর মধ্যেই এখানে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাট বসবে। মারিয়া হ্যারিরা একবার বিক্রি হয়ে গেলে আর তাদের খোঁজ পাওয়া অসম্ভব। কাজেই আজ রাতেই ওদের মুক্তির জন্যে চেষ্টা করতে হবে। শাঙ্কো এরমধ্যে উপায়টা ভেবে নিল। সবকিছুই নির্ভর করছে কয়েদখানায় ক’জন পাহারাদার রাখা হয় তার ওপর।

শাঙ্কো নিজের কেবিনঘরে নেমে এলো। বিছানায় শুয়ে পড়ল। ভাবতে লাগল। অনেক ভাবনা মাথায়।

দুপুরে গোল রুটি কেটে নিয়ে চিনি দিয়ে খেল। খিদের মুখে ঐ খাবারই অমৃত মনে হল।

সন্ধে হল। শাঙ্কো তখনও চুপ করে বিছানায় শুয়ে রইল।

রাত হল। রাতের খাওয়া খেয়ে শাঙ্কো ওদের অস্ত্রঘরে গেল। তীর ধনুক নিল। কোমরে তলোয়ার গুজল। বলা যায় না যদি লড়াইয়ে নামতে হয়।

রাত বাড়তে লাগল। শাঙ্কো তখনও বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম করছে।

রাত গম্ভীর হল। শাঙ্কো তীর ধনুক নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। ডেক-এ শুয়ে পড়ে গড়িয়ে মাস্তুলের আড়ালে এলো। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে দেখল–পাহারাদার সৈন্যরা ডেক-এর এখানে-ওখানে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। ডাক্‌নিশ্চিন্ত।

শাঙ্কো কাঠের পাটাতন দিয়ে অন্ধকারে আস্তে আস্তে তীরে নেমে এলো। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে চলল কয়েদঘরের দিকে।

অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কয়েদঘরের কাছে এসে দেখল কয়েদঘরে দরজার কাছে। দুতিনটে মশাল জ্বলছে। চারজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে। দু’জন বসে আছে। দু’জন। খোলা তলোয়ার হাতে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

শাঙ্কো অন্ধকারে হাঁটু গেড়ে বসল। ধনুকে তীর পরাল। তারপর মশালের আলোয় নিশানা ঠিক করতে লাগল। বেশি তীর খরচ করা চলবে না। একটুক্ষণ নিশানা ঠিক করে শাঙ্কো তীর ছুঁড়ল। তীর গিয়ে লাগল খোলা তলোয়ার হাতে এক পাহারাদারের পায়ে। সে তলোয়ার ফেলে পা চেপে বসে পড়ল। অন্য তিনজন পাহারাদার চারদিকে তাকাতে লাগল। ওরা রবুঝে উঠতে পারলো না কোথা থেকে তীর ছুটে এলো। শাঙ্কো আবার তীর ছুঁড়ল। এই তীর একজন পাহারাদারের বুকে গিয়ে লাগল। সে উবু হয়ে দরজার কাছে মুখ থুবড়ে পড়ল। বাকি দুজন সভয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। শাঙ্কোর পরের তীরটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। তীরটা ঠং করে লোহার দরজায় লেগে নীচে পড়ে গেল। দু’জন পাহারাদার আর ওখানে থাকতে সাহস পেল না। দু’জনেই অন্ধকারে লাফিয়ে নেমে ছুটল নিজেদের জাহাজের দিকে। অন্ধকারে শাঙ্কো লক্ষ্য স্থির করতে পারল না। ওরা নিশ্চয়ই জাহাজে গিয়ে আল জাহিরিকে খবর দেবে। হাতে সময় কম। ধনুক পিঠে ঝুলিয়ে শাঙ্কো দ্রুত ছুটে এলো। দেখল একজন পাহারাদার পা টিপে ধরে বসে আছে। অন্যজন উবু হয়ে পড়ে আছে। ওর কোমরেই শাঙ্কো দেখল চাবির গোছা। শাঙ্কো এক হ্যাঁচকা টানে চাবির গোছা নিয়ে নিল। শাঙ্কো আহত পাহারাদারকে স্পেনীয় ভাষায় বলল–একেবারে চুপ করে থাকবে। টু শব্দটি করেছো কি তোমাকে শেষ করে দেব। সব কথা না বুঝলেও পাহারাদারটি বুঝল ওকে চ্যাঁচামেচি করতে মানা করছে। ও চুপ করে হাত চেপে পায়ের রক্তপড়া বন্ধ করার চেষ্টা করতে লাগল।

শাঙ্কো আর দাঁড়াল না। ছুটে গেল কয়েদঘরের দরজার কাছে। বড়ো তালাটায় চাবি ঢুকিয়ে। ঢুকিয়ে দেখতে লাগল। একটা চাবি লেগে গেল। কন্ট্র করে তালাটায় শব্দ হল। তালা খুলে গেল। শাঙ্কো বেশ শব্দ করেই দরজা খুলল যাতে সবাই সজাগ হয়। ভেতরে ঢুকেশাঙ্কো চাপা গলায় বলল–ভাইসব–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের পালাতে হবে। জলদি। ভাইকিংরা সঙ্গে সঙ্গেউঠেদাঁড়াতে লাগল।তারপরছুটল দরজার দিকে। সবারই দু’হাত বাঁধা। ছুটে যেতে অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু উপায় নেই। পালাবার এই সুযোগ ছাড়া চলবে না।

সবাই কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এলো। শাঙ্কো বলল–এখন আমরা শহরে যাবো না অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকবো।

হ্যারি বলল–বাঁদিকে কিছুদুরে একটা জঙ্গলা জায়গা দেখা যাচ্ছে। ওখানেই আমরা আশ্রয় নেব। ছোটো সবাই। সবাই ছুটলে সেই জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলে ঢুকে একটা ফাঁকা জায়গামতো পেল। সেখানেই বসে পড়ল সবাই। হাঁপাতে লাগল।

শাঙ্কো কোমর থেকে ছোরা বের করল। তারপর মারিয়ার হাতবাঁধা দড়ি কেটে দিল। একে একে সবাইর হাতের দড়ি কাটা হল।

হ্যারি ওপরের দিকে তাকাল। একফালি আকাশ দেখল। তারাগুলোর আলো ম্লান হয়ে আসছে। তার মানে রাত শেষ হয়ে আসছে।

কিছু পরে সূর্য উঠল। হ্যারিরা জঙ্গলের মধ্যে থাকায় সূর্য ওঠা দেখতে পেল না। ততক্ষণে পাখিদের ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে।

আল জাহিরির কয়েদখানা থেকে তো পালানো গেল। এবার চাই খাদ্য আর আশ্রয়। এতজনের খাদ্যআরআশ্রয় জোগাড় করা একসমস্যা।হ্যারি বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল ভাইসব–এবার খাদ্য আর আশ্রয় চাই। কিন্তু এতজন সবাই একসঙ্গে বাইরে বেরুনো যাবে না। আমি জনাদশেককে সঙ্গে নিয়ে বেরুবো। ফিরে এসে আবার জনা দশেককে নিয়ে যাবো। তোমরা কেউ গ্রীক ভাষা জানো না। কথা বলে আমাকেই সব ব্যবস্থা করতে হবে। এবার জনাদশেক আমার সঙ্গে চলো। হ্যারি থামল। তারপর মারিয়াকে বলল–আপনিও চলুন। মারিয়া বলল সবাইআশ্রয়পাকতারপরআমি যাবো।-না রাজকুমারী–আপনি এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হন নি। আপনার কথা আমাকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। চলুন।

মারিয়া আর জনাদশেক বন্ধুকে নিয়ে হ্যারি বন থেকে বেরিয়ে এলো। দেখল কিছুটা খোলা মাঠের মতো। তারপর কেরিনিয়া নগরের রাস্তা।

ওরা রাস্তা দিয়ে চলল। রাস্তায় লোকজনের খুব একটা ভিড় নেই। একটা পাথরের বড়ো বাড়ির সামনে এসে হ্যারি বলল দাঁড়াও সবাই। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। হ্যারি এগিয়ে গিয়ে কাঠের দরজায় বড়ো কড়াটা দিয়ে ঠক্ঠক্‌শব্দ করল। একটু পরেই দরজা খুলে একজন প্রৌঢ় এসে দাঁড়ালেন। তিনি বেশ অবাক হয়েই হ্যারিদের তাকিয়ে দেখলেন। প্রৌঢ়ের গায়ে বেশ দামি পোশাক। বোঝা গেল যথেষ্ট স্বচ্ছল পরিবার। হ্যারি ভাঙাভাঙা গ্রীক ভাষায় বলল– আমরাবিদেশি–ভাইকিং। প্রৌঢ় বললেন তোমাদের কথা আমরা শুনেছি।দক্ষ জাহাজ চালক তোমরা। দুঃসাহসী। তবে জলদস্যু বলে তোমাদের দুর্নামও আছে।

আমাদের সঙ্গে যারা পেরে ওঠে না তারা এই দুর্নাম দেয়। হ্যারি বলল।

–ঠিক আছে ঠিক আছে। ওসব কথা থাক। তোমরা কী চাও? প্রৌঢ়টি বললেন।

–দেখুন–আমাদের জাহাজডুবি হয়েছে। কোনোরকমে এই ক’জন প্রাণে বেঁচেছি। আপনার বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য আশ্রয় চাই। হ্যারি বলল।

–নিশ্চয়ই–প্রৌঢ়টি বললেন–আপনারা থাকুন। আসুন। প্রৌঢ়টি দরজা ছেড়ে দাঁড়ালেন। প্রথমে মারিয়া পরে শাঙ্কো, বিস্কোরা কয়েকজন ঢুকল। প্রৌঢ়টি হ্যারিকে বললেন–আমার নাম অ্যান্তিকো। তোমাদের যখন যা প্রয়োজন পড়ে জানাবে।

বাইরের ঘরটায় এসে দাঁড়াল সবাই। দেখলকাঠের তক্তায় পাতা বিছানামতো। ওরা বসল। বাড়ির ভেতর থেকে একজন বয়স্কা মহিলা এঘরে এলেন। অ্যান্তিকো তাকে হ্যারিদের কথা বললেন। মহিলাটি মারিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন–তুমি কে? গ্রীক ভাষা। মারিয়া কিছুই বুঝল না। হ্যারি বলল–উনি গ্রীক ভাষা জানেন না। আমি ওঁর পরিচয় দিচ্ছি। উনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।

–তা রাজকুমারী রাজপ্রাসাদের আরাম স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে এভাবে বিদেশে এসেছেন কেন? মহিলাটি বললেন।

–রাজকুমারী দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন। তাঁর স্বামীও আমাদের সঙ্গে আছেন। হ্যারি বলল।

–তা রাজকুমারীর স্বামী কে? মহিলাটি বললেন।

-ওসব জেনে তোমার কী হবে? অ্যান্তিকো বললেন–ওদের জলখাবারের ব্যবস্থা করো। মহিলাটি আর কোনো কথা বললেন না। বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। হ্যারি বলল-রাজকুমারী আপনারা এখানে থাকুন। আমি যাচ্ছি। অন্য বন্ধুদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। হ্যারি চলে গেল।

হ্যারি আরও দুটো বাড়িতে বন্ধুদের ভাগ ভাগ করে থাকার ব্যবস্থা করল। আশ্রয় আহার জুটল। এবার ফ্রান্সিসের আসার জন্য অপেক্ষা করা।

কিন্তু হ্যারিদের ভাগ্য খারাপই বলতে হবে। হ্যারিদের পালিয়ে যাবার খবর শুনে আল জাহিরি রেগে আগুন হয়ে গেল। কয়েদঘরের পাহারাদার ক’জনকে চাবুক মারল। মনের ঝাল মিটিয়ে এবার ভাবতে বসল কী করে বন্দিদের আবার ধরা যায়। ফিরিয়ে আনা যায়।

খোঁজখবর করতে করতে অ্যান্তিকোর বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো আল জাহিরি। আশপাশের দোকানে বাড়িতে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানল কিছু ভিনদেশি লোক অ্যান্তিকোর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কাজেই আল জাহিরির হ্যারিদের হদিশ পেতে অসুবিধে হয়নি।

বাড়ির বাইরে আটদশজন সৈন্যকে দাঁড় করিয়ে রেখে আল জাহিরি বাড়ির দরজায় হাত ঠুকে টক্ শব্দ করল।

একটু পরে অ্যান্তিকো দরজা খুলে দাঁড়ালেন। আল জাহিরিকে দেখে সৈন্যদের দেখে একটু অবাকই হলেন। বললেন–কী ব্যাপার?

–আপনার বাড়িতে আমার ক্রীতদাসরা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আমি তাদের ধরে নিয়ে যেতে এসেছি। আল জাহিরি বলল। অ্যান্তিকো বললেন আমাকে তো ওরা বলেছে ওদের জাহাজডুবি হয়েছে।

–মিথ্যে কথা। ওরা আমার ক্রীতদাস। আল জাহিরি বলল।

–আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। অ্যান্তিকো বললেন।

আল জাহিরি ঢোলা পোশাকের নীচে থেকে একটা গুটোনা পার্চমেন্ট কাগজ বের করল। অ্যান্তিকোর হাতে দিয়ে বলল–এটা রাজা গী দ্য লুসিগনানের ফরমান। এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ক্রীতদাস কেনাবেচার ফরমান আমি পেয়েছি। কাজেই পলাতক ক্রীতদাসদের বন্দি করে ধরে নিয়ে যাবার অধিকার আমার আছে।

–তা ঠিক। তবে আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে এরা। এভাবে এদের

–কোনো কথা নয়। অ্যান্তিকোকে কথা শেষ করতে না দিয়েই আল জাহিরি বলে উঠল–আপনি সরে দাঁড়ান। আমি দেখছি।

আল জাহিরি অ্যান্তিকোকে প্রায় হঠিয়ে দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকল। বাইরের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।হারিরাও চমকে উঠল। একেবারে দোরগোড়ায় আল জাহিরি দাঁড়িয়ে আছে। আল জাহিরি কেঠো হাসি হাসল। বলল–আমার হাত থেকে নিস্তার নেই। সব চলো কয়েদখানায়। হ্যারি বলে উঠল–না–আমরা যাবো না। আমরা আপনার ক্রীতদাস নই। এসময় অ্যান্তিকো এলেন। বললেন–তোমরা ক্রীতদাস এটা আমাকে বলোনি। হ্যারি বলে উঠল–আল জাহিরি আমাদের জাহাজ দখল করে আমাদের ধরে নিয়ে এসেছে। আমাদের অর্থের বিনিময়ে কেনেনি। তাহলে আমরা ক্রীতদাস হলাম কী করে? অ্যান্তিকো বললেন –এসব তো প্রমাণসাপেক্ষ। তাছাড়া ক্রীতদাস কেনাবেচার অধিকার নিয়ে একে রাজা গী দ্য লুসিগনান ফরমান দিয়েছেন। এক্ষেত্রে কেউ বাধা দিতে পারবে না। এবার হ্যারি বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে দেশীয় ভাষায় সব বলল। তারপর বলল–আমরা যাবো না। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল– ওহোহো। আজ জাহিরি এতে খুব ঘাবড়াল না। কারণ ওর হাতে রাজার ফরমান রয়েছে। আল জাহিরি বাইরে সদরদরজার দিকে তাকিয়ে ইশারায় সৈন্যদের ডাকল। সৈন্যরা খোলা তলোয়ার হাতে এসে ঘরে ঢুকল। হ্যারি বুঝল আল জাহিরি তৈরি হয়েই এসেছে। বুঝল সশস্ত্র সৈন্যদের নিরস্ত্র অবস্থায় বাধা দেওয়া অসম্ভব। বাধা দিতে গেলে বন্ধুদের অনেকেই মারা যাবে। কাজেই ধরা দেওয়াই এখন ভালো। পরে মুক্তির উপায় ভেবে বের করতে হবে।

হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসবজানি এখন ধরা দিতে আমাদের পৌরুষে বাধবে। কিন্তু উপায় নেই। আমাদের ধরা দিতেই হবে। তাহলেই আমরা সবাই বেঁচে থাকবো। পরে মুক্তির উপায় ভাববো। বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। অনেকেই এভাবে কাপুরুষের মত হার স্বীকার করতে রাজি হচ্ছিল না। হ্যারি বুঝল বিপদ। যদি বন্ধুরা মাথা গরম করে সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে এক রক্তঝরা লড়াই হবে। নিরস্ত্র বন্ধুদের অনেকেই মারা যাবে বা ভীষণ আহত হবে। তাই হ্যারি চিৎকার করে বলল–কেউ লড়াইয়ে নেমো না। আমাদের সবচেয়ে বড়ো সান্ত্বনা ফ্রান্সিস মুক্ত আছে। ফ্রান্সিস আমাদের মুক্তির কোনো পথ নিশ্চয়ই বের করবে। এখন সবাই শান্ত হও। কেউ মাথা গরম করো না। বুদ্ধিমানে মতো মাথা ঠাণ্ডা রাখো। ফ্রান্সিস থাকলে সেও ঠিক এ কথাই বলতো। এবার বন্ধুরা শান্ত হলো। বুঝল–এখন লড়াইয়ে নামা বোকামি হবে। তাছাড়া ফ্রান্সিস তো মুক্ত আছে। ফ্রান্সিসের ওপর ওদের বিশ্বাস খুবই গভীর। শুধু বিস্কো বলল–আমরা আল জাহিরির সঙ্গে ফিরে যাবো। কিন্তু আমারে হাত বাঁধা চলবে না। আমরা কেউ পালাবার চেষ্টা করবো না। আর একটা কথা রাজকুমারী মারিয়াকে কয়েদঘরে রাখা চলবে না। তাকে আমাদের জাহাজে রাখতে হবে। হ্যারি কথাগুলো আল জাহিরিকে বুঝিয়ে বলল। আল জাহিরি খুবই বুদ্ধিমান। ও দুটো শর্তেই রাজি হলো। ওর তখন চিন্তা কোনোরকমে একবার কয়েদঘরে ঢোকাতে পারলেই নিশ্চিন্ত।

হ্যারি ওরা সৈন্যদের পাহারায় বাড়ির বাইরে এলো। রাস্তায় দাঁড়াল। সৈন্যরা ওদের ঘিরেদাঁড়াল। আল জাহিরি হ্যারিকে বলল–তোমাদের আরো বন্ধু আছে। তারা কোথায়?

–আমি জানি না। হ্যারি বলল।

–একসঙ্গে পালালে আর এখন বলছো জানি না। আল জাহিরি বলল।

-যে যেখানে পেরেছে আশ্রয় নিয়েছে নয় তো এ নগর থেকেই পালিয়ে গেছে। হ্যারি বলল।

–ঠিক আছে। তাদেরও ধরবো। আল জাহিরি বলল।

–দেখুন চেষ্টা করে। হ্যারি বলল।

সবাই চলল জাহাজটার দিকে। শাঙ্কো ওর তির-ধনুক নিয়ে যাচ্ছিল। একজন সৈন্য আল জাহিরির ইঙ্গিতে তির-ধনুক কেড়ে নিল।

সৈন্যদের পাহারায় হ্যারিরা যখন যাচ্ছে তখন রাস্তার লোকজন ওদের দেখতে লাগল। হয়তো ভাবল এরা কোন্ দেশের লোক। এদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেন।

জাহাজঘাটা থেকে একটু দূরে সেই কয়েদখানার সামনে এলো সবাই। হ্যারিদের এক এক করে ঢোকানো হতে লাগল। সবশেষে হ্যারি ও মারিয়া। হ্যারি বলল রাজকুমারী আপনি এইকয়েদখানায় থাকবেন না। আমাদের জাহাজে আপনার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আল জাহিরি এ ব্যবস্থায় রাজি হয়েছে। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল–না–আমি তোমাদের সঙ্গে এখানেই থাকবো। হ্যারি বলল-রাজকুমারী এসময় আপনি অবুঝ হবেন না। আপনি জাহাজে থাকলে আমরা অনেক নিশ্চিন্ত থাকবো। তাছাড়া আপনাকে জাহাজে রাখার কারণ আছে। একটু থেমে হ্যারি বলল–আল জাহিরির সঙ্গেশর্ত থাকবে আপনি প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে আমাদের এই কয়েদঘরে দেখতে আসবেন। এবার হ্যারি গলা নামিয়ে আস্তে বলল–আসার সময় আপনি গাউনের নীচে যে ক’টা তলোয়ার আনা সম্ভব আনবেন। এভাবে কিছু অস্ত্র হাতে পেলে আমরা লড়াইয়ে নামবো। আপনি এখানে থাকলে সেটা সম্ভব হবে না। কাজেই আপনি জাহাজেই থাকুন। আপনার শরীরের দুর্বলতা এখনো যায়নি। মারিয়া আর কোনো কথা বলল না। বুঝল হ্যারি ঠিকই বলেছে।

হ্যারি কয়েদঘরে ঢুকল। আল জাহিরি একজন সৈন্যকে হুকুম করল–মারিয়াকে তাদের জাহাজে রেখে আসতে। দু’জন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে মারিয়াকে তাদের জাহাজের দিকে নিয়ে চলল।

পরদিন সকালে খাওয়া-দাওয়ার পর মারিয়া পোশাক রাখার চামড়ার পেটিটা খুলল। খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে বড়ো আর ঢোলা গাউনটা বের করল। গাউনটা বেশ জমকালো।

এবার মারিয়া অস্ত্রঘরে এলো। কোমরের দুপাশে আর পেছনে তিনটে তলোয়ার দড়ি দিয়ে শরীরের সঙ্গে বেঁধে নিল। তারপর কেবিনঘরে এসে সেই বড়ো গাউনটা পরল। বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় রইল না। তলোয়ারগুলোর মারিয়া খুপসুদ্ধ বেঁধেছিল। তাই হাঁটতে গিয়ে তলোয়ারের খোঁজা লাগল না। তলোয়ারের খাপগুলো লাগল। তাতে কেটে ছড়ে গেল না।

সেই জমকালো গাউন পরে মারিয়া জাহাজ থেকে পাটাতন দিয়ে নেমে এলো। দু’জন সৈন্য ছুটে এসে মারিয়ার দু’পাশে খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে দাঁড়ালো। সৈন্যরা সবাই হাঁ করে মারিয়ার সেই জমকালো পোশাক দেখতে লাগলো। যেন নাচের আসরে যাচ্ছে এমনি ভঙ্গিতে মারিয়া কয়েদঘরের দিকে চলল।

কয়েদঘরের দরজার কাছে এসে পাহারাদারদের ইঙ্গিতে দরজা খুলে দিতে বলল। পাহারাদার দরজার তালা খুলল। দরজা খুলে দিল। মারিয়া কয়েদঘরে ঢুকে একপাশে ডানদিকে সরে গেল। পাহারাদাররা আর মারিয়াকে দেখতে পেল না।

মারিয়া এবার শাঙ্কোকে ডেকে বলল–আমার শরীরে তলোয়ার বাঁধা আছে। খুলে নাও। শাঙ্কো আস্তে আস্তে খাপসুষ্ঠু তলোয়ার তিনটের বাঁধা দড়ি খুলে তলোয়ার বের করে আনল। তারপর দ্রুতহাতে ঘাসের বিছানার নীচে তলোয়ার তিনটে গুঁজে রাখল।

একটু পরে কিছু কথাবার্তা বলে মারিয়া চলে এলো।

এভাবে তিনদিন ধরে মারিয়া গাউনের নীচে তলোয়ার নিয়ে কয়েদঘরে আসতে লাগল। শাঙ্কো আর বিস্কো তলোয়ার লুকিয়ে রাখতে লাগল।

পরের দিন দুপুরে দুটো জাহাজ জাহাজঘাটায় এসে লাগল। হ্যারি পাহারাদারদের কথাবার্তা থেকে জানল ঐ দুটো জাহাজে মূর ক্রীতদাসদের বিক্রির জন্যে আনা হয়েছে। কালকেই ক্রীতদাসদের কেনাবেচার হাট বসবে। একটু দূরে দুটো বাদামগাছের নীচে কাঠের পাটাতন পাতা মাচার মতো। ওখানেইক্রীতদাসদের তোলা হয়। ক্রেতারা চারদিকে জড়ো হয়। ক্রীতদাসদের দেখেশুনে দাম হাঁকে। দরাদরির পর ক্রীতদাসদের কিনে লোকেরা নিয়ে যায়। হ্যারি বুঝল আর দেরি করা চলবে না। আজ রাতেই যা অস্ত্র পাওয়া গেছে। তাই নিয়ে লড়াইতে নামতে হবে।

হ্যারি বন্ধুদের ডেকে বলল–ভাইসব–কালকে এখানে ক্রীতদাস বিকিকিনির হাট বসবে। তাই আজকে রাতেই লড়াইয়ে নামতে হবে। বেশ কিছু তলোয়ার পেয়েছি। এই নিয়েই লড়াই করতে হবে। সবাই চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো। পাহারাদার কয়েকজন লোহার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বন্দিরা চিৎকার করে ধ্বনি তুলল কেন কিছুই বুঝল না ওরা। হ্যারিরা নিজেদের মধ্যে যে কথাবার্তা বলছে তাও বুঝল না। ওরা একটুক্ষণ দেখে দরজা থেকে সরে গেল।

তখন রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। যে সৈন্যরা খাবার দিতে এসেছিল তারা চলে গেছে।

হ্যারি মৃদুস্বরে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো। হ্যারির সামনে এসে মাথা নিচু করল। হ্যারি বাঁধা হাত দুটো শাঙ্কোর ঢোলা পোশাকের মধ্যে ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করল। ছোরাটা দিয়ে শাঙ্কোর হাতের দড়ি ঘষে ঘষে কাটতে লাগল। উত্তেজনায় ছোরার মুখ এদিক ওদিক ঘুরে যেতে লাগল। তাতে শাঙ্কোর হাত কেটে যেতে লাগল। রক্ত বেরুলো। শাঙ্কো দাঁত চেপে সব সহ্য করতে লাগলো।

একসময় দড়িটা কেটে গেল। শাঙ্কো একহ্যাঁচকা টানে সবটা কাটা দড়ি ছিঁড়ে ফেলল। তারপর ছোরাটা হাতে নিয়ে সবার হাতের দড়ি কেটে ফেলতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সবার হাতে দড়ি কাটা হলো।

তারপর মরিয়া যে দশ-বারোটা তলোয়ার এনেছিল সেইসব তলোয়ারগুলো ঘাসের বিছানার তলা থেকে বের করে ভাইকিংরা লড়াইয়ের জন্যে তৈরি হলো।

হ্যারির নির্দেশমতো দু’তিনজন ভাইকিং কয়েদঘরের দরজার কাছে গিয়ে চাঁচামেচি শুরু ক। দু’জন পাহারাদার দরজার কাছে এলো। বলতে লাগল কী হয়েছে? ভাইকিংরাও আজেবাজে বকতে লাগল।কউে কারো কথা বুঝল না। ভাইকিংরা ইঙ্গিতে পাহারাদারদের ভেতরে আসতে বলল। পাহারাদার দরজা খুলল। তিনজন পাহারাদার খোলা তলোয়ার হাতে ভেতরে ঢুকল। সশস্ত্র ভাইকিংরা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। পাহারাদাররা ঘরে ঢুকতেই ওদের ওপর তলোয়ার হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পাহারাদাররা স্বপ্নেও ভাবেনি এরকমভাবে আক্রান্ত হবে। ওরা তলোয়ার চালিয়ে লড়াই করতে লাগল। কিন্তু ভাইকিংদের নিপুণ তলোয়ার চালানোর সামনে ওরা দাঁড়াতেই পারল না। তিনজন পাহারাদারই আহত হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল। গোঙাতে লাগল।

হ্যারিওরা খোলা দরজা দিয়ে বাইরে এলো। কয়েদঘরের বাইরে উঠোন মতো জায়গায় আল জাহিরি একদল সৈন্য শুয়ে ঘুমিয়ে ছিল। কয়েদঘরের চিৎকার চাচামেচিতে ওদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ওরা কয়েদঘরের দরজার কাছে জ্বলন্ত মশালের আলোয় দেখল হ্যারিরা খোলা তলোয়ার হাতে বেরিয়ে আসছে। সৈন্যরা পরস্পরকে ধাক্কাধাক্কি করে ঘুম ভাঙাল। তারপর খাপ থেকে তলোয়ার খুলে নিয়ে ছুটে এলো।

ভাইকিংরাও ছুটে এলো। শুরু হলো তরোয়ালেরলড়াই।আল জাহিরির সৈন্যরা একটুক্ষণের মধ্যেই বুঝল–এ বড়ো কঠিন ঠাই। দুর্ধর্ষ ভাইকিংদের অভিজ্ঞ হাতের তলোয়ারের মারের কাছে ওরা একে একে হার স্বীকার করতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই অর্ধেক সৈন্য আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। উঠোনমতো জায়গাটা ভরে উঠল আহত সৈন্যদের গোঙানিতে আর্ত চিৎকারে। বাকিরা প্রাণভয়ে অন্ধকারে এদিক ওদিক পালিয়ে গেল।

ওদিকে এখানে লড়াইয়ের চিৎকারে আর্তনাদে আল জাহিরির জাহাজের সৈন্যদের ঘুম ভেঙে গেল। ওরা খোলা তলোয়ার হাতে দল বেঁধে জাহাজ থেকে নেমে এলো। ভাইকিংরাও ওদের দিকে ছুটে এলো। আল জাহিরির একদল সৈন্যকে হারিয়ে ভাইকিংরা প্রত্যেকেই তলোয়ার পেয়েছে। ভাইকিংরা একবার অস্ত্র হাতে পেলে তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করা সহজ কথা নয়।

দু’দল পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে হ্যারি গিয়ে দু’দলের মাঝখানে দাঁড়াল। হ্যারি দু’হাত তুলে চিৎকার করেউঠল–থামো। দু’দলই দাঁড়িয়ে পড়ল।হ্যারি আলজাহিরির সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল–সৈন্যরা–এইমাত্র তোমাদের একদল সৈন্যকে আমরা হারিয়ে দিয়ে এসেছি। আমাদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামলে তোমাদেরও সেই দশা হবে। তার আগে বলছি—তোমরা অস্ত্ৰ ত্যাগ কর। হার স্বীকার করো। তোমাদের জাহাজে করে তোমরা চলে যাবে। আমরা কোনো বাধা দেব না। হ্যারি একটুক্ষণের জন্যে থেমে বলল–এখন তোমরাই বিবেচনা কর কী চাও তোমরা মৃত্যু না বেঁচে থাকা। আল জাহিরির সৈন্যদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। এসময় আল জাহিরি জাহাজের রেলিঙের কাছে এসে দাঁড়াল। চিৎকার করে ওর সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? আক্রমণ করো। সৈন্যরা দ্বিধায় পড়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। হ্যারি চিৎকার করে বলল–সৈন্যরা–তোমরা একবার লড়াইয়ে নামলে কেউ বাঁচবে না। আল জাহিরির কথায় তোমরা বোকার মতো মরতে যাবে কেন? অস্ত্র ত্যাগ করো। আবার সৈন্যদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। ওরা সংখ্যায় বেশি হলেও লড়াইতে নামতে ইতস্তত করতে লাগল। হ্যারি আবার চিৎকার করে বলল–সৈন্যরা অস্ত্র তাগ কর। আল জাহিরি চিৎকার করে বলে উঠল কাপুরুষের দল লড়াই ক–আক্রণ কর।

এবার কিছু সৈন্য তলোয়ার মাটিতে ফেলে দল থেকে সরে দাঁড়াল। বাকিরা এগিয়ে এলো। মুহূর্তে ভাইকিংরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো লড়াই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আল জাহিরির অর্ধেকের বেশি সৈন্য হয় মারা গেল না তো আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গোঙাতে লাগল। লড়াই চলল। কিন্তু আল জাহিরির বাকি সৈন্যদের মনোবল ততক্ষণে ভেঙে গেছে। ওরা অন্ধকারের মধ্যে গা ঢাকা দিল। নয়তো পালিয়ে গেল।

ভাইকিংরা ধ্বনি তুলল ওহোহো। লড়বার জন্যে আল জাহিরির একটি সৈন্যও আর তখন সামনে নেই।

হ্যারি দেখল জাহাজের রেলিঙের কাছে আল জাহিরি নেই। হ্যারি চিৎকার করে বলল–শাঙ্কো শিগগিরি জাহাজে যাও। আল জাহিরি না পালিয়ে যায়।

শাঙ্কো এক ছুটে জাহাজে উঠে পড়ল। ডেক-এর কোথাও আল জাহিরিকে দেখল না। সিঁড়ি বেয়ে নীচেনামল। কেবিনঘরের মধ্যে দেখতে লাগল।আল জাহিরি কোনো কেবিনঘরে নেই। রসুইঘরেও নেই। নিশ্চয়ই ডেক-এ কোথাও লুকিয়ে আছে। অন্ধকারে জলে নেমে পালাবার ধান্দায় আছে। শাঙ্কো দ্রুতপায়ে ডেক-এ উঠে এলো। চারদিকে খুঁজতে লাগল। তখনই অস্পষ্ট জলে সাঁতার কাটার শব্দ শুনলো। শাঙ্কো জহাজের পেছনের দিকে এলো। হালের কাছে এসে নীচে জলের দিকে তাকাল। অন্ধকারে অস্পষ্ট দেখল কেউ যেন জলে সাঁতরে চলেছে তীরের দিকে। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার দাঁতে চেপে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দ্রুত সাঁতার কেটে পলায়নপর আল জাহিরি পেছনে পেছনে চলল।

কিছুক্ষণ পরে আল জাহিরি তীরে উঠল। শাঙ্কোও শ্যাওলাধরা পাথরে পা রেখে সাবধানে তীরে উঠল। অন্ধকারে আল জাহিরি ছুটে পালাতে যাবে তখনই শাঙ্কো ওর পেছনে এসে দাঁড়াল। দু’জনেই হাঁপাচ্ছে তখন।

তলোয়ার হাতে নিয়ে শাঙ্কো তলোয়ারের ডগাটা আল জাহিরির গলায় ঠেকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–পালাবার চেষ্টা করলেই মরবে। কথাটা শাঙ্কো স্পেনীয় ভাষায় বলল। আল জাহিরি এটুকু বুঝল যে আর পালাবার উপায় নেই। আল জাহিরিও তখন হাঁপাচ্ছে। শাঙ্কো বলল–তোমার সৈন্যরা কিছুমরেছে কিছু আহত হয়ে গোঙাচ্ছে কিছু পালিয়েছে। মোট কথা আল জাহিরি এখন তুমি একেবারে একা।

আল জাহিরি হঠাৎ একটু নিচু হয়ে একহঁচকা টানে কোমরের ঝোলানো তলোয়ারটা খুনে আনল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল এখন তুমিও একা। লড়ে আমাকে হারাও দেখি। শাঙ্কোও কোমর থেকে তলোয়ার বের করল। আকাশে ভাঙা চাঁদ। অনুজ্জ্বল চাঁদের আলোয় দু’জনের তলোয়ারের লড়াই শুরু হলো। প্রায় অন্ধকারে দু’জনের হাঁপানোর শব্দ আর তরোয়ালের ঠোকাঠুকির শব্দ।

কিছুক্ষণ লড়েই আল জাহিরি বুঝল কেন ভাইকিংদের দুর্ধর্ষ বলা হয়। শাঙ্কোর নিপুণ তলোয়ার চলানো দেখে আল জাহিরি বুঝল ওকে সহজে হারানো যাবে না। অথচ এখন শাঙ্কোকে হারাতে না পারলে ওর আর পালিয়ে যাওয়া হবে না। আল জাহিরি প্রাণপণে লড়তে লাগল। দু’জনের নাক মুখ দিয়ে বেশ শব্দ করে শ্বাস পড়ছে। লড়াই চলল।

একসময় শাঙ্কো কয়েক পা দ্রুত পিছিয়ে গেল। আল জাহিরি এক লাফে এগিয়ে এলো। শাঙ্কো এই সুযোগ কাজে লাগালো। শাঙ্কো সামনে লাফিয়ে পড়ে দ্রুত তলোয়ার চালাল। এত দ্রুত তলোয়ারে ঘা নেমে এলো যে আল জাহিরি আত্মরক্ষা করার সময় পেল না। শাঙ্কো আল জাহিরির ডানবাহুতে তলোয়ারের কোপ বসিয়ে দিল। তীব্র ব্যথায় আল জাহিরি ঝাঁকিয়ে উঠল। হাতির দাঁতে বাঁধানো বাঁটওয়ালা তলোয়ারটা মাটিতে ফেলে বাঁ হাত দিয়ে কাটা জায়গাটা চেপে ধরল।

শাঙ্কো তলোয়ারটা তুলে নিল। তারপর হাঁপাতে হাঁপতে বলল–তোমাকে এক্ষুণি নিকেশ করতে পারি। কিন্তু তা করবো না। তোমাদের জাহাজের কয়েদঘরে তোমাকে বন্দি করে রাখবো। কত নিরীহ মানুষদের রক্তে আর চোখের জলে ভেজা ঐ কয়েদঘর। তোমাকে সেখানে বন্দি করে রাখা হবে। নিরীহ মানুষগুলো দিনের পর দিন কী অমানুষিক দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থেকেছে তার স্বাদ তুমিও পাও। তোমার প্রায়শ্চিত্ত হোক। আল জাহিরি অনুনয়ের সুরে বলল–আমাকে ছেড়ে দাও। কথা দিচ্ছি–আমি আর ক্রীতদাস বিক্রির ব্যবসা করবো না।

না–শাঙ্কো বলল–তুমি অনেক রক্ত ঝরিয়েছো, অনেক চোখের জল ঝরিয়েছো। তার প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে করতেই হবে। চলো তোমাদের জাহাজে। শাঙ্কো ওর তলোয়ার আল জাহিরির পিঠে ঠেকাল। বলল চলো।

দু’জনে যখন আল জাহিরির জাহাজ থেকে ফেলা কাঠের পাটাতন দিয়ে উঠছে তখন ভাইকিংরা নিজেদের জাহাজ থেকে উল্লাসের ধ্বনি তুলল ওহোহো।

সিঁড়ি বেয়ে দু’জনে নেমে কয়েদঘরের দরজার কাছে এলো। আর জাহিরি এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলল–এই কয়েদঘরে থাকলে আমি মরে যাবো।

–তোমাকে তিলে তিলে মারবার জন্যেই এই কয়েদঘরে রাখা হবে। শাঙ্কো বলল।

এবার আল জাহিরি বলল–আমার কাছে মুক্তো মণি-মাণিক্য আছে। সব তোমাকে দেব। আমাকে ছেড়ে দাও।

–ও সব লোভ আমাকে দেখিও না। ঢোকো কয়েদঘরে। কথাটা বলে শাঙ্কো আল জাহিরির পিঠে তলোয়ারের চাপ বাড়ালো। আল জাহিরি এবার কেঁদে ফেলল। বলল আমাকে এভাবে তিল তিল করে মেরো না। বুকে তলোয়ার ঢুকিয়ে একবারে মেরে ফেলো।

–না–তোমাকে এই কয়েদঘরেই মরতে হবে। ঢোকো কয়েদঘরে। কথাটা বলে শাঙ্কো তলোয়ারের চাপ বাড়ালো। আল জাহিরি কাঁদতে কাঁদতে কয়েদঘরে ঢুকল। শাঙ্কো বাইরে থেকে লোহার দরজা বন্ধ করে দিল।

কোমরে তলোয়ার খুঁজেশাঙ্কো সিঁড়ি দিয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। জাহাজের পেছন দিকেহালের কাছে এলো। দেখল এই ক্যারাভেল জাহাজের সঙ্গে ওদের জাহাজটা দড়ি দিয়ে বাঁধা। শাঙ্কো কোমর থেকে ছোরা বের করল। বাঁধা দড়িটা ছোরা দিয়ে ঘষে ঘষে কেটে ফেলল। ওদের জাহাজটা হাত দশেক দূরে সরে গেল।

এবার শাঙ্কো কয়েকজন ভাইকিংকে এই জাহাজে আসতে বলল।ওরা এলো। শাঙ্কো বলল-চলো নোঙর তুলতে হবে।

কয়েকজন মিলে টেনে টেনে নোঙর তুলল। যেখানে নোঙর আটকানো থাকে সেখানে নোঙর তুলে রাখলো তারপর ক্যরাভেলহাজ থেকে সকলেই নেমে এসে নিজেদের জাহাজে উঠল। ক্যারাভেল জাহাজটা হাওয়ার ধাক্কায় আস্তে আস্তে মাঝ সমুদ্রের দিকে চলল। জাহাজটার নীচের কয়েদঘরে একা আল জাহিরি তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

হ্যারি জিজ্ঞেস করলশাঙ্কো, আল জাহিরিকে কী করেছো?

–ঐ জাহাজের কয়েদঘরে বন্দি করে রেখে এসেছি। শাঙ্কো বলল।

–ভালো করেছে। নিজের জীবন দিয়ে ও বুঝুক মানুষের ওপর অত্যাচারের ফল কী? হ্যারি বলল। আল জাহিরিকে কী শাস্তি দেওয়া হয়েছে সেটা সকলেই শুনল। আনন্দে ওরা আবার চিৎকার করে উঠল–ওহোহো।

ওদিকে আল জাহিরির যে পাঁচ-ছ’জন পাহারাদার সৈন্য অক্ষত দেহে পালাতে পেরেছিল তারা কয়েদঘরের পেছনের জঙ্গলটায় জড়ো হল। ওরা কয়েদঘরের আড়াল থেকে দেখেছিল একজন ভাইকিং আল জাহিরিকে ওদের জাহাজে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের আশঙ্কা ছিল হয়তো ওরা আল জাহিরিকে মেরে ফেলেছে। এখন দেখল আল জাহিরি বেঁচে আছে। ওদের জাহাজেই আল জাহিরিকে বন্দি করে রাখা হয়েছে–এটা বুঝল।

ওরা আরো দেখল ভাইকিং যোদ্ধাটি ওদের জাহাজ থেকে নেমে এলো। ঘাট পর্যন্ত। পাতা কাঠের পাটাতন তুলে ফেলল। তারপর ভাইকিংটা নিজেদের জাহাজে গিয়ে উঠল। বোঝাই গেল আল জাহিরিকে কয়েদঘরেই বন্দি করে রেখে ভাইকিংটা চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে ওরা দেখল ওদের জাহাজ মাঝ সমুদ্রের দিকে ভেসে চলেছে।

একজন সৈন্য বলে উঠল-জাহাজটা চালাবার মতো কেউ নেই। এভাবে ভেসে গেলে অনেক দূর চলে যাবে। আমরা আর জাহাজটার কোনো খোঁজই পাবো না। কাজেই এখনি আমাদের ঐ জাহাজটায় গিয়ে উঠতে হবে।

–কিন্তু যাবো কীভাবে? একনজ সৈন্য বলল।

সাঁতার কেটে চলল। একজন সৈন্য বলল।

–না। এতদূর সাঁতরে যেতে গিয়ে হয়তো হাঙরের মুখে পড়বো। কেউ বাঁচবো না তাহলে। অন্যজন বলল।

–তাহলে এক কাজ করা যাক। জেলেপাড়ায় চলো।

ওখানে নিশ্চয়ই একটা মাছধরা নৌকো পাবো। একজন বলল। এ কথায় সবাই। রাজি হল। অন্ধকারে চলল জেলেপাড়ার দিকে।

কিছুক্ষণ পরে জেলেদের বস্তী দেখল। পাথ আর কাঠের বাড়িঘরদোর। সমুদ্র তীরটা এখানে বেঁকে গেছে। সেই বাঁকে অন্ধকারেও দেখা গেল আট-দশটা জেলে নৌকো জল থেকে একটু দূরে লয়াড়িতে তুলে রাখা হয়েছে।

সৈন্যরা পাঁচজন নৌকোগুলোর কাছে গেল। শক্তপোক্ত দেখে একটা নৌকো ওরা বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলল। তারপর সমুদ্রের জলে নামাল। নৌকোতে উঠল ওরা। দাঁড় নিল একজন। অন্যজন দাঁড় হালের মতো জলে রাখল। দাঁড় বাওয়া চলল। নৌকোও চলল আল জাহিরির জাহাজ লক্ষ্য করে। রাত শেষ হয়ে। সূর্য উঠল। ভোরের নরম আলো ছড়ালো আকাশে সমুদ্রে। ওদের ভাগ্যি ভালো যে একটা ঘন কুয়াশার আস্তরণে ওদের নৌকোটা ঢাকা পড়ে গেছে।

ফ্রান্সিসদের জাহাজের নজরদার পেড্রো কুয়াশায় ঢাকা পড়া নৌকোটা দেখতে পেল না।

কুয়াশা ঢাকা সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ওদের নৌকো চলল আল জাহিরির জাহাজ লক্ষ্য করে। আল জাহিরির জাহাজও কুয়াশায় দেখা যাচ্ছে না। বেশ আন্দাজেই দিক ঠিক করে ওরা নৌকো বেয়ে চলল।

কিছুক্ষণ পরেই ঘন কুয়াশাঘেরা আল জাহিরির জাহাজটা ওরা দেখতে পেল। ওরা নৌকোটা আরো দ্রুত চালাল।

একসময় জাহাজের গায়ে এসে লাগল ওদের নৌকোটা। জাহাজ থেকে ঝুলে থাকা দড়িদড়া ধরে ওরা জাহাজটায় উঠল। দেখল ডেক-এ কেউ নেই। ওরা দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচের কেবিনঘরগুলোর সামনে এলো। প্রত্যেকটি কেবিনঘর খুঁজে দেখল– আল জাহিরি কোথাও নেই। ওদের চিন্তা হল–তাহলে কি ঐ ভিনদেশি লোকেরা আল জাহিরিকে মেরে ফেলে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে? একজন পাহারাদার সৈন্য বললও সেকথা। আর একজন বলল-ওরা আল জাহিরিকে মেরে ফেলে নি। চলোতো একবার কয়েদখানাটা দেখি।

এবার সবাই ছুটল নীচের কয়েদঘরের দিকে। কয়েদঘরের গরাদের সামনে এসে দেখল কয়েদঘরে মেঝের দুই হাঁটুতে হাত রেখে মাথা নিচু করে আল জাহিরি বসে আছে। ওদের পায়ের শব্দে আল জাহিরি মুখ তুলে তাকাল। সৈন্যদের দেখেই ছুটে লোহার দরজার কাছে এলো। চিৎকার করে বলল-শিগগিরি দরজা খো। আমাকে বোঁচা। সৈন্যরা দেখল দরজায় তালা লাগানো। কিন্তু চাবি কোথায়? ওরা লোহার দরজার কাছে জায়গাটা ভালো করে খুঁজল। কোথাও চাবিটা পড়েনি।

তখন একজন সৈন্য ছুটল যেখানে জাহাজ মেরামতির জন্যে হাতুড়ি গজাল থাকে।

একটা মোটা হাতুড়ি আর গজাল নিয়ে সৈন্যটি ফিরে এলো। গজালটা তালার ওপর রেখে গজালটায় হাতুড়ির ঘা মারতে লাগল। ও কয়েকটা হাতুড়ির ঘা মেরে আর একজনের হাতে হাতুড়িটা দিল। সে এবার হাতুড়ির ঘা মারতে লাগল। লোহার গরাদের ওপাশে আল জাহিরি তখন ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে–আমাকে বাঁচা তোরা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তালার জোড়াটা ভেঙে খসে পড়ল। ওরা দরজা খুলল। আল জাহিরি পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে এলো। চিৎকার করে বলল-ওরা আমাকে এখানে বন্দি করে ক্ষুধায় তৃষ্ণায় মারার ব্যবস্থা করেছিল। আমি এর শোধ তুলবো। ওদের দেশের রাজকুমারীর ওপর নজর রাখবো। একা পেলেই বন্দি করে এই জাহাজে নিয়ে আসবো। তারপর উত্তর কার্সিকায় যে ক্রীতদাস কেনাবেচার বড় হাট বসে সেখানে রাজকুমারীকে বিক্রি করে দেব। এত দাম পাবো যে বাকি জীবন আমার রাজার হালে। কেটে যাবে। কথাগুলো বলে আল জাহিরি হাঁপাতে লাগল। হাঁপতে হাঁপাতে বলল– শিগগিরি আমায় খেতে দে। খিদের জ্বালায় মরে গেলাম।

সৈন্যদের মধ্যে একজন চলে গেল রসুইঘরে। তাড়াতাড়িতে কিছু খাবার রান্না করতে লাগল।

আল জাহিরি চলল নিজের কেবিনঘরের দিকে। পেছন চারজন সৈন্যও চলল। আল জাহিরি কেবিনঘরে ঢুকেই বিছানায় শুয়ে পড়ল। সৈন্যরা দাঁড়িয়ে রইল।

আল জাহিরি বলল কালকে সকালেই তোরা তীরে যাবি। আমার সৈন্যরা অনেক মরেছে। তবে কিছু বেঁচেও তো আছে। তাদের খুঁজে বের করবি। এভাবেই সৈন্য সংখ্যা বাড়াতে হবে। একটু থেমে জাহিরি বলল–একজন সৈন্য সবসময় কয়েদঘরের আড়াল থেকে লক্ষ্য রাখবি ওদের রাজকুমারী নিশ্চয়ই জাহাজ থেকে নেমে একা একটু বেরিয়ে বেড়াতে পারে। সুযোগ বুঝে রাজকুমারীকে বন্দি করতে হবে। কী? পারবি তো? চারজনেই বলল–হ্যাঁ পারবো। একজন সৈন্য বলল–রাজকুমারী ঐ ভিনদেশিদের চোখের আড়ালে গেলেই আমরা রাজকুমারীকে ধরবো। আল জাহিরি বলল–তোরা এই জাহাজে এলি কী করে? সাঁতরে?

না—-জেলেদের নোকোয় চড়ে এসেছি। একজন সৈন্য বলল।

এবার ঐ নৌকো করেই তীরে যা। যা যা বললাম তাই করবি। আল জাহিরি বলল।

সৈন্য চারজন চলে গেল।

তখনই রাঁধুনি সৈন্যটি কাঠের থালা বাটিতে গোল রুটি আর মাংসের ঝোল নিয়ে ঢুকল। বিছানায় রাখল। আল জাহিরি পাগলের মতো খাবারের ওপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাপুস হুপুস করে খেতে লাগল।

সৈন্য চারজন জাহাজ থেকে দড়ির মই নামিয়ে দিল। মই বেয়ে বেয়ে ওরা নৌকোয় ৭ উঠল। দাঁড় হাতে নিয়ে নৌকো চালাল তীরভূমির দিকে।

তখন ভোর হয়েছে। সকালের নরম রোদ সমুদ্রের জলের ওপর ছড়িয়েছে। কয়েদঘরের পেছনে জঙ্গলে পাখির ডাকাডাকি শুরু হয়েছে। নৌকো তীরে এসে লাগল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ থেকে নজরদার পেড্রো অস্পষ্ট নৌকোটা দেখল। কিন্তু জেলেদের নৌকো বলে ও নৌকোটাকে কোনো গুরুত্ব দিল না।

আল জাহিরির জাহাজটা সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে যেখানে সমুদ্রের তীরভূমি বাঁক নিয়েছে সেখানটায় এলো। এই বাঁকের জন্যেই ফ্রান্সিসদের জাহাজ থেকে নজরদার পেড্রো জাহাজটা দেখতে পাচ্ছিল না।

আল জাহিরির চার সৈন্য তীরে নামল। চলল জেলে পাড়ার দিকে। জেলেপাড়া থেকে তখন জেলেরা বেরিয়ে আসছে। নৌকো নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাবে। ওরা জেলেদের জিজ্ঞেস করতে লাগল–আমাদের কয়েকজন সৈনিক বন্ধু কি তোমাদের কারো বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। জেলেরা মাথা নেড়ে বলল–না। একজন জেলে বলে উঠল–দু’জন সৈন্য আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তবে সে দু’জন তোমাদের বন্ধু কি না জানি না। একজন সৈন্য বলল–আমাদের তোমার বাড়িতে নিয়ে চলো। ঐ। দু’জন সৈন্যকে দেখলেই বুঝতে পারবো আমাদের বন্ধু কিনা। জেলেটি বলল–বেশ– এসো। আমি দেরি করতে পারবো না। আমাকে এখুনি নৌকো নিয়ে মাছ ধরতে যেতে হবে।

–না-না। আমরা দেখলেই বুঝতে পারবো। একজন সৈন্য বলল।

জেলের পেছনে পেছনে সৈন্য চারজন চলল। জেলেটি ওদের নিজের কাঠপাথরের বাড়িতে নিয়ে এলো। গলা চড়িয়ে বৌকে বলল–যে দু’জন সৈন্য আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বাইরে আসতে বলো। দু’জন সৈন্য তখন ঘরের ভেজানো দরজার আড়াল থেকে বাইরে কারা এসেছে দেখল। ওরা নিশ্চিন্ত হল। ওদেরই বন্ধু। দু’জনে বাইরে বেরিয়ে এলো। ওরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল। একজন সৈন্য বলল–এখানে দেরি করা চলবে না। অন্য বন্ধুদের খুঁজতে হবে। চলো সব।

সৈন্যরা দল বেঁধে চলল। ওরা জাহাজঘাটার দিকে গেল না। কয়েদঘরের পেছনের জঙ্গলটায় ঢুকল। বড়ো বড়ো গাছের গুঁড়ি আর লতাপাতার মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে চলল ওরা। গাছের ডালপালার মধ্যে দিয়ে কোথাও ভাঙা ভাঙা রোদ পড়েছে। ওরা আস্তে আস্তে যেতে যেতে বন্ধুদের নাম ধরে ডাকতে লাগল। হঠাৎ জঙ্গলের মধ্যে থেকে তিজন বন্ধু সাড়া দিল। তারপর ওদের দিকে এগিয়ে এলো। ওরা এসে বলল আরো দু’জন কেরিনিয়া নগরে কোথায় আশ্রয় নিয়েছে। এবার সবাই মিলে চলল। কেরিনিয়া নগরে। নগরের পথে খুব একটা ভিড় নেই। ওরা ঐ রাস্তা দিয়ে ঘুরতে লাগল। খুঁজতে লাগল দুই বন্ধুকে।

খুঁজতে খুঁজতে বেশ বেলা হল। খিদেও পেয়েছে। ওরা একটা সরাইখানায় ঢুকল খাবার খেতে। তখনই ওরা দেখল বন্ধু দু’জনও খাচ্ছে। দুই বন্ধুকে পেয়ে ওরা খুশিই হল।

খেয়েদেয়ে সবাই হাঁটতে হাঁটতে জেলেপাড়ায় এলো। শুধু একজন সৈন্য কয়েদঘরের আড়ালে দাঁড়াল। মারিয়ার ওপর নজর রাখার জন্যে।

জেলেপাড়ার ঘাটে নৌকো পেল না ওরা। সবকটা নৌকো চালিয়ে জেলেরা মাছ ধরতে চলে গেছে। অগত্যা ওরা নৌকো ফিরে আসার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।

বিকেল নাগাদ জেলেরা নৌকো নিয়ে ফিরল। সৈন্যরা দুটো জেলে নৌকো জোগাড় করল। নৌকোয় চড়ে চলল আল জাহিরির জাহাজের দিকে।

সেদিন বিকেল থেকেই মারিয়া বুঝতে পারল জ্বর আসছে। শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যথা শুরু হল। মারিয়া চুপ করে বিছানায় শুয়ে রইল।

সন্ধের সময় হ্যারি মারিয়ার কাছে এলো খোঁজখবর করতে। মারিয়াকে শুয়ে থাকতে দেখে বলল–আপনার কি শরীর খারাপ?

–না-না–একটু বিশ্রাম করছি। মারিয়া বলল।হ্যারি বলল–বেশি শুয়ে থাকবেন না। এসময় তো আপনি ডেক-এ যান। এখন যান। একটু ঘুরে আসুন।

–আজকে ভালো লাগছে না। মারিয়া বলল। এবার হ্যারি চিন্তিতস্বরে বলল– ফ্রান্সিসরা ফিরল না। যীশুর মূর্তি উদ্ধার করতে পেরেছে কি না–এখন ওরা কোথায় আছে-কী করছে কোনো খবরই পাচ্ছি না।

–এতে ভাববার কী আছে। মূর্তি খুঁজে পেলেই চলে আসবে। মারিয়া বলল।

–তা ঠিক। তবু দুশ্চিন্তা হচ্ছে। হ্যারি বলল। একটু থেমে বলল–আপনি বিশ্রাম করুন আমি যাচ্ছি। হ্যারি চলে গেল।

রাতের খাবার খেল না মারিয়া। মাথা যেন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা। জ্বর বেড়েই চলেছে। মারিয়া বুঝল–অসুখের কথা আর গোপন করা চলবে না। জ্বর বাড়তে বাড়তে ও হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাবে। ভেনকে খবর দিতে হয়। মারিয়া ঠিক করল ও নিজেই ভেনকে ডেকে আনবে। আর কাউকে জানতে দেবে না। যদি ভাইকিং বন্ধুরা জানতে পারে যে মারিয়া অসুস্থ তাহলে ওরা খুবই চিন্তায় পড়ে ঘাবে। আবার ফ্রান্সিসও এখানে নেই। ওদের দুশ্চিন্তা আরো বাড়বে।

রাত বাড়ল। মারিয়া বুঝল আর দেরি করা উচিত হবে না। মারিয়া আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠল। যে মোটা কাপড়টা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে ছিল সেটা গায়ে দিয়ে চলল। মাথার যন্ত্রণায় ভালো করে তাকাতে পারছে না। কানের দু’পাশ ঝা ঝা করছে। দরজার কাছে যেতেই মাথা ঘুরে উঠল। দরজা চেপে ধরে টাল সামলাল।

একটা ঝুলন্ত কাঁচে-ঢাকা আলো জ্বলছে বাইরে। ঐ সামান্য আলোতেই দেখে দেখে ভেন-এর কেবিনঘরের দরজার সামনে মারিয়া এলো। দরজা খোলাই ছিল। মারিয়া কেবিনঘরে ঢুকে,ঢুকল–ভেন-ভেন। ভেন-এর ঘুম ভেঙে গেল।ও উঠে বসল। জিজ্ঞেস করল-কে? রাজকুমারী?

-হ্যাঁ। একবার এসো তো। একটু জ্বরমতো হয়েছে। মারিয়া বলল।

–সে কি! এই সেদিন অসুখ থেকে উঠলেন। ভেন বলল।

ঐ কেবিনঘরে বিস্কোও থাকে। বিস্কোর ঘুম ভেঙে গেল। বলল-রাজকুমারীর কী হয়েছে?

–একটু জ্বর হয়েছে–ওষুধ পড়লেই সেরে যাবে। মারিয়া বলল। বিস্কো বিছানা থেকে নেমে এলো। বলল–চলুন আপনাকে আমি নিয়ে যাচ্ছি–ভেনকে বলল ভেন–তুমি ওষুধ নিয়ে এসো।বিস্কো মারিয়াকেসঙ্গে নিয়ে চলল মারিয়ার কেবিনঘরের দিকে। এতক্ষণ মারিয়া শরীরের ব্যথা বেদনা মাথার অসহ্য যন্ত্রণা প্রবল জ্বর অনেক কষ্টে সহ্য করেছিল। আর পারল না। নিজের কেবিনঘরের দরজার কাছে এসে মাথা ঘুরে মেঝেয় পড়ে গেল। বিস্কো তো অবাক। সামান্য জ্বরে মারিয়া এতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ও মারিয়ার পিঠে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে মারিয়াকে উঠে বসাল। তারপর মারিয়াকে পাঁজাকোলা করে তুলল। এইবার বিস্কো বুঝল–রাজকুমারীর শরীর প্রচণ্ড জ্বরে যেন পুড়ে যাচ্ছে। বিস্কো আস্তে আস্তে মারিয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিল।

মারিয়ার গলা থেকে ঘোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগল।বিস্কো মারিয়ার মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

ভেন ঢুকল। হাতের ওষুধের বোয়ামটা বিছানায় রাখল। মারিয়ার কপালে গলায় হাত রেখে জ্বরের তাপ দেখল। তারপর চোখ দেখল। হাতের নাড়ির গতি দেখল। তারপর মেঝেয় গিয়ে বসল। বোয়ামটা নিল। বোয়াম থেকে সবুজ রঙের আঠালো একটা ওষুধ বের করল। হাত দিয়ে চারটে বড়ি করল। বিস্কোকে বলল-জল এনে ওষুধের একটা বড়ি রাজকুমারীকে খাইয়ে দাও। বিস্কো কাঠের গ্লাসে জল এনে মারিয়াকে মৃদুস্বরে বলল রাজকুমারী এই ওষুধটা খেয়ে নিন। এটা খেলে কষ্ট কমবে। মারিয়া তখন প্রায় অজ্ঞানের মতো। বিস্কো বুঝল সেটা। তবুওষুধটা খাওয়াতে হবেই। বিস্কো মারিয়ার পিঠে হাত রেখে মাথাটা উঁচু করল। জলের গ্লাস থেকে মুখে জল ঢালল। মারিয়া জল খেল। বিস্কো এবার একটা বড়ি খাইয়ে দিল। তারপর মারিয়াকে শুইয়ে দিল।

বিস্কো ভেনকে বলল-ভেন তুমি চলে যেও না। ভেন বলল–আমাকে এখানে সারারাতই জেগে থাকতে হবে।

–আমি হ্যারিকে ডেকে আনছি। বিস্কো বলল। তারপর দ্রুত পায়ে কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

একটু পরেই হ্যারি এলো। সঙ্গে শাঙ্কো। হ্যারি এগিয়ে গিয়ে মারিয়ার কপালে হাত রাখল। গলায় হাত রাখল। বলল–ভেনজুর খুব বেশি–তাই না?

ভেন বলল– হা। ওষুধ দিয়েছি। জ্বর কমবে।

ভেন বিছানায় বসল। মাঝে মাঝে মারিয়ার কপালে হাত দিয়ে দেখতে লাগল। হ্যারিরা মেঝেয় বসে রইল। হ্যারি ভাবছিল এই বিপদের সময় ফ্রান্সিস নেই। ফ্রান্সিস থাকলে মনে অনেক জোর পাওয়া যেত।

ততক্ষণে ভাইকিংরা খবর পেয়েছে রাজকুমারী ভীষণ অসুস্থ। ওরা কেবিনঘরের বাইরে ভিড় করল।

শেষ রাতের দিকে মারিয়াকে পরীক্ষা করে ভেন বলল–হ্যারি-জ্বর অনেকটা কমেছে। হ্যারি মারিয়ার কপালে হাত রাখল। হ্যাঁজুর অনেক কম।

ভোর হল। ভেন আর হ্যারিরা তখনও বসে আছে। রাতে কেউ আর ঘুমোয় নি।

হ্যারি ভেনকে বলল–তোমার কি মনে হয় এই ওষুধেই রাজকুমারী সুস্থ হবেন?

–ঠিক বলতে পারছি না। কয়েকদিন যাক–তখন বলতে পারবো। ভেন বলল।

বিকেল হতেই মারিয়ার আবার জ্বর এলো। জ্বর বাড়তে লাগল। জ্বর এত বাড়ল যে মারিয়া প্রায় অজ্ঞানের মতো হয়ে গেল। হ্যারি ভেনকে ডেকে নিয়ে এলো। ভেন মারিয়ার কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল। ভেন-এর মুখ চিন্তাকুল হল।

ভেন মেঝেয় বসল। যে ঝোলাটা এনেছিল সেটা থেকে একটা শুকনো শেকড় বের করল। তারপর বের করল দুটো পাথর। বিস্কোকে জল আনতে বলল। বিস্কো কাঠের গ্লাশে জল ভরে দিল। ভেন শেকড়টা কিছুক্ষণ জলে ভিজিয়ে রাখল। তারপর শেকড়টা একটা পাথরের ওপর রাখল। অন্য পাথরটা দিয়ে শেকড়টা ঘষতে লাগল। হলুদ রঙের রস বেরোতে লাগল। সেই রসটা কাঠের গ্লাশের জলের সঙ্গে মেশাল। হ্যারিকে বলল–হলুদ জলটুকু রাজকুমারীকে খাইয়ে দাও।

হ্যারি সবধানে মারিয়ার মাথাটা দু’হাতে তুলে ধরল। আস্তে আস্তে মারিয়াকে ওঠাতে ওঠাতে বলল–রাজকুমারী–কষ্ট করে ওষুধটা খেয়ে নিন। মারিয়া দু’একবার দম নিয়ে ওষুধটা খেল। হ্যারি সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিল। এবার জ্বর কমে কিনা তার। জন্য প্রতীক্ষা করা।

সন্ধে হল। রাত বাড়তে লাগল। ভেন মাঝে মাঝেই মারিয়ার গলায় কপালে হাত দিয়ে জ্বর বাড়ছে না কমছে তা দেখতে লাগল।

একসময় ভেন হ্যারিকে বলল–আমি এখানে আছি। তোমরা গিয়ে খেয়ে এসো। হ্যারিরা খেতে গেল। কিন্তু কেউই বেশি খেতে পারল না।

ওরা কেবিনঘরে ফিরে এলো।

হ্যারিরা মেঝেয় বসে রইল। কারো চোখেই ঘুম নেই।

শেষ রাতের দিকে মারিয়ার শরীর আরো খারাপ হল। জ্বর এত বাড়ল যে মারিয়া অজ্ঞান হয়ে গেল।

ভেন মারিয়ার চোখ দেখল। কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল। পা ও হাত চেপে দেখল। মৃদুগলায় ডাকল–হ্যারি। হ্যারির একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। ডাক কানে যেতেই ও দ্রুত ভেন-এর কাছে এলো। ভেন বলল–হ্যারি আমার জ্ঞান বুদ্ধিমতো চিকিৎসা আমি করেছি। আমার আর কিছু করার নেই। এখন কেরনিয়া নগরে ভালো বৈদ্যের খোঁজ কর। তাকে দেখাও। এছাড়া আর কিছু করার নেই।

ভোরবেলা। মারিয়ার জ্বর একটু কমল। কষ্টও একটু কমল।

হ্যারি বিস্কোকে ডেকে বলল–চলো–ভালো বৈদ্যের খোঁজে কেরিনিয়ায় নগরে আমাদের যেতে হবে।

–কিন্তু বৈদ্যের খোঁজ পাব কী করে? বিস্কো বলল।

-দেখি। যে ভদ্রলোকের বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম তাকেই জিজ্ঞেস করবো। চলো। হ্যারি বলল।

ওরা দু’জন জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। হ্যারি দেখল–এখানে-ওখানে ভাইকিং বন্ধুরা দল বেঁধে বসে আছে। গতরাতে কেউই বোধহয় ঘুমোয় নি।

দু-একজন ভাইকিং বন্ধু হ্যারির কাছে এগিয়ে এলো। বলল–হ্যারি রাজকুমারী এখন কেমন আছেন?

–ভালো না–আমরা ভালো বৈদ্যের সন্ধানে যাচ্ছি।

হ্যারি আর রিস্কো জাহাজ থেকে নেমে এলো। মারিয়ার শিয়রের কাছে ভেন বসে রইল। মেঝেয় বসে রইল শাঙ্কো। ভাইকিং বন্ধুরা মাঝে মাঝে এসে খবর নিয়ে যাচ্ছে। মারিয়া তখন জ্বরে অজ্ঞান।

হ্যারি আর রিস্কো অ্যান্তিকের সামনে এলো। পেতলের কড়াটা দরজায় ঠুকে শব্দ করল। দরজা খুলে গেল।

অ্যান্তিকো দাঁড়িয়ে। বললেন কী ব্যাপার? হ্যারি বলল–আমাদের দেশের রাজকুমারী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার চিকিৎসার জন্যে একজন ভালো বৈদ্যের খোঁজ দিতে পারেন?

–আমি পেশায় বৈদ্য। তোমরা রাজকুমারীকে নিয়ে এসো। আমিই চিকিৎসা করবো। কোনো ভয় নেই। অ্যান্তিকো বললেন।

হ্যারি আর বিস্কো দু’জনেই নিশ্চিন্ত হল। খুশিও হল।

ওরা অ্যান্তিকোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। হ্যারি বলল–বিস্কো একটা কৃকদের শস্যটানা গাড়ি জোগাড় করতে হবে।

দু’জনে বাজার এলোকায় এলো।খুঁজে খুঁজে একাট গাড়ি পেল। ভাড়া করল গাড়িটা। গাড়িট চেপে দু’জন জাহাজঘাটায় এলো। জাহাজে উঠল। কেবিনঘরে ঢুকে দেখল ভেন বসে আছে। ভেন বলল–বৈদ্যের খোঁজ পেলে?

–হ্যাঁ–হ্যারি বলল রাজকুমারীকে নিয়ে যাওয়া যাবে?

–হা–তবে সাবধানে গাড়ি করে নিয়ে যাবে। ভেন বলল।

–আমরা গাড়ির ব্যবস্থা করেছি। হ্যারি বলল।

তখন বেলা হয়েছে। হ্যারি মারিয়ার মুখের কাছে মুখ এনে বলল–রাজকুমারী ভালো চিকিৎসার জন্যে আপনাকে নিয়ে যাবো। গাড়িতে করে। একটু কষ্ট হবে। সহ্য করবেন।

বিস্কো বিছানার কাছে গেল। মারিয়ার পিঠে বাঁ হাতটা রাখল। ডান হাত পায়ের নীচে দিয়ে আস্তে আস্তে মারিয়াকে তুলে পাঁজাকোলা করল। আস্তে আস্তে কেবিনঘরের বাইরে নিয়ে এলো। সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। পেছনে হ্যারি।

মারিয়ার দুই চোখ বোজা। এবার মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগল। মারিয়ার এই কষ্ট দেখে বিস্কোও সহ্য করতে পারছিল না। কিন্তু মারিয়াকে সম্পূর্ণ সুস্থ করার জন্যে মারিয়াকে তো এই কষ্ট মেনে নিতেই হবে।

বিস্কো মারিয়াকে নিয়ে জাহাজ থেকে জাহাজঘাটায় পেতে রাখা কাঠের তক্তায় উঠল। একজনের যাওয়ার জন্যে তক্তা। বিস্কো সাবধানে মারিয়াকে নিয়ে তক্তায় উঠল। তারপর পা টিপ টিপ করে তক্তার ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। তক্তা শেষ। বিস্কো জাহাজঘাটায় নামল। বিস্কোর আগেই হ্যারি এটা বড়ো মোটা কাপড় আর বালিশমতো নিয়ে এসেছিল। সেসব ঐ গাড়িতে আগেই পেতে রেখেছিল হ্যারি।

বিস্কোকে এত সন্তর্পণে মারিয়াকে আনতে হল যে বিস্কোর দু’হাত ধরে এলো। হাত দুটোয় ব্যথা করতে লাগল।

বিস্কো মারিয়াকে আস্তে আস্তে গাড়ির মধ্যে পাতা কাপড়ে শুইয়ে দিল। বালিশমতো পুঁটুলিটা মাথার নীচে দিল। মারিয়ার তখনও চোখ বোজা। গোঙানিটা কমেছে।

হ্যারি আর বিস্কো গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ির চালককে গাড়ি চালাতে বলল। ঘর ঘর শব্দ তুলে এক ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলতে শুরু করল। গাড়ির ঝাঁকুনিতে মারিয়ার কষ্ট বাড়ল। মুখ থেকে জোরে গোঙানির শব্দ ভেসে আসতে লাগল। হ্যারি চালককে বলল–এমনভাবে গাড়ি চালাও যাতে ঝাঁকুনি কম হয়। চালক এবার আস্তে আস্তে চালাতে লাগল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি অ্যান্তিকোর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। হ্যারি গাড়ি থেকে নেমে দরজার পেতলের কড়াটা দরজায় ঠুকল। দরজা খুলে দাঁড়ালেন অ্যান্তিকোর স্ত্রী। বললেন–তোমরা রোগীকে এনেছো?

–হ্যাঁ। হ্যারি বলল।

–বাইরের ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দাও। ভদ্রমহিলা বললেন।

এবার হ্যারি আর বিস্কো দু’জনেই মারিয়াকে তুলে আস্তে আস্তে বাইরের ঘরে নিয়ে এলো। ঘরে লম্বা তক্তপোষমতো পাতা। ওপরে বিছানা পাতা। দু’জনে মারিয়াকে আস্তে আস্তে শুইয়ে দিয়ে হ্যারি বাইরে এলো। চালকের দাম মেটাল। মোটা কাপড় আর বালিশ গাড়ি থেকে নিয়ে এলো। মারিয়ার মাথার নীচে বালিশটা দিয়ে দিল হ্যারি। মোট কাপড়টা একপাশে রাখল।

দু’জনে ঐ বিছানায় বসল। একটু পরেই অ্যান্তিকো এলেন। খুব মনোযোগ দিয়ে মারিয়াকে নানাভাবে পরীক্ষা করলেন। তারপর পাশে দাঁড়ানো স্ত্রীকে মৃদুস্বরে কিছু বললেন। স্ত্রী বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। একটু পরে একটি চিনেমাটির ছোটো বোয়াম নিয়ে এলেন। অ্যান্তিকো বোয়ামের মুখ খুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে কালো রঙের আঠামতো ওষুধ বের করলেন। মারিয়ার মুখ একটু খুলে ওষুধটা মুখে ঢুকিয়ে দিলেন। মারিয়ার চোখ মুখ কুঁচকে গেল। বোঝা গেল ওষুধটা তেতো। তবে মারিয়া ওষুধটা ফেলে দিল না। আস্তে আস্তে খেয়ে নিল।

অ্যান্তিকো বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। হ্যারিদের দিকে তাকিয়ে বললেন– আজকের রাতটা কাটলেই উনি আস্তে আস্তে সুস্থ হবেন। এখন আপনারা চলে যেতে পারেন।হ্যারি বলল–আমরা দুপুরে একবার খেতে যাবো। তারপর দুপুরের পর থেকে সারারাত এখানেই থাকবো।

–বেশ। তাহলে ভালোই হয়। রোগীকে রাতে দু’বার দুটো ওষুধ খাওয়াতে হবে। আপনারা থাকলে ওষুধ দুটো আপনারাই খাওয়াতে পারবেন। অ্যান্তিকো বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। বোয়ামটা নিয়ে অ্যান্তিকোর স্ত্রী ভেতরে চলে গেলেন।

হ্যারি আর বিস্কো বিছানার একপাশে বসে রইল।

দুশ্চিন্তায় গত রাতটা ওরা দু’চোখের পাতা এক করেনি। হ্যারির শরীর বরাবরই দুর্বল। রাত জাগার ক্লান্তিতে হ্যারির মাথা টিটি করতে লাগল। নিজেকে বেশ দুর্বল মনে হতে লাগল। বিস্কো বুঝল সেটা। ও বলল হ্যারি তুমি একপাশে শুয়ে ঘুমিয়ে নাও। আম তো জেগে আছি। হ্যারি মাথা নেড়ে বলল–না। বিস্কো ধমকের সুরে বলল–পাগলামি করো না। তুমি যে শরীরের দিক থেকে খুব দুর্বল সেটা আমরা জানি। এবার তোমার কিছু হলে আমাদের বিপদই বাড়বে। কথা শোনো-ঘুমিয়ে নাও। দুপুরে খেতে যাবার সময় তোমাকে ডেকে নেব। হ্যারি বুঝল–না ঘুমলে শরীরের দুর্বলতা যাবে না। হ্যারি বিছানার একপাশে শুয়ে পড়ল। চোখ দুটো জ্বালা করছে। মাথাটাও টিটি করছে। দেখা যাক–শরীরের এই অবস্থায় ঘুম আসে কি না।

একটু পরেই হারি ঘুমিয়ে পড়ল।

দুপুরে বিস্কো হ্যারির ঘুম ভাঙাল। হ্যারি উঠে বসল। চোখ কচলাল। তারপর মারিয়ার কপালে হাত রাখল গলায় হাত রাখল। জ্বর অনেক কমে গেছে। খুশির চোখে বিস্কোর দিকে তাকিয়ে বলল–বিস্কো জ্বর অনেক কমে গেছে। তখনই দেখল–মারিয়ার চোখ খোলা। ওর দিকে তাকিয়ে মারিয়া দুর্বল স্বরে বলল–আমার জন্যে তোমাদের ভোগান্তির শেষ নেই।

হ্যারি বলে উঠল। ওসব নিয়ে ভাববেন না। আগে সম্পূর্ণ সুস্থ হোন। তারপরে এসব কথা ভাববেন। বিস্কো বলল-রাজকুমারী–আমরা এখন খেতে যাচ্ছি। কতটা খেতে পারবো জানি না। তবু আমাদের তো সুস্থ থাকতে হবে।

দু’জনে এবার চলল জাহাজঘাটার দিকে। জাহাজে উঠতেই বন্ধুরা ছুটে এল। হ্যারি একটু গলা চড়িয়ে বলল –ভাইসব রাজকুমারীর জ্বর কমেছে। এখন অনেকটা ভালো আছেন। সবাই আনন্দের ধ্বনি তুলল– ও হো হো।

খাওয়া-দাওয়া সেরে হ্যারি আর বিস্কো আবার অ্যান্তিকোর বাড়িতে ফিরে এলো। রাজকুমারী বেশ দুর্বলস্বরে আস্তে আস্তে বলল–অ্যান্তিকোর স্ত্রী মায়ের মত আমাকে দুপুরে ফলের রস খাইয়েছেন। ওষুধ খাইয়েছেন। হ্যারি বিস্কো শুনে আশ্বস্ত হল।

ওদিকে কয়েদঘরের পেছনে থেকে আল জাহিরির যে সৈন্যটা মারিয়ার দিকে নজর রাখছিল সে সবই দেখল। অসুস্থ মারিয়াকে গাড়িতে তোলা হল। গাড়িতে দু’জন ভাইকিং চলল। গাড়িটা যেহেতু খুব জোরে যাচ্ছিল না সৈন্যটি একটু জোরে হেঁটে গাড়ির প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চলল।

অ্যান্তিকোর বাড়িতে ঢোকা এসবুই সৈন্যটি দেখল। তারপর পিছু ফিরে ও চলল জেলেপাড়ার দিকে। সমুদ্রতীরে এসে একটা জেলেনৌকোয় চড়ে ও জাহাজের দিকে চলল।

জাহাজে উঠে চলল আল জাহিরির কেবিনঘরের দিকে। আল জাহিরিকে ও সব বলল। আল জাহিরি তখন সৈন্যটিকে বলল–তুই আবার যা। শুধু লক্ষ্য রাখবি কখন ভাইকিং দু’জন নিজেদের জাহাজে খেতে যায়। ঐ সময় রাজকুমারী একা থাকবে। সেই সুযোগটাই তখন কাজে লাগাতে হবে। তুই সেই সময়ে আসবি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

সৈন্যটি এবার চলল নৌকোয় চড়ে তীরের দিকে।

অ্যান্তিকোর বাড়ির সামনে গিয়ে সৈন্যটি দাঁড়াল। নজর রাখল কখন ভাইকিং দু’জন বেরোয়।

হ্যারি গভীর রাতে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। বিস্কো একটানা জেগে রইল। অ্যান্তিকোর নির্দেশমতো মারিয়াকে ওষুধ খাওয়াল।

পরদিন সকালে মারিয়া অনেকটা সুস্থ বোধ করল। অ্যান্তিকোর স্ত্রী মারিয়াকে ওষুধ ও খাইয়ে গেলেন।

কিছু পরে অ্যান্তিকো এলেন। মারিয়াকে পরীক্ষা করে দেখে হ্যারিকে বললেন– আপনাদের রাজকুমারীর বিপদ কেটে গেছে। উনি এবার আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ সুস্থ হবেন। হ্যারি আর বিস্কো মারিয়ার দিকে তাকিয়ে খুশির হাসি হাসল।

মারিয়া আস্তে আস্তে বিছানায় উঠে বসল। হ্যারিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগল। তখনও দুর্বলতা কাটেনি।

একটু বেলায় হ্যারি আর বিস্কো খেতে চলল। ওরা রাস্তা ধরে কিছুটা যেতেই নজরদার সৈন্যটি বাজার এলাকা থেকে একটা শস্যটানা গাড়ি ভাড়া করে দ্রুত গিয়ে জেলেপাড়ায় উঠল। আল জাহিরিকে বলল–পাহারাদার দু’জন ভাইকিংই ওদের জাহাজে খেতে চলে গেছে।

আল জাহিরি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ল। বলল–চারজন আমার সঙ্গে চল। যে নৌকোয় পাহারাদার এসেছিল সেই নৌকোয় চড়ে সবাই তীরে এলো। যে গাড়িটায় পাহারাদর এসেছিল সেই গাড়িতে চড়ে ওরা দ্রুত চলল অ্যান্তিকোর বাড়ির দিকে।

অ্যান্তিকের বাড়িতে পৌঁছে দরজায় পেতলের কড়া দিয়ে ঠক্ঠক্‌শব্দ করল। দরজা খুলে দাঁড়ালেন অ্যান্তিকোর স্ত্রী। আল জাহিরি তাকে সরিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকল। চলল বাইরের ঘরের দিকে। অ্যান্তিকোর স্ত্রী বললেন–আপনারা কারা? কী চান? আল জাহিরি হেসে বলল–আমরা আমাদের রাজকুমারীকে নিয়ে যেতে এসেছি।

–কিন্তু রাজকুমারী এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হননি। অ্যান্তিকোর স্ত্রী বললেন।

–জাহাজে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব। আল জাহিরি বলল।

সৈন্য নিয়ে আল জাহিরি বাইরের ঘরে ঢুকল। দেখল মারিয়া বিছানায় শুয়ে আছে। আল জাহিরিকে দেখে মারিয়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিছানায় উঠে বসল। বলল কী চাই তোমাদের? আল জাহিরি হেসে বলল–কোনো কথা নয়। আমরা আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি। যদি যেতে না চান চিৎকার চাচামেচি করেন তাহলে বুকে তলোয়ার বিধিয়ে দেব। একটু থেমে বলল–উঠে বসুন।

–আমি যাবো না। বেশ চড়া গলায় মারিয়া বলল। আল জাহিরি বলল চাঁচাতে মানা করেছি। দু’জন সৈন্যকে বলল–যা ধরে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তোল।

দু’জন সৈন্য মারিয়ার দু’হাত ধরে দাঁড় করাল। আল জাহিরি তলোয়ার বের করল। তরোয়ালের ডগা মারিয়ার পিঠে ঠেকিয়ে বলল–আর একটা কথা বলেছেন কি তলোয়ার বিঁধিয়ে দেব। মারিয়া বুঝল এখন ওকে বাঁচাবার কেউ নেই। অ্যান্তিকো বা তার স্ত্রী কিছুই করতে পারবেন না। মারিয়া চুপ করে রইল। আল জাহিরি পিঠে তলোয়ারের চাপ বাড়াল। বলল–চলুন।

মারিয়া দুর্বল পায়ে হেঁটে চলল বাইরের দরজার দিকে। অ্যান্তিকো আর তার স্ত্রী দু’জন ছুটে এলেন। অ্যান্তিকো বললেন–আপনারা কারা? আল জাহিরি বলল– আমরা ভাইকিং। আমাদের রাজকুমারীকে জাহাজে নিয়ে যাচ্ছি। মারিয়া বলে উঠল– ও মিথ্যে কথা। অ্যান্তিকো বললেন–এই তো রাজকুমারী বলছেন আপনি মিথ্যে কথা বলছেন। আল জাহিরি রাগতস্বরে বলে উঠল–সত্য মিথ্যে জানি না। আমরা রাজকুমারীকে নিয়ে যাবোই। বাধা দিতে এলে আপনারা দুজনেই খতম হয়ে যাবেন।

–কিন্তু রাজকুমারীর অসুখ এখনও সম্পূর্ণ সারেনি। অ্যান্তিকো বললেন।

–আমাদের জাহাজের বৈদ্য চিকিৎসা করবে। তাতেই ভালো হয়ে যাবে। আল জাহিরি বলল।

মারিয়াকে নিয়ে আল জাহিরি বাড়ির বাইরে এলো। মারিয়াকে গাড়িতে তুলে নিয়ে বসিয়ে দিল। সঙ্গের সৈন্যরাও গাড়িতে উঠল। আল জাহিরি গাড়িতে উঠে হুকুম দিল– জেলেপাড়ায় চল–জ্লদি।

গাড়ি চলল। দুপুর নাগাদ গাড়ি সমুদ্রতীরে জেলেপাড়ায় পৌঁছল। আল জাহিরি নিশ্চিন্ত হল যে পাহারাদার ভাইকিং দু’জন ফেরার আগেই রাজকুমারীকে নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে।

মারিয়াকে ধরে ধরে নৌকোয় তোলা হল। সবাই নৌকোয় উঠলে নৌকো বেয়ে চলল একজন সৈন্য। মারিয়া একবার ভাবল যে চাঁচামেচি করে লোকজন জড়ো করে। কিন্তু তাতে লাভ কিছু হবে না। কেউ ওকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে না। বরং তাতে আল জাহিরি ক্রুদ্ধ হবে। এরা যা নৃশংস। হয়তো তাকে মেরেও ফেলতে পারে। মারিয়া চুপ করে নৌকোয় বসে রইল।

নৌকো গিয়ে জাহাজে লাগল। হালের দিকে ঝোলা দড়ি ধরে দড়ির মই বেয়ে সবাই জাহাজে উঠে গেল। একজন সৈন্য নৌকোয় রইল। জাহাজ থেকে দড়ির জাল ফেলা হল। সেই সৈন্যটি মারিয়াকে দড়ির জালে ধরে ধরে বসিয়ে দিল। জাহাজ থেকে দড়ির জাল টেনে তোলা হল। মারিয়া ডেক-এ নামতেই আল জাহিরি বলল–রাজকুমারীকে আমার পাশের কেবিনঘরে নিয়ে যা আর বৈদ্যকে বল রাজকুমারীর চিকিৎসা করতে।

মারিয়াকে দু’জন সৈন্য ধরে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামাল। নির্দিষ্ট কেবিনঘরে ঢুকিয়ে দিল। দুর্বল শরীর নিয়ে মারিয়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। এলোমেলো বিছানাটায় শুয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ পরে গোঁফ দাড়িওয়ালা জাহাজের বৈদ্য এলো। মারিয়াকে পরীক্ষা করল। হেসে বলল কিছু চিন্তা নেই ভালো হয়ে যাবেন। কথাটা গ্রীক ভাষায় বলল। মারিয়া কিছুই বুঝল না। বৈদ্যকে হাসতে দেখে বুঝল ও অনেকটা সুস্থ হয়েছে।

যখন মারিয়াকে গাড়ি থেকে নৌকোয় তোলা হচ্ছিল তখন জেলেরা ভিড় করে দেখছিল। ওরা বুঝতে পারছিল না এই একেবারে অন্যরকম পোশাক পরা মেয়েটি কোন্ দেশের? মারিয়াকে নিয়ে নৌকোটা চলল জাহাজের দিকে। তখনও জেলেরা জটলা করে নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে কথা বলছিল। তারপর ভিড় ভেঙে গেল। যে যার কাজে চলে গেল।

ওদিকে হ্যারি আর বিস্কো জাহাজে খাওয়াদাওয়া সেরে অ্যান্তিকের বাড়িতে এলো। দরজার কড়াঠুকে শব্দ করতে অ্যান্তিকোর স্ত্রী দরজা খুরলেন।হ্যারিদের দেখে বললেন– কী ব্যাপার বলো তো। একটা লোক কয়েকজন সৈন্য নিয়ে এসেছিল। বলল যে ওরা ভাইকিং। ওরা জোর করে রাজকুমারীকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে গেছে।

হ্যারি আর বিস্কো পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। হ্যারি বলল, ডাহা মিথ্যে কথা বলেছে ওরা।

ততক্ষণে অ্যান্তিকোও এলো। স্ত্রী যা বলেছেন উনিও তাই বললেন। হ্যারি তখনও ভাবছে এভাবে রাজকুমারীকে নিয়ে গেল কারা?

হ্যারি বলল–আচ্ছা দলনেতা লোকটা দেখতে কেমন? অ্যান্তিকো বললেন লোকটার গায়ের রং ফর্সা। মুখের চিবুকে অল্প দাড়ি। গোঁফ আছে। মাথায় কালো বিড়ের মতো পাগড়ি। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল–এ আল জাহিরি।

–কিন্তু আল জাহিরিকে তো শাঙ্কো ওর জাহাজের কয়েদখানায় বন্দি করে রেখে এসেছিল। বিস্কো বলল।

–ওর পাহারাদার কিছু সৈন্য আমাদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় পালিয়েছিল। তারাই একত্র হয়ে আল জাহিরিকে তাদের জাহাজের কয়েদঘর থেকে মুক্ত করেছে। হ্যারি বলল।

–তাহলে তো আবার ওরা ওদের জাহাজে গিয়ে জড়ো হয়েছে। বিস্কো বলল।

–ঠিক তাই হ্যারি বলল–এবার ঐ জাহাজটা খুঁজে বের করতে হবে।

–একটা কথা মনে হচ্ছে–বিস্কো বলল–রাজকুমারীকে যখন বন্দি করে নিয়ে গেছে তখন জাহাজটা ঘাটের কাছেই কোথাও আছে। বিস্কো বলল।

–আল জাহিরি রাজকুমারীকে বন্দি করেছে এইজন্যে যে ক্রীতদাস বিক্রির হাটে রাজকুমারীকে অনেক স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করতে পারবে। হ্যারি বলল।

–তাহলে তো এক্ষুণি সেই জাহাজটা কোথায় আছে তা খুঁজে বের করতে হয়। বিস্কো বলল।

-হা এক্ষুণি। নইলে আল জাহিরি রাজকুমারীকে নিয়ে. জাহাজ চালিয়ে চলে যাবে। হ্যারি বলল।

ওরা দু’জনে অ্যান্তিকো আর তার স্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে জাহাজঘাটার দিকে চলল।

দু’জনে জাহাজে উঠতেই সব ভাইকিং বন্ধুরা এগিয়ে এলো। ওরা জানতে চায় রাজকুমারী কেমন আছেন। এবার হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–রাজকুমারী অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু আল জাহিরি রাজকুমারীকে বন্দি করে তার জাহাজে নিয়ে গেছে। আমাদের সবাইকে এবার সমুদ্রতীরে ছড়িয়ে পড়তে হবে। আল জাহিরির ক্যারাভেল জাহাজটা খুঁজে বের করতে হবে। তারপরে প্রয়োজনে লড়াই করে রাজকুমারীকে মুক্ত করতে হবে। হ্যারির কথা শেষ হতেই সবাই সমুদ্রতীরে নেমে এলো। ছড়িয়ে পড়ে আল জাহিরির ক্যারাভেল জাহাজটা খুঁজতে লাগল।

হ্যারি গলা চড়িয়ে পেস্রোকে ডাকল। পেড্রো মাস্তুল বেয়ে দড়ি ধরে নেমে এলো। হ্যারি বলল–পেড্রো-আল জাহিরির ক্যারাভেলটা দেখেছো। পেড্রো মাথা নেড়ে বলল–না। তবে বাঁ দিকে দূরে সমুদ্রতীরটা বাঁক নিয়েছে। ঐ বাঁকে যদি কোনো জাহাজ থাকে তবে আমি দেখতে পাবো না। হ্যারি বলল–আমরা সমুদ্রতীর ধরে অনেকটা যাবো। বিশেষ করে দূরে যে সমুদ্রের বাঁকটা আছে সেখানে যাবো। কারণ এখান থেকে বাঁকের জন্যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হ্যারি আর বিস্কো সমুদ্রতীর ধরে চলল। যেতে যেতে জেলেপাড়া পার হয়ে এলো। এখান থেকেই শুরু হয়েছে বাঁকটা। বাঁকটা ছাড়তেই একটু দূরে দেখল আল জাহিরির ক্যারাভেল জাহাজটা নোঙর করা।

দু’জনেই দাঁড়িয়ে পড়ল। দু তিনটে নারকোল গাছের আড়ালে দাঁড়াল। আড়াল থেকে ওরা দেখল আল জাহিরির চার-পাঁচজন সৈন্য জাহাজের ডেক-এ শুয়ে বসে। আছে। হ্যারি বলল-রাজকুমারীকে নিশ্চয়ই এই জাহাজে বন্দি করে রাখা হয়েছে।

–আমারও তাই মনে হয়। বিস্কো বলল। তারপর বলল–এখন কী করবে? হ্যারি বলল–

–আল জাহিরির জাহাজে কত সৈন্য রয়েছে আমরা সেটা সঠিক জানি না। শুধু তুমি আর আমি তিন-চারজন সৈন্যের সঙ্গে লড়তে পারি। তার বেশি হলে পিরবো না। আমরা দুজন যদি এখন আক্রমণ করি তাহলে আল জাহিরি জেনে যাবে যে আমরা ওর জাহাজ খুঁজে পেয়েছি। তখন আল জাহিরি সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমারীকে নিয়ে জাহাজ চালিয়ে পালিয়ে যাবে। কাজেই আজ রাতে সবাই মিলে আক্রমণ করতে হবে। হ্যারি বলল।

–যদি রাজকুমারীকে এই জাহাজে না পাওয়া যায়? বিস্কো বলল। হ্যারি বলল তখন আল জাহিরিকে বন্দি করে রাজকুমারীকে কোথায় বন্দি করে রেখেছে সেটা জানতে হবে। এখন জাহাজে ফিরে চলো। জাহাজে ফিরে হ্যারি সবাইকে ডেকে বলল–ভাইসব, আল জাহিরির জাহাজ আমরা খুঁজে পেয়েছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আল জাহিরির ক্যারাভেলেই রাজকুমরীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আর দেরি করা চলবে না। আজ রাতেই আমরা আল জাহিরির জাহাজ আক্রণ করবো। সবাই রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি খেয়ে তৈরি থাকবে।

রাতের খাওয়াটা সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল।

তিন-চারজন মিলে নোঙর খুলে দিল। হ্যারির নির্দেশে জাহাজ চলল ঐ বাঁকের দিকে। চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল। বেশ কিছুদূর পর্যন্ত সমুদ্র, সমুদ্রতীর দেখা যাচ্ছে।

বাঁকের কাছে এসে হ্যারিরা আল জাহিরির ক্যারাভেল দেখতে পেল না। হ্যারি আর বিস্কো যেখানে জাহাজটা দেখে গিয়েছিল সেখানে জাহাজটা নেই।

তখনই মাস্তুলের ওপর থেকে নজরদার পেড্রো চিৎকার করে বলল–হ্যারি আল জাহিরি ক্যারাভেল জাহাজ চালিয়ে পালাচ্ছে। এখনও বেশিদূর যেতে পারি নি। পিছু ধাওয়া করো। হ্যারিরা মনোযোগ দিয়ে দেখল সত্যিই ক্যারাভেলটা দ্রুত চলেছে। একটু আগে কুয়াশার জন্যে ক্যারাভেলটা ওরা দেখতে পায় নি। কুয়াশা কেটে যেতেই ক্যারাভেলটা দেখল। এবার গতি চাই। ক্যারাভেলটা ধরতে হবে। হ্যারি চিৎকার করে বলল–ভাইসব-পশ্চিম দিকে দেখো ক্যারাভেলটা পালাচ্ছে। যে করেই হোক ঐ ক্যারাভেলটাকে ধরতে হবে। একদল পাল খাটাতে উঠে যাও। সবগুলো পাল খুলে দাও। আর একদল চলে যাও দাঁড় টানতে। জাহাজের গতি বাড়াও। ঐ ক্যারাভেলটা ধরতেই হবে।

একদল দড়ি ধরে উঠলো পালগুলোর কাছে। সব পাল খুলে দিল। জোরে হাওয়া বইছে তখন। পালগুলো সব ফুলে উঠল। আর একদল দাঁড়ঘরে গেল। জলে দাঁড় পড়তে লাগল–ছপছপ। জাহাজের গতি অনেক বেড়ে গেল।কয়েকজন ভাইকিং এদিক ওদিকপাল ঘুরিয়ে পালে যেতে বেশি বাতাস লাগে তার ব্যবস্থা করল।দাঁড়ঘরে দাঁড়িরাও প্রাণপণে দাঁড় বাইতে লাগল। ক্যারাভেলের সঙ্গে হ্যারিদের জাহাজের দূরত্ব কমে আসতে লাগল। সমুদ্রের বুকে কোথাও কোথাও কুয়াশা জমেছে। মাঝে মাঝেই কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ক্যারাভেলটা। হ্যারি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ক্যারাভেল জাহাজটার দিকে। চাঁদের আলোয় দেখে বুঝল ক্যারাভেল থেকে ওদের জাহাজটা বেশি গতিতে চলছে।

ফ্রান্সিসদের জাহাজটা যেন জলের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে।

ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ক্যারাভেলের কাছে চলে এলো হ্যারিদের জাহাজটা। হ্যারি গলা চড়িয়ে জাহাজচালক ফ্লেজারকে বলল–ক্যারাভেল জাহাজের গায়ে গায়ে লাগাও।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হ্যারিদের জাহাজটা ক্যারাভেল জাহাজের গায়ে লাগল। হ্যারি দেখল আল জাহিরির ক্যারাভেলের ডেক-এ পনেরোজন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যারি গলা চড়িয়ে চড়িয়ে বলল–তোমাদের চেয়ে আমরা সংখ্যায় বেশি। একবার লড়াইয়ে নামলে তোমরা কেউ বাঁচবে না। আল জাহিরির জন্যে তোমরা কেন মরতে যাবে। তোমরা অস্ত্র ত্যাগ করো। আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করবো না। সৈন্যরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু অস্ত্র ত্যাগ করল না।

তখনই ক্যারাভেলের ডেক-এ উঠে এলো আল জাহিরি। সৈন্যদের ধমক দিয়ে বলল–এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন–ওদের আক্রমণ কর।

কিন্তু সৈন্যরা কেউ নড়ল না। হ্যারি বলে উঠল–আল জাহিরি তোমাদের জাহাজে আমাদের রাজকুমারীকে বন্দি করে রেখেছে।

–তোমাদের রাজকুমারীকে আমি বন্দি করে রাখিনি। আল জাহিরি গলা চড়িয়ে বলল।

–তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না। রাজকুমারীকে তোমাদের জাহাজেই বন্দি করে রেখেছে।

–বললাম তো রাজকুমারীকে আমরা বন্দি করে রাখিনি। আল জাহিরি বলল। হ্যারি বলল–আবার বলছি মিথ্যে কথা বলো না। রাজকুমারী তোমাদের জাহাজেই বন্দি আছেন। রাজকুমারীকে আমাদের জাহাজে আসতে দাও। রাজকুমারী মুক্ত হলে আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করবো না। আমরা আমাদের জাহাজ চালিয়ে চলে যাবো।

রাজকুমারী কেরিনিয়ার কয়েদখানায় রয়েছে। আল জাহিরি বলল।

–মিথ্যে কথা। তোমাকে আর তোমার সৈন্যদের বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়েছিলাম। সেই সুযোগ কাজে লাগালে না। এবার মরার জন্যে তৈরি হও। হ্যারি বলল। তারপর গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–সবাই অস্ত্র হাতে নাও। এবার লড়াই। ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল–ওহোহো। তারপর সবাই সিঁড়ি দিয়ে নেমে অস্ত্রঘর থেকে অস্ত্র নিয়ে এলো। প্রথমবারে আট-দশজন লাফিয়ে ক্যারাভেলের ডেক-এ উঠে এলো। শুরু হল আল জাহিরির সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই। আবার একদল ভাইকিং লাফিয়ে ক্যারাভেল এ উঠল। তারাও লড়াই শুরু করল। আবার একদল গিয়ে লাফিয়ে ক্যারাভেল-এ উঠল। আল জাহিরির সৈন্যরা হার স্বীকার করতে লাগল।

হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, কাউকে হত্যা করো না। আহত করো।

অল্পক্ষণের মধ্যেই আল জাহিরির সৈন্যরা আহত হয়ে ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ল। গোঙাতে লাগল।

তখনই আল জাহিরি নীচের কেবিনঘর থেকে মারিয়াকে নিয়ে ডেক-এর ওপর উঠে এলো। হাতের তলোয়ারটা মারিয়ার পিঠে ঠেকিয়ে বলল–তোমরা এক্ষুণি আমার জাহাজ ছেড়ে চলে যাও। যদি না যাও রাজকুমারীর পিঠে আমি তলোয়ার ঢুকিয়ে দেব।

হ্যারি বুঝল–এই নরপশুটা এখন রাজকুমারীকে যেকোনো মুহূর্তে মেরে ফেলতে পারে। হ্যারি চেঁচিয়ে বলল–ভাইসব–সবাই আমাদের জাহাজে চলে এসো। আর লড়াই নয়।

ভাইকিংরা রাজকুমারীর বিপদ ভালো করেই বুঝল। সবাই লাফিয়ে নিজেদের জাহাজে ফিরে এলো।

হ্যারি ইশারায় শাঙ্কোকে কাছে ডাকল। মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বলল–আল জাহিরি– তিরের নিশানা।শাঙ্কো কোনো কথা না বলে আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। তারপর দ্রুত পায়ে অস্ত্রঘরে এলো। তীর ধনুক নিল। নিজের কেবিনে এসে বিছানায় পাতা মোটা কাপড়টাকে গায়ে জড়াল। তির ধনুক ঢাকা পড়ে গেল। শাঙ্কো সিঁড়ি বেয়ে উঠে ডেক-এ এলো। তারপর আস্তে আস্তে মাস্তুলের পেছনে চলে এলো। তারপর গা থেকে কাপড় খুলে ফেলল। ডেক-এ হাঁটু গেড়ে বসে মাস্তুলের আড়াল থেকে ধনুক তুলল। তির পেরিয়ে মাস্তুলের পাশে সরে এলো। আল জাহিরিকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আল জাহিরি তখন তলোয়ারের ডগাটা মারিয়ার গলায় চেপে ধরে বলে উঠল–একটু সময় দাও। আমরা এক্ষুণি জাহাজ চালিয়ে চলে যাবো। আল জাহিরি নিশ্চিন্ত হল।

শাঙ্কো তির নিশানা করল। তারপর তির ছুঁড়ল। নিখুঁত নিশানা। তির গিয়ে লাগল আল জাহিরির ডান বাহুতে। ঐ হাতেই আল জাহিরি তলোয়ার ধরেছিল। আল জাহিরি আর্ত চিৎকার করে উঠল। তারপরই হাতের তলোয়ার ফেলে বাহু বাঁ হাতে চেপে ধরল। তারপর টেনে তিরটা খুলল। গল্প করে রক্ত বেরিয়ে এলো। আল জাহিরি ডেক-এ বসে পড়ল।

হ্যারি চিৎকার করে বলল–রাজকুমারী চলে আসুন। মারিয়া দ্রুত ছুটে এলো হ্যারিদের জাহাজের দিকে। বিস্কো আর কয়েকজন ভাইকিং ছুটে গিয়ে মারিয়াকে ধরে ওদের জাহাজে নিয়ে এলো। মারিয়া আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ডেক-এর ওপর আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল। একে দুর্বল শরীর তারসঙ্গে মৃত্যুভী—িমারিয়া এসব সহ্য করতে পারল না।

হ্যারি ডাকল–ভেন-রাজকুমারীকে দেখো। বৈদ্য ভেন এগিয়ে এলো। বসে রাজকুমারীর নাড়ি দেখল। চোখ টেনে দেখল। বলল–ভয়ের কিছুই নেই। শুধু ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কেবিনঘরে নিয়ে চলো।

মারিয়াকে কেবিনঘরে ধরাধরি করে আনা হল। ভেনও নিজের কেবিনঘর থেকে ওষুধ নিয়ে এলো।

হ্যারিদের জাহাজ ফিরে চলল কেরিনিয়া বন্দরের দিকে

ওদিকে ফ্রান্সিসকে আর পারিসি গাড়িতে চড়ে এক সন্ধ্যায় নিকোশিয়ায় পৌঁছল। রাজধানী নিকোশিয়া বেশ বড়ো শহর। গরিব লোকজন আছে, তেমনি ঝলমলে পোশাক পরা অভিজাত ধনীর মানুষরাও আছে। নতুন শহর। সাজানোগুছানো সুন্দর শহর। কত লোক। কিন্তু ফ্রান্সিসের সেসব দিকে চোখ নেই। পারিসি বলল, রাজধানী শহর আপনি তো আগে দেখেননি। চলুন ঘুরে ঘুরে দেখবেন। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। বলল, বন্ধুরা, মারিয়া–সবাই ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি হবে। আমার এখন এক চিন্তা কী করে সবাইকে মুক্ত করবো। অন্য কোনোদিকে তাকাবার অবকাশ নেই আমার। এবার পারিসি ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝলো। কোনো কথা বলল না।

সেই রাতটা ওরা একটা সরাইখানায় কাটালো। সকালে ফ্রান্সিস বলল, গী দ্য লুসিগনানের বিচারসভা কখন বসে?

একটু বেলায়। পারিসি বলল।

তাহলে সকালের খাবার খেয়ে চলো বিচারসভায় যাবো। ফ্রান্সিস বলল।

একটু বেলায় রাজার বিচারসভায় দু’জনে পৌঁছল। তখন বিচারের কাজ চলছিল। কাঠের জমকালো সিংহাসনের সবুজ কাপড়ে মোড়া আসনে গী দ্য লুসিগনান বসে ছিল। একটা বিচারের কী রায় দিল লুসিগনান। বাচ্চাকোলে এক মা হাসতে হাসতে চলে গেল। পেছনে পেছনে গেল তার স্বামীই বোধহয়।

সেনাপতি খুবই ধূর্ত। পারিসি তার নজরে পড়ল। সেনাপতি আসন থেকে উঠে লুসিগনানকে কী বলল। তারপর আঙুল তুলে পারিসিকে দেখিয়ে দ্বাররক্ষীদের হুকুম দিল পারিসিকে বন্দি করার জন্য। দ্বাররক্ষীরা ছুটে এসে পারিসিকে ধরতে গেল। ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে ওদের থামতে বলল। দ্বাররক্ষীরা দাঁড়িয়ে পড়ল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।

ফ্রান্সিস পারিসিকে বলল,তুমি লুসিগনানকে বুঝিয়ে বলো যে আমি ভাইকিং, বিদেশি, বিশেষ একটা প্রয়োজনে রাজার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমাকে যা বলার রাজা লুসিগনান যেন স্পেনীয় ভাষায় বলে। আমি গ্রীক ভাষা জানি না। এবার পারিসি ফ্রান্সিসের শেখানো কথাগুলো পর পর বলে গেল। সব শুনে গী দ্য লুসিগনান ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। স্পেনীয় ভাষায় বলল, তুমি এই সাইপ্রাস দ্বীপে এসছো কেন?

সে অনেক কথা। শুধু এইটুকু বলি আল জাহিরি আমাদের জাহাজ দখল করে এখানে বন্দি করে নিয়ে এসেছে। আমাদের সকলকে সে ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করবে বলে এনেছে। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যাঁ, কেরিনিয়া বন্দরের কাছে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাট বসে। যারা কেনাবেচা করে সেই ব্যবসায়ীরা আমার অনুমতির জন্য আমাদের প্রাপ্য স্বর্ণমুদ্রা দেয়। তুমি একা কী করে এলে? লুসিগনান বলল।

পালিয়ে এসেছি। আমার একটা আর্জি আপনাকে জানাতে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।

কী আর্জি? লুসিগনান বলল।

পারিসির কাছে দেবতুল্য একজন মানুষ নিওফিতসের কথা শুনেছি। নিওফিতস খ্রীস্টান সমাজ পরিচালনার রীতি পদ্ধতি যে গ্রন্থটিতে লিখে রেখেছিলেন, সেই গ্রন্থ পারিসি আপনাদের দিয়েছে।

হ্যাঁ দিয়েছে। কিন্তু সেই গ্রন্থে যীশুর একটি মূর্তি আঁকা আছে। লুসিগনান বলল।

ফ্রান্সিস বলল, আপনাদের বিশ্বাস নিওফিতস ঐ রকম একটি কাঠের মূর্তি নিজের হাতে কাঠ কুঁদে কুঁদে তৈরি করেছিলেন। পারিসি সেটা কোনোদিন দেখেনি।

লুসিগনান বলে উঠল–পারিসি মিথ্যেবাদী।

না, না, পারিসি জানে না কোথায় আছে সেই কাঠের মূর্তি। ফ্রান্সিস বলল, ভেবে দেখুন মান্যবর রাজা–পারিসি নিওফিতসের গ্রন্থটা নিয়েও পালাতে পারতো কিন্তু সে তা করেনি। আপনাকে দিয়েছে। মূর্তি পেলে নিশ্চয়ই দিয়ে দিতো। মূর্তি চুরি করে কী লাভ ওর? তাছাড়া মূর্তি বিক্রি করতে গেলেও ধরা পড়তো।

রাজা গী দ্য লুসিগনান মাথা নেড়ে বলল, নানা–ওকে আমি আবার জেরস পাহাড়ে পাঠাবো।

বেশ। এবার আমার আর্জিটা জানাই মান্যবর রাজা–পারিসির সঙ্গে আমিও জেরস পাহাড়ের চূড়ার কাছে সেই গুহায় মূর্তি খুঁজতে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।

লুসিগনান বেশ আগ্রহের সঙ্গে বলল–তুমি পারবে ঐ কাঠের মূর্তি উদ্ধার করতে?

সেটা আমি গুহা পাহাড় এসব দেখে-টেখে বলতে পারবো। এজন্যে আপনার অনুমতি চাইছি। ফ্রান্সিস বলল।

বেশ তো তুমিও যাও। লুসিগনান বলল।

মাননীয় রাজা, আমার বিনীত অনুরোধ যদি আমি সেই মূর্তিটা উদ্ধার করতে পারি তাহলে আল জাহিরির হাতে বন্দি আমাদের দেশের রাজকন্যা ও বন্ধুদের মুক্তি দিতে হবে। পারিসিকেও কোনো শাস্তি দেবেন না।

ঠিক আছে–আগে তো মূর্তিটা উদ্ধার করো। রাজা বলল।

সেক্ষেত্রে আমার শর্তটা কিন্তু মানতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

ঠিক আছে–দেরি না করে কাজে লেগে পড়ো। রাজা লুসিগনান বলল।

আমরা আজকেই জেরস পাহাড়ের দিকে যাত্রা শুরু করবো। ফ্রান্সিস বলল।

কিন্তু তোমাদের পাহারা দেবার জন্যে চারজন রক্ষী যাবে। যদি তোমরা কাঠের মূর্তি নিয়ে পালিয়ে যাও। রাজা বলল।

মান্যবর রাজা, আমার স্ত্রী ও বন্ধুরা এখনও আল জাহিরির হাতে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে–ওদের ফেলে রেখে আমি পালাতে পারি? ফ্রান্সিস বলল।

হু। রাজা গী দ্য লুসিগনান পাশের আসনে বসা মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে পরামর্শ করল। তারপর বলল, ঠিক আছে অনুমতি দিলাম। কিন্তু মূর্তি উদ্ধার করে মূর্তি নিয়ে পালালে তোমাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

সেরকম কিছু ঘটলে যেকোনো শাস্তি মেনে নেব। ফ্রান্সিস বলল।

এবার ফ্রান্সিস বলল, মাননীয় রাজা, সাধু নিওফিতসের গ্রন্থটা একবার দেখতে পারি?

গ্রন্থটি আমার গ্রন্থাগারে সযত্নে রক্ষিত আছে। যদি দেখতে চাও তবে গ্রন্থাগারে যেতে হবে। লুসিগনান বলল।

আপনি অনুমতি দিলে এখুনি যেতে পারি। ফ্রান্সিস বলল।

বেশ যাও। কথাটা বলে লুসিগনান একজন দ্বাররক্ষীকে ইঙ্গিতে ডাল। মৃদুস্বরে রক্ষীকে কী নির্দেশ দিল। রক্ষীটী ফ্রান্সিসদের আসতে বলে রাজসভাঘরের বাইরের দিকে চলল। ফ্রান্সিস আর পারিসিও চলল।

রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন একটা পাথরের ঘরের সামনে এসে রক্ষীটা দাঁড়াল। কাঠের বিরাট দরজা বন্ধ। রক্ষীটা পেতলের কড়া কাঠের দরজায় ঠুকে শব্দ করল। দরজার একটা পাল্লা খুলে গেল। এক টাকমাথা বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। পরনে দামি কাপড়ের আলখাল্লা মতো। বোঝা গেল ইনিই রাজার গ্রন্থাগারটির দেখাশুনো করেন। রক্ষীর সঙ্গে কথা শেষ করে তিনি হেসে ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসদের ভেতরে আসতে বললেন।

ফ্রান্সিসরা দরজা পেরিয়ে ঢুকল। এই দিনের বেলায়ও ঘরটা বেশ অন্ধকার। কয়েকটা মোমবাতি জ্বলছে। এবার গ্রন্থাগারিক গ্রীক ভাষায় কিছু বললেন। ফ্রান্সিস বুঝল না। তখন উনি পরিষ্কার স্পেনীয় ভাষায় বললেন, আপনি কি শুধু সাধু নিওফিতসের গ্রন্থটিই দেখবেন?

হা–ফ্রান্সিস বলল, গ্রীক ভাষায় লেখা। আমি কিছুই বুঝবো না। শুধু গ্রন্থটির প্রথম পাতায় যীশুখ্রিস্টের যে ছবিটা আছে সেটা দেখবো।

শুধুছবিটা দেখবেন? এই কথা বলে গ্রন্থাগারিক একটা মোমবাতি হাতে নিয়ে চললেন।

হ্যাঁ, রাজা গী দ্য লুসিগনানের বিশ্বাস সাধু নিওফিস ঐ ছবির মতো একটি কাঠের মূর্তিও তৈরি করেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।

অসম্ভব নয়–ছবিটা এত জীবন্ত যে অবাক হতে হয়, গ্রন্থাগারিক বললেন। কাঠের পাটাতনে রাখা আশেপাশের বড়ো বড়ো গ্রন্থগুলি পরে কোণার দিকের এক কাঠের পাটাতনের সামনে এসে গ্রন্থাগারিক বললেন, সাধু নিওফিতসের লেখা এই গ্রন্থটি।

ফ্রান্সিস মোটা চামড়া-বাঁধাই হাতে লেখা মোটা গ্রন্থটির মলাট ওল্টালো। দেখল– যীশুর ছবি আঁকা। সত্যিই ছবিটি জীবন্ত মনে হচ্ছে। পাতা উল্টে দেখল গ্রীক ভাষায় লেখা। ফ্রান্সিস কিছুই বুঝল না। গ্রন্থাগারিক জিজ্ঞেস করল, গ্রন্থটি কী বিষয় নিয়ে লেখা?

খ্রীস্টিয় ধর্মমণ্ডলী কীভাবে পরিচালিত হবে তার নির্দেশ। সাধু নিওফিতস বেশ কয়েক বছর ধরে গুহার নির্জনতায় আশ্রয় নিয়ে এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন গ্রন্থাগারিক বললেন।

কিন্তু লেখা শেষ করে যেতে পারেননি। পারিসি বলল।

হ্যাঁ, শেষ নেই। হয়তো আরো কিছু তার লেখার ইচ্ছে ছিল গ্রন্থাগারিক বললেন।

ফ্রান্সিস গ্রন্থাগারিককে জিজ্ঞেস করল, আপনার কি মনে হয় সাধু নিওফিতস ঠিক এই ছবির মতো একটি কাঠের যীশুমূর্তির বানিয়েছিলেন?

তা বলতে পারবো না। তবে রাজা গী দ্য লুসিগনান বিশ্বাস করেন সাধু নিওফিতস। একটা এই ছবির মতো মূর্তি গড়েছিলেন। গ্রান্থাগারিক বললেন।

কোন ঘটনার জন্যে তার এই বিশ্বাস হয়েছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল। গ্রন্থাগারিক তখন গ্রন্থের ছবিটা দেখিয়ে বললেন, যীশুর স্নানের জল পবিত্র–এই কথা দিয়েই পুস্তকটি শুরু হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো পুস্তকের আঁকা যীশুকে তো স্নান করানো সম্ভব নয়। তাই সাধু নিওফিতস এমনি একটা মূর্তি গড়েছিলেন, হয়তো সেই মূর্তিটিকেই স্নান করাতেন। সে জলটুকু নিশ্চয়ই পবিত্র জল। তাই আমরা বিশ্বাস করি এমনি একটি মূর্তি নিশ্চয়ই সাধু নিওফিতস তৈরি করেছিলেন এবং সেটা সেই গুহাতে বা তার আশেপাশে কোথাও আছে।

ফ্রান্সিস পারিসিকে দেখিয়ে বলল, এর নাম পারিসি। সাধু নিওফিতসের শেষ সময় পারিসি বেশ কিছুকাল তার সেবা-শুশ্রূষা করেছিল। কিন্তু পারিসিক্যে তিনি কোনোদিন কোনো মূর্তির কথা বলেননি।

গ্রন্থাগারিক বললেন, এই পরিসির কথা আমরা জানি। পারিসিই এই গ্রন্থটি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিল।

ফ্রান্সিস বলল, তাই আমরা মূর্তিটা খুঁজে বের করতে জেরস পাহাড়ে যাচ্ছি।

খুব ভালো কথা। সাধু নিওফিতসের নিজের হাতে তৈরি মূর্তি তো আমাদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ। যীশুর কাছে প্রার্থনা করি আপনারা সফল হোন।

ফ্রান্সিস আর পারিসি গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে এলো।

.

এবার কাজে নামা। বাইরে এসো চাষী গাড়ি চালিয়ে ওদের নিয়ে এসেছিল সেই গাড়ি চড়ে বাজারে এসে এক সরাইখানায় খেয়ে নিল। এ-দোকান সে-দোকান ঘুরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনল। পশমী পোশাক বেশি কিনল। পারিসি বারবারই ঐ গুহার এলাকায় প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কথা বলছিল। খাবার-দাবারও কিনল সব গুছিয়ে দু’জনে দুই বোঁচকামতো বাঁধল। গাড়িতে রাখল। গাড়োয়ান চাষীটিকে ফ্রান্সিস পুরো একটা স্বর্ণমুদ্রা দিল। বলল, জেরস পাহাড়ের নিচে আমাদের পৌঁছে দাও। চাষী স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে খুব খুশি। ফ্রান্সিস আর পারিসি গাড়িতে উঠল। গাড়োয়ান চাষী গাড়ি চালাল জেরস পাহাড়ে উদ্দেশে।

জেরস পাহাড়ের নিচে যখন পৌঁছল তখন বিকেল। ফ্রান্সিস আর পারিসি মালপত্র নামিয়ে নিলে। গাড়ি ছেড়ে দিল।

দু’জনে বোঁচকা কাঁধে পাহাড়ে উঠতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য অস্ত গেল। ওরা একটা পাহাড়ি মানুষদের বস্তিতে পৌঁছল। বস্তির মানুষের ওদের দেখে খুশিই হলো। পারিসিকে এর আগে অনেকেই দেখেছো। জানে যে নিওফিতসের জীবনের শেষ সময় পরিসি সেই মহাপুরুষকে সেবা-শুশ্রূষা করেছে।

সেই রাতটা ওরা বস্তিতেই কাটালো।

পরদিন সকালে আবার বোঁচকা কাঁধে পাহাড়ে উঠতে লাগল। দুপুরে একটা চেস্টনাস্ট গাছের নিচে বসে দু’জনে বোঁচকা থেকে শুকনো খাবার বের করে খেয়ে নিল। তারপর আবার উঠতে লাগল।

গত দু’দিন একটু রাস্তামতে পেয়েছে। বিকেল নাগাদ দেখল রাস্তা বলে আর কিছু নেই। পাথরের চাঙ-এর ওপর পা রেখে রেখে ওঠা। শুরু হলো কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। দু’জনেই মাথাটাকা পশমের পোশাক পরে নিল।

সন্ধ্যে নাগাদ একটা ছোট্ট পাহাড়ি মানুষদের বস্তি পেল।

সেই বস্তিতেই খেয়েদেয়ে রাত কাটাল।

পরদিন সকাল থেকেই যাত্রা শুরু করল। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার বেগ বাড়লো। গা মাথা ভালো করে গরম কাপড়ে জড়িয়ে ওরা উঠতে লাগল।

দুপুর নাগাদ একটা গুহার সামনে এলো। পারিসি বলল, মহাপুরুষ নিওফিতস এই গুহাটায় প্রথমে ছিলেন। পরে আরো উঁচুতে এক গুহায় চলে যান।

ওরা গুহাটায় ঢুকল। ফ্রান্সিস গুহাটা দেখতে দেখতে বলল, আজকে বিশ্রাম নেব এখানে। রাতটা কাটিয়ে কাল আবার ওঠা শুরু করবো।

দু’জনে গুহাটার এবড়েঅখেবড়ো মেঝের কাপড় পেতে বসল। খাওয়া দাওয়া সারল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। অনেক চিন্তা মাথায়। যীশুর মূর্তি আদৌ নিওফিতস তৈরিকরেছিলেন কি না। করলে মূর্তিটা কোথায় রেখেছিলেন? আরো চিন্তা হাতে সময় খুব কম। আল জাহিরি ক্রীতদাস ব্যবসায়ী। ও তাড়াতাড়ি মারিয়াকে, বন্ধুদের বিক্রি করে দিতে চাইবে। তার আগেই মূর্তি উদ্ধার করতে হবে। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে উঠে কিছু খেয়ে নিয়ে আবার শুরু হলো পাহাড়ে ওঠা। এখানে গাছ-গাছালি নেই বললেই হয়। শুধু বিরাট বিরাট পাথরেরাই। সেসব কখনো উঠে কখনো নেমে একফালি জায়গা দিয়ে ওঠা। ঠাণ্ডার তীব্রতা বাড়তে লাগল। কখনো কুয়াশা মেঘের মতো চারদিক ঢেকে ফেলছে। এক হাত দূরে কিছু দেখা যায় না। পরক্ষণেই তীব্র হিমেল বাতাস ও কুয়াশা উড়িয়ে দিচ্ছে। রোদ দেখা যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত। তারপরেই কুয়াশা ঢেকে ফেলেছে চারদিক। কুয়াশা আর রোদের খেলা চলছে।

দুপুরে থামল একটা বিরাট পাথরের চাইয়ের নীচে। খাবার বের করে খেয়ে নিল।

আবার পাহাড়ে ওঠা। বিকেলের কিছু আগে একটা বেশ বড়ো সমতলভূমি দেখল। কয়েদঘর পাহাড়ি লোকের বাস এখানে। ঐ সমতলভূমিতে গম ভুট্টার চাষ করে।

সমতলটুকু পেরিয়ে আসতেই দেখল উঁচুতে একটা পাহাড়ি গুহা। এই গুহার মুখটা বড়ো। খাড়া চড়াইয়ের মাথায় সেই গুহা।

গুহাটা দেখিয়ে পারিসি বলল, এই গুহাটাতেই সাধু নিওফিতসের সঙ্গে আমি শেষ পর্যন্ত ছিলাম। ফ্রান্সিস গুহাটা দেখতে দেখতে বলল, কিন্তু গুহাটায় উঠলে কী করে?

সেই দড়ি-মইয়ের কথা বলেছিলাম। পারিসি বলল।

কিন্তু সেটা কি আছে এখনও? ফ্রান্সিস বলল।

দেখা যাক। পারিসি বলল।

এমন সময় এই বস্তি থেকে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলো। পারিসির কাছে এসে পারিসিকে দেখে হাসল। বোঝা গেল পারিসিকে চিনেছে। বৃদ্ধের মুখে বলিরেখা ফুটে উঠল। বৃদ্ধের সঙ্গে পারিসির কিছু কথা হলো। ফ্রান্সিস তার কিছুই বুঝল না। বৃদ্ধটি চলে গেল।

পারিসি ফ্রান্সিসকে নিয়ে খাড়া পাহাড়টার নীচে এলো। দেখল দুটো দড়ি ঝুলছে। দড়ির মধ্যেকার কাঠের সিঁড়িগুলো খসে গেছে। দু’টো টানা দড়িই ভরসা।

দু’টো দড়ি ধরেই ওঠা যাবে। ফ্রান্সিস বলল।

আজকে উঠবেন? পারিসি জিজ্ঞেস করল।

না, সন্ধে হয়ে গেছে। কালকে সকালে উঠবো। ফ্রান্সিস বলল।

রাত হলো। পাহাড়ি বস্তির সেই বৃদ্ধটি এলো। পারিসিকে হেসে কী বলল। পারিসি বলল, ফ্রান্সিস, আজ রাতে এরা অতিথি হতে বলছে।

ভালোই তো, ফ্রান্সিস বলল, তুমি বৃদ্ধকে বলো আমরা আনন্দের সঙ্গে অতিথি হবো। তবে শুধু খাবো, থাকবো না। পারিসি কথাগুলো বৃদ্ধকে বলল। বৃদ্ধ খুব খুশি।

ফ্রান্সিস আর পারিসি বোঁচকা রেখে খেতে গেল। এক বৃদ্ধা ওদের সমাদরে একফালি ঘরে বসাল। বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ছেলে-মেয়েরাও ফ্রান্সিসদের পেয়ে খুব খুশি। পাহাড়ি জীবনে বাইরের মানুষের সঙ্গে তো ওদের খুব কমই সাক্ষাৎ হয়। ঐ একফালি ঘরেই ওদের বসিয়ে খাওয়াল-বাড়িতে তৈরি গোল রুটি আর পাখির মাংস। ফ্রান্সিস তো পেট পুরে খেল। একদিন তো ভালো খাবার কপালে জোটেনি। পারিসিও পেট ভরে খেল।

বৃদ্ধটি বারবার ঐ একফালি ঘরেই ওদের থাকতে বলল। ফ্রান্সিস বুঝল এই ঠাণ্ডায় বৃদ্ধের পরিবারের লোকদের কষ্ট হবে। ওরা পাহাড়ি পরিবারের কাছে বিদায় নিয়ে চলে এলো। বড়ো পাথরের চাইটার ওপর পশুলোমের কম্বলমতো পেতে গরম পোশাক গায়ে দিয়েই ওরা শুয়ে পড়ল। শেষরাতের দিকে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। খোলা জায়গায় শীতার্ত হাওয়া যেন গায়ে কামড় বসাচ্ছে। ফ্রান্সিস আর ঘুমলো না। আকাশে। চাঁদের আলো উজ্জ্বল। তবে মাঝে মাঝে কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে উঁচু পাহাড়ের চুড়ো আর তিনদিকের শূন্যতায় কুয়াসার গায়ে চাঁদের আলো। সুন্দর দেখাচ্ছে। হঠাৎই ফ্রান্সিসের মনে পড়ে গেল মারিয়া আর বন্ধুদের কথা। কী কষ্টে ওদের দিন কাটছে। কুয়াশায় চাঁদের আলো খেলা, পাহাড়ি সৌন্দর্য সবই ফ্রান্সিসের কাছে ম্লান হয়ে গেল। ও চোখ বুজে ঝিমোতে লাগল।

সকাল হতেই ফ্রান্সিসরা কাজে নামল। বোঁচকা পিঠে নিয়ে ফ্রান্সিসই প্রথম দড়ি দুটোর কাছে এলো। ফ্রান্সিস দড়ি দুটো গায়ের জোরে টানল। যাক–দড়ি দুটো আলগা হয়নি। ওপরে কোনো পাথরের চাইয়ের সঙ্গে বাঁধা আছে বোধহয়।

প্রথমে ফ্রান্সিস একটা দড়ি ধরে দড়িটার দুদিকে পাহাড়ের গায়ে পা রেখে রেখে গুহার মুখের কাছে উঠে এলো। এবার পারিসি উঠতে লাগল। ফ্রান্সিস দড়ি টেনে টেনে পারিসিও গুহার মুখে উঠে এলো। দুজনেই হাঁপাচ্ছে তখন।

এবার দু’জনে গুহায় ঢুকল। বাইরের আলো থেকে এসে অন্ধকারই লাগল গুহার ভেতরটা। আস্তে আস্তে অন্ধকারটা চোখে সয়ে এলো। ফ্রান্সিস দেখল গুহাটা বেশ বড়ো। বাইরের তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়া গুহার ভেতরে অল্পই ঢুকছে। সেইজন্যেই গুহার ভেতরটায় একটু গরমভাব।

পারিসি গুহাটার বেশ ভেতরে এলো। দেখা গেল অনেকটা জায়গায় শুকনো পাতা বিছানা। জায়গাটা দেখিয়ে পরিসি বলল, এইখানে সাধু নিওফিস শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর সময়ও তিনি বিন্দুমাত্রও বিচলিত হননি। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। ধর্মতত্ত্বের কথা সেসব। আমার কি সেসব বোঝার মতো বিদ্যেবুদ্ধি আছে নাকি। তবু শুনতাম। বুঝতাম তিনি তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো বলে আনন্দ পাচ্ছেন। পারিসি থামল। তারপর গুহার কোণার দিকে পোড়া হাঁড়ি-কুড়ি দেখিয়ে বলল, সেদিন সন্ধের সময়ই সাধু নিওফিতস খেয়ে নিলেন। আমিই রান্নাবান্না করতাম। সব দিন নয়। পাহাড়ি বস্তির লোকেরা সেই দড়ির সিঁড়ির কাছে রান্নাকরা খাবার খেতে যেত। যেদিন ওসব খাবার পেতাম না সেদিন রান্না করতাম। একটু থেমে পারিসি বলতে লাগল, একটু রাতে সাধু নিওফিতস মৃদুস্বরে আমাকে ডাকলেন–পারিসি–পারিসি। আমার ঘুম ভেঙে গেল। শুনলাম উনি বলছেন–পারিসি, তুমি আমার জন্যে অনেক করেছো। এবার আমার যাবার সময় হয়েছে। দেখছে না স্বর্গের দেবদূতেরা এসেছে। আমি যাচ্ছি। আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। দেখি-গুহাটা এক অপার্থিব আলোয় ভরে গেছে। আমি সেই আলোর বর্ণনা করতে পারবো না। আমি দ্রুত এসে সাধু নিওফিতসের পায়ে হাত দিলাম। বরফের মতো ঠাণ্ডা গায়ে হাত দিলাম–ঠাণ্ডা। মুখের কাছে কান পাতলাম। শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ নেই। বুকে কান পাতলাম কোনো শব্দ নেই। আমি কেঁদে উঠলাম। সারারাত সাধু নিওফিতসের পা ধরে কাঁদলাম। একটু থেমে পারিসি বলল, সকাল হতে আমি গ্রন্থটা হাতে নিয়ে দড়ির মই বেয়ে নীচে নামলাম। একটু বেলায় পাফোসের খ্রীস্টিয় মঠের অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করলাম। গ্রন্থ দিলাম। সব বললাম। তাঁরাই সাধু নিওফিতসের শেষ কাজ করলেন। পারিসি থামল। তারপর কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে মেঝের পাতা-ছড়ানো জায়গাটায় চুম্বন করল। ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না।

এবার ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে গুহাটা দেখতে লাগল। গুহাটার একবারে পেছনে একটা বড়ো ফাটল মতো আছে। তারপরেই একটা ঝর্ণার জল নীচে নেমে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস বুঝল এই ঝর্ণার জলই নিওফিতস খেতেন। এই ঝর্ণার জলেই স্নান করতেন।

ফ্রান্সিস ফিরে এসো বোঁচকা খুলল। শুকনো পাতা-ছাওয়া জায়গাটায় একটা মোটা কম্বলমতো পাতল। তারপর শুয়ে পড়ল। পারিসিও বোঁচকা খুলে মোটা কাপড় পেতে বসল। ফ্রান্সিস বলল, পারিসি, এখানে মানে গুহাটার বাইরে সব জায়গাটাই তুমি দেখেছো?

হা। পারিসি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।

কী আছে বাইরে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

পাহাড়-টাহাড় যেমন হয়। এখানে ছোটো ছোটো কয়েকটা সীডার, চেস্টনাট গাছ আছে। পারিসি বলল।

তাহলে সাধু নিওফিতস কাঠ পেয়েছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যাঁ, শীতের সময় আগুন জ্বালাবার জন্যে জ্বালানি কাঠও এই গুহার কোণায় জড়ো করা থাকতো। পারিসি বলল।

হুঁ-খাওয়াদাওার পর এই গুহা আর চারপাশ ভালো করে দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

দুপুরবেলায় খোলা বোঁচকা থেকে আটা, আলু এসব বের করে পরিসি রান্না চাপিয়ে দিল।

খাওয়াদাওয়া সেরে ফ্রান্সিস গুহাটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল, জ্বলন্ত মশাল হাতে। গুহাটার কঠিন পাথুরে গা। দেখবার কিছুই নেই।

একসময় ফ্রান্সিস কাঠ রাখবার জায়গাটায় এলো। কাঠ, শুকনো ডালপালা সরিয়ে সরিয়ে দেখছে, তখনই হঠাৎ নজরে পড়ল একটা হাতুড়ি। ছোটো হাতুড়ি। ঐ জায়গায় ডালপাতা সরাতেই দেখল দুটো বাটালি। একটা বড়ো একটা ছোটো। ফ্রান্সিস উত্তেজনায় চেঁচিয়ে ডাকল, পারিসি। পারিসি ওর কাছে এলো। ফ্রান্সিস ততক্ষণে হাতুড়ি আর বাটালি দুটো তুলে নিয়েছে। পরিসি কাছে এলে বলল, এসব কী বুঝতে পারছো। পারিসি মাথা নেড়ে বলল, নাঃ। ফ্রান্সিস বলল–সাধু নিওফিতস এই হাতুড়ি, বাটালি দিয়েই কাঠ কুঁদে কুঁদে প্রভু যীশুর মূর্তি গড়েছিলেন। কাজেই আমার অনুমান ঠিক। এখানেই কোথাও আছে সেই কাঠের মূর্তি।

হাতুড়ি বাটালি রেখে ফ্রান্সিস গুহার চারদিকটা মশালের আলোয় ভালো করে দেখতে লাগল। আর কিছু পেল না। তবে নিশ্চিত হলো যে কাঠের মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল।

ফ্রান্সিস মশালটা গুহায় রেখে গুহার শেষ ছোটো মুখটা দিয়ে বাইরে এলো। দেখল সেই ঝর্ণাটা। ফ্রান্সিসের মনে পড়ল নিওফিতসের লেখা সেই গ্রন্থ শুরু হয়েছে যীশুর স্নানের জল পবিত্র–এই কথাটা দিয়ে। তার মানে জলের কথা বলা হয়েছে। কাজেই এই ঝর্ণার জলের গুরুত্ব বেড়ে গেল।

ফ্রান্সিস আর পারিসির একঘেয়ে সময় কাটতে লাগল। খাওয়া দাওয়া আর গুহার মধ্যে বাইরে কাঠের মূর্তির সন্ধান। একটা ব্যাপারে ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হল যে নিওফিতস তার হাতে তৈরি যীশুর মূর্তির কথা কাউকে বলে যেতে পারেন নি অথবা এও হতে পারে তিনি ইচ্ছে করে কাউকে বলেন নি। যে গুহায় ছিলেন সেখানে অন্য কেউ আসেনি। পরে এই গুহায় থাকাকালীন একমাত্র পরিসিই এসেছিল। বলার ইচ্ছে থাকলে পারিসিকে বলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি বলেন নি। কোনো সূত্রও রেখে যাননি। শুধুমাত্র এই গ্রন্থের প্রথম কথাটি-যীশুর স্নানের জল পবিত্র। এই জল কথাটি নিয়েই ফ্রান্সিস বেশি ভাবছে।

সেদিন ফ্রান্সিসকে পারিসি বলল–এই ঠাণ্ডায় এই গুহায় পড়ে থেকে কী হবে। চলুন নেমে যাই।

–না–ফ্রান্সিস বলল ইচ্ছে হলে তুমি নেমে যেতে পারো। আমি মূর্তি উদ্ধার করার জন্যে থাকবো। পারিসি বুঝল–ফ্রান্সিসকে সঙ্কল্পচ্যুত করা যাবে না। ও আর কিছু বলল না। ফ্রান্সিস সকাল দুপুর গুহার বাইরে মূর্তি খুঁজে বেড়াতে লাগল। গুহায় গুহার ধারে কাছে ফ্রান্সিস তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল।

সেদিন সকালের খাওয়া সেরেছে ওখানেই। গুহামুখে একজন সৈন্য এসে দাঁড়াল। শিরস্ত্রাণ বর্ম নেই। কিন্তু কোমরে তলোয়ার গোঁজা। ফ্রান্সিস পারিসি দুজনেই বেশ আশ্চর্য হল।

সৈন্যটি সটান গুহার মধ্যে ঢুকে ফ্রান্সিসদের সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস পারিসিকে বলল–বলো তো লোকটা কি সৈনিক? এখানে এসেছে কেন? পারিসি তাই জিজ্ঞাসা করল। লোকটি গ্রীক ভাষায় কী বলে গেল। পারিসি ফ্রান্সিসকে বলল–ও বলছে–ও সৈনিক। নাম আন্তো। ও নিওফিতসের হাতে তৈরি মূর্তির কথা শুনেছে। সেটা উদ্ধার করতে আমরা এসেছি তাও জানে। কৌতূহল হয়েছে ওর। তাই দেখতে এসেছে কীভাবে আমরা মূর্তিটা উদ্ধার করছি। ফ্রান্সিস এবার আন্তোকে স্পেনীয় ভাষায় বলল–তুমি স্পেনীয় ভাষা জানো?

শুনলে বুঝতে পারি–অল্পস্বল্প বলতেও পারি। আন্তো বলল।

–তাহলে শোনো। সাধু নিওফিতস যীশুর কাঠের মূর্তি গড়েছিলেন সেটা পুরোটাই রাজা গী দ্য লুসিগনান থেকে শুরু করে সকলেরই কল্পনা। এর কোনো প্রমাণ এখনও কেউ পায়নি। আমরাও পাইনি। ফ্রান্সিস বলল।

তবে এখানে এই ঠাণ্ডায় গুহার মধ্যে আছেন কেন? আন্তো বলল।

–আর কয়েকটা দিন খোঁজাখুঁজি করবো তারপর নেমে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।

আমিও আপনাদের সঙ্গে নেমে যাবো। আন্তো বলল।ফ্রান্সিস বুঝল–এই লোকটা পিছু ছাড়বে না। তাই বলল–

–এখানে কিন্তু খাওয়াদাওয়ার খুব কষ্ট হবে।

আপনারা যা খাবেন তাই খাবো। আপনারা না খেয়ে থাকলে আমিও না খেয়ে থাকবো। আন্তো বলল। তারপর হাতে বড়ো পুঁটুলিটা দেখিয়ে বলল–অবশ্য আমি কিছু শুকনো খাবার নিয়ে এসেছি। একসঙ্গেই খাবো। ফ্রান্সিস বুঝল আন্তো আটঘাট বেঁধেই এসেছে। ওকে এড়ানো মুস্কিল। থাকুক–ক্ষতি তো করবে না।

আন্তো ফ্রান্সিসদের সঙ্গে থেকে গেল।

সেদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস পারিসিকে বলল–সাধু নিওফিতস আগে মানে প্রথমে যে গুহাটায় ছিলেন সেটা এখনও দেখা হয়ে ওঠেনি। আজকে চলো নেমে ওই গুহাটা দেখে আসি।

ফ্রান্সিস আর পারিসি চলল নামবার দড়িটার দিকে। আন্তোও পেছনে পেছনে চলল।

গুহামুখ থেকে ঝোলানো দড়ি ধরে ধরে ওরা নীচের একফালি সমতলভূমিতে এলো। তারপরই উত্রাই বেয়ে নামতে লাগল। পথ বলে কিছু নেই। ওঁচানো পাথর ধরে ধরে নামা। বেশ কিছুটা নামার পর অন্য গুহাটার মুখে এলো। এই গুহাটা ওপরের গুহাটার তুলনায় ছোটো।

গুহাটায় ঢুকল তিনজনে। ফ্রান্সিস দেখল ওপরের গুহার মতো এই গুহাতেও শুকনো ঘাসপাতা বিছিয়ে বিছানামতো করা। ফ্রান্সিস বলল–পারিসি এই গুহাটায় তুমি কখনো এসেছিলে? পারসি মাথা নেড়ে বলল–না।

ফ্রান্সিস সঙ্গে আনা মোটা কাপড়টা ঘাসপাতার ওপর বিছিয়ে দিল। পারিসি আর আন্তো বসল। ফ্রান্সিস বসল না। ঘুরে ঘুরে গুহাটা দেখতে লাগল। গুহাটার এক কোণে পোড়া হাঁড়িকুড়ি রাখা। সাধু নিওফিতস যখন এখানে থাকতেন তখন রান্নটান্না করতেন। এখানেও একপাশে গাছের শুকনো ডাল কাণ্ড পাতা রাখা। সাধু নিওফিস রান্না করতেন। আগুন জ্বালাতেন। কিন্তু কোথায় কাঠের যীশু মূর্তি?

ফ্রান্সিস গাছের কাণ্ড ডালপাতা সরাল যদি কিছু পাওয়া যায়। পেলও–একটা ছোটো হাতুড়ি আর ছোটো বাটালি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে সাধু নিওফিতস এখানেও কাঠের কাজ করেছিলেন। যীশুর মূর্তি তৈরি করেছিলেন। তাহলে কি সাধু নিওফিতস একটার বেশি যীশু মূর্তি কাঠকুদে বানিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস ভাবল হয়তো দু’তিনটে মূর্তি সাধু নিওফিতস গড়েছিলেন। কিন্তু একটি মূর্তিও তো পাওয়া গেল না। একটি মূর্তি পাওয়া গেলেও বোঝা যেত আরো মূর্তি তৈরি হয়েছিল কিনা।

ফ্রান্সিস গুহাটার শেষের দিকে এলো। দেখল একটা বড়ো ফাটল। ফাটলটা দিয়ে ফ্রান্সিস বাইরে বেরিয়ে এলো। চারদিকে গাছ পাথর। পাহাড়ি এলাকা যেমন হয়। এদিক ওদিক কিছুদূর ঘুরে এলো ফ্রান্সিস। কিন্তু কোথাও ঝর্ণা বা জলজমা কুণ্ড দেখতে পেল না। তবে সাধু নিওফিতস কোথায় স্নান করতেন? খাবার জলই বা পেতেন কোথায়?

ফ্রান্সিস গুহায় ফিরে এসে পারিসিকে সেই প্রশ্ন করল–পারিসি এখানে কাছাকাছি কোথাও ঝর্ণা বা জমা জল দেখলাম না। তাহলে সাধু নিওফিতস খাবার জল কীভাবে পেতেন? স্নানই বা করতেন কোথায়? পারিসি বলল–তা তো বলতে পারবো না। আমি তো এই গুহায় কখনো থাকি নি। ফ্রান্সিস বলল–আমার দৃঢ় বিশ্বাস এখানে কোথাও ঝর্ণা বা অমনি কোনো জলের জায়গা আছে। পারিসি বলল হতে পারে।

তিনটি পাথরে তৈরি উনুনটায় পারিসি আগুন জ্বালাল। সঙ্গে যে খাবার এনেছিল তাই গরম করে সবাইকে খেতে দিল। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল–পারিসি আমরা এই গুহায় কয়েকদিন থাকবো। এখানে ঠাণ্ডাটাও অনেক কম। খেয়েদেয়ে যাও ওপরের গুহা থেকে খাবারদাবার কাপড়চোপড় নিয়ে এসো। সব এনে তুমি একবার নীচের পাহাড়ি গাঁয়ে যাবে। গাঁয়ের লোকদের অনুরোধ করবে তারা যেন দু’তিনদিন পর পর আমাদের জন্যে খাবারদাবার এই গুহার নীচের এক চিলতে সমভূমিতে রেখে যায়। এবার আন্তোকেও বলল–তুমিও যাও পারিসিকে সাহায্য করো। খাওয়া-দাওয়া সেরে পারিসি আর আন্তো বেরিয়ে গেল।

পারিসি বিকেলের মধ্যেই ওপরের গুহা থেকে সব এনে এই গুহায় জড়ো করল।

পারিসি আন্তোকে সঙ্গে নিয়ে নীচে নেমে এল। পাহাড়ি গাঁয়ের মানুষদের অনুরোধ করে এলো দুতিনদিন অন্তর অন্তর খাবারদাবার দিয়ে যেতে। কেন ও আর ফ্রান্সিস অনেক কষ্ট সহ্য করেও গুহায় পড়ে আছে তাও বলল। বলল–মহাপুরুষ নিওফিতসের নিজের হাতে গড়া কাঠের যীশুর মূর্তি উদ্ধারই আমাদের উদ্দেশ্য। তার জন্যেই এত কষ্ট সহ্য করছি। সাধু নিওফিতসের নাম শুনেই সবাই মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানাল।

থাকা খাওয়ার মোটামুটি ব্যবস্থা হল। এবার মূর্তি খোঁজা।

গুহাটা ফ্রান্সিস তন্ন তন্ন করে খুঁজল। পাথরের কোনো খোঁজই বাদ দিল না। কিন্তু। মূর্তি নেই। কোথাও নেই। কোনো সূত্রই ফ্রান্সিসের হাতে নেই। শুধু সাধু নিওফিতসের গ্রন্থের সেই প্রথম কথাটা–যীশুর স্নানের জল পবিত্র। অথচ এখানে কোথাও জলই নেই। ওপরের গুহার পেছনে তবু একটা ছোটো ঝর্ণা আছে। এখানে তাও নেই।

পরদিন সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস বেরিয়ে এলো গুহা থেকে। পাথরে পা রেখে এদিকওদিক ঘুরে বেড়ালো। কিন্তু ঝর্ণা কোথাও নেই। বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে একটা পাথরের চাইয়ের ওপর বসল। তখনইনজরে পড়ল বাঁ দিকে একটা পাথরের চাইয়ের ওপাশটায় কুয়াশা জমছে। তারপর মনে হল ধোঁয়া। ফ্রান্সিস ভালো করে তাকিয়ে থেকে বুঝল ওটা বাষ্প। কিন্তু জল ছাড়া বাষ্প এটা ঠিক বুঝল না ফ্রান্সিস। সন্দেহ নিরসনের জন্যে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে পাথরে চাইটা পেরোতেই চমকে উঠল। দেখল একটা জলের কুণ্ড।তাই থেকে বাষ্প উঠেছে। তার মানে উষ্ণ প্রস্রবণ। এই উষ্ণ প্রস্রবণেই নিওফিস স্নান করতেন। ফ্রান্সিস আরো কয়েক পা এগোতেই দেখল উষ্ণ জলের কুণ্ডে ভাসছে একটা কাঠের মূর্তি। ক্রশবিদ্ধ যীশুরমূর্তি। ঠিক যেমনটি ও দেখেছিল নিওফিতসের সেই পুস্তকে। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি নেমে এলো। উবু হয়ে বসে জলে হাত রাখল-বেশ গরম। এবার বুকে ক্রশ আঁকলো। তারপর হাত বাড়িয়ে কাঠের মূর্তিটা তুলে নিল। তারপর কোমরের ফেট্টিতে গুজল। আস্তে আস্তে চলল গুহার দিকে।

গুহায় ঢুকে ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–পারিসি–দেখো। এই মূর্তিটাই নিওফিতস নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন। পারিসি মোটা কাপড়ের বিছানায় শুয়ে ছিল। এক লাফে উঠে পড়ল। ছুটে এলো ফ্রান্সিসের কাছে। ফ্রান্সিস কোমর থেকে খুলে মূর্তিটা পারিসিকে দিল। তখন আন্তোও ছুটে এসেছে। পারিসি মূর্তিটা কপালে ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল–এই মূর্তির কথা নিওফিতস আমাকে কখনও বলেন নি। নিওফিতসের হাতে তৈরি মূর্তি। কী অমূল্য সম্পদ।

পারিসি মূর্তিটা পাথরের খাঁজে বসাল। তারপর মাথা নিচু করে ক্রশ আঁকলো। তারপর বিছানায় এসে বসল। তখন ওর ফুঁপিয়ে কান্না বন্ধ হয়েছে। ও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মূর্তিটার দিকে। আন্তোও অবাক চোখে তাকিয়ে রইল মূর্তিটার দিকে। পারিসি এবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। বলল–চলুন এবার নেমে যাই। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–না–এখন নয়। আমার কেমন বিশ্বাস নিওইফতস দুটো মূর্তি তৈরি করেছিলেন। একটা তো পেলাম। আর একটা আছে ওপরের গুহার ধারেকাছে কোথাও। ভুলে যেও না–দুটো গুহাতেই আমরা হাতুড়ি বাটালি পেয়েছি।

–তাহলে আবার ওপরের গুহায় যাবেন? পারিসি বলল।

–হা আর একটা মূর্তির সন্ধান করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস সব গুছিয়ে নিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে এলো। পারিসি কপালে একটা কাপড়ের ফেট্টি বেঁধে তাতে মূর্তিটা গুঁজে রাখল। এতে দু’হাত খোলা রইল। পাহাড়ে ওঠার সুবিধে হল।

তিনজনে পাহাড়ের ওপরের গুহাটায় যাবার জন্যে রওনা হলো। কখনও পাথুরে চাই-এ উঠে কখনও খণ্ড পাথরে পা রেখে রেখে তিনজনে ওপরের গুহার নীচের সমতল অল্প জায়গাটায় এলো। তারপর ঝোলানো দড়ি বেয়ে বেয়ে প্রথমে ফ্রান্সিস উঠে এলো। তারপর পারিসি আর আন্তো উঠে এলো। সবাই গুহাটায় ঢুকল।

গুহায় মোটা কাপড় পেতে বিছানামতো করা হলো।

ফ্রান্সিস আর পারিসি বলল। পারিসি কপালে বাঁধা মূর্তিটা বের করে মাথার কাছে রাখল। আন্তো বসল না। বলল–যাই ঝর্ণার জলে চানটা সেরে আসি। আন্তো গুহার পিছন দিকে দিয়ে বেরিয়ে গেল। এবার পারিসি বলল–ফ্রান্সিস আমি তো নীচের পাহাড়ি গ্রামগুলোয় আমাদের খাবার দেবার কথা বলতে গিয়েছিলাম তখন শুনেছি সেনাপতি ফেলকো রাজা গী দ্য লুসিগনানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। এই কেরিনিয়ার দুর্গে সে আস্তানা গেড়েছে। আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে সেনাপতি ফেলকো আস্তোকে পাঠিয়েছে আমাদের ওপর নজর রাখার জন্যে।

–কেন? ফ্রান্সিস বলল।

–আমরা নিওফিতসের হাতে-গড়া মূর্তি উদ্ধার করতে পারলাম কিনা তার খোঁজ নিতে। দেখছেন না আস্তো কেমন ছায়ার মতো আমাদের সঙ্গে থাকে। আমার একমাত্র চিন্তা আন্তো আমাদের কোনো বিপদে না ফেলে। পারিসি বলল।

দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।

–এই যে আন্তো হঠাৎ চান করতে চলে গেল তার কারণ কী। আন্তো এত সকালে কোনোদিন চান করে না। পারিসি বলল।

–তাহলে আন্তো কোথায় গেল? ফ্রান্সিস বলল।

–আন্তো এর মধ্যে নীচে নেমে লোক দিয়ে বিদ্রোহী সেনাপতি ফেলকোকে সংবাদ পাঠিয়েছে যে সাধু নিওফিতসের মূর্তি আমরা খুঁজে পেয়েছি। পারিসি বলল।

–তা’তে কী হল? বলল।

–আমরা নীচে নামলেই ফেলকোর সৈন্যরা আমাদের কাছ থেকে মূর্তিটা কেড়ে নেবে। পারিসি বলল।

ফ্রান্সিস একটু ভাবল। তারপর বলল–আমরা অন্য দিক দিয়ে পাহাড় থেকে নামবো। সেনাপতি ফেলকোর সৈন্যদের নজর এড়িয়ে পালাবো।

–সে চেষ্টাই করতে হবে। পারিসি বলল।

বেশ দেরি করে আন্তো ফিরে এলো। হাতে খাবার। বলল–নীচে পাহাড়ি লোকেরা এই খাবারদাবার রেখেছে। আমি তাও নিয়ে এলাম।

তিনজনে খেতে লাগল। ফ্রান্সিস আর পারিসি কোনো কথা বলল না।

খুব ভোরে। তখনও সূর্য ওঠেনি। পারিসির ধাক্কায় ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও উঠে বসে জিজ্ঞাসা করল–কী ব্যাপার।

–আন্তো যীশুর মূর্তিটা নিয়ে পালিয়েছে। পারিসি কঁদো কাঁদো গলায় বলল– মূর্তিটা আমি মাথার কাছে রেখে ঘুমিয়েছিলাম। ফ্রান্সিস দেখল আন্তোর শয্যা শূন্য।

.

পরদিন সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস গুহার পেছনের ফাটলটা দিয়ে বাইরে এলো। ঝণাটার জল একনাগাড়ে শব্দ তুলে বয়ে চলেছে। ফ্রান্সিস ঝণাটার পাশ দিয়ে। ছোটো ছোটো ঝোঁপ, পাথরের বড়ো বড়ো টুকরোর ওপর পা রেখে রেখে উঠতে লাগল। কিছুদূরে খাড়াই ওঠার পর দেখল ঝর্ণাটা একটা ছোট্ট গুহামুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ঝোঁপঝাড় ধরে ধরে ফ্রান্সিস গুহামুখটায় এলো। তখনই দেখল ঝর্ণাটা দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। একটা নেমে গেছে ওদের গুহাটার পেছন দিয়ে আর একটা ধারা। নেমে গেছে ডানদিক দিয়ে। ফ্রান্সিস এই নতুন ধারাটার পাশ দিয়ে নামতে নামতে দেখল ঐ জলাধার একটা কুণ্ডের মতো জায়গায় জমেছে। কুণ্ডটার নীচে কোণে ফাটলের মধ্যে দিয়ে সেই জল বেরিয়ে যাচ্ছে। এই জন্যেই কুণ্ডে বেশি জল জমছে না। কুণ্ডের চারপাশের লম্বা লম্বা ঘাস ঝোঁপঝাড় কুণ্ডটাকে প্রায় ঢেকে দিয়েছে। এ কঁকটুকু দিয়ে তাকিয়ে ফ্রান্সিসের মনে হলো কুণ্ডের জলে কী যেন ভাসছে। ফ্রান্সিস দ্রুত নেমে এলো। লম্বা লম্বা ঘাস ঝোঁপ সরিয়ে দেখল–একটা কাঠের মূর্তি ভাসছে। উল্টোমুখ তাই কীসের মূর্তি বুঝল না। ফ্রান্সিস নিচু হয়ে বেশ কষ্ট করে মূর্তিটা তুলে আনল। এ কী? যীশুর মূর্তি। আর একটি। নিওফিতসের গ্রন্থে আঁকা ছবির সঙ্গে হুবহু মিল। তাহলে এই কাঠের মূর্তিটাও নিওফিতস নিজের হাতে গড়েছিলেন। আনন্দে ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে বলে উঠল, পারিসি আর একটি মূর্তি। ফ্রান্সিস ভক্তিভরে বুকে ক্রশ আঁকল।

এবার ফ্রান্সিস মূর্তিটা জামার সামনের গলার কাছ দিয়ে ঢুকিয়ে নিল। দু’হাত তো খোলা রাখতে হবে। নইলে পাথরে ওঠা-নামা করতে পারবে না। ফ্রান্সিস কুণ্ডের এলাকা থেকে আস্তে আস্তে উঠে আগের ঝর্ণাটার মুখে এলো তারপর ঝর্ণার ধার দিয়ে পাথর ঝোঁপঝাড় ধরে ধরে নিজেদের গুহার পেছনে এলো। ফাটল দিয়ে গুহার মধ্যে ঢুকল। দেখল, পারিসি বসে আছে। ফ্রান্সিস মূর্তিটা বের করে পরিসির চোখের সামনে ধরল। মূর্তি দেখে পারিসি অবাক হয়ে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রলি। তারপর দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বুকে ক্রশ আঁকল। জলে ভেজা মূর্তির পায়ে চুম্বন করল। ফ্রান্সিস মূর্তিটা ওর বিছানায়। রাখল। কয়েকদিনের পাহাড়ে ওঠার প্রচণ্ড পরিশ্রম, কষ্ট-খাওয়াও ভালো জোটেনি, নাওয়াও হয়নি- ক্লান্তিতে ফ্রান্সিস মূর্তির পায়ের কাছে মাথা রেখে শুয়ে রইল। এই অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যেও শুনল পারিসি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

ঘুম ভাঙতে ফ্রান্সিস দেখল বেশ বেলা হয়েছে। পরিসি ফ্রান্সিসকে ডাকল-খেয়ে যান। ফ্রান্সিস দেখল পারিসি খাবার নিয়ে বসে আছে। তার মানে ওকে আজ রাঁধতে হয়নি। পাহাড়ি বস্তির লোকেরা সেই দড়ির নীচের সমতল মাটিতে খাবার রেখে গেছে। পারিসি দড়ি বেয়ে নেমে সেই খাবার নিয়ে এসেছে।

খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস বলল, পারিসি, আর এখানে থেকে লাভ নেই। চলো আজকেই নেমে যাবো।

দু’জনে আবার বিছানা কাপড় সব নিয়ে বোঁচকা বাঁধল। পারিসি কোমরের ফেট্টি খুলল। কপালের কাছে যীশুমূর্তি রেখে ফেট্টি দিয়ে বাঁধল। তারপর গুহা থেকে ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে বোঁচকা কাঁধে বেরিয়ে এলো।

নামার সময় যে যে পাহাড়ি বস্তিতে ওরা আশ্রয় নিচেছে সেখানকার সবাই যীশুর মূর্তিতে পা চুম্বন করেছে। পারিসি সেই মূর্তি কপালের ফেট্টির সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চলেছে।

পাহাড়ের যে পথ দিয়ে লোকজন ওঠা-নামা করে আর ফ্রান্সিস ও পারিসি যে পথ দিয়ে উঠে এসেছিল সেই পথ দিয়ে ফ্রান্সিস ও পারিসি নামবে না স্থির করল। নামতে লাগল পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে।

এদিক দিয়ে তো লোক চলাচল করে না। কাজেই পথ বলে কিছু এদিকে নেই! বড়ো বড়ো পাথরের চাই, ঝোঁপ জঙ্গল পাথরের টুকরো ছড়ানো জায়গা। এসবের মধ্যে দিয়ে দু’জনে নেমে চলল। পাহাড়ের মাঝামাঝি নামতেই শুরু হল রোদের তেজ। ঐ রোদের মধ্য দিয়েই দু’জনে নামতে লাগল। একে রাস্তা বলে কিছু নেই পাথরের চাই গাছের গুঁড়ি এসব ধরে ধরে নামতে হচ্ছে। দু’জনেই বেশি কাহিল হয়ে পড়ল। এক সময় ফ্রান্সিস বলল–পারিসি–কপাল থেকে মূর্তিটা নামিয়ে পোশাকের ভেতরে রাখো। ঐ মূর্তিটা ওভাবে রাখলে সহজেই লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। কার মনে কী আছে কে জানে। পারিসি মূর্তিটা খুলে পোশাকের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল।

সামনে একটা গাছ। এটা পেরোলেই এবড়োখেবড়ো ঘাসে ঢাকা সমতলভূমি। পাহাড় শেষ। ফ্রান্সিস হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–পারিসি থামো। দু’জনেই গাছটার আড়ালে দাঁড়াল। দেখল একটু নীচে সমতলভূমিতে আন্তো দাঁড়িয়ে আছে। এখন শিরস্ত্রাণ বর্ম পরা। সঙ্গে চারজন অস্ত্রে সজ্জিত সৈন্য। পারিসি বলল–আন্তো এখানে সৈন্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন?

–ঠিক বুঝতে পারছি না ফ্রান্সিস বলল–তবে কি ও জানতে পেরেছে যে আমরা আর একটা মূর্তি পেয়েছি?

–কী করবেন এখন? পারিসি বলল।

চলো নামা যাক। দেখি আন্তোরা কী চায়। ফ্রান্সিস বলল। ফ্রান্সিস আর পারিসি গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। কয়েকটা পাথরের চাঁইয়ে পা রেখে রেখে নীচে নেমে এলো।

দু’জনে নামতেই আন্তো হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। বলল–ফ্রান্সিস–তুমি খুব বুদ্ধিমান। আমি ভালো করেই জানতাম যে পথ দিয়ে সবাই পাহাড়টায় ওঠানামা করে সেই পথ দিয়ে তুমি নামবে না। পাহাড়ের উল্টো দিক দিয়ে নামবে। তাই আমি সৈন্যদের নিয়ে এই উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছি। ফ্রান্সিসও হেসে বলল–তোমাকে আমরা খাদ্য দিয়েছিলাম, থাকতে দিয়েছিলাম। বিনিময়ে তুমি মূর্তি চুরি করে পালালে। তুমি যে জন্যে আমাদের গুহায় গিয়েছিলে তা তো করেছে। তবে এখন আবার আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছো কেন? আন্তো বলল–তুমি যা বুদ্ধিমান তাতে আর একটা মূর্তিও তুমি উদ্ধার করতে পেরেছো। আমরা সেটাই নিতে এসেছি।

–আর কোনো মূর্তি আমরা পাইনি। ফ্রান্সিস বলল।

মিথ্যে কথা। আন্তো বলল। ফ্রান্সিস বলল–ঐ মূর্তিটা কী করেছো?

–সেনাপতি ফেলকোকে দিয়েছি। আন্তো বলল।

–তাহলে আর সেনাপতি অন্য মূর্তিটা চাইবেন কেন? ফ্রান্সিস বলল।

–দুটো মূর্তিই তার চাই। একটা থাকবে সেনাপতির শিয়রে। অন্যটা থাকবে এই দুর্গের গীর্জায়। এবার ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বুঝিয়ে বলল–আন্তো–আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের আল জাহিরি কয়েদখানায় বন্দি করে রেখেছে। এখন রাজা গী দ্য লুসিগনানকে আমি বলেছি যে মহামতি নিওফিতসের হাতে তৈরি যীশুর মূর্তি আমি উদ্ধার করে আনবো। শেষ পর্যন্ত একটা উদ্ধার করলাম। সেটা তুমি বেইমানি করে চুরি করে নিয়ে পালালে। মহামতি নিওফিতসের হাতে তৈরি আর একটি একইরকম দেখতে মূর্তি আমরা উদ্ধার করেছি। রাজার সঙ্গে আমার চুক্তি হয়েছে যে মূর্তি উদ্ধার করে দিলে তিনি আল জাহিরির কয়েদঘর থেকে আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। দুটো মূর্তি উদ্ধার করেছি। অন্তত একটি মূর্তিও তো রাজাকে দিতে হবে। তা নইলে আমার বন্ধুদের, স্ত্রীর মুক্তি হবে না। তাই তোমাকে অনুরোধ করছি যে কথাগুলি আমি বললাম তা সেনাপতি ফেলকোকে গিয়ে বলো। একটা মূর্তি তো পেয়েছেন আর একটা মূর্তি আর ও চাইবেন না।

-না–সেনাপতি ফেলকো দুটি মূর্তিই নেবেন। আন্তো বলল।

–তাহলে তো লড়াইয়ে নামতে হয়। কথাটা বলেই ফ্রান্সিস এক লাফে এগিয়ে এসে আন্তোর, কোমরে ঝোলানো তলোয়ারের খাপ থেকে তলোয়ারটা এক ঝটকায় খুলে নিল। তারপর খোলা তলোয়ার হাতে সৈন্যদের আক্রমণের মোকাবিলা করতে দাঁড়াল। আস্তে বলল–পারিসি তুমি এখান থেকে সরে যাও। পারিসি দ্রুতপায়ে সরে গেল। আন্তো চিৎকার করে বলল–সৈন্যরা খতম করো এই ভিনদেশীটিকে। ফ্রান্সিসের রুদ্রমূর্তি দেখে সকলেই একটু ঘাবড়ে গেল। আন্তো একটি চিৎকার করে বলে উঠল– আক্রমণ করো। ওর কাছেই নিওফিতসের মূর্তিটা রয়েছে। সেই মূর্তি আমাদের চাই। এবার চারজন সৈন্যই ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস নানা কৌশলে ওদের তলোয়ারের মার ঠেকাতে লাগল। নিজে অক্রমণ করল না। সৈন্য চারজন অল্পক্ষণের মধ্যে হাঁপাতে শুরু করল। ফ্রান্সিস তখনও সমান তেজে তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছে।

সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসের বুকে বর্ম নেই মাথায় শিরস্ত্রাণ নেই। বেশ কিছুক্ষণ লড়াইয়ের পর এখনও ওর দেহ অক্ষত। সৈন্যরা বুঝল ফ্রান্সিসকে সহজে কাবু করা যাবে না।

ফ্রান্সিস বুঝল সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস এটাই চাইছিল। এবার ফ্রান্সিস আক্রমণ করল। এক সৈন্যের বাহুতে তলোয়ারের কোপ বসাল। সেই সৈন্যটা তলোয়ার ফেলে বাহু চেপে ধরল অন্য হাতে। তবু রক্ত পড়তে লাগল। একজন সৈন্যের শিরস্ত্রাণ তলোয়ারের মারে উড়িয়ে দিল। শিরস্ত্রাণ মাটিতে পড়ে গেল। এবার ফ্রান্সিস ওর মাথায় আস্তে তলোয়ারের কোপ বসাল। মাথা কেটে রক্ত বেরিয়ে এলো। আর একজনের পায়ে তলোয়ার চালাল। সে বেচারা দু’হাতে পা চেপে ধরে বসে পড়ল।

তলোয়ার চালানোর ফাঁকে ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল আন্তো প্রান্তর দিয়ে ছুটে চলেছে।

আহত সৈন্যরা তখন যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে। দু’জন সৈন্য শুধু আহত হয়নি। দু’জন দূরে সরে গেল। ফ্রান্সিস বলে উঠল–পারিসি পালাও। একথা বলেই ফ্রান্সিস ঘাসে ঢাকা প্রান্তর দিয়ে ছুটল। পেছনে পারিসি। কিছুটা ছুটে গিয়ে দেখল প্রান্তরের ওপাশ থেকে একদল সৈন্য ছুটে আসছে। ফ্রান্সিস বুঝল আন্তো দুর্গে গিয়েছিল সৈন্যদের ডাকতে। দু’জনে ছুটেছে তখনও। সৈন্যরা ছুটে এসে দু’জনকে ঘিরে ফেলল। ফ্রান্সিস তলোয়ার ফেলে দিল। এখন এতজনের সঙ্গে লড়তে যাওয়া বোকামি।

আন্তো এগিয়ে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–এবার মূর্তিটা দাও।ফ্রান্সিস বলল– তোমাকে মূর্তি দেব না। আমাদের সেনাপতির কাছে নিয়ে চল। মূর্তি আমি তাকেই দেব।

–বেশ চলো। আন্তো বলল। আন্তোর সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস আর পারিসি চলল।

প্রান্তরের শেষেই দুর্গ। পাথর দিয়ে তৈরি। দুর্গের সদর দেউড়ির কাছে এলো সবাই। বিরাট বন্ধ দরজা ঘর ঘশব্দে খুলে গেল। সৈন্যদের সঙ্গে ফ্রান্সিস আর পারিসি দুজনেই ঢুকল।

দুর্গের একটা ঘরে ওদের নিয়ে এলো আন্তো। মশালের আলোয় দেখা গেল এটা। পাথরের আসনে সেনাপতি ফেলকো বসে আছে। সভাঘরে শুধু ঢুকল আন্তো। পেছনে পেছনে ফ্রান্সিস আর পারিসি। আন্তো একবার মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে গ্রীক ভাষায় সব জানাল। সেনাপতি ফেলকো ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কী বলল। ফ্রান্সিস কিছুই বুঝল না। ও বলল—আমি গ্রীক ভাষা জানি না। আপনি যা বলবার স্পেনীয় ভাষায়। বলুন। এবার সেনাপতি স্পেনীয় ভাষায় বলল–দুটো যীশুর মূর্তি তুমি উদ্ধার করেছে। একটা মূর্তি আন্তো নিয়ে এসেছে। অন্যটা তোমার কাছে আছে সেটা দাও। আমি স্থির করেছি একটা মূর্তি এই দুর্গের গীর্জায় বসাবো। ফ্রান্সিস বলল–

–এ কথা সত্য যে আমি দুটো মূর্তিই উদ্ধার করেছি। এর মধ্যে একটা আমার খুবই প্রয়োজন। একাট মূর্তি রাজা লুসিগনানকে দিতে পারলে আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের মুক্ত করতে পারবো। কারণ ওরা সবাই আল জাহিরির কয়েদঘরে বন্দি হয়ে আছে। সেনাপতি ফেলকো সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো–না রাজাকে দেওয়া চলবে না। বোধহয় তোমরা জানো যে আমি রাজা গী দ্য লুসিগনানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি। রাজাকে দেওয়া চলবে না। দুটো মূর্তিই আমার চাই।

–তাহলে আপনিই তাদের বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করুন। ফ্রান্সিস বলল।

–না আমি তা পারবো না। আল জাহিরি প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা আমাকে দিয়েছে। তাই তাকে ক্রীতদাস কেনা বেচার হাট এখানে খুলতে দিয়েছি। সেনাপতি বলল।

–তাহলে আল জাহিরিকে বলুন ও যেন আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের মুক্তি দেয়।ফ্রান্সিস বলল।

–আমি তা পারবো না। এটা ওর ব্যবসা। সেনাপতি বলল। ফ্রান্সিস চুপ করে রইল। সেনাপতি বলল-মূর্তি দাও। ফ্রান্সিস অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলার দিকে দিয়ে হাত ঢুকিতে মূর্তিটা বের করল। এগিয়ে ধরল মূর্তি। সেনাপতি উঠে এগিয়ে এলো। বুকে ক্রশ এঁকে মূর্তিটা নিল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মূর্তিটার দিকে।

ফ্রান্সিস ঘিরে দাঁড়াল। পারিসিকে বলল–চলো। দু’জনে সেই ঘরটা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। পারিসি বলল–মূর্তিটা এভাবে দিয়ে দিলেন?

–উপায় কি। আমাদের মাথার শিরস্ত্রাণ তো দূরের কথা একটা ঢালও নেই। এ অবস্থায় লড়াইয়ে নামলে মৃত্যু অবধারিত। বেঁচে থাকলে সবই হবে। ফ্রান্সিস বলল।

–এবার কী করবেন?

–একটা সরাইখানায় থাকবো। মূর্তিটা গীর্জায় প্রতিষ্ঠা করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। তারপর মূর্তিটা চুরি করবো।

–পারবেন চুরি করতে? পারিসি বলল।

–সব ব্যবস্থা দেখবো তবেই বলা যাবে পারবো কিনা। ফ্রান্সিস বলল।

কেরিনিয়া নগরের পথ দিয়ে ফ্রান্সিস আর পারিসি চলল। কিছুদূর যেতেই রাস্তার ধারে একটা বড়ো সরাইখানা পেল। দু’জনে ঢুকল। এখানে বিদেশি লোকের সংখ্যাই বেশি। ঐ সরাইখানার একটা ঘরে দু’জনে আশ্রয় নিল।

তখন বিকেল। ফ্রান্সিস পারিসিকে বলল–পারিসি দুর্গে যাও। তুমি এই সাইপ্রাসের মানুষ। তোমাকে সন্দেহ করবে না। গীর্জায় প্রার্থনা করতে যাচ্ছো বললে কেউ বাধা দেবে না। গীর্জায় গিয়ে দেখবে নিওফিতসের তৈরি মূর্তিটা বেদীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেখলেই কাজে নামতে হবে। এবার দুর্গের গীর্জায় যাও। লক্ষ্য করো গীর্জায় তালা লাগানো হয় কি না।

পারিসি সরাইখানা থেকে বেরিয়ে দুর্গের গীর্জায় চলল। দুর্গোর সেই সদর দেউড়ির সামনে বেশি পাহারাদার নেই। পারিসি দরজা পার হল। একজন পাহারাদার জিজ্ঞেস করল–কোথায় যাচ্ছো?

–গীর্জায় প্রার্থনা করতে পারিসি বলল।

হু —-যাও। পাহারাদার আর কিছু বলল না।

গীর্জার ভেতরে তখন কিছু লোকজনের ভিড় রয়েছে। ভেতরে ঢোকার আগে পারিসি ভালো করে দরজার মোটা কড়াটা দেখল। না কোনো তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়নি। তার মানে গীর্জাটার দরজা সারারাত খোলাই থাকে। এই গীর্জায় পরিসি আগেও দু’তিনবার এসেছে। দূর থেকেই দেখল অগের মূর্তিটা বেদীতে নেই। সেখানে নিওফিতসের হাতে তৈরি মূর্তিটা বসানো হয়েছে। পরিসি যা জানতে এসেছিল তা সবই জানা হয়ে গেল। পারিসি গীর্জার আরো ভেতরে না ঢুকে বাইরে বেরিয়ে এলো। চলল সরাইখানার দিকে।

ফ্রান্সিসকে সব বলল। ফ্রান্সিস খুশিতে লাফিয়ে উঠল। মূর্তিটা বেদীতে স্থাপন করা হয়েছে আর গীর্জার দরজায় তালা দেওয়া হয় না ভেজিয়ে রাখা হয়। এই দুটো তথ্য পেয়ে ফ্রান্সিস খুশি হল। বলল–পারিসি–আজ রাতেই হানা দিতে হবে।

দু’জনে সরাইখানায় ফিরে এলো। সারাদিন শুয়ে বসে সময় কাটাল। কখন রাত হবে। কখন রাত গম্ভীর হবে তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।

এক সময় সন্ধে হল। দু’জনে তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে নিল। এখন রাত গম্ভীর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা।

রাত বাড়তে লাগল। ফ্রান্সিস একসময় বলল–এবার চলো পারিসি।

দু’জনে সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এলো। পথঘাট অন্ধকারে ডুবে আছে। ফ্রান্সিস অন্ধকারই চাইছিল। চললদু’জনে। দু’চারবার জোরহাওয়া বয়ে গেল। ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকাল। একটা তারাও দেখা গেল না। ঘন মেঘে আকাশ অন্ধকার।

দুর্গের কাছাকাছি আসতে প্রথমে ছুটে এলো প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস। তারপরই শুরু হল বৃষ্টি। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে লাগল। দু’জনেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চলল। সদর দেউড়ির দিকে যাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই পাহারাদার রয়েছে।

ফ্রান্সিস দুর্গের পেছন দিকে চলল। তখন প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। দুর্গের পেছনে বিস্তৃত বন জঙ্গল। ফ্রান্সিস দুর্গের প্রাচীর দেখতে দেখতে চলল। দুর্গ প্রাচীর কোথাও ফাটল নেই। দেখতে দেখতে একটা জায়গা এলো। বিদ্যুতের আলোয় দেখল প্রাচীরের একটা চৌকোণো পাথর দেয়াল থেকে বেরিয়ে আছে। আবার বিদ্যুৎ চমকাল। দেখল দেয়ালের মাথার কাছে দুটো পাথর আলগা। ফ্রান্সিস ঠিক করল দুর্গে ঢুকতে হলে এখান দিয়েই ঢুকতে হবে। প্রচণ্ড ঝড়জলের মধ্যে ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–পারিসি–এখান দিয়েই দেয়াল ডিঙোতে হবে। ফ্রান্সিস এরকম ঝড়জলই চাইছিল। ও মনে মনে ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাল।

ফ্রান্সিস খুলে ঝুলতে থাকা চৌকোণো পাথরের টুকরোটা সরিয়ে নীচে ফেলল। জায়গাটায় খোঁদলমতোহল। সেটায় রেখে ফ্রন্সিস উঠে দাঁড়াল। বুকের কাছে একটা পাথরের পাটায় হাত দিয়ে বুঝল-নড়বড় করছে। ফ্রান্সিস দুতিনবার টানতেই পাটাটা খুলে এলো। ওটা নীচে ফেলে দিল। এবার সেই খোদলটায় পা রেখে প্রাচীরের মাথার কাছে একটা বেরিয়ে থাকা পাথরের পাটা টানাটানি করে বুঝল ওটা শক্ত আছে। ফ্রান্সিস ঐ পাটায় ঝুলে পড়ে এক ঝটকায় প্রাচীরের মাথায় উঠে বসল।

এতক্ষণে বৃষ্টি কমে এসেছে। হাওয়ার সেই তেজও আর নেই। ফ্রান্সিস প্রাচীরের গায়ে দুটো পাথরের পাটা আগা দেখল। ও তারই একটা ঠেলে দিল। যে খোদলমতো হল সেটাতে পা রেখে লাফ দিয়ে নেমে এলো। প্রাচীরের ওপাশে তো ঘন জঙ্গল। তাই এপাশের প্রাচীরের ধারে কাছে সেনাপতি ফেলকোর কোনো পাহারাদার সৈন্য নেই। অবশ্য এই ঝড়জলে কোনো পাহারাদারও এদিকে থাকতে আসেনি।

এতক্ষণে বৃষ্টি আরো কমে এসেছে। হাওয়ার দাপটও কমেছে।

পাথর বাঁধানো প্রাঙ্গণ দিয়ে মাথা নিচু করে ফ্রান্সিস ছুটে চলল গীর্জাটার দিকে। গীর্জাটা ঘুরে আসতে হবে গীর্জাটার দরজার কাছে। ফ্রান্সিস এবার সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে দেখল–কোথাও মশাল জ্বলছে না। শুধু সৈন্যাবাসে মশাল জ্বলছে।

ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে পাথরের প্রাঙ্গণটা পার হয়ে গীর্জার সদর দরজার কাছে। এলো। দেখল দরজায় দুটো বড়ো কড়া লাগানো কিন্তু তালা দেওয়া নেই। ফ্রান্সিস আস্তে দরজার একটা পাট খুলল। কচ্ কোঁচ্। অল্প শব্দ হল। ও গীর্জার ভেতরে ঢুকল। ভেতরে দু’পাশের পাথুরে দেওয়ালে দুটো নয় একটা মশাল জ্বলছে। বেদীতে কয়েকটা মোমবাতি জ্বলছে। সেই আলোয় যীশুখ্রীস্টের মূর্তিটা দেখা যাচ্ছে।

ফ্রান্সিস দ্রুত বেদীর কাছে ছুটে এলো। ঝড়বৃষ্টি থেমে গেছে। এখন হয়তো পাহারাদাররা পাহারা দিতে বেরুবে। মূর্তিটার সামনে দাঁড়িয়ে ও বুকে ক্রশচিহ্ন আঁকল। তারপর আলগোছে মূর্তিটা তুলে নিয়ে বুকের কাছে পোশাকের নীচে ঢুকিয়ে রাখল।

এবার পালানো। গীর্জার দরজার কাছে এলো ফ্রান্সিস। দেখল সদর দেউড়িতে কয়েকটা মশাল জ্বলছে। ওখানে জনা কয়েক সৈন্য পাহারা দিচ্ছে। ওদিক দিয়ে পালানো যাবে না।

ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে অন্ধকারে ছুটল যেখান দিয়ে ঢুকেছিল সেইদিকে। পাথরখসা খোঁদলে পা রেখে রেখে প্রাচীরের মাথায় উঠে এলো। তারপর নীচের ঝোঁপ জঙ্গলে ঝপ করে নেমে এলো। পারিসি গলা নামিয়ে বলল–মূর্তি আনতে পেরেছেন? ফ্রান্সিস হেসে বলল–এ তো ছেলেখেলা। চলো এবার। এতল্লাটে আর থাকবো না।

অন্ধকার পথ দিয়ে দু’জনে সরাইখানায় এলো। খাওয়া-দাওয়ার পর দু’জনে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বলল–পারিসি–পাফোসের মঠটা কোথায় জানো?

জানি। এখান থেকে মাইল কয়েক দূরে। পারিসি বলল।

কালকে ঐ মঠে যাবো। অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করবো। ফ্রান্সিস বলল।

পরদিন দু’জনে চলল পাফোসের মঠের অধ্যক্ষের উদ্দেশে। মঠেই দু’জনে দেখা করল অধ্যক্ষের সঙ্গে। মূর্তি দেখাল। অধ্যক্ষ তো আনন্দে দিশাহারা। বললেন, পারিসি কী পরম পবিত্র মূর্তি তোমরা এনেছো, তোমরা বোধহয় জানো না। মহান পুরুষ নিওফিতসের নিজের হাতে তৈরি মূর্তি যে খ্রীস্টিয় সমাজে কী অপরিসীম মূল্যবান তা বলে বোঝাতে পারবো না।

ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে পারিসি বলল, এঁর নাম ফ্রান্সিস। জাতিতে ভাইকিং। ইনিই উদ্ধার করেছেন এই মূর্তি। অধ্যক্ষ তখন ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললেন, বলো তুমি কী পুরস্কার চাও।

ফ্রান্সিস বলল, আমি কোনো পুরস্কার চাই না। আপনি দয়া করে এই মঠের একজন ধর্মযাজককে আমার সঙ্গে যেতে আদেশ দিন।

তা দিচ্ছি, কিন্তু সে তোমার সঙ্গে কোথায় যাবে? অধ্যক্ষ জানতে চাইলেন।

রাজা গী দ্য লুসিগনানের রাজসভায়। রাজা লুসিগনানের সঙ্গে আমার একটা শর্ত ছিল। ধর্মযাজক যেন বলেন আমি মূর্তি উদ্ধার করেছি এবার রাজা তার শর্ত রাখুন।

মঠাধ্যক্ষ বললেন–বেশ তোমাকে একজন ধর্মযাজক নিয়ে যাবেন। এই মূর্তি এখন আমরা গীর্জার পবিত্রস্থানে রাখবো। কালকে রাজধানী নিকোশিয়া যাবার আগে তোমাদের দেওয়া হবে। সেই রাতটা দু’জনে অধ্যক্ষের অতিথি হয়ে মঠেই রইল।

পরদিন সকালে মঠাধ্যক্ষ একটা বড়ো গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলেন। একজন ধর্মযাজককে সঙ্গে দিলেন। সেই ধর্মযাজক মূর্তিটা দু’হাতে বুকের কাছে ধরে রইলেন। গাড়িতে ধর্মযাজকের পেছনে পেছনে ফ্রান্সিস, পারিসি উঠল। গাড়ি চলল রাজধানী নিকোশিয়ার দিকে।

দ্রুতগতিতে গাড়ি চলল। দুপুরের আগেই গাড়িটা নিকোশিয়া পৌঁছল। রাজপ্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তিনজনেই রাজসভায় ঢুকল। চারপাশের লোকজন প্রহরীরা সবাই মাথা নুইয়ে ধর্মযাজককে সম্মান জানাল। রাজাও সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ধর্মযাজক হাত নেড়ে তাদের বসতে বললেন। সবাই বসলেন।

ধর্মযাজককে একটা আসনে বসতে দেওয়া হলো। ফ্রান্সিস আর পারিসি দাঁড়িয়ে রইল। ধর্মযাজক তার বুকে ধরা যীশুর মূর্তিটা রাজাকে দেখিয়ে বললেন–রাজা–এই মূর্তিটিই মহাপুরুষ নিওফিতসের নিজের হাতে তৈরি মূর্তি। ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বললেন–এর নাম ফ্রান্সিস। এরা দুঃসাহসী ভাইকিং। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর প্রায় উপবাসে থেকে এই মূর্তিটা উদ্ধার করেছি। কিন্তু আপনার বিদ্রোহী সেনাপতি ফেলকো সেটা লোক দিয়ে চুরি করিয়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখেছে। রাজা বললেন–কয়েকদিনের মধ্যে ফেলকোকে পরাস্ত করে আমি ঐ মূর্তিটাও উদ্ধার করবো। ধর্মযাজক এবার ফ্রান্সিসকে বললেন–তুমি রাজকে কী বলবে বলেছিলেন সেটা বলো। ফ্রান্সিস মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানিয়ে রাজাকে বলল– মহামান্য রাজা–আপনি কথা দিয়েছিলেন যে মূর্তি উদ্ধার করতে পারলে আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের আল জাহিরির হাত থেকে মুক্ত করে দেবেন। রাজা বললেন–হ্যাঁ বলেছিলাম। সমস্ত সাইপ্রাসবাসীরা আজ তোমার জন্য এক অমূল্য সম্পদের অধিকারী হল। তোমার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। একটু থেমে বললেন–কিন্তু মুস্কিল হয়েছে আমার ভূতপূর্ব সেনাপতি ফেলকো বিদ্রোহ করে এর মধ্যে কেরিনিয়ার দুর্গ দখল করে ওর রাজত্ব কায়েম করেছে। আমার লোকজন আর এখন কেরিনিয়ায় ঢুকতে পারবে না।

–তাহলে আমার বন্ধুরা কীভাবে মুক্তি পাবে। ফ্রান্সিস বলল।

কয়েকদিনের মধ্যেই আমি কেরিনিয়া আক্রমণ করে দখল করবো। তখন তোমার বন্ধুদের মুক্ত করবো। রাজা বললেন।

–ততদিনে ক্রীতদাসের হাটে হয়তো আমার স্ত্রী আর বন্ধুরা বিক্রি হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল। রাজা বললেন–সেজন্যেই আমি স্থির করলাম আমার বর্তমান সেনাপতি তোমাকে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে কেরিনিয়ার সীমান্তে রেখে আসবে। তুমি কেরিনিয়ায়। ঢুকে বন্ধুদের খোঁজখবর করতে পারবে। তুমি বিদেশি। তোমাকে কেউ কিছু বলবে না।

–কিন্তু আল জাহিরি আমাকে দেখলেই বন্দি করবে। ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি যতটা সম্ভব আত্মগোপন করে কাজ সারবে। রাজা বললেন।

–বেশ তাই হবে। ফ্রান্সিস বলল। এবার রাজা বললেন—

–এবার বলো তুমি যে মূর্তি উদ্ধার করেছে তার বিনিময়ে কি চাও?

–আমি দশটি স্বর্ণমুদ্রা চাই। প্রয়োজনে আমি আংটি বন্ধক রেখেছিলাম। সেটা ছাড়াতে হবে। আর কয়েকটা দিন আমাকে আত্মগোপন করে থাকতে হবে। কাজেই দশটি স্বর্ণমুদ্রা আমার খুবই প্রয়োজন।

-বেশ। আর কিছু চাই? রাজা বললেন।

–না। ফ্রান্সিস বলল।

তুমি একটা অমূল্য জিনিস উদ্ধার করেছো। তুমি যা খুশি চাইতে পারো। রাজা বললেন।

–না। মান্যবর রাজা আমার কিছুই চাই না। শুধু আমার বন্ধুদের মুক্তি চাই। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। রাজা একজন প্রহরীকে ইঙ্গিতে কাছে ডাকলেন। রাজা তাকে কিছু নির্দেশ দিলেন। একটু পরেই প্রহরীটি ফিরে এসে রাজাকে দশটি স্বর্ণমুদ্রা দিল। রাজা সেই দশটি স্বর্ণমুদ্রা ফ্রান্সিসকে দিলেন।

রাজপ্রাসাদ থেকে ফ্রান্সিস ও পারিসি বেরিয়ে এলো। পারিসি বলল–ফ্রান্সিস আমার কাজ তো শেষ। আমি এবার বাড়ি যাবো। আমার বুড়ি মা একা আছে।

–ঠিক আছে তুমি যাও। আমার সঙ্গে থেকে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। এই কথা বলে ফ্রান্সিস পারিসির ডান হাতটা জড়িয়ে ধরল। পারিসিও হাতে জোরে চাপ দিল। তারপর চলে গেল। পারিসি ওর মা’র কথা বলল। তাতেই ফ্রান্সিসের নিজের মায়ের কথা মনে পড়ল। ওর চোখ দুটো ভিজে উঠল। চোখ মুছে তাকিয়ে দেখল সামনেই রাজবাড়ির গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িতে সেনাপতি বসে আছে। সেনাপতি ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসকে গাড়িতে উঠে আসতে বলল। ফ্রান্সিস গাড়িতে উঠে সেনাপতির সামনের আসনে বসল। ফ্রান্সিস বলল–কেরেনিয়া তো বেশ দূর। পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত গম্ভীর হয়ে যাবে।

–আমিও সেটাই চাই। রাতের অন্ধকারেই তোমতাকে রেখে আসবো। সেনাপতি বলল।

গাড়ি চলল কেরিনিয়া বন্দর শহরের উদ্দেশে। কথা প্রসঙ্গে সেনাপতি বলল–এই মওকায় তুমি সোনাদানা চাইলে রাজা তাই দিতেন। ফ্রান্সিস হেসে বলল–সোনাদানার ওপর কোনো লোভ নেই আমার। আমার এখন সবচেয়ে প্রয়োজন বন্ধুদের মুক্তি। আর কিছু না। কথাটা বলেই ফ্রান্সিসের মনে পড়ল ওদের বিয়ের সেই দামি আংটিটা এক স্বর্ণকারের কাছে বন্ধক আছে। ফ্রান্সিস বলল–সেনাপতি মশাই–একটা ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই।

–বলো কী রকম সাহায্য? সেনাপতি বলল।

–একজন স্বর্ণকারের কাছে অভাবের সময় একটা আংটি বন্ধক রেখেছি। ওটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।

–বেশ তো–স্বর্ণকারের দোকানটা কোথায় দেখিয়ে দাও। সেনাপতি বলল।

–চলুন দেখাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।

দোকানটার সামনে এসে ফ্রান্সিস সেনাপতিকে দোকানটা দেখাল। সেনাপতি গাড়ি থামাতে বলল। গাড়ি থামল। সেনাপতি কোচওয়ানকে বলল–স্বর্ণকারকে ডেকে নিয়ে, আয়। একটু পরেই কোচয়ানের সঙ্গে কাঁপতে কাঁপতে স্বর্ণকার এলো। সেনাপতি ডাকছেন। ভয় তো হবেই। সেনাপতি ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বলল–এর একটা আংটি তোমার কাছে বন্ধক আছে?

আজ্ঞে হ্যাঁ। স্বর্ণকার ভীতস্বরে বলল।

–ঐ আংটিটা নিয়ে এসো। সেনাপতি বলল।

–এক্ষুণি আনছিস্বর্ণকার পড়িমরি করে ছুটল। আংটিটা নিয়ে ফিরে এলো। সেনাপতি আংটিটা হাতে ফ্রান্সিসকে বলল–এটাই তোমার আংটি?

-হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল। সেনাপতি আংটিটা ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিস আংটিটা আঙ্গ লে পরতে পরতে বলল–কিন্তু আমাকে কত দিতে হবে। সেনাপতি হাত তুলে ফ্রান্সিসকে .থামাল। কোচোয়ানকে বলল–গাড়ি চালা। গাড়ি চলল।

গাড়িতে বসে ফ্রান্সিসের সঙ্গে সেনাপতির সামান্য কথাই হল।

তখন রাত গভীর। অন্ধকারে একটা বিরাট গাছের নীচে এসে সেনাপতি গাড়ি থামাতে বলল। কোচোয়ান গাড়ি থামাল। সেনাপতি বলল–এখান থেকে কেরিনিয়া শুরু হল। আমরা আর যাবো না। তুমি নেমে যাও।

ফ্রান্সিস গাড়ি থেকে নেমে এলো। অন্ধকারে উত্তরমুখো কেরিনিয়া বন্দরের উদ্দেশে চলল।

কেরিনিয়া বন্দর শহরে যখন ঢুকল্প তখন পুব আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। একটু পরেই সূর্য উঠল। ফ্রান্সিস আগেই জাহাজঘাটার দিকে গেল না। খুঁজে খুঁজে একটা সরাইখানায় উঠল। সকালের জলখাবার খেয়েই শুয়ে পড়ল। মাথায় চিন্তা কীভাবে বন্ধুদের মুক্ত করবে। কে জানে এই কদিনের মধ্যেই মারিয়া আর বন্ধুদের আল জাহিরি ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করে দিয়েছে কিনা। এইসব ভাবতে ভাবতে রাত জাগার ক্লান্তিতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।

দুপুরে ঘুম থেকে উঠে স্নান খাওয়া সারল। তারপর তৈরি হয়ে গেল। কেরিনিয়া দুর্গ জাহাজঘাটা থেকে দূরে। কাজেই বিদ্রোহী সেনাপতি ফেলকোর সৈন্যদের নজরে পড়ার সম্ভাবনা নেই। বাকি রইল আল জাহিরি আর তার সৈন্যরা কয়েদঘরের আড়াল থেকে সব দেখতে হবে।

ফ্রান্সিস যখন জাহাজঘাটার কাছে পৌঁছল তখন বেশ বেলা হয়েছে। দূর থেকেই দেখল জাহাজঘাটায় ওদের জাহাজটা নেই। ফ্রান্সিসের কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল। তাহলে কি ওর বন্ধুদের ও মারিয়াকে ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করে আল জাহিরি ওর সৈন্যদের নিয়ে জাহাজ চালিয়ে চলে গেছে? ফ্রান্সিস কিছুই ভেবে ঠিক করতে পারল না। সত্যি সত্যি এখানে ঠিক কী ঘটেছে।

ফ্রান্সিস বাড়িঘরের আড়ালে আড়ালে লম্বাটে কয়েদঘরটার কাছে এলো। কয়েদঘরের আড়াল থেকে নজর রাখল ওদের জাহাজের ওপর। জাহাজের ডেক-এ কয়েকজন ভাইকিং শুয়ে বসে আছে এটা দেখল। আবছা আন্দাজে চিনতেও পারল না। কিন্তু ওরা বন্দি না মুক্ত এটা ঠিক বুঝল না।

বেশ কিছুক্ষণ কয়েদঘরের আড়াল থেকে ফ্রান্সিস নজর রাখল।হঠাৎ বন্ধুদের সামনে যাওয়াটা উচিত হবে না। বন্ধুদের দেখে এটা বোঝা যাচ্ছে যে ওরা বন্দি নয়। বন্দি হলে নীচে কয়েদঘরে থাকতো ওরা। ডেক-এ নয়।

ফ্রান্সিস এসব ভাবছে তখনই দেখল ধনুকতির কাঁধে শাঙ্কো জাহাজের পাটাতন দিয়ে নেমে আসছে। এবার ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হল যে বন্ধুরা বন্দি হয়ে নেই।

শাঙ্কো শিকারের জন্যে কয়েদঘরের ওপাশে বড়ো জঙ্গলটার দিকে যাচ্ছে। শাঙ্কো কয়েদঘর:ছাড়িয়ে আসতেই ফ্রান্সিস ছুটে ওর সামনে গেল। ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। শাঙ্কো কিছুতেই ফ্রান্সিসকে ছাড়ছে না। তখন ফ্রান্সিস ওর পিঠে আস্তে চাপড় মেরে বলল–এই শাঙ্কো-পাগলামি করো না। শাঙ্কো হাত আলগা করল। ফ্রান্সিস বলল–কী ব্যাপার বলো তো? আল জাহিরি তার জাহাজ পাহারাদার সৈন্যরা কোথায় সব?

–মাঝ সমুদ্রে নিজে একা আল জাহিরি তার জাহাজে ঘুরপাক খাচ্ছে। শাঙ্কো বলল।

–কিছুই বুঝলাম না। ফ্রান্সিস বলল। বলো–

–জাহাজে চলো সব বলছি। তার আগে বলো তুমি কি যীশুর মূর্তি উদ্ধার করতে পেরেছো? শাঙ্কো জানতে চাইল।

-হ্যাঁ–একটা নয় দুটো মূর্তি। তার একটা বিদ্রোহী সেনাপতি ফেলকো চুরি করে নিয়েছে। অন্যটা আমি আর পারিসি রাজা গী দ্য লুসিগনানের হাতে দিয়েছি। শাঙ্কো চিৎকার করে ধ্বনি তুলল—ও হো হো। ফ্রান্সিসও গলা মেলাল। তারপর দুজনে ওদেরজাহাজে দিকে চলল।

জাহাজের পাটাতনে ফ্রান্সিসরা পা রাখতেই ডেক-এ শুয়ে বসে থাকা ভাইকিং বন্ধুরা ওদের দেখল। ওরা উঠেপঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল–ফ্রান্সিস এসেছে। নিচের কেবিনঘর থেকে সবাই ছুটে এসে ডেক-এ উঠতে লাগল। হ্যারি ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। মারিয়া হাসতে হাসতে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল মারিয়ার শরীরটা বেশ রোগা হয়ে গেছে। ভাবল–মারিয়াকে এই অভিযানে আনা উচিত হয়নি। ছোটবেলা। থেকে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে আদরে মানুষ হয়েছে মারিয়া। ওর পক্ষে এত ধকল পোহানো সম্ভব নয়। ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল এখন আর ওসব ভেবে কি লাভ। ওদিকে বন্ধুরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল—ও হো হো ।

মারিয়া হাসতে হাসতে এসে ফ্রান্সিসের একটা হাত ধরল। ফ্রান্সিস হেসে বলল– এবারও আমার হাত খালি। তবে যদি আর এক সপ্তাহ এখান অপেক্ষা করতে পারো তবে মহাত্মা নিওফিতসের নিজের হাতে তৈরি একটা যীশুর মূর্তি পেতে পারি।

-না-মারিয়া মাথা নেড়ে বলল–আমরা এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরবো।

বেশ তোমরা যেমন চাও। ফ্রান্সিস বলল।

ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল—ও হো হো। তারপর একদল ছুটল নোঙর তুলতে অন্যদল পাল খুলে দিতে আর একদল দাঁড়ঘরে দাঁড় টানার জন্যে। এবার দেশে ফেরা। জাহাজ চালাতে হবে যত দ্রুত সম্ভব।

হ্যারি আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসকে বলল মারিয়ার অসুস্থতার কথা আল জাহিরির সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা সবই বলল। ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল–এখন তোমার শরীর কেমন? মারিয়া হেসে বলল–তুমি এসেছো–আমার দুশ্চিন্তা কমল–এবার আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হবো। তুমি কিচ্ছু ভেবো না।

ততক্ষণে জাহাজের সব পাল খুলে দেওয়া হয়েছে। দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে দাঁড় টানছে। ফ্রান্সিসদের জাহাজ পূর্ণবেগে সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে চলল।

(সমাপ্ত)

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor