Friday, April 3, 2026
Homeবাণী ও কথাআঁধার ঘর - সঙ্কৰ্ষণ রায়

আঁধার ঘর – সঙ্কৰ্ষণ রায়

নীল-পর্দা-ঢাকা-জানলাগুলি-ভেদকরে-আসা পরিভুত ছায়াস্নিগ্ধ মৃদু আলোয় শোবার ঘরের ভেতরটা যেন স্বপ্নিল। খাটের পাশের জানলাটির গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছে কুণাল। ছিপছিপে সুঠাম দেহের ঋজুতায় পৌরুষ আছে—আশ্চর্য রকম আত্মনির্ভর দাঁড়াবার ভঙ্গি।

তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে দুহাত দিয়ে তার ডান হাতটি সযত্নে তুলে ধরে কাজরী বলল, ঘুম ভাঙল বুঝি?

কুণালের চোখ দুটি কাজরীর মুখের ওপর এসে পড়ে। কাজরীকে দেখছে, অথচ দেখছে না, অর্থহীন শূন্য দৃষ্টি।

চিনতে পারছে না সে কাজরীকে।

কুণালকে খাটে এনে বসাল কাজরী। তার পর দুহাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে সে ডাকল, কুণাল! আমার কুণাল!

কুণাল শিউরে ওঠে। কাজরীর আলিঙ্গনে ওর যেন দম আটকে আসতে চায়।

কাজরী আকুল স্বরে বলে চলে, চেয়ে দেখ কুণাল, ভাল করে চেয়ে দেখ, এই আমি—তোমার কাজরী।

কুণাল শুনেও যেন শোনে না। কাজরীর আর্ত আকুল আহ্বানে সাড়া দেয় —গত পাঁচ বছর ধরে দেয় নি।

কুণালের নির্বাক মুখের দিকে চেয়ে পাঁচ বছর আগেকার তার অজস্র কথায় মুখর দিনগুলো যেন স্বপ্নের মত মনে হয়। সুদীর্ঘ নীরবতার ব্যবধান অতিক্রম করে কুণালের কথা বলা মুহূর্তগুলোকে যেন খুঁজে পাওয়া যায় না। কুণালের কথা ভাবতে গিয়ে মনে হয় বুঝি আর কারুর কথা ভাবছে সে।

.

মনে পড়ে পূর্বাচল-সঙেঘর পাঠচক্রের সেই সন্ধ্যা। বৈঠকে পৌঁছতে সেদিন দেরি হয়ে গিয়েছিল কাজরীর। সভাকক্ষের দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে—এমন সময় কানে এল, অপরিচিত কণ্ঠে কে যেন সেদিনকার আলোচ্য বিষয় জীবনে নেতিমূলক চিন্তা অস্তিত্বমূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে কতখানি সাহায্য করে, সে সম্বন্ধে বলছে। স্পষ্ট সরল বলবার ভঙ্গী। বক্তব্য যাই হোক, বলবার ভঙ্গিমা শ্রুতিকে আকর্ষণ করে। কথার স্রোতে পৌরুষ যেন স্বতঃস্ফূর্ত। দেখবার মত মানুষের অভাব হয়নি কাজরীর জীবনে, কিন্তু শোনবার মত কথা বলতে পেরেছে কজন? পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে উৎকর্ণ হয়ে শুনল সে।

ঘরে ঢুকেই অবাক হয়ে গিয়েছিল কাজরী। গলার স্বরে যাকে কল্পনা করেছে, চাক্ষুষ যেন অবিকল তাকেই দেখতে পেল। দেহের ঋজুতায় পৌরুষের অভিব্যক্তি, আত্মভোলা সুন্দর মুখ, আকাশের মায়া-জড়ানো টানা টানা চোখ দুটি যেন সুদুর স্বপ্নে সমাহিত।

কাজরী ঘরে ঢুকতেই দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হল। এক মুহূর্তে ওরা পরস্পরকে চিনে নিয়েছিল। কাজরীর স্মৃতিতে সেই প্রথম দৃষ্টির রোমাঞ্চ আজও শিউরে ওঠে। অনেক অন্বেষণের শেষে স্বপ্নসম্ভবাকে আবিষ্কারের বিস্ময় বুঝি ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল কুণালের চোখ দুটিতে।

কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর কুণাল আবার পূর্বকথার জের টেনে বলতে শুরু করে কাজরী লক্ষ্য করল যে তার কথার খেই সে হারিয়ে ফেলেনি।

দীপার পাশে বসে কাজরী তার কানে কানে জিজ্ঞাসা করেছিল, হ্যাঁ রে দীপু, ভদ্রলোকটি কে?

দীপা বলল, কে এক কুণাল সেন। পূর্বাচলের সভ্য হতে চান শুনলুম।

সভার শেষে কাজরীর কাছে এসে কুণাল বলল, নমস্কার কাজরী দেবী। আপনি বোধ হয় আমাকে চিনতে পারেননি?

বিব্রত মুখে কাজরী বলল, না তো।

কুণাল হেসে বলল, আট বছর আগেকার ইন্টারকলেজ ডিবেটে ধারালো তলোয়ারে মত ঝলসে উঠেছিলেন আপনি। বক্তব্য আপনার বেশী ছিল না, কিন্তু মনে স্থায়ী দাগ রাখার মত। সেদিনকার বিতর্কে আমারও সামান্য অংশ ছিল। কিন্তু আপনার সামনে আর সকলের মত আমিও নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছিলুম।

মাথা নীচু করে কাজরী বলল, বড্ড খারাপ আমার স্মরণশক্তি! কিচ্ছু মনে থাকে লো।

কুণাল বলল, আমার স্মরণশক্তিও খুব সুবিধের নয়। কিন্তু—

পরক্ষণে গলার স্বর নামিয়ে সে বলে ফেলল, আপনাকে ভুলতে পারিনি।

নিমেষে আবীর রাঙা হয়ে ওঠে কাজরীর মুখখানা। মাথা নীচু করে ডান হারে অনামিকায় শাড়ির আঁচলের প্রান্ত জড়াতে থাকে সে।

গলার স্বর খাদে রেখে কুণাল বলতে থাকে, সেদিনকার বেস্ট ডিবেটার হিসেবে আপনিই মনোনীত হয়েছিলেন। কবে কথা বলতে শিখেছি স্মরণ নেই, সেদিন আপনার কথা শুনে কিন্তু আবিষ্কার করলুম যে আমরা শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।

কাজরী লজ্জা-জড়ানো মৃদু কণ্ঠে বলল, আপনার কথা শুনে কিন্তু তা মনে হচ্ছে না।

কুণাল হেসে বলে, এ আপনারই দান। সেদিনকার ডিবেটে আমার ব্যর্থতা আপনার সাফল্যের মধ্যে আশ্রয় খুঁজেছিল।

মনে মনে অস্বস্তি বোধ করছিল কাজরী। কথার মোড় ঘোরাবার জন্য সে বলল, সেদিন ডিবেটে কোন কলেজকে রেপ্রেজেন্ট করেছিলেন আপনি?

কুণাল বলল, সেন্ট জেভিয়ার্স। ওই কলেজের ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র ছিলুম তখন। ইংরেজীতে অনার্স ছিল।

ও মা! আমারও তখন ফোর্থ ইয়ার। বেথুনে ইংরেজী অনার্স নিয়েই পড়তুম। কিন্তু য়ুনিভার্সিটিতে গিয়ে তো আপনাকে দেখি নি।

দেখবেন কী করে? বি. এ. পাস করে দিল্লী য়ুনিভার্সিটিতে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলুম।

প্রথম আলাপেই কাজরীর মনের অনাহত তারে ঝঙ্কার উঠেছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই তার মনের আগল আলগা করে দিয়ে অনায়াসে কুণাল তার পথ করে নিল।

তারপর কাজরী একদিন বলল, এ যে অকালবসন্ত কুণাল! বয়স তো আমার। কম হয়নি!

তুমি আমার চিরনবীনা-কাজরীর কানের কাছে মুখ এনে কুণাল বলল : তোমার বসন্তের সময়-অসময় নেই। চির বসন্তের রাণী তুমি।

ইডেন-গার্ডেনের নিভৃত ছায়ানিবিড় সন্ধ্যাগুলির পরিমিত অবকাশটুকু মন্থন করে অমৃত পান করে ওদের দুটি হৃদয়।

কাজরী বলল, দিনে মোটে দুটি ঘণ্টা আমাকে সঙ্গ দাও–আমার বাকি দিনের সমস্তটুকু জুড়ে থাকবার জন্য বুঝি! কাজে মন দিতে পারি নে, থসিস লেখা আর হয় না। এর চেয়ে আরও একটু সময় দাও না। আরও একটু অবসর দাও তোমাকে ভালবাসবার।

নিবিড়তম আলিঙ্গনের মধ্যে কাজরীকে বন্দী করে কুণাল বলল, আমার সমস্ত দিন রাত্রি জুড়ে থাকবে তুমি—এই তো আমি চাই। বল, কবে আমার ঘরে আসবে?

যেদিন তুমি চাও।–কুণালের বুকে মুখ গুঁজে কাজরী বলল।

বিয়ের কয়েক দিন আগে কুণাল বলেছিল, কাজরী, তোমার সাংসারিক বুদ্ধি একেবারেই পাকেনি। আমার সম্বন্ধে রীতিমত খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত ছিল তোমার।

কাজরী নিস্পলক দৃষ্টিতে কুণালের মুখের পানে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল, তোমাকে তো জানি কী আর খোঁজ নেব?

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে কুণাল বলল, তুমি জান, আমার আপনার বলতে কেউ নেই। তোমাকে পেয়ে আমার জীবনের শূন্যতা ভরে গেছে। তোমাকে নিয়ে আজ আমার জীবনের সত্যিকারের শুরু, তার আগেকার সৃষ্টিছাড়া দিনগুলোর কথা ভুলে যেতে চাই। আগে যেন জীবন্থত হয়ে ছিলুম—তোমাকে পেয়ে বেঁচে উঠেছি।

কুণালের গলা জড়িয়ে ধরে কাজরী বলল, থাক থাক, ও সব কথা নয়। আজকের এমনি সুন্দর সন্ধ্যাটিতে অন্য কথা বল।

কথায় তো কুলোবে না। তোমার ডিবেট শুনে মুগ্ধ হয়েছিলুম বটে, কিন্তু কথায় কি মন ভরে?বলে কুণাল কাজরীর তৃষিত ওষ্ঠাধরে গভীর চুম্বন এঁকে দিল।

কাজরীর বাবা-মা বিয়েতে রীতিমত আপত্তি জানিয়েছিলেন। জানা নেই, শোনা নেই—কোথাকার কে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, ভাল করে খোঁজ-খবর না নিয়ে বিয়েতে মত দিতে তারা সম্মত হননি।

কাজরী বলল, খোঁজ নেবার কোন দরকার নেই। ওর ওপর পুলিসের গোয়েন্দাগিরি তোমরা করতে পারবে না।

বিয়ের পর কুণালের ছোট্ট ফ্ল্যাটে কাজরীর নিরাড়ম্বর ঘরকন্না শুরু হল। পরিমিত উপকরণ, কিন্তু পরিমেয় ঐশ্বর্যের স্বাদ পেল কাজরী। দুটি স্বল্পায়ন ঘরে ঘরণী হলেও সে যেন ইন্দ্রলোকের ইন্দ্রাণী। একটি মানুষকে কেন্দ্র করে যেন একটা অনন্ত আনন্দলোক গড়ে ওঠে। হৃদয়মন্থন করা অমৃতসেচনে যে মূর্তিটি গড়ে ওঠে সে যেন কুণালকেও অতিক্রম করে যায়, সে যেন তার প্রেমের সাধনার সৃষ্টি।

অকস্মাৎ নিষ্ঠুর আঘাতে সে মূর্তি ভেঙে গিয়েছিল।

কাজরীর বাবাই খবরটা এনে গিয়েছিলেন। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে নাকি তাঁর ঘুম হচ্ছিল না। গোপনে কুণাল সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়েছিলেন তিনি।

কাজরীকে একদিন তিনি ডেকে পাঠালেন। তার কাছে উদঘাটিত করে দিলেন কুণালের প্রকৃত পরিচয়।

কাজরীর চোখের সামনে রূপেবর্ণে-গন্ধে-ভরা তিলেতিলে গড়ে-ওঠা আনন্দলোক মুহূর্তে বিবর্ণ বিরস হয়ে ওঠে। মনের কানায় কানায় ভরে-ওঠা অমৃত বিষে রূপান্তরিত হল।

কাজরীর বাবা রণদাবাবু ম্যাকনেইল অ্যান্ড বেরীতে খবর নিয়ে জেনেছিলেন যে, কুণাল সেখানে চাকরি করে না। তারপর হঠাৎ কুণালের মায়ের খোঁজ পেলেন; বাগবাজারের এক অখ্যাত গলিতে মাটির দুটো ঘর ভাড়া করে তিনি তার নাবালক ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকেন। কুণালের সামান্য রোজগারই তার একমাত্র অবলম্বন। কোনও এক মাড়োয়ারীর গদিতে কুণাল নাকি কাজ করে, বেতন তিন শো নয়, দেড় শো। বি.এ. পাস করেই সে নাকি চাকরিটি নিয়েছিল। দিল্লী য়ুনিভার্সিটিতে এম.এ. ক্লাসে ভর্তি সে কোন কালেও হয় নি। কাজরীর সঙ্গে কুণালের বিয়ের খবর কুণালের মা বিয়ের প্রায় এক মাস বাদে জানতে পারলেন। এতদিন কুণালের কোন খোঁজ ছিল না। বাড়ি ছেড়ে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়েছিল কুণাল। রণদাবাবুর নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে কুণালের মা তার কাছে এসেছিলেন।

রণদাবাবুর কাছে তিনি তার ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য ভিক্ষা জানিয়ে গেছেন।

রণদাবাবু কাজরীকে বললেন, বুদ্ধি-বিবেচনা তো তোর কম নয় মা, এখন ভেবে দেখ কী করব!

দু চোখে দুঃসহ জ্বালা ছিটিয়ে কাজরী বলল, কে তোমাকে অত খোঁজ খবর নিতে বলেছিল বাবা! তোমাকে আমি বলিনি আমাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি তুমি করো না?

দু চোখ কপালে তুলে রণদাবাবু বললেন, গোয়েন্দাগিরি কাকে বলছিস মা। কুণালের মা নিজেই খোঁজখবর নিয়ে এলেন, তাতেই জানলুম

রণদাবাবুর কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কাজরী।

রোজকার মত সেদিন রাত্রে কুণাল দু ছড়া রজনীগন্ধার মালা নিয়ে ঘরে ফিরেছিল। মালা দুটো টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে দিল কাজরী।

এ কী করলে কাজরি!কুণাল আর্তস্বরে বলে ওঠে।

ঠিকই করেছি। কঠোর স্বরে কাজরী বলল ও আমার গলায় তোমার হারে ফুলের মালার চেয়ে দড়ি দেওয়াও ভাল। তোমার অসংখ্য মিথ্যার মত ও-মালাটিও তো ছল!

স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কুণাল। কাজরীর কথাগুলো যেন গলিত ধাতুর মত তার কানে এসে ঢুকতে থাকে। অতি কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে নিয়ে সে বলল, সব শুনেছ মনে হচ্ছে, কিন্তু কী করে?

তোমার মা আমার বাবার কাছে এসেছিলেন। তা ছাড়া ম্যাকনেইল এ্যান্ড বেরীতে আমার বাবার যাতায়াত আছে। কঠিন জমাটবাঁধা গলায় বলল কাজরী।

পাংশু হয়ে ওঠে কুণালের মুখ। কিন্তু সে কয়েক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে কাজরীর প্রদীপ্ত চোখ দুটির দিকে চেয়ে সে বলল, নিজের দৈন্য ও তুচ্ছতা নিয়ে তোমরা কাছে এগুতে সাহস হয়নি, তাই মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছিলাম। মিথ্যের দুঃসহ গ্লানির বোঝা মাথা পেতে নিয়েছিলুম তোমাকে পাবার জন্যে।

কিন্তু কেন?—দু চোখে অমানুষিক জ্বালা ছিটিয়ে কাজরী বলল। কী করে জানলে তোমার দারিদ্র্য আমি সহ্য করতে পারব না?

কুণাল গাঢ় কণ্ঠে বলল, আমার দেউলে-হওয়া জীবনে দাঁড়াবার জায়গা নেই। সেখানে তোমার যোগ্য ঠাই ছিল না। আমার দৈন্যের ফাঁকে ভালবাসার ফুল ফোঁটাতে পারতুম না। ভারবাহী পশুর পরিচয় নিয়ে কী করে বলতুম তোমায় যে, তোমাকে আমি ভালবাসি?

তাই বলে নিজের বিধবা মা, নাবালক ভাইবোনদের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে এসে নিজের সুখ খুঁজেছ!

কুণাল ম্লান হেসে বলল, নিজের সুখ! সুখই শুধু দেখছ কাজরী! রম সুখের জন্যে রম দুঃখের মূল্য আমি দিয়েছি সে তো তুমি জান না।

খুব হয়েছে, থাম। কাজরীর সুন্দর মুখে নির্দয় কাঠিন্য ফুটে ওঠে : ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলতে খুব পার। মিথ্যে মিথ্যে—যা বলছ সবই মিথ্যে। এক ফোঁটা সত্য নেই তোমার মধ্যে। তোমার ভালবাসাও মিথ্যে।

মড়ার মত সাদা হয়ে ওঠে কুণালের মুখ। তার আহত দৃষ্টির মর্মান্তিক বেদনা কাজরীর নজরেও এল না।

খাটের একটি প্রান্ত দু হাত দিয়ে চেপে ধরে যেন প্রাণপণ আঘাত হজম করবার চেষ্টা করেছিল কুণাল। কোন কথাই বলতে পারেনি।

কাজরীর মনের আগুন আত্মবিস্মৃত চিৎকারে ফেটে পড়ে : আর এক মুহূর্তও তোমার সংস্রব আমি রাখতে চাই না। এই এক মাস তোমার ধ্ব মিথ্যেকে মাথা পেতে নিয়ে নিজেকে তোমার কাছে সঁপে দিয়েছি, এর জন্য নিজেকেও আমি ক্ষমা করব না। আমি চললুম।

না, যেয়ো না।–বলে খপ করে কাজরীর একটি হাত ধরে ফেলল কুণাল। হাতে যেন হাজারটা বিছে কামড়ে দিয়েছে, এমনি মনে হল কাজরীর। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে বলল, ছুঁয়ো না আমাকে। ঠক, জোচ্চোর কোথাকার!

কুণাল শিউরে ওঠে। অস্বাভাবিক সে শিহরণ। অব্যক্ত যন্ত্রণায় তার সুন্দর মুখটা দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। কাজরী দেখল।

অনতিবিলম্বে কুণালের ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেল কাজরী। কুণাল নিষ্প্রাণ পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল, একটি কথাও বলল না।

হিন্দুস্থান রোডে দীপাদের হস্টেল। সেখানে গিয়ে উঠল কাজরী। রণদাবাবু খবর পেয়ে ছুটে এসে বললেন, এ কী, এখানে কেন? বাড়ি চল।

কাজরী বলল, না।

সে কি! নিজের বাড়িতে যাবি নে!

দোহাই তোমার বাবা, কিছুদিন একা থাকতে দাও আমাকে।

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে অনেকেই সহানুভূতি জানাতে এগিয়ে আসে। কিন্তু কাজরী সযত্নে সবাইকে এড়িয়ে চলে। তার প্রতিটি দিন যেন ভারবাহী নৌকার মত স্বেচ্ছামত ভেসে যায়। অনুভূতিশক্তি যেন ভোতা হয়ে গেছে, দুঃখ-ক্লেশবোধও বুঝি নেই।

য়ুনিভার্সিটি-লাইব্রেরির এক কোণে সকাল থেকে সন্ধ্যা বইয়ের স্তুপের মধ্যে প্রাণপণ নিজেকে হারিয়ে ফেলবার চেষ্টা করে সে, তার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা তার থিসিসের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করে সে যেন বিশ্বসংসারকে বিস্মৃত হতে চায়।

কিন্তু পারে না। আত্মশাসনের কঠোরতা সত্ত্বেও অবাধ্য পাগলা ঘোড়ার মত মন তার লাগামছাড়া হয়ে অতি-অবাঞ্ছিত চিন্তাগুলির অলিতে গলিতে ছুটোছুটি করতে থাকে। কঠোর বিস্মৃতির মধ্যে যাকে সে প্রাণপণে তলিয়ে রাখতে চায় মনের কঠিনতম আগল ভেঙ্গে বার বার সে আত্মপ্রকাশ করে। মনের সমস্ত ঘৃণা-জড়ো করা আগুনে ওর স্মৃতির শেষ কণাটিকেও পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতে গিয়ে সে নিজেই দগ্ধ হয়। তার লজ্জাকর স্মৃতি তার সমস্ত সত্তাকে জড়িয়ে থাকে। এ যেন চরম লজ্জাকর রাহুগ্রাস, যার কবল থেকে মুক্তি নেই।

বাক্স ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ একদিন কুণালের একটি ছবি বেরিয়ে পড়ল। ছবিটি হাতে নিয়ে কাজরী প্রথমে ভাবল ছিঁড়ে নিশ্চিহ্ন করে। কিন্তু পরক্ষণে তার নিজের অজ্ঞাতসারে নিজেকে সে যেন ছবির মধ্যে হারিয়ে ফেলল। দেবদুলভ অনিন্দ্য মুখকান্তি, আয়ত উজ্জ্বল চোখ-জোড়ায় কোথাও এক ফোঁটা পাপ নেই। কাজরীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন বেদনায় মুচড়ে ওঠে। ওর সেই বিদায়-মুহূর্তের বেদনাবিদ্ধ করুণ দৃষ্টি মনে পড়ে গেল তার। যত মিথ্যারই আশ্রয় নিক, ওর ভালবাসায় সত্যিই তো কোনও ফাঁকি ছিল না।

কাজরীর মনের পাহাড়প্রমাণ কঠোরতার বরফগুলি গলতে থাকে। তার শুষ্ক চোখের মরুদাহে মেঘের ছায়ার সঞ্চার হয়, অশ্রুধারায় বহু বিনিদ্র প্রহর কেটে যায়।

সে ভেবে পেল না কী করবে। ওকে ফিরিয়ে এনে অনুতপ্ত অশ্রুভরা আত্মসমর্পণের জন্য তার সমস্ত নারীহৃদয় আকুল হয়ে ওঠে, কিন্তু একবার যে মন সংশয়বিমুখ হয়েছে, সে যেন আর সহজ হতে চায় না। অকুণ্ঠ আত্মদান আর বুঝি সম্ভব নয়।

লাইব্রেরি-ঘরের কোণে সন্ধ্যাগুলি বড় নিঃসঙ্গ, বড় বিষণ্ণ মনে হয় কাজরীর। বাইরে ক্রমশ-ঘনিয়ে-আসা অন্ধকার যেন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তার সমস্ত ভবিষ্যৎ জীবনকে যেন এই অতলস্পর্শী অন্ধকারের মধ্যে সে প্রত্যক্ষ করল। পিছনে ফেলে-আসা দিনগুলির স্বপ্ন সৌরভের স্মৃতি লাইব্রেরি-ঘরের বন্ধ বাতাসকে উতলা করে তোলে। কাজরী ভয় পায়। যেন চিরদিনের মত তার জীবন থেকে সমস্ত রঙ-রস নিঃশেষে মুছে গেছে, এক সীমাহীন নৈঃসঙ্গ্য যেন তিলে তিলে তাকে গ্রাস করছে।

অসহ্য লাগে কাজরীর। এক-একদিন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসে, রাস্তায় জনস্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে লক্ষ্যহীনের মত ঘুরে বেড়ায় সে ইতস্ততঃ।

একদিন সে ইডেন গার্ডেনে এল। ছায়াচ্ছন্ন অস্ফুট আলোর কুহক-জড়ানো, কাকর-ছড়ানো পথে দাঁড়িয়ে থাকে সে আচ্ছন্নের মত। এ পথ যেন তার অতীতের করুণ রঙিন অধ্যায়—এপথে চলার অধিকার সে যেন চিরকালের মত হারিয়ে ফেলেছে।

প্যাগোডার অনতিদূরে অন্ধকারের সঙ্গে একাকার বেঞ্চিটার কাছে এসে দাঁড়াল সে দ্বিধাজড়িত পদক্ষেপে। অনেক মুধুর স্মৃতি সৌরভ যেন এখানকার বাতাসকে ভরে রেখেছে।

হঠাৎ যেন সেই বিস্মৃত প্রায় অতীতের স্বপ্নগুলি জীবন্ত হয়ে ওঠে করুণ আবানে।

কাজরী!

কাজরী চমকে ওঠে। কাজরীর পাশে এসে দাঁড়াল স্বপ্ন নয়, কুণাল।

আলোর চেয়ে অন্ধকারই বেশী। তবু কাজরী দেখতে পেল শুষ্ক শীর্ণ চেহারা, সরল-সুন্দর চোখ দুটিতে নিবিড় করুণ কাতরতা।

কিন্তু এ কী হল তার! তার মনের সমস্ত আকুলতা নিমেষে নিথর হয়ে মনটাকে পাথরের মত শক্ত করে তোলে কেন?

রুদ্ধশ্বাসকম্পিত স্বরে কুণাল বলল, তুমি এসেছ কাজরী?

এমনি বেড়াতে এসেছিলাম। —নির্লিপ্ত, উদাসীন কণ্ঠে কাজরী বলল।

কুণালের মাথা নিমেষের জন্য নুয়ে আসে। পরক্ষণে মাথা তুলে সে বলে, শুধু বেড়াতে?

হ্যাঁ, তাই। কাজরী বলল।

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে কুণাল ক্ষীণ আর্তকণ্ঠে বলল, আমার অপরাধের কি ক্ষমা নেই কাজরী?

কাজরীর বুক ফেটে যায়। ইচ্ছে করে সেই মুহূর্তে ওর বুকে আঁপিয়ে পড়ে বলে তুমি আমার জীবনকে পূর্ণ করেছ, তোমার অপরাধ নিয়ে আমি অপরাধী হতে চাই নে।

কিন্তু এ কী নিষ্ঠুর জ্বালা তার চোখে জ্বলে! যন্ত্রণা দেবার জন্যই যেন মরিয়া হয়ে ওঠে সে। বলে, না, নেই। মিথ্যে আমি সইতে পারি নে। মিথ্যের পাহাড় সাজিয়েছ, তুমি কি জানতে না যে মিথ্যে কখনও চাপা থাকে না?

জানতুম।—ওষ্ঠপ্রান্তে ম্লান হাসি ফুটিয়ে কুণাল বলল? কিন্তু সেই সঙ্গে এই বিশ্বাসও ছিল যে তুমি আমাকে ভালবাস। তোমার ভালবাসা তোমাকে ক্ষমা করবার শক্তি দেবে ভেবেছিলুম।

কাজরী চমকে ওঠে।

কুণাল বলে চলে, বুঝতে পারছি, তুমি আমাকে ভালবাসতে পারনি। হয়তো দু দিনের জন্যে নিজেকে ভুলেছিলে।

কুণাল!–কাজরী আর্তনাদ করে ওঠে।

কুণাল স্থির অবিচল, অদ্ভুত দৃষ্টিতে বহুক্ষণ ধরে কাজরীর মুখের দিকে চেয়ে রইল। খানিকক্ষণ বাদে উত্তেজিত স্বরে সে বলে ওঠে, আমার ভালবাসা আমার প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে আগুনের মত জ্বলছে। আমি আর সইতে পারছি নে। প্রতিদান চাই না, শুধু ভালবাসতে চাই।

বলতে বলতে দু হাত বাড়িয়ে হঠাৎ কাজরীকে সে জড়িয়ে ধরে নিষ্ঠুর আলিঙ্গনের মধ্যে নিষ্পিষ্ট করতে করতে বলল, তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না কাজরী। আমার জীবনের আর সব চাওয়া-পাওয়া ফুরিয়েছে, শুধু তোমাকে চাই।

ছেড়ে দাও আমাকে।—অমানুষিক চিৎকার করে ওঠে কাজরী ও ছাড় আমাকে ছাড়।

কাজরীর চিৎকারে আকৃষ্ট হয়ে নিমেষের মধ্যে এক দল তোক ছুটতে ছুটতে এসে উপস্থিত হল।

কাজরীকে ছেড়ে দিল কুণাল। লোকগুলো প্রায় সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে : কী হয়েছে?

কাজরী হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ওই লোকটা আমার গায়ে হাত তুলেছিল।

মুহূর্তের মধ্যে ইডেন গার্ডেনের শান্ত স্তব্ধ সন্ধ্যার বুকে রক্তাক্ত বিভীষিকার সৃষ্টি হল। নিমেষে এতগুলো লোক এতখানি নৃশংস হয়ে উঠল কী করে, কাজরী ভেবে পেল না।

আত্মরক্ষার বিন্দুমাত্রও চেষ্টা করেনি কুণাল। তার ভয়লেশহীন ঋজুতা এক মুহূর্তের জন্যও নুয়ে যায়নি। একটি কথাও সে বলেনি, অস্ফুটতম চিৎকারও তার গলা থেকে বেরিয়ে আসেনি।

ছায়াভরা বিষাদ তার আয়ত চোখ দুটিতে আচ্ছন্ন করে ছিল, কাজরীর মুখের ওপর নিস্পলক নিবদ্ধ সরল সকরুণ অবিকৃত দৃষ্টি শূন্যতার মধ্যে মিলিয়ে যাবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আকাশের তারাগুলির মতই প্রদীপ্ত হয়ে রইল। ওদের দুজনের সোহাগনিবিড় সব কটি সন্ধ্যার নিবিড় মায়া যেন সেই কটি মুহূর্তে তার চোখ দুটিতে ছাপিয়ে উঠেছিল।

কাজরীর পরবর্তী প্রতিটি বিনিদ্র রাত্রির বুকে ওই দৃষ্টির স্বাক্ষর থেকে গেছে।

অ্যাম্বুলেন্স এল। কুণালকে মেডিক্যাল কলেজের এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হল।

কাজরীর বহু উৎকণ্ঠিত দিন ও রাত্রি জীবন-মৃত্যুর নিষ্ঠুর দ্বন্দ্বের সাক্ষী হয়ে রইল। প্রথম একটি মাস জুড়ে শঙ্কা ও সংশয়, তারপর অতি ধীরে ধীরে সেরে উঠতে থাকে কুণাল। কাজরীর অনেক দিনের শঙ্কাভীরু প্রতীক্ষার শেষে কুণালের জ্ঞান ফিরে এল— সে চোখ মেলে তাকাল। তাকাল বটে, কিন্তু কোথায় সেই সুদূর স্বপ্নলীন দৃষ্টি, যাতে স্বর্গের হাতছানি প্রত্যক্ষ করেছিল কাজরী? এ কোন্ অপরিচিত আগন্তুক, যার শূন্য চোখে চাওয়া চির অপরিচিতের রাজ্যে ব্যর্থ অন্বেষণে দিশেহারা? চেতনা হারাবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত প্রদীপ্ত স্বর্গের আলো কোথায় হারিয়ে গেল। কাজরীর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে।

রণদাবাবু বললেন, ওর পাওনা শাস্তিই ও পেয়েছ, তার জন্য দুঃখ করিস নে মা। ওকে অ্যাসাইলামে ভর্তি করার ব্যবস্থা করে তুই ঘরে ফিরে আয়।

কাজরী বলল, সে হয় না বাবা।

কুণালের মায়ের শুকনো চোখে মর্মান্তিক জ্বালা প্রত্যক্ষ করেছিল কাজরী। তিনি বলেছিলেন, সর্বনাশী মেয়ে! আমার সোনার ছেলেকে ভুলিয়ে আমার কাছ থেকে। কেড়ে নিয়েছ, তারপর ওকে প্রাণে মারতে চেয়েছিলে। কিন্তু এ কী করেছ! প্রাণে না মেরে এ কী সাংঘাতিকভাবে মেরে রেখেছ ওকে! আমি মা—আমি বলছি আমি যেমন ভুগছি, তার হাজার গুণ তুমি প্রতি মুহূর্তে ভুগবে।

তাই হোক মা—অবরুদ্ধ কণ্ঠে কাজরী বলেছিল।

কুণাল হাসপাতাল থেকে খালাস পেল। তাকে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে এল কাজরী।

কুণালের নিজের হাতে অতি যত্নে সাজানো ঘরগুলির মধ্যে কোথাও পূর্বস্মৃতির কোন সূত্র খুঁজে পেল না কুণাল। তার পরিচিত বস্তুগুলি তার আচ্ছন্ন চেতনায় লেশমাত্রও সাড়া জাগাল না।

সাইকিয়াট্রিস্ট ডক্তর মুখার্জি কুণালকে পরীক্ষা করে বললেন, রীতিমত শক ট্রিটমেন্ট করতে হবে। বাড়িতে রেখে করতে অনেক হাঙ্গামা—অনেক খরচও। তার চেয়ে–

কাজরী বাধা দিয়ে বলে, যত হাঙ্গামা হোক খরচ হোক, বাড়িতেই ওঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন ডক্টর মুখার্জি। হাসপাতালে বা অ্যাসাইলামে ওঁকে ভর্তি করাতে পারব না আমি।

ডক্টর মুখার্জি বললেন, কেন মা? হাসপাতলে বা অ্যাসাইলামে ভর্তি করাতে হাঙ্গামা তো কিছু নেই।

কাজরী চুপ করে রইল। ডক্টর মুখার্জিকে সে কী করে বোঝাবে যে কুণালের প্রতিটি মুহূর্তকে সে আগলে রাখতে চায় অনুতপ্ত হৃদয়ের ব্যাকুলতা দিয়ে! যে চরম ভুল-বোঝার মধ্যে তার চেতনা ডুবে গেছে, চেতনার উন্মীলন-মুহূর্তে অনুতাপের অশ্রুধারায় তার পরিসমাপ্তি ঘটাবে সে! হাসপাতাল বা অ্যাসাইলামের বিরস রুগ্ন পরিবেশ নয়, সে চায় তার বুকভরা ভালবাসার স্নিগ্ধ ছায়ায় কুণাল জেগে উঠুক।

কাজরীর জেদে বাড়িতেই চিকিৎসার ব্যবস্থা হল। দিনের পর দিন মাসের পর মাস কুণালের বোধশক্তিহীন মস্তিষ্কে চেতনার সঞ্চারের ক্লান্তিকর প্রয়াস চলে।

কিন্তু কোন ফল হয় না। কুণালের শূন্য দৃষ্টিতে এক ফোঁটা বুদ্ধির স্ফুলিঙ্গও জাগে না। মুখে ভাষা ফোটে না। সমস্ত চিকিৎসার বিরুদ্ধে অনড় হয়ে থাকে তার নিঃসাড় নির্বোধ সত্তা।

মুখ ফুটে না বললেও বোঝা যায় যে, ডক্টর মুখার্জি আর তেমন আশান্বিত বোধ। করছেন না।

ইতিমধ্যে কাজরী তার রিসার্চ ছেড়ে একটি মহিলা কলেজে অধ্যাপনার চাকরি নিয়েছে। কলেজে চাকরি ছাড়াও প্রাইভেট টুইশান ও নোটবই লেখার কাজ নিয়ে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করতে হয় তাকে। কুণালের চিকিৎসার খরচ আছে, তার মা ও ভাইবোনদের ভরণপোষণের যাবতীয় দায়িত্ব সে নিয়েছে, কেবলমাত্র অধ্যাপনার পরিমিত আয়ে সমস্ত ব্যয়সঙ্কুলান হওয়া শক্ত।

বাগবাজারের এঁদো গলি থেকে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন পাড়ায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে কুণালের মা ও ভাইবোনদের স্থানান্তরিত করল কাজরী। নিজের ফ্ল্যাটে ওঁদের সে নিয়ে যেতে চেয়েছিল; কিন্তু কুণালের মা আপত্তি করেছিলেন।

রণদাবাবু দীপা মারফত কাজরীকে বলে পাঠালেন যে, কুণালকে অ্যাসাইলামে ভর্তি না করালে কাজরীর সঙ্গে কোন সম্পর্ক তিনি রাখবেন না।

কাজরী বলল, নাই রাখলেন।

শেষ পর্যন্ত রণদাবাবু একটি চিঠি লিখলেন কাজরীকে। তিনি লিখলেন, কলেজে চাকরি ছাড়াও বাড়তি রোজগারের জন্য দু বেলা অতিরিক্ত খাটুনি খেটে তোমার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে শুনি। অবাঞ্ছিত কতকগুলো দায়িত্ব নিয়ে অনর্থক নিজেকে তুমি তিলে তিলে কেন ক্ষয় করছ জানি না। কুণাল ও তার মা-ভাইবোনদের দায়িত্ব নিয়ে তুমি আত্মনিগ্রহ করে যাচ্ছ। পত্রপাঠ তুমি ওদের ছেড়ে চলে এসে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন কর।

কাজরী এ চিঠির কোনও জবাব দেয়নি।

বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে প্রায় সকলেই কাজরীর ওপর বিরক্ত হল। কুণালকে ছেড়ে এসে আবার পুর্বের সহজ নির্ঞ্ঝাট জীবনের মধ্যে ফিরে আসতে পরামর্শ দিল ওরা সবাই। কাজরীর মনে হল, সমস্ত বিশ্বসংসার যেন তার বিরুদ্ধে এসে দাঁড়িয়েছে। মাঝে মাঝে অতল নৈঃসঙ্গবোধের মধ্যে তার মনটা যেন দিশেহারা হয়ে যায়, কুণালের ভাবলেশহীন চোখের দৃষ্টিতে সে যেন কোন আশ্রয়ই খুঁজে পায় না।

এক-একদিন তার মনে হয়, কুণাল বুঝি আর সেরে উঠবে না। ডক্টর মুখার্জির বিধাগ্রস্ত কথাবার্তাগুলি তার মনের মধ্যে আশঙ্কা জাগায়। যে আঁধার কুণালের চেনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সে যেন তার সমস্ত অস্তিত্ববোধকে ছেয়ে ফেলে।

কাজরীর সুমুখে তার সমস্ত ভবিষ্যৎ জুড়ে অবশ্যম্ভাবী আঁধারের ভয়। কুণালের আচ্ছন্ন চেতনায় এক নিমেষের জন্যও যদি একটু আলোর স্ফুলিঙ্গের সঞ্চার হত! একটি মুহূর্তের জন্যও যদি সে তাকে চিনতে পারত! এক নিমেষের জন্য যদি তার আঁধার মনে চাপা-পড়ে-থাকা বিপুল অভিমানকে ঘুচিয়ে দেবার সুযোগ পেত।

মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যায়। যেন নিষ্ফল ভারবহনের ক্লান্তিকর সম্ভাবনা নিয়ে এক-একটি দিনের প্রভাত আসে, সারাদিনের কাজকর্মে একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিগুলি মনে অবসাদ আনে। তার পর সুদীর্ঘ বিনিদ্র রাত্রি-জোড়া নৈঃসঙ্গবোধ। নিদ্রিত কুণালের মুখের দিকে চেয়ে মনের মধ্যে গুমরে ওঠে নিষ্ফল কান্না। কুণালের আধার মন যেন সমস্ত রাত্রিকে জুড়ে থাকে। তার সেই হারিয়ে-যাওয়া চোখের আলো আকাশের তারায় তারায় সুদূর স্বপ্নের স্মৃতির মত ঝিলিক দেয়। কুণালের চোখে আবার তা এসে মিশবে আর বুঝি তার কোন সম্ভাবনা নেই।

ব্যাকুলভাবে কুণালকে জড়িয়ে ধরে কাজরী বলে, সামান্য কয়েকটা মুহূর্তের জন্যও আমাকে দয়া করতে পার না? চিরদিনের মত আমাকে অপরাধী করে রাখবে? একটিবারও জানতে চাও না কী কঠিন প্রায়শ্চিত্ত আমি করে যাচ্ছি?

ডক্টর মুখার্জি বললেন, সেরে উঠতে বেশ কিছু সময় লাগবে মনে হচ্ছে।

কাজরী বলল, প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে ডক্টর মুখার্জি। আর কতদিন?

আর কতদিন!—ডক্টর মুখার্জি যেন অস্বস্তি বোধ করেন? সে তো আমি বলতে পারি নে মা।

কাজরী আকুল হয়ে বলে, ডক্টর মুখার্জি, পুরোপুরি ও সেরে উঠবে—এ যেন আর আশা করতে পারছি না। এখন ভাবছি, সামান্য কিছুক্ষণের জন্যও যদি ওর চৈতন্য হত!

তা কেন মা! কুণাল পুরোপুরিই সেরে উঠবে—ডক্টর মুখার্জি ঈষৎ ইতস্ততঃ করে বললেন।

কাজরী সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তার মুখের পানে তাকাল।

রণদাবাবু দীপাকে বললেন, আমি ভুলে যেতে চাই যে আমার মেয়ে বেঁচে আছে।

বান্ধবীদের মধ্যে একমাত্র দীপাই এসে মাঝে মাঝে খোঁজ নেয় কাজরীর।

দীপা একদিন বলল, বারো মাস—তিন শো পঁয়ষট্টি দিন একটা পাগলকে নিয়ে আছিস, অথচ সজ্ঞানে যারা তোর হিতাকাঙ্ক্ষী তাদের সংস্রব ছেড়েছিস! তোর জন্যে দুঃখ হয় কাজরী।

কাকে পাগল বলছিস তুই!—কাজরী প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।

দীপা বলে, কুণালের রোগটাকে তো অস্বীকার করতে পারিস না। পাগলকে পাগল বললে দোষ কী হয় ভেবে পাই নে।

কাজরী বেদনার্ত চোখে দীপার দিকে চেয়ে থাকে, কিছু বলে না।

দীপা বলল, রোগের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়। বাড়িতে রেখে কুণালের চিকিৎসার যত ভাল ব্যবস্থা কর না কেন, কোন ফল হবে না। তোর এই অহেতুক অন্ধ মমতা সব রকম চিকিৎসার প্রতিবন্ধক। ডক্টর মুখার্জির সঙ্গে আজ আমার দেখা হয়েছিল, তিনি বললেন, কুণালকে সারিয়ে তুলতে হলে প্রথমেই দরকার ওকে তোর কাছ থেকে সরিয়ে আনা।

সঙ্গে সঙ্গে কাজরীর বহু বিনিদ্র রাত্রির কালিমালিপ্ত চোখে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। রুদ্ধশ্বাস-চাপা উত্তেজিত স্বরে সে বলে ওঠে, ডক্টর মুখার্জির সঙ্গে তুই দেখা করতে গিয়েছিলি? কে বলেছিল তোকে যেতে?

দীপা হতভম্ব। আমতা আমতা করে বলে, কে আবার বলবে! কুণালের অবস্থাটা উনিই ভাল বলতে পারবেন বলে ওঁর কাছ গিয়েছিলুম।

কাজরী চিৎকার করে ওঠে, তোদের কী মতলব আমি বুঝি না ভেবেছিস! ওকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নেবার জন্যে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে চলেছিস। তাই ডক্টর মুখার্জির কাছে গিয়েছিলি।

দীপা নির্বাক, একটি কথাও বলে না।

চলে যা তুই, আর আসিস না। তোর সংস্রব আর আমি রাখতে চাই না।

কাজরীর প্রায়-চেঁচিয়ে বলা কথাগুলোর পরতে পরতে কান্নার উচ্ছ্বাস।

দীপা চলে গেল।

কাজরীর খোঁজখবর নিতে সে আর আসে ন। কুণালের শূন্য চোখের দিকে চেয়ে কাজরীর বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে। মনে হয়, কেবলমাত্র তার উপস্থিতি দিয়ে দীপা তার শূন্যতাবোধের যে বিপুল গহ্বরটার অনেকখানি আড়াল করে রেখেছিল তা যেন পুরোপুরি প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আঁধারলীন শূন্যতার গ্রাস তিলে তিলে তাকে আকর্ষণ করছে, ওখানে তলিয়ে যেতে আর বুঝি তার দেরি নেই।

কিন্তু এ তো সে চায়নি!

কুণালকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের মধ্যে ফিরে পেতে চেয়েছে, আঁধার নয়, আলোর দিকে যেতে সে চায়। কিন্তু দিনের পর দিন যাচ্ছে–সুমুখে নৈরাশ্য ছাড়া কিছু তো সে দেখতে পাচ্ছে না!

নিজের অবস্থার কথা ভেবে শিউরে ওঠে কাজরী। তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে তার দেহ-মন–কুণালের মৃত প্রায় চেতনার দিবারাত্রির সান্নিধ্য তার সমস্ত সত্তাকে যেন হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে।

অথচ সে তো বাঁচতে চায়।

সে দিন গভীর রাত্রে বিছানা থেকে উঠে এসে লেখবার টেবিলে আলো জ্বালিয়ে ডক্টর মুখার্জিকে চিঠি লিখতে বসল কাজরী।

ডক্টর মুখার্জিকে সে লিখল, কুণালকে উপযুক্ত ক্লিনিকে ভর্তি করবার ব্যবস্থা তিনি যেন করে দেন।

চিঠি লেখা শেষ হতেই মৃদু আহ্বান কাজরীর কানে এল।

কাজরী!

সুদীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সে কান পেতে আছে এ আহ্বানের জন্য। ভুল শোনেনি তো সে?

কাজরী!

আবার স্পষ্ট শুনতে পেল কাজরী। ভুল শোনেনি, কুণালই ডাকছে তাকে।

কাজরীর বুকের রক্তস্রোত উদ্দাম হয়ে ওঠে।

টেবিল-ল্যাম্পের স্বল্পায়তন আলোকবৃত্তের বাইরে গাঢ় ছায়ার মধ্যে বিছানার আদলটুকুই শুধু চোখে পড়ে। কুণালকে সে দেখতে পাচ্ছিল না।

তাড়াতাড়ি খাটের কাছে এগিয়ে এল কাজরী। তার হাত পা কাঁপছে। কোনমতে বেড-সুইচটা টিপে কুণালের শিয়রে এসে দাঁড়াল সে।

নীলাভ আলোয় কুণালের উন্মীলিত চোখ দুটি দেখতে পেল কাজরী। পাঁচ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আলো প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে তার চোখের তারায়।

কুণালের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে কাজরী ব্যাকুল স্বরে বলে ওঠে, এই যে আমি, তোমার কাজরী। চেয়ে দেখ কুণাল!

কাজরীর চোখে চোখ রাখল কুণাল। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপর ধীরে ধীরে আবার তার চোখ দুটি থেকে সব আলো নিবে গেল। আবার অর্থহীন শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে।

দু হাত দিয়ে ব্যাকুলভাবে কুণালকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কাজরী। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে বলে, আমাকে চিনে যাও কুণাল। আর কিছু চাই নে—শুধু আমাকে চিনে যাও।

কুণাল ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। কাজরীর বুকফাটা কান্না তার অসাড় চেনায় শুধু নিষ্ফল মাথা কোটে।

বেড সুইচ নিবিয়ে লেখবার টেবিলে আবার এল কাজরী। ডক্টর মুখার্জিকে লেখা চিঠিখানা তুলে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দিল সে।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi