Friday, April 3, 2026
Homeবাণী ও কথাসম্পর্ক - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সম্পর্ক – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সম্পর্ক – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

লাচ্চু আমেরিকায় গিয়েছিল জাহাজে। তখন তার কুড়ি বছর বয়স। ডাকাবুকো, উচ্ছৃঙ্খল এবং বন্ধনহীন। বাপের সঙ্গে বনিবনা ছিল না, কারণ তার বাবা ননীগোপাল রাগি মানুষ। ছেলেকে শাসন করাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। লাচ্চুকে মাঝে-মাঝে বদমায়েশির জন্য এমন মার দিতেন যে পরে ডাক্তার ডাকতে হত। কতবার যে বাবার মার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে লাচ্চু তার হিসেব নেই।

বিশ বছর পেরোয়নি তখনও, লাচ্চু তার এক বন্ধুর দাদাকে ধরে মালের জাহাজে খালাসির চাকরি পেল। মতলব ছিল জাহাজ আমেরিকায় যদি কখনও যায় তখন লাচ্চু পালাবে।

সুযোগ এল প্রায় সাত মাস বাদে। সাত মাসে জাহাজে সি সিকনেস, আমাশা এবং দুজন সমকামী খালাসির অত্যাচার তাকে সইতে হয়েছিল। তবে তার বাড়ির জন্য মন কেমন করত না। বরং একটা জ্বালা ছিল, একটা প্রতিহিংসাপরায়ণতাও।

জাহাজটা ছিল স্প্যানিশ। হামবুর্গ থেকে মাল নিয়ে সাত মাসের মাথায় নিউইয়র্কে পৌঁছোল। পৌঁছনোর কথা ছিল না। আটলান্টিকে প্রবল ঝড়ে জাহাজ যায়-যায় হয়েছিল। তিন দিন টানা ঝড়। লাচ্চু বাঁচার আশাই করেনি। যখন নিউইয়র্কে পৌঁছল তখন মনে হল, বেঁচে যখন আছি তখন একটা কিছু করতেই হবে।

ভয়ডর জাহাজেই কেটে গিয়েছিল লাচ্ছ্বর। অচেনা, অজানা জায়গা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, বিপদের আশঙ্কা, ধরা পড়ার সম্ভাবনা এসব নিয়ে সে বিশেষ মাথা ঘামাল না। তবে হট করে না পালিয়ে সে দিনতিনেক অপেক্ষা করল। তারপর একদিন ডকে নেমে সুযোগ বুঝে ভিড়ে মিশে গেল।

দেশটা কঠিন। চট করে যে এখানে কিছু করে বা হয়ে ওঠা যাবে না এটা সে জানত। আর জানত কোনও গির্জাটির্জা বা মিশনারির আশ্রয় নিলে বেঁচে যাবে। প্রথম দিনদুয়েক মাইনের টাকা ভেঙে খেল আর বড়-বড় ফ্লাই ওভারের নীচে শুয়ে রাত কাটাল। ভাগ্য ভালো যে তখন শীতকাল ছিল না।

নিউইয়র্ক শহরে পায়ে হেঁটে ঘুরতে–ঘুরতে সে একদিন বাস্তবিক ভাগ্যক্রমে একটা হোম ফর দি ডেস্টিটিউটস পেয়ে যায়। তারা যে তাকে দু-হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিল তা নয়, তবে সে কাজকর্ম করে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় ঠাঁই হয়ে গেল।

কাজকর্ম মেলাই ছিল। লাচ্চু খাটত খুব। মাসখানেক পরে ইতালিয়ান একটা দোকানে চাকরি হল তার। থাকত নিউইয়র্কের কুখ্যাত বস্তিতে, যেখানে হেন পাপ নেই যা হয় না। এখানেই সে শেখে, মার্কিনিরা যেসব জিনিস ফেলে দেয় সেগুলো কুড়িয়ে এনে কিছু লোকের জীবিকা নির্বাহ হয়।

লাছুর মাথা পরিষ্কার। লেখাপড়ায় মাথাটা না খুললেও তার প্রিয় হল যন্ত্রপাতি, কলকবজা ইত্যাদি। মাঝে-মাঝে সে জাঙ্ক থেকে টিভি বা টু–ইন–ওয়ান কুড়িয়ে এনে খুলে ফেলে ভিতরকার মেকানিজম বুঝবার চেষ্টা করত। দিনকতক চেষ্টার পর সে একটা টিভি সেট সারিয়ে ফেলল। মেরামত করল একটা সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর এবং একটা বাতিল ক্যামেরা। আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল তার।

আমেরিকানরা বেশির ভাগ জিনিসই খারাপ হলে ফেলে দিয়ে নতুন একটা কেনে। এই যে গারবেজ করার প্রবণতা এর কারণ অনুধাবন করে লাচ্চু বুঝল, জিনিস খারাপ হলে তা সারাতে যে মজুরি লাগে তা ভয়াবহ। তার চেয়ে নতুন কেনাই লাভজনক।

লাচ্চু একটা হোম সার্ভিস খোলার চেষ্টা করতে লাগল। টিভি বা ছোটখাটো ইলেকট্রনিক জিনিস খারাপ হলেই ফেলে না দিয়ে অল্প পয়সায় সারিয়ে নিতে আমেরিকানদের কেমন লাগবে? সব আমেরিকানই তো আর বড়লোক নয়!

কষ্টে কিছু টাকা জমিয়ে এবং ফাঁকে-ফাঁকে সারাইয়ের কাজ লিখে লাচ্চু তৈরি হতে লাগল। সে আলাপি এবং মিশুকে ছেলে। টকাটক বেশ কিছু জানপয়ান হয়ে গেল তার। যন্ত্র সারানোনার ডাকও আসতে লাগল ঘনঘন। সেইসঙ্গে ডলার।

দু-বছর বাদে জেনারেল অ্যামনেস্টি ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে আমেরিকান নাগরিক হয়ে গেল। বাঁচোয়া। ব্রংকস বরোতে একটা ঘিঞ্জি পাড়ায় শেয়ারে একটা দোকানঘর করল সে। সেখানে পুরোনো যত ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে পার্টর্স খুলে নিয়ে গুছিয়ে রাখত সে। পরে অন্য সব মেশিনে সেগুলো লাগাত।

মজা হল আমেরিকানরা সব জিনিসই খারাপ হলে ফেলে দিতে চায় না। কোনও জিনিসের সঙ্গে হয়তো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কাজেই লাচ্চু যখন স্থানীয় একটা দৈনিক পত্রে বিজ্ঞাপন দিল তখন তার দোকানে বেশ খদ্দের আসতে লাগল, এবং ডলারও।

নৰ্মা নামে একটি মার্কিন মেয়েকে সে বিয়ে করে তেইশ বছর বয়সে। কিন্তু মেয়েটা বড্ড উড়নচণ্ডী। বিয়েটা আপসে ভেঙে গেল এক বছর বাদে। দ্বিতীয় বিয়েটা সে করল পঁচিশ বছর বয়সে। ছাব্বিশে সেটাও ভাঙল। পরের বিয়েটা সে করল একটা বাঙালি মেয়েকে। দেখা গেল, মেয়েটা পাগল। বাপ-মা পাগলামির কথা চেপে রেখে বিয়ে দিয়েছিল যখন মেয়েটার কিছুদিনের জন্য স্বাভাবিকত্ব ফিরে এসেছিল। সাতাশ বছর বয়সের মধ্যেই তিন–তিনটে বিয়ে ও বিচ্ছেদ থেকে লাচ্ছ্বর ধারণা হল, বিয়ে তার কপালে নেই, ও তার সইবে না। সে টাকা রোজগারে মন দিল।

ঊনত্রিশ বছর বয়সে লাচ্চু এখন মাঝারি ধনী। তার তিনটে দোকান বেশ রমরম করে চলে।

লাছুর সঙ্গে একদিন দেখা হল পুরোনো এক বন্ধুর। সে আমেরিকায় পড়তে এসেছিল। লাছুর সঙ্গে বাড়ির কোনও যোগাযোগই ছিল না। শমিতের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ম্যানহাটনের রাস্তায়। অনেক কথার পর অবশেষে বন্ধু শমিত বলল , বাড়ির কোনও খবর রাখিস না?

না। কেন বল তো!

তোর বাবা চার বছর আগে মারা গেছেন।

সে কী!

তুই পালিয়ে যাওয়ায় শক পেয়েছিলেন তো। তাই—

লাচ্চুর মনটা তার অত্যাচারী বাবার শোকে বেশ কাতর হয়ে পড়ল। চোখে জল এল। ঠিক কথা যে, ছেলেবেলা থেকে বাবার আদর বা প্রশয় সে পায়নি। রাগি বাবা কারণে–অকারণে বেধড়ক মারত। এও সত্যি বাবার হাত থেকে বাঁচবার জন্যই সে বাড়ি থেকে পালায়। বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কের পূর্ণচ্ছেদও সেইখানেই ঘটে যায়। তবু আজ হঠাৎ মৃত্যুসংবাদটা পেয়ে মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল তারও।

সে বলল , মা কি বেঁচে আছে?

শমিত একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল , আছে।

কিন্তু শমিতের মুখের ভাব অন্য কথা বলছে। লাচ্চু বলল , তুই একটা কিছু চাপছিস। খুলে বল।

তুই পালিয়ে আসার পর তোর মা পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি–বাড়ি ঘুরে তোকে খুঁজত। সারা রাত সদর দরজা খুলে বসে থাকত। তারপর একদিন পিছনের পুকুরে ভোরবেলা তার লাশ পাওয়া যায়।

লাচ্চু অস্থির হল না। কিন্তু কাঁদল। বাবার মৃত্যু নয়, মায়ের মৃত্যুর জন্য সে সরাসরি দায়ী। বলল , বাবা কি আবার বিয়ে করেছিল?

হ্যাঁ। তো সেই মা বেঁচে আছে।

আমার ছোট বোনটা! তার খবর কী?

বিয়ে হয়ে গেছে।

তারা কি জানে যে, আমি এখানে আছি?

শমিত মাথা নাড়ল, না। তোর খবর কেউই তো জানে না। সবাই ধরেই নিয়েছে, হয় তুই বেঁচে নেই, না হলে সাধু হয়ে গেছিস। কিন্তু তুই তো দেখছি আমেরিকায় বেশ জাঁকিয়ে বসেছিস।

অনেক লড়াই করতে হয়েছে, ধৈর্য ধরতে হয়েছে।

শমিত একটু হতাশার গলায় বলল , আমি তো অনেক লেখাপড়া শিখে এসেছি, এখানেও পি এইচ ডি করলাম, কিন্তু আমার যা সাকসেস বা টাকা হয়েছে বা হবে তুই তার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে আছিস।

কুইনসে একটা বাড়ি কিনেছে লাচ্চু। বেশ বড় বাড়ি। দু-খানা দামি গাড়ি আছে তার। শমিতকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে একদিন আটকে রাখল সে।

শমিত বলল , এত বড় বাড়িতে একা থাকিস, বিয়ে করিসনি কেন?

করেছি। তিনবার। তারপর নাক–কান মলেছি, আর বিয়ে নয়।

কেন রে? বিয়ে কি টিকল না?

প্রথম দুটো বউ ছিল আমেরিকান। প্রথমটা তো একেবারে দুশ্চরিত্র। দ্বিতীয়টার ছিল টাকার খাঁই। বছরখানেকের মধ্যেই টাকাপয়সা একেবারে দুয়ে নিয়েছে। তিন নম্বরটা পাগল।

বলিস কী! তোর কথা শুনে তো বিয়ের কথা ভাবতেই ভয় করছে।

এ দেশেবিয়ে করিস না। দেশে গিয়ে করিস।

আজকাল বাঙালিরাও কি আর ভালো আছে?

তা হয়তো নেই, কিন্তু তারতম্য হয়তো আছে। তবে আমার মনে হয়, বিয়ে জিনিসটাই বাজে।

তুই তা হলে সিঙ্গল থাকবি?

অবশ্যই।

তোর গার্ল ফ্রেন্ড আছে?

না, তাও নেই। আমার মাথায় কাজের চিন্তা এত প্রবল যে সেক্স নিয়ে ভাবিই না।

তা হলে তোর রাত কাটে কী করে?

লাচ্চু হাসল, মোষের মতো ঘুমোই। শোন, আমার একটা বউয়ের দরকার ছিল বটে, কিন্তু বেড পার্টনার হিসেবে নয়। বউ হতে পারত আমার ব্যাবসার মস্ত সহায়। আমার বিশ্বাসযোগ্য একজন বন্ধু। নইলে একটা মেয়েমানুষকে তার শরীরের জন্য পুষব এই আইডিয়াটাই আমার ভালো লাগে না।

যাই হোক, তোর একজন পার্টনার কিন্তু দরকার।

সে পরে ভাবা যাবে। আমার কাছে দু-দিন থাক তা হলেই বুঝবি আমার দিন কেমন উড়ে যায়। রোমান্সের ছিটেফোঁটাও নেই। তবে টাকা আছে।

তুই কি অনেক টাকা করেছিস?

এখানে অনেক মানেও তো যথেষ্ট নয়। নিউইয়র্কে চারদিকে চেয়ে টাকার কী খেলাটাই না দেখতে পাই। না রে, আমেরিকার তুলনায় আমার কিছুই সম্বল নয়। তবে চলে যায়।

লাচ্চু নিজে কথা বলতে-বলতে বারবার মা-বাবার কথা ভাবছিল।

শমিত বলল , তুই আজ খুব আনমনা।

লাচ্চু মাথা নেড়ে বলল , হ্যাঁ। অনেকদিন ডলার ছাড়া আর কিছুই চিন্তাই করিনি। এখানে এসে কষ্ট আর লড়াই কম করতে হয়নি। মা-বাবা বা বোনটার কথা মাঝে-মাঝে মনে পড়ত বটে কিন্তু টাকা ছিল না। আজ হঠাৎ তোর মুখে মা আর বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনে হঠাৎ কেমন রুটলেস লাগছে। বাংলায় বোধহয় ছিন্নমূল বলে।

শমিত তিন নম্বর দুঃসংবাদটা দিল বিদায় নেওয়ার আগে। লাচ্চু তাকে বলেছিল, দেখ, দুনিয়ায় তো আমার আপনজন বলতে এখন শুধু বোনটা। তার ঠিকানা জানিস?

শমিত একটু দ্বিধায় পড়ল। তারপর বলল , দেখ, তোকে পরপর খারাপ খবর দিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। তবু দিচ্ছি। তার কারণ, লক্ষ করলাম তুই বেশ শক্ত মানুষ। শাক–সংবাদগুলো তোকে কাহিল করেনি তেমন।

লাচ্চু উদ্বেগের সঙ্গে বলে, তার মানে কী? সাবিত্রী কি বেঁচে নেই?

না। বিয়ের এক বছর বাদে বাচ্চা হতে গিয়ে ইনফেকশানে মারা যায়।

লাচ্চু মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বলল , মা-বাবার তবু বয়স হয়েছিল, কিন্তু সাবুটার তো অল্প বয়স। হ্যাঁ রে, তিন–তিনজন মরে গেল? এরকমও হয় নাকি?

ব্যাড লাক রে ভাই, কী করবি?

তা হলে কি আমার আর কেউ নেই?

ভারচুয়ালি না। তবে যদি সত্মাকে ধরিস তা হলে বলতে হবে, আছে।

দুর! সৎ মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কীসের?

শমিত কথাটা স্বীকার করল। বলল , হ্যাঁ, সত্মায়েদের সম্পর্কে আমরা ভালো কথা কখনও শুনিনি বিশেষ। তবে এই ভদ্রমহিলাকে আমি দেখেছি। খুবই রোগভোগা মানুষ। দুটো বাচ্চা, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। তোর বাবা তো তোর বোনের বিয়ে দিতে গিয়েই ফতুর হয়ে যান, ফলে এদের জন্য বিশেষ কিছু রেখে যাননি। ভদ্রমহিলা খুব সামান্য একটা আয়া বা ওই ধরনের কাজ করেন। খুব কষ্ট।

লাচ্চুর ভিতরে কথাগুলো ঢুকলই না। তার চোখে আজ বারবার জল আসছিল। অতীতটা একেবারেই মুছে গেল। শিকড়ের আর কোনও বন্ধন নেই। তিনটে মুখ বারবার ঘুরেফিরে স্মৃতিতে ভেসে উঠছিল। মা, বাবা, সাবি।

এক উইক এন্ডের শেষ রবিবার বিকেলে শমিত চলে যাওয়ার পর একা হল লাচ্চু। একা হয়েই বুঝতে পারল, কতখানি একা সে। চারদিকটা যেন খাঁখাঁ করছে। ধূধূ করছে। কুড়ি বছর বয়সে যখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল তখন লাচ্চুর পিছুটান ছিল না। সামনে ছিল শুধু অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ, বুকে ছিল বেপরোয়া সাহস এবং আত্মনির্ভরতা। উনত্রিশ বছর বয়সে এখন লাঞ্জু আর তা নেই। আমেরিকার কাজ পাগল সমাজে এমনিতেই মানুষ একটু একা। তার ওপর এখানে পারিবারিক বন্ধন জিনিসটা তেমন দৃঢ় নয়, তাই মানুষ আরও একা। কাজ নিয়ে থাকে, তাই ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। লাচ্চু আমেরিকান নাগরিক বটে, কিন্তু চরিত্রে তা নয়। ফলে তার মধ্যে একটা হঠাৎ অসহায় একাকিত্ব আজ বারবার গুমরে উঠছে। কুইনসের এই মাঝারি বাড়িটা যেন বড্ড ছমছম করছে। লাচ্চু রাতে খেল না। অনেক রাত অবধি কাঁদল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

শেষ রাতে একটু ঘুমোল। সকালে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিত্যদিনের কাজে। কাজ, কাজ ছাড়া এই একাকিত্বকে ভুলে থাকবার কিছু নেই। সে মেরামতির কারবার একজন গুজরাটিকে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন সে কম্পিউটারের ব্যাবসা করে। বেশিরভাগই কন্ট্রাক্ট মেইনটেনেন্স। তাতে তার প্রচুর ডলার আয় হয়।

লাচ্চুর সংসার নেই, মদ খায় না, ফুর্তি করে না, বেড়াতে ভালোবাসে না। সুতরাং তার ডলার। শুধু ব্যাঙ্কে জমা হয়। কিছু খাটে শেয়ার বাজারে। এই অর্থাগমটা তার ক’দিন হল অর্থহীন লাগছে।

মাসখানেক বাদে সে শমিতকে ফোন করল। এ-কথা সে-কথার পর হঠাৎ জিগ্যেস করল, আচ্ছা সেই ভদ্রমহিলার নাম কী বল তো!

কোন ভদ্রমহিলা?

আমার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের কথা বলছি।

কেন বল তো?

ভাবছি, ভদ্রমহিলা কষ্টে আছেন, কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।

শমিত উৎসাহের গলায় বলল , ভালোই হবে রে, এটা বেশ ভালো একটা ডিসিশন নিয়েছিস। তবে একটা কথা বলে রাখি তোকে, উনি কিন্তু খুব পারসোনালিটিওলা মহিলা। সহজে কারও কাছে হাত পাতেন না। তোর বাবা মারা যাওয়ার পর অনেকেই ওকে পরামর্শ দিয়েছিল কোনও এমএলএ-র কাছে যেতে। উনি যাননি। একটা পুজো কমিটি থেকে কিছু সাহায্য দেওয়া হয়েছিল, তাও নেননি। আত্মসম্মানবোধ খুব বেশি। যদি টাকা পয়সা পাঠাস তাহলে একটা নরম করে চিঠি দিস।

যদি রিফিউস করে তাহলে?

সম্ভাবনা আছে।

তা হলে থাক বাবা, পাঠানোর দরকার নেই।

তবু নামটা জেনে রাখ। ওঁর নাম সবিতা রায়।

লাচ্চু প্যাডে নামটা নোট করে নিল বটে, কিন্তু সেটা যে কোনও কাজে লাগবে না তাও মনে হল তার।

লাচ্চুর হাড়ভাঙা পরিশ্রম এবং ছোটাছুটির মধ্যে আবার হারিয়ে গেল সবিতা রায় এবং তার দুই বাচ্চার কথা। মনে রাখার কথাও নয় লাচ্চুর। নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে লাচ্ছ্বর মাখামাখি না থাকলেও সম্পর্ক আছে। বাঙালিদের অনুষ্ঠানে চাঁদা দেয়, বাংলা নাটক দেখতে যায়, বাঙালি গায়ক–গায়িকা এলে টিকিট কেটে গান শুনে আসে, দুর্গাপুজো বা বঙ্গ সম্মেলনেও যায় ফি বছরই। তবে এসব বাঙালিয়ানার ব্যারাম তার কাছে গভীর কিছু নয়। কুইনসে উইক এন্ডের এক দুর্গাপুজোয় হাজির ছিল লাচ্চু। বাঙালিদের বেশ সুন্দর একটা জমায়েত। খিচুড়ি রান্না হচ্ছে, চমৎকার নিরামিষ তরকারির গন্ধ ছড়াচ্ছে বাতাসে। পেপার মাসের তৈরি দুর্গামূর্তির সামনে রেকাবিতে ডলার প্রণামী জমা হচ্ছে। মন্ত্রপাঠ, অঞ্জলি, কোনওটাই বাদ নেই। সেই জমায়েতে এক বৃদ্ধ এসে তাকে ধরলেন, তুমি লাচ্চু না?

লাচ্চু চিনল। তাদের পাড়ার মোহিতবাবু। ছেলে আমেরিকায় এসেছে বছরদুয়েক। সেই সুবাদেই এসেছেন। এ-কথা সে-কথার পর বললেন, তুমি যে বেঁচে আছ এটাই তো জানা ছিল না আমাদের। তোমার পুরো ফ্যামিলিটাই তো শেষ। তবে সবিতা আছে, সে বড় ভালো মেয়ে।

লাচ্চু বলল , আমি তো ওঁকে চিনি না।

না চেনারই কথা।

ওঁরা খুব কষ্টে আছেন?

কষ্ট বলে কষ্ট? তোমার বাবা তো কিছু রেখে যাননি। সবিতারও বাপের বাড়ি বলতে কিছু নেই, এক মামার কাছে মানুষ। খুবই কষ্ট ওদের। বাড়িটা আছে বলে রক্ষে। নইলে ভেসে যেত।

লাচ্চু আবার ভাবনায় পড়ল। তার অনেক টাকা। যদি বিয়ে না করে বা পুষ্যি না নেয়, তা হলে তার মৃত্যুর পর টাকাপয়সার গতি কী হবে কে জানে! না, সবিতা রায় বা তার ছেলেমেয়ে তার আপনজন নয়, তবু ক্ষীণ একটা সম্পর্ক আছে বোধ হয়।

অনেক ভাবল সে। তারপর তার পার্টনারকে ব্যাবসা চালানোর ভার দিয়ে সে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে ভারতমুখী প্লেনের টিকিট কেটে উড়ে গেল।

২.

সবিতার রোগভোগা শরীরের মধ্যে প্রকট মাত্র দুটি চোখ। লোকে বলে সবিতার চোখ নাকি জ্বলে। সবিতা অবশ্য সে-খবর রাখে না। তার জীবনটা কেটেছে আদ্যন্ত ঘৃণা ও আক্রোশের এক বলয়ের মধ্যে। শিশুকালে পিতৃ–মাতৃহীন সবিতা ছিল মামার গলগ্রহ। আক্ষরিক অর্থেই তাকে লাথি–ঝাঁটা খেয়ে বড় হতে হয়েছে। সে ছিল কার্যত মামার বাড়ির বিনা পয়সার ঝি। খাণ্ডার মামি দুনিয়ার যত ঝাল ঝাড়ত তারই ওপর। মামাও যে ভালো কিছু ছিল তা নয়। সবিতাকে ক্লাস ফোর অবধি পড়িয়েছিল মামা। তার পর স্কুল থেকে ছাড়িয়ে পুরোপুরি গৃহকর্মে লাগিয়ে দেয়। সবিতার প্রাণের জোর ছিল বটে। নইলে একবার কলেরা, একবার টাইফয়েড এবং সবশেষে প্লুরিসি হয়েও সে বেঁচে যায়। প্রতিবারই তাকে পাঠানো হয়েছিল অস্বাস্থ্যকর হাসপাতালের জেনারেল বেড–এ। টি বি হয়েছিল আঠার বছর বয়সে। মামা বা মামি কেউই তাকে ঘরে ঠাঁই দিতে রাজি ছিলেন না আর। সবিতা কার্যত আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। শেষে যাদবপুরের টি বি হাসপাতালে ঠাঁই হয়। এবং আশ্চর্যের বিষয়, নিছক প্রাণশক্তির জোরেই সে আরোগ্য লাভ করে। মামা–মামি সন্দিহান থেকেও তাকে ফের ঘরে ঠাঁই দেন বটে, কিন্তু খুশি হয়ে নয়। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তার বিয়ের জোগাড় হল। পাত্রর বয়স ছাপ্পান্ন, বিপত্নীক।

বিয়ের আনন্দ কিছু ছিল না, শুধু স্থান বদলের স্বস্তিটা আশা করেছিল সবিতা। এই বয়স্ক পুরুষের কাছ থেকে প্রত্যাশাই বা কী ছিল তার? লোকটাকে ভালোবাসার কোনও চেষ্টা সে করেনি, সম্ভবও ছিল না। তবে লোকটা দুঃখী মানুষ। ছেলে নিরুদ্দেশ, বউ মারা গেছে, ঘরে

বয়সের মেয়ে। এই মেয়ে সাবিত্রীর বিয়ে দিতে হবে বলেই লোকটা সবিতাকে বিয়ে করেছিল পাঁচ হাজার টাকা নগদ নিয়ে। সেই পাঁচ হাজার আর সবিতার দেড় ভরি গয়না নিয়ে আর কিছু ধারকর্জ করে সাবিত্রীকে পার করল। তারপর বছর না ঘুরতেই সাবিত্রী গেল, তারপর লোকটাও গেল। রেখে গেল দুটো সন্তান।

ঘৃণা আর আক্রোশ ছাড়া সবিতা জীবনে কিছুই পায়নি। এখনও সে মানুষের কাছ থেকে তাই পায় এবং তাতেই স্বস্তি বোধ করে। মানুষ তাকে দয়া বা করুণা করলেই বরং সে ভয়ঙ্কর অস্বস্তি বা অপমান বোধ করে। ও তার অভ্যস্ত জিনিস।

তথাকথিত স্বামীর মৃত্যুর পর সবিতা তথাকথিত বিধবা হল। সধবা আর বিধবার তফাত সামান্যই। দুর্দশা বা দুর্গতি যেমন ছিল তেমনই রইল। দুটো সন্তান তার কোনও ভালোবাসার ফসল নয়। তবু সন্তান আঁকড়েই বেঁচে থাকার একটা চেষ্টা করতে হলো তাকে। লেখাপড়া জানা নেই, কোনও হাতের কাজটাজও শেখেনি, চাকরিটা হবে কীসে? সবিতা কারও কাছে হাত পাতল, অযাচিত সাহায্য ফিরিয়ে দিল এবং চাকরি খুঁজতে লাগল। মেয়েটা ছয় বছরের, ছেলেটার পাঁচ। ছয় বছরের মেয়ে প্রয়োজনের তাগিদে শিশু বয়সেই সাবালিকার মতো দায়িত্ব নিতে শিখে গেল। প্রয়োজনে মানুষ সব পারে। তার হেফাজতে ছেলেকে রেখে সবিতা বাইরে বেরুতে লাগল। কাজ জুটল আয়ার। এক হাসপাতালে।

আয়ার কাজে বাঁধা বাইনে নেই। কাজ পেলে বাঁধা রেটে টাকা। কখনও-সখনও বকশিস বা শাড়িটা জামাটা পাওয়া যায়। গ্রাসাচ্ছাদন চলে বটে তার। কিন্তু এত কষ্ট যে বলার নয়। সবিতাকে পাঁচ-দশ পয়সারও হিসেব করে চলতে হয়। অসুখ–বিসুখ হলে অগাধ জল।

তার তথাকথিত স্বামী বাড়িটাই যা রেখে গেছেন। ছোট এবং পুরোনো দু-ঘরের এই বাড়িটুকুই এই গোটা দুনিয়ায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তবে পাড়া–পড়শিরা অনেকেই তাকে ভয় দেখায়, আছ তো বাপু ভালোই, কিন্তু লাচ্চু যদি ফিরে আসে তা হলে এই বাড়িতে কি থাকতে পারবে? সে তোমাকে তাড়িয়ে ছাড়বে। ভীষণ বদমাশ ছেলে। লাচ্চুর কথা সে তার তথাকথিত স্বামীর কাছে শুনেছে। হ্যাঁ, লাচ্চু মস্ত দাবিদার। যদি ফিরে আসে এবং সবিতাকে তাড়ায় তাহলে সে কোথায় যাবে তা ভেবে পায় না। এই একটা ভয় তার আছে। লাচ্চু। কেউ কেউ বলে, সে সাধু হয়ে গেছে, কেউ বলে মরে গেছে, কেউ বলে সে জীবনে উন্নতি করে ফেলেছে। লাচ্ছ্বর আসল খবর কারও জানা নেই। এবং সেইটেই চিন্তা এবং ভয়ের বিষয়।

পাশের বাড়িটা পরেশ সাহার। পরেশবাবু ইদানীং হঠাৎ ব্যাবসা–বাণিজ্যে উন্নতি করেছে। ইদানীং তিনি মাঝে-মাঝে সবিতার কাছে বাড়িটা কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। দামটা খারাপ দেবেন না। কিন্তু সবিতা রাজি হয়নি। তার কারণ টাকা সে রাখতে পারবে না। মাঝখান থেকে পৃথিবীর শেষ আশ্রয়টুকু হাতছাড়া হবে। তার ওপর এ বাড়ি তো তার একার নয়। লাচ্ছ্বরও ভাগ আছে। পরেশবাবু অবশ্য বলেছেন, লাচ্চু বেঁচে নেই বউমা। যদি থাকে তা হলে তার দায় আমার। আমি ওর সঙ্গে বুঝে নেব।

পরেশ সাহাকে ইদানীং একটু ভয় পাচ্ছে সবিতা। টাকার ক্ষমতা যে অনেক তা সে জানে। পারেশ সাহা ইচ্ছে করলে তাকে যে-কোনও উপায়ে উচ্ছেদ করে দিতে পারে।

কিন্তু সবিতা তো কখনও স্বস্তিতে থাকেনি। তার সারা জীবনটাই তো নানা বিরুদ্ধতার সঙ্গে বেঁচে থাকা মাত্র। ভয় সে পায় বটে, কিন্তু খুব একটা অসহায় বোধ করে না। বস্তি আছে, ফুটপাত আছে। বাচ্চা দুটোকে নিয়েই যা চিন্তা।

খুব সম্প্রতি মাত্র দুদিন আগে পরেশ সাহার লোক বাসু বলে একটা ছেলে এসেছিল। সে একটু চোখ রাঙিয়ে গেছে। সবিতা বুঝতে পারছে বাড়িটা হয়তো সে রাখতে পারবে না। আজ সে তাই বস্তিতে ঘর দেখতে গিয়েছিল।

সন্ধেবেলা ফিরে সে এখন জিরোচ্ছে একটু। মেয়েটা পড়তে বসেছে। ছেলেটা তার কাছ ঘেঁষে বসে আছে। তার ছেলে এবং মেয়ে দুজনেই শান্ত। ওইটুকু বাচ্চা, তবু তারা মায়ের শ্রান্তি ক্লান্তি হতাশা এবং মেজাজ টের পায়।

দরজায় কড়া নড়তেই মেয়েটা উঠে গিয়ে খিল খুলল।

দরজার বাইরে একজন ভালো পোশাক–পরা যুবক দাঁড়িয়ে। দাড়ি আছে, গোঁফ আছে, চোখে কালচে চশমা, হাতে একটা স্যুটকেস।

বলল , ভিতরে আসতে পারি?

সবিতার চোর ডাকাতের ভয় নেই। চোর এলে বরং সবিতার পক্ষে লজ্জারই ব্যাপার। তবে এরকম সম্রান্ত চেহারার যুবককে দেখে সন্ত্রস্ত হল। তাড়াতাড়ি উঠে বলল , আসুন।

ছেলেটা ঘুরে ঢুকে বলল , আমি কিছু প্রোডাক্ট নিয়ে এসেছি। সবিতা বলল , তার মানে? ছোঁকরা স্যুটকেসটা নড়বড়ে টেবিলটার ওপর রেখে খুলে ফেলল। তারপর একগাদা জিনিস বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে লাগল। চকোলেট বার, সিরিয়াল, টিনের দুধ, খেলনা, সেন্ট, সাবান কত কী।

সবিতা সভয়ে বলল , এসব কী!

ছেলেটা হেসে বলল , আমি একটা বড় কোম্পানির সেলসম্যান। আমরা এসব জিনিস তৈরি করি। এগুলো ফ্রি স্যাম্পল। আপনাকে দাম দিতে হবে না। যদি ব্যবহার করে পছন্দ হয় তবেই কিনবেন।

সবিতা কাঁদো–কাঁদো হয়ে বলল , আমরা বড় গরিব। ওসব জিনিস কেনার সাধ্য আমাদের নেই। আপনি নিয়ে যান।

ছেলেটা হেসে বলল , তাতে কী? না কিনলে, না কিনবেন। কোম্পানি তো এগুলো ফ্রি–ই দিচ্ছে।

ছেলেটা চারদিকে একটু চেয়ে বলল , এটা কি আপনার বাড়ি?

হ্যাঁ, একরকম তাই। আমার স্বামীর বাড়ি। তবে কতদিন রাখতে পারব জানি না।

কেন বলুন তো?

আমরা গরিব তো, পয়সাওয়ালারা তুলে দিতে চাইছে। অনাথা বিধবা, কিছু তো করার নেই।

ও! আচ্ছা, আজ আসি।

ছেলেটা চলে যাওয়ার পর সবিতা টেবিলের কাছে এসে যা দেখল তাতে তার চোখ চড়কগাছ। মাখন, চিজ থেকে শুরু করে বিস্কুট, টিনের খাবার, এসব ছাড়াও একটা হাতঘড়ি অবধি দিয়ে গেছে। এরকম হয় নাকি? সে স্বপ্ন দেখছে না তো!

ছেলেমেয়েরা জীবনে এত সুখাদ্য খায়নি। সবিতার রাতে ভালো করে ঘুম হল না। বারবার ছেলেটার দাড়িওলা মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে।

দুদিন বাদে পরেশ সাহা এক সকালে এসে হাজির। মুখে বিরক্তি। বউমা, এসব কী? বাড়ি বিক্রি করবে না তা সাফ জানিয়ে দিলেই হত। পুলিশে খবর দিতে গেলে কেন?

সবিতা অবাক হয়ে বলল , খবর দিইনি তো!

না দিলে তারা এসে আমাকে এমনি শাসিয়ে যায়?

আরও দিনসাতেক পরে ছেলেটা এক সন্ধেবেলা এসে হাজির। আজও হাতে স্যুটকেস।

সবিতা তাড়াতাড়ি ছেলেটাকে একটা চেয়ার পেতে বসতে দিয়ে বলল , সেদিন আপনি ভুল করে একটা ঘড়ি রেখে গেছেন।

না, ভুল করে নয়।

ভুল করে নয়?

না, ভুল করে রাখব কেন?

আপনার কোম্পানি কি ঘড়িও তৈরি করে?

ছেলেটা হেসে বলল , না। তবে সেলস প্রমোশনের জন্য কাস্টমারকে ছোটখাটো উপহার দেওয়া হয়।

কিন্তু আমি তো কাস্টমার নই!

আমরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে কাজ করি। আপনার নাম আমাদের কম্পিউটারই সাজেস্ট করেছে।

এসব কথার অর্থ জানে না সবিতা। তবে সে আজ এই সুঠাম যুবকটিকে ভালো করে দেখল। স্বাস্থ্যবান, ছমছমে চেহারা, সবিতার মতোই বয়স হবে। হ্যাঁ, এরকম একটি যুবকের সঙ্গেই তো বিয়ে হতে পারত তার। এক অক্ষম, গরিব, বৃদ্ধ দোজবরের সঙ্গে নামমাত্র বিয়ে কেন হল তার? সবিতার ব্যর্থ যৌবন কোনও পুরুষকেই আকাঙ্ক্ষা করতে পারেনি ভয়ে। আজ অযাচিত সাহায্যকারী এই যুবকের দিকে মুগ্ধ চোখে একটু চেয়ে রইল সে। লাচ্ছ্বও চেয়ে ছিল। মহিলার বয়স ত্রিশ-একত্রিশ হতে পারে। দারিদ্র্যের অবশ্যম্ভাবী রসকষহীনতাকে বাদ দিলে মহিলা সুশ্রীই। স্বাস্থ্য ফিরলে এঁর রূপ উপেক্ষা করার মতো হবে না।

লাচ্চু স্যুটকেস খুলে বলল , আজ কিন্তু পোশাক–আশাক আছে। রেখে যাচ্ছি।

যেসব জিনিস স্যুটকেস থেকে বেরোল তা দেখে আতঙ্কিত সবিতা বলল , এসব কী করছেন? আমাকে বিক্রি করলেও যে দাম উঠবে না।

কয়েকটা শাড়ি, ফ্রক, জামা-প্যান্ট নামাল লাচ্চু। তারপর সবিতার দিকে ফিরে বলল , আপনার বাড়িটার সংস্কার দরকার।

হ্যাঁ। কিন্তু আমার সাধ্য তো নেই।

শুনুন। আমাদের ফার্মটা হচ্ছে ফ্রেন্ড অফ দি আনলাকিজ। অর্থাৎ যাদের ভাগ্য খারাপ আমাদের ফার্ম তাদের সাহায্য করে। কিন্তু সেটা দয়া বা করুণা নয়। আপনাকে কোম্পানির তরফ থেকে কুড়ি হাজার টাকার একটা লোন দিয়ে যাচ্ছি। এখন নয়, দশ বছর পর থেকে আপনি লোনটা ধীরে-ধীরে শোধ করবেন।

সবিতার কেমন যেন ধন্ধ লাগছিল। সে হঠাৎ বলল , আমার এসব কথা কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে। না। এরকম হয় না।

হয়। হবে না কেন?

সবিতার আত্মসম্মানবোধ প্রবল। কিন্তু এই সুঠাম যুবকটির দিকে চেয়ে আজ তার বুকে একটা অদ্ভুত দোলা আর আবেগ কাজ করছে। সে একে প্রত্যাখ্যান করতে পারছে না। সবিতার চোখে জল এল। সে লিত কণ্ঠে বলল , আপনি আমাকে দয়া করছেন।

একদম নয়। আমার সঙ্গে লোনের কাগজপত্র আছে। আপনি পড়ে সই করে দিন।

একটুও বিশ্বাস করল না সে ছেলেটাকে। কিন্তু এক চোরা আনন্দে বুক ভেসে যাচ্ছিল তার। এমনকী হতে পারে যে, এই যুবক তার প্রেমে পড়েছে? সবিতা সই করল এবং করকরে কুড়ি হাজার টাকা নিল।

দুদিন বাদে ছেলেটা একটা ঝকঝকে গাড়ি নিয়ে এল সকালবেলায়।

চলুন, আপনাদের একটু আউটিং–এ নিয়ে যাই।

সবিতা মুচকি হেসে বলল , এটাও কি সেলস প্রমোশন?

হ্যাঁ, এ সবই সেলস প্রমোশন।

ছেলেটার দেওয়া নতুন শাড়ি পরল সবিতা, বাচ্চাদেরও সাজিয়ে নিল। এবং জন্মে যা কখনও করেনি আজ তাও করল সে, একটু সাজল। চোখে কাজল, কপালে টিপ।

ছেলেটা নিজেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়। রেস্টুরেন্টে দারুণ খাওয়াল এবং কিনে দিল আরও নানা দামি উপহার। সেই উপহারের মধ্যে সবিতার জন্য চার ভরি সোনার একটা হার, চার গাছা সলিড সোনার চুড়ি এবং বাচ্চাদের জন্য হার আর আংটি।

সবিতা বারণ করার অনেক চেষ্টা করেও পারল না। ঠিক কথা আজ সবিতা অনেকটা বিবশ, রসস্থ। সে তেমন দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতেও পারল না। তার মনে হচ্ছে, তার জীবনে এই প্রথম একজন সত্যিকারের পুরুষের সবল প্রবেশ ঘটছে। সে ঠেকাবে কেন সেই অনুপ্রবেশ? জীবনে সে তো কিছুই পায়নি।

বিকেলে তারা একটা থিয়েটার দেখল। বাচ্চাদের একপাশে রেখে সবিতা ইচ্ছে করেই ছেলেটার পাশে বসল। অন্ধকারে সে ইচ্ছে করেই হাত ধরল ছেলেটার। ধরে রইল।

ছেলেটা আসতে লাগল ঘন ঘন। সবিতার এখন পুষ্টিকর খাবারের অভাব হচ্ছে না। বাড়িটার শ্রী ফিরেছে। বেশ ভালো সময় যাচ্ছে তার। তবে ছেলেটা কখনও প্রেমের কথা বলে না। তাকায় আর হাসে। সবিতার কাছে তাই যথেষ্ট।

সবিতা এক সন্ধেবেলা একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে বলল , তুমি কি আমার কাছে কিছু চাও? চাইলে মুখ ফুটে বলো না কেন?

৩.

লাচ্চু একেবারে একটা খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে। লাফ দেবে? সম্পর্কটা সংস্কার ছাড়া আর কী? এই ভদ্রমহিলাকে তার বৃদ্ধ বাবা অন্যায়ভাবে বিয়ে করেছিল। সেই অন্যায়কে স্বীকৃতি না। দিলে ক্ষতি কী? দুনিয়া তো চলেছে সংস্কার ভাঙার দিকেই। সবিতাকে কয়েকদিন দেখে তার

মেয়েদের সম্পর্কে অনেক বদ্ধমূল ধারণা ভেঙে গেছে। দারিদ্র্য, অপমান, অবিচার সয়ে বড় হওয়া এই মহিলা যেমন সাহসী–তেমন সহনশীলা। লাচ্চু কি চোখ বুজে লাফটা দেবে? আমেরিকার মুক্ত সমাজে সব চলে। অতীত লুপ্ত হয়ে যাবে। দেবে লাফ?

লাচ্চুর অতীত বলতে যা, সেটা মনে না রাখলেও চলে। সব ভুলে যাওয়া যায়। একটা দুটো কথা মাঝে-মাঝে হানা দেবে ঠিকই। কিন্তু ওসব মাছির মতো উড়িয়ে দেওয়া যাবে। নতুন একটা সম্পর্ক হোক।

সন্ধেবেলা লাচ্চু গিয়ে দেখল আজ বাড়িটা একটু সাজানো হয়েছে। টেবিলের ওপর তার। বাবার ছবি বসানো, গলায় মালা, সামনে ধূপ জ্বলছে।

এসব কী? সবিতা একটু লজ্জা পেয়ে বলল , বিলু তার বাবার জন্মদিন পালন করছে। আজ কি বাবার জন্মদিন?

হ্যাঁ। এসব বিলুই মনে রাখে। বাবাকে খুব ভালোবাসত তো? আঠাশে কার্তিক কবে আসে ঠিক হিসেব রাখে।

ও।

ওর বাবা ওকে বলত একটা ছেলে ছিল, একটা মেয়ে, কাউকেই আদর দিতে পারিনি। দুটোই হারিয়ে গেল। তোরা হারিয়ে যাস না। আমাকে মনে রাখিস। শোনো, আজ তুমি এখানেই খেয়ে নাও। রান্না করছি।

লাচ্চু খেল। মাথা নীচু করে, শক্ত হয়ে এবং কথা না বলে। এ-বাড়িতে বাবার একটা ছবি ছিল, এটা খেয়াল ছিল না তার। টেবিলের ওপর বাবার গড়ানে বয়সের ছবি থেকে একজোড়া চোখ তাকে স্থির দৃষ্টিতে দেখছিল।

একটা ছবি সব ভণ্ডুল করে দিল নাকি? বড় গ্লানি লাগছে যে ভিতরে।

লাচ্চু পরদিন রাতে প্লেন ধরল। ফিরে এল নিউইয়র্কে তার কুইনসের বাড়িতে। চুপচাপ এবং একা কাটাল দুটো দিন। তারপর সাহস করে একটা এয়ারোগ্রাম বের করে সবিতার ঠিকানায় লিখল। তারপর আরও একটু সাহস করে পাঠ লিখল, শ্রীচরণেষু মা….

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi